Sunday, February 11, 2018

জামায়াতের সংবিধানবিরোধী অবস্থান ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম নিষিদ্ধের জন্য রীট পিটিশন ও অন্যান্য


কী যে হলো, হঠাৎ একদল হুজুর সংবাদ সম্মেলন করে ‘ফতোয়া’ জারি করে বসলেন। কই এর আগে কোন মৌলানা দলকে তো কখনই ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যাকারী, বাঙালী নারীর ধর্ষক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতা বা ডাক্তার, প্রকৌশলী, সেনা, পুলিশ, মুক্তিযোদ্ধাদের পরিকল্পিত হত্যাকান্ডের হোতাদের বিরুদ্ধে ‘তারা কাফের, তারা জেনাকারী, হত্যাকারী হিসেবে যে স্বাধীনতার তারা বিরুদ্ধাচারণ করেছে, সেই স্বাধীন দেশে তাদের ঠাঁই হবে না,’ বলে এমন কোন ফতোয়া দিতে শুনিনি। তারা তো ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বা মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় অপরাধী। ফতোয়া যদি কেউ দিতে উদ্বুদ্ধ হতেন, তবে এদের ফতোয়া দিয়ে রাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের দাবি করতেন। মাঝখান থেকে তসলিমা নাসরিন বা দাউদ হায়দারকে তালেবানপন্থী একদল কট্টর জঙ্গীবাদী মোল্লা দেশছাড়া করেছিল ,যে দেশের স্বাধীনতায অর্জনে সেই ঘাতক ফতোয়াবাজ মোল্লাদলের কোন অবদান ছিল না।
তরিকত ফাউন্ডেশন যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতের সংবিধানবিরোধী অবস্থান ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম নিষিদ্ধের জন্য রীট পিটিশন করে হাইকোর্টের কাছ থেকে একটি কাঙ্খক্ষত ঐতিহাসিক রায় জনগণকে উপহার দিয়েছে, এজন্য তাঁরা ধন্যবাদার্হ।
কিন্তু স্মরণ রাখতে হবে, মুসলিম দেশগুলোতে বা ভারতেও মুসলিম নারীরাই মুসলিম পুরুষের অন্যায় ফতোয়ার শিকার হয়েছে। আশ্চর্য হলেও সত্য এই যে, এই মৌলানারা কোন নারীর সন্তান, কোন নারীর কাছ থেকে তাঁরা বিবাহিত জীবনের আনন্দ লাভ করেছেন, কেউ বা প্রেম লাভ করেছেন, তাঁদের সবারই আছে পুত্র ও কন্যা, বোন, খালা, চাচি, ফুফু। নয় কি? তারপরও দেখা গেল, শ্বশুরের দ্বারা ধর্ষিতা নারীটি তার স্বামীর (স্বামীর মতে) সঙ্গে থাকতে চাইলেও ফতোয়াবাজ মৌলানারা শ্বশুরের সঙ্গে থাকার আদেশ দেয়। রাজিব গান্ধীর উদ্যোগে মুসলিম নারীদের সমঅধিকারের আইনটি দিল্লীভিত্তিক মুসলিম মৌলানাদের দলের প্রবল বাধার কারণে সংসদে পাস হতে পারেনি। শ্বশুর দ্বারা পুত্রবধূ ধর্ষণের চেষ্টা বা ধর্ষণ, এমনকি এ কাজে শাশুড়ি বাধ্য হয়ে স্বামীর হুকুম পালনে সহায়তা করেছেÑএমন অসংখ্য উদাহরণ পর্দার অন্তরালে সঞ্চিত আছে-এ কথা মৌলানারাসহ জনগণ ভালভাবেই জানেন।
এ গেল এক ধরনের নারী নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ফতোয়ার ব্যবহার। ফতোয়ার দ্বিতীয় অপব্যবহার অতি উচ্চমাত্রায় হচ্ছেÑএটি হলো, ‘হিল্লা বিয়ে’ ও ‘তালাক’ হওয়া সম্পর্কিত। এ আলোচনায় যাওয়ার আগে আমি দেশের সব বড় আলেম-মৌলানাদের কাছে একটি প্রশ্ন করব, এই একবিংশ শতাব্দীতে যেখানে খ্রিস্টান, ভারতে হিন্দু নারীরা ‘তালাক’-এর ক্ষেত্রে কোন রকম ‘হিল্লা বিয়ে’ নামের সম্পূর্ণ অমানবিক ঘৃণ্য নারীর জন্য দ্বিতীয় প্রকৃতির ধর্ষণের ব্যবস্থা করে যেসব মৌলানা, তাদের বিরুদ্ধে আপনারা কখনও ফতোয়া দিয়েছেন কি? অথবা তাদেরকে বিচারে সোপর্দ করেছেন কি? জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে বিচারপতি গোলাম রব্বানী ও বিচারপতি নাজমুন নাহার ফতোয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একটি ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিলেন, যেটি খুব সম্ভব আপীল বিভাগে এখনও আটকে আছে। মৌলানাদের নিজ কন্যাদের ও বোনদের ’আইয়ামে জাহিলিয়া’ যুগের পুরুষের ইচ্ছায় বিবাহিতা নারীকেও অন্য পুরুষের কাছে ‘আইনী’ভাবে ধর্ষিতা হবার ধর্মের নামে সমাজে প্রচলিত অপরাধমূলক ফাক-ফোঁকরগুলো বন্ধ করতে এগিয়ে আসতে হবে। এটা বলাবাহুল্য। গ্রামেগঞ্জে এই ‘তালাক’ নিয়ে ‘হিল্লা’ বিয়ের মাধ্যমে ধর্ষণ হচ্ছে, তা বন্ধ করা মৌলবী-মোল্লাদের একটি অন্যতম দায়িত্ব। তাঁরা সে দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসবেন এবং অন্তত, কন্যা ও বোনদের নারী নির্যাতক ফতোয়াবাজদের হাত থেকে রক্ষা করবেন, অন্যকিছু করার আগে এটাই তাঁদের জন্য কর্তব্য হিসেবে অগ্রগণ্য।
এছাড়াও মৌলানাদের একটি বড় দায়িত্ব হচ্ছে, দেশের সংখ্যালঘুদের সংখ্যাগুরুর দ্বারা নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ এর শিকার হওয়া, তাদের বসত-জমি-জীবিকা দখল হওয়া থেকে রক্ষা এবং সর্বোপরি তাদের প্রাণের নিরাপত্তা প্রদান যে সংখ্যাগুরুর দায়িত্ব, এই তথ্য প্রচারের মাধ্যমে সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করা, পাড়া-মহল্লায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা। ইসলামের নবী সঠিকভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে সংখ্যাগুরুর হাতে ‘আল্লাহর আমানত’ হিসেবে গণ্য করতে বলেছেন। তাদের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব সংখ্যাগুরুর হাতেই, এ কথা মৌলানাদের উপলব্ধি করতে হবে এবং একই সাথে ইসলাম ধর্মের এ মহৎ সুশিক্ষার পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে। মৌলানা সাহেবরা দেশের সংখ্যালঘুর, হিন্দু আদিবাসী ভূমিগ্রাসকারীদের বিরুদ্ধে ফতোয়া নয়, সামাজিক বয়কট, তাদের বিচারে সোপর্দ করতে এগিয়ে আসবেন, এটিই জনগণের প্রত্যাশা।
মৌলানা সাহেবরা  আমেরিকায় বাংলাদেশের একজন ব্যক্তি ওই দেশের একটি অঙ্গরাষ্ট্রের আইনী অধিকার সমকামী বিবাহ সম্পর্কে তাঁর ‘ব্যক্তিগত মত’ প্রকাশ করেছেন বলে তাঁকে ‘দেশ ছাড়া’ করবার ফতোয়া দেন, যা দেবার প্রয়োজন ছিল না।
 মানবাধিকারে ব্যক্তিগত মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে উচ্চ স্থান দেয়া হয়। একটা কথা না বললে এ বিষয়টা পরিষ্কার হবে না। পশ্চিমা দেশগুলোতে ধর্ম ব্যক্তির চর্চার বিষয় কিন্তু রাষ্ট্র সব ধর্মের এবং আস্তিক-নাস্তিক সবার জন্য অধিকার রক্ষার জন্য আইন তৈরি করে।
যদিও আমেরিকা বা ইউরোপের দেশগুলোতে সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র কোন ধারা যুক্ত নেই। সত্যি বলতে, ওদের ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মানবাধিকার চর্চার ব্যাপক বিস্তৃতির সুযোগে আমাদের দেশের বা এশিয়া, আফ্রিকার সন্ত্রাসী, খুনী, জঙ্গী জেহাদীরা পশ্চিমা দেশেই ঠাঁই গেড়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী, তাদের সন্তানরা ’৭১-এ অনেক যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সন্তানেরা তো পশ্চিমা দেশেই বসবাস করছে। জঙ্গী জেহাদীরা মালয়েশিয়াতেও বসবাস করছে যাদের অনেকেরই টার্গেট ওখান থেকে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া পাড়ি দেয়া। এই জঙ্গীদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ বেশি জরুরী।
আমাদের তদানীন্তন শাসকদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ময়মনসিংহে সে সময়ে সিনেমা হলে জঙ্গীদের বোমা হামলা, ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের ওপর হাওয়াভবনে পরিকল্পিত শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত গ্রেনেড হামলাকে পর্যন্ত অবিশ্বাস্য জেনেও আওয়ামী লীগের দ্বারাই সেসব সংঘটিত বলে যে মিথ্যা ভিত্তিহীন অপরাজনীতি, দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি করেছিল- সেই মিথ্যা পশ্চিমারা বলে না।
কিন্তু তাদের কোন মিত্রকে যদি কখনোও আত্মবিশ্বাসী, আত্মনির্ভরশীল, নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিতে দেখে, তাহলে যুদ্ধাস্ত্র যাদের ব্যবসার প্রথম পণ্য, সেই পশ্চিমারা তাকে কিভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ সাদ্দাম ও গাদ্দাফী।
এমন কি আফগানিস্তানে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো ধ্বংস করার জন্য তারা জন্ম দিয়েছিল ও বিকশিত করেছিল সস্ত্রাস, জঙ্গী দল আল কায়েদা, তালেবান ও লাদেনকে! সে অবমুক্ত দৈত্যকে আবার পরে তাদেরই হত্যা করতে হয়েছে ও হচ্ছে! দুনিয়ার তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ-সব কিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পশ্চিমারা এক পুতুল খেলায় রত, যে খেলায় কোন একভাবে দরিদ্র দেশগুলোকেও খেলতে হচ্ছে!
তবে পশ্চিমা সাধারণ নাগরিকরা যুদ্ধ ও এসবের বিরুদ্ধবাদী এবং ওদের ব্যক্তি স্বাধীনতা, বাক-স্বাধীনতা ও মানবাধিকার প্রীতি এসবের প্রতি গভীর আস্থা না থাকলে আজ আমাদের লেখক তসলিমা নাসরিন, দাউদ হায়দার, সালমান রুশদীরা প্রাণে বাঁচতে পারত না। খেয়াল করে দেখুন, এই মুরতাদ, কাফের নাম দিয়ে মুসলমান উগ্র জেহাদী মৌলানারাই তাদের কতল করবে বলে ঘোষণা দিচ্ছে-যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ! মসুলমান ছাড়া অন্য কোন ধর্মীয় সম্প্রদায় সারা দুনিয়ায় কোন কবি লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীকে কত্্ল্যোগ্য দাবি করেনি! এমন কি এখনকার জঙ্গী, ইংরেজী মাধ্যমে শিক্ষিত তরুণরাও মুক্তিযুদ্ধপন্থী এখন প্রগতিশীল ব্লগারদের কতল্যোগ্য ঘোষণা করছে, কতলও করছে!
’৭১-সালের রাজাকার গোলাম আযম, নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদীদের উত্তরসূরী বর্তমান যুগের ইংরেজী মাধ্যমে শিক্ষিতদের মধ্যেও যদি জঙ্গী খুনী জন্ম নিতে পারে, মাদ্রাসায় তো কিছু সংখ্যক জন্ম নিচ্ছেই-তাহলে মৌলানারা এই জল্লাদ-সৃষ্টিকারী মসুলিম মৌলানাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ও সংশোধনমূলক প্রচার কর্মকা- শুরু করবেন।- এটাই অনেক বেশি কাক্সিক্ষত ও প্রয়োজনীয়। পশ্চিমাদের ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সম্মান করার ফলে একজন শিশুকে মা-বাবা জন্মদান করে তবে মালিক হতে পারে না, সে নির্যাতিত হলে পুলিশ ঐ মা, বাবা রাষ্ট্রের স্বাধীন নাগরিক সন্তানের দেখভালের উপযুক্ত নয় গণ্য করে শিশুকে নিজেদের তত্ত্বাবধানে নিয়ে যায়!
সবশেষে ছোট্ট করে বলতে চাই- সমকামিতা-দোষে দুষ্ট পৃথিবীর সব দেশের সব সমাজ। আমাদের কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এসবের হোস্টেল, আরও নানা স্থানকে সমকামিতার কেন্দ্রস্থল বলে চুপিসারে মানুষ সমালোচনা করে। পশ্চিমারা ওটাকে ব্যক্তির নিজস্ব অভিরুচি হিসেবে মান্য করে, সেটাকে গোপন বিষয়ে পরিণত না করতে বিবাহের আইন পাস করেছে আমেরিকার কোন কোন অঙ্গরাষ্ট্র। কে কোথায় এ বিষয়ে একমত পোষণ করল তাতে আপনাদের–আমাদের কোন ক্ষতি হবে না। আর যদি আপনারা সত্যিই ধর্ষক, সমকামী, বহু বিবাহকারী, যৌতুকদাবিকারী, নারী হত্যাকারী এবং প্রগতিশীল তরুণ-তরুণী হত্যাকারীদের দেশছাড়া করার ঘোষণা দিয়ে দাবি আদায়ের আইনসম্মত কর্মসূচী গ্রহণ করেন, তাহলে সত্যিই দেশ ও জাতির অগ্রগতি ও উন্নয়নে আপনাদের মৌলানাদের বিপুল ভূমিকা শ্রদ্ধা অর্জন করবে।

Tuesday, February 6, 2018

‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ ও ‘নারী’ কোটা বাতিলের দাবি ॥ পরিকল্পিত এই আন্দোলনকারী কারা?


দাবি অনুসারে ৩৪তম বিসিএসের ফল পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্তের পরেও আন্দোলন চলছে। বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধাসহ সকল কোটা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়েছে আন্দোলনকারীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবন, প্রক্টর অফিস, রেজিস্ট্রার বিল্ডিং, উপাচার্যের কার্যালয়ে ভাংচুরসহ আন্দোলনকারীরা অন্তত পাঁচটি গাড়িতে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। রক্ষা পায়নি গণমাধ্যমের গাড়ি ও গণমাধ্যমকর্মীরাও। আন্দোলনরতদের ‘শিবির’ অভিযুক্ত করে তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে ছাত্রলীগ কর্মীরা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আর তাদের হাতে নেই বলে অভিযোগ এনেছেন বুধবার সংহতি প্রকাশ করা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এম আমজাদ আলী। এদিকে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা কোটাপদ্ধতি বিশেষ করে মুুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরুদ্ধে হঠাৎ করে কিছু অতিউৎসাহীর আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হঠাৎ করে মুক্তিযোদ্ধা, নারী কোটাসহ সকল প্রকার কোটা বাতিলের আন্দোলনের প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছে ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’।
সরকারী কর্মকমিশনের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আ ই ম নেছার উদ্দিন ফল পুনর্বিবেচনার পরেও আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বলেছেন, এখন এই আন্দোলনের পেছনে অন্য বিশেষ গোষ্ঠীর হাত আছে।
 তারা চাইছে সাধারণ কিছু ছাত্রকে ব্যবহার করে সঙ্কট তৈরি করতে। কারণ এই কোটাপদ্ধতি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সাল থেকেই চলে আসছে। ১৯৮৫ সালে কোটার শতাংশ হারে একটা স্থায়ীরূপ পায়। এখন হঠাৎ এ ধরনের দাবি তুলে আন্দোলন করার কারণ ভিন্ন কিছু। ঠিক একই অভিযোগ ঢাবির প্রক্টর অধ্যাপক এম আমজাদ আলীরও। বুধবার তিনি আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু ফল পুনর্বিবেচনার পর এখন এ ধরনের কর্মকা- নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসে হামলা, ভাংচুরের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি ভাল নয়।
বুধবার শিক্ষার্থীদের যে আন্দোলন ছিল তা আর এখন তাদের হাতে নেই। এখন যারা আন্দোলন করছে তাদের উদ্দেশ্য দাবি আদায় নয়, ভিন্ন কোন উদ্দেশ্য। তারা উপাচার্যের বাসভবন, কার্যালয়, আমার কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে ভাংচুর চালিয়ে তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য প্রমাণ করেছে।
এর আগে বুধবার ৩৪তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় বাদ পড়া প্রার্থীদের দিনভর রাস্তা অবরোধ ও বিক্ষোভের পর ফল পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেয় পিএসসি। তবে রাজধানীর শাহবাগে পরীক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধে তীব্র যানজটে পড়তে হয়েছে রাজধানীবাসীকে। রাত ১০টায় শাহবাগে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ ঘোষণা দেয়Ñ ফল পুনর্বিবেচনাই নয়, বরং মুক্তিযোদ্ধাসহ সকল কোটা বাতিল করতে হবে। এ দাবিতে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় তারা আবারও শাহবাগে অবরোধ করার ঘোষণা দেয়। কিন্তু এ ধরনের ঘোষণায় অনেক সাধারণ শিক্ষার্থী এমনকি আন্দোলনের সঙ্গে থাকা ছাত্রলীগের কর্মী-সমর্থকরা আর আন্দোলন না করার পক্ষে অবস্থান নেয়। মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে এ ধরনের আন্দোলন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রথম দিনের আন্দোলনে থাকা অনেকেই। তবে তার পরেও বৃহস্পতিবার সকালে শাহবাগ অবরোধ করার চেষ্টা করে অতিউৎসাহী একটি গোষ্ঠী।
সকাল এগারোটার দিকে ৩৪তম বিসিএসের পরীক্ষার্থীরা শাহবাগে জড়ো হতে শুরু করলে যানজট সৃষ্টি হওয়ায় পুলিশ বাধা দেয়। তার পরেও তাদের একটি অংশ শাহবাগে অবস্থান করছিল। আরেকটি অংশ পুলিশী বাধায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে সরে যায়। তারা চারুকলার সামনের রাস্তায় এটিএন বাংলার একটি গাড়িসহ দুটি গাড়ি ভাংচুর করে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। পুলিশ টিয়ারশেল ছুড়লে তারা ক্যাম্পাসের আরও ভেতরে অবস্থান নেয় এবং পুলিশের একটি মোটরসাইকেলে আগুন জ্বেলে বিক্ষোভ জানাতে থাকে। বেলা সাড়ে বারোটার দিকে চারুকলার সামনে পুলিশ আর আন্দোলনকারীদের মধ্যে আবার সংঘর্ষ বাধে। একই সময়ে ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ‘শিবির’ হিসেবে অভিহিত করে বিশাল মিছিল বের করে। প্রতিটি হল থেকে নেতাকর্মীরা একত্র হয়ে তারা শিবিরবিরোধী মিছিল করে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে। এ সময় আন্দোলনকারীদের বেশ কয়েকজনকে তারা পিটিয়ে আহত করে। আন্দোলনরতদের একটি অংশ দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে নীলক্ষেতের দিকে এগিয়ে যায়। এ সময় তারা কলা ভবনে অবস্থিত প্রক্টরের অফিস ভাংচুর করে। পুলিশী বাধায় তারা ইটপাটকেল ছোড়ে। এখানেও পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে শিক্ষার্থীদের পিছু হটতে বাধ্য করে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা একপর্যায়ে উপাচার্যের বাসভবনে আক্রমণ করেন। পাশাপাশি তারা দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি ও সিএনজিচালতি একটি অটোরিকশা ভাংচুর করেন।
এ সময় পুলিশ রোকেয়া হলের সামনে দিয়ে কলা ভবনের সামনে আসলে আন্দোলনকারীরা তাদের ধাওয়া করে এবং পুলিশ পিছু হটে। তারা রোকেয়া হলের সামনে গিয়ে টিয়ারশেল ছুড়তে থাকলে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময়ও তারা বুদ্ধিজীবী চত্বরে অবস্থান নিয়ে উপাচার্য ভবনের দিকে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকলে ছাত্রলীগ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধাওয়ার মুখে ক্যাম্পাস ত্যাগ করে। এ সময় পুলিশ আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকে আটজনকে আটক করে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে অবস্থিত উপাচার্যের কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখে আন্দোলনরত বিসিএস পরীক্ষার্থীরা। এখানেও আন্দোলনকারীরা উপাচার্য অফিস ও রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের বেশ কয়েকটি অফিসে হামলা চালায়। এছাড়া প্রশাসনিক ভবনের সামনে মল চত্বরে অসংখ্য পরীক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করে।
পুলিশের রমনা জোনের এসি শিবলী নোমান ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিতে চাইলে আমরা তাদের পাবলিক লাইব্রেরী অথবা টিএসসিতে কর্মসূচী পালন করতে অনুরোধ করি। কিন্তু তারা সে অনুরোধ না মেনে শাহবাগে অবস্থান নিতে চাইলে আমরা বাধা দেই। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে তাদের ছত্রভঙ্গ করতেই কাঁদানে গ্যাস ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে হয়েছে। এদিকে বিকেলে মধুর ক্যান্টিনে আন্দোলন নিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগ সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ বলেছেন, বিসিএস-বঞ্চিতদের বুধবারের আন্দোলনে ছাত্রলীগের সমর্থন ছিল। তবে পিএসসি দাবি মেনে নেয়ার পরও তারা আন্দোলন থেকে সরে না আসায় আমরা উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, কিছু শিবিরকর্মী সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কথা বলছে। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের কটূক্তি করছে। এটা চলতে দেয়া যায় না। তবে আন্দোলনরতদের মারধরের ঘটনা অস্বীকার করেন তিনি। কোটা বাতিলের আন্দোলন তারা সমর্থন করেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সোহাগ বলেন, প্রয়োজন হলে কোটা সঙ্কোচন করা যেতে পারে।

