Thursday, February 5, 2015

জেনে নিক্ তৃষাতুর ঘাতক-সুমি খান

বাতাসে লাশের গন্ধ-
২৫ মার্চ ১৯৭১-
ইয়াহিয়ার দাবি ছিল অতি 'সামান্য'
বাংলাদেশের মাটি-
সে মাটি লুটে নিতে
 লুটেছে তোমার আমার সব-
লুটেছে রবীন্দ্র -নজরুল-জীবনানন্দ-সুকান্ত
 কেড়েছে তিরিশ লাখ প্রাণ
 লুটেছে তিন লাখ নারীর সম্ভ্রম-
বাড়ি-ঘর
 মন্দির-মসজিদ-গীর্জা-প্যাগোডা
 আজো সেই প্রেতাত্মার রক্তবীজ
 রক্তপিপাসু লালায়িত -
চলছে রক্তের হোলিখেলা-
তুমি আমি নির্বাক-
প্রশ্নের ঝোড়ো হাওয়া লুটে নেয় রক্তপ্রাণ
 প্রশ্নচিহ্ন আছে বটে-
তবে সেটা
 শুধু শ্লীল অশ্লীলতার কি?
বিষয়টা ভাবনার
 গভীর থেকে গভীরতর-
যেন গভীরখাদ..
উবু হয়ে দেখতে হবে।
 পেছনে প্রস্তুত ঘাতকের সারি!
যাদের দায়িত্ব সামান্যই-
তুমি উবু হতেই
 খুব হাল্কা হাতে
 তোমার মাথার ঠিক পেছনটায়
 একটা চাটি-
তলিয়ে যাবে তুমি-
খাদের একেবারে তলানিতে!!
তবু জেগে আছি আমি তুমি
 পিতৃপুরুষের ঋণে
 তিরিশ লাখ প্রাণের প্রতিশোধের দাবি নিয়ে-
জেনে যাক্ ঘাতকের দল-
যতোই বড়ো হোক্ ঘাতকের সারি-
আমাদের মিছিলের সারি আজ তার চেয়ে অনেক বড়ো-
জেগে আছি আমি তুমি
 লাশ কাটা ঘর নয়
 লাল সবুজের সবীজ মাতৃভূমির বুকে-
ধানসিঁড়িটির তীরে-
শঙ্খচিল শালিকের ভিড়ে-
কর্ণফুলীর তীরে
 মাস্টার'দা প্রীতিলতার রক্তবীজ বেয়ে-
ঘাতকের শান দেয়া ছুরির মুখে
 আমি আছি
 আছো তুমি বন্ধু চিরঞ্জীব!

(সুকান্ত রক্ষিতের পোস্টে " যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবি শ্লীল না অশ্লীল?"- এ প্রশ্নের জবাব লিখতে গিয়ে বিকেল ৫টা, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫)

Wednesday, February 4, 2015

কথাসাহিত্যিক শামসুদ্দীন আবুল কালামের সমাধি রোমের খ্রীষ্টান গোরস্থানে ১৮ বছর-সুমি খান

‘কাশবনের কন্যা’ খ্যাত কথা সাহিত্যিক শামসুদ্দীন আবুল কালাম আজ যেন বিস্মৃত এক নাম। ঊনিশ'শ পঞ্চাশ ও ষাট দশকের অন্যতম শক্তিশালী এই ঔপন্যাসিক অনাদরে, অবহেলায় শায়িত আছেন সুদূর ইতালির খৃষ্টান গোরস্থানে। কোন বাঙ্গালী তাঁর খোঁজ রাখার প্রয়োজনও মনে করে না। এমনই দুর্ভাগা জাতি আমরা, কেউ কখনো দায়িত্ব নিয়ে তাঁর স্মরণ সভা অথবা তাঁর স্মৃতির প্রতি দায়িত্ব পালন করি না।

বাংলার প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শামসুদ্দীন আবুল কালামের মৃত্যুর ১৮ বছর পর ও তাঁর সমাধি রোমের খৃষ্টান কবরস্থান থেকে মুসলিম কবরস্থানে স্থানাস্তরিত করার উদ্যোগ নেয়নি কেউ । ১৯৯৭ সালের ১০ই জানুয়ারী ইতালীর রাজধানী রোমে এক নির্জন এপার্টমেন্টে জীবনাবসান ঘটে প্রচন্ড অভিমানী এই মেধাবী বাঙ্গালীর।সত্তরের দশকে শামসুদ্দীন আবুল কালাম কর্মরত ছিলেন জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও)-এর রোম সদর দফতরে এবং ইতালির বাংলাদেশ দূতাবাসে। ইতালীয়ান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ছিল তাঁর দৃপ্ত পদচারণা।একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ইতালী থেকেই ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করে তিনি অসামান্য অবদান রাখেন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ।
জানা যায়, শামসুদ্দীন আবুল কালাম তাঁর নির্জন এ্যাপার্টমেন্টে মারা যাওয়ার বেশ অনেকক্ষণ পর ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল বহুতল ভবনের বাইরে থেকে জানালা ভেঙ্গে তাঁর লাশ উদ্ধার করে।
 ১৯৫৯ সাল থেকে ইতালীতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন তিনি । দেশটির ‘প্রথম বাংলাদেশী’ শামসুদ্দীন আবুল কালামের মরদেহ উদ্ধারের পর কোন দলিল বা অফিসিয়াল কাগজপত্রে তাঁর কোন ধর্মীয় পরিচয় না থাকায় এবং তাঁর কোন পরিচিত স্বজনের সন্ধান না পেয়ে মূলত ‘বেওয়ারিশ’ লাশ হিসেবে  পুলিশ তাঁকে রোমের এক প্রান্তে ‘প্রিমাপর্তা’ এরিয়ার খ্রীস্টান কবরস্থানে সমাহিত করে। পাশে মুসলিম কবরস্থান থাকলেও ‘রক্ত-সম্পর্কীয়’ স্বজনদের উদ্যোগ বা  অনুমতির অভাবে এই প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিকের সমাধি আজো স্থানান্তর করা হয়নি । শামসুদ্দীন আবুল কালামের প্রতি যেন চরম দায়িত্বহীন রোমের বাংলাদেশ কমিউনিটি। এ প্রসঙ্গে শ. ম তিমির তাঁর ফেসবুকে লিখেছেন, বাংলাদেশভিত্তিক নোংরা রাজনীতি এবং ভিলেজ পলিটিক্স চর্চার ‘ক্যামব্রিজ-অক্সফোর্ড’ খ্যাত এখানকার কমিউনিটি আজ অবধি ন্যূনতম সম্মান দেখায়নি ‘প্রিমাপর্তা’ সমাধিক্ষেত্রে শুয়ে থাকা বাংলার এই সোনার সন্তানের প্রতি।
শামসুদ্দীন আবুল কালামের জন্ম ১৯২৬ সালে বাংলাদেশের বরিশালে। ।১৯৫৯ থেকে ১৯৯৭ সুদীর্ঘ ৩৮ বছর ইতালীতে প্রবাস জীবনের শেষ দিনগুলোতে  তাঁকে প্রচন্ড নিঃসঙ্গতা গ্রাস করলেও দেশটির সাহিত্য সংস্কৃতি এবং কর্মক্ষেত্রে ছিল তাঁর সফল পদচারণা।

ইতালীতে আসার আগেই পঞ্চাশের দশকে প্রকাশিত হয় শামসুদ্দীন আবুল কালামের বেশ ক’টি বিখ্যাত উপন্যাস। বিখ্যাত এই কথাসাহিত্যিকের  সাড়াজাগানো উপন্যাস ‘কাশবনের কন্যা’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৪ সালে। পরবর্তীতে পাঠকের চাহিদা মেটাতে তিনি  আরো কিছু উপন্যাস লিখেন। এর মধ্যে রয়েছে দুই মহল (১৯৫৫), কাঞ্চনমালা (১৯৫৬), জীবন কান্ড (১৯৫৬), জাইজঙ্গল (১৯৭৮), মনের মতো স্থান (১৯৮৫), সমুদ্রবাসর (১৯৮৬), যার সাথে যার (১৯৮৬), নবান্ন (১৯৮৭) ও কাঞ্চনগ্রাম (১৯৮৭)। ভাষা আন্দোলনের বছর ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয় শামসুদ্দীন আবুল কালামের গল্প সংগ্রহ ‘অনেক দিনের আশা’।পরের বছর ‘ঢেউ’ ও ‘পথ জানা নেই’। দুই হৃদয়ের তীর (১৯৫৫) এবং সাহের বানু (১৯৫৭) এই বাঙ্গালী গুণীজনের অমর সৃষ্টি। ১৯৫৯ সালে ইতালী পাড়ি জমাবার আগে সংসার জীবনে সুখী হতে পারেননি শামসুদ্দীন আবুল কালাম। কন্যা ক্যামেলিয়ার জন্মের পর স্ত্রীর সাথে ডিভোর্স হয়ে যায়।এর পর তাঁর সাবেক স্ত্রীকে বিয়ে করেন প্রখ্যাত অভিনেতা গোলাম মোস্তফা। ক্যামেলিয়া পরবর্তীতে মোস্তফার পরিচয়েই বড়ো হন।

 ১৯৫৯ সাল থেকে স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন তিনি ইতালিতে। দেশটির ‘প্রথম বাংলাদেশী’ কথা সাহিত্যিক ও উপন্যাসিক শামসুদ্দীন আবুল কালামের জন্ম ১৯২৬ সালে বাংলাদেশের বরিশালে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ইতালি থেকেই ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করে তিনি অসামান্য অবদান রাখেন বাংলা দেশের অভ্যুদয়ে। সত্তরের দশকে শামসুদ্দীন আবুল কালাম কর্মরত ছিলেন জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ফাও) রোমের সদর দফতরে এবং ইতালির বাংলাদেশ দূতাবাসে। ইতালিয়ান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেও ছিল তাঁর পদচারণা। ইতালিতে আসার আগেই পঞ্চাশের দশকে প্রকাশিত হয় শামসুদ্দীন আবুল কালামের বেশ ক’টি বিখ্যাত উপন্যাস। 


