বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান বৈশিষ্ট্য গণহত্যা। গত কয়েক দশক গণহত্যার বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। শুধু বিদেশেই নয় স্বদেশেও। এর একটি কারণ, বাংলাদেশের গণহত্যা সম্পর্কে পাশ্চাত্যের নীরবতা এবং স্বদেশেও এ বিষয়ে আলোচনার অনীহা। যে কারণে, বাংলাদেশের গণহত্যায় কত মানুষ প্রাণ হারিয়ে ছিলেন সে সম্পর্কেও বিতর্কের অবতারণা করা হয়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পগ্রোম বা ভিয়েতনামের মাইলাই নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা হয়েছে। বসনিয়া, হার্র্জিগোভিনা, কম্বোডিয়া, রুয়ান্ডা প্রভৃতি দেশের গণহত্যাও ব্যাপক আলোচিত এবং সেই সব আলোচনা ও বিতর্কের ফলে গণহত্যাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ বলে গণনা করা হচ্ছে এবং অপরাধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আদালতও গঠিত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে খুব বেশি একটা কেউ আলোচনা করতে চান না। এর কারণ খুঁজতে গেলে ১৯৭১ সালের পরিস্থিতি আলোচনা করতে হবে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সমর্থন করেনি আমেরিকা, চীন, সৌদি আরব ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশসমূহ। তারা গণহত্যাকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। স্বপ্নেও তারা ভাবেনি, লুঙ্গিপরা, থ্রি নট থ্রি সম্বল করে গরিব জীর্ণশীর্ণ মানুষগুলো জিততে পারবে। কিন্তু বাঙালীরা জিতেছিল। এই পরাজয় তাদের আত্মগরিমায় আঘাত করেছে। গণহত্যা যেহেতু অপরাধ এবং এ নিয়ে বেশি আলোচনা করলে আমেরিকা, চীন, সৌদি আরবসহ ও পাকিস্তান সমর্থনকারী দেশগুলোর ওপর গণহত্যার দায় বর্তায়। সে কারণে, গণহত্যা নিয়ে আলোচনা তারা করেনি।
অন্যদিকে, ১৯৭৫ সালে ক্ষমতা দখল করে জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের সেই গণহত্যাকারীদেরই ক্ষমতায় আনেন। সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধি হিসেবে জিয়া-এরশাদ-খালেদা-নিজামী ২৫ বছরের ওপর প্রায় একাধিক্রমে বাংলাদেশ শাসন করেছে। গণহত্যা দূরে থাকুক তখন ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল যে, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল।
বাংলাদেশে নির্মূল কমিটির নেতৃত্বে যখন যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি প্রাধান্য পেল জাতীয় রাজনীতি তখন গণহত্যা ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্যাতন ও নারী ধর্ষণের বিষয়টিও নিয়ে বিতর্ক শুরু হলো। গণহত্যা বিষয়ে বলা হলো, শেখ মুজিবুর রহমান তো ইংরেজী তেমন জানতেন না। ইংরেজীতে সাক্ষাতকার দিতে গিয়ে থ্রি লাখকে থ্রি মিলিয়ন বলে ফেলেছিলেন। সেই থেকে বাংলাদেশের গণহত্যা সম্পর্কে চালু হয়ে গেল ত্রিশ লাখ বা থ্রি মিলিয়ন মারা গেছে। এটি কি সম্ভব? বিএনপি-জামায়াত সমর্থক ‘বুদ্ধিজীবী’রা এ বিষয়টিকে বিভিন্নভাবে উস্কে দিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর কথায় ত্রিশ লাখ শহীদের কথা চালু হয়নি। ত্রিশ লাখ শহীদের কথা প্রথম উল্লেখ করা হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র প্রাভদায়। এর পর অস্ট্রেলিয়া বেতার থেকেও খুব সম্ভব একই কথা বলা হয়েছিল। সেই থেকে গণহত্যায় ত্রিশ লাখের কথা বলা হয়।