এদিকে পাবলিক লাইব্রেরীর সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ ঘোষণা দিয়েছে, সব ধরনের সরকারী চাকরিতে কোটা প্রথা বাতিলের দাবিতে তাদের আন্দোলন চলবে। রোজাদার জনসাধারণ যাতে দুর্ভোগে না পড়েন সেজন্য বৃহস্পতিবারের মতো কর্মসূচী স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীদের একজন খুলনা বিএল কলেজের শিক্ষার্থী সিদ্দিকুর রহমান। তিনি বলেন, শুক্রবার বিকেল ৩টায় শাহবাগে সম্মিলিতভাবে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচী ঘোষণা করা হবে।
পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) শিক্ষার্থীদের এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করে আবারও বলেছে, প্রিলিমিনারি থেকে এবার কোটা ঠিক করা হলেও মেধাবীরা কোনভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। ৩৪তম বিসিএসের দায়িত্বে থাকা পিএসসির সদস্য মুহম্মদ লিয়াকত আলী খান সাংবাদিকদের বলেন, মৌখিক পরীক্ষার পর কোটা ঠিক করতে গিয়ে দেখা যায়, অনেক পদ শূন্য পড়ে থাকে। প্রার্থী থাকেন না। সে কারণে এবার প্রিলিমিনারি পর্যায় থেকেই যে কোটায় যতগুলো পদ আসে তার বিপরীতে প্রার্থী নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, তবে কাট নম্বর (একটি নির্দিষ্ট নম্বর যার বেশি পেলে লিখিত পরীক্ষার জন্য যোগ্য বিবেচিত হয়) সবার একই রাখা হয়েছে। এতে মেধাবীদের শুরুতেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি নেই। আইনের বাইরে গিয়ে পিএসসি কিছু করেনি। পিএসসির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আ ই ম নেছার উদ্দিন বলেন, ফলাফল নিয়ে আসলে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। মেধাবীরা বাদ পড়েছেন তা ঠিক নয়।
এদিকে কোটা বাতিলের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করে রাজশাহী এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে একদল শিক্ষার্থী। একই দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এক ঘণ্টার সড়ক অবরোধের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপের পর তা তুলে নেয় বিক্ষোভকারীরা। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কোটা প্রথা বাতিলের দাবিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু শিক্ষার্থী ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে। দুপুর ১২টার দিকে বিক্ষোভ শুরু করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করলে উভয় দিকে অনেক যানবাহন আটকা পড়ে। দেড়টার দিকে তারা অবরোধ তুলে নিয়ে শুক্রবার সিলেট শহীদ মিনারে অবস্থানের ঘোষণা দেয়। একই দাবিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে একদল শিক্ষার্থী। বিসিএস কোটা বাতিল ও মেধার অবমূল্যায়নের অভিযোগ এনে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) কিছু শিক্ষার্থী মানববন্ধন করেছে।
এদিকে হঠাৎ করে মুক্তিযোদ্ধা, নারী কোটাসহ সকল প্রকার কোটা বাতিলের আন্দোলনের প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছে ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’।
এরা কারা? কেউ অনুসন্ধান করেছেন?
আজ সকাল এগারোটায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এ কর্মসূচী পালন করা হবে। সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এক প্রতিবাদ লিপিতে ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, যারা মুক্তিযোদ্ধা ও নারী কোটা বাতিল চায় তারা সাধারণ ছাত্রের নামধারী জামায়াতের দোসর। কোন বিশেষ মহলের ইন্ধনেই সাধারণ ছাত্রদের মাঠে নামিয়ে অস্থিরতা তৈরির পাঁয়তারা করছে জামায়াত শিবির। এ ধরনের তৎপরতার বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন নেতৃবৃন্দ।
আন্দোলনের মধ্যে ‘করণীয় নির্ধারণে’ বৈঠক করেছে সরকারী কর্মকমিশন (পিএসসি)।
বৃহস্পতিবার বিকেলে কমিশনের চেয়ারম্যান এ টি আহমেদুল হক চৌধুরী বলেন, আমরা বৈঠক করেছি তবে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি। আবারও বৈঠকে বসে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কত দিনের মধ্যে ৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারির ফল পুনর্বিবেচনা করা হবে? এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিএসসি চেয়ারম্যান বলেন, এটা করতে বেশি দিন লাগবে না।

Monday, February 5, 2018

আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির পিতামহ -আবদুল গাফফার চৗধুরী


প্রবীণ এক বাম নেতার এই সাক্ষাতকারটি প্রথমে আমার চোখে পড়েনি। কোন প্রতিষ্ঠিত জাতীয় দৈনিকে সাক্ষাতকারটি বেরোয়নি। একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকে বেরিয়েছে, যেটি সচরাচর আমার চোখে পড়ে না। বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে শুনে সাক্ষাতকারটি পড়লাম। দৈনিকটির ৫ অক্টোবরের সংখ্যায় তা বেরিয়েছে। ছোট সাক্ষাতকার। তবু আমার জন্য খুবই আগ্রহোদ্দীপক। কারণ, তিনি আমার কলেজ জীবনের খুবই প্রিয় শিক্ষক। পরবর্তীকালে তিনি হন দেশের এক সময়ের বৃহত্তম বাম গণতান্ত্রিক সংগঠন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। এখন বিরানব্বই বছর বয়স। তাঁকে এখন বলা চলে আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির পিতামহ। তাঁকে আমি খুবই শ্রদ্ধা করি।
ন্যাপের সেই সুদিন এখন আর নেই। অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ এখনও দলের সভাপতি আছেন বটে, বয়সাধিক্যে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তবু এই বয়সেও তিনি তাঁর চিন্তা-চেতনা ও পরামর্শ দ্বারা দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করছেন। তাঁর কথা কেউ শুনছে কী শুনছে না, তার পরোয়া করছেন না। তিনি এখনও আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি বাতিঘর। ৫ অক্টোবর ঢাকার বহুল প্রচারিত দৈনিকটিতে আলাপচারিতা বিভাগে প্রকাশিত তাঁর দেয়া সাক্ষাতকারটিতেও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা সম্পর্কে তাঁর প্রকৃত সচেতনতার পরিচয় পাওয়া যায়। এ জন্যই সাক্ষাতকারটি আমি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে পড়েছি।
এই সাক্ষাতকারটি পড়তে গিয়ে আমি এমন একটি তথ্যের মুখোমুখি হয়েছি, যা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের মতো নব্বই-উর্ধ প্রবীণ রাজনৈতিক নেতার মুখ থেকে বের না হলে আমার পক্ষেও বিশ্বাস করা সহজ হতো না। এ কথা অস্বীকার করব না, আমি ড. কামাল হোসেন ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কঠোর সমালোচক। বিশেষ করে ড. কামাল হোসেনের। কারণ, তিনি এক সময় বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুই তাঁকে হাত ধরে টেনে এনে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেন। পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে তিনি বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার রাজনীতির অবশ্যই সমালোচনা, এমনকি বিরোধিতাও করতে পারেন। কিন্তু হাসিনার প্রতি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিদ্বেষে অন্ধ হয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শবিরোধী চক্রান্তের শিবিরে গিয়ে সরাসরি যোগ দিতে পারেন, এটা আমার কাছেও ছিল অকল্পনীয়।
ঢাকার দৈনিকটির ৫ অক্টোবরের সংখ্যায় প্রকাশিত ‘আলাপচারিতায়’ দেশের বয়োবৃদ্ধ প্রবীণতম নেতা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেছেন, ‘আমি যে রাজনীতি করি, তা ষড়যন্ত্রের রাজনীতি নয়। এটি সরল রাজনীতি। আমি ষড়যন্ত্রের মধ্যে নেই। ড. কামাল হোসেন এসেছিলেন আমার কাছে জাতীয় সরকারের রূপরেখা নিয়ে। আমার কাছে দোয়া চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি ষড়যন্ত্রের রাজনীতির মধ্যে নেই। আমি রাজি হইনি। আমার রাজনীতির অর্থ হচ্ছে সত্য কথা বলা, সড়ক দিয়ে হাঁটা এবং ডাল দিয়ে খাবার খাওয়া। ড. কামাল হোসেন ও নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের প্রধান হিসেবে কাজ করতে ইচ্ছুক। সে কারণে তাঁরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করছেন।’
অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের ‘আলাপচারিতায়’ এই বক্তব্যটি দেশের অনেক মানুষের কাছে ড. কামাল ও ড. ইউনূস জুটির বর্তমান কার্যকলাপ ও আচার-আচরণের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে দেবে। আমি নিজেও দীর্ঘদিন যাবত এই জুটির কার্যকলাপ ও বক্তৃতা-বিবৃতির সমালোচনা করলেও সবসময় ভেবেছি, এরা শেখ হাসিনার প্রতি প্রচ- বিরাগবশত দেশের গণতান্ত্রিক শিবিরের যে ক্ষতি করছেন, তা হয়ত নিজেরাও উপলব্ধি করছেন না। কিন্তু তাঁরা যে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থের কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত গোঁ চরিতার্থ করার জন্য সরাসরি ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে যোগ দিতে এবং এতটা নিচে নেমে যেতে পারেন, তা কল্পনাও করিনি। আওয়ামী লীগ রাজনীতির একটা বড় দুর্ভাগ্য, এই রাজনীতিতে এক মোশতাকের তিরোভাব না ঘটতেই আরেক মোশতাকের আবির্ভাব হয়।
একটি তথাকথিত ‘জাতীয় সরকারের রূপরেখা’ পকেটে নিয়ে ড. কামাল হোসেন দেশে যা করে বেড়াচ্ছেন, তা যে ‘ষড়যন্ত্রের রাজনীতি’ এটা বুঝতে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের মতো রাজনীতির বটবৃক্ষের কিছুমাত্র অসুবিধা হয়নি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ড. কামাল হোসেনকে বলে দিয়েছেন, ‘আমি ষড়যন্ত্রের মধ্যে নেই’ এবং তাদের ষড়যন্ত্রে দোয়া (সমর্থন) দিতেও রাজি নন। শুধু অধ্যাপক মোজাফ্ফর নন, ড. কামাল হোসেন নাকি তাঁর জাতীয় সরকারের রূপরেখা (যে সরকারে তিনি কিংবা ড. ইউনূস প্রধান হবেন) নিয়ে দেশের আরও কয়েকটি ডান এবং বাম গণতান্ত্রিক দলের নেতার দরজায় গিয়ে দোয়া লাভের জন্য ধর্ণা দিয়েছিলেন। তাঁরা সকলেই একবাক্যে না বলে দিয়েছেন।
শেষপর্যন্ত তিনি সম্ভবতঃ তাঁরই মতো জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত কয়েকজন নেতাকে তাঁর বিতর্কিত রাজনীতিতে সঙ্গী করতে পেরেছেন। এরা হলেন ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কাদের সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না প্রমুখ। এদের অধিকাংশই সচরাচর নির্বাচনে জেতেন না। কারও কারও জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। ড. কামাল হোসেনকে বঙ্গবন্ধু একবার বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদে জিতিয়ে এনেছিলেন। তারপর আর কোনও নির্বাচনে জেতেননি। শেখ হাসিনা তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে দাঁড় করিয়েছিলেন। সেখানেও বিএনপির বিচারপতি সাত্তারের কাছে হেরেছেন। গত নির্বাচনে তাঁর গণফোরামের প্রার্থীদের কারও জামানত রক্ষা পায়নি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের রেকর্ড তো অনুরূপ উজ্জ্বল। তেজারতিতে তিনি দক্ষ। তবুও রাজনীতিতে ঢোকার খুব শখ। কিন্তু রাজনৈতিক মূলধন কিছুই নেই। ছাত্রজীবন থেকে বাংলাদেশের কোনও রাজনৈতিক আন্দোলনের ত্রিসীমানায় তিনি ছিলেন না। গরিবের নামে ব্যবসা করে নিজে বিরাট ধনী হয়েছেন। গরিবের বাড়িতে ভুলেও যান না। তাঁর জেট সেট লাইফ। রাজারাজরাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ান। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের তিনি বিশ্বস্ত অনুচর।
ফলে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের প্রভুরা তাঁকে খুশি হয়ে অর্ধেক নোবেল পুরস্কার দিয়েছে এবং এখনও বড় বড় পুরস্কার দিচ্ছে। অর্ধেক নোবেলজয়ী হওয়ার পর আনন্দের এভারেস্ট চূড়ায় উঠে ওই নোবেল পুরস্কারকে মূলধন করে তিনি নূতন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দেন। এই দল গঠনের এক মাসের মধ্যে তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর দল শেষপর্যন্ত ‘কাকতাড়ুয়ার দল’ হয়ে দাঁড়াবে। তিনি রাজনীতি করার আগেই জনগণ কর্র্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে রাজনীতি ছাড়েন।
রাজনীতির সদর দরজা দিয়ে যাঁরা ক্ষমতায় যেতে পারেন না, তাঁরা পেছনের দরজা দিয়ে সেই ক্ষমতায় যেতে চাইবেন, তা আর এমন কী বিস্ময়ের ব্যাপার। তবে কামাল হোসেনদের ক্ষেত্রে বিস্ময়ের কথা এই যে, তাঁরা গণতন্ত্র, সুশাসন, স্বচ্ছ রাজনীতি এ সবের কথা বড় বেশি বলেন। গণতন্ত্র, সুশাসন ও স্বচ্ছ রাজনীতির পথ তো হচ্ছে জনগণের কাছে যাওয়া, স্বচ্ছ, বাস্তব ও সুস্থ কর্মসূচীর মাধ্যমে তাদের কাছে ক্ষমতায় যাওয়ার ম্যান্ডেট চাওয়া। সে জন্যে নির্বাচনে যাওয়া।
ড. কামাল হোসেনরা গণতন্ত্রের এই সদর দরজা দিয়ে না হেঁটে কেন পেছনের দরজা খুঁজছেন এবং তথাকথিত জাতীয় সরকারের একটি রূপরেখা (যেটি আসলে ষড়যন্ত্রের নীলনক্সা) পকেটে নিয়ে একশ্রেণীর প্রবীণ-নবীন রাজনীতিক নেতার বাড়িতে ধর্ণা দিয়ে তাদের দোয়া চেয়ে বেড়াচ্ছেন? জনগণ কর্তৃক বার বার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরই জাতীয় সরকার নামক একটি অনির্বাচিত সরকার গঠন দ্বারা পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার ভূতটি ড. কামাল হোসেনদের মাথায় চেপেছে।
মজার ব্যাপার এই যে, মাত্র গত ২৩ সেপ্টেম্বর (সোমবার) বরিশালে এক জনসভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘...এবার দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করে ছাড়ব।’ এটা খুবই ভাল কথা। দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করে যদি কামাল হোসেন সাহেবরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করতে পারেন, তাহলে তো বলব, তাঁরা গণতন্ত্রের পথেই হাঁটছেন। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও জাতীয় সরকার তো এক কথা নয়।
ড. কামাল হোসেনরা কোনটি চান? যদি সত্যিই তাঁরা বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সমর্থন করেন, তাহলে এই দাবি আদায়ের জন্য বিএনপি চলতি মাসেই যে আন্দোলন শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে, সে আন্দোলনে যোগ দিন। তা না করে পর্দার আড়ালে আবার জাতীয় সরকারের খেলা খেলছেন কেন? জনগণের কাছে না গিয়ে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের মতো প্রবীণ নেতাদের দরজায় গিয়ে গোপন ধর্ণা দিচ্ছেন কেন? আবার জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করে নিজে কিংবা ড. ইউনূসের সেই অনির্বাচিত জাতীয় সরকারের প্রধান হওয়ার আগাম ইচ্ছা ব্যক্ত করছেন কেন?
ড. কামাল হোসেন ও ড. ইউনূসের জুটির নেতৃত্বে চালিত তথাকথিত সুশীল সমাজের মনস্তত্ত্বটা বুঝতে কারোই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। জনগণের আস্থা তাদের ওপর নেই, জনগণ কখনই তাদের ভোট দেবে না এবং নির্বাচন এলে যত খারাপ বা মন্দ হোক আওয়ামী লীগ বা বিএনপিকেই তারা ভোট দেবে। দেশের মানুষ এই দল দুটিকে বোঝে। এই দুই দলের নেতারা যত অপরিশীলিত ভাষায় বক্তৃতা দেন, তার অর্থ তারা বোঝে। আর ড. কামাল হোসেন বা ড. ইউনূস সাহেবরা গণতন্ত্রের অভিধান থেকে যে সব ভাল ভাল কথা বেছে নিয়ে জনগণের নাগালের বাইরের এভারেস্ট চূড়া থেকে কথা বলেন, তার অর্থ তারা বোঝে না। সে সব কথায় আস্থা স্থাপনও করে না।
অনির্বাচিত জাতীয় সরকার গঠন ড. কামাল হোসেনের বহুদিনের একটি পেট থিয়োরি। বার বার নির্বাচনে দাঁড়িয়ে হেরে গিয়ে এবং জনগণকর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে প্রবল রাজনৈতিক হতাশা থেকে সম্ভবতঃ তাঁর মনে এই থিয়োরিটির জন্ম। বহুকাল আগে তিনি তাঁর ‘সুশীল সমাজ’ দ্বারা এই থিয়োরিটি একবার জনসমক্ষে এনেছিলেন। দেশের মানুষ এই গণঅধিকার বর্জিত সরকারের থিয়োরি গ্রহণ করেনি। তখন এক বাম রাজনীতিক প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, ‘গু মড়াবৎহসবহঃ, মড়ড়ফ ড়ৎ নধফ, রং নবঃঃবৎ ঃযধহ ঁহবষবপঃবফ মড়ড়ফ মড়াবৎহসবহঃ’ (আমার সরকার, ভালোমন্দ যা-ই হোক, অনির্বাচিত ভালো সরকারের চাইতে ভালো)।
নিজের পছন্দের, নিজের ভোটাধিকার দ্বারা গঠিত সরকার মন্দ হলেও জনগণ সেই সরকারই চায়। অন্যের পছন্দের এবং অন্যদের ইচ্ছায় গঠিত সরকার ভালো হলেও জনগণ তা পছন্দ করে না। এটা গণতন্ত্রের ইতিহাসের আদি সত্য।
ড. কামাল হোসেনদের অনেক বিদ্যাবুদ্ধি। কিন্তু এই সত্যটা তাঁরা বোঝেন না। আর বোঝেন না বলে জনগণের কাছে পৌঁছতেও পারেন না। এদিকে, ক্ষমতায় যাওয়ার অদম্য লিপ্সা তাদের তাড়িত করে বেড়ায়। তখন ক্ষমতার লোভে বিদেশী সাহায্য ও সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে গিয়ে তাঁরা দেশ এবং গণতন্ত্রের সমূহ সর্বনাশ করেন। আমার আশঙ্কা, ড. কামাল হোসেনদের বর্তমান ষড়যন্ত্রের রাজনীতি দেশের জন্য এক অকল্যাণকর পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে।
ঢাকার বহুল প্রচারিত দৈনিকটিতে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের আলাপচারিতার বক্তব্য পাঠের আগেই আমার এক লেখায় ড. কামাল হোসেন ও ড. ইউনূসের বর্তমান কার্যকলাপ সম্পর্কে আমার সন্দেহের কথা প্রকাশ করেছিলাম। লিখেছিলাম, বাংলাদেশে কারজাই অথবা জারদারি মার্কা একটি সরকার অনির্বাচিত জাতীয় সরকার হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার জন্য যে তৎপরতা চলছে, সেটি সফল করার লক্ষ্যে এই সুশীল চক্রের এক নেতা ইউরোপ-আমেরিকার রাষ্ট্র নেতাদের দরবারে তাদের সাহায্য ও সমর্থনের আশায় ধর্ণা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। অন্যদিকে, অন্য নেতা দেশের ভেতরে সেই জাতীয় সরকারের নীলনক্সায় রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বাইরে তাঁরা দেখাচ্ছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ে সমর্থন দানের জন্যই দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা করছেন।
এরা হয়ত ভাবতে পারেননি, দেশের বাম রাজনীতির এক বটবৃক্ষ নেতা এমন সোজা সরল ভাষায় তাদের গোপন তৎপরতার কথা ফাঁস করে দেবেন এবং তাকে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি আখ্যা দেবেন। ড. কামাল হোসেন জানেন কিনা জানি না, তিনি রাজনীতির রেসের মাঠে পরাজিত ও প্রত্যাখ্যাত ঘোড়ায় পরিণত হয়েছেন। বিদেশীরা তাঁকে নিয়ে খেলতে পারে, কিন্তু ক্ষমতায় বসাবে না। তিনি এখন তাদের বাতিল ও ব্যর্থ নেতাদের তালিকায় আছেন। তিনি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী থেকে কাদের সিদ্দিকী পর্যন্ত যাদের সঙ্গে জুটিয়েছেন তাঁরাও এই তালিকাভুক্ত নেতা। এই দলে নতুন মুখ ড. ইউনূসের। কিন্তু মাটিতে তাঁর পা নেই। তিনি শাখামৃগের মতন। শাখামৃগের ওপর কেউ নির্ভর করে না। তাকে কলা দেখিয়ে ব্যবহার করে মাত্র।

লন্ডন, ৮ অক্টোবর, মঙ্গলবার, ২০১৩ ॥

Thursday, January 25, 2018

সফল নেতা শেখ হাসিনা, কুর্নিশ তোমায়- সুমি খান

একটা স্বাধীন দেশ -একটা সূর্যরাঙ্গা সকাল আর একটা পতাকা-এই তো! এ আর এমন কী! না, অনেক কিছুই! সখিনা বিবির ভাঙলো কপাল, সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর। দানবের মতো চিৎকার করতে করতে শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাংক এলো! ছাত্রাবাস, বস্তি উজাড় হল। রিকয়েললেস রাইফেল আর মেশিনগান খই ফোটাল যত্রতত্র। ছাই হল গ্রামের পর গ্রাম।

বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভুর বাস্তুভিটার ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে একটানা আর্তনাদ করেছিলো একটি বা অনেক কুকুর। শকুনেরা ব্যবচ্ছেদ করেছিলো লাশের পর লাশ! কতো যে অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিয়েছিলো পিতামাতার লাশের ওপর। আর সেই অবুঝ শিশুটি পিতামাতার ঘাতকদের বিচারের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনেছে ৪৪ বছর! আর যুদ্ধজয়ী ক্লান্ত খোকার প্রতীক্ষায় নুয়ে পড়া লতাটার কুমড়ো ফুল শুকিয়ে গেছে অনেকদিন! ঝরে পড়েছে ডাঁটা; পুঁইলতাটা নেতানো, মায়ের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত চোখ শুধায়-“খোকা এলি?’ ঝাপসা চোখে মা তাকায় উঠোনে, উঠোনে যেখানে খোকার শব শকুনিরা ব্যবচ্ছেদ করে।

এখন, মা’র চোখে চৈত্রের রোদ পুড়িয়ে দেয় শকুনিদের। শহীদ জননীর চোখের চৈত্রের রোদের তেজ আমাদের জননন্দিত রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চোখে। বর্বর আত্মম্ভরী ঘাতকদের একের পর এক বিচারের মুখোমুখি করে তাদের ফাঁসি কার্যকর করলেন শেখ হাসিনা!

