Saturday, June 29, 2013

শিবিরের রগকাটা অপারেশন

আমি সেই দিন হবো শান্ত-যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না -অত্যাচারীর খড়গকৃপাণ ভীমরণভূমে রনিবে না

প্রিয় কবির প্রিয় কবিতা- আমার বন্ধুদের জন্যে- যদি আর বাঁশি না বাজে -সকলের বাঁচার মাঝে আমি বাঁচবো

Friday, June 28, 2013

‘অপাপনারী’ আমি নারীসাংবাদিক; এসেছি পাপের কূলে.. সুমি খান


‘অপাপনারী’ আমি নারীসাংবাদিক; এসেছি পাপের কূলে...
সুমি খান, অতিথি লেখক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
08 Mar 2012 09:38:29 PM Thursday BdST

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছিলো “ওহে, অপাপপুরুষ দীনহীন আমি এসেছি পাপের কূলে, প্রভু দয়া কোরো হে ,দয়া কোরো হে ,দয়া করে লও তুলে। আমি জলের মাঝারে বাস করি, তবু তৃষায় শুকায়ে মরি। প্রভু দয়া করো হে, দয়া করে দাও সুধায় হৃদয় ভরি।..”

আমি একজন মানুষ। পেশায় সামান্য একজন সংবাদকর্মী। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আমি কাজ করেছি, সেখানে যারা নীতিনির্ধারকের দায়িত্বে ছিলেন এবং এখনো আছেন, তাদের অনেকের কাছে আমার প্রথম পাপ আমি নারী হয়ে এদেশে জন্মেছি, দ্বিতীয় পাপ আমি সাংবাদিকতা পেশায় দায়বদ্ধ থাকতে অঙ্গীকারাবদ্ধ।

মাঝে মাঝে কলম অথবা কী বোর্ডে আঙুল চালাতে গিয়েও হাত থেমে যায়। গভীর বেদনা বাজে কণ্ঠে; এক অন্ধকার থেকে আরো জমাট অন্ধকারের গহ্বর থেকে এক নারীসাংবাদিক আমি বলে উঠি, ‘ আমি কোনো পাপ করিনি। অপাপনারী আমি এসেছি পাপের কূলে।’
আজ মহান নারীদিবস। নারী শ্রমিকদের আত্মদানের স্মৃতিতে বিশ্বজুড়ে আট মার্চ পালিত হয় দিবসটি; তাদের প্রতি আমার লাল সালাম। অচলায়তন ভাঙার কাজটি করেছিলেন জার্মানির কম্যুনিস্টনেত্রী ক্লারা জেটকিন(Clara Zetkin)ও লুইস জাইৎস (Luise Zietz)। প্রতিবছর আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের জন্য ১৯১০ সালের দিকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেশ করেন জার্মান কম্যুনিস্ট নারীনেত্রী লুইস জাইৎস। আর তাতে সমর্থন দেন অপর জার্মান কম্যুনিস্ট নারীনেত্রী ক্লারা জেটকিন(Clara Zetkin)। পরে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক ব্লকের দেশগুলোতে নারীদিবস পালিত হতে থাকে। রাশিয়ায় তা দিবসটি প্রথম পালিত হয় ১৯১৩ সালে। তার অনেক পরে ১৯৭৪ সালের দিকে জাতিসংঘ দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। এই দিবসটাকে প্রতিবছর পালন করা উচিত। যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাসের রক্তাক্ত সেই অধ্যায়কে জানতে পারে; আর এটা শুধু নারীদের দিন নয়, বরং নারীর ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল এক সর্বজনীন দিন যা নারী-পুরুষ সবার সমঅধিকার ও সম-বিকাশের কথা বলে।
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোরের পুরো পোর্টাল যেন আজ নারী দিবসকে উৎসর্গ করেছে। দেখে বেশ ভালোই লাগলো। এর প্রধান সম্পাদক আমাদের শ্রদ্ধেয় ব্যতিক্রমী সাংবাদিক-ব্যক্তিত্ব আলমগীর হোসেনের প্রতি মনে মনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। এতোদিনে অন্তত মুক্তভাবে কথা বলার একটি জায়গা তৈরি হলো। ভালো লিখছেন ফজলুল বারী ভাই, ফারজানা খান গোধুলী, শাহনাজ মুন্নী, সঞ্জীব রায়, আদিত্য আরাফাত, মাহমুদ মেনন, আমার ছোটবোন জাকিয়াসহ আরো অনেকেই। অব্যাহত থাকুক এই যাত্রা।

তবে বিভিন্ন নিউজপোর্টালসহ জাতীয় এবং চট্টগ্রামের স্থানীয় দৈনিকে নারী দিবস নিয়ে প্রকাশিত লেখাগুলো পড়তে গিয়ে হাসি আটকাতে পারলাম না (আমি বংশগতভাবে হাসির ব্যারামে আক্রান্ত বলেই হয়তো!)।
মিডিয়া হাউজগুলোর দায়িত্বশীলদের ভণ্ডামির (হিপোক্রেসি) বোধহয় কোন সীমা থাকতে নেই। আজকের দিনে তার দরকারও হয়তো নেই। তবে প্রতিবাদী মন জেগে ওঠে।
মনের ভেতর কে যেন ডাক দিয়ে বলে যায়, সৎ সাংবাদিকতায় দায়বদ্ধ থাকবার ‘অপরাধে ’(?) মিডিয়ার ক্ষমতাসীন ‘জিম্মাদার’ সুশীল-কুশীলদের অন্যায়, হীনমন্যতা, মানসিক পীড়নের শিকার হচ্ছি যারা, তাদের কথা বলার সময় এসে গেছে। লেখার প্রচণ্ড তাগিদ অনুভব করলাম।
এই আত্মকথনের ব্যাখ্যা যে যার মতো করে করতে পারেন, (যা আমাদের সহকর্মীরা করে থাকেন) তাতে আমার কিছুই যায় আসে না।
আজ এ মহান দিনে শুরু করলাম ইতিহাস বা আত্মকথন লেখা। যেকোনো সময় আমার মৃত্যু অবধারিত। আমি নিশ্চিত আমার মৃত্যুর পর আমার পরবর্তী প্রজন্মের মাধ্যমে অব্যাহত থাকবে সাংবাদিকতা জগতের অকপট উন্মোচন।
স্কুলজীবনে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা শুরু করি; সে ১৯৮৫-’৮৬ সালের কথা। ১৯৯১ সালে আমার বিয়ের পর সদ্যবিবাহিত স্ত্রীকে লেখালেখিতে দেখতে চান আলেক্স আলীম (যদিও আমার একই অনুরোধ তার প্রতি, যার এখনো কোনো গুরুত্ব নেই)। তারই নিয়ত অনুপ্রেরণায় (এখনো আমার লেখালেখিতে তার তাগিদই বেশি) রিপোর্টিং শুরু ১৯৯৩ সালে। রক্ষণশীল ঘরের ছোটবৌ, সূর্যাস্ত থেকে মধ্যরাত অব্দি সাংসারিক কাজে বন্দি । তবু একটু মানসিক প্রশান্তির জন্যে ফাঁক বুঝে রিপোর্টিং শুরু করি আলেক্স আলীমের অনুপ্রেরণায়, বাবা ভাষাবীর সাইফুদ্দিন খানের হাত ধরে । যিনি নিজেও দৈনিক সংবাদে বেশকিছু লেখালিখি করেছেন।
দৈনিক ভোরের কাগজের স্থানীয় সাপ্তাহিক পাতা ‘চলমান চট্টগ্রামে’ কাজ করতে থাকলাম ১৯৯৩ সাল থেকে। এর আগে আজাদী,পূর্বকোণে নিয়মিত কলাম এবং প্রতিবেদন লিখেছি। আজাদীর নারীপাতার দায়িত্বে এখনো আমার বন্ধু সানজিদা মালেক। তাকে একদিন অনুরোধ করেছিলাম তার বাবা এবং আজাদীর সম্পাদক এমএ মালেককে আমার কথা যেন বলে, আমি সাংবাদিকতা করতে চাই। এর ক’দিন পর সানজিদা জানায়, “আব্বুকে বলেছি, আব্বু তো কোনোভাবেই রাজী হলো না।” অপরাধ কি জানি না। তবে সেখানে কাজ করার ‘বিশেষ যোগ্যতা ’ দরকার, যা আমার নেই- বুঝে গেলাম। ‘চলমান চট্টগ্রামে’ কয়েকটি মূল প্রতিবেদন প্রকাশিত হবার পর দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছে আবেদন করলাম নিয়মিত সংবাদকর্মী হিসেবে কাজে যুক্ত হবার।
সুশীল সমাজের অন্যতম ধারক-বাহক বুদ্ধিজীবীর পক্ষ থেকে এর যা জবাব পেলাম, এখনো চোখে ভাসে-কানে বাজে। বললেন, “ চট্টগ্রামে তো মেয়েদের সাংবাদিকতা করার পরিবেশ নেই। তুমি এতো পরিশ্রমী, এতো রাত পর্যন্ত কাজ করে রিপোর্ট আমার হাতে দিয়ে যাও!!.. ফ্রিল্যান্স করো, খারাপ কী?” হতোদ্যম হইনি, পূর্ণোদ্যমে কাজ করে যাই নীরবে।
এখন চট্টগ্রামে অনেক নারীসাংবাদিক, সেই বুদ্ধিজীবীর দৃষ্টিতে নারীর জন্যে সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে কিনা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। তবে কোনও দায়িত্বহীন কাজ না করলেও, আমাকে সুশীল সমাজের যোগ্য কখনোই মনে করেননি সুশীল সমাজের ধারক-বাহকেরা। সে নাহয় নাইবা হলো। কিন্তু নষ্ট সাংবাদিকদের সিন্ডিকেটবাজীর কাছে জিম্মি করা হবে কেন আমাদের?