নারী নির্যাতন নিয়ে সুভাষচন্দ্র বসুর নাতনি শর্মিলা বসু বিতর্ক ছড়িয়ে দেন। ১৯৭১ সালে ও তার পর পাকিস্তানীরা যা বলতেন, শর্মিলাও একই কথা বলা শুরু করেন। তিনি বলতে থাকেন এবং মস্ত বই লিখে ‘প্রমাণ’ করার চেষ্টা করলেন যে, বাংলাদেশে মাত্র ৩০০০ নারী ধর্ষিত হয়েছেন। এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকেই অপমান। আসলে শর্মিলাদের মতো পাকিস্তানীমনাদের পাঞ্জাবী সৈনিকদের হাতে তুলে দিলে তারা বুঝতে পারত ধর্ষণ কী? ধর্ষণের অপমান আর্তি কী? ধর্ষণের যে সংখ্যা ১৯৭১ সালে বলা হতো এখন তা চার ভাগের এক ভাগে চলে এসেছে।
এভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আক্রান্ত হচ্ছে। এবং এর বিরুদ্ধে যথাযোগ্য উত্তর দেয়ার লোকের সংখ্যাও কমে গেছে। এ ছাড়া আমাদের মানসিকতায় বীরত্ব বড় ব্যাপার। গণহত্যা, নির্যাতন, লাঞ্ছনা নয়। সে কারণে বলব, বাংলাদেশের গণহত্যা, নির্যাতন ও নারী ধর্ষণের যে ইতিহাস ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছেÑ তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মানসিকতা গড়ে তোলা বাঞ্ছনীয়। এ বিষয়ে পরে আবার আলোচনা করব। তবে, এই মানসিকতার সূত্রপাত নিয়ে প্রথম আলোচনা করা যাক।
॥ ২ ॥
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ইতোমধ্যে সহস্রাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর অধিকাংশই স্মৃতিকথা, দিনলিপি, যুদ্ধের বিবরণ প্রভৃতি। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের, অহঙ্কারের দিকটি যত আলোচিত হয়েছে সে মাত্রায় হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর অত্যাচার, নারী নির্যাতন, গণহত্যার দিকগুলো রয়ে গেছে উপেক্ষিত।
আসলে বাঙালী ভালবাসে বীরত্বগাথা। এর একটি কারণ বোধহয়, ক্ষুদ্র এক ব-দ্বীপে তার বসবাস। মাত্র কিছুদিন হলো বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। সে দেখেছে আশপাশে নির্যাতিত, গরিব, ক্ষুদ্র সব মানুষ। চিন্তুার জগতটাই তার ছোট। তাই সাহসী কাউকে দেখলেই সে চমৎকৃত হয়। সে সবসময় বীরের কথা বলতে চায়, যদি সে বীর হয় ‘ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়ে চলিল’ -এর মতোও। এ যাবত প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বইপত্র দেখলে এ কথাটি আরও স্পষ্ট হবে। শুধু রণগাথা, বীরত্বের ব্যঞ্জনা। না, নির্যাতন, অত্যাচারের কথা তেমন নেই। এ ইঙ্গিতও নেই কোথাও যে, অত্যাচার ও বীরত্বও এই সূত্রে গাঁথা। মানুষ অত্যাচারিত হয়, নিপীড়িত হয়, বিদ্রোহ করে এবং তার পর অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে লড়াই করে। মুক্তিযুদ্ধ কি তাই নয়? পাকিস্তানের কলোনির অধিবাসী হিসেবে বাঙালী অপমানিত, শোষিত হয়েছে, ১৯৭১-এর শুরু থেকে অত্যাচারিত হয়েছে, তারা রুখে দাঁড়িয়েছে অপমানের প্রতিশোধ নিতে। লড়াই করেছে বীরের মতো। তাই শুধু বীরত্ব যদি হয় ইতিহাসের গাথা তাহলে পটভূমিকা থাকে অস্পষ্ট, অজানা সেই বীরত্বের ব্যঞ্জনাও হারিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের গাথা কি কম রচিত হয়েছেÑ কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গান বা ইতিহাসে? কিন্তু বীরত্বের গাথা কতটুকু মনে রেখেছে বাঙালী? মনে রাখলেও রেখেছে খুব অস্পষ্টভাবে। স্পষ্টভাবে রাখলে তো বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী রাজাকার হতো না। ‘আলবদর মাওলানা’ মান্নান (প্রয়াত) বা গোলাম আযম তো ১৯৭১ সালের পর প্রকাশ্যে ঘুরেফিরে বেড়াতে পারত না। কারণ, এই বীরত্বের পটভূমিকাটি সবসময় স্পষ্ট হয়নি, অনবরত বলা হয়নি এটি নতুন প্রজন্মের কাছে।
