Tuesday, May 15, 2018

”প্রসিকিউটর হিসাবে তুরিন যা বলেছেন, তা সম্পূর্ণ আনএথিক্যাল “- ওয়াহিদুল হক

 একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ করার দায়ে গ্রেফতার ওয়াহিদুল হক জিজ্ঞাসাবাদে তদন্ত কমিটিকে বলেছেন, ”আকস্মিক ভাবে তুরিন আফরোজ ফোন করে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার প্রস্তাব দেন এবং পরবর্তীতে প্রসিকিউটর হিসাবে যেসব কথা বলেছেন, তা সম্পূর্ণ আনএথিক্যাল ।”

তার মোবাইল ফোনে থাকা দুই অডিও রেকর্ডের কারণে ফেঁসে গেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ।আইনমন্ত্রী দেশে ফিরলেই পরবর্তী পদক্ষেপ ।

রাজধানীর গুলশান থেকে গত ২৪ এপ্রিল জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা-এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ওয়াহিদুল হককে গ্রেফতার করে গুলশান পুলিশ। তার মোবাইল ফোনটি জব্দ করার পর সেটি পরীক্ষা করতে গিয়ে দুটি অডিও রেকর্ড পাওয়া যায়। অডিওতে তার সঙ্গে তুরিনের যোগাযোগের তথ্য ছিল। অডিও রেকর্ড আইনমন্ত্রী  শুনেছেন। আইনমন্ত্রী দেশে ফিরলেই পরবর্তী পদক্ষেপ  নেয়া হবে বলে জানা যায় ।

তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগে তদন্ত হচ্ছে ৷  আসামি ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে গোপন বৈঠক, মামলার নথি তার কাছে হস্তান্তর ও মামলার মেরিট নিয়ে কথা বলা৷
অভিযোগের প্রমাণ ও অডিও রেকর্ড এরই মধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করেছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু৷ প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তুরিন আফরোজকে ট্রাইব্যুনালের সব মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে৷

গুলশান থানার ওসি অডিও রেকর্ড দুটি কপি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তর করেন৷ পরে সংস্থা তা ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরকে দিলে তুরিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়।

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সিনিয়র সমন্বয়ক সানাউল হক বলেন,আমরা এ ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে গেছি।আমাদের জন্যে এ ধরণের আচরণ একেবারেই অপ্রত্যাশিত । তিনি বলেন , তুরিন আফরোজ নিজেই আগ্রহী হবার পর  ট্রাইব্যুনালের চীফ প্রসিকিউটরের নির্দেশ ক্রমে এই মামলাটি তাকে দেয়া হয় গত নভেম্বরে । কিন্তু এ পর‌্যন্ত তিনি কোন কাগজপত্র ফেরত ও দেন নি তার দায়িত্বের ব্যাপারে কোন অগ্রগতি ও তদন্ত কমিটিকে জানান নি।

তিনি আরো জানান , দুটি অডিওর মধ্যে একটি টেলিফোন কথোপকথনের রেকর্ড৷ এটি চার মিনিটের মতো৷ অন্য অডিওটি ওই গোপন বৈঠকের, প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টার মতো৷
গোলাম আরিফ টিপু বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আইন মন্ত্রণালয় তদন্ত করছে৷ তিনি দোষী হলে অবশ্যই তার শাস্তি হবে৷

আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও বুধবার তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর কথা জানিয়েছেন৷ আসামি ওয়াহিদুল হকের মামলার প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ এবং তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান৷ গত বছর তদন্ত শুরু হওয়ার পর ১১ নভেম্বর তুরিন আফরোজকে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়৷

অভিযোগ উঠেছে, ওয়াহিদুল হককে গ্রেফতারের আগে গত নভেম্বরে তুরিন আফরোজ প্রথমে তাকে টেলিফোন করে দেখা করার সময় চান৷ এর পর একটি হোটেলে ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে গোপন বৈঠকও করেন তিনি৷

তদন্ত সংস্থার সিনিয়র সমন্বয়ক সানাউল হক বলেন, তাদের টেলিফোনে কথা হয় গত বছরের ১৮ নভেম্বর। আর পর দিন ঢাকার গুলশানের  অলিভ গার্ডেন নামে একটি রেস্তোরাঁর গোপন কক্ষে বৈঠকটি হয়। সেখানে তুরিন আফরোজ, তার সহকারী ফারাবি, আসামি ওয়াহিদুল হকসহ মোট পাঁচজন ছিলেন৷
তিনি জানান, টেলিফোন রেকর্ডে তুরিন আফরোজ জানিয়েছেন যে তিনি বোরকা পরে ওই হোটেলে যাবেন৷ তার সঙ্গে থাকবে সহকারী ফারাবি, যাকে তিনি নিজের স্বামী পরিচয়ে সেখানে নিয়ে যাবেন৷
বৈঠকের অডিও রেকর্ডে কী আছে জানতে চাইলে সানাউল হক বলেন, যা বলা সম্ভব তাই বলছি৷ বৈঠকে তুরিন আফরোজ মামলার মেরিট নিয়ে আসামির সঙ্গে দীর্ঘ কথা বলেন এবং মামলার পুরো ডকুমেন্টের এক সেট ফটোকপি আসামিকে হস্তান্তর করেন৷

আরেক প্রশ্নের জবাবে সানাউল হক বলেন, তুরিন আফরোজের সহকারী ফারাবি বারবার ওয়াহিদুল হকের কাছে তার আর্থিক অবস্থার কথা জানতে চান৷ ওয়াহিদুল হককে বলেন, “আপনি তো অনেক গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ পদে চাকরি করেছেন৷ আপনার তো অনেক টাকা-পয়সা থাকার কথা৷”

তুরিনের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে সানাউল হক বলেন, এখানে আসলে তিনটি বিষয় বিবেচ্য৷ আসামির সঙ্গে গোপনে ছদ্মবেশে দেখা করা, তাকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট হস্তান্তর করা এবং মামলার মেরিট নিয়ে আসামির সঙ্গে আলোচনা করা৷ এর কোনোটিই তিনি করতে পারেন না৷ আইন মন্ত্রণালয় এখন পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে৷ আসামি মামলার ডকুমেন্ট পাবে আদালতের নির্দেশে৷ প্রসিকিউটর ব্যক্তিগতভাবে আসামির সঙ্গে দেখা করতে পারেন না৷ এমনকি মামলার মেরিট নিয়েও আসামির সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন না প্রসিকিউটর৷

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য তুরিন আফরোজের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি । তবে তিনি একটি ফেসবুক পোস্টে ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে বৈঠকের কথা স্বীকার করে বলেছেন, আমি তদন্তের জন্য যে কোনো কৌশল অবলম্বন করতে পারি৷ আর আমি যা করেছি, আমার ঊর্ধ্বতনদের জানিয়ে করেছি৷ আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো হচ্ছে৷

সানাউল হক বলেন, তুরিন আফরোজ মামলার তদন্তকারী নন৷ তদন্ত করছেন উপপরিচালক মতিউর রহমান৷ সুতরাং তুরিন আফরোজের তদন্তের প্রশ্নই ওঠে না৷ তা ছাড়া তিনি আসামির সঙ্গে গোপন বৈঠক করবেন বা দেখা করবেন– এটি আমাদের বা চিফ প্রসিকিউটরকে জানাননি৷ জানালেও অনুমতি পেতেন না৷ কারণ এটি বেআইনি৷ মানবতাবিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আরেকজন প্রসিকউটর রানা দাশগুপ্ত ডয়চে ভেলেকে বলেন, অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণ হওয়ায় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে তুরিন আফরোজকে সব মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে৷

তবে প্রসিকিউটরদের নিয়োগ দেয় সরকার৷ তাই তার বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে আইন মন্ত্রণালয়৷
তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ের তদন্তে যদি তুরিন আফরোজ চূড়ান্তভাবে দোষী প্রমাণিত হন,প্রসিকিউশনে কোনো প্রভাব পড়বে না৷

ফিরলো না মেয়েটি - সুমি খান

৭.৪৮ সকাল,  মঙ্গলবার ১৫ মে ২০১৮

হার্মোনিকা ঠোঁটে আলপথ ধরে এঁকে বেঁকে চলে গেলো মেয়েটি
কেউ তাকে মনে রাখেনি-
বিশুদ্ধতায় ডুবে যাওয়া
চলিত রীতির অচলায়তন ভাঙ্গা মেয়েটি কে কোথাও খুঁজে পেলো না কেউ-
আশালতার আত্মদান  নিভৃতে হারিয়ে যায়
নন্দী  ডাক্তার দের দেশত্যাগের ইতিহাস যার বুকে রক্ত ঝরাতো-

নিউজরুমে খবরের খোল নলচে পাল্টে মিথ্যার বেসাতি
যাকে দুমরে মুচড়ে দিতো-
মেয়েটি হারিয়ে গেলো -

লু হাওয়া কদমবুচি দিয়ে যায়
জননীর চরণে- কে ও?
তবে কি ও এসেছিলো?

পৌরুষের সংস্কারে আপাদমস্তক সুরক্ষিত সমাজ

মায়ের চাদর সুরক্ষিত করে নিপীড়ককে

বাবার ভাঙ্গা চশমারর কাঁচে জলের ফোঁটা
কাজল স্যারের চশমার ফাঁক গলে নেমে আসা
ফার্স্ট ব্র্যাকেট আর লাফিয়ে পড়া থার্ড ব্র্যাকেট এর গলাগলি-
যোগ বিয়োগের সাথে গুণ ভাগের দলাদলি
এসেছিলো-সীমন্তিনী
নীরব সমর্পনে অন্য জীবনে
আকাশসীমার শেষে দিগন্তবিস্তৃত
ময়রাপাড়ার মাঠ পেরিয়ে চলে গেলো না ফেরার দেশে
হার্মোনিকার সুর ছড়িয়ে চলে যাবার পথে আর পিছু তাকায় নি

সীমন্তিনীদের ফিরতে নেই
 তাই বুঝি  আর ফেরে নি সেই মেয়েটি

Monday, May 14, 2018

কালো বোরকার তালগাছে উন্মত্ত মাতঙ্গিনী -সুমি খান

রাজভোগের ভাগ নিতে
ঘাতকের দুয়ারে
কালো নেকাব!
আহা,  পাকিসেনার সাথে এমন খাস মোলাকাত!
বেরসিক কালবোশেখি ঝড়!

 বিশ্বাস আর ঘাতকের মিলিত  বিষাক্ত শ্বাস
 তবু তালগাছ-আর তালগাছ
মূলে নির্মূলে  মিলে যায় ঘাতকের অট্টহাসি-
ভেসে যায় মেশিন গানের গুলিতে ঝাঁঝরা শত শত প্রাণ-

তিরিশ লাখ শহীদের পবিত্র রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার এতো জোর?

স্যুপের বাটিতে ওঠা ঢেউ ছলকে পড়ে
ওয়েটারের পোষাকেরআড়ালে
সিধু কানুর বুকের কাছটায় !
নীরব চোখের জলে ভেসে যায়
শত শত সাঁওতাল শহীদের রক্তাক্ত আত্মা!

কোটি টাকার হিসেব কষে বেভুল কালো কোট
অন্তর্ভেদী বিষাক্ত হাওয়ার তোড়ে
মেতে ওঠে মিথ্যার ওজরেরা -

দু'পাতার কাগজটি নির্বিকার হস্তান্তর-
সিধু কানুর নীরব রক্তাক্ত চোখে আগুন ঝরে -
মেশিন গানের গুলিতে ঝাঁঝড়া বুকের রক্তে
মাতঙ্গী মেতেছে আজ সমর রঙ্গে!

কালো বোরকার পকেট কি ফাঁকাই রয়ে গেলো?
নাকি জমেছে যতোটা -
তারো চেয়ে বেশি জমবে গ্লানি আর ক্লেদ
কিছু নাই তবু খেদ-
নিন্দার ভার ঝেড়ে ফেলে
কান কানা রমজান !
শুধু জাগে সংশপ্তকের নির্ঘুম প্রহর!

ধর্মের কলে কালবোশেখি ঝড়-
মাতৃমুক্তি পণ করে সত্যনিষ্ঠ
উন্মত্ত মাতঙ্গীনি মাতে সমররঙ্গে
ভয় কী মরণে!

