Friday, August 17, 2012

ঈদের ঘরমুখো মানুষজনকে পরিবহনে সরকারি, নৌবাহিনীর জাহাজ, নানান জলযান, সেনাবাহিনীর গাড়ি, বিশ্ববিদ্যালয় সহ নানান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাস-গাড়ি ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে

অস্ট্রেলিয়ার চাকরিতে কোন উৎসব বোনাস নেই। চাকরিতে বছরে ছ’সপ্তাহের পেইড হলিডে আছে। অসুস্থতার ছুটি না নিলে বার্ষিক এই পেইড হলিডে সাত সপ্তাহে দাঁড়ায়! কাজ না করেই বেতন! আবার ছুটি না নিলে বছরের নির্দিষ্ট সময় পরে সংশ্লিষ্টরা এ টাকাটি নগদ তুলে নিতে পারেন। এটিকেই বোনাস মনে করেন এদেশের মানুষজন! খ্রীস্টান প্রধান এ দেশটির বেশিরভাগ মানুষ ক্রিসমাসের আগে ইংরেজি নববর্ষ মিলিয়ে এই হলিডে নিতে চান। কিন্তু এই হলিডে কাটাতে এদের তেমন কেউ গ্রামের বাড়িতে যান না। এরা ছোটেন দেশবিদেশের নানান টুরিস্ট জোন-স্পটে। এরজন্যে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু করে জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বিমানের টিকেটের দাম থাকে স্বাভাবিকের চেয়ে দেড়-দু’গুণ বেশি। বছরের এই সময়টায় এদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রায় দু’মাসের ছুটি থাকে। আমাদের দেশের মতো পরিবারগুলো বছরের এই সময়টাতেই দেশে বেড়াতে যেতে চান। কিন্তু বিমান টিকেটের উচ্চমূল্য মেটাতে সক্ষমরাই এটা পারেন! আবার দেশে যাওয়া মানে একটি পরিবারের দশ-পনের হাজার ডলারের ধাক্কা! এদেশের খুব কম মানুষের এত টাকা হাতে জমা থাকে। অনেক ক্রেডিটকার্ডের ওপর ভরসা করে চলে যান। পরে ক্রেডিট কার্ডের এসব বকেয়া আর সুদ সামাল দিতে গিয়ে এখানে ফেরার পর সংশ্লিষ্টদের দিন-রাত অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। এসবই এসব দেশের বাস্তবতা। টাকা দেন, বোনাস দেন, বখশিস দেন, বাড়ি যামু’ বলে আন্দোলন-অবরোধ করার সুযোগই এখানে নেই। সেভাবে বিষয়টি এদেশে কেউ ভাবেনওনা!
ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর ঢাকাকে প্রায় খালি করে আমাদের দেশের লোকজন গ্রামের বাড়ি যান। এ নিয়ে নানান দূর্ভোগের সচিত্র খবর ছাপা-প্রকাশ হয় দেশের মিডিয়ায়। দেশের পরিবহন ব্যবস্থাটি ভেতর থেকে এমনিতই নড়বড়ে। একসঙ্গে এত মানুষজনকে পরিবহনের মতো অবকাঠামোও দেশের নেই। এবার নানা টিভির রিপোর্ট দেখে দেখে মনে হলো এতগুলো টিভি চ্যানেলের প্রতিযোগিতামূলক রিপোর্টিং, এত ক্যামেরার কারনে অনেককিছুর জবাবদিহিও আগের চেয়ে বেড়েছে। দেশের ইতিহাসের ব্যতিক্রমী যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সক্রিয় সরেজমিন ছোটাছুটির কারনেও পরিস্থিতির তুলনামূলক উন্নতি ঘটেছে। আমার মনে হয়েছে পুরো বিষয়টি নিয়ে নতুন কিছু ভাবার আছে সরকারের। যেমন ঈদের ঘরমুখো মানুষজনকে পরিবহনে সরকারি সব ধরনের যানবাহন, নৌবাহিনীর জাহাজ সহ নানান জলযান, সেনাবাহিনীর গাড়িরবহর, বিশ্ববিদ্যালয় সহ নানান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাস-গাড়িসমূহ ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এসব পরিবহন ব্যবহারকারীরা সরকার নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধ করবেন। এতে চলতি ভোগান্তির কিছুটা হলেও লাঘব হবে। সরকারি দায়িত্বশীলরা কি বিষয়টি নিয়ে ভাববেন?

Wednesday, August 15, 2012

মাদারীপুরে নবজাতকের হাত ভেঙে দিলেন নার্স!

মাদারীপুরে মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের (মাতৃমঙ্গল) এক নার্স ছুড়ে ফেলে দিয়ে এক নবজাতকের হাত ভেঙে দিয়েছেন বলে পরিবার থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নবজাতক ১৩ দিন ধরে অসুস্থ হয়ে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।

মাদারীপুর সদর হাসপাতাল, নবজাতকের মা রোজিনা বেগম ও নানী সুফিয়া বেগম বাংলানিউজকে জানান, মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের সস্তাল গ্রামের কৃষক আমিন তালুকদারের স্ত্রী রোজিনা বেগমের ২ আগস্ট প্রসবব্যথা শুরু হলে মাদারীপুর সদরের মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়।

সেখানে দায়িত্বরত ডাক্তার ও নার্স রোজিনাকে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানোর কথা বলেন।

কিন্তু রোজিনা অপারেশন করবেন না বলে জানান। এতে নার্স ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে রুম থেকে বের করে দেন। কোনো উপায় না পেয়ে রোজিনা হাসপাতালের নিচে বসে অপেক্ষা করতে থাকেন।

একপর্যায়ে নার্স বাধ্য হয়ে তাকে লেবার রুমে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর তিনি অপারেশন ছাড়াই স্বাভাবিক নিয়মেই একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন।

দায়িত্বরত নার্স প্রথমে সন্তানকে তার মায়ের পাশে দেন। পরে শিশুটিকে মৃত বলে পাশের একটি বেডে ছুড়ে ফেলে দেন।

এসময় নবজাতক নড়ে উঠলে তাকে ফের মায়ের কাছে দেওয়া হয়। ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য দ্রুত মা ও শিশু সুস্থ আছে বলে ৯শ টাকা বকশিস রেখে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।

বাড়িতে যাওয়ার পর রোজিনা টের পান তার সন্তানের হাত ভাঙা। ২ দিন পর ওই শিশুকে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এবিষয়ে রোজিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাংলানিউজকে জানান, এটাই তাদের প্রথম সন্তান। তার স্বামী মানুষের জমিতে কৃষি কাজ করেন। মাতৃমঙ্গলের নার্স তাকে অপারেশনের কথা বললে টাকার কথা চিন্তা করে তিনি রাজি হননি।

পরে অপারেশন ছাড়াই তিনি একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। তাদের কথা মতো অপারেশন না করায়, নার্স ক্ষিপ্ত হয়ে তার ছেলেকে মৃত বলে ছুড়ে ফেলে দেয়। এতে তার সন্তানের ডান হাত ভেঙে যায়। এসময় তারা এ ঘটনার জন্য তার কাছে ক্ষমাও চায়।

