Saturday, January 13, 2018

পাপের ও বাপ থাকে প্রমাণ করলো ওয়ান-ইলেভেন- সুমি খান

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারী ঘুম ভেঙ্গে খালেদা জিয়া  স্তম্ভিত হয়েছিলেন তার সহযোগী অপশক্তি পাকিস্তানী গোষ্ঠীর দোসরদের মদতে  সন্ত্রাস ধর্ষণ , নির‌্যাতন,বোমা হামলায় ধ্বংসগামী রাষ্ট্র  বাংলাদেশকে থমকে দাঁড়াতে দেখেছিলেন। ১১ বছরে অনেকটা এগিয়েছে বাংলাদেশ ।জ্বালানি ,বিদ্যুত, কৃষি,নারী উন্নয়ন এবং শিক্ষা  প্রতিটি খাতে  অগ্রগতি চমকে দিয়েছে সারা বিশ্বকে ।

তবে হঠকারী রাজনীতি থেমে নেই ।ক্ষমতাসীন দল ঘিরে যথারীতি অন্ধকারের শক্তির তান্ডবে বিপন্ন শুভশক্তি ।

২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চেয়ে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে খালেদা ফিরেছিলেন কুমিল্লা থেকে। সেখানে থেকে ঢাকায় ফিরেছেন রাত প্রায় ১টা বেজে গেছে । পরদিন বেগম খালেদা জিয়া পরদিন যখন ঘুম থেকে জাগলেন, বঙ্গভবনে তখন সেনা প্রধান মইন ইউ আহমেদসহ অন্যরা। সেদিন সন্ধ্যা নাগাদ রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ  ২২ জানুয়ারীর একপক্ষীয় নির্বাচন বাতিল করে জরুরি অবস্থা জারি করেন।একই সাথে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে রাজি হন ইয়াজউদ্দিন ।গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি পদত্যাগ করার সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন।

পরবর্তীতে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। এর আগের ইতিহাস জানা সবার। নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করতে বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে দিয়েছিল খালেদা-নিজামী সরকার। সাধারণ জনগণ সেটা মেনে না নেয়াতে দেশে এক রক্তক্ষয়ী অবস্থার সৃষ্টি হয়।

অবশেষে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বেই গঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার।  অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ করতে থাকে, বিএনপিকে আবার সরকারে আনার ব্যবস্থা করছেন ইয়াজউদ্দিন। এর পর আবারও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। আন্তর্জাতিক শক্তির চাপে সেনা বাহিনী দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়, বাংলাদেশের জনগণ মুখোমুখি হয় ওয়ান ইলেভেন এর ।সেই মুহূর্তে ‘গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি এড়ানো গেছে বলে জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

মাইনাস -টু ফর্মুলা অনুযায়ী সেনা সমর্থিত  তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনীতি থেকে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াকে ‘মাইনাস’ করার চেষ্টা করে। জনচাপে সেটা সফল না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে এবং পরে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ‘আলোচিত-সমালোচিত’ নির্বাচন করে ৯ বছর ধরে ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে , ২০০৬ সালে  জামাত -বিএনপি যদি ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য লোভ না করতো অার প্রকৃতই একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতো, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস অন্যরকমও হতে পারতো।

মূলতঃ এক/এগারোর মাধ্যমে জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে নিয়ে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির সাজানো নির্বাচনে ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে ধরে রাখার লোভ বিএনপি করেছিল, পন্ড হয়ে গেল সেই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ।

Saturday, January 6, 2018

অভ্র’ যেভাবে করলেন ডাক্তার মেহদি হাসান খান



অভ্র। আভিধানিক অর্থ ‘আকাশ’। অভিধান ঘেটেঁ এই নামটি বের করেছিলো একজন ১৮ বছরের তরুণ, তার স্বপ্নের নাম দিতে। এটি হবে বিনামূল্যের সফটওয়্যার,যেখানে সবাই স্বাধীনভাবে ব্যবহার করবে, এসব চিন্তা করে এই নামটাই তার সবচাইতে মনে ধরেছিলো।

হালকা পাতলা ধরনের একটি ছেলে। চোখে চারকোনা মোটা ফ্রেমের চশমা, আর মাথা ভর্তি চুল। যা দিয়ে নিমিষেই আলদা করা যায় তাকে। কোন একটি জায়গায় চুপ করে দাঁড়াচ্ছে না, হেঁটে যাচ্ছে, হেঁটেই যাচ্ছে; কথা বললে হাত পেছনে নিয়ে শুনছে, তাকাচ্ছে এদিক ওদিক। এই তাকানোটাতে আবার কোন লুকোছাপা নেই। পূর্ণ দৃষ্টি। ক্যাম্পাসে ভয়ডরহীন আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হাসি।

সহজ ভাষায় এই হচ্ছে মেহদী। মেহদী হাসান খান। অভ্রের জনক।

অভ্র শুরুর গল্প-
অভ্রের প্রথম ভার্সনে এর কিবোর্ড লে আউটের নাম ছিলো ’ইউনিবিজয়’। এর কারন হলো, ইউনিকোড ভিত্তিক ’ইউনিবাংলা’ ফন্ট এবং বিজয় কি বোর্ডের ইউনিকোড সংস্করণ ছিলো অভ্রের প্রাথমিক ধারনাতে। যদিও ঠিক পরের সংস্করণেই মেহদী সেটার নাম বদলে রাখেন ’অভ্র’।

অভ্রের শুরু ২০০৩ সালে। মেহদী হাসান খান তখন নটরডেম কলেজের ছাত্র। ক্লাস নাইন থেকেই তার প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি নেশা। নিজে নিজেই বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রোগ্রামিংয়ের উপর বই পত্র জোগাড় করে নিজেই একাডেমিক পড়াশোনার ফাকেঁ ফাকেঁ প্রোগ্রামিং নিয়ে পড়াশোনা ও চর্চা চালিয়ে যেতেন সে সময়। ২০০৩ সালের একুশে বইমেলায় বায়োস (Bangla Innovation Through Open Source) নামের একটা বাংলাদেশী সংগঠন থেকে কিছু ছেলেমেয়ে পুরোপুরি বাংলায় লোকালাইজ করা একটা লিনাক্স ডিস্ট্রো নিয়ে এসেছিলো। নাম ‘বাংলা লিনাক্স’। মানে সেখানে শুধু বাংলাতে লেখাই যায় না, সেই সাথে সব উইন্ডোর টাইটেল, মেনু, ফাইলের নামকরণ সব ছিলো বাংলায়।

কম্পিউটারে তখন বাংলা বলতে ’বিজয়’ আর ‘প্রবর্তন’। খুব দরকার পড়লে সেগুলো দিয়ে শুধূ বাংলায় টাইপ করা যায়। কিন্তু পুরো অপারেটিং সিস্টেম বাংলায়, এর আগে এমনটা আর কখনো দেখা যায়নি। এমনকি ’বায়োস’ বইমেলা উপলক্ষ্যে নিজেদের যে সাইট বানিয়েছিলো, সেটাও বাংলায়! এইসব দেখে কিশোর মেহদী মুগ্ধতায় অভিভূত ও বিস্মিত হয়ে যায়।

বায়োস একটা নতুন ফন্টও বানিয়েছিলো সেই ডিস্ট্রোর জন্য। নাম ’ইউনিবাংলা’। সেখান থেকেই ইউনিকোড নিয়ে মেহদীর জানা শোনার সূত্রপাত। মেহেদী তখন উইন্ডোজ ব্যবহার করতো, তাই সঙ্গত কারনেই সেই বাংলা লিনাক্স তার কোন কাজে আসলো না। কিন্তু সে ঐ ফন্টটি নিয়ে পড়ে থাকলো। ফন্টটি ইন্সটল করার পর সে খেয়াল করলো, মাইক্রোসফট ওয়ার্ড এ ইনসার্ট কি ব্যবহার করে খুব সহজেই যুক্তাক্ষর বানানো যাচ্ছে। মানে, তখন যেমন বাংলা যুক্তাক্ষর বানানোর জন্য বিশেষায়িত সফটওয়্যার আর ফন্ট উভয়ই লাগতো, তেমনটা আর লাগছে না, তার বদলে শুধুমাত্র ফন্ট দিয়েই যুক্তাক্ষর বানানো যাচ্ছে।

কিন্তু ইনসার্ট ক্যারেক্টার ব্যবহার করে একটা একটা করে অক্ষর টাইপ করা অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ ও বিরক্তিকর কাজ, তাই মেহদীর মনে হলো, এখন জাষ্ট একটা কি বোর্ড ইনপুট মেথড হলে এই ফন্ট দিয়েই দিব্যি বাংলা টাইপিংয়ের কাজ চালিয়ে নেওয়া যাবে।

সে ভাবলো এটা হয়তো কেউ না কেউ ইতিমধ্যেই বানিয়ে রেখেছে। তাই সেটা খোজাঁর আশায় সে পুরো ইন্টারনেট চষে বেড়ালো। কিন্তু মেহদী অবাক হয়ে খেয়াল করলো, উইন্ডোজে কাজ করে এমন কোন ইউনিকোডভিত্তিক কিবোর্ড লে আউট কোথাও নেই। সে বুঝলো, এই জিনিসটা এখন পর্যন্ত কেউ বানায় নি। সুতরাং, তার যদি একান্তই এটার প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটা তাকে নিজের হাতে বানিয়ে প্রয়োজন মেটাতে হবে।

যেই ভাবা সেই কাজ। ততদিনে সে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। মেডিকেলের প্রচন্ড পড়াশোনার চাপ মাথায় নিয়ে সে তার হোষ্টেলের রূমে বসে দরজা বন্ধ করে ঐ ইউনিকোড ভিত্তিক কিবোর্ড বানানোর কাজে লেগে পড়লো। রাত দিন খেটে সে মুটামুটি কাজ চালানোর মতো একটা প্রোটোটাইপ দাঁড় করিয়ে ফেল্ল। এটা করতে গিয়ে তার চোখের নীচে কালি পড়ে গেলো, ক রাত ঘুমায় না কে জানে? যে ছেলে রেগুলার মেডিসিন ক্লাবে আসতো, মেডিসিন ক্লাবের প্রত্যেকটা কাজে সরব, উপস্থিতিও সেরকম প্রানোচ্ছল, হঠাৎ করে সে ছেলেটা হয়ে গেলো চুপচাপ। মাথা নিচু করে হাঁটছে, জিজ্ঞাসা করলে কথা বলছে। মেহদীর চরিত্রের সাথে যায় না।

কিছুদিনের মধ্যে ক্যাম্পাসে জানাজানি হয়ে গেলো, মেহদী কম্পিউটারে বাংলা লেখার জন্য নিজস্ব একটা সফটওয়্যার বানাচ্ছে। তো এরপর দেখা হলে মেডিক্যালের সিনিয়র ভাইরা জিগেস করতো - ’কত করে নিবি?’

মেহদী অবাক হয়ে উত্তর দিতো -’ মানে?  কিসের কত করে নিবো?’

- আরে তোর সফটওয়্যারের দাম কত করে রাখবি?

- দাম রাখবো কেন? ওটা তো ফ্রি। কোন টাকা পয়সা দিতে হবে না।

- বলিস কি!

- হ্যাঁ। ভাষার জন্য টাকা নেবো কেন?

মেহদীর কথা শুনে তাদের আক্কেলগুড়ুম হয়ে যেতো। ১৯ বছরের একটা ছেলে বলছে এই কথা!

মেহদী যেহেতু উইন্ডোজ ওএসের জন্য এ্যাপ্লিকেশন বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, সেহেতু তাকে স্বভাবতই মাইক্রোসফটের ডটনেট ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করতে হলো। পরে ভারতের একটা বাংলা ফন্ট প্রতিযোগীতায় ইমেইল করে নিজের বানানো প্রোটোটাইপটা পাঠানোর পর তারা জানালো, ’এইটা তো ঘন ঘন ক্র্যাশ করছে’। তারপর আবার রাতের পর রাত জেগে সেই প্রোটোটাইপের বাগ সারানো। তার আগে ডটনেট বাদ দিয়ে ক্লাসিক ভিজুয়াল বেসিকে সবগুলো কোড নতুন করে আবার লেখলেন মেহদী। (যদিও পরবর্তীতে আবারো একেবারে নতুন করে কোড লেখা হয় Delphi/Object Pascal এ। বর্তমানে অভ্র এই ফ্রেমওয়ার্কেই আছে।)  ক্র্যাশের ঝামেলা কমলো। তারপর সে মনোযোগ দিলো অভ্রর অফিসিয়াল সাইটটা বানানোয়। মেহদী তার সাইটে ফোরাম সেটাপ করলো, এটা অভ্রর জীবনে একটা গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ছিলো। ফোরামে অভ্র’র ইউজাররা ফিডব্যাক দিতো, বাগ রিপোর্ট করতো, প্রশ্নত্তোর চলতো।

মেহেদী ততদিনে অভ্রকে বেশ সিরিয়াসভাবে নেওয়া শুরু করেছেন। কিন্তু কলেজে পড়ুয়া একটা ছেলে শখের বশে ঘরে বসে একটা সফটওয়্যার বানিয়েছে, এই কথা জানলে স্বভাবতই কেউ অভ্রকে পাত্তা দিতে চাইবে না। তাই তিনি যথাসম্ভব চেষ্টা করলেন তার কাজে পেশাদারিত্বের ছোঁয়া রাখার। তিনি নিয়মিত রিলিজ লগ লিখতেন, নিয়মমতো ভার্সন নাম্বার বাড়াতেন, বিশাল বিশাল সব ইউজার ম্যানুয়াল লিখতেন, যাতে করে যে কেউ প্রথম দেখায় ভাবে যে এটা একটা পেশাদার সফটওয়্যার ডেভেলপার টিমের কাজ। কোন একক মানুষের শখের বশে অবসরে বানানো কোন হেলাফেলার জিনিস নয়।

মেহেদীর উদ্দেশ্য সফল হলো পুরোপুরি। তারঁ নিজের মুখ থেকেই শোনা যাক - “আমাকে যারা চিনতো না, তাদের অনেকের ধারনা ছিলো, দেশের বাইরে থেকে প্রফেশনাল সফটওয়্যার ডেভেলপারের একটা গ্রুপ এই প্রজেক্টটা চালায়। এখন ফ্রি দিচ্ছে মার্কেটিংয়ের জন্য। পরে পয়সা নিবে। দেশ নিয়ে আমাদের এই ধরনের অবজ্ঞা কেন, আমি জানি না। যেন দেশে ভালো কিছু হতে পারে না। তাছাড়া, শখের প্রজেক্টেই বা কি সমস্যা?”

মেহদী তার ব্রেইনচাইল্ড অভ্রের পেছনে রীতিমতো পাগলের মতো লেগে রইলেন আর একে আরো নিখুতঁ করার জন্য ক্রমাগত শ্রম দিতে লাগলেন। যখনি মনে হয়, কাজ প্রায় শেষ, তখনি হঠাৎ নতুন নতুন আইডিয়া আসে, আর তিনি সাথে সাথেই নাওয়া খাওয়া ভুলে সেটা নিয়ে কাজে নেমে যান।

এমনও হয়েছে, রাতে ঘুমানোর জন্য বিছানায় যাবার পর বাতি নিভিয়ে শোবার কিছুক্ষন পরেই মনে হয়েছে, কোন একটা ডায়লোগ বক্সের বাটন গুলোর ডিভাইডারের দাগগুলো পেশাদার সফটওয়্যার কোম্পানি যেভাবে দেয়, সে সেভাবে দেয়নি। তখনি বাতি জ্বালিয়ে বিছানা থেকে উঠে আবার কম্পিউটার ছেড়ে সেই ডায়লোগবক্সের বাটনের ডিভাইডার নিয়ে কাজ করেছে। সেটা করার সময় আরো অনেক বাগ ধরা পড়লো, কিংবা নতুন আইডিয়া আসলো, দেখা গেলো কাজ শেষ করে তিনি যখন আবার বিছানায় গেছেন, ততক্ষনে সকাল হয়ে গেছে।

অভ্র নিয়ে রাত দিন পড়ে থাকার কারনে মেহদীর মেডিকেলের পড়া শিকেয় উঠলো। এই দেখে সেখানকার তাবৎ বিজ্ঞ শিক্ষকেরা ঘোষণা দিয়ে জানিয়ে দিলেন, এ ছেলে মেডিকেলের অনুপযোগী। বিজ্ঞ শিক্ষকেরা বলে দিলেন, সময় থাকতে মেডিকেল ছেড়ে দিতে। মেডিকেলের অসহ্য, দমবন্ধ করা পৃথিবী মেহদীকে চেপে ধরছিলো আষ্টেপৃষ্ঠে, মরে যাওয়ার কথা ছিলো ছেলেটার। একদিকে নতুন আইডিয়া, তার স্বপ্ন, আরেকদিকে মেডিকেল। অসম্ভব অস্থিরতা। তবু শত্রুর মুখে ছাই আর সবাইকে অবাক করে দিয়ে দিন শেষে সে ঠিকঠাকভাবেই মেডিকেলের পাট চুকাতে পেরেছিলো। তিন সাফল্যের সাথেই এমবিবিএস পাশ করে বের হন।

সে সময়ের জনপ্রিয় প্রযুক্তি বিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন “কম্পিউটার টুমোরো” একদিন ফিচার প্রতিবেদন করলো মেহদীর অভ্রকে নিয়ে। শুধু তাই না, সেই ম্যাগাজিনের সাথে অভ্রের সিডির একটা করে কপি ফ্রি দেয়া হয়েছিলো। “সে মাসে নিউ মার্কেটের দোকানে দোকানে সিডিসহ ম্যাগাজিন, কি যে দারুন অনুভূতি! ইচ্ছে করছিলো রাস্তার সবাইকে ডেকে ডেকে দেখাই!” - এভাবেই সে সময়কার অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন মেহেদী।

ওমিক্রন ল্যাবের নামকরণঃ

প্রথম দিকে অভ্রর সাইটের নাম ছিলো ওমিক্রন ল্যাব। যেটা মেহদীর মাথায় এসেছিলো মূলতঃ মুহম্মদ জাফর ইকবালের বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস “ওমিক্রনিক রূপান্তর” থেকে। লেজের সঙ্গে ’ল্যাব’ শব্দটা যুক্ত হয়েছিলো একটা ভারিক্কি-সিরিয়াস ভাব আনার জন্য, এ কথা মেহদী নিজেই বলেছেন।

প্রথম ওয়েব সাইট ডোমেইনটা কেনা হয় এক প্রবাসী মামাকে অনুরোধ করে। মামা দেশে এসে বিয়ে করেছিলেন, সেই বিয়ের ছবি তুলে দেবার দায়িত্ব ছিলো মেহদীর ঘাড়ে। ওমিক্রন ল্যাব নামে যে সাইটটা বানানো হয়, সেটাতে সেই ছবিগুলোও আপলোড করে দেয়া হয় মামাকে খুশী করতে। তার একটু নীচে স্রেফ লেখা ছিলো ‘তুমি যদি এই সাইটে ইউনিবিজয়ের জন্য এসে থাকো, তবে এখানে ক্লিক করো।” ব্যস, আর কিছু লেখা ছিলো না। অবশ্য মামার বিয়ের ছবিওয়ালা ঐ সাইটটা অনলাইনে খুব বেশীদিন ছিলো না।

যেভাবে অভ্র টিম গঠিত হলোঃ

অভ্রের সাইটের সেই ফোরামটা অভ্র টিম গঠনে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছিলো। কারন সেই ফোরামের মাধ্যমেই অভ্র টিমের বাকী সবার সাথে প্রথম পরিচয় হয়েছিলো। প্রথমে ওমরের সাথে। এলিফ্যান্ট রোডে উনার একটা সফটওয়্যার বিক্রির দোকান ছিলো, নাম ‘বাঙ্গালিয়ানা’, নিভৃতচারী ও প্রচন্ডরকমের প্রচারবিমুখ মেহদী হাসান তখন সমমনা আর কাউকে চিনতেন না সে সময়, তাই ওমর ভাইর দোকানে গিয়ে প্রায়ই আড্ডা চলতো। মূলতঃ সেখান থেকেই টিমের সূত্রপাত।