তাছাড়া বাঙালীর কন্ট্রাডিকশনের আরেকটি দিক উল্লেখ্য। বাঙালী আবার কোন বীরকে বেশিদিন সহ্য করতে পারে না। প্রথম সুযোগে তাকে ধুলায় ফেলে দিতে বাঙালী কার্পণ্য করে না। এ ধরনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য খুব কম জাতিরই আছে। কিন্তু বাঙালী যেহেতু মানুষ এবং মানুষ আর কিছু না হলেও অত্যাচার-অপমানের কথাটা মনে রাখে। বাঙালীরও তাই আর কিছু না হোক অত্যাচারের কথাটা মনে থেকেছে। গ্রামেগঞ্জে ঘুরলে এ কথাটা টের পাওয়া যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে উপন্যাস, গল্প থেকে কবিতা, প্রবন্ধ থেকে গান সবখানে কি বার বার ঘুরেফিরে আসে না হিটলারের সেই ক্রুর মুখ আর গুলির শব্দ। ইউরোপের শহরে-বন্দরে কি এখনও চোখে পড়ে না ফ্যাসিস্ট বা নাৎসিদের বীভৎসতার স্মারক? এর কারণ, সেখানে বীরত্বের গাথা যেমন রচিত হয়েছে, তেমনি সঙ্গে সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে অত্যাচারের গাথাও এবং তা বর্ণিত হয়েছে প্রবলভাবে, জোরালোভাবে, যা এখনও মর্মমূল কাঁপিয়ে দেয়। যে কারণে এখনও অসীম ধৈর্যের সঙ্গে নির্মিত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় অসামান্য সব চলচ্চিত্র। নির্মিত হয় ‘গণহত্যা’ জাদুঘর। জেনেশুনে ইউরোপ সে কথা মনে রেখেছিল যেÑ মানুষ সব ভুলতে পারে কিন্তু অত্যাচার-অপমানের কথা ভোলে না।
আমরা আবার অনেক সময় অত্যাচারকে মনে করি অপমান। আমাদের মনস্তাত্ত্বিক গড়নে এ ধরনের হীনম্মন্যতা সব সময় ছিল এবং আছে। উদাহরণ দেয়া যাক একজন শিক্ষককে পাঁচজন ছাত্র এসে পিটিয়ে গেল বা একজন তরুণীকে দু’জন মিলে ধর্ষণ করল, তাতে ঢি-ঢি পড়ে গেল। সমাজ এ সব ঘটনাকে ব্যক্তির অপমান হিসেবে চিহ্নিত করে লুকোতে চায়। ঘটনাটি উল্টো করে দেখি না-কেন? পাঁচজন একজনকে পেটাল, যাকে পেটাল তার অপমান হয় না, বরং ভীরুতা প্রমাণিত হয় পাঁচজনের এবং সেই ভীরুতা হলো অপমান। দু’জন এক তরুণীকে ধর্ষণ করলে তরুণীটি কেন অপমানিত হবে? অপমানিত হবে যারা তাকে রক্ষা করতে পারেনি, অর্থাৎ আশপাশের মানুষ, পাড়া-প্রতিবেশী, সমাজ। কারণ, তাদের ভীরুতার কারণেই তরুণীটি ধর্ষিত হয়েছে। অপমানিত হবে সে সব পরিবার, যে সব পরিবারে ধর্ষকরা বড় হয়েছে, কিন্তু মানুষ হয়নি। কারণ, সে সব পরিবার তাদের শেখায়নি সভ্য সমাজে কিভাবে বসবাস করতে হয়।
এ পরিপ্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে, মুক্তিযুদ্ধের গৌরব আর অহঙ্কারের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের মধ্যে আত্মশ্লাঘার সঞ্চার করে নিশ্চিতভাবে কিন্তু অপমানের বা নির্যাতনের ঘটনার আবেদনও কিছুমাত্র কম নয়। বরং অপমানের ঘটনা জাতির অনুভূতিতে যে গভীর ক্ষত এবং তা যে সংহতি গড়ে তুলতে পারে, তা গৌরবের আনন্দ দিয়ে সম্ভব নাও হতে পারে। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধের অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত বা অনালোচিত বিষয়ের উপাত্ত সংগ্রহে মনোনিবেশ করা দরকার। মুক্তিযুদ্ধের কম আলোচিত দিকগুলোর একটি হচ্ছে গণহত্যা। পাকবাহিনী একাত্তরে শহর থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামপর্যন্ত অগণিত গণহত্যা চালায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ সব গণহত্যার শিকার নিম্নবর্ণের মানুষ যাদের পরিচয় পাওয়া যায় না। কারণ, তাঁরা ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, যুক্তিযুদ্ধে তাঁদের অবদানের উপযুক্ত মূল্যায়ন হয় না। ওয়াহিদুল হক ‘জাহানারা ইমাম স্মারক’ বক্তৃতায় যথার্থই বলেছেন যে স্বাধীনতার চেতনার মধ্যে ‘গণহত্যার চেতনা’ প্রধান, ‘গণহত্যাকে, ত্রিশ লাখের বলিকে প্রায় চার লাখ বাঙালী নারীর সম্ভ্রম আহূতিকে ভুলতে পারলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কিছুই বাকি থাকে না। মুক্তিযুদ্ধের আদিতে আরম্ভ এই দিনে গড় দশ হাজার বাঙালী নিধনের নিরন্তর মোচ্ছব, একে ভুলিয়ে দিয়েই আরম্ভ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উৎসাধন।...একমাত্র গণহত্যার চেতনাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিকষিত হেমে পরিণত করতে পারে।
এক সময় কোন একদিকে আযানের শব্দ শুনতে পেলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে আরও কয়েকদিকে আযান শোনা গেল। মনে হলো আযানের এমন করুণ সুর- এত বিষণœ সুর আর কোনদিন শুনিনি। গোলাগুলির শব্দ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল কিন্তু বন্ধ ছিল মুহূর্তের জন্য মাত্র। আবার চলল গোলাগুলি পুরোদমে। ভোরের দিকে মাইকে কারফিউ জারির ঘোষণা শুনলাম। তখন ভাবলাম বেলা হলে বোধ হয় এমন নির্বিচারে আর মারবে না। কিন্তু একটু ফর্সা হয়ে যেতেই দেখা গেল এখানে সেখানে পালিয়ে থাকা ছাত্রদের ধরে এনে গুলি করছে। যেন দেখতে না পায় আমাকে এ ভাবেই মাথা নিচু করে লেট্রিনের মধ্যে বসে রইলাম।
বেলা হলো। এক সময় আমার কাছাকাছি বারান্দায় অনেকের কথা শুনতে পেলাম। ছাত্ররা কথা বলছে তা নিশ্চিত হয়ে আমি লেট্রিনের দরজা খুলে বেরুলাম। বেরিয়েই দেখি সিঁড়ির মাথায় মেশিনগান তাক করে মিলিটারি দাঁড়িয়ে আছে আর কয়েকজন ছাত্র একটি লাশ ধরাধরি করে নামাবার চেষ্টা করছে। রাতে আমার মাথার কাছে দেয়ালের ওপাশে যে গোংগাচ্ছিল এটা তারই লাশ। এবং সে আর কেউ নয়, আমাদের হলের দারোয়ান সবার প্রিয় প্রিয়নাথ দা। তাঁকে দিয়ে মেশিনগানের মুখে সব পথ দেখে নিয়ে নামার মুহূর্তে এখানে গুলি করে রেখে গেছে। আমিও আর নিষ্কৃতি পেলাম না।
আমাকে ধরতে হয় লাশ। তিন তলা থেকে দোতলা, সেখান থেকে একতলা এবং একতলার দক্ষিণ দিকের ভাঙ্গা গেট দিয়ে ব্যাংকের (এখন যেটা সুধীরের কেন্টিন; ওটা ছিল ন্যাশনাল ব্যাংক অফ পাকিস্তান) উত্তর পাশে নিয়ে রাখলাম। আরো লাশ জড়ো করা হলো সেখানে। ওখানে আমাদের বসার নির্দেশ দিল একজন পাক সেনা।
তখন ছিলাম আমরা কয়েকজন ছাত্র, কয়েকজন মালী, লন্ড্রির কয়েকজন, দারোয়ান গয়ানাথের দুই ছেলে- শংকর ও তার বড় ভাই আর সবাই ছিল সুইপার। লাশগুলোর পাশ ঘিরে আমরা সবাই বসেছিলাম। সুইপারগুলো ওদের ভাষায় মিলিটারিদের কাছে অনুরোধ করছিল ওদের ছেড়ে দেবার জন্য। বলছিল ওরা বাঙালী নয়। সুতরাং ওদের কি দোষ? একজন মিলিটারি ওদের আলাদা হয়ে বসতে বলল। আমাদের কাছ থেকে ওদের নিয়ে কয়েকজন মিলিটারি সোজা উত্তর বাড়ির মাঠে চলে গেল। ভাবলাম ওদের ছেড়ে দেবে। আমাদের আবার লাশগুলো বহন করতে আদেশ দিল। লাশগুলো নিয়ে এসেমব্লির সামনের রাস্তা দিয়ে সোজা পূর্ব দিকে গেটের বাইরে চলে গেলাম। গেটের বাইরে দক্ষিণ পাশে একটি বড় গাছের গোড়ায় জড়ো করলাম লাশগুলো। এই সময় আমাদের সঙ্গে প্রায় সমান সংখ্যক মিলিটারি ছিল। এবং তারা সবাই ছিল আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। ওখানে গিয়ে