পেশাগত কাজে এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া শুরু থেকেই পর্যবেক্ষণ করছি। এই বিচারে নিয়োজিত তদন্ত কর্মকর্তা এবং প্রসিকিউটরদের অনেক কাজের সাথে আমি সম্পৃক্ত। এই ঘাতকদের বর্বর নির্যাতনের শিকার আমার পিতার রক্তশপথে আমি নিজেকে এ কাজে উৎসর্গ করেছি অনেক আগেই। আর তাই বার বার আভূমি নত হয়ে কুর্নিশ করি রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে।

যিনি বারবার আমাকে দৃপ্ত শপথে পুনর্জীবিত করেন। এ দেশের জন্মলগ্ন থেকেই আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমির বিরুদ্ধে হাজারো লক্ষ ষড়যন্ত্র চলমান। পাশাপাশি ঘাতকদের বিচারও চলমান। এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেশে বিদেশে অনেক খ্যাতিমান সাংবাদিক, সম্পাদক এবং নীতিনির্ধারকেরা আমাকে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন করেছেন। আমি দ্বিধাহীন চিত্তে গভীর আত্মবিশ্বাসের সাথে তাদের প্রত্যেককে সেই শুরু থেকেই বারবার বলে এসেছি আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যতোক্ষণ বেঁচে আছেন, তিরিশ লাখ শহীদের রক্তের শপথে একাত্তরের ঘৃণ্য ঘাতকদের ফাঁসি তিনি কার্যকর করবেনই।

বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখে আমাদের এ বীর রাষ্ট্রনায়ক শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে উচ্চারণ করেন- “এই বাংলাদেশের কেউ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্থ করতে চাইলে তারাও যুদ্ধাপরাধী।” সত্যি, একাত্তরের ডিসেম্বরের ১০ তারিখের পর দেশের এ প্রান্তে ও প্রান্তে পরাজয় নিশ্চিত জেনে যারা তালিকা করে এদেশকে মেধাশূন্য করতে শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের একের পর এক হত্যা করেছে-সেই ঘাতকদের কখনো রাষ্ট্রপতি, কখনো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীত্ব , কখনো বা শর্ষিনার পীরের মতো ঘাতককে ‘স্বাধীনতা পদক’ দিয়ে হায়েনার মতো হা-হা-হা করে হেসেছে! আর দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের রক্তে রঞ্জিত হাতের নির্দেশে রাস্তায় নামিয়েছে শহীদ পরিবারের সদস্যদের ।

আমার বাবার মতো বীর মুক্তিযোদ্ধারা চোখের জলে ভেসে রাজপথ কাঁপিয়েছন প্রতিবাদে। যাদের বঙ্গবন্ধু দেশের সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করে মাথা গোঁজার ঠাঁই দিয়েছিলেন, তাদের স্বজনদের কর্মসংস্থান করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু চোখের জলে ভেসে যে বীরাঙ্গনাদের যুদ্ধশিশুদের সন্তানের কাগজে কলমে আক্ষরিক অর্থে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, সেই বীরাঙ্গনা এবং তাদের সন্তানদের পথের ভিখারীতে পরিণত করেছিলো যারা, কমরেড মণিসিংহসহ এ দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারীদের স্বজনদের জন্যে বঙ্গবন্ধু যে বাড়ি দিয়েছিলেন, সেই বাড়ি থেকে তাদের উচ্ছেদ করে কোথাও নজরুল একাডেমী , কোথাও বা জামাতের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান করে ৯৯ পয়সার বিনিময়ে শত বছরের লীজ দিয়েছে।

দেশ বিরোধী, পাকি সাপের বিষধারী সেই সাবেক রাষ্ট্রনায়কেরা আজ তাদের কলঙ্কিত পায়ে আমাদের মহান স্মৃতিসৌধ, বধ্যভূমি এবং শহীদ মিনারে যাচ্ছে, মহান শহীদদের রক্তে রঞ্জিত হাতে শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক দিচ্ছে- সে কি লোক দেখানো নয়? এই বোধোদয় আমাদের কবে হবে? আর তাই বঙ্গবন্ধু কন্যা যথারীতি একাত্তরের ঘাতক পুনর্বাসনকারী রাজনৈতিক দল বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উদ্দেশ্যে নির্ভীক কন্ঠে বারবার বলে যেতে হয়, ‘‘যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে আবার স্মৃতিসৌধে যান তিনি! এ তো লোক দেখানো এবং মানুষের চোখে ধুলি দেয়ার চেষ্টা মাত্র।” যে মুক্তিযোদ্ধারা এই যুদ্ধাপরাধী দলের সাথে স্মৃতিসৌধে যায়,তাদেরও এ বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত বললেন প্রধানমন্ত্রী। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, যুদ্ধাপরাধী ঘাতকদের পুনর্বাসনকারীদের সাথে বসবাস করে নিজেকে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করা চরম মিথ্যাচার ছাড়া আর কী হতে পারে।

প্রথাবিরোধী বহুমাত্রিক লেখক ড. হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা আমৃত্যু মুক্তিযোদ্ধা না ও থাকতে পারেন, রাজাকার আমৃত্যু রাজাকার।’ গত পয়লা নভেম্বরে ‘পাকিস্তানী সাপের বাচ্চারা কিলবিল করছে’ শিরোনামে জাহিদ নেওয়াজ খানের কলামের একটি অংশ এখানে তুলে ধরা জরুরী। “খালেদা জিয়া তার রাজনৈতিক স্বার্থে আর জামায়াত তার যুদ্ধাপরাধী নেতাদের বাঁচানোর লক্ষ্যে হেফাজতকে মাঠে নামালেও সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, আর কোনো গণজাগরণ যাতে না ঘটে সেজন্য আওয়ামী লীগ সরকারও তলে তলে হেফাজতকে উস্কানি দিয়েছে।

সরকারের পক্ষে হেফাজতকে জমি-জিরেত এবং অন্য সুবিধা দেয়ার কথা বাদ দিলেও তাদের তাণ্ডবের বিচার না হওয়া এর এক বড় প্রমাণ। এভাবে হেফাজত নামের সাপটিকে দুধকলা দিয়ে পোষ মানিয়ে আর বাংলাদেশে সব ধরণের জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বটবৃক্ষ যে জামায়াত, তার নেতাদের ন্যায়সঙ্গতভাবে বিচারের মুখোমুখি করে সরকার আপাতঃ দৃষ্টিতে বড় বড় সাপগুলোকে ঝাপিতে পুরে ফেলতে পারলেও তাদের বাচ্চা আর জ্ঞাতি গোষ্ঠি কখনো আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামে, কখনো আনসার আল ইসলাম পরিচয়ে, কখনো আইএস বা আল কায়েদার উপমহাদেশীয় শাখার নাম উল্লেখ করে ঠিকই বিষের ছোবল অব্যাহত রেখেছে।”

আর এই বাস্তবতা উপলব্ধি করলে অপশক্তি ঠেকানো খুব কঠিন নয়। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের বক্তব্যে বঙ্গকন্যা হুংকার দিলেন, আগামীতে আর সেই চেষ্টা করতে পারবে না। তাদের বিষদাঁত একে একে ভেঙ্গে দিচ্ছি, ভেঙ্গে দেবো!” একেই বলে বাপকা বেটি! স্যালুট মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! ঠিক এই প্রত্যয়ে বারবার জেগে উঠি দৃপ্ত শপথে।

আজকের বিশ্বে ইতিমধ্যেই প্রমাণিত সত্য, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত কাজ একের পর এক শেষ করে বিশ্বসভায় বাংলাদেশ অনুকরণীয় এবং অনুসরনীয় রাষ্ট্রের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন সফল রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের সহ-সভাপতি কৌশিক বসু বলে গেছেন, বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে চীনের সমপর্যায়ের। পাকিস্তান পরিত্যাজ্য করার সাহসী ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পাকিস্তানের ধৃষ্টতা দিনে দিনে কতোটা বাড়ছে, তা দৃশ্যমান। ব্যর্থ রাষ্ট্র পাকিস্তান জনগণকে একাত্তরে বাঙ্গালী নিধনের মতো করেই নিজেদের দেশে বালুচিস্তানের নিরীহ মানুষ নিধন যজ্ঞে মেতেছে। বালুচ ভাষার বদলে উর্দু ভাষা বলতে বাধ্য করছে তাদের। তুমুল আন্দোলন চলছে বালুচ জনগণের। এই পরিস্থিতিতেও পাকি গোয়েন্দা সংস্থা এখনো বাংলাদেশকে তাদের মতো ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। তার প্রমাণ ঢাকায় পাকিস্তান দূতাবাসের কর্মকর্তা ফারিনা আরশাদ সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ। গত ২৮ নভেম্বর রাজধানীর উত্তরা ও খিলগাঁও থেকে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) চার সদস্যকে গ্রেফতার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

এদের একজন পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইএ’র চর ইদ্রিস শেখ। পাকিস্তানের পাসপোর্টধারী পাকি –বাংলা জঙ্গী ইদ্রিস শেখের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে জানা যায়, জেএমবিকে নিয়মিত টাকা দিতেন পাকি দূতাবাসের কর্মকর্তা ফারিনা আরশাদ। জঙ্গী ইদ্রিস আদালতে জানিয়েছে, ২০০২ সালে সে করাচির রাজনৈতিক দল পাক-মুসলিম অ্যালায়েন্সের প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়।

২০০৭ সালে স্থায়ীভাবে ঢাকায় এসে প্রথমে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করে। ২০১২ সালের পর এয়ার টিকিটিং ও ভিসা প্রসেসিংয়ের ব্যবসা করতে গিয়ে বাবুল এবং পরবর্তীতে তার মাধ্যমেই কামাল নামে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আ্ইএসআই’র এজেন্টের সাথে পরিচয় হয়। ঘনঘন টিকিট করিয়ে দেয়ার কারণে বাবুলের কাছে তার অনেক টাকা বাকি পড়ে।

একপর্যায়ে বাবুল পাকিস্তানে চলে যায়। সেখানে গিয়ে সে ফারিনা আরশাদের মোবাইল নাম্বার দেয়। ইদ্রিসের স্বীকারোক্তি থেকে প্রকাশ, নিয়মিত জামায়াতকে অর্থায়ন করার পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াত নিষিদ্ধ হবার পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মানুষকে বিপন্ন করার জন্যে আরো কয়েকটি জঙ্গী সংগঠন তৈরি জরুরী হয়ে যায় পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থা ‘আইএসআই’ এর জন্যে। তারই অংশ হিসেবে জেএমবিকে বেছে নেয় তারা। এরই অংশ জেএমবি’র পাঁচ জনের দল গঠন করে সৃষ্টিশীল মুক্তচিন্তার অধিকারী, ধর্ম যাজক, বিদেশী সমাজহিতৈষী, সুফি বাদী ব্যক্তি, শিয়া মসজিদ এবং মন্দিরে একের পর এক হত্যাকাণ্ড এবং বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা এবং সাংস্কৃতিক উৎসবে হামলা চালিয়ে আসছে।

এ্ই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে জাল মুদ্রার ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। পাকিস্তান থেকেই বিমানে করে আনা হচ্ছে জাল ভারতীয় রুপি। পাকিস্তানি এয়ার লাইনসের বিমানে করে বাংলাদেশে সেই জাল মুদ্রা আনে। জাল মুদ্রা নিয়ন্ত্রন করার জন্যে বাংলাদেশ শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর নিরাপত্তা বাড়িয়ে দেয়। এ কারণে কিছুদিন পাকিস্তানি বিমান চলাচল বন্ধ ছিল। পরে আবার চালু হয়। বাংলাদেশ শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বিষয়টি সাংবাদিকদের কাছে নিশ্চিত করেন।

আকর্ষণীয় পাকি কর্মকর্তা ফারিনা আরশাদের সাথে মদ এবং নারীর লোভে লালায়িত দেশের শীর্ষ আমলা, শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব্বে নিয়োজিত অনেকে অনৈতিক ঘনিষ্ঠতায় জড়িয়েছেন এমন প্রমাণও পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এরই মধ্যে ফারিনা আরশাদের ভয়ঙ্কর কর্মকাণ্ডসহ অন্যান্য অপরাধ বিষয়ে ঢাকা মহানগর হাকিম আবদুল্লাহ আল মাসুদের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন জঙ্গী ইদ্রিস শেখ।

গোয়েন্দা সূত্র মতে, শুধু সরকার পতনের ভয়াবহ জঙ্গী নাশকতাই নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মুদ্রাবাজার ধ্বংস করে দেয়ার ষড়যন্ত্র করেছে আইএসআই। যা কার্যকর করতে গুটি হিসেবে ব্যবহার হয়েছে পাকি নারী কূটনীতিক। এর আগে জঙ্গী ও জাল মুদ্রার ব্যবসার অভিযোগ এনে ২০১৪ সালে পাকিস্তান দূতাবাসের ভিসা কর্মকর্তা মাযহার খানকে বহিষ্কারের দাবি জানানো হয়। অভিযোগের পর তড়িঘড়ি করে তাকে প্রত্যাহার করে নেয় পাকিস্তান। এরপর জঙ্গী ও জাল মুদ্রার ব্যবসাসহ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার এবং জনগণকে ধ্বংসের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় ফারিনাকে।

ইদ্রিস দাবি করে, বাবুলের মাধ্যমেই মূলত তার ফারিনার সঙ্গে পরিচয়। আইএসআই এর ষড়যন্ত্রে যুক্ত হবার কিছু দিন পরই ঢাকা বিমানবন্দরে জাল ভারতীয় রুপিসহ ধরা পড়েছিলো ইদ্রিস। পরবর্তীতে প্রভাবশালী ব্যক্তির মাধ্যমে জামিন পেয়ে যায় ইদ্রিস এবং বাবুলের মাধ্যমে পাকি দূতাবাসে ফারিনা আরশাদের কাজে সম্পৃক্ত হয়।

ইদ্রিসের দাবি, সে প্রথমে পাকিস্তানের এক স্কুল শিক্ষক শাহনাজ বেগমকে বিয়ে করেছিল। ওই ঘরে মোহাম্মদ আদিল নামের এক ছেলে রয়েছে। পরে ২০০০ সালে দেশে ফিরে সে পাশের গ্রামের মনোয়ারা বেগমকে বিয়ে করে। ইদ্রিসের বাড়ি বাগেরহাটের চিতলমারিতে। এই সংসারে তার এক ছেলে দুই মেয়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব ঘটনার নেপথ্যে আইএসআই নিয়োজিত পাকি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের নাম আদালতে নথিভুক্ত হচ্ছে পাকিজঙ্গীদের স্বীকারোক্তিতেই। এতে আবারো প্রমাণিত হলো পাকি দূতাবাসের কর্মকর্তারা বাংলাদেশে বসেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একের পর এক নাশকতার কর্মকাণ্ডে অর্থ যোগান দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর অবৈতনিক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় সম্প্রতি বলেছেন, এদেশে জঙ্গীবাদের কোন ঠাঁই হবে না। প্রথম বারের মতো রাষ্ট্রের কোন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বললেন, এদেশে নাস্তিকদের ও স্বাধীন মত প্রকাশ এবং স্বাধীনভাবে বাঁচবার অধিকার রয়েছে। কাউকে হত্যা করার কোন অধিকার জঙ্গীদের দেয়নি কেউ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর তৃতীয় প্রজন্ম, এর কাছে এমন বক্তব্যই প্রত্যাশিত। একই সাথে রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জগদ্দল পাথরের মতো গেড়ে বসা রাজাকার আলবদরের বশংবদদের নির্মূলের সময় এসেছে। তবে প্রশ্ন জাগে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির বিবাদ-বিচ্ছিন্নতার মেঘ কাটবে কি কখনো? সত্যিকার অর্থে একের পর এক ষড়যন্ত্র্র প্রমাণিত হবার পরও এদেশে পাকি দূতাবাসের কার্যক্রম সক্রিয় রাখার প্রয়োজন রয়েছে কি?

দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এ দেশের সফল রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী এবং তার পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র সুগভীর ষড়যন্ত্র ঠেকানো জরুরী। আর তা করতে হলে পাকি দূতাবাসের কার্যক্রম বন্ধ করা জরুরী। প্রাণের চেয়ে প্রিয় এই মাতৃভূমি সুরক্ষা এবং পরবর্তী প্রজন্মকে নিরাপদ রাখার প্রয়েোজনে দৃঢ়পণে এই মেঘ কাটিয়ে পাকিস্তানি সাপের বাচ্চাদের নির্মূলে একাত্ম হতে হবে সকলকে।

(১৫ নভেম্বর , ২০১৫ চ্যানেল আই অনলাইনে প্রকাশিত )

Saturday, January 13, 2018

পাপের ও বাপ থাকে প্রমাণ করলো ওয়ান-ইলেভেন- সুমি খান

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারী ঘুম ভেঙ্গে খালেদা জিয়া  স্তম্ভিত হয়েছিলেন তার সহযোগী অপশক্তি পাকিস্তানী গোষ্ঠীর দোসরদের মদতে  সন্ত্রাস ধর্ষণ , নির‌্যাতন,বোমা হামলায় ধ্বংসগামী রাষ্ট্র  বাংলাদেশকে থমকে দাঁড়াতে দেখেছিলেন। ১১ বছরে অনেকটা এগিয়েছে বাংলাদেশ ।জ্বালানি ,বিদ্যুত, কৃষি,নারী উন্নয়ন এবং শিক্ষা  প্রতিটি খাতে  অগ্রগতি চমকে দিয়েছে সারা বিশ্বকে ।

তবে হঠকারী রাজনীতি থেমে নেই ।ক্ষমতাসীন দল ঘিরে যথারীতি অন্ধকারের শক্তির তান্ডবে বিপন্ন শুভশক্তি ।

২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চেয়ে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে খালেদা ফিরেছিলেন কুমিল্লা থেকে। সেখানে থেকে ঢাকায় ফিরেছেন রাত প্রায় ১টা বেজে গেছে । পরদিন বেগম খালেদা জিয়া পরদিন যখন ঘুম থেকে জাগলেন, বঙ্গভবনে তখন সেনা প্রধান মইন ইউ আহমেদসহ অন্যরা। সেদিন সন্ধ্যা নাগাদ রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ  ২২ জানুয়ারীর একপক্ষীয় নির্বাচন বাতিল করে জরুরি অবস্থা জারি করেন।একই সাথে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে রাজি হন ইয়াজউদ্দিন ।গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি পদত্যাগ করার সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন।

পরবর্তীতে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। এর আগের ইতিহাস জানা সবার। নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করতে বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে দিয়েছিল খালেদা-নিজামী সরকার। সাধারণ জনগণ সেটা মেনে না নেয়াতে দেশে এক রক্তক্ষয়ী অবস্থার সৃষ্টি হয়।

অবশেষে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বেই গঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার।  অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ করতে থাকে, বিএনপিকে আবার সরকারে আনার ব্যবস্থা করছেন ইয়াজউদ্দিন। এর পর আবারও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। আন্তর্জাতিক শক্তির চাপে সেনা বাহিনী দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়, বাংলাদেশের জনগণ মুখোমুখি হয় ওয়ান ইলেভেন এর ।সেই মুহূর্তে ‘গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি এড়ানো গেছে বলে জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

মাইনাস -টু ফর্মুলা অনুযায়ী সেনা সমর্থিত  তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনীতি থেকে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াকে ‘মাইনাস’ করার চেষ্টা করে। জনচাপে সেটা সফল না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে এবং পরে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ‘আলোচিত-সমালোচিত’ নির্বাচন করে ৯ বছর ধরে ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে , ২০০৬ সালে  জামাত -বিএনপি যদি ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য লোভ না করতো অার প্রকৃতই একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতো, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস অন্যরকমও হতে পারতো।

মূলতঃ এক/এগারোর মাধ্যমে জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে নিয়ে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির সাজানো নির্বাচনে ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে ধরে রাখার লোভ বিএনপি করেছিল, পন্ড হয়ে গেল সেই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ।

Saturday, January 6, 2018

অভ্র’ যেভাবে করলেন ডাক্তার মেহদি হাসান খান



অভ্র। আভিধানিক অর্থ ‘আকাশ’। অভিধান ঘেটেঁ এই নামটি বের করেছিলো একজন ১৮ বছরের তরুণ, তার স্বপ্নের নাম দিতে। এটি হবে বিনামূল্যের সফটওয়্যার,যেখানে সবাই স্বাধীনভাবে ব্যবহার করবে, এসব চিন্তা করে এই নামটাই তার সবচাইতে মনে ধরেছিলো।

হালকা পাতলা ধরনের একটি ছেলে। চোখে চারকোনা মোটা ফ্রেমের চশমা, আর মাথা ভর্তি চুল। যা দিয়ে নিমিষেই আলদা করা যায় তাকে। কোন একটি জায়গায় চুপ করে দাঁড়াচ্ছে না, হেঁটে যাচ্ছে, হেঁটেই যাচ্ছে; কথা বললে হাত পেছনে নিয়ে শুনছে, তাকাচ্ছে এদিক ওদিক। এই তাকানোটাতে আবার কোন লুকোছাপা নেই। পূর্ণ দৃষ্টি। ক্যাম্পাসে ভয়ডরহীন আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হাসি।

সহজ ভাষায় এই হচ্ছে মেহদী। মেহদী হাসান খান। অভ্রের জনক।

অভ্র শুরুর গল্প-
অভ্রের প্রথম ভার্সনে এর কিবোর্ড লে আউটের নাম ছিলো ’ইউনিবিজয়’। এর কারন হলো, ইউনিকোড ভিত্তিক ’ইউনিবাংলা’ ফন্ট এবং বিজয় কি বোর্ডের ইউনিকোড সংস্করণ ছিলো অভ্রের প্রাথমিক ধারনাতে। যদিও ঠিক পরের সংস্করণেই মেহদী সেটার নাম বদলে রাখেন ’অভ্র’।

অভ্রের শুরু ২০০৩ সালে। মেহদী হাসান খান তখন নটরডেম কলেজের ছাত্র। ক্লাস নাইন থেকেই তার প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি নেশা। নিজে নিজেই বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রোগ্রামিংয়ের উপর বই পত্র জোগাড় করে নিজেই একাডেমিক পড়াশোনার ফাকেঁ ফাকেঁ প্রোগ্রামিং নিয়ে পড়াশোনা ও চর্চা চালিয়ে যেতেন সে সময়। ২০০৩ সালের একুশে বইমেলায় বায়োস (Bangla Innovation Through Open Source) নামের একটা বাংলাদেশী সংগঠন থেকে কিছু ছেলেমেয়ে পুরোপুরি বাংলায় লোকালাইজ করা একটা লিনাক্স ডিস্ট্রো নিয়ে এসেছিলো। নাম ‘বাংলা লিনাক্স’। মানে সেখানে শুধু বাংলাতে লেখাই যায় না, সেই সাথে সব উইন্ডোর টাইটেল, মেনু, ফাইলের নামকরণ সব ছিলো বাংলায়।

কম্পিউটারে তখন বাংলা বলতে ’বিজয়’ আর ‘প্রবর্তন’। খুব দরকার পড়লে সেগুলো দিয়ে শুধূ বাংলায় টাইপ করা যায়। কিন্তু পুরো অপারেটিং সিস্টেম বাংলায়, এর আগে এমনটা আর কখনো দেখা যায়নি। এমনকি ’বায়োস’ বইমেলা উপলক্ষ্যে নিজেদের যে সাইট বানিয়েছিলো, সেটাও বাংলায়! এইসব দেখে কিশোর মেহদী মুগ্ধতায় অভিভূত ও বিস্মিত হয়ে যায়।

বায়োস একটা নতুন ফন্টও বানিয়েছিলো সেই ডিস্ট্রোর জন্য। নাম ’ইউনিবাংলা’। সেখান থেকেই ইউনিকোড নিয়ে মেহদীর জানা শোনার সূত্রপাত। মেহেদী তখন উইন্ডোজ ব্যবহার করতো, তাই সঙ্গত কারনেই সেই বাংলা লিনাক্স তার কোন কাজে আসলো না। কিন্তু সে ঐ ফন্টটি নিয়ে পড়ে থাকলো। ফন্টটি ইন্সটল করার পর সে খেয়াল করলো, মাইক্রোসফট ওয়ার্ড এ ইনসার্ট কি ব্যবহার করে খুব সহজেই যুক্তাক্ষর বানানো যাচ্ছে। মানে, তখন যেমন বাংলা যুক্তাক্ষর বানানোর জন্য বিশেষায়িত সফটওয়্যার আর ফন্ট উভয়ই লাগতো, তেমনটা আর লাগছে না, তার বদলে শুধুমাত্র ফন্ট দিয়েই যুক্তাক্ষর বানানো যাচ্ছে।

কিন্তু ইনসার্ট ক্যারেক্টার ব্যবহার করে একটা একটা করে অক্ষর টাইপ করা অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ ও বিরক্তিকর কাজ, তাই মেহদীর মনে হলো, এখন জাষ্ট একটা কি বোর্ড ইনপুট মেথড হলে এই ফন্ট দিয়েই দিব্যি বাংলা টাইপিংয়ের কাজ চালিয়ে নেওয়া যাবে।

সে ভাবলো এটা হয়তো কেউ না কেউ ইতিমধ্যেই বানিয়ে রেখেছে। তাই সেটা খোজাঁর আশায় সে পুরো ইন্টারনেট চষে বেড়ালো। কিন্তু মেহদী অবাক হয়ে খেয়াল করলো, উইন্ডোজে কাজ করে এমন কোন ইউনিকোডভিত্তিক কিবোর্ড লে আউট কোথাও নেই। সে বুঝলো, এই জিনিসটা এখন পর্যন্ত কেউ বানায় নি। সুতরাং, তার যদি একান্তই এটার প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটা তাকে নিজের হাতে বানিয়ে প্রয়োজন মেটাতে হবে।

যেই ভাবা সেই কাজ। ততদিনে সে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। মেডিকেলের প্রচন্ড পড়াশোনার চাপ মাথায় নিয়ে সে তার হোষ্টেলের রূমে বসে দরজা বন্ধ করে ঐ ইউনিকোড ভিত্তিক কিবোর্ড বানানোর কাজে লেগে পড়লো। রাত দিন খেটে সে মুটামুটি কাজ চালানোর মতো একটা প্রোটোটাইপ দাঁড় করিয়ে ফেল্ল। এটা করতে গিয়ে তার চোখের নীচে কালি পড়ে গেলো, ক রাত ঘুমায় না কে জানে? যে ছেলে রেগুলার মেডিসিন ক্লাবে আসতো, মেডিসিন ক্লাবের প্রত্যেকটা কাজে সরব, উপস্থিতিও সেরকম প্রানোচ্ছল, হঠাৎ করে সে ছেলেটা হয়ে গেলো চুপচাপ। মাথা নিচু করে হাঁটছে, জিজ্ঞাসা করলে কথা বলছে। মেহদীর চরিত্রের সাথে যায় না।

কিছুদিনের মধ্যে ক্যাম্পাসে জানাজানি হয়ে গেলো, মেহদী কম্পিউটারে বাংলা লেখার জন্য নিজস্ব একটা সফটওয়্যার বানাচ্ছে। তো এরপর দেখা হলে মেডিক্যালের সিনিয়র ভাইরা জিগেস করতো - ’কত করে নিবি?’

