Saturday, October 19, 2013

কথিত নাস্তিকেরা “নাস্তিক” নন-পিনাকী ভট্টাচার্য



নাস্তিক শব্দটি বাংলা নয়, সংস্কৃত এবং বৈদিক। শব্দটি যখন বাংলায় অন্তর্ভুক্ত হয়, সে সময় যারা এই শব্দটাকে বাংলা ভাষায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন তারা শব্দটার সঠিক অর্থ অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সেকারণে নাস্তিক বলতে সংস্কৃতে যা বোঝায় বাংলায় সেটা বোঝানো হয়না। বাংলায় নাস্তিককে এথিস্টের সমার্থক মনে করা হয়। এই সরলীকরণ ধর্মতত্ত্বের জন্য একটা বড় সমস্যা। কারণ সংস্কৃতে নাস্তিক মানে নিরীশ্বরবাদী নয়। বিশেষ করে নাস্তিক শব্দটি যারা আবিষ্কার করেছে তাঁদের জন্যও নাস্তিক শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহার অস্বস্তিকর। ধর্মতাত্ত্বিক এই জটিল সমস্যা মেটানোর জন্য প্রয়োজনে বাংলা অভিধান সংশোধন করা যেতে পারে।

হিন্দু ধর্মতত্ত্বে নাস্তিক বলতে তাঁদেরকেই বোঝায় যারা বেদের অপৌরুষেয়তায় বিশ্বাস করে না। অর্থাৎ বেদকে ঐশ্বরিক গ্রন্থ মনে করে না। এর মানে এটা নয় যে নাস্তিকরা নিরীশ্বরবাদী বা ধর্মদ্রোহী। হিন্দুদের মধ্যে চার্বাক পন্থীরা ধর্ম পালন করেও নাস্তিক্যবাদের চর্চা করতে পারেন। তারা বেদের পশুঘাত, শ্রাদ্ধাদি ক্রিয়া এবং ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব মানেন না। হিন্দু ধর্মের মতে ভারতীয় দর্শনের মধ্যে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মও নাস্তিক দর্শন।

নাস্তিক শব্দটা অবশ্য প্রথমে ঘৃণা ও অবহেলা প্রকাশের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিলো। কিন্তু নাস্তিক ও আস্তিকদের মধ্যে হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা তীক্ষ্ণ বিতর্কে হিন্দু ধর্মের কঠোরতা পরিবর্তিত হয়েছে। ভারতবর্ষের অহিংসার দর্শন নাস্তিকদের অবদান। জৈন আর বৌদ্ধ ধর্মের উদ্ভব হওয়ার ক্ষেত্রে চার্বাক নাস্তিকদের অবদান অনস্বীকার্য। নাস্তিকদের কারণেই হিন্দু ধর্ম সংস্কার এবং এর ফলে মানব জীবনের আদর্শ উচ্চতর হয়েছে। তর্কবিদ্যাও নাস্তিকদের অবদান।

এথিস্টদের নিরীশ্বরবাদী বলার ক্ষেত্রেও সমস্যা আছে, কারণ বৌদ্ধরা নিরীশ্বরবাদী। তবে কী বলা যায় এথিস্টদের? আমার প্রস্তাব যাদের জন্য এটা মাথা ব্যথা তারা একটু এটা নিয়ে মাথা ঘামাক।

হেফাজতে ইসলামী কি জানে যে এটা একটা বিশুদ্ধ সংস্কৃত এবং কঠোর বৈদিক শব্দ?