ডাক্তার ও নার্সের নাম জানতে চাইলে রোজিনা বলতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমি কীভাবে তাদের নাম বলবো? মাত্র কয়েক ঘন্টা সেখানে ছিলাম।‘

রোজিনা অভিযোগ করে জানান, নার্সের জন্যই তার ছেলের হাত ভেঙে গেল। অথচ তারা ছেলেকে কোনো চিকিৎসা বা পরামর্শ না দিয়েই ৯শ টাকা বকশিস রেখে দ্রুত তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।

তবে এ ব্যাপারে রোজিনার স্বামী দুই/একদিনের মধ্যে মাদারীপুর সদর থানায় মামলা করবে বলে জানান তিনি।
মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা গোপাল চন্দ্র সূত্রধরের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ওই সময় আমি ছুটিতে ছিলাম। তাই, এই ঘটনাটি আমার জানা নেই। তবে নার্সরা ইচ্ছে করে এ ঘটনা ঘটাতে পারেননা। হয়ত ভুল করে এ ঘটনা ঘটতে পারে।‘

মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বাংলানিউজকে জানান, এ ব্যাপারে থানায় কেউ এখনও অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কবর প্রথম বাঁধাই করে অবিসংবাদিত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ছিলেন এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী



 সুমি খান: “ যে নেতার নির্দেশে এ দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো , তাকে সপরিবারে  নির্মম হত্যার পর তার অস্তিত্ব মুছে ফেলার চক্রান্ত করেছিলো খুনিরা। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা কর্মীর মতো আমিও গ্রেফতার হই, ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে আমাকে। কোন্ সালে সেটা মনে নেই, দেশে একটু মুক্ত চলাচলের  সুযোগ পেতেই বঙ্গবন্ধুর কবর জেয়ারত করতে ছুটে গিয়েছিলাম টুঙ্গিপাড়া । কবরের অবস্থা দেখে  মনে হলো  পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে এই কবর টি  সংরক্ষণ করা জরুরী।”
পনেরোই আগষ্ট সকালে চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সভাপতি এ বি মহিউদ্দিন চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর সাথে জড়িয়ে তার স্মৃতি তুলে ধরলেন আমাদের সময়ের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে ।  প্রথমেই অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেন সাম্প্রতিক সময়ে অনেক কথাই মনে রাখতে পারছেন না বলে। পর মুহুর্তেই ধীরে ধীরে মনে করলেন সেই ঐতিহাসিক দিনটির অনেক কথা।
“ টুঙ্গিপাড়া থেকে গোপালগঞ্জ অনেক দূরে। রাস্তা খুব খারাপ ছিল তখন, ইট, সিমেন্ট , রাজমিস্ত্রি- কিছুই তো নেই।  তবু মন মানলোনা। আমার   সাথে চট্টগ্রামের কাট্টলীর কয়েকজন নেতা কর্মী ছিল। তাদের সাথে নিয়ে গোপালগঞ্জ থেকে ইট আর সিমেন্ট আনলাম।  কোনভাবে ইট সিমেন্টের গাঁথুনি তুলে আমাদের প্রিয় নেতার  কবর বাঁধাই করে দিলাম  নিজেরাই। আমরা তো মিস্ত্রি নই, প্ল্যাষ্টার করতে পারলাম না।”  ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ঢাকায় ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার কথা ছিল তার ও । সকালে রেডিও খুলতেই মেজর ডালিমের বেতার ঘোষণার মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। বললেন, যে নেতার নির্দেশে এ দেশের তরুণ সমাজ মোহমুগ্ধ হয়ে সাহস করে  মাঠে  নেমেছে, সেই নেতাকে নির্মম ভাবে হত্যার ঘটনা প্রচন্ড ক্ষুব্ধ করে দেয় সেদিনের তরুণ শ্রমিক নেতা এবং সংগঠক  মহিউদ্দিন চৌধুরীকে। ১৬ আগষ্ট চট্টগ্রামে এসে নেতাকর্মীদের সংগঠিত করতে লালখানবাজার যাওয়ার পথে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের  সদস্যেরা গ্রেফতার করে নিয়ে যায় তাকে। এর পর তাকে পাঠানো হলো রাজশাহী জেলে। প্রায় ৬ মাস পর জামিনে মুক্ত হয়ে চট্টগ্রাম আসেন । সীমান্ত পেরিয়ে আগরতলা চলে যান।সেখান থেকে কোলকাতা যান এবং জীবিকার প্রয়োজনে নানান কাজের সাথে  যুক্ত হন। এর কিছুদিন পর দেশে ফেরার সাথে সাথে  আবার শুরু হয় নির্যাতন। বললেন, আমরা যারা বঙ্গবন্ধুর খুনি সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ছিলাম, তাদের মধ্যে সুলতানুল কবির, পুলিন দে, আব্দুল্লাহ আল হারুণ, ডা. আফসারুল আমিন, লোকমান সহ অনেক কে  ক্যান্টনমেন্টে  ধরে নিয়ে খুব নির্যাতন করা হতো। স্বাধীনতা বিরোধী চক্র এবং সেনাবাহিনীর পাকিস্তানঘেঁষা ব্যক্তিদের সমন্বয়ে  বাংলাদেশ বিরোধী সাম্প্রদায়িক একটি দল গঠন করা হলো। আমাদের দলের মধ্যেও বিভেদ সৃষ্টি হলো।মুক্তিযুদ্ধেও পর সুবিধাভুক্ত গোষ্ঠিীর কারণে যারা অভিমান করে বা  কোন কারণে ভুল বুঝে দল থেকে দূরে সরে গেছে তাদের  কারো কারো সাথে সংঘবদ্ধ হয়ে একটি  অতিবাম সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হলো। সদ্যস্বাধীন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত  বাংলাদেশ কে বঙ্গবন্ধু যেভাবে গড়ে তুলছিলেন,তা ধ্বংস করার জন্যে আন্তর্জাতিক চক্রান্তে অংশ নিলো সেই অতিবাম গোষ্ঠী। এগ্রেসিভ হয়ে একের পর এক বিভিন্ন নাশকতা মূলক কাজ করে সংকটে ফেলেছে বঙ্গবন্ধুকে।”
মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি বারবার বঙ্গবন্ধু , তার কন্যা শেখ হাসিনা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে । সবরকম দুর্নীতি এবং জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি সোচ্চার।  তার মতে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিশাল অপশক্তি ওঁৎ পেতে আছে। এই শক্তি প্রতিরোধ করতে হবে। দলের নেতা কর্মীদের সতর্ক থাকতে হবে যাতে তারা এমন কোন কাজ না করে, যা বর্তমান সরকারের জনকল্যাণ মুখী  ভূমিকাকে সংকটে ফেলতে পারে।
 চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের অন্ত:র্কোন্দল মিটাতে সম্প্রতি নুরুল ইসলাম বিএসসি এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ডা. আফসারুল আমিনের  বাসায় গেছেন এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ।বললেন, বড় দলে মত বিরোধ হয়, আবার মিটে যায়। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তিনবার নির্বাচিত মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী  পদ্মা সেতু  প্রসঙ্গে বলেন, বিশ্বের অনেক বড়ো শক্তির বিরোধিতার পরও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা এ দেশ স্বাধীন করেছি। প্রয়োজনে এক মুঠো ভাত কম খেয়ে হলেও আমরা ১৪ কোটি মানুষ নেত্রীর পদক্ষেপে একাত্ম।আমরা ভিক্ষুক হয়ে বাঁচতে রাজী না।জনগণের কথা ভেবে দেশের সন্তান হিসেবে ড. ইউনুস কে  পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান মহিউদ্দিন চৌধুরী। সুমি খান ১৫/০৮/১২