বাঙ্গালিয়ানায় আড্ডা দিতে গিয়ে এরপর পরিচয় হলো রিফাতের (রিফাত-উন-নবী) সঙ্গে, যে রিফাত অভ্রের ম্যাক ভার্সন বানিয়েছে। সিয়াম (তানবিন ইসলাম সিয়াম) আর শাবাব (শাবাব মুস্তফা) এর সাথে পরিচয় অভ্রের ফোরামের মাধ্যমে। সিয়াম অভ্র টিমে ঢুকেই বানিয়ে ফেল্ল ’কাল পুরুষ’ আর ‘সিয়াম রূপালি’ নামে দুটো ফন্ট। এ দুটো ফন্ট শুধুমাত্র অভ্রের জন্যই বানানো হয়েছিলো। ভারত থেকে একটা ছেলে এসেছিলো ফোরামে, নাম নিপন। ফোরামের অন্যতম মডারেটর হয়ে যায় সে। অনেক পরে সারিম যোগ দেয় টিমে। সে অভ্রের বর্তমান ওয়েব সাইট আর অভ্রের লিনাক্স ভার্সন বানায়। এমনকি মেহদীর স্ত্রী সুমাইয়া নাজমুনও প্রায় দেড় লাখ শব্দ সম্পাদনা করেছিলেন অভ্রর ডিকশনারীর জন্য।

২০০৭ সালে 'অভ্র কীবোর্ড পোর্টেবল এডিশন' বিনামূল্যে ব্যবহারের জন্যে উন্মুক্ত করা হয়। অভ্রের সোর্স কোড উন্মুক্ত, অর্থাৎ যে কেউ চাইলেই গিটহাব রিপোজেটরি থেকে এর উন্নয়নে অংশগ্রহন করতে পারবেন। উল্লেখ্য, ভার্সন ৫ এর পর থেকে অভ্রকে ফ্রিওয়্যার থেকে ওপেনসোর্সে রূপান্তর করা হয়। এবং এটি ’মজিলা পাবলিক লাইসেন্স’এর অধীনে লাইসেন্সকৃত।

অভ্রের স্বীকৃতিঃ

১) মাইক্রসফটের অনলাইন সংগ্রহশালায় ইন্ডিক ভাষাসমূহের সমাধানের তালিকায় অভ্র কী-বোর্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা।

২) জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির কাজে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন অভ্র ব্যবহার করে।

৩) অভ্রকে বাংলা কীবোর্ড রিসোর্স হিসেবে ইউনিকোড সংস্থার ওয়েব সাইটে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

৪) বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস বা বেসিস বাংলা তথ্য প্রযুক্তিতে বিশেষ অবদানের জন্য অভ্রটিমকে-কে ২০১১ 'বিশেষ অবদান পুরষ্কার' (Special Contribution Award) প্রদান করে

এছাড়াও, মেহদী ব্যাক্তিগতভাবে ২০১৬ সালের সেপ্টেস্বরে Top Ten Outstanding Young Persons পুরস্কার লাভ করেন।

পরিবার ও ব্যাক্তিগত জীবনঃ

মেহদী হাসান খান একজন দায়িত্ববান স্বামী এবং একজন স্নেহপরায়ন পিতা। তার ছেলের নাম ’অর্ক হাসান খান’। ব্যক্তিগতভাবে মেহদী অতি নিভৃতচারী, বিনয়ী, অত্যন্ত স্বল্পভাষী ও প্রচারবিমুখ একজন মানুষ। অনেকেই হয়তো জানেন না, মেহদী একজন অসাধারন চিত্রগ্রাহক। তার ফটোগ্রাফির হাত দুর্দান্ত রকমের ভালো। ফ্লিকরে তার একটি একাউন্ট রয়েছে, যদিও সম্প্রতী তিনি তার সকল ছবি ব্যক্তিগত এক কারণে লোকচক্ষুর আড়াল করে রেখেছেন।

মেডিক্যাল কলেজ থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে পাশ করে বের হলেও তিনি নামের আগে কখনো ডাঃ বসাননি। কারন তিনি পেশায় একজন প্রোগ্রামার, বর্তমানে আছেন ’ব্যাকপ্যাকে।’ প্রোগ্রামিং তার নেশা, অবসেশন। তিনি জাভাস্ক্রিপ্ট কোড লেখায় বিশেষভাবে দক্ষ। শেষ করছি, প্রোগ্রামিং আর মানব কল্যান নিয়ে তারঁ নিজের চমৎকার কিছু কথা দিয়ে।

”ক্লাস নাইনে ওঠার পর বইপত্র যোগাড় করে প্রোগ্রামিংটা শেখার পর আর অন্যদিকে তাকানো হয়নি, এখনো লেগে আছি। কম্পিউটার আর ইন্টারনেট থাকলে আমার আর কিছুর দরকার হয় না। দিনশেষে মনে হয়, প্রোগ্রামিংটা বেশ ইন্টারেস্টিং, অনেকটা সুপার পাওয়ারের মতো। তবে তার চাইতেও অনেক বেশী ইন্টারেস্টিং হলো, সেই সুপার পাওয়ার দিয়ে মানুষের কাজে লাগে এমন কিছু বানাতে পারা। যারা সেই মজা পেয়েছেন ও ভবিৎষতে পাবেন, তাদের জন্য আমার ভালোবাসা রইলো।”
একুশে পদকের দাবী-
অভ্রের জন্য একুশে পদকের দাবী জানানো হচ্ছে বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই। এই দাবীর শুরুটা হয়েছিলো বাংলা ব্লগে। এমনকি প্রতি বছরই ফেসবুক ও কমিউনিটি ব্লগগুলোতে অসংখ্য পোষ্ট আসে অভ্রকে একুশে পদক দেবার দাবী জানিয়ে। এবং এই দাবীটা অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত।

কারণ, বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা বাংলা লেখার জন্য যতগুলো কি বোর্ড লে আউট ব্যবহার করে, তার ভেতর সবচাইতে জনপ্রিয় এবং সবচাইতে বহুল ব্যবহৃত কি বোর্ড হচ্ছে অভ্রের ফনেটিক কি বোর্ড। এর জনপ্রিয়তার মূল কারন হলো, অন্যান্য প্রচলিত বাংলা লে আউটের মতো এটার লে আউট মুখস্ত করতে হয় না। ইংরেজী অক্ষর চেপেই বাংলা অক্ষর টাইপ করা যায়। যেমনঃ Ami bhat khai টাইপ করলে লেখা হবে 'আমি ভাত খাই।’ সুতরাং, অভ্রের মাধ্যমে যে কেউ যে কোন সময়েই দুয়েক মিনিটের চর্চাতেই বাংলা টাইপিংয়ে দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন। অভ্র ছাড়া এত সহজে আর এত অল্প সময়ে এত নিখুঁতভাবে বাংলা লেখা হয়তো কোনভাবেই সম্ভবপর হয়ে উঠতো না। অভ্র দিয়ে অনলাইন কিংবা অফলাইন, উভয় জাগাতেই সমান দক্ষতায় বাংলা টাইপিং সম্ভব। আরেকটি বড় দিক হচ্ছে, এটা একেবারেই বিনামূল্যে পাওয়া যায়। কোন টাকা পয়সা খরচ করতে হয় না।

মেহদী ক্রমাগত বছরের পর বছর ধরে শ্রম আর অধ্যবসায় দিয়ে অভ্রকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। সে এই পৃথিবীকে যেটা দিয়েছে, তা হচ্ছে মুক্তি, স্বাধীনতা। বাংলা লেখার স্বাধীনতা।

তাই মেহদীর অভ্র -এর স্লোগান,"ভাষা হোক উন্মুক্ত"।

উন্মুক্ত এই সফটওয়্যার বাঁচিয়েছে সরকারের কোটি কোটি টাকা। সরকারী দপ্তরগুলোতে অভ্র ব্যবহার হয়। নির্বাচন কমিশন ব্যবহার করে আমার আপনার পরিচয়পত্র বানাচ্ছে,পাসপোর্ট বানাচ্ছে,সরকারী ফাইলে হচ্ছে লেখা। সবকিছুর মূলে ছিলো মেহদীর সেই এক রুমের পৃথিবী, একটা ছোট্ট কম্পিউটার আর পর্বতসম স্বপ্ন। এবং তার স্বপ্নকে সে বিনামূল্যে ছড়িয়ে দিয়েছে পৃথিবীময় সমস্ত বাংলাদেশীর কাছে।

অভ্র আমাকে বাংলায় লেখার স্বাধীনতা দিয়েছে। খুব সম্ভবত আপনাকেও। এই স্বাধীনতা দেয়ার জন্য মেহদী কিংবা অভ্রের কিছু প্রাপ্য। প্রাপ্য সরকারের কাছেও। তীব্র প্রচারবিমুখ আর বিনয়ী ছেলেটার স্বপ্নটাকে একটা রাষ্ট্রীয় পুরস্কার কি দেয়া যায়না? একুশে পুরস্কার অভ্র’র করুণা নয়, পাওনা। এবং এই পাওনার দায় আমাদের মাথার উপর ঝুলে আছে গত প্রায় এক দশক ধরে। এখন সময় এসেছে এই পাওনা শোধ করে দায়মুক্ত হবার।

(তথ্যের জন্য কৃতজ্ঞতাঃ নন্দিত.কম,উইকিপিডিয়া, বাংলাদেশ ওয়েব পোর্টাল, মাসিক বিজ্ঞানচিন্তা, বিভিন্ন সময় প্রকাশিত ব্লগ ও সংবাদ কলাম, এবং মেহদীর মেডিক্যাল কলেজের সিনিয়র ভাই ’মানিক চন্দ্র দাস’)

Sunday, December 3, 2017

রোহিঙ্গাদের বুক পেতে গ্রহণ করেছি অথচ হিন্দুদের বুক আগলে রক্ষা করব না?-মুহম্মদ জাফর ইকবাল

১.১২.২০১৭
খবরের কাগজে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ছবি দেখে দেখে এতদিনে আমাদের অভ্যস্ত হয়ে যাবার কথা ছিল। কিন্তু আমার মনে হয় আমরা এখনো অভ্যস্ত হতে পারিনি। সম্ভবত তার প্রধান কারণ হচ্ছে রোহিঙ্গা শিশু।


একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ তার জীবনের সবকিছু পিছনে ফেলে হেঁটে হেঁটে অনিশ্চিত একটা জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেই দৃশ্যটি যথেষ্ট হৃদয় বিদারক। তার চাইতে শতগুণ বেশি হৃদয় বিদারক দৃশ্য একটি অবোধ শিশু যখন তার চারপাশে কী ঘটছে তার কিছুই বুঝতে না পেরে, তার বাবা বা মায়ের পাশে পাশে হেঁটে হেঁটে যায়।


তাদের চোখে এক ধরনের বিস্ময়, এক ধরনের অবিশ্বাস এবং আতঙ্ক। সেই চোখের দৃষ্টি দেখে বিচলিত না হয়ে নিরাসক্ত দৃষ্টিতে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। শিশুগুলো যখন খুব ছোট তখন তারা থাকে তাদের মায়ের কোলে, একটুখানি বড় হয়ে গেলে বাবার কোলে বা কাঁধে। তারা যদি হাঁটতে শিখে তাহলে নিজেরাই বাবা কিংবা মায়ের পাশে পাশে হেঁটে হেঁটে আসে। আরেকটু বড় হয়ে গেলে অবধারিত ভাবে তাদের মাথায় একটা বোঝা থাকে।

এই কিশোর কিংবা কিশোরীর চোখের দৃষ্টি দেখে কেন জানি নিজের ভেতরে এক ধরনের তীব্র অপরাধবোধের জন্ম হয়। এই পৃথিবীতে কত সম্পদ, কত ঐশ্বর্য অথচ এই রোহিঙ্গা শিশুদের জন্যে কিছু নেই। শুধুমাত্র প্রাণটুকু বাঁচিয়ে রাখতেই তাদের পুরো জীবনীশক্তি ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে।

রোহিঙ্গা শিশুদের দেখে প্রথমেই আমার মনে হয় এখন তাদের স্কুলে যাবার কথা কিন্তু সেই কথাটি উচ্চারণ করাই মনে হয় একটা উৎকট রসিকতার মতো মনে হবে। আমাদের ছেলে মেয়েরা এখন পরীক্ষা দিচ্ছে, পরীক্ষা শেষে অনেকেই বাবা মায়ের সঙ্গে বেড়াতে যাবে, আগ্রহ নিয়ে পরীক্ষার ফলাফলের জন্যে অপেক্ষা করবে।

নতুন বছর শুরু হলে তাদের সবার হাতে নতুন বই উঠবে। সেই বই হাতে নিয়ে তাদের মুখে হাসি ফুটে উঠবে। অথচ এই রোহিঙ্গা শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার কিছু নেই। শুধুমাত্র শরণার্থী শিবিরে একটি দিনের পর আরেকটি দিন বেঁচে থাকা।

শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম মহিলা যখন তার মিলিটারী জেনারেলদের নিয়ে রোহিঙ্গাদের হত্যা ধর্ষণ করে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে দেশ ছাড়া করেছিল তখন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষদের নিয়ে তাদের আশ্রয় দিয়েছেন। সারা পৃথিবীর মানুষের সামনে ঘোষণা করেছেন আমরা ষোল কোটি মানুষ যদি খেতে পারি, তাহলে এই দশ লক্ষ লোকও খেতে পারবে। নতুন এবং পুরাতন মিলে প্রায় দশ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী এখন এই দেশের মাটিতে স্থান পেয়েছে, মাথার ওপর একটুখানি আচ্ছাদন পেয়েছে, দুই বেলা খেতে পারছে, অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাচ্ছে, সবচেয়ে বড় কথা প্রাণের ভয়ে তাদের বনের পশুর মত বনে জঙ্গলে ছুটে বেড়াতে হচ্ছে না।

এই মুহূর্তে পৃথিবীর কত জায়গায় কত রকম যুদ্ধ বিগ্রহ কত রকম নিষ্ঠুরতা তার ভেতরে হত দরিদ্র দুঃখী রোহিঙ্গাদের কথা পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারতো। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্যি পৃথিবীর সব মানুষ এই রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচারের কথা মানে। (শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া পৃথিবীর একজন নিষ্ঠুরতম মহিলার সম্মাননা একটি একটি করে প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে, এর চাইতে বড় লজ্জা আর অপমান কি হতে পারে?

খবরের কাগজে দেখতে পাচ্ছি আলোচনা চলছে, চুক্তি হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা হচ্ছে। দিনে তিনশত করে শরণার্থী প্রক্রিয়া করা সম্ভব হবে বলে দেখেছি। সেটি যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে দশ লক্ষ রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে দশ বছর সময় লাগবে। সোজা বাংলায় যার অর্থ এই রোহিঙ্গা মানুষগুলোকে আমাদের বছরের পর বছর আশ্রয় দিতে হবে।

যদি তাই সত্যি হয় তাহলে এই রোহিঙ্গা শিশুদের ভবিষ্যৎ কী আমাদের একটু আলাদা ভাবে দেখার প্রয়োজন নেই? আমরা আমাদের শিশুদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে দেব কিন্তু একই ভূখণ্ডে আশ্রয় নেওয়া অন্য শিশুদের লেখা পড়ার ব্যবস্থা করব না? তাদের ভবিষ্যতের কোনো স্বপ্ন থাকবে না?

আমরা যখন স্কুল কলেজে লেখাপড়া করেছি তখন চীন দেশের কমিউনিস্ট নেতা মাও সে তুংয়ের কথা খুব শুনতে পাওয়া যেতো। তার একটা বিখ্যাত উক্তি ছিল এরকম- ‘একজন মানুষ খাওয়ার জন্যে একটি মুখ কিন্তু কাজ করার জন্য দুটি হাত নিয়ে জন্মায়।’ আমরা কী এখন রোহিঙ্গা শিশুদের জন্যে সেই কথাটিই ব্যবহার করতে পারি না? তাদের মুখ একটি, হাত দুটি এবং মস্তিষ্কে নিউরন একশ বিলিওন?
২.
একজন মানুষকে ঘর ছাড়া কিংবা দেশ ছাড়া করার সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর পদ্ধতি হচ্ছে তার বাড়িতে আগুন দিয়ে দেওয়া। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম মহিলা এবং তার জেনারেলরা সেই তথ্যটি খুব ভালো করে জানে তাই তারা একটি একটি করে রোহিঙ্গা গ্রামের প্রতিটি বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে তাদের ঘর ছাড়া করেছে, দেশ ছাড়া করেছে।

কেউ কী লক্ষ্য করেছে আমার নিজের দেশের রংপুরে হিন্দুদের বেলায় হুবহু একই ব্যাপার ঘটেছে। অনেক মানুষ মিলে পুলিশের সামনে হিন্দুদের বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়াতেও একই প্রক্রিয়ায় একই ব্যাপার ঘটেছিল।

তখন রসরাজ নামে একজন অসহায় নিরীহ মানুষকে ব্যবহার করে কাজটি করা হয়েছিল এবারে টিটু রায় নামে অন্য একজনকে বেছে নেওয়া হয়েছে। পুরো ব্যাপারটির মাঝে এক ধরনের অচিন্ত্যনীয় নিষ্ঠুরতা রয়েছে অথচ অবিশ্বাসের কথা হচ্ছে এইটিটু রায়কে দিনের পর দিন রিমান্ডের অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে।

আমরা রোহিঙ্গাদের বুক পেতে গ্রহণ করেছি অথচ হিন্দুদের বুক আগলে রক্ষা করব না? এ কেমন কথা?

৩.
সবে মাত্র জেএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে, খবরের কাগজ থেকে জানতে পেরেছি সবগুলো পরীক্ষার সবগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। সারা দেশে যেরকম তুলকালাম কান্ড হওয়ার কথা ছিল তার কিছুই হয়নি। প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে সাথে সাথে পরীক্ষাটি বাতিল হয়ে যাবার কথা- একটি পরীক্ষাও বাতিল হয়নি কাজেই ধরে নিচ্ছি শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি মেনে নিয়েছে।

যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়াটি মেনে নেয় তাহলে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবকেরা সেটি কেন মেনে নেবে না? সবাই মেনে নিয়েছে এবং বিষয়টা একটা উৎসবে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে এর চাইতে কালো কোনো অধ্যায় কী হওয়া সম্ভব?

জেএসসি পরীক্ষা শেষে পিএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। জেএসসি পরীক্ষার ‘ঐতিহ্য’ ধরে রেখে এর প্রশ্নও ফাঁস হতে শুরু হয়েছে। প্রাইমারীর ছেলে মেয়েরা একেবারেই শিশু তাদের প্রশ্ন ফাঁসে অভ্যস্ত করে দেওয়ার মতো নিষ্ঠুরতা আর কী হতেপারে? জেএসসি , এসএসসি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে যে লাগাম ছাড়া সমস্যার জন্ম হয়েছে প্রাইমারী পরীক্ষার বেলায় সেটি একেবারেই হওয়ার কথা ছিল না, কারণ এই পরীক্ষাটিই হওয়ার কথা ছিল না।

এই দেশের লেখাপড়া নিয়ে কথা বলা হলে যে শিক্ষানীতির কথা বলা হয় সেই শিক্ষানীতিতে প্রাইমারী পরীক্ষাটির কথা বলা নেই। শিক্ষানীতিকে সম্মান দেখিয়ে যদি এই পরীক্ষাটিকে পাবলিক পরীক্ষার মত একটি বিশাল যজ্ঞ দজ্ঞতে রূপান্তর করে ফেলা না হতো তাহলেই এর প্রশ্নফাঁসের ব্যাপারটাই থাকতো না। যদি পরীক্ষাই না থাকে তাহলে কোন পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হবে?