লেখক: ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্ট Unmochon

আলোর জরিপে এতটা আঁধার ! জামায়াত, তোমার কী লাগে আর ? -ফেরদৌস আরেফীন



বাংলাদেশের অন্যতম জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ‘‌‌‌‌‌‌প্রথম আলো’র উদ্যোগে একটি পেশাদার জরিপ প্রতিষ্ঠান পরিচালিত সম্প্রতি প্রকাশিত হওয়া সর্বশেষ রাজনৈতিক জরিপটি অনেকগুলো কারণেই বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। বিশেষ করে, জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় এবং নির্বাচন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মতানৈক্য থেকে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার কারণে, জনমত ভিত্তিক রাজনৈতিক তথ্য-উপাত্ত সম্বলিত এই জরিপটি গেল ১০ অক্টোবর দৈনিক ‘‌‌‌‌‌‌প্রথম আলো’র প্রথম পাতায় প্রধান শিরোনামে বিশাল অংশ জুড়ে ছাপা হওয়ার পর থেকে অনেকেই এটি নিয়ে চিন্তা-গবেষণা-মন্তব্য করছেন, সোজা কথায় মাথা ঘামাচ্ছেন। জরিপের উদ্যোক্তা দৈনিক পত্রিকাটি তাদের এই জরিপটির স্বপক্ষে একাধিক মতামত তথা উপ-সম্পাদকীয় প্রকাশের মাধ্যমে, জরিপ থেকে উঠে আসা ফলাফলগুলো আমলে নিয়ে নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে পারলে তারা লাভবান হবে বা হতে পারবে -এমন একটি মতবাদ দেয়ারও চেষ্টা করেছে। কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল জরিপটি নিয়ে আলোচনা, টক-শো আয়োজন করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মুখ থেকেও এই জরিপ বিষয়ে যার-যার অবস্থান অনুযায়ী কম-বেশি বক্তব্য পাওয়া গেছে।
জরিপটি প্রকাশের পর এর খুঁটিনাটি পড়ে এবং ‘প্রথম আলো অনলাইন’ সংস্করণ থেকে মুল জরিপের ইংরেজি ভার্সনটিতে চোখ বোলানোর পর, দীর্ঘ রিপোর্টিং ক্যারিয়ারে জন্ম নেয়া ব্যাক্তিগত ‘সন্দেহপ্রবণ ও অনুসন্ধানী’ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বিশ্লেষণ করে জরিপটির গোড়াতেই অনেকগুলো বেখাপ্পা গলদ আমার চোখে পড়ে। আমি কোনো জরিপ বিশেষজ্ঞ নই, অর্থনীতি বা পরিসংখ্যানের লোকও নই। কিন্তু মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদ চর্চায় নিজেকে একজন অগ্রপথিক মনে করি। আর দৈনিক ‘‌‌‌‌‌‌প্রথম আলো’র জরিপটি তাই যুক্তির ছকে ফেলে তাতে মুক্তচিন্তার প্রয়োগের পর কিছু বিষয়ের জন্য এটিকে সোজা ভাষায় ‌উদ্দেশ্যমূলক, দূরভিসন্ধীমূলক এবং এক বা একাধিক বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টায় সুকৌশলে চরম বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে মূল্যায়ণ করা ছাড়া আমার পক্ষে আর কিছুই মনে করা সম্ভব হয়নি! আর, বিভিন্ন এলাকার ভিন্ন-ভিন্ন শ্রেনী, পেশা ও বয়সের পাঁচ হাজার মানুষের মতামতের ভিত্তিতে এই জরিপ করা হয়েছে এবং যে কোনো জরিপের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য এই ‘পাঁচ হাজার’ সংখ্যাটি একটি বৃহত্ এমনকি যথেষ্ঠেরও অধিক বলে আ্যখ্যা দিয়ে, বারবারই পত্রিকাটি এই জরিপটিকে সম্পূর্ণ যৌক্তিক, বস্তুনিষ্ঠ এবং প্রায়-বাস্তবসম্মত মানের একটি জরিপ হিসেবে আখ্যা দেয়ার যে চেষ্টা করছে, তার জবাবে শুধু একটা কথাই বলতে হয়- তথ্যদাতার বিশাল সংখ্যা কিংবা তথাকথিত ‘বহুস্তরবিশিষ্ট প্রণালিবদ্ধ দৈবচয়ন নমুনায়ন ভিত্তিক’ –এরকম যত কথাই বলা হোক না কেন, জরিপের ফলাফল বলতে গেলে পুরোটাই নির্ভর করে মতামত গ্রহণের জন্য প্রস্তুতকৃত প্রশ্ন ও বিষয়াবলীর ওপরই। আর এক্ষেত্রে প্রশ্নের ধরন ও মাত্রিকতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দৈনিক ‘‌‌‌‌‌‌প্রথম আলো’র জরিপে ওই পাঁচ হাজার মানুষের মতামত গ্রহণের সময় তাদের সামনে রাখা প্রশ্ন ও বিষয়াবলী এতটাই উদ্দেশ্যমূলক, একপাক্ষিক, বিভ্রান্তিকর এবং বাস্তবতা বিবর্জিত ছিলো যে, এই জরিপের ফলাফল শেষ পর্যন্ত পুরো জাতির মনে কেবল একরাশ বিভ্রান্তি আর দোলাচলের সৃষ্টি করেছে, আর এটাই ছিলো জরিপের মূল উদ্দেশ্য।