সাত ও আটের  দশকে ইতালিতে খুব স্বল্পসংখ্যক বাংলাদেশীর বসবাস ছিল । ন'য়ের দশকে দেশটিতে বাংলাদেশীদের আগমন দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও স্বদেশীদের সঙ্গে খুব একটা মেশা হয়ে ওঠেনি শামসুদ্দীন আবুল কালামের । বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরির সূত্রে আরেক প্রবীণ বাংলাদেশী লুৎফর রহমান যিনি এখনও জীবিত আছেন, মূলত তাঁর সঙ্গেই কদাচিৎ দেখা-সাক্ষাত হতো শামসুদ্দীন আবুল কালামের।

অভিমানী এই কথাসাহিত্যিক জীবনের শেষ দিনগুলোতে এতটাই জীবনবিমুখ হয়ে উঠেছিলেন যে, ব্যাংকে পর্যাপ্ত অর্থ থাকা সত্ত্বেও বাজার করতেন না এবং অনেকটা না খেয়েই ধীরে ধীরে ধাবিত হন নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে।

Tuesday, February 3, 2015

জামায়াত সহ অন্যদের জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সমন্বয় ও অর্থায়ন করার অভিযোগে বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহার পাকি কূটনীতিক



 
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস-এর অন্যতম সংগঠকের দায়িত্ব পালন করছিলেন ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনের সহকারী ভিসা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাযহার খান ।দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সমন্বয় ও অর্থায়ন করেন তিনি। গোয়েন্দা তথ্যে প্রকাশ, মাযহার খান পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন হিযবুত তাহরীর, আনসারউল্লাহ বাংলা টিম এবং জামায়াত-শিবিরকে। একই সাথে বাংলাদেশের মুদ্রাবাজার ধ্বংস করার লক্ষ্যে ভারতীয় জাল রুপির বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন পাকি কর্মকর্তা মাযহার খান।এই পাকি কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর সম্পৃক্ততার সন্দেহ করছেন গোয়েন্দারা। গোপন বৈঠক করাকালীন মাযহার ধরা পড়েন গোয়েন্দা সংস্থার হাতে। কিন্তু কূটনৈতিক আইনের সুবিধা নিয়ে তাকে  পুলিশের থেকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতায় জড়িত এই কর্মকর্তাকে গোপনে পাকিস্তান পাঠিয়ে দেয় ঢাকার পাকিস্তান দূতাবাস।

গোয়েন্দা সূত্র মতে মাযহার খান পাকিস্তান দূতাবাসের অন্যান্য কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বাংলাদেশের মুদ্রা বাজারে জাল নোট ছড়িয়ে দেন। এর মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীর, আনসার উল্লাহ বাংলা টিম ও জামায়াত-শিবিরের বিভিন্ন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ করা হয়। মূলত বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশে ব্যাপকহারে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়, যা এখনো ধারাবাহিকভাবে চলছে।  
গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের মন্তব্য অংশে বলা হয়েছে, পাকিস্তান হাইকমিশনে ২ বছর দায়িত্ব পালনের বাইরে মোহাম্মদ মাযহার খান নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীর, আনসার উল্লাহ বাংলা টিম ও জামায়াত-শিবিরের কর্মকাণ্ড, পৃষ্টপোষকতা, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।  

 পাকি কূটনীতিক মাযহার খানের বাংলাদেশবিরোধী ভয়ঙ্কর এসব গোপন তৎপরতার তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন  দেশের গোয়েন্দারা। এসব তথ্য প্রকাশিত হবার পর সরকারের বিভিন্ন মহলে তোলপাড় চলছে। জঙ্গি তৎপরতাই শুধু নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মুদ্রাবাজার ধ্বংস করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেন তিনি।এ জন্যে পরিচালনা করেন ভারতীয় জাল রুপির এক বিশাল নেটওয়ার্ক।

দেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি দূতাবাস কর্মকর্তার সহযোগী মজিবুর রহমান নামে বাংলাদেশি একজন নাগরিক গ্রেফতার হওয়ার পর ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ ও ধারাবাহিক তদন্তের সূত্র ধরেই বেরিয়ে এসেছে জঙ্গি তৎপরতা ও জাল রুপি নেটওয়ার্কে থাকা ব্যক্তিদের কার্যক্রমের ক্রমধারা ও রূপরেখা। পাওয়া গেছে তাদের তালিকা ও কথোপকথনের সারাংশ। ওই প্রতিবেদনে তিনটি সুপারিশ করা হয়েছে। যাতে কড়া ভাষায় পাকিস্তান হাইকমিশনের শিষ্টাচারবহির্ভূত কার্যক্রমের নিন্দা জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভিসা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাযহার খানকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার ও পাকিস্তান হতে বাংলাদেশের আসা ব্যক্তিদের ওপর কড়া নজরদারির সুপারিশ করা হয়েছে।  
 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রকাশ, নাশকতার সঙ্গে পাকিস্তান দূতাবাসের সহকারী ভিসা কর্মকর্তা মাযহার খানের সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় দীর্ঘ অনুসন্ধান পরিচালনা করে বাংলাদেশের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। তদন্তে জানা যায়, মাযহার খান জাল নোট (রুপি) তৈরি ও সংগ্রহ করে কতিপয় বাংলাদেশী নাগরিকের মাধ্যমে ভারতে পাচার করেন। এতে তিনি প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গোয়েন্দারা অনুসন্ধানে আরও নিশ্চিত হন যে, মাযহার খানের সঙ্গে জলিল   আখতার ও মো. মজিবুর রহমানসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন মহলের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। এদের মধ্যে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পুলিশের কর্মকর্তা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের (পিআইএ) কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসরত বিশেষ করে লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, যশোর, বেনাপোল এলাকার বাংলাদেশি নাগরিকরা রয়েছেন।

‌এ সংক্রান্ত তথ্য নিশ্চিত হবার পর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাকে নজরদারীতে রাখেন। সেই ধারাবাহিকতায়  গত ১২ জানুয়ারি সোমবার রাতে রাজধানীর বনানীর মৈত্রী মার্কেট এলাকায় মজিবুর রহমান ও পাকিস্তান দূতাবাসের ভিসা কর্মকর্তা মাযহার খানকে গোপন বৈঠকের সময় আটক করে। সে সময়ে পাকি কূটনীতিক মাযহার তার সঙ্গে থাকা বেশ কিছু কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলেন। ছিঁড়ে ফেলা কাগজ সংগ্রহ করে গোয়েন্দারা কিছু বাংলাদেশি পাসপোর্ট নম্বর পান। ওই পাসপোর্টের সূত্র ধরে আরও অনুসন্ধান করে জানতে পারেন যে, পাসপোর্টধারীদের এমন তিন ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের নাম বিভিন্ন সময়ে প্রস্তুত করা হিযবুত তাহরীরের তালিকায় আছে। এরপরই গোয়েন্দারা মজিবুর ও মাযহারকে আটক করে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বনানী থানায় নিয়ে যান।

মাযহারের গ্রেফতারের খবর পেয়ে তাৎক্ষনিক ভাবে সেদিন রাত ১০টার দিকে ঢাকার পাকিস্তান হাইকমিশনের প্রথম সচিব সামিনা মাহতাব বনানী থানায় উপস্থিত হয়ে মাযহার খানকে নিজের হেফাজতে নিয়ে যান। বাংলাদেশী নাগরিক মজিবুর রহমানকে পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

 প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, মজিবুর রহমানের সঙ্গে মাযহার খানের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন মাযহার খানের পূর্বসূরি সহকারী ভিসা কর্মকর্তা। গত ১০ বছরে  পাকিস্তানে ২২ বার,  ভারতে ১১ বার ও  থাইল্যান্ডে ২২ বার ভ্রমন করেছেন মজিবুর রহমান। পরবর্তীতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবিন্দতে মজিবুর জানান, মাযহার খান এক লাখ ৮০ হাজার ভারতীয় জাল রুপি বাজারে ছাড়তে দেন তাকে। একইভাবে মাযহার  জাহিদ, ইমরান ও আরও কয়েকজনকে দিয়ে বড়ো অংকের ভারতীয় জাল রুপি বাংলাদেশের বাজারে ছাড়িয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রের তথ্যমতে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৫ জানুয়ারি পাকিস্তানি নাগরিক মোহাম্মদ ইমরানকে আশি লাখ জাল রুপিসহ আটক করা হয় হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে। ইমরানের পাসপোর্টের ভিসাও ছিল জাল। আগের ঘটনাগুলোর সঙ্গে ইমরানের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়।

পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই'র পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের মুদ্রাবাজার ধ্বংস করার লক্ষ্যে বিশাল জাল রুপির নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন মাযহার । এই নেটওয়ার্কের অন্যতম সদস্য মুজিবুর রহমান জঙ্গিসংগঠনগুলোর জন্য অর্থ পাচার কাজে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। এ জন্যই তিনি ঘন ঘন ভারত, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডে আসা-যাওয়া করেছেন। পাকিস্তানে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ভিসা প্রদান না করায় জাল ভিসার সংখ্যা বাড়ছে বলেও মন্তব্য করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, পাসপোর্ট অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে পাঠানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অতি জরুরিভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয় বলে জানা গেছে।

আরাফাত ‘কোকো’ রহমানের সিমেন্স ও চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি কর্তৃক প্রদত্ত ঘুষ-হাসান ফেরদৌস

পাঠকদের অবগতির জন্য আরাফাত রহমান কোকোর বিরুদ্ধে মার্কিন বিচার বিভাগ কর্তৃক উত্থাপিত মামলা বিষয়ে কিছু সম্পূরক তথ্য প্রদান করা হলো।এখানে যোগ করা ভালো যে আরাফাত রহমান কোকোর এই মামলাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ব্যাংকে প্রশিক্ষণকাজে ‘উদাহরণযোগ্য কেস স্টাডি’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

১। ১৫ ডিসেম্বর ২০০৮ সালে মার্কিন বিচার বিভাগের প্রদত্ত তথ্য অনুসারে, সিমেন্স স্বীকার করে নেয় যে ২০০১ সালের মে মাস থেকে ২০০৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত তারা তথাকথিত বিজনেস কনসালট্যান্টের মাধ্যমে ৫৩ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৯ ডলার ঘুষ প্রদান করে। এই নথিতে আরাফাত রহমানের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লিখিত হয়নি। মার্কিন বিচার বিভাগের নথিটি এই ওয়েব লিঙ্কে দেখুন: (
http://www.justice.gov/archive/opa/pr/2008/December/08-crm-1105.html)