১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হতে যাচ্ছিলো দৈনিক যুগান্তর। এর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ করে দিলেন চট্টগ্রামের ব্যুরো চিফ জসীম চৌধুরী সবুজ। এজন্যে তার কাছে কৃতজ্ঞ আমি। এর এক বছরের মাথায় ২০০০ সালের নভেম্বরে এক কিশোরী গৃহকর্মীকে ধর্ষণ করে চারতলা থেকে ফেলে দেয়ার অভিযোগ ওঠে যমুনা অয়েলের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের ২৪ নম্বর বেডে শয্যাশায়ী নির্যাতিত কিশোরীটির কোমর থেকে পা পর্যন্ত প্লাস্টার করা। ভাঙা হাড়ের প্রচণ্ড ব্যথায় কোঁকাচ্ছিলো কিশোরীটি। কয়েকজন সাংবাদিককে দেখলাম হাসপাতালে। নির্যাতিত মেয়েটির ছবি তুললেন প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিক। আমার অনুরোধে এক কপি ছবি দিলেন তিনি আমাকে।
অভিযুক্ত সেই কর্মকর্তার সৌভাগ্য, তিনি দুই জাতীয় দৈনিকের দু’জন প্রভাবশালী সাংবাদিকের স্বজন। প্রেসক্লাব, সিইউজে একাট্টা হলো এই ভয়াবহ সংবাদ ধামাচাপা দেয়া হবে। আমি তৎকালীন বার্তা সম্পাদকের মোবাইলে ফোন করে পুরো পরিস্থিতি জানালাম। তিনি রিপোর্টটি পাঠাতে বলেন। সে সময়ে ব্যুরোচিফ সম্পাদকের কন্যার বিয়েতে ঢাকায় ছিলেন। তার পরবর্তী জন বামপন্থী ছাত্রনেতা বেশ গম্ভীর ভাবে বললেন , এই রিপোর্ট আপনি পাঠাবেন না ঢাকায়। পুরুষ হিসেবে তিনি দায়িত্বশীল পদে থাকলেও কাজে তিনি আমার জুনিয়ার। প্রশ্ন করলাম,“ কেন পাঠাবো না? ” কোনও জবাব দিলেন না তিনি। আমি নিজেই বার্তাসম্পাদককে পাঠিয়ে দিই সেই রিপোর্ট এবং ছবি। পরদিন ২০০০ সালের ২৫ নভেম্বর যুগান্তরের ভেতরের পাতার নিচের দিকে ছোট করে সংবাদটি প্রকাশ হয়। একই দিন সংবাদ, আজাদী, মুক্তকন্ঠ, এবং দৈনিক কর্ণফুলী নিজেদের মতো করে সংবাদটি প্রকাশ করেছে। প্রথমআলো, জনকন্ঠ এবং অন্যান্য কিছু পত্রিকার চট্টগ্রাম অফিস থেকে দায়িত্ব নিয়েই হত্যা করা হলো এই সংবাদ। আজাদী ‘জ্বীনের ধাক্কা ?’ শিরোনামে এক কলাম লিড, সংবাদ পেছনের পাতায় শেষ কলাম। দেখলাম একই ছবি ছেপেছে সবাই।অন্য তিনজন পুরুষ হবার সুবাদে বেঁচে গেলেও আমি ‘নারীসাংবাদিক’।
ধর্ষণের হুমকি দিলেন প্রথম শ্রেণীর দৈনিকের তখনকার একজন সিনিয়র সাংবাদিক(বর্তমানে একটি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার চট্টগ্রাম এক্সিকিউটিভ)।
তিন দিন পর্যন্ত অবলীলায় এই হুমকি দিতে থাকলেন সেই সাংবাদিক। শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্বিগ্ন অনুরোধে আবাসিক সম্পাদককে রাতে ফোন করলাম। প্রশ্ন করলাম, তার উপস্থিতিতে তারই অফিস থেকে একজন সাংবাদিক আরেকজন সহকর্মীকে তিন দিন ধরে প্রকাশ্যে এই হুমকি কী করে দিয়ে যায়? এভাবে আর কতোদিন চলবে? বেশ উত্তেজিত কন্ঠে তিনি আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “ তোমরাও সাংবাদিকতা শিখেছো, আমাদেরকে সাংবাদিকতা শেখাচ্ছো? একটা কাজের মেয়ে রেপড হলো কি হলো না সেটা নিয়েও রিপোর্ট করতে হয়?..”
এর পরের কথাগুলো সে অনেক বেদনার, অনেক ভয়ংকর কথা; অন্যদিন লিখবো। তবে জানিয়ে রাখি, আবাসিক সম্পাদকের প্রশ্রয় পাচ্ছে বুঝতে পেরে সুশীল সমাজের ধারক-বাহক পত্রিকাটির সম্পাদককে দু’পাতার একটি চিঠি লিখি। সঙ্গে অন্য চারটি পত্রিকায় প্রকাশিত একই সংবাদের ফটোকপি। তাতে লিখেছিলাম, এই সাংবাদিক সম্প্রতি কন্যাসন্তানের জনক হয়েছেন শুনেছি। তার কন্যার নিরাপদ ভবিষ্যৎ কামনা করি আমি।(এই চিঠির কপি এখনো আমার কাছে আছে)।
অবাক ব্যাপার এরপরও প্রকাশ্যে অব্যাহত থাকে এই হুমকি। তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
অথচ আমার বিরুদ্ধে যুগান্তর থেকে পরপর তিনবার শোক’জ করলেন ব্যুরোচিফ।বার্তা সম্পাদক কোনও দায়িত্ব নিলেন না। ইউনিয়নের ভোট হারানোর ভয় ছিলো হয়তো। তার ভোটাররা পুরুষ ছিলেন যে!
যুগান্তরের পিয়ন সিরাজ ভাই তৃতীয়বার শোক’জ এর চিঠি এনে দরোজায় কলিংবেল দিতেই বাবা সেই চিঠির কথা জেনে গেলেন। এতোদিন জানাইনি বাবাকে। বাবা বিস্মিত হলেন। এর কারণ পরে বলা যাবে।তিনি নিজের হাতে আমার রেজিগনেশান লেটার লিখে দিলেন। সেই সাংবাদিকের উন্মত্ততায় উদ্বিগ্ন হয়ে সহকর্মী সুহৃদরা বললেন সেই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে। এক সময়ে অভিযোগটি মামলা হিসেবে নিতে হবে, চট্টগ্রামের চার সিনিয়র এবং শীর্ষ সাংবাদিক এগিয়ে এলেন। বললেন তারা আদালতে দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দেবেন। এতে ভয় পেয়ে পত্রিকার সহকারী আবাসিক সম্পাদক এই হুমকিদাতা সাংবাদিক এবং আমাদের এক বন্ধু পুলিশ কর্মকর্তাকে সাথে নিয়ে আমার বাড়িতে এসে ক্ষমা চাইলে মামলা তুলে নিয়েছিলাম। এরপর সাক্ষীদের কটাক্ষ করে ‘রাজসাক্ষী’ ডাকতেন ধর্ষণের হুমকিদাতা নির্লজ্জ বেহায়া সেই সাংবাদিক। এতোটাই বেহায়া হয় অপরাধীরা, সম্প্রতি ফেসবুকে আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতেও দ্বিধা হয়নি তার।
ধর্ষকগোষ্ঠী এবং চট্টগ্রামের তৎকালীন সাংবাদিকসমাজ প্রেসক্লাবে বৈঠক করলেন। তাদের চাপে আমাকে যুগান্তরের চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হলো। ২০০০ সালের নভেম্বরেই সাপ্তাহিক ২০০০ এর চট্টগ্রাম প্রতিনিধির দায়িত্ব পেলাম।
সুশীল সমাজের প্রদতনিধি এই বুদ্ধিজীবী এবং সাংবাদিকদের ‘কীর্তিময়’ কিছু কথা আজ মনে পড়ছে খুব। সেই পত্রিকায় লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে ক’জন সাংবাদিক নিয়োগ দেয়া হয়। কোনও এক কারণে পরীক্ষায় প্রথম স্থান পাওয়া ছাত্রটিকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় স্থান পাওয়া এক ছাত্রীকে নিয়োগ দেন দায়িত্বশীল ব্যক্তি ।পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে লাশ পাওয়া গিয়েছিলো এক নারীর । তাকে নিয়ে বেশ রগরগে ‘পরকীয়া ’ র কাহিনী তুলে ধরেছিলো এই নারীসাংবাদিক তার রিপোর্টে । আরেকটি রিপোর্টের কথা মনে পড়ছে; চট্টগ্রাম সরকারী কলেজের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে পরীক্ষার হলে শ্লীলতাহানির অভিযোগ এনে প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয় সেই রিপোর্ট। সেই শিক্ষকের অনেক সহকর্মীর ক্ষুব্ধ প্রশ্ন ছিলো: পরীক্ষার হলে শ্লীলতাহারন সম্ভব কিনা।তাদের বক্তব্য, সেই শিক্ষকের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে একটি গোষ্ঠি এই প্রতিবেদনটি করিয়েছে। যার শাস্তি হিসেবে তাকে উত্তরবঙ্গে বদলি করা হয়। সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে রেখে তাকে চলে যেতে হয়েছিলো। সেই সময়ে দৈনিক পত্রিকায় চট্টগ্রামে একমাত্র নারীসাংবাদিক হবার বিশাল কৃতিত্ব এখনো গর্বের সাথে উচ্চারণ করেন তিনি। যা লিখছিলাম, প্রথম শ্রেণীর দৈনিকে সাংবাদিকতার গরবে গর্বিত এই নারীসাংবাদিক অবশ্য বিয়ের পর সেই চাকরি ছেড়ে কিছুদিন একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে জনসংযোগ কর্মকর্তার চাকরি করেন। সাংবাদিকতা পাঠ্য হলেও সাংবাদিকতা তাদের ধ্যানজ্ঞান হতে হবে এমন কোনও কথা নেই। সাংবাদিকতার নীতি নৈতিকতাও সবার জন্যে বাধ্যতামূলক নয়।তবু তাদের চাকরি খুবই সহজলভ্য। এই অসম সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন আনন্দের বটে। তবে সততার সাথে হলে আনন্দটি নি:সন্দেহে অন্যরকম হয়!!
নারীসাংবাদিক অথবা পুরুষ সাংবাদিক যেই হই, আমরা যারা এই পেশাকে ধ্যান-জ্ঞান , জীবন-মরণ ভেবে অন্য পেশার সব প্রলোভন ছুড়ে ফেলে দিই, আমাদের জন্যে প্রতিটি মুহূর্ত যারা প্রতিকূল করে তুলেছে, তাদের মুখোশ খুলে দেয়ার দিন এসেছে। কারণ এখনো সৎকাজ তাদের সিন্ডিকেটবাজীর কাছে জিম্মি হয়ে আছে। এভাবে আর চলতে দেয়া যায় না।আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন অন্তত তাদের প্রতিকূলতার শিকার না হয়। তাই বন্ধুর পথের সহযাত্রী বন্ধুদের কথা বলে যাবো এভাবেই । শুরু হলো আরো বন্ধুর পথে চলা। সারা দেশে আমার যতো সহকর্মী ভাইবোন সৎ এবং নির্ভীক সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠার জন্যে নিরন্তর সংগ্রাম করে যাচ্ছেন তাদের সবার প্রতি নিরন্তর শুভকামনা । আজকের এই মহান দিনে আসুন হাতে হাত মিলিয়ে প্রতিরোধ করি যতো অন্যায় আর নিপীড়ন।

Tuesday, June 25, 2013

সালাম আম্মা জাহানারা ইমাম !!!


শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ১৯ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ! দীর্ঘদিন ক্যান্সারে ভুগে ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের ডেট্রয়েটের একটি হাসপাতালে মারা যান জাহানারা ইমাম । একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূলে নেতৃত্ব দেবার 'অপরাধে' স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলা মাথায় নিয়েই প্রয়াত হন নিবেদিতপ্রাণ মেধাবী মহিয়সী সাহসী যোদ্ধা এবং শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ।


১৯২৯ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে তার জন্ম। সরকারী কর্মকর্তা সৈয়দ আবদুল আলির সাত সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ সন্তান জাহানারা ইমাম কে সর্বোচ্চ মিক্ষায় শিক্ষিত করার সব রকমের চেষ্টা করেছেন তার পিতা সৈয়দ আবদুল আলি এবং মাতা হামিদা আলি । ১৯৪৫ সালে রংপুরের কারমাইকেল কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়েন। এ সময়ে তার সাথে বন্ধুত্ব হয় কলেজের কৃতি ছাত্র শরীফুল আলম ইমাম আহমেদ এর সাথে। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর কোলকাতায় লেডি ব্রেবোর্ণ কলেজে ভর্তি হন জাহানারা ইমাম। সেখানে বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন তিনি। সেখান থেকে ১৯৪৭ সালে তার গ্র্যাজুয়েশান শেষ করেন। '৪৭ এর দেশভাগের পর তার বাবা-মায়ের কাছে ময়মনসিংগে এসে বিদ্যাময়ী সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৪৮ সালে তার বিয়ে হয় প্রকৌশলী শরীফুল আলম ইমাম আহমেদ এর সাথে। তারা ঢাকায় চলে আসেন। সিদ্ধেশ্বরী গার্লস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকার পদে যোগ দেন জাহানারা ইমাম।

'খাওয়াতিন' নামে একটি মাসিক পত্রিকার প্রথম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন জাহানারা ইমাম ১৯৫২ সালে। পরবর্তী কয়েক বছর তিনি সফলতার সাথে এই পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন। ১৯৫২ এবং ১৯৫৪ সালে তার দুই পুত্র রুমী এবং জামীর জন্ম হয়। ১৯৬০ সালে প্রধান শিক্ষকের চাকরি ছেড়ে দিলেন সন্তান দের জন্যে। এসময় বললেন , " আমি হাজার হাজার সন্তানের শিক্ষা দিয়েছি। এখন আমার দুই সন্তানকে গড়ে তোলার জন্যে কিছু সময় দিতে হবে।"

এ সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যে এম এ ডিগ্রি অর্জন করেন। এর পর তিনি পুরোপুরি শিক্ষকতায় নিয়োজিত হন। ১৯৬৬ থেকে '৬৮ ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষকতা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইন্সটিটিউটে খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে ও কয়েক বছর ছিলেন। তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শিক্ষকতায় দেন তিনি। ১৯৬৪-৬৫ সালে ফুলব্রাইট স্কলার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্যান ডিয়েগো বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রিত হন। পরবর্তীতে আবারো ১৯৭৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আমন্ত্রনে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন তিনি।

১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী তাদের এদেশীয় সহযোগী বাহিনী রাজাকার আলবদর দের সাথে নিয়ে নিরীহ বাঙ্গালী দের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লে
তাদের প্রতিহত করতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন জাহানারা ইমামের পুত্র গেরিলা যোদ্ধা শফি ইমাম রুমি । বেশ কিছু অপারেশনে সরাসরি অংশ নেন তিনি। পাকিস্তানী সেনারা এক রাতে তুলে নিয়ে যায় রুমি এবং তার পিতা প্রকৌশলী শরীফুল আলম ইমাম আহমেদ কে। অত্যাচারিত নির্যাতিত শরীফুল ইমাম মৃত্যুবরণ করেন ১৩ ডিসেম্বর ।মায়ের কোলে আর ফিরে এলেন না রুমি।

১৯৯২ সালে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ গঠনের সময়ে বেগম সুফিয়া কামাল তার বাড়িতে বসে প্রস্তাব করেন জাহানারা ইমামকে এর দায়িত্ব দেবার জন্যে। জননী সাহসিকার সিদ্ধান্ত তখন শিরোধার্য। কারণ , তার দূরদর্শীতার কাছে সবাই পরাজিত হয়েছে।! এর ধারাবাহিকতায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন যুদ্ধাপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির নেতৃত্ব দেন শহীদ রুমির মা জাহানারা ইমাম। ক্যান্সার নিয়েও একাত্তরের ঘাতকদের বিচারের দাবিতে সক্রিয় আন্দোলন চালিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হন তিনি । ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত জাহানারা ইমামের আত্মজীবনীমূলক‘ গ্রন্থ একাত্তরের দিনগুলি’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি অসাধারণ দলিল। এছাড়া আরো ৭টি গ্রন্থ রয়েছে তার 'বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার' সহ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হন জননী জাহানারা ইমাম! সারা জাতি আজ তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে।

Monday, June 24, 2013

হেফাজতে ইসলাম: কওমি শিক্ষা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা: শিক্ষা কোন মিডিয়ামে হবে?