Tuesday, August 14, 2012

আমাদের ছোট রাসেল সোনা শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী


রাসেল, রাসেল তুমি কোথায়?

রাসেলকে মা ডাকে, আসো,খাবে না, খেতে আসো। 
মা মা মা, তুমি কোথায় মা?
মা যে কোথায় গেল--মাকে ছাড়া রাসেল যে ঘুমাতে চায় না ঘুমের সময় মায়ের গলা ধরে ঘুমাতে হবে।
মাকে ও মা বলে যেমন ডাক দিত, আবার সময় সময় আব্বা বলেও ডাকত।

আব্বা ওর জন্মের পরপরই জেলে চলে গেলেন। ৬ দফা দেওয়ার কারণে আব্বাকে বন্দি করল পাকিস্তানি শাসকরা। রাসেলের বয়স তখন মাত্র দেড় বছরের কিছু বেশি। কাজেই তার তো সব কিছু ভালোভাবে চেনার বা জানারও সময় হয়নি। রাসেল আমাদের সবার বড় আদরের;  সবার ছোট বলে ওর আদরের কোনও সীমা নেই। ও যদি কখনও একটু ব্যথা পায় সে ব্যথা যেন আমাদের সবারই লাগে। আমরা সব ভাইবোন সব সময় চোখে চোখে রাখি, ওর গায়ে এতটুকু আঁচড়ও যেন না লাগে। কী সুন্দর তুলতুলে একটা শিশু। দেখলেই মনে হয় গালটা টিপে আদর করি।

১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর রাসেলের জন্ম হয় ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাসায় আমার শোয়ার ঘরে। দোতলা তখনও শেষ হয়নি। বলতে গেলে মা একখানা করে ঘর তৈরি করেছেন। একটু একটু করেই বাড়ির কাজ চলছে। নিচতলায় আমরা থাকি। উত্তর-পূর্ব দিকের ঘরটা আমার ও কামালের। সেই ঘরেই রাসেল জন্ম নিল রাত দেড়টায়। আব্বা নির্বাচনী মিটিং করতে চট্টগ্রাম গেছেন। ফাতেমা জিন্নাহ প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। সর্বদলীয় ঐক্য পরিষদ আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে একটা মোর্চা করে নির্বাচনে নেমেছে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরু্দ্ধে সব রাজনৈতিক দল। তখনকার দিনে মোবাইল ফোন ছিল না। ল্যান্ডফোনই ভরসা। রাতেই যাতে আব্বার কাছে খবর যায় সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাসেলের জন্মের আগের মুহূর্তগুলো ছিল ভীষণ উৎকণ্ঠার। আমি, কামাল, জামাল, রেহানা ও খোকাকাকা বাসায়। বড় ফুফু ও মেজ ফুফু মার সাথে। একজন ডাক্তার এবং নার্সও এসেছেন। সময় যেন আর কাটে না। জামাল আর রেহানা কিছুক্ষণ ঘুমায় আর জেগে ওঠে। আমরাও ঘুমে ঢুলঢুলু চোখে জেগে আছি নতুন অতিথির আগমনবার্তা শোনার অপেক্ষায়। মেজ ফুফু ঘর থেকে বের হয়ে এসে খবর দিলেন আমাদের ভাই হয়েছে। খুশিতে আমরা আত্মহারা। কতক্ষণে দেখব। ফুফু বললেন, তিনি ডাকবেন। কিছুক্ষণ পর ডাক এলো। বড় ফুফু আমার কোলে তুলে দিলেন রাসেলকে। মাথাভরা ঘন কালো চুল। তুলতুলে নরম গাল। বেশ বড়সড় হয়েছিল রাসেল। মাথার চুল একটু ভেজা মনে হলো। আমি আমার ওড়না দিয়েই মুছতে শুরু করলাম। তারপরই এক চিরুনি নিলাম মাথার চুল আচড়াতে। মেজ ফুফু নিষেধ করলেন, মাথার চামড়া খুব নরম তাই এখনই চিরুনি চালানো যাবে না। হাতের আঙ্গুল বুলিয়ে সিঁথি করে দিতে চেষ্টা করলাম।

আমাদের পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট রাসেল। অনেক বছর পর একটা ছোট বাচ্চা আমাদের ঘর আলো করে এসেছে, আনন্দের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। আব্বা বার্ট্র্যান্ড রাসেলের খুব ভক্ত ছিলেন, রাসেলের বই পড়ে মাকে ব্যাখ্যা করে শোনাতেন। মা রাসেলের ফিলোসফি শুনে শুনে এত ভক্ত হয়ে যান যে নিজের ছোট সন্তানের নাম রাসেল রাখলেন। ছোট্ট রাসেল আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। মা রাসেলকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সংসারের কাজ করতেন, স্কুল বন্ধ থাকলে তার পাশে শুয়ে আমি বই পড়তাম। আমার চুলের বেণি ধরে খেলতে খুব পছন্দ করতো ও। আমার লম্বা চুলের বেণিটা ওর হাতে ধরিয়ে দিতাম। ও হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে হাসতো। কারণ নাড়াচাড়ায় মুখে চুল লাগতো তাতে খুব মজা পেত।

জন্মের প্রথম দিন থেকেই ওর ছবি তুলতাম, ক্যামেরা আমাদের হাতে থাকতো। কত যে ছবি তুলেছি। ওর জন্য আলাদা একটা অ্যালবাম করেছিলাম যাতে ওর জন্মের দিন, প্রথম মাস, প্রতি তিন মাস, ছয় মাস অন্তর ছবি অ্যালবামে সাজানো হতো। দুঃখের বিষয় ওই ফটো অ্যালবামটা অন্যসব জিনিসপত্রের সঙ্গে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী লুট করে নেয়। হারিয়ে যায় আমাদের অতি যত্নে তোলা আদরের ছোট্ট ভাইটির অনেক দুর্লভ ছবি।