২। ৮ জানুয়ারি ২০০৯ সালে মার্কিন বিচার বিভাগ কর্তৃক যে সংশোধিত অভিযোগনামা পেশ করেন, তাতে কোকোর নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লিখিত হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে আরাফাত ‘কোকো’ রহমানের নামে সংরক্ষিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সিমেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড ও চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি কর্তৃক প্রদত্ত ঘুষের টাকার খোঁজ পাওয়া গেছে। (The forfeiture action was filed Jan. 8, 2009, in U.S. District Court in the District of Columbia against funds located in Singapore held by multiple account holders. The forfeiture complaint relates primarily to alleged bribes paid to Arafat ‘Koko’ Rahman, the son of the former prime minister of Bangladesh, in connection with public works projects awarded by the government of Bangladesh to Siemens AG and China Harbor Engineering Company. According to the forfeiture complaint, the majority of funds in Koko’s account are traceable to bribes allegedly received in connection with the China Harbor project, which was a project to build a new mooring containment terminal at the port in Chittagong, Bangladesh.
<
http://www.fbi.gov/washingtondc/
press–releases/2009/wfo010909.htm>
বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে। বিস্তারিত দেখুন: <
http://star.worldbank.org/corruption-cases/node/18728>

২০০৯ সালের ১ এপ্রিল আমেরিকান পাবলিক টেলিভিশন (পিবিএস) এক বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরাফাত রহমান কোকোর নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে এক দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচার করে। তাতে বলা হয়, (বিদেশি কোম্পানি দুটি) তাদের অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির ওপর টেক্কা দিতে একজন বাংলাদেশি কনসালট্যান্ট নিয়োগ করে যার সরাসরি যোগাযোগ ছিল প্রধানমন্ত্রীর ছেলে আরাফাত রহমানের সঙ্গে। তিনি ছাড়াও একজন মন্ত্রী ও আরও চারজন এই বন্দোবস্তের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সিমেন্সের নিজস্ব স্বীকারোক্তি অনুসারে তারা আরাফাত রহমানের সিঙ্গাপুর অ্যাকাউন্টে ১ লাখ ৮০ হাজার ডলারের (ঘুষ) প্রদান করে।
 
 বিস্তারিত  <http://www.pbs.org/frontlineworld/stories/bribe/2009/04/bangladesh-following-the-siemens-bribery-trail.html>

হাসান ফেরদৌস, নিউইয়র্ক।

‘কোকো কাহিনি’র তৃতীয় পাঠ -মিজানুর রহমান খান

‘কোকো কাহিনি’ নিয়ে এর আগে দুটি লেখা ছাপা হয়েছে। হাসান ফেরদৌসের পরে গতকাল মাহবুব উদ্দীন খোকন লিখেছেন। তিনি একটি ভালো কাজ করেছেন। ভয়েস অব আমেরিকার কোনো কোনো খবর সম্প্রচারের আগে ঘোষণা আসে যে এতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মতামত প্রতিফিলত হচ্ছে। তেমনি খোকন বলে নিয়েছেন যে তিনি কোকোর আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধটি লিখেছেন। অবশ্য তাঁর পরিচয়ে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদবি রয়েছে। তিনি সুপ্রিম কোর্ট বারের সম্পাদক। বার কাউন্সিলের হিউম্যান রাইটস ও লিগ্যাল কমিটির চেয়ারম্যান।
তবে তাঁর লেখাটি পড়ে অনেকের ধারণা হতে পারে যে কোকোর বিরুদ্ধে সিঙ্গাপুরের সরকারও কোনো সাজানো মামলায় অংশ নিয়েছে কি না। খোকনের চারটি দাবি আমরা আমাদের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে যাচাই করব। ১. সিঙ্গাপুরে কোকোর কখনোই কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না। সুতরাং দেশটির ব্যাংকের কথিত অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ২. কোকোর স্বাক্ষর প্রমাণ করার জন্য সিঙ্গাপুরের ব্যাংক থেকে কেউ সাক্ষ্যও দেয়নি। ৩. দুদকের এজাহার থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে কোকো কখনো সিঙ্গাপুরি কোম্পানি ‘জেডএএসজেড’–এর শেয়ারহোল্ডার বা পরিচালক ছিলেন না। ৪. কোকো ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ থেকে ১৭ জুলাই ২০০৮ পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন। তাই এজাহারমতে ১৬ নভেম্বর ২০০৭ তারিখে টাকা সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে জমা দেওয়া অথবা সেই টাকা ফেরত আনার দাবি হাস্যকর।
এই লেখা কোকো কাহিনির তৃতীয় পাঠ। এটা লেখার আগে আধা ঘণ্টা বিএনপির একজন ওয়াকিবহাল নেতার সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করেছি। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।
প্রথম আলো কোকো কাহিনির অনুসন্ধান শুরু করেছিল সেই ২০০৮ সাল থেকে। ১৯ ডিসেম্বর ২০০৮–এ ছাপা হয়েছিল ‘কোকোর ১৬ কোটি টাকা জব্দ সিঙ্গাপুরে’। ২১ ডিসেম্বর ছাপা হয়েছিল ‘কাজ পেতে কোকোকে ঘুষ দেয় সিমেন্স’। পরে ২০১১ সালের ৩ জানুয়ারি ‘তিন মিলিয়ন ডলারের বেশি স্থানান্তরের জন্য জরিমানা’ শিরোনামে সিঙ্গাপুরের স্ট্রেইট টাইমস-এ একটি খবর ছাপা হলো। এতে বলা হলো, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর পক্ষে মানি লন্ডারিং করার জন্য লিম সিউ চ্যাং দোষ স্বীকার করেন। আদালত তাঁকে ৯ হাজার ডলারের বেশি জরিমানা করেন। এই প্রতিবেদনের প্রতিবেদক খুশবন্ত সিংয়ের কাছে (প্রখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক খুশবন্ত সিং নন) ই-মেইল করে আদালতের নথিপত্র উদ্ধারের চেষ্টা করি। তিনি ফ্যাক্সে পাঠাবেন বলেছিলেন। আমি তা পাইনি। পরে ১১ জানুয়ারি ২০১১ দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় একজন রাষ্ট্রদূতের কাছে এ ব্যাপারে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চাওয়া হয় প্রথম আলোর পক্ষ থেকে। ওই রাষ্ট্রদূত জানালেন, সব নথিপত্র এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। তবে তাঁর পরামর্শে ১২ জানুয়ারিতে আমি সিঙ্গাপুর সরকারের করপোরেট কমিউনিকেশনসের জ্যেষ্ঠ উপপ্রধান মিশেল চিয়াংকে ই-মেইল করি। তিনি পরদিনই মামলার অভিযোগপত্র ও স্টেটমেন্ট অব ফ্যাক্টস পাঠিয়ে দেন। আমি তাঁকে লিখি যে আমি আপনাদের দেশে আসতে চাই। মি. লিম, ব্যাংক ও তদন্তকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাই। সেটা কি সম্ভব? এর উত্তরে তিনি মিস লির ঠিকানা দেন। লি জিন হ সিঙ্গাপুরের অ্যাটর্নি জেনারেলের চেম্বারের করপোরেট কমিউনিকেশনসের সহকারী পরিচালক।
১৯ জানুয়ারি ২০১১ তাঁর কাছে প্রশ্ন ছিল: উদ্ধার করা অর্থের ভবিষ্যৎ কী? সিঙ্গাপুরের আইন কি বিদেশি বিনিয়োগের উৎস সম্পর্কে একেবারেই নীরব? তাঁর উত্তর ছিল: বিষয়টি যেহেতু এখনো আদালতে বিচারাধীন, তাই উদ্ধার করা অর্থের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এখনই কোনো মন্তব্য করা যাবে না। আপনি এই মামলার সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটরদের সঙ্গে কথা বলার যে অনুরোধ করেছেন, তা-ও রক্ষা করা সম্ভব নয়। বিদেশি বিনিয়োগসংক্রান্ত আমাদের আইনের বিষয়ে আপনি ঠিক কী জানতে চাইছেন? ২৯ জানুয়ারি আমি এর উত্তরে লিখি: ‘অভিযুক্ত দোষ স্বীকার করেছেন। আদালত তাঁর রায়ও দিয়েছেন। তাহলে এখনো কীভাবে তা বিচারাধীন বলে গণ্য হতে পারে? তাহলে কি এ মামলা সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো বিষয় এখনো ‘চলমান’ রয়েছে? আদালত কি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থের উৎস জানতে চাইতে পারেন? পারলেও বিদেশিদের জন্য কোনো দায়মুক্তি আছে কি না?’
১৪ ফেব্রুয়ারি মিস লি আমাকে এর উত্তরে লিখেছেন, ‘মি. লিম সিউ চ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পরিচালিত প্রসিকিউশন শেষ হলেও মামলাটি এখনো চলমান রয়েছে। কারণ এর সঙ্গে জব্দ করা অর্থের কী হবে, তা ফয়সালার প্রশ্ন জড়িত রয়েছে। তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে আমরা স্বাধীন নই।’ এরপর আমি আর ধারাবাহিকতা রক্ষা করিনি। তবে আমাদের কাছে সিঙ্গাপুর সরকারের যে নথি রয়েছে, তা কোকো কাহিনির তৃতীয় পাঠের জন্য যথেষ্ট।
১৭ ডিসেম্বর ২০১০ সিঙ্গাপুর সরকারের করাপ্ট প্র্যাকটিসেস ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোর প্রিন্সিপাল স্পেশাল ইনভেস্টিগেটর তক থিয়াম সুন ফ্রেডরিক লিমের বিরুদ্ধে দুটি পৃথক অভিযোগপত্র তৈরি করেন। এতে বলা হয়, ফেয়ারহিল নামের কোম্পানির নমিনি পরিচালক হিসেবে আপনি (লিম) জনৈক আরাফাত রহমানের দ্বারা আদিষ্ট হয়ে ২০০৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কোম্পানির অ্যাকাউন্ট থেকে নিজের নামে ৯ লাখ ৬৭৭ ডলার স্থানান্তর করেছেন। ১৭ ডিসেম্বর ২০১০ ফ্রেডরিক তাঁর দ্বিতীয় অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন যে আপনি ২২ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ জনৈক আরাফাত রহমানের আদেশে জেডএএসজেড (আরাফাত রহমানের স্ত্রী ও কন্যাদের নামের অাদ্যক্ষর নিয়ে কোম্পানিটির নামকরণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়) ট্রেডিং কোম্পানির নমিনি পরিচালক হিসেবে এর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ২০ লাখ ডলার স্থানান্তর করেছেন। সন্দেহজনক এই দুটি লেনদেনকেই ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এখন আমরা এই অভিযোগের পূর্ববৃত্তান্ত জানব ৩ জানুয়ারি ২০১১ সিঙ্গাপুরের ডেপুটি পাবলিক প্রসিকিউটর চারলিন টে-র বরাতে। ১৩টি প্যারায় তিনি কোকো কাহিনি গ্রন্থনা করেছেন।
লিম সিউ চ্যাং একটি পরামর্শক ও আরেকটি সাচিবিক সহায়তাদানকারী কোম্পানি চালান। সিঙ্গাপুরভিত্তিক কিউসি শিপিংয়ের ক্যাপ্টেন সোহেল চ্যাংকে একদিন আরাফাত রহমান কোকোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ১২ এপ্রিল ২০০৪ জেডএএসজেডের নামে যৌথ ব্যাংক হিসাব খুলতে কোকো চ্যাংয়ের সঙ্গে ইউওবি ব্যাংকের ত্যানজং পাগার শাখায় যান। এরপর কোকো ‘ফেয়ারহিল’ নামে চ্যাংয়ের নামে আরেকটি কোম্পানি খোলেন। কোকো হয়তো কোনো বিপদ টের পেয়েছিলেন। ২০০৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর কোকো এ জন্য ইউওবি ব্যাংকের শেনটন ওয়ে ব্রাঞ্চে গিয়েছিলেন এবং পরে কোকোর এই বুদ্ধিমত্তার প্রমাণও মিলেছে। কারণ ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ কোকোর ফোন পান চ্যাং। তাঁকে বলা হয়, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমস্যা চলছে। উভয় কোম্পানি বন্ধ করে দিতে হবে। ব্যাংকের টাকা তৃতীয় আরেকটি ব্যাংক হিসাব খুলে সেখানে সরাতে হবে। এই বিবরণী চ্যাংয়ের জবানবন্দি থেকে নয়, সিঙ্গাপুর সরকারের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে বলছি। সিআইসি নামের আরেকটি ব্যাংকে নতুন হিসাব খুলে চ্যাং ওই দুই কোম্পানির অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা সরান। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ সালে ৯ লাখ ডলার এবং ২২ ফেব্রুয়ারি ২০ লাখ ডলার জেডএএসজেড থেকে স্থানান্তর করা হয়। সুতরাং
সবটাই ঘটেছে কোকোর জেলে যাওয়ার আগে। এই তদন্ত প্রতিবেদনে দুটি অ্যাকাউন্টে অনেক মানুষের বিপুল অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর ও তা প্রত্যাহারের কথা উল্লেখ আছে। এই মামলায় কোকো দণ্ডিত হলেও সব তথ্য দেশবাসীর জানা হয়নি বলেই আমাদের বিশ্বাস।
লেখার শুরুতেই বিএনপির এক নেতার সঙ্গে কথা বলার প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছিলাম। বিএনপির ওই নেতা আমাকে বলেন, নির্বাসিত কোকোর সঙ্গে থাইল্যান্ডে তাঁর দুই দফা আলোচনা হয়। কোকো তাঁকে বলেছেন, ওই টাকা তাঁর নয়। তবে প্রয়াত মন্ত্রী আকবর হোসেনের ছেলে এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন বলে কোকো ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ২০০৬ সালে কোকো তাঁকে বলেছিলেন, তাঁর সাড়ে তিন কোটি টাকা আছে। তিনি তাতেই সুখী। আমি তাঁকে বললাম, দুদকের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট আর সিমেন্স–সংক্রান্ত রায় দেখিয়েও আপনারা কোকো কাহিনির বিভ্রান্তি দূর করতে পারবেন না। আপনারা কি সিঙ্গাপুরের তদন্তকারী কর্মকর্তা, ব্যাংক, আদালত এমনকি অভিযুক্ত ব্যক্তি কারও সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছেন? তিনি না বলেন। প্রশ্নের জবাবে এসব ‘ধারণা নেই’ বলে নাকচও করেননি।
দুদক কোকোর বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে মামলা করলেও সিঙ্গাপুরে এই অর্থের হদিস এক-এগারোর পরেই উদ্ঘাটিত হয়েছিল। আসলে সিঙ্গাপুরে কোকোর কোম্পানি-সংশ্লিষ্ট লিম সিউ চ্যাং এবং সিমেন্স উভয়ে সংশ্লিষ্ট আদালতে পত্রপাঠ দোষ স্বীকার করেছেন। না করলে দীর্ঘ শুনানি হতো, আর তাতে বিস্তারিত তথ্য বেরোত। জার্মানির সিমেন্সের ১৪০ কোটি ডলারের বেশি ঘুষের অর্থ এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে বিলি হয়।
সিমেন্স দ্রুত দোষ স্বীকার করেছে, কারণ তারা জানে বিশ্বব্যাপী নামগুলো প্রকাশ পেলে কী ক্ষতি হবে। আর এফবিআই দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয় যে তারা তাদের স্বার্থ বিকিয়ে বিশ্বময় কোকোদের নাম ফেরি করে বেড়াবে। আর্জেন্টিনা, বাংলাদেশ ও ভেনেজুয়েলার সিমেন্স কার্যালয় যুক্তরাষ্ট্রকে পাঁচ লাখ ডলার করে জরিমানা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ধনী বিশ্বের কবে হুঁশ ফিরবে। কবে তারা বুঝবে এই জরিমানার টাকা ভোগের বিনিময়ে অপরাধীদের প্রকৃত দায়মুক্তি দেওয়ার ফলে দরিদ্র বিশ্বে কী নিষ্ঠুর উন্নয়ন বঞ্চনা ঘটছে।
কোকো লঞ্চ বেরোনোর পর পাকিস্তানের ডন পত্রিকার এক নিবন্ধে ‘কোকোইজম’-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। কোকোর অকাল মৃত্যুর জন্য দুঃখ প্রকাশ করি। অভিশাপ দিই সেই রাজনীতিকে, যে রাজনীতি কোকোইজম লালন করে চলেছে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক, প্রথম আলো

