Saturday, March 1, 2014

এটা একটা তারবার্তা ছিল না, জনাব রাষ্ট্রদূত - মোজাম্মেল খান


সম্প্রতি বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম, সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস মরিয়ার্টি ২০০৮ সালে তারেক রহমানকে বাংলাদেশে মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থ’ী হিসেবে উল্লেখ করে ওয়াশিংটনে যে বার্তা পাঠান তার বিশদ বিষয়বস্তু (যেটা উইকিলিকস ২০১১ সালে প্রকাশ করেছিল) প্রকাশ করে। তারবার্তায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তারেক রহমানের ঢুকতে না দিতে ওয়াশিংটনে সুপারিশ করা হয়েছিল। গত ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখে, মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা, বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক শেষে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘আমি শ্রেণীবদ্ধ নথি সংক্রান্ত কোন অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য করব না। আপনারা যদি অনেক তারবার্তার একটি নিয়ে কথা বলেন তাহলে সেটাতে ভুল সিদ্ধান্ত প্রতিফলিত হতে পারে। যেহেতু প্রতিদিন অনেক তারবার্তা যাওয়া-আসা করছে, কোন এক বিশেষ তারবার্তা কোন একটা মুহূর্তের চিন্তাকেই প্রতিফলিত করে।’ 
না, জনাব রাষ্ট্রদূত, এটা একটা তারবার্তা ছিল না। এটা ২০০৫ থেকে ২০০৮ সাল অবধি যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকা মিশনপ্রধানদের কয়েকটা তারবার্তা, যার সবই তারেক রহমানের কুকীর্তির বিশদ বিবরণ দেয়া হয়েছে এবং এর সব ক’টি একে অপরের সম্পূরক, সাংঘর্ষিক তো নয়ই এবং সেদিক দিয়ে কোনটাই প্রসঙ্গের বাইরে নয়। নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদগুলোতে কালানুক্রমিকভাবে ঐ তারবার্তাগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হলো, যার সবই ৩০ আগস্ট, ২০১১ সালে উইকিলিকস প্রকাশ করে। 
এই তারবার্তাটির শিরোনাম ছিল ‘খালেদা দুর্নীতিগ্রস্ত পুত্রকে রক্ষা করে ব্যর্থ হয়েছেন’ এবং পাঠান রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টমাস ২০০৫-এর মার্চ মাসে। এ তারবার্তায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মুখ্য সচিব কামালউদ্দিন সিদ্দিকী বাংলাদেশে তখন মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে কি বলেন তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে। তাঁর ভাষায়, খালেদার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা ছিল তার দুর্নীতিগ্রস্ত ছেলে তারেক রহমানকে রক্ষা করা। তিনি [ সিদ্দিকী ] বর্ণনা দিয়েছেন কিভাবে তার দুর্নীতিস্ত পুত্রকে প্রশ্রয় এবং রক্ষা করেছেন।
২০০৫ সালের ১৩ মার্চ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কামালুদ্দিন সিদ্দিকীর ৪০ মিনিটের একটি বৈঠক হয়। ঐ বৈঠকে ওয়াশিংটনে জ্যেষ্ঠ মার্কিন সরকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে তারেকের বৈঠকের অনুরোধ প্রটোকল ও অন্যান্য কারণে সম্ভব নয় বলে রাষ্ট্রদূত সিদ্দিকীকে জানান। সিদ্দিকী এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পূর্ণ ঐকমত্য পোষণ করে বলেন, উত্তরাধিকারের রাজনীতি একটি উঠতি গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক নয়। 
মার্কিন দূতের সঙ্গে বৈঠকে সিদ্দিকী আরও বলেন, মার্কিন চাপ এবং ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রথম বিশ্বব্যাংকের বৈঠক বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষার খাতিরে খালেদা জিয়া অবশেষে রাজশাহী অঞ্চলে বিএনপির সাংসদ, মন্ত্রী এবং জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ ‘গ্যাংস্টার’দের রক্ষা করা বন্ধের নীতি গ্রহন করেন। সিদ্দিকী বলেন, বিএনপি সরকারের সমস্যা হলো এরা শুধু চাপের মুখে কাজ করে। যার ফলে যে কাজ আগেই করা উচিত; সেটা করেও তার কৃতিত্ব তারা দাবি করতে পারে না। 
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন যার নাম সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ্্ এএমএস কিবরিয়াকে গ্রেনেড হামলায় হত্যা করার অভিযোগে মিডিয়ায় প্রকাশ হয়েছে সে ব্যাপারে রাষ্ট্রদূত জিজ্ঞাসা করলে সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিস চৌধুরীর নাম উল্লেখ করেন। সিদ্দিকী জানান, তৎকালীন সিভিল এ্যাভিয়েশন প্রতিমন্ত্রী মীর নাসির উদ্দিন বিমানের জন্য বোয়িং বা এ্যায়ারবাস কিনবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নিতেও ঘুষ চেয়েছিলেন। প্রতিমন্ত্রীর ঘুষের ইচ্ছার জন্যই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন। 
দ্বিতীয় তারবার্তাটিও পাঠিয়েছিলেন হ্যারি কে টমাস ১১ মে, ২০০৫ সালে। এটাতে বলা হয়েছিল, বিশ্বস্ততা, ঘনিষ্ঠতা এবং পারিবারিক সম্পর্ক ছিল তার দ্বিতীয় মেয়াদে যে কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়ায় প্রধান প্রভাব, কোন প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের কোন মূল্যায়ণ তিনি করেননি। তারবার্তায় বলা হয়, খালেদা জিয়ার কাছে আনুগত্য দ্বিমুখী রাস্তা। এটা হলো আদান-প্রদানের ব্যাপার। ১৭ ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়েছিল খালেদা জিয়ার ওপর সর্বোচ্চ প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণকারী হিসাবে। এদের তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছিল- ভেতরের, মাঝের এবং বাইরের। এদের অনেকের সঙ্গেই তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। 
ঐ তারবার্তায় তারেক রহমান সম্পর্কে আরও বলা হয়, ‘হাওয়া ভবন’ নামে এক ‘ছায়া সরকার’ তিনি চালিয়েছেন, বিশেষ করে সরকারী নিয়োগ এবং ঠিকাদারি কাজ দেয়ার ব্যাপারে ঐ ভবনের কথাই ছিল শেষ কথা। ২০০১ সালের নির্বাচনের পরে গঠিত ৬০ জনের মন্ত্রিসভার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তিনিই বিক্রি করেছিলেন। তিনি নৃশংস, সীমাহীন দুর্নীতিবাজ, রাজনীতিতে এবং ব্যবসায় অনভিজ্ঞ, অশিক্ষিত, বাস্তব জ্ঞানবিবর্জিত এবং অমানবিক। 
অন্যান্য ১৫ জনের মধ্যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়- খালেদা জিয়ার সংসদীয় এবং জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা এ ব্যক্তিটি এক বহুমুখী প্লেয়ার, যাকে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং হত্যাকারী, ধর্ষক এবং অস্ত্র চোরাচালানকারীসহ এমন কোন অপরাধ নেই; যার সঙ্গে তিনি যুক্ত নন। ওআইসি মহাসচিব পদে হেরে যাবার পরও তার প্রভাব বিন্দুমাত্র ক্ষুন্ন হয়নি। শেখ হাসিনাকে তিনি অনেকবার অভদ্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন এবং চট্টগ্রাম অস্ত্র চোরাচালানোর সঙ্গে তার জড়িত থাকার কথাও শোনা যাচ্ছে।
পরবর্তী তারবার্তাটি, যার শিরোনাম ছিল, ‘অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতি‘, ২৪ আগস্ট ২০০৬ সালে পাঠান প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিস, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দুই মাস আগে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার তার মেয়াদের শেষদিকে দুর্নীতির একটি দৃশ্যত নজিরবিহীন পর্যায়ে জড়িত ছিল। তারবার্তায় বলা হয়, লোভ এবং আসন্ন রাজনৈতিক প্রচারণায় অর্থ যোগানোর প্রয়োজন দুর্নীতি উর্ধগতিপ্রাপ্ত হয়। এটা ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হতো যে প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য উর্ধ্বতন মন্ত্রীদের পরিবারের সদস্যদের দুর্নীতির দায়মুক্তি নিম্ন কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে উৎসাহ যুগিয়েছে এবং এটাতে সব পর্যায়ে ছোটখাটো দুর্নীতির ব্যাপক প্রসার ঘটিয়েছে। উদাহরণ দিয়ে কয়েক শ’ মিলিয়ন ডলারের দুর্নীতির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট এবং পুলিশের রেডিও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের চুক্তি। আমেরিকান কোম্পানি মটোরোলার সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি কিভাবে তারেক এবং আরাফাত রহমান কোকোর প্রভাবে বাতিল করে সিঙ্গাপুর টেকনোলজি কোম্পানিকে দেয়া হয়- তার বিবরণও দেয়া হয়েছে তারবার্তায়।
পরবর্তী তারবার্তাটি পাঠান রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি ২০০৮ সালের ৩ নবেম্বরে। ওই তারবার্তায় তারেক রহমানকে, লোভ-লালসা-চোরামি আর দুর্নীতিবান সরকারের এবং হিংস্র রাজনীতির প্রতিবিম্ব হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং তাকে যেন যুক্তরাষ্টে ঢোকার অনুমতি না দেয়া হয় সে সুপারিশ করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস বিশ্বাস করে, তারেক রহমান ‘কুখ্যাত রাজনৈতিক দুর্নীতির দোষে দোষী’ এবং এ ব্যাপারে দূতাবাস তারেকের কিছু বড় ধরনের দুর্নীতির বিবরণ ঐ তারবার্তায় তুলে ধরে। 
এসব তারবার্তা পাঠানোর ৬ মাস পর ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত গীতা পাশি ওয়াশিংটনে আরও একটি তারবার্তা পাঠান। ঐ তারবার্তায় বলা হয়, স্টেট ডিপার্টমেন্ট প্রেসিডেন্সিয়াল ঘোষণার আওতায় তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করছে। ঐ বার্তায় বলা হয়, তার অপকর্ম সরকারের প্রতি জনগণের আস্থাকে দুর্বল করেছে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের স্থায়িত্বকে খর্ব করেছে। তার কোটি কোটি ডলারের চুরি এ মধ্যপন্থী মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থায়িত্ব এবং ভিতকে দুর্বল করেছে এবং যার প্রেক্ষিতে এ দেশে একটা শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যবস্থা সৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যয় ও প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। 
তারেকের দুর্নীতি চর্চা মার্কিন স্বার্থের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে বলে মরিয়ার্টি লিখেন। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বাংলাদেশে দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাত এবং ঘুষের যে সংস্কৃতি চালু করেছে সেটাতে মার্কিন ব্যবসার অনেক ক্ষতি হয়েছে এবং অনেক অপূরণীয়ভাবে সুযোগ হারিয়ে গেছে, মরিয়ার্টি উল্লেখ করেন ওই তারবার্তায়। সংক্ষেপে, বাংলাদেশের যা কিছু দুর্দশা তার সিংহভাগের জন্য দায়ী তারেক এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। 
এসব কারণে রাষ্ট্রপতি প্রক্ল্যামেশন ৭৭৫০-এর মাধমে মার্কিন রাষ্ট্রদূত তারেক রহমানকে যুক্তরাষ্ট্রে এন্ট্রি ব্লক করার সুপারিশ করেন। 
তারেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ঘুষ, অর্থ আত্মসাৎ এবং করফাঁকির অভিযোগে একাধিক মামলা থাকা সত্ত্বেও জামিনে তারেকের মুক্তি পাওয়া সম্পর্কে মরিয়ার্টি লেখেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক তার জামিনের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও গভীর রাজনৈতিক বন্ধন, যেটা দেশের সর্বোচ্চ আদালতে পৌঁছাতে পারে, সেটা দ্বারা বিচার প্রক্রিয়াকে নিপুণভাবে মানিপুলেটের মাধ্যমে তিনি জামিন পেতে সমর্থ হন।
এসব তারবার্তার বিষয়বস্তু কোনটার সঙ্গে কোনটা সম্পর্কহীন বা কোনটাতে কি কোন অপ্রাসঙ্গিকতা ধরা পড়েছে বা কোন অংশকে কি সম্পূর্ণ তারবার্তাসমূহের বিষয়বস্তুর বাইরে নিয়ে বিবেচনা করা হয়েছে, জনাব রাষ্ট্রদূত?

লেখক : কানাডা প্রবাসী অধ্যাপক এবং সিনেটের ডেপুটি স্পীকার

জঙ্গীবাদের বিশ্বায়ন, সরকার এবং বাংলাদেশে : আবদুল মান্নান


বাংলায় প্রবাদ আছে-সর্ষে দিয়ে নাকি ভূত তাড়ায়। তারপরের প্রশ্ন হচ্ছে সর্ষেই যদি ভূত থাকে তাহলে সেই সর্ষে দিয়ে ভূত তাড়ানো সম্ভব কিনা। সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ দেশীয় মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারিত হয়েছে বা হচ্ছে, যার অন্যতম হচ্ছে, কারাগার থেকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার পথে একেবারে ফিল্মি স্টাইলে তিন ভয়ঙ্কর জঙ্গীবাদী জেএমবি’র সন্ত্রাসীকে মাঝপথে মিনিট তিন হতে চারের মধ্যে ছিনতাই করে নিয়ে যায়। ঘটনার সময় ছিনতাইকারীদের গুলিতে এক পুলিশ সদস্যও নিহত হন। এমন ঘটনা বাংলাদেশে তো নয়ই উপমহাদেশে এর আগে কখনও ঘটেছে বলে শোনা যায়নি, এমনকি জঙ্গীবাদী সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য পাকিস্তানেও না। বাংলায় আরও একটি প্রবাদ আছে, যেটিতে বলা হয় ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে।’ এখন এই ঘটনা নিয়ে সরকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন শাখার মধ্যে পরস্পর পরস্পরকে দোষারোপের কাজ চলছে। এর মধ্যে একজন জঙ্গী রাকিব, পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিল। কিন্তু পুলিশের সঙ্গে এনকাউন্টারে সে নিহত হয়েছে বলে পুলিশ দাবি করেছে। রাকিবের বেঁচে থাকার প্রয়োজন ছিল। কারণ তা হলে তার কাছ থেকে এই অপারেশন সম্পর্কে হয়ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যেত। এসব প্রসঙ্গে পরে আসছি। এখন আসি সর্ষের মধ্যে ভূতের প্রসঙ্গে। এই ভূত হচ্ছে সরকারের মধ্যে ভূত এবং এই ভূত সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য যা যা করার প্রয়োজন, ঠিক তাই করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি আরও সত্য। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতি দেশের মানুষকে ঠিক আড়াআড়ি মাঝখান দিয়ে দু’ভাগে ভাগ করে ফেলেছে। আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর দীর্ঘ একুশ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল। এই সময়ে সরকারের মধ্যে এমন অনেক মানুষ ঢুকে পড়েছে যাদের অনেকেই বাংলাদেশের মৌলিক কাঠামোকে বিশ্বাস করেন না। পারলে কালকেই বাংলাদেশকে একাত্তর পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যান। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ বিরতির পর এসব কর্মচারী আর কর্মকর্তাকে নিয়েই যাত্রা শুরু করে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, এরপর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও এখনও আওয়ামী লীগ তার মিত্র কারা আর শত্রু কারা তা বুঝতে পারেনি অথবা বুঝতে পারলেও তার গুরুত্ব দেয় না। এই ভুলটি বঙ্গবন্ধুও করেছিলেন এবং এর ফলে শুধু তাঁকে সপরিবারে নিহতই হতে হয়নি জাতিকেও অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে এটি মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে; বঙ্গবন্ধু কন্যাও মাঝে মাঝে একই ভুল করেন। বাবা এবং কন্যার মধ্যে তফাৎ এই যে, বাবা সময় থাকতে বুঝতে পারেননি তাঁকে একদল ঘাতক নীরবে তাড়া করছে। কিন্তু সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় কন্যার তো বোঝা উচিত একটি বুলেট তাঁকে সর্বক্ষণ তাড়া করছে। শুধু একটি ঘটনার কথা পাঠকদের জানার জন্য বলি তাহলে পাঠক বুঝতে পারবেন, কখনও কখনও পরিস্থিতি কত নাজুক হয়ে উঠতে পারে। 
১৭ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লায় দীর্ঘ প্রতীক্ষিত লাইট এ্যান্ড সাউন্ড শো’র প্রদর্শনী উদ্বোধন হবে। এমন প্রদর্শনী ভারতের অনেক ঐতিহাসিক শহরে অনুষ্ঠিত হয়। শুধু আলো, শব্দ আর ধারা বর্ণনায় জীবন্ত করে আনা হয় ওই অঞ্চলের ইতিহাসকে। লালবাগ দুর্গের এমন এক স্থায়ী প্রদর্শনীর আয়োজক সংস্কৃৃতি মন্ত্রণালয়। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। সাতটার একটু আগেই মূল প্রদর্শনী শুরু হবে। আধ ঘণ্টারও কম সময়ের অনুষ্ঠান সাড়ে সাতটার এশার আযানের আগেই শেষ হতে হবে। আমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যা শ’দুয়েক হবে। সেই মতোই সব কিছুর প্রস্তুতি। প্রধানমন্ত্রী মাগরিবের নামাজের পর পরই চলে এলেন। তাঁর গাড়ি কেল্লার ভেতরে ঢুকলো। প্রধানমন্ত্রী গাড়ি হতে নেমেই দু-কদম না দিতেই কেল্লার সব বাতি নিভে গেল। কেল্লার বাইরের সব বাতি কিন্তু তখন জ্বলছিল। আর আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন তাঁদের কারো হাতে কোন টর্চ লাইট দেখা যায়নি। ভরসা সব টিভি ক্যামেরার সঙ্গে থাকা লাইট। সেই আলোয় প্রধানমন্ত্রী নির্ধারিত আসনে গিয়ে বসলেন। তারপর আবার আলো জ্বলে ওঠে। প্রথমত প্রধানমন্ত্রীর রাতের বেলায় পুরনো ঢাকায়, যেখানে রাস্তাঘাট খুব সরু, সেখানে যাওয়াটা তাঁর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে খুব বেশি সমীচীন হয়েছে বলা যাবে না। দ্বিতীয়ত এই এলাকায় আওয়ামী লীগের ভেতরের দলীয় কোন্দল বহু পুরনো। কোন একটি এলাকায় দলীয় কোন্দল থাকলে তার কি পরিণতি হতে পারে তা আমার একবার দেখার দুর্ভাগ্য, হয়েছিল চট্টগ্রামের লালদিঘীর ময়দানে আওয়ামী লীগের জনসভায়। সেটি সম্ভবত ১৯৮৪ সাল। সেই সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন দলীয়প্রধান শেখ হাসিনা। জনসভা চলাকালীন সভাস্থলে শুরু হলো দুই উপদলের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ। শেখ হাসিনাসহ মঞ্চে উপবিষ্ট সকলে তখন বেশ অসহায় হয়ে পড়েন। দলীয় নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনাকে বহু কষ্টে পুলিশ পাহারায় রক্ষা করেন। তৃতীয়ত, এলাকাটিতে বিডিআর হত্যা মামলায় আটক নাসির উদ্দিন পিন্টুর কর্মীরা বেশ সক্রিয়। তারাও যে কোন সময় একটি দুর্ঘটনা ঘটাতে সক্ষম। সেদিন সংক্ষিপ্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষ হলেও মূল অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে দুবার ছন্দপতন ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি প্রাণহীন হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এমন একটি ঘটনা অভূতপূর্ব এবং সম্পূর্ণ অনাকাক্সিক্ষত। তবে ওই রাতেই বিদ্যুত কর্তৃপক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত বারো কর্মচারী আর কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ঘটনার তদন্তের পদক্ষেপ অবশ্যই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এই যাবত মানুষ জানতে পারেনি তদন্তের ফলাফল কি হলো। 
তবে সাম্প্রতিককালে সব চেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ছিল ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশের প্রিজনভ্যানে হামলা চালিয়ে দ-প্রাপ্ত ও নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবি’র তিন সদস্য ছিনতাই যার কথা প্রথমেই উল্লেখ করেছি। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সম্প্রতি এই ছিনতাইকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে অবহিত করলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। এমন একটি উক্তি দায়িত্বহীনতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ছিনতাইয়ের জন্য ছিনতাইকারী জেএমবি’র সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে এবং তারা তা নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করেছে। ছিনতাইকৃতদের একজন পালিয়ে গিয়ে আবার ধরা পড়ার পর পুলিশের সঙ্গে এনকাউন্টারে মারা গেলেও আরও দুজন ভয়াবহ জঙ্গী এখনও পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে আছে। তাদের এই সফল অপারেশনের পর নিশ্চিতভাবে তাদের মনোবল আরও চাঙ্গা হবে এবং হয়ত পরবর্তী আরও এমন একটি ভয়াবহ অপারেশনের জন্য ইতোমধ্যে সকলের অজ্ঞাতে প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। এই ঘটনার পর যেটি দেখা যাচ্ছে তা হচ্ছে, একে অন্যকে দোষারোপ করা। কোন কোন সংবাদ মাধ্যম খবর দিচ্ছে তারা পলাতক এবং পরে নিহত রাকিব ও গাড়ির চালক জেএমবি সদস্য জাকারিয়ার কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই যাবত বাকি দু’জন জঙ্গী এখনও পলাতক আছে। এই অপারেশনে সহায়তা করেছে কারাগারের কিছু পুলিশ। তারা নিয়মিত অর্থের বিনিময়ে জঙ্গীদের মোবাইল ফোনে তাদের বাইরের সঙ্গীদের সঙ্গে কথা বলতে দিত। কারা কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে কারাগার হতে মোবাইলে কথা বলা সম্ভব নয়। কারণ কারাগারে মোবাইল জ্যামার বসানো আছে। যেটি তারা বলে না তা হচ্ছে জ্যামারকে বন্ধ করে রাখা কোন ব্যাপারই নয়। এটি হচ্ছে এ রকম যে, একটি মার্কেটে রাতেরবেলায় ডাকাতি হলো। জানা গেল সেই মার্কেটে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা ছিল কিন্তু তা রাতেরবেলায় বন্ধ ছিল। পুলিশের জানা উচিত বাংলাদেশে অশিক্ষিত-মূর্খরা জঙ্গী হয় না, তারা বড় জোর সন্ত্রাসী হয়। যারা জঙ্গী হয় তাদের বেশিরভাগই শিক্ষিত এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। অনেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত গিয়েছে। আয়মান আল জাওহিরি, যার বার্তা নিয়ে বাংলাদেশে এত হৈচৈ তিনি একজন পিএইচডিপ্রাপ্ত জঙ্গী গুরু। বাংলাদেশে যে হিজবুত তাহরীর এত সক্রিয় তারা প্রায় সকলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এদের গুরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর। ব্লগার রাজিবকে যারা হত্যা করেছিল তারা সকলে বনেদী বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় নর্থসাউথের ছাত্র। পুলিশ প্রশাসন যদি একজন সন্ত্রাসী আর একজন জঙ্গীর মধ্যে তফাৎ বুঝতে না পারেন তা হলে বুঝতে হবে তাদের প্রশিক্ষণে যথেষ্ট ঘাটতি আছে। সম্প্রতি ছাত্র শিবিরকে যখন আইএচএস জেনস টেররিজম এ্যান্ড ইনসারজেন্সি সেন্টার বিশ্বের তৃতীয় ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করলো ঠিক তখন বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমে অনেকে তার সমালোচনা করে বললেনÑ এই স্থানটি তো পাওয়া উচিত ছাত্রলীগের। কারণ তাদের হাতেই একে-৪৭ রাইফেল দেখা যায়। যারা এই ধরনের মন্তব্য করে তারা বুঝতে পারে না এরা হচ্ছে স্রেফ সন্ত্রাসী। এরা টেন্ডারবাজি, দলবাজি, অথবা চাঁদাবাজির জন্য সন্ত্রাস করে ছাত্র শিবিরের মতো কোন মতবাদকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়ার জন্য নয়। ছাত্রলীগ বা এমনকি ছাত্রদলও জঙ্গীবাদের আশ্রয় নিয়ে কোন মতবাদ প্রচার করে না যা ছাত্র শিবির করে। 
পুলিশ যখন একজন আসামিকে আদালতে হাজিরা দিতে নিয়ে যায় সে সময় বিরাট একটি অর্থের লেনদেন হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীকে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় হাজিরা দিতে ঢাকা হতে চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়ার সময় অর্থের বিনিময়ে একাধিকবার তার দলীয় কর্মীরা পথের মধ্যে তার সঙ্গে সাক্ষাত করেছে। চট্টগ্রামের ভয়াবহ সন্ত্রাসী শিবির ক্যাডার নাসিরকে অর্থের বিনিময়ে আদালত হতে কারাগারে ফিরিয়ে নেয়ার সময় চট্টগ্রামের চকবাজারের সবুজ হোটেলে বিরানি খাওয়ারও সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল। নাসির অর্থের বিনিময়ে কারাগারে ফোন ব্যবহার করে বিদেশে অবস্থানরত তার সাঙ্গোপাঙ্গদের সঙ্গেও নিয়মিত কথা বলে আর তারা নিয়মিত বাইরে চাঁদাবাজি করে। এই যে তিনজন ভয়াবহ জঙ্গীকে একই ভ্যানে তিনজন গাদা বন্দুকধারী পুলিশ দিয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয় তা হয় উদ্দেশ্যমূলক না হয় চরম আহাম্মকি। কোনটি ঠিক; তা খুঁজে বের করার দায়িত্ব সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার। তবে বাংলাদেশের গোয়েন্দারা যদিও অনেক দুরূহ রহস্যের সমাধান পূর্বে করেছেন অথবা করছেন তবুও তাদের আনাড়িপনাও মাঝে মধ্যে ক্ষমার অযোগ্য হয়ে পড়ে। একটি দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রথম পূর্বশর্ত হচ্ছে তার গোয়েন্দা সংস্থাকে শক্তিশালী করা। যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ একবারই হয়েছিল। এরপর হয়ত চেষ্টা করা হয়েছিল একাধিকবার। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থার আগাম ব্যবস্থার কারণে তা সম্ভব হয়নি। জঙ্গীবাদের বিশ্বায়নের কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে অনেক ঝুঁকির মধ্যে আছে। 
আমরা সব জঙ্গীবাদ উচ্ছেদ করে ফেলেছি অথবা জঙ্গীরা এখন আগের চেয়ে অনেক দুর্বল তেমন কথা বলে যদি ঢেঁকুর তুলি তাহলে সেটি হতে পারে একটি ভয়াবহ আত্মঘাতী ভুল। বাংলাদেশ গত চল্লিশ বছরে অনেক ভুল করেছে। জাতি আর কোন ভুলের খেসারত দিতে প্রস্তুত নয়। আশা করব বঙ্গবন্ধু কন্যা কাকে দিয়ে কি কাজ হবে তা বুঝতে পারবেন এবং সেই মতে তাকে কাজে লাগাবেন।

লেখক: শিক্ষবিদ ও বিশ্লেষক

Friday, February 28, 2014

নারীমুক্তির সংকট:বর্তমান প্রেক্ষাপট - নূরজাহান খান


  'নারী ছাড়া কোনো গণআন্দোলন হতে পারে না।' মহান বিপ্লবী ক্লারা জেৎকিনের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেছিলেন মহামতি লেনিন। পিছিয়ে থাকা নারীদের এগিয়ে নেয়ার জন্য তিনি বলেছিলেন, নারীদের বোঝাতে হবে সন্তান ধারণ ও সন্তানকে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষা এবং জীবনচর্চায় তাদের পুরুষের সমকক্ষ হতে হবে।  আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০১৪তে থিম করা হয়েছে পরিবর্তনের অনুপ্রেরণাকে। আমরা  নারীর প্রতি দায়বদ্ধ  এবং জবাবদিহিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করে আসছি ১৯৭০ সাল থেকে। গত চার দশকে  এর সফলতা অনেক ; তবে ব্যর্থতা ও কম নয় ।সেই ব্যর্থতা কাটাতে  সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরী ।
আমার সাম্প্রতিক  অভিজ্ঞতায়  বর্তমান সমাজবাস্তবতার কিছু সফলতা -ব্যর্থতার চিত্র  এ লেখায় তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

 রাজপথ থেকে প্রশাসন সর্বত্র নারীর দৃপ্ত পদ পদচারনা। নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা হলেই এদেশে প্রকৃত মানবমুক্তি আসবে। আমরা বলি, পরিবার এবং কর্মক্ষেত্রে নারীকে পুরুষের সমকক্ষ হতে হবে।নারীর শিক্ষার মান বেড়েছে। নারীর সমতা বিধান রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার নারীবান্ধব পরিবেশ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। নারীর নৈতিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা নারীমুক্তির অগ্রযাত্রার সহায়ক বলে মনে করছে বর্তমান সরকার। এ কাজে নারীর পাশাপাশি পুরুষেরও এগিয়ে আসা একান্ত প্রয়োজন। ১৯৭৬-৮৫ সালে জাতিসংঘের ঘোষণা ছিল নারীর সমতা, উন্নয়ন ও শান্তি। জাতিসংঘ নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার জন্য ঘোষণা দেয় কাজ, শিক্ষা, বিশ্রাম, চিত্তবিনোদন, চিকিৎসা প্রভৃতি বিষয়ে। কোনো কোনো দেশের সংবিধানে আছে নারীরা গৃহকাজের বাইরে অন্য কাজে যেতে পারবে না। মধ্যপ্রাচ্যে এখনো ভোটাধিকারের দাবিতে লড়াই করতে হচ্ছে নারীকে।

আমাদের খালাম্মা বেগম সুফিয়া কামাল বলতেন, মঞ্চে কিছু মানুষ নির্ধারিত বক্তব্য বলে যায়, "দর্শকরা শুনে যান। এর খুব একটা প্রভাব সমাজে পড়ে না। নারীর প্রতি আন্তরিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দায়িত্বশীলতার কথা সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে বলতে হবে। সমাজ পরিবর্তনের মাঠে নামতে হবে মানবিকবোধসম্পন্ন মানুষকে। এর কোনো বিকল্প নেই। এ আমাদের নিজেদেরই কাজ। "

সচেতনতার অভাবে  ফতোয়া, পর্দা, হিজাব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। সমাজ গবেষক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল  স্বাভাবিকভাবেই এর বিরুদ্ধে তার হতাশা এবং আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। যে কোনো সচেতন ব্যক্তিমাত্রই এতে শঙ্কিত হবেন। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে নারীকে আবার পর্দার ভেতরে বন্দি করার সংঘবদ্ধ যে অপচেষ্টা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান আমাদের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের।  এতে সাড়া দেবার কেউ আছেন কি?