মেহদী অবাক হয়ে উত্তর দিতো -’ মানে?  কিসের কত করে নিবো?’

- আরে তোর সফটওয়্যারের দাম কত করে রাখবি?

- দাম রাখবো কেন? ওটা তো ফ্রি। কোন টাকা পয়সা দিতে হবে না।

- বলিস কি!

- হ্যাঁ। ভাষার জন্য টাকা নেবো কেন?

মেহদীর কথা শুনে তাদের আক্কেলগুড়ুম হয়ে যেতো। ১৯ বছরের একটা ছেলে বলছে এই কথা!

মেহদী যেহেতু উইন্ডোজ ওএসের জন্য এ্যাপ্লিকেশন বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, সেহেতু তাকে স্বভাবতই মাইক্রোসফটের ডটনেট ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করতে হলো। পরে ভারতের একটা বাংলা ফন্ট প্রতিযোগীতায় ইমেইল করে নিজের বানানো প্রোটোটাইপটা পাঠানোর পর তারা জানালো, ’এইটা তো ঘন ঘন ক্র্যাশ করছে’। তারপর আবার রাতের পর রাত জেগে সেই প্রোটোটাইপের বাগ সারানো। তার আগে ডটনেট বাদ দিয়ে ক্লাসিক ভিজুয়াল বেসিকে সবগুলো কোড নতুন করে আবার লেখলেন মেহদী। (যদিও পরবর্তীতে আবারো একেবারে নতুন করে কোড লেখা হয় Delphi/Object Pascal এ। বর্তমানে অভ্র এই ফ্রেমওয়ার্কেই আছে।)  ক্র্যাশের ঝামেলা কমলো। তারপর সে মনোযোগ দিলো অভ্রর অফিসিয়াল সাইটটা বানানোয়। মেহদী তার সাইটে ফোরাম সেটাপ করলো, এটা অভ্রর জীবনে একটা গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ছিলো। ফোরামে অভ্র’র ইউজাররা ফিডব্যাক দিতো, বাগ রিপোর্ট করতো, প্রশ্নত্তোর চলতো।

মেহেদী ততদিনে অভ্রকে বেশ সিরিয়াসভাবে নেওয়া শুরু করেছেন। কিন্তু কলেজে পড়ুয়া একটা ছেলে শখের বশে ঘরে বসে একটা সফটওয়্যার বানিয়েছে, এই কথা জানলে স্বভাবতই কেউ অভ্রকে পাত্তা দিতে চাইবে না। তাই তিনি যথাসম্ভব চেষ্টা করলেন তার কাজে পেশাদারিত্বের ছোঁয়া রাখার। তিনি নিয়মিত রিলিজ লগ লিখতেন, নিয়মমতো ভার্সন নাম্বার বাড়াতেন, বিশাল বিশাল সব ইউজার ম্যানুয়াল লিখতেন, যাতে করে যে কেউ প্রথম দেখায় ভাবে যে এটা একটা পেশাদার সফটওয়্যার ডেভেলপার টিমের কাজ। কোন একক মানুষের শখের বশে অবসরে বানানো কোন হেলাফেলার জিনিস নয়।

মেহেদীর উদ্দেশ্য সফল হলো পুরোপুরি। তারঁ নিজের মুখ থেকেই শোনা যাক - “আমাকে যারা চিনতো না, তাদের অনেকের ধারনা ছিলো, দেশের বাইরে থেকে প্রফেশনাল সফটওয়্যার ডেভেলপারের একটা গ্রুপ এই প্রজেক্টটা চালায়। এখন ফ্রি দিচ্ছে মার্কেটিংয়ের জন্য। পরে পয়সা নিবে। দেশ নিয়ে আমাদের এই ধরনের অবজ্ঞা কেন, আমি জানি না। যেন দেশে ভালো কিছু হতে পারে না। তাছাড়া, শখের প্রজেক্টেই বা কি সমস্যা?”

মেহদী তার ব্রেইনচাইল্ড অভ্রের পেছনে রীতিমতো পাগলের মতো লেগে রইলেন আর একে আরো নিখুতঁ করার জন্য ক্রমাগত শ্রম দিতে লাগলেন। যখনি মনে হয়, কাজ প্রায় শেষ, তখনি হঠাৎ নতুন নতুন আইডিয়া আসে, আর তিনি সাথে সাথেই নাওয়া খাওয়া ভুলে সেটা নিয়ে কাজে নেমে যান।

এমনও হয়েছে, রাতে ঘুমানোর জন্য বিছানায় যাবার পর বাতি নিভিয়ে শোবার কিছুক্ষন পরেই মনে হয়েছে, কোন একটা ডায়লোগ বক্সের বাটন গুলোর ডিভাইডারের দাগগুলো পেশাদার সফটওয়্যার কোম্পানি যেভাবে দেয়, সে সেভাবে দেয়নি। তখনি বাতি জ্বালিয়ে বিছানা থেকে উঠে আবার কম্পিউটার ছেড়ে সেই ডায়লোগবক্সের বাটনের ডিভাইডার নিয়ে কাজ করেছে। সেটা করার সময় আরো অনেক বাগ ধরা পড়লো, কিংবা নতুন আইডিয়া আসলো, দেখা গেলো কাজ শেষ করে তিনি যখন আবার বিছানায় গেছেন, ততক্ষনে সকাল হয়ে গেছে।

অভ্র নিয়ে রাত দিন পড়ে থাকার কারনে মেহদীর মেডিকেলের পড়া শিকেয় উঠলো। এই দেখে সেখানকার তাবৎ বিজ্ঞ শিক্ষকেরা ঘোষণা দিয়ে জানিয়ে দিলেন, এ ছেলে মেডিকেলের অনুপযোগী। বিজ্ঞ শিক্ষকেরা বলে দিলেন, সময় থাকতে মেডিকেল ছেড়ে দিতে। মেডিকেলের অসহ্য, দমবন্ধ করা পৃথিবী মেহদীকে চেপে ধরছিলো আষ্টেপৃষ্ঠে, মরে যাওয়ার কথা ছিলো ছেলেটার। একদিকে নতুন আইডিয়া, তার স্বপ্ন, আরেকদিকে মেডিকেল। অসম্ভব অস্থিরতা। তবু শত্রুর মুখে ছাই আর সবাইকে অবাক করে দিয়ে দিন শেষে সে ঠিকঠাকভাবেই মেডিকেলের পাট চুকাতে পেরেছিলো। তিন সাফল্যের সাথেই এমবিবিএস পাশ করে বের হন।

সে সময়ের জনপ্রিয় প্রযুক্তি বিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন “কম্পিউটার টুমোরো” একদিন ফিচার প্রতিবেদন করলো মেহদীর অভ্রকে নিয়ে। শুধু তাই না, সেই ম্যাগাজিনের সাথে অভ্রের সিডির একটা করে কপি ফ্রি দেয়া হয়েছিলো। “সে মাসে নিউ মার্কেটের দোকানে দোকানে সিডিসহ ম্যাগাজিন, কি যে দারুন অনুভূতি! ইচ্ছে করছিলো রাস্তার সবাইকে ডেকে ডেকে দেখাই!” - এভাবেই সে সময়কার অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন মেহেদী।

ওমিক্রন ল্যাবের নামকরণঃ

প্রথম দিকে অভ্রর সাইটের নাম ছিলো ওমিক্রন ল্যাব। যেটা মেহদীর মাথায় এসেছিলো মূলতঃ মুহম্মদ জাফর ইকবালের বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস “ওমিক্রনিক রূপান্তর” থেকে। লেজের সঙ্গে ’ল্যাব’ শব্দটা যুক্ত হয়েছিলো একটা ভারিক্কি-সিরিয়াস ভাব আনার জন্য, এ কথা মেহদী নিজেই বলেছেন।

প্রথম ওয়েব সাইট ডোমেইনটা কেনা হয় এক প্রবাসী মামাকে অনুরোধ করে। মামা দেশে এসে বিয়ে করেছিলেন, সেই বিয়ের ছবি তুলে দেবার দায়িত্ব ছিলো মেহদীর ঘাড়ে। ওমিক্রন ল্যাব নামে যে সাইটটা বানানো হয়, সেটাতে সেই ছবিগুলোও আপলোড করে দেয়া হয় মামাকে খুশী করতে। তার একটু নীচে স্রেফ লেখা ছিলো ‘তুমি যদি এই সাইটে ইউনিবিজয়ের জন্য এসে থাকো, তবে এখানে ক্লিক করো।” ব্যস, আর কিছু লেখা ছিলো না। অবশ্য মামার বিয়ের ছবিওয়ালা ঐ সাইটটা অনলাইনে খুব বেশীদিন ছিলো না।

যেভাবে অভ্র টিম গঠিত হলোঃ

অভ্রের সাইটের সেই ফোরামটা অভ্র টিম গঠনে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছিলো। কারন সেই ফোরামের মাধ্যমেই অভ্র টিমের বাকী সবার সাথে প্রথম পরিচয় হয়েছিলো। প্রথমে ওমরের সাথে। এলিফ্যান্ট রোডে উনার একটা সফটওয়্যার বিক্রির দোকান ছিলো, নাম ‘বাঙ্গালিয়ানা’, নিভৃতচারী ও প্রচন্ডরকমের প্রচারবিমুখ মেহদী হাসান তখন সমমনা আর কাউকে চিনতেন না সে সময়, তাই ওমর ভাইর দোকানে গিয়ে প্রায়ই আড্ডা চলতো। মূলতঃ সেখান থেকেই টিমের সূত্রপাত।

বাঙ্গালিয়ানায় আড্ডা দিতে গিয়ে এরপর পরিচয় হলো রিফাতের (রিফাত-উন-নবী) সঙ্গে, যে রিফাত অভ্রের ম্যাক ভার্সন বানিয়েছে। সিয়াম (তানবিন ইসলাম সিয়াম) আর শাবাব (শাবাব মুস্তফা) এর সাথে পরিচয় অভ্রের ফোরামের মাধ্যমে। সিয়াম অভ্র টিমে ঢুকেই বানিয়ে ফেল্ল ’কাল পুরুষ’ আর ‘সিয়াম রূপালি’ নামে দুটো ফন্ট। এ দুটো ফন্ট শুধুমাত্র অভ্রের জন্যই বানানো হয়েছিলো। ভারত থেকে একটা ছেলে এসেছিলো ফোরামে, নাম নিপন। ফোরামের অন্যতম মডারেটর হয়ে যায় সে। অনেক পরে সারিম যোগ দেয় টিমে। সে অভ্রের বর্তমান ওয়েব সাইট আর অভ্রের লিনাক্স ভার্সন বানায়। এমনকি মেহদীর স্ত্রী সুমাইয়া নাজমুনও প্রায় দেড় লাখ শব্দ সম্পাদনা করেছিলেন অভ্রর ডিকশনারীর জন্য।

২০০৭ সালে 'অভ্র কীবোর্ড পোর্টেবল এডিশন' বিনামূল্যে ব্যবহারের জন্যে উন্মুক্ত করা হয়। অভ্রের সোর্স কোড উন্মুক্ত, অর্থাৎ যে কেউ চাইলেই গিটহাব রিপোজেটরি থেকে এর উন্নয়নে অংশগ্রহন করতে পারবেন। উল্লেখ্য, ভার্সন ৫ এর পর থেকে অভ্রকে ফ্রিওয়্যার থেকে ওপেনসোর্সে রূপান্তর করা হয়। এবং এটি ’মজিলা পাবলিক লাইসেন্স’এর অধীনে লাইসেন্সকৃত।

অভ্রের স্বীকৃতিঃ

১) মাইক্রসফটের অনলাইন সংগ্রহশালায় ইন্ডিক ভাষাসমূহের সমাধানের তালিকায় অভ্র কী-বোর্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা।

২) জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির কাজে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন অভ্র ব্যবহার করে।

৩) অভ্রকে বাংলা কীবোর্ড রিসোর্স হিসেবে ইউনিকোড সংস্থার ওয়েব সাইটে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

৪) বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস বা বেসিস বাংলা তথ্য প্রযুক্তিতে বিশেষ অবদানের জন্য অভ্রটিমকে-কে ২০১১ 'বিশেষ অবদান পুরষ্কার' (Special Contribution Award) প্রদান করে

এছাড়াও, মেহদী ব্যাক্তিগতভাবে ২০১৬ সালের সেপ্টেস্বরে Top Ten Outstanding Young Persons পুরস্কার লাভ করেন।

পরিবার ও ব্যাক্তিগত জীবনঃ

মেহদী হাসান খান একজন দায়িত্ববান স্বামী এবং একজন স্নেহপরায়ন পিতা। তার ছেলের নাম ’অর্ক হাসান খান’। ব্যক্তিগতভাবে মেহদী অতি নিভৃতচারী, বিনয়ী, অত্যন্ত স্বল্পভাষী ও প্রচারবিমুখ একজন মানুষ। অনেকেই হয়তো জানেন না, মেহদী একজন অসাধারন চিত্রগ্রাহক। তার ফটোগ্রাফির হাত দুর্দান্ত রকমের ভালো। ফ্লিকরে তার একটি একাউন্ট রয়েছে, যদিও সম্প্রতী তিনি তার সকল ছবি ব্যক্তিগত এক কারণে লোকচক্ষুর আড়াল করে রেখেছেন।

মেডিক্যাল কলেজ থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে পাশ করে বের হলেও তিনি নামের আগে কখনো ডাঃ বসাননি। কারন তিনি পেশায় একজন প্রোগ্রামার, বর্তমানে আছেন ’ব্যাকপ্যাকে।’ প্রোগ্রামিং তার নেশা, অবসেশন। তিনি জাভাস্ক্রিপ্ট কোড লেখায় বিশেষভাবে দক্ষ। শেষ করছি, প্রোগ্রামিং আর মানব কল্যান নিয়ে তারঁ নিজের চমৎকার কিছু কথা দিয়ে।

”ক্লাস নাইনে ওঠার পর বইপত্র যোগাড় করে প্রোগ্রামিংটা শেখার পর আর অন্যদিকে তাকানো হয়নি, এখনো লেগে আছি। কম্পিউটার আর ইন্টারনেট থাকলে আমার আর কিছুর দরকার হয় না। দিনশেষে মনে হয়, প্রোগ্রামিংটা বেশ ইন্টারেস্টিং, অনেকটা সুপার পাওয়ারের মতো। তবে তার চাইতেও অনেক বেশী ইন্টারেস্টিং হলো, সেই সুপার পাওয়ার দিয়ে মানুষের কাজে লাগে এমন কিছু বানাতে পারা। যারা সেই মজা পেয়েছেন ও ভবিৎষতে পাবেন, তাদের জন্য আমার ভালোবাসা রইলো।”
একুশে পদকের দাবী-
অভ্রের জন্য একুশে পদকের দাবী জানানো হচ্ছে বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই। এই দাবীর শুরুটা হয়েছিলো বাংলা ব্লগে। এমনকি প্রতি বছরই ফেসবুক ও কমিউনিটি ব্লগগুলোতে অসংখ্য পোষ্ট আসে অভ্রকে একুশে পদক দেবার দাবী জানিয়ে। এবং এই দাবীটা অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত।

কারণ, বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা বাংলা লেখার জন্য যতগুলো কি বোর্ড লে আউট ব্যবহার করে, তার ভেতর সবচাইতে জনপ্রিয় এবং সবচাইতে বহুল ব্যবহৃত কি বোর্ড হচ্ছে অভ্রের ফনেটিক কি বোর্ড। এর জনপ্রিয়তার মূল কারন হলো, অন্যান্য প্রচলিত বাংলা লে আউটের মতো এটার লে আউট মুখস্ত করতে হয় না। ইংরেজী অক্ষর চেপেই বাংলা অক্ষর টাইপ করা যায়। যেমনঃ Ami bhat khai টাইপ করলে লেখা হবে 'আমি ভাত খাই।’ সুতরাং, অভ্রের মাধ্যমে যে কেউ যে কোন সময়েই দুয়েক মিনিটের চর্চাতেই বাংলা টাইপিংয়ে দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন। অভ্র ছাড়া এত সহজে আর এত অল্প সময়ে এত নিখুঁতভাবে বাংলা লেখা হয়তো কোনভাবেই সম্ভবপর হয়ে উঠতো না। অভ্র দিয়ে অনলাইন কিংবা অফলাইন, উভয় জাগাতেই সমান দক্ষতায় বাংলা টাইপিং সম্ভব। আরেকটি বড় দিক হচ্ছে, এটা একেবারেই বিনামূল্যে পাওয়া যায়। কোন টাকা পয়সা খরচ করতে হয় না।

মেহদী ক্রমাগত বছরের পর বছর ধরে শ্রম আর অধ্যবসায় দিয়ে অভ্রকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। সে এই পৃথিবীকে যেটা দিয়েছে, তা হচ্ছে মুক্তি, স্বাধীনতা। বাংলা লেখার স্বাধীনতা।

তাই মেহদীর অভ্র -এর স্লোগান,"ভাষা হোক উন্মুক্ত"।

উন্মুক্ত এই সফটওয়্যার বাঁচিয়েছে সরকারের কোটি কোটি টাকা। সরকারী দপ্তরগুলোতে অভ্র ব্যবহার হয়। নির্বাচন কমিশন ব্যবহার করে আমার আপনার পরিচয়পত্র বানাচ্ছে,পাসপোর্ট বানাচ্ছে,সরকারী ফাইলে হচ্ছে লেখা। সবকিছুর মূলে ছিলো মেহদীর সেই এক রুমের পৃথিবী, একটা ছোট্ট কম্পিউটার আর পর্বতসম স্বপ্ন। এবং তার স্বপ্নকে সে বিনামূল্যে ছড়িয়ে দিয়েছে পৃথিবীময় সমস্ত বাংলাদেশীর কাছে।

অভ্র আমাকে বাংলায় লেখার স্বাধীনতা দিয়েছে। খুব সম্ভবত আপনাকেও। এই স্বাধীনতা দেয়ার জন্য মেহদী কিংবা অভ্রের কিছু প্রাপ্য। প্রাপ্য সরকারের কাছেও। তীব্র প্রচারবিমুখ আর বিনয়ী ছেলেটার স্বপ্নটাকে একটা রাষ্ট্রীয় পুরস্কার কি দেয়া যায়না? একুশে পুরস্কার অভ্র’র করুণা নয়, পাওনা। এবং এই পাওনার দায় আমাদের মাথার উপর ঝুলে আছে গত প্রায় এক দশক ধরে। এখন সময় এসেছে এই পাওনা শোধ করে দায়মুক্ত হবার।

(তথ্যের জন্য কৃতজ্ঞতাঃ নন্দিত.কম,উইকিপিডিয়া, বাংলাদেশ ওয়েব পোর্টাল, মাসিক বিজ্ঞানচিন্তা, বিভিন্ন সময় প্রকাশিত ব্লগ ও সংবাদ কলাম, এবং মেহদীর মেডিক্যাল কলেজের সিনিয়র ভাই ’মানিক চন্দ্র দাস’)

Sunday, December 3, 2017

রোহিঙ্গাদের বুক পেতে গ্রহণ করেছি অথচ হিন্দুদের বুক আগলে রক্ষা করব না?-মুহম্মদ জাফর ইকবাল

১.১২.২০১৭
খবরের কাগজে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ছবি দেখে দেখে এতদিনে আমাদের অভ্যস্ত হয়ে যাবার কথা ছিল। কিন্তু আমার মনে হয় আমরা এখনো অভ্যস্ত হতে পারিনি। সম্ভবত তার প্রধান কারণ হচ্ছে রোহিঙ্গা শিশু।


একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ তার জীবনের সবকিছু পিছনে ফেলে হেঁটে হেঁটে অনিশ্চিত একটা জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেই দৃশ্যটি যথেষ্ট হৃদয় বিদারক। তার চাইতে শতগুণ বেশি হৃদয় বিদারক দৃশ্য একটি অবোধ শিশু যখন তার চারপাশে কী ঘটছে তার কিছুই বুঝতে না পেরে, তার বাবা বা মায়ের পাশে পাশে হেঁটে হেঁটে যায়।


তাদের চোখে এক ধরনের বিস্ময়, এক ধরনের অবিশ্বাস এবং আতঙ্ক। সেই চোখের দৃষ্টি দেখে বিচলিত না হয়ে নিরাসক্ত দৃষ্টিতে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। শিশুগুলো যখন খুব ছোট তখন তারা থাকে তাদের মায়ের কোলে, একটুখানি বড় হয়ে গেলে বাবার কোলে বা কাঁধে। তারা যদি হাঁটতে শিখে তাহলে নিজেরাই বাবা কিংবা মায়ের পাশে পাশে হেঁটে হেঁটে আসে। আরেকটু বড় হয়ে গেলে অবধারিত ভাবে তাদের মাথায় একটা বোঝা থাকে।

এই কিশোর কিংবা কিশোরীর চোখের দৃষ্টি দেখে কেন জানি নিজের ভেতরে এক ধরনের তীব্র অপরাধবোধের জন্ম হয়। এই পৃথিবীতে কত সম্পদ, কত ঐশ্বর্য অথচ এই রোহিঙ্গা শিশুদের জন্যে কিছু নেই। শুধুমাত্র প্রাণটুকু বাঁচিয়ে রাখতেই তাদের পুরো জীবনীশক্তি ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে।

রোহিঙ্গা শিশুদের দেখে প্রথমেই আমার মনে হয় এখন তাদের স্কুলে যাবার কথা কিন্তু সেই কথাটি উচ্চারণ করাই মনে হয় একটা উৎকট রসিকতার মতো মনে হবে। আমাদের ছেলে মেয়েরা এখন পরীক্ষা দিচ্ছে, পরীক্ষা শেষে অনেকেই বাবা মায়ের সঙ্গে বেড়াতে যাবে, আগ্রহ নিয়ে পরীক্ষার ফলাফলের জন্যে অপেক্ষা করবে।

নতুন বছর শুরু হলে তাদের সবার হাতে নতুন বই উঠবে। সেই বই হাতে নিয়ে তাদের মুখে হাসি ফুটে উঠবে। অথচ এই রোহিঙ্গা শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার কিছু নেই। শুধুমাত্র শরণার্থী শিবিরে একটি দিনের পর আরেকটি দিন বেঁচে থাকা।

শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম মহিলা যখন তার মিলিটারী জেনারেলদের নিয়ে রোহিঙ্গাদের হত্যা ধর্ষণ করে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে দেশ ছাড়া করেছিল তখন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষদের নিয়ে তাদের আশ্রয় দিয়েছেন। সারা পৃথিবীর মানুষের সামনে ঘোষণা করেছেন আমরা ষোল কোটি মানুষ যদি খেতে পারি, তাহলে এই দশ লক্ষ লোকও খেতে পারবে। নতুন এবং পুরাতন মিলে প্রায় দশ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী এখন এই দেশের মাটিতে স্থান পেয়েছে, মাথার ওপর একটুখানি আচ্ছাদন পেয়েছে, দুই বেলা খেতে পারছে, অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাচ্ছে, সবচেয়ে বড় কথা প্রাণের ভয়ে তাদের বনের পশুর মত বনে জঙ্গলে ছুটে বেড়াতে হচ্ছে না।

এই মুহূর্তে পৃথিবীর কত জায়গায় কত রকম যুদ্ধ বিগ্রহ কত রকম নিষ্ঠুরতা তার ভেতরে হত দরিদ্র দুঃখী রোহিঙ্গাদের কথা পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারতো। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্যি পৃথিবীর সব মানুষ এই রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচারের কথা মানে। (শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া পৃথিবীর একজন নিষ্ঠুরতম মহিলার সম্মাননা একটি একটি করে প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে, এর চাইতে বড় লজ্জা আর অপমান কি হতে পারে?