দালাল আইনে আটক সাজাপ্রাপ্তদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা ১৯৭৩

সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার প্রতিবেদন : দৈনিক বাংলা ১ ডিসেম্বর ১৯৭৩
 
উপ-শিরোনাম : দেশের কাজে আত্মনিয়োগের জন্য ক্ষমাপ্রাপ্তদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আহ্বান : ধর্ষণ ও হত্যাকারীদের ক্ষমা নেই
 
সরকার বাংলাদেশ দালাল আইনে অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনাল) অধ্যাদেশ ১৯৭২ বলে যারা আটক হয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা অথবা হুলিয়া রয়েছে এবং যারা এই আইনে সাজা ভোগ করছেন তাদের সকলের প্রতিই এই সাধারণ ক্ষমা প্রযুক্ত হবে এবং তারা অবিলম্বে মুক্তিলাভ করবেন। তবে নরহত্যা, নারী ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগ অথবা বিস্ফোরকের সাহায্যে ঘরবাড়ি ধ্বংস অথবা জলযান ধ্বংসের অভিযোগে অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা প্রযুক্ত হবে না। গতকাল শুক্রবার রাতে প্রকাশিত এক সরকারী প্রেসনোটে এই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার কথা প্রকাশিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গতরাতে বলেন, দলমত নির্বিশেষে সকলেই যাতে আমাদের মহান জাতীয় দিবস ১৬ ডিসেম্বরে ঐক্যবদ্ধভাবে নতুন দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে দেশ গড়ার শপথ নিতে পারে সরকার সেজন্য 'দালাল আইনে ' আটক ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। বাংলাদেশ দালাল অধ্যাদেশে আটক ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যাতে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর অনতিবিলম্বে জেল থেকে মুক্তিলাভ করতে পারেন এবং আসন্ন ১৬ ডিসেম্বরে বিজয় উৎসবে যোগ দিতে পারেন বঙ্গবন্ধু সেজন্য তাদের মুক্তি তরান্বিত করতে স্বরাষ্ট্র দফতরের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। সাধারণ ক্ষমায় যারা মুক্তি পাবেন তাদের বিজয় দিবসের উৎসবে একাত্ম হতে এবং দেশ গঠনের পবিত্র দায়িত্ব ও দেশের স্বাধীনতা রক্ষার শপথ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
 
বঙ্গবন্ধু তাঁর সরকারের সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শনের কথা ঘোষণা করতে গিয়ে বলেন, মুক্ত হয়ে দেশগঠনের পবিত্র দায়িত্ব গ্রহণের পূর্ণ সুযোগ তারা গ্রহণ করবেন এবং তাদের অতীতের সকল তৎপরতা ও কার্যকলাপ ভুলে গিয়ে দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন তিনি এটাই কামনা করেন।
 
 বঙ্গবন্ধু বলেন, বহু রক্ত, ত্যাগ তিতিক্ষা আর চোখের পানির বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি। যে কোনো মূল্যে এই স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে এবারের বিজয় দিবস বাঙালীর ঘরে ঘরে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণের এক নতুন দিগন্ত উম্মোচিত করবে।
 প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কিছু লোক দখলদার বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করে আমাদের মুক্তি সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিলেন। পরে বাংলাদেশ দালাল আদেশ বলে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে অনেকেই পরিচিত ব্যক্তি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দখলদার বাহিনীর সঙ্গে তাদের সহযোগিতার ফলে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশা নেমে এসেছিল।
 
বঙ্গবন্ধু বলেন, এসব লোক দীর্ঘদিন ধরে আটক রয়েছেন। তিনি মনে করেন এতদিনে তারা নিশ্চয়ই গভীরভাবে অনুতপ্ত। তারা নিশ্চয়ই তাদের অতীত কার্যকলাপের জন্য অনুশোচনায় রয়েছেন। তিনি আশা করেন তারা মুক্তিলাভের পর তাদের সকল অতীত কার্যকলাপ ভুলে গিয়ে দেশ গঠনের নতুন শপথ নিয়ে প্রকৃত দেশপ্রেমিকের দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন।

গতকাল স্বরাষ্ট্র দফতর থেকে নিম্নোক্ত প্রেসনোটটি ইস্যু করা হয়।
 
প্রেসনোট :