বাসার সামনে ছোট্ট একটা লন। সবুজ ঘাসে ভরা। আমার মা খুবেই যত্ন নিতেন বাগানের। বিকেলে আমরা সবাই বাগানে বসতাম। সেখানে একটা পাটি পেতে ছোট্ট রাসেলকে খেলতে দেওয়া হতো। একপাশে একটা ছোট্ট বাঁশ বেঁধে দেওয়া ছিল, সেখানে রাসেল ধরে ধরে হাঁটতে চেষ্টা করতো। তখন কেবল হামাগুড়ি দিতে শুরু করেছে। আমরা হাত ধরে হাঁটাতে চেষ্টা করতাম। কিন্তু কিছুতেই হাঁটতে চাইতো না। ওর স্বাস্থ্য খুব ভালো ছিল। বেশ নাদুস-নুদুস একটা শিশু। আমরা ভাইবোন সব সময় ওকে হাত ধরে হাঁটাতাম। একদিন আমার হাত ধরে হাঁটছে। ওর যেন হাঁটার ইচ্ছা খুব বেড়ে গেছে। সারা বাড়ি হাত ধরে ধরে হাঁটছে। হাঁটাতে হাঁটতে পেছনের বারান্দা থেকে সামনের বারান্দা হয়ে বেশ কয়েকবার ঘুরলো। এই হাঁটার মধ্যে আমি মাঝে মাঝে চেষ্টা করছি আঙ্গুল ছেড়ে দিতে, যাতে নিজে হাঁটতে পারে। কিন্তু সে বিরক্ত হচ্ছে, আর বসে পড়ছে, হাঁটবে না আঙ্গুল ছাড়া। তার সাথে হাঁটতে হাঁটতে আমি বরাবরই চেষ্টা করছি যদি নিজে হাঁটে। হঠাৎ সামনের বারান্দায় হাঁটতে হাঁটতে আমার হাত ছেড়ে নিজে হাঁটতে শুরু করলো। হাঁটতে হাঁটতে চলছে। আমি পেছনে পেছনে যাচ্ছি। সেই প্রথম হাঁটা শুরু করল। আমি ভাবলাম কতটুকু হেঁটে আবার আমার হাত ধরবে। কিন্তু যতই হাঁটছি দেখি আমার হাত আর ধরে না, চলছে তো চলছেই, একেবারে মাঝের প্যাসেজ হয়ে পেছনের বারান্দায় চলে গেছে। আমি তো খুশিতে সবাইকে ডাকাডাকি শুরু করেছি যে, রাসেল সোনা হাঁটতে শিখে গেছে। একদিনে এভাবে কোনও বাচ্চাকে আমি হাঁটতে দেখিনি। অল্প অল্প করে হেঁটে হেঁটে তবেই বাচ্চারা শেখে। কিন্তু ওর সবকিছু যেন ছিল ব্যতিক্রম। ও যে খুবই মেধাবী তার প্রমাণ অনেকভাবে আমরা পেয়েছি। আমকে হাসুপা বলে ডাকত। কামাল ও জামালকে ভাই বলত আর রেহানাকে আপু। কামাল ও জামালের নাম কখনও বলতো না।আমরা অনেক চেষ্টা করতাম নাম শেখাতে, মিষ্টি হেসে মাথা নেড়ে বলতো ভাই। দিনের পর দিন আমরা যখন চেষ্টা করে যাচ্ছি- একদিন বলেই ফেলল ‘কামমাল’, ‘জামমাল’। তবে সব সময় ভাই বলেই ডাকত।

চলাফেরায় বেশ সাবধানি কিন্তু সাহসী ছিল, সহসা কোনও কিছুতে ভয় পেতো না। কালো কালো বড় পিপড়া দেখলে ধরতে যেত। একদিন একটা বড় ওলা (বড় কালো পিঁপড়া) ধরে ফেললো আর সাথে সাথে কামড় খেল। ছোট্ট আঙ্গুল কেটে রক্ত বের হলো। সাথে সাথে ওষুধ দেওয়া হলো। আঙ্গুলটা ফুলে গেছে। তারপর থেকে আর পিঁপড়া ধরতে যেত না। কিন্তু ওই পিঁপড়ার একটা নাম নিজেই দিয়ে দিল। কামড় খাওয়ার পর থেকেই কালো বড় পিপড়া দেখলেই বলতো ‘ভুট্টো’। নিজে থেকেই নামটা দিয়েছিল।

রাসেলের কথা ও কান্না টেপরেকর্ডারে টেপ করতাম। তখনকার দিনে বেশ বড় টেপরেকর্ডার ছিল। এর কান্না মাঝে মাঝে ওকেই শোনাতাম। সব থেকে মজা হতো ও যদি কোনও কারণে কান্নাকাটি করতো, আমরা টেপ ছেড়ে দিতাম, ও তখন চুপ হয়ে যেত। অবাক হতো মনে হয়। একদিন আমি রাসেলের কান্না টেপ করে বারবার বাজাচ্ছি, মা ছিলেন রান্নাঘরে। ওর কান্না শুনে মা ছুটে এসেছেন। ভেবেছিলেন ও বোধহয় একা, কিন্তু এসে দেখেন আমি টেপ বাজাচ্ছি আর ওকে নিয়ে খেলছি। মার আর কী বলবেন। প্রথমে বকা দিলেন, কারণ মা খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন ও একা আছে মনে করে। তারপর হেসে ফেললেন ওর টেপ করা কান্না শুনে। আমি ওকে দিয়ে কথা বলিযে টেপ করতে চেষ্টা করছিলাম।

আব্বা যখন ৬-দফা দিলেন তারপরই তিনি গ্রেফতার হয়ে গেলেন। রাসেলের মুখে হাসিও মুছে গেল। সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে রাসেল আব্বাকে খুঁজত। রাসেল যখন কেবল হাঁটতে শিখেছে, আধো আধো কথা বলতে শিখেছে, আব্বা তখনই বন্দি হযে গেলেন। মা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আব্বার মামলা-মকদ্দমা সামলাতে, পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। সংগঠনকে সক্রিয় রেখে আন্দোলন-সংগ্রাম চালাতেও সময় দিতে হতো। আমি কলেজে পড়ি, সাথে সাথে রাজনীতিতে সক্রিয় হযে কাজ শুরু করি। কামাল স্কুল শেষ করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়। সেও রাজনীতিতে যোগ দেয়। জামাল ও রেহেনা স্কুলে যায়। আব্বা গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই রাসেলের খাওয়া-দাওয়া একরকম বন্ধ হয়ে যায়। কিছু খেতে চাইতো না। ওকে মাঝে মাঝ ছোট ফুফুর বাসায় নিয়ে যেতাম। সেখানে গেলে আমার ছোট ফুফার সাথে বসে কিছু খেতে দিতেন। ছোট ফুফা ডিম পোচের সাথে চিনি দিয়ে রাসেলকে খেতে দিতেন। ঢেঁড়স ভাজির সাথেও চিনি দিয়ে রুটি খেতেন, রাসেলকেও খাওয়াতেন। আমাদের বাসায় আম্বিয়ার মা নামে এক বুয়া ছিল, খুব আদর করতো রাসেলকে। কোলে নিয়ে ঘুরে ঘুরে খাবার খাওয়াতো।