গত ২২ জুন ২০১৩, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কার্যালয়ে 'হেফাজতে ইসলাম : কওমি শিক্ষা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় চার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন হেফাজতে ইসলামের একজন প্রতিনিধি। আলোচনায় বাংলাদেশের রাজনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা এবং ধর্মীয় চেতনার পারস্পরিক সম্পর্কের পাশাপাশি বেরিয়ে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ বহু পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ।
শিক্ষা যদি চরিত্র গঠন এবং পেশা সৃষ্টিতে সাহায্য করে, তবে ইসলামি শিক্ষারও প্রয়োজন আছে। এটা আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে-- শুধু ইসলামি শিক্ষা দিয়ে হবে না। আরও কিছু শেখা প্রয়োজন। মাদ্রাসা শিক্ষা একপেশে শিক্ষা। শুধু চরিত্র গঠন করে কিছু হবে না। যদি অন্যান্য শিক্ষা গ্রহণ না হয়। তাহলে আপনি আধুনিক পৃথিবীর প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাবেন। --সলিমুল্লাহ খান
অংশগ্রহণ করেছেন

অধ্যাপক সালাহউদ্দীন আহমদ : জাতীয় অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম : ইতিহাসবিদ ও বাংলাপিডিয়ার সম্পাদক

মওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : ইসলামি চিন্তাবিদ ও শোলাকিয়ার ইমাম

অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান : অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক

মুফতি মিযানুর রহমান সাইদ : অন্যতম আহ্বায়ক, হেফাজতে ইসলাম

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা : বৈঠক সঞ্চালক

মুহম্মদ নূরুল হুদা :
আজকে আমাদের গোলটেবিল বৈঠকের বিষয় হল কওমি শিক্ষা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। কওমি শিক্ষা আমাদের উপমহাদেশে নতুন কোনো বিষয় নয়। এর রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। সেই ইতিহাস বিষয়ে আমাদের এখানে দুজন ইতিহাসবিদ উপস্থিত আছেন, তারা বলবেন। আর কওমি শিক্ষা সম্পর্কে এখানে উপস্থিত রয়েছেন দুজন ইসলামি চিন্তাবিদ, তারা বলবেন। সেই সঙ্গে আমাদের এখানে উপস্থিত রয়েছেন নতুন প্রজন্মের একজন দার্শনিক ও চিন্তাবিদ। আমরা তার কাছ থেকেও এ বিষয়ে জানব। আমি প্রথমেই অধ্যাপক সালাহউদ্দীন আহমদকে তার বক্তব্য প্রদানের জন্য অনুরোধ করছি।


অধ্যাপক সালাহউদ্দীন আহমদ :
একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে আমার মনে হয় যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার যে উন্মেষ ও বিকাশ ঘটেছে সেটা আমাদের জানা একান্ত প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দুই ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এক. আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা বা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা। দুই. মাদ্রাসা শিক্ষা বা ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা।

এ দুটি ব্যবস্থা নিয়ে আজকে যে সংকট এবং বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে এতে দুটো মাইন্ডসেট কাজ করে। ফলে দুই ধরনের চিন্তাধারা দেখতে পাওয়া যায়। এ জন্য অবশ্যই শিক্ষার ইতিহাস জানা দরকার।

আমাদের উপমহাদেশে মুসলমানরা শাসন করেছে বহুদিন। প্রাক-ব্রিটিশ যুগে আমাদের দেশে যে শিক্ষাব্যবস্থা ছিল সেটা মুসলমানদের জন্য মক্তব এবং মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা ছিল। মক্তবে ছিল প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা আর মাদ্রাসায় উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থা। ১৮০০ শতকের শেষ নাগাদ এসে ব্রিটিশ সরকার মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে। তার আগে কিন্তু সরকারি ব্যবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। এদের পৃষ্ঠপোষকতায় মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা চালু হয়। ওই সময় হিন্দুদের জন্য পাঠশালা এবং টোল ছিল। পাঠশালা হল প্রাইমারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং টোল হল উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রথম সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপমহাদেশে ইংরেজরাই প্রতিষ্ঠা করেছে। ১৭৮০ সালে তাদের উদ্যোগে প্রথম ওয়ারেন হেস্টিং কলকাতায় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই ছিল প্রথম সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কেন করলেন? কারণ তখন সরকারি ভাষা ছিল ফার্সি। ইংরেজরা এ দেশে হঠাৎ করে আসেননি। তারা এসেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে ব্যবসায়ী হিসেবে। ঘটনাচক্রে যখন তারা এ দেশে আসেন তখন এখানকার ভাষা জানতেন না। এ দেশে যখন দুই জাতির মধ্যে অরাজকতা সৃষ্টি হয়, সেই সুযোগে তারা ক্ষমতা গ্রহণ করে। যেহেতু তারা ছিল ব্যবসায়ী কাজেই তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ব্যবসা। তারা সবকিছুই ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখত। তাই হিন্দু-মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তারা নাক গলাত না। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠিত যে শাসনব্যবস্থা ছিল সেটাতেও তারা হস্তক্ষেপ করতে চায়নি। ফার্সি ভাষা ইংরেজরাও জানতেন। তাই এ ভাষাতে প্রশাসনিক কাজ চলত। বিশেষ করে বিচারকাজ। এ ব্যবস্থা বেশ কিছুদিন চলছিল। ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত এ ব্যবস্থা ছিল। এ পর্যন্ত মাদ্রাসা ছিল গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯ শতকের প্রথম দিকে বিলেতে সংস্কার আন্দোলনের শুরু হয়। যার ফলে মানুষের মধ্যে একটা ধারণা জন্মায় যে, এই শিক্ষাব্যবস্থা পুরনো ব্যবস্থা। এই যে ফার্সি ভাষায় জ্ঞানদান হচ্ছে, এটা বদলাতে হবে। এখন দরকার মডার্ন অ্যাডুকেশন। ফার্সি ভাষাকে ট্রান্সফার করতে হবে। প্রশ্ন উঠতে পারে শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? যে শিক্ষা কাজে লাগবে সেটা শিখতে হবে। লর্ড ব্যান্টিংয়ের সময় থেকে আরবি ও ফার্সি ভাষায় শিক্ষার সংস্কার কাজ চালু হয়। কেননা এটা ছিল ইউজলেস শিক্ষা। ফার্সি ভাষার মধ্যে যে জ্ঞান রয়েছে সেটা অনেক উঁচু স্তরের। কিন্তু তা যুগের প্রয়োজনে টিকতে পারে না। সে জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা তুলে দেওয়ার কথা ওঠে।

১৭৯২ সালে বেনারসে এবং পরে কলকাতায় ইংরেজি ব্যবস্থামুখী আধুনিক শিক্ষা চালু হয়। তখন একটা তীব্র প্রতিবাদ দেখা দিয়েছিল। সুদীর্ঘ মুসলিম আমলে অনেকে ফার্সি শিখেছিলেন। এমনকি রাজা রামমোহন রায়ও ফার্সি শিখেছিলেন। তার প্রথম বই বের হয়েছিল ১৮০৩ সালে। এই উপমহাদেশে তিনিই প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশ করেন ফার্সি ভাষায়। হিন্দুরা মুসলমানদের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবমুখী ছিল। তারা প্রয়োজনে নিজেদের বদলিয়েছে কিন্তু মুসলমানরা সে রকম ছিল না।

১৮১৬ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রথম ইংরেজদের মাধ্যমে এ দেশের মানুষ আধুনিক শিক্ষা ও সভ্যতার সংস্পর্শে আসে। হিন্দুরা এ ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করেননি। তারা বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু মুসলমানরা বিষয়টিকে গ্রহণ করে না। তারা তীব্র প্রতিবাদ জানায়। মুসলমানরা মনে করেছে, এতে আমাদের ইসলাম এবং ইসলামি চিন্তাধারা নষ্ট হবে। ইংরেজরা ভাবল, এরা না চাইলে এদের ঘাটাব না। ফলে মাদ্রাসা থেকে গেল। কিন্তু মাদ্রাসায় কীভাবে শিক্ষাব্যবস্থা চলছে? দেখা গেল সেখানে যে সমস্ত বিষয় পড়ানো হয় এবং যেভাবে শিক্ষা দেওয়া হয় তা বাস্তবমুখী নয়। সেগুলো হাজার বছরের পুরনো।

মুহম্মদ নূরুল হুদা :

স্যার আপনি যে পর্যায়ে এসে উপস্থিত হয়েছেন সেটি হল ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার ধারা। আমরা এবার এই ধারার শুরু ও তা কীভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে এবং সমাজে এর প্রভাব কিরূপ-- এসব বিষয়ে শুনব মওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের কাছ থেকে।


মওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ :
কওমি মাদ্রাসার শুরুটা হয়েছিল মূলত রসুলে করীম (সা:)-এর সময় থেকে। হিযরতের পর এ শিক্ষার দিকে তিনি নজর দেন। মসজিদে নববির চত্বরে শিক্ষার্থীদের নিয়ে তিনি কওমি মাদ্রাসা চালান। সেখানে যেসব শিক্ষার্থী ছিল তাদের তিনি খোরপোষেরও ব্যবস্থা করেছিলেন। এর মধ্যে আবু হুরায়রা (রা:) ছিলেন। এভাবে অগ্রসর হতে হতে উমাইয়াদের যুগ, আব্বাসীয় যুগসহ আরও অনেক সময় পার হয়ে ওসমানী সাম্রাজ্য অতিক্রম করেও এ শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল। আমি অত বিস্তারিত যাব না। সংক্ষেপে বলছি। শ্রদ্ধেয় প্রফেসর সালাহউদ্দীন সাহেব যেমন বলেছেন মাদ্রাসা শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা ছিল। এটি সে সময় শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, অমুসলিমরাও এ শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। প্রচুর অমুসলিম মাদ্রাসা শিক্ষা থেকে ডিগ্রি লাভ করেছেন। সালাহউদ্দীন সাহেব যেমন রাজা রামমোহনের কথা বলেছেন। যিনি ফার্সি শিখেছিলেন।