 মুক্ত হাওয়ায় নারীর নিঃশ্বাস নিতেও বাধা?  হিজাব তার ই প্রকাশ। তবে সমাজের উচ্চশ্রেণীর  কিছু  নারী স্বেচ্ছায় এ শৃঙ্খলে বন্দি হচ্ছেন। কেউ কেউ আবার হিজাবে ফ্যাশনের বেশ বাহার দেখান।

 তাদের প্রতি আমার আবেদন, নজরুলের সেই জনপ্রিয় আহ্বান ভুলে যাবেন না, 'মাথার ঘোমটা খুলে ফেলো নারী, ছিঁড়ে ফেলো ও শিকল- যে ঘোমটা তোমা করিয়াছে ভীরু ওড়াও সে আবরণ।' সৃষ্টিশীল মনকে শৃঙ্খলিত করার মতো স্বেচ্ছাচারিতার কোনো অধিকার নিজেরও নেই। এ সমাজে জন্ম, শিক্ষা এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রতিটি মানুষের অবদান আছে। সেই মানুষগুলোর প্রতি, এ সমাজের প্রতি তার দায়বদ্ধ থাকতে হবে। পর্দাপ্রথা প্রত্যাখ্যান সমাজ সচেতনতার প্রকাশ। এর সাথে ধর্মের কোন দ্বন্দ্ব নেই। আধুনিক কালে  ধর্মের এমন অপব্যাখ্যা দিয়ে নারীকে আবার অবরোধবাসিনী করার হীন প্রচেষ্টা করা হচ্ছে; যা ঠেকানো জরুরী বলে আমার মনে হয়।

নারীকে কূপমন্ডকতার  দিকে ঠেলে দেয়ার এ হীন প্রচেষ্টা প্রতিরোধ করে এগিয়ে নিতে হবে পরবর্তী প্রজন্মকে। সব সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধে  উঠে অসাম্প্রদায়িক চেতনায়, মানবিক মন নিয়ে গড়ে তুলতে হবে এ সমাজ।

ফতোয়া, পর্দা, হিজাব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সমাজ গবেষক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল হতাশা এবং আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। যে কোনো সচেতন ব্যক্তিমাত্রই এতে শঙ্কিত হবেন। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে নারীকে আবার পর্দার ভেতরে বন্দি করার সংঘবদ্ধ যে অপচেষ্টা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কেউ আছেন কি?

 মুক্ত হাওয়ায় নারীর নিঃশ্বাস নিতেও বাধা? তবে সমাজের উচ্চশ্রেণীর  কিছু  নারী স্বেচ্ছায় এ শৃঙ্খলে বন্দি হচ্ছেন। কেউ কেউ আবার হিজাবে ফ্যাশনের বেশ বাহার দেখান।

 তাদের প্রতি আমার আবেদন, নজরুলের সেই জনপ্রিয় আহ্বান ভুলে যাবেন না, 'মাথার ঘোমটা খুলে ফেলো নারী, ছিঁড়ে ফেলো ও শিকল- যে ঘোমটা তোমা করিয়াছে ভীরু ওড়াও সে আবরণ।' সৃষ্টিশীল মনকে শৃঙ্খলিত করার মতো স্বেচ্ছাচারিতার কোনো অধিকার নিজেরও নেই। এ সমাজে জন্ম, শিক্ষা এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রতিটি মানুষের অবদান আছে। সেই মানুষগুলোর প্রতি, এ সমাজের প্রতি তার দায়বদ্ধ থাকতে হবে। পর্দাপ্রথা প্রত্যাখ্যান সমাজ সচেতনতার প্রকাশ। এর সাথে ধর্মের কোন দ্বন্দ্ব নেই। আধুনিক কালে  ধর্মের এমন অপব্যাখ্যা দিয়ে নারীকে আবার অবরোধবাসিনী করার হীন প্রচেষ্টা করা হচ্ছে; যা ঠেকানো জরুরী বলে আমার মনে হয়।

  স্বাবলম্বী হবার প্রয়াসে অথবা সংসারে সচ্ছলতা আনতে  গিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছে যে নারীরা তাদের  কথা এবার বলতে হয়।  ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদে পা দিয়েছে গ্রামাঞ্চলের নারীরা। ঋণের ভার বইতে না পেরে আত্মহত্যা করার ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। তবু প্রত্যন্ত জনপদে ক্ষুদ্রঋণগ্রহীতাদের হার কম নয়।  পোষাক কারখানায় কর্মজীবি মেয়েরা শহরে ছোট রুম ভাড়া করে কষ্ট করে থাকে। তবে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান  কোম্পানি নিজেদের পরিবহন ব্যবস্থায় গ্রাম থেকেও কর্মীদের নিয়ে আসছে। গ্রামের প্রতিটি ঘরে ব্যস্ততা। স্বামী সন্তানদের খাবারের ব্যবস্থা করে নিজের খাবার সাথে নিয়ে কর্মক্ষেত্রে রুদ্ধশ্বাসে ছুটছে উদ্যমী নারী। এমনও দেখা যায়, বিয়ের ১৮-১৯ বছর পরও স্বামীর একার রোজগারে সংসার চলে না। ৩৭-৩৮ বছরের নারীও গার্মেন্টসে চাকরি নিচ্ছে। তবে ভীষণ দুশ্চিন্তা হয় , যখন দেখতে পাই দুর্জনেরা কিছু গার্মেন্টস কর্মীদের ফাঁদে ফেলে পঙ্কিলতার অন্ধকারে ডুবিয়ে দিচ্ছে তাদের জীবন। গ্রামের কর্মজীবী নারীর পরিবার এবং সন্তানের নিরাপত্তায় মায়ের অবর্তমানে প্রতিবেশীরা যেন সহনশীলতার সঙ্গে সহযোগিতা করে। সুখের ব্যাপার, কোনো কোনো গার্মেন্টে ডে-কেয়ার সেন্টার আছে, যেখানে গার্মেন্টসকর্মীরা তাদের শিশু-সন্তানকে রেখে নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারে।
বেগম রোকেয়ার স্বপ্ন আজ সত্য। লেডি কেরানি থেকে বিচারপতি সব পদে নারী দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করছে। বিচারিক কাজে নারীর সিদ্ধান্ত খুব কমই ভুল হয়। ব্যতিক্রম থাকতে পারে, তবে তা খুবই নগণ্য। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে বারবার উঠে এসেছে বাস্তবে নারী তার কর্মক্ষেত্রে তুলনামূলক বিচারে পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি সৎ এবং পরিশ্রমী।

কন্যা শিশুর বিপন্নতা সমাজের আরেক ভয়াবহ বাস্তবতা। পরিণত বয়স্ক পুরুষ দ্বারাও অনেক সময়ে নির্যাতিত হয়ে তার জীবন সঙ্কটাপন্ন হয়। বিকৃত রুচির মানুষগুলো আইনের কঠোর সাজার তোয়াক্কা কেন করেন না- সেই  বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারেন অপরাধবিশেষজ্ঞ বা সমাজ গবেষকরা। তবে  নিরীহ শিশু বা তরুণীদের জিম্মি করে পর্নোগ্রাফি তৈরি এবং প্রচারের মতো জঘন্য অপরাধ কন্যা শিশুদের নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে। এ এক  সঙ্কটকাল অতিক্রম করছি আমরা।

 আশার কথা,  তথ্যপ্রযুক্তি অপরাধীদের শাস্তির বিধান জারি করে আইন পাস হয়েছে সংসদে। অপরাধীদের অন্তত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া জরুরী; যার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি।

অনেক ক্ষেত্রে একটি কিশোরী বা তরুণীর ছবির সঙ্গে অন্য কোনো ছবি জুড়ে অশ্লীল, অশালীন বক্তব্যদানকারী  ধরা পড়ার পর তাদের বাঁচানোর জন্য দুর্ভাগ্যজনকভাবে সমাজের প্রভাবশালীরা তৎপর হন।

 রেল স্টেশন বা বাজারে পথশিশুরা পলিথিন মুখে দিয়ে মাদকে বুঁদ হয়ে  রাস্তায় পড়ে থাকে- তাদের বাঁচানোর উদ্যোগ না নিলে অন্ধকারের গহ্বরে তারা তলিয়ে যাবে। যারা সমাজকে মাদকের অন্ধকার গহ্বরে তলিয়ে দিতে চায়, সেসব গডফাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সময় এসেছে।একই ভাবে বলতে হয়,   মানবপাচার এখন সারা বিশ্বের বড় সমস্যা। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও অনেক সংগঠন এ নিয়ে কাজ করছে। অথচ মূল পাচারকারী শাস্তির বাইরেই থেকে যাচ্ছে, এ ব্যাপারে কারো সদিচ্ছা আছে বলে মনে হয় না।

দু' বছর আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ইভ টিজিংয়ের শিকার হয়ে এসিড পান করে। এক বছর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মৃত্যুর কাছে হার মানে সেই তরুণী।  মামলার আসামি ইভ টিজার তরুণের আইনজীবীর  আর্জি মতো ছাত্রটির শিক্ষাজীবন বাঁচাতে মহামান্য আদালত তার জামিন দেন।

এখানে পেশাগত দায়িত্ব প্রধান; মানবতাবোধ বিন্দুমাত্রও তাড়িত করেনি  আসামীপক্ষের  আইনজীবীকে। পরিতাপের বিষয়, এ ধরনের ঘটনা যখন ঘটে, সারাদেশে মানববন্ধন, আন্দোলন, সভা সমিতি হয়। তাও একসময়ে গতানুগতিক নিয়মে ভাটা পড়ে। সেই নিরীহ শিশু, কিশোরী-তরুণীর পাশে কেউ থাকে না।

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর মাদ্রাসা শিক্ষক আবদুস সাত্তার ২০০৪ সালে চার বছরের একটি কন্যা শিশুকে (বালকেরাও মাদ্রাসা শিক্ষকদের বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়) নির্যাতন করার পর তার পক্ষে সমাজসেবা অফিসের কর্মকর্তা সাক্ষ্য দেন। আদালতে বললেন, মামলার অভিযোগে উলি্লখিত ঘটনার সময়ে সাত্তার (ধর্ষক) নাকি সাতকানিয়া সমাজসেবা অফিসে ছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তৎকালীন মন্ত্রী, এমপিও এ ধর্ষকের চরিত্র 'ফুলের মতো পবিত্র' এমন সনদপত্র দেন। অনেক আইনজীবী আদালতে দাঁড়ান ধর্ষণকারী সাত্তারের পক্ষে, আর নির্যাতিত শিশুটির পাশে দাঁড়িয়ে আমি দেখলাম কেউ নেই। আরো অনেক মামলার মতো এ মামলাটি নিয়েও ৪টি বছর লড়াই করলাম। পাশে পেয়েছিলাম প্রথিতযশা আইনজীবী অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্তকে (বর্তমানে মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর)।

২০১০ সালে চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের তৎকালীন পিপি আখতার হোসেনের নেতৃত্বে মামলা পরিচালনাকালে  আসামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হলো। ৭ বছরের সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হলো ধর্ষক আবদুস সাত্তার।

তবে  খ্যাতনামা এবং উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিদের কেউ কেউ নিজের ব্যবসা, চাকরির সফলতার জন্য নিজের স্ত্রী বা কন্যাকে ক্ষমতাবান কোনো পুরুষের হাতে সমর্পণ করেন এমন অভিযোগ ও রয়েছে। অভিযোগের বিপরীতে  অভিযুক্ত ব্যক্তির  আত্মপক্ষ সমর্থন করে কোন বক্তব্য থাকে না।  তাদের কোনো অপরাধবোধও থাকে না। যা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয় এবং সমাজের জন্যে ভয়ংকর!

সমাজপতিদের কাছে নারী পুরুষের শারীরিক কাঠামোগত বৈষম্য ই গুরুত্বপূর্ণ।  নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সমাজপতিদের চরম অনিচ্ছা আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে অনেক খানি।

নারী পুরুষের সমানাধিকার, নারীর স্বনির্ভরতা, শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। জাতিসংঘ নারীর বৈষম্য দূর করার যে প্রস্তাব রেখেছে, নিজেদের স্বার্থে, সমাজের স্বার্থে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে। এতে পরিবার এবং সমাজ লাভবান হবে।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না,  নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠার দূরদৃষ্টি নিয়ে বেগম রোকেয়া  'সুলতানার স্বপ্ন'  দেখিয়েছেন । বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তার উত্তরসূরি বেগম সুফিয়া কামাল আমাদের হাত ধরে রাজপথে নামিয়েছেন। আজ সর্বক্ষেত্রে নারীর সদর্প পদচারণা, সমাজে নারীর যে অগ্রগতি তা তারই সুফল। আর বিভেদ নয়, আর অসাম্য নয়। নারী-পুরুষ পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক। একসাথে এগিয়ে যাবো আমরা। বর্তমানে সরকার নারীমুক্তির যে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, তা বাস্তবায়নের জন্য এগিয়ে আসতে হবে সমাজকেই।

 সমাজের সকল অন্ধকার দূর করে একদিন  আরো বহুদূরএগিয়ে যাবে নারী।   সেই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে নারীকে কূপমন্ডকতার  দিকে ঠেলে দেয়ার সব রকমের  হীন প্রচেষ্টা প্রতিরোধ করতে হবে।  এগিয়ে নিতে হবে পরবর্তী প্রজন্মকে। সব সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধে  উঠে অসাম্প্রদায়িক চেতনায়, মানবিক মন নিয়ে গড়ে তুলতে হবে এ সমাজ। আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০১৪ সফল হোক্।

নূরজাহান খান:  মানবাধিকার সংগঠক/ প্রধান নির্বাহী , লিরো

নারী- কাজী নজরুল ইসলাম

সাম্যের গান গাই-
   আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!
   বিশ্বে যা-কিছু মহান্‌ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
   অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
   বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,
   অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।
   নরককুন্ড বলিয়া কে তোমা’ করে নারী হেয়-জ্ঞান?
   তারে বলো, আদি পাপ নারী নহে, সে যে নর-শয়তান।
   অথবা পাপ যে-শয়তান যে-নর নহে নারী নহে,
   ক্লীব সে, তাই সে নর ও নারীতে সমান মিশিয়া রহে।
   এ-বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল,
   নারী দিল তাহে রূপ-রস-মধু-গন্ধ সুনির্মল।
   তাজমহলের পাথর দেখেছ, দেখেছো কি তার প্রাণ?
   অন্তরে তার মোমতাজ নারী, বাহিরেতে শা-জাহান।
   জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য লক্ষ্মী নারী,
   সুষমা-লক্ষ্মী নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারি’।
   পুরুষ এনেছে যামিনী-শানি-, সমীরণ, বারিবাহি!
   দিবসে দিয়াছে শক্তি সাহস, নিশীতে হ’য়েছে বধূ,
   পুরুষ এসেছে মরুতৃষা ল’য়ে, নারী যোগায়েছে মধু।
   শস্যক্ষেত্র উর্বর হ’ল, পুরুষ চালাল হল,
   নারী সেই মাঠে শস্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল।
   নর বাহে হল, নারী বহে জল, সেই জল-মাটি মিশে’
   ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে।

       স্বর্ণ-রৌপ্যভার,
   নারীর অঙ্গ-পরশ লভিয়া হ’য়েছে অলঙ্কার।
   নারীর বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি-প্রাণ,
   যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।

   নর দিল ক্ষুধা, নারী দিল সুধা, সুধায় ক্ষুধায় মিলে’
   জন্ম লভিছে মহামানবের মহাশিশু তিলে তিলে!
   জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান,
   মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান্‌।
   কোন্‌ রণে কত খুন দিল নর লেখা আছে ইতিহাসে,
   কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।
   কত মাতা দিল হৃদয় উপড়ি’ কত বোন দিল সেবা,
   বীরের স্মৃতি-স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?
   কোনো কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারী,
   প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।
   রাজা করিতেছে রাজ্য-শাসন, রাজারে শাসিছে রাণী,
   রাণীর দরদে ধুইয়া গিয়াছে রাজ্যের যত গ্লানি।

    পুরুষ হৃদয়-হীন,
মানুষ করিতে নারী দিল তারে আধেক হৃদয় ঋণ।
ধরায় যাঁদের যশ ধরে না’ক অমর মহামানব,
বরষে বরষে যাঁদের স্মরণে করি মোরা উৎসব,
খেয়ালের বশে তাঁদের জন্ম দিয়াছে বিলাসী পিতা,-
লব-কুশে বনে ত্যজিয়াছে রাম, পালন ক’রেছে সীতা।
নারী সে শিখা’ল শিশু-পুরুষেরে স্নেহ প্রেম দয়া মায়া,
দীপ্ত নয়নে পরা’ল কাজল বেদনার ঘন ছায়া।
অদ্ভুতরূপে পুরুষ পুরুষ করিল সে ঋণ শোধ,
বুকে ক’রে তারে চুমিল যে, তারে করিল সে অবরোধ!
    তিনি নর-অবতার-
পিতার আদেশে জননীরে যিনি কাটেন হানি’ কুঠার।
পার্শ্ব ফিরিয়া শুয়েছেন আজ অর্ধনারীশ্বর-
নারী চাপা ছিল এতদিন, আজ চাপা পড়িয়াছে নর।
    সে যুগ হয়েছে বাসি,
যে যুগে পুরুষ দাস ছিল না ক’, নারীরা আছিল দাসী!
বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি,
কেহ রহিবে না বন্দী কাহারও , উঠিছে ডঙ্কা বাজি’।
নর যদি রাখে নারীরে বন্দী, তবে এর পর যুগে
আপনারি রচা ঐ কারাগারে পুরুষ মরিবে ভুগে!
     যুগের ধর্ম এই-
পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই।

    শোনো মর্ত্যের জীব!
অন্যেরে যত করিবে পীড়ন, নিজে হবে তত ক্লীব!
স্বর্ণ-রৌপ্য অলঙ্কারের যক্ষপুরীতে নারী
করিল তোমায় বন্দিনী, বল, কোন্‌ সে অত্যাচারী?
আপনারে আজ প্রকাশের তব নাই সেই ব্যাকুলতা,
আজ তুমি ভীরু আড়ালে থাকিয়া নেপথ্যে কও কথা!
চোখে চোখে আজ চাহিতে পার না; হাতে রুলি, পায় মল,
মাথার ঘোম্‌টা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙে ফেল ও-শিকল!
যে ঘোমটা তোমা’ করিয়াছে ভীরু, ওড়াও সে আবরণ,
দূর ক’রে দাও দাসীর চিহ্ন, যেথা যত আভরণ!

        ধরার দুলালী মেয়ে,
ফির না তো আর গিরিদরীবনে পাখী-সনে গান গেয়ে।
কখন আসিল ‘প্নুটো’ যমরাজা নিশীথ-পাখায় উড়ে,
ধরিয়া তোমায় পুরিল তাহার আঁধার বিবর-পুরে!
সেই সে আদিম বন্ধন তব, সেই হ’তে আছ মরি’
মরণের পুরে; নামিল ধরায় সেইদিন বিভাবরী।
ভেঙে যমপুরী নাগিনীর মতো আয় মা পাতাল ফুঁড়ি’!
আঁধারে তোমায় পথ দেখাবে মা তোমারি ভগ্ন চুড়ি!
পুরুষ-যমের  ক্ষুধার কুকুর মুক্ত ও পদাঘাতে
লুটায়ে পড়িবে ও চরণ-তলে দলিত যমের সাথে!
এতদনি শুধু বিলালে অমৃত, আজ প্রয়োজন যবে,
যে-হাতে পিয়ালে অমৃত, সে-হাতে কূট বিষ দিতে হবে।
   সেদিন সুদূর নয়-
যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়!