মিলিটারিরা দাঁড়াল অনেক্ষণ। একজন সিগারেট বের করে দিল সবাইকে। আমাদের কেউ বসে, কেউ শুয়ে থাকল। আমিও কাত হয়ে ছিলাম গাছের শিকড়ের ওপর। এইখানে পাক সেনারা আমাদের উদ্দেশে বিশ্রী ও অকথ্য ভাষায় ক্রমাগত গালাগালি করছিল। যতটা বুঝতে পারছিলাম তাতে বুঝলাম, শালা বাংলাদেশ স্বাধীন করিয়ে দেব, বল একবার শালার জয় বাংলা শেখ মুজিবকেও বাংলাদেশের স্বাধীন করিয়ে দেব। আরও নানা অশ্লীল গালাগালি দিচ্ছিল। এ সময় গাড়ির বহর রেসকোর্সের দিক থেকে এসে ওখানে থামল। আমাদের সঙ্গের মিলিটারির একজন সামনের একটি জীপের কাছে গেল। তাকে কিছু নির্দেশ দেয়া হলো। সেখান থেকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে বিভিন্ন দিকে নিয়ে গেল লাশ বয়ে আনতে। আমাদের অংশটিকে নিয়ে গেল ড. গুহ ঠাকুরতা যে কোয়ার্টারে থাকতেন সেই দিকে। সেই বিল্ডিংয়ের সিঁড়ির কাছে অনেক লাশ পড়েছিল, সিঁড়ির কাছে এনে গুলি করেছে বোঝা গেল। একটি লাশ দেখলাম সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা, মাথায় টুপি, পাতলা চেহারা। সেখান থেকে নিয়ে গেল দোতলা, তিনতলা ও চারতলায় লাশ বয়ে আনতে। প্রতিটি তলায় ওরা খোঁজ নিচ্ছিল কোন জীবিত প্রাণী আছে কি না। আর খুঁজছিল দামী মালামাল, ঘড়ি, সোনা-দানা ইত্যাদি। চারতলায় একটি রুমে ঢুকতে পারছিল না কারণ রুমের দরজা বন্ধ ছিল ভেতর থেকে। দরজা ওরা ভেঙ্গে ফেলল। ঢুকে কাউকে পাওয়া গেল না। কতকগুলো এলোমেলো কাপড় চোপড়, বিছানাপত্র ছাড়া কিছুই ছিল না সেখানে। একজনকে ছাদে উঠে কালো ও স্বাধীন বাংলার পতাকা নামাতে বলল। পতাকা নামিয়ে আনলে মিলিটারিদের একজন নিয়ে এলো সেগুলো। আমাদের নিচে নামতে বলল। নিচে নামলাম আমরা। সিঁড়ির কাছে লাশগুলো নিতে বলল। অনেক লাশ রাস্তায় আগেই জমা করা ছিল। বয়ে আনা লাশগুলোও জড়ো করলাম এ গুলোর লাশ পরে নিয়ে গেল। ঐ বিল্ডিংয়ের সামনের দোতলা বাংলো বাড়িটিতে (তখনকার এসএম হলের প্রভোস্টের বাড়ি) সামনে দিয়ে ঢুকতে না পেরে পেছন দিয়ে ঢুকলাম বাড়িতে। নিচতলার সব রুমেই খুঁজলাম। এলোমেলো কাপড় চোপড় স্যুটকেস, বাক্স, খোলা ফ্যান ছাড়া কিছুই দেখা গেল না সেখানে। মিলিটারিরা দামী জিনিসপত্র খুঁজে খুঁজে নিয়ে নিল। কোন লাশ কিংবা রক্তের দাগ ছিল না। ঐ দালানে নেমে আসলাম আমরা সবাই এবং জড়ো হলাম আবার লাশের কাছে। মিলিটারিরা কালো পতাকা ও স্বাধীন বাংলার পতাকা পোড়াল।
আমাদের আবার লাশ নিতে বলল। রাস্তা দিয়ে সোজা উত্তর দিকে অধ্যাপক গোবিন্দ দেবের বাসার সম্মুখ দিয়ে ইউওটিসি বিল্ডিংয়ের সামনে জগন্নাথ হলের মাঠের পূর্ব দিকের ভাঙ্গা দেয়াল দিয়ে ঢুকতে বলল। হলের মেইন বিল্ডিংয়ের সামনে শহীদ মিনারের সংলগ্ন লাশগুলোর কাছে জড়ো করতে লাগলাম লাশগুলো। লাশ যখন নিচ্ছিলাম তখন দেখলাম ড. দেবের বাসা থেকে বের করে নিয়ে আসছে সেলাইর মেশিন ও অন্যান্য ছোটখাটো মালপত্র। রাস্তার পাশে অনেক মিলিটারি ট্রাক যুদ্ধের বিভিন্ন সাজসরঞ্জাম নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। শিববাড়ীর রাস্তার তিনমাথায় অনেক মর্টার চতুর্দিকে তাক করে রেখেছিল।
দু’জন তিনজন করে আমরা এক একটা লাশ বহন করছিলাম। কোন জায়গায় বসলে কিংবা ধীরে ধীরে হাঁটলে গুলি করার জন্য তেড়ে আসছিল। সব সময়ই আমরা সবাই গা ঘেঁষে বসছিলাম ও চলছিলাম।