পরবর্তীতে মুসলমানদের পক্ষ থেকে যখন বহু প্রতিক্রিয়া হয় তখন ইংরেজরা কলকাতায় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে। ঐ প্রতিষ্ঠার একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া নয়; বরং তাদের উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের বিদ্রোহ প্রশমন করা। আর ছিল মুসলমানদের পরাধীন করে রাখা। এমনকি আমি বলব, মীর জাফর মনে করেছিলেন, সিরাজুদ্দৌলার মতো তরুণের হাতে যদি ক্ষমতা আসে তাহলে ক্ষমতাকে সংকুচিত করা যাবে না। তাই আমার মতো একজন বয়স্ক বুদ্ধিমানের হাতে ক্ষমতা আসুক। কিন্তু মীর জাফর ক্লাইভের সঙ্গে কুটকৌশলে পেরে ওঠেননি। পরে মীর জাফর তার ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। এ থেকে বেরিয়েও আসতে চেয়েছিলেন কিন্তু পারেননি। মুসলমানরা এরপর থেকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। পরবর্তীতে সিপাহি বিদ্রোহ হয়। সেটা সবাই জানেন। একটি বিষয় লক্ষ্যনীয় যে মুসলমানরা বারবার বিপ্লব, বিদ্রোহ করেছে। ইংরেজরা ভাবল, মুসলমানদের বিদ্রোহ, বিপ্লব দমন করার উপায় একটাই। কলকাতায় যে মাদ্রাসা তারা প্রতিষ্ঠা করেছে সেখানে কিছু করতে হবে। তারা মাদ্রাসা শিক্ষার কারিকুলামে বেশ কিছু কাটছাট করে। এতে জেহাদবিষয়ক যে অধ্যায় ছিল সেখান থেকে তারা অনেক কিছু বাদ দিয়েছে। আরেকটি কাজ করেছে, এই মাদ্রাসাগুলো পরিচালনা করার জন্য তারা প্রথম থেকেই বেশ কিছু অমুসলিম নিয়োগ দিয়েছে। এর মধ্যে কিছু খ্রিস্টানও ছিল।

মুহম্মদ নূরুল হুদা :

হুজুর একটা প্রশ্ন ছিল।

মওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ :

এক মিনিট, বলছি। একসময় মাদ্রাসা শিক্ষার বিরাট ঘাঁটি ছিল দিল্লি। সিপাহি বিদ্রোহের পরে সে ঘাঁটিগুলো নষ্ট হয়ে যায় এবং মাদ্রাসা শিক্ষার যে মূলধারা ছিল সেটা ধ্বংসের মুখে পড়ে। এরপর তারা আলেম-ওলামাদের গায়েবও করেছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি অনেক হত্যাযজ্ঞও চালায় সে সময়। পৃথিবীর সব দেশে হত্যার বিচার হয়েছে; কিন্তু আমাদের আফসোস, ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের এ হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার হয়নি। এ বিচারের দাবি না কংগ্রেস করেছে, না মুসলমানরা করেছে। ওই সময় এমন হয়েছে যে, শোনা যায়, একজন মানুষ মারা গেলে তার জানাযার জন্য আলেম খুঁজতে কোনো গ্রামে গেলে শোনা যেত সেই আলেম মারা গেছে। তারা বলত অমুক গ্রামে যান সেখানে আলেম আছে। সেখানে গেলে জানা যেত আলেম অ্যারেস্ট হয়েছে। যখন দেখা যেত লাশের মধ্যে পচন ধরেছে তখন মানুষ সেটাকে করব দিত। ওই সময় আলেমরা অনেক নির্যাতিত হয়েছেন। তাহলে এই দেশে ইসলাম বাঁচিয়ে রাখার উপায় কী? সকল দিকে তো হতাশা। তখন আলেমরা দেখলেন কিছু একটা করতে হবে। ১৮৬৬ সালে দিল্লির একটি নিভৃত গ্রাম (আমবালা), যেটা দিল্লি থেকে প্রায় ১০০ মাইল দূরে, সেখানে একজন ছাত্র নিয়ে একটি ডালিম গাছের নিচে যে মাদ্রাসা শুরু হয়, সেটাই এ উপমাহাদেশে স্থাপিত প্রথম কওমি মাদ্রাসা। সেই ছাত্র পরে অনেক প্রসিদ্ধ লাভ করেছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিল। আধুনিক কালের কওমি মাদ্রাসার সেই শুরু। তাকে কেন্দ্র করে পরে ওই ধারায় আরও অনেক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মাদ্রাসগুলো প্রতিষ্ঠায় সাধারণ মুসলমানদের অনেক সাহায্য ও সহযোগিতা ছিল। তাদের সহযোগিতায় মাদ্রাসাগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব মাদ্রাসা সাধারণত সরকার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। ওই মাদ্রাসাগুলোর কারিকুলাম করেছেন দারসি নিজামি। দারসি নিজামির মধ্যে দুই ধরনের বিষয় দেখা যায়। একটি হল উলুমে আলিয়া এবং অন্যটি হল উলুমে আফিয়া। উলুমে আলিয়া বলতে বোঝায় কোরআন, হাদিস, তাফসির ও ফিকাহ। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু জিনিস যেগুলো একজন মুসলমানের সবসময় প্রয়োজন। সেসব বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে এর মধ্যে কোরআন-হাদিসের মধ্যে কোনো পরিবর্তন হবে না। এতে পরিবর্তনের অবকাশ নেই। ফেকাহর মধ্যে যা আছে, তা পরিবর্তন হবে না। আরেকটা হল উলুমে আফিয়া, মানে ওইগুলোর জন্য হল ভাষা, ব্যকরণ, জ্যোতির্বিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ইত্যাদি। এরপরে অনেকবার পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সেগুলো সহায়ক বিষয়ে। মৌলিক বিষয়গুলোতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য, ইসলামকে বাঁচিয়ে রাখা এবং সাম্রাজ্যবাদ থেকে দূরে থাকা। তিনি বলেছেন যতদিন ভারত সাম্রাজ্যবাদের অধীনে থাকবে, ততদিন সারাবিশ্ব সাম্রাজ্যবাদীদের অধীনে থাকবে। উনি যখন মাল্টা থেকে জাহাজে করে ভারতবর্ষ আসছিলেন, সেই সময় যখন তিনি ভারতের তীর দেখতে পেয়ে তার সঙ্গীকে বলেছিলেন, দেখ এ আমার দেশ।

যতদিন ভারতকে সাম্রাজ্যবাদীদের হাত থেকে মুক্ত করা যাবে না ততদিন পৃথিবী সাম্রাজ্যবাদীর হাত থেকে মুক্তি পাবে না।

মুহম্মদ নূরুল হুদা :

ভারত স্বাধীন হল, উপমহাদেশ স্বাধীন হল; কিন্তু আপনারা অনেকেই এই দ্বিজাতি তত্ত্বের সঙ্গে একমত নন। ভারত, পাকিস্তান পরবর্তীতে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আমাদের যে সংস্কৃতি এবং আমাদের যে চিরায়ত ইসলাম ধর্ম, এর সঙ্গে অন্যান্য ধর্মের কোনো সংঘর্ষ ছিল না। ধর্মের সঙ্গে সংস্কৃতির মধ্যে ঐকমত্য বজায় রেখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে ভাষা কতখানি অবদান রেখেছে সে বিষয়ে এবার বলবেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম।

মওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ :

এক মিনিট। আমি বলতে চাচ্ছি উনি দ্বি-জাতিতত্ত্বের পক্ষে ছিলেন না। উনি দেখেছেন এটা ইসলাম সমর্থিত নয়। এ দেশের সাধারণ মানুষকে স্বাধীনতার স্বাদ বোঝানো দরকার। সুতরাং আমাদের ভাবতে হবে এটা কীভাবে সম্ভব? তখন তিনি দেখলেন এক্ষেত্রে আমাদের নেতা দরকার। কিন্তু নেতা হতে হবে অসাম্প্রদায়িক। হিন্দুদের মধ্যে তখন গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে অনেক কাজ করেছেন। তার কথা ভাবলেন তিনি। গান্ধীকে নেতা বানানো হল। সে সময় তিনি তার পয়সা দিয়ে তাকে সারা ভারত সফর করিয়েছিলেন।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম :
হুজুর যেভাবে বলেছেন, আমি তো সেভাবে বলতে পারি না। আমাদের অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে ব্রিটিশ শাসনের প্রাথমিক যুগে ব্রিটিশরা নিজেরাই মাদ্রাসা স্থাপন করেছে। তবে তাদের উদ্দেশ্য ছিল না ইসলামকে রক্ষা করা। কোম্পানি আমলে সরকারি নীতি ছিল খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সীমিত রাখা। তারা জানত, হিন্দু-মুসলমান এক হয়ে গেলে তাদের অনেক সমস্যা। তাই তাদের মধ্যে বিরোধ লাগিয়ে রাখত। কলকাতায় যখন তারা মাদ্রাসা স্থাপন করেছিল, তখন মুসলমানদের পক্ষ থেকে কোনো প্রস্তাব ছিল না। তারা প্রশাসনিক কাজকর্ম চালানোর জন্য এটা করেছিল। কেননা, সকল আইনকানুন ছিল আরবি, ফার্সি ভাষায়। এবং ব্রিটিশ আমলের আগে তা ছিল আরবি ভাষায়। এই যে ভাষার ঐতিহ্য এটা অক্ষত রাখার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতায় মাদ্রাসা স্থাপন করে। ওই মাদ্রাসায় আরবি ও ফার্সি ভাষা শেখানো হয়। সেখানে সংস্কৃত ভাষাও ছিল। আদালতে কাজ করার জন্য তাদের এ ভাষা শিক্ষার প্রয়োজন ছিল। কেননা আদালতের ভাষা ছিল ফার্সি এবং স্থানীয় বাংলা। আদালত যখন ইংরেজদের শাসনে চলে গেল, তখন তারা ভাবল, আইন ঠিকভাবে না জানলে দেশে অশান্তি আন্দোলন লেগে থাকবে। তাই তারা আদালতের ভাষা হিসেবে দুটি ভাষা চালু রাখল। ফার্সি এবং বাংলা। এটা ১৮২২ সাল পর্যন্ত ছিল। এরপর এর সঙ্গে যুক্ত হল ইংরেজি। ১৮৩৫ সাল থেকে ইংরেজি ভাষা আদালতের ভাষা হিসেবে যোগ হয়। তখন আদালতে তিনটি ভাষায় রায় হত। ফার্সি, বাংলা, ইংরেজি। এটা চলছিল ১৮৪০ সাল পর্যন্ত। এরপর তারা ১৮৯২ সালে ফার্সি ভাষা তুলে দেয়। পরে বাংলাও তুলে দেয়। থাকল শুধু ইংরেজি। সুতরাং সেই থেকে আদালতের ভাষা হল ইংরেজি, যা অদ্যাবদি চলছে। আমাদের দেশে এখনও ইংরেজিতে রায় হয়। সেই ইংরেজি অনেক দুর্বল। আমাদের ভাষার জন্য অনেক রক্ত দিতে হয়েছে এসব বিষয় সবাই জানেন। কিন্তু এ দেশের আদালতে ইংরেজিতে রায় হয় এটা বেশ হতাশাজনক। একটি দেশের সংস্কৃতির গোড়া হল তার ভাষা।

ভাষা কী? আমার আপনার চিন্তা, বিশ্বাস, আইনকানুন, সংস্কৃতি সবকিছু ধারণ করছে ভাষা।

মুহম্মদ নূরুল হুদা :

স্যার, কওমি শিক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে কি না জানি না; কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কওমি শিক্ষা যেমন ছিল তেমনি আছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা হওয়া উচিত সে বিষয়ে কিছু বলুন।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম :

ইংরেজ শাসন খুব ইন্টারেস্টিং। ইংরেজরা একটা বিশেষ সময়ে হিন্দুদের নিয়ে ছিল। কিন্তু হিন্দুরা যখন জেগে যায়, তখন তারা মুসলমানদের ডেকে আনে। মুসলমানদের শিক্ষার জন্য তারা তৎপর হয়। তারা মাদ্রাসা স্থাপন করে। সেগুলো যেমন ইংরেজি শিক্ষার বাহন, তেমনি মুসলিম সংস্কৃতির বাহনও বলা যায়। ওই ধারায় সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হল মুসলমানদের জন্য জুনিয়র মাদ্রাসা ও সিনিয়র মাদ্রাসা। মিড ফর্টিজে আমি মাদ্রাসার ছাত্র ছিলাম। সেখানে আমি আরবি , ফার্সি, উর্দু, ইংরেজি, বাংলা পড়েছি। আমার আরবি ভাষাটি বেশ ভালো লাগত। জুনিয়র মাদ্রাসায় আরবি উর্দু শেখানো হত। সিনিয়র মাদ্রাসায় আরবি, ফার্সি, উর্দু, ইংরেজি এবং ভালো ইংরেজি শেখানো হত। আমি দেখেছি পাকিস্তান হওয়ার পর প্রশাসন, সিভিল সার্ভিস, পুলিশ সার্ভিসে যারা কাজ করছেন তাদের অনেকেই মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। ফলে পাকিস্তান আমলে তাদের ভাষাগত কোনো সমস্যা হয়নি। কাজেই শিক্ষার বাহন হিসেবে ইংরেজরা যা শুরু করেছিল, তা বেশ ফলপ্রসু ছিল। তারা সে সময় শুধু সিনিয়র, জুনিয়র মাদ্রাসাই স্থাপন করেননি, গ্রামে গ্রামে জমিদারদের বলেছিলেন মাদ্রাসা স্থাপন করতে। তাই দেখা যেত, প্রত্যেক মুসলমান জমিদার কাছারির পাশে মাদ্রাসা স্থাপন করত। আমাদের প্রফেসর সাজ্জাদ হোসেনের মতো সফিসটিকেটেড ইংলিশম্যানদের মতো মানুষও মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। আহমদ শরীফ সাহেবও মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন।

আসলে আরবি ভাষা ভীষণ সাইন্টিফিক। বেশ পাওয়ারফুল ল্যাঙ্গুয়েজ। এটা পৃথিবীকে শাসন করেছে বহুদিন। আমরা বাঙালি ছেলে হয়ে আরবি পড়েছি কোনো অসুবিধা হয়নি। কিন্তু জুনিয়র ও সিনিয়র মাদ্রাসা তুলে দেওয়া হয়েছে। তখনই এর ডিপারচারটা আসে। আগের যুগে শিক্ষার যে স্ট্যান্ডার্ড ছিল এখন সেটা নেই। আমি বলছি না যে মাদ্রাসা ভালো, সেটা ফিরে আসুক। মূলকথা হল, এখন আমাদের নিজেদের ভাষার মাধ্যমে শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে হবে। ইংরেজরা যেটা করেছিল, প্রায়োগিক দিক দিয়ে সেটা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমাদের স্বাধীন দেশে কেন আদালতের ভাষা হবে ইংরেজি? ব্রিটিশরা যদি আদালতের ভাষা বাংলা করতে পারে, আমরা বাঙালি হয়ে সেটা কেন পারি না? আমাদের আদালতে যে ভাষা ব্যবহার হয় তা মিক্সড ইংলিশ। যাকে বলে মোক্তারি ইংরেজি।

মুহম্মদ নূরুল হুদা :

আসলে আমাদের একটা শিক্ষানীতি তৈরি করা দরকার। এ দেশে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। এরই একটি ধারা হচ্ছে কওমি শিক্ষাব্যবস্থা। যা ৪২ বছর ধরে চলছে। এ বিষয়ে আমরা জানব মুফতি মিযানুর রহমানের কাছে।


মুফতি মিযানুর রহমান সাইদ :
সকলকে ধন্যবাদ। আমরা শুনছিলাম কওমি শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বিষয়ে নানাকথা। যদি বিষয় এটি হয়, তাহলে কওমি শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে বুঝে নিতে হবে। আমাদের মওলানা মাসঊদ সাহেব খুব সুন্দরভাবে এর ইতিহাস বলেছেন। এর মধ্যে আর একটু যোগ করা যায় ১৮৬৬ সালে যেমন কওমি মাদ্রাসার শুরু হয়েছিল ইংরেজদের অপপ্রচারের কারণে। অনেক আলেম একত্র হয়ে ইসলামকে রক্ষা করার জন্য যে চেষ্টা নিয়েছিলেন, সেটা ১৮৫৭ সালে আমবালা ও সামিলির ময়দানে। রসুলে করিমের নির্দেশে স্বপ্নযোগে যে লাঠির মাধ্যমে এর স্থান নির্ধারিত হয়েছিল সেটা ছিল একটি আধ্যাত্মিক ঘটনা। সুরা জুমার তিন নং আয়াতই কওমি মাদ্রাসার সিলেবাসের মূল উৎস। মাদ্রাসার আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠাতা আল্লাহর রাসুল। বাহ্যিক প্রতিষ্ঠাতা দারসে নিযামি। কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস মূলত ছয়টি বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত। সেগুলো হল-- আকিদা, ইবাদত, আখলাক, সামাজিক-অর্থনৈতিক এবং রাষ্ট্র পরিচালনা। এই ছয়টি বিষয়ের উপর কওমি মাদ্রাসার কারিকুলাম প্রতিষ্ঠিত।

এখন আমি বলব ইসলামি রাজনীতি কাকে বলে? ইসলামি রাজনীতি হল প্রতিষ্ঠিত সরকারকে আল্লাহর বিধিবিধান অনুযায়ী পরিচালনার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা। এতে যদি কোনো ভুলত্রুটি সরকার করে থাকে, তাহলে জাতি ও জনগোষ্ঠীর কল্যাণে আল্লাহর গোলামির মধ্যে আবদ্ধ থেকে তার বিধিবিধানে যত প্রকারের দাবি দাওয়া আছে সেটা সরকারের কাছে তুলে ধরে তাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে সাহায্য করা। এছাড়া ইনসাফ বা সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা। সকল প্রকারের জুলুম, অন্যায়, অত্যাচার নিরসন করে অকল্যাণ দূরীভূত করা। আর এসবই কোরআন-হাদিসের মাধ্যমে করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী চলতে হবে। কওমি মাদ্রাসার সিলেবাসের সর্বশেষ বিষয় হল রাষ্ট্র পরিচালনা করা। আর এটি আল্লাহর গোলামি, যাকে বলে আল্লাহর ইবাদত করা। এটা বেসিক জিনিস। জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহকে মানার বিষয় রয়েছে। মোটকথা পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক--প্রত্যেক জীবনে আল্লাহর বিধানকে অনুসরণ করা আমাদের কর্তব্য। এসবই কওমি মাদ্রাসার সিলেবাসের মধ্যে থাকে।

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনীতি ইবাদতের অন্তর্গত। আমি বিষয়টিকে পরিষ্কার করতে চাই। যারা রাজনীতিকে একদম ধর্মহীন বলতে চান, ইসলাম এর সঙ্গে কখনও একমত নয়। কারণ, ইসলামে রাজনীতি একটি মানুষের জীবনে অনেক প্রয়োজন। জাতির জন্য, জনগণের জন্য ইসলাম কোনো দিক নির্দেশনা দিবে না তা তো হতে পারে না। ইসলাম যেমন সবকিছুর দায়িত্ব মুসলমানকে দিয়েছে, মুসলমানও তেমনি রাজনীতিকে পাশ কাটিয়ে চলতে পারে না। তবে এ দুটি বিষয়ের মধ্যে আজকাল সীমা লংঘন দেখা যায়। কেউ কেউ শুধু রাজনীতি বা রাষ্ট্রনীতি করেন। ইসলামি রাজনীতি এটা সমর্থন করে না। আবার কেউ কেউ মনে করেন, রাজনীতিতে ধর্মের গন্ধ থাকবে না, ইসলাম এটাও সমর্থন করে না।

তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে, রাজনীতি ইসলামের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। ইসলামি রাজনীতি মানে ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠা করা। কওমি মাদ্রাসায় এসব বিষয় শেখানো হয়। এর সঙ্গে সমাজনীতি, পারিবারিক নীতি, আকাইদ ইত্যাদি শেখানো হয়। এর সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত থাকে রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতির বিষয়। এটা যে সকলকে বাস্তবায়ন করতে হবে এমন নয়। আমাদের মধ্যে একটি দল (জামাত) আছে, যারা মাঠে রাজনীতি করছে। আমরা বলেছি আপনারা রাজনীতি করেন, আমরা আত্মশুদ্ধি করব। এছাড়া আমাদের অনেক কাজ আছে। আমরা গ্রুপ করে একেকজন একেক কাজ করব। রিচার্স করব। এসবের মাধ্যমে ইসলামকে ধরে রাখব। যদি কেউ কোরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী খোলামনে রাজনীতি করে, তাতে তার ইবাদতের সওয়াব হবে। প্রচলিত রাজনীতির বিভিন্ন ধারা আমরা সমর্থন করি না। তবে কওমি শিক্ষার মধ্যে রাজনীতি নেই। হেফাজতের প্রসঙ্গে বলি, আমার জানামতে ইসলাম রক্ষার জন্য একটি বিশেষ ইস্যু নিয়ে তারা মাঠে নেমেছে, এতে রাজনীতি নেই।

মুহম্মদ নূরুল হুদা:

খুব সুন্দর বক্তব্য। বিশ্লেষণও চমৎকার। সবশেষে যেকথা বললেন, আমরাও এর সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে চাই যে আপনারা শাপলা চত্বরে অবস্থান করেছিলেন-- সেটা কি ভুল ছিল? সিলেটে হেফাজতের একজন নেতা বলেছেন এই অবস্থান ভুল ছিল। যাহোক, দেশ স্বাধীন হল, ৭৫-এর নারকীয় হত্যা, সামরিক শাসন, স্বৈরশাসন অনেক কিছু হয়েছে এ দেশে তখন আপনারা কিছু করেননি; কিন্তু যুদ্ধাপরাধীর বিচারের প্রসঙ্গ আসাতেই হেফাজতের উত্থান হয়েছে বলে কেউ কেউ বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করেছে। রাজনীতিতে হেফাজত সরাসরি আসবে কি না জানতে চাচ্ছি।


মুফতি মিযানুর রহমান সাইদ:
আমি হেফাজতের দায়িত্বশীল কেউ নই। তবে ব্যক্তিগতভাবে কিছুটা দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি। অতীতে আল্লা-রাসুল, কোরআন-সুন্নাহর বিরুদ্ধে এ দেশে অনেক কাজ হয়েছে। প্রত্যেক বড় বড় ইসুতে এ দেশের মানুষ এবং ওলামা ইকরাম কথা বলেছে। সালমান রুশদি এ দেশের মানুষ না, এরপরও তার বিরুদ্ধে আমরা রুখে দাঁড়িয়েছিলাম। আমরা কারও গদি দখল করার জন্য কাজ করি না বা কাউকে গদি থেকে সরানোর জন্যও কাজ করি না।

তবে হঠাৎ কেন হেফাজত আসল, এটা একটা প্রশ্ন বটে। আমাদের একটি বড় দল জামাত মাঠে রয়েছে। আমাদের বড় বড় নেতারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। এ অবস্থায় যখন দেখি নাস্তিক ব্লগাররা ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলে, তখন আমরা সোচ্চার হই। ওলামা-ইকরাম মিলে আমরা একটি মিটিং করি। ঐ মিটিংয়ে পরিষ্কার একথা বলা হয়েছে, কোনোদিন হেফাজত রাজনীতিতে যাবে না। আমরা দীন রক্ষার জন্য কাজ করব। সরকার যদি কোনোদিন আমাদের মূল্যায়ন করে, ইসলামি দাওয়াত করে-- তাহলে তাদের বোঝাব। তবে বিশাল একটি জনগোষ্ঠী এর সঙ্গে জড়িত হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে কার মুখ বন্ধ রাখবেন?