Wednesday, February 19, 2014

মোস্টওয়ান্টেড টপটেরর জাওয়াহিরি এবং বাংলাদেশের গণমাধ্যম- সুমি খান

সম্প্রতি  আফগানিস্তান ভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন আল-কায়েদা  প্রধান  বিশ্বের মোস্ট ওয়ান্টেড টপ টেরর  জাওয়াহিরির নাম ও ছবিসহ এক অডিও বার্তায় বাংলাদেশ সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইসলামবিরোধী ষড়যন্ত্রেরবিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার আহ্বান জানানো হয়। ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের  সমাবেশের নামে তান্ডবের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির পতনের  স্বপ্ন দেখেছিলো যুদ্ধাপরাধী শক্তি। তাতে ব্যর্থ হয়ে ‘হাজার হাজার মানুষ’ হত্যার গল্পকথা ফেঁদে বিশ্বজুড়ে  জঙ্গী জনগোষ্ঠীকে একাট্টা করতে মাঠে সোচ্চার অন্ধকারের শক্তি আল-কায়দা-জামাত । জাওয়াহিরির এই বার্তায়  রাজপথে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করার অভিযোগ আনা হয়েছে  বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে। আর বাংলাদেশ সরকারকে   ধর্মনিরপেক্ষ সরকারহিসাবে  ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়েছে জাওয়াহিরি। মিশরীয় এই জঙ্গী সংগঠক তার অনুসারী জামাত হেফাজতিদের বিপন্নতা সইবে কী করে! যারা গত কয়েক দশক থেকে তাদের অর্থ এবং মানুষ যোগান দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক লবিস্ট টোবি ক্যাডম্যান ও আল-কায়েদা নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি জামায়াতে ইসলামীর হয়ে  বর্তমান সরকারকে হুমকি  দেবার প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, সন্ত্রাসীদের আওয়ামী লীগকে ভয় করা উচিত  । গত রোববার ফেইসবুকে এক স্ট্যাটাসে জয় লিখেছেন, “বিশ্বের মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসী আয়মান আল-জাওয়াহিরি আমাদের সরকারকে হুমকি দিচ্ছে তার সন্ত্রাসী ভাইদের দমন করায় যাদের ক্যাডম্যান রক্ষা করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। আমার কাছে বিষয়টা খুব মজার মনে হয়েছে  টোবি ক্যাডম্যান এবং আল-কায়েদা উভয়ই জামায়াতের পক্ষ থেকে আমাদের সরকারকে হুমকি দিচ্ছে।আমরা একজন ভাড়াটে আইনজীবী ও দালাল পেয়েছি , যিনি  তাদের পক্ষে , যারা পথচারীদের ওপর নির্বিচারে পেট্রোল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেই বিএনপি-জামায়াতের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে  বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে সরকারের বিরুদ্ধে ক্যাডম্যানের অভিযোগ এবং সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আল-কায়েদা প্রধানের জিহাদের ডাক বাংলাদেশ সরকারের জন্য ভালো হয়েছে মনে করেন জয়। জামায়াতের সন্ত্রাসীরা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ও তাদের আইনি প্রতিনিধিদের সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছে, এটা তাই প্রমাণ করে যে, আমরা ভালো লোক। আমি অতিশয় আনন্দিত যে সন্ত্রাসীরা আমাদের একই সাথে ঘৃণা এবং ভয় করে! তাদের উচিৎ আওয়ামী লীগকে ভয় করা, অনেক ভয়। জয় বলেন, সরকার ও তার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শুধু অধিকার নয়, তাদের আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব নাগরিকদের জীবন রক্ষা করা।যদি কোনো সন্ত্রাসী মানুষের গায়ে আগুন দিতে চায় বা বোমার বিস্ফোরণ ঘটাতে চায়, পুলিশের দায়িত্ব তাদের থামাতে যে কোনো এবং সব ধরনের প্রয়োজনীয় বল প্রয়োগ করা। যখন একজন নিরীহ নাগরিক এবং একটা সন্ত্রাসীর মাঝ থেকে বেছে নেয়ার সুযোগ দেয়া হবে তখন আমরা অবশ্যই বেছে নিবো কীভাবে নাগরিকদের রক্ষা করা যায়। কথাটি এক অর্থে ঠিক বলেছেন তিনি, রাষ্ট্রক্ষমতায় আওয়ামী লীগ থাকলে যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়, যদি  কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী  বা জঙ্গী সংগঠন এদেশের মাটিকে ব্যবহার করে প্রশ্রয় না পায় , তবে আওয়ামী লীগ তাদের ত্রাস বটে; তারা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার কে ক্ষমতাচ্যুত করার সব ধরণের ষড়যন্ত্র করবে এটাই স্বাভাবিক। তবে  জেনে বা না জেনে যখন সেই ষড়যন্ত্রের সহায়ক শক্তি  হিসেবে ক্ষমতাসীন দলের  বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা কর্মীর সংশ্লিষ্টতা থাকে – তা ভয়ংকর বিপজ্জনক!  এ কারণে সরকার এবং দলের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সতর্ক ভূমিকা জনগণ প্রত্যাশা করে।
গত বছরের হেফাজতকাণ্ডের সূত্র ধরে আল-কায়েদার ওই বার্তায় রাজপথে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করার অভিযোগ আনা হয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে। মূলত:  একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে ক্ষোভ স্পষ্ট হয়েছে এ বার্তায়।
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক  ১৭ ফেব্রুয়ারী কুতুবদিয়ায় নৌবাহিনীর  বার্ষিক মহড়া দেখার পর   জাওয়াহিরির ভিডিও বার্তা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের  জবাবে  স্পষ্ট ভাবে বলেছেন,  “বাংলাদেশে আল কায়দা  আগে যে ফেসিলিটিজ পেতো, তা এখন পায় না বলেই হুমকি দিচ্ছে । তাই আল কায়দার হুমকি সবসময় আছে ,  তা মোকাবেলায় সরকার প্রস্তুত । প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  ক্ষমতায় এসেই বলেছেন, এদের বের করে দাও। অনেককে বের করে দেয়া হয়েছে। আগে অনেক সরকারি সংস্থাও তাদের সুবিধা দিয়েছিল। তাই প্রধানমন্ত্রীর  জীবনের ঝুঁকি অনেক আগে থেকেই আছে। ( বিডি নিউজ ২৪ , ১৭ ফেব্রুয়ারী)  ।  প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা জেনারেল তারেকের  এ বক্তব্য বাস্তব সত্য বলেই আমরা বারবার জেনেছি।  তবে তার আরেকটি বক্তব্য নিয়ে  আমার প্রশ্ন  রয়েছে।  তারিক সিদ্দিক কী করে বললেন, “আগে আল কায়েদার একটা পলিসি ছিল। আমরা তোমাদের এখানে আসবো-থাকবো; তোমাদের ক্ষতি করব না। এখন আর সে পলিসি নেই”?  বিস্মিত হলাম এ বক্তব্যে। কখনো  কোন কালে কি কারো  ক্ষতি না করার  পলিসি আল কায়দার  ছিল, তিনি জানেন? কোথায় ছিল?  সত্যি,যদি তা  হয়ে থাকে - সকলের  জানা প্রয়োজন।  আর যদি তা না হয়ে থাকে, রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের  দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিদের এমন বক্তব্য উদ্বেগজনক। বেসিক কনসেপশানের জায়গায় আমাদের  হয়তো এখনো অনেক ত্রুটি রয়ে গেছে । 
সারা বিশ্বে ‘আল কায়দা’ বা ‘মুসলিম ব্রাদার হুড’  ভয়ংকর সন্ত্রাসে নেতৃত্ব দিচ্ছে , তার জবাব ও পাচ্ছে। মুরসির ফাঁসি নিশ্চিত-বলছে আমার মিশরীয় অনেক বন্ধু। মানবতার চরম অবমাননার শাস্তি একদিন পেতেই হয়- এ তার প্রমাণ । এ বাস্তবতায়  রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আল- কায়দা বা মুসলিম ব্রাদারহুডের জঙ্গীবাদ এবং সভ্যতার প্রতি তারা কতো বড়ো হুমকি-সে  সম্পর্কে  স্পষ্ট এবং স্বচ্ছ ধারণা  থাকা জরুরী। নাহয়  এদেশে  তাদের দোসর হেফাজত জামাত বিএনপির তান্ডব মোকাবেলা কঠিন থেকে কঠিনতর হবে।
 আল কায়দার হুমকি  বাংলাদেশের জন্যে নতুন কিছুই নয়। জাওয়াহিরির মরিয়া বক্তব্যের এ  বার্তা  জামাত বিএনপি প্রেমী দের একাত্মতা নতুন করে মনে করিয়ে দিলো কেবল।
এক্ষেত্রে আমাদের মিডিয়াকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাদের করনীয়। আর কতোদিন তারা তথাকথিত ‘গণতন্ত্রে’ র নামে জামাত বিএনপি হেফাজতিদের সংবাদ প্রকাশ করে যাবে? রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ পজেটিভ যে অবস্থানে পৌঁছেছে, বিশ্বজুড়ে তার স্বীকৃতি থাকলেও নিজের দেশের গণমাধ্যমে তার বিপরীত চিত্র আমরা দেখতে পাই।
এর কারণ কী?  কালো টাকার কাছে বন্দী গণমাধ্যমে দলীয় বিবেচনায় পদায়ন নিয়মিত চিত্র। যে কারণে  পেশাদারীত্ব রক্ষায় দায়িত্বশীল আচরণ নেই কারো। এ পরিস্থিতিতে একুশে পদক আলোচনা- সমালোচনায় আসবে এটাই স্বাভাবিক।  
জনকন্ঠের নির্বাহী সম্পাদক  শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক স্বদেশ রায় ১৩ ফেব্রুয়ারী জনকন্ঠে প্রকাশিত তার লেখায় সত্যিই সাহসের সাথে সত্য উচ্চারণ করেছেন  । এ তার স্বভাবজাত। । শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক মুনতাসির মামুন তার ‘রাজাকারের আত্মজীবনী ‘ লেখাটিতেও এ বিষযটি তুলে ধরেছেন।
আমি অতি সাধারণ এক সংবাদকর্মী। হিসেব করে চলতে পারি না, তাই হিসেব করার চেষ্টা ও করিনি কখনো। তবে দেশের সুশীল সমাজ আর ‘কৃতি’ সাংবাদিক নেতাদের  এমন দোদুল্যমান  বা সন্ত্রাসের পক্ষে অবস্থান আমার মনে অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম দেয়। 
বাংলাদেশের জামাত বিএনপির প্রোপাগান্ডা থামবে না। তবে প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং পাকিস্তানের  অনেক গণমাধ্যম এখনো জামাত আল- কায়দা নিয়ন্ত্রিত সন্ত্রাসের প্রকৃত তথ্য প্রকাশে নিঃশঙ্ক চিত্ত।  আমরা কেন তা হারাতে বসেছি?  জাওয়াহিরির বক্তব্যের সাথে সাথে  পত্রিকা, টেলিভিশনে গুরুত্বের সাথে হেফাজতের সংবাদ, তাদের দোসর বিএনপি জামাতের বক্তব্য প্রচার করলো সবাই । তাদের জবাবদিহিতায় আনার চেষ্টা করলো না কেউ?
ভারতের বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রচারিত হয়েছে, জামাতে ইসলাম আর ভারতের আম-আদমী পার্টি একাট্টা হয়েছে । এই ঠগবাজ দের সাধারণ মানুষ আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে ও তাদের দুই কান কাটা। তাই তাদের যেন  লজ্জা ও লাগে না।বাংলাদেশ , ভারত আর পাকিস্তানের জামাতে ইসলামী আল-কায়দার সাথে কাজ করছে বরাবরই। ভারতের আম আদমী পার্টির প্রধান  অরবিন্দ কেজরিওয়াল  দিল্লীতে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন জামাতে ইসলামী তাদের সাথেই আছে।১৪ ফেব্রুয়ারী ভ্যালেন্টাইন’স ডেতে বিশাল অনুষ্ঠান করে ভারতের  জামাতে ইসলাম। জামাতে ইসলাম হিন্দ এর  কেন্দ্রীয় কমিটি মারকাজে মজলিশে শুরার  প্রভাবশালী সদস্য হাসান রাজা ইসলামিক একাডেমি সহ জামাত নিয়ন্ত্রিত অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রধান। তার সভাপতিত্বে  দিল্লীতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তারা আম আদমী পার্টিকে আমন্ত্রন জানায়। অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক ছিল  জামাতের সহযোগী  সংগঠন ইউনাইটেড মিল্লি ফোরাম। ছবি সহ এই সংবাদ প্রকাশ করে জামাতের সহযোগী এ সংগঠনগুলোকে  কাগুজে বাঘের সাথে তুলনা করেছে নর্দার্ন ভয়েজ অনলাইন। জামাত আয়োজিত  এ অনুষ্ঠানের অতিথি  আম আদমী পার্টির শীর্ষ সংগঠক সঞ্জয় সিং জামাতের সাথে তাদের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে বলেছেন আম আদমী পার্টি ধর্ম বর্ণ গোত্র ভেদাভেদ করে না, তাই তারা জামাতের সাথে একাত্ম। আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার মুখপাত্র টাইমস  অফ আসাম ১৮ ফেব্রুয়ারী লীড প্রধান সংবাদে প্রচার করেছে, ৫ জানুয়ারীর ‘বিতর্কিত’ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করার ‘ষড়যন্ত্র’ করেছে ভারত।
  অন্যদিকে পাকিস্তানের কোন কোন গণমাধ্যম বাংলাদেশের সাফল্যের সংবাদ গর্বের সাথে প্রচার করছে। ২৩ অক্টোবর,২০১৩ পাকিস্তানের সাংবাদিক মুতাজা হায়দার  ডন পত্রিকায় রিপোর্ট করেছেন,  ১৯৭১ সালে যে বাংলাদেশ কে জুলফিকার আলী ভুট্টো ‘শুয়োরের দেশ’  (শুকরের দেশ) বলেছিলো , পশ্চিম পাকিস্তানীরা ‘ ভুখা –নাঙ্গা’ বলে যে বাঙ্গালীদের বকা ঝকা করতো,  একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জন করে সেই বাংলাদেশ এখন পাকিস্তান, এমনকি ভারতকেও ছাড়িয়েছে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতায়।তাই বাংলাদেশ আর দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুধাপীড়িত দেশ নেই ।গ্লোব্যাল হাঙ্গার ইনডেক্স এর জরীপ তুলে ধরে ডন লিখেছে, পাকিস্তান এখনো  ক্ষুধাপীড়িত নাগরিক দের মুখে অন্ন জোগানোর  চেষ্টায়  ছুটাচ্ছে, আর বাংলাদেশ মানব উন্নয়নের ঘোড়ায় লাগাম ছুটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দোর্দন্ড প্রতাপে। 

সাধারন মানুষের জীবন বিপন্ন করে  জঙ্গী গোষ্ঠী সর্বত্র  হত্যা, সন্ত্রাস আর আপহরণের তান্ডব চালাচ্ছে।  আল আদল ইরান ও ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র সিরিয়ায় বন্দি ৩শসুন্নির সঙ্গে তাদের বিনিময় করার দাবি করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে । দশদিন আগে পাকিস্তানি সুন্নি জঙ্গিরা পাঁচ ইরানি সীমান্তরক্ষীকে  বন্দী করেছে। সুন্নি জঙ্গিগোষ্ঠী জইশ আল আদল বলেছে, ইরানি রক্ষীদের আটকের পেছনে তাদের হাত রয়েছে।অজ্ঞাত একটি জায়গায় কয়েকজনকে বেঁধে রাখা হয়েছে, এমন একটি ছবি পোস্ট করে তা ইরানি রক্ষীদের বলে দাবি করেছে গোষ্ঠীটি। শুক্রবার আল আরাবিয়া টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভিডিওতে, আটককৃত ইরানি রক্ষীদের মধ্যে একজন সার্জেন্ট জামশেদ দানাইফার্দ ভিডিও তে বলেছেন- তারা নিরাপদ ও ভালোআছেন। এদের মুক্ত করতে যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে দেশটিতে সেনা অভিযান চালানোর হুমকি দিয়েছে ইরানি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুলরেজা রহমানি ফাজলি ।বিবিসি বলেছে, ৮ ফেব্রুয়ারি ওই রক্ষীদের ইরানের সিসতান বেলুচিস্তান অঞ্চল থেকে আটক করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।কঠোরতারসঙ্গে বিষয়টি দেখার ও বন্দিদের মুক্ত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপনেয়ার জন্য ইসলামাবাদের কাছে দাবি জানিয়েছেন ইরানি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফাজলি।  ইরানি রক্ষীদের যে দিন আটক করা হয়, সেই দিনই ইরানে নিযুক্ত পাকিস্তানি চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে ডেকে পাঠায় ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই বিষয়ে ইসলামাবাদ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটির নেতাদের ও সদস্যদের (যারা পাকিস্তানে পালিয়ে গেছে) বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেবলে দাবি জানায়।
১৭ ফেব্রুয়ারী  একই দাবির পুনারাবৃত্তি করে ফাজলি বলেছেন, অন্যথায়,  আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের  সীমান্ত এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তানের অবশ্যই ইরানকে কাজ করার অনুমতি দিতে হবে।
আবারো পাকিস্তানের ডন পত্রিকার একটি সংবাদ তুলে ধরতে হয়।  ২০১৩  সালের ৩ সেপ্টেম্বর মোষ্ট ওয়ান্টেড এক্সট্রিমিস্ট লিডার আবু জারারা আল ইয়েমিনিকে পাকিস্তানের  মুরিরি এলাকার সবচেয়ে জনপ্রিয় ভ্যাকেশন স্পটের একটি হোটেল থেকে  গ্রেফতার করে নিয়ে যায়  সৌদি বিশেষ বাহিনী। ৪টি হেলিকপ্টারে করে এই বাহিনীর সদস্যরা পাকিস্তানের  পাঞ্জাবের রাওয়িন্ড এলাকায় অবতরণ করে। সেখান থেকে উটে চড়ে মুরুরি এলাকায় গিয়ে ঘাড়ে ধরে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় শীর্ষ সন্ত্রাসী জারারা কে ।  জামাতে ইসলাম পাকিস্তান এবং অন্যেরা ঘটনার বর্ণনা শুনে প্রাথমিক ভাবে ধারণা করে এই  গ্রেফতার অভিযান মার্কিন বাহিনীর। জামাতে ইসলাম পাকিস্তান এবং জামিয়াত উলামায়ে ইসলাম বিক্ষোভে ফেটে পড়ে রাস্তায়।  পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন করে  বারবার এমন মার্কিনি হামলা বরদাশত করা হবে না।  গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশের জন্যে দাবি তোলে। এমন ও বলে, “  যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সে যদি জারারাও হয়,পাকিস্তান সরকারের লজ্জিত হওয়া উচিত!কারণ, সে একজন মুক্তিযোদ্ধা; আমেরিকার বিরুদ্ধে সে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করছে!”  কিন্তু  জারারা কে গ্রেফতার করেছে সৌদী বাহিনী – এ তথ্য  জানার সাথে সাথে জামাতি  ঠগবাজ নেতাদের  এতোক্ষণের ক্ষুব্ধ মনোভাব আর কুঁচকানো ভুরু বদলে হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে।   নিজেদের দেশে ‘বাপের দেশ’ সৌদী অভিযানে যেন চরম  উল্লসিত তারা। জামাতি জঙ্গীরা চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘জাজ্জাকাল্লাহ’  ! আরবী ভাষায় যার অর্থ , আল্লাহ তোমায় পুরস্কৃত করুন! আরো বললো, “মাশাল্লাহ! মাশাল্লাহ! ইসলামী দুনিয়ার জন্যে আজ সবচেয়ে গৌরবের দিন!!” সেই সমাবেশেই  তারা চিৎকার করে বলে ওঠে, “ না, জারারা  পাকিস্তানের কোন বন্ধুই হতে পারে না। এমন কি  সে মুসলমান ই নয়!” “এই এক্সট্রিমিস্ট রা পাকিস্তানের চরম শত্রু, এদের হত্যাই একমাত্র শাস্তি!” এমন বক্তব্য দিয়ে জামাতে ইসলাম পাকিস্তান এবং জামিয়াত উলামায়ে ইসলাম সহ তাদের অন্যান্য সহযোগী সংগঠন এক যৌথ বিবৃতি দেয়।  পরবর্তীতে পাকি মিলিটারী স্পোকসম্যান সংবাদ সম্মেলন করে সৌদি বাহিনীর টপ টেরর গ্রেফতার  অভিযান ব্যাখ্যা করে।  এতেই শেষ নয়,  ঘটনার পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বক্তব্য দিয়ে পাকিস্তানের জনগণ  এবং সৌদী সরকারকে ধন্যবাদ জানায় পাকিস্তানের জঙ্গীবিরোধী অভিযান সফল করা এবং এতে সহযোগিতা করার জন্যে। এবার জামাত কার পক্ষে বলবে?
  যথারীতি এখানে ও একই হঠকারী ভন্ড  আচরণ জামাতের।  চট্টগ্রামের লালখান বাজার মাদ্রাসার পরিচালক মুফতি ইজাহার এর  মাদ্রাসায় ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর  হ্যান্ড গ্রেনেড তৈরির সময়ে  শক্তিশালী বিষ্ফোরণে  তিন মাদ্রাসা ছাত্র নিহত হয়।  ঘটনার পরপর হেফাজতে ইসলাম সংবাদ সম্মেলন করে মুফতি ইজাহারের সাথে কন্ঠ মিলিয়ে  হাস্যকর  ভাবে বলে, এ ঘটনা সামান্য কম্পিউটার বিষ্ফোরণ এবং পুরোটাই পুলিশের সাজানো । এ মামলায়  ইজাহার এবং তার পুত্র  হেফাজতের সামরিক শাখার প্রধান হারুণ ইজাহারের  বিরুদ্ধে  চার্জশীট দেয় পুলিশ। সাথে সাথে হেফাজতে ইসলাম চট্টগ্রামে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে , ইজাহার এবং তার পুত্র হেফাজতের কেউ নয়! চমৎকার!
পরিশেষে উল্লেখ করতে হয় গত বিশ বছর ধরে এই অন্ধকার  তালেবান জঙ্গী গোষ্ঠীর হত্যা , সন্ত্রাস আর ষড়যন্ত্রের চিত্র তুলে ধরেছি তৃণমূল থেকে। তার খেসারত হিসেবে মৃত্যু পরোয়ানা, আক্রমন, হামলা, গ্রেফতার  সবই পোহাতে হয়েছে। এখন  পোহাতে হচ্ছে ‘আওয়ামী লীগের দালাল’ অপবাদে কর্মহীন জীবনের গ্লানি।   ২৮ নভেম্বর ২০০৪ সালে গ্রেফতার  করে বিএনপি সরকার। বারবার ইন্টারোগেশান সেলের মুখোমুখি হই প্রশ্ন ছিল তালেবান কে, কোথায়?  আমি পাল্টা প্রশ্ন করেছিলাম, “আপনারা জানেন না, কারা রাস্তায় প্রকাশ্যে মিছিল করে বলে,আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান!”  মনে পড়ছে প্রিসিলা রাজ , সালিম সামাদের কথা । যারা অনেক নির্যাতিত হয়েছিলেন। আমার ছোট্ট শিশুটির গায়ে  সেদিন অনেক জ্বর । কখন যেন রাস্তায় বেরিয়ে পুলিশের গাড়ির পেছন পেছন চলে গিয়েছিলো কিছু পথ।সেসব অনেক কথা, পরে জানতে পেরেছি।  আবারো হয়তো দুর্দিন এলে আমাদের কলম থেমে থাকবে না কখনো।
তবে সেদিন যারা বিএনপির সন্ত্রাস নারী নির্যাতন বা জঙ্গী পোষণে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলো, গত ৫ বছরে তাদের রম্য হর্ম্য মাঝে রমরমা অবস্থা দেখে বুঝে গেছি, এ সমাজ সবসময়ে অপরাধীদের পক্ষে । তাই তো স্বদেশ রায় , মুনতাসীর মামুন বা শাহরিয়ার কবিরের কলম থামে না।  এই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আতিকুল্লাহ খান মাসুদ বা তোয়াব খান ছাড়া দুঃসময়ে সত্য প্রকাশের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাউকে পাওয়া যাবে না। তাই সম্মানিত এই সম্পাদক প্রকাশকদের জীবদ্দশায়  রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি  না ও পেতে পারেন। তাতে কী বা এলো গেলো । সমাজ বদলের সংগ্রামে এবং  দেশ মাতৃকার কল্যাণে একজন সংবাদকর্মী নিবেদিত থাকলে তার পাঠক বা দর্শক ই তার সর্বোচ্চ বিচারক। তাদের বিচারে যদি সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা গণ্য হয়, আমার  বিশ্বাস কলম সৈনিক দের সেটাই পাথেয়! sumikhan29bdj@gmail.com

Monday, February 17, 2014

এই পরাজয় শুধু বিএনপির নয়, সুশীল সমাজেরও -আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী


আমার যেসব বন্ধু ঢাকার ‘ডেইলি স্টার’ কাগজটি পাঠ করেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ইদানীং আমাকে জিজ্ঞাসা করতে শুরু করেছেন, ‘পত্রিকাটির সম্পাদক মাহফুজ আনাম হঠাৎ এত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন কেন? আগে তাঁর লেখায় আওয়ামী ও হাসিনাবিদ্বেষ থাকলেও তাতে একটা সংযম ও শালীনতার বাঁধ ছিল। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের কিছু আগে থেকে সেই বাঁধটি হঠাৎ ভেঙ্গে গেল কেন? নিরপেক্ষতার ভান করে স্টারের সহোদরা প্রথম আলোর সম্পাদক আওয়ামী-বেসিংয়ের কাজটি চালাতেন। হঠাৎ সেই কাজটি মাহফুজ আনাম কেন আরও উলঙ্গভাবে করতে শুরু করেছেন?’

এই প্রশ্নটির জবাব দিতে আমাকে যে ভাবতে হয়নি তা নয়। কিন্তু দিয়েছি। নিজের বিচার-বিবেচনা অনুযায়ীই আমার এই জবাব। ‘স্টারের’ পাঠক বন্ধুদের বলেছি, মানুষ রাগলে তার আসল চরিত্রটা বেরিয়ে আসে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন হতে পারাটা এবং আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থেকে যাওয়াটা মাহফুজ আনামকে এতটাই ক্রুদ্ধ ও হতাশ করেছে যে, তাঁর সৌম্য শান্ত ভদ্র চেহারার আড়াল থেকে চরিত্রের আসল রূপটি বেরিয়ে এসেছে।

ক্রুদ্ধ হয়েছেন অবশ্য প্রথম আলোর মতিউর রহমানও। তিনি চালাক। তাঁর আওয়ামীবিদ্বেষী চেহারাটা বাইরে বেশি এক্সপোজড হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন দুজন মুন্সি নিয়োগ করেছেন তাঁর হয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তীর ছোঁড়ার জন্য। তাতে পাল্টা তীরের প্রত্যাঘাত থেকে নিজে বেঁচে যাবেন ভাবছেন। তবে একটু কম চালাক মাহফুজ আনাম প্রচন্ড রাগে হঠাৎ স্বরূপে আবির্ভূত হয়েছেন।

তাঁর এই রাগের কারণও আছে। দীর্ঘকাল ধরে তাঁরা একটি স্বপ্নের চাষ করে আসছেন। সেটি হলো বাংলাদেশে রাজনৈতিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থপুষ্ট বিগ এনজিওগুলোর কর্তৃত্বাধীন একটি অনির্বাচিত সরকার গুড গবর্নেন্স বা সুশাসনের নামে প্রতিষ্ঠা করা। এটা সামরিক শাসনের যুগ নয়। তাই আমেরিকাও এখন কোন দেশে তার স্বার্থরক্ষা ও আধিপত্য রক্ষার জন্য সামরিক ডিক্টেটরশিপ প্রতিষ্ঠা করতে চায় না। সাবেক তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে তারা সামরিক বাহিনীর স্থলাভিষিক্ত করেছে বিগ এনজিও।

সামরিক বাহিনী থেকে কোন জেনারেলকে লৌহমানব সাজিয়ে ক্ষমতায় বসানোর বদলে তারা এই অনুগত এনজিওর কর্তাব্যক্তিদের মধ্য থেকে কাউকে নাইটহুড, কাউকে নোবেল পুরস্কার পাইয়ে দিয়ে দেশটির মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলে ক্ষমতায় বসিয়ে সে দেশে তাদের সাম্রাজ্যবাদী ও ধনবাদী বিশ্বস্বার্থ ও আধিপত্য স্থায়ী করতে চায়। এ জন্যই আগের বাতিস্তা, পিনোচেট, আইয়ুব, ইয়াহিয়ার বদলে মালিকি, কারজাই প্রমুখ অসামরিক ব্যক্তিদের আবির্ভাব ও ক্ষমতা লাভ। অবশ্য তাঁদের ক্ষমতায় আনার জন্য মার্কিন সেনাবাহিনীর পাহারায় নির্বাচন-প্রহসনও করতে হয়েছে। এখন আমেরিকা বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনায় মুখর। কিন্তু তাদের প্রত্যক্ষ অথবা প্রচ্ছন্ন পাহারায় ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে যে ধরনের নির্বাচন হয়েছে, তার প্রক্রিয়া সম্পর্কে নীরব।

তবে একটা ব্যাপারে মার্কিন তাঁবেদার সামরিক ডিক্টেটরদের মুখে যে সেøাগান শোনা গেছে, তা এখন আমেরিকার সমর্থনপুষ্ট বিগ এনজিওগুলোর কর্তাব্যক্তি এবং তাদের অর্থ ও অনুগ্রহপুষ্ট একশ্রেণীর সুশীল সমাজের মুখেও শোনা যায়। সেøাগানটি হলো ‘রাজনীতি খারাপ। রাজনৈতিক সরকার সুশাসন দিতে পারে না। তারা সকলেই দুর্নীতিপরায়ণ’-উপমহাদেশে এই সেøাগানটি প্রথম শোনা গিয়েছিল পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের মুখে। তিনি বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করে সেøাগান তুলেছিলেন, ‘উবাবষড়ঢ়সবহঃ ৎধঃযবৎ ঃযবহ ফবসড়পৎধপু’ (গণতন্ত্রের চাইতে উন্নয়ন দরকার)। 
আইয়ুবের দীর্ঘ দশ বছরের স্বৈরাচারী শাসনে দেখা গেল, রাজনৈতিক আমলের চাইতে পঞ্চাশগুণ বেশি দুর্নীতিতে তাঁর সব উন্নয়ন রাঘব বোয়ালে খেয়ে ফেলেছে। যে ‘নিউইয়র্ক টাইমস্্’ পত্রিকাটি তাদের দ্বারা সৃষ্ট লৌহমানব আইয়ুবের গুণগানে মুখর ছিল, সেই পত্রিকা আইয়ুবের পতনের আগে তাঁকে খেতাব দিয়েছিল। ‘থিফ অব বাগদাদ।’ তাঁর ছেলে গওহর আইয়ুবের সামান্য ক্যাপ্টেন পদ থেকে রাতারাতি ধনকুবের ও শিল্পপতি হওয়ার কাহিনীতে সংবাদপত্রের পৃষ্ঠা ভরে উঠেছিল।

বাংলাদেশে রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে আইয়ুবের সেøাগানের পুনরাবৃত্তি করেন ‘ক্ষুদে বাংলাদেশী আইয়ুব’ জেনারেল জিয়াউর রহমান। ‘রাজনীতিকরা সকলেই খারাপ’ শুধু এই কথা বলেই তিনি ক্ষান্ত হননি, ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘ও রিষষ সধশব ঢ়ড়ষরঃরপং ফরভভরপঁষঃ ভড়ৎ ঢ়ড়ষরঃরপরধহং’ (আমি রাজনীতিকদের জন্য রাজনীতি করা কষ্টকর করে তুলব)। সেটা তিনি করেছিলেনও। ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ ধ্বনি তুলে সরকারী ব্যাংক, বেসরকারী ব্যাংক, বিদেশী উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ এবং পেট্রোডলার দু’হাতে ছড়িয়ে দেশে চরিত্রহীন নব্য ধনপতি শ্রেণীর বিকাশ ঘটান এবং সেই সঙ্গে সৎ ও প্রকৃত রাজনীতিকদের রাজনীতি থেকে তাড়িয়ে এমন সব নব্য রাজনীতিককে বাজারে এনে প্রতিষ্ঠা দেন যাঁদের দুর্নীতি ও সন্ত্রাস-অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।
ইতিহাস একদিন সাক্ষ্য দেবে বাংলাদেশের মূল রাজনীতি, ছাত্র রাজনীতি ও যুব রাজনীতিকে জিয়াউর রহমানই প্রথম ‘পলুয়েটেড’ করার সূচনা করেন। তার পরবর্তী শাসক জেনারেল এরশাদ তাঁকে পূর্ণতা দেন। দুর্নীতিতে দেশ ভরে গেছে এই অজুহাত তুলে যিনি ক্ষমতা দখল করেছিলেন, তাঁর শাসনামলে দেখা গেল তিনি যাঁদের দুর্নীতির দায়ে জেলে পুরেছেন, তাঁদেরই জেল থেকে ছাড়িয়ে এনে তাঁর মন্ত্রী, ভাইস প্রেসিডেন্ট ইত্যাদি পদে বসাচ্ছেন। দুর্নীতির বিশ্ব রেকর্ড ভঙ্গের অভিযোগ নিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে জেনারেল এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে।

রাজনৈতিক শাসনেও দুর্নীতি হয়। এমন যে পবিত্র মক্কা শরীফ, সেখানেও চুরি, দুর্নীতির দায়ে প্রতিসপ্তাহে মানুষের কল্লা কাটা হয়। চীনে কমিউনিস্ট শাসনও দুর্নীতি উচ্ছেদ করতে পারেনি। কমিউনিস্ট পার্টি ও সরকারের বাঘা বাঘা নেতার দুর্নীতির দায়ে ফাঁসি হয়। রাজনীতিকরাও সকলে ফেরেশতা নন। তবে অরাজনৈতিক ও অনির্বাচিত শাসকদের মতো তাঁরা দু’হাতে শোষণ-লুণ্ঠন চালাতে পারেন না। তাঁদের একটা জবাবদিহিতা আছে, দায়বদ্ধতা আছে নির্বাচকমন্ডলীর কাছে। প্রতি ৫ বছর অন্তর তাঁদের নির্বাচকমন্ডলীর সামনে দাঁড়াতে হয়। তাঁদের দুর্নীতি ধরা পড়লে শুধু আদালতের বিচারেই দন্ডিত হন না, নির্বাচকম-লীর দ্বারাও প্রত্যাখ্যাত হন। সকল রাজনীতিকই যে ধরা পড়েন ও শাস্তি পান তাও নয়। সেটা রাজনীতির দোষ নয়; সমাজ ব্যবস্থার দোষ।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক শাসনে প্রচুর দুর্নীতি হয়েছে। তার একটা বড় কারণ, অস্ত্রের জোরে প্রকৃত রাজনীতি ও রাজনীতিকদের রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে হটিয়ে দিয়ে সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসকরা বেপরোয়া লুটপাটের যে কলুষ প্রশাসনে ও রাজনীতিতে ছড়িয়ে দিয়ে যান, প্রকৃত রাজনীতিকরা ক্ষমতায় এসে তাঁর লেগাসি থেকে সহজে মুক্ত হতে পারেন না। মুক্ত হওয়ার জন্য রাজনৈতিক শাসনকে, তা যতই ভাল কিংবা মন্দ হোক একটা দীর্ঘ সময় দিতে হবে। বারংবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর ক্ষমতার হাত বদলই দেশে দুর্নীতির প্রকোপ ধীরে ধীরে হ্রাস করতে পারে। দুর্নীতি দূর করা গেলে সুশাসন প্রতিষ্ঠাও সম্ভব। কারণ, একটি অন্যটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কোন দেশে দুর্নীতির জোয়ারে শুধু উন্নয়ন নয়, সুশাসনও ভেসে যায়।