কতগুলো লাশ এভাবে বহন করছি ঠিক মনে নেই। শেষ যে লাশটা টেনেছিলাম তা ছিল দারোয়ান সুনীলের। তার শরীর তখনও গরম ছিল। অবশ্য রৌদ্রে থাকার জন্যও হতে পারে। লাশ নিয়ে মাঠের মাঝামাঝি যেতেই হঠাৎ কতগুলো মেয়েলোক চিৎকার করে উঠল। দেখি মাঠের দক্ষিণ দিকের বস্তিটির মেয়ে ছেলেরা মাঠের দিকে আসতে চাচ্ছে আর পাক সেনারা মেশিনগান নিয়ে ওদের তাড়াচ্ছে। সামনে চেয়ে দেখি সুইপারদের মাঠে এনে দাঁড় করিয়েছে গুলি করার জন্য। এই সুইপারদেরকেই ব্যাংকের কাছে আমাদের থেকে আলাদা করে এই মাঠে নিয়ে এসেছিল ওরা।
সুইপারদের গুলি করে মারছে আর ওই মেয়েছেলেরা চিৎকার করছে এবং ছুটে যেতে চাচ্ছে ওদিকে। বুঝলাম এবার আমাদের পালা। আমাদের আগে যারা লাশ নিয়ে পৌঁছেছিল তাদেরও দাঁড় করিয়েছে। তাদের মধ্যে একজন খুব জোরে জোরে শব্দ করে কোরানের আয়াত পড়ছিল। ব্যাংকের কাছে যখন বসেছিলাম তখন জেনেছি এই ছেলেটি জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। কিশোরগঞ্জে ছিল তার বাড়ি। আগের দিন বিকালে আর এক বন্ধুসহ এসে উঠেছিল তার হলের এক বন্ধুর রুমে। গুলি করল তাদের সবাইকে। আমরা কোন রকমে দুজনে লাশটা টানতে টানতে নিয়ে এসেছি। সামনেই দেখি ড. গোবিন্দ দেবের মৃতদেহ। ধুতিপরা, খালি গা। ক্ষতবিক্ষত ও বিকৃত সারা শরীর। পশ্চিম দিকে মাথা দিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে। আমার সঙ্গে যে ছেলেটি লাশ টানছিল সে গোবিন্দ দেবের লাশটি দেখে বলল, দেবকেও মেরেছে। তবে আমাদের আর মরতে ভয় কি? কি ভেবে, আমি দেবের লাশের পশ্চিম পাশ ঘেঁষে সুনীলের লাশসহ শুয়ে পরলাম। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে থাকার অবস্থা তখন আমার ছিল না। চোখ বুজে পড়ে থেকে ভাবছিলাম এই বুঝি লাথি মেরে তুলে গুলি করবে। এক সময় ভাবছিলাম তবে কি আমাকে গুলি করছে, আমার তখন কোন অনুভূতি নেই। কি হচ্ছিল বুঝতে পারছিলাম না। এই মরার মতো অবস্থায় কতক্ষণ কেটেছে বলতে পারি না। এক সময় আমার মাথার কাছে ছেলেমেয়েদের ও বাচ্চাদের কান্না শুনতে পেলাম। চোখ খুলে দেখি সুইপার, দারোয়ান ও মহিলাদের বাচ্চারা ও মেয়েছেলেগুলো মৃত স্বামী কিংবা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করছে। তখনও অনেকে মরেনি। কেউ পানি চাচ্ছে। তাদের কেউ কেউ পানি খাওয়াচ্ছে এই সময় দেখলাম এক একজন গুলি খেয়েও হামাগুড়ি দিয়ে শহীদ মিনারের পাশ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। মাথা তুলে দেখি যেদিকে মিলিটারির গাড়ি ও অসংখ্য মিলিটারি ছিল সেদিকে কোন গাড়ি বা মিলিটারি নেই। চতুর্দিকে একনজর দেখে নিয়ে মেয়েছেলে ও বাচ্চাদের মধ্যে দিয়ে নুয়ে নুয়ে বস্তির মধ্যে গেলাম। প্রথমে গিয়ে ঢুকি চিৎকালীর ঘরে। চিৎকালী ঘরে ছিল না। এক মহিলা ভয়ে কাঁপছিল। তাঁর কাছে পানি খেতে চাইলে সে একটি ঘটি দেখিয়ে দিল। পানি খেয়ে ওর ঘরে কোণে যে খাটে ছিল তার নিচে লুকিয়ে থাকতে চাইলাম। মহিলাটি আমাকে তক্ষুণি সরে যেতে বলল। তখন আমি বস্তির পাশের লেট্রিনে ঢুকে পড়ি।”
এবার ঐ সময়ের বিদেশী সংবাদপত্রের কিছু ভাষ্য উদ্ধৃত করছি। ১৯৭২ সালে ফজলুর রহমানের বাংলাদেশের গণহত্যা শীর্ষক বইয়ে উদ্ধৃতিগুলো অনুবাদ করা হয়েছিল।
[টাইম, ১২ এপ্রিল, ১৯৭১]
... কোন সন্দেহ নেই যে, এক্ষেত্রে ‘গণহত্যা’ শব্দটি ব্যবহার করা যায়। এটা হচ্ছে একটা মারাত্মক রক্তপাত। সৈন্যরা ছিল নিষ্ঠুর পাষ- পাশ্চাত্যের এক কর্মচারী মর্মাহত হয়ে বলেছিলেন- এটা চেঙ্গিস খানের মতো কার্যকলাপ।
[লা এক্সপ্রেস, ১২ থেকে ১৮ এপ্রিল, ১৯৭১]