আমাদের বাসায় কবুতরের ঘর ছিল। বেশ উঁচু করে ঘর করা হয়েছিল। অনেক কবুতর থাকতো সেখানে। মা খুব ভোরে উঠতেন, রাসেলকে কোলে নিয়ে নিচে যেতেন এবং নিজের হাতে কবুতরদের খাবার দিতেন। রাসেল যখন হাঁটতে শেখে তখন নিজেই কবুতরের পেছনে ছুটত, নিজে হাতে করে তাদের খাবার দিত। আমাদের গ্রামের বড়িতেও কবুতর ছিল। কবুতরের মাংস সবাই খেত। বিশেষ করে বর্ষকালে যখন অধিকাংশ জমি পানির নিচে থাকতো তখন তরকারি ও মাছের বেশ অভাব দেখা দিত। তখন প্রায়ই কবুতর খাওয়ার রেওয়াজ ছিল। সকালের নাস্তার জন্য পরোটা ও কবুতরের মাংস ভুনা সবার প্রিয় ছিল। তাছাড়া কারও অসুখ হলে কবুতরের মাংসের ঝোল খাওয়ানো হতো। ছোট ছোট বাচ্ছাদের কবুতরের স্যুপ করে খাওয়ালে রক্ত বেশি হবে, তাই বাচ্চাদের নিয়মিত কবুতরের স্যুপ খাওয়াতো। রাসেলকে কবুতর দিলে কোনও দিন খেত না। এত ছোট বাচ্চা কিভাবে যে টের পেত কে জানে। ওকে আমরা অনেকভাবে চেষ্টা করেছি। ওর মুখের কাছে নিলেও খেত না। মুখ ফিরিয়ে নিত। শত চেষ্টা করলেও কোনোদিন কেউ ওকে কবুতরের মাংস খাওয়াতে পারে নি।

আব্বার সঙ্গে প্রতি ১৫ দিন পর আমরা দেখা করতে যেতাম। রাসলকে নিয়ে গেলে আর আসতে চাইতো না। খুবই কান্নাকাটি করতো। ওকে বোঝানো হয়েছিল যে আব্বার বাসা জেলখান আর আমরা আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছি। আমরা  বাসায় ফেরত যাবো। বেশ কষ্ট করেই ওকে বাসায় ফেরত আনা হতো। আর আব্বার মনের অবস্থা কী হতো তা আমরা বুঝতে পারতাম। বাসায় আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা ওকে বোঝাতো এবং মাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। মাকেই আব্বা বলে ডাকতো।

১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি আব্বাকে আগরতলা মামলায় আসামি করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে বন্দি করে রাখে। ছয় মাস আব্বার সঙ্গে দেখা হয়নি। আমরা জানতেও পারিনি আব্বা কেমন আছেন, কোথায় আছেন। রাসেলের শরীর খারাপ হয়ে যায়। খাওয়া-দাওয়া নিয়ে আরও জেদ করতে শুরু করে। ছোট্ট বাচ্চা মনের কষ্টের কথা মুখ ফুটে বলতেও পারে না, আবার সহ্যও করতে পারে না। কী যে কষ্ট ওর বুকের ভেতরে তা আমরা বুঝতে পারতাম।

কলেজ শেষ করে ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। মা আব্বার মামলা ও পার্টি নিয়ে ব্যস্ত। প্রায়ই বাসার বাইরে যেতে হয়। মামলার সময় কোর্টে যান। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন জেরদার করার জন্য ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ১৯৬৮ সালে ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলন নিয়ে সবাই ব্যস্ত। আন্দোলন সংগ্রাম তখন জোরদার হয়েছে। রাসলকে সময় দিতে পারি না বেশি। আম্বিয়ার মা সব সময় দেখে রাখতো। এমনি খাবার খেতে চাইত না কিন্তু রান্নাঘরে যখন সবাই খেত তখন সবার সঙ্গে বসতো। পাশের ঘরে বসে লাল ফুল আঁকা থালায় করে পিঁড়ি পেতে বসে কাজের লোকদের সঙ্গে ভাত খেতে পছন্দ করতো।

আমাদের একটা পোষা কুকুর ছিল; ওর নাম টিম। সবার সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব ছিল। ছোট্ট রাসেলও টমিকে নিয়ে খেলতো। একদিন খেলতে খেলতে হঠাৎ টমি ঘেউ ঘেউ করে ডেকে ওঠে, রাসেল ভয় পেয়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে রেহানার কাছে এসে বলে, টমি বকা দিচ্ছে। তার কথা শুনে আমরা তো হেসেই মরি। টমি আবার কিভাবে বকা দিল। কিন্তু রাসেলকে দেখে মনে হলো বিষয়টা নিয়ে সে বেশ বেশ গম্ভীর। টমি তাকে বকা দিয়েছে এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না, কারণ টমিকে সে খুব ভালোবাসতো। হাতে করে খাবার দিত। নিজের পছন্দমতো খাবারগুলো টমিকে ভাগ দেবেই, কাজেই সেই টমি বকা দিলে দুঃখ তো পাবেই।

১৯৬৯ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি প্রায় তিন বছর পর আব্বা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যখন মুক্তি পান তখন রাসেলের বয়স চার বছর পার হয়েছে। কিন্তু ভীষণ রোগা হয়ে গিয়েছিল বলে আরও ছোট্ট দেখাতো।

ওর মধ্যে আর একটি জিনিস আমরা লক্ষ্য করলাম। খেলার ফাঁকে ফাঁকে কিছুক্ষণ পরপরই আব্বাকে দেখে আসত। আব্বা নিচে অফিস করতেন। আমরা তখন দোতলায় উঠে গেছি। ও সারাদিন নিচে খেলা করত। আর কিছুক্ষণ পরপর আব্বাকে দেখতে যেত। মনে মনে বোধহয় ভয় পেত যে আব্বাকে বুঝি আবার হারায়।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন অসহযোগ আন্দোলন চলছে, তখন বাসার সামনে দিয়ে মিছিল যেত আর মাঝে মধ্যে পুলিশের গাড়ি চলাচল করত। দোতলায় বারান্দায় রাসেল খেলা করত, যখনই দেখত পুলিশের গাড়ি যাচ্ছে তখনই চিৎকার করে বলত, ‘ও পুলিশ কাল হরতাল’। যদিও ওই ছোট্ট মানুষের কণ্ঠস্বর পুলিশের কানে পৌঁছত না কিন্তু রাসেল হরতালের কথা বলবেই। বারন্দায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ‘হরতাল হরতাল’ বলে চিৎকার করত। স্লোগান দিন ‘জয় বাংলা’। আমরা বাসায় সবাই আন্দোলনের ব্যাপারে আলোচনা করতাম, ও সব শুনত এবং নিজেই আবার তা বলত।