ভারতের মতো প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রের দেশে অব্যাহত রাজনৈতিক শাসনেও দুর্নীতির প্লাবন রোধ করা যায়নি। কিন্তু এই দুর্নীতির প্লাবন রোধে আন্না হাজারের মতো প্রতিবাদী কণ্ঠ কোটি মানুষের সমর্থন পেয়েছে। আম-জনতার পার্টি গঠিত হয়েছে। তারা দিল্লীর মতো রাজ্যে ক্ষমতা দখলও করেছে। কেন্দ্রে শাসক কংগ্রেস দল এখন দুর্নীতির অভিযোগে বিব্রত এবং নিজেদের সংশোধনে ব্যস্ত। ভারতে রাজনৈতিক শাসনের বদলে অনির্বাচিত সুশীল সমাজের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলেও এটা হতে পারত না।

বাংলাদেশেও দুর্নীতি এবং আমলাতান্ত্রিক অপশাসন এতটা ঘাঁটি গেড়ে বসতে পারত না যদি রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক শাসনকে (তা যত ভাল অথবা খারাপ হোক) বার বার উচ্ছেদ করে সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসন প্রতিষ্ঠা করা না হতো, সামরিক শাসকরা তাদের ক্ষমতার স্বার্থে রাজনীতিকদের একটা অংশকে চরিত্রভ্রষ্ট ও দুর্নীতিগ্রস্ত করার সুযোগ না পেতেন। তারপরও দুর্নীতি থাকত, যেমন আছে ভারতে, ব্রিটেনে কিংবা আমেরিকায়। কিন্তু নির্বাচন ও নির্বাচকম-লীর পাহারায় তার থাবা হতো নিয়ন্ত্রিত। গণতান্ত্রিক বা রাজনৈতিক শাসন নিয়মিত সময়ের নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেই নিজেকে সংশোধন করে। অন্য কোন শাসনে সেই সংশোধনের সুযোগ নেই। গণতান্ত্রিক রাজনীতির এখানেই মাহাত্ম।

বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ ও ধনবাদ তাই সাবেক তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে প্রকৃত রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক শাসনকে ভয় পায়। তাঁরা জানে রাজনৈতিক শাসন যত খারাপ হোক, জনগণের কাছে তাঁদের দায়বদ্ধতার দরুন তাঁরা সাম্রাজ্যবাদীদের একেবারে আজ্ঞাবহের ভূমিকা পালন করতে পারেন না; তাঁদের যে কোন গণবিরোধী কাজে সায় দিতে পারেন না। এটা পারে একটা অনির্বাচিত ও অরাজনৈতিক সরকার; যাদের অস্তিত্ব বিদেশীপ্রভুদের মদদ ও সমর্থনের ওপর নির্ভর করে। এ জন্যই অবিভক্ত পাকিস্তানের খাজা নাজিমউদ্দীন সরকারের চরিত্র অনেকটাই আধা নির্বাচিত ও রাজনৈতিক হওয়াতে ১৯৫৩ সালে প্রচণ্ড চাপের মুখেও আমেরিকার সঙ্গে সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরে সাহসী হননি। তখন ওয়াশিংটন থেকে বগুড়ার মোহাম্মদ আলীকে করাচীতে উড়িয়ে এনে অবৈধ ও অনির্বাচিতভাবে ক্ষমতায় বসিয়ে এবং পার্লামেন্টকে এড়িয়ে পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি সম্পাদন করতে হয়েছিল।

বিশ্বময় সামরিক শাসন ডিসক্রেডিট হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশেও আমেরিকা আর সামরিক শাসন বহাল রাখায় উৎসাহী হয়নি। তদ্দিনে দেশের ভেতরে বিগ এনজিওগুলো প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আসলে এর অনেকই নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের পাল্টা অনির্বাচিত ও অদৃশ্য সরকার। এর নিয়ন্ত্রণ বিদেশীদের হাতে। সামনে একজন নেটিভ স্যার বা নোবেল লরিয়েটকে শিখ-ি খাঁড়া করা হয়। এই বিগ এনজিও, নব্যধনী গোষ্ঠী এবং তাদের আর্থিক ও অন্য সর্বপ্রকার সাহায্যে গড়ে ওঠা শহুরে এলিটক্লাস বা সুশীল সমাজ এই তিনের সমন্বয়ে যে ‘দেশীয় সামাজিক অভিজাত শক্তি’ গড়ে ওঠে সাম্রাজ্যবাদ ও ধনবাদ অধুনা সামরিক বাহিনীর বদলে তাদের ওপরে নির্ভর করতে চায় এবং তাদের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়ে তাদের স্বার্থ ও আধিপত্য কায়েম রাখতে চায়। মুখে গণতন্ত্রের জন্য বড় বড় বুলি আওড়ালেও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও ধনবাদ এশিয়া-আফ্রিকার কোন দেশেই প্রকৃত এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক শাসন পছন্দ করে না।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনের সময়েও আমেরিকা ও ইউরোপের এই চাতুরির খেলা এবং সেই সঙ্গে তাদের স্টুজ একটি সুশীল সমাজ এবং এই সুশীলদের মুখপত্র দুটির ভূমিকাও আমরা দেখেছি। এই চাতুরির খেলা এবং চক্রান্তের রাজনীতি ও সাংবাদিকতা এবার ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার জ্বালা ও হতাশাই মাহফুজ আনাম সংবরণ করতে পারছেন না। তিনি জানেন, ৫ জানুয়ারির ঘটনায় যে বড় পরাজয়টি হলো তা শুধু বিএনপির নয়, সুশীল সমাজেরও। এ সম্পর্কে একটু বিশদ আলোচনা প্রয়োজন। 

লন্ডন ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ বুধবার ॥
যুগটা সামন্ত বা ফিউডাল হোক, কিংবা ধনবাদ বা ক্যাপিটালিজমের হোক, সকল সময়ই দেখা গেছে সংশ্লিষ্ট দেশের এলিট ক্লাসের বড় অংশ রাজদরবারের বা এসটাবলিশমেন্টের অনুগত ভূমিকা পালন করেছে। তিনি রাজা বিক্রমাদিত্য হোন, সম্রাট অশোক হোন, কিংবা সম্রাট আকবর হোন, তাঁরা প্রধান সভাসদ হিসেবে দেশের এলিট ক্লাস বা বুদ্ধিজীবীদের মধ্য থেকে লোক বাছাই করতেন এবং তাদের দিয়ে ‘নবরত্নসভা’ বসাতেন।
এ যুগে আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিকে দেখা গেছে, তিনি তাঁর প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানে কবি রবার্ট ফ্রস্টকে আমন্ত্রণ করে এনেছিলেন তাঁর বন্দনা করে একটি কবিতা পাঠের জন্য। পরে এই রবার্ট ফ্রস্টের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের সম্পর্ক ভাল থাকেনি।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থানে সবচাইতে বেশি সহায়তা যুগিয়েছে ব্রিটেনসহ ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর সুশীল সমাজের বড় অংশ। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজের অধ্যাপকদের একটা বড় অংশ কমিউনিজম ও সোস্যালিজমের জোয়ার ঠেকানোর জন্য সেøাগান তুলেছিলেন ‘better dead then Red’ (লাল বা কমিউনিস্ট হওয়ার চাইতে মরে যাওয়া ভাল) পরে ফ্যাসিবাদী জার্মানিকর্তৃক ব্রিটেনসহ গোটা ইউরোপ আক্রান্ত হওয়ার পর এই পণ্ডিতকুলের মুখে আর রা সরেনি। 
পাকিস্তান আমলে আইয়ুবের ফৌজি শাসনের সময়ে তৎকালীন পাকিস্তানে সুশীল সমাজকে বশ মানিয়ে সামরিক শাসনের অনুকূলে জনসমর্থন তৈরির জন্য নাৎসি জার্মানির হিটলারের অনুসরণে সরাসরি সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় যে ‘রাইটার্স গিল্ড’ প্রতিষ্ঠা করা হয়, তার পূর্ব পাকিস্তান শাখায় লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের প্রগতিশীল অংশটির অধিকাংশকে যুক্ত করা হয় এবং তাঁরাও সানন্দে তাতে যোগ দেন। এই রাইটার্স গিল্ড ছিল প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুবের প্রিন্সিপাল অফিসার কুদরততুল্লা শেহাবের (পরে আলতাফ গওহরের) প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে। পাশাপাশি ছিল ব্যুরো অব ন্যাশনাল রিকনস্ট্রাকশন নামে আরেকটি সংস্থা, এটি ছিল অর্থ ও সুযোগ-সুবিধা বিলিয়ে বুদ্ধিজীবী ক্রয়ের সংস্থা। এই সংস্থার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন সুশীল সমাজের তখনকার একটি অংশ। কিন্তু তাতে কি তাঁরা বাঁচতে পেরেছিলেন? অপ্রীতিকর হলেও কথাটা সত্য, পরে ’৭১ সালে বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধ দমনে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞে এই প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদেরও অন্যদের সঙ্গে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশে গণহত্যার অন্যতম নায়ক পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তা রাও ফরমান আলী পাকিস্তানে (লাহোরে) প্রত্যাবর্তনের পর এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ঢাকায় বুদ্ধিজীবীদের হত্যার জন্য তাঁকে লোক খুঁজতে হয়নি। জামায়াত নেতাদের বলতেই তারা রাইটার্স গিল্ডের শীর্ষ নেতাদের নামের তালিকা সেনাবাহিনীকে দিয়েছিল। তাতে আরও কিছু নাম তারা যুক্ত করেছিল, রাইটার্স গিল্ডের সঙ্গে যাঁরা সম্পর্কিত ছিলেন না। করাচীর ‘দি লিডার’ নামক সান্ধ্য দৈনিকটি এই খবর প্রকাশ করেছিল।

সন্দেহ নেই, বর্তমানেও আওয়ামী লীগ ও হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বর্তমান সুশীল সমাজের যে অংশটি উঠেপড়ে লেগেছেন, তাঁরা হয়ত কালিদাস পণ্ডিতের মতো গাছের যে ডালে বসে আছেন, সেই ডালটিই কাটার অবার্চীন সুলভ তৎপরতায় লিপ্ত আছেন। হাসিনা সরকার ভাল হোক আর মন্দ হোক, তাঁরা ক্ষমতায় না থেকে জামায়াত-বিএনপি ক্ষমতা দখল করতে পারলে এবং ক্ষমতায় পাকাপোক্ত হয়ে বসতে পারলে এই সুশীলদের অবস্থা কী হতো, একাত্তরের সুশীল সমাজের একটি বড় অংশের পরিণতি দেখেও তা তাঁরা উপলব্ধি করতে পারছেন না।

আমি আগেও লিখেছি, আমাদের তথাকথিত সুশীল সমাজের একটি বড় অংশই এখন বিগ এনজিওগুলোর গোপন রাজনৈতিক অভিসন্ধি পূরণের বাহন। এদের ওপর ইউনূস শিবিরেরই আধিপত্য বেশি। ইউনূস শিবিরের অঘোষিত ইংরেজী মুখপত্র ‘দি স্টার’। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেও ইউনূস শিবিরের সকল তৎপরতা ব্যর্থ হওয়ায় স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের গাত্রদাহ বেশি। এখন গল্পের পাগলা মেহের আলীর মতো অবস্থা তাঁর। 

ব্যবসায় সংক্রান্ত (গ্রামীণ ব্যাংক) ও ব্যক্তিগত কারণে ড. ইউনূস কতটা হাসিনাবিদ্বেষী তার প্রমাণ মেলে গত নির্বাচনের সময় বিএনপি-জামায়াতের সমর্থনে তাঁর প্রকাশ্য ভূমিকা গ্রহণে। এই প্রকাশ্য ভূমিকা ছাড়া তাঁর আরও ভয়ঙ্কর একটি অপ্রকাশ্য ভূমিকা ছিল। সেটি হলো এবার মাইনাস টু নয়, মাইনাস ওয়ান ফর্মুলা (অর্থাৎ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে উচ্ছেদ করা) সফল করার জন্য যে কোন পন্থার আশ্রয় গ্রহণ।

আমি খবরটা লন্ডনে বসে নির্ভরযোগ্য সূত্রে পেয়েছি। কতটা সঠিক হলপ করে বলতে পারব না। কিন্তু যিনি বলেছেন তিনিও ড. ইউনূসকর্তৃক আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। তবু খবরটা সঠিক না হলে সংশ্লিষ্ট মহল যদি প্রতিবাদ করেন, তাহলে আমার পরবর্তী লেখায় তা উল্লেখ করে ভুল শোধরাব। খবরটা হলো নির্বাচনের কিছুদিন আগে ড. ইউনূস কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে আলাচনার নামে আমন্ত্রণ জানান। তাদের মধ্যে রেহমান সোবহান ও ড. আনিসুজ্জামানও ছিলেন। শেখ হাসিনাকে যে কোনভাবে হোক দেশের রাজনীতি থেকে সরাতে হবে- এই কথাটি যখন ড. ইউনূস ব্যাখ্যা করছিলেন, তখন রেহমান সোবহান নাকি রেগে উঠে বলেন, "এবানডন দিস আইডিয়া (এই মতলব বাদ দাও)। "এই মন্তব্যের পর বৈঠকটি ভন্ডুল  হয়ে যায়। 

এই খবরটি আমার কাছে সঠিক মনে হয়েছে এ কারণে যে, ইউনিভার্সিটিতে ড. ইউনূসের শিক্ষক ছিলেন রেহমান সোবহান। তিনি ড. ইউনূসকে ধমকানোর সাহস রাখেন। আমার শুধু বিস্ময় এই যে, হাসিনাবিরোধী চক্রান্ত বন্ধ করার জন্য ড. ইউনূসকে যে রেহমান সোবহান ধমকাতে পারেন, তিনি তার কিছুদিন পরই ‘স্টপ দ্য ইলেকশন’ এ দাবি তুলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সভাতে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও মাহফুজ আনামদের মতো ইউনূস শিবিরের শিখন্ডিদের সঙ্গে কী করে গলা মেলান?

এখানেই আমাদের সুশীল সমাজের চরিত্রভ্রষ্টতার প্রশ্নটি এসে যায়। অতীতেও এরা যতই প্রগতিশীলতার মুখোশ ধারণ করুন না কেন, এদের বড় অংশই ছিল এসটাবলিশমেন্টের দাস। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে এদের একটা অংশের চরিত্র-বৈশিষ্ট্যে ব্যতিক্রম দেখা যায়, যেমন তখনকার ফোরাম গ্রুপের (ঋড়ৎঁস মৎড়ঁঢ়) ভূমিকা। তার কারণ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় এসটাবলিশমেন্টের পূর্ব পাকিস্তানের সুশীল সমাজের প্রতি উপেক্ষা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সুশীল সমাজের মতো তাদের সুযোগ-সুবিধা না দেয়া।

ইত্যবসরে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানেও বাঙালীদের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠিত কায়েমী স্বার্থ ও বড় ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগী একটি নব্য পুঁজিপতি শ্রেণীর বিকাশ শুরু হয়। পূর্ব পাকিস্তানের শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা (সুশীল সমাজেরও নেতা) যেমন রেহমান সোবহান, ড. নূরুল ইসলাম প্রমুখ এই নতুন পূর্ব পাকিস্তানী বিত্তবানদের মুখপাত্র সেজে ভবিষ্যতে অধিকতর লাভবান হওয়ার কৌশল গ্রহণ করেন। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের নব্য পুঁজিপতিদের অধিকাংশের সঙ্গে রেহমান সোবহানের মতো অর্থনীতিবিদরা বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার সরব সমর্থক হয়ে ওঠেন। তখনকার তরুণ আইনজীবী ড. কামাল হোসেনও এই দলে এসে জোটেন। তাদের উদ্যোগে যে ইংরেজী সাপ্তাহিক ফোরাম পত্রিকা প্রকাশিত হয়, তা কার্যত ছয় দফা আন্দোলনের শক্তিশালী সমর্থক হয়ে ওঠে।

বাঙালীর রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বাধিকারের দাবি ছিল ছয় দফাতে। পূর্ব পাকিস্তানের নব্য পুঁজিপতিরা ভেবেছিলেন, এই অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের সুযোগে পশ্চিম পাকিস্তানের বিগ বিজনেসের প্রতিযোগিতামুক্ত যে বিরাট বাজার তাঁরা পাবেন, তাতে রাতারাতি তাঁরা বাঙালী আদমজী, ইস্পাহানি হয়ে উঠবেন। ছয় দফা দাবি সমর্থনের মুখোশের আড়ালে রেহমান সোবহানরা তখন ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের এই উদীয়মান ও নব্যপুঁজির মুখপাত্র।

তখন এই পুঁজিপতিরা বুঝতে পারেননি ছয় দফাই বঙ্গবন্ধুর কাছে শেষ কথা নয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি এ দেশীয় পুঁজিপতিদেরও (তাঁর দলের ভেতরেও তারা ছিল) অবাধ লুণ্ঠন বন্ধ করার জন্য বাকশাল পদ্ধতির শাসন প্রবর্তন করে কমান্ড অর্থনীতি ও রাজনীতি অনুসরণ করবেন। এই বাকশাল পদ্ধতি প্রবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন মন্ত্রিসভায় শপথ না নিয়ে কিছুকালের জন্য অক্সফোর্ডে নানা অজুহাতে পালিয়ে গিয়ে থাকেন ড. কামাল হোসেন। এর পর বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে সঙ্গে রেহমান সোবহানের গ্রুপটিও অক্সফোর্ডে গিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য আশ্রয় নেন। দেশে ফ্যাসিস্ট মিলিটারি শাসন প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে সুশীল সমাজের প্রতিরোধ গড়ার কোন চেষ্টাই তখন দেখা যায়নি। সুশীল সমাজের শীর্ষ নেতারাই পালিয়ে গেলে বাকিরা আর কী করবেন? তাদের কেউ কেউ তখন আবার সামরিক জান্তার অনুমোদনে আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাকরিও নিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর লন্ডনের রেডিক্যাল এশিয়া বুকস পাবলিকেশন্স বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত একটি ইংরেজী বই প্রকাশ করেন। তাতে প্রকাশিত নিজের লেখায় রেহমান সোবহান বলেন, শেখ মুজিবের হত্যাকা-ের একটা বড় কারণ যে নব্য বাঙালী পুজিপতি শ্রেণীর সমর্থন ভিত্তি করে তাঁর নেতৃত্বের বিকাশ, সেই শ্রেণী তাঁকে তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধাচারী (পষধংং-ঃৎধরঃড়ৎ) মনে করেছিল। তাঁর জাতীয়করণ নীতি ও বাকশাল শাসন প্রতিষ্ঠা এই পুঁজিপতিদের বিকাশের পথ বন্ধ করে দিয়েছিল।’
কথাটা সত্য। রেহমান সোবহান কেবল বলেননি, তাঁরাও ছিলেন এই নব্য উদীয়মান বণিক স্বার্থের সহযোগী। বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক শোষণ-মুক্তির রাজনৈতিক পথের সহযাত্রী নন। সে দিনও গণতন্ত্রের নামে বাকশাল পদ্ধতির সমর্থনে তাঁরা দ্বিধা ও অসন্তোষ দেখিয়েছেন। বর্তমানেও তাঁরা গণতন্ত্রের নামে দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য শেখ হাসিনার কঠিন সংগ্রামের বিরোধিতা করছেন। 

বাংলাদেশে গণতন্ত্র নিয়ে হঠাৎ আমেরিকার এত দরদ কেন? -আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী


কোনো রাষ্ট্র বা সরকারকে যদি একবার বলদর্পিতা পেয়ে বসে তার পক্ষে নিজের ভুল নীতি ও ব্যর্থ নীতি সংশোধন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এ কথাটা সর্বাংশে সঠিক মনে হয়। সাম্প্রতিক 'সিরিয়া ডিবাক্ল্' এবং আফগানিস্তানে 'প্রায় ভিয়েতনাম পরিস্থিতি'র সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও আমেরিকা তা থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের বর্তমান শান্ত পরিস্থিতি অশান্ত করার জন্য ওয়াশিংটন আবার তৎপর হয়ে উঠেছে।

এই তৎপরতার ফলে তাদেরই আশ্রিত নেটিভ সুশীল সমাজটিও তৎপর। হিজ মাস্টার্স ভয়েসের অনুধ্বনি শোনা যাচ্ছে এই সুশীল সমাজের মুখপাত্রগুলোর কণ্ঠে।

বাংলাদেশে গত ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচনটি হাসিনা সরকার একতরফা করেনি। করেছে বিরোধী বিএনপি জোটই। আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনেক সাধ্য-সাধনা করেও বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে পারেনি। বিএনপি একটি দাবির গোঁ ধরে বসে রয়েছে এবং সন্ত্রাসী দল জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সারাদেশে সন্ত্রাস চালিয়ে অগণতান্ত্রিকভাবে সরকারের পতন ঘটানোর চেষ্টা করেছে।
আমেরিকারও দাবি, তারা বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে। তাহলে নিশ্চয়ই তারা বাংলাদেশে হাসিনা সরকারকে এই সন্ত্রাসের কাছে আত্মসমর্পণ করে দেশটিকে সন্ত্রাসীদের ও জঙ্গি মৌলবাদীদের হাতে তুলে দেওয়ার পরামর্শ দিতে পারে না। বাস্তবে তারা তাই দিয়েছে। বারবার বলেছে, সংলাপে বসো।

হাসিনা সরকার কার সঙ্গে সংলাপে বসবে? এক বিভীষিকাময় সন্ত্রাসের সঙ্গে?

আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এ ক্ষেত্রে উচিত ছিল, তাদের সর্বপ্রকার নৈতিক শক্তি প্রয়োগে বিএনপিকে সন্ত্রাসীদের খপ্পরমুক্ত করার কাজে সফল হওয়া। নির্বাচন যাতে অবাধ ও সুষ্ঠু হয়, সে জন্য প্রয়োজন হলে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা। তা না করে তারা হাসিনা সরকারকে অনবরত চাপ দিয়েছে বিএনপির সন্ত্রাসমূলক তৎপরতার মুখে তাদের অন্যায় দাবিগুলোও মেনে সংলাপে বসার জন্য। এক কথায় বিরোধীদের কাছে আত্মসমর্থণের জন্যই ছিল এই চাপ।
প্রতিবেশী ভারত ও ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশের জোর সমর্থনের ফলে এবং দেশের জনমত অনুকূল থাকায় হাসিনা সরকার বৃহৎ শক্তি আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই চাপ উতরে উঠতে পেরেছে। যে কোনোভাবেই হোক সাধারণ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে ও নির্বাচনটি হওয়ার ফলে আর যাই হোক দেশে সন্ত্রাস বন্ধ হয়েছে এবং জনজীবনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। দেশের মানুষও চায় এই স্বস্তিটা কিছুদিন অব্যাহত থাকুক। মাসের পর মাস বিএনপি-জামায়াত দেশে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, সেই যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থা থেকে দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠিত হোক। তারপর আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেই সরকার সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
সে কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন। তিনি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সীমাবদ্ধতা জানেন এবং এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে কেন নির্বাচন করতে হয়েছে সে কথাও দেশবাসীর কাছে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি স্পষ্টই বলেছেন, বিএনপি সন্ত্রাসী জামায়াতের সঙ্গ ছেড়ে আসুক। '৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বাধাদানের নীতি বর্জন করে সংলাপে বসুক। তাহলে একটা গ্রহণযোগ্য মীমাংসায় পৌঁছাতে বাধা কোথায়?

 আমেরিকা বিএনপির ওপর জামায়াতের সংশ্রব ত্যাগের চাপ না বাড়িয়ে চাপ বাড়াচ্ছে হাসিনা সরকারের ওপর_ বিএনপি সন্ত্রাসীদের সংশ্রবমুক্ত এবং দেশে আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আগেই অবিলম্বে নির্বাচনের দিন-তারিখ ঘোষণার জন্য অর্থাৎ বাংলাদেশে আবারও অশান্ত পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা।

অথচ এই আমেরিকা আফগানিস্তানে তালেবানদের কাছে শর্ত দিয়েছিল তারা যেন লাদেনপন্থি আল কায়দার সংশ্রব বর্জন করে_ তাহলেই তাদের সঙ্গে ওয়াশিংটন সংলাপে যাবে। আমেরিকার বিদেশনীতির ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আলোচনা করতে গেলে একটি মহাভারত লিখতে হয়। এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের জন্য কাবুলে আমেরিকারই পুতুল প্রেসিডেন্ট কারজাই পর্যন্ত এখন বেঁকে বসেছেন এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্যদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরে রাজি হচ্ছেন না। তিনি লন্ডনের সানডে টাইমসের এক সাংবাদিকের কাছে বলেছেন, 'আমেরিকা সন্ত্রাস দমনের নামে ড্রোন হামলায় প্রত্যহ শয়ে শয়ে নিরীহ আফগান নরনারী হত্যা করছে। আফগানিস্তানে শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা তাদের লক্ষ্য নয়।'কাবুলের কারজাইয়ের এই উপলব্ধি বাংলাদেশের কারজাইদের মধ্যে এখনও ঘটেনি। 

ফলে দেশে 'নির্ভেজাল গণতন্ত্র' প্রতিষ্ঠার নামে বাংলাদেশ সম্পর্কে মার্কিন পরিকল্পনা (তাদের নতুন এশীয় নীতির অংশ) সফল করার জন্য তারা যা করছে, তাতে দেশটিতে গণতন্ত্র সুরক্ষা পাওয়া দূরের কথা, রাষ্ট্রের সেক্যুলার ভিত্তি ধ্বংস হয়ে আধা-তালেবানি শাসন প্রতিষ্ঠালাভ এবং আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মতো রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ায় সমূহ আশঙ্কা বিরাজমান। ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় ভারত ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকিয়ে নিজের আধিপত্য নিরঙ্কুশ করার জন্য বাংলাদেশেও আমেরিকা পানি ঘোলা করতে চায়।

তা না হলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর দেশের মানুষ যেখানে এই সরকারকে আপাতত দেশ শাসনে সম্মতি দিয়েছে এবং দীর্ঘকালীন সংকট ও সন্ত্রাসের পর দেশের পরিস্থিতিও মোটামুটি শান্ত এবং সরকারও সন্ত্রাসবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে মনোযোগ দিয়েছে, সেখানে আমেরিকার পক্ষে গায়ে পড়ে বাংলাদেশে আরেকটি নির্বাচন অবিলম্বে অনুষ্ঠানের চাপ সৃষ্টি দ্বারা আবার অশান্ত ও সন্ত্রাস ফিরিয়ে আনার এই অপচেষ্টা কেন? যে আমেরিকার ইতিহাস হচ্ছে দেশে দেশে নির্বাচিত সরকারগুলো উচ্ছেদের জন্য সাহায্য করা এবং সামরিক শাসকদের ক্ষমতায় বসানো, সেই আমেরিকা কেন বাংলাদেশে 'খাঁটি গণতন্ত্র' প্রতিষ্ঠার জন্য এত ব্যাকুল?