সকাল ৮টা ৩৫
১৫ মে ২০১৮

Wednesday, May 2, 2018

একজন সাহিত্যিক অশোক মিত্র - শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য


অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরিচিতি পেলেও, ডক্টর অশোক মিত্র মনেপ্রাণে সাহিত্যের মানুষ ছিলেন। একান্ত আলাপে বারবার বলেছেন যে উনি একজন ইকোনমিস্ট বাই মিসটেক। আরেক রকম পত্রিকায় সম্পাদনার সূত্রে ওনার সাহিত্যপ্রীতির কয়েকটা উদাহরণ পেয়েছিলাম। 


আরেক রকমে মার্ক্স ও সোভিয়েত নিয়ে আমার কয়েকটা লেখা ২০১৭ সালে কিছু বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। সেই নিয়ে একদিন অশোক বাবু স্নেহ-মিশ্রিত শাসন করেছিলেন। মূলত প্রগলভতার কারণেই। তারপর বললেন,
​​
"আপনাকে একটা অন্য কাজ দিচ্ছি। অনেক তো মার্ক্স নিয়ে লিখলেন। এবারে সাহিত্যে আসুন। দীনেশ দাশের 'এ যুগের চাঁদ হল কাস্তে' কবিতাটার শিরোনাম  নিয়ে বুদ্ধদেব বসু তাঁর কবিতা পত্রিকাতে দুই বিপরীত মতাদর্শের কবি, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও বিষ্ণু দেকে লিখতে বলেছিলেন।  ১৩৪৭ সনের কার্তিক সংখ্যাতে পিঠোপিঠি কবিতা দুইখানা বেরিয়েছিল। ওটা নিয়ে এখনকার পাঠক কী ভাবছে, সেটা আমি জানতে চাই। এখনো সোশালিস্ট রিয়ালিজম জিনিসটার সত্যিই কতখানি আবেদন আছে, বোঝা দরকার। আপনি কবিতা দুখানা নিয়ে লিখুন"। (উনি সকলকেই 'আপনি' বলতেন) 

দুইখানা ভুলে যাওয়া কবিতাকে আবার রিভাইভ করিয়ে পাঠকের অন্দরে নিয়ে আসা, এটা সেদিন বুঝিয়ে দিয়েছিল ডক্টর মিত্র-র সাহিত্যবোধ কতখানি আধুনিক। ওনার কাছ থেকে সেই সূত্রে এবং তার পরেও শব্দচয়ন সংক্রান্ত প্রচুর খুঁটিনাটি শেখা হয়েছিল। এর পরেও নানা লেখা লিখিয়েছেন। অন্নদাশংকর রায়ের কবিতা থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকার বামপন্থা, তাঁর আগ্রহ ছিল সজাগ। মাঝে মাঝেই ফোন করে বলতেন, "এটা নিয়ে লিখুন"। 

আরেক রকম সম্পাদনার সময়ে ওনার সঙ্গে একদিন বাড়িতে একটা হালকা বিতর্ক হয়েছিল। যে কবিতা লিখবে , সে কি রাজনীতি করবে না ? নাকি স্লোগান সর্বস্ব কবিতা লেখাটাই তার জীবনের নিয়তি? অশোক বাবুর মতামত ছিল, সুকান্ত ভট্টাচার্য্য বেঁচে থাকলে যদি সক্রিয় রাজনীতি করতেন, তাঁর কবিতা ঝুলে যাবার প্রভূত সম্ভাবনা ছিল। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের উদাহরণ টেনে বলেছিলেন, রাজনীতির ঘোর প্যাচ প্রকৃত শিল্পকে নষ্ট করে দেয়। এই দোষে আমাদের কমিউনিস্ট আন্দোলনের লিটারেচার ডুবেছে। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাহলে মায়াকভস্কি? অথবা অক্টাভিও পাজ? উনি উত্তর দিয়েছিলেন, মায়াকভস্কি সক্রিয় রাজনীতি করেন নি। বুঝতেনও না। তারপর আঁদ্রে মালরোর উদাহরণ টানলেন। কনভিন্সড হতে পারিনি। সেই তর্কটার আর মুলতুবি হল না, জীবনের আর সবকিছুর মতই। 

শেষ দিন পর্যন্ত জীবনচর্যায়  ছিলেন আদ্যোপান্ত কমিউনিস্ট। বিশ্বাস করতেন এ দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে মাথা তুলে দাঁড়াতে গেলে বুর্জোয়া পার্টির সঙ্গে সমঝোতা করে সেটা সম্ভব নয়। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অম্ল-মধুর, ঘনিষ্ট সহযোগিতা এবং মতভেদে পূর্ণ । কিন্তু তাঁর দৃঢ় মতামত ছিল যে  ভারতবর্ষে বামপন্থী আন্দোলনকে বিকশিত করতে গেলে সিপিআই(এম)-এর কোনও বিকল্প নেই। আন্তঃপার্টি মতাদর্শগত বিতর্কগুলি যখন বাইরে আসত, তাঁর অবস্থান  কখনো বাম দিক থেকে এক ইঞ্চিও বিচ্যুত হয়নি। 

শেষ এডিট মিটিং ওনার বাড়িতে হয়েছিল, মার্চ মাসে। মিটিং-এর শেষে বলেছিলেন, "আমার বাড়িতে এটাই শেষ সম্পাদকীয় বৈঠক। সামনের সপ্তাহ থেকে আমি নার্সিং হোমে চলে যাচ্ছি। ফিরব কি না জানি না। আপনাদের সকলকে নমস্কার জানাচ্ছি"। 

আমরা এক এক করে বেরিয়ে আসছিলাম বইতে ঠাসা ঘর থেকে। শেষে ছিলাম আমি। একবার পেছন ফিরে দেখলাম, একটা রোগা বৃদ্ধ শরীর নিঝুম হয়ে বসে আছে। একলা। পৃথিবীর শেষ কমিউনিস্ট। একটা বদলে যাওয়া আপোসকামী  পৃথিবীতে নিঃসঙ্গ, নন-কনফরমিস্ট অবস্থানে অনড় থাকতে থাকতে যিনি হঠাৎ আবিষ্কার করলেন, তাঁদের মত দানবদের যুগ আজ শেষ। এবার আসছে বামনদের রাজত্ব। ছায়া ক্রমে আসিতেছে। মৃত নগরীর অন্ধ রাজা অয়দিপাউসের এখন ধীরে ধীরে মঞ্চ থেকে প্রস্থান করবার সময় আগত।

Sunday, April 1, 2018

শঠতার পরাকাষ্ঠা- সুমি খান

আপন সবাই
পর হলো সেই
শেয়াল কুমির শঠতায়-
দেখনদারী কব্জাধারী
ভুলায় হঠকারীতায়!


পরের ধনে পোদ্দারী-
পরকে নিয়ে সর্দারী!
পরকে ‘আপন’ দাবি করে
শঠতা- খবরদারি!
কৃতঘ্নতার পরাকাষ্ঠা
হারালো গুণবিচারী!
♥ সুমি খান
বেলা ১১টা, পয়লা এপ্রিল, ২০১৮

Sunday, February 11, 2018

জামায়াতের সংবিধানবিরোধী অবস্থান ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম নিষিদ্ধের জন্য রীট পিটিশন ও অন্যান্য


কী যে হলো, হঠাৎ একদল হুজুর সংবাদ সম্মেলন করে ‘ফতোয়া’ জারি করে বসলেন। কই এর আগে কোন মৌলানা দলকে তো কখনই ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যাকারী, বাঙালী নারীর ধর্ষক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতা বা ডাক্তার, প্রকৌশলী, সেনা, পুলিশ, মুক্তিযোদ্ধাদের পরিকল্পিত হত্যাকান্ডের হোতাদের বিরুদ্ধে ‘তারা কাফের, তারা জেনাকারী, হত্যাকারী হিসেবে যে স্বাধীনতার তারা বিরুদ্ধাচারণ করেছে, সেই স্বাধীন দেশে তাদের ঠাঁই হবে না,’ বলে এমন কোন ফতোয়া দিতে শুনিনি। তারা তো ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বা মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় অপরাধী। ফতোয়া যদি কেউ দিতে উদ্বুদ্ধ হতেন, তবে এদের ফতোয়া দিয়ে রাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের দাবি করতেন। মাঝখান থেকে তসলিমা নাসরিন বা দাউদ হায়দারকে তালেবানপন্থী একদল কট্টর জঙ্গীবাদী মোল্লা দেশছাড়া করেছিল ,যে দেশের স্বাধীনতায অর্জনে সেই ঘাতক ফতোয়াবাজ মোল্লাদলের কোন অবদান ছিল না।
তরিকত ফাউন্ডেশন যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতের সংবিধানবিরোধী অবস্থান ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম নিষিদ্ধের জন্য রীট পিটিশন করে হাইকোর্টের কাছ থেকে একটি কাঙ্খক্ষত ঐতিহাসিক রায় জনগণকে উপহার দিয়েছে, এজন্য তাঁরা ধন্যবাদার্হ।
কিন্তু স্মরণ রাখতে হবে, মুসলিম দেশগুলোতে বা ভারতেও মুসলিম নারীরাই মুসলিম পুরুষের অন্যায় ফতোয়ার শিকার হয়েছে। আশ্চর্য হলেও সত্য এই যে, এই মৌলানারা কোন নারীর সন্তান, কোন নারীর কাছ থেকে তাঁরা বিবাহিত জীবনের আনন্দ লাভ করেছেন, কেউ বা প্রেম লাভ করেছেন, তাঁদের সবারই আছে পুত্র ও কন্যা, বোন, খালা, চাচি, ফুফু। নয় কি? তারপরও দেখা গেল, শ্বশুরের দ্বারা ধর্ষিতা নারীটি তার স্বামীর (স্বামীর মতে) সঙ্গে থাকতে চাইলেও ফতোয়াবাজ মৌলানারা শ্বশুরের সঙ্গে থাকার আদেশ দেয়। রাজিব গান্ধীর উদ্যোগে মুসলিম নারীদের সমঅধিকারের আইনটি দিল্লীভিত্তিক মুসলিম মৌলানাদের দলের প্রবল বাধার কারণে সংসদে পাস হতে পারেনি। শ্বশুর দ্বারা পুত্রবধূ ধর্ষণের চেষ্টা বা ধর্ষণ, এমনকি এ কাজে শাশুড়ি বাধ্য হয়ে স্বামীর হুকুম পালনে সহায়তা করেছেÑএমন অসংখ্য উদাহরণ পর্দার অন্তরালে সঞ্চিত আছে-এ কথা মৌলানারাসহ জনগণ ভালভাবেই জানেন।
এ গেল এক ধরনের নারী নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ফতোয়ার ব্যবহার। ফতোয়ার দ্বিতীয় অপব্যবহার অতি উচ্চমাত্রায় হচ্ছেÑএটি হলো, ‘হিল্লা বিয়ে’ ও ‘তালাক’ হওয়া সম্পর্কিত। এ আলোচনায় যাওয়ার আগে আমি দেশের সব বড় আলেম-মৌলানাদের কাছে একটি প্রশ্ন করব, এই একবিংশ শতাব্দীতে যেখানে খ্রিস্টান, ভারতে হিন্দু নারীরা ‘তালাক’-এর ক্ষেত্রে কোন রকম ‘হিল্লা বিয়ে’ নামের সম্পূর্ণ অমানবিক ঘৃণ্য নারীর জন্য দ্বিতীয় প্রকৃতির ধর্ষণের ব্যবস্থা করে যেসব মৌলানা, তাদের বিরুদ্ধে আপনারা কখনও ফতোয়া দিয়েছেন কি? অথবা তাদেরকে বিচারে সোপর্দ করেছেন কি? জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে বিচারপতি গোলাম রব্বানী ও বিচারপতি নাজমুন নাহার ফতোয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একটি ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিলেন, যেটি খুব সম্ভব আপীল বিভাগে এখনও আটকে আছে। মৌলানাদের নিজ কন্যাদের ও বোনদের ’আইয়ামে জাহিলিয়া’ যুগের পুরুষের ইচ্ছায় বিবাহিতা নারীকেও অন্য পুরুষের কাছে ‘আইনী’ভাবে ধর্ষিতা হবার ধর্মের নামে সমাজে প্রচলিত অপরাধমূলক ফাক-ফোঁকরগুলো বন্ধ করতে এগিয়ে আসতে হবে। এটা বলাবাহুল্য। গ্রামেগঞ্জে এই ‘তালাক’ নিয়ে ‘হিল্লা’ বিয়ের মাধ্যমে ধর্ষণ হচ্ছে, তা বন্ধ করা মৌলবী-মোল্লাদের একটি অন্যতম দায়িত্ব। তাঁরা সে দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসবেন এবং অন্তত, কন্যা ও বোনদের নারী নির্যাতক ফতোয়াবাজদের হাত থেকে রক্ষা করবেন, অন্যকিছু করার আগে এটাই তাঁদের জন্য কর্তব্য হিসেবে অগ্রগণ্য।
এছাড়াও মৌলানাদের একটি বড় দায়িত্ব হচ্ছে, দেশের সংখ্যালঘুদের সংখ্যাগুরুর দ্বারা নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ এর শিকার হওয়া, তাদের বসত-জমি-জীবিকা দখল হওয়া থেকে রক্ষা এবং সর্বোপরি তাদের প্রাণের নিরাপত্তা প্রদান যে সংখ্যাগুরুর দায়িত্ব, এই তথ্য প্রচারের মাধ্যমে সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করা, পাড়া-মহল্লায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা। ইসলামের নবী সঠিকভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে সংখ্যাগুরুর হাতে ‘আল্লাহর আমানত’ হিসেবে গণ্য করতে বলেছেন। তাদের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব সংখ্যাগুরুর হাতেই, এ কথা মৌলানাদের উপলব্ধি করতে হবে এবং একই সাথে ইসলাম ধর্মের এ মহৎ সুশিক্ষার পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে। মৌলানা সাহেবরা দেশের সংখ্যালঘুর, হিন্দু আদিবাসী ভূমিগ্রাসকারীদের বিরুদ্ধে ফতোয়া নয়, সামাজিক বয়কট, তাদের বিচারে সোপর্দ করতে এগিয়ে আসবেন, এটিই জনগণের প্রত্যাশা।
মৌলানা সাহেবরা  আমেরিকায় বাংলাদেশের একজন ব্যক্তি ওই দেশের একটি অঙ্গরাষ্ট্রের আইনী অধিকার সমকামী বিবাহ সম্পর্কে তাঁর ‘ব্যক্তিগত মত’ প্রকাশ করেছেন বলে তাঁকে ‘দেশ ছাড়া’ করবার ফতোয়া দেন, যা দেবার প্রয়োজন ছিল না।
 মানবাধিকারে ব্যক্তিগত মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে উচ্চ স্থান দেয়া হয়। একটা কথা না বললে এ বিষয়টা পরিষ্কার হবে না। পশ্চিমা দেশগুলোতে ধর্ম ব্যক্তির চর্চার বিষয় কিন্তু রাষ্ট্র সব ধর্মের এবং আস্তিক-নাস্তিক সবার জন্য অধিকার রক্ষার জন্য আইন তৈরি করে।
যদিও আমেরিকা বা ইউরোপের দেশগুলোতে সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র কোন ধারা যুক্ত নেই। সত্যি বলতে, ওদের ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মানবাধিকার চর্চার ব্যাপক বিস্তৃতির সুযোগে আমাদের দেশের বা এশিয়া, আফ্রিকার সন্ত্রাসী, খুনী, জঙ্গী জেহাদীরা পশ্চিমা দেশেই ঠাঁই গেড়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী, তাদের সন্তানরা ’৭১-এ অনেক যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সন্তানেরা তো পশ্চিমা দেশেই বসবাস করছে। জঙ্গী জেহাদীরা মালয়েশিয়াতেও বসবাস করছে যাদের অনেকেরই টার্গেট ওখান থেকে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া পাড়ি দেয়া। এই জঙ্গীদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ বেশি জরুরী।
আমাদের তদানীন্তন শাসকদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ময়মনসিংহে সে সময়ে সিনেমা হলে জঙ্গীদের বোমা হামলা, ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের ওপর হাওয়াভবনে পরিকল্পিত শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত গ্রেনেড হামলাকে পর্যন্ত অবিশ্বাস্য জেনেও আওয়ামী লীগের দ্বারাই সেসব সংঘটিত বলে যে মিথ্যা ভিত্তিহীন অপরাজনীতি, দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি করেছিল- সেই মিথ্যা পশ্চিমারা বলে না।
কিন্তু তাদের কোন মিত্রকে যদি কখনোও আত্মবিশ্বাসী, আত্মনির্ভরশীল, নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিতে দেখে, তাহলে যুদ্ধাস্ত্র যাদের ব্যবসার প্রথম পণ্য, সেই পশ্চিমারা তাকে কিভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ সাদ্দাম ও গাদ্দাফী।
এমন কি আফগানিস্তানে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো ধ্বংস করার জন্য তারা জন্ম দিয়েছিল ও বিকশিত করেছিল সস্ত্রাস, জঙ্গী দল আল কায়েদা, তালেবান ও লাদেনকে! সে অবমুক্ত দৈত্যকে আবার পরে তাদেরই হত্যা করতে হয়েছে ও হচ্ছে! দুনিয়ার তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ-সব কিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পশ্চিমারা এক পুতুল খেলায় রত, যে খেলায় কোন একভাবে দরিদ্র দেশগুলোকেও খেলতে হচ্ছে!
তবে পশ্চিমা সাধারণ নাগরিকরা যুদ্ধ ও এসবের বিরুদ্ধবাদী এবং ওদের ব্যক্তি স্বাধীনতা, বাক-স্বাধীনতা ও মানবাধিকার প্রীতি এসবের প্রতি গভীর আস্থা না থাকলে আজ আমাদের লেখক তসলিমা নাসরিন, দাউদ হায়দার, সালমান রুশদীরা প্রাণে বাঁচতে পারত না। খেয়াল করে দেখুন, এই মুরতাদ, কাফের নাম দিয়ে মুসলমান উগ্র জেহাদী মৌলানারাই তাদের কতল করবে বলে ঘোষণা দিচ্ছে-যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ! মসুলমান ছাড়া অন্য কোন ধর্মীয় সম্প্রদায় সারা দুনিয়ায় কোন কবি লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীকে কত্্ল্যোগ্য দাবি করেনি! এমন কি এখনকার জঙ্গী, ইংরেজী মাধ্যমে শিক্ষিত তরুণরাও মুক্তিযুদ্ধপন্থী এখন প্রগতিশীল ব্লগারদের কতল্যোগ্য ঘোষণা করছে, কতলও করছে!
’৭১-সালের রাজাকার গোলাম আযম, নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদীদের উত্তরসূরী বর্তমান যুগের ইংরেজী মাধ্যমে শিক্ষিতদের মধ্যেও যদি জঙ্গী খুনী জন্ম নিতে পারে, মাদ্রাসায় তো কিছু সংখ্যক জন্ম নিচ্ছেই-তাহলে মৌলানারা এই জল্লাদ-সৃষ্টিকারী মসুলিম মৌলানাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ও সংশোধনমূলক প্রচার কর্মকা- শুরু করবেন।- এটাই অনেক বেশি কাক্সিক্ষত ও প্রয়োজনীয়। পশ্চিমাদের ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সম্মান করার ফলে একজন শিশুকে মা-বাবা জন্মদান করে তবে মালিক হতে পারে না, সে নির্যাতিত হলে পুলিশ ঐ মা, বাবা রাষ্ট্রের স্বাধীন নাগরিক সন্তানের দেখভালের উপযুক্ত নয় গণ্য করে শিশুকে নিজেদের তত্ত্বাবধানে নিয়ে যায়!
সবশেষে ছোট্ট করে বলতে চাই- সমকামিতা-দোষে দুষ্ট পৃথিবীর সব দেশের সব সমাজ। আমাদের কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এসবের হোস্টেল, আরও নানা স্থানকে সমকামিতার কেন্দ্রস্থল বলে চুপিসারে মানুষ সমালোচনা করে। পশ্চিমারা ওটাকে ব্যক্তির নিজস্ব অভিরুচি হিসেবে মান্য করে, সেটাকে গোপন বিষয়ে পরিণত না করতে বিবাহের আইন পাস করেছে আমেরিকার কোন কোন অঙ্গরাষ্ট্র। কে কোথায় এ বিষয়ে একমত পোষণ করল তাতে আপনাদের–আমাদের কোন ক্ষতি হবে না। আর যদি আপনারা সত্যিই ধর্ষক, সমকামী, বহু বিবাহকারী, যৌতুকদাবিকারী, নারী হত্যাকারী এবং প্রগতিশীল তরুণ-তরুণী হত্যাকারীদের দেশছাড়া করার ঘোষণা দিয়ে দাবি আদায়ের আইনসম্মত কর্মসূচী গ্রহণ করেন, তাহলে সত্যিই দেশ ও জাতির অগ্রগতি ও উন্নয়নে আপনাদের মৌলানাদের বিপুল ভূমিকা শ্রদ্ধা অর্জন করবে।