একজন ইউরোপীয় প্রত্যাগমনকারী বলেন, ‘প্রত্যেক রাতে আমি ভারি মেশিনগান ও মর্টারের আওয়াজ শুনতাম। সেখানে পানি, বিদ্যুৎ কিছুই ছিল না। সৈন্যরা বাঙালীদের পিছনে পিছনে ছুটত এবং যাদের ধরতে পারত তাদের ট্যাঙ্কের পেছনে এমনভাবে বাঁধত যাতে তাদের মাথাগুলো মাটিতে আছড়াতে থাকে।’
[টাইম, ৩ মে, ১৯৭১]
সবচেয়ে বর্বরতম হত্যা সংঘটিত হয় শহরের পুরনো এলাকায়। সেখানে অনেক য়গা পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয়। সৈন্যরা প্রত্যেক মহল্লার চারদিকে গ্যাসোলিন ছড়িয়ে দেয় এবং হাউই ছুড়ে সেগুলো জ্বালিয়ে দেয়; তারপর আগুনের বেড়াজাল ডিঙ্গিয়ে যে- সমস্ত লোক পালাতে চেষ্টা করেছিল তাদের কচুকাটা করা হয়।
একজন বিদেশী শুনতে পান সৈন্যরা চেঁচিয়ে বলছে ‘ওরা বেরিয়ে আসছে, মারো হারামজাদাদের।’
খুব কম লোকই এই ধ্বংসলীলার হাত হতে রক্ষা পায়। পুরনো ঢাকা ২৫টি মহল্লায় ছড়িয়ে আছে যারা বেঁচে যায় তাদের ভয় দেখাবার জন্য সৈন্যরা তিনদিন পর্যন্ত গলিত লাশগুলো সরাতে অস্বীকার করে; অথচ ইসলাম ধর্মে রুহ্কে মুক্ত করার জন্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মৃতদেহ দাফন করার নির্দেশ রয়েছে।
ঘর-বাড়ি খানা-তল্লাশি করার সময় একজন যুবক সৈন্যদের তার সতেরো বছর বয়স্ক তরুণী বোনটিকে ছেড়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ জানায়। ফলে সৈন্যরা তার চোখের সামনে তার বোনকে বেয়নেট দিয়ে হত্যা করে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন ডাক্তার কর্নেল আবদুল হাইকে তার পরিবারের কাছে শেষবারের মতো একবার ফোন করার সুযোগ দেয়া হয়। আর তার এক ঘণ্টা পরই বাড়িতে তার লাশ পাঠানো হয়।
যে বুড়ো লোকটি কারফিউ উপেক্ষা করে জুমার নামাজকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল তাকে মসজিদে ঢোকার পথে গুলি করে মারা হয়।
[স্টেট্স্ম্যান, ১৩ মে, ১৯৭১]
শকুনগুলো বেশি খাওয়ায় উড়তে না পেরে গঙ্গার তীরে ভয়াবহ তৃপ্তিতে বসে আছে। মার্চ মাস থেকে পাঁচ লাখেরও বেশি নিহত পাকিস্তানীদের তারা খাদ্য হিসেবে পেয়েছে।
চট্টগ্রাম যাওয়ার পথের দুধারে বাঙালী-অধ্যুষিত পুরো এলাকার ঘরবাড়ি, দোকানপাট ভেঙ্গে চুরে ধূলিস্মাৎ করে দেয়া হয়।
[সানডে টাইমস, ২০ জুন, ১৯৭১]
কার্যক্ষেত্রে বাংলাদেশের মুক্তিসেনাদের পরাজিত করার জন্য ঢাকায় অবস্থিত সামরিক শাসকগোষ্ঠী একটি দ্বি-মাত্রিক সাঁড়াশি নীতি উদ্ভাবন করে। প্রথমত, সমস্ত সরকারী কর্মচারী, শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক ও শিল্পপতিদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপিত হয়। দ্বিতীয়ত, যদি কাউকে প্রচ্ছন্নভাবে বিপজ্জনক মনে করা হয় তবে তাকে সরিয়ে ফেলা হয়। ইতোমধ্যেই সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ শিক্ষক, সাংবাদিক ও অন্যান্য প্রবাবশালী বাঙালীদের গ্রেফতার ও জেরা করতে শুরু করেছে। যারা বিচ্ছিন্নতাবাদী আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন অথবা এর সমর্থক সেইসব সন্দেহজনক ব্যক্তিদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তাদের তিন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। সাদা, ধূসর ও কালো। সাদাদের ছেড়ে দেয়া হবে। ধূসর তালিকাভুক্ত লোকদের চাকরি যাবে কিংবা হয়ত জেলও হতে পারে, আর কালো তালিকাভুক্তদের গুলি করে মারা হবে।
সরকারী চাকুরেদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ৩৬ জন জেলা শাসক ও মহকুমা অফিসারকে হত্যা করা হয়েছে ...