বর্তমান হাসিনা সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর মনে হয়েছিল, আমেরিকা পরিস্থিতি আপাতত মেনে নিয়েছে এবং দেশটি পুনর্গঠনে এই সরকারের সঙ্গে একটা ওয়ার্কিং রিলেশন বজায় রেখে চলবে। কিন্তু হঠাৎ ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে গেছে। আমেরিকা বাংলাদেশের হাসিনা সরকার সম্পর্কে হার্ডলাইনে ফিরে গেছে। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা আবার ছুটে গেছেন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য।
অন্যদিকে একদল মার্কিন কূটনীতিক ও প্রতিনিধি দিলি্লতে বিজেপি নেতা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ছুটে গেছেন।

এক শ্রেণীর ভারতীয় পত্রিকার অনুমান, দিলি্লর কংগ্রেস সরকার ভারতের নিজস্ব স্বার্থ ও নিরাপত্তার খাতিরে বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের পক্ষে যে শক্ত অবস্থান নিয়েছে, বিজেপির নরেন্দ্র মোদি নিকট ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলে যাতে সেই নীতি থেকে সরে আসেন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার কাজে মার্কিন-নীতিতে সহায়তা দেন, সেই উদ্দেশ্য সাধনই ছিল এই প্রচেষ্টার লক্ষ্য।

এই প্রচেষ্টায় আমেরিকা কি সফল হবে? দিলি্লর যে ক'জন প্রবীণ ভারতীয় সাংবাদিকের সঙ্গে আমি আলাপ করেছি, তারা একবাক্যে বলেছেন, 'না, এটা সফল হওয়া সম্ভব নয়।' একে তো গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নরেন্দ্র মোদির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে আমেরিকা একবার তাকে তাদের দেশে যাওয়ার ভিসা দেয়নি, তাতে নরেন্দ্র মোদি রুষ্ট।
 অন্যদিকে ভারতও এখন বিশ্ব রাজনীতিতে এমন একটা শক্তিশালী অবস্থানে এসে পৌঁছেছে, কেবল দিলি্লতে ক্ষমতার হাতবদল হলে সে নীতি থেকে কোনো সরকারের সম্পূর্ণ সরে আসা অসম্ভব। আমেরিকায় ওবামা যেমন পারেননি বুশের যুদ্ধবাদী বিদেশনীতি থেকে সহসা সরে আসতে, তেমনি ভবিষ্যতে দিলি্লতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলেও ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তাভিত্তিক বিদেশনীতি পরিবর্তন তাদের পক্ষে সহজ হবে না। সম্ভবও হবে না।

 দিলি্লর এই সাংবাদিক মহলের আরও একটি ধারণা, বাংলাদেশ সম্পর্কে বিজেপির আগের মনোভাব এখন অনেকটাই পরিবর্তিত। ভারতকে সন্ত্রাসমুক্ত রাখা, তার পূর্বাঞ্চলের অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা এবং সংখ্যালঘু মুসলমানদের আস্থা অর্জনের জন্যও তারা বাংলাদেশে একটি সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। এ ব্যাপারে চাই কি, বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তারা বর্তমান কংগ্রেস সরকারের চেয়েও বেশি উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। আমেরিকার নতুন এশীয় নীতিতে ভারত ও চীন এই দুটি বড় এশিয়ান দেশ কতটা যুক্ত হতে চাইবে, তা সন্দেহের বিষয়।

সম্ভবত এটা জেনেই বাংলাদেশের ওপর আমেরিকা তার অর্থনৈতিক চাপও বাড়াতে চায়। এই চাপটা হলো, তারা কিছুকাল আগে বাংলাদেশকে দেওয়া যে জিএসপি (শুল্কমুক্ত সুবিধা) সুবিধা প্রত্যাহার করে, তা পুনর্বহালের জন্য ১৬টি শর্ত আরোপ করে। বাংলাদেশ সরকার এর ১৩টি শর্ত পূরণ এবং বাকি তিনটি পূরণের উদ্যোগে নেওয়ার পরও আমেরিকা টালবাহানা করছে।

এই টালবাহানা করার রহস্যটিও সম্প্রতি বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের বক্তব্যে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। মন্ত্রী বলেছেন, আমরা ১৩টি শর্ত পূরণ এবং আরও তিনটি পূরণের ব্যবস্থা করার পরও ওয়াশিংটন জিএসপি সুবিধা পুনর্বহালে টালবাহানা করছে। মুখে না বললেও ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রসঙ্গটি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ওই শর্তের সঙ্গে যুক্ত করছে।

 মাত্র এক ব্যক্তিকে তার অবৈধ সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ব্যাপারে একটি বৃহৎ শক্তি কী ধরনের নির্লজ্জ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে, এটা তার প্রমাণ। সম্প্রতি '৭১-এর যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেওয়ার সময় স্বয়ং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি এই ফাঁসি বন্ধ করার দাবি জানিয়েছিলেন। মার্কিন বিদেশনীতি এখনও যে পুরনো বলদর্পিতা দ্বারা পরিচালিত, তার স্পষ্ট প্রমাণ এ দুটি ঘটনা।

ওয়াশিংটনের কোনো কোনো সূত্র থেকে জানা যায়, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে এখন দুটি পক্ষ। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের অনুসারী ও রিপাবলিকান সমর্থক অংশ প্রচণ্ডভাবে হাসিনা সরকারবিরোধী।  এদের ওপর ড. ইউনূসের প্রভাব এখনও বিদ্যমান এবং ড. ইউনূস এখনও পর্দার আড়ালে খেলছেন। বর্তমানে আবার হাসিনা সরকারকে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানে চাপ দেওয়ার মার্কিন তৎপরতার পেছনেও নাকি ড. ইউনূস কলকাঠি নাড়ছেন। স্টেট ডিপার্টমেন্টের অন্য অংশটিও বাংলাদেশে আরেকটি নির্বাচন চায়; কিন্তু সে জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টির পক্ষপাতী নয়। এখন পর্যন্ত স্টেট ডিপার্টমেন্টে হাসিনা সরকারের বিরোধী অংশটিই বেশি শক্তিশালী এবং ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত মজীনা তাদের হয়েই তৎপরতা চালাচ্ছেন। এই বিশ্লেষণ কতটা সঠিক, তা হয়তো শিগগিরই বাংলাদেশ সম্পর্কে মার্কিননীতি থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

হাসিনা সরকার সাম্প্রতিক অতীতে বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তির চাপের মুখে নতি স্বীকার না করে বাংলাদেশের সম্মান বাড়িয়েছে। আগামীতেও কতটা পারবে, তা নির্ভর করে তার মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে সহযোগিতা ও সমর্থন আদায় এবং দেশের ভেতর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রবল জনমত গড়ে তোলার সাফল্যের ওপর। এ জন্য দেশের সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে হাসিনা সরকারের উচিত ঐক্যবদ্ধ করা। বিশ্বে এখন একক পরাশক্তির প্রভাব ও ক্ষমতাও ক্ষীয়মাণ। আমেরিকার শুধু অর্থনীতিতে নয়, সাম্রাজ্যশক্তিতেও ধস নেমেছে। এই অবস্থায় নতুন এশীয় নীতি নিয়ে ওয়াশিংটন আবার আগ্রাসী ভূমিকা গ্রহণ করতে চাইলে তাতে কতটা সফল হবে, তা নিয়ে অনেকের সন্দেহ আছে। অনেকে মনে করেন, আমেরিকার বর্তমান বাংলাদেশ-নীতি একাত্তরের মতোই ব্যর্থতা বরণ করবে।

লন্ডন, শুক্রবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

Sunday, February 16, 2014

এক রাজাকারের আত্মজীবনী - মুনতাসীর মামুন


॥ ১ ॥
‘রাজাকার’, ‘দালাল’, যোগসাজশকারী বা ‘কোলাবরেটর’, ‘আল-বদর’, ‘আল-শামস’ শব্দগুলোর সঙ্গে ১৯৭১ সালের আগে বাঙালীর কোন পরিচয় ছিল না। দালাল শব্দটির সঙ্গে অবশ্য পরিচয় বাঙালীর অনেক দিনের। তবে, ১৯৭১ সালে ‘দালাল’ বা ‘দালালি’ যে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে সে অর্থে নয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বিভিন্ন গ্রুপের গঠন, গ্রুপের সদস্যদের মন-মানসিকতার ভিত্তিতে উদ্ভব হয়েছে শব্দগুলোর।

১৯৭১ সালের পরিপ্রেক্ষিতে দালাল কে? জানুয়ারি ১৯৭২ সালে দালাল অধ্যাদেশ ‘বাংলাদেশ কোলাবরেটরস স্পেশাল ট্রাইব্যুনালস অর্ডার ১৯৭২’ জারি করা হয়। এতে দালাল বা যোগসাজশকারী বা কোলাবরেটরদের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে-
“১. পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে বাংলাদেশে বেআইনী দখল টিকিয়ে রাখার জন্য সাহায্য করা, সহযোগিতা বা সমর্থন করা।
২. প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দখলদার পাকবাহিনীকে বস্তুগত সহযোগিতা প্রদান বা কোন কথা, চুক্তি ও কার্যাবলীর মাধ্যমে হানাদার বাহিনীকে সাহায্য করা।
৩. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বা যুদ্ধের চেষ্টা করা।
৪.মুক্তিবাহিনীর তৎপরতার বিরুদ্ধে এবং মুক্তিকামী জনগণের কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
৫. পাকবাহিনীর অনুকূলে কোন বিবৃতি প্রদান বা প্রচারণায় অংশ নেয়া এবং পাকবাহিনীর কোন প্রতিনিধি, দল বা কমিটির সদস্য হওয়া। হানাদারদের আয়োজিত উপনির্বাচনে অংশ নেয়া।” 
উল্লেখিত সমস্ত গ্রুপই এর আওতায় পড়ে। যে অর্থে রাজাকার, কোলাবরেটর, আল-বদর বা পাকিস্তানপন্থী-সবাইকেই দালাল বলা হয়।

রাজাকার বাহিনী বা রাজাকারদের সংগঠন করেছিল তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। জেনারেল টিক্কা খান ১৯৭১ সালের জুন মাসে রাজাকার অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন।
 পূবর্তন আনসার, মুজাহিদদের নিয়ে প্রাথমিকভাবে এ দল গঠিত হয়। কিন্তু পরে বিভিন্ন শ্রেণীর পাকিস্তানপন্থীরা এই বাহিনীতে যোগ দেয়। এরা ছিল সশস্ত্র। হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবেই তারা মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়েছে। জেনারেল নিয়াজী এক সাক্ষাতকারে আমাকে বলেছিলেন যে, রাজাকার বাহিনীর তিনিই স্রষ্টা। তারা যথেষ্ট খেদমত করেছে পাকিস্তানী বাহিনীকে, যে কারণে তাঁর বইটি তিনি তাদের উদ্দেশেই উৎসর্গ করেছেন।
আল-বদররা ছিল ডেথ স্কোয়াড। রাজাকার বাহিনীর পর পরই এটি গঠিত হয়। তবে, রাজাকার অধ্যাদেশের মতো কোন আইনগত বিধান এর ভিত্তি নয়। কিন্তু, পাকিস্তানী বাহিনীর প্রেরণায় এরা সংগঠিত হয় এবং হানাদার বাহিনীর সঙ্গে এদের যোগাযোগ ছিল গভীর। আল-বদর বাহিনীকে অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য উপকরণ হানাদার বাহিনীই যুগিয়েছে। রাও ফরমান আলির নোটে আল-বদরদের উল্লেখ আছে।
অবশ্য, সরকারীভাবে পাকিস্তানী বাহিনী তা অস্বীকার করেছে। আল-বদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন বর্তমান জামায়াতে ইসলামীর নেতা মতিউর রহমান নিজামী। ৭ নবেম্বর ১৯৭১ সালে তারা ‘আল-বদর দিবস’ পালন করে। ১৪ নবেম্বর ১৯৭১ সালে নিজামী ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এ আলবদর বাহিনী সম্পর্কে লেখেন-
“...আমাদের পরম সৌভাগ্য বলতে হবে। পাকসেনার সহযোগিতায় এদেশের ইসলামপ্রিয় তরুণ ছাত্র সমাজ বদর যুদ্ধের স্মৃতিকে সামনে রেখে আল-বদর বাহিনী গঠন করেছে। বদর যুদ্ধে মুসলিম যোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল তিন শত তেরো। এই স্মৃতিকে অবলম্বন করে তিন শত তেরোজন যুবকের সমন্বয়ে এক একটি ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বদর যোদ্ধাদের সেই সব গুণের কথা আমরা আলোচনা করেছি, আল-বদরের তরুণ মুজাহিদদের মধ্যে ইনশাআল্লাহ, সেই সব গুণাবলী আমরা দেখতে পাব।”

“পাকিস্তানের আদর্শ ও অস্তিত্ব রক্ষার দৃঢ় সঙ্কল্প নিয়ে গঠিত আল-বদরের যুবকেরা এবারের বদর দিবসে নতুন করে শপথ নিয়েছে, তাদের তেজোদীপ্ত কর্মীদের তৎপরতার ফলেই বদর দিবসের কর্মসূচী দেশবাসী তথা দুনিয়ার মুসলমানের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। ইনশাআল্লাহ বদর যুদ্ধের বাস্তব স্মৃতিও তারা তুলে ধরতে সক্ষম। তরুণ যুবকেরা আমাদের সশস্ত্রবাহিনীর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হিন্দু বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে হিন্দুস্তানকে খতম করে সারা বিশ্বে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করবে।”

রাজাকারদের সঙ্গে আল-বদরদের খানিকটা তফাত ছিল। রাজাকাররা সামগ্রিকভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরোধিতা করেছে, সংঘর্ষ হলে খুন করেছে, লুটপাট ও ধর্ষণ করেছে। অনেকে যুদ্ধকালীন দুরবস্থার কারণে বাধ্য হয়েও রাজাকার হয়েছে, কিন্তু, আল-বদরদের লক্ষ্য ছিল স্থির। প্রকৃতিতে তারা ছিল অতীব হিংস্র ও নিষ্ঠুর। তারা বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের সম্পূর্ণভাবে নিকেশ করে দিতে চেয়েছে। কারণ, তারা অনুধাবন করেছিল, যে ধরনের শাসন তারা করতে চায়, বুদ্ধিজীবীরা হয়ে উঠবে তার প্রধান প্রতিবন্ধক। মুক্তিযুদ্ধ তো ছিল একটি আদর্শগত লড়াইও। বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল বাংলাদেশ তত্ত্বে বিশ্বাসী যা পরে প্রতিফলিত হয়েছিল ১৯৭২ সালের সংবিধানে। দালালরা ছিল পাকিস্তান তত্ত্বে বিশ্বাসী। এই তত্ত্বে যারা বিশ্বাসী তাদেরও বিভিন্ন পর্যায় ছিল। রাজাকারদের মন-মানসিকতা বুঝতে হলে পাকিস্তান তত্ত্ব বা প্রত্যয় এবং এর বিভিন্ন পর্যায়ের খানিকটা ব্যাখ্যা দরকার। তা হলে বুঝতে পারব, কারা দালালি করেছে, কেন করেছে?
বাকি রইল আল-শামস। এরা আল-বদর ধরনেরই আরেকটি স্কোয়াড। হত্যাই ছিল যাদের মূল লক্ষ্য।

॥ ২ ॥
এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বাতন্ত্র্য বোধ কাজ করেছে সেই ষষ্ঠ শতক থেকেই। ১৯৪৭-এর আগে এই আঞ্চলিকতা বোধ রূপান্তরিত হতে থাকে বাঙালী মুসলিম জাতীয়তাবাদে। এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, বাঙালী হলেও আগে মুসলমান হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তান চেয়েছিল। গত শতকের শেষার্ধ থেকে বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় হিসেবে মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্যবোধের সৃষ্টি হয়েছিল। সম্প্রদায় হিসেবে সে ছিল অধস্তন। একজন বর্ণহিন্দু একজন শূদ্রের সঙ্গে যে ব্যবহার করে একজন মুসলমানের সঙ্গেও সে ব্যবহারে কোন তারতম্য ছিল না।
আজিজুর রহমান মল্লিক ও সৈয়দ আনোয়ার হোসেন একটি প্রবন্ধে বিষয়টির আরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন-“মুসলমানদের এই পৃথক পরিচয় দাবি বাহ্যত ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক প্রকৃতির বলে প্রতীয়মান হলেও মূলত তা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের আর্থ-রাজনৈতিক সমাজ-পরিবেশে একটি প্রান্তিকীকৃত অর্থাৎ ন্যায্য অধিকার বঞ্চিত সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম।

এর ফলে, উপমহাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিম-লে জনসংখ্যার অবস্থানগত বাস্তবতা এখানকার হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়কে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়, যেখানে হিন্দুরা ছিল প্রায় সকল সুযোগ-সুবিধার অধিকারী এবং মুসলমানরা ছিল ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।”

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর উঠতি বাঙালী মধ্যবিত্ত মুসলমান অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছিল। মুসলিম লীগ ছিল নেতৃত্বে। কিন্তু সমগ্র পাকিস্তান ভিত্তিতে বাঙালী মুসলিম লীগ নেতারা ছিল অধস্তন। অন্যদিকে, বাঙালী হিন্দুদের দেশত্যাগ বেশ একটা বড়সংখ্যক বাঙালী মুসলমানকে সুযোগ করে দিয়েছিল সম্পদের ভিত্তি গড়ার। 

রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল যাদের সুবিধাটি তারাই পেয়েছিল। এভাবে আদর্শের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল কায়েমি স্বার্থ। তবে, পাকিস্তানী আদর্শকে সামনে রেখে অর্থাৎ ধর্মকে ব্যবহার করে ‘ইসলামপন্থী’ কিছু দলের সৃষ্টি হয়, যেমন-জামায়াতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম প্রভৃতি। মুসলিম লীগের সঙ্গে এদের লড়াইটা ছিল আদর্শ থেকে ক্ষমতা করায়ত্তের।

এর বিরুদ্ধে সংস্কৃতির প্রশ্নেই দ্বন্দ্বটি প্রকট হয়ে ১৯৪৭-এর পর থেকে যার বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে। এর সঙ্গে যুক্ত হলো অর্থনীতি। মধ্যবিত্ত তো বটেই সাধারণ বাঙালীর প্রসারণের সুযোগই সংকুচিত হয়ে গেল। ফলে, সংস্কৃতির সত্তায় স্বাধীনতা ও প্রসারণের দাবিতে এগিয়ে এল পাকিস্তান কাঠামোর ভেতরেই অন্যান্য দল, যার মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি, আওয়ামী লীগ, ন্যাপ প্রধান। 

পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী সবসময় ইসলামকেই শোষণ ও কায়েমি স্বার্থ বজায় রাখার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। শাসকদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ হলেই তা দেখা হতো ইসলামদ্রোহী হিসেবে। সমীকরণটি ছিল এরকম-ইসলামের বিরোধিতা মানে ভারতকে সমর্থন। ইসলামের প্রতীক পাকিস্তান, হিন্দুত্বের প্রতীক ভারত। পাকিস্তানী শাসকদের বিরোধিতা করার অর্থ হচ্ছে হিন্দুত্ব সমর্থন। কেন্দ্রের অধস্তন বাঙালী সহযোগীরাও তা বিশ্বাস করত এবং প্রচার করত (যেমন মুসলিম লীগ, জামায়াত)।

 অধস্তন হলেও তারা তৃপ্তি পেত এই ভেবে যে, তারাও ক্ষমতার সহযোগী, কখনও কখনও অংশীদার এবং সে সুযোগে অর্থনৈতিক উপায়েরও সুবিধাভোগী। তবে, তাদের সবাই অর্থনৈতিক সুবিধার অংশীদার ছিল তা নয়, কিন্তু মনোজগতে যে আধিপত্য সৃষ্টি করেছিল দল তা ভাঙ্গা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

১৯৫৮ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর পাকিস্তান প্রত্যয়ে নতুন কিছু উপাদান যুক্ত হলো। ধর্ম ছাড়াও শাসনের উপাদান হিসেবে যুক্ত হলো আমলা, বিশেষ করে সামরিক আমলাতন্ত্রের আধিপত্য। এর অর্থ, আমলাতন্ত্র, বিশেষ করে সামরিক আমলাতন্ত্র কর্তৃক সিভিল সমাজ ও রাজনীতিবিদদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা, অভ্যন্তরীণ লুটের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ (বিশেষ করে পাকিস্তানবিরোধী) এ আদর্শ, আরও অনেক বাঙালীকে যুক্ত করতে পেরেছিল শাসকদের সঙ্গে।

এই সামগ্রিক বঞ্চনার আবেগ পাকিস্তানের পরিসরে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীর মনে সেই পুরনো আঞ্চলিকতার রেশ ফিরিয়ে আনে অর্থাৎ পূর্ববঙ্গ একটি একক যা বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা বা স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা তারই প্রতিফলন। ছয় দফা প্রত্যাখ্যাত হলে সৃষ্টি করা হয় ‘পাকিস্তান’-এর বিপরীতে সোনার বাংলা মিথ। আঞ্চলিকতা বোধ উত্তরিত হয় জাতীয়তাবাদে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী সোনার বাংলার স্বপ্ন মেনে নিতে থাকে। প্রশ্ন ওঠে সোনার বাংলা শ্মশান কেন? 

লিখেছেন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর-“এভাবে পুনর্নিমিত, পুনর্গঠিত হয়েছে ইতিহাসের দিক থেকে মৌল এবং স্থায়ী এক প্রতিরোধ পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্গত পূর্ব পাকিস্তান/বাংলাদেশের মধ্যে। সোনার বাংলার এই নির্মাণের ফলে পাকিস্তানের কেবল কথা বলার অধিকার আছে এবং পূর্ব বাংলা/পূর্ব পাকিস্তান/বাংলাদেশ কেবল নীরব, স্তব্ধ, মৌন, এই ধারণা যায় বদলে। এটি বদলে দেয় পরিস্থিতি এবং সাব অলটার্ন বাঙালীদের অভিজ্ঞতা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, সমাজের বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যার মধ্যে স্পষ্ট হতে শুরু করে দ্বৈরথের সম্মুখীন হয়ে, নিশ্চিতভাবেই জাতীয়তাবাদী ইতিহাস তত্ত্বের ভিত্তিতে।

শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর নেতৃত্বে বাঙালী নতুন আদর্শ প্রতিষ্ঠার সঙ্কল্প নেয়। মানসিকভাবে বাঙালী প্রস্তুত হয়ে ওঠে দ্বৈরথের জন্য। অন্যদিকে, ১৯৭০-এর নির্বাচনের আগে সংখ্যাগরিষ্ঠের মনোজগতে পরিবর্তন আসা শুরু করলেও পাকিস্তান আদর্শের ধ্বজাধীরারা তা গ্রাহ্যের মধ্যে আনেনি। কারণ, তাদের ধারণা ছিল মনোজগতে এবং কায়েমি স্বার্থ কেন্দ্রগুলোতে তাদের আধিপত্য কেউ ভাঙতে পারবে না, তা অটুট।


॥ ৩ ॥
১৯৭০-এর নির্বাচনের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। পাকিস্তান আদর্শের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে বাংলাদেশ আদর্শ। পাকিস্তান আদর্শ যারা অটুট রাখতে চেয়েছিল তারা গুরুত্ব দেয় পেশীশক্তির ওপর। পরিণামে শুরু হয় তাদের ভাষায় ‘গৃহযুদ্ধ’।
 বাংলাদেশ আদর্শের পতাকাবাহীদের ভাষায় মুক্তিযুদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তান আদর্শবাদীদের জন্য বিপন্ন অবস্থার সৃষ্টি করে। এদের মধ্যে যাঁরা নিষ্ক্রিয় জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন তাঁরা মানসিক কষ্টের শিকার হলেও নিষ্ক্রিয়ই ছিলেন। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্তান আদর্শের বিপর্যয় হিসেবেই দেখেছিলেন। কারণ, তাঁদের কাছে কখনও মনে হয়নি বাঙালী পরিচয়টি প্রথম, পাকিস্তানী পরিচয় আসে তার পরে।

রাজনীতির সঙ্গে যারা যুক্ত ছিল তারা ফিরতে চায়নি। কারণ, পাকিস্তান আদর্শ ও কেন্দ্রের সেনাবাহিনীর শক্তি তাদের কাছে ছিল অজেয়। তাদের মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের আদর্শ জয়ী হলে তাদের স্থান হবে বিপন্ন। যে রাজনীতি করে তারা ক্ষমতার অংশীদার বা কায়েমি স্বার্থের অংশীদার হয়েছিল সেটি থাকবে না। নতুন বাংলাদেশে তাদের স্থান থাকবে না। এর চেয়ে পাকিস্তানে অধস্তন হিসেবে ক্ষমতার সহযোগী হওয়া ছিল শ্রেয়। এখানে আদর্শ বা ধর্মের প্রশ্ন আসতে পারে। কিন্তু সেটি গৌণ।

 সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী কি মুসলমান ছিল না? বা ইসলামে বিশ্বাস করত না? তবে ধর্মটিকে ঢাল হিসেবে রাখা ছাড়া তাদের উপায় ছিল না। একটা উদাহরণ দিলেই তা স্পষ্ট হবে। তারা যা করেছে তা কি ইসলামী আদর্শে অনুমোদিত? ফলে, অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে যা করার করেছে। ড. সাজ্জাদ হোসায়েনের পক্ষে সম্ভব ছিল না, সাধারণ আল-বদরের মতো অস্ত্র হাতে ঘোরা। কিন্তু লক্ষ্য ছিল এক। ফলে, যার যার অবস্থান থেকে সে সে কাজ করে গেছে। এভাবে সৃষ্টি হয়েছে পাকিস্তানীদের দালালদের, দালালদের মধ্যে অবস্থানগত কারণে আবার বিভিন্ন গ্রুপের। এর মধ্যে সবচেয়ে হিংস্র ও ফ্যাসিস্ট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলাম ও তার অঙ্গ সংগঠন ছাত্রসংঘ। 

পাকিস্তানের অ্যাকাডেমিশিয়ান আব্বাস রশীদ ‘পাকিস্তান : মতাদর্শের পরিধি’ শীর্ষক প্রবন্ধে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন- “উলেমাগোষ্ঠীর নিকট আইউব খানের নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়ে সামরিক বাহিনী এবং সনাতনপন্থী সংগঠনের মাঝে অসম হলেও পারস্পরিক ফলপ্রসূ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে, সনাতনপন্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে অগঠিত, অসংঘবদ্ধ উলেমাগোষ্ঠী নয় বরং তাদের স্থান ইতোমধ্যে দখল করে নেয় সুসংগঠিত জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্ব পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞকে কেবল সমর্থনই করেনি, তাদের কর্মী ও সদস্যরা শান্তি কমিটিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। সামরিক বাহিনী কর্তৃক সৃষ্ট এই শান্তি বাহিনীর দায়িত্ব ছিল বিদ্রোহ দমনে সামরিক কর্মকর্তাদের সহায়তা করা। আদর্শগত পর্যায়েও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সামরিক বাহিনী স্বাগত জানিয়েছিল সর্বান্তকরণে।” তাই আমরা দেখি, আল-বদর ও আল-শামসদের মধ্যে জামায়াতের কর্মীই বেশি।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরই দালালদের দ্বারা গঠিত হয় শান্তি কমিটি। ২৬ এপ্রিল, ১৯৭১ সালের ‘দৈনিক পাকিস্তানে’র সংবাদ অনুসারে “স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দ্রুত পুনর্প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রবিরোধী ও সমাজবিরোধী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জনগণকে সজাগ রাখা ও গুজব রচনাকারীদের দুরভিসন্ধি প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে এই কমিটি গঠিত হয়েছে।” এর সদস্যরা ছিল পাকিস্তান আদর্শের অনুসারী বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, এলিট, যারা অস্ত্রহাতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ করতে যায়নি। কিন্তু হত্যাকান্ডে  পরিকল্পনায় বা অংশগ্রহণে তারা নিষ্ক্রিয় ছিল না অনেক ক্ষেত্রে।
বিভিন্ন পেশায় বা পদে থেকে এবং রাজনীতিবিদ হিসেবে যারা হানাদারদের সহযোগিতা করেছে সেই সময়, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে ‘কোলাবরেটর’ হিসেবে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক অনেকেই ছিলেন।

এরপর ছিল রাজাকার। আসলে এর শুদ্ধ উচ্চারণ ‘রেজাকার’- ফারসী শব্দ। ‘রেজা’ হলো স্বেচ্ছাসেবী, ‘কার’ অর্থ কর্মী। এক কথায় স্বেচ্ছাসেবী। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় হায়দরাবাদের নিজাম অনিচ্ছুক ছিলেন ভারতের সঙ্গে মিলনে। আত্মরক্ষার জন্য তিনি গঠন করেছিলেন একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী যার নাম দেয়া হয়েছিল রেজাকার বাহিনী।

মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত নেতা এ.কে.এম. ইউসুফ শব্দটি ধার করেন এবং খুলনায় রেজাকার বাহিনীর সূত্রপাত করেন। ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, ৯৬ জন জামায়াত কর্মী নিয়ে এই বাহিনীর সূত্রপাত যা পরে পুরো বাংলাদেশ ছড়িয়ে পড়ে। পূর্বোক্ত গ্রন্থ অনুযায়ী- “প্রশাসনিকভাবে এই বাহিনীতে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর লোক অন্তর্ভুক্ত হলেও তাদেরকে তিনভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমত যারা ‘পাকিস্তান’ ও ইসলামকে রক্ষার জন্য বাঙালী হত্যা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধ করাকে কর্তব্য করেছিল, দ্বিতীয়ত, যারা লুটপাট, প্রতিশোধ গ্রহণ, নারী নির্যাতন করার একটি সুযোগ গ্রহণ করতে চেয়েছিল এবং তৃতীয়ত, গ্রামের দরিদ্র অশিক্ষিত জনগণ যারা সীমান্তের ওপারে চলে যেতে ব্যর্থ হয় এ ধরনের লোককে প্রলুব্ধকরণ, বল প্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে রাজাকার বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।”
রাজাকার বাহিনী যাদের নিয়েই গঠিত হোক না কেন, এই বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করত জামায়াতে ইসলামী। আবু সাইয়িদ তাঁর সাধারণ ঘোষণার প্রেক্ষিত ও গোলাম আজম’ গ্রন্থে জনৈক রাজাকারের পরিচয়পত্র তুলে দিয়েছেন যেখানে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে-
‘‘This is to certify that Mr. haroon-ur-Rashid khan. S/o. Abdul Azim Khan, 36 Purana Paltan Lane. Dacca-2 is our active worker. He is ture Pakistani and dependable. He is trained Razakar. He has been issued a Rifle No-776.. with ten round ammunition for self-protection.
Sd/illegible
INCHARGE
RAZAKAR AND MUZAHID JAMAT-E-ISLAM
91/92 Siddique Bazar, Dacca.”
রাজাকারদের বিভিন্ন স্থাপনা পাহারা দেয়া, মুক্তিবাহিনীর খোঁজ করা প্রভৃতি কাজে ব্যবহার করা হতো। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে এরাই ছড়িয়ে পড়েছিল। সে কারণে, বাঙালীদের কাছে রাজাকার শব্দটি বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে।