এবারের পিএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সাথে সাথে আমরা নতুন আরো একটা বিষয় দেখতে পেয়েছি, সেটি হচ্ছে প্রশ্নপত্রের ভুল। যারা পত্রপত্রিকা পড়েন তাদের একজনও নাই যারা প্রশ্নের ইংরেজিটি দেখে আতঙ্কে শিউরে ওঠেনি। প্রশ্নপত্রের এই ভুলটি যেরকম অবিশ্বাস্য এর প্রতিকার হিসেবে যে কাজটি করা হয়েছে সেটি আরও অবিশ্বাস্য। খুঁজে খুঁজে সেই মানুষটিকে বের করা হয়েছে যে প্রশ্নপত্রটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে তারপর তাঁকে বরখাস্ত করে দেওয়া হয়েছে।

যে ইংরেজীতে অনুবাদ করেছে তার ইংরেজির জ্ঞান খুব কম, তার পক্ষে এর চাইতে ভালো ইংরেজি লেখা সম্ভব নয়, তাই সে এরকম একটি অনুবাদ করেছে। এটি অন্যায় হতে পারে না, এটি হচ্ছে ব্যর্থতা। ব্যর্থতার জন্য কাউকে শাস্তি দেওয়া যায় না। যদি শাস্তি দিতেই হয় তাহলে শাস্তি দিতে হবে এই প্রশ্ন প্রণয়ন করার দায়িত্বে থাকা কমিটিকে, তার সভাপতিকে, তার সদস্যদের।

তারা অনেক বড় অন্যায় করেছেন, তারা এমন একজন মানুষকে প্রশ্ন অনুবাদ করার দায়িত্ব দিয়েছেন যিনি ইংরেজি জানেন না। শুধু তাই না, ইংরেজিতে অনুবাদ করার পর সেই কমিটি প্রশ্ন পত্রটিতে চোখ বুলানো প্রয়োজন মনে করেননি কিংবা চোখ বুলিয়ে ভুল ইংরেজি দেখার পরও সেটি সংশোধন করা দরকার মনে করেননি।

একটি বিশাল বিপর্যয় ঘটবে, যারা সেই বিপর্যয়টি ঘটাবে তারা ধরা ছোওয়ার বাইরে থাকবে, খুঁজে পেতে সবচেয়ে নিরীহ এবং ক্ষুদ্র মানুষটিকে বের করে তাকে শাস্তি দিয়ে সবাই আনন্দে বগল বাজাতে থাকবে এটি কেমন কথা? একজন মানুষ ইংরেজি না জানলে তাকে শাস্তি দেওয়া যায় না, যে তাকে দিয়ে ইংরেজি অনুবাদ করেছে তাঁকে খুঁজে বের করে প্রয়োজন হলে তাঁকে শাস্তি দিতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, একটা বিপর্যয় ঘটে যাবার পর কাউকে খুঁজে বের করে তাকে শাস্তি দিয়ে কোনো লাভ নেই, বিপর্যয় না ঘটলে অনেক বড় লাভ হয় এই সহজ কথাটি কেউ কেন বুঝতে পারছে না?
৪.
সাম্প্রতিক ঘটনার মাঝে আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে যে ঘটনাটি সেটি হচ্ছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের একটি ঘোষণা, সেটি হচ্ছে তারা এখন স্কুলে স্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করবে। নিজের কানে শুনেও আমি কথাটি বিশ্বাস করতে পারছি না।

বর্তমান ছাত্রলীগ কী আমাকে সারা দেশে একটি ঘটনার কথা বলতে পারবে যেটি দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নেব যে আমার স্কুলে পড়ুয়া সন্তানকে ছাত্রলীগের সদস্য করে দিতে হবে? যদি না পারে তাহলে তাদের এই সর্বনাশা প্রজেক্টে হাত দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

Sunday, October 22, 2017

আদমজীর পাগলা আবদুল হক - তুষার কান্তি বসাক

১৯৬৮ সাল। ৬দফা সমর্থনে দেশব্যাপী চলছে প্রচার অভিযান।


 আদমজী জুট মিলস ছিল তখন ৬ দফার শক্ত ঘাটি। কুটির হাট অঞ্চলের অনেকে তখন আদমজী জুট মিলে চাকুরি করতেন তাদের মধ্যে গোপাল গাঁও গ্রামের আবদুল হক (পাগলা আবদুল হক) ও আমীন উল্ল্যাহ অন্যতম। একদিন ছুটিতে এরা দু'বন্ধু দেশে আসেন। কুটির হাট বাজারের ঈদগাওয়ের এককোনে বসে গল্প করছেন। সেই সময় ঈদগাওতে ভাসানি ন্যাপের সভা চলছে নেতৃত্ব রফিকুল ইসলাম ভূঞা ইন্তু মিয়া। সেই সভাতে হামলা করে তখনকার সরকার সমর্থক গোষ্ঠী। আবদুল হক ও আমান উল্ল্যা দেখলেন আদমজীতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে শক্ত অবস্থান আছে কিন্তু নিজ এলাকায় সমর্থক থাকলেও কোন সাংগঠনিক কাটামো নেই। তাই তারা দু'জন নিজ এলাকায় সাংগঠনিক কাটামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে একদিন শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেন এবং নিজ এলাকায় একজন নেতাকে আমন্ত্রন জানান। বঙ্গবন্ধু তখন বলেন থানা কমিটি ও জেলা কমিটির অনুমোদন নিয়ে আসতে। তখন থানা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন ইছহাক মিয়া ও জেলা কমিটির সভাপতি ছিলেন আবদুল মালেক উকিল। তাঁরা থানা কমিটির এছহাক মিয়া অনুমতি নিয়ে জেলা কমিটির অনুমতি আনতে গেলে আব্দুল মালেক উকিল নিজে উনাদেরকে শেখ মুজিবের কাছে নিয়ে যান। পরে সিদ্ধান্ত হয় তখনকার আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক তাজ উদ্দীন আহম্মদ আসবেন বিষ্ণুপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ দফার পক্ষে জনসভা করতে। কিন্তু ইস্কুলের তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন এবিএম তালেব আলী তিনি ইস্কুল মাঠে অনুমতি দিতে নারাজ। এর পর মাস্টার নূর আহম্মদকে সভাপতি কাজী আব্দুল কাদেরকে সাধারন সম্পাদক ও মাস্টার মাহবুবল হক, মুলকতের রহমান, জহির উদ্দীন ভূঞা, হাফেজ আহম্মদ ভূঞা সহ অনেককে সদস্য করে ১ নং চরমজলিশপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের কমিটি গঠন করা হয়। এবিএম তালেব আলীর অনুমতি না পেয়ে  সভাপতির দায়িত্বে থাকা নুর আহম্মদ মাস্টার নোয়াখালী গিয়ে জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিয়ে বিষ্ণুপুর উচ্চবিদ্যালয়ে ৬দফার সমর্থনে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক তাজ উদ্দীন আহম্মদের উপস্থিতিতে সভা করতে সমর্থ হয় এভাবে ইউনিয়ন আওয়ামী কমিটি গঠিত হয়। ঠিক ঐ সময়ে বড়হালিয়া গ্রামের সোলতান আহম্মদকে সভাপতি ও আবদুছ সালাম বিএসসিকে সাধারন সম্পাদক করে ২নং বগাদানা ইউনিয়ন কমিটিও গঠিত হয়।

পরবর্তীতে ৭০ এর নির্বাচনে আবদুল হক ও আমান উল্ল্যার নেতৃত্বে একদল আদমজীর শ্রমিক বঙ্গবন্ধুর কাছে দাবী জানান এবিএম তালেব আলীকে নোমিনেশন দিতে। সেই নির্বাচনে এছহাক মিয়া ও বালিগাঁও ইস্কুলের প্রধান শিক্ষক শাহনেওয়াজও প্রার্থীর জন্য নোমিনেশন চেয়েছিল। কিন্তু এবিএম তালেব আলী ভাসানী ন্যাপ থেকে আওয়ামীলীগে যোগদান করে বিপুল ভোটে জয় লাভ করেন। এবং ফেনী ৩ নং আসনটি ৮৬ সাল পর্যন্ত  আওয়ামী লীগের দখলে ছিলেন।

ছবিতে: আবদুল হক, মুক্তিযোদ্ধা (প্রয়াত), আমান উল্ল্যা ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার, বর্তমানে কুটির হাট বাজারে ফুটপাতে ব্যাবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

কচ ও দেবযানী - জয়তি রায়

পৌরাণিক নারী( ধারাবাহিক)
 অহল্যা, তুলসী, কুন্তীর পরে দেবযানী)
Add caption

   
    কচ ও দেবযানী
        পর্ব ১
----------------------------
   দেবগুরু বৃহস্পতির কপালে ভাঁজ। স্বভাবতঃ শান্ত মানুষ, দেবগুরুজনচিৎ কোনো হাঁক ডাক করেন না। শান্ত মনে দেবতাদের কল্যানে পূজো আর, তিন স্ত্রী আর সন্তানাদি নিয়ে নিজের মতো থাকতে চাইলে কি হবে? ওই যে অর্বাচীন দেবরাজ ইন্দ্র, তাঁর যন্ত্রনায় দেবলোকে কেউ সুস্থির হয়ে বসতে পারবে ? কস্মিন কালেও নয়। মনে মনে মহা বিরক্ত হয়ে দেবগুরু ভাবেন--’ ইন্দ্র থাকে তো অপ্সরা বেষ্টিত হয়ে, নাহলে মুনি পত্নীদের পিছনে পিছনে ঘুরে বেড়ান মর্ত্য লোকে গিয়ে! তাই করো না বাপু। এখন তোমার সঞ্জীবনী মন্ত্রের কি দরকার হলো? যুদ্ধ তো করেন বিষ্ণু মহেশ্বর। তোমার গায়ে তো  আঁচ টুকু লাগে না। তবে? ‘  ক্ষুদ্ধ স্বরে তিনি প্রিয় পুত্রের উদ্দেশ্যে ডাক পাড়লেন---
    ‘ও কচ। কচ। এদিকে একটু এসো বৎস।’
*
সময় টি ভারি মনোরম। অবশ্য স্বর্গে কোন সময়ই বা খারাপ? তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের যে উপায় মহাপ্রযুক্তি বিশারদ বিশ্বকর্মা আবিষ্কার করেছেন, তাতে স্বর্গে সবসময় এক মধুর আবহাওয়া , সুগন্ধী পরিজাতের সুগন্ধ , মন্দাকিনীর জলের নীচে এমন ভেষজ ঔষধি লতা গুল্ম রয়েছে, যে প্রবাহমান ওই স্রোতে যে স্নান করে , গায়ের বর্ণ উজ্জ্বল , চুল ত্বক সব সুন্দর হতে বাধ্য। স্থানে স্থানে কৃত্রিম কুঞ্জ তৈরি করা আছে। যার যখন ইচ্ছে, যে কোনো কুঞ্জে ঢুকে বসলেই, উৎকৃষ্ট মদিরা পাবে, অন্তরালে ব্যক্তির রুচি অনুযায়ী সুমধুর যন্ত্র বেজে উঠবে।
         এমন একটি কুঞ্জে বসে বৃহস্পতি পুত্র কচ, গভীর ভাবে মগ্ন ছিল অধ্যয়নে। বৃহস্পতির পনেরটি পুত্র কন্যার মধ্যে একমাত্র কচ, চিকিৎসা বিদ্যা আর দর্শন শাস্ত্র দুটোতেই সমান পারদর্শী। মাত্র কুড়ি বছর বয়স তাঁর, অপূর্ব সুন্দর চেহারার সঙ্গে মিশেছে বুদ্ধির দিব্য আভা। কচের পরিণত বুদ্ধির উপরে দেবতাদের খুব ভরসা। পাঠে মগ্ন হলেও কচের কানে পৌঁছলো পিতার ব্যাকুল ডাক। ব্যস্ত হয়ে পুঁথি ফেলে পিতার কাছে এসে সে প্রশ্ন আকুল চোখ দুটি তুলে তাকালো। কোনো সমস্যা আছে। নাহলে পিতা কখনো এভাবে ডাকেন না।
     ঝকঝকে সুঠাম শরীর, অতন্ত্য ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুত্রকে দেখে অন্যদিন বুকে জড়িয়ে নেন দেবগুরু। আজ কেমন বিষণ্ন স্বরে বললেন --
‘ বসো পুত্র।’
---’ কি হয়েছে?’ অভিবাদন করে,  না বসেই জিজ্ঞেস করলো কচ। সময় নষ্ট করতে সে ভালো বাসেনা।
  বৃহস্পতি বললেন--
   ‘ বসো। সময় লাগবে। দেখো বৎস, তুমি তো জানো ,দেবতা আর অসুরদের মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহ লেগেই আছে। শক্তিতে কেউ কারো চেয়ে কম যায় না, কিন্তু বুদ্ধিতে দেবতারা শ্রেষ্ঠ। দেখো বাবা, এদের এই লড়াইয়ে না চাইতেও আমার সঙ্গে থাকতে হয়। তুমি তো জানো , ছলনা করে অমৃত দেবতারা চুরি করে খেয়ে নিয়ে অমরত্ব লাভ করে  ভেবেছিলো এবার অসুরদের জব্দ করবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি ঢেলে দিয়েছেন, অসুরগুরু শুক্রাচার্য। ‘
  দম নেবার জন্য থামতেই কচ বলল--
  ‘ পিতা, ক্ষমা করবেন। আমি এসব শুনে কি করবো? মাথায় কিছু ঢুকছে না। একটা নতুন বিষয় এমন ভাবে আমার চিন্তাকে অধিকার করে আছে, যে কোনো অন্য কথা ভালো লাগছে না।’
   এমন সময় আচমকা সেখানে নারদ ঋষির প্রবেশ। যে কোনো জায়গায়, আলোচনায় নারদ একমাত্র ব্যক্তি ,যিনি বিনা অনুমতিতে ঢুকে তাঁর মতামত জানাতে পারেন। এখানেও তিনি হাসতে হাসতে ঢুকে বললেন--
  ‘ বৎস কচ, দেবকুলে তুমি হলে সবচেয়ে মেধাবী, তার উপরে সুদর্শনও বটে। তোমাকেই দেবগুরু শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানীর সঙ্গে ভালবাসার ছলনা করে, সঞ্জীবনী মন্ত্রটি শিখে আসতে হবে। ‘
     কচ একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন। সে শান্ত স্বভাবের একলা থাকা ছেলে। নতুন এক গবেষণায় ইদানিং খুব ব্যস্ত। আশেপাশে, স্বর্গ, দেবতা, অপ্সরা কিছুই খবর রাখার ইচ্ছে তার নেই, হঠাৎ এমন রাজনৈতিক ডামাডোলে একেবারে নায়ক হয়ে যাবার ধাক্কায় সে একেবারে অবাক হয়ে গেল।
    খুব রুষ্ট এবং গম্ভীর গলায় সে প্রশ্ন করলো ---
   ‘ ব্যাপারটা খুলে বলবেন মহর্ষি? গোলমেলে সে তো বুঝতেই পারছি। অমর দেবতাদের সঞ্জীবনী মন্ত্র জানার কি দরকার পড়লো? আর পড়লেও অসুররাজ বৃষপর্বা তার রাজ্যে আমাকে ঢুকতে দেবেন এবং শুক্রাচার্য শত্রুর ছেলেকে আদর করে সঞ্জীবনী মন্ত্রটি শিখিয়ে দেবেন! কি অদ্ভুত!’
    নারদ হাসতে হাসতে বললেন --
      ‘ আর একটু পরেই দেবরাজ ইন্দ্রের সভায় তোমার ডাক পড়বে কচ। বিষ্ণু আর ইন্দ্র পুরো ঘটনা বুঝিয়ে দেবেন। তৈরী হয়ে নাও।’
   --’ আবার চক্রান্ত? ,
দেবতারা চক্রান্ত ছাড়া কিছু বোঝেনা?’
---’ তুমি এখনো তরুণ কচ। নির্মল তোমার দৃষ্টি। পরিপক্ক হলে বুঝতে, সমাজ, দেশ বাঁচানোর জন্য কোনো কিছুই পাপ বা চক্রান্ত নয়। অসুরকুল সঞ্জীবনী মন্ত্রের জোরে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তাদের শক্তি খর্ব করতে হবে। দেবতাদের উপরে কেউ যেতে পারবে না। যাও, দেরি করোনা। কাজের কৌশল তোমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
*
   আকাশ যানে করে মর্ত্যের দিকে উড়ে যাচ্ছিলেন কচ। মন খুব ভার। গতকাল ইন্দ্র আর বিষ্ণুর সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছেন একজন বিদ্বান ধার্মিক বৃদ্ধ আর তাঁর কন্যা দেবযানী সঙ্গে অভিনয় করতে হবে তাঁকে। সে প্রশ্ন করেছিল,
   --’ বিদ্যা শিখতে গিয়ে গুরু কন্যার সঙ্গে প্রেমের অভিনয় কেন?’
   তাতে অট্টহাস্য হেসে ইন্দ্র বললেন--’ তুমি নিজের সত্য পরিচয়ই দেবে। কোনো সমস্যা নেই তাতে।দেবগুরু বৃহস্পতির পুত্র বিদ্যা শিখতে আসতেই পারে।  বিদ্যা শেখাতে ,শত্রু মিত্র ভেদ কেউ করেনা। কিন্তু, বাছা কচ, তিনি তোমাকে ওই বিশেষ বিদ্যাটি কখনোই শেখাবেন না। সেখানে প্রেমিকা দেবযানী বাধ্য করবে পিতাকে। শুনেছি, মাতৃহীন কন্যাটির কোনো কথাই দৈত্যগুরু উপেক্ষা করেন না।’
    মাথা নিচু করে বসে থাকা কচের কাঁধে হাত রেখে বিষ্ণু বললেন---
‘ মারি অরি পারি যে কৌশলে’ এতে কোনো দোষ নেই । তুমি যাও। কাজ শেষ করে এসো।’
      মিথ্যে ছলনা করে চুরি করতে হবে সঞ্জীবনী বিদ্যা! মানা করলে স্বর্গ থেকে নির্বাসন ।  না শব্দটি শোনা দেবতাদের ধাতে নেই। বিষ্ণুর গম্ভীর গলায় বলা শব্দকটি--কাজ শেষ করে এস--এক ধরণের আদেশ বই কি!
     কচ বাস্তববাদী ছেলে। মর্ত্যের দিকে যেতে যেতে পরিকল্পনা ছকে নিচ্ছিল মনে মনে। ভোর আকাশের মিষ্টি  আলোতে সবুজ গ্রহ পৃথিবী ভারি সুন্দর আর স্নিগ্ধ। কচ ভাবলেন--
   ‘ কারো পরিণতির জন্য কেউ দায়ী হয়না ।  যা হবার , তা আগে থেকে ঘটেই থাকে। কেউ একজন নিমিত্ত মাত্র হয়। তাই, আগামীদিনে যাই ঘটুক না কেন , কচ তার জন্য দায়ী নয় কোনোমতেই। ‘ মনকে প্রস্তুত করে, শুক্রাচার্যের আশ্রমের সামনে আকাশ যান থেকে নেমে পড়ল কচ।
*
শুক্রাচার্য কে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল কচ। শুনছিলো, ইনি ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ এবং মহাজ্ঞানী। মহা উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী এই ব্রাহ্মণের রাজনীতির মতো কঠিন শাস্ত্র দর্শনে যেমন প্রজ্ঞা , তেমনি চিকিৎসা শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি  অসাধারণ। সমস্ত অবয়বে জ্ঞান মাধুরী যেন ঝরে পড়ছে। স্নেহ মিশ্রিত চোখ দুটি তুলে কচের দিকে তাকালো শুক্রাচার্য।
 ‘এনাকে ঠকাতে হবে? এনার প্রাণ পুতুলি কন্যা দেবযানীর সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করতে হবে? ‘ তীব্র যন্ত্রনা মাখানো স্বরে কচ বললো---
  ‘ প্রভু! আমি কচ। অঙ্গিরা ঋষির পৌত্র। বৃহস্পতির পুত্র। আমি আপনার শিষ্য হতে চাই। এবং যতদিন আপনার শিক্ষা চলবে, আমি গুরুগৃহে থেকে কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করবো।’
  ---’ কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে আগমন হয়েছে তোমার? বৎস? দেবতার মতো জাত, বিনা উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করে না।’
   কেঁপে ওঠা বুক সামলে , বিনীত মুখে কচ জবাব দেয়--
  ---’ দৈত্য দেবতা জানি না ঋষিবর। আমার জীবনের উদ্দেশ্য একটাই। তা হলো জ্ঞান অর্জন। জ্ঞান বৃদ্ধি। আর আপনার কাছে সে অভিষ্ট আমার পূর্ণ হবে, সে কথা আপনিও জানেন।’
---’ বৎস। জ্ঞানের দুয়ারে শত্রু মিত্র বলে কিছু নেই। গুরু শিষ্য সম্পর্ক পিতা পুত্রের চেয়েও দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ। আশা করবো তুমি তোমার শিষ্যত্বের সম্মান রক্ষা করবে। ‘
  আবারো কেঁপে উঠলো কচ। মুখে অমলিন হাসি বজায় রেখে ,ব্রহ্মচর্যের ব্রত গ্রহণ করলেন। স্মিত হেসে শুক্রাচার্য বললেন---
   ‘ আগামী কাল প্রাতে দেখা হবে।’ এই বলে, এক অনুচরকে  কচের থাকবার সু ব্যবস্থা করার আদেশ দিয়ে, নিজ গৃহর উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন আচার্য।
     সেখানে পৌঁছে কন্যা দেবযানীকে দেখে বৃদ্ধ পিতার মন খুশিতে ভরে গেল
   ‘ সারাদিন একলা  কি করো তুমি  কন্যে? তোমার মা বেঁচে থাকলে,,,’ কথা শেষ না করে শ্বাস ফেললেন পিতা। দেবযানী তাড়াতাড়ি পিতার বিশ্রামের ব্যবস্থা করে , সান্ত্বনার সুরে বলল--
 --” আমি সারাদিন খুব ভালো কাটাই পিতা। কিন্তু আজ আপনার একটু দেরি হলো যে?’
 --’দেবযানী। আজ দেবগুরুর পুত্র আমার কাছে বিদ্যালাভের জন্য এলো।’ ঈষৎ অহংকারী গলায় বললেন আচার্য--’ তবে ছেলেটি এত সুন্দর, যেমন ভদ্র, তেমনি সুকুমার, তেমনি আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের বিভা। বড় ভালো ছেলে। দেখেই অতন্ত্য সৎ এবং আন্তরিক মনে হলো।’
 দেবযানী অবাক হয়ে পিতার ভাবাবেগ দেখছিল। কে সেই শিষ্য? যার সম্পর্কে স্বল্প ভাষী পিতা এতটাই আপ্লুত? দেখতে হবে তো! হঠাৎ দেবযানীর হাতে ধরা জল ভরা স্বর্ণপাত্রটি মাটিতে পড়ে গেলো। কোথায় একটা পাখি ডেকে উঠলো কর্কশ স্বরে। মন কেমন কু গেয়ে উঠলো কেন কে জানে?
আশ্রমে একজনের আগমন সংবাদ তো আনন্দ বয়ে নিয়ে আসবে। অমঙ্গল চিহ্ন চোখে পড়ে কেন?