Monday, February 5, 2018

আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির পিতামহ -আবদুল গাফফার চৗধুরী


প্রবীণ এক বাম নেতার এই সাক্ষাতকারটি প্রথমে আমার চোখে পড়েনি। কোন প্রতিষ্ঠিত জাতীয় দৈনিকে সাক্ষাতকারটি বেরোয়নি। একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকে বেরিয়েছে, যেটি সচরাচর আমার চোখে পড়ে না। বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে শুনে সাক্ষাতকারটি পড়লাম। দৈনিকটির ৫ অক্টোবরের সংখ্যায় তা বেরিয়েছে। ছোট সাক্ষাতকার। তবু আমার জন্য খুবই আগ্রহোদ্দীপক। কারণ, তিনি আমার কলেজ জীবনের খুবই প্রিয় শিক্ষক। পরবর্তীকালে তিনি হন দেশের এক সময়ের বৃহত্তম বাম গণতান্ত্রিক সংগঠন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। এখন বিরানব্বই বছর বয়স। তাঁকে এখন বলা চলে আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির পিতামহ। তাঁকে আমি খুবই শ্রদ্ধা করি।
ন্যাপের সেই সুদিন এখন আর নেই। অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ এখনও দলের সভাপতি আছেন বটে, বয়সাধিক্যে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তবু এই বয়সেও তিনি তাঁর চিন্তা-চেতনা ও পরামর্শ দ্বারা দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করছেন। তাঁর কথা কেউ শুনছে কী শুনছে না, তার পরোয়া করছেন না। তিনি এখনও আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি বাতিঘর। ৫ অক্টোবর ঢাকার বহুল প্রচারিত দৈনিকটিতে আলাপচারিতা বিভাগে প্রকাশিত তাঁর দেয়া সাক্ষাতকারটিতেও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা সম্পর্কে তাঁর প্রকৃত সচেতনতার পরিচয় পাওয়া যায়। এ জন্যই সাক্ষাতকারটি আমি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে পড়েছি।
এই সাক্ষাতকারটি পড়তে গিয়ে আমি এমন একটি তথ্যের মুখোমুখি হয়েছি, যা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের মতো নব্বই-উর্ধ প্রবীণ রাজনৈতিক নেতার মুখ থেকে বের না হলে আমার পক্ষেও বিশ্বাস করা সহজ হতো না। এ কথা অস্বীকার করব না, আমি ড. কামাল হোসেন ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কঠোর সমালোচক। বিশেষ করে ড. কামাল হোসেনের। কারণ, তিনি এক সময় বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুই তাঁকে হাত ধরে টেনে এনে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেন। পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে তিনি বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার রাজনীতির অবশ্যই সমালোচনা, এমনকি বিরোধিতাও করতে পারেন। কিন্তু হাসিনার প্রতি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিদ্বেষে অন্ধ হয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শবিরোধী চক্রান্তের শিবিরে গিয়ে সরাসরি যোগ দিতে পারেন, এটা আমার কাছেও ছিল অকল্পনীয়।
ঢাকার দৈনিকটির ৫ অক্টোবরের সংখ্যায় প্রকাশিত ‘আলাপচারিতায়’ দেশের বয়োবৃদ্ধ প্রবীণতম নেতা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেছেন, ‘আমি যে রাজনীতি করি, তা ষড়যন্ত্রের রাজনীতি নয়। এটি সরল রাজনীতি। আমি ষড়যন্ত্রের মধ্যে নেই। ড. কামাল হোসেন এসেছিলেন আমার কাছে জাতীয় সরকারের রূপরেখা নিয়ে। আমার কাছে দোয়া চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি ষড়যন্ত্রের রাজনীতির মধ্যে নেই। আমি রাজি হইনি। আমার রাজনীতির অর্থ হচ্ছে সত্য কথা বলা, সড়ক দিয়ে হাঁটা এবং ডাল দিয়ে খাবার খাওয়া। ড. কামাল হোসেন ও নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের প্রধান হিসেবে কাজ করতে ইচ্ছুক। সে কারণে তাঁরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করছেন।’
অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের ‘আলাপচারিতায়’ এই বক্তব্যটি দেশের অনেক মানুষের কাছে ড. কামাল ও ড. ইউনূস জুটির বর্তমান কার্যকলাপ ও আচার-আচরণের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে দেবে। আমি নিজেও দীর্ঘদিন যাবত এই জুটির কার্যকলাপ ও বক্তৃতা-বিবৃতির সমালোচনা করলেও সবসময় ভেবেছি, এরা শেখ হাসিনার প্রতি প্রচ- বিরাগবশত দেশের গণতান্ত্রিক শিবিরের যে ক্ষতি করছেন, তা হয়ত নিজেরাও উপলব্ধি করছেন না। কিন্তু তাঁরা যে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থের কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত গোঁ চরিতার্থ করার জন্য সরাসরি ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে যোগ দিতে এবং এতটা নিচে নেমে যেতে পারেন, তা কল্পনাও করিনি। আওয়ামী লীগ রাজনীতির একটা বড় দুর্ভাগ্য, এই রাজনীতিতে এক মোশতাকের তিরোভাব না ঘটতেই আরেক মোশতাকের আবির্ভাব হয়।
একটি তথাকথিত ‘জাতীয় সরকারের রূপরেখা’ পকেটে নিয়ে ড. কামাল হোসেন দেশে যা করে বেড়াচ্ছেন, তা যে ‘ষড়যন্ত্রের রাজনীতি’ এটা বুঝতে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের মতো রাজনীতির বটবৃক্ষের কিছুমাত্র অসুবিধা হয়নি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ড. কামাল হোসেনকে বলে দিয়েছেন, ‘আমি ষড়যন্ত্রের মধ্যে নেই’ এবং তাদের ষড়যন্ত্রে দোয়া (সমর্থন) দিতেও রাজি নন। শুধু অধ্যাপক মোজাফ্ফর নন, ড. কামাল হোসেন নাকি তাঁর জাতীয় সরকারের রূপরেখা (যে সরকারে তিনি কিংবা ড. ইউনূস প্রধান হবেন) নিয়ে দেশের আরও কয়েকটি ডান এবং বাম গণতান্ত্রিক দলের নেতার দরজায় গিয়ে দোয়া লাভের জন্য ধর্ণা দিয়েছিলেন। তাঁরা সকলেই একবাক্যে না বলে দিয়েছেন।
শেষপর্যন্ত তিনি সম্ভবতঃ তাঁরই মতো জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত কয়েকজন নেতাকে তাঁর বিতর্কিত রাজনীতিতে সঙ্গী করতে পেরেছেন। এরা হলেন ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কাদের সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না প্রমুখ। এদের অধিকাংশই সচরাচর নির্বাচনে জেতেন না। কারও কারও জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। ড. কামাল হোসেনকে বঙ্গবন্ধু একবার বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদে জিতিয়ে এনেছিলেন। তারপর আর কোনও নির্বাচনে জেতেননি। শেখ হাসিনা তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে দাঁড় করিয়েছিলেন। সেখানেও বিএনপির বিচারপতি সাত্তারের কাছে হেরেছেন। গত নির্বাচনে তাঁর গণফোরামের প্রার্থীদের কারও জামানত রক্ষা পায়নি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের রেকর্ড তো অনুরূপ উজ্জ্বল। তেজারতিতে তিনি দক্ষ। তবুও রাজনীতিতে ঢোকার খুব শখ। কিন্তু রাজনৈতিক মূলধন কিছুই নেই। ছাত্রজীবন থেকে বাংলাদেশের কোনও রাজনৈতিক আন্দোলনের ত্রিসীমানায় তিনি ছিলেন না। গরিবের নামে ব্যবসা করে নিজে বিরাট ধনী হয়েছেন। গরিবের বাড়িতে ভুলেও যান না। তাঁর জেট সেট লাইফ। রাজারাজরাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ান। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের তিনি বিশ্বস্ত অনুচর।
ফলে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের প্রভুরা তাঁকে খুশি হয়ে অর্ধেক নোবেল পুরস্কার দিয়েছে এবং এখনও বড় বড় পুরস্কার দিচ্ছে। অর্ধেক নোবেলজয়ী হওয়ার পর আনন্দের এভারেস্ট চূড়ায় উঠে ওই নোবেল পুরস্কারকে মূলধন করে তিনি নূতন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দেন। এই দল গঠনের এক মাসের মধ্যে তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর দল শেষপর্যন্ত ‘কাকতাড়ুয়ার দল’ হয়ে দাঁড়াবে। তিনি রাজনীতি করার আগেই জনগণ কর্র্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে রাজনীতি ছাড়েন।
রাজনীতির সদর দরজা দিয়ে যাঁরা ক্ষমতায় যেতে পারেন না, তাঁরা পেছনের দরজা দিয়ে সেই ক্ষমতায় যেতে চাইবেন, তা আর এমন কী বিস্ময়ের ব্যাপার। তবে কামাল হোসেনদের ক্ষেত্রে বিস্ময়ের কথা এই যে, তাঁরা গণতন্ত্র, সুশাসন, স্বচ্ছ রাজনীতি এ সবের কথা বড় বেশি বলেন। গণতন্ত্র, সুশাসন ও স্বচ্ছ রাজনীতির পথ তো হচ্ছে জনগণের কাছে যাওয়া, স্বচ্ছ, বাস্তব ও সুস্থ কর্মসূচীর মাধ্যমে তাদের কাছে ক্ষমতায় যাওয়ার ম্যান্ডেট চাওয়া। সে জন্যে নির্বাচনে যাওয়া।
ড. কামাল হোসেনরা গণতন্ত্রের এই সদর দরজা দিয়ে না হেঁটে কেন পেছনের দরজা খুঁজছেন এবং তথাকথিত জাতীয় সরকারের একটি রূপরেখা (যেটি আসলে ষড়যন্ত্রের নীলনক্সা) পকেটে নিয়ে একশ্রেণীর প্রবীণ-নবীন রাজনীতিক নেতার বাড়িতে ধর্ণা দিয়ে তাদের দোয়া চেয়ে বেড়াচ্ছেন? জনগণ কর্তৃক বার বার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরই জাতীয় সরকার নামক একটি অনির্বাচিত সরকার গঠন দ্বারা পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার ভূতটি ড. কামাল হোসেনদের মাথায় চেপেছে।
মজার ব্যাপার এই যে, মাত্র গত ২৩ সেপ্টেম্বর (সোমবার) বরিশালে এক জনসভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘...এবার দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করে ছাড়ব।’ এটা খুবই ভাল কথা। দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করে যদি কামাল হোসেন সাহেবরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করতে পারেন, তাহলে তো বলব, তাঁরা গণতন্ত্রের পথেই হাঁটছেন। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও জাতীয় সরকার তো এক কথা নয়।
ড. কামাল হোসেনরা কোনটি চান? যদি সত্যিই তাঁরা বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সমর্থন করেন, তাহলে এই দাবি আদায়ের জন্য বিএনপি চলতি মাসেই যে আন্দোলন শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে, সে আন্দোলনে যোগ দিন। তা না করে পর্দার আড়ালে আবার জাতীয় সরকারের খেলা খেলছেন কেন? জনগণের কাছে না গিয়ে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের মতো প্রবীণ নেতাদের দরজায় গিয়ে গোপন ধর্ণা দিচ্ছেন কেন? আবার জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করে নিজে কিংবা ড. ইউনূসের সেই অনির্বাচিত জাতীয় সরকারের প্রধান হওয়ার আগাম ইচ্ছা ব্যক্ত করছেন কেন?
ড. কামাল হোসেন ও ড. ইউনূসের জুটির নেতৃত্বে চালিত তথাকথিত সুশীল সমাজের মনস্তত্ত্বটা বুঝতে কারোই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। জনগণের আস্থা তাদের ওপর নেই, জনগণ কখনই তাদের ভোট দেবে না এবং নির্বাচন এলে যত খারাপ বা মন্দ হোক আওয়ামী লীগ বা বিএনপিকেই তারা ভোট দেবে। দেশের মানুষ এই দল দুটিকে বোঝে। এই দুই দলের নেতারা যত অপরিশীলিত ভাষায় বক্তৃতা দেন, তার অর্থ তারা বোঝে। আর ড. কামাল হোসেন বা ড. ইউনূস সাহেবরা গণতন্ত্রের অভিধান থেকে যে সব ভাল ভাল কথা বেছে নিয়ে জনগণের নাগালের বাইরের এভারেস্ট চূড়া থেকে কথা বলেন, তার অর্থ তারা বোঝে না। সে সব কথায় আস্থা স্থাপনও করে না।
অনির্বাচিত জাতীয় সরকার গঠন ড. কামাল হোসেনের বহুদিনের একটি পেট থিয়োরি। বার বার নির্বাচনে দাঁড়িয়ে হেরে গিয়ে এবং জনগণকর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে প্রবল রাজনৈতিক হতাশা থেকে সম্ভবতঃ তাঁর মনে এই থিয়োরিটির জন্ম। বহুকাল আগে তিনি তাঁর ‘সুশীল সমাজ’ দ্বারা এই থিয়োরিটি একবার জনসমক্ষে এনেছিলেন। দেশের মানুষ এই গণঅধিকার বর্জিত সরকারের থিয়োরি গ্রহণ করেনি। তখন এক বাম রাজনীতিক প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, ‘গু মড়াবৎহসবহঃ, মড়ড়ফ ড়ৎ নধফ, রং নবঃঃবৎ ঃযধহ ঁহবষবপঃবফ মড়ড়ফ মড়াবৎহসবহঃ’ (আমার সরকার, ভালোমন্দ যা-ই হোক, অনির্বাচিত ভালো সরকারের চাইতে ভালো)।
নিজের পছন্দের, নিজের ভোটাধিকার দ্বারা গঠিত সরকার মন্দ হলেও জনগণ সেই সরকারই চায়। অন্যের পছন্দের এবং অন্যদের ইচ্ছায় গঠিত সরকার ভালো হলেও জনগণ তা পছন্দ করে না। এটা গণতন্ত্রের ইতিহাসের আদি সত্য।
ড. কামাল হোসেনদের অনেক বিদ্যাবুদ্ধি। কিন্তু এই সত্যটা তাঁরা বোঝেন না। আর বোঝেন না বলে জনগণের কাছে পৌঁছতেও পারেন না। এদিকে, ক্ষমতায় যাওয়ার অদম্য লিপ্সা তাদের তাড়িত করে বেড়ায়। তখন ক্ষমতার লোভে বিদেশী সাহায্য ও সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে গিয়ে তাঁরা দেশ এবং গণতন্ত্রের সমূহ সর্বনাশ করেন। আমার আশঙ্কা, ড. কামাল হোসেনদের বর্তমান ষড়যন্ত্রের রাজনীতি দেশের জন্য এক অকল্যাণকর পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে।
ঢাকার বহুল প্রচারিত দৈনিকটিতে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের আলাপচারিতার বক্তব্য পাঠের আগেই আমার এক লেখায় ড. কামাল হোসেন ও ড. ইউনূসের বর্তমান কার্যকলাপ সম্পর্কে আমার সন্দেহের কথা প্রকাশ করেছিলাম। লিখেছিলাম, বাংলাদেশে কারজাই অথবা জারদারি মার্কা একটি সরকার অনির্বাচিত জাতীয় সরকার হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার জন্য যে তৎপরতা চলছে, সেটি সফল করার লক্ষ্যে এই সুশীল চক্রের এক নেতা ইউরোপ-আমেরিকার রাষ্ট্র নেতাদের দরবারে তাদের সাহায্য ও সমর্থনের আশায় ধর্ণা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। অন্যদিকে, অন্য নেতা দেশের ভেতরে সেই জাতীয় সরকারের নীলনক্সায় রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বাইরে তাঁরা দেখাচ্ছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ে সমর্থন দানের জন্যই দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা করছেন।
এরা হয়ত ভাবতে পারেননি, দেশের বাম রাজনীতির এক বটবৃক্ষ নেতা এমন সোজা সরল ভাষায় তাদের গোপন তৎপরতার কথা ফাঁস করে দেবেন এবং তাকে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি আখ্যা দেবেন। ড. কামাল হোসেন জানেন কিনা জানি না, তিনি রাজনীতির রেসের মাঠে পরাজিত ও প্রত্যাখ্যাত ঘোড়ায় পরিণত হয়েছেন। বিদেশীরা তাঁকে নিয়ে খেলতে পারে, কিন্তু ক্ষমতায় বসাবে না। তিনি এখন তাদের বাতিল ও ব্যর্থ নেতাদের তালিকায় আছেন। তিনি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী থেকে কাদের সিদ্দিকী পর্যন্ত যাদের সঙ্গে জুটিয়েছেন তাঁরাও এই তালিকাভুক্ত নেতা। এই দলে নতুন মুখ ড. ইউনূসের। কিন্তু মাটিতে তাঁর পা নেই। তিনি শাখামৃগের মতন। শাখামৃগের ওপর কেউ নির্ভর করে না। তাকে কলা দেখিয়ে ব্যবহার করে মাত্র।