॥ ৪ ॥
১৯৭১ সালে তো বটেই, তারপর প্রায় চার দশক পর্যন্ত, এ দেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি কিভাবে কাজ করে বা মনোজগতে আধিপত্য বিস্তার করে যাচ্ছে সে ব্যাপারে গভীরভাবে কেউ চিন্তা করেছেন বলে জানি না।
আগেই উল্লেখ করেছি মুক্তিযুদ্ধের বা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বা স্বায়ত্তশাসনেরও বিরোধিতা করেছেন অনেকে ১৯৭১ সালের আগে। ঐ বিরোধিতা, যুক্তির খাতিরে অগ্রহণযোগ্য এমন বলা যাবে না। কিন্তু, ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর এবং স্বাধীনতার পর এ যুক্তি কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সংবিধানের প্রথম পাতাতেই লেখা আছে-
“আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের (সংশোধিত পাঠ) মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।”

এরপর স্বাধীনতাসংক্রান্ত কোন বিষয় আদালতের এখতিয়ারে পর্যন্ত আসতে পারে না। কিন্তু, বাংলাদেশ যেহেতু পৃথিবীর একমাত্র সব সম্ভবের দেশ সেহেতু এখানে এর উল্টোটাই ঘটেছে। পৃথিবীতে একমাত্র বাংলাদেশেই স্বাধীনতাপক্ষের ও বিপক্ষের শক্তি আছে। এ প্রশ্ন অবশ্যই অনেকে করতে পারেন যে, স্বাধীনতালাভের পর একটি দেশে আবার স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি হয় কিভাবে? পৃথিবীতে, এ দেশেরই একমাত্র সরকার ও বিরোধীদল একই সঙ্গে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তির সঙ্গে নমনীয় ব্যবহার করে।পৃথিবীতে একমাত্র বাংলাদেশেই স্বাধীনতার বিপক্ষের পত্রিকাসমূহ অবাধে প্রকাশিত হয় এবং স্বাধীনতার বিপক্ষীয়রা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিষোদগার করে যেতে পারছে। 

শুধু তাই নয়, প্রাক্-মুক্তিযুদ্ধ পর্বের পাকিস্তান প্রত্যয়ের বিভিন্ন উপাদান আবার যুক্ত হচ্ছে রাজনীতিতে। বাংলাদেশ আদর্শের বিপরীতে সে বিষয়গুলো তুলে ধরা হচ্ছে, যে দেশের ভবিষ্যতের জন্য ভয়ঙ্কর। এই আদর্শের নাম দেয়া যেতে পারে পাক-বাংলা আদর্শ। এ আদর্শের যারা ধারক তাদের বাংলাদেশের অস্তিত্ব মেনে নিতে হচ্ছে। 

কিন্তু, বাংলাদেশ আদর্শ তাদের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না হীনম্মন্যতার কারণে। কায়েমি স্বার্থ যা সৃষ্টি হয়েছে গত ত্রিশ বছরে তা বজায় রাখতে গেলেও পাক-বাংলা আদর্শ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। এর প্রধান উপাদান পাকিস্তানে বিশ্বাস, ভারতকে ইহজগতের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা কিন্তু ভারতকে গোপনে সুযোগ দেয়া, ইসলাম ধর্মকে ক্ষমতা দখলের স্বার্থে ব্যবহার করা, সামরিক আধিপত্যে বিশ্বাস ইত্যাদি। এই আদর্শের স্রষ্টা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শত্রুরা। এদের পুনর্বাসিত করে জিয়াউর রহমান এই আদর্শের প্রবক্তা হয়ে ওঠেন, পরে হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ তাঁকে অনুসরণ করেন। আরো পরে খালেদা আসেন। তিনি রাজাকারদের ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। পৃথিবীতে এ ধরনের ঘটনা বিরল। জিয়া ও এরশাদ যুক্ত করেন কাকুল কালচার। কাকুলে যৌবনে তারা প্রশিক্ষিত হয়েছিলেন এবং তা মগজে গেঁথে গিয়েছিল। সেটিরও আবার ক্লোন তৈরিতে তাঁরা সমর্থ হয়েছেন। পাকিস্তানে আদর্শের স্রষ্টাদের অনেকের মৃত্যু হলেও তাদের দলে নতুন ক্লোন সৃষ্টি করা হয়েছে। এই ক্লোনরা যে সবাই সে আদর্শে বিশ্বাসী তা নয়। তারা বিশ্বাসী কায়েমি স্বার্থ বজায় রাখা, স্বার্থের নতুন মানচিত্র তৈরি করায়।
এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানী একাডেমিশিয়ান পারভেজ আলী হুদোভয় আবদুল হামিদ নায়ার ‘পাকিস্তানের ইতিহাস পুনর্লিখন’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন “দেশ বিভাগের ৩০ বছর পর পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের পুনর্জাগরণে এটাই প্রমাণ করে যে ধর্মীয় কোন মহৎ উদ্দেশ্য নয়, রাজনৈতিক মতলববাজিই এখানে বৃহত্তর ভূমিকা পালন করেছে। সমাজের চিরস্থায়ী সামরিকীকরণের জন্য চাই একজন চিরস্থায়ী শত্রু। অনেক কারণেই পাকিস্তানের অন্যান্য প্রতিবেশীরা এই কাজের জন্য উপযুক্ত নয়। অপরদিকে ভারত ও পাকিস্তানের শাসকবর্গ এই পারস্পরিক শত্রুতা ও উত্তেজনাকে একটি অপরিহার্য রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখে আসছে।”

এখানে সৃষ্ট পাকি ক্লোনরা ঠিক একই কাজ করছে কিনা সচেতন নাগরিক মাত্রই তা বিচার করতে পারবেন। গত বিশ বছরে এ দেশে সৃষ্ট নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতিই এর প্রমাণ।
এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা হলে হয়ত কিছু জানা যেত। কিন্তু হয়নি এবং তথ্যের স্বল্পতাও লক্ষণীয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের কার্যকলাপের বিবরণ সংগ্রহ করা এখন প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরাই এগুলো নষ্ট করে ফেলেছে বা ফেলছে। মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ বছর পর, এ. এস. এম.শামসুল আরেফিন ‘রাজাকার ও দালাল অভিযোগে গ্রেফতারকৃতদের তালিকা’ প্রণয়ন করেছেন যার কয়েকটি খ- মাত্র প্রকাশিত হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতাবিরোধী যাঁরা আত্মজীবনী লিখেছেন এবং পাক-বাংলা আদর্শের হয়ে কাজ করেছেন তাঁদের গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে রচনা করেছিলাম- ‘রাজাকারের মন’ বা অন্যভাবে বলা যেতে পারে, ‘রাজাকারের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধ’। সরল ভাষায়, একজন রাজাকার বা স্বাধীনতাবিরোধী কিভাবে বিচার করেছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বা বাংলাদেশ? সে কি এখনও বিশ্বাস করে বংলাদেশে? তার গ্রন্থে সত্যের ভাগ কতটুকু? কিইবা তারা লিখেছেন বা অধিকাংশই কেন লেখেননি, এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছিল। আমার লেখা রাজাকারের মন (২ খ-) গ্রন্থে। এ প্রবন্ধেও সেই বিষয়গুলো এসেছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে যাদের বই নিয়ে আলোচনা করেছিলাম বা এখন যার বই নিয়ে আলোচনা করছি তাদের কেউ ছিল কোলাবরেটর, কেউ আল-বদর বা অন্যকিছু। কিন্তু আগেই বলেছি কাগজপত্রে বিভিন্ন বিভাগ থাকলেও মূলত এরা সব একই লক্ষ্যের অনুসারী। এই বিভাজন বিভ্রান্তিও সৃষ্টি করতে পারে মাঝে মাঝে। শামসুল আরেফিন নিজেও এ সমস্যায় পড়েছিলেন তাঁর উপযুক্ত গ্রন্থ লিখতে গিয়ে। লিখেছেন তিনি “বিভিন্ন পরিচয়ে এদের ভাগে ভাগে না দেখিয়ে গড়পড়তা সবাইকে ‘দালাল’ পরিচয়ে চিহ্নিত করার প্রয়াসের পেছনে একটা কারণও রয়েছে। সবচেয়ে বড় কারণ যেটি তা হলো, যে সব সরকারী কাগজের আলোকে এই তালিকাটি প্রস্তুত হয়েছে সেই সবের ছক অভিন্ন ছিল না। কোথাও গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির অপরাধের কারণ সংক্ষেপে বলা হয়েছে, কোথাও শুধু বলা হয়েছে কোলাবরেটর অথবা দালাল অথবা পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগী। কোন কোন তালিকায় তাদের পরিচয় এরূপও রয়েছে যে, “Arrested Razakars. Al-Badars and Mujahids’, ‘ Arrested on.. as they were either members of Razakars, Al-Badars, Al-Shams or Mujahid organisation and also supported the Pak Army in killing innocent public. looting, arson etc”

এ পরিপ্রেক্ষিতে এক কথায়, মোটাদাগে স্বাধীনবিরোধীদের আমি ‘রাজাকার’ নামে অভিহিত করেছি। রাজাকার, আগেই উল্লেখ করেছি, যারা বাংলাদেশে ছিল এবং মানুষ এই নাম ও তাদের কার্যকলাপের সঙ্গে পরিচিত হয়ে সাধারণের ভাষ্যে চলে আসে। হুমায়ূন আহমেদের একটি নাটকের সংলাপ ছিল- ‘তুই রাজাকার’।
এসব কারণে, স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তি সে আলবদরই হোক বা দালালই হোক বা শান্তি কমিটিই- পরিচিত হয়ে ওঠে রাজাকার হিসেবে। তাঁরা ‘রাজাকার’ ছিলেন না, ছিলেন ‘রেজাকার’।
 হতে পারে রেজাকার শুদ্ধ, কিন্তু মানুষের কাছে অশুদ্ধ রাজাকারই পরিচিত। তাই আমিও রেজাকার-কে রাজাকারই লিখলাম।

তিনি সাধারণ পরিবার থেকে এসেছেন। মাসে যা বেতন পেতেন তা স্ত্রী নার্গিসের হাতে তুলে দিতেন। তিনি নিজেকে ভাবতেন আল্লাহর সৈনিক হিসেবে, যিনি নিজেকে রসুলের (সঃ) যোদ্ধা সাহাবা হিসেবে ভাবতেন। তিনি জানিয়েছেন, ১৯৬৩ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত দলের জন্য এমন ব্যস্ত থেকেছেন যে ঋতু পরিবর্তন বুঝতে পরেননি। এমন কী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ঘুরে দেখারও সুযোগ পাননি। একবার শুধু রমনা পার্কে গিয়েছিলেন। তার স্ত্রী মাত্র তিন মাস তাঁর সঙ্গে একত্রে কাটিয়েছেন। জামায়াত গড়ার জন্য তিনি হাতিয়া, সোনাগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া, ফেনী, কোম্পানীগঞ্জ, রায়পুর, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর অন্যান্য অঞ্চল সফর করেছেন।

মহিউদ্দিন জানাচ্ছেন, ১৯৬৯ সালে জামায়াত ব্যস্ত ছিল আওয়ামী লীগের ছয় দফা, ছাত্রদের ১১ দফার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি আরও লিখেছেন, আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জ করার মতো একটি বড় দলই ছিল। তাহলো জামায়াতে ইসলামী। সে কারণে আওয়ামী লীগের টার্গেট হয়ে দাঁড়ায় জামায়াত। মহিউদ্দিন নিজে দাঁড়িয়েছিলেন প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে। তিনি লেখেছেন, পল্টনে যেমন আওয়ামী লীগ মওদুদীর সভা আক্রমণ করে ভেঙ্গে দিয়েছিল, তেমনি নির্বাচনের আগে নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগ জামায়াতের সব সভায়ই হামলা চালিয়েছে।

১৯৭০ সালেই প্রয়ংকরী ঝড়ে পূর্ব পাকিস্তানের একটি অংশ লন্ডভন্ড হয়ে যায়। কেন্দ্রীয় শাসক, রাজনীতিবিদ, এমনকি প্রেসিডেন্ট গভর্নরও দুর্যোগময় এলাকা পরিদর্শনে সুযোগ পাননি। ফলে, তার মতে, শেখ মুজিব পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে বলার জন্য আরেকটি অজুহাত পেলেন। অথচ তিনি নিজে কোন এলাকা পরিদর্শনে যাননি। জামায়াত নেতা গোলাম আযম একমাত্র রাজনীতিবিদ যিনি দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। তিনি গোলাম আযমের সঙ্গে গিয়েছিলেন হাতিয়া। দু’দিন পর ঈদ। তাদের ফেরার কথা ছিল ঢাকা। কিন্তু নোয়াখালীতেই আত্মীয়-পরিজন ছাড়া তাদের দু’জনকে ঈদ করতে হলো। এটিকে তিনি জনগণের খেদমতের এক বিরল দৃষ্টান্ত বলে উল্লেখ করেছেন।

এই ঘটনাটিকে তিনি বিশদভাবে দেখেছেন ও বর্ণনা করেছেন। নোয়াখালী ছিল আওয়ামী লীগের দুর্গ। এর বিপরীতে জামায়াতের নিয়মিত কর্মী ছিলেন ছয়জন। একজন সামান্য কাপড় ব্যবসায়ী, একজন দর্জি, প্রাইমারি স্কুলের একজন শিক্ষক, নোয়াখালী পৌরসভার একজন কেরানি ও দু’জন বেকার। কোন কোন কমিটিতে কলেজের দু’একজন শিক্ষককে পাওয়া যেত। মহি উদ্দিনের মতে, তার সদস্যরা গরিব ছিলেন কিন্তু জনগণের বিশাল সমর্থন ছিল তাদের পিছে। যদি জানমালের ভয় না থাকত তাহলে সাধারণ মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জামায়াতকে ভোট দিত। আসলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তো জামায়াতেরই জেতার কথা কিন্তু নির্বাচন তো সুষ্ঠু হয়নি। জামায়াত জিতবে কীভাবে? ফ্যান্টাসি আর কাকে বলে।

সেই ঈদের দিন গোলাম আযম ও তিনি ক্যান্টিন থেকে দু’প্লেট মাংস আর দুটি পরাটা এনে নাস্তা সারলেন। মহি উদ্দিন এ পরিপ্রেক্ষিতে লিখেছেন, যাদের আছে তারা কখনও জামায়াতকে সমর্থন করেনি। গোলাম আযম বা আবদুর রহিম অনেকদিন নোয়াখালী এসেছেন কিন্তু কোথায়ও আশ্রয় পাননি। তাদের পার্টি অফিসে থাকতে হয়েছে।
মহি উদ্দিনের আফসোস, আওয়ামী লীগের অনেকে জানতেন যে গোলাম আযম নোয়াখালীতে আছেন। কিন্তু, কারও নৈতিক সাহস হলো না, তাকে এসে বলা ঈদ মোবারক। তিনি আর গোলাম আযম কয়েক টুকরো গরুর মাংস, ভাত আর মসুরের ডাল দিয়ে দুপুরের খাওয়া সারলেন। আরও দু’বার কোরবানির ঈদের সময় মহিউদ্দিন নোয়াখালী শহরে ছিলেন। তখন তিনি বা তার গরিব কর্মীরা কোরবানি দিতে পারেনি। শহরের কেউ তাকে ঈদে আমন্ত্রণ জানিয়ে খাওয়ায়নি। প্রায় না খেয়ে থেকেছেন।
নিজেই প্রশ্ন রেখেছেন, তা হলে লক্ষ্মীপুরে বৌ-ছেলেমেয়ে রেখে তাকে কে বাধ্য করেছিল নোয়াখালী থাকতে। এর উত্তর তিনি নিজেই দিয়েছেন- কেউই নয়, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার জন্যই শহরে থেকেছেন। ঈদ জামায়াতে বক্তৃতা দিয়ে কোরবানির ফযিলত বুঝিয়েছেন। কিন্তু, প্রশ্ন ওঠে নোয়াখালীতে ছয়জন নিয়মিত কর্মী ছাড়া জামায়াতের তেমন সংগঠন ছিল না। সেখানে ঈদের জামায়াতে তাদের বক্তৃতা দিতে কে আমন্ত্রণ করবে? কেনই বা আমন্ত্রণ জানাবে? 

॥ ৮ ॥

আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হবার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের কিছু নেতা পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে থাকে। আরেকটি গ্রুপও একই ধরনের কাজ করতে থাকে। আর দু’টি গ্রুপকে সহায়তা করছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্র অর্থাৎ ভারত। কারণ, ভারত পাকিস্তানকে ভাঙতে চাচ্ছিল। মহিউদ্দিনের মতে, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো ইসলামী রেনেসাঁয় ভীত হয়ে পাকিস্তানের শত্রুকে সহায়তা করছিল।
মহিউদ্দিন এরপর মুসলমান চরিত্র বিশ্লেষণ করেছেন। তার মতে, ভারতীয় মুসলমানরা ছিল ‘পারভারটেড’ তাদের বলা হয়েছিল পাকিস্তানে ভোট দেওয়ার জন্য। কিন্তু “আমাদের চরিত্র তো ইসলামিক নয়।” খেদ জানিয়েছেন তিনি। তিনি লিখেছিলেন, পশ্চিম পাকিস্তানীরা মিথ্যাচার করেননি, পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানরা সত্যিকারের মুসলমান নয়, তারা হিন্দুদের ছেলেপিলে, ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব শিক্ষালয়ে হিন্দু শিক্ষকরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। স্কুল-কলেজে পড়ানো হয় হিন্দু দর্শন। হিন্দু গবেষক শিক্ষকরাই বই লেখেন। বাংলা [পূর্ব পাকিস্তান] হচ্ছে একটি জাদুর দেশ..., প্রত্যেক মুসলমান মেয়ে গায়িকা এবং নর্তকী, পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের ভারস্বরূপ। দেশটি হচ্ছে, সাইক্লোন আর বন্যার দেশ। একটি অভিশপ্ত প্রদেশ। আল্লাহ পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে খুশি নয়। খুশি হলে ঐ এলাকায় এত প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেন হবে?

এ প্রসঙ্গে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন। সাধারণ নির্বাচনের [১৯৭০] নোয়াখালীর মাইজদী কোর্টে টাউন হলে তিনি বজ্র কঠিন গলায় বলেছিলেন- “করাচি হয়ে গেছে একটি সোনালী শহর; মরুভূমি রূপান্তরিত হয়েছে সোনালী মরূদ্যানে; ইসলামাবাদ নির্মিত হচ্ছে সোনা দিয়ে। এ সবই করা সম্ভব হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদের কারণে। তারা মংলাবাঁধ নির্মাণ করেছে, নির্মাণ করেছে তারবেলা বাঁধ, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জন্য কিছুই না; আমি যখন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য দাবি তুললাম, তখন তারা মানুষকে ইসলামের নামে ভোলাবার জন্য মওদুদীকে পাঠালো। 

এখানেই আসে স্বদেশ রায়ের লেখা- জনকণ্ঠে প্রকাশিত ‘‘এ সরকারের ভেতর এখনও ‘পাকিস্তান’ আছে।’’ এ লেখাটি প্রচুর মানুষ পড়েছেন এবং মতবিনিময় করেছেন এবং সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। স্বদেশ রায়ের ভাগ্য ভাল যে, রাজনীতিবিদরা এসব পড়েন না, জনকণ্ঠ তো না-ই। তাঁরা যদি পড়েনও, তাহলে প্রথম আলো পড়েন বা ডেইলি স্টার উল্টে দেখেন। যে প্রশ্নগুলো গত পাঁচ বছর এবং এখনও আলোচিত হচ্ছে তার নির্যাস তিনি তুলে ধরেছেন। এখানেই আসে দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্ন। স্বদেশ যেহেতু সাংবাদিক সেহেতু অনেক হোমরাচোমরার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব আছে, তাঁর সাম্প্রতিক লেখা পড়লে তাঁরা তাঁকে এড়িয়েই চলবেন। কারণ, সমালোচনা আওয়ামী লীগের নেতারা একদম বরদাশত করতে পারেন না, অসহিষ্ণু, সমালোচনা ভাবেন বিরোধিতা এবং কোন বিষয়ে আলোচনা তাঁদের সঙ্গে করা নিষ্ফল।

প্রথমেই যে দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেছিলাম সেই দৃষ্টিভঙ্গির কথায় আসি। গাফ্ফার চৌধুরীর দৃষ্টিভঙ্গি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কাছাকাছি, স্বদেশের নয়। একুশে পদক নিয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় স্বদেশ লেখাটি লিখেছেন।
প্রথমেই বলে রাখি, পদক নিয়ে সব সময় বিতর্ক থাকবেই। এবং পুরস্কারের অপব্যাখ্যা থাকবেই। যেমন, অর্থনীতিতে কোন নোবেল প্রাইজ নেই। সেটি একটি ব্যাংকের পুরস্কার যেটিকে নোবেল বলে চালানো হচ্ছে। যাহোক, পদক বিতরণের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ যথেষ্ট সতর্কতার পরিচয় দিয়েছে। গত ৭ বছরে যাঁরা রাষ্ট্রীয় পদক পেয়েছেন তাঁদের অধিকাংশকে নিয়ে বিতর্ক হয়নি। অন্তত শর্ষিনার পীরের মতো যুদ্ধাপরাধীদের এ সরকার পদক দেয়নি। কিন্তু, দু’একটি ব্যতিক্রম অনেক সম্মান হ্রাস করে।

সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার ও ইকবাল সোবহানকে নিয়ে স্বদেশ কিছু মন্তব্য করেছেন। এঁরা সবাই আমাদের দীর্ঘদিনের পরিচিত, কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত অসদ্ভাবও নেই। কিন্তু, আমরা পরিচিতজনের বিচ্যুতি নিয়ে সাধারণত আলোচনা করি না। যা আলোচনা তা নীতিগত, কিন্তু আমাদের সমাজে সে পার্থক্য নেই। সব আলোচনাই ব্যক্তিগত আক্রমণ বলে বিবেচনা করা হয়।

 স্বদেশ সেই প্রথা ভাঙ্গার সাহস দেখিয়েছেন দেখে তাঁর লেখা এত আদৃত হচ্ছে। এটি আরেকটি বার্তা প্রদান করছে। বর্তমান রাজনীতিবিদ বা সুশীলরা যে দৃষ্টিভঙ্গি লালন করছেন সেটির গ্রহণযোগ্যতা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে যা তাঁরা অনুধাবন করতে পারছেন না।
স্বদেশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলছেন। তাঁর মতে, গোলাম সারওয়ারকে সাংবাদিকতার জন্য একুশে পুরস্কার দিয়ে সরকার প্রমাণ করল,  তাঁদের ভেতর পাকিস্তানী সংস্কৃতির কদর এখনও কমেনি। তাঁর শুধু নয়, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শিবিরের একটি প্রশ্ন, সরকার এখন ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের যা খুশি করার ক্ষমতা আছে বলে ভাবছে। এ রকমটি বিএনপি-জামায়াতও ভেবেছিল। গোলাম সারওয়ার সেই ১৫ জনের একজন। এই ১৫ জন কে? যারা সরকারের চূড়ান্ত বিপদের সময় মৌলবাদীদের সমর্থন দিয়েছিল। স্বদেশ লিখেছেন-
এ দেশের মানুষ বিশেষ করে প্রগতিশীল মানুষ বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করে ওই মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা হলে দেশের ১৫ জন সম্পাদক তার মুক্তি দাবি করে বিবৃতি দেয়। মাহমুদুর রহমান সেদিন যে কাজটি করেছিল সেটা এই ১৫ সম্পাদকের অজানা, সেটা একজন বালকও বিশ্বাস করবেন না। কারণ, এই ১৫ সম্পাদক শিশু নন। তাঁরা কেউ ফিডার খান না। তাই সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার সঙ্গে মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতারকে জড়ানোর কোন যুক্তি থাকতে পারে না। আগেও এই কলামে লিখেছি, আবারও বলব এই ১৫ সম্পাদক ভবিষ্যতে বহুভাবে সম্মানিত হতে পারেন। কিন্তু জাতির ইতিহাসে তাঁরা রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধের দাবিতে যে বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানী চিন্তার পক্ষ হয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন ইতিহাস এই ১৫ সম্পাদককে অবশ্যই সেই কাতারে রাখবে। বরং আরও খারাপভাবে দেখবে। কারণ তাঁরা সেই ব্যক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, যিনি সন্ত্রাসের মাধ্যমে সরকার উৎখাত ও সরকারপ্রধান হত্যা পরিকল্পনার অন্যতম। তারা দেশের প্রগতিশীলতার এক ভয়াবহ দুর্দিনে পাকিস্তানী আইএসআইয়ের ক্রীড়নক এই জঙ্গীবাদীর মুক্তির দাবিতে বিবৃতি দিয়েছিল। তাই হাজার যুক্তি দাঁড় করানো হোক না কেন, এই ১৫ সম্পাদক ও আইএসআই-এর ক্রীড়নকরা যে একই সূত্রে গাঁথা এ নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। এবং এ নিয়ে বাংলাদেশের প্রগতিশীল সমাজের অবস্থানও স্পষ্ট। তারা জানে যে বাংলাদেশের ভেতর এই যে পাকিস্তানী এজেন্টরা রয়ে গেছে, এদের বিরুদ্ধেই বাংলাদেশের প্রগতিশীল শক্তিকে লড়াই করে যেতে হবে আরও দীর্ঘ দিন। এবং লড়াইয়ের ফসল হিসেবে তারা বর্তমান সরকারকে মনে করে।

কিন্তু এই সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথমবারেই মাহমুদুর রহমানের মুক্তি দাবি করা ১৫ সম্পাদকের একজনকে একুশে পদক দিয়ে বাংলাদেশের প্রগতিশীল সমাজের প্রতি কী বার্তা দিলেন? সরকারের নিজের চরিত্রের কী প্রকাশ পেল? এই ১৫ সম্পাদকের একজনকে একুশে পদক দেয়ার ভেতর দিয়ে সরকারের এই চরিত্র প্রকাশ পেল যে, বর্তমান সরকারের ভেতরও ‘পাকিস্তান’ আছে। এই সরকারও ‘পাকিস্তান’ মুক্ত নয়।”
এ যুক্তি সরকারের পক্ষে খন্ডানো সম্ভব নয়। পদক দেয়ার সঙ্গে জড়িত সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং একটি কেবিনেট কমিটি আছে সেটির। সবশেষ প্রধানমন্ত্রীকে সম্মতি দিতে হয় তাদের সুপারিশে। বিষয়টি অন্যভাবেও দেখা যেতে পারে।

গোলাম সারওয়ার একুশে পদক পাওয়ার যোগ্য নয় এ মন্তব্য যিনি করবেন আমি তার প্রতিবাদ করব। এবং সাংবাদিকতায় তিনি যথেষ্ট সিনিয়র। এবিএম মূসাও তো তারেক জিয়ার একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। তিনিও বর্তমান সরকারের আমলে পদক পেয়েছেন।

 কিন্তু প্রশ্ন, তোয়াব খান কেন পাননি? গত দু’দশক যিনি একনিষ্ঠভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে পত্রিকা পরিচালনা করেছেন। চরম দুর্দিনেও পক্ষ ছাড়েননি। তিনি এদের সবার সিনিয়র। আমি ধরে নিলাম, ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী বা সংস্কৃতিমন্ত্রী পছন্দ করেন না। কিন্তু এই দলই কি শু-মেকার হিসেবে খ্যাত আসম আবদুর রবকে মন্ত্রী করেনি, এরশাদ বা জাতীয় পার্টির লোকজনকে মন্ত্রী করেনি, চরম আওয়ামী বিরোধী সাম্যবাদী দল, জাপা (মঞ্জু), ওয়ার্কার্স পার্টি বা জাসদ থেকে মন্ত্রী করেনি? তাহলে কি ব্যাপারটা এ রকম দাঁড়ায় ,আমি যাকে পছন্দ করি না তাঁর যত অবদানই থাকুক, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতিতে বা স্বদেশে তিনি গ্রহণযোগ্য নন। কিন্তু তাকেই পছন্দ করি যে অহরহ আমাদের নিন্দা করে, ঘৃণা করে এবং ব্যাম্বু দেয়। যদি এটি ঠিক হয় তবে, এটি সুস্থ কোন দৃষ্টিভঙ্গি নয়।