কচ ও দেবযানী- পর্ব ২

_------++++++------------
     দেবযানী জানে যে সে একটু পাগল। একটু কেন? ভালোমতো পাগল। এর জন্যে পিতার অপরিমিত প্রশয় দায়ী কিছুটা, আর কিছুটা তাঁর জন্ম গত। যা চাই, তা চাই ই। সে যত অসম্ভব চাহিদা হোক, শুক্রাচার্য পূরণ করবেনই। খামখেয়ালী মেয়ে , মাতৃহীন, জীবনে ওই মেয়ে আর নিজের পড়াশুনো ছাড়া আর কিছু নেই  তাঁর। তাই যত যা কিছু বলুক দেবযানী , তিনি না করেন না। অবশ্য তাঁর হয়ে, ব কলমে দানব রাজ বৃষপর্বাই মেটান সব দাবী।
        আর সে দাবী না মেটানোর তো কোনো কারণ নেই।  শুক্রাচার্য হলেন দৈত্যরাজের শক্তি, তাঁর আবিষ্কৃত সঞ্জীবনী ঔষুধের জোরে আজ দেবতাদের সমকক্ষ অসুর। অবশ্য  দানব রাজ বৃষ পর্বা দেবতাদের যিনি মোটেই বিশেষ বীর ভাবতে রাজি নন।  তাঁর বক্তব্য, আজ দেবতাদের অমরত্বের   পিছনেও আছে বিরাট চক্রান্ত।
    সমুদ্র মন্থন করে অমৃত আহরণ করতে দেবতা অসুর দুই পক্ষই। অথচ ছলনা করে ওই বিষ্ণু পুরোটাই দেবতাদের ভোগে লাগালেন। মনে মনে  তাই ঘৃণা করেন দেবতাদের। তবে, আজ চিত্র বদলেছে। এখন  অসুররা যুদ্ধে আহত হলে, মৃত্যুর কাছে চলে গেলেও, ওই ঔষধে নিমেষে উঠে বসছে। সঙ্গে সঙ্গে দেবতারা ‘ গেল গেল ‘ রব তুলছে। আবার কি ছলনা করে ওই মন্ত্র হাতিয়ে নেয় কে জানে? পাষন্ড গুলো কে কোনো বিশ্বাস নেই।  তাই দানবরাজ--, শুক্রচার্য আর তাঁর কন্যাকে মাথায় করে রাখেন। কোনো রকম অমর্যাদা যেন না হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি তাঁর। এর মধ্যে গুপ্তচর  ব্যাজার মুখ নিয়ে  অভিবাদন করে বললো----
  ---’ মহারাজ। গুরুদেব শুক্রাচার্য, দেবগুরু বৃহস্পতির পুত্র কচ কে শিষ্য করে নিজের আশ্রমে রেখেছে।’
 ---’ সে কি! ‘আর্তনাদ করে সিংহাসন থেকে পড়ে যান আরকি দানবরাজ---’ নাঃ, এই সরল গুরুকে নিয়ে আর পারা যায় না। নিশ্চই কোনো ভুজুং ভাজুং মিথ্যে বলে ঢুকেছে ওই দেবপুত্র। পাত্র মিত্র অমাত্য সবাই নজর রাখো ওই ছেলের উপর। নিশ্চয় করে বলা যায়, সঞ্জীবনী মন্ত্র চুরি করতেই বিষ্ণু আর ইন্দ্র মিলে পাঠিয়েছে। ‘
----’ মহারাজ, এই কথা দৈত্য গুরুকে বুঝিয়ে বললেই হয়!’
---’ না না। শুক্রাচার্য যেন ঘুণাক্ষরে টের না পান, তার শিষ্যর উপর আমরা নজর রাখছি। উনি অপমানিত বোধ করবেন।’
---’ মহারাজ, দৈত্যগুরু দেবযানী আর বৃহস্পতিপুত্র কচ, এদের মধ্যে আজকাল খুব বন্ধুত্ব। সারাদিন দুজনে একসঙ্গে থাকে। ‘  ব্যাজার মুখে গুপ্তচর খবর দিলো। শুনে মহারাজ মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলেন। রাক্ষসেরা নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া চায়ি করে ঠিক করল, একলা পেলেই কচকে খুন করে ফেলবে। তবেই আবার শান্তি ফিরবে অসুররাজ্যে।
*
 কচ যতবার ফুলগুলি তুলে তোড়া বাঁধছে, মনের মতো হয়না যেন। সকালের পাঠ সাঙ্গ হয়েছে। ভেষজ বিদ্যার জটিল কিছু সূত্র, আর রাজনীতি র কিছু অঙ্কের সমাধান করে, কচ চলেছে দেবযানীর গৃহের দিকে। এতক্ষনে সে নিশ্চয়ই স্নানাদি সেরে কচের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে। কিন্তু উপায় কি? ফুলের তোড়া যেমন তেমন হলে হবে না। সব রঙের একটি অপূর্ব মিশেল থাকতে হবে। মাঝে মাঝে থাকবে কিছু সবুজ পাতা। খেয়াল রাখতে হবে, গতকালের ফুল সাজানো আর  আজকের মধ্যে কিছু  ফারাক থাকে। তবে তো দিনের বিশেষ চরিত্রটি প্রকাশ পাবে। নতুবা মনে হবে, এটা একটা অভ্যাসের দায় সারা কাজ। যে দিচ্ছে , তার মনে যাকে দিচ্ছে তার প্রতি কতখানি অন্তরকিতা আছে, সেটা প্রকাশ পায় উপহারে। তা সে যত সামান্যই হোক না কেন!
     কচ নিজেও খুব খুঁতখুঁতে। তার উপরে দেবযানীর তুষ্টি এক বড় কারণ এমন মনোযোগের। অবশেষে ফুল নিয়ে আশ্রম গৃহের প্রাঙ্গনে পা রাখলো, তখন সূর্য মধ্য গগনে।
    নীল শাড়ীর আঁচল দুলিয়ে দৌড়ে এলো দেবযানী---’ কচ, কচ, চলো। আজ তোমার জন্য এক বিশেষ মিষ্টান্ন প্রস্তুত হয়েছে। খাবে চলো।’ তারপরেই ফুল দেখে খুশি হয়ে বলল--’ ওমা! আজকের তোড়াটি সবচেয়ে সুন্দর। এটা এখানে রেখে, তুমি খাবে চলো।’
 কচ অনিচ্ছুক ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো। মিষ্টি খেতে সে একবারে ভালোবাসে না। ম্রিয়মান স্বরে  বলল---’ থাক, মিষ্টান্ন থাক। তুমি বাইরে গিয়ে পাথরের উপরে বসো দেখি, কুন্দ ফুলের মালাটি তোমার পায়ে পরিয়ে দি।’
   দেবযানী হৈ হৈ করে হেসে উঠে বললো--’ খাবে না? মেদ বৃদ্ধি হবে বলে? কচ, তোমার এই সুঠাম সুন্দর শরীর--আহা! কত যত্নে বানানো। তোমাকে দেখে আমি আত্মহারা হয়ে যাই।’ বলে মুগ্ধ চোখে কচের শরীরের দিকে চেয়ে থেকে আচমকাই তাঁর গলা জড়িয়ে বলে উঠলো---’ আমি তোমাকে চাই কচ। তুমিও নিশ্চয় আমাকে কামনা করো?’ দেবযানীর তৃষিত চোখ থেকে চোখ সরিয়ে, মৃনাল বাহু দুটি খুলে দিয়ে কচ বললো--
---’ কত আশ্চর্য সব গল্প বলবো বলে সকাল থেকে বসে আছি। চলো, সারা দুপুর আমরা উদ্যানে ঘুরে বেড়াব আজ।’
   দেবযানী কচের ছলনা বোঝেনা। সে সোজাসুজি নিজের মনের কথা জানায়। এই ফুল এনে দেওয়া, এই গান , কবিতা শোনানো, অদ্ভুত সব গল্প বলা, মায়ের স্নেহের মতো মাঝে মাঝে বকুনী দেওয়া, এমন কি দেবযানীর চুল পর্যন্ত বেঁধে দিয়েছে কচ একদিন। ছোট থেকেই সে  যা চেয়েছে সব পেয়ে এসেছে। কচ কে সে কামনা করে, এ কথা জানিয়েছে পিতাকে। পিতা প্রশয়ের হাসি হেসেছেন। কাজেই দেবযানী নিশ্চিন্ত। সে হাসি মুখে কচের হাত ধরে গৃহের বাইরে পা বাড়াতে গেলে,  হঠাৎ পায়ে  কঙ্কর ফুটে গেল এক। তাড়াতাড়ি দেবযানীর নরম পায়ে  নিজের  আঙ্গুল বুলিয়ে দিতে দিতে মৃদু বকুনী দিলো কচ---’ দেখে চলতে পারো না?’
---’ এখনো তো গৃহেই আছি। তাই নিশ্চিন্ত ছিলাম।’
----’ গৃহ হোক আর উদ্যান সতর্ক থাকবে। নিশ্চিন্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে থাকলে  এমনি করেই আঘাত পাবে , মনে রেখো।’
    থমকে যায় দেবযানী। সরলা বালিকার মতো অপাপবিদ্ধ দুটি চোখ মেলে তাকায় কচের ভাবলেশহীন মুখের দিকে। মাঝে মাঝেই কেমন দূরের মনে হয় তাকে! কেন? বুঝে পায়না সে  মনে হয়,  যে বসে আছে তার সামনে, সে কচ নয় ,অন্য কেউ। বুকের মধ্যে উথাল পাথাল করে ওঠে। শত্রু মিত্র, দেব দানব কিছুই বোঝে না সে। প্রথম প্রেমের সৌরভে ,তার তরুণী মন ডুবে রয়েছে এক আনন্দ সরোবরে। মুক্ত কণ্ঠে সে বলতে চায়--’ আকাশ দেখো, বাতাস শোনো, ওগো নদীর জল, কাননের ফুল সকলে শোনো, আমি ভালোবাসি গো ভালোবাসি।
     কোনো দ্বিধা সংকোচ জড়তা তার নেই। সে যা ভাবে, যা চায়, যেমন ভাবে পারিপার্শ্বিক কে নিয়ে খেলতে চায়-- তাই করে। কোনো আপোষে সে বিশ্বাস করে না। কোনো কারণে ‘ না’ শুনতে পছন্দ করে না। দেবযানী ধরেই নিয়েছে যে কচ ও তাঁকে ভালোবাসে। এক অসম্ভব অধিকার বোধ কাজ করে তার কচের ব্যাপারে। পাঠের সময়টুকু ছাড়া এক নিমেষের জন্য চোখের আড়াল করেনা তাকে।

 ‘ ব্যাথা করছে’ ? কচের প্রশ্নে সম্বিত ফেরে দেবযানীর। অনেক ক্ষণ ধরে তাঁর
 
     রক্ত পদ্মের মতো চরণটিকে নিজের হাতের উপর ধরেছিল কচ। আরামে চোখ বুজে প্রিয় স্পর্শের সুখে বিভোর দেবযানীকে মৃদু ধাক্কায় বাস্তবে ফিরিয়ে তার হাত ধরে সাবধানে উদ্যানের দিকে পা বাড়ালো কচ, মুখে মৃদু রহস্যময়তা, মনে চিন্তা কবে হবে কার্য সিদ্ধি? কবে ফিরে যেতে পারবে আপন পরিচিত পাঠ কক্ষে? নিজের মনে কথা বলে বলে হাঁটছিল দেবযানী, তাই নজরে পড়েনি কচের মুখ। তবে দেখলেও কি বুঝতে পারত কিছু? সরল পাখী কি বোঝে চতুর ব্যাধের কুটিলতা?