যারা ১৯৭২ সালের দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনাল) আদেশ (পি.ও নং-৮, ১৯৭২ সালের) বলে আটক রয়েছেন অথবা সাজাভোগ করছেন তাদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শনের প্রশ্নটি সরকার আগেও বিবেচনা করে দেখেছেন। সরকার এ সম্পর্কে এখন নিম্নোক্ত ঘোষণা করছেন :
 
১. দু'নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত ব্যক্তিদের ও অপরাধ সমূহের ক্ষেত্র ছাড়া :
 
 (ক) ১৮৯৮ সালের ফৌজদারী দন্ডবিধি ৪০১ নং ধারা অনুযায়ী উল্লিখিত আদেশবলে আটক ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের রেহাই দেওয়া হচ্ছে এবং উল্লিখিত আদেশ ছাড়া অন্য কোনো আইনবলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকলে তাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার অনতিবিলম্বে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হবে।
(খ) কোনো বিশেষ ট্রাইবুনালের সম্মুখে অথবা কোনো বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে উক্ত আদেশবলে বিচারাধীন সকল মামলা সংশ্লিষ্ঠ ট্রাইবুনাল ও ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে প্রত্যাহার করা হবে এবং উল্লিখিত আদেশ ছাড়া অন্য কোনো আইনে তাদের বিরুদ্ধে বিচারাধীন কোনো মামলা বা অভিযোগ না থাকলে তাদের হাজত থেকে মুক্তি দেওয়া হবে।
(গ) কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে উল্লিখিত আদেশবলে আনীত সকল মামলা ও তদন্ত তুলে নেওয়া হবে এবং উল্লিখিত আদেশ ছাড়া অন্য কোনো আইনে বিচার বা দন্ডযোগ্য আইনে সে অভিযুক্ত না হলে তাকে মুক্তি দেওয়া হবে। উল্লিখিত আদেশবলে ইস্যু করা সকল গ্রেফতারী পরোয়ানা, হাজির হওয়ার নির্দেশ অথবা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে হুলিয়া কিংবা সম্পত্তি ক্রোকের নোটিশ দেয়া থাকলে তা প্রত্যাহার বলে বিবেচিত হবে এবং গ্রেফতারী পরোয়ানা অথবা হুলিয়ার বলে কোনো ব্যক্তি ইতিপূর্বে গ্রেফতার হয়ে হাজতে আটক থাকলে তাকে অনতিবিলম্বে মুক্তি দেওয়া হবে। অবশ্য সে ব্যক্তি উল্লিখিত দালাল আদেশ ছাড়া কোনো বিচার বা দন্ডযোগ্য অপর কোনো আইনে তার বিরুদ্ধে যদি কোনো মামলা না থাকে তবেই।
 
 যাদের অনুপস্থিতিতেই সাজা দেওয়া হয়েছে অথবা যাদের নামে হুলিয়া বা গ্রেফতারী পরোয়ানা ঝুলছে তারা যখন উপযুক্ত আদালতে হাজির হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা ও বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করবে কেবল তখনই তাদের বেলা ক্ষমা প্রযোজ্য হবে।
 ২. দন্ডবিধির ৩০২ নং ধারা (হত্যা), ৩০৪ নং ধারা, ৩৭৬ ধারা (ধর্ষণ), ৪৩৫ ধারা (গুলি অথবা বিস্ফোরক ব্যবহার করে ক্ষতিসাধন), ৪৩৬ ধারা (ঘর জ্বালানো) ও ৪৪৮ ধারায় (নৌযানে আগুন বা বিস্ফোরণ) অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্তগণ এক নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লিখিত ক্ষমার আওতায় পড়বে না।

দৈনিক বাংলা
 
জিয়া সরকারের প্রধানমন্ত্রী হওয়া শাহ আজিজুর রহমান এবং এরশাদের কাছে স্বাধীনতা পদকে সম্মানিত শর্ষীনার পীর সাহেবের জেলমুক্তি নিয়ে খবরটি। লেখা হয়েছে :
 
 বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ আদেশে গতকাল শুক্রবার সকালে ঢাকা সেন্ট্রাল জেল থেকে অধুনালুপ্ত পিডিপির নেতা শাহ আজিজুর রহমান এবং শর্ষীনার পীর সাহেবকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। দখলদার বাহিনীর সাথে সহযোগিতার অপরাধে তাদের আটক করা হয়েছিলো। এনার খবরে একথা জানা গেছে। স্মর্তব্য শাহ আজিজুর রহমান পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর সমর্থনে জাতিসংঘে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। একটু খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে গভর্ণর মালেক ও শাহ আজিজের মতো হাইপ্রোফাইল দালালদের কাউকেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বাইরে স্থানান্তর করা হয়নি। গ্রেফতারের পর থেকে তারা সেখানেই ছিলেন মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত। তাই জেল থেকে ডেকে এনে শাহ আজিজকে নিয়ে কুমিল্লায় বঙ্গবন্ধুর খিচুড়ি খাওয়ার গল্পের মতো আজগুবী দাস্তান বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।
 ৩ ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকের খবরে সাধারণ ক্ষমার ফলোআপ -সাধারণ ক্ষমার সিদ্ধান্তটাকে সকল মহল স্বাগত জানিয়েছে । 
 
 স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আবদুল মালেক উকিল 'দালাল আইনে' আটকদের এবং মুক্তিপ্রাপ্তদের বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
 
দালাল আইনে আটক ব্যক্তিদের মোট সংখ্যা ৩৭ হাজার ৪শত ৭১ শিরোনামে ওই খবরে লেখা হয়েছে : সরকার কর্তৃক সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় এই আদেশের আওতাভুক্ত সকল ব্যক্তির মুক্তি ত্বরান্বিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়াছেন। গতকাল (শনিবার) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সহিত আলাপ-আলোচনাকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আবদুল মালেক উকিল এ কথা জানান। তিনি বলেন যে, সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন আদেশের সহিত দালালি আইনে আটক ব্যক্তিদের তালিকা পরীক্ষা করার পর ইহার আওতাভুক্ত সকল ব্যক্তিকে মুক্তিদানের জন্য তিনি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মচারীদের নির্দেশ দিয়াছেন।
 
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান যে, 'দালাল আইন' অনুযায়ী মোট অভিযুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৩৭ হাজার ৪ শত ৭১ জন। ইহার মধ্যে চলতি বছর অক্টোবর মাস পর্যন্ত ২ হাজার ৮ শত ৪৮ জনের বিরুদ্ধে মামলার নিষ্পত্তি হইয়াছে। তন্মধ্যে ৭ শত ৫২ জনের সাজা হইয়াছে এবং বাকি ২ হাজার ৯৬ জন খালাস পাইয়াছেন। তিনি বলেন একটি সংবাদপত্রে দালাল আইনে আটক ব্যক্তিদের সংখ্যা ৮৬ হাজার বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। কিন্তু উহা সত্য নহে বরং অতিরঞ্জিত।
 
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আটককৃত বা সাজাপ্রাপ্ত অনেক প্রাক্তন নেতা এই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আওতায় মুক্তি লাভ করিবেন। তিনি বলেন যে যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্তন গভর্ণর ডাঃ এ এম মালেক ও তাহার মন্ত্রীসভার সদস্যবৃন্দ শীঘ্রই মুক্তিলাভ করিবেন। অন্যদের মধ্যে যাহারা মুক্তি পাইবেন তাহাদের মধ্যে ডঃ কাজী দীন মোহাম্মদ, ডঃ হাসান জামান, ডঃ সাজ্জাদ হোসেন, ডঃ মোহর আলী (প্রত্যেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দালাল শিক্ষক) ও খান আবদুর সবুরও রহিয়াছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন,মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তাহাদের সম্পত্তি ফেরত পাইবেন এবং দেশের নাগরিকদিগকে প্রদত্ত সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করিবেন। 
 
সূত্র : দৈনিক বাংলা, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলার বাণী ও বাংলাদেশ অবজারভার
 

Monday, February 2, 2015

ইউটিউবে খালেদার কথোপকথন নিয়ে মন্ত্রিসভা সরব

 
ইউটিউবে খালেদা জিয়ার কথোপকথন নিয়ে তোলপাড়  হলো মন্ত্রিসভা।চার বছর আগে ঢাকায় বিএনপির একটি সমাবেশের সময় দলের কয়েকজন নেতার সঙ্গে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কয়েকটি টেলিফোন সংলাপের অডিও টেপ সম্প্রতি প্রকাশ হয়েছে ইউটিউবে, যাতে তাকে নেতাদের নানা নির্দেশ দিতে শোনা যায়।

টেলিফোনে  নাশকতার নির্দেশ দিয়ে দলের নেতাদের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কথোপকথন নিয়ে সরব ছিল মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ সদস্য।  ২০১১ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে সারাদেশ থেকে জনসমাগমের প্রস্তুতি নিয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। অনুষ্ঠানস্থল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সকালে আগতদের পুলিশ লাঠিপেটা করে বের করে দিলে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ বাধে, যা ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন জেলায়। ওই সময় ঢাকায় বোমা বিস্ফোরণে একজন মারা যায়, পোড়ানো হয় কয়েকটি গাড়ি। সিলেটে বাসে আগুন দেয়া হলে পুড়ে মারা যান এক যাত্রী। এই ধারাবাহিকতায় এখনো দেশে বোমাবাজির মহোৎসবে প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছেন নিরীহ বাস যাত্রী বা ট্রেন যাত্রী সহ অনেক মানুষ। এর শেষ দেখতে চায় দেশের জনগণ! খালেদা জিয়ার পাঁচটি অডিও টেপ প্রকাশ করেছে বাংলা লিকস । তার মধ্যে চারটিই ওই সমাবেশ শুরুর আগে কয়েকজন নেতার সঙ্গে তার কথোপকথন সংক্রান্ত। খালেদার এসব কথোপকথনে দলের নেতা কর্মীদের পদ রক্ষা করতে হলে নাশকতা করার সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন খালেদা জিয়া ।