১৯৭১ সালের পঁচিশ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হামলা চালালে আব্বা স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ছাব্বিশ মার্চ প্রথম প্রহরের পরপরই আব্বাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। পরদিন আবার আমাদের বাসা আক্রমণ করে। রাসেলকে নিয়ে মা ও জামাল পাশের বাসায় আশ্রয় নেন। কামাল আমাদের বাসার পেছনে জাপানি কনস্যুলেটের বাসায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। কামাল মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চলে যায়। আমার মা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হন। আমাদের ধানমণ্ডির ১৮ নম্বর সড়কে (পুরাতন) একটা একতলা বাসায় বন্দি করে রাখে।

ছোট্ট রাসেলও বন্দি জীবনযাপন করতে শুরু করে। ঠিকমতো খাবার-দাবার নেই। কোনো খেলনা নেই, বইপত্র নেই, কী কষ্টের দিন যে ওর জন্য শুরু হলো। বন্দিখানায় থাকতে আব্বার কোনও খবরই আমরা জানি না। কোথায় আছেন কেমন আছেন কিছুই জানি না। প্রথম দিনে রাসেল আব্বার জন্য খুব কান্নাকাটি করত। তার ওপর আদরের কামাল ভাইকে পাচ্ছে না, সেটাও ওর জন্য কষ্টকর। মনের কষ্ট কীভাবে চেপে রাখবে আর কীভাবেই বা ব্যক্ত করকে। চোখের কোণে সব সময় পানি। যদি জিজ্ঞাসা করতাম, ‘কি হয়েছে রাসেল?’ বলত ‘চোখে ময়লা’।

ওই ছোট্ট বয়সে সে চেষ্টা করত মনের কষ্ট লুকাতে। মাঝে মধ্যে রমার কাছে বলত। রমা ছোট থেকেই আমাদের বাসায় থাকতো, ওর সাথে খেলতো। পারিবারিকভাবে ওদের বংশ পরম্পরায় আমাদের বাড়িতে বিভিন্ন কাজ করত। ওকে মাঝে মধ্যে দুঃখের কথা বলত। ওর চোখে পানি দেখলে যদি জিজ্ঞেস করতাম, বলত চোখে কী হয়েছে। অবাক লাগত এটুকু একটা শিশু কীভাবে নিজের কষ্ট লুকাতে শিখল। আমরা বন্দিখানায় সব সময় দুঃশ্চিন্তায় থাকতাম, কারণ পাকবাহিনী মাঝে মধ্যেই ঘরে এসে সার্চ করত। আমাদের নানা কথা বলত। জামালকে বলত, তোমাকে ধরে নিয়ে শিক্ষা দেব। রেহানাকে নিয়েও খুব চিন্তা করতো। জয় এরই মধ্যে জন্ম নেয়। জয় হওয়ার পর রাসেল যেন একটু আনন্দ পায়। সারাক্ষণ জয়ের কাছে থাকত। ওর খোঁজ নিতো।

যখন ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধ শুরু হয় তখন তার জয়কে নিয়েই চিন্তা। এর কারণ হলো, আমাদের বাসার ছাদে বাংকার করে মেশিনগান বসানো ছিল, দিন-রাতই গেলাগুলি করত। প্রচণ্ড আওয়াজ হতো। জয়কে বিছানায় শোয়াতে কষ্ট হতো। এটুকু ছোট্ট বাচ্চা মাত্র চার মাস বয়স, মেশিগানের গুলিতে কেঁপে কেঁপে উঠত।

এরপর শুরু হল এয়ার রেইড। আক্রমণের সময় সাইরেন বাজত। রাসেল এ ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিল। যখনই সাইরেন বাজত বা আকাশে মেঘের মতো আওয়াজ হত, রাসেল তুলা নিয়ে এসে জয়ের কানে গুঁজে দিত। সব সময় পকেটে তুলা রাখত।

সে সময় খাবারের কষ্টও ছিল, ওর পছন্দের কোনো খাবার দেওয়া সম্ভব হতো না। দিনের পর দিন বন্দি থাকা, কোনো খেলার সাথি নেই। পছন্দমতো খাবার পাচ্ছে না, একটা ছোট বাচ্চার জন্য কত কষ্ট নিয়ে দিনের পর দিন কাটাতে হয়েছে তা কল্পনাও করা যায় না।

রাসেল অত্যন্ত মেধাবী ছিল। পাকসেনারা তাদের অস্ত্রশস্ত্র পরিস্কার করত। ও জানালায় দাঁড়িয়ে সব দেখত। অনেক অস্ত্রের নামও শিখেছিল। যখন এয়ার রেইড হতো তখন পাকসেনারা বাংকারে ঢুকে যেত আর আমরা তখন বারান্দায় বের হওয়ার সুযোগ পেতাম। আকাশে যুদ্ধবিমানের ‘ডগ ফাইট’ দেখারও সুযোগ হয়েছিল। প্লেন দেখা গেলেই রাসেল খুশি হয়ে হাতে তালি দিত।

ষোল ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে সারেন্ডার হয়, পাকিস্তান যুদ্ধে হেরে যায়, বাংলাদেশ মুক্ত হয়। আমরা সেদিন মুক্তি পাইনি। আমরা মুক্তি পাই ১৭ ডিসেম্বর সকালে। যে মুহূর্তে আমরা মুক্ত হলাম এবং বাসার সৈনিকদের ভারতীয় মিত্রবাহিনী বন্দি করল, তারপর থেকে আমাদের বাসায় দলে দলে মানুষ আসতে শুরু করল। এর মধ্যে রাসেল মাথায় একটা হেলমেট পরে নিল, সাথে টিটোও একটা পরল। দুইজন হেলমেট পরে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা শুরু করল। আমরা তখন একদিকে মুক্তির আনন্দে উদ্বেলিত আবার আব্বা, কামাল, জামালসহ অগণিত মানুষের জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। কে বেঁচে আছে কে নেই কিছুই তো জানি না। এক অনিশ্চয়তার ভার বুকে নিয়ে বিজয়ের উল্লাস করছি। চোখে পানি, মুখে হাসি--এই ক্ষণগুলো ছিল অদ্ভুত এক অনুভূতি নিয়ে, কখও হাসছি কখনও কান্নাকাটি করছি। আমাদের কাঁদতে দেখলেই রাসেল মন খারাপ করত। ওর ছোট্ট বুকের ব্যথা আমরা কতটুকু অনুভব করতে পারি? এর মধ্যে কামাল ও জামাল রণাঙ্গন থেকে ফিরে এসেছে। রাসেলের আনন্দ ভাইদের পেয়ে, কিন্তু তখন তার দু’চোখ ব্যথায় ভরা, মুখফুটে বেশি কথা বলত না। কিন্তু ওই দুটো চোখ যে সব সময় আব্বাকে খঁজে বেড়াচ্ছে তা আমি অনুভব করতে পারতাম।