কচ ও দেবযানী পর্ব--৩
------------------------
   রাত এখন গভীর। আশ্রমের সকলে নিদ্রার কোলে। টিম টিম করে আলো জ্বেলে গভীর মনোযোগে দিনলিপি লিখছে কচ। শিখছে অনেক কিছু, যা কল্পনার অতীত। দৈত্যগুরুর অতলান্ত জ্ঞান দেখে অবাক হয়ে যায় সে। শ্রুতি পদ্ধতিতে পাঠ দেন মহর্ষি। শ্রুতি মানে শুনে মনে রাখা। এই পদ্ধতি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক। এর ফলে মেধা মনন সমস্ত কিছুর উন্নতি অনিবার্য। বৈদিক যুগে,  শিক্ষাপদ্ধতি উন্নতির জন্য ঋষিরা আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত উপায় প্রয়োগ করেছেন। শ্রুতি তার মধ্যে একটি। অদ্ভুত এই উপায়। আচার্য মুখে বলছেন, শিষ্যরা কানে শুনছে, মনে রাখছে। একটা বুনন চলে। তার ফলে মস্তিষ্কের কোষ উজ্জীবিত হয়। শ্রবণ যন্ত্র তীক্ষ্ণ হয়,স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধি পায় বহুগুণ।
     তবু, সময় পেলেই কচ কিছু সূত্র লিখে রাখে। যদিও তাঁর মনে রাখার ক্ষমতা আগামী একশো বছরেও লাঘু হবার নয়, তবু সে সুযোগের ব্যবহার করে। যে কুটিরটিতে সে থাকে, তাতে আরামের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত। এগুলি আসলে নামেই কুটির। অসুররাজ্যে ঐশ্বর্যের প্রতুলতা দিয়েছে আরাম আর প্রাচুর্য। মদ্য, মাংস, নারী কোনো কিছুর অভাব নেই। যদিও ব্রহ্মচর্য পালন কালে, কচ ওসবের দিকে ফিরেও তাকাবে না। কিন্তু চাইলে সে আশ্রমের বাইরে সব কিছুই ভোগ করতে পারে।
     রাত্রি গাঢ়। বড় বড় বৃক্ষের শাখায় সর সর হাওয়ার শব্দ ছাড়া সব নিঃশব্দ। বাতাসের মতো ধীর পায়ে  ঘরে ঢুকে  এলো কেউ। হাওয়ায় ভাসা গলায় আগন্তুক বললো--’ সাবধান কচ। প্রাণের আশঙ্কা আছে তোমার। ‘
--’ কিন্তু, আমার এখানে আসার কারণ তো কেউ জানে না।’
 আবছা হাসলো আগন্তুক--’  কুটিল ষড়যন্ত্র চলছে  তোমাকে বাঁচাতে পারে একমাত্র দেবযানী। সে তোমাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে।’
---’ আর সেই বিশ্বাস আমাকে ভঙ্গ করতে হবে! নিজেকে এতখানি নিচে নামাতে হবে ভাবিনি কখনো!’ ক্ষোভে  দুঃখে বলে উঠলো কচ।
--’ আমি  দেবতাদের আজ্ঞাবহ দূত মাত্র।
 তবু তোমার মনোবেদনার উত্তরে বলতে পারি, জাতির উপকারের জন্য সব কিছু করা যায়।’
---’ এমন কপটতার পরিবর্তে নিজের প্রাণ দিলে ভালো হতো।’ তরুণ কণ্ঠ বেদনায় বুজে যায়। দেবযানীর সরল মুখখানি মনে পড়ে। দূত বলে গেল তাঁর প্রাণ হানির আশঙ্কা আছে। এমন ধিক জীবন! যদি যায় তো যাক।
*
  বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হতে চলেছে, অথচ শুক্রাচার্যের হোমধেনু বনের কাছে চরাতে গিয়ে কচ ফেরেনি। উৎকণ্ঠায় ঘর বার করছে দেবযানী, চিন্তার আরো বিশেষ কারণ হলো, নিদির্ষ্ট সময়ে চেনা রাস্তা ধরে ঘরে ফিরে এসেছে, হোমধেনু। কিন্তু দূর দূর পর্যন্ত কচকে দেখা যাচ্ছে না।
      খুব রাগ হলো দেবযানীর। এই সময় সে গান শোনে। কচ গান গাইতে গাইতে, তার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। এসব তার অভ্যেস হয়ে গেছে। এখন যদি হঠাৎ করে অভ্যাস পূরণের লোক অদৃশ্য হয়ে যায়, তবে এমন বিরক্তি লাগে, যেন চোখে একটা ছোট বালি ঢুকে কির কির করছে।
    তারপর হলো উৎকণ্ঠা। কচ কে বিশ্বাস করে সে। নিয়ম মেনে চলা ছেলে, এমন করতেই পারে না। নির্ঘাৎ কোনো দুর্ঘটনায় পড়েছে । ভয়ে চিন্তায় অস্থির হয়ে ছুটে গেল পিতার কাছে---
  ‘ পিতা, কচ এখনো ফেরেনি। ধেনু গুলি ফিরে এসেছে। কচ নয়। পিতা, আমি নিশ্চিত, ওর কোনো বিপদ হয়েছে। তুমি কিছু করো। কচের যদি মৃত্যু ঘটে আমি কিন্তু বাঁচবো না।’
      শুক্রাচার্য অবাক হয়ে গেলেন। মেয়ে তার অবুঝ,  জেদী, অভিমানী, কিন্তু এমন স্পষ্ট করে নিজের প্রেমের কথা বলতে পারে যে, সে তো আত্মবিশ্বাসী ও বটে। মেয়ের ব্যাকুল চোখের দিকে তাকিয়ে,
  শুক্রাচার্য বুঝলেন দেরী করলে বিপদ হতে পারে। তিনি ধ্যান যোগে দেখলেন কিছু দানব , কচকে মেরে, টুকরো টুকরো করে কুকুরদের খাইয়ে দিচ্ছে।
  শিউরে উঠলেন দৈত্যগুরু। বুঝলেন, দৈত্যদের কাছে কচ এখনো শত্রুর ছেলে অথবা এক তস্কর। তাঁকে রাস্তা থেকে সরাবে অসুররাজ যেভাবেই হোক।  মনখারাপ হয়ে গেল তাঁর। নিছক সন্দেহের বশে এমন জঘন্য কাজ যারা করে, তারা কি করে দেবতাদের সমালোচনা করে? জলদ গম্ভীর স্বরে তিনি বললেন-- ‘ মা, চিন্তা নেই। এখুনি সঞ্জীবনী মন্ত্রে আহবান করছি কচ কে।’
   মন্ত্র উচ্চারণে জীবিত কচ, একেবারে অবাক হয়ে গেল। দেবযানী ছুটে গিয়ে তাঁর হাত ধরে ব্যাকুল হয়ে বলল--
  ‘ কি হয়েছিল তোমার? ‘
ভয়ার্ত গলায় কচ বললো---’আমাকে কতগুলো অসুর এসে হত্যা করেছিল দেবযানী।  ও দেবযানী! দেখো আমি বেঁচে আছি। এ কি করে সম্ভব হলো?’
 তাচ্ছিল্যের স্বরে দেবযানী বললো--’  পিতার সঞ্জীবনী মন্ত্রের গুনে তুমি ফিরে এসেছ। তিন লোকে কেবল আমার পিতাই  এই মন্ত্র জানেন। আর কেউ নয়।’
 কচ দেবযানীর হাত ধরে গাঢ় স্বরে বলল--’ আবার যদি এমন বিপদ হয়?’
---’ আবার তোমাকে বাঁচিয়ে তুলবো। তোমাকে ভালোবাসি। তোমার জন্য সব করতে পারি।’
    সন্ধ্যার অন্ধকারে ঢেকে গেছে আশ্রমের চারিপাশ। মুখ দেখা যায়না ভালো। না হলে দেবযানী দেখতে পেত তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে  এক অচেনা কচ। মুখে যার ধূর্ত কৌশলী হাসি। যে পরিষ্কার বুঝতে পারছে, সঞ্জীবনী মন্ত্রের জন্য কেন দেবযানীকে লক্ষ্য পূরণের অস্ত্র ভাবতে বলেছিলেন শ্ৰী বিষ্ণু।
কচ ও দেবযানী--৪
      কচের উপর দ্বিতীয় আক্রমণ ঘটলো খুব তাড়াতাড়ি। রোজকার মতো সেদিনও দেবযানীর জন্য ফুল সংগ্রহে গভীর অরণ্যে প্রবেশ করেছিল সে। যত গভীর অরণ্য, ততো নাম না জানা ফুলের সমারোহ। এগুলি আনলে ,চমকে যায় দেবযানী।
 ছেলে মানুষের মতো হাতে তালি দিয়ে হেসে ওঠে
     --’ আহ্হঃ। তোমার সব কিছু কেমন অন্যরকম কচ। তোমার ভাবনা, কথা, গান--এমন আর কেউ নয়।’
  ----’ এমন বলো কেন দেবযানী? আমি সাধারণ। ওই দেখো, দেখো ,বিকেলের আকাশ দিয়ে পাখা মেলে উড়ে যায় বলাকা। দেখো!’ কচ ভয় পায় নাকি? কথা ঘুরিয়ে দেয়। সে প্রেমিক নয়। সে আসলে এক নকল জাদুগর। যদি ধরে ফেলে এই সরলা বালিকা? যদি বুঝে যায়, কচের বাঁশির সুরে মিশে আছে বিষ। প্রেম নেই কোথায়ও। আছে বিশ্বাসঘাতকের কালো ধোঁয়া।
    অসুরপুরের অরণ্য আদিম। আকাশ ছোঁয়া দীর্ঘ পুরোনো বৃক্ষরাজির আড়াল ভেদ করে সূর্যের প্রবেশ অবাধ নয়, তাই নীচের জমি স্যাঁতসেঁতে ভেজা। ঝরে পড়া পাতার রাশিতে লুকিয়ে থাকে বিষাক্ত সাপ, কীট পতঙ্গ। কচ এমন দেখেনি আগে। এমন থমথমে, ঘুমন্ত অরণ্য স্বর্গে নেই। স্বর্গে সমস্ত কিছু হিসেব করে। অরণ্য আছে। কিন্তু তা পাহাড় ঝর্ণা দিয়ে সাজিয়ে মনোরম করে রাখা। স্বাভাবিক সৌন্দর্যে বেড়ে ওঠা বৃক্ষরাজির বেয়াদপি দেবরাজ সহ্য করবেন না। কচ বার বার এই অরণ্যে ছুটে আসে। এর আদিম শরীরী ঘ্রাণ বুক ভরে নেয়। খুঁজে বার করে এমন অনেক পুষ্প, যা এতদিন গোপণ ছিল, কেউ দেখেনি।
    অরণ্যের গভীরে প্রবেশের কারণ শুধু ফুল নয়, অনেক অজানা অচেনা লতা গুল্মের সন্ধান পায়  কচ, যা ভেষজ চিকিৎসায় খুব উপকারী। পাকে চক্রে দেবতা অসুরের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লেও, মূলত তাঁর মন আনন্দ পায় নিত্য নতুন আবিষ্কারে। এই যেমন সেদিন এক লতা গুল্ম আবিষ্কার করলো যার রস থেকে কর্কট রোগের আরাম হয়। যদিও এখনো সে সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারেনি। তবে, স্বর্গে তাঁর অধ্যয়ন কক্ষের উপকরণের সাহায্যে  এই লতাকে পরীক্ষা করলে হয়তো সমাধান হবে। নিজের প্রিয় পাঠ কক্ষের কথা মনে করে দীর্ঘশ্বাস পড়লো কচের। কবে শেষ হবে এই নির্বাসন?
       অরণ্যে ফুল তুলতে তুলতে রাগ ইমনের সুর গুণ গুণ করছিল কচ। আজ ইমন রাগিনীতে বীণ বাজিয়ে শোনাবে দেবযানীকে। গতকালের ওই ভয়ঙ্কর ঘটনার পরে মন এখন অনেক শান্ত। বিকেল বিকেল আশ্রমে ফিরে, বীণা বাজাবে সে। দেবযানী মানা করেছিল আজ আশ্রমের বাইরে যেতে। কিন্তু কচ তা শুনবে কেন?  নিবিড় বনানীর রহস্যময়তা তাকে টানে। সুর আর সৌন্দর্যের নেশায় বিভোর থাকলেও কচ  দেখতে পেল মাথার ওপরে নেমে আসছে চকচকে ধারালো খড়্গ। প্রাণ পনে দৌড়োলো সে। খড়্গ যেন বিদ্রুপের হাসি হেসে ধড় থেকে মাথাটা কচাৎ করে কেটে দিলো। মুণ্ডহীন কচ কিছুক্ষন ধড়ফর করার পরে স্থির হয়ে গেল।
*
  অসুররাজ্যে প্রথমেই যেটি চোখে পড়ে তা হলো ঐশ্বর্যের ঝলমলানি। বিলাসিতায় প্রকট চারিপাশ। উৎকৃষ্ট সুরা, পণ্য সামগ্রী, অপ্সরা তুল্য রমনী , মহার্ঘ বস্ত্র পরিহিত দৈত্য গণের সদর্প চলা ফেরা। রাজ্যে স্বচ্ছলতা , প্রাচুর্য উপচে পড়ছে। ময় দানবের  সুদক্ষ পরিচালনায় দক্ষ কারিগর, শিল্পীদের দলটি ক্রমাগত রাজধানীর সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে ব্যস্ত।
   শুক্রাচার্যের আশ্রমটি পাহাড়ের উপরে অতি মনোরম করে সাজানো। ভিতরে এক ছোট নদী আছে। আছে দেবযানীর পছন্দ মতো গাছ গাছালি। একটি স্বয়ংচালিত খেয়া নৌকা করে মরালির মতো নদীতে ভেসে যাচ্ছিল দেবযানী। গোধূলির আলো পড়েছে তাঁর কোমল মুখখানিতে। সে আজকাল সখীদের থেকে দূরে থেকে কচের সঙ্গে সময় কাটাতে পছন্দ করে। আর একটু পরেই আসবে কচ। বাজাবে বীণ। পাহাড়ের ওই ওপরে চাঁদ উঠে আসবে যখন , তখন নিজ কুটিরে ফেরে কচ। প্রতীক্ষা মাঝে মাঝে এত অসহনীয় হয়ে ওঠে কেন বোঝেনা দেবযানী? সূর্য ডুবে গেল যেন? ওই কে আসে ছুটে ছুটে? দেবযানী তাড়াতাড়ি ডিঙি ঘুরিয়ে তীরে চলে। কে ওই অর্বাচীন দূত? যে বলে কচ আর বেঁচে নেই?
*

 দেবযানী পাগলের মতো আচরণ করতে লাগলো। আবারো সিদ্ধ সঞ্জীবনী মন্ত্র প্রয়োগ করে বাঁচালেন কচকে ঋষি। কিন্তু এবার ক্ষুব্ধ  শুক্রাচার্য বেগে চললেন দৈত্যরাজ বৃষপর্বার কাছে
 ---’ এসব কি হচ্ছে দৈত্যরাজ? কচ আমার আশ্রিত, সন্তান তুল্য। তার ওপর এমন আক্রমণ? এ আমার অপমান! ‘
---’বিশ্বাস করুন গুরুদেব। আমি কিছুই জানি না ।  আজকাল কিছু বাইরের অবাঞ্ছিত দৈত্যের প্রবেশ ঘটেছে রাজ্যে। হয়তো তাদের সঙ্গে কোনো বিরোধ ঘটে থাকবে কচের। ‘
---’ ওমন ছেলেই নয় সে , যে অকারণ বিরোধ ঘটাবে। আপনি আমার সঙ্গে ছলনা করবেন না দৈত্যরাজ!’ ক্রোধে অগ্নিবর্ন হয়ে শুক্রাচার্য বললেন।
---’ গুরুদেব। গুরুদেব  শান্ত হন। উতলা হবেন না। আপনি অন্তর্যামী। আপনাকে ছলনা করবো এমন ক্ষমতা আমার নেই।’ রাজা বৃষপর্বা আকুল হয়ে গুরুদেবের চরণ তলে বসে পড়লেন।
---’ ব্রাহ্মণের ক্রোধ উচিৎ নয়। কিন্তু মহারাজ , আপনি সতর্ক না হলে,,কথা শেষ না করে বেগে প্রস্থান করলেন ঋষি।
   সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে রাজা বললেন
----’ আপনি সরল ব্রাহ্মণ। দেবতাদের চক্রান্ত বোঝেন না। আপনি আর দেবযানী হতে বিপদে পড়বো আমরা।’ তারপরেই হুঙ্কার দিয়ে  দৈত্যদের দিকে ফিরে বললেন --
 অপদর্থের দল! বার বার বেঁচে ফিরে আসছে বৃহস্পতি পুত্র। এবার এমন বুদ্ধি বার করো, যেন সিদ্ধ সঞ্জীবনীও বাঁচাতে না পারে ওই দুষ্টকে।’
*
 সে এক বুদ্ধি বেরোলো বটে ! দানবরা প্রথমে কচ কে কেটে কুচি কুচি করে, পুরো শরীরটাকে পুড়িয়ে, ভস্ম বানিয়ে ফেললো, তারপরে সেই ভস্মচূর্ণ  উৎকৃষ্ট মদ্যের সঙ্গে মিশিয়ে শুক্রাচার্যকে পান করতে দিলো। সন্দেহের কোনো কারণ ছিল না। সুরাপান তাঁর নিয়মিত অভ্যাসের মধ্যে পড়ে। তিনি নির্দ্বিধায় সুরার সঙ্গে মিশ্রিত কচের দেহ ভস্ম খেয়ে নিয়ে বিশ্রাম নিতে চলে গেলেন।
   উৎকন্ঠিত দেবযানীর চোখের সামনে রাত গভীর হতে লাগলো ধীরে ধীরে। কচ ফিরলো না। দেবযানীর চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগলো। অসহায়ের মত ছুটে গেল পিতার কক্ষে। উত্তেজিত কন্যার আকুল কান্নায় ঘুম ভেঙে উঠে শুক্রাচার্য বার বার প্রয়োগ করতে লাগলেন সিদ্ধ মন্ত্র। কিন্তু তবু কচ ফিরলো না। আকুল কান্নায় ভেঙে পড়লো দেবযানী। তাই দেখে দৈত্য গুরু বললেন
---’ শান্ত হও কন্যে। তুমি এত বিদ্যা শিক্ষা করেছ, জানোনা যে মরণ আসবেই একদিন? তার জন্য শোক বৃথা? আর তা ছাড়া তোমার কোনো দিক থেকেই যোগ্য নয় ওই ছেলে। শোক ভুলে নিজের কাজ করো।’
 উপদেশের উত্তরে আরো জোরে কেঁদে উঠলো দেবযানী। কাঁদতে কাঁদতে বললো---
---’ দানবরাজ্যের মতো ধনবান না হোক পিতা, কচ হৃদয়ে ধনী। আমি যা বলতাম তাই শুনতো। কোনোদিন প্রতিবাদ করেনি। পিতা, কচ আমার সখা, আমার প্রাণ।’
---’ এসব কি বলছো কন্যে?’
---’ পিতা! ওমন সুন্দর পুরুষ আমি কোনদিন দেখিনি। ওমন বিদ্বান ওমন স্নেহ --পিতা ! কচ কে আমি ভালোবাসি। সে যদি ফিরে না আসে আমি আত্মহত্যা করবো।’
    শুক্রাচার্য কন্যাকে ভালোবাসেন। কিন্তু নিজের কাজের বাইরে সময় কতটুকু দিতে পারেন? সখীদের সঙ্গে একলাই বড় হচ্ছে কন্যে। সময় দিতে অপারগ হয়ে দেন অপরিমিত প্রশয়। সেই প্রশয়ের ফল আজ সামনে দাঁড়ানো। জেদী ,অপরিণত বুদ্ধির এক তরুণী। এবং এমন সর্বনাশা জেদ ডেকে আনতেই পারে মৃত্যু, সে কথাও বোঝেন তিনি। নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকেই দুষলেন ঋষিশ্রেষ্ঠ। সান্ত্বনা দিয়ে কন্যাকে কাছে টেনে চোখের জল মুছিয়ে  ভারী গলায় বললেন---
   ‘ কেঁদোনা দেবযানী। পিতা আমি। কিন্তু পিতার কর্তব্য করিনি কোনোদিন। তোমার একাকিত্ব বুঝিনি আমি।  তোমার মনের সেই শুন্য জায়গা ভরে দিয়েছে কচ। আমি আনবো তাকে ফিরিয়ে। যে ভাবেই হোক। কিন্তু, কন্যে, আজ একটি কথা শোনা এই অসহায় পিতার। মন যেন কখনো ক্রীতদাস না হয় কারো। ক্রীতদাস মন সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ হয়ে পড়ে।’
---’পিতা! ‘ ক্রোধে চিৎকার করে ওঠে দেবযানী--’ অনর্থক কথায় সময় নষ্ট করছেন আপনি। ধ্যানযোগে জানুন কচ কোথায়? তারপর উদ্ধার করুন তাঁকে।’
----’ বেশ পুত্রী। তাই হোক তবে।’  আচমন করে ধ্যানে বসলেন মহামতি।
      নির্জন বনানী। অপার মহিমায় রাত্রি ক্রমে রহস্যময়। কিছু নিজস্ব শব্দ থাকে রাতের, থাকে নিজস্ব স্পর্শ। গোটা একটা দিন হলো প্রকৃতির সংবাদ বাহক। সকাল থেকে রাত বিভিন্ন সময়ের প্রেক্ষাপট , বিভিন্ন বার্তা বহন করে আনে।
   উৎকন্ঠিত দেবযানীর সামনে চোখ খুললেন শুক্রাচার্য। এই মাত্র ধ্যানে যা দেখলেন তা এত ভয়ঙ্কর, এতই বেদনাবহ এবং বীভৎস --সে সংবাদ তিনি দেবেন কি করে ওই প্রাণ পুতুলিকে? নিজেকে মহাজ্ঞানী মনে করতেন তিনি। আজ দেখলেন সময়ের বিদ্রূপের কাছে কিভাবে পরাজিত হয় জ্ঞান। এমন অসহায় ,এমন ক্লান্ত কখনো বোধ করেন নি তিনি। দেবতা অসুর মানব --কালের পদতলে প্রত্যেকেকে নতজানু হতে হয়। ক্লিষ্ট মুখে তিনি তাকালেন কন্যার দিকে। এমনই বেদনার্ত সেই ভঙ্গী যে দেবযানী চমকে উঠলো , দ্রুত পায়ে পিতার কাছে বসে, দুই হাতে গলা জড়িয়ে স্নেহ সিক্ত স্বরে প্রশ্ন করলো --
  ‘ কি হয়েছে পিতা? কি হয়েছে আমাকে বলো?’
কন্যার সুকুমার মুখটির দিকে তাকিয়ে চোখে জল এলো দোর্দন্ডপ্রতাপ ঋষির। শুষ্ক হেসে বললেন---
  ‘ তোমার প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়েছি পুত্রী। জেনেছি কচ কোথায় আছে?’
---’ জানতাম পিতা। আপনি সর্বশক্তিমান। আপনি পারবেন না, এমন কোনো কাজ নেই। এবার ফিরিয়ে দিন আমার প্রিয়তমকে।’
---’তার আগে একটি প্রশ্নের উত্তর তোমাকে দিতে হবে, দেবযানী।’
---’প্রশ্ন? এই সময়ে? আচ্ছা, বলুন কি প্রশ্ন?’
---’ কাকে জীবিত দেখতে চাও তুমি? তোমার পিতাকে না কচকে? যে কোনো একজন কে বেছে নিতে হবে তোমাকে। পিতা অথবা কচ!’

    রাত্রির অন্ধকার ভেদ করে কর্কশ স্বরে পেঁচক ডেকে উঠলো এক। পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো কন্যার প্রতি পিতার চিরকালীন প্রশ্ন
----’কাকে চাও কন্যে? পিতা না প্রেমিক? পিতা না প্রেমিক? পিতা না প্রেমিক?’
পর্ব --৫
---------
       অসুররাজ্যে  উৎসবের মেজাজ  আজ সকাল থেকে।  উৎসবের কারণ নিয়ে  কেউ কিছু বলছে না। এমন কি কানাকানি পর্যন্ত নয়। চাপা খুশি যাকে বলে। কিন্তু লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়, অন্যদিনের তুলনায় দৈত্যরাজ বৃষপর্বা, বেশ খোশ মেজাজে সিংহাসনে বসে উৎকৃষ্ট মৈরেয় পান করছেন সেই সঙ্গে অকাতরে দান করেছেন ছোট ছোট মূল্যবান স্ফটিক খন্ড, স্বর্ণ মুদ্রা, গহনা এবং সূক্ষ্ম বস্ত্র। আজ সভায় রোজকার কাজের তেমন গুরুত্ত্ব নেই, বরং অমাত্য ও অন্যান্য উচ্চ পদস্থ রাজ কর্মচারীরা নিজেদের মধ্যে কৌতুক দৃষ্টি বিনিময় করে চলেছে।
  এমন সময় রাজ সমীপে এসে অভিবাদন করে দাঁড়ালো গুপ্তচর।
---’ এখন কি সংবাদ হে?’ লঘু মেজাজে জিজ্ঞেস করলেন মহারাজ।
---’ মহারাজ। রাত ভোর পর্যন্ত গুরুদেব আর আচার্যা দেবযানীর বাক বিতণ্ডা চলেছে। তারপর হঠাৎ সব নীরব হয়ে যায়। মহারাজ, আপনি তো জানেন, গুরুদেবের আশ্রমে প্রবেশ করা, যে কোনো দুর্গের চাইতেও কঠিন।’ ইনিয়ে বিনিয়ে সংবাদ বাহক অজুহাত দিতে থাকে।
----’ অযথা বাক্য প্রবাহে বিলম্ব না করে মূল কথায় এসো তুমি।’  বিরক্তি চাপা নেই দৈত্যরাজের স্বরে,
  ---’ গুরুদেব আর তাঁর কন্যার বাক বিতন্ডার সংবাদে আমার কোনো রুচি নেই। আর তোমাকে , তোমার দল বল সহ গুরুদেবের উপরে নজর রাখতে বলা হয়েছিল, তুমি এখানে চলে এলে কেন?’
---’ মহারাজ! সেই কথাই তো বলছি, আমরা ভালো করে কিছু দেখতে পাইনি সত্য, কিন্তু শুনতে পেয়েছি।’
----’ শুনবে আর কি? প্রথমে বাক বিতণ্ডা তারপরে কান্না। দেবযানীর কান্না। মৃত কচের জন্য। হাঃ। কি আনন্দ আজ। দুষ্ট দেবতাদের চক্রান্ত ব্যর্থ হলো। শান্তিতে মদ্য পান করবো আজ।’
 বার্তা বাহক দানব কুন্ঠিত মুখে, বিশাল শরীর যথা সাধ্য ঝুঁকিয়ে, করুণ কণ্ঠে বললো---
   ‘ কান্না নয় মহারাজ। ভোর সকালে আমরা শুনলাম বীণা বাজিয়ে গান।’
---গান?’ সমস্বরে সভাস্থ সমস্ত দানব আর্তনাদ করে উঠলো--’ বীণা বাজিয়ে গান?’ মুহূর্তে আমোদিত সভাঘরের উপর ছেয়ে গেল বিষাদের কালো মেঘ। কি বলে এই অর্বাচীন? জলদগম্ভীর কণ্ঠে প্রধান অমাত্য প্রশ্ন করলেন---
  ‘ গান? কচ মৃত। এখন গান কে গাইবে? হে দূত, তুমি দেবযানীর কান্নাকেই গান ভেবে ভুল করছো। ভালো করে ভেবে বলো।’ রুষ্ট কণ্ঠে মহামন্ত্রী বলেন।
---’ না মহামন্ত্রী।  কান্না নয়। পুরুষ কণ্ঠে সুন্দর সাবলীল সুর পাহাড়ের উপর দিয়ে ভেসে ভেসে আমাদের কানে এলো। ব্যাপার কিছু বুঝতে না পেরেই আমি এখানে চলে এসেছি।’
   থেমে গেল নর্তকীদের নুপূর নিক্কন, ফেনিভ মদিরার পাত্র ম্রিয়মান, হীরক খণ্ডের মতো বাতিদান নিষ্প্রভ, স্বর্ণ সিংহাসনে উজ্জ্বল বস্ত্রে সুপরুষ দৈত্যরাজের হাস্যোজ্জ্বল মুখে কালো ছায়া
  পুরুষ কণ্ঠে সংগীত? বীণ বাদন? তার মানে?
      কচ বেঁচে আছে? জীবিত আছে?  কি করে সম্ভব হলো এই অসম্ভব কাজ? কে করলো? কিভাবেই বা করলো?
কচ ও দেবযানী ---পর্ব -৬ ---জয়তী রায়