 
সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত  বৈঠকে অনির্ধারিত এই আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ওই টেলিফোন সংলাপগুলো শোনানো হয় বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য।মন্ত্রিসভার এক সদস্য জানান, টেলিসংলাপ শুনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "সত্যি সত্যিই তো উনি (খালেদা জিয়া) নাশকতার নির্দেশ দিয়েছেন, এ কণ্ঠ ওনারই!"
 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মন্ত্রী বলেন, 'মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ সদস্যই এ আলোচনায় অংশ নেয়। বৈঠকে জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের পাশাপাশি প্রতিমন্ত্রীরাও খালেদা জিয়ার নির্দেশে ওই সময় যারা নাশকতায় অংশ নিয়েছিল, তাদের গ্রেফতারের দাবি জানান। যদিও প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে আর কিছু বলেননি, তিনি শুধু মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। '
 

 
খালেদার এসব কথোপকথন বাংলা লিকস নামের একটি একাউন্ট থেকে আপলোড করা হয়েছে, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। খালেদা জিয়ার এসব নির্দেশ নাশকতা ঘটানোর উদ্দেশ্যেই- এমন কথা রয়েছে অডিও ফাইলগুলোর শিরোনামে। 
https://video.search.yahoo.com/video/play;_ylt=A2KIo9QVcdBUthwA3eD7w8QF;_ylu=X3oDMTByMjBzZmhtBHNlYwNzcgRzbGsDdmlkBHZ0aWQDBGdwb3MDNg--?p=bangla+leaks+khaleda&vid=a5d434f50012185576d9d4922f7c7621&l=1%3A48&turl=http%3A%2F%2Fts4.mm.bing.net%2Fth%3Fid%3DVN.608031077366827083%26pid%3D15.1&rurl=https%3A%2F%2Fwww.youtube.com%2Fwatch%3Fv%3De9JulMuErMk&tit=%E0%A6%96%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%A6%E0%A6%BE+%E0%A6%9C%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B0+%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B6%E0%A6%95%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%82%E0%A6%B2%E0%A6%95+%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A1%E0%A7%87%E0%A6%B0+%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A7%A6%E0%A7%A7&c=5&sigr=11bfeukjl&sigt=1462ngiqp&sigi=11rh2qchs&age=1391520241&fr2=p%3As%2Cv%3Av&&tt=b
 

আহমদুল কবিরের ৯৩তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি-সুমি খান

 
 

 
দৈনিক সংবাদ'র প্রধান সম্পাদক ও দেশের প্রগতিশীল ধারার রাজনীতির পুরোধা ব্যক্তিত্ব আহমদুল কবির (মনু মিয়া)  এর ৯৩তম জন্মদিন আজ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে। আহমদুল কবির দেশের একজন বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তাও ছিলেন । এ দেশের শিল্প-বাণিজ্য প্রসারে তার সক্রিয় অবদান রয়েছে। ১৯২৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ঘোড়াশালের ঐতিহ্যবাহী মিয়া বাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মরহুম আবু ইউসুফ লুৎফুল কবির ছিলেন ঘোড়াশালের জমিদার। তাঁর মায়ের নাম মরহুমা সুফিয়া খাতুন। ২০০৩ সালের ২৪ নভেম্বর কোলকাতার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। 

 
আহমদুল কবির ছিলেন ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতা অঙ্গনের এক প্রতিভাদীপ্ত ব্যক্তিত্ব। আপসহীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জন্য পাকিস্তান আমল থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি ছিলেন একজন ভিন্নমাত্রার রাজনীতিক। মূলত তার রাজনৈতিক দর্শন ছিল এদেশের সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে কাজ করা। তদানীন্তন পাকিস্তানের রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল যে ধারা এদেশে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিপুল জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক চেতনাকে নাড়া দিয়েছিল, সেই একই ধারার পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন আহমদুল কবির। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী রাজনীতির নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তি  আহমদুল কবির দেশের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের কাছে পরিচিত ছিলেন আদর্শবান এবং নীতিনিষ্ঠ এক নেতা হিসেবে। তিনি সত্তরের দশকে গণতন্ত্রী পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি আমৃত্যু গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি ছিলেন।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর প্রথম ভিপি ছিলেন আহমদুল কবির ।১৯৬৫ সালে আহমদুল কবির ন্যাপের প্রার্থী হিসেবে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন । সংবাদপত্রকে তিনি তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ প্রচার ও স্বকীয় প্রতিভা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। সাংবাদিকতায় তার অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল এবং বস্তুনিষ্ঠ চেতনার প্রতিরূপ  দৈনিক 'সংবাদ'।
 
দৈনিক সংবাদ-এ বস্তুনিষ্ঠ খবর ও মতামত প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেন। আমৃত্যু তিনি তার এই আদর্শ লালন করে গেছেন। কমনওয়েলথ প্রেস ইউনিয়নের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতির পদও অলঙ্কৃত করেছিলেন তিনি।
 
আমার সৌভাগ্য, আমার বাবা সাইফুদ্দিন খানের কল্যাণে আহমদুল কবীরকে কাছে থেকে দেখবার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। আমার বাবার গুরুতর অসুস্থতায় আহমেদুল কবীর অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে বারডেমে নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসকদের মাধ্যমে বাবার জরুরী অপারেশন করিয়ে সুস্থ করে তুলেছিলেন। এমন নেতা এবং নীতিনির্ধারকের আজ বড়োই অভাব।আজ তিনি বেঁচে থাকলে দেশের সাংবাদিকতা জগত ,  রাজনীতি এবং ব্যবসা ক্ষেত্র গতিশীল নেতৃত্বে সমৃদ্ধ হতো। দেশের এমন সংকটকালে আহমদুল কবীরের স্মৃতির প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।
 

আমার অনেক ঋণ আছে.......

স্মৃতি ঝলমল সুনীল মাঠের কাছে
পানি টলটল মেঘনা নদীর কাছে
আমার অনেক ঋণ আছে

বকের ডানায় ছাওয়া চরের কাছে
চাঁদ জাগা বাঁশ বাগানের কাছে
আমার অনেক ঋণ আছে
যখন হাওয়ায় উড়ে কালো হলদে পাখি
আমি কেবল মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকি
উড়ন্ত ঐ পাখির মালার কাছে
আমার অনেক ঋণ আছে.......ঋণ আছে।


গীতিকারঃ সামসুর রহমান, শিল্পীঃ রুনা লায়লা

সংলাপ-ড. মো আনোয়ার হোসেন


‘বলতে পার মৃত্যু কী ভয়ঙ্কর? সবাই যখন কথা কইবে, রইবে তুমি নিরুত্তর।’

১৯৯৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানের সমাবর্তন বক্তা অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। বিএনপি-জামাত সমর্থিত শিক্ষকদের সমাবর্তন বর্জন এবং ছাত্রদল ও শিবিরের সমাবর্তন বানচালের ঘোষণার মধ্যে অনুষ্ঠিত এই সমাবর্তনে অধ্যাপক অমর্ত্য সেন এসেছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই। কার...
ণ বিএনপি-জামাত ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে তাঁকে জানানো হয়েছিল যে, ঢাকায় এলে তাঁর জীবন বিপন্ন হতে পারে।

সে প্রেক্ষাপটে মঞ্চে মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে অমর্ত্য সেন তাঁর সমাবর্তন বক্তৃতায় উপরের উদ্ধৃতিটি দেন। সংঘাতের চাইতে আলাপ-আলোচনা কিংবা বিতর্ক যে ভালো, তার প্রতিই ইঙ্গিত করছিলেন তিনি। মৃত্যু অবধি বিতর্ক করে যাওয়ার স্বাধীনতা, আনন্দ এবং তার মধ্য দিয়ে কোনো সমাধানে পৌঁছানো আধুনিক মানব সভ্যতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

ছাত্রদল ও শিবিরের সমাবর্তন বানচালের ঘোষণার মধ্যে অনুষ্ঠিত এই সমাবর্তনে অধ্যাপক অমর্ত্য সেন এসেছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে
ছাত্রদল ও শিবিরের সমাবর্তন বানচালের ঘোষণার মধ্যে অনুষ্ঠিত এই সমাবর্তনে অধ্যাপক অমর্ত্য সেন এসেছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে
তবে দূর অতীতেও সংলাপ-কথোপকথন যে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাও আমরা জানি। আমাদের বাতিঘর প্রয়াত সরদার ফজলুল করিমের অনুবাদ গ্রন্থ ‘প্লেটোর সংলাপ’ বাংলা ভাষা-ভাষী মানুষদের সুযোগ করে দিয়েছিল তা পড়ে দেখবার। শিষ্যদের সঙ্গে সক্রেটিসের আলাপচারিতার কথাও বহুল প্রচারিত।

আমাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত সংলাপটি হয়েছিল ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের মধ্যে। সংলাপ চলাকালে একদিকে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী গণহত্যা চালিয়ে স্বাধীনতাপ্রত্যাশী বাঙালি জনগোষ্ঠীকে দমন করতে গোপনে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে দেশজুড়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষের বিপুল অধিকাংশ স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবন বিসর্জন দেবার প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল।

সেই সংলাপ ব্যর্থ হয় ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক গণহত্যা শুরু এবং ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে।সংলাপ ব্যর্থ হয়েছিল, কিন্তু নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরাজয় ও নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল।

বাংলাদেশে সামরিক স্বৈরশাসনের অবসানে আন্দোলনরত গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে সংলাপ হয়েছে। তার শুভ প্রভাব পড়েছে আন্দোলনে। এসব সংলাপে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যকার সংলাপ। সংলাপ সফল হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে বিজয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের পতন এবং গণতান্ত্রিক শাসনের নবযাত্রা সূচিত হয়েছিল। এরপর ক্ষমতার পালাবদল কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে সংলাপ হয়েছে। সে সব সংলাপ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলেও সাফল্যের উদাহরণ আছে। সংলাপের প্রেক্ষাপটগুলো বিবেচনা করা যাক।

৯০’এর গণঅভ্যুত্থানের পর অপ্রত্যাশিতভাবে বিএনপি ক্ষমতাসীন হয়। নতুন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বিরোধী-দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সফল সংলাপের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের নবযাত্রা সূচিত হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ক্ষমতার পালাবদল নির্বিঘ্ন হয় না। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে নানাভাবে সংলাপ হলেও তা কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মোর্চার তীব্র আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়া বাধ্য হন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে। ক্ষমতায় আসে শেখ হাসিনার সরকার।