খবরের কাগজে দেখতে পাচ্ছি আলোচনা চলছে, চুক্তি হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা হচ্ছে। দিনে তিনশত করে শরণার্থী প্রক্রিয়া করা সম্ভব হবে বলে দেখেছি। সেটি যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে দশ লক্ষ রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে দশ বছর সময় লাগবে। সোজা বাংলায় যার অর্থ এই রোহিঙ্গা মানুষগুলোকে আমাদের বছরের পর বছর আশ্রয় দিতে হবে।

যদি তাই সত্যি হয় তাহলে এই রোহিঙ্গা শিশুদের ভবিষ্যৎ কী আমাদের একটু আলাদা ভাবে দেখার প্রয়োজন নেই? আমরা আমাদের শিশুদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে দেব কিন্তু একই ভূখণ্ডে আশ্রয় নেওয়া অন্য শিশুদের লেখা পড়ার ব্যবস্থা করব না? তাদের ভবিষ্যতের কোনো স্বপ্ন থাকবে না?

আমরা যখন স্কুল কলেজে লেখাপড়া করেছি তখন চীন দেশের কমিউনিস্ট নেতা মাও সে তুংয়ের কথা খুব শুনতে পাওয়া যেতো। তার একটা বিখ্যাত উক্তি ছিল এরকম- ‘একজন মানুষ খাওয়ার জন্যে একটি মুখ কিন্তু কাজ করার জন্য দুটি হাত নিয়ে জন্মায়।’ আমরা কী এখন রোহিঙ্গা শিশুদের জন্যে সেই কথাটিই ব্যবহার করতে পারি না? তাদের মুখ একটি, হাত দুটি এবং মস্তিষ্কে নিউরন একশ বিলিওন?
২.
একজন মানুষকে ঘর ছাড়া কিংবা দেশ ছাড়া করার সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর পদ্ধতি হচ্ছে তার বাড়িতে আগুন দিয়ে দেওয়া। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম মহিলা এবং তার জেনারেলরা সেই তথ্যটি খুব ভালো করে জানে তাই তারা একটি একটি করে রোহিঙ্গা গ্রামের প্রতিটি বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে তাদের ঘর ছাড়া করেছে, দেশ ছাড়া করেছে।

কেউ কী লক্ষ্য করেছে আমার নিজের দেশের রংপুরে হিন্দুদের বেলায় হুবহু একই ব্যাপার ঘটেছে। অনেক মানুষ মিলে পুলিশের সামনে হিন্দুদের বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়াতেও একই প্রক্রিয়ায় একই ব্যাপার ঘটেছিল।

তখন রসরাজ নামে একজন অসহায় নিরীহ মানুষকে ব্যবহার করে কাজটি করা হয়েছিল এবারে টিটু রায় নামে অন্য একজনকে বেছে নেওয়া হয়েছে। পুরো ব্যাপারটির মাঝে এক ধরনের অচিন্ত্যনীয় নিষ্ঠুরতা রয়েছে অথচ অবিশ্বাসের কথা হচ্ছে এইটিটু রায়কে দিনের পর দিন রিমান্ডের অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে।

আমরা রোহিঙ্গাদের বুক পেতে গ্রহণ করেছি অথচ হিন্দুদের বুক আগলে রক্ষা করব না? এ কেমন কথা?

৩.
সবে মাত্র জেএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে, খবরের কাগজ থেকে জানতে পেরেছি সবগুলো পরীক্ষার সবগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। সারা দেশে যেরকম তুলকালাম কান্ড হওয়ার কথা ছিল তার কিছুই হয়নি। প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে সাথে সাথে পরীক্ষাটি বাতিল হয়ে যাবার কথা- একটি পরীক্ষাও বাতিল হয়নি কাজেই ধরে নিচ্ছি শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি মেনে নিয়েছে।

যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়াটি মেনে নেয় তাহলে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবকেরা সেটি কেন মেনে নেবে না? সবাই মেনে নিয়েছে এবং বিষয়টা একটা উৎসবে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে এর চাইতে কালো কোনো অধ্যায় কী হওয়া সম্ভব?

জেএসসি পরীক্ষা শেষে পিএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। জেএসসি পরীক্ষার ‘ঐতিহ্য’ ধরে রেখে এর প্রশ্নও ফাঁস হতে শুরু হয়েছে। প্রাইমারীর ছেলে মেয়েরা একেবারেই শিশু তাদের প্রশ্ন ফাঁসে অভ্যস্ত করে দেওয়ার মতো নিষ্ঠুরতা আর কী হতেপারে? জেএসসি , এসএসসি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে যে লাগাম ছাড়া সমস্যার জন্ম হয়েছে প্রাইমারী পরীক্ষার বেলায় সেটি একেবারেই হওয়ার কথা ছিল না, কারণ এই পরীক্ষাটিই হওয়ার কথা ছিল না।

এই দেশের লেখাপড়া নিয়ে কথা বলা হলে যে শিক্ষানীতির কথা বলা হয় সেই শিক্ষানীতিতে প্রাইমারী পরীক্ষাটির কথা বলা নেই। শিক্ষানীতিকে সম্মান দেখিয়ে যদি এই পরীক্ষাটিকে পাবলিক পরীক্ষার মত একটি বিশাল যজ্ঞ দজ্ঞতে রূপান্তর করে ফেলা না হতো তাহলেই এর প্রশ্নফাঁসের ব্যাপারটাই থাকতো না। যদি পরীক্ষাই না থাকে তাহলে কোন পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হবে?

এবারের পিএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সাথে সাথে আমরা নতুন আরো একটা বিষয় দেখতে পেয়েছি, সেটি হচ্ছে প্রশ্নপত্রের ভুল। যারা পত্রপত্রিকা পড়েন তাদের একজনও নাই যারা প্রশ্নের ইংরেজিটি দেখে আতঙ্কে শিউরে ওঠেনি। প্রশ্নপত্রের এই ভুলটি যেরকম অবিশ্বাস্য এর প্রতিকার হিসেবে যে কাজটি করা হয়েছে সেটি আরও অবিশ্বাস্য। খুঁজে খুঁজে সেই মানুষটিকে বের করা হয়েছে যে প্রশ্নপত্রটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে তারপর তাঁকে বরখাস্ত করে দেওয়া হয়েছে।

যে ইংরেজীতে অনুবাদ করেছে তার ইংরেজির জ্ঞান খুব কম, তার পক্ষে এর চাইতে ভালো ইংরেজি লেখা সম্ভব নয়, তাই সে এরকম একটি অনুবাদ করেছে। এটি অন্যায় হতে পারে না, এটি হচ্ছে ব্যর্থতা। ব্যর্থতার জন্য কাউকে শাস্তি দেওয়া যায় না। যদি শাস্তি দিতেই হয় তাহলে শাস্তি দিতে হবে এই প্রশ্ন প্রণয়ন করার দায়িত্বে থাকা কমিটিকে, তার সভাপতিকে, তার সদস্যদের।

তারা অনেক বড় অন্যায় করেছেন, তারা এমন একজন মানুষকে প্রশ্ন অনুবাদ করার দায়িত্ব দিয়েছেন যিনি ইংরেজি জানেন না। শুধু তাই না, ইংরেজিতে অনুবাদ করার পর সেই কমিটি প্রশ্ন পত্রটিতে চোখ বুলানো প্রয়োজন মনে করেননি কিংবা চোখ বুলিয়ে ভুল ইংরেজি দেখার পরও সেটি সংশোধন করা দরকার মনে করেননি।

একটি বিশাল বিপর্যয় ঘটবে, যারা সেই বিপর্যয়টি ঘটাবে তারা ধরা ছোওয়ার বাইরে থাকবে, খুঁজে পেতে সবচেয়ে নিরীহ এবং ক্ষুদ্র মানুষটিকে বের করে তাকে শাস্তি দিয়ে সবাই আনন্দে বগল বাজাতে থাকবে এটি কেমন কথা? একজন মানুষ ইংরেজি না জানলে তাকে শাস্তি দেওয়া যায় না, যে তাকে দিয়ে ইংরেজি অনুবাদ করেছে তাঁকে খুঁজে বের করে প্রয়োজন হলে তাঁকে শাস্তি দিতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, একটা বিপর্যয় ঘটে যাবার পর কাউকে খুঁজে বের করে তাকে শাস্তি দিয়ে কোনো লাভ নেই, বিপর্যয় না ঘটলে অনেক বড় লাভ হয় এই সহজ কথাটি কেউ কেন বুঝতে পারছে না?
৪.
সাম্প্রতিক ঘটনার মাঝে আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে যে ঘটনাটি সেটি হচ্ছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের একটি ঘোষণা, সেটি হচ্ছে তারা এখন স্কুলে স্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করবে। নিজের কানে শুনেও আমি কথাটি বিশ্বাস করতে পারছি না।

বর্তমান ছাত্রলীগ কী আমাকে সারা দেশে একটি ঘটনার কথা বলতে পারবে যেটি দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নেব যে আমার স্কুলে পড়ুয়া সন্তানকে ছাত্রলীগের সদস্য করে দিতে হবে? যদি না পারে তাহলে তাদের এই সর্বনাশা প্রজেক্টে হাত দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

Sunday, October 22, 2017

আদমজীর পাগলা আবদুল হক - তুষার কান্তি বসাক

১৯৬৮ সাল। ৬দফা সমর্থনে দেশব্যাপী চলছে প্রচার অভিযান।


 আদমজী জুট মিলস ছিল তখন ৬ দফার শক্ত ঘাটি। কুটির হাট অঞ্চলের অনেকে তখন আদমজী জুট মিলে চাকুরি করতেন তাদের মধ্যে গোপাল গাঁও গ্রামের আবদুল হক (পাগলা আবদুল হক) ও আমীন উল্ল্যাহ অন্যতম। একদিন ছুটিতে এরা দু'বন্ধু দেশে আসেন। কুটির হাট বাজারের ঈদগাওয়ের এককোনে বসে গল্প করছেন। সেই সময় ঈদগাওতে ভাসানি ন্যাপের সভা চলছে নেতৃত্ব রফিকুল ইসলাম ভূঞা ইন্তু মিয়া। সেই সভাতে হামলা করে তখনকার সরকার সমর্থক গোষ্ঠী। আবদুল হক ও আমান উল্ল্যা দেখলেন আদমজীতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে শক্ত অবস্থান আছে কিন্তু নিজ এলাকায় সমর্থক থাকলেও কোন সাংগঠনিক কাটামো নেই। তাই তারা দু'জন নিজ এলাকায় সাংগঠনিক কাটামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে একদিন শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেন এবং নিজ এলাকায় একজন নেতাকে আমন্ত্রন জানান। বঙ্গবন্ধু তখন বলেন থানা কমিটি ও জেলা কমিটির অনুমোদন নিয়ে আসতে। তখন থানা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন ইছহাক মিয়া ও জেলা কমিটির সভাপতি ছিলেন আবদুল মালেক উকিল। তাঁরা থানা কমিটির এছহাক মিয়া অনুমতি নিয়ে জেলা কমিটির অনুমতি আনতে গেলে আব্দুল মালেক উকিল নিজে উনাদেরকে শেখ মুজিবের কাছে নিয়ে যান। পরে সিদ্ধান্ত হয় তখনকার আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক তাজ উদ্দীন আহম্মদ আসবেন বিষ্ণুপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ দফার পক্ষে জনসভা করতে। কিন্তু ইস্কুলের তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন এবিএম তালেব আলী তিনি ইস্কুল মাঠে অনুমতি দিতে নারাজ। এর পর মাস্টার নূর আহম্মদকে সভাপতি কাজী আব্দুল কাদেরকে সাধারন সম্পাদক ও মাস্টার মাহবুবল হক, মুলকতের রহমান, জহির উদ্দীন ভূঞা, হাফেজ আহম্মদ ভূঞা সহ অনেককে সদস্য করে ১ নং চরমজলিশপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের কমিটি গঠন করা হয়। এবিএম তালেব আলীর অনুমতি না পেয়ে  সভাপতির দায়িত্বে থাকা নুর আহম্মদ মাস্টার নোয়াখালী গিয়ে জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিয়ে বিষ্ণুপুর উচ্চবিদ্যালয়ে ৬দফার সমর্থনে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক তাজ উদ্দীন আহম্মদের উপস্থিতিতে সভা করতে সমর্থ হয় এভাবে ইউনিয়ন আওয়ামী কমিটি গঠিত হয়। ঠিক ঐ সময়ে বড়হালিয়া গ্রামের সোলতান আহম্মদকে সভাপতি ও আবদুছ সালাম বিএসসিকে সাধারন সম্পাদক করে ২নং বগাদানা ইউনিয়ন কমিটিও গঠিত হয়।

পরবর্তীতে ৭০ এর নির্বাচনে আবদুল হক ও আমান উল্ল্যার নেতৃত্বে একদল আদমজীর শ্রমিক বঙ্গবন্ধুর কাছে দাবী জানান এবিএম তালেব আলীকে নোমিনেশন দিতে। সেই নির্বাচনে এছহাক মিয়া ও বালিগাঁও ইস্কুলের প্রধান শিক্ষক শাহনেওয়াজও প্রার্থীর জন্য নোমিনেশন চেয়েছিল। কিন্তু এবিএম তালেব আলী ভাসানী ন্যাপ থেকে আওয়ামীলীগে যোগদান করে বিপুল ভোটে জয় লাভ করেন। এবং ফেনী ৩ নং আসনটি ৮৬ সাল পর্যন্ত  আওয়ামী লীগের দখলে ছিলেন।

ছবিতে: আবদুল হক, মুক্তিযোদ্ধা (প্রয়াত), আমান উল্ল্যা ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার, বর্তমানে কুটির হাট বাজারে ফুটপাতে ব্যাবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

কচ ও দেবযানী - জয়তি রায়

পৌরাণিক নারী( ধারাবাহিক)
 অহল্যা, তুলসী, কুন্তীর পরে দেবযানী)
Add caption

   
    কচ ও দেবযানী
        পর্ব ১
----------------------------
   দেবগুরু বৃহস্পতির কপালে ভাঁজ। স্বভাবতঃ শান্ত মানুষ, দেবগুরুজনচিৎ কোনো হাঁক ডাক করেন না। শান্ত মনে দেবতাদের কল্যানে পূজো আর, তিন স্ত্রী আর সন্তানাদি নিয়ে নিজের মতো থাকতে চাইলে কি হবে? ওই যে অর্বাচীন দেবরাজ ইন্দ্র, তাঁর যন্ত্রনায় দেবলোকে কেউ সুস্থির হয়ে বসতে পারবে ? কস্মিন কালেও নয়। মনে মনে মহা বিরক্ত হয়ে দেবগুরু ভাবেন--’ ইন্দ্র থাকে তো অপ্সরা বেষ্টিত হয়ে, নাহলে মুনি পত্নীদের পিছনে পিছনে ঘুরে বেড়ান মর্ত্য লোকে গিয়ে! তাই করো না বাপু। এখন তোমার সঞ্জীবনী মন্ত্রের কি দরকার হলো? যুদ্ধ তো করেন বিষ্ণু মহেশ্বর। তোমার গায়ে তো  আঁচ টুকু লাগে না। তবে? ‘  ক্ষুদ্ধ স্বরে তিনি প্রিয় পুত্রের উদ্দেশ্যে ডাক পাড়লেন---
    ‘ও কচ। কচ। এদিকে একটু এসো বৎস।’
*
সময় টি ভারি মনোরম। অবশ্য স্বর্গে কোন সময়ই বা খারাপ? তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের যে উপায় মহাপ্রযুক্তি বিশারদ বিশ্বকর্মা আবিষ্কার করেছেন, তাতে স্বর্গে সবসময় এক মধুর আবহাওয়া , সুগন্ধী পরিজাতের সুগন্ধ , মন্দাকিনীর জলের নীচে এমন ভেষজ ঔষধি লতা গুল্ম রয়েছে, যে প্রবাহমান ওই স্রোতে যে স্নান করে , গায়ের বর্ণ উজ্জ্বল , চুল ত্বক সব সুন্দর হতে বাধ্য। স্থানে স্থানে কৃত্রিম কুঞ্জ তৈরি করা আছে। যার যখন ইচ্ছে, যে কোনো কুঞ্জে ঢুকে বসলেই, উৎকৃষ্ট মদিরা পাবে, অন্তরালে ব্যক্তির রুচি অনুযায়ী সুমধুর যন্ত্র বেজে উঠবে।
         এমন একটি কুঞ্জে বসে বৃহস্পতি পুত্র কচ, গভীর ভাবে মগ্ন ছিল অধ্যয়নে। বৃহস্পতির পনেরটি পুত্র কন্যার মধ্যে একমাত্র কচ, চিকিৎসা বিদ্যা আর দর্শন শাস্ত্র দুটোতেই সমান পারদর্শী। মাত্র কুড়ি বছর বয়স তাঁর, অপূর্ব সুন্দর চেহারার সঙ্গে মিশেছে বুদ্ধির দিব্য আভা। কচের পরিণত বুদ্ধির উপরে দেবতাদের খুব ভরসা। পাঠে মগ্ন হলেও কচের কানে পৌঁছলো পিতার ব্যাকুল ডাক। ব্যস্ত হয়ে পুঁথি ফেলে পিতার কাছে এসে সে প্রশ্ন আকুল চোখ দুটি তুলে তাকালো। কোনো সমস্যা আছে। নাহলে পিতা কখনো এভাবে ডাকেন না।
     ঝকঝকে সুঠাম শরীর, অতন্ত্য ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুত্রকে দেখে অন্যদিন বুকে জড়িয়ে নেন দেবগুরু। আজ কেমন বিষণ্ন স্বরে বললেন --
‘ বসো পুত্র।’
---’ কি হয়েছে?’ অভিবাদন করে,  না বসেই জিজ্ঞেস করলো কচ। সময় নষ্ট করতে সে ভালো বাসেনা।
  বৃহস্পতি বললেন--
   ‘ বসো। সময় লাগবে। দেখো বৎস, তুমি তো জানো ,দেবতা আর অসুরদের মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহ লেগেই আছে। শক্তিতে কেউ কারো চেয়ে কম যায় না, কিন্তু বুদ্ধিতে দেবতারা শ্রেষ্ঠ। দেখো বাবা, এদের এই লড়াইয়ে না চাইতেও আমার সঙ্গে থাকতে হয়। তুমি তো জানো , ছলনা করে অমৃত দেবতারা চুরি করে খেয়ে নিয়ে অমরত্ব লাভ করে  ভেবেছিলো এবার অসুরদের জব্দ করবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি ঢেলে দিয়েছেন, অসুরগুরু শুক্রাচার্য। ‘
  দম নেবার জন্য থামতেই কচ বলল--
  ‘ পিতা, ক্ষমা করবেন। আমি এসব শুনে কি করবো? মাথায় কিছু ঢুকছে না। একটা নতুন বিষয় এমন ভাবে আমার চিন্তাকে অধিকার করে আছে, যে কোনো অন্য কথা ভালো লাগছে না।’
   এমন সময় আচমকা সেখানে নারদ ঋষির প্রবেশ। যে কোনো জায়গায়, আলোচনায় নারদ একমাত্র ব্যক্তি ,যিনি বিনা অনুমতিতে ঢুকে তাঁর মতামত জানাতে পারেন। এখানেও তিনি হাসতে হাসতে ঢুকে বললেন--
  ‘ বৎস কচ, দেবকুলে তুমি হলে সবচেয়ে মেধাবী, তার উপরে সুদর্শনও বটে। তোমাকেই দেবগুরু শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানীর সঙ্গে ভালবাসার ছলনা করে, সঞ্জীবনী মন্ত্রটি শিখে আসতে হবে। ‘
     কচ একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন। সে শান্ত স্বভাবের একলা থাকা ছেলে। নতুন এক গবেষণায় ইদানিং খুব ব্যস্ত। আশেপাশে, স্বর্গ, দেবতা, অপ্সরা কিছুই খবর রাখার ইচ্ছে তার নেই, হঠাৎ এমন রাজনৈতিক ডামাডোলে একেবারে নায়ক হয়ে যাবার ধাক্কায় সে একেবারে অবাক হয়ে গেল।
    খুব রুষ্ট এবং গম্ভীর গলায় সে প্রশ্ন করলো ---
   ‘ ব্যাপারটা খুলে বলবেন মহর্ষি? গোলমেলে সে তো বুঝতেই পারছি। অমর দেবতাদের সঞ্জীবনী মন্ত্র জানার কি দরকার পড়লো? আর পড়লেও অসুররাজ বৃষপর্বা তার রাজ্যে আমাকে ঢুকতে দেবেন এবং শুক্রাচার্য শত্রুর ছেলেকে আদর করে সঞ্জীবনী মন্ত্রটি শিখিয়ে দেবেন! কি অদ্ভুত!’
    নারদ হাসতে হাসতে বললেন --
      ‘ আর একটু পরেই দেবরাজ ইন্দ্রের সভায় তোমার ডাক পড়বে কচ। বিষ্ণু আর ইন্দ্র পুরো ঘটনা বুঝিয়ে দেবেন। তৈরী হয়ে নাও।’
   --’ আবার চক্রান্ত? ,
দেবতারা চক্রান্ত ছাড়া কিছু বোঝেনা?’
---’ তুমি এখনো তরুণ কচ। নির্মল তোমার দৃষ্টি। পরিপক্ক হলে বুঝতে, সমাজ, দেশ বাঁচানোর জন্য কোনো কিছুই পাপ বা চক্রান্ত নয়। অসুরকুল সঞ্জীবনী মন্ত্রের জোরে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তাদের শক্তি খর্ব করতে হবে। দেবতাদের উপরে কেউ যেতে পারবে না। যাও, দেরি করোনা। কাজের কৌশল তোমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
*
   আকাশ যানে করে মর্ত্যের দিকে উড়ে যাচ্ছিলেন কচ। মন খুব ভার। গতকাল ইন্দ্র আর বিষ্ণুর সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছেন একজন বিদ্বান ধার্মিক বৃদ্ধ আর তাঁর কন্যা দেবযানী সঙ্গে অভিনয় করতে হবে তাঁকে। সে প্রশ্ন করেছিল,
   --’ বিদ্যা শিখতে গিয়ে গুরু কন্যার সঙ্গে প্রেমের অভিনয় কেন?’
   তাতে অট্টহাস্য হেসে ইন্দ্র বললেন--’ তুমি নিজের সত্য পরিচয়ই দেবে। কোনো সমস্যা নেই তাতে।দেবগুরু বৃহস্পতির পুত্র বিদ্যা শিখতে আসতেই পারে।  বিদ্যা শেখাতে ,শত্রু মিত্র ভেদ কেউ করেনা। কিন্তু, বাছা কচ, তিনি তোমাকে ওই বিশেষ বিদ্যাটি কখনোই শেখাবেন না। সেখানে প্রেমিকা দেবযানী বাধ্য করবে পিতাকে। শুনেছি, মাতৃহীন কন্যাটির কোনো কথাই দৈত্যগুরু উপেক্ষা করেন না।’
    মাথা নিচু করে বসে থাকা কচের কাঁধে হাত রেখে বিষ্ণু বললেন---
‘ মারি অরি পারি যে কৌশলে’ এতে কোনো দোষ নেই । তুমি যাও। কাজ শেষ করে এসো।’
      মিথ্যে ছলনা করে চুরি করতে হবে সঞ্জীবনী বিদ্যা! মানা করলে স্বর্গ থেকে নির্বাসন ।  না শব্দটি শোনা দেবতাদের ধাতে নেই। বিষ্ণুর গম্ভীর গলায় বলা শব্দকটি--কাজ শেষ করে এস--এক ধরণের আদেশ বই কি!
     কচ বাস্তববাদী ছেলে। মর্ত্যের দিকে যেতে যেতে পরিকল্পনা ছকে নিচ্ছিল মনে মনে। ভোর আকাশের মিষ্টি  আলোতে সবুজ গ্রহ পৃথিবী ভারি সুন্দর আর স্নিগ্ধ। কচ ভাবলেন--
   ‘ কারো পরিণতির জন্য কেউ দায়ী হয়না ।  যা হবার , তা আগে থেকে ঘটেই থাকে। কেউ একজন নিমিত্ত মাত্র হয়। তাই, আগামীদিনে যাই ঘটুক না কেন , কচ তার জন্য দায়ী নয় কোনোমতেই। ‘ মনকে প্রস্তুত করে, শুক্রাচার্যের আশ্রমের সামনে আকাশ যান থেকে নেমে পড়ল কচ।
*
শুক্রাচার্য কে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল কচ। শুনছিলো, ইনি ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ এবং মহাজ্ঞানী। মহা উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী এই ব্রাহ্মণের রাজনীতির মতো কঠিন শাস্ত্র দর্শনে যেমন প্রজ্ঞা , তেমনি চিকিৎসা শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি  অসাধারণ। সমস্ত অবয়বে জ্ঞান মাধুরী যেন ঝরে পড়ছে। স্নেহ মিশ্রিত চোখ দুটি তুলে কচের দিকে তাকালো শুক্রাচার্য।
 ‘এনাকে ঠকাতে হবে? এনার প্রাণ পুতুলি কন্যা দেবযানীর সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করতে হবে? ‘ তীব্র যন্ত্রনা মাখানো স্বরে কচ বললো---
  ‘ প্রভু! আমি কচ। অঙ্গিরা ঋষির পৌত্র। বৃহস্পতির পুত্র। আমি আপনার শিষ্য হতে চাই। এবং যতদিন আপনার শিক্ষা চলবে, আমি গুরুগৃহে থেকে কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করবো।’
  ---’ কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে আগমন হয়েছে তোমার? বৎস? দেবতার মতো জাত, বিনা উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করে না।’
   কেঁপে ওঠা বুক সামলে , বিনীত মুখে কচ জবাব দেয়--
  ---’ দৈত্য দেবতা জানি না ঋষিবর। আমার জীবনের উদ্দেশ্য একটাই। তা হলো জ্ঞান অর্জন। জ্ঞান বৃদ্ধি। আর আপনার কাছে সে অভিষ্ট আমার পূর্ণ হবে, সে কথা আপনিও জানেন।’
---’ বৎস। জ্ঞানের দুয়ারে শত্রু মিত্র বলে কিছু নেই। গুরু শিষ্য সম্পর্ক পিতা পুত্রের চেয়েও দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ। আশা করবো তুমি তোমার শিষ্যত্বের সম্মান রক্ষা করবে। ‘
  আবারো কেঁপে উঠলো কচ। মুখে অমলিন হাসি বজায় রেখে ,ব্রহ্মচর্যের ব্রত গ্রহণ করলেন। স্মিত হেসে শুক্রাচার্য বললেন---
   ‘ আগামী কাল প্রাতে দেখা হবে।’ এই বলে, এক অনুচরকে  কচের থাকবার সু ব্যবস্থা করার আদেশ দিয়ে, নিজ গৃহর উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন আচার্য।
     সেখানে পৌঁছে কন্যা দেবযানীকে দেখে বৃদ্ধ পিতার মন খুশিতে ভরে গেল
   ‘ সারাদিন একলা  কি করো তুমি  কন্যে? তোমার মা বেঁচে থাকলে,,,’ কথা শেষ না করে শ্বাস ফেললেন পিতা। দেবযানী তাড়াতাড়ি পিতার বিশ্রামের ব্যবস্থা করে , সান্ত্বনার সুরে বলল--
 --” আমি সারাদিন খুব ভালো কাটাই পিতা। কিন্তু আজ আপনার একটু দেরি হলো যে?’
 --’দেবযানী। আজ দেবগুরুর পুত্র আমার কাছে বিদ্যালাভের জন্য এলো।’ ঈষৎ অহংকারী গলায় বললেন আচার্য--’ তবে ছেলেটি এত সুন্দর, যেমন ভদ্র, তেমনি সুকুমার, তেমনি আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের বিভা। বড় ভালো ছেলে। দেখেই অতন্ত্য সৎ এবং আন্তরিক মনে হলো।’
 দেবযানী অবাক হয়ে পিতার ভাবাবেগ দেখছিল। কে সেই শিষ্য? যার সম্পর্কে স্বল্প ভাষী পিতা এতটাই আপ্লুত? দেখতে হবে তো! হঠাৎ দেবযানীর হাতে ধরা জল ভরা স্বর্ণপাত্রটি মাটিতে পড়ে গেলো। কোথায় একটা পাখি ডেকে উঠলো কর্কশ স্বরে। মন কেমন কু গেয়ে উঠলো কেন কে জানে?
আশ্রমে একজনের আগমন সংবাদ তো আনন্দ বয়ে নিয়ে আসবে। অমঙ্গল চিহ্ন চোখে পড়ে কেন?