এর আগে সরকারের সঙ্গে আমাদের কথা ছিল কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন পাস করা যাবে না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে কী? নির্বাচন সম্পর্কে কী বলব। মুসলমানদের হাতে বেশি ভোট রয়েছে। নির্বাচনে এর একটা প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে। তবে এটা সত্যি যে আমাদের কোনঠাসা করার জন্য অন্যায়-অত্যাচার করা হচ্ছে। জুলুম করে আবার মিডিয়ার মাধ্যমে সেটা মিথ্যাচার হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। এর জন্য আমরা আল্লাহর কাছে বলব। মাঠে নেমে হাঙ্গামা করা আমাদের কাজ নয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছে ক্ষমতায় বসান। এতে আমাদের কিছু নেই। আমাদের অনেক কাজ রয়েছে। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে দীনি কাজ করতে চাই।

মুহম্মদ নূরুল হুদা :

এতক্ষণ আমরা ভারত বিভাগ, পাকিস্তানের অভ্যুদয়, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে বিস্তার এবং এর সঙ্গে কওমি মাদ্রাসা ও হেফাজত বিষয়ে নানা আলোচনা শুনলাম। এবার আমরা সলিমুল্লাহ খানের কাছে শুনব শাহবাগে তরুণদের জাগরণ, বাংলার সমাজবিবর্তন, হেফাজতের উত্থান এবং তার রাজনৈতিক অবস্থান ইত্যাদি বিষয়।


ড. সলিমুল্লাহ খান :
আমি হেফাজতের কেউ নই। সুতরাং আমি হেফাজতের পক্ষে কিছু বলতে পারব না। আমার কথা নির্ভরযোগ্য হবে না। তারা বলছে, তারা রাজনীতি করতে চায় না। কিন্তু হেফাজতে যা করছে, তা কিন্তু রাজনীতি।

আমি একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই। সেখানে লেখা আছে আমাদের এই ক্যাম্পাস ধূমপান এবং রাজনীতিমুক্ত। অতএব ধূমপান এবং রাজনীতিকে তারা একই পর্যায়ে ফেলেছে। ছাত্ররা রাজনীতি করবে না, এটা এক হিসেবে ঠিক আছে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন না হলে ৭১ সালে স্বাধীনতা আন্দোলন হত না। ৫২ সালে আন্দোলন করেছে কারা? বয়স্করা তো করেনি, তরুণ ছাত্ররা করেছে। সে সময় তাদের আত্মত্যাগকে তখনকার মূখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন যেভাবে সমালোচনা করেছিলেন, আমরা তো সেই ভাষায় তাদের অপমান করেছি। যদি রাজনীতি করাটা অন্যায় হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের শহীদরা যা করেছেন সেটা ঠিক হয়নি। এখন বলি চীনে একটি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় আছে আপনারা জানেন। ৭০-এর দশকে পিকিং শব্দটির বানান বদলে গেছে। চীনে এর সঙ্গতিপূর্ণ নাম বেইজিং। আগে পেইজিং লেখা হত। কিন্তু পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় বলছে, আমরা আমাদের নামের বানান বদলাব না। এখনও ওরা পিকিং লেখে। তাই রাষ্ট্র চায় না পিকিং নামটি বেইজিং হয় ইংরেজিতে।

১৯১৯ সালের ৪ঠা মে যখন ভার্সাই চুক্তি হচ্ছিল ইউরোপে, যুদ্ধোত্তর চীনের ভাগ্য কী হবে? চীনের প্রজাতন্ত্র সরকার ১৯১১, ১২ সালে জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিতে চেয়েছিল। এতে প্রতিবাদ করে ছাত্র-যুবকরা। প্রায় তিন হাজার ছাত্র রাস্তায় বেরিয়ে মিছিল করে এবং একজন মন্ত্রীর বাড়ির সামনে আগুন ধরিয়ে দেয়। এখন চীনে যে আন্দোলন চলছে সেই আন্দোলন অন্যরকম। কাজেই রাজনীতিকে ছোট করার কিছু নেই। আমি মনে করি এই যে হেফাজতে ইসলাম যদি রাজনীতি করে তাহলে তারা কোনো ভুল করছে না। আসলে রাজনীতিটা কী এটাই বলা দরকার। এখানে কওমি শিক্ষা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিষয়টিতে আমি অন্যায় দেখতে পাচ্ছি। আমাদের আলোচনা করা দরকার জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে। আমরা ধরে নিচ্ছি, রাজনীতিতে কোনো অন্যায় নেই। সেটাই আদর্শ এবং উত্তম। এর মধ্যে কওমি শিক্ষার ত্রুটি বা গ্রহণযোগ্যতা কোথায় এটাই আমরা আলোচনা করছি। আমরা মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্কিটেকচার পড়াচ্ছি। কওমি মাদ্রাসায় সেগুলো পড়াচ্ছে না। সেখানে কী পড়াচ্ছে তা আমাদের ঠিকমতো জানা নেই। মনে রাখতে হবে, শিক্ষায় কমপক্ষে দুটো জিনিস করে। এক বেকারত্ব দূর, অর্থাৎ এটা আপনাকে ব্যবসা বা চাকরিতে সুযোগ দেবে। আরেকটা হচ্ছে চরিত্র গঠন। আমার পরিচিত একজন বন্ধু নুরুল মোমিন ভূঁইয়া, যিনি পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃতত্ত্ব বিষয়ে পিএইচডি করেছেন। তিনি সিলেটের বিশ্বনাথে একটি মাদ্রাসায় তার থিসিস পেপারের গবেষণার কাজ করেছিলেন। তার সেই থিসিস পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তিনি দেড় বছর সেই মাদ্রাসায় থেকেছেন। তখন সেখানকার শিক্ষকদের জিজ্ঞেস করেছেন যে আপনারা কী উদ্দেশ্যে এই মাদ্রাসা তৈরি করেছেন? সে এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সে জিজ্ঞেসা করেছিল আপনাদের শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? ওরা বলেছে আমরা সাচ্চা মুসলমান তৈরি করতে চাই। আমাদের সেই বন্ধুটি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। সে বলেছে, তারা যদি বলত আমরা সাচ্চা মানুষ তৈরি করতে চাই তাহলে আমিও তাদের সঙ্গে একমত হতে পারতাম। সে তখন দাঁড়ি রেখেছিল, এখনও কাটেনি। তার কথা, আমি যে মাদ্রাসায় ছিলাম সে মাদ্রাসায় ছাত্রদের সঙ্গে যদি কখনও দেখা হয় তারা ভাববে গবেষণা করতে গিয়ে দাড়ি রেখেছিলাম, এখন সেটা কেটে ফেলেছি। আমি তাদের সঙ্গে এই বেইমানি করতে চাই না। সে বলল যে, ওখানে থেকে যে আখলাক বা চরিত্র গঠন শিখেছিলাম সেটা আমাকে পরিবর্তন করে ফেলেছে। আমাদের ইংরেজি শিক্ষার মধ্যে এটা পাই না।

ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত সব লোকই যে চরিত্রহীন, তা বলা ঠিক নয়। দয়া করে আমাকে ভুল বুঝবেন না। শিক্ষা যে চরিত্র গঠন করে সেটা যদি আমরা বারবার মনে করিয়ে না দেই তাহলে আমাদের শিক্ষার মান অর্ধেক হয়। আপনারা জানেন ইংরেজি শিক্ষকদেরও শিক্ষক ফরাসি দেশের দার্শনিক রুশো একটি বই লিখেছেন। তাতে তিনি বলেছেন যে ষোল বছর বয়সের নিচে বাচ্চাদের হাতে একটাও বই দেওয়া দরকার নেই। তারা শিখবে প্রকৃতি থেকে। তারা শিখবে খোলা হাওয়ায়। লেখাপড়া শিখবে তারা প্রকৃতির কাছ থেকে। তার মতে বই হল একটা করাপশন। যাই হোক আমরা যে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা বা ইংরেজি শিক্ষার কথা বলি। এটাকে আমরা সর্বোচ্চ আদর্শ মনে করে মাদ্রাসা শিক্ষার সমালোচনা করি। দিল্লির মামলুক সুলতান মোহাম্মদ বিন তুঘলকের আমলে বেশ কিছু মাদ্রাসা ছিল। বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের জন্য সোনারগাঁয়ে যারা মাদ্রাসা তৈরি করেছিলেন সে মাদ্রাসা চলত কী করে? আইয়ুব সাহেবের একটি বই আছে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত, সেটা কিনে আমি পড়েছি। সেখানে লেখা আছে আগে ইংরেজরা আসার আগ পর্যন্ত এ দেশের মোট জমির শতকরা ২৫ ভাগ ব্যবহার হত ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে। আমাদের তিনটি প্রশ্ন করতে হবে। এক. মাদ্রাসা শিক্ষা চলে কার টাকায়? আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চলে কার টাকায়? আগে ল্যান্ডগ্রান্ডের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পশ্চিমেও তাই হয়। এইখানে মানুষ ধর্মীয় কারণে নিজেদের জমি মাদ্রাসার জন্য দান করেছে। এগুলো ওয়াকফ আকারে চলবে। কলকাতায় হেস্টিং সাহেব আলীয়া মাদ্রাসা করেছেন। ঢাকায় বিভাগোত্তরকালে এখানেও অনেক মাদ্রাসা হয়েছে। সেগুলো তারা করেছে মূলত ফার্সি ভাষার কর্মচারী তৈরি করার জন্য। কিন্তু সেটা দিয়ে তো শিক্ষাব্যবস্থা চলতে পারে না। কিছুদিন পরে তারা ফোর্ড উইলিয়াম কলেজ তৈরি করেছে। এরপরও তারা আরও কিছু কলেজ তৈরি করেছে। এগুলো তো শিক্ষার মডেল হতে পারে না। এখন ইতিহাসকে আমরা মাইনোরিটি করে ফেলি। শুধু একটা এর স্লাইস দেখাই। তাহলে তো অবিচার হয়। আমাদের শিক্ষার মধ্যে কোথাও একটা ক্রটি আছে। ইতিহাসবিদদের ক্রটি আছে। কওমি মাদ্রাসার একজন ভারতীয় গবেষক , উনি আমেরিকায় পড়ান। ভদ্রমহিলা একবার ছাত্রদের জিজ্ঞেস করেছিলেন ১৯৪৭ সন কী? তারা বলে জানি না। ইতিহাস বিষয়ে এসব ছাত্র যে কত নিন্মগামী কী বলব। এরপর তারা বলেছিল কী হয়েছিল যেন? মাওলানারাও নিজেরা জানেন তাদের মধ্যে কোনো ঐকমত্য নেই। মাদ্রাসার সিলেবাস নিয়ে কথা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। ভিতর থেকে দাবি উঠছে এটা বদলাতে হবে। এটা ভেতর থেকে উঠে আসতে হবে। কিন্তু ভেতর থেকে কী উঠে আসবে এটা আমি খুব সংক্ষেপে বলি। আমরা যে সমালোচনা করছি, তারা যে লেখাপড়া করাচ্ছেন-- তারা বলছেন সিলেবাসের দুটো বড় অংশ। একটা হচ্ছে আল উলুম নফলিয়া অর্থাৎ যেটাকে আমরা বলি ‘চলিয়া আসিতেছে’।
সেখানে কোরআন, হাদিস শোনানো হবে, তাফসির শেখানো হবে। তাতে কী আছে? সেটাতে স্টান্ডার্ড সিলেবাস তৈরি করে এমনকি মুসলমানদের মিরাজ এবং সম্পত্তি ভাগাভাগি কীভাবে হবে সেটাও এর সঙ্গে পড়ে। এখানে আরেকটা শব্দ আছে আল উলুমুল আকোলিয়া। যেখানে সাইকোলজি, হিকমত এগুলো থাকবে। আমরা বলি যে দুনিয়াবি শিক্ষা শিখতে হবে। কিন্তু মাদ্রাসার ছেলেরা তা নয়। আগে তো ইউনানি বা কৃষি এগুলোর চল ছিল। এগুলো হল ব্যবহারিক শিক্ষা। এগুলো শিখবে না কেন? তাহলে শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সিলেবাস নিয়ে আমাদের আলোচনা করতে হবে। কি শেখানো হয় মাদ্রাসায় এবং কি শেখানো হয় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে? তুলনা করুন। আমি বলব আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, এগ্রিকালচার প্যাটার্ন যদি বাদ দেন আমি আইন পড়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ে, অর্থনীতি পড়েছি এবং আমি অন্যান্য বিষয়ও পড়ি।
আমি জানি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বা শিক্ষাব্যবস্থার কনটেন্ট এর চেয়ে ভালো নয়। আমি একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়াই। সেখানে একজন বিখ্যাত চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেনও পড়ান। তিনি সেদিন আমাদের শিক্ষকদের বলছিলেন তার ক্লাসে ৪০ জন ছাত্র আছে। তিনি তাদের চলচ্চিত্র শব্দটি বানান করতে বলেছিলেন, ৪০ জন ছাত্রের মধ্যে একটি ছাত্রও সেটার শুদ্ধ বানান করতে পারেনি। এই হল আমাদের নন-কওমি শিক্ষা। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম ঠিকই বলেছেন, আগে বলুন শিক্ষা কোন মিডিয়ামে হবে? আমাদের বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসা যারা তৈরি করেছেন আমি সবিনয়ে তাদের বিষয়ে দু-একটি সমালোচনা করব। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আমাদের শিক্ষার ভাষা হল আরবি, উর্দু, ফার্সি কিংবা ইংরেজি। ১৮৮২ সালে হান্টার একটি বিষযে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছেন বাঙালি মুসলমানদের মাতৃভাষা উর্দু। বাঙালি মুসলমানরা, যারা অভিজাত আছেন তারাই মুসলমান, আমাদের তো তারা মুসলমান মনে করেন না। আর ব্রাক্ষণরা তো মনে করেছিল, আমরা মানবজাতির না, দানবজাতির। এই যে অনুমান এগুলোই শ্রেণিবিভেদ। আমাদের মওলানা সাহেবরাও ভুল করলেন। তারা তাদের শিক্ষার মাধ্যম বাংলায় করলেন না। শুধু একা তাদের দোষ দেই না, আমরাও তো বাংলা করি নাই। অন্তত এখন পর্যন্ত করতে পারি নাই। এটা হচ্ছে আমাদের প্রথম ভুল। দুই নম্বর হচ্ছে শিক্ষার বিষয়বস্তু। যেখানে আমি আগেই বলেছি ইলমুল নফলিয়াত চলবে না। নফলিয়াতে দুটো সুন্দর ভাষা আছে। একটা আদব একটা কায়দা। আমরা একসঙ্গে আদবকায়দা বলি। মাদ্রাসার একটি ডিগ্রির নাম ফাজিল। আমরা কথায় কথায় বলি ফাজলামো করিস না। অথচ ফাজিল একটি সন্মানিত ডিগ্রি। আগে এটা মেট্রিকের সমান ছিল। এখন ইন্টারমিডিয়েটের সমান করা হয়েছে। এছাড়া মুন্সি, আলেম, কামেল, মোনতাসে মোহাদ্দিস এমনকি আপনারা অনেকে পিএইচডি ডিগ্রি লেখেন। এই বিষয়গুলো আমরা ঠিকভাবে বুঝতে পারি না। তুরস্কে মোস্তফা কামাল কীভাবে মাদ্রাসা শিক্ষাকে বদলে ফেলেছিলেন ভাবাই যায় না। মোস্তফা কামালের যত দোষ থাকুক, উনি কিন্তু ইংরেজদের নিকট আত্মসমর্পণ করেননি। তিনি বলেছিলেন আত্মসমর্পণ করার যখন উপায় নাই, তখন নিজেই ইংরেজ হয়ে যাই। তিনি হ্যাট পরে নিয়েছিলেন।