পাকিস্তানী ও তাদের সহযোগী রাজাকার-আলবদর বাহিনী বাঙালীদের ওপর যে অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে তার প্রচুর বিবরণ থাকা উচিত ছিল যাতে ভবিষ্যতে নাগরিকরা বুঝতে পারে বাংলাদেশবিরোধীরা কী রকম প্রতিহিংসাপরায়ণ ছিল। দুর্ভাগ্যবশত সে রকম প্রচুর বিবরণ নেই। কিছু খ-চিত্র পাওয়া যাবে শাহরিয়ার কবির সম্পাদিত একাত্তরের দুঃসহ স্মৃতি, মন্টু খানের হায়েনার খাঁচায় অদম্য জীবন, রশীদ হায়দার সম্পাদিত একাত্তরের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এবং আতোয়ার রহমান সম্পাদিত একাত্তরের কড়চায়। শাহরিয়ার তাঁর গ্রন্থের ভূমিকায় অত্যাচারের একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করে লিখেছেন- তথ্য মন্ত্রণালয় প্রকাশিত হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ; দলিলপত্রের ১৬ খ-ের মাত্র একখ- (১৯৭৭) ‘গণহত্যা, শরণার্থী শিবির ও প্রাসঙ্গিক ঘটনা’ নিয়ে। এরপর যেসব বিবরণ বেরিয়েছে তার অধিকাংশের সূত্র এই অষ্টম খ- যদিও পরবর্তী প্রায় বিবরণে এই সূত্রের উল্লেখ নেই।
“নির্বিচার গণহত্যার ভেতরে ক্ষেত্রবিশেষে অগ্রাধিকারেরও একটি বিষয় ছিল। পাকিস্তানীরা তাদের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল-১. আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের, ২. কমিউনিস্ট ও সমাজতন্ত্রীদের, ৩. মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সহযোগীদের, ৪. নারী পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে হিন্দু সম্প্রদায়কে এবং ৫. ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদের।”
তবে সবসময় যে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে হত্যা করা হয়েছিল, তা নয়। প্রথমদিকে এবং পরেও প্রথমে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। তারপর অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাড়ি থেকে তুলে এনে হত্যা করা হয়েছে।
আগেই উল্লেখ করেছি হত্যার আগে নির্যাতনের কিছু কিছু বিবরণ লিপিবদ্ধ হয়েছে, তবে সামান্য। শাহরিয়ার নির্যাতনের বিভিন্ন বিবরণ উল্লেখ করেছেন। তাঁর চিহ্নিত মাধ্যমগুলো হলো-
“নির্যাতনের জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি পাকিস্তানী সামরিক কর্মকর্তা ও সাধারণ সৈন্যরা গ্রহণ করত তা হচ্ছে-১. অশ্লীল ভাষায় গালাগাল, তৎসঙ্গে চামড়া ফেটে না বেরুনো পর্যন্ত শারীরিক প্রহার, ২. পায়ের সঙ্গে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা, তৎসঙ্গে বেয়নেট দিয়ে খোঁচানো ও রাইফেলের বাঁট দিয়ে প্রহার, ৩. উলঙ্গ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উন্মুক্ত স্থানে দাঁড় করিয়ে রাখা, ৪. সিগারেটের আগুন দিয়ে সারা শরীরে ছ্যাঁকা দেয়া, ৫. হাত ও পায়ের নখ ও মাথার ভেতর মোটা সুঁচ ঢুকিয়ে দেয়া, ৬. মলদ্বারের ভেতর সিগারেটের আগুনে ছ্যাঁকা দেয়া এবং বরফখন্ড ঢুকিয়ে দেয়া, ৭. চিমটে দিয়ে হাত ও পায়ের নখ উপড়ে ফেলা, ৮. দড়িতে পা বেঁধে ঝুলিয়ে মাথা গরম পানিতে বার বার ডোবানো, ৯. হাত-পা বেঁধে বস্তায় পুরে উত্তপ্ত রোদে ফেলে রাখা, ১০. রক্তাক্ত ক্ষতে লবণ ও মরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে দেয়া, ১১. নগ্ন ক্ষতবিক্ষত শরীর বরফের সø্যাবের ওপর ফেলে রাখা, ১২. মলদ্বারে লোহার রড ঢুকিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেয়া, ১৩. পানি চাইলে মুখে প্রস্রাব করে দেয়া, ১৪. অন্ধকার ঘরে দিনের পর দিন চোখের ওপর চড়া আলোর বাল্ব জ্বেলে ঘুমোতে না দেয়া, ১৫. শরীরের স্পর্শকাতর অংশে বৈদ্যুতিক শক প্রয়োগ প্রভৃতি।”
(চলবে)

No comments:
Post a Comment