কচ ও দেবযানী- পর্ব ২

_------++++++------------
     দেবযানী জানে যে সে একটু পাগল। একটু কেন? ভালোমতো পাগল। এর জন্যে পিতার অপরিমিত প্রশয় দায়ী কিছুটা, আর কিছুটা তাঁর জন্ম গত। যা চাই, তা চাই ই। সে যত অসম্ভব চাহিদা হোক, শুক্রাচার্য পূরণ করবেনই। খামখেয়ালী মেয়ে , মাতৃহীন, জীবনে ওই মেয়ে আর নিজের পড়াশুনো ছাড়া আর কিছু নেই  তাঁর। তাই যত যা কিছু বলুক দেবযানী , তিনি না করেন না। অবশ্য তাঁর হয়ে, ব কলমে দানব রাজ বৃষপর্বাই মেটান সব দাবী।
        আর সে দাবী না মেটানোর তো কোনো কারণ নেই।  শুক্রাচার্য হলেন দৈত্যরাজের শক্তি, তাঁর আবিষ্কৃত সঞ্জীবনী ঔষুধের জোরে আজ দেবতাদের সমকক্ষ অসুর। অবশ্য  দানব রাজ বৃষ পর্বা দেবতাদের যিনি মোটেই বিশেষ বীর ভাবতে রাজি নন।  তাঁর বক্তব্য, আজ দেবতাদের অমরত্বের   পিছনেও আছে বিরাট চক্রান্ত।
    সমুদ্র মন্থন করে অমৃত আহরণ করতে দেবতা অসুর দুই পক্ষই। অথচ ছলনা করে ওই বিষ্ণু পুরোটাই দেবতাদের ভোগে লাগালেন। মনে মনে  তাই ঘৃণা করেন দেবতাদের। তবে, আজ চিত্র বদলেছে। এখন  অসুররা যুদ্ধে আহত হলে, মৃত্যুর কাছে চলে গেলেও, ওই ঔষধে নিমেষে উঠে বসছে। সঙ্গে সঙ্গে দেবতারা ‘ গেল গেল ‘ রব তুলছে। আবার কি ছলনা করে ওই মন্ত্র হাতিয়ে নেয় কে জানে? পাষন্ড গুলো কে কোনো বিশ্বাস নেই।  তাই দানবরাজ--, শুক্রচার্য আর তাঁর কন্যাকে মাথায় করে রাখেন। কোনো রকম অমর্যাদা যেন না হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি তাঁর। এর মধ্যে গুপ্তচর  ব্যাজার মুখ নিয়ে  অভিবাদন করে বললো----
  ---’ মহারাজ। গুরুদেব শুক্রাচার্য, দেবগুরু বৃহস্পতির পুত্র কচ কে শিষ্য করে নিজের আশ্রমে রেখেছে।’
 ---’ সে কি! ‘আর্তনাদ করে সিংহাসন থেকে পড়ে যান আরকি দানবরাজ---’ নাঃ, এই সরল গুরুকে নিয়ে আর পারা যায় না। নিশ্চই কোনো ভুজুং ভাজুং মিথ্যে বলে ঢুকেছে ওই দেবপুত্র। পাত্র মিত্র অমাত্য সবাই নজর রাখো ওই ছেলের উপর। নিশ্চয় করে বলা যায়, সঞ্জীবনী মন্ত্র চুরি করতেই বিষ্ণু আর ইন্দ্র মিলে পাঠিয়েছে। ‘
----’ মহারাজ, এই কথা দৈত্য গুরুকে বুঝিয়ে বললেই হয়!’
---’ না না। শুক্রাচার্য যেন ঘুণাক্ষরে টের না পান, তার শিষ্যর উপর আমরা নজর রাখছি। উনি অপমানিত বোধ করবেন।’
---’ মহারাজ, দৈত্যগুরু দেবযানী আর বৃহস্পতিপুত্র কচ, এদের মধ্যে আজকাল খুব বন্ধুত্ব। সারাদিন দুজনে একসঙ্গে থাকে। ‘  ব্যাজার মুখে গুপ্তচর খবর দিলো। শুনে মহারাজ মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলেন। রাক্ষসেরা নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া চায়ি করে ঠিক করল, একলা পেলেই কচকে খুন করে ফেলবে। তবেই আবার শান্তি ফিরবে অসুররাজ্যে।
*
 কচ যতবার ফুলগুলি তুলে তোড়া বাঁধছে, মনের মতো হয়না যেন। সকালের পাঠ সাঙ্গ হয়েছে। ভেষজ বিদ্যার জটিল কিছু সূত্র, আর রাজনীতি র কিছু অঙ্কের সমাধান করে, কচ চলেছে দেবযানীর গৃহের দিকে। এতক্ষনে সে নিশ্চয়ই স্নানাদি সেরে কচের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে। কিন্তু উপায় কি? ফুলের তোড়া যেমন তেমন হলে হবে না। সব রঙের একটি অপূর্ব মিশেল থাকতে হবে। মাঝে মাঝে থাকবে কিছু সবুজ পাতা। খেয়াল রাখতে হবে, গতকালের ফুল সাজানো আর  আজকের মধ্যে কিছু  ফারাক থাকে। তবে তো দিনের বিশেষ চরিত্রটি প্রকাশ পাবে। নতুবা মনে হবে, এটা একটা অভ্যাসের দায় সারা কাজ। যে দিচ্ছে , তার মনে যাকে দিচ্ছে তার প্রতি কতখানি অন্তরকিতা আছে, সেটা প্রকাশ পায় উপহারে। তা সে যত সামান্যই হোক না কেন!
     কচ নিজেও খুব খুঁতখুঁতে। তার উপরে দেবযানীর তুষ্টি এক বড় কারণ এমন মনোযোগের। অবশেষে ফুল নিয়ে আশ্রম গৃহের প্রাঙ্গনে পা রাখলো, তখন সূর্য মধ্য গগনে।
    নীল শাড়ীর আঁচল দুলিয়ে দৌড়ে এলো দেবযানী---’ কচ, কচ, চলো। আজ তোমার জন্য এক বিশেষ মিষ্টান্ন প্রস্তুত হয়েছে। খাবে চলো।’ তারপরেই ফুল দেখে খুশি হয়ে বলল--’ ওমা! আজকের তোড়াটি সবচেয়ে সুন্দর। এটা এখানে রেখে, তুমি খাবে চলো।’
 কচ অনিচ্ছুক ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো। মিষ্টি খেতে সে একবারে ভালোবাসে না। ম্রিয়মান স্বরে  বলল---’ থাক, মিষ্টান্ন থাক। তুমি বাইরে গিয়ে পাথরের উপরে বসো দেখি, কুন্দ ফুলের মালাটি তোমার পায়ে পরিয়ে দি।’
   দেবযানী হৈ হৈ করে হেসে উঠে বললো--’ খাবে না? মেদ বৃদ্ধি হবে বলে? কচ, তোমার এই সুঠাম সুন্দর শরীর--আহা! কত যত্নে বানানো। তোমাকে দেখে আমি আত্মহারা হয়ে যাই।’ বলে মুগ্ধ চোখে কচের শরীরের দিকে চেয়ে থেকে আচমকাই তাঁর গলা জড়িয়ে বলে উঠলো---’ আমি তোমাকে চাই কচ। তুমিও নিশ্চয় আমাকে কামনা করো?’ দেবযানীর তৃষিত চোখ থেকে চোখ সরিয়ে, মৃনাল বাহু দুটি খুলে দিয়ে কচ বললো--
---’ কত আশ্চর্য সব গল্প বলবো বলে সকাল থেকে বসে আছি। চলো, সারা দুপুর আমরা উদ্যানে ঘুরে বেড়াব আজ।’
   দেবযানী কচের ছলনা বোঝেনা। সে সোজাসুজি নিজের মনের কথা জানায়। এই ফুল এনে দেওয়া, এই গান , কবিতা শোনানো, অদ্ভুত সব গল্প বলা, মায়ের স্নেহের মতো মাঝে মাঝে বকুনী দেওয়া, এমন কি দেবযানীর চুল পর্যন্ত বেঁধে দিয়েছে কচ একদিন। ছোট থেকেই সে  যা চেয়েছে সব পেয়ে এসেছে। কচ কে সে কামনা করে, এ কথা জানিয়েছে পিতাকে। পিতা প্রশয়ের হাসি হেসেছেন। কাজেই দেবযানী নিশ্চিন্ত। সে হাসি মুখে কচের হাত ধরে গৃহের বাইরে পা বাড়াতে গেলে,  হঠাৎ পায়ে  কঙ্কর ফুটে গেল এক। তাড়াতাড়ি দেবযানীর নরম পায়ে  নিজের  আঙ্গুল বুলিয়ে দিতে দিতে মৃদু বকুনী দিলো কচ---’ দেখে চলতে পারো না?’
---’ এখনো তো গৃহেই আছি। তাই নিশ্চিন্ত ছিলাম।’
----’ গৃহ হোক আর উদ্যান সতর্ক থাকবে। নিশ্চিন্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে থাকলে  এমনি করেই আঘাত পাবে , মনে রেখো।’
    থমকে যায় দেবযানী। সরলা বালিকার মতো অপাপবিদ্ধ দুটি চোখ মেলে তাকায় কচের ভাবলেশহীন মুখের দিকে। মাঝে মাঝেই কেমন দূরের মনে হয় তাকে! কেন? বুঝে পায়না সে  মনে হয়,  যে বসে আছে তার সামনে, সে কচ নয় ,অন্য কেউ। বুকের মধ্যে উথাল পাথাল করে ওঠে। শত্রু মিত্র, দেব দানব কিছুই বোঝে না সে। প্রথম প্রেমের সৌরভে ,তার তরুণী মন ডুবে রয়েছে এক আনন্দ সরোবরে। মুক্ত কণ্ঠে সে বলতে চায়--’ আকাশ দেখো, বাতাস শোনো, ওগো নদীর জল, কাননের ফুল সকলে শোনো, আমি ভালোবাসি গো ভালোবাসি।
     কোনো দ্বিধা সংকোচ জড়তা তার নেই। সে যা ভাবে, যা চায়, যেমন ভাবে পারিপার্শ্বিক কে নিয়ে খেলতে চায়-- তাই করে। কোনো আপোষে সে বিশ্বাস করে না। কোনো কারণে ‘ না’ শুনতে পছন্দ করে না। দেবযানী ধরেই নিয়েছে যে কচ ও তাঁকে ভালোবাসে। এক অসম্ভব অধিকার বোধ কাজ করে তার কচের ব্যাপারে। পাঠের সময়টুকু ছাড়া এক নিমেষের জন্য চোখের আড়াল করেনা তাকে।

 ‘ ব্যাথা করছে’ ? কচের প্রশ্নে সম্বিত ফেরে দেবযানীর। অনেক ক্ষণ ধরে তাঁর
 
     রক্ত পদ্মের মতো চরণটিকে নিজের হাতের উপর ধরেছিল কচ। আরামে চোখ বুজে প্রিয় স্পর্শের সুখে বিভোর দেবযানীকে মৃদু ধাক্কায় বাস্তবে ফিরিয়ে তার হাত ধরে সাবধানে উদ্যানের দিকে পা বাড়ালো কচ, মুখে মৃদু রহস্যময়তা, মনে চিন্তা কবে হবে কার্য সিদ্ধি? কবে ফিরে যেতে পারবে আপন পরিচিত পাঠ কক্ষে? নিজের মনে কথা বলে বলে হাঁটছিল দেবযানী, তাই নজরে পড়েনি কচের মুখ। তবে দেখলেও কি বুঝতে পারত কিছু? সরল পাখী কি বোঝে চতুর ব্যাধের কুটিলতা?

কচ ও দেবযানী পর্ব--৩
------------------------
   রাত এখন গভীর। আশ্রমের সকলে নিদ্রার কোলে। টিম টিম করে আলো জ্বেলে গভীর মনোযোগে দিনলিপি লিখছে কচ। শিখছে অনেক কিছু, যা কল্পনার অতীত। দৈত্যগুরুর অতলান্ত জ্ঞান দেখে অবাক হয়ে যায় সে। শ্রুতি পদ্ধতিতে পাঠ দেন মহর্ষি। শ্রুতি মানে শুনে মনে রাখা। এই পদ্ধতি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক। এর ফলে মেধা মনন সমস্ত কিছুর উন্নতি অনিবার্য। বৈদিক যুগে,  শিক্ষাপদ্ধতি উন্নতির জন্য ঋষিরা আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত উপায় প্রয়োগ করেছেন। শ্রুতি তার মধ্যে একটি। অদ্ভুত এই উপায়। আচার্য মুখে বলছেন, শিষ্যরা কানে শুনছে, মনে রাখছে। একটা বুনন চলে। তার ফলে মস্তিষ্কের কোষ উজ্জীবিত হয়। শ্রবণ যন্ত্র তীক্ষ্ণ হয়,স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধি পায় বহুগুণ।
     তবু, সময় পেলেই কচ কিছু সূত্র লিখে রাখে। যদিও তাঁর মনে রাখার ক্ষমতা আগামী একশো বছরেও লাঘু হবার নয়, তবু সে সুযোগের ব্যবহার করে। যে কুটিরটিতে সে থাকে, তাতে আরামের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত। এগুলি আসলে নামেই কুটির। অসুররাজ্যে ঐশ্বর্যের প্রতুলতা দিয়েছে আরাম আর প্রাচুর্য। মদ্য, মাংস, নারী কোনো কিছুর অভাব নেই। যদিও ব্রহ্মচর্য পালন কালে, কচ ওসবের দিকে ফিরেও তাকাবে না। কিন্তু চাইলে সে আশ্রমের বাইরে সব কিছুই ভোগ করতে পারে।
     রাত্রি গাঢ়। বড় বড় বৃক্ষের শাখায় সর সর হাওয়ার শব্দ ছাড়া সব নিঃশব্দ। বাতাসের মতো ধীর পায়ে  ঘরে ঢুকে  এলো কেউ। হাওয়ায় ভাসা গলায় আগন্তুক বললো--’ সাবধান কচ। প্রাণের আশঙ্কা আছে তোমার। ‘
--’ কিন্তু, আমার এখানে আসার কারণ তো কেউ জানে না।’
 আবছা হাসলো আগন্তুক--’  কুটিল ষড়যন্ত্র চলছে  তোমাকে বাঁচাতে পারে একমাত্র দেবযানী। সে তোমাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে।’
---’ আর সেই বিশ্বাস আমাকে ভঙ্গ করতে হবে! নিজেকে এতখানি নিচে নামাতে হবে ভাবিনি কখনো!’ ক্ষোভে  দুঃখে বলে উঠলো কচ।
--’ আমি  দেবতাদের আজ্ঞাবহ দূত মাত্র।
 তবু তোমার মনোবেদনার উত্তরে বলতে পারি, জাতির উপকারের জন্য সব কিছু করা যায়।’
---’ এমন কপটতার পরিবর্তে নিজের প্রাণ দিলে ভালো হতো।’ তরুণ কণ্ঠ বেদনায় বুজে যায়। দেবযানীর সরল মুখখানি মনে পড়ে। দূত বলে গেল তাঁর প্রাণ হানির আশঙ্কা আছে। এমন ধিক জীবন! যদি যায় তো যাক।
*
  বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হতে চলেছে, অথচ শুক্রাচার্যের হোমধেনু বনের কাছে চরাতে গিয়ে কচ ফেরেনি। উৎকণ্ঠায় ঘর বার করছে দেবযানী, চিন্তার আরো বিশেষ কারণ হলো, নিদির্ষ্ট সময়ে চেনা রাস্তা ধরে ঘরে ফিরে এসেছে, হোমধেনু। কিন্তু দূর দূর পর্যন্ত কচকে দেখা যাচ্ছে না।
      খুব রাগ হলো দেবযানীর। এই সময় সে গান শোনে। কচ গান গাইতে গাইতে, তার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। এসব তার অভ্যেস হয়ে গেছে। এখন যদি হঠাৎ করে অভ্যাস পূরণের লোক অদৃশ্য হয়ে যায়, তবে এমন বিরক্তি লাগে, যেন চোখে একটা ছোট বালি ঢুকে কির কির করছে।
    তারপর হলো উৎকণ্ঠা। কচ কে বিশ্বাস করে সে। নিয়ম মেনে চলা ছেলে, এমন করতেই পারে না। নির্ঘাৎ কোনো দুর্ঘটনায় পড়েছে । ভয়ে চিন্তায় অস্থির হয়ে ছুটে গেল পিতার কাছে---
  ‘ পিতা, কচ এখনো ফেরেনি। ধেনু গুলি ফিরে এসেছে। কচ নয়। পিতা, আমি নিশ্চিত, ওর কোনো বিপদ হয়েছে। তুমি কিছু করো। কচের যদি মৃত্যু ঘটে আমি কিন্তু বাঁচবো না।’
      শুক্রাচার্য অবাক হয়ে গেলেন। মেয়ে তার অবুঝ,  জেদী, অভিমানী, কিন্তু এমন স্পষ্ট করে নিজের প্রেমের কথা বলতে পারে যে, সে তো আত্মবিশ্বাসী ও বটে। মেয়ের ব্যাকুল চোখের দিকে তাকিয়ে,
  শুক্রাচার্য বুঝলেন দেরী করলে বিপদ হতে পারে। তিনি ধ্যান যোগে দেখলেন কিছু দানব , কচকে মেরে, টুকরো টুকরো করে কুকুরদের খাইয়ে দিচ্ছে।
  শিউরে উঠলেন দৈত্যগুরু। বুঝলেন, দৈত্যদের কাছে কচ এখনো শত্রুর ছেলে অথবা এক তস্কর। তাঁকে রাস্তা থেকে সরাবে অসুররাজ যেভাবেই হোক।  মনখারাপ হয়ে গেল তাঁর। নিছক সন্দেহের বশে এমন জঘন্য কাজ যারা করে, তারা কি করে দেবতাদের সমালোচনা করে? জলদ গম্ভীর স্বরে তিনি বললেন-- ‘ মা, চিন্তা নেই। এখুনি সঞ্জীবনী মন্ত্রে আহবান করছি কচ কে।’
   মন্ত্র উচ্চারণে জীবিত কচ, একেবারে অবাক হয়ে গেল। দেবযানী ছুটে গিয়ে তাঁর হাত ধরে ব্যাকুল হয়ে বলল--
  ‘ কি হয়েছিল তোমার? ‘
ভয়ার্ত গলায় কচ বললো---’আমাকে কতগুলো অসুর এসে হত্যা করেছিল দেবযানী।  ও দেবযানী! দেখো আমি বেঁচে আছি। এ কি করে সম্ভব হলো?’
 তাচ্ছিল্যের স্বরে দেবযানী বললো--’  পিতার সঞ্জীবনী মন্ত্রের গুনে তুমি ফিরে এসেছ। তিন লোকে কেবল আমার পিতাই  এই মন্ত্র জানেন। আর কেউ নয়।’
 কচ দেবযানীর হাত ধরে গাঢ় স্বরে বলল--’ আবার যদি এমন বিপদ হয়?’
---’ আবার তোমাকে বাঁচিয়ে তুলবো। তোমাকে ভালোবাসি। তোমার জন্য সব করতে পারি।’
    সন্ধ্যার অন্ধকারে ঢেকে গেছে আশ্রমের চারিপাশ। মুখ দেখা যায়না ভালো। না হলে দেবযানী দেখতে পেত তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে  এক অচেনা কচ। মুখে যার ধূর্ত কৌশলী হাসি। যে পরিষ্কার বুঝতে পারছে, সঞ্জীবনী মন্ত্রের জন্য কেন দেবযানীকে লক্ষ্য পূরণের অস্ত্র ভাবতে বলেছিলেন শ্ৰী বিষ্ণু।
কচ ও দেবযানী--৪
      কচের উপর দ্বিতীয় আক্রমণ ঘটলো খুব তাড়াতাড়ি। রোজকার মতো সেদিনও দেবযানীর জন্য ফুল সংগ্রহে গভীর অরণ্যে প্রবেশ করেছিল সে। যত গভীর অরণ্য, ততো নাম না জানা ফুলের সমারোহ। এগুলি আনলে ,চমকে যায় দেবযানী।
 ছেলে মানুষের মতো হাতে তালি দিয়ে হেসে ওঠে
     --’ আহ্হঃ। তোমার সব কিছু কেমন অন্যরকম কচ। তোমার ভাবনা, কথা, গান--এমন আর কেউ নয়।’
  ----’ এমন বলো কেন দেবযানী? আমি সাধারণ। ওই দেখো, দেখো ,বিকেলের আকাশ দিয়ে পাখা মেলে উড়ে যায় বলাকা। দেখো!’ কচ ভয় পায় নাকি? কথা ঘুরিয়ে দেয়। সে প্রেমিক নয়। সে আসলে এক নকল জাদুগর। যদি ধরে ফেলে এই সরলা বালিকা? যদি বুঝে যায়, কচের বাঁশির সুরে মিশে আছে বিষ। প্রেম নেই কোথায়ও। আছে বিশ্বাসঘাতকের কালো ধোঁয়া।
    অসুরপুরের অরণ্য আদিম। আকাশ ছোঁয়া দীর্ঘ পুরোনো বৃক্ষরাজির আড়াল ভেদ করে সূর্যের প্রবেশ অবাধ নয়, তাই নীচের জমি স্যাঁতসেঁতে ভেজা। ঝরে পড়া পাতার রাশিতে লুকিয়ে থাকে বিষাক্ত সাপ, কীট পতঙ্গ। কচ এমন দেখেনি আগে। এমন থমথমে, ঘুমন্ত অরণ্য স্বর্গে নেই। স্বর্গে সমস্ত কিছু হিসেব করে। অরণ্য আছে। কিন্তু তা পাহাড় ঝর্ণা দিয়ে সাজিয়ে মনোরম করে রাখা। স্বাভাবিক সৌন্দর্যে বেড়ে ওঠা বৃক্ষরাজির বেয়াদপি দেবরাজ সহ্য করবেন না। কচ বার বার এই অরণ্যে ছুটে আসে। এর আদিম শরীরী ঘ্রাণ বুক ভরে নেয়। খুঁজে বার করে এমন অনেক পুষ্প, যা এতদিন গোপণ ছিল, কেউ দেখেনি।
    অরণ্যের গভীরে প্রবেশের কারণ শুধু ফুল নয়, অনেক অজানা অচেনা লতা গুল্মের সন্ধান পায়  কচ, যা ভেষজ চিকিৎসায় খুব উপকারী। পাকে চক্রে দেবতা অসুরের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লেও, মূলত তাঁর মন আনন্দ পায় নিত্য নতুন আবিষ্কারে। এই যেমন সেদিন এক লতা গুল্ম আবিষ্কার করলো যার রস থেকে কর্কট রোগের আরাম হয়। যদিও এখনো সে সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারেনি। তবে, স্বর্গে তাঁর অধ্যয়ন কক্ষের উপকরণের সাহায্যে  এই লতাকে পরীক্ষা করলে হয়তো সমাধান হবে। নিজের প্রিয় পাঠ কক্ষের কথা মনে করে দীর্ঘশ্বাস পড়লো কচের। কবে শেষ হবে এই নির্বাসন?
       অরণ্যে ফুল তুলতে তুলতে রাগ ইমনের সুর গুণ গুণ করছিল কচ। আজ ইমন রাগিনীতে বীণ বাজিয়ে শোনাবে দেবযানীকে। গতকালের ওই ভয়ঙ্কর ঘটনার পরে মন এখন অনেক শান্ত। বিকেল বিকেল আশ্রমে ফিরে, বীণা বাজাবে সে। দেবযানী মানা করেছিল আজ আশ্রমের বাইরে যেতে। কিন্তু কচ তা শুনবে কেন?  নিবিড় বনানীর রহস্যময়তা তাকে টানে। সুর আর সৌন্দর্যের নেশায় বিভোর থাকলেও কচ  দেখতে পেল মাথার ওপরে নেমে আসছে চকচকে ধারালো খড়্গ। প্রাণ পনে দৌড়োলো সে। খড়্গ যেন বিদ্রুপের হাসি হেসে ধড় থেকে মাথাটা কচাৎ করে কেটে দিলো। মুণ্ডহীন কচ কিছুক্ষন ধড়ফর করার পরে স্থির হয়ে গেল।
*
  অসুররাজ্যে প্রথমেই যেটি চোখে পড়ে তা হলো ঐশ্বর্যের ঝলমলানি। বিলাসিতায় প্রকট চারিপাশ। উৎকৃষ্ট সুরা, পণ্য সামগ্রী, অপ্সরা তুল্য রমনী , মহার্ঘ বস্ত্র পরিহিত দৈত্য গণের সদর্প চলা ফেরা। রাজ্যে স্বচ্ছলতা , প্রাচুর্য উপচে পড়ছে। ময় দানবের  সুদক্ষ পরিচালনায় দক্ষ কারিগর, শিল্পীদের দলটি ক্রমাগত রাজধানীর সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে ব্যস্ত।
   শুক্রাচার্যের আশ্রমটি পাহাড়ের উপরে অতি মনোরম করে সাজানো। ভিতরে এক ছোট নদী আছে। আছে দেবযানীর পছন্দ মতো গাছ গাছালি। একটি স্বয়ংচালিত খেয়া নৌকা করে মরালির মতো নদীতে ভেসে যাচ্ছিল দেবযানী। গোধূলির আলো পড়েছে তাঁর কোমল মুখখানিতে। সে আজকাল সখীদের থেকে দূরে থেকে কচের সঙ্গে সময় কাটাতে পছন্দ করে। আর একটু পরেই আসবে কচ। বাজাবে বীণ। পাহাড়ের ওই ওপরে চাঁদ উঠে আসবে যখন , তখন নিজ কুটিরে ফেরে কচ। প্রতীক্ষা মাঝে মাঝে এত অসহনীয় হয়ে ওঠে কেন বোঝেনা দেবযানী? সূর্য ডুবে গেল যেন? ওই কে আসে ছুটে ছুটে? দেবযানী তাড়াতাড়ি ডিঙি ঘুরিয়ে তীরে চলে। কে ওই অর্বাচীন দূত? যে বলে কচ আর বেঁচে নেই?
*