লন্ডন, ৮ অক্টোবর, মঙ্গলবার, ২০১৩ ॥

Thursday, January 25, 2018

সফল নেতা শেখ হাসিনা, কুর্নিশ তোমায়- সুমি খান

একটা স্বাধীন দেশ -একটা সূর্যরাঙ্গা সকাল আর একটা পতাকা-এই তো! এ আর এমন কী! না, অনেক কিছুই! সখিনা বিবির ভাঙলো কপাল, সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর। দানবের মতো চিৎকার করতে করতে শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাংক এলো! ছাত্রাবাস, বস্তি উজাড় হল। রিকয়েললেস রাইফেল আর মেশিনগান খই ফোটাল যত্রতত্র। ছাই হল গ্রামের পর গ্রাম।

বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভুর বাস্তুভিটার ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে একটানা আর্তনাদ করেছিলো একটি বা অনেক কুকুর। শকুনেরা ব্যবচ্ছেদ করেছিলো লাশের পর লাশ! কতো যে অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিয়েছিলো পিতামাতার লাশের ওপর। আর সেই অবুঝ শিশুটি পিতামাতার ঘাতকদের বিচারের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনেছে ৪৪ বছর! আর যুদ্ধজয়ী ক্লান্ত খোকার প্রতীক্ষায় নুয়ে পড়া লতাটার কুমড়ো ফুল শুকিয়ে গেছে অনেকদিন! ঝরে পড়েছে ডাঁটা; পুঁইলতাটা নেতানো, মায়ের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত চোখ শুধায়-“খোকা এলি?’ ঝাপসা চোখে মা তাকায় উঠোনে, উঠোনে যেখানে খোকার শব শকুনিরা ব্যবচ্ছেদ করে।

এখন, মা’র চোখে চৈত্রের রোদ পুড়িয়ে দেয় শকুনিদের। শহীদ জননীর চোখের চৈত্রের রোদের তেজ আমাদের জননন্দিত রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চোখে। বর্বর আত্মম্ভরী ঘাতকদের একের পর এক বিচারের মুখোমুখি করে তাদের ফাঁসি কার্যকর করলেন শেখ হাসিনা!

পেশাগত কাজে এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া শুরু থেকেই পর্যবেক্ষণ করছি। এই বিচারে নিয়োজিত তদন্ত কর্মকর্তা এবং প্রসিকিউটরদের অনেক কাজের সাথে আমি সম্পৃক্ত। এই ঘাতকদের বর্বর নির্যাতনের শিকার আমার পিতার রক্তশপথে আমি নিজেকে এ কাজে উৎসর্গ করেছি অনেক আগেই। আর তাই বার বার আভূমি নত হয়ে কুর্নিশ করি রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে।

যিনি বারবার আমাকে দৃপ্ত শপথে পুনর্জীবিত করেন। এ দেশের জন্মলগ্ন থেকেই আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমির বিরুদ্ধে হাজারো লক্ষ ষড়যন্ত্র চলমান। পাশাপাশি ঘাতকদের বিচারও চলমান। এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেশে বিদেশে অনেক খ্যাতিমান সাংবাদিক, সম্পাদক এবং নীতিনির্ধারকেরা আমাকে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন করেছেন। আমি দ্বিধাহীন চিত্তে গভীর আত্মবিশ্বাসের সাথে তাদের প্রত্যেককে সেই শুরু থেকেই বারবার বলে এসেছি আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যতোক্ষণ বেঁচে আছেন, তিরিশ লাখ শহীদের রক্তের শপথে একাত্তরের ঘৃণ্য ঘাতকদের ফাঁসি তিনি কার্যকর করবেনই।

বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখে আমাদের এ বীর রাষ্ট্রনায়ক শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে উচ্চারণ করেন- “এই বাংলাদেশের কেউ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্থ করতে চাইলে তারাও যুদ্ধাপরাধী।” সত্যি, একাত্তরের ডিসেম্বরের ১০ তারিখের পর দেশের এ প্রান্তে ও প্রান্তে পরাজয় নিশ্চিত জেনে যারা তালিকা করে এদেশকে মেধাশূন্য করতে শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের একের পর এক হত্যা করেছে-সেই ঘাতকদের কখনো রাষ্ট্রপতি, কখনো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীত্ব , কখনো বা শর্ষিনার পীরের মতো ঘাতককে ‘স্বাধীনতা পদক’ দিয়ে হায়েনার মতো হা-হা-হা করে হেসেছে! আর দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের রক্তে রঞ্জিত হাতের নির্দেশে রাস্তায় নামিয়েছে শহীদ পরিবারের সদস্যদের ।

আমার বাবার মতো বীর মুক্তিযোদ্ধারা চোখের জলে ভেসে রাজপথ কাঁপিয়েছন প্রতিবাদে। যাদের বঙ্গবন্ধু দেশের সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করে মাথা গোঁজার ঠাঁই দিয়েছিলেন, তাদের স্বজনদের কর্মসংস্থান করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু চোখের জলে ভেসে যে বীরাঙ্গনাদের যুদ্ধশিশুদের সন্তানের কাগজে কলমে আক্ষরিক অর্থে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, সেই বীরাঙ্গনা এবং তাদের সন্তানদের পথের ভিখারীতে পরিণত করেছিলো যারা, কমরেড মণিসিংহসহ এ দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারীদের স্বজনদের জন্যে বঙ্গবন্ধু যে বাড়ি দিয়েছিলেন, সেই বাড়ি থেকে তাদের উচ্ছেদ করে কোথাও নজরুল একাডেমী , কোথাও বা জামাতের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান করে ৯৯ পয়সার বিনিময়ে শত বছরের লীজ দিয়েছে।