আমিও আপনাদের কথার সঙ্গে একমত যে, শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে রাজনীতি থাকতে হবে। হেফাজতে রাজনীতি নেই এটা ঠিক নয়। তারা প্রথম যখন ১৩ দফা প্রকাশ করলেন তখন আমার সৌভাগ্য হয়েছিল একটি টিভি সাক্ষাৎকারে যাওয়ার। আমি একজন মওলানাকে বললাম যে আপনারা বুদ্ধিমানের মতো কাজ করেছেন। ৫ ফেব্রুয়ারি যখন ছাত্ররা গণজাগরণ মঞ্চ করল, আর আপনারা ৯ মার্চ থেকে ১৩ দফা নিয়ে নামলেন। এর আগে নামেন নাই কেন? এরপর আবার মিথ্যা কথা লিখলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মিথ্যা কথা পছন্দ করেন না। আপনারা লিখলেন কি? বায়তুল মোকাররম মসজিদসহ দেশের নানা মসজিদে নামাজ পড়তে দেওয়া হচ্ছে না। কথাটি কি আসলে ঠিক ছিল? আসলে ২২ ফেব্রুয়ারি কী হয়েছিল? সেখানে সাংবাদিকসহ অনেক লোক আহত হয়েছে। তাই উত্তর গেট বন্ধ করে পূর্ব ও পশ্চিম গেট খুলে দেওয়া হয়েছিল। আপনারা বিষয়টির অপব্যাখ্যা করলেন। আপনারা মিথ্যা কথা বললেন। বললেন দেশের কোনো মসজিদে নামাজ পড়তে দেওয়া হচ্ছিল না? নিজের ধর্ম পালনে বাধা দিলে শুধু সেই সম্প্রদায়ের লোকরা প্রতিবাদ করবে না, সকল নাগরিকের দায়িত্ব প্রতিবাদ করা । আপনারা শুধু নিজেদের কথা বলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে একশ’য়ের মতো মন্দিরে আগুন দেওয়া হল। তখন আপনারা কি কোনো প্রতিবাদ করেছেন? কেউ প্রতিবাদ করেননি। ফরহাদ মজহার একটি কমিটি করলেন। আমি বলব উনি এক ভণ্ড দেশপ্রেমিক। উনি বললেন, হেফাজতের লোকদের রাস্তায় রাস্তায় পানি দেন, রুটি দেন; কিন্তু মন্দিরে হামলার বিষয়ে কোনো প্রতিবাদ করলেন না। পরে তের দফায় আপনারা সংশোধন করেছেন। সবশেষে লিখেছেন সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে। এটা হল বাস্তববুদ্ধির পরিচয়। আমি প্রার্থনা করি আপনাদের বাস্তববুদ্ধির উদয় হোক।

আমাদের দেশের রাজনীতিতে সকলই অংশগ্রহণ করতে পারে। কেন মওলানা সাহেবরা অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। এটা তাদের নাগরিক অধিকার। কিন্তু সেটা হতে হবে ঐকমত্যের ভিত্তিতে। আমি জানি হুকমত শব্দটির অর্থ ন্যায়বিচার। ন্যায়বিচার শব্দটির বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ধর্মহীনতা। আপনি যদি কোনো জায়গায় বিচারক হন আপনার পুত্র কন্যা সেখানে বিচারপ্রার্থী হয়, অভিযুক্ত হয়-- তাহলে আপনি বিব্রতবোধ করবেন, আপনি সরে দাঁড়াবেন। এটা হল ন্যায়বিচারের মাপকাঠি। কাজেই রাষ্ট্র বিশেষ কোনো ধর্মকে বা কোনো ধর্মের গোষ্ঠীকে পক্ষপাত করবে না। শুধু ‘হিন্দু মুসলমান হিন্দু মুসলমান’ করে কিছু হবে না।

আজকে যে কারণে আমাদের আলোচনা করতে এত অসুবিধা হচ্ছে-- সেটা বলি। সারাবিশ্বে দুটো ঘটনা ঘটেছে। এক হচ্ছে রাশিয়া আক্রমণের পর আফগানিস্তানে আমেরিকানরা মুসলমানদের মধ্যে জেহাদি মনোভাব গড়ে তোলার জন্য অনেক টাকা খরচ করেছে। সেদিন হিলারি ক্লিনটন নিজেই বললেন, আল কায়েদা আমাদের তৈরি। এখন আমেরিকা এবং আল কায়েদা দুটোই সারাবিশ্বের মুসলমানদের জন্য শত্রু। কাজেই আপনাদের কোন পথে লড়াই করতে হবে সেটা ঠিক করুন। তবে আল কায়েদার মতো সন্ত্রাসী পথে যাবেন না। তাহলে কোন পথে যাবেন? গণআন্দোলন এবং গণজাগরণ ছাড়া আর কোনো পথ নেই। আপনাদের এত তাড়াহুড়ো কেন? ৫ ফেব্রুয়ারি দেশে গণজাগরণ মঞ্চ হয়েছে। কেননা এর আগে একটি রায় হয়েছে সেটা ছাত্ররা মেনে নিতে পারেনি। আমি তাদের ছাত্রই বলছি। এরপর আপনারা ৯ মার্চ তের দফা দিলেন। সেটা আগে দিলেন না কেন? গণজাগরণ মঞ্চের পরে দিলেন কেন? এর আগে ২০১০ সালে হেফাজতে ইসলাম দলটি গঠিত হয়েছে। কিন্তু তাদের তের দফা করার সময় হল ছাত্ররা আন্দোলন করার এক মাস পাঁচদিন পর। এপ্রিল মাসে সেটা আপনারা সংশোধন করলেন। আবার এ মাসেই একটি প্রোগ্রাম দিলেন। ঢাকায় আসলেন আবার চলেও গেলেন। ৫ এপ্রিল এমন প্রোগ্রাম দিলেন যেন আপনাদের তর সইছে না। কেউ যদি আল্লাহ-রাসুলের প্রতি অপমান করে তাদের খুঁজে বের করুন। একটা বিচার প্রক্রিয়া আছে। এ জন্য অনুসন্ধান দরকার। সরকারের সাহায্য নিন। এ বিষয়ে সরকার কাজ না করলে সরকারকে উস্কে দিতে পারেন। নির্বাচনের দাবি করতে পারেন; অথবা যারা নির্বাচনে ইশতেহার দেবে তাদের বলতে পারেন। যাক, এবার মূল কথায় আসা যাক। শিক্ষা যদি চরিত্র গঠন এবং পেশা সৃষ্টিতে সাহায্য করে, তবে ইসলামি শিক্ষারও প্রয়োজন আছে। এটা আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে-- শুধু ইসলামি শিক্ষা দিয়ে হবে না। আরও কিছু শেখা প্রয়োজন। মাদ্রাসা শিক্ষা একপেশে শিক্ষা। শুধু চরিত্র গঠন করে কিছু হবে না। যদি অন্যান্য শিক্ষা গ্রহণ না হয়। তাহলে আপনি আধুনিক পৃথিবীর প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাবেন।

আমাদের দেশের বিখ্যাত লেখক আহমদ ছফা ১৯৯৮ সালে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেটা ছিল কামরাঙ্গিরচর মাদ্রাসায় শিক্ষাবিপ্লব। উনি সেখানকার একজন হাফেজ্জি হুজুরের কাছে যেতেন। হাফেজ্জি হুজুরের অনেক শিষ্য ছিলেন। তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলতেন। একদিন তাদের সঙ্গে কথা বলে জানেন, তারাও মাদ্রাসার পাশে জিজ্ঞিরায় যেমন টেকনিক্যাল শিল্প হয়, সে রকম টেকনিক্যাল স্কুল খোলার কথা ভাবছেন। এটা শুনে আহমদ ছফা বললেন, মাদ্রাসার ছাত্ররা অন্য কাজ শিখবে না কেন? এটা তো সত্যি যে আমাদের মসজিদের জন্য মওলানা, খতিব, মোয়াজ্জেন হওয়ার জন্য তাদের মাদ্রাসা শিক্ষা দরকার। কিন্তু এর বাইরে যারা আছেন তারা কী করবেন? এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তিনি ঐ প্রবন্ধটি লিখেছিলেন। আমি যে ইউরোপীয় শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলছি তা নয়। আমাদের দরকার আমাদের মতো শিক্ষাব্যবস্থা। তাহলে মাদ্রাসা শিক্ষার ছাত্ররা কেন রাজনীতি করবে না। তাদের শিক্ষানীতিতে তাদের কী ভূমিকা আছে? আমরা জাতীয় শিক্ষানীতির কথা বলছি। আমার মনে হয় এটা উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া। আমরা যেমন কোরআন হাদিস পারি না। এ বিষয়ে আমরা মুর্খ। তেমনি আপনারা প্রকৃত জগতের বিষয়ে কী পড়েন?

মুহম্মদ নূরুল হুদা :

অত্যন্ত বাস্তবসঙ্গত কথা। কেউ ধর্মগ্রন্থ পড়ে না, আবার কেউ পার্থিব বিষয়ের চর্চা করে না। সলিমুল্লাহ খান একটি বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করলেন। এবার উপস্থিত সুধীবৃন্দের মধ্য থেকে কোনো প্রশ্ন থাকলে করতে পারেন।

সাজেদুল হক :

রাসুল (সা.) তার সময় যেভাবে বাস্তবতার নিরিখে তার জীবনবোধ থেকে যে শিক্ষা কওমি মাদ্রাসায় দিয়ে গেছেন, আজকে কি সে রকম শিক্ষা দেওয়া হয়?