 দেবযানী পাগলের মতো আচরণ করতে লাগলো। আবারো সিদ্ধ সঞ্জীবনী মন্ত্র প্রয়োগ করে বাঁচালেন কচকে ঋষি। কিন্তু এবার ক্ষুব্ধ  শুক্রাচার্য বেগে চললেন দৈত্যরাজ বৃষপর্বার কাছে
 ---’ এসব কি হচ্ছে দৈত্যরাজ? কচ আমার আশ্রিত, সন্তান তুল্য। তার ওপর এমন আক্রমণ? এ আমার অপমান! ‘
---’বিশ্বাস করুন গুরুদেব। আমি কিছুই জানি না ।  আজকাল কিছু বাইরের অবাঞ্ছিত দৈত্যের প্রবেশ ঘটেছে রাজ্যে। হয়তো তাদের সঙ্গে কোনো বিরোধ ঘটে থাকবে কচের। ‘
---’ ওমন ছেলেই নয় সে , যে অকারণ বিরোধ ঘটাবে। আপনি আমার সঙ্গে ছলনা করবেন না দৈত্যরাজ!’ ক্রোধে অগ্নিবর্ন হয়ে শুক্রাচার্য বললেন।
---’ গুরুদেব। গুরুদেব  শান্ত হন। উতলা হবেন না। আপনি অন্তর্যামী। আপনাকে ছলনা করবো এমন ক্ষমতা আমার নেই।’ রাজা বৃষপর্বা আকুল হয়ে গুরুদেবের চরণ তলে বসে পড়লেন।
---’ ব্রাহ্মণের ক্রোধ উচিৎ নয়। কিন্তু মহারাজ , আপনি সতর্ক না হলে,,কথা শেষ না করে বেগে প্রস্থান করলেন ঋষি।
   সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে রাজা বললেন
----’ আপনি সরল ব্রাহ্মণ। দেবতাদের চক্রান্ত বোঝেন না। আপনি আর দেবযানী হতে বিপদে পড়বো আমরা।’ তারপরেই হুঙ্কার দিয়ে  দৈত্যদের দিকে ফিরে বললেন --
 অপদর্থের দল! বার বার বেঁচে ফিরে আসছে বৃহস্পতি পুত্র। এবার এমন বুদ্ধি বার করো, যেন সিদ্ধ সঞ্জীবনীও বাঁচাতে না পারে ওই দুষ্টকে।’
*
 সে এক বুদ্ধি বেরোলো বটে ! দানবরা প্রথমে কচ কে কেটে কুচি কুচি করে, পুরো শরীরটাকে পুড়িয়ে, ভস্ম বানিয়ে ফেললো, তারপরে সেই ভস্মচূর্ণ  উৎকৃষ্ট মদ্যের সঙ্গে মিশিয়ে শুক্রাচার্যকে পান করতে দিলো। সন্দেহের কোনো কারণ ছিল না। সুরাপান তাঁর নিয়মিত অভ্যাসের মধ্যে পড়ে। তিনি নির্দ্বিধায় সুরার সঙ্গে মিশ্রিত কচের দেহ ভস্ম খেয়ে নিয়ে বিশ্রাম নিতে চলে গেলেন।
   উৎকন্ঠিত দেবযানীর চোখের সামনে রাত গভীর হতে লাগলো ধীরে ধীরে। কচ ফিরলো না। দেবযানীর চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগলো। অসহায়ের মত ছুটে গেল পিতার কক্ষে। উত্তেজিত কন্যার আকুল কান্নায় ঘুম ভেঙে উঠে শুক্রাচার্য বার বার প্রয়োগ করতে লাগলেন সিদ্ধ মন্ত্র। কিন্তু তবু কচ ফিরলো না। আকুল কান্নায় ভেঙে পড়লো দেবযানী। তাই দেখে দৈত্য গুরু বললেন
---’ শান্ত হও কন্যে। তুমি এত বিদ্যা শিক্ষা করেছ, জানোনা যে মরণ আসবেই একদিন? তার জন্য শোক বৃথা? আর তা ছাড়া তোমার কোনো দিক থেকেই যোগ্য নয় ওই ছেলে। শোক ভুলে নিজের কাজ করো।’
 উপদেশের উত্তরে আরো জোরে কেঁদে উঠলো দেবযানী। কাঁদতে কাঁদতে বললো---
---’ দানবরাজ্যের মতো ধনবান না হোক পিতা, কচ হৃদয়ে ধনী। আমি যা বলতাম তাই শুনতো। কোনোদিন প্রতিবাদ করেনি। পিতা, কচ আমার সখা, আমার প্রাণ।’
---’ এসব কি বলছো কন্যে?’
---’ পিতা! ওমন সুন্দর পুরুষ আমি কোনদিন দেখিনি। ওমন বিদ্বান ওমন স্নেহ --পিতা ! কচ কে আমি ভালোবাসি। সে যদি ফিরে না আসে আমি আত্মহত্যা করবো।’
    শুক্রাচার্য কন্যাকে ভালোবাসেন। কিন্তু নিজের কাজের বাইরে সময় কতটুকু দিতে পারেন? সখীদের সঙ্গে একলাই বড় হচ্ছে কন্যে। সময় দিতে অপারগ হয়ে দেন অপরিমিত প্রশয়। সেই প্রশয়ের ফল আজ সামনে দাঁড়ানো। জেদী ,অপরিণত বুদ্ধির এক তরুণী। এবং এমন সর্বনাশা জেদ ডেকে আনতেই পারে মৃত্যু, সে কথাও বোঝেন তিনি। নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকেই দুষলেন ঋষিশ্রেষ্ঠ। সান্ত্বনা দিয়ে কন্যাকে কাছে টেনে চোখের জল মুছিয়ে  ভারী গলায় বললেন---
   ‘ কেঁদোনা দেবযানী। পিতা আমি। কিন্তু পিতার কর্তব্য করিনি কোনোদিন। তোমার একাকিত্ব বুঝিনি আমি।  তোমার মনের সেই শুন্য জায়গা ভরে দিয়েছে কচ। আমি আনবো তাকে ফিরিয়ে। যে ভাবেই হোক। কিন্তু, কন্যে, আজ একটি কথা শোনা এই অসহায় পিতার। মন যেন কখনো ক্রীতদাস না হয় কারো। ক্রীতদাস মন সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ হয়ে পড়ে।’
---’পিতা! ‘ ক্রোধে চিৎকার করে ওঠে দেবযানী--’ অনর্থক কথায় সময় নষ্ট করছেন আপনি। ধ্যানযোগে জানুন কচ কোথায়? তারপর উদ্ধার করুন তাঁকে।’
----’ বেশ পুত্রী। তাই হোক তবে।’  আচমন করে ধ্যানে বসলেন মহামতি।
      নির্জন বনানী। অপার মহিমায় রাত্রি ক্রমে রহস্যময়। কিছু নিজস্ব শব্দ থাকে রাতের, থাকে নিজস্ব স্পর্শ। গোটা একটা দিন হলো প্রকৃতির সংবাদ বাহক। সকাল থেকে রাত বিভিন্ন সময়ের প্রেক্ষাপট , বিভিন্ন বার্তা বহন করে আনে।
   উৎকন্ঠিত দেবযানীর সামনে চোখ খুললেন শুক্রাচার্য। এই মাত্র ধ্যানে যা দেখলেন তা এত ভয়ঙ্কর, এতই বেদনাবহ এবং বীভৎস --সে সংবাদ তিনি দেবেন কি করে ওই প্রাণ পুতুলিকে? নিজেকে মহাজ্ঞানী মনে করতেন তিনি। আজ দেখলেন সময়ের বিদ্রূপের কাছে কিভাবে পরাজিত হয় জ্ঞান। এমন অসহায় ,এমন ক্লান্ত কখনো বোধ করেন নি তিনি। দেবতা অসুর মানব --কালের পদতলে প্রত্যেকেকে নতজানু হতে হয়। ক্লিষ্ট মুখে তিনি তাকালেন কন্যার দিকে। এমনই বেদনার্ত সেই ভঙ্গী যে দেবযানী চমকে উঠলো , দ্রুত পায়ে পিতার কাছে বসে, দুই হাতে গলা জড়িয়ে স্নেহ সিক্ত স্বরে প্রশ্ন করলো --
  ‘ কি হয়েছে পিতা? কি হয়েছে আমাকে বলো?’
কন্যার সুকুমার মুখটির দিকে তাকিয়ে চোখে জল এলো দোর্দন্ডপ্রতাপ ঋষির। শুষ্ক হেসে বললেন---
  ‘ তোমার প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়েছি পুত্রী। জেনেছি কচ কোথায় আছে?’
---’ জানতাম পিতা। আপনি সর্বশক্তিমান। আপনি পারবেন না, এমন কোনো কাজ নেই। এবার ফিরিয়ে দিন আমার প্রিয়তমকে।’
---’তার আগে একটি প্রশ্নের উত্তর তোমাকে দিতে হবে, দেবযানী।’
---’প্রশ্ন? এই সময়ে? আচ্ছা, বলুন কি প্রশ্ন?’
---’ কাকে জীবিত দেখতে চাও তুমি? তোমার পিতাকে না কচকে? যে কোনো একজন কে বেছে নিতে হবে তোমাকে। পিতা অথবা কচ!’

    রাত্রির অন্ধকার ভেদ করে কর্কশ স্বরে পেঁচক ডেকে উঠলো এক। পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো কন্যার প্রতি পিতার চিরকালীন প্রশ্ন
----’কাকে চাও কন্যে? পিতা না প্রেমিক? পিতা না প্রেমিক? পিতা না প্রেমিক?’
পর্ব --৫
---------
       অসুররাজ্যে  উৎসবের মেজাজ  আজ সকাল থেকে।  উৎসবের কারণ নিয়ে  কেউ কিছু বলছে না। এমন কি কানাকানি পর্যন্ত নয়। চাপা খুশি যাকে বলে। কিন্তু লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়, অন্যদিনের তুলনায় দৈত্যরাজ বৃষপর্বা, বেশ খোশ মেজাজে সিংহাসনে বসে উৎকৃষ্ট মৈরেয় পান করছেন সেই সঙ্গে অকাতরে দান করেছেন ছোট ছোট মূল্যবান স্ফটিক খন্ড, স্বর্ণ মুদ্রা, গহনা এবং সূক্ষ্ম বস্ত্র। আজ সভায় রোজকার কাজের তেমন গুরুত্ত্ব নেই, বরং অমাত্য ও অন্যান্য উচ্চ পদস্থ রাজ কর্মচারীরা নিজেদের মধ্যে কৌতুক দৃষ্টি বিনিময় করে চলেছে।
  এমন সময় রাজ সমীপে এসে অভিবাদন করে দাঁড়ালো গুপ্তচর।
---’ এখন কি সংবাদ হে?’ লঘু মেজাজে জিজ্ঞেস করলেন মহারাজ।
---’ মহারাজ। রাত ভোর পর্যন্ত গুরুদেব আর আচার্যা দেবযানীর বাক বিতণ্ডা চলেছে। তারপর হঠাৎ সব নীরব হয়ে যায়। মহারাজ, আপনি তো জানেন, গুরুদেবের আশ্রমে প্রবেশ করা, যে কোনো দুর্গের চাইতেও কঠিন।’ ইনিয়ে বিনিয়ে সংবাদ বাহক অজুহাত দিতে থাকে।
----’ অযথা বাক্য প্রবাহে বিলম্ব না করে মূল কথায় এসো তুমি।’  বিরক্তি চাপা নেই দৈত্যরাজের স্বরে,
  ---’ গুরুদেব আর তাঁর কন্যার বাক বিতন্ডার সংবাদে আমার কোনো রুচি নেই। আর তোমাকে , তোমার দল বল সহ গুরুদেবের উপরে নজর রাখতে বলা হয়েছিল, তুমি এখানে চলে এলে কেন?’
---’ মহারাজ! সেই কথাই তো বলছি, আমরা ভালো করে কিছু দেখতে পাইনি সত্য, কিন্তু শুনতে পেয়েছি।’
----’ শুনবে আর কি? প্রথমে বাক বিতণ্ডা তারপরে কান্না। দেবযানীর কান্না। মৃত কচের জন্য। হাঃ। কি আনন্দ আজ। দুষ্ট দেবতাদের চক্রান্ত ব্যর্থ হলো। শান্তিতে মদ্য পান করবো আজ।’
 বার্তা বাহক দানব কুন্ঠিত মুখে, বিশাল শরীর যথা সাধ্য ঝুঁকিয়ে, করুণ কণ্ঠে বললো---
   ‘ কান্না নয় মহারাজ। ভোর সকালে আমরা শুনলাম বীণা বাজিয়ে গান।’
---গান?’ সমস্বরে সভাস্থ সমস্ত দানব আর্তনাদ করে উঠলো--’ বীণা বাজিয়ে গান?’ মুহূর্তে আমোদিত সভাঘরের উপর ছেয়ে গেল বিষাদের কালো মেঘ। কি বলে এই অর্বাচীন? জলদগম্ভীর কণ্ঠে প্রধান অমাত্য প্রশ্ন করলেন---
  ‘ গান? কচ মৃত। এখন গান কে গাইবে? হে দূত, তুমি দেবযানীর কান্নাকেই গান ভেবে ভুল করছো। ভালো করে ভেবে বলো।’ রুষ্ট কণ্ঠে মহামন্ত্রী বলেন।
---’ না মহামন্ত্রী।  কান্না নয়। পুরুষ কণ্ঠে সুন্দর সাবলীল সুর পাহাড়ের উপর দিয়ে ভেসে ভেসে আমাদের কানে এলো। ব্যাপার কিছু বুঝতে না পেরেই আমি এখানে চলে এসেছি।’
   থেমে গেল নর্তকীদের নুপূর নিক্কন, ফেনিভ মদিরার পাত্র ম্রিয়মান, হীরক খণ্ডের মতো বাতিদান নিষ্প্রভ, স্বর্ণ সিংহাসনে উজ্জ্বল বস্ত্রে সুপরুষ দৈত্যরাজের হাস্যোজ্জ্বল মুখে কালো ছায়া
  পুরুষ কণ্ঠে সংগীত? বীণ বাদন? তার মানে?
      কচ বেঁচে আছে? জীবিত আছে?  কি করে সম্ভব হলো এই অসম্ভব কাজ? কে করলো? কিভাবেই বা করলো?
কচ ও দেবযানী ---পর্ব -৬ ---জয়তী রায়