দেশ বিরোধী, পাকি সাপের বিষধারী সেই সাবেক রাষ্ট্রনায়কেরা আজ তাদের কলঙ্কিত পায়ে আমাদের মহান স্মৃতিসৌধ, বধ্যভূমি এবং শহীদ মিনারে যাচ্ছে, মহান শহীদদের রক্তে রঞ্জিত হাতে শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক দিচ্ছে- সে কি লোক দেখানো নয়? এই বোধোদয় আমাদের কবে হবে? আর তাই বঙ্গবন্ধু কন্যা যথারীতি একাত্তরের ঘাতক পুনর্বাসনকারী রাজনৈতিক দল বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উদ্দেশ্যে নির্ভীক কন্ঠে বারবার বলে যেতে হয়, ‘‘যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে আবার স্মৃতিসৌধে যান তিনি! এ তো লোক দেখানো এবং মানুষের চোখে ধুলি দেয়ার চেষ্টা মাত্র।” যে মুক্তিযোদ্ধারা এই যুদ্ধাপরাধী দলের সাথে স্মৃতিসৌধে যায়,তাদেরও এ বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত বললেন প্রধানমন্ত্রী। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, যুদ্ধাপরাধী ঘাতকদের পুনর্বাসনকারীদের সাথে বসবাস করে নিজেকে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করা চরম মিথ্যাচার ছাড়া আর কী হতে পারে।

প্রথাবিরোধী বহুমাত্রিক লেখক ড. হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা আমৃত্যু মুক্তিযোদ্ধা না ও থাকতে পারেন, রাজাকার আমৃত্যু রাজাকার।’ গত পয়লা নভেম্বরে ‘পাকিস্তানী সাপের বাচ্চারা কিলবিল করছে’ শিরোনামে জাহিদ নেওয়াজ খানের কলামের একটি অংশ এখানে তুলে ধরা জরুরী। “খালেদা জিয়া তার রাজনৈতিক স্বার্থে আর জামায়াত তার যুদ্ধাপরাধী নেতাদের বাঁচানোর লক্ষ্যে হেফাজতকে মাঠে নামালেও সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, আর কোনো গণজাগরণ যাতে না ঘটে সেজন্য আওয়ামী লীগ সরকারও তলে তলে হেফাজতকে উস্কানি দিয়েছে।

সরকারের পক্ষে হেফাজতকে জমি-জিরেত এবং অন্য সুবিধা দেয়ার কথা বাদ দিলেও তাদের তাণ্ডবের বিচার না হওয়া এর এক বড় প্রমাণ। এভাবে হেফাজত নামের সাপটিকে দুধকলা দিয়ে পোষ মানিয়ে আর বাংলাদেশে সব ধরণের জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বটবৃক্ষ যে জামায়াত, তার নেতাদের ন্যায়সঙ্গতভাবে বিচারের মুখোমুখি করে সরকার আপাতঃ দৃষ্টিতে বড় বড় সাপগুলোকে ঝাপিতে পুরে ফেলতে পারলেও তাদের বাচ্চা আর জ্ঞাতি গোষ্ঠি কখনো আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামে, কখনো আনসার আল ইসলাম পরিচয়ে, কখনো আইএস বা আল কায়েদার উপমহাদেশীয় শাখার নাম উল্লেখ করে ঠিকই বিষের ছোবল অব্যাহত রেখেছে।”

আর এই বাস্তবতা উপলব্ধি করলে অপশক্তি ঠেকানো খুব কঠিন নয়। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের বক্তব্যে বঙ্গকন্যা হুংকার দিলেন, আগামীতে আর সেই চেষ্টা করতে পারবে না। তাদের বিষদাঁত একে একে ভেঙ্গে দিচ্ছি, ভেঙ্গে দেবো!” একেই বলে বাপকা বেটি! স্যালুট মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! ঠিক এই প্রত্যয়ে বারবার জেগে উঠি দৃপ্ত শপথে।

আজকের বিশ্বে ইতিমধ্যেই প্রমাণিত সত্য, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত কাজ একের পর এক শেষ করে বিশ্বসভায় বাংলাদেশ অনুকরণীয় এবং অনুসরনীয় রাষ্ট্রের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন সফল রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের সহ-সভাপতি কৌশিক বসু বলে গেছেন, বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে চীনের সমপর্যায়ের। পাকিস্তান পরিত্যাজ্য করার সাহসী ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পাকিস্তানের ধৃষ্টতা দিনে দিনে কতোটা বাড়ছে, তা দৃশ্যমান। ব্যর্থ রাষ্ট্র পাকিস্তান জনগণকে একাত্তরে বাঙ্গালী নিধনের মতো করেই নিজেদের দেশে বালুচিস্তানের নিরীহ মানুষ নিধন যজ্ঞে মেতেছে। বালুচ ভাষার বদলে উর্দু ভাষা বলতে বাধ্য করছে তাদের। তুমুল আন্দোলন চলছে বালুচ জনগণের। এই পরিস্থিতিতেও পাকি গোয়েন্দা সংস্থা এখনো বাংলাদেশকে তাদের মতো ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। তার প্রমাণ ঢাকায় পাকিস্তান দূতাবাসের কর্মকর্তা ফারিনা আরশাদ সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ। গত ২৮ নভেম্বর রাজধানীর উত্তরা ও খিলগাঁও থেকে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) চার সদস্যকে গ্রেফতার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

এদের একজন পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইএ’র চর ইদ্রিস শেখ। পাকিস্তানের পাসপোর্টধারী পাকি –বাংলা জঙ্গী ইদ্রিস শেখের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে জানা যায়, জেএমবিকে নিয়মিত টাকা দিতেন পাকি দূতাবাসের কর্মকর্তা ফারিনা আরশাদ। জঙ্গী ইদ্রিস আদালতে জানিয়েছে, ২০০২ সালে সে করাচির রাজনৈতিক দল পাক-মুসলিম অ্যালায়েন্সের প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়।

২০০৭ সালে স্থায়ীভাবে ঢাকায় এসে প্রথমে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করে। ২০১২ সালের পর এয়ার টিকিটিং ও ভিসা প্রসেসিংয়ের ব্যবসা করতে গিয়ে বাবুল এবং পরবর্তীতে তার মাধ্যমেই কামাল নামে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আ্ইএসআই’র এজেন্টের সাথে পরিচয় হয়। ঘনঘন টিকিট করিয়ে দেয়ার কারণে বাবুলের কাছে তার অনেক টাকা বাকি পড়ে।

একপর্যায়ে বাবুল পাকিস্তানে চলে যায়। সেখানে গিয়ে সে ফারিনা আরশাদের মোবাইল নাম্বার দেয়। ইদ্রিসের স্বীকারোক্তি থেকে প্রকাশ, নিয়মিত জামায়াতকে অর্থায়ন করার পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াত নিষিদ্ধ হবার পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মানুষকে বিপন্ন করার জন্যে আরো কয়েকটি জঙ্গী সংগঠন তৈরি জরুরী হয়ে যায় পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থা ‘আইএসআই’ এর জন্যে। তারই অংশ হিসেবে জেএমবিকে বেছে নেয় তারা। এরই অংশ জেএমবি’র পাঁচ জনের দল গঠন করে সৃষ্টিশীল মুক্তচিন্তার অধিকারী, ধর্ম যাজক, বিদেশী সমাজহিতৈষী, সুফি বাদী ব্যক্তি, শিয়া মসজিদ এবং মন্দিরে একের পর এক হত্যাকাণ্ড এবং বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা এবং সাংস্কৃতিক উৎসবে হামলা চালিয়ে আসছে।

এ্ই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে জাল মুদ্রার ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। পাকিস্তান থেকেই বিমানে করে আনা হচ্ছে জাল ভারতীয় রুপি। পাকিস্তানি এয়ার লাইনসের বিমানে করে বাংলাদেশে সেই জাল মুদ্রা আনে। জাল মুদ্রা নিয়ন্ত্রন করার জন্যে বাংলাদেশ শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর নিরাপত্তা বাড়িয়ে দেয়। এ কারণে কিছুদিন পাকিস্তানি বিমান চলাচল বন্ধ ছিল। পরে আবার চালু হয়। বাংলাদেশ শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বিষয়টি সাংবাদিকদের কাছে নিশ্চিত করেন।

আকর্ষণীয় পাকি কর্মকর্তা ফারিনা আরশাদের সাথে মদ এবং নারীর লোভে লালায়িত দেশের শীর্ষ আমলা, শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব্বে নিয়োজিত অনেকে অনৈতিক ঘনিষ্ঠতায় জড়িয়েছেন এমন প্রমাণও পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এরই মধ্যে ফারিনা আরশাদের ভয়ঙ্কর কর্মকাণ্ডসহ অন্যান্য অপরাধ বিষয়ে ঢাকা মহানগর হাকিম আবদুল্লাহ আল মাসুদের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন জঙ্গী ইদ্রিস শেখ।

গোয়েন্দা সূত্র মতে, শুধু সরকার পতনের ভয়াবহ জঙ্গী নাশকতাই নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মুদ্রাবাজার ধ্বংস করে দেয়ার ষড়যন্ত্র করেছে আইএসআই। যা কার্যকর করতে গুটি হিসেবে ব্যবহার হয়েছে পাকি নারী কূটনীতিক। এর আগে জঙ্গী ও জাল মুদ্রার ব্যবসার অভিযোগ এনে ২০১৪ সালে পাকিস্তান দূতাবাসের ভিসা কর্মকর্তা মাযহার খানকে বহিষ্কারের দাবি জানানো হয়। অভিযোগের পর তড়িঘড়ি করে তাকে প্রত্যাহার করে নেয় পাকিস্তান। এরপর জঙ্গী ও জাল মুদ্রার ব্যবসাসহ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার এবং জনগণকে ধ্বংসের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় ফারিনাকে।

ইদ্রিস দাবি করে, বাবুলের মাধ্যমেই মূলত তার ফারিনার সঙ্গে পরিচয়। আইএসআই এর ষড়যন্ত্রে যুক্ত হবার কিছু দিন পরই ঢাকা বিমানবন্দরে জাল ভারতীয় রুপিসহ ধরা পড়েছিলো ইদ্রিস। পরবর্তীতে প্রভাবশালী ব্যক্তির মাধ্যমে জামিন পেয়ে যায় ইদ্রিস এবং বাবুলের মাধ্যমে পাকি দূতাবাসে ফারিনা আরশাদের কাজে সম্পৃক্ত হয়।

ইদ্রিসের দাবি, সে প্রথমে পাকিস্তানের এক স্কুল শিক্ষক শাহনাজ বেগমকে বিয়ে করেছিল। ওই ঘরে মোহাম্মদ আদিল নামের এক ছেলে রয়েছে। পরে ২০০০ সালে দেশে ফিরে সে পাশের গ্রামের মনোয়ারা বেগমকে বিয়ে করে। ইদ্রিসের বাড়ি বাগেরহাটের চিতলমারিতে। এই সংসারে তার এক ছেলে দুই মেয়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব ঘটনার নেপথ্যে আইএসআই নিয়োজিত পাকি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের নাম আদালতে নথিভুক্ত হচ্ছে পাকিজঙ্গীদের স্বীকারোক্তিতেই। এতে আবারো প্রমাণিত হলো পাকি দূতাবাসের কর্মকর্তারা বাংলাদেশে বসেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একের পর এক নাশকতার কর্মকাণ্ডে অর্থ যোগান দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর অবৈতনিক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় সম্প্রতি বলেছেন, এদেশে জঙ্গীবাদের কোন ঠাঁই হবে না। প্রথম বারের মতো রাষ্ট্রের কোন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বললেন, এদেশে নাস্তিকদের ও স্বাধীন মত প্রকাশ এবং স্বাধীনভাবে বাঁচবার অধিকার রয়েছে। কাউকে হত্যা করার কোন অধিকার জঙ্গীদের দেয়নি কেউ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর তৃতীয় প্রজন্ম, এর কাছে এমন বক্তব্যই প্রত্যাশিত। একই সাথে রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জগদ্দল পাথরের মতো গেড়ে বসা রাজাকার আলবদরের বশংবদদের নির্মূলের সময় এসেছে। তবে প্রশ্ন জাগে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির বিবাদ-বিচ্ছিন্নতার মেঘ কাটবে কি কখনো? সত্যিকার অর্থে একের পর এক ষড়যন্ত্র্র প্রমাণিত হবার পরও এদেশে পাকি দূতাবাসের কার্যক্রম সক্রিয় রাখার প্রয়োজন রয়েছে কি?

দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এ দেশের সফল রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী এবং তার পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র সুগভীর ষড়যন্ত্র ঠেকানো জরুরী। আর তা করতে হলে পাকি দূতাবাসের কার্যক্রম বন্ধ করা জরুরী। প্রাণের চেয়ে প্রিয় এই মাতৃভূমি সুরক্ষা এবং পরবর্তী প্রজন্মকে নিরাপদ রাখার প্রয়েোজনে দৃঢ়পণে এই মেঘ কাটিয়ে পাকিস্তানি সাপের বাচ্চাদের নির্মূলে একাত্ম হতে হবে সকলকে।

(১৫ নভেম্বর , ২০১৫ চ্যানেল আই অনলাইনে প্রকাশিত )

Saturday, January 13, 2018

পাপের ও বাপ থাকে প্রমাণ করলো ওয়ান-ইলেভেন- সুমি খান

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারী ঘুম ভেঙ্গে খালেদা জিয়া  স্তম্ভিত হয়েছিলেন তার সহযোগী অপশক্তি পাকিস্তানী গোষ্ঠীর দোসরদের মদতে  সন্ত্রাস ধর্ষণ , নির‌্যাতন,বোমা হামলায় ধ্বংসগামী রাষ্ট্র  বাংলাদেশকে থমকে দাঁড়াতে দেখেছিলেন। ১১ বছরে অনেকটা এগিয়েছে বাংলাদেশ ।জ্বালানি ,বিদ্যুত, কৃষি,নারী উন্নয়ন এবং শিক্ষা  প্রতিটি খাতে  অগ্রগতি চমকে দিয়েছে সারা বিশ্বকে ।

তবে হঠকারী রাজনীতি থেমে নেই ।ক্ষমতাসীন দল ঘিরে যথারীতি অন্ধকারের শক্তির তান্ডবে বিপন্ন শুভশক্তি ।

২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চেয়ে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে খালেদা ফিরেছিলেন কুমিল্লা থেকে। সেখানে থেকে ঢাকায় ফিরেছেন রাত প্রায় ১টা বেজে গেছে । পরদিন বেগম খালেদা জিয়া পরদিন যখন ঘুম থেকে জাগলেন, বঙ্গভবনে তখন সেনা প্রধান মইন ইউ আহমেদসহ অন্যরা। সেদিন সন্ধ্যা নাগাদ রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ  ২২ জানুয়ারীর একপক্ষীয় নির্বাচন বাতিল করে জরুরি অবস্থা জারি করেন।একই সাথে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে রাজি হন ইয়াজউদ্দিন ।গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি পদত্যাগ করার সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন।

পরবর্তীতে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। এর আগের ইতিহাস জানা সবার। নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করতে বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে দিয়েছিল খালেদা-নিজামী সরকার। সাধারণ জনগণ সেটা মেনে না নেয়াতে দেশে এক রক্তক্ষয়ী অবস্থার সৃষ্টি হয়।

অবশেষে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বেই গঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার।  অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ করতে থাকে, বিএনপিকে আবার সরকারে আনার ব্যবস্থা করছেন ইয়াজউদ্দিন। এর পর আবারও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। আন্তর্জাতিক শক্তির চাপে সেনা বাহিনী দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়, বাংলাদেশের জনগণ মুখোমুখি হয় ওয়ান ইলেভেন এর ।সেই মুহূর্তে ‘গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি এড়ানো গেছে বলে জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

মাইনাস -টু ফর্মুলা অনুযায়ী সেনা সমর্থিত  তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনীতি থেকে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াকে ‘মাইনাস’ করার চেষ্টা করে। জনচাপে সেটা সফল না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে এবং পরে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ‘আলোচিত-সমালোচিত’ নির্বাচন করে ৯ বছর ধরে ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে , ২০০৬ সালে  জামাত -বিএনপি যদি ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য লোভ না করতো অার প্রকৃতই একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতো, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস অন্যরকমও হতে পারতো।

মূলতঃ এক/এগারোর মাধ্যমে জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে নিয়ে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির সাজানো নির্বাচনে ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে ধরে রাখার লোভ বিএনপি করেছিল, পন্ড হয়ে গেল সেই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ।

Saturday, January 6, 2018

অভ্র’ যেভাবে করলেন ডাক্তার মেহদি হাসান খান



অভ্র। আভিধানিক অর্থ ‘আকাশ’। অভিধান ঘেটেঁ এই নামটি বের করেছিলো একজন ১৮ বছরের তরুণ, তার স্বপ্নের নাম দিতে। এটি হবে বিনামূল্যের সফটওয়্যার,যেখানে সবাই স্বাধীনভাবে ব্যবহার করবে, এসব চিন্তা করে এই নামটাই তার সবচাইতে মনে ধরেছিলো।

হালকা পাতলা ধরনের একটি ছেলে। চোখে চারকোনা মোটা ফ্রেমের চশমা, আর মাথা ভর্তি চুল। যা দিয়ে নিমিষেই আলদা করা যায় তাকে। কোন একটি জায়গায় চুপ করে দাঁড়াচ্ছে না, হেঁটে যাচ্ছে, হেঁটেই যাচ্ছে; কথা বললে হাত পেছনে নিয়ে শুনছে, তাকাচ্ছে এদিক ওদিক। এই তাকানোটাতে আবার কোন লুকোছাপা নেই। পূর্ণ দৃষ্টি। ক্যাম্পাসে ভয়ডরহীন আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হাসি।

সহজ ভাষায় এই হচ্ছে মেহদী। মেহদী হাসান খান। অভ্রের জনক।

অভ্র শুরুর গল্প-
অভ্রের প্রথম ভার্সনে এর কিবোর্ড লে আউটের নাম ছিলো ’ইউনিবিজয়’। এর কারন হলো, ইউনিকোড ভিত্তিক ’ইউনিবাংলা’ ফন্ট এবং বিজয় কি বোর্ডের ইউনিকোড সংস্করণ ছিলো অভ্রের প্রাথমিক ধারনাতে। যদিও ঠিক পরের সংস্করণেই মেহদী সেটার নাম বদলে রাখেন ’অভ্র’।

অভ্রের শুরু ২০০৩ সালে। মেহদী হাসান খান তখন নটরডেম কলেজের ছাত্র। ক্লাস নাইন থেকেই তার প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি নেশা। নিজে নিজেই বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রোগ্রামিংয়ের উপর বই পত্র জোগাড় করে নিজেই একাডেমিক পড়াশোনার ফাকেঁ ফাকেঁ প্রোগ্রামিং নিয়ে পড়াশোনা ও চর্চা চালিয়ে যেতেন সে সময়। ২০০৩ সালের একুশে বইমেলায় বায়োস (Bangla Innovation Through Open Source) নামের একটা বাংলাদেশী সংগঠন থেকে কিছু ছেলেমেয়ে পুরোপুরি বাংলায় লোকালাইজ করা একটা লিনাক্স ডিস্ট্রো নিয়ে এসেছিলো। নাম ‘বাংলা লিনাক্স’। মানে সেখানে শুধু বাংলাতে লেখাই যায় না, সেই সাথে সব উইন্ডোর টাইটেল, মেনু, ফাইলের নামকরণ সব ছিলো বাংলায়।

কম্পিউটারে তখন বাংলা বলতে ’বিজয়’ আর ‘প্রবর্তন’। খুব দরকার পড়লে সেগুলো দিয়ে শুধূ বাংলায় টাইপ করা যায়। কিন্তু পুরো অপারেটিং সিস্টেম বাংলায়, এর আগে এমনটা আর কখনো দেখা যায়নি। এমনকি ’বায়োস’ বইমেলা উপলক্ষ্যে নিজেদের যে সাইট বানিয়েছিলো, সেটাও বাংলায়! এইসব দেখে কিশোর মেহদী মুগ্ধতায় অভিভূত ও বিস্মিত হয়ে যায়।

বায়োস একটা নতুন ফন্টও বানিয়েছিলো সেই ডিস্ট্রোর জন্য। নাম ’ইউনিবাংলা’। সেখান থেকেই ইউনিকোড নিয়ে মেহদীর জানা শোনার সূত্রপাত। মেহেদী তখন উইন্ডোজ ব্যবহার করতো, তাই সঙ্গত কারনেই সেই বাংলা লিনাক্স তার কোন কাজে আসলো না। কিন্তু সে ঐ ফন্টটি নিয়ে পড়ে থাকলো। ফন্টটি ইন্সটল করার পর সে খেয়াল করলো, মাইক্রোসফট ওয়ার্ড এ ইনসার্ট কি ব্যবহার করে খুব সহজেই যুক্তাক্ষর বানানো যাচ্ছে। মানে, তখন যেমন বাংলা যুক্তাক্ষর বানানোর জন্য বিশেষায়িত সফটওয়্যার আর ফন্ট উভয়ই লাগতো, তেমনটা আর লাগছে না, তার বদলে শুধুমাত্র ফন্ট দিয়েই যুক্তাক্ষর বানানো যাচ্ছে।

কিন্তু ইনসার্ট ক্যারেক্টার ব্যবহার করে একটা একটা করে অক্ষর টাইপ করা অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ ও বিরক্তিকর কাজ, তাই মেহদীর মনে হলো, এখন জাষ্ট একটা কি বোর্ড ইনপুট মেথড হলে এই ফন্ট দিয়েই দিব্যি বাংলা টাইপিংয়ের কাজ চালিয়ে নেওয়া যাবে।

সে ভাবলো এটা হয়তো কেউ না কেউ ইতিমধ্যেই বানিয়ে রেখেছে। তাই সেটা খোজাঁর আশায় সে পুরো ইন্টারনেট চষে বেড়ালো। কিন্তু মেহদী অবাক হয়ে খেয়াল করলো, উইন্ডোজে কাজ করে এমন কোন ইউনিকোডভিত্তিক কিবোর্ড লে আউট কোথাও নেই। সে বুঝলো, এই জিনিসটা এখন পর্যন্ত কেউ বানায় নি। সুতরাং, তার যদি একান্তই এটার প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটা তাকে নিজের হাতে বানিয়ে প্রয়োজন মেটাতে হবে।

যেই ভাবা সেই কাজ। ততদিনে সে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। মেডিকেলের প্রচন্ড পড়াশোনার চাপ মাথায় নিয়ে সে তার হোষ্টেলের রূমে বসে দরজা বন্ধ করে ঐ ইউনিকোড ভিত্তিক কিবোর্ড বানানোর কাজে লেগে পড়লো। রাত দিন খেটে সে মুটামুটি কাজ চালানোর মতো একটা প্রোটোটাইপ দাঁড় করিয়ে ফেল্ল। এটা করতে গিয়ে তার চোখের নীচে কালি পড়ে গেলো, ক রাত ঘুমায় না কে জানে? যে ছেলে রেগুলার মেডিসিন ক্লাবে আসতো, মেডিসিন ক্লাবের প্রত্যেকটা কাজে সরব, উপস্থিতিও সেরকম প্রানোচ্ছল, হঠাৎ করে সে ছেলেটা হয়ে গেলো চুপচাপ। মাথা নিচু করে হাঁটছে, জিজ্ঞাসা করলে কথা বলছে। মেহদীর চরিত্রের সাথে যায় না।

কিছুদিনের মধ্যে ক্যাম্পাসে জানাজানি হয়ে গেলো, মেহদী কম্পিউটারে বাংলা লেখার জন্য নিজস্ব একটা সফটওয়্যার বানাচ্ছে। তো এরপর দেখা হলে মেডিক্যালের সিনিয়র ভাইরা জিগেস করতো - ’কত করে নিবি?’

মেহদী অবাক হয়ে উত্তর দিতো -’ মানে?  কিসের কত করে নিবো?’

- আরে তোর সফটওয়্যারের দাম কত করে রাখবি?

- দাম রাখবো কেন? ওটা তো ফ্রি। কোন টাকা পয়সা দিতে হবে না।

- বলিস কি!

- হ্যাঁ। ভাষার জন্য টাকা নেবো কেন?

মেহদীর কথা শুনে তাদের আক্কেলগুড়ুম হয়ে যেতো। ১৯ বছরের একটা ছেলে বলছে এই কথা!

মেহদী যেহেতু উইন্ডোজ ওএসের জন্য এ্যাপ্লিকেশন বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, সেহেতু তাকে স্বভাবতই মাইক্রোসফটের ডটনেট ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করতে হলো। পরে ভারতের একটা বাংলা ফন্ট প্রতিযোগীতায় ইমেইল করে নিজের বানানো প্রোটোটাইপটা পাঠানোর পর তারা জানালো, ’এইটা তো ঘন ঘন ক্র্যাশ করছে’। তারপর আবার রাতের পর রাত জেগে সেই প্রোটোটাইপের বাগ সারানো। তার আগে ডটনেট বাদ দিয়ে ক্লাসিক ভিজুয়াল বেসিকে সবগুলো কোড নতুন করে আবার লেখলেন মেহদী। (যদিও পরবর্তীতে আবারো একেবারে নতুন করে কোড লেখা হয় Delphi/Object Pascal এ। বর্তমানে অভ্র এই ফ্রেমওয়ার্কেই আছে।)  ক্র্যাশের ঝামেলা কমলো। তারপর সে মনোযোগ দিলো অভ্রর অফিসিয়াল সাইটটা বানানোয়। মেহদী তার সাইটে ফোরাম সেটাপ করলো, এটা অভ্রর জীবনে একটা গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ছিলো। ফোরামে অভ্র’র ইউজাররা ফিডব্যাক দিতো, বাগ রিপোর্ট করতো, প্রশ্নত্তোর চলতো।

মেহেদী ততদিনে অভ্রকে বেশ সিরিয়াসভাবে নেওয়া শুরু করেছেন। কিন্তু কলেজে পড়ুয়া একটা ছেলে শখের বশে ঘরে বসে একটা সফটওয়্যার বানিয়েছে, এই কথা জানলে স্বভাবতই কেউ অভ্রকে পাত্তা দিতে চাইবে না। তাই তিনি যথাসম্ভব চেষ্টা করলেন তার কাজে পেশাদারিত্বের ছোঁয়া রাখার। তিনি নিয়মিত রিলিজ লগ লিখতেন, নিয়মমতো ভার্সন নাম্বার বাড়াতেন, বিশাল বিশাল সব ইউজার ম্যানুয়াল লিখতেন, যাতে করে যে কেউ প্রথম দেখায় ভাবে যে এটা একটা পেশাদার সফটওয়্যার ডেভেলপার টিমের কাজ। কোন একক মানুষের শখের বশে অবসরে বানানো কোন হেলাফেলার জিনিস নয়।

মেহেদীর উদ্দেশ্য সফল হলো পুরোপুরি। তারঁ নিজের মুখ থেকেই শোনা যাক - “আমাকে যারা চিনতো না, তাদের অনেকের ধারনা ছিলো, দেশের বাইরে থেকে প্রফেশনাল সফটওয়্যার ডেভেলপারের একটা গ্রুপ এই প্রজেক্টটা চালায়। এখন ফ্রি দিচ্ছে মার্কেটিংয়ের জন্য। পরে পয়সা নিবে। দেশ নিয়ে আমাদের এই ধরনের অবজ্ঞা কেন, আমি জানি না। যেন দেশে ভালো কিছু হতে পারে না। তাছাড়া, শখের প্রজেক্টেই বা কি সমস্যা?”