---------–----/-----------------------------------
        ‘ নারায়ণ নারায়ণ’ বলতে বলতে নারদ হাজির বিষ্ণুলোকে। স্বর্গ মর্ত্য পাতাল তিনলোকে নারদ , যেখানে যখন মন চায় পৌঁছে যান। তিনি হলেন সবজান্তা ঋষি। তিনলোকের সব গোপন খবর তাঁর ঝুলিতে মজুত। তবে শিবলোকে নারদ ঘেঁষেন না। ওই ভোলানাথকে তিনি সমীহ করেন। ভূত প্রেত , বদমেজাজী নন্দী ভৃঙ্গি নিয়ে সপরিবারে বাস দেবের দেব মহাদেব স্বর্গের ধার ধারেন না । বেশির ভাগ সময় গভীর তপস্যায় মগ্ন থাকেন। যে যুদ্ধে দেবতারা একেবারে গো হারান হেরে যান, সেখানে তিনি ত্রাতা রূপে উপস্থিত হবেন, নিজের ভয়ঙ্কর ত্রিশূল নিয়ে। এবং, সে যুদ্ধে জয় অনিবার্য। ওখানে নারদ ঘেঁষেন না। কে জানে কখন তৃতীয় নয়নের আগুন দিয়ে ভস্ম করে দেন। আসলে যেখানে কপটতা নেই, সেই স্থানে একটু সামলে চলাই ভালো।
  বিষ্ণুলোক স্বর্গের সবচেয়ে সুন্দর স্থান। দেবরাজ ইন্দ্রের সভায় ঐশ্বর্যের আড়ম্বর বেশি, কিন্তু বিষ্ণুলোক , লক্ষীর হাতের ছোঁয়াতে সৌন্দর্য ও সুরুচির প্রকাশে অপরূপ। ব্যক্তির নিজের বিভা স্থান কে মহত্ব পূর্ণ করে তোলে। শ্রী বিষ্ণু , একজন ধী যুক্ত দেবতা। জ্ঞান, বুদ্ধি, ব্যক্তিত্বে তিনি সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। নারদ নিজেকে বিষ্ণুর পরম ভক্ত বলে মনে করেন। এবং যখন ইচ্ছে হয়, নিজের ইষ্ট দেবতাকে দর্শণ করতে চলে আসেন।
      নারদকে দেখে খুশি মনে আহবান জানালেন বিষ্ণু
      ---’ আসন গ্রহণ করুন ঋষিবর। কুশল মঙ্গল সব?’
 প্রণাম করে নারদ বললেন--’ আপনার ছত্র ছায়ায় আছি ভগবন। কোনো অনিষ্টর ক্ষমতা নেই আমাকে স্পর্শ করবার।’
স্মিত প্রশয়ের হাসি হাসলেন বিষ্ণু। কে না জানে ভক্ত হলো দেবতার বড় হাতিয়ার। যার যত ভক্ত, সে তত শক্তিশালী দেবতা।
 --’ আয়ুষ্মান ভব। তা ঋষিবর , আগমনের হেতু?’
 --’  ভগবন! এখন তো সর্বত্র প্রধান আলোচ্য বিষয়  কচ দেবযানী। সিদ্ধ সঞ্জীবনী মন্ত্রটি অপহরণ করতে সে সক্ষম হলো শেষ পর্যন্ত, এই নিয়েই নানা আলোচনা চলছে।’ বিনীত কিন্তু কৌশলী কণ্ঠে বললেন নারদ। একটু উপহাস যেন বলার ভঙ্গীতে?
---’অপহরণ? অপহরণ কেন বলছো নারদ? তোমার আস্পর্ধা তো কম নয়? বৃহস্পতি পুত্র  মন্ত্র  শিক্ষা করতে গেছে। চাতুরী করতে নয়।’
 ---’ প্রভু রুষ্ট হবেন না প্রভু। এ আমার কথা নয়। তিনলোকেই এমন কানাকানি চলছে যে, দেবতারা বড় ঘৃণিত ছলনা করেছে অসুরদের সঙ্গে। প্রভু! কি বলবো আপনাকে লজ্জার কথা, লোকে এমন কথাও বলছে যে, ভবিষ্যতে দেবযানী গভীর বিষাদে ডুবে যাবে  কচের জন্য।’
----’ তুমি থামো নারদ। দেবযানী কখনোই হার মানবে না জীবনের কাছে। সে বাঁচতে জানে। কচ স্বর্গ রাজ্যে ফিরে এলেই সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে আবার। ‘
----’ প্রভু। কি যে বলেন! ক্ষমা করবেন দেব। কচ ছলনা করেছে, কিন্তু দেবযানী নয়। সে মন সমর্পণ করেছে কচকে।
---’ শোনো নারদ। যা ঘটবার তাই ই ঘটবে। ন্যায় অন্যায় সব কিছু কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। দুঃখ বা আঘাতের প্রয়োজন আছে বই কি! দুঃখের আগুনে পুড়ে আসে পরিণত বোধ।’
---’ নারায়ণ ! নারায়ণ! প্রণাম। আপনার সান্নিধ্য আমাকে বড় আনন্দ দেয় প্রভু! এখন দাসের প্রতি কি আজ্ঞা?’
----’ কে দাস? ভক্ত কখনো দাস নয়। প্রকৃত ভক্তের দাস স্বয়ং ভগবান। সে যাই হোক, তুমি অসুর রাজ্যে যাও।  অনুপার্বিক জেনে আমাকে বলো।’
----’ যথা আজ্ঞা  প্রভু।’
*
 মহর্ষি শুক্রাচার্যের  আশ্রমে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। ঠান্ডা বাতাস বইছে। পাখিদের কূজন আর সুবাসিত পুষ্পের আয়োজনে একটি নিশ্চিন্ত ভোর নেমে এসেছে  আশ্রমের উপরে।
       আহির ভৈরবীর সুরে বীণ বাজিয়ে তন্ময় সুরে গান গাইছে কচ। ঈষৎ দূরে একটু  শুক্রাচার্য বসে আছেন নিমিলিত চোখে, শরীরে ক্লান্তির ছায়া হলেও মুখখানি প্রফুল্ল। দেবযানী হাঁটুর উপরে মুখ খানি রেখে শান্ত মনে কচের গান শুনছে। সমস্ত বাতাবরণ শান্ত, স্নিগ্ধ, সৌম্য। গতরাতে যে বিপদের ঝড় বয়ে গিয়েছিল , তার চিন্হ মাত্র আর নেই।
    গান শেষ হলে, শুক্রাচার্য আপন কক্ষে ফিরে গেলে, কচ  দেবযানীর কাছে গিয়ে,  করতলে তার মুখখানি নিয়ে বললো---
   ‘ গতকাল তোমার জন্য প্রাণ ফিরে পেলাম। তোমার জন্যই  সিদ্ধ সঞ্জীবনী  মন্ত্র শিখতে পারলাম। এখনো ভাবলে শিউরে উঠছি, কি করে গুরুদেবের উদর থেকে আমি নতুন জন্ম লাভ করলাম। ‘
   দুই হাত দিয়ে প্রিয়তমের মাথার চুল গুলি নেড়ে দিল দেবযানী। অপলক তাকিয়ে রইলো তাঁর মুখের দিকে। এমন তো নয়, যে, তাকে কেউ কোনোদিন প্রেম নিবেদন করেনি? কিন্তু এমন সারল্য , তাকে ঘিরেই স্নেহের দিনরাতের আবর্তন আর কার ছিল? কচ যখন তাকে ‘ দেবী ‘ বলে সম্বোধন করে, তার কেমন মৃতা মায়ের কথা মনে হয়। যাকে সে কোনোদিন পায়নি।
  --’ কচ !কচ! তুমি জানো না, আমার জীবনে যে সুর তুমি বাজিয়েছ, তার মূল্য কতখানি। কচ তুমি জানোনা গতকাল রাতে আমি কি ভয়ঙ্কর খেলা খেলেছি পিতার সঙ্গে, শুধু তোমার জন্য। ভালোবাসলে মানুষ সব পারে।’ অস্ফুটে নিজের মনে কথা গুলো বললো দেবযানী।
---’ দেবী! চলো কুটিরে ফিরে যাই। তুমি একটু বিশ্রাম করো। আজ পাঠে যাবো না। গুরুদেব বিশ্রাম নিক। আমি তোমার জন্য মালা গেঁথে দি।”
---’ কচ। আমার কোথায়ও যেতে ইচ্ছে করছে না। সমস্ত আতঙ্কের শেষে শরীর ভার মুক্ত। এখন এই নরম তৃণের উপরে নিজের শরীর ছেড়ে দিয়ে বেশ লাগছে।’
--’ তাহলে তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দি?’
---’ কচ। এমন কেন করছো? শান্ত হয়ে বসো। একটু অনুভব করি এসো। কেন তোমার ভালো লাগছে না মুহূর্তটি?’
---’ দেবী!  আমার তো আজ ভোরে নতুন জন্ম হলো। মনে করে দেখো, আমার ভস্মীভূত শরীর সুরার সঙ্গে পান করেছেন গুরুদেব। এবার যদি তিনি সিদ্ধ সঞ্জীবনীর জোরে আমাকে বাঁচাতে যান , তবে তাঁর পেট চিরে আমাকে বেরোতে হবে। অর্থাৎ গুরুদেব মৃত্যু না হলে আমি বাঁচবো না।’
---’ পিতাও সে কথাই বলেছিলেন কচ। প্রশ্ন করেছিলেন যে পিতা না প্রেমিক -- দুজনের মধ্যে কাকে চাই আমি!’ কচের কোলে নিজের ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়ে দেবযানী বললো। এক রাতেই তাঁর পরিবর্তন লক্ষণীয়। চপলা কিশোরী থেকে পরিণত নারী যেন আজ সে। সস্নেহে দেবযানীর কপোল চুম্বন করে কচ বলে--
  -’ বুঝতে পারছি তোমার সংকট’
দেবযানী যেন শুনতেই পেলনা কচের কথা। দুরাগত পাখির শিষের মতো গলায় বলে গেল--
  ‘ আমি চিৎকার করে বললাম , দুজনকেই চাই পিতা। দুজনকেই চাই। কঠিন গলায় পিতা বললেন একজন দেবযানী। মাত্র একজন।’ চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল নেমে এলো বলতে বলতে
---’ কি অসহায় অবস্থা আমার। বুকটা যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। হাল ছেড়ে দিয়ে পিতার মুখের দিয়ে তাকিয়ে বসে রইলাম। পিতা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে উঠলেন। হাতে মন্ত্রপূতঃ জল নিয়ে সেই কাজ করলেন, যা কেবল মাত্র একজন পিতাই করতে পারেন।’
---’ জানি দেবী। আমি তখন গুরুদেবের উদরে। তাঁর সঞ্জীবনী মন্ত্রের প্রভাবে জ্ঞান চোখ মেলেছি সেখানেই। কিন্তু সেই শরীর তখন সূক্ষ্ম। যদি বেরোতে চাই, মারা পড়বেন গুরুদেব। সে কথা টি খুব সংকোচে জানাতে গুরুদেব আমাকে দান করলেন সিদ্ধ সঞ্জীবনী মন্ত্র। ‘ বলতে বলতে দু হাত উপরে তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াল কচ, ঊর্ধ্বমুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবাবেগে বলতে লাগলো
--’ আমি সমস্ত মন প্রাণ দিয়ে অপরাজেয় ওই মন্ত্র শিক্ষা করলাম। বার বার মনন করলাম। তারপর গুরুর উদর ছিন্ন করে বাইরে এসে, মন্ত্রের প্রথম পরীক্ষা করলাম গুরুদেবের মৃত দেহের উপর।’
     উত্তেজিত কচ স্থান কাল পাত্র ভুলে আকাশপানে দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল-
---’আশ্চর্য আশ্চর্য। আমি মন্ত্র প্রয়োগ করা মাত্র গুরুদেব বেঁচে উঠলেন। ওহঃ, কি আনন্দ। কি আনন্দ। মৃত শরীর প্রাণ পেল। আমি পারলাম সেই অসম্ভব সম্ভব করতে। আমার সব পরিশ্রম সফল। এবার ফিরে যাব স্বর্গরাজ্যে।’
---’ কচ!!’ তীর বেগে উঠে দাঁড়ালো দেবযানী, নিজের কানকে বিশ্বাস না করে,  বিস্ফারিত দুই চোখ টান করে চিৎকার করে বললো সে---’ ফিরে যাবে? কোথায় ফিরে যাবে? কি বলছো তুমি? আমরা বিবাহ করবো এবার কচ। ‘
---’বিবাহ? সে তো সম্ভব নয় দেবী। গুরু কন্যা তুমি। সর্বোপরি, গতকাল গুরু শুক্রাচার্যের উদর হতে পুনর্জন্ম হয়েছে আমার। সেই হিসেবে আমরা ভাই বোন। বিবাহের তো প্রশ্নই নেই।’

   এতক্ষণ আড়ালে দাঁড়িয়ে এই নাটকটি দেখছিলেন দেবর্ষি নারদ। দেবযানীর দিকে তাকিয়ে সমস্ত দেবতা জাতের উপর ক্রোধে জ্বলছিল তাঁর সর্ব অঙ্গ। তিনি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। তীব্র বেগে স্বর্গের দিকে পলায়ন করলেন।  প্রত্যাখ্যাতা নারী বিষধর সাপের চাইতেও ভয়ঙ্কর। নারদ কি ভয় পেলেন? অভিজ্ঞ ঋষি জানেন, নারী যেমন সর্বস্ব দেয়, তেমনি সর্বস্বান্ত করেও দিতে পারে। পরিণতির ভয়ঙ্কর ফলাফলকে স্বর্গের নিরাপদ স্থানে বসে দেখাই ভালো।