---------–----/-----------------------------------
        ‘ নারায়ণ নারায়ণ’ বলতে বলতে নারদ হাজির বিষ্ণুলোকে। স্বর্গ মর্ত্য পাতাল তিনলোকে নারদ , যেখানে যখন মন চায় পৌঁছে যান। তিনি হলেন সবজান্তা ঋষি। তিনলোকের সব গোপন খবর তাঁর ঝুলিতে মজুত। তবে শিবলোকে নারদ ঘেঁষেন না। ওই ভোলানাথকে তিনি সমীহ করেন। ভূত প্রেত , বদমেজাজী নন্দী ভৃঙ্গি নিয়ে সপরিবারে বাস দেবের দেব মহাদেব স্বর্গের ধার ধারেন না । বেশির ভাগ সময় গভীর তপস্যায় মগ্ন থাকেন। যে যুদ্ধে দেবতারা একেবারে গো হারান হেরে যান, সেখানে তিনি ত্রাতা রূপে উপস্থিত হবেন, নিজের ভয়ঙ্কর ত্রিশূল নিয়ে। এবং, সে যুদ্ধে জয় অনিবার্য। ওখানে নারদ ঘেঁষেন না। কে জানে কখন তৃতীয় নয়নের আগুন দিয়ে ভস্ম করে দেন। আসলে যেখানে কপটতা নেই, সেই স্থানে একটু সামলে চলাই ভালো।
  বিষ্ণুলোক স্বর্গের সবচেয়ে সুন্দর স্থান। দেবরাজ ইন্দ্রের সভায় ঐশ্বর্যের আড়ম্বর বেশি, কিন্তু বিষ্ণুলোক , লক্ষীর হাতের ছোঁয়াতে সৌন্দর্য ও সুরুচির প্রকাশে অপরূপ। ব্যক্তির নিজের বিভা স্থান কে মহত্ব পূর্ণ করে তোলে। শ্রী বিষ্ণু , একজন ধী যুক্ত দেবতা। জ্ঞান, বুদ্ধি, ব্যক্তিত্বে তিনি সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। নারদ নিজেকে বিষ্ণুর পরম ভক্ত বলে মনে করেন। এবং যখন ইচ্ছে হয়, নিজের ইষ্ট দেবতাকে দর্শণ করতে চলে আসেন।
      নারদকে দেখে খুশি মনে আহবান জানালেন বিষ্ণু
      ---’ আসন গ্রহণ করুন ঋষিবর। কুশল মঙ্গল সব?’
 প্রণাম করে নারদ বললেন--’ আপনার ছত্র ছায়ায় আছি ভগবন। কোনো অনিষ্টর ক্ষমতা নেই আমাকে স্পর্শ করবার।’
স্মিত প্রশয়ের হাসি হাসলেন বিষ্ণু। কে না জানে ভক্ত হলো দেবতার বড় হাতিয়ার। যার যত ভক্ত, সে তত শক্তিশালী দেবতা।
 --’ আয়ুষ্মান ভব। তা ঋষিবর , আগমনের হেতু?’
 --’  ভগবন! এখন তো সর্বত্র প্রধান আলোচ্য বিষয়  কচ দেবযানী। সিদ্ধ সঞ্জীবনী মন্ত্রটি অপহরণ করতে সে সক্ষম হলো শেষ পর্যন্ত, এই নিয়েই নানা আলোচনা চলছে।’ বিনীত কিন্তু কৌশলী কণ্ঠে বললেন নারদ। একটু উপহাস যেন বলার ভঙ্গীতে?
---’অপহরণ? অপহরণ কেন বলছো নারদ? তোমার আস্পর্ধা তো কম নয়? বৃহস্পতি পুত্র  মন্ত্র  শিক্ষা করতে গেছে। চাতুরী করতে নয়।’
 ---’ প্রভু রুষ্ট হবেন না প্রভু। এ আমার কথা নয়। তিনলোকেই এমন কানাকানি চলছে যে, দেবতারা বড় ঘৃণিত ছলনা করেছে অসুরদের সঙ্গে। প্রভু! কি বলবো আপনাকে লজ্জার কথা, লোকে এমন কথাও বলছে যে, ভবিষ্যতে দেবযানী গভীর বিষাদে ডুবে যাবে  কচের জন্য।’
----’ তুমি থামো নারদ। দেবযানী কখনোই হার মানবে না জীবনের কাছে। সে বাঁচতে জানে। কচ স্বর্গ রাজ্যে ফিরে এলেই সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে আবার। ‘
----’ প্রভু। কি যে বলেন! ক্ষমা করবেন দেব। কচ ছলনা করেছে, কিন্তু দেবযানী নয়। সে মন সমর্পণ করেছে কচকে।
---’ শোনো নারদ। যা ঘটবার তাই ই ঘটবে। ন্যায় অন্যায় সব কিছু কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। দুঃখ বা আঘাতের প্রয়োজন আছে বই কি! দুঃখের আগুনে পুড়ে আসে পরিণত বোধ।’
---’ নারায়ণ ! নারায়ণ! প্রণাম। আপনার সান্নিধ্য আমাকে বড় আনন্দ দেয় প্রভু! এখন দাসের প্রতি কি আজ্ঞা?’
----’ কে দাস? ভক্ত কখনো দাস নয়। প্রকৃত ভক্তের দাস স্বয়ং ভগবান। সে যাই হোক, তুমি অসুর রাজ্যে যাও।  অনুপার্বিক জেনে আমাকে বলো।’
----’ যথা আজ্ঞা  প্রভু।’
*
 মহর্ষি শুক্রাচার্যের  আশ্রমে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। ঠান্ডা বাতাস বইছে। পাখিদের কূজন আর সুবাসিত পুষ্পের আয়োজনে একটি নিশ্চিন্ত ভোর নেমে এসেছে  আশ্রমের উপরে।
       আহির ভৈরবীর সুরে বীণ বাজিয়ে তন্ময় সুরে গান গাইছে কচ। ঈষৎ দূরে একটু  শুক্রাচার্য বসে আছেন নিমিলিত চোখে, শরীরে ক্লান্তির ছায়া হলেও মুখখানি প্রফুল্ল। দেবযানী হাঁটুর উপরে মুখ খানি রেখে শান্ত মনে কচের গান শুনছে। সমস্ত বাতাবরণ শান্ত, স্নিগ্ধ, সৌম্য। গতরাতে যে বিপদের ঝড় বয়ে গিয়েছিল , তার চিন্হ মাত্র আর নেই।
    গান শেষ হলে, শুক্রাচার্য আপন কক্ষে ফিরে গেলে, কচ  দেবযানীর কাছে গিয়ে,  করতলে তার মুখখানি নিয়ে বললো---
   ‘ গতকাল তোমার জন্য প্রাণ ফিরে পেলাম। তোমার জন্যই  সিদ্ধ সঞ্জীবনী  মন্ত্র শিখতে পারলাম। এখনো ভাবলে শিউরে উঠছি, কি করে গুরুদেবের উদর থেকে আমি নতুন জন্ম লাভ করলাম। ‘
   দুই হাত দিয়ে প্রিয়তমের মাথার চুল গুলি নেড়ে দিল দেবযানী। অপলক তাকিয়ে রইলো তাঁর মুখের দিকে। এমন তো নয়, যে, তাকে কেউ কোনোদিন প্রেম নিবেদন করেনি? কিন্তু এমন সারল্য , তাকে ঘিরেই স্নেহের দিনরাতের আবর্তন আর কার ছিল? কচ যখন তাকে ‘ দেবী ‘ বলে সম্বোধন করে, তার কেমন মৃতা মায়ের কথা মনে হয়। যাকে সে কোনোদিন পায়নি।
  --’ কচ !কচ! তুমি জানো না, আমার জীবনে যে সুর তুমি বাজিয়েছ, তার মূল্য কতখানি। কচ তুমি জানোনা গতকাল রাতে আমি কি ভয়ঙ্কর খেলা খেলেছি পিতার সঙ্গে, শুধু তোমার জন্য। ভালোবাসলে মানুষ সব পারে।’ অস্ফুটে নিজের মনে কথা গুলো বললো দেবযানী।
---’ দেবী! চলো কুটিরে ফিরে যাই। তুমি একটু বিশ্রাম করো। আজ পাঠে যাবো না। গুরুদেব বিশ্রাম নিক। আমি তোমার জন্য মালা গেঁথে দি।”
---’ কচ। আমার কোথায়ও যেতে ইচ্ছে করছে না। সমস্ত আতঙ্কের শেষে শরীর ভার মুক্ত। এখন এই নরম তৃণের উপরে নিজের শরীর ছেড়ে দিয়ে বেশ লাগছে।’
--’ তাহলে তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দি?’
---’ কচ। এমন কেন করছো? শান্ত হয়ে বসো। একটু অনুভব করি এসো। কেন তোমার ভালো লাগছে না মুহূর্তটি?’
---’ দেবী!  আমার তো আজ ভোরে নতুন জন্ম হলো। মনে করে দেখো, আমার ভস্মীভূত শরীর সুরার সঙ্গে পান করেছেন গুরুদেব। এবার যদি তিনি সিদ্ধ সঞ্জীবনীর জোরে আমাকে বাঁচাতে যান , তবে তাঁর পেট চিরে আমাকে বেরোতে হবে। অর্থাৎ গুরুদেব মৃত্যু না হলে আমি বাঁচবো না।’
---’ পিতাও সে কথাই বলেছিলেন কচ। প্রশ্ন করেছিলেন যে পিতা না প্রেমিক -- দুজনের মধ্যে কাকে চাই আমি!’ কচের কোলে নিজের ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়ে দেবযানী বললো। এক রাতেই তাঁর পরিবর্তন লক্ষণীয়। চপলা কিশোরী থেকে পরিণত নারী যেন আজ সে। সস্নেহে দেবযানীর কপোল চুম্বন করে কচ বলে--
  -’ বুঝতে পারছি তোমার সংকট’
দেবযানী যেন শুনতেই পেলনা কচের কথা। দুরাগত পাখির শিষের মতো গলায় বলে গেল--
  ‘ আমি চিৎকার করে বললাম , দুজনকেই চাই পিতা। দুজনকেই চাই। কঠিন গলায় পিতা বললেন একজন দেবযানী। মাত্র একজন।’ চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল নেমে এলো বলতে বলতে
---’ কি অসহায় অবস্থা আমার। বুকটা যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। হাল ছেড়ে দিয়ে পিতার মুখের দিয়ে তাকিয়ে বসে রইলাম। পিতা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে উঠলেন। হাতে মন্ত্রপূতঃ জল নিয়ে সেই কাজ করলেন, যা কেবল মাত্র একজন পিতাই করতে পারেন।’
---’ জানি দেবী। আমি তখন গুরুদেবের উদরে। তাঁর সঞ্জীবনী মন্ত্রের প্রভাবে জ্ঞান চোখ মেলেছি সেখানেই। কিন্তু সেই শরীর তখন সূক্ষ্ম। যদি বেরোতে চাই, মারা পড়বেন গুরুদেব। সে কথা টি খুব সংকোচে জানাতে গুরুদেব আমাকে দান করলেন সিদ্ধ সঞ্জীবনী মন্ত্র। ‘ বলতে বলতে দু হাত উপরে তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াল কচ, ঊর্ধ্বমুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবাবেগে বলতে লাগলো
--’ আমি সমস্ত মন প্রাণ দিয়ে অপরাজেয় ওই মন্ত্র শিক্ষা করলাম। বার বার মনন করলাম। তারপর গুরুর উদর ছিন্ন করে বাইরে এসে, মন্ত্রের প্রথম পরীক্ষা করলাম গুরুদেবের মৃত দেহের উপর।’
     উত্তেজিত কচ স্থান কাল পাত্র ভুলে আকাশপানে দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল-
---’আশ্চর্য আশ্চর্য। আমি মন্ত্র প্রয়োগ করা মাত্র গুরুদেব বেঁচে উঠলেন। ওহঃ, কি আনন্দ। কি আনন্দ। মৃত শরীর প্রাণ পেল। আমি পারলাম সেই অসম্ভব সম্ভব করতে। আমার সব পরিশ্রম সফল। এবার ফিরে যাব স্বর্গরাজ্যে।’
---’ কচ!!’ তীর বেগে উঠে দাঁড়ালো দেবযানী, নিজের কানকে বিশ্বাস না করে,  বিস্ফারিত দুই চোখ টান করে চিৎকার করে বললো সে---’ ফিরে যাবে? কোথায় ফিরে যাবে? কি বলছো তুমি? আমরা বিবাহ করবো এবার কচ। ‘
---’বিবাহ? সে তো সম্ভব নয় দেবী। গুরু কন্যা তুমি। সর্বোপরি, গতকাল গুরু শুক্রাচার্যের উদর হতে পুনর্জন্ম হয়েছে আমার। সেই হিসেবে আমরা ভাই বোন। বিবাহের তো প্রশ্নই নেই।’

   এতক্ষণ আড়ালে দাঁড়িয়ে এই নাটকটি দেখছিলেন দেবর্ষি নারদ। দেবযানীর দিকে তাকিয়ে সমস্ত দেবতা জাতের উপর ক্রোধে জ্বলছিল তাঁর সর্ব অঙ্গ। তিনি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। তীব্র বেগে স্বর্গের দিকে পলায়ন করলেন।  প্রত্যাখ্যাতা নারী বিষধর সাপের চাইতেও ভয়ঙ্কর। নারদ কি ভয় পেলেন? অভিজ্ঞ ঋষি জানেন, নারী যেমন সর্বস্ব দেয়, তেমনি সর্বস্বান্ত করেও দিতে পারে। পরিণতির ভয়ঙ্কর ফলাফলকে স্বর্গের নিরাপদ স্থানে বসে দেখাই ভালো।

  পর্ব -৬
---------------------
        ‘ নারায়ণ নারায়ণ’ বলতে বলতে নারদ হাজির বিষ্ণুলোকে। স্বর্গ মর্ত্য পাতাল তিনলোকে নারদ , যেখানে যখন মন চায় পৌঁছে যান। তিনি হলেন সবজান্তা ঋষি। তিনলোকের সব গোপন খবর তাঁর ঝুলিতে মজুত। তবে শিবলোকে নারদ ঘেঁষেন না। ওই ভোলানাথকে তিনি সমীহ করেন। ভূত প্রেত , বদমেজাজী নন্দী ভৃঙ্গি নিয়ে সপরিবারে বাস দেবের দেব মহাদেব স্বর্গের ধার ধারেন না । বেশির ভাগ সময় গভীর তপস্যায় মগ্ন থাকেন। যে যুদ্ধে দেবতারা একেবারে গো হারান হেরে যান, সেখানে তিনি ত্রাতা রূপে উপস্থিত হবেন, নিজের ভয়ঙ্কর ত্রিশূল নিয়ে। এবং, সে যুদ্ধে জয় অনিবার্য। ওখানে নারদ ঘেঁষেন না। কে জানে কখন তৃতীয় নয়নের আগুন দিয়ে ভস্ম করে দেন। আসলে যেখানে কপটতা নেই, সেই স্থানে একটু সামলে চলাই ভালো।
  বিষ্ণুলোক স্বর্গের সবচেয়ে সুন্দর স্থান। দেবরাজ ইন্দ্রের সভায় ঐশ্বর্যের আড়ম্বর বেশি, কিন্তু বিষ্ণুলোক , লক্ষীর হাতের ছোঁয়াতে সৌন্দর্য ও সুরুচির প্রকাশে অপরূপ। ব্যক্তির নিজের বিভা স্থান কে মহত্ব পূর্ণ করে তোলে। শ্রী বিষ্ণু , একজন ধী যুক্ত দেবতা। জ্ঞান, বুদ্ধি, ব্যক্তিত্বে তিনি সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। নারদ নিজেকে বিষ্ণুর পরম ভক্ত বলে মনে করেন। এবং যখন ইচ্ছে হয়, নিজের ইষ্ট দেবতাকে দর্শণ করতে চলে আসেন।
      নারদকে দেখে খুশি মনে আহবান জানালেন বিষ্ণু
      ---’ আসন গ্রহণ করুন ঋষিবর। কুশল মঙ্গল সব?’
 প্রণাম করে নারদ বললেন--’ আপনার ছত্র ছায়ায় আছি ভগবন। কোনো অনিষ্টর ক্ষমতা নেই আমাকে স্পর্শ করবার।’
স্মিত প্রশয়ের হাসি হাসলেন বিষ্ণু। কে না জানে ভক্ত হলো দেবতার বড় হাতিয়ার। যার যত ভক্ত, সে তত শক্তিশালী দেবতা।
 --’ আয়ুষ্মান ভব। তা ঋষিবর , আগমনের হেতু?’
 --’  ভগবন! এখন তো সর্বত্র প্রধান আলোচ্য বিষয়  কচ দেবযানী। সিদ্ধ সঞ্জীবনী মন্ত্রটি অপহরণ করতে সে সক্ষম হলো শেষ পর্যন্ত, এই নিয়েই নানা আলোচনা চলছে।’ বিনীত কিন্তু কৌশলী কণ্ঠে বললেন নারদ। একটু উপহাস যেন বলার ভঙ্গীতে?
---’অপহরণ? অপহরণ কেন বলছো নারদ? তোমার আস্পর্ধা তো কম নয়? বৃহস্পতি পুত্র  মন্ত্র  শিক্ষা করতে গেছে। চাতুরী করতে নয়।’
 ---’ প্রভু রুষ্ট হবেন না প্রভু। এ আমার কথা নয়। তিনলোকেই এমন কানাকানি চলছে যে, দেবতারা বড় ঘৃণিত ছলনা করেছে অসুরদের সঙ্গে। প্রভু! কি বলবো আপনাকে লজ্জার কথা, লোকে এমন কথাও বলছে যে, ভবিষ্যতে দেবযানী গভীর বিষাদে ডুবে যাবে  কচের জন্য।’
----’ তুমি থামো নারদ। দেবযানী কখনোই হার মানবে না জীবনের কাছে। সে বাঁচতে জানে। কচ স্বর্গ রাজ্যে ফিরে এলেই সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে আবার। ‘
----’ প্রভু। কি যে বলেন! ক্ষমা করবেন দেব। কচ ছলনা করেছে, কিন্তু দেবযানী নয়। সে মন সমর্পণ করেছে কচকে।
---’ শোনো নারদ। যা ঘটবার তাই ই ঘটবে। ন্যায় অন্যায় সব কিছু কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। দুঃখ বা আঘাতের প্রয়োজন আছে বই কি! দুঃখের আগুনে পুড়ে আসে পরিণত বোধ।’
---’ নারায়ণ ! নারায়ণ! প্রণাম। আপনার সান্নিধ্য আমাকে বড় আনন্দ দেয় প্রভু! এখন দাসের প্রতি কি আজ্ঞা?’
----’ কে দাস? ভক্ত কখনো দাস নয়। প্রকৃত ভক্তের দাস স্বয়ং ভগবান। সে যাই হোক, তুমি অসুর রাজ্যে যাও।  অনুপার্বিক জেনে আমাকে বলো।’
----’ যথা আজ্ঞা  প্রভু।’
*
 মহর্ষি শুক্রাচার্যের  আশ্রমে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। ঠান্ডা বাতাস বইছে। পাখিদের কূজন আর সুবাসিত পুষ্পের আয়োজনে একটি নিশ্চিন্ত ভোর নেমে এসেছে  আশ্রমের উপরে।
       আহির ভৈরবীর সুরে বীণ বাজিয়ে তন্ময় সুরে গান গাইছে কচ। ঈষৎ দূরে একটু  শুক্রাচার্য বসে আছেন নিমিলিত চোখে, শরীরে ক্লান্তির ছায়া হলেও মুখখানি প্রফুল্ল। দেবযানী হাঁটুর উপরে মুখ খানি রেখে শান্ত মনে কচের গান শুনছে। সমস্ত বাতাবরণ শান্ত, স্নিগ্ধ, সৌম্য। গতরাতে যে বিপদের ঝড় বয়ে গিয়েছিল , তার চিন্হ মাত্র আর নেই।
    গান শেষ হলে, শুক্রাচার্য আপন কক্ষে ফিরে গেলে, কচ  দেবযানীর কাছে গিয়ে,  করতলে তার মুখখানি নিয়ে বললো---
   ‘ গতকাল তোমার জন্য প্রাণ ফিরে পেলাম। তোমার জন্যই  সিদ্ধ সঞ্জীবনী  মন্ত্র শিখতে পারলাম। এখনো ভাবলে শিউরে উঠছি, কি করে গুরুদেবের উদর থেকে আমি নতুন জন্ম লাভ করলাম। ‘
   দুই হাত দিয়ে প্রিয়তমের মাথার চুল গুলি নেড়ে দিল দেবযানী। অপলক তাকিয়ে রইলো তাঁর মুখের দিকে। এমন তো নয়, যে, তাকে কেউ কোনোদিন প্রেম নিবেদন করেনি? কিন্তু এমন সারল্য , তাকে ঘিরেই স্নেহের দিনরাতের আবর্তন আর কার ছিল? কচ যখন তাকে ‘ দেবী ‘ বলে সম্বোধন করে, তার কেমন মৃতা মায়ের কথা মনে হয়। যাকে সে কোনোদিন পায়নি।
  --’ কচ !কচ! তুমি জানো না, আমার জীবনে যে সুর তুমি বাজিয়েছ, তার মূল্য কতখানি। কচ তুমি জানোনা গতকাল রাতে আমি কি ভয়ঙ্কর খেলা খেলেছি পিতার সঙ্গে, শুধু তোমার জন্য। ভালোবাসলে মানুষ সব পারে।’ অস্ফুটে নিজের মনে কথা গুলো বললো দেবযানী।
---’ দেবী! চলো কুটিরে ফিরে যাই। তুমি একটু বিশ্রাম করো। আজ পাঠে যাবো না। গুরুদেব বিশ্রাম নিক। আমি তোমার জন্য মালা গেঁথে দি।”
---’ কচ। আমার কোথায়ও যেতে ইচ্ছে করছে না। সমস্ত আতঙ্কের শেষে শরীর ভার মুক্ত। এখন এই নরম তৃণের উপরে নিজের শরীর ছেড়ে দিয়ে বেশ লাগছে।’
--’ তাহলে তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দি?’
---’ কচ। এমন কেন করছো? শান্ত হয়ে বসো। একটু অনুভব করি এসো। কেন তোমার ভালো লাগছে না মুহূর্তটি?’
---’ দেবী!  আমার তো আজ ভোরে নতুন জন্ম হলো। মনে করে দেখো, আমার ভস্মীভূত শরীর সুরার সঙ্গে পান করেছেন গুরুদেব। এবার যদি তিনি সিদ্ধ সঞ্জীবনীর জোরে আমাকে বাঁচাতে যান , তবে তাঁর পেট চিরে আমাকে বেরোতে হবে। অর্থাৎ গুরুদেব মৃত্যু না হলে আমি বাঁচবো না।’
---’ পিতাও সে কথাই বলেছিলেন কচ। প্রশ্ন করেছিলেন যে পিতা না প্রেমিক -- দুজনের মধ্যে কাকে চাই আমি!’ কচের কোলে নিজের ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়ে দেবযানী বললো। এক রাতেই তাঁর পরিবর্তন লক্ষণীয়। চপলা কিশোরী থেকে পরিণত নারী যেন আজ সে। সস্নেহে দেবযানীর কপোল চুম্বন করে কচ বলে--
  -’ বুঝতে পারছি তোমার সংকট’
দেবযানী যেন শুনতেই পেলনা কচের কথা। দুরাগত পাখির শিষের মতো গলায় বলে গেল--
  ‘ আমি চিৎকার করে বললাম , দুজনকেই চাই পিতা। দুজনকেই চাই। কঠিন গলায় পিতা বললেন একজন দেবযানী। মাত্র একজন।’ চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল নেমে এলো বলতে বলতে
---’ কি অসহায় অবস্থা আমার। বুকটা যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। হাল ছেড়ে দিয়ে পিতার মুখের দিয়ে তাকিয়ে বসে রইলাম। পিতা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে উঠলেন। হাতে মন্ত্রপূতঃ জল নিয়ে সেই কাজ করলেন, যা কেবল মাত্র একজন পিতাই করতে পারেন।’
---’ জানি দেবী। আমি তখন গুরুদেবের উদরে। তাঁর সঞ্জীবনী মন্ত্রের প্রভাবে জ্ঞান চোখ মেলেছি সেখানেই। কিন্তু সেই শরীর তখন সূক্ষ্ম। যদি বেরোতে চাই, মারা পড়বেন গুরুদেব। সে কথা টি খুব সংকোচে জানাতে গুরুদেব আমাকে দান করলেন সিদ্ধ সঞ্জীবনী মন্ত্র। ‘ বলতে বলতে দু হাত উপরে তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াল কচ, ঊর্ধ্বমুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবাবেগে বলতে লাগলো
--’ আমি সমস্ত মন প্রাণ দিয়ে অপরাজেয় ওই মন্ত্র শিক্ষা করলাম। বার বার মনন করলাম। তারপর গুরুর উদর ছিন্ন করে বাইরে এসে, মন্ত্রের প্রথম পরীক্ষা করলাম গুরুদেবের মৃত দেহের উপর।’
     উত্তেজিত কচ স্থান কাল পাত্র ভুলে আকাশপানে দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল-
---’আশ্চর্য আশ্চর্য। আমি মন্ত্র প্রয়োগ করা মাত্র গুরুদেব বেঁচে উঠলেন। ওহঃ, কি আনন্দ। কি আনন্দ। মৃত শরীর প্রাণ পেল। আমি পারলাম সেই অসম্ভব সম্ভব করতে। আমার সব পরিশ্রম সফল। এবার ফিরে যাব স্বর্গরাজ্যে।’
---’ কচ!!’ তীর বেগে উঠে দাঁড়ালো দেবযানী, নিজের কানকে বিশ্বাস না করে,  বিস্ফারিত দুই চোখ টান করে চিৎকার করে বললো সে---’ ফিরে যাবে? কোথায় ফিরে যাবে? কি বলছো তুমি? আমরা বিবাহ করবো এবার কচ। ‘
---’বিবাহ? সে তো সম্ভব নয় দেবী। গুরু কন্যা তুমি। সর্বোপরি, গতকাল গুরু শুক্রাচার্যের উদর হতে পুনর্জন্ম হয়েছে আমার। সেই হিসেবে আমরা ভাই বোন। বিবাহের তো প্রশ্নই নেই।’

   এতক্ষণ আড়ালে দাঁড়িয়ে এই নাটকটি দেখছিলেন দেবর্ষি নারদ। দেবযানীর দিকে তাকিয়ে সমস্ত দেবতা জাতের উপর ক্রোধে জ্বলছিল তাঁর সর্ব অঙ্গ। তিনি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। তীব্র বেগে স্বর্গের দিকে পলায়ন করলেন।  প্রত্যাখ্যাতা নারী বিষধর সাপের চাইতেও ভয়ঙ্কর। নারদ কি ভয় পেলেন? অভিজ্ঞ ঋষি জানেন, নারী যেমন সর্বস্ব দেয়, তেমনি সর্বস্বান্ত করেও দিতে পারে। পরিণতির ভয়ঙ্কর ফলাফলকে স্বর্গের নিরাপদ স্থানে বসে দেখাই ভালো।

     ( ক্রমশঃ)