আমরা যে বাসায় ছিলাম তার সামনে বাড়িভাড়া নেওয়া হলো। কারণ এত মানুষ আসছে যে বসারও জায়গা দেওয়া যাচ্ছে না। এদিকে আমাদের ৩২ নম্বর ধানমণ্ডির বাসা লুটপাট করে বাথরুম, দরজা-জানলা সব ভেঙে রেখে গেছে পাকসেনারা। মেরামত না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকতে হবে।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি আব্বা ফিরে এলেন বন্দিখানা থেকে মুক্তি পেয়ে। আমার দাদা রাসেলকে নিয়ে এয়ারপোর্ট গেলেন আব্বাকে আনতে। লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল সেদিন, আব্বা প্রথম গেলেন তার প্রিয় মানুষের কাছে। তারপর এলেন বাড়িতে। আমরা সামনের বড় বাড়িটায় উঠলাম। ছোট যে বাসাটায় বন্দি ছিলাম সে বাসাটা দেশ-বিদেশ থেকে সব সময় সাংবাদিক ফটোগ্রাফার আসত আর ছবি নিত। মাত্র দুটো কামরা ছিল। আব্বার থাকার মতো জায়গা ছিল না এবং কোনও ফার্নিচারও ছিল না। যা হোক, সব কিছু তড়িঘড়ি করে জোগাড় করা হলো।

রাসেলের সব থেকে আনন্দের দিন এলো যেদিন আব্বা ফিরে এলেন। এক মুহূর্তে যেন আব্বাকে কাছছাড়া করতে চাইত না। সব সময় আব্বার পাশে পাশে ঘুরে বেড়াত। ওর জন্য ইতোমধ্যে অনেক খেলনাও আনা হয়েছে। ছোট সাইকেলও এসেছে, কিন্তু কিছুক্ষণ পরপরই ও আব্বার কাছে চলে যেত।

ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা ৩২ নম্বর সড়কে আমাদের বাসায় ফিরে এলাম। বাসাটা মেরামত করা হয়েছে। রাসেলের মুখে হাসি, সরা দিন খেলা নিয়ে ব্যস্ত। এর মাঝে গণভবনও মেরামত করা হয়েছে। পুরনো গণভন বর্তমানে সুগন্ধাকে প্রধানমন্ত্রীর কর্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এবার গণভবন ও তার পাশেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কার্যক্রম শুরু করা হলো। গণভবন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসস্থান আর এর পাশেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে, ভেতর থেকে রাস্তা ছিল, হেঁটেই কার্যালয়ে যাওয়া যেত।

আব্বা প্রতিদিন সকালে অফিসে আসতেন, দুপুরে গণভবনে বিশ্রাম নিতেন, এখানেই খাবার খেতেন। বিকেলে হাঁটতেন আর এখানেই অফিস করতেন।

রাসেল প্রতিদিন বিকেলে গণভবনে আসত। তার সাইকেলটাও সাথে আসত। রাসেলের মাছ ধরার খুব শখ ছিল। কিন্তু মাছ ধরে আবার ছেড়ে দিতো। মাছ ধরবে আর ছাড়বে এটাই তার খেলা ছিল। একবার আমরা সবাই মিলে নাটোরে উত্তরা গণভবনে যাই। সেখানেও সারা দিন মাছ ধরতেই ব্যস্ত থাকতো।

রাসেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি স্কুলে ভর্তি হয়। তবে স্কুলে যেতে মাঝে মধ্যেই আপত্তি জানাত। তখন আমরা ছোটবেলা থেকে যে শিক্ষকের কাছে পড়েছি তার কাছে পড়বে না। তখন ও স্কুলে ভর্তি হয় নি এটা স্বাধীনতার আগের ঘটনা, তার পছন্দ ছিল ওমর আলীকে। বগুড়ায় বাড়ি। দি পিপল পত্রিকার অ্যাডে কণ্ঠ দিয়েছিল, টেলিভিশনে ইংরেজি খবর পড়ত। মাঝে মধ্যে আমাদের বাসায় আসত, তখন রাসেলের জন্য অনেক ‘কমিক’ বই নিয়ে আসত এবং রাসেলকে পড়ে শোনাত। যা হোক স্বাধীনতার পরে একজন ভদ্র মহিলাকে রাসেলের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো। রাসেলকে পড়ানো খুব সহজ কথা ছিল না। শিক্ষককে তার কথাই শুনতে হতো। প্রতিদিন শিক্ষয়িত্রীকে দুটো করে মিষ্টি খেতে হবে। আর এ মিষ্টি না খেলে সে পড়বে না। কাজেই শিক্ষিকাকে খেতেই হতো। তা ছাড়া সব সময় তার লক্ষ্য থাকত শিক্ষিকার যেন কোনও অসুবধা না হয়। মানুষকে আপ্যায়ন করতে খুই পছন্দ করত।

টুঙ্গিপাড়া গ্রামের বাড়িতে গেলে তার খেলাধুলার অনেক সাথি ছিল। গ্রামের ছোট ছোট অনেক বাচ্চাদের জড়ো করত। তাদের জন্য ডামি বন্দুক বানিয়ে দিয়েছিল। সেই বন্দুক বানিয়ে দিয়েছিল। সেই বন্দুক হাতে তাদের প্যারেড করাত। প্রত্যেকের জন্য খাবার কিনে দিত। রাসেলের খুদে বাহিনীর জন্য জামা-কাপড় ঢাকা থেকেই কিনে দিতে হতো। মা কাপড়-চোপড় কিনে চুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যেতেন। রাসেল সেই কাপড় তার খুদে বাহিনীকে দিত। সব সময় মা কাপড়-চোপড় কিনে আলমারিতে রেখে দিতেন। নাসের কাকা রাসেলকে এক টাকা নোটের বাণ্ডিল দিতেন। খুদে বাহিনীকে বিস্কুট লজেন্স কিনে খেতে টাকা দিত। প্যারেড শেষ হলেও তাদের হাতে টাকা দিত। এই খুদে বাহিনীকে নিয়ে বাড়ির উঠোনেই খেলা করতো। রাসলেকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করতো, বড় হয়ে তুমি কি হবে? তাহলে বলতো, আমি আর্মি অফিসার হব।

ওর খুব ইচ্ছা ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দেবে। মুক্তিযুদ্ধের চলাকালীন থেকেই ওর ওই ইচ্ছা। কামাল ও জামাল মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর সব গল্প বলার জন্য আবদার করতো। খুব আগ্রহ নিয়ে শুনতো।

রাসেল আব্বাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করতো। আব্বাকে মোটেই ছাড়তে চাইতো না। যেখানে যেখানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব আব্বা সেখানে তাকে নিয়ে যেতেন। মা ওর জন্য প্রিন্স স্যুট বানিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ আব্বা প্রিন্স স্যুট যেদিন পরতেন রাসেলও পরতো। কাপড়-চোপড়ের ব্যাপারে ছোটবেলা থেকেই তার নিজের পছন্দ ছিল। তবে একবার একটা পছন্দ হলে তা আর ছাড়তে চাইতো না। ওর নিজের আলাদা একটা ব্যক্তিত্ব ছিল। নিজের পছন্দের ওপর খুব বিশ্বাস ছিল। খুব স্বাধীন মত নিয়ে চলতে চাইতো। ছোট মানুষটার চরিত্রের দৃঢ়তা দেখে অবাক হতে হতো। বড় হয়ে সে যে বিশেষ কেউ একটা হবে তাতে কোনও সন্দেহ ছিল না।