  পর্ব -৬
---------------------
        ‘ নারায়ণ নারায়ণ’ বলতে বলতে নারদ হাজির বিষ্ণুলোকে। স্বর্গ মর্ত্য পাতাল তিনলোকে নারদ , যেখানে যখন মন চায় পৌঁছে যান। তিনি হলেন সবজান্তা ঋষি। তিনলোকের সব গোপন খবর তাঁর ঝুলিতে মজুত। তবে শিবলোকে নারদ ঘেঁষেন না। ওই ভোলানাথকে তিনি সমীহ করেন। ভূত প্রেত , বদমেজাজী নন্দী ভৃঙ্গি নিয়ে সপরিবারে বাস দেবের দেব মহাদেব স্বর্গের ধার ধারেন না । বেশির ভাগ সময় গভীর তপস্যায় মগ্ন থাকেন। যে যুদ্ধে দেবতারা একেবারে গো হারান হেরে যান, সেখানে তিনি ত্রাতা রূপে উপস্থিত হবেন, নিজের ভয়ঙ্কর ত্রিশূল নিয়ে। এবং, সে যুদ্ধে জয় অনিবার্য। ওখানে নারদ ঘেঁষেন না। কে জানে কখন তৃতীয় নয়নের আগুন দিয়ে ভস্ম করে দেন। আসলে যেখানে কপটতা নেই, সেই স্থানে একটু সামলে চলাই ভালো।
  বিষ্ণুলোক স্বর্গের সবচেয়ে সুন্দর স্থান। দেবরাজ ইন্দ্রের সভায় ঐশ্বর্যের আড়ম্বর বেশি, কিন্তু বিষ্ণুলোক , লক্ষীর হাতের ছোঁয়াতে সৌন্দর্য ও সুরুচির প্রকাশে অপরূপ। ব্যক্তির নিজের বিভা স্থান কে মহত্ব পূর্ণ করে তোলে। শ্রী বিষ্ণু , একজন ধী যুক্ত দেবতা। জ্ঞান, বুদ্ধি, ব্যক্তিত্বে তিনি সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। নারদ নিজেকে বিষ্ণুর পরম ভক্ত বলে মনে করেন। এবং যখন ইচ্ছে হয়, নিজের ইষ্ট দেবতাকে দর্শণ করতে চলে আসেন।
      নারদকে দেখে খুশি মনে আহবান জানালেন বিষ্ণু
      ---’ আসন গ্রহণ করুন ঋষিবর। কুশল মঙ্গল সব?’
 প্রণাম করে নারদ বললেন--’ আপনার ছত্র ছায়ায় আছি ভগবন। কোনো অনিষ্টর ক্ষমতা নেই আমাকে স্পর্শ করবার।’
স্মিত প্রশয়ের হাসি হাসলেন বিষ্ণু। কে না জানে ভক্ত হলো দেবতার বড় হাতিয়ার। যার যত ভক্ত, সে তত শক্তিশালী দেবতা।
 --’ আয়ুষ্মান ভব। তা ঋষিবর , আগমনের হেতু?’
 --’  ভগবন! এখন তো সর্বত্র প্রধান আলোচ্য বিষয়  কচ দেবযানী। সিদ্ধ সঞ্জীবনী মন্ত্রটি অপহরণ করতে সে সক্ষম হলো শেষ পর্যন্ত, এই নিয়েই নানা আলোচনা চলছে।’ বিনীত কিন্তু কৌশলী কণ্ঠে বললেন নারদ। একটু উপহাস যেন বলার ভঙ্গীতে?
---’অপহরণ? অপহরণ কেন বলছো নারদ? তোমার আস্পর্ধা তো কম নয়? বৃহস্পতি পুত্র  মন্ত্র  শিক্ষা করতে গেছে। চাতুরী করতে নয়।’
 ---’ প্রভু রুষ্ট হবেন না প্রভু। এ আমার কথা নয়। তিনলোকেই এমন কানাকানি চলছে যে, দেবতারা বড় ঘৃণিত ছলনা করেছে অসুরদের সঙ্গে। প্রভু! কি বলবো আপনাকে লজ্জার কথা, লোকে এমন কথাও বলছে যে, ভবিষ্যতে দেবযানী গভীর বিষাদে ডুবে যাবে  কচের জন্য।’
----’ তুমি থামো নারদ। দেবযানী কখনোই হার মানবে না জীবনের কাছে। সে বাঁচতে জানে। কচ স্বর্গ রাজ্যে ফিরে এলেই সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে আবার। ‘
----’ প্রভু। কি যে বলেন! ক্ষমা করবেন দেব। কচ ছলনা করেছে, কিন্তু দেবযানী নয়। সে মন সমর্পণ করেছে কচকে।
---’ শোনো নারদ। যা ঘটবার তাই ই ঘটবে। ন্যায় অন্যায় সব কিছু কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। দুঃখ বা আঘাতের প্রয়োজন আছে বই কি! দুঃখের আগুনে পুড়ে আসে পরিণত বোধ।’
---’ নারায়ণ ! নারায়ণ! প্রণাম। আপনার সান্নিধ্য আমাকে বড় আনন্দ দেয় প্রভু! এখন দাসের প্রতি কি আজ্ঞা?’
----’ কে দাস? ভক্ত কখনো দাস নয়। প্রকৃত ভক্তের দাস স্বয়ং ভগবান। সে যাই হোক, তুমি অসুর রাজ্যে যাও।  অনুপার্বিক জেনে আমাকে বলো।’
----’ যথা আজ্ঞা  প্রভু।’
*
 মহর্ষি শুক্রাচার্যের  আশ্রমে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। ঠান্ডা বাতাস বইছে। পাখিদের কূজন আর সুবাসিত পুষ্পের আয়োজনে একটি নিশ্চিন্ত ভোর নেমে এসেছে  আশ্রমের উপরে।
       আহির ভৈরবীর সুরে বীণ বাজিয়ে তন্ময় সুরে গান গাইছে কচ। ঈষৎ দূরে একটু  শুক্রাচার্য বসে আছেন নিমিলিত চোখে, শরীরে ক্লান্তির ছায়া হলেও মুখখানি প্রফুল্ল। দেবযানী হাঁটুর উপরে মুখ খানি রেখে শান্ত মনে কচের গান শুনছে। সমস্ত বাতাবরণ শান্ত, স্নিগ্ধ, সৌম্য। গতরাতে যে বিপদের ঝড় বয়ে গিয়েছিল , তার চিন্হ মাত্র আর নেই।
    গান শেষ হলে, শুক্রাচার্য আপন কক্ষে ফিরে গেলে, কচ  দেবযানীর কাছে গিয়ে,  করতলে তার মুখখানি নিয়ে বললো---
   ‘ গতকাল তোমার জন্য প্রাণ ফিরে পেলাম। তোমার জন্যই  সিদ্ধ সঞ্জীবনী  মন্ত্র শিখতে পারলাম। এখনো ভাবলে শিউরে উঠছি, কি করে গুরুদেবের উদর থেকে আমি নতুন জন্ম লাভ করলাম। ‘
   দুই হাত দিয়ে প্রিয়তমের মাথার চুল গুলি নেড়ে দিল দেবযানী। অপলক তাকিয়ে রইলো তাঁর মুখের দিকে। এমন তো নয়, যে, তাকে কেউ কোনোদিন প্রেম নিবেদন করেনি? কিন্তু এমন সারল্য , তাকে ঘিরেই স্নেহের দিনরাতের আবর্তন আর কার ছিল? কচ যখন তাকে ‘ দেবী ‘ বলে সম্বোধন করে, তার কেমন মৃতা মায়ের কথা মনে হয়। যাকে সে কোনোদিন পায়নি।
  --’ কচ !কচ! তুমি জানো না, আমার জীবনে যে সুর তুমি বাজিয়েছ, তার মূল্য কতখানি। কচ তুমি জানোনা গতকাল রাতে আমি কি ভয়ঙ্কর খেলা খেলেছি পিতার সঙ্গে, শুধু তোমার জন্য। ভালোবাসলে মানুষ সব পারে।’ অস্ফুটে নিজের মনে কথা গুলো বললো দেবযানী।
---’ দেবী! চলো কুটিরে ফিরে যাই। তুমি একটু বিশ্রাম করো। আজ পাঠে যাবো না। গুরুদেব বিশ্রাম নিক। আমি তোমার জন্য মালা গেঁথে দি।”
---’ কচ। আমার কোথায়ও যেতে ইচ্ছে করছে না। সমস্ত আতঙ্কের শেষে শরীর ভার মুক্ত। এখন এই নরম তৃণের উপরে নিজের শরীর ছেড়ে দিয়ে বেশ লাগছে।’
--’ তাহলে তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দি?’
---’ কচ। এমন কেন করছো? শান্ত হয়ে বসো। একটু অনুভব করি এসো। কেন তোমার ভালো লাগছে না মুহূর্তটি?’
---’ দেবী!  আমার তো আজ ভোরে নতুন জন্ম হলো। মনে করে দেখো, আমার ভস্মীভূত শরীর সুরার সঙ্গে পান করেছেন গুরুদেব। এবার যদি তিনি সিদ্ধ সঞ্জীবনীর জোরে আমাকে বাঁচাতে যান , তবে তাঁর পেট চিরে আমাকে বেরোতে হবে। অর্থাৎ গুরুদেব মৃত্যু না হলে আমি বাঁচবো না।’
---’ পিতাও সে কথাই বলেছিলেন কচ। প্রশ্ন করেছিলেন যে পিতা না প্রেমিক -- দুজনের মধ্যে কাকে চাই আমি!’ কচের কোলে নিজের ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়ে দেবযানী বললো। এক রাতেই তাঁর পরিবর্তন লক্ষণীয়। চপলা কিশোরী থেকে পরিণত নারী যেন আজ সে। সস্নেহে দেবযানীর কপোল চুম্বন করে কচ বলে--
  -’ বুঝতে পারছি তোমার সংকট’
দেবযানী যেন শুনতেই পেলনা কচের কথা। দুরাগত পাখির শিষের মতো গলায় বলে গেল--
  ‘ আমি চিৎকার করে বললাম , দুজনকেই চাই পিতা। দুজনকেই চাই। কঠিন গলায় পিতা বললেন একজন দেবযানী। মাত্র একজন।’ চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল নেমে এলো বলতে বলতে
---’ কি অসহায় অবস্থা আমার। বুকটা যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। হাল ছেড়ে দিয়ে পিতার মুখের দিয়ে তাকিয়ে বসে রইলাম। পিতা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে উঠলেন। হাতে মন্ত্রপূতঃ জল নিয়ে সেই কাজ করলেন, যা কেবল মাত্র একজন পিতাই করতে পারেন।’
---’ জানি দেবী। আমি তখন গুরুদেবের উদরে। তাঁর সঞ্জীবনী মন্ত্রের প্রভাবে জ্ঞান চোখ মেলেছি সেখানেই। কিন্তু সেই শরীর তখন সূক্ষ্ম। যদি বেরোতে চাই, মারা পড়বেন গুরুদেব। সে কথা টি খুব সংকোচে জানাতে গুরুদেব আমাকে দান করলেন সিদ্ধ সঞ্জীবনী মন্ত্র। ‘ বলতে বলতে দু হাত উপরে তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াল কচ, ঊর্ধ্বমুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবাবেগে বলতে লাগলো
--’ আমি সমস্ত মন প্রাণ দিয়ে অপরাজেয় ওই মন্ত্র শিক্ষা করলাম। বার বার মনন করলাম। তারপর গুরুর উদর ছিন্ন করে বাইরে এসে, মন্ত্রের প্রথম পরীক্ষা করলাম গুরুদেবের মৃত দেহের উপর।’
     উত্তেজিত কচ স্থান কাল পাত্র ভুলে আকাশপানে দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল-
---’আশ্চর্য আশ্চর্য। আমি মন্ত্র প্রয়োগ করা মাত্র গুরুদেব বেঁচে উঠলেন। ওহঃ, কি আনন্দ। কি আনন্দ। মৃত শরীর প্রাণ পেল। আমি পারলাম সেই অসম্ভব সম্ভব করতে। আমার সব পরিশ্রম সফল। এবার ফিরে যাব স্বর্গরাজ্যে।’
---’ কচ!!’ তীর বেগে উঠে দাঁড়ালো দেবযানী, নিজের কানকে বিশ্বাস না করে,  বিস্ফারিত দুই চোখ টান করে চিৎকার করে বললো সে---’ ফিরে যাবে? কোথায় ফিরে যাবে? কি বলছো তুমি? আমরা বিবাহ করবো এবার কচ। ‘
---’বিবাহ? সে তো সম্ভব নয় দেবী। গুরু কন্যা তুমি। সর্বোপরি, গতকাল গুরু শুক্রাচার্যের উদর হতে পুনর্জন্ম হয়েছে আমার। সেই হিসেবে আমরা ভাই বোন। বিবাহের তো প্রশ্নই নেই।’

   এতক্ষণ আড়ালে দাঁড়িয়ে এই নাটকটি দেখছিলেন দেবর্ষি নারদ। দেবযানীর দিকে তাকিয়ে সমস্ত দেবতা জাতের উপর ক্রোধে জ্বলছিল তাঁর সর্ব অঙ্গ। তিনি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। তীব্র বেগে স্বর্গের দিকে পলায়ন করলেন।  প্রত্যাখ্যাতা নারী বিষধর সাপের চাইতেও ভয়ঙ্কর। নারদ কি ভয় পেলেন? অভিজ্ঞ ঋষি জানেন, নারী যেমন সর্বস্ব দেয়, তেমনি সর্বস্বান্ত করেও দিতে পারে। পরিণতির ভয়ঙ্কর ফলাফলকে স্বর্গের নিরাপদ স্থানে বসে দেখাই ভালো।

     ( ক্রমশঃ)

হে শহুরে বাবু - রুচিরা দেওয়ান

যাই হোক সাজেকের অভিজ্ঞতা আর একটু শেয়ার করি । (ন্ হালিলে ভিলে দুধও হেই ন পায়)  । যখন আমার গন্তব্যস্থলে পৌঁছালাম প্রায় অন্ধকার হয়ে আসছে । কারণ বৃষ্টির কালো মেঘ  সাথে থেমে থেমে বৃষ্টি । ( দেরী এজন্য আমারর রথ দেখা আর কলা বেচা । দিঘীনালায় থেমেছি ৩ ঘন্টার মত । কারণ মামা বাড়ী + নানি অসুস্থ তাকেও দেখা)   ঠিক সে সময় দু'জন ঢাকায়া ছেলে বলে উঠলো এই সময়েও বেড়াতে আসে !!  আমি বললাম এখানেই রাতে থাকবো । ওরা অবাক !!  কোথায় থাকবেন।?  বললাম দেখে যেতে পারেন । ওরা রুমের ভাড়া শুনে যত না অবাক তারচেয়ে আরো বেশী অবাক হ্যাডম্যান বাবু'র মেয়ের জামাইয়ের পেটানো শরীর দেখে !!  ওহ্ দাদা কিভাবে এই বডি বানালেন ?  আমরাতো ফার্মের মুরগী হয়ে গেছি । অনেক চেষ্টা করেও পারছি না 😃😃 আসলেই ওদের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে চিন্তা করে দেখলাম  লম্বা একহারা গড়ন পেটানো শরীর ।ওদের লোভি বা কেন হবে না !!  সাজেকবাসীর  আগে বাজারে যেতেই লাগত দু'দিন । এখন রাস্তা হওয়ার কারণে দিনের ভিতরেই ফিরতে পারে । আগে যে কলার ছড়া বিক্রি করতো ১ দিনের পথ হেঁটে ২০ টাকায় সে কলা এখন বাড়ীর কাছেই বিক্রি করছে জোড়া ৫ টাকায় । আসার সময় ছোট এক ছেলেকে সঙ্গে পাঠিয়ে ছিলো আমার ব্যাগ আর তাদের দেওয়া জুমের চাল ৪ কেজির মত সেগুলো পৌঁছে দিয়ে যাবে । ফেরার সময় কথা হলো তারর সাথে । কথা বলার শুরুতেই তোতলামি শুরু হয় তার । মা বাবা নাই। থাকে দাদু'র সাথে। কাজ করে রিসোর্টে  বাসন মাজা + বোর্ডারদের খাবার পৌঁছে দেওয়া।  ভালোই টাকা পায় । যখন পৌঁছালাম আমি দিলাম ১০ টাকা। না সে বললো ৫০ টাকা দিতে হবে। অথচ তাকে বলা হয়েছে টাকা না নিতে 😃 ।
এভাবে বিভিন্নভাবে টাকা কামানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে অনেকের । একজনকে দেখলাম ছোট ছোট বাঁশের লাঠি বিক্রি করছে ।
সাজেক বললে অনেকে রাগে লাফায় । ওদের রাগের কারণটাও ঠিক উপরে উপরে অনেক কিছু দেখা যায় কিন্তু বাস্তব উপলদ্ধি অনেক কঠিন ।  শহুরে বাবু সুইচ টিপলে বাতি জ্বলে, ঠান্ডা সুপেয় পানি পাওয়া যায়। হয়তো দেখা গেলো এক গ্লাস পানি নিজ হাতে ঢেলেও খেতে হয় না। কাজের লোক  অথবা মা অথবা বউ করে দিচ্ছে । বর্ষাকালটা খুব আরামে কাটে সাজেক বাসীর । যখন পানি অনেক নীচে নেমে ঝর্ণা থেকে সংগ্রহ করা লাগে তখনি  পানির কষ্ট কাকে বলে বুঝা যায় । একটা কাল্লোংয়ে( বেতের তৈরী যেগুলো রশি পেঁচিয়ে মাথায় করে জিনিসপত্র আনা নেওয়া করে পাহাড়বাসী) ২টা কলসি একসাথে নিয়ে আসে । আমাকে বললো, এভাবে এতবড় পাহাড় বেয়ে কতবার আনা যায় ?
হে শহুরে বাবু,  আপনি রাস্তায় বেরুলেই গাড়ী, নদী পথে গেলে স্পীড বোট,  দূরে কোথাও বেরাতে গেলে এসি গাড়ী, বাজার ঘরের দুয়ারে । সেই তুমি কি ওদেরকে আমৃত্যু পায়ে হেঁটে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে বলবে ??   অসুস্থ হলেও কাজ করে যেতে হয় । আমি আমরা হলে বিছানা থেকেও নড়তে পারতাম না। আর কতো বন্ধু  be  practical ,,,,

Wednesday, October 18, 2017

শুভ জন্মদিন ভাইয়া- সুমি খান

".....ছিলাম রে, কতোই আশা লইয়া, ভাই না আইলো , আমার পরান গেলো জ্বইলা ..."
.বাবার অবর্তমানে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পরিবারের প্রধান। বাবার বর্তমানে ও অামার বড় ভাই পরিবারের সবকিছুতে সব দায়িত্ব অাগ বাড়িয়ে নিয়েছে। অসীম স্নেহ ভালোবাসায় অাগলে রেখেছে পরিবারের সকলকে। নিজের কর্মপরিসর, পরিবারের দায়িত্বের বাইরেও মায়ের প্রতিটি কাজ, সামাজিকতা, মানবসেবার নেপথ্যে যাদের পূর্ণ সহযোগিতা প্রধান ভূমিকা রাখছে, তারা অামার দু'টি ভাই। পরিবারের বড়ো সন্তান হিসেবে ভাইয়া তার কর্মজীবনের শুরুতে, একেবারে অল্প বয়সেই অবলীলায় অামার অনেক দায়িত্ব তার মাথায় নিয়েছিলো। তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে অামার অনেক অাদরের ছোট ভাইটি ও। ভাবতে ভীষণ ভালো লাগে, অামার দু'টি ভাই কর্মসূত্রে যতো দূরেই থাকুক, এতোটাই বড়ো মন নিয়ে প্রতিটি সমস্যা, সংকটে, অানন্দে পরিবারের ভেতরের বাইরের প্রতিটি সদস্যদের পাশে থাকে, যার কোন তুলনা কোথাও নেই। তাই মনে মরে স্মৃতিচারণ করি অাশৈশব বেড়ে ওঠার কথকতা.....সেসব অারেকদিন লিখবো।অাজ বলি, বিয়ের পর অনেক দিন দেখিনি তোমাকে। খুব মিস করতাম ভাইয়া তোমাকে, এখনো অনেক মিস করি তোমাদের!। তখন সন্ধ্যার অাকাশের চাঁদের দিকে তাকালেই বাপের বাড়ির জন্য মন কেমন করতো! ভাইদের জন্যে খুব প্রাণ কাঁদতো। বাঙালী বোনদের মনের কথার গীতিকার মীরা দেব বর্মনের কালজয়ী গানটা গাইতাম, " কে যাস রে, ভাটি গাঙ বাইয়া, অামার ভাইধনরে কইও নাইওর নিত বইলা.... সুজন মাঝি রে, ভাইরে কইও গিয়া, না অাসিলে স্বপনেতে দেখা দিত বইলা.....! " ভাইয়া, অাজ তোমার জন্মদিন, শুভ হোক এই দিন। অনেক ভালো থেকো !  কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি -যেমন দিয়ে যাচ্ছো তোমার নীরব সেবা, শতায়ু হয়ে তার শতগুণ যেন তোমার জন্যে ফিরে পাও!

Tuesday, October 3, 2017

কী করে কার্টুনিস্ট হয়ে উঠলেন ঋতুপর্ণ বসু

ঋতুপর্ণ বসু। এই সময়ের শক্তিশালী কার্টুন-শিল্পী পেশায় শিক্ষক । তাঁর আত্মজীবনীতে কার্টুনিস্ট  ওঠার গল্প বললেন এই প্রথিত যশা শিল্পী।  পশ্চিমবঙ্গের উদ্ভাস পত্রিকায় প্রকাশিত  এ আত্মজীবনী  নতুন প্রজন্মে অনুপ্রাণিত এবং উজ্জীবিত হবার প্রয়াসে কার্টুনিস্ট ঋতুপর্ণ বসুর অনুমতিতে অন্যদৃষ্টিতে এই আত্মজীবনী প্রকাশিত হলো।  উদ্ভাসের কাছে অন্যদৃষ্টির আন্তরিক  কৃতজ্ঞতা ।

"খুব ছেলেবেলা থেকেই যে জিনিসটা সবচেয়ে ভাল পারতাম তা হল ছবি আঁকা। বেশ মনে আছে চক হাতে নিয়ে বাড়ির মেঝেগুলি হামাগুড়ি দিয়ে নানান আঁকিবুকিতে ভরিয়ে তুলছি।



 আমার উৎসাহ দেখে মেঝেতে এক-একটি অবয়ব এঁকে দিতেন আমার বাবা। সেই অবয়বগুলি রপ্ত করে ফেলতে আমার বেশি সময় লাগত না। এরপর চলল বড়দের মতো কলম বাগিয়ে খাতার উপর অপটু হাতে শিল্পচর্চা। অনেক সময় দরকারী কাগজ বা অফিসের কাগজেও ফুটে উঠত এই ‘শিল্পচর্চার  নিদর্শন।


ছবি আঁকতে আঁকতে আমার অনেক সময় কেটে যেত। স্কুলের পাঠ্যবইয়ের পাতায় পাতায় — নোটবইয়ের এখানে সেখানে অগোছালোভাবে কত যে ড্রয়িং করেছি তার হিসাব নেই।তবে নিজের এই ভগবানদত্ত গুণটির প্রতি যতটা সিরিয়াস হওয়া উচিত ছিল ও চর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা উচিৎ ছিল তার কোনোটাই হয়নি।
যাদুকর পি সি সরকারের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন

 এরপর স্কুল পাশ করে কলেজ, কলেজের গণ্ডি পার করে বিশ্ববিদ্যালয় — বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্ব শেষ হতে না হতেই শিক্ষকতার চাকরিতে প্রবেশ।

এই দীর্ঘ ছাত্রজীবনে না করতে পেরেছি নিজের সহজাত শিল্পীসত্ত্বার প্রতি কোনো সুবিচার — না হয়েছে শিল্পী বা শিল্প জগতের সঙ্গে কোনো সংস্রব। এমনকি আর্ট কলেজে ঢোকার কথাও মনে হয়নি কখনও।

 সদ্য চাকরিতে ঢুকে জীবনযাপনের অনিশ্চয়তা যখন অনেকটা কেটে গেছে — তখন নিজের ভাললাগার ব্যাপারগুলো নিয়ে চর্চা করার একটা আগ্রহ তৈরি হয়।  শুরু করলাম বই কেনা — বিশেষতঃ কমিক্স ও চিত্রশিল্প সম্পর্কিত। যাতায়াত শুরু হল বিভিন্ন চিত্র-প্রদর্শনীতে।


বই ও পত্রপত্রিকায় ইলাস্ট্রেশন দেখা, কমিক্স নিয়ে নিজের কৌতুহল মেটানো ও কার্টুন নিয়ে চর্চা করাটা মূলতঃ ওই সময় থেকেই আরম্ভ। এই প্রক্রিয়াগুলি এমনই যে একবার শুরু হলে আর থামার ব্যাপার নেই। তাই এই বিষয়গুলি আজও সমানভাবে আমার মনের খোরাক জুগিয়ে চলেছে।


বই আমি খুবই ভালবাসি এবং বিশেষতঃ কার্টুনের ওপর বই সংগ্রহ করাটা আমার নেশা। তবে বই জমতে জমতে এখন স্থান সংকুলানের সমস্যা বেশ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।


 আমার বাবা আমাকে বলেছিলেন ‘তুই নিয়মিতভাবে ভালো ভালো এইসব একজিবিশন, সেমিনার বা ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করার চেষ্টা করবি। তাতে সমমানসিকতাসম্পন্ন লোকজনদের সাথে তোর যোগাযোগ গড়ে উঠবে — একটা ভাল সার্কেলের মধ্যে তুই চলে যেতে পারবি।’