মেহদী তার ব্রেইনচাইল্ড অভ্রের পেছনে রীতিমতো পাগলের মতো লেগে রইলেন আর একে আরো নিখুতঁ করার জন্য ক্রমাগত শ্রম দিতে লাগলেন। যখনি মনে হয়, কাজ প্রায় শেষ, তখনি হঠাৎ নতুন নতুন আইডিয়া আসে, আর তিনি সাথে সাথেই নাওয়া খাওয়া ভুলে সেটা নিয়ে কাজে নেমে যান।

এমনও হয়েছে, রাতে ঘুমানোর জন্য বিছানায় যাবার পর বাতি নিভিয়ে শোবার কিছুক্ষন পরেই মনে হয়েছে, কোন একটা ডায়লোগ বক্সের বাটন গুলোর ডিভাইডারের দাগগুলো পেশাদার সফটওয়্যার কোম্পানি যেভাবে দেয়, সে সেভাবে দেয়নি। তখনি বাতি জ্বালিয়ে বিছানা থেকে উঠে আবার কম্পিউটার ছেড়ে সেই ডায়লোগবক্সের বাটনের ডিভাইডার নিয়ে কাজ করেছে। সেটা করার সময় আরো অনেক বাগ ধরা পড়লো, কিংবা নতুন আইডিয়া আসলো, দেখা গেলো কাজ শেষ করে তিনি যখন আবার বিছানায় গেছেন, ততক্ষনে সকাল হয়ে গেছে।

অভ্র নিয়ে রাত দিন পড়ে থাকার কারনে মেহদীর মেডিকেলের পড়া শিকেয় উঠলো। এই দেখে সেখানকার তাবৎ বিজ্ঞ শিক্ষকেরা ঘোষণা দিয়ে জানিয়ে দিলেন, এ ছেলে মেডিকেলের অনুপযোগী। বিজ্ঞ শিক্ষকেরা বলে দিলেন, সময় থাকতে মেডিকেল ছেড়ে দিতে। মেডিকেলের অসহ্য, দমবন্ধ করা পৃথিবী মেহদীকে চেপে ধরছিলো আষ্টেপৃষ্ঠে, মরে যাওয়ার কথা ছিলো ছেলেটার। একদিকে নতুন আইডিয়া, তার স্বপ্ন, আরেকদিকে মেডিকেল। অসম্ভব অস্থিরতা। তবু শত্রুর মুখে ছাই আর সবাইকে অবাক করে দিয়ে দিন শেষে সে ঠিকঠাকভাবেই মেডিকেলের পাট চুকাতে পেরেছিলো। তিন সাফল্যের সাথেই এমবিবিএস পাশ করে বের হন।

সে সময়ের জনপ্রিয় প্রযুক্তি বিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন “কম্পিউটার টুমোরো” একদিন ফিচার প্রতিবেদন করলো মেহদীর অভ্রকে নিয়ে। শুধু তাই না, সেই ম্যাগাজিনের সাথে অভ্রের সিডির একটা করে কপি ফ্রি দেয়া হয়েছিলো। “সে মাসে নিউ মার্কেটের দোকানে দোকানে সিডিসহ ম্যাগাজিন, কি যে দারুন অনুভূতি! ইচ্ছে করছিলো রাস্তার সবাইকে ডেকে ডেকে দেখাই!” - এভাবেই সে সময়কার অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন মেহেদী।

ওমিক্রন ল্যাবের নামকরণঃ

প্রথম দিকে অভ্রর সাইটের নাম ছিলো ওমিক্রন ল্যাব। যেটা মেহদীর মাথায় এসেছিলো মূলতঃ মুহম্মদ জাফর ইকবালের বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস “ওমিক্রনিক রূপান্তর” থেকে। লেজের সঙ্গে ’ল্যাব’ শব্দটা যুক্ত হয়েছিলো একটা ভারিক্কি-সিরিয়াস ভাব আনার জন্য, এ কথা মেহদী নিজেই বলেছেন।

প্রথম ওয়েব সাইট ডোমেইনটা কেনা হয় এক প্রবাসী মামাকে অনুরোধ করে। মামা দেশে এসে বিয়ে করেছিলেন, সেই বিয়ের ছবি তুলে দেবার দায়িত্ব ছিলো মেহদীর ঘাড়ে। ওমিক্রন ল্যাব নামে যে সাইটটা বানানো হয়, সেটাতে সেই ছবিগুলোও আপলোড করে দেয়া হয় মামাকে খুশী করতে। তার একটু নীচে স্রেফ লেখা ছিলো ‘তুমি যদি এই সাইটে ইউনিবিজয়ের জন্য এসে থাকো, তবে এখানে ক্লিক করো।” ব্যস, আর কিছু লেখা ছিলো না। অবশ্য মামার বিয়ের ছবিওয়ালা ঐ সাইটটা অনলাইনে খুব বেশীদিন ছিলো না।

যেভাবে অভ্র টিম গঠিত হলোঃ

অভ্রের সাইটের সেই ফোরামটা অভ্র টিম গঠনে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছিলো। কারন সেই ফোরামের মাধ্যমেই অভ্র টিমের বাকী সবার সাথে প্রথম পরিচয় হয়েছিলো। প্রথমে ওমরের সাথে। এলিফ্যান্ট রোডে উনার একটা সফটওয়্যার বিক্রির দোকান ছিলো, নাম ‘বাঙ্গালিয়ানা’, নিভৃতচারী ও প্রচন্ডরকমের প্রচারবিমুখ মেহদী হাসান তখন সমমনা আর কাউকে চিনতেন না সে সময়, তাই ওমর ভাইর দোকানে গিয়ে প্রায়ই আড্ডা চলতো। মূলতঃ সেখান থেকেই টিমের সূত্রপাত।

বাঙ্গালিয়ানায় আড্ডা দিতে গিয়ে এরপর পরিচয় হলো রিফাতের (রিফাত-উন-নবী) সঙ্গে, যে রিফাত অভ্রের ম্যাক ভার্সন বানিয়েছে। সিয়াম (তানবিন ইসলাম সিয়াম) আর শাবাব (শাবাব মুস্তফা) এর সাথে পরিচয় অভ্রের ফোরামের মাধ্যমে। সিয়াম অভ্র টিমে ঢুকেই বানিয়ে ফেল্ল ’কাল পুরুষ’ আর ‘সিয়াম রূপালি’ নামে দুটো ফন্ট। এ দুটো ফন্ট শুধুমাত্র অভ্রের জন্যই বানানো হয়েছিলো। ভারত থেকে একটা ছেলে এসেছিলো ফোরামে, নাম নিপন। ফোরামের অন্যতম মডারেটর হয়ে যায় সে। অনেক পরে সারিম যোগ দেয় টিমে। সে অভ্রের বর্তমান ওয়েব সাইট আর অভ্রের লিনাক্স ভার্সন বানায়। এমনকি মেহদীর স্ত্রী সুমাইয়া নাজমুনও প্রায় দেড় লাখ শব্দ সম্পাদনা করেছিলেন অভ্রর ডিকশনারীর জন্য।

২০০৭ সালে 'অভ্র কীবোর্ড পোর্টেবল এডিশন' বিনামূল্যে ব্যবহারের জন্যে উন্মুক্ত করা হয়। অভ্রের সোর্স কোড উন্মুক্ত, অর্থাৎ যে কেউ চাইলেই গিটহাব রিপোজেটরি থেকে এর উন্নয়নে অংশগ্রহন করতে পারবেন। উল্লেখ্য, ভার্সন ৫ এর পর থেকে অভ্রকে ফ্রিওয়্যার থেকে ওপেনসোর্সে রূপান্তর করা হয়। এবং এটি ’মজিলা পাবলিক লাইসেন্স’এর অধীনে লাইসেন্সকৃত।

অভ্রের স্বীকৃতিঃ

১) মাইক্রসফটের অনলাইন সংগ্রহশালায় ইন্ডিক ভাষাসমূহের সমাধানের তালিকায় অভ্র কী-বোর্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা।

২) জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির কাজে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন অভ্র ব্যবহার করে।

৩) অভ্রকে বাংলা কীবোর্ড রিসোর্স হিসেবে ইউনিকোড সংস্থার ওয়েব সাইটে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

৪) বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস বা বেসিস বাংলা তথ্য প্রযুক্তিতে বিশেষ অবদানের জন্য অভ্রটিমকে-কে ২০১১ 'বিশেষ অবদান পুরষ্কার' (Special Contribution Award) প্রদান করে

এছাড়াও, মেহদী ব্যাক্তিগতভাবে ২০১৬ সালের সেপ্টেস্বরে Top Ten Outstanding Young Persons পুরস্কার লাভ করেন।

পরিবার ও ব্যাক্তিগত জীবনঃ

মেহদী হাসান খান একজন দায়িত্ববান স্বামী এবং একজন স্নেহপরায়ন পিতা। তার ছেলের নাম ’অর্ক হাসান খান’। ব্যক্তিগতভাবে মেহদী অতি নিভৃতচারী, বিনয়ী, অত্যন্ত স্বল্পভাষী ও প্রচারবিমুখ একজন মানুষ। অনেকেই হয়তো জানেন না, মেহদী একজন অসাধারন চিত্রগ্রাহক। তার ফটোগ্রাফির হাত দুর্দান্ত রকমের ভালো। ফ্লিকরে তার একটি একাউন্ট রয়েছে, যদিও সম্প্রতী তিনি তার সকল ছবি ব্যক্তিগত এক কারণে লোকচক্ষুর আড়াল করে রেখেছেন।

মেডিক্যাল কলেজ থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে পাশ করে বের হলেও তিনি নামের আগে কখনো ডাঃ বসাননি। কারন তিনি পেশায় একজন প্রোগ্রামার, বর্তমানে আছেন ’ব্যাকপ্যাকে।’ প্রোগ্রামিং তার নেশা, অবসেশন। তিনি জাভাস্ক্রিপ্ট কোড লেখায় বিশেষভাবে দক্ষ। শেষ করছি, প্রোগ্রামিং আর মানব কল্যান নিয়ে তারঁ নিজের চমৎকার কিছু কথা দিয়ে।

”ক্লাস নাইনে ওঠার পর বইপত্র যোগাড় করে প্রোগ্রামিংটা শেখার পর আর অন্যদিকে তাকানো হয়নি, এখনো লেগে আছি। কম্পিউটার আর ইন্টারনেট থাকলে আমার আর কিছুর দরকার হয় না। দিনশেষে মনে হয়, প্রোগ্রামিংটা বেশ ইন্টারেস্টিং, অনেকটা সুপার পাওয়ারের মতো। তবে তার চাইতেও অনেক বেশী ইন্টারেস্টিং হলো, সেই সুপার পাওয়ার দিয়ে মানুষের কাজে লাগে এমন কিছু বানাতে পারা। যারা সেই মজা পেয়েছেন ও ভবিৎষতে পাবেন, তাদের জন্য আমার ভালোবাসা রইলো।”
একুশে পদকের দাবী-
অভ্রের জন্য একুশে পদকের দাবী জানানো হচ্ছে বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই। এই দাবীর শুরুটা হয়েছিলো বাংলা ব্লগে। এমনকি প্রতি বছরই ফেসবুক ও কমিউনিটি ব্লগগুলোতে অসংখ্য পোষ্ট আসে অভ্রকে একুশে পদক দেবার দাবী জানিয়ে। এবং এই দাবীটা অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত।

কারণ, বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা বাংলা লেখার জন্য যতগুলো কি বোর্ড লে আউট ব্যবহার করে, তার ভেতর সবচাইতে জনপ্রিয় এবং সবচাইতে বহুল ব্যবহৃত কি বোর্ড হচ্ছে অভ্রের ফনেটিক কি বোর্ড। এর জনপ্রিয়তার মূল কারন হলো, অন্যান্য প্রচলিত বাংলা লে আউটের মতো এটার লে আউট মুখস্ত করতে হয় না। ইংরেজী অক্ষর চেপেই বাংলা অক্ষর টাইপ করা যায়। যেমনঃ Ami bhat khai টাইপ করলে লেখা হবে 'আমি ভাত খাই।’ সুতরাং, অভ্রের মাধ্যমে যে কেউ যে কোন সময়েই দুয়েক মিনিটের চর্চাতেই বাংলা টাইপিংয়ে দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন। অভ্র ছাড়া এত সহজে আর এত অল্প সময়ে এত নিখুঁতভাবে বাংলা লেখা হয়তো কোনভাবেই সম্ভবপর হয়ে উঠতো না। অভ্র দিয়ে অনলাইন কিংবা অফলাইন, উভয় জাগাতেই সমান দক্ষতায় বাংলা টাইপিং সম্ভব। আরেকটি বড় দিক হচ্ছে, এটা একেবারেই বিনামূল্যে পাওয়া যায়। কোন টাকা পয়সা খরচ করতে হয় না।

মেহদী ক্রমাগত বছরের পর বছর ধরে শ্রম আর অধ্যবসায় দিয়ে অভ্রকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। সে এই পৃথিবীকে যেটা দিয়েছে, তা হচ্ছে মুক্তি, স্বাধীনতা। বাংলা লেখার স্বাধীনতা।

তাই মেহদীর অভ্র -এর স্লোগান,"ভাষা হোক উন্মুক্ত"।

উন্মুক্ত এই সফটওয়্যার বাঁচিয়েছে সরকারের কোটি কোটি টাকা। সরকারী দপ্তরগুলোতে অভ্র ব্যবহার হয়। নির্বাচন কমিশন ব্যবহার করে আমার আপনার পরিচয়পত্র বানাচ্ছে,পাসপোর্ট বানাচ্ছে,সরকারী ফাইলে হচ্ছে লেখা। সবকিছুর মূলে ছিলো মেহদীর সেই এক রুমের পৃথিবী, একটা ছোট্ট কম্পিউটার আর পর্বতসম স্বপ্ন। এবং তার স্বপ্নকে সে বিনামূল্যে ছড়িয়ে দিয়েছে পৃথিবীময় সমস্ত বাংলাদেশীর কাছে।

অভ্র আমাকে বাংলায় লেখার স্বাধীনতা দিয়েছে। খুব সম্ভবত আপনাকেও। এই স্বাধীনতা দেয়ার জন্য মেহদী কিংবা অভ্রের কিছু প্রাপ্য। প্রাপ্য সরকারের কাছেও। তীব্র প্রচারবিমুখ আর বিনয়ী ছেলেটার স্বপ্নটাকে একটা রাষ্ট্রীয় পুরস্কার কি দেয়া যায়না? একুশে পুরস্কার অভ্র’র করুণা নয়, পাওনা। এবং এই পাওনার দায় আমাদের মাথার উপর ঝুলে আছে গত প্রায় এক দশক ধরে। এখন সময় এসেছে এই পাওনা শোধ করে দায়মুক্ত হবার।

(তথ্যের জন্য কৃতজ্ঞতাঃ নন্দিত.কম,উইকিপিডিয়া, বাংলাদেশ ওয়েব পোর্টাল, মাসিক বিজ্ঞানচিন্তা, বিভিন্ন সময় প্রকাশিত ব্লগ ও সংবাদ কলাম, এবং মেহদীর মেডিক্যাল কলেজের সিনিয়র ভাই ’মানিক চন্দ্র দাস’)