নতুন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বিরোধী-দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সফল সংলাপের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের নবযাত্রা সূচিত হয়
নতুন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বিরোধী-দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সফল সংলাপের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের নবযাত্রা সূচিত হয় ।
আমাদের তথাকথিত সুশীল সমাজের কেউ কেউ বলে থাকেন, সেই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত-ই-ইসলামীর মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য ছিল। কথাটি ভুল। বাস্তবে এই একটি যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাস্তবায়িত হয়। আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে এক মঞ্চে কখনওই বসেনি, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনও করেনি।

হাসিনা সরকারের মেয়াদ শেষে ২০০১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি-জামাত জয়ী হয়। নির্বিঘ্নেই ক্ষমতা হস্তান্তর হয়। এরপর ’৯৬ সালের মতোই আবারও স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য এবং অর্থবহ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ক্ষমতাসীন খালেদা জিয়ার সরকারের অনীহার মুখে দুই প্রয়াত নেতা আবদুল মানান ভূঁইয়া এবং আবদুল জলিলের মধ্যে দীর্ঘ সংলাপ হলেও তা ব্যর্থ হয়। ফলশ্রুতিতে সেনাচালিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ, দুই নেত্রীর গ্রেপ্তার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সূচিত অভূতপূর্ব ছাত্র-শিক্ষক আন্দোলনের হাত ধরে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিন চতুর্থাংশ আসন নিয়ে সরকার গঠন করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার।

এবারও মেয়াদ শেষে ক্ষমতার পালাবদল নির্বিঘ্ন হয় না। কারণ, ইতোমধ্যে দেশের সর্বোচ্চ আদালত অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আমাদের সংবিধানের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্শিক বলে রায় দেয়। সে রায়ের সূত্র ধরে আমাদের জাতীয় সংসদ নির্বাচিত সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে। নির্বাচন ছাড়াও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার জামাত-বিএনপি জোটের সামনে বড় ইস্যু হয়ে দেখা দেয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি তারিখে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের বহু পূর্ব থেকেই এই জোট ক্ষমতাসীন সরকার পতনের লক্ষ্যে দেশে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। নির্বাচনে জামায়াতে-ই-ইসলামীর অংশগ্রহণ নির্বাচনী আইন বহির্ভূত হয়ে যাওয়া এবং এই দলের শীর্ষনেতাদের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের সম্মুখীন হওয়ায় বিএনপি নির্বাচন বর্জন ও সরকার পতনের সহিংস আন্দোলনে সর্বশক্তি নিয়োগ করে।

সমস্যার শান্তিপূর্ণ নিরসনে দুই নেত্রীর মধ্যে সংলাপের জোরালো দাবি ওঠে। বেগম খালেদা জিয়াকে সরাসরি ফোন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপের সূচনা করেন। যথার্থই একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ হাসিনা বিনয়, ধৈর্য ও আন্তরিকতা নিয়ে বিরোধী-দলের নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ টেলিফোন সংলাপ করেন। দুই নেত্রীর টেলিসংলাপ গোপন থাকে না। বেগম খালেদা জিয়ার অত্যন্ত রুঢ় আচরণেও শেখ হাসিনা যে ধৈর্য ও সৌজন্যবোধ দেখান তা জনগণের নজর এড়িয়ে যায় না।

স্বচ্ছ, অবাধ ও অংশগ্রহণকারী সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে সমঝোতায় পৌঁছাতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপের দ্বার অবারিত করলেও বেগম খালেদা জিয়া তাতে সাড়া দেন না। জামাত-হেফাজত-জঙ্গিদের নিয়ে তিনি সরকার পতনের আন্দোলনে এগিয়ে যান। কার্যত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ চালিয়ে যায় বিএনপি-জামাত জোট। আন্দোলনের নামে এমন পরিকল্পিত সহিংস অরাজকতা বাংলাদেশে নতুন। টেলিভিশনের পর্দায় দেখা পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া বা আফ্রিকার কোনো কোনো দেশে মানবতার বিরুদ্ধে ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠীর নিষ্ঠুরতার ভয়াবহ চিত্রগুলো বাংলাদেশে ঘটতে দেখে মানুষ আতংকিত হয়ে পড়ে।

ইতোমধ্যে দেশের সর্বোচ্চ আদালত অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সংবিধানের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে রায় দেয়। ইতোমধ্যে দেশের সর্বোচ্চ আদালত অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সংবিধানের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে রায় দেয়
এমন একটি পরিবেশে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি-জামাতের সহিংসতার কারণে নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি কম হলেও নির্বাচন বানচালে বিরোধী গোষ্ঠী ব্যর্থ হয়। তার মূখ্য কারণ, তাদের ডাকে জনগণ সাড়া দেয়নি। বিএনপির মধ্যপন্থী অনেক নেতাই নির্বাচনে অংশগ্রহণের পক্ষে থাকলেও তারেক জিয়া ও জামাতের চাপের কাছে খালেদা জিয়া নতি স্বীকার করেন। সংলাপ ও নির্বাচন বর্জন করে তিনি যুদ্ধের পথই বেছে নেন। সে যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন। তৃতীয় বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা।

যুদ্ধে জয়লাভ করে বিজয়ী শক্তি যে কার্যক্রম গ্রহণ করে শেখ হাসিনা তাই করছেন। শক্তহাতে দেশ পরিচালনা এবং উন্নয়নের গতিশীল কার্যক্রম চালিত করে তিনি ইতোমধ্যেই দেশের জনগণ ও বহির্বিশ্বের সামনে বাংলাদেশকে এক সম্ভাবনার দেশ হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন। অগ্রগতির অনেক সূচকেই বাংলাদেশকে রোল মডেলের অবস্থানে নিয়ে গেছেন শেখ হাসিনা।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে জনগণের উল্লেখযোগ্য অংশ এবং বিশ্বজনমত যেখানে নির্বাচন ও নতুন সরকারের প্রতি আস্থা স্থাপনে দ্বিধান্বিত ছিল, গত এক বছরে সেখানে বড় পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। ভারতের মোদী সরকার, আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া, জাপান, চীন ও আরব দেশগুলো বৈরিতার পরিবর্তে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে। উন্নয়নের উচ্চ প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রেখে সর্ব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে থাকে।

যুদ্ধে পরাজিত পক্ষ ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আপন শক্তি সংহত করতে পারে। সঠিক নীতি-কৌশল অনুসরণ করে পরবর্তী যুদ্ধে জয়লাভের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পারে। ইতোমধ্যেই বিএনপির কয়েকটি নীতিগত বিষয়ে বোধোদয় হওয়ার কথা ছিল। জামাতে ইসলামী যে তাদের জন্য কোনো আশীর্বাদ নয়, বরং মাথার উপর জগদ্দল বোঝা, তা বেগম খালেদা জিয়া এবং তাঁর পুত্র তারেক জিয়া না বুঝলেও দলের নেতা-কর্মীদের তা না বোঝার কথা নয়। ‘প্রথম আলো’র মতো পত্রিকা যেখানে নানা সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশের সায় থাকত বিএনপির পক্ষে, সেখানে ইদানিং কেন উল্টো চিত্র, তা নিয়ে ভাববার কথা ছিল ওই দলের নীতি নির্ধারকদের।

দুর্ভাগ্যবশত, তা তাঁরা ভেবেছেন বলে মনে হয় না। গত প্রায় এক মাস অব্যাহত অবরোধের পরও সরকার পতনের সম্ভাবনা দেখা না দিলেও বেগম খালেদা জিয়া সংঘাতের পথ থেকে সরে আসেনি। তাঁর ঘোষিত অবরোধ-হরতালের নির্মম শিকার হয়ে অগ্নিদগ্ধ শিশু-যুবা-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটগুলোতে অপরিসীম যন্ত্রণা নিয়ে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছে। পুত্রের মৃত্যুতে গভীর শোকে মুহ্যমান হলেও খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের করুণ মৃত্যু বেগম খালেদা জিয়ার কঠিন হৃদয়ে কোনো দাগই ফেলতে পারে না।

২৯ জানুয়ারি ঢাকা শহরে হরতালের কোনো ঘোষণা না থাকার পরও এতিমদের অর্থ আত্মসাতের মামলায় খালেদা জিয়ার কোর্টে হাজিরা এড়াতে তড়িঘড়ি হরতাল ডেকে দেওয়া হয় নগর বিএনপির পক্ষ থেকে। বিএনপি-জামাতের নিজস্ব ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টার অবশ্য খোলাই থাকে। অন্যদিকে, অবরোধ-হরতালে কর্মহীন অভাবী মানুষকে আগুনে পোড়ার ঝুঁকি নিয়েও জীবন-জীবিকার সংগ্রামে নামতে হয়। বিএনপি-জামাত পিকেটারদের ছুঁড়ে দেওয়া পেট্রোল বোমার আগুনে পোড়া ট্রাক ড্রাইভার যখন রংপুর মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তখন স্ত্রীর আহাজারি, ‘আগুনে তো কোনো নেতা পোড়ে না’ শুনেও বেগম খালেদা জিয়ার চক্ষুলজ্জা হয় না।

অবরোধের কারণে সারা দেশে ক্ষেতের শাক-সবজি ক্ষেতেই নষ্ট; লেখাপড়া বন্ধ; পোশাক শিল্পে ধস; কষ্টের মৃত্যু– এসবের কারণে কৃষকের অভিশাপ, প্রায় পনের লাখ ছাত্রছাত্রীর জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমিক পরীক্ষার মধ্যে লাগাতার হরতাল ঘোষণায় ছাত্র-অভিভাবকদের গভীর হতাশা, কর্মহীন শ্রমজীবী নারী-পুরুষের যাতনা, বিশ্ব ইজতেমায় জড়ো হওয়া লাখ মুসল্লির অনুরোধ, ঈদে-মিলাদুন্নবি কিংবা সরস্বতী পূজা এবং এমনকি ছেলের মৃত্যু বা অপ্রত্যাশিতভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সশরীরে গুলশানের অফিসে এসে পুত্রহারা বেগম খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে আসা– কিছুই টলাতে পারছে না বেগম খালেদা জিয়াকে।

জনগোষ্ঠীর যে অংশ আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে বিএনপিকে সমর্থন করে আসছিল তারাও ভেবে পাচ্ছে না কেন বেগম খালেদা জিয়া সংঘাতের এমন সর্বনাশা পথ যা দিয়ে সরকার পতন হবে না, তা থেকে সরে আসছেন না। যুদ্ধে পশ্চাদপসরণের একাধিক সুযোগ কেন হেলায় হারাচ্ছেন তিনি তাও বুঝতে বেগ পেতে হচ্ছে সচেতন দেশবাসীর।