বাবার কথাটা বেশ তাড়াতাড়িই ফলে গেল কারণ সিগাল আর্টস এন্ড মিডিয়া রিসোর্স সেন্টারে ‘রে সোসাইটি’ আয়োজিত একটি সেমিনারে আলাপ হয়ে গেল বিশ্বদেব গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে। নামটির সঙ্গে পরিচিতি আগেই ছিল কারণ বিশ্বদেববাবুর সহ-সম্পাদনায় বেরোতে শুরু করেছে একের পর এক দুরন্ত কাজ রঙ্গ ব্যঙ্গ রসিকেষু পত্রিকার ব্যানারে।


কাফী খাঁ, রেবতীভূষণ, অহিভূষণ মালিক, শৈল চক্রবর্তী ইত্যাদি সংখ্যা আমাদের দেশে কার্টুন ডকুমেন্টেশনের ক্ষেত্রে এক একটা মাইলফলক।


 কার্টুনপ্রেমী ও সংগ্রাহক বিশ্বদেববাবু অচিরেই হয়ে উঠলেন আমার অগ্রজপ্রতিম। ওনাকে একসময় জানালাম আমার কার্টুন আঁকার ইচ্ছের কথাটা। উনি সানন্দে রঙ্গ ব্যঙ্গ রসিকেষু পত্রিকায় কার্টুন আঁকার জন্য প্রস্তাব দিলেন।


২০০৩ সালে উক্ত পত্রিকায় আমার প্রথম কার্টুন ছাপা হয়। এক বিশাল মুখব্যাদানকারী সিংহের পেটে চলে যাচ্ছে অসংখ্য লিলিপুট আকারের শিক্ষিত যুবক। কার্টুনটির বিষয় ছিল ‘বেকারত্ব’। প্রথম কার্টুনটি ছাপা হবার পর দ্বিগুণ উৎসাহে শুরু করলাম রঙ্গ ব্যঙ্গ রসিকেষু পত্রিকায় ইলাস্ট্রেশন ও প্রচ্ছদ। এই সূত্রে আবার শুরু হয়ে গেল ছবি আঁকা প্র্যাক্টিস করা — তবে এবার একটু সিরিয়াসভাবে।


ভাল মানের তুলি, রং, নিব ও কালি কিনে ড্রয়িং অভ্যাস, ব্রাশ টানা, ক্রোকুইলের ব্যবহার — এই সমস্ত ব্যাপার নিয়ে উঠে পড়ে লাগলাম। স্বশিক্ষার মাধ্যমে চিত্রবিদ্যা আয়ত্ত্ব করার এই প্রক্রিয়া যেন ছিল মহাভারতের একলব্যের একক প্রয়াসের মত। যে কোন সাধনাই গুরু ছাড়া অসম্পূর্ণ থাকে।

 আমার ক্ষেত্রে দ্রোণাচার্যের জায়গাটি নিয়েছিলেন স্বনামধন্য শিল্পী দেবাশীষ দেব। তখনও পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিগত যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি তার সঙ্গে। কলেজে পড়ার সময় থেকেই দেবাশীষ দেবের ছবি খুব আকর্ষণ করত। পরে যখন নতুন করে ফিরে এল ছবি আঁকার অভ্যাস তখন বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, সংবাদপত্র বা বইতে প্রকাশিত দেবাশীষ দেবের আঁকা ছবিগুলি আমাকে পথ দেখিয়েছিল।শেখার তাগিদে আমি ওনার ছবিগুলিকে একধার থেকে নকল করতে আরম্ভ করেছিলাম। ওর আঁকাগুলি আমার কাছে যেন Training Manual এর অংশ।


দেবাশীষ দেবের ড্রয়িং, কম্পোজিশন, রং চাপানো, লেটারিং সব কিছু খুব মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে গেছি বারবার। এখনও করি। দেবাশীষ দেবের সাথে আলাপ করি জীবনানন্দ সভাগৃহে ‘শিশুসাহিত্যে অলঙ্করণ’ বিষয়ক একটি সেমিনারে। দেবাশীষ দেব অত্যন্ত মিশুকে ও বন্ধুবৎসল — কারণ এক লহমায় আমার মত গোটানো স্বভাবের মানুষকে বেশ আপন করে নিলেন। তাঁর সান্নিধ্য আমার ছবি আঁকার কাজে আরও গতি এনে দিল। একটু অনিয়মিতভাবে হলেও ওঁর বাড়িতে যাতায়াত শুরু হল। গোড়ায় ওঁকে সম্বোধন করতাম দেবাশীষবাবু বলে;  পরে সেটা দেবাশীষ'দা হয়ে গেল।আমার আঁকা ওনাকে দেখাতাম — উনি ভুলত্রুটি গুলি সংশোধন করে দিতেন — প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতেন। ওঁর কাজ দেখে ও কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি।

২০০৭ সালে কলকাতা বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গণের বাইরের মাঠে। বাঙালির অত সাধের বইমেলা তখন ঠাঁইনাড়া হয়ে স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে বেড়াচ্ছে। মিলনমেলায় তখনও সে থিতু হয়নি।

মনে আছে সেই ২০০৭-এর বইমেলায় বেশ কিছু স্টলে গিয়ে প্রকাশক ও লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের সাথে যোগাযোগ করে নিজের পোর্টফোলিও দেখাই। তেমন কোন সাড়া পাইনি। ব্যতিক্রম কেবলমাত্র এখন বিসংবাদ নামে একটি পত্রিকার স্টল। আমি আগেই দেখেছিলাম ওনারা পত্রিকার বেশিরভাগ প্রচ্ছদেই একটা বড় কার্টুন ছাপান।

 আমি সরাসরি অ্যাপ্রোচ করি ওঁদের কাছে। সম্পাদক বাসুদেব ঘটক শুধু কার্টুন ভালবাসেন তাই নয় — শিল্পমাধ্যম হিসাবে কার্টুনের প্রচার ও প্রসারে তাঁর ঐকান্তিক আগ্রহ। সেই যে এখন বিসংবাদ পত্রিকার সাথে যোগাযোগ শুরু হল তা দিনে দিনে আরও গভীর হয়েছে।

২০০৭ থেকে ২০১৬ — নয় নয় করে অনেক প্রচ্ছদই আঁকার সুযোগ পেয়েছি। এখন বিসংবাদ পত্রিকাকে কৃতিত্ব দিতে হবে আমার কার্টুনচর্চার ধারাবাহিকতাকে অব্যাহত রাখার জন্য। এই ২০০৭ সালের বইমেলাতেই আত্মপ্রকাশ করে বিষয় কার্টুন পত্রিকা। যাকে বলা যায় চলতি সময়ের কার্টুন বিষয়ক একমাত্র পত্রিকা।

বিশ্বদেব গঙ্গোপাধ্যায়ের সুযোগ্য সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকাটি আজ মানুষের কাছে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। পথচলা শুরু হয়েছিল কার্টুনিস্ট কুট্টিকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। তারপর একে একে যতীন সেন, হার্জ, রেবতীভূষণ, সমর দে, ময়ূখ চৌধুরী, খালেদ চৌধুরী ও প্রতুল মুখোপাধ্যায় সংখ্যা বের হয়েছে। এই পত্রিকার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকতে পেরে খুব ভাল লাগে।

২০১২ সালে যে ঘটনাটি ঘটে তা আমার কাছে বেশ অভূতপূর্ব। প্রকাশক সুমন্ত বিশ্বাসের ‘ঠিক ঠিকানা’-র প্রথম বই পরিবর্তন আদতে কার্টুনেরই বই। বইটি আদ্যোপান্ত রাজনৈতিক এবং এর সব কার্টুনই আমার আঁকা। প্রকাশিত হয়েছিল ‘আরবি’ ছদ্মনামে।

 সাবেক বাম আমল ও নবাগত পরিবর্তিত সরকারের কর্মকাণ্ডের তুলনা করা হয়েছে কার্টুনের মাধ্যমে। এর সুন্দর ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন অধ্যাপক শুভেন্দু দাশগুপ্ত।


শুভেন্দুদার কথা একটু বিশদে আলোচনা না করলেই নয়। অর্থনীতির প্রাক্তন অধ্যাপক এই সুভদ্র মানুষটির ভালবাসার বিষয় তথা গবেষণার বিষয় হল কার্টুন। কার্টুন সংগ্রাহক থেকে এঁর উত্তরণ ঘটেছে কার্টুন-সংগঠকের ভূমিকায়। ২০১৩ সালে শুভেন্দুদার উদ্যোগে কলকাতার নামী, অনামী সিনিয়র ও জুনিয়র কার্টুনিস্টদের নিয়ে গঠিত হয় কার্টুন দল ।কার্টুনকে প্রান্তিকতার জায়গা থেকে সরিয়ে শিল্পের মূল ধারায় ফেরত নিয়ে আসার ক্ষেত্রে কার্টুন দল-এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

২০১৪ ও ২০১৫ সালের সরকারী চারুকলা মেলায় কার্টুনদল-এর অংশগ্রহণ ও ২০১৪ সালে মায়া আর্ট স্পেস গ্যালারীতে কার্টুন প্রদর্শনী এই প্রচেষ্টারই অঙ্গ। কার্টুন দল আমার কাছে বেশ বড় জোরের জায়গা। কার্টুনিস্টদের একটা প্ল্যাটফর্ম করে দেওয়াটা তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।


এছাড়া উল্লেখ করব রঙ্গ ব্যাঙ্গ রসিকেষু তথা মাসকাবারি পত্রিকার বর্তমান সম্পাদক প্রদীপ পারেখ-এর কথা। কৃতী বিজ্ঞানী প্রদীপদা জন্মসূত্রে বাঙালি না হলেও বাংলা ভাষা, গান ও সাহিত্য-সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে গেছেন।

চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত কিঞ্জল পত্রিকার বিষয় নির্বাচনে রয়েছে অভিনবত্ব। গণসংযোগ সংখ্যা, বাজি সংখ্যা, মোবাইল ফোন সংখ্যা, মধ্যবিত্ত সংখ্যা ছাড়াও শৈল চক্রবর্তী, চণ্ডী লাহিড়ী, অমল চক্রবর্তী, নারায়ণ দেবনাথ ও সম্প্রতি দেবাশীষ দেবকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে কিঞ্জল ।
 

 আমার কার্টুন প্রকাশিত হয়েছে লিপিনাগরিক, শনিবারের চিঠি, যারা পরিযায়ী পত্রিকায়। ঐতিহ্যবাহী সন্দেশ পত্রিকায় বেরিয়েছে একপাতার কমিক্স। পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত শুভেন্দু দাশগুপ্তের ব্যঙ্গরচনা সরকার বাহাদুর-এর প্রচ্ছদ ও ইলাস্ট্রেশন করেছি আমি। এছাড়া ছড়ার বই 'মীরজাফরী চার নম্বরী'-র প্রচ্ছদটিও আমার করা।

যখনই ছবি আঁকার সুযোগ পেয়েছি, সাধ্যমতো ভাল কাজ করার চেষ্টা করেছি।

 কর্মসূত্রে খিদিরপুর অঞ্চলে যাতায়াত করতে করতে বেশ অনেকদিন হয়ে গেল।

 ধর্মীয় কারণে কোনরকম গানবাজনাচর্চা ও ছবি আঁকায় নিষেধাজ্ঞা ব্যাপারটা আমাকে প্রথমে বেশ হতভম্ব করে দিয়েছিল।

 একটা বিশেষ সমাজে সেন্স ও হিউমারের অভাব এতটাই প্রকট যে তাঁদের সংবেদনশীলতাকে আহত না করার জন্য বেশ সংযতভাবে কথা বলতে হয়। বসে আঁকো প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে ফেলে পরে ধর্মীয় কারণে বাড়ির আপত্তিতে সজল চোখে ছাত্রদের নাম তুলে নেওয়া — সামনে থেকে না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত যে এমন জিনিসও হতে পারে।


 আমি আদ্যোপান্ত কলকাতার ছেলে। কলকাতায় দীর্ঘদিন বসবাসের ফলে বাঙালিদের সাধারণ চরিত্রের বেশ কয়েকটি মজার দিক বেশ অন্যভাবে চোখে ধরা দেয়।


একটা উদাহরণ দিই : একসময় মর্নিং ওয়াক করার চেষ্টা করেছিলাম। খুব ভোরে বাড়ির কাছের মাঠে যে দৃশ্যটা চোখে পড়েছিল তা হল বহু বাঙালি ভদ্রলোক পুরোদস্তুর মর্নিং ওয়াকের পোশাকে সজ্জিত হয়ে অর্থাৎ দৌড়নোর জুতো, ট্র্যাকসুট বা দৌড়নোর প্যান্ট পরে রাস্তার একটা চায়ের দোকানে জটলা করছে ধূমায়িত চায়ের কাপ হাতে। হাঁটা বা দৌড়নোর পরিবর্তে তারা রাজনীতির তর্কবিতর্ক করছে — রাজা উজির মারছে! অথচ একই মাঠে অবাঙালিরাও প্রাতভ্রমণে বেরিয়েছেন। তাদের কেউ ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম করছেন, কেউ বা জগিং করছেন, কেউ মাঠটা কয়েক-পাক ঘুরে নিচ্ছেন। তাদের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে, ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছে। এই টুকরো টুকরো দৃশ্যগুলি অনেক কথা বলে দেয়।

আমার ঘুরে বেড়াতে ভাল লাগে মিউজিয়ামে, চিড়িয়াখানায়, বইমেলায়, শপিং মলের বইয়ের দোকানে, আর্ট গ্যালারিতে। চিড়িয়াখানায় ও মিউজিয়ামে বহু অল্পবয়সী শিল্পীকে দেখি মগ্ন হয়ে ছবি আঁকছে। কোনো পাথরের মূর্তি বা জীবন্ত পশু তাদের মডেল। ধীরে ধীরে কাগজে ফুটে উঠছে নিখুঁত অবয়ব। চোখের সামনে একটি ছবির জন্ম হয়।

থিমপুজো আমার আকর্ষনের অন্যতম বিষয়বস্তু। এটা মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বৈচিত্র্যময়, এক্সপেরিমেন্টাল ও জনপ্রিয় ইনস্টলেশন আর্ট। থিম আর্টিস্টের কল্পনা ও পরিকল্পনার ফসল ওই অপূর্ব মণ্ডপসজ্জা, প্রতিমা, আলোর ব্যবহার ও সমগ্র অ্যাম্বিয়েন্স। বহু শিল্পীকে নিজস্ব প্রতিভা মেলে ধরার সুযোগ করে দিয়েছে এই থিমপুজো পাশাপাশি আয়ের একটা পথও খুলে গেছে। নান্দনিকতা ও কারিগরির মিশেলে তৈরি হওয়া থিমপুজোর বাড়বাড়ন্ত — মিডিয়ার উচ্ছ্বাস ও মানুষের হুল্লোড় মন্দ লাগে না। মাঝে মাঝে ভাবি এই থিম আর্টিস্টদের দলে ভিড়ে যেতে পারলে বেশ হয়।

 তবে বিভিন্ন আর্টিস্ট বিশেষ করে কার্টুনিস্ট, শিল্পমনস্ক ও কার্টুনপ্রেমী মানুষদের সান্নিধ্য পেয়ে চলেছি এ যাবৎ। চর্চা ও ফোকাসের অভাবে প্রকৃত শিল্পী হতে না পারলেও রং ও তুলির জগতের বাসিন্দা হবার ইচ্ছে কিছুটা হলেও পূরণ হয়েছে। কিছুটা হলেও নিজের মনের মতো একটা জগৎ খুঁজে নিতে পেরেছি। জীবনের সমস্ত চাওয়া-পাওয়ার বাইরে এ এক অন্যরকম উপলব্ধি। ০২ অক্টোবর, ২০১৭, কোলকাতা

Sunday, September 17, 2017

মোস্তফা,ওয়াজিউল্লাহ অার বাবুলের অাত্মদানের স্বীকৃতি দিন শিক্ষামন্ত্রী



১৯৫৯ থেকে ২০১৭! শিক্ষা দিবসের দাবি এখনো হিমাগারে।শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এই অান্দোলনের সাতের দশকের লড়াকু যোদ্ধা। ৫৮ বছর পরও তিনি বাস্তবায়ন করলেন না শিক্ষা দিবসের মূল দাবী কুদরাত ই খুদা শিক্ষা কমিশন বাস্তবায়ন, বিজ্ঞানভিত্তিক একমুখী শিক্ষা। অন্ধকারের শক্তি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে।হাতে রক্তাক্ত খঞ্জর।ধর্ম নিয়ে ব্যবসাতে নামিয়ে দিয়েছে অাপামর ছাত্রছাত্রীকে।
১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর, ক্ষমতা দখলের ২ মাসের মধ্যে জেনারেল আইয়ুব খান শিক্ষানীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে পাকিস্তানের তৎকালীন শিক্ষা সচিব এসএম শরিফকে প্রধান করে শিক্ষা কমিশন গঠন করে।

সেই কমিশন ১৯৫৯ সালের আগস্ট মাসে ২৪ অধ্যায়ে বিভক্ত বিশাল শিক্ষা রিপোর্ট প্রণয়ন করে, যা ছাত্রদের চরম স্বার্থবিরোধী।
সেই কালো রিপোর্টের অধিকাংশ সুপারিশ গ্রহণ করে পাকিস্তান সামরিক সরকার তা বাস্তবায়ন শুরু করলে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সৃষ্টি হয় একের পর এক ইতিহাস। প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শে প্রণীত শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের শুরু থেকেই ছাত্রদের শক্তিশালী প্রতিরোধের মুখে পড়ে। ছাত্র সংগঠনগুলো এই জনবিরোধী শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে রাজপথে নামে। আন্দোলনের অংশ হিসেবে ১৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপি হরতাল আহ্বান করা হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকে দেশব্যাপি সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। সে দিন পুলিশের গুলিতে নিহত হন মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহ, বাবুল। ২৪ সেপ্টেম্বর পল্টন ময়দানের ছাত্রসমাবেশ থেকে শিক্ষানীতি বাতিল, হত্যার বিচারসহ ছাত্রসমাজের উত্থাপিত দাবি মানার জন্য চরমপত্র ঘোষণা করা হয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে সরকার শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন স্থগিত করে। ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন পরবর্তী সময়ে ৬৬’র ছয় দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনায় গভীর অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। সেদিন ছাত্রসমাজই পালন করেছিল নতুন ইতিহাস নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা, যার ধারাবাহিকতা আজ অবধি অব্যাহত রয়েছে।
বর্তমান সরকারের আমলে একটি শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে, যাতে শিক্ষাব্যবস্থায় কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে কিন্তু অন্যান্য শিক্ষা রিপোর্টের মতোই ছাত্রসমাজ তথা জনগণের মঙ্গল করার মতো কিছুর প্রতিফলন তাতে ঘটেনি।
সব সরকারই মুক্তবাজার অর্থনীতির দর্শনকে ধারণ করে ধনিকশ্রেণির স্বার্থরক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে নীতি প্রণয়ন করে, যার মধ্যে শিক্ষানীতি অন্যতম।
সংবিধানের ১৭নং অনুচ্ছেদে গণমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সার্বজনীন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও ১৯৭৫ সালে জাতির পিত্ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে সপরিবারে বর্বরোচিত হত্যার মধ্যে দিয়ে সমাজবিধ্বংসী জগাখিচুড়ি মার্কা নীতিহীন শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন রাষ্ট্রের অঙ্গীকার ছিল গণমুখী, সার্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের। স্বাধীনতার ৪০ বছর এবং ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলনের ৫০ বছর পরও এদেশের ছাত্রসমাজকে শিক্ষার অধিকার আদায়ে নিরবচ্ছিন্ন লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। ’
১৯৭৫ এর পরের সরকার গুলো ‘টাকা যার শিক্ষা তার’ নীতি বাস্তবায়িত করেছে
’৫২-র ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, যার অনিবার্য পরিণতিরূপে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, তেমনিভাবে বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রসমাজ সর্বগ্রাসী শিক্ষা সঙ্কট উত্তরণে গঠনমূলক কাজে নিজেদের নিয়োজিত করে পরবর্তী প্রজন্মকে বিজ্ঞানমুখী, মানবতার শিক্ষা ও দীক্ষার দ্বার উন্মোচিত করবে। এই হোক মহান শিক্ষা দিবসের এবারের শপথ!
sumikhan29bdj@gmail.com