জনাব গাফ্ফার চৌধুরী ও আওয়ামী লীগের দৃষ্টিভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতে বলতে পারি-মতিউর রহমান বা মাহফুজ আনামকেও কেন পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করা হবে না? তাঁরা শূন্য থেকে দুটি পত্রিকাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী পত্রিকায় পরিণত করেছেন এবং গণতন্ত্র প্রশ্নে বিএনপি-জামায়াতকে অকুণ্ঠ সমর্থন করেছেন এবং ঐ ১৫ জনেরও তাঁরা দলভুক্ত। প্রাক-নির্বাচনের ৬ মাস কিন্তু দৈনিক সমকালও একই ভূমিকা রেখেছে, তবে ততটা কঠোরভাবে নয়। আবেদ খানও তো বিবেচিত হলেন না। এই প্রশ্নগুলোই উঠেছে সমাজের বিভিন্ন পর্যায় থেকে।

স্বদেশ বেশ কঠোরভাবে তথ্য উপদেষ্টা সম্পর্কেও লিখেছেন। তাঁর মতে, “শেখ হাসিনার পাশে গোলাম আযমের নাগরিকত্বের দাবিতে বিবৃতিদানকারীও আছেন।... এই বার্তা নিশ্চয়ই এটাই জানিয়ে দেয় যে, বর্তমান সরকার জীবন বাজি রেখে প্রগতিশীলতার পক্ষে সাংবাদিকতা চায় না।” 
এই বিষয়টি গুরুতর। আমরা দেখেছি, যখন শেখ হাসিনা সংবিধানের কথা বলেছেন তখন জামায়াত-বিএনপির সহিংসতা সত্ত্বেও টকশো ও সংবাদপত্রে তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। পশ্চিমা রাষ্ট্রদূতরাও এতে সুর মিলিয়েছেন। তখন গুটিকয় পত্রিকা, সেখানে কয়েকজন কলামিস্ট ও গুটিকয় টিভি চ্যানেল, গুটিকয় বক্তা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করেছেন। এবং তাঁদের জোরালো বক্তব্য ও লেখা জনমতের দৃষ্টি অনেকটা ঘুরিয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, হতাশ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেকের বুকে সাহস যুগিয়েছে। সরকারের নেতৃবৃন্দ তা অস্বীকার করতে পারেন, কিন্তু সেটিই সত্য।
যদি উদাহরণ এ রকম দু’একটি হতো তা হলে কথা ছিল না বা এত লেখারও দরকার ছিল না। কিন্তু, বিএনপি-জামায়াতপন্থীদের বা বিএনপি-জামায়াতপন্থী না হোক, আওয়ামী লীগবিরোধীদের তোষণের দিকে একটি ঝোঁক রয়েই গেছে যেটি খুব একটা ইতিবাচক নয়। স্বদেশ সে কথাও উল্লেখ করেছেন-
‘‘২০০৯-এ শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পরে ঠিক একই বার্তা তাঁর সরকারের পক্ষ থেকে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ দিয়েছিলেন। তিনি দায়িত্ব নিয়ে প্রথম গিয়েছিলেন সেই পত্রিকা অফিসটিতে যে পত্রিকার সম্পাদক লিখেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা মিথ্যে বলেন’, লিখেছিলেন, শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে বিদায় নিতে হবে। প্রথম যে টেলিভিশন চ্যানেলটিতে গিয়েছিলেন ওই চ্যানেলটি বঙ্গবন্ধুর খুনী রশীদের সাক্ষাতকার সম্প্রচার করে। ২০০৯-এর তথ্যমন্ত্রীর বার্তার শেষ পরিণতি কী হয়েছিল সেটা পাঁচ বছরে শেখ হাসিনার সরকার হাড়ে হাড়ে টের পায়। মিডিয়ার পাকিস্তানপন্থীরাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনার সরকারের কোন ভাল কাজ সেদিনের অধিকাংশ মিডিয়াই প্রচার করেনি। বরং যতভাবে সরকারকে ক্ষতি করা যায় এবং শেখ হাসিনার ক্ষতি করা যায় সেটাই ছিল সেদিন তাদের চেষ্টা।’’
আরও উল্লেখ্য, সরকারী বিজ্ঞাপন এখন লাভজনক না হওয়া সত্ত্বেও জনকণ্ঠ কিন্তু সে আমলে সরকারী বিজ্ঞাপনও কম পেয়েছে, অথচ জনকণ্ঠ একমাত্র পত্রিকা যা গত দেড়দশক নিরবচ্ছিন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এবং আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে এসেছে।
৪.
যখন জামায়াত-বিএনপি নেতাকর্মীরা সাতক্ষীরা ও সুন্দরগঞ্জে হত্যাকান্ড ঘটাচ্ছিল তখন টিভি চ্যানেল ‘সময়’ একটি প্রতিবেদন তুলে ধরে। তাতে বলা হয় ‘জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পর ২৮ ফেব্রুয়ারি দুপুরে বামনডাঙ্গা রেলস্টেশন জালিয়ে দেয় জামায়াত-শিবিরের কয়েক হাজার সশস্ত্র নেতাকর্মী। লুটপাট করে শত শত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। পরে বামনডাঙ্গা পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ করে চার পুলিশ সদস্যকে নির্মমভাবে খুন করা হয়। এই ঘটনার প্রতিবাদ করায় দরিদ্র এক রিক্সা চালককেও হত্যা করা হয়। তার জিহ্বা কেটে, চোখ উপড়ে ফেলা হয়। একইদিন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ ভবন ও থানা ভবনসহ সরকারী অফিস-আদালত লুট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।”

মামলা হলেও আসামিরা বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়ায়। প্রতিবেদন অনুসারে- এখানে ভয়ঙ্কর যে বিষয়টি শুধু পুলিশ নয়, আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গেও জামায়াতের শক্ত কানেকশন ধরা পড়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারির নাশকতায় সরাসরি জড়িত জামায়াত নেতা মাওলানা সাখাওয়াত হোসেনকে ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক বানিয়ে দেয়া লিখিত কাগজ আদালতে জমা দেয়া হয়েছিল।

গত জুন মাসের দিকে জামায়াতের অর্থদাতা হিসেবে পরিচিত ব্যবসায়ী আজিম ঘটনার দিন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সহিংসতার নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু পুলিশ যখন তাকে গ্রেফতার করে তখন আবার বামনডাঙ্গায় পুলিশকে আক্রমণের চেষ্টা করা হয়। আশ্চর্য বিষয় হলো, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম নিটন মাইকিং করে রাস্তাঘাট অবরোধ করে তাঁকে পুলিশের কাছ থেকে উদ্ধারের আহ্বান জানান।
বিভিন্ন সময় টাকার বিনিময়ে মামলা থেকে আসামিদের নাম কাটার অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগ যেমন পুলিশের বিরুদ্ধে তারচেয়ে বেশি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

রংপুর অঞ্চলে দল পরিচালনার জন্য অর্থের সংস্থান করে থাকে বান্না এন্টারপ্রাইজ নামে জামায়াত নেতাদের পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। মূলত বেসরকারী পরিচালনার জন্য ট্রেন লিজ নিয়ে তাঁরা পরিচালনা করেন। বিএনপি-জামায়াত আমলে বান্না নাম ব্যবহার করলেও আওয়ামী লীগ আমলে তা হয়ে গেছে তাজ এন্টারপ্রাইজ। এই প্রতিষ্ঠানটি এখনও ১২টি ট্রেন পরিচালনা করছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি স্টেশন পোড়াতে পার্বতীপুর থেকে ধানের খড় এনে আগের দিন স্টেশন ভবনে ঢোকানো হয়েছিল। আর এরই একটি ট্রেনে করে আনা হয়েছিল খড়গুলো। বোনারপাড়া স্টেশনের কাছে রেলে নাশকতায় পাঁচ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। পদ্মরাগ নামে এই ট্রেনটি পরিচালনা করে তাজ এন্টারপ্রাইজ।
বান্না এন্টারপ্রাইজ: নজরুল ইসলাম, জেলা জামায়াতের নেতা।
তাজ এন্টারপ্রাইজ: হারুনুর রশিদ, জেলা জামায়াতের নেতা।
হোপ এ্যাগ্রো লিমিটেড: প্রভাষক আজাদুল ইসলাম, সাংগঠনিক।
মূল প্রতিষ্ঠান বান্না এন্টারপ্রাইজ। বিএনপি আমলে ট্রেনগুলো বান্না এন্টারপ্রাইজের নামে ছিল। এখন চলছে তাজ এন্টারপ্রাইজের নামে। উল্লেখিত তিন জনই ২৮ ফেব্রুয়ারির ৪ পুলিশ হত্যা ও পুলিশ ফাঁড়ি হামলার মামলার আসামি। তাদের পরিচালিত একটি ট্রেনে করে খড় আনা হয়েছিল, স্টেশনে আগুন লাগানোর কাজে ব্যবহার করা হয়েছিলো।”
আওয়ামী লীগ একটি বড় দল। সেখানে কোন্ উপজেলায় কী হচ্ছে তার অনেক খবরই হয়ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পৌঁছায় না। কিন্তু যখন পৌঁছায় তখন কি কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়? সুন্দরগঞ্জের ঘটনায় যেসব আওয়ামী লীগ নেতা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কি কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? বা রেল যে জামায়াতী সংস্থাকে ট্রেন লিজ দিয়েছে তার লিজ কি বাতিল হয়েছে?
উপজেলার কথা বাদ দিই। নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় দু’এক নেতা কি জামায়াত নেতাদের বরণ করেননি? বা অনেক জামায়াত কর্মীকে আওয়ামী লীগে অন্তর্ভুক্ত করেননি?

কয়েকদিন আগে, নির্মূল কমিটির এক আলোচনা সভায় যেখানে অর্থমন্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন, শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী অভিযোগ করে বললেন, আমার স্বামী ডা. আলীম চৌধুরীকে হত্যা করেছিল যে আলবদর আবদুল মান্নান, সেই মান্নানের এক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় এমপি ও আওয়ামী লীগ নেতা। ওই নেতা অনুষ্ঠান বলেন, মান্নানের আত্মত্যাগ এ দেশের মানুষ ভুলবে না। বাংলাদেশের জন্য তার অবদান অনেক। মানুষ তা মনে রাখবে।

আলবদর মান্নান বেঁচে থাকলে যুদ্ধাপরাধের জন্য আজ তার বিচার হতো। সেই মান্নানের স্মরণসভা হয় এ দেশে এবং এ আমলে এবং সেখানে উপস্থিত থাকেন আওয়ামী লীগ নেতা ও এমপি এবং স্মরণ করেন এ দেশের জন্য আত্মত্যাগের কথা। মানুষ কতটা অবিবেচক ও নিষ্ঠুর হলে এ ধরনের কাজ করতে পারে এবং তা কতটা মর্মান্তিক একটি শহীদ পরিবারের জন্য।

এই যে ঝোঁক, এটিই ভয়ঙ্কর এবং যে সব কাজ আওয়ামী লীগ নেতারা [জামায়াত বরণ] ও সরকার [যেমন পদায়ন ও পদকায়ন] করছে তা আওয়ামী লীগকে খাদের কিনারায় নিয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, বিএনপি ও আওয়ামী লীগে কোন পার্থক্য থাকবে না। এবং তখন মানুষ বিএনপিকেই পছন্দ করবে। কারণ বিএনপি নেতারা তাদের কর্মী ও সমর্থকদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। আওয়ামী লীগ নেতারা প্রায়ই কেড়ে নেয়, দেয় না তেমন কিছু। আর রাজনীতির অন্য নাম তো পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানও। আওয়ামী লীগ মানুষ করে আদর্শের কারণে।

এ প্রসঙ্গে অনেকে ভোটের রাজনীতির কথা বলতে পারেন। বিএনপি-জামায়াত যুক্ত হলে বিএনপির ভোট কমবে। এটি এক ধরনের ফাযলামি এবং অবিবেচক আওয়ামী লীগাররাই একথা বলেন। যুদ্ধাপরাধের বিচার না করলে এবং যাদের মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে তাদের মুক্তি দিলেও কোন জামায়াত কর্মী বা নেতা আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে না। বিএনপির কেউ কেউ হয়ত দিলেও তা দিতে পারে। তা ছাড়া জামায়াতের ভোট কয় পার্সেন্ট? পাঁচ? এই পাঁচ পার্সেন্ট ভোটের জন্য এত বছরের আদর্শ ত্যাগ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। যে বঙ্গবন্ধুকে এখনও নিয়ত বিক্রি করতে হয় আওয়ামী লীগকে। এর চেয়ে মন ঠিক না করা ভোটারদের দিকে মনোসংযোগ করলে সেই ভোট পার্সেন্টের বেশি বাড়তেও পারে। এদিক থেকে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা যে বক্তব্য রেখেছে সেটিই সঠিক যে, জামায়াতকে কোন ছাড় দেয়া হবে না। কিন্তু একই সঙ্গে এ কথাও তাঁকে জানাতে হবে, তার দলের যারা ছাড় দিচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে তার নীতি কী হবে?

এ প্রশ্ন তুলতে হচ্ছে এ কারণে যে, মিডিয়া এখন অনেকে স্বাধীন এবং তাদের ঝোঁক আওয়ামী লীগ বিরোধিতা। আওয়ামী লীগপন্থী মনে করে যাদের টিভি লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল তা তারা বিক্রি করছে বিএনপি ও জামায়াতপন্থীদের কাছে। বিএনপিপন্থীরা যারা বিএনপি আমলে লাইসেন্স পেয়েছিল তারা কিন্তু তা বিক্রি করেনি। এই হচ্ছে আওয়ামীপন্থী ও বিএনপিপন্থীদের মধ্যে পার্থক্য। শুধু তাই নয়, আওয়ামী মন্ত্রীদের একটি ঝোঁক আছে বিএনপিপন্থীদের সাহায্য করা।১৯৯৬-২০০০ সালে বিএনপি নেতা মোরশেদ খানকে মোবাইল ফোনের মনোপলি দেয়া এর একটি উদাহরণ। 

আর একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। সাগর-রুনি হত্যাকান্ড। এ জন্য ব্যথিত না এ রকম একটি পাষন্ডও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এবং এক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ ও র‍্যাব কর্মকর্তাদের আওয়াজ বিষয়টিকে আরো জটিল করে তুলেছে। এবং এটি সরকারের একটি ব্যর্থতা। বিএনপি-জামায়াত সাংবাদিকরা চেয়েছেন এটি সরকারের একটি বড় ব্যর্থতা হিসেবে প্রমাণ করতে। এবং এতে প্রবলভাবে সাহায্য করেছেন সোবহান-বুলবুল নেতৃত্ব। এ কারণে, জনাব সোবহানকে পুরস্কৃত করা হয়েছে, বুলবুলও হবেন।

 কিন্তু যে প্রশ্নটা থেকে যায়, জামায়াত-বিএনপি আমলে শামছুর রহমান, বালু থেকে আরও অনেক সাংবাদিককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, পেটানো হয়েছে কতজনকে তার ইয়ত্তা নেই, কিন্তু সোবহান-বুলবুল গ্রুপ কি তখন এত সোচ্চার ছিলেন? বিএনপি-জামায়াতীরা কি তাদের হাত ধরে দুই বছর রাস্তায় রাস্তায় স্লোগান দিয়েছে। বা এখন তাদের কথাও বা কেন অনুল্লিখিত থাকছে? কারণ একটিই, আওয়ামী লীগকে বা শেখ হাসিনাকে যে যত ক্রসিফাই করতে পারে তার তত কদর। এ রকম একটি বিকৃত ঝোঁক আওয়ামী নেতৃত্বের মধ্যে বলবৎ।
আওয়ামী লীগ জোট সরকারের হেজাবি তোষণ নীতি যদি বন্ধ হয় তাহলে অবস্থা কী দাঁড়াতে পারে অন্তত মিডিয়ার ক্ষেত্রে তা স্বদেশ তাঁর প্রবন্ধের উপসংহারে উল্লেখ করেছেন-

‘‘এবারও প্রথমে শেখ হাসিনার সরকারের পক্ষ থেকে মাহমুদুর রহমানের মুক্তি দাবি করা ১৫ সম্পাদকের একজনকে একুশে পদকে ভূষিত করে একই কাজ করা হয়েছে। সরকার যদি এখনই ভুল সংশোধন না করে এ পথেই চলে তাহলে আগামী পাঁচ বছরে মিডিয়ায় এই পাকিস্তানপন্থীরাই দাপিয়ে বেড়াবে। পাশাপাশি এই বার্তার মাধ্যমে এটাও পরিষ্কার হলো যে, শেখ হাসিনার সরকার ‘পাকিস্তান’ মুক্ত নয়। শেখ হাসিনার এখনও নিজের ঘরে অনেক কাজ বাকি। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর এমনিভাবে নিজের ঘর পরিষ্কার করা হয়নি। যার ফলে ধরে রাখা সম্ভব হয়নি স্বাধীনতাকে। ১৯৭৫-এর ১৫আগস্ট শেষ হয়ে যায়। এবারও যদি সরকারের ভেতরের এই ‘পাকিস্তান’ পরিষ্কার করা না হয়, যদি ১৫ সম্পাদকের মতো আইএসআই-এর ক্রীড়নককে সমথর্নকারীদের তোষণ করা হয় ,তাহলে ভবিষ্যত ভাল নয়।”

এ প্রসঙ্গে আরও বলা দরকার, আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে বটে তবে তার সাংগঠনিক অবস্থা খুবই নড়বড়ে। উপজেলা নির্বাচনে তার আলামত পাওয়া যাচ্ছে। এর একটি কারণ, বর্তমান নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে প্রধানত পৃষ্ঠপোষকতায়, ওপর থেকে তা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। আগের মতো তা নিচ থেকে উঠে আসেনি। এলে এ মন্তব্য করতে হতো না।

এসব আলোচনার ক্ষেত্রে অনেক ভোটের রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে আনেন এবং বলেন, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। এ আপ্ত্যবাক্য সুবিধাবাদীদের। এ সুবিধাবাদী রাজনীতির কারণে জাতীয় পার্টির সঙ্গে আঁতাত করতে হয়েছে। আমরা কখনই এরশাদের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই এবং রাজনীতি থেকে তাকে অপসারণ জাতির জন্য মঙ্গল বলে মনে করি। এই লোকটিও আলবদর মান্নানকে মন্ত্রী করেছিলেন। হেজাবিদের পানি খাওয়ানোর জন্য মতিঝিলে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু, এই জোকারকেও ছাড় দেয়ার তেমন প্রতিবাদ করা হয়নি, তার একটি কারণ, এরশাদ বা জাতীয় পার্টি সেই রাজনীতি থেকে অনেকটা সরে এসেছেন। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধী বিচারের প্রশ্নে তাঁরা বিচারের পক্ষ সমর্থন করেছেন এবং এ ক্ষেত্রে বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। সম্প্রতি এটি একটি বড় নিরিখ তো বটেই। নির্বাচনের প্রশ্নে এরশাদ ক্লাউনের মতো আচরণ করলে তাঁর দলের সিংহভাগ তাকে প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ও স্বদেশ রায়ের লেখার প্রসঙ্গ নিয়েই এই দীর্ঘ নিবন্ধের ইতি টানব। যদি জনাব চৌধুরী ও আওয়ামী/জোট নেতৃত্বের বক্তব্য ও নীতিতে গুরুত্ব দিতে হয় তা হলে বিষয়টা দাঁড়াবে এমনÑ যারা আওয়ামী লীগ আমলে নানা প্রশ্নে কারণে অকারণে তাদের বিরোধিতা করে তাদের গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজনে পদ ও পদকায়ন। জামায়াত-বিএনপি আমলেও আবার তারা বহাল তবিয়তে থাকে। পদায়ন ও পদকায়ণ ঘটে ব্যবসা-বাণিজ্য হয় এবং বিএনপি-জামায়াত তাদের ‘সংরক্ষণ’ করে। ঐ আমলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কাউকে ছাড় দেয়া হয় না। আমাকে বা শাহরিয়ার কবিরের ক্ষেত্রে কী হয়েছিল তা এর উদাহরণ। তৎকালীন একুশে টিভি বন্ধ এর একটি উদারহণ। সে আমলে প্রচুর সাংবাদিক আহত, নিহত হয়েছেন। তাঁদের পন্থী কোন সাংবাদিক রাস্তায় নামেনি, সংহতির খাতিরেও। ইকবাল সোবহান গোলাম আযমের পক্ষে স্বাক্ষর করা সত্ত্বেও তাকে ছাড় দেয়া হয়নি। তত্ত্বাবধায় এবং সামরিক আমলেও তাদের রবরবা লক্ষণীয়। অর্থাৎ তারা সব সময় ভাল থাকবে। সমাজ-রাষ্ট্র তাদের সম্মানিত করবে। আর যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের জন্য চিৎকার করছেন, পদায়ন বা পদকায়ণ ঐ আমলে বা সামরিক তত্ত্বাবধায়ক আমলে তাদের কপালে জোটা দূরে থাকুক, তারা নিষিদ্ধ। আর মুক্তিযুদ্ধের শক্তির আমলে আমলে তারা শারীরিকভাবে নিরাপদ থাকে, তাদের সরাসরি পদাঘাত করা হয় না বটে, কখনও হয়ত করাও হয়। কিন্তু উপেক্ষাটি নিশ্চিত তাদের কপালে জোটে। স্বদেশ এ কথাটিই বলতে চেয়েছেন।

স্বদেশ যে রকম আবেগাক্রান্ত হয়ে লিখেছেন আমি সে রকম লিখব না। আমি আর তরুণ নই, সাহসও নেই তেমন। গোলাম সারওয়ার বা ইকবাল সোবহান তো একটি ভুল করতেও পারেন। সে জন্য কি আজীবন কাফফারা দেবেন? হ্যাঁ, আজীবন কাফফারা দেবেন না। এবং সেটি উচিতও না। কিন্তু একবার তো দেবেন। কাফফারা একেবারে না দিয়ে পুরস্কৃত হলে যে পুরস্কৃত করেছেন তিনি তো ধর্মবিরোধী কাজ করছেন বলেই তা বিবেচিত হবে। বিষয়টা এ রকম, সুশীল বাটপাররা জামায়াত-বিএনপি আমলে পদায়িত হবে, ভাল থাকবে এবং আওয়ামী আমলে পদায়িত ও পুরস্কৃত হবে। যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ বলে চেঁচাবে, একপাও নড়বে না, তাকে বিএনপি আমলে লাঞ্ছিত হতে হবে এবং আওয়ামী আমলে লাঞ্ছিত না হলেও অপমানিত বা পদাঘাতের সম্মুখীন হতে হবে।

সবশেষে একটি গল্প দিয়ে শেষ করি। আমার এক বাল্যবন্ধু গল্পটি আমাকে শুনিয়ে বলেছেন, এটি নাকি এখন খুব প্রচলিত। গল্পটি হলো দুই বন্ধু, ছেলেবেলার বন্ধু, পানশালায় গেছেন। তাদের একজন বিএনপি, অন্যজন আওয়ামী লীগ সমর্থক। দু-এক পেগ পেটে পড়ার পর তারা আলোচনা করতে লাগলেন সাম্প্রতিক রাজনীতি নিয়ে।

বিএনপি : দোস্ত, তোমরা তো দ্যাশটা দখল কইরা লইলা।
আওয়ামী : খালি মাঠ থাকলে গোল তো খাইতেই হইব।
বিএনপি : তবে সময় বেশি নাই, ম্যাডাম প্রিন্সের জন্য অপেক্ষা করছেন। প্রিন্স আইলেই খেল খতম।
আওয়ামী : কেমতে।
বিএনপি : তখন কি আর সরকার থাকতে পারব। আওয়ামীরা পলাইয়া দিশা পাইব না। ঘাবড়াও মাৎ। আমি তোমারে টাকা ছাড়া প্রোটেকশন দিমু।
আওয়ামীদের ম্যাংগো আর ম্যাক কোনটাই থাকবা না।
আওয়ামী : দোস্ত, বিএনপি দেইখাই পলিটিক্সটা বোঝলা না। শোন, ব্রান্ডিং বোঝ। বোঝ না; একেবারে মাথায় গাটনা দেয়।
বিএনপি : হ্যাঁ, বুঝলাম।
আওয়ামী : আমরা কিছু ব্রান্ডিং করছি। এই ব্রান্ডিং থেইকা ফিউচার জেনারেশনেরও মুক্তি নাই। তোমাগো তো নাই-ই। সব সময় এই ব্রান্ডিংগুলোর বিরুদ্ধে তোমাগো যুদ্ধ করন লাগব। ব্রান্ডিংগুলো শুনÑ মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, ত্রিশ লাখ শহীদ, যুদ্ধাপরাধের বিচার ও জয়বাংলা।

তো এই যে ব্রান্ডিং, এই ব্রান্ডিংয়ের সিংহভাগ কৃতিত্ব লেখক, সংস্কৃতি ও মিডিয়া কর্মীদের। বঙ্গবন্ধু ব্রান্ডিংয়ের কৃতিত্ব আওয়ামী লীগের সিংহভাগ। অপরগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও আওয়ামী লীগেরও অংশ আছে। কিন্তু এসব ব্রান্ডিংয়ে লেখক-সংস্কৃতিকর্মী, সিভিল সমাজ, মিডিয়া কর্মীদের কৃতিত্ব সিংহভাগ। এ সত্য স্বীকার করতেও পারেন, নাও পারেন, কিন্তু এটিই সত্য।

আমাদের শ্রদ্ধেয় কলামিস্ট ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতিবিদরা এখন এটি ভাবার কোন কারণ নেই যে, সব সময় এ রকম চলবে। দিন যেমন বদলাচ্ছে তেমনি মানুষের মনও বদলাচ্ছে। আমরা ব্রান্ডিং না করলে, প্রতিরোধ না করলে কী হতে পারে তা বুঝলে এ ধরনের আত্মঘাতী পদক্ষেপ থেকে আওয়ামী লীগ বা সরকার বিরত থাকবে।
এরপর মহিউদ্দিন যা লিখেছেন, আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে তার বক্তব্যটি সঠিক কিন্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, অনুচ্ছেদটি এমনভাবে লেখা হয়েছে যাতে পশ্চিম পাকিস্তানী, তাদের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি, কলোনির শোষণ চাপা পড়ে যায়।
তিনি লিখেছেন, ১৯৭১ সালে সেনাবাহিনীর এ্যাকশনের কারণে পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। ১৯৪৭ সাল থেকেই এর শুরু। শহীদ-ই-মিল্লাতকে [লিয়াকত আলী খান] খুন, মওদুদীকে ফাঁসিতে ঝোলানোর নির্দেশ, বাংলাভাষা আন্দোলন, নারায়ণগঞ্জ পাট কারখানা আন্দোলন, কর্ণফুলী কাগজকল আন্দোলন, শিল্পাঞ্চলে সংঘর্ষ, সংবিধান পরিত্যাগ, সামরিক শাসন জারি, মৌলিক গণতন্ত্রের প্রবর্তন, এবডো এবং সর্বশেষে আর্মি এ্যাকশন। এ সব বিষয় বিচ্ছিন্ন কোন বিষয় নয়। বরং তারা একটি শেকলের মতো। এই শেকলটি কালো হাতে কেউ ধরেছিল কিন্তু আমরা সামনে দেখেছি জেড এ ভুট্টো এবং শেখ মুজিবকে। আমরা দেখেছি ডাল রুটি, ডাল ভাতের জন্য তাদের দাবি, তাদের জীর্ণ শালওয়ার, শার্ট, লুঙ্গি বিশ্বাস করেছি তাদের, তাদের শিকার হয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাকিস্তানকে খ-িত করেছি। (পৃ-৮১]
প্রথমেই বলে নেয়া হচ্ছে ১৯৭১ সালের কর্মকাণ্ডের জন্য পাকিস্তানী সেনাবাহিনী দায়ী নয়, শেষেও একই কথা বলা হচ্ছে। লিয়াকত আলী ও মওদুদীর বিষয়কে একইভাবে দেখা হয়েছে। যদিও দু’টি বিষয় সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং এ অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে এর বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। নারায়ণগঞ্জ এবং কাপ্তাইয়ে কারখানায় কোন আন্দোলন হয়নি। হয়েছিল বাঙালী বিহারি দাঙ্গা এবং তা উসকে দিয়েছিল অবাঙালী কর্মকর্তারাই। এখানে পাকিস্তানী রাজনীতিবিদ আমলাদের চক্রান্ত, কলোনি শাসন, সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য ও নিপীড়ন, জামায়াত-মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি অনুপস্থিত। অদৃশ্য কালো হাত যে পাঞ্জাবীদের সেটি বাদ দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, ইয়াহিয়ার কথা একবারও উল্লেখ নেই। ১৯৭১ জামায়াত পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হয়ে কাজ করেছিল।
জামায়াতের মজলিসে শূরার অধিবেশন হলো ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে। অধিবেশনে অংশগ্রহণ করে নোয়াখালী জেলায় সাংগঠনিক সফর করলেন মহিউদ্দিন। কী হবে কী হবে সবাই এ চিন্তায় ব্যস্ত।
ঢাকা জ্বলছে, পূর্ব পাকিস্তান জ্বলছে লিখেছেন মহিউদ্দিন, সবাই উত্তেজিত, কিন্তু মহিউদ্দিনের কোন উত্তেজনা নেই। স্বাভাবিকভাবেই দিন যাপন করছেন যেন কিছুই হয়নি। কর্মীদের শুধু বললেন, রাজনীতির যা-ই হোক না তারা যেন জামায়াতের সঙ্গে বন্ধন শক্তিশালী করে। কী ঘটবে মহিউদ্দিন জানতেন কীনা জানি না। এ সম্পর্কে তিনি কিছু জানাননি। না জানলে ধরে নিতে হবে, রাজাকারের রক্ত অতি ঠা-া। যে কারণে ১৯৭১ সালে তারা ঠা-া মাথায় গণহত্যা করতে পেরেছিল।