Sunday, December 3, 2017

রোহিঙ্গাদের বুক পেতে গ্রহণ করেছি অথচ হিন্দুদের বুক আগলে রক্ষা করব না?-মুহম্মদ জাফর ইকবাল

১.১২.২০১৭
খবরের কাগজে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ছবি দেখে দেখে এতদিনে আমাদের অভ্যস্ত হয়ে যাবার কথা ছিল। কিন্তু আমার মনে হয় আমরা এখনো অভ্যস্ত হতে পারিনি। সম্ভবত তার প্রধান কারণ হচ্ছে রোহিঙ্গা শিশু।


একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ তার জীবনের সবকিছু পিছনে ফেলে হেঁটে হেঁটে অনিশ্চিত একটা জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেই দৃশ্যটি যথেষ্ট হৃদয় বিদারক। তার চাইতে শতগুণ বেশি হৃদয় বিদারক দৃশ্য একটি অবোধ শিশু যখন তার চারপাশে কী ঘটছে তার কিছুই বুঝতে না পেরে, তার বাবা বা মায়ের পাশে পাশে হেঁটে হেঁটে যায়।


তাদের চোখে এক ধরনের বিস্ময়, এক ধরনের অবিশ্বাস এবং আতঙ্ক। সেই চোখের দৃষ্টি দেখে বিচলিত না হয়ে নিরাসক্ত দৃষ্টিতে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। শিশুগুলো যখন খুব ছোট তখন তারা থাকে তাদের মায়ের কোলে, একটুখানি বড় হয়ে গেলে বাবার কোলে বা কাঁধে। তারা যদি হাঁটতে শিখে তাহলে নিজেরাই বাবা কিংবা মায়ের পাশে পাশে হেঁটে হেঁটে আসে। আরেকটু বড় হয়ে গেলে অবধারিত ভাবে তাদের মাথায় একটা বোঝা থাকে।

এই কিশোর কিংবা কিশোরীর চোখের দৃষ্টি দেখে কেন জানি নিজের ভেতরে এক ধরনের তীব্র অপরাধবোধের জন্ম হয়। এই পৃথিবীতে কত সম্পদ, কত ঐশ্বর্য অথচ এই রোহিঙ্গা শিশুদের জন্যে কিছু নেই। শুধুমাত্র প্রাণটুকু বাঁচিয়ে রাখতেই তাদের পুরো জীবনীশক্তি ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে।

রোহিঙ্গা শিশুদের দেখে প্রথমেই আমার মনে হয় এখন তাদের স্কুলে যাবার কথা কিন্তু সেই কথাটি উচ্চারণ করাই মনে হয় একটা উৎকট রসিকতার মতো মনে হবে। আমাদের ছেলে মেয়েরা এখন পরীক্ষা দিচ্ছে, পরীক্ষা শেষে অনেকেই বাবা মায়ের সঙ্গে বেড়াতে যাবে, আগ্রহ নিয়ে পরীক্ষার ফলাফলের জন্যে অপেক্ষা করবে।

নতুন বছর শুরু হলে তাদের সবার হাতে নতুন বই উঠবে। সেই বই হাতে নিয়ে তাদের মুখে হাসি ফুটে উঠবে। অথচ এই রোহিঙ্গা শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার কিছু নেই। শুধুমাত্র শরণার্থী শিবিরে একটি দিনের পর আরেকটি দিন বেঁচে থাকা।

শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম মহিলা যখন তার মিলিটারী জেনারেলদের নিয়ে রোহিঙ্গাদের হত্যা ধর্ষণ করে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে দেশ ছাড়া করেছিল তখন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষদের নিয়ে তাদের আশ্রয় দিয়েছেন। সারা পৃথিবীর মানুষের সামনে ঘোষণা করেছেন আমরা ষোল কোটি মানুষ যদি খেতে পারি, তাহলে এই দশ লক্ষ লোকও খেতে পারবে। নতুন এবং পুরাতন মিলে প্রায় দশ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী এখন এই দেশের মাটিতে স্থান পেয়েছে, মাথার ওপর একটুখানি আচ্ছাদন পেয়েছে, দুই বেলা খেতে পারছে, অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাচ্ছে, সবচেয়ে বড় কথা প্রাণের ভয়ে তাদের বনের পশুর মত বনে জঙ্গলে ছুটে বেড়াতে হচ্ছে না।

এই মুহূর্তে পৃথিবীর কত জায়গায় কত রকম যুদ্ধ বিগ্রহ কত রকম নিষ্ঠুরতা তার ভেতরে হত দরিদ্র দুঃখী রোহিঙ্গাদের কথা পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারতো। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্যি পৃথিবীর সব মানুষ এই রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচারের কথা মানে। (শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া পৃথিবীর একজন নিষ্ঠুরতম মহিলার সম্মাননা একটি একটি করে প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে, এর চাইতে বড় লজ্জা আর অপমান কি হতে পারে?

খবরের কাগজে দেখতে পাচ্ছি আলোচনা চলছে, চুক্তি হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা হচ্ছে। দিনে তিনশত করে শরণার্থী প্রক্রিয়া করা সম্ভব হবে বলে দেখেছি। সেটি যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে দশ লক্ষ রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে দশ বছর সময় লাগবে। সোজা বাংলায় যার অর্থ এই রোহিঙ্গা মানুষগুলোকে আমাদের বছরের পর বছর আশ্রয় দিতে হবে।

যদি তাই সত্যি হয় তাহলে এই রোহিঙ্গা শিশুদের ভবিষ্যৎ কী আমাদের একটু আলাদা ভাবে দেখার প্রয়োজন নেই? আমরা আমাদের শিশুদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে দেব কিন্তু একই ভূখণ্ডে আশ্রয় নেওয়া অন্য শিশুদের লেখা পড়ার ব্যবস্থা করব না? তাদের ভবিষ্যতের কোনো স্বপ্ন থাকবে না?

আমরা যখন স্কুল কলেজে লেখাপড়া করেছি তখন চীন দেশের কমিউনিস্ট নেতা মাও সে তুংয়ের কথা খুব শুনতে পাওয়া যেতো। তার একটা বিখ্যাত উক্তি ছিল এরকম- ‘একজন মানুষ খাওয়ার জন্যে একটি মুখ কিন্তু কাজ করার জন্য দুটি হাত নিয়ে জন্মায়।’ আমরা কী এখন রোহিঙ্গা শিশুদের জন্যে সেই কথাটিই ব্যবহার করতে পারি না? তাদের মুখ একটি, হাত দুটি এবং মস্তিষ্কে নিউরন একশ বিলিওন?
২.
একজন মানুষকে ঘর ছাড়া কিংবা দেশ ছাড়া করার সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর পদ্ধতি হচ্ছে তার বাড়িতে আগুন দিয়ে দেওয়া। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম মহিলা এবং তার জেনারেলরা সেই তথ্যটি খুব ভালো করে জানে তাই তারা একটি একটি করে রোহিঙ্গা গ্রামের প্রতিটি বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে তাদের ঘর ছাড়া করেছে, দেশ ছাড়া করেছে।

কেউ কী লক্ষ্য করেছে আমার নিজের দেশের রংপুরে হিন্দুদের বেলায় হুবহু একই ব্যাপার ঘটেছে। অনেক মানুষ মিলে পুলিশের সামনে হিন্দুদের বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়াতেও একই প্রক্রিয়ায় একই ব্যাপার ঘটেছিল।

তখন রসরাজ নামে একজন অসহায় নিরীহ মানুষকে ব্যবহার করে কাজটি করা হয়েছিল এবারে টিটু রায় নামে অন্য একজনকে বেছে নেওয়া হয়েছে। পুরো ব্যাপারটির মাঝে এক ধরনের অচিন্ত্যনীয় নিষ্ঠুরতা রয়েছে অথচ অবিশ্বাসের কথা হচ্ছে এইটিটু রায়কে দিনের পর দিন রিমান্ডের অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে।

আমরা রোহিঙ্গাদের বুক পেতে গ্রহণ করেছি অথচ হিন্দুদের বুক আগলে রক্ষা করব না? এ কেমন কথা?

৩.
সবে মাত্র জেএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে, খবরের কাগজ থেকে জানতে পেরেছি সবগুলো পরীক্ষার সবগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। সারা দেশে যেরকম তুলকালাম কান্ড হওয়ার কথা ছিল তার কিছুই হয়নি। প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে সাথে সাথে পরীক্ষাটি বাতিল হয়ে যাবার কথা- একটি পরীক্ষাও বাতিল হয়নি কাজেই ধরে নিচ্ছি শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি মেনে নিয়েছে।

যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়াটি মেনে নেয় তাহলে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবকেরা সেটি কেন মেনে নেবে না? সবাই মেনে নিয়েছে এবং বিষয়টা একটা উৎসবে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে এর চাইতে কালো কোনো অধ্যায় কী হওয়া সম্ভব?

জেএসসি পরীক্ষা শেষে পিএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। জেএসসি পরীক্ষার ‘ঐতিহ্য’ ধরে রেখে এর প্রশ্নও ফাঁস হতে শুরু হয়েছে। প্রাইমারীর ছেলে মেয়েরা একেবারেই শিশু তাদের প্রশ্ন ফাঁসে অভ্যস্ত করে দেওয়ার মতো নিষ্ঠুরতা আর কী হতেপারে? জেএসসি , এসএসসি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে যে লাগাম ছাড়া সমস্যার জন্ম হয়েছে প্রাইমারী পরীক্ষার বেলায় সেটি একেবারেই হওয়ার কথা ছিল না, কারণ এই পরীক্ষাটিই হওয়ার কথা ছিল না।

এই দেশের লেখাপড়া নিয়ে কথা বলা হলে যে শিক্ষানীতির কথা বলা হয় সেই শিক্ষানীতিতে প্রাইমারী পরীক্ষাটির কথা বলা নেই। শিক্ষানীতিকে সম্মান দেখিয়ে যদি এই পরীক্ষাটিকে পাবলিক পরীক্ষার মত একটি বিশাল যজ্ঞ দজ্ঞতে রূপান্তর করে ফেলা না হতো তাহলেই এর প্রশ্নফাঁসের ব্যাপারটাই থাকতো না। যদি পরীক্ষাই না থাকে তাহলে কোন পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হবে?

এবারের পিএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সাথে সাথে আমরা নতুন আরো একটা বিষয় দেখতে পেয়েছি, সেটি হচ্ছে প্রশ্নপত্রের ভুল। যারা পত্রপত্রিকা পড়েন তাদের একজনও নাই যারা প্রশ্নের ইংরেজিটি দেখে আতঙ্কে শিউরে ওঠেনি। প্রশ্নপত্রের এই ভুলটি যেরকম অবিশ্বাস্য এর প্রতিকার হিসেবে যে কাজটি করা হয়েছে সেটি আরও অবিশ্বাস্য। খুঁজে খুঁজে সেই মানুষটিকে বের করা হয়েছে যে প্রশ্নপত্রটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে তারপর তাঁকে বরখাস্ত করে দেওয়া হয়েছে।

যে ইংরেজীতে অনুবাদ করেছে তার ইংরেজির জ্ঞান খুব কম, তার পক্ষে এর চাইতে ভালো ইংরেজি লেখা সম্ভব নয়, তাই সে এরকম একটি অনুবাদ করেছে। এটি অন্যায় হতে পারে না, এটি হচ্ছে ব্যর্থতা। ব্যর্থতার জন্য কাউকে শাস্তি দেওয়া যায় না। যদি শাস্তি দিতেই হয় তাহলে শাস্তি দিতে হবে এই প্রশ্ন প্রণয়ন করার দায়িত্বে থাকা কমিটিকে, তার সভাপতিকে, তার সদস্যদের।

তারা অনেক বড় অন্যায় করেছেন, তারা এমন একজন মানুষকে প্রশ্ন অনুবাদ করার দায়িত্ব দিয়েছেন যিনি ইংরেজি জানেন না। শুধু তাই না, ইংরেজিতে অনুবাদ করার পর সেই কমিটি প্রশ্ন পত্রটিতে চোখ বুলানো প্রয়োজন মনে করেননি কিংবা চোখ বুলিয়ে ভুল ইংরেজি দেখার পরও সেটি সংশোধন করা দরকার মনে করেননি।

একটি বিশাল বিপর্যয় ঘটবে, যারা সেই বিপর্যয়টি ঘটাবে তারা ধরা ছোওয়ার বাইরে থাকবে, খুঁজে পেতে সবচেয়ে নিরীহ এবং ক্ষুদ্র মানুষটিকে বের করে তাকে শাস্তি দিয়ে সবাই আনন্দে বগল বাজাতে থাকবে এটি কেমন কথা? একজন মানুষ ইংরেজি না জানলে তাকে শাস্তি দেওয়া যায় না, যে তাকে দিয়ে ইংরেজি অনুবাদ করেছে তাঁকে খুঁজে বের করে প্রয়োজন হলে তাঁকে শাস্তি দিতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, একটা বিপর্যয় ঘটে যাবার পর কাউকে খুঁজে বের করে তাকে শাস্তি দিয়ে কোনো লাভ নেই, বিপর্যয় না ঘটলে অনেক বড় লাভ হয় এই সহজ কথাটি কেউ কেন বুঝতে পারছে না?
৪.
সাম্প্রতিক ঘটনার মাঝে আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে যে ঘটনাটি সেটি হচ্ছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের একটি ঘোষণা, সেটি হচ্ছে তারা এখন স্কুলে স্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করবে। নিজের কানে শুনেও আমি কথাটি বিশ্বাস করতে পারছি না।

বর্তমান ছাত্রলীগ কী আমাকে সারা দেশে একটি ঘটনার কথা বলতে পারবে যেটি দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নেব যে আমার স্কুলে পড়ুয়া সন্তানকে ছাত্রলীগের সদস্য করে দিতে হবে? যদি না পারে তাহলে তাদের এই সর্বনাশা প্রজেক্টে হাত দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।