জাপান থেকে আব্বার রাষ্ট্রীয় সফরের দাওয়াত আসে। জাপানিরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দেয়। শরণার্থীদের সাহায্য করে জাপানের শিশুরা তাদের টিফিনের টাকা দেয় আমাদের দেশের শিশুদের জন্য।

সেই জাপান যখন আমন্ত্রণ জানায় তখন গোটা পরিবারকেই আমন্ত্রণ দেয় বিশেষভাবে রাসেলের কথা উল্লেখ করে। রাসেল ও রেহানা আব্বার সাথে জাপান যায়। রাসেলের জন্য বিশেষ কর্মসূচিও রাখে জাপান সরকার। খুব আনন্দ করেছিল রাসেল সেই সফরে। তবে মাকে ছেড়ে কোথাও ওর থাকতে কষ্ট হয়। সারাদিন খুব ব্যস্ত থাকতো কিন্তু রাতে আব্বার কাছেই ঘুমাতো। আর তখন মাকে মনে পড়ত। মার কথা মনে পড়লেই মন খারাপ করতো। আব্বার সঙ্গে দেশেও বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগ দিতো। আব্বা নেভির কর্মসূচিতে যান। সমুদ্রে জাহাজ কমিশন করতে গেলে সেখানে রাসেলকে সাথে নিয়ে যান। খুব আনন্দ করেছিল ছোট্ট রাসেল।

রাসেলের একবার খুব বড় অ্যাকসিডেন্ট হলো। সে দিনটার কথা এখনও মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে। রাসেলের একটা ছোট মপেট মোটরসাইকেল ছিল আর একটা সাইকেলও ছিল। বাসায় কখনও রাস্তায় সাইকেল নিয়ে চলে যেত। পাশের বাড়ির ছেলেরা ওর সঙ্গে সাইকেল চালাতো। আদিল ও ইমরান দুই ভাই এবং রাসেল একসঙ্গে খেলা করতো। একদিন মপেট চালানোর সময় রাসেল পড়ে যায় আর ওর পা আটকে যায় সাইকেলের পাইপে। বেশ কষ্ট করে পা বের করে। আমি বাসার উপর তলায় জয় ও পুতুলকে নিয়ে ঘরে। হঠাৎ রাসেলের কান্নার আওয়াজ পাই। ছুটে উত্তর-পশ্চিমের খোলা বারান্দায় চলে আসি, চিৎকার করে সবাইকে ডাকি। এর মধ্যে দেখি কে যেন ওকে কোলে নিয়ে আসছে। পায়ের অনেকখানি জায়গা পুড়ে গেছে। বেশ গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হযেছে। ডাক্তার এসে ওষুধ দিল। অনেকদিন পর্যন্ত পায়ের ঘা নিয়ে কষ্ট পেয়েছিল। এর মধ্যে আব্বা অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাশিয়া যান চিকিৎসা করাতে।

সেখানে রাসেলের পায়ে চিকিৎসা হয়। কিন্তু সারতে অনেক সময় নেয়। আমাদের সবার আদরের ছোট ভাইটি। ওর ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। খুবই সাবধানী ছিল। আর এখন এতো কষ্ট পাচ্ছে।

১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে কামাল ও জামালের বিয়ে হয়। হলুদ ও বিয়ের অনুষ্ঠানে আমরা অনেক মজা করি। বাইরে চাকচিক্য বেশি ছিল না কিন্তু ভেতরে আমরা আত্মীয়-স্বজন মিলে অনেক আনন্দ করি। বিশেষ করে হলুদের দিন সবাই খুব রং খেলে। রাসেল ওর সমবয়সীদের সাথে রং খেলে। বিয়ের সময় দুই ভাইয়ের পাশে পাশেই থাকে। দুই ভাইয়ের বিয়ে কাছাকাছি সময়ই হয়। কামালের ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই, আর জামালের ১৭ জুলাই বিয়ে হয়। রাসেল সব সময় ভাবিদের পাশে ঘুর ঘুর করতো, আর কী লাগবে খুব খেয়াল রাখতো।

৩০ জুলাই আমি জার্মানিতে স্বামীর কর্মস্থলে যাই। রাসেলের খুব মন খারাপ ছিল। কারণ সে জয়ের সাথে এক সঙ্গে খেলতো। সব থেকে মজা করতো যখন রাসেল জয়ের কাছ থেকে কোনও খেলনা নিতে চাইতো তখন জয়কে চকলেট দিত। আর চকলেট পেয়ে জয় হাতের খেলনা দিয়ে দিত, বিশেষ করে গাড়ি। রাসেল গাড়ি নিয়ে খেলতো, জয়ের যেই চকলেট শেষ হয়ে যেত তখন বলত চকলেট শেষ, গাড়ি ফেরত দাও। তখন আবার রাসেল বলতো চকলেট ফেরত দাও, গাড়ি ফেরত দেব। এই নিয়ে মাঝে মধ্যে দু`জনের মধ্যে ঝগড়া লেগে যেত, কান্নাকাটি শুরু হতো। মা সবসময় আবার জয়ের পক্ষ নিতেন।

রাসেল খুব মজা পেত। পুতুলের খেলার জন্য একটা ছোট্ট খেলনা পুতুল ও প্রাম ছিল, ওই প্রাম থেকে খেলার পুতুল সরিয়ে পুতুলকে বসিয়ে ঠেলে নিয়ে বেড়াত। পুতুল এত ছোট ছিল যে, খেলার প্রামে ভালোই বসে থাকতো। রাসেল খুব মজা করে জয়-পুতুলকে নিয়ে খেলত। আমি জার্মানি যাওয়ার সময় রেহানাকে আমার সাথে নিয়ে যাই। রাসেলকে সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু ওর জন্ডিস হয়, শরীর খারাপ হয়ে পড়ে। সে কারণে মা ওকে আর আমাদের সাথে যেতে দেননি। রাসেলেকে সেদিন আমাদের সাথে নিয়ে যেতে পারতাম তা হলে ওকে আর হারাতে হতো না।

১৯৭৫ সালের পনের আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেট কেড়ে নিল ছোট্ট রাসেলকে। মা, বাবা, দুই ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, চাচা সবার লাশের পাশ দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে সবার শেষে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করল রাসেলকে। ওই ছোট্ট বুকটা কি তখন ব্যথায় কষ্টে বেদনায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যাদের সান্নিধ্যে স্নেহ-আদরে হেসে খেলে বড় হয়েছে তাদের নিথর দেহগুলো পড়ে থাকতে দেখে ওর মনের কী অবস্থা হয়েছিল- কী কষ্টই না ও পেয়েছিল- কেন কেন কেন আমার রাসেলকে এত কষ্ট দিয়ে কেড়ে নিল? আমি কি কোনোদিন এই `কেন`র উত্তর পাব