এমন মরিয়া পরিস্থিতিতে দুই নেত্রীর মধ্যে সংলাপের তাগিদ দিচ্ছেন বিপর্যস্ত মানুষ ও সুশীল সমাজ। এটা অনেকটা এমন যে, জিম্মিকারীদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে হলেও জিম্মিদশা থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করা। সফল কিংবা বিফল, যাই হোক, দূর অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীজুড়ে নানা বিরোধ সমাধানে সংলাপের প্রয়োজনীয়তার কথা উদাহরণ দিয়ে উল্লেখ করেছি। শান্তিপূর্ণ সংলাপ-সমঝোতার জন্য বিবদমান দুই পক্ষকে সেই উপলব্ধিতে আসতে হয় যে, এছাড়া অন্য আর পথ খোলা নেই।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার জন্যে এক পক্ষের পরাজয় বা জেতার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য হয়ে পড়া প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। যেমনটা হয়েছিল ১৯৭১ সালে, নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের পর, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে এমন উদাহরণ হল, ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণআন্দোলনের বিজয়ের মুখে ক্ষমতাসীন খালেদা জিয়া সরকারের নতি স্বীকার ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন মেনে নেওয়া। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বেগম খালেদা জিয়া তেমন পরিস্থিতিতে না যাওয়া পর্যন্ত রণে ভঙ্গ দেবেন না। তার কতকগুলো কারণও আছে।

খোদ ক্যান্টনমেন্ট থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তিশালী স্তম্ভ, সেনাবাহিনী এবং সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার সক্ষমতা তিনি অনেকটা হারিয়েছেন। রাজনীতিতে কখনও অংশ নেবেন না এই মুচলেকা দিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দুই পুত্রকে তাদের লুণ্ঠিত অর্থসম্পদসহ দেশের বাইরে পাঠিয়েও তিনি শান্তিতে থাকতে পারেননি। খোদ মার্কিন এফবিআই-এর উদ্যোগে কোকোর পাচার করা অর্থের কিছু অংশ বাইরে থেকে বাংলাদেশে ফেরত এসেছে। মানি-লন্ডারিং মামলায় সাজা মাথায় নিয়ে সিঙ্গাপুরে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে তাকে।
অপর পুত্র, তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান মামলার রায় হবে সামনে। হরতাল ও নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেও এতিমদের টাকা আত্মসাতের মামলা থেকে অব্যাহতি পাচ্ছেন না বেগম খালেদা জিয়া। আন্দোলনে জনগণের সমর্থন লাভে ব্যর্থ হয়ে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে চোরাগুপ্তা আক্রমণে খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার প্রধান ভরসা জামায়াত-শিবির যুদ্ধাপরাধ মামলায় অনেকটা পর্যদুস্থ। এমন কোণঠাসা অবস্থায় সরকার পতনে শেষ মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া।

জনগণের জীবন-মরণ প্রশ্নে নির্ধারক অবস্থান না নিয়ে ভালো ভালো কথার আড়ালে নিজেদের নিরপেক্ষ চেহারা বজায় রেখে রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চাইছেন এমন সুশীলদের মুখপত্র ড. কামাল হোসেন ও মাহমুদুর রহমান মান্না গিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে। শুধুমাত্র পুত্রশোকে কাতর একজন মাকে সমবেদনা জানাতেই গুলশানের কার্যালয়ে তাঁরা গিয়েছিলেন, মিডিয়ার সামনে এমন বয়ান দেওয়ার পরও একথা বুঝতে কারও অসুবিধা হয় না যে, মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় অবরোধ-হরতাল কর্মসূচি প্রত্যাহারে খালেদা জিয়াকে রাজি করাতেই তাঁরা গিয়েছিলেন সেখানে। সফল হননি। ভালোমানুষী নিরপেক্ষতার ঘোমটা অটুট রাখতে হলে পর্দার আড়ালে নয়, খোলাখুলিভাবে বেগম খালেদা জিয়ার উদ্দেশে তাদের বলতে হবে, অবরোধ-হরতাল প্রত্যাহার করুন, সরকারের সঙ্গে সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টি করুন। আপনাদের কাছে এমন চাওয়া খুব বড় চাওয়া নয়।

সুশীলদের এমন আহ্বানে বেগম খালেদা জিয়া সাড়া দিলে নিজের এবং দলের জন্য ভালো করবেন। এর অন্যথা হলে পত্রিকার সমীক্ষায় যেমনটা পাওয়া গেছে– রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শক্ত অবস্থান নিলে বর্তমান অচলাবস্থা কেটে যাবে– এই মতের পক্ষে শতকরা সত্তর ভাগ অংশগ্রহণকারীর সায় অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। তার মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া-তারেক জিয়া-জামাত চক্রকে নির্ধারকভাবে পরাজিত করেই সংলাপের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

বিএনপির সভাপতি বেগম খালেদা জিয়া তার গুলশানস্থ পার্টি অফিস থেকে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সামনে নিজে সারাদেশে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। সারা দেশের জনগণ তা দেখেছে। প্রায় মাসব্যাপী এই অবরোধে জীবন প্রদীপ নিভে গেছে এখন পর্যন্ত ৪৬ জন সাধারণ মানুষের। বিএনপি-জামাত জঙ্গিদের ছোঁড়া পেট্রোল বোমায় পুড়ে মারা গেছে নিহতদের প্রায় অর্ধেক। দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে। পয়লা ফেব্রুয়ারি তারিখের পত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকটি খবর: সিরাজগঞ্জে পেট্রোল বোমায় অটোরিকশা চালক নিহত-দগ্ধ পাঁচ; ঝিনাইদহে গরুর ট্রাকে পেট্রোল বোমা; যশোরে চালবোঝাই ট্রাক ও প্রাইভেট কারে আগুণ; খুলনায় পুলিশ দপ্তরে হাতবোমা বিস্ফোরণ; রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানায় বোমা মেরে পালানোর সময় দুই শিবির কর্মী ধৃত; চাঁদপুরে পেট্রোল বোমাসহ আটক এক।
বেগম খালেদা জিয়া ঘোষিত অবরোধ-হরতালে জানমালের এই ক্ষতির দায়দায়িত্ব তো তাঁকেই নিতে হবে। তাই আর কালবিলম্ব না করে সময়সীমা বেঁধে দিয়ে তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হোক, অবরোধ-হরতাল প্রত্যাহার করুন। তা না হলে দেশ ও জনগণকে বাঁচাতে আপনাকে গ্রেপ্তার করা হবে।
 
২০১৪ সালের শুরুতে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট বিএনপির প্রতি আহবান জানিয়েছিল জামাত-হেফাজতের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত দলগুলোকে নিষিদ্ধ করার কথা বলেছিল। জানুয়ারি ১৬ তারিখের প্রকাশিত রেসোলিউশনে বলা হয়:
The European Parliament, [...] whereas the BNP opposition is continuing to cooperate with Jamaat-e-Islami and the splinter group Hafezat-e-Islam, which are regarded as the main instigators of the violence; [...] whereas during and after the elections thousands of citizens belonging to vulnerable minority groups, particularly Hindus, have been violently attacked and chased from their homes, reportedly mainly by Jammat e-Islami militants, for reasons partly linked to the ICT trials, as many of the prosecution witnesses are Hindus; [...] Believes that, in the interest of Bangladesh’s future, parties having a democratic reputation need to develop a culture of mutual respect; urges the BNP to unequivocally distance itself from Jamaat-e-Islami and Hafezat-e-Islam; [...] Stresses that parties which turn to terrorist acts should be banned; [...].

মার্কিন সিভিল ওয়ারের সময় প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন যখন জানতে পারেন মেরিল্যান্ড স্টেটের একটি রেললাইন তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ উপড়ে ফেলতে পারে, তিনি তখন একক সিদ্ধান্তে এবং সাময়িকভাবে রিট অব হেবিয়াস কর্পাস স্থগিত করেছিলেন। একেই বলা হয় গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব। জনগণের জন্য গণতন্ত্র এবং জনগণের শত্রুদের বিরুদ্ধে একনায়কত্ব। আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান যেখানে কার্যকর গণতন্ত্র আছে, সেসব দেশে কোনো রাজনৈতিক দল বিএনপি-জামাতের মতো রাষ্ট্র ও জনগণ-বিরোধী সন্ত্রাসী অপতৎপরতা চালালে তাদের পরিণতি যা হত, তাই গ্রহণ করা হোক এদের বিরুদ্ধে। পৃথিবীর সকল গণতান্ত্রিক দেশে এই ব্যবস্থাই কার্যকর আছে।

মার্কিন সিভিল ওয়ারের সময় প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন একক সিদ্ধান্তে ও সাময়িকভাবে রিট অব হেবিয়াস কর্পাস স্থগিত করেছিলেন।

দেশে প্রকৃত ও কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য অবিলম্বে সংলাপ শুরু করা প্রয়োজন। ঠিক করে ফেলতে হবে ‘কার সঙ্গে সংলাপ, কী নিয়ে সংলাপ’, সেই প্রশ্নটি। একটি গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা বাংলাদেশ অর্জন করেছি। এই অর্জনে নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সে জন্যই তিনি জাতির পিতা। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অর্জন আমাদের সংবিধান ও চার মূলনীতিঃ গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র।
এসব মৌলিক বিষয়ে যারা একমত এবং এসব মতের বিরুদ্ধ শক্তি যেমন, জামাত ও ধর্মীয় জঙ্গি চক্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে যারা একমত হবেন, তাদের মধ্যে অর্থপূর্ণ সংলাপ শুরু হওয়া অতি জরুরি। খালেদা-তারেক-জামাতের নির্ধারক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বিএনপি ও অন্যান্য ডানপন্থী দলের সুস্থ, গণতান্ত্রিক ও সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল অংশের সামনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। মধ্য-ডান-বাম গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো সংলাপের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ বহু প্রত্যাশিত জাতীয় ঐকমত্য অর্জনে সমর্থ হবে।
গণতন্ত্র ও প্রগতির সম্ভাবনার বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে দ্রুতগতিতে, কিন্তু সুনিশ্চিত পদক্ষেপে।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।