মুফতি মিযানুর রহমান সাইদ :

আমাদের প্রতিষ্ঠানে ইসলামি অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতির উপর এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থার উপর আমরা ক্লাস নিয়ে থাকি। ছাত্রদের পড়াই। মূল ছয়টি বিষয়কে গুরুত্ব দেই। দাওরা শরীফ থেকে বেশি শিক্ষা দেওয়া সম্ভব হয় না। ফেকাহ বিভাগ থেকেও কম শিক্ষা দেওয়া হয়। ব্যবসা, সুদবিহীন ব্যবসা বা সুদের সমস্যা এসব অর্থ ব্যবস্থার মধ্যে এসে যায়। এছাড়া রাজনীতি এবং রাষ্ট্রনীতি-- এগুলো পড়ানো হয়। এগুলোর কোনো বাস্তবায়ন আপনারা দেখতে পান না। আল্লাহর রাসুল তার সময়কে যেভাবে বদলে দিয়েছেন সে রকম তো আমরা পারব না। এখন আমাদের সমাজে সে রকম বিজ্ঞ আলেম অনেক কম। থাকলেও ইসলামবিরোধী শক্তি এত শক্তিশালী যে তারা অনেক কিছু করতে পারেন না।

সলিমুল্লাহ খান :

আমি একটা কথা বলব। আপনারা মাদ্রাসায় কী পড়ান আমি জানি না। আগে দারসে নিযামির কথা বলেছেন। উনি মারা গেছেন। সেই সময় থেকে পৃথিবী বদলাচ্ছে, সিলেবাস বদলাচ্ছে। আপনাদের কতটা বদল হয়েছে জানি না। ইসলামি ফিলসফিতে যেটা বলা হয় যে, কোরআন হাদিসকে রেফারেন্স দিয়ে প্লেটোর কথাগুলোকে প্রমাণ অথবা অপ্রমাণ করা হয়। এ রকম যদি চলে, তাহলে কি হবে? অ্যাডাম স্মিথ লিখেছেন ‘নানা জাতির ধন-দৌলত’।
সেটা আমাদের মাদ্রাসায় কেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ানো হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের বয়স হল আশি বছর। আমি বলব অর্থনীতির ইতিহাস জানেন, এমন একজন শিক্ষকও সেখানে নেই। গত নব্বই বছরেও তাদের পক্ষে ওয়েলথ অব নেশন-এর বাংলা অনুবাদও তাদের পক্ষে করা সম্ভব হয়নি। আমি আপনাদের সিলেবাস জানি না। তবে ভারতের একটি মাদ্রাসার একটি সিলেবাস কনসাল করে দেখেছি। যে মহিলা বইটি লিখেছেন তার নাম বারবারা। উনি শুধু সেখানে দেখিয়েছেন ১৮০৭ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত। তার সেই সিলেবাসে দেখলাম প্লেটো অ্যারিস্টটল পড়ানো হবে। কিন্তু হিউম, কান্ট, হেগেলের নাম নেই। ওরা তো মুসলমান ছিলেন না, ওদের বই কেন পড়ানো হবে। অথচ আধুনিক দার্শনিকদের বই পড়ানো যাবে না কেন?

আপনারা বলছেন ব্যাংকিং পড়ানো হয়। কী পড়ান সেখানে? এই যে ইসলামি ব্যাংকের কথা বলছেন, সেখানে সুদের নামে কী হচ্ছে? আমি যদি সুদ নামটা বাদ দিয়ে লাভটা গ্রহণ করি তাহলে এর শোষণচরিত্র বন্ধ হয় না। আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন, কিন্তু সুদকে নিষেধ করেছেন। তাহলে জানতে হবে সুদ কাকে বলে? এর চরিত্র কী? এবং ব্যবসার মধ্যে মুনাফার চরিত্র কী? এই তিনটি জিনিসের চরিত্র কার্ল মার্কস নামে একজন ইহুদি পণ্ডিত নিরূপন করেছেন। তিনি বলেছেন, খাজনা, মুনাফা এবং সুদ তিনটিকে বলে উদ্বৃত্ত মূল্য। শ্রমিককে বঞ্চিত করে মালিকের হাতে যা থাকে তার নাম সারপ্রাস ভেলু। এটাকে নানা নামে মানুষের মধ্যে বন্টন করা হয়। আমরা যে উচ্চ দালানে বসে আছি এর মধ্যে সেই বন্টন আছে। এগুলো তো কার্ল মার্কসের বইতে লেখা আছে। সেটা একটা সাইন্স।মাদ্রাসায় কেন কার্ল মার্কসের দাস ক্যাপিটাল পড়ানো হবে না? আমরা কি সিলেবাসে এসব আলোচনা করতে পারব? তাহলে প্লেটো অ্যারিস্টটল আমরা কীভাবে পড়াব? এই কথাগুলো মোকাবেলা করার মতো সাহস আমাদের হোক এটাই প্রার্থনা করি।

মওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ :

আপনারা যারা কলেজে পড়াচ্ছেন তাদের সঙ্গে আমাদের মাদ্রাসার শিক্ষকদের যে দূরত্ব এটা একটা সমস্যা। এ জন্য আমি বলি, এসব কাগুজে শিক্ষার কথা। বারবারার কথা আমি জানি। ও দীর্ঘদিন মাদ্রাসায় ছিল। আমি একটি ঘটনার কথা বলি। আমেরিকার একজন কর্মকর্তা আমাদের মাদ্রাসায় এসেছিল। এসে কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে এদিকওদিক তাকায়। আমি বলি কী হয়েছে? উনি বললেন, আমি এখানে আসার আগে সবাই আমাকে সাবধান করে দিয়েছে যে ওরা তোমার কল্লা নিতে পারে। কিন্তু আমি তো দেখছি এখানে সবাই পড়ালেখা করছে। এ জন্য বলি আমাদের পরস্পরের মধ্যে আদানপ্রদান দরকার। একজন আরেকজন সম্পর্কে জানাও ভীষণ প্রয়োজন।

তাহলে এসব সমস্যা থাকবে না।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম :

আমাদের আগের এবং পরবর্তী আলোচনা বেশ শান্তিপূর্ণভাবেই হয়েছে। তবে একটি জিনিস বুঝতে পারলাম আমাদের মধ্যে আন্ত‍:যোগাযোগের সমস্যা রয়েছে। আমরা একটি জাতি। কিন্তু এর মধ্যে নানা শ্রেণি তৈরি হবে এবং ওই শ্রেণিগুলোর মধ্যে নানা চিন্তাধারা কর্মধারা প্রবাহিত হবে অথচ সেটা কেউ জানবে না-- এটা একটি জাতীয় দুর্বলতা। সলিমুল্লাহ যেভাবে বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন তাতে তার অসাধারণ পাণ্ডিত্য বোঝা গেছে। আমরা তার চিন্তাধারা বুঝতে পেরেছি। আসলে আমরা সবাই শান্তি চাই, ঐক্য চাই। বুঝতে হবে। বুঝতে পারলে অনেক সংগ্রাম, সংঘর্ষ কেটে যাবে। আমাদের আজকের আলোচনা আমার কাছে বেশ ফলপ্রসূ মনে হয়েছে।

অধ্যাপক সালাহউদ্দীন আহমদ :

এখানে এসে অনেক কিছু জানলাম, শিখলাম। খোলামনে আলোচনাটার দরকার ছিল। আসলে আমাদের শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান অর্জন করা। অনেকের ধারণা মাদ্রাসায় বুঝি পুরাতন ঐতিহ্যের জ্ঞানকে সংরক্ষণ করা হয়। নতুন কোনো জ্ঞান সৃষ্টি করা হয় না, এটা ঠিক নয়।


সলিমুল্লাহ খান :
নতুন কথা কিছু নয়। তিনটি প্রশ্ন আছে। এক. আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কী পড়ানো হবে। দুই. কোন ভাষায় পড়ানো হবে। আমাদের দীনি শিক্ষা যে পড়ানো হচ্ছে, এতে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এটা সমসাময়িক করা যাবে কি না? আমরা বুঝতে পারছি মাদ্রাসা শিক্ষার মাধ্যম এখন বাংলা হওয়া উচিত। আমাদের অন্যান্য শিক্ষা কেন বাংলায় হবে না। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা হল মৌলিক শিক্ষা। উচ্চশিক্ষা অপশোনাল। সারাবিশ্বে মৌলিক শিক্ষার বয়স বার বছর। তবে ইদানিং দেখা যাচ্ছে জাতিসংঘসহ আমাদের বাংলাদেশে তিন চার বছর বস্তির শিশুদের শিক্ষা দেওয়ার পর বলা হচ্ছে তোমার পড়া শেষ। তাদের সনদ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা ঠিক নয়। এটা একটা প্রতারণা। পৃথিবীর সব দেশে মৌলিক শিক্ষার বয়স কমপক্ষে বার বছর। কিন্তু আমাদের এখানে এসব বিষয় ঠিক করতে হবে।

মুহম্মদ নূরুল হুদা :

আমরা যে উদ্দেশে এই বৈঠকের আয়োজন করেছিলাম তা বহুলাংশে সফল। আমরা এ পর্যায়ে এসে পড়েছি। আলোচনা শুরুর আগে এখানে অনেকে কওমি শিক্ষা কী বা এর সিলেবাস কী রকম-- এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তারই পথ ধরে আমরা শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্নতা, তার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত ও সবশেষে বতর্মান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে হেফাজতসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উত্থান লক্ষ করছি। সুনীতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের বাস্তবায়নে আমাদের সবাইকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে ও আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে আসতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহিত বাংলাদেশে এ পথেই একটি মঙ্গলময় ও সৃষ্টিশীল সমাজ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।

Sunday, June 23, 2013

আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই


আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই , বঞ্চিত করে বাঁচালে আমায়!
শবে বরাতের রাতে কতো প্রত্যাশা কতো জনের !! প্রত্যাশা মতো ভাগ্য খুলে গেলে প্রাণে খুশির জোয়ার! আর নাহয় তো হতাশায় ডুবে যাওয়া... এই তো জীবন!!...
ছোটবেলায় এই রাত টির জন্যে অপেক্ষায় থাকতাম.... মোমবাতি , আতশবাজি নিয়ে আসতেন বাবা। আর মা সারাদিন ব্যাংকিং, মহিরা পরিষদ এর মামরা মোকদ্দমা - আন্দোলন সংগ্রাম সেরে বুটের ডালের হালুয়া, পরোটা, ঝাল ঝাল মুরগীর মাংস, গরুর মাংস, আরো নানান নাশতা নিয়ে বাপ্পুর বাসা, ফুইয়া দের বাসা, খালাম্মাদের বাসা , মামা দের বাসায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা! কী অপূর্ব বন্ধন! পারিবারিক একাত্মতা ধরে রাখার একনিষ্ঠ প্রয়াস! আমি নিজের অবস্থান থেকে ভাবতে থাকি -আমার বাস্তবতা আমার পারিপার্শ্বিকতা এতো বিরূপ কেন? এখনো আম্মু তার এ চর্চা ধরে রাখতে পেরেছে! আর আমি এখনো অস্তিত্বের সংগ্রাম করে চলেছি!

আব্বু পাথরঘাটার বাড়িটা তোলার পর আমরা নীচতালায় থাকতাম। ঘরের সামনের সিঁড়ি তে সুন্দর করে নানান রঙ্গের মোম জ্বালাতাম। আব্বুর হাতে ছোট ছোট মোম আর অনেক বাজি! আমি ভাইয়া, অমি< ইশতিয়াক... সবার হাতে হাতে মোম আর বাজি!! শিশুদের আনন্দ দেবার জন্যে বাবার যে কী উৎসাহ!!
মোমের আলোয় কী সুন্দর আলোর সারি !! আর অনেক বাজির মধ্যে তারা বাজি হাতে নিলেই কী ভয় যে লাগতো! আবার আনন্দ ও পেতাম খুব!
আব্বুর মনের ভেতর আমৃত্যু এই শিশুতোষ - শিশুপ্রেমী মন ছিল। আমার বিয়ের পর ও শবেবরাতের সন্ধ্যায় বাবা একইভাবে মোম আর বাজি নিয়ে গিয়েছিলেন! আরো কতো কী যে নিতেন! লুডু ও নিয়ে যেতেন! বলতেন বাড়ির বৌয়েরা একটু অবসরে খেলবে বাচ্চাদের নিয়ে!!একটি রক্ষণশীল পরিবারে বাবার এমন প্রস্তাব এর যে কী ভয়াবহ আর বিপরীত প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো! সেসব মনে হলো হঠাৎ নিজেকে এতো বেশী অপরাধী মনে হয়!!

সব থেকেই একদিন বঞ্চিত হতে হয় মানুষ কে!