॥ ৯ ॥
নোয়াখালী শহরে ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালে জামায়াত অফিসে মহিউদ্দিন বসেছিলেন। হঠাৎ দেখেন দু’জন অফিসে ঢুকলেন। তাদের দেখে তিনি খুব অবাক হলেন। এদের একজন হলেন চট্টগ্রামের ভূতপূর্ব আমির শফিউল্লাহ, তখন জামায়াতের শ্রম সম্পাদক। মহিউদ্দিনকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন;
‘আপনি এখনও এখানে?’
‘কেন, কী হয়েছে?’
‘কিছু একটা ঘটবে। উঠুন, চলুন লক্ষ্মীপুরে যাই।’
তারপর তিনি ঠিক করলেন কী ভাবে যাবেন। সোজাপথে না গিয়ে তিনি ঠিক করলেন, গ্রামের রাস্তায় রিক্সা করে যাবেন। বিদায় নিয়ে তিনি রওয়ানা হলেন। অর্থাৎ শফিউল্লাহ জানতেন কী হতে যাচ্ছে। মহিউদ্দিন বিকেলে লক্ষ্মীপুর পৌঁছলেন। ২৫ মার্চ থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি লক্ষ্মীপুরে নিজ বাড়িতে ছিলেন। সেখানে তিনি সেনাবাহিনীর ‘নির্যাতন’ ‘নিষ্ঠুরতা’-বিডিআর ও পুলিশদের দমন। বিভিন্ন সেনানিবাসেব বাঙালী পাক সেনাদের আক্রমণ ও প্রতিআক্রমণের কথা শুনেছেন। এখানে লক্ষণীয়, হানাদার বাহিনীর ‘নির্যাতন’ ও নিষ্ঠুরতা’ তিনি বিশ্বাস করেন না।
এবার রাজাকারের দিকের বয়ান শুনুন। তিনি লিখেছেন, “আমি এক শ‘ ভাগ নিশ্চিত যে একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কারণে আর্মি এ্যাকশন হয়েছে। যদি তা না হয় তাহলে যাদের পূর্বপুরুষরা পাকিস্তানের জন্য লড়াই করেছে, তাদের কেন শত্রু বানানো হবে? শত্রু বানানোর কারণ, তাহলে বাঙালীরা ক্ষুব্ধ হবে, পাকিস্তানী সেনাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেবে এবং এক সময় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে যেখান থেকে ফেরা যাবে না।’
মহিউদ্দিন মনে করেন, পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে গ্রাম, বিভিন্ন শহর ও ঢাকা থেকে আওয়ামী লীগের নেতারা আশ্রয়ের নামে ভারত চলে যায়। ইকবাল হল ও অন্যান্য হল যা ছিল নেতাদের দুর্গ তা ২৫ মার্চ বিকেলেই খালি হয়ে যায়। শহরে তো লোক বেশি ছিল না। সেগুলোও খালি হয়ে যায়।
বিনা কারণে রাজাকার মহিউদ্দিন বর্ণনা দেননি। এর পরে শুনলে বোঝা যাবে কোন মিথ্যা অনুচ্ছেদটি লেখা হয়েছে। তার ভাষায়, সেনারা খালি হলগুলোতে অভিযান চালায়। ঢাকায় তারা এক বিশেষ ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করে যার ফলে আলোর ফুলঝুরি উঠত। এই অস্ত্র ছিল নিরস্ত্রদের ভয় দেখানোর জন্য। মানুষজন হেঁটে গ্রামের দিকে রওনা দিল। হ্যাঁ, কিছু মানুষ মারা গেছে কিন্তু তা পরিকল্পনার বোকামির কারণে। কিন্তু সেই বোকামি নিরস্ত্র মানুষের না সশস্ত্র পাকিদের তা লিখতে ভুলে গেছেন মহিউদ্দিন। তিনি লিখছেন, না বোকামি বলব না বরং বলব চতুর। রেল লাইনের পাশে যদি গরিব শ্রমিকদের কয়েকজন মারা যায় বা গ্রেফতার করা হয়। তা হলে নিশ্চিতভাবে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হবে। যদি হিন্দু এক দার্শনিক অধ্যাপক মারা যায়, তা হলে পুরো হিন্দু সম্প্রদায় ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেবে, যার অজুহাতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। এবং বাস্তবে তাই ঘটেছিল। এতক্ষণে বোঝা গেল, মহিউদ্দিন প্রথমে উল্লেখিত আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের রেফারেন্স দিচ্ছেন। অর্থাৎ ষড়যন্ত্রকারীরা চতুরতার সঙ্গে এই কাজ করেছিল যাতে বাঙালীরা ক্ষুব্ধ হয় ভারত ক্ষুব্ধ হয়। বলিহারি রাজাকারের কল্পনা শক্তি।
২৫ মার্চ ও তার পরবর্তী ঘটনাগুলোর বিবরণ যেভাবে মহিউদ্দিন দিয়েছেন তাতে মনে হতে পারে মার্চ-এপ্রিলে যা ঘটেছে বলে প্রকাশিত হয়েছে আসলে তা গুজব। লিখেছেন তিনি, ‘একদিন সকালে একলা গ্রামের রাস্তা ধরে ভবানিগঞ্জ যাচ্ছিলাম। এক লোকের সঙ্গে দেখা। তার সঙ্গে আলাপ শুরু করলাম। তিনি বললেন, আমি চট্টগ্রাম থেকে পায়ে হেঁটে আসছি। হাজার হাজার শিশু, নারী, বৃদ্ধ একইভাবে খাওয়া-পানি ছাড়া হেঁটে আসছে। চাঁটগায় পাঞ্জাবীরা লাখ লাখ হত্যা করেছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।’
‘এ সময় দেখলাম জাতিসংঘের একটি গাড়ি আসছে। হাত তুলে থামালাম। চালক বিদেশী। আমি তাকে অনুরোধ জানালাম, ঐ লোককে গাড়িতে একটা লিফট দিতে যার মতে, শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে, চাঁটগায়ে লাখ লাখ লোক মারা গেছে, পাঞ্জাবী সৈন্যরা হেরে গেছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জিতছে এবং জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রের কর্ণধার হয়েছে।’ (পৃ. ৮৫]
২৫ মার্চ গণহত্যা নিয়ে বেশ একটা ব্যঙ্গ করা হয়েছে। কিন্তু তার মধ্যেও লক্ষ্য করুন। দু’টি অনুচ্ছেদে নিজে নিজেই শব্দের মানে বদলে ফেলেছেন। প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, পাঞ্জাবীরা হত্যা করছে, পরাজিত হয়েছে এমন কথা বলা হয়নি। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর কথা নেই, জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হয়েছেন তার উল্লেখ নেই।
১৫ এপ্রিল তিনি খবর পেলেন তার দূর সম্পর্কের এক শ্যালক মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছেন। মহিউদ্দিনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তারপরও মহিউদ্দিন যেচে গেলেন সেখানে। তাকে দেখা মাত্র বোঝা গেল শ্যালক ক্ষুব্ধ হলেন, যদিও মুখে কিছু বললেন না। তাকে স্বাগতও জানালেন না। মহিউদ্দিন বসা মাত্র শ্যালক পাকিস্তানী সৈন্যরা যে হত্যা লুট অগ্নিসংযোগ করছে তার কয়েকটি ঘটনা বললেন। মহিউদ্দিন খান বলেছেন, এসব গুজব, প্রোপাগা-া।’
এটি শোনা মাত্র মহিউদ্দিনের ভাষায় শ্যালক তাকে আমার্জিত ভাষায় গালাগাল করে বললেন, ‘আমার বাড়ি থেকে বের হও রাস্কেল, পাঞ্জাবী এজেন্ট, বের হও ইত্যাদি।’
মহিউদ্দিন পরে ঘটনাটি বিশ্লেষণ করে লিখেছেন, এরকম প্রতিক্রিয়ার কারণ কী? সেই একই কৌশল। তার জামাই ঢাকায় কোন এক জায়গায় কেরানির কাজ করে। ঢাকা থেকে পায়ে হেঁটে বাড়ি রওনা হয়েছিল। তিনদিন হেঁটে বাড়ি পৌঁছে সে জানিয়েছে, ঢাকা ধ্বংস্তূপে পরিণত হয়েছে। সব হিন্দু এবং প্রায় সব আওয়ামী লীগারকে মেরে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে বুড়িগঙ্গায়। রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া, পাবনা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রামেও একই ঘটনা ঘটেছে। হাজার হাজার লোক ঢাকা ত্যাগ করে গ্রামে গঞ্জে পৌঁছে এ ধরনের প্রচার করছে। তারা এমনভাবে বলছে যেন সব ঘটনা তাদের চোখের সামনেই ঘটেছে।
এরই সূত্র ধরে মহিউদ্দিন জানাচ্ছেন, এ ধরনের শত শত গল্পগাছা তখন পল্লবিত হয়েছে। মানুষকে বোকা বানানো হয়েছে। পাকিস্তানের শত্রুরা এতে সফল হয়েছে। এই ধরনের একটি কাহিনীর তিনি উল্লেখ করেছেন।
“টিক্কা খান নয়ফুট লম্বা এবং তিন ফুট পাশে। দিনে তিনি তিন কিলো মানুষের রক্ত পান করেন, সকালের নাস্তায় তিনি মানুষের মগজ খান। তিনি বলেছেন, আমি সব বাঙালীকে হত্যা করব। আমি মাটি চাই মানুষ চাই না।”

ঐ সময়ে এ ধরনের কাহিনী আমি শুনিনি। শেষ বাক্যটি সত্য। ঐ বাক্যটি ইচ্ছে করে দেয়া হয়েছে যাতে মানুষের মনে হয় এ ধরনের গুজব রটেছিল। মহিউদ্দিন আবার তার যুক্তি তুলে ধরেছেন এভাবে
যুগ যুগ ধরে মানুষ শুনে আসছে শিরির মুখে এক আজলা পানি তুলে দেয়ার জন্য ফরহাদ বিশাল এক পাথুরে পাহাড় কেটে পানির নহর এনেছেন। হযরত আলীর তরবারির ওজন তিন মণ, তার পুত্র হযরত হানিফা সকালে এক মণ চিড়া খেতেন। সোনাভান যে আলখাল্লা পরে যুদ্ধে নেমেছিলেন তার ওজন ছিল ছয় মণ। শেখ সাদী বাঘের পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়াতেন। বায়েজিদ বোস্তামী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন কা’বাতে গিয়ে। অশিক্ষিত মানুষ এসব কল্পকথা বিশ্বাস করে। কেউ তার প্রতিবাদ জানালে তাকে কাফের ঘোষণা করা হয়।

 মহিউদ্দিন বলতে চাচ্ছেন, এসব যেমন সত্য নয়; পাকিস্তানীদের হত্যাযজ্ঞও সত্য নয়। তবে, কথা হচ্ছে মহিউদ্দিন যেসব কাহিনীর উল্লেখ করেছেন সেগুলোর পুঁথির কল্পকথা। মানুষ এভাবেই তা নেয়। হয়ত কিছু বিশ্বাস করে। কিন্তু সেগুলো চ্যালেঞ্জ করলে কেউ কাফের ভূষিত হয়েছে শুনি নাই।

একবিংশ শতকেও তো কিছু মানুষ বিশ্বাস করেছে, সাঈদী চাঁদে; ১৬ কোটির সবাই তা বিশ্বাস করলে তো সেদিন আর সরকার থাকে না। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান কী করেছে তা রাজাকার আর আল বদর ছাড়া সবাই জানে, বিশ্বাসও করে। মহিউদ্দিন বলছেন, নিজের মা-বোন বা স্ত্রীর ধর্ষিত হওয়ার বা দু’একটি বাড়ি পোড়ানোর ঘটনা ঘটায় সবার বিশ্বাস হলো যে, ঢাকা শেষ তার মানুষজনও শেষ। ঘটনা আরও বিশ্বাসযোগ্য হলো এ কারণে যে, কিছু কিছু ছাত্র গ্রামে এসে যখন বলল, ইতিহাসে মুসলমান কর্তৃক মুসলমান হত্যার ঘটনা আছে।

 দিল্লীতে তৈমুর লঙ ৫০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে, মুঘলরা পাঠানদের হত্যা করেছে। এবং সবাই মুসলমান। তা’ হলে পাঞ্জাবী সৈন্যরা ৩০ লাখ মুসলমানকে হত্যা করলে অবিশ্বাসের কী আছে?

এরপর মহিউদ্দিন রাজাকার আলবদর ও ধর্ষণ সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন তাতে চমৎকৃত হতে হয়। তিনি লিখেছেন, ধর্ষণের কথা বলা হয়, কিন্তু আমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি। একজন রাজাকার-আলবদরও এ ধরনের কার্যে লিপ্ত হয়নি। আমরা সেটার চিন্তা করতে পারিনি। আল্লাহ আমাদের এ ধরনের পাপ থেকে রক্ষা করেছেন।”
এটি যে সর্বৈব মিথ্যা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমার লেখা ‘বীরাঙ্গনা ৭১’ ও ‘শান্তি কমিটি ১৯৭১’-এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা আছে কেস স্টাডিসহ। তাই এখানে সে বিষয় আর বিশদ উদাহরণ দিলাম না।
মহিউদ্দিন লিখছেন, তারা নিজেরাই নাকি নিজেদের নিয়ে ভয় পাচ্ছিলেন। জামায়াত ও মুসলিম লীগের লোকদের লাইন করে মারা হয়েছে। হ্যাঁ, রাজাকার আল বদররা যুদ্ধে মারা গেছে। কিন্তু মুসলিম লীগমনা বা জামায়াত সমর্থক লোক যারা নিষ্ক্রিয় ছিলেন তাদের হত্যা করা হয়েছে এমন ঘটনা বিরল। আফসোস করে লিখেছেন- ভুট্টো-মুজিব যদি এ ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি না করতেন তা’হলে গ্রামে-গঞ্জে আর্মির আগমন ঘটত না। কিন্তু কেন ঘটল? এবার রাজাকারী ব্যাখ্যা শুনুন।
আওয়ামী লীগ পাকিস্তানী আর্মিকে প্রতিরোধ করতে চাইল। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বাঙালী অফিসাররা দলত্যাগ করে বিভিন্ন জায়গায় তাদের সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। এর আগে আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করে তাদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। “আমাদের এলাকায়। অর্থাৎ নোয়াখালী] ভারতীয় সেনারা ছদ্মবেশে উপস্থিত হলো। ফেনী, চৌমুহনী, মাইজদি কোর্টে শ’য়ে শ’য়ে ভারতীয় সেনা ছদ্মবেশে অবস্থান নিল। পাকিস্তান বাহিনী এসব জায়গায় পৌঁছলে ভারতীয়রা গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নিল।” মহিউদ্দিনকে তার কর্মীরা জানিয়েছেন নিজ চোখে তারা এসব সৈন্যকে দেখেছেন।

এবার রাজাকার হত্যার বর্ণনা শুনুন
মুক্তিবাহিনী তার আক্রমণ শুরু করল। তাদের নীতি ছিল পাকিস্তানী বাহিনীকে অ্যামবুশ করা ও পাকিস্তানপন্থীদের হত্যা করা। “তারা আমাদের সাহসী ও কর্মচঞ্চল শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ শফিককে গ্রেফতার করে ধানক্ষেতে নিয়ে গেল। সেখানে প্রথমে তাকে নির্যাতন করা হলো। এখানে তারা তার গোড়ালি কাটল, তারপর হাঁটু, তারপর কোমর, তারপর গলা কর্তন করল। সে তারস্বরে সাহায্যের জন্য আবেদন করছিল আর অনুরোধ জানাচ্ছিল তাকে যেন এক কোপে মেরে ফেলা হয়। আমাদের জেলায় এটি ছিল প্রথম শাহাদতের কাহিনী। [পৃ. ৯৩]
ফেনীর মতো জায়গায় এ ধরনের ঘটনা ঘটান যে কত অসম্ভব তা যারা ১৯৭১ ছিলেন এ দেশে তারা জানেন। তারা কারো কোমর দ্বিখ-িত করে ফেললে সাহায্যের জন্য চিৎকারের প্রশ্নই তো আসে না।
এরপর তিনি আরও দু’তিনটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। এরা ছিলেন স্থানীয় জামায়াত নেতা, মুক্তি-বাহিনী যাদের তুলে নিয়ে হত্যা করে। সেটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। শত্রুদের কে না ঘায়েল করতে চাইবে।
১০ জুন তিনি ফেনী গেলেন সেনাবাহিনীর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে কথা বলতে। সেখান থেকে এলেন মাইজদি কোর্ট শান্তি কমিটির সহ-সভাপতি ও এ্যাডভোকেট সিদ্দিকুল্লাহ্র সঙ্গে কথা বলতে। এক সঙ্গে তারা মাগরেব পড়লেন। এমন সময় নোয়াখালী জামায়াতের দফতর সম্পাদক মওলানা নুরুল্লাহ এসে খবর দিলেন খলিফার হাটের এক জামায়াতকর্মী খবর দিয়েছে মুক্তিবাহিনী মাইজদি কোর্ট আক্রমণ করবে। নোয়াখালী কলেজ ইউনিয়নের সভাপতি ছাত্র সংঘের তোফায়েল আহমদ ও ছিলেন সেখানে। তারা ঠিক করলেন নিরাপদ জায়গায় তারা সরে যাবেন। জামায়াতে ইসলামের অফিসের পাশে ছিল মহিউদ্দিনের বাসা। সেখানে গেলেন তোফায়েল ও শামসুল আলম। একজন সরকারি অফিসের বাসায় আশ্রয় নিলেন মৌলানা নুরুল্লা ও একজন জামায়াতকর্মী। নোয়াখালী কলেজের এক শিক্ষকের বাসায় আশ্রয় নিলেন মহিউদ্দিন, অধ্যাপক ফজলে আজিম এবং এ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসেন। গভীর রাতে ঐ তিনজনকে দেখে বেচারা অধ্যাপক খুবই নার্ভাস বোধ করছিলেন। যা হোক, নোয়াখালী কলেজে যেহেতু দু’জনে চাকরি করেছেন সেহেতু আর অমত করেননি।
রাত দু’টোর সময় মুক্তিবাহিনী সত্যি সত্যিই মাইজদি কোর্টে পাকিস্তানী দালালদের খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় আক্রমণ করলেন। মহিউদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী এ্যাডভোকেট আশরাফুল হক যিনি পরিচিত ছিলেন সারা উকিল নামে তার বাসা মুক্তিবাহিনী আক্রমণ করে। তিনি পালাতে পারেননি। তাকে নাকি বারবার মহিউদ্দিনের কথা জিজ্ঞেস করা হয়। তিনি কোন খোঁজ দিতে পারেননি। তিনি, তার স্ত্রী, এক সন্তান ও গৃহভৃত্যকে মুক্তিবাহিনী গুলি করে হত্যা করে।
মহিউদ্দিন উল্লেখ করেছেন, এরপর থেকে এ ধরনের ঘটনা নিত্যনৈমত্তিক হয়ে উঠল। এ সব ঘটনা সামাল দেবার জন্য পাকিস্তানপন্থীদের নিয়ে গঠিত হলো রাজাকার বাহিনী। পূর্ব পাকিস্তানে এ ধরনের ‘এক্সপেরিমেন্ট’ ছিল নতুন এবং তা সফল হলো। এই কৌশলকে ভিত্তি করে সারা পূর্ব পাকিস্তানে রাজাকার বাহিনী গঠন করা হলো। পরে এই বাহিনীর নামকরণ করা হয় আল বদর, আল শামস এবং আর মুজাহিদ। ইসলামী ছাত্র সংঘ যারা করতেন তাদের বলা হতো আল বদর। জামায়াতী ইসলাম, মুসলিম লীগ, নেজামী ইসলামী প্রভৃতির ‘দেশ প্রেমিক জনগণ’ ছিল আল শামস এবং বিহারিরা আল মুজাহিদ।
এখানে খানিকটা বিভ্রান্তি হতে পারে। রাজাকার সব সময় আলাদা বাহিনীই ছিল। বাকি তথ্যগুলো সঠিক। এই প্রথম একজন রাজাকার লিখিতভাবে স্বীকার করেছেন ইসলামী ছাত্র সংঘ সম্পূর্ণভাবে আল বদর বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছিল যার প্রধান ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী। পরবর্তীকালে নিজামী ও অন্যান্য আলবদর নেতা মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, কাদের মোল্লা প্রমুখ এই সত্যটি অস্বীকার করেছেন।
নোয়াখালীতে তার ভাষ্য অনুযায়ী রাজাকারদের সাত দিনের রাইফেল ট্রেনিং দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় মোতায়েন করা হয়েছিল। মুক্তিবাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য। মহিউদ্দিন স্বীকার করেছেন, একবার রাজাকার বাহিনীতে কেউ যোগ দিলে একা নিজ গ্রামে যেতে পারত না। কারণ, মুক্তিবাহিনীও সাধারণ জনগণ মনে করতেন, রাজাকার হচ্ছে পাঞ্জাবীদের এজেন্ট, সুতরাং বাঙালীদের শত্রু। এবং তাই তাকে হত্যা করতে হবে।
মহিউদ্দিন জানাচ্ছেন, প্রচ্ছন্ন গর্বের সুরে যে, এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই অবস্থা চলেছে। আমাদের দিনরাত্রি এই রকম আর্মি অপারেশন অবস্থায় জরুরী অবস্থার মতো কাটাতে হয়েছে। জনগণ আমাদের সমর্থন করেনি কিন্তু আমাদের ভারতে ঠেলে দিতে পারেনি। মুক্তিযোদ্ধাদের দমন করা হয়েছে। তারা মর্টার, স্টেনগান, ভারি অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে আমাদের ঘাঁটি আক্রমণ করেছে। আমাদের ছিল শুধু থ্রি নট থ্রি। গ্রামবাসীরা তাদের গোপন আশ্রয়ে থেকেছে কিন্তু বাজার হাট বা শহর আমাদের নিয়ন্ত্রণে থেকেছে।” শেষোক্ত মন্তব্য সত্য হলে রাজাকারদের পরাজিত হওয়ার কোন কারণ ছিল না।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ‘ঢাকা পতনের’ আগে মুক্তি বাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী নোয়াখালী আক্রমণ করে। মহিউদ্দিন তখন চিকিৎসার কারণে ছিলেন ঢাকায়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী রাজাকারদের সম্মুখযুদ্ধে পাঠাল। মহিউদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী ‘তারা বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে শহীদ হলো। ৮ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী নোয়াখালী দখল করে রাজাকার ঘাঁটিগুলো আক্রমণ করে। বেশিরভাগ রাজাকারই মারা পড়ে। মহিউদ্দিন জানাচ্ছেন, ঢাকার পতনের পর ১০ হাজার পাকিস্তানপন্থীদের হত্যা করা হয়, তার মধ্যে ৫০০০ ছিল নোয়াখালীর।
জামায়াতের ২০ জন জেলা আমীর, শান্তি কমিটির সভাপতি ও সম্পাদকদের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার মাত্র একজনের নাগরিকত্ব বাতিল করে এবং জীবিত বা মৃত ব্যক্তিটির জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে। ব্যক্তিটি হলেন মহিউদ্দিন। তার এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, নোয়াখালীতে কী ত্রাসের রাজত্ব চালিয়ে ছিলেন তিনি।
বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয় পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে যেখানে দেখা যায় নোয়াখালীতে পাকিস্তানীদের পক্ষে তিনিই ছিলেন প্রধান স্তম্ভ। 
॥ ১১ ॥
নোয়াখালী থেকে মহিউদ্দিন তার স্ত্রী নার্গিস, দুই শিশু সন্তান ও কিশোর শ্যালক শাব্বিরকে জুন মাসে ঢাকা পাঠিয়ে দিলেন। এর অর্থ নোয়াখালী মহিউদ্দিনের কাছেও আর নিরাপদ ঠেকছিল না।
রেল ব্যবস্থা তখন বিপর্যস্ত। কুমিল্লা পর্যন্ত যেতে পারলেন নার্গিস। তার মামাকে আসতে বলেছিলেন স্টেশনে। কারফিউয়ের কারণে, মামা আসতে পারেননি। মহিউদ্দিন লিখেছেন, সেখানে এই চারজন ছাড়া আর কোন স্ত্রীলোক ছিল না। নিশুতি রাত, কারফিউ তারপর সম্মান ও পবিত্রতা (সতীত্ব) রক্ষার প্রশ্ন থাকা সত্ত্বে¡ও ‘ইসলামী আন্দোলনের অকুতোভয় মহিলা সৈন্য’ এক শিশুকে কোলে আরেক শিশু কন্যার হাত ধরে তিন মাইল পথ হেঁটে মামাবাড়ি পৌঁছান।
জুলাই বা আগস্ট মাসে জেনারেল টিক্কা খান নোয়াখালী এলেন। ডেপুটি কমিশনার সরকারী কর্মচারী ও শান্তি কমিটির সদস্যদের সভা করলেন। শান্তি কমিটির সদস্যরা সভাপতি এ্যাডভোকেট সৈয়দুর রহমানের বাসায় সভা করলেন। সিদ্ধান্ত হলো, টিক্কা খানকে সাদরে অভ্যর্থনা জানানো হবে এবং তাকে অভিনন্দনপত্র দেয়া হবে। কিন্তু মুক্তিবাহিনীর ভয়ে কেউ আর অভিনন্দনপত্র পড়তে রাজি নন। মহিউদ্দিনই জানালেন, তিনিই অভিনন্দনপত্র পাঠ করবেন।
জুন থেকে অক্টোবর মহিউদ্দিন নোয়াখালীতে বিভিন্ন রাজাকার ক্যাম্পে অবস্থান করেছেন। অক্টোবরে তিনি আলসারে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং গোলাম আজমের কাছে অনুমতি চান ঢাকায় চিকিৎসা করার। গোলাম আজম অনুমতি দেন। মকবুল আহমেদকে নোয়াখালীর আমীর করা হয়। মহিউদ্দিন কর্মী এবং রাজাকারদের থেকে বিদায় নিয়ে চট্টগ্রাম গেলেন, সেখান থেকে প্লেনে ঢাকা। প্রতীয়মান হয় যে, পাকিস্তানী দালাল এবং ত্রাস হিসেবে মহিউদ্দিন পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন এবং তার আশঙ্কা ছিল তার ওপর আক্রমণ হতে পারে। সে কারণে, রাজাকার ক্যাম্পে থাকতে তিনি স্বস্তি বোধ করতেন। তিনি চালাক লোক, বুঝেছিলেন, পাকিস্তানীরা হটে যেতে পারে তাই তিনি ঢাকা চলে যেতে চাইছিলেন। অসুখটা ছিল অজুহাত।
ঢাকায় তিনি স্ত্রী, পুত্র নিয়ে নাখালপাড়া থাকতেন। শ্বশুরকে বলেছিলেন- বাসাবো থেকে মালিবাগ চলে আসতে নিরাপত্তাজনিত কারণে। ভারতীয় আক্রমণ শুরু হলে তিনি এক আল বদরকে নির্দেশ দেন একটা বাস পাঠাতে।