জরিপের শুরুতেই দেখা যায়, ‘প্রথম আলো’র ছাপার ভাষায়- “এ মুহূর্তে নির্বাচন হলে দেশের ৩৬.৫ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগকে, আর ৫০.৩ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিতে চান”। আবার এই জরিপেরই আরেকটি অংশে দেখা যায় যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হওয়ার পক্ষে আছেন দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় আসলে যে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়াটি নিশ্চিতভাবেই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে- সে কথা পাগলেও জানে। জরিপ থেকে উঠে আসা এই দুই তথ্য দেখার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হওয়ার পক্ষে থাকা ওই ৮০ শতাংশ মানুষের ৩৬.৫ শতাংশ যদি আওয়ামী লীগে ভোট দিতে ইচ্ছুক অংশের সেই মানুষেরা হয়ে থাকেন, তাহলে বিচারের পক্ষে থাকা বাদবাকি ৪৩.৫ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগকে ভোট না দিয়েও কিভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন? তারা সবাই কি এতটাই বিভ্রান্ত? নাকি জরিপ প্রতিষ্ঠানটি বেছে-বেছে কেবল বিভ্রান্ত ব্যাক্তিদের কাছ থেকেই মতামত সংগ্রহ করেছে? নাকি আবার এই সাড়ে ৪৩ শতাংশ মানুষ ভাবছেন যে বিএনপি ক্ষমতায় গেলেও যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচার প্রক্রিয়া এরকমই চালু রাখবে? কিন্তু স্বয়ং বিএনপি-চেয়ারপার্সন যেখানে বলেছেন যে, “বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডের বিচার করা হবে”, সেখানে বিএনপি ক্ষমতা পেলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ভদ্রলোকের মতো চালিয়ে যাবে –এটা চিন্তা করা তো একেবারেই অসম্ভব! এই জরিপে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে সমর্থন করা মানুষের অনুপাত এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষ-বিপক্ষ মতামত নিয়ে পাওয়া অনুপাত দেখে মনে হয় যেন, এই ফলাফল দুটি জরিপের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান দৈনিক ‘‌‌‌‌‌‌প্রথম আলো’র সেই চিরায়ত আওয়ামী-বিরোধীতা সত্ত্বেও প্রগতিশীলতার ভাব রক্ষার্থে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষাবলম্বন করা এক অদ্ভুত-সাংঘর্ষিক মানসিকতারই বহি:প্রকাশ। ঠিক এরকম বহি:প্রকাশই ‘‌‌‌‌‌‌প্রথম আলো’ দেখিয়েছিলো এ বছরের এপ্রিল মাসে, এই একই বিচার সম্পর্কিত অন্য একটি ইস্যুতে- যখন যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবিতে শাহাবাগে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এবং ওই মঞ্চে ‘প্রথম আলো’র বেশ ক’জন সিনিয়র কর্তাব্যাক্তির নিয়মিত-সরব উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও, সেই ‘প্রথম আলো’তেই আবার হাসনাত আবদুল হাই রচিত চরম বিতর্কিত একটি গল্প প্রকাশের মধ্য দিয়ে গণজাগরণ মঞ্চের গোটা বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি হীন-জঘণ্য অপচেষ্টার মাধ্যমে। অব’শ্য ব্যাপক নিন্দা ও প্রতিবাদের মুখে ‘মাফ চেয়ে’ গল্পটি ‘প্রত্যাহার’ করে নেয় পত্রিকাটি! (ছাপানো অক্ষর প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া আমার এই ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে অদ্যাবধি ধরেনি!)
এ তো গেল একটা ভন্ডামি। এবার লক্ষ্য করুন আরেকটি আরও ভয়াবহ বিভ্রান্তি সৃষ্টির প্রয়াস। তা হলো এই যে, জরিপটি করার সময় যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নে মানুষের মতামত নেয়া হলেও, আগামী নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তখন এই বিচার প্রক্রিয়া চলমান কিংবা স্থবির –এ দুই অবস্থার প্রয়োজনীয়তা এবং সম্ভাবনা নিয়ে কোনো ধরনের মতামতই নেয়া হয়নি! অথচ পুরো জাতির সামনে এখন এটি একটি অনেক বড় প্রশ্ন! বিএনপি ক্ষমতায় গেলে বিচারের কি হবে, ট্রাইবুনাল থাকবে নাকি বিলুপ্ত হয়ে যাবে- এসব নিয়ে জনগণের মধ্যে যে চরম শঙ্কা-সন্দেহ-দুশ্চিন্তা বিরাজ করছে, সেটি ‘প্রথম আলো’র জানা নেই- তাও কি বিশ্বাস করতে হবে! আবারও বলতে হচ্ছে, যে কোনো জরিপের ফলাফল পুরোপুরিই বিষয় আর প্রশ্নের ওপর নির্ভরশীল। প্রশ্ন না থাকলে উত্তর-অনুপাত আসবে কোথা থেকে?
বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, যুদ্ধাপরাধের রায় নিয়ে বিএনপি’র নীরব ভূমিকা বিষয়েও এই জরিপে ভোট বা মতামত নেয়া হয়েছে! বিএনপি’র নীরবতা সঠিক না বেঠিক- তা নিয়ে জনগণের এত মাথাব্যাথা তো কোত্থাও দেখলাম না? তাহলে ‘‌‌‌‌‌‌প্রথম আলো’র এ নিয়ে এত দুশ্চিন্তা কিসের? অথচ এর চেয়ে অনেক-অনেক জরুরী বিষয় বিএনপি ক্ষমতায় আসলে এই বিচার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যত্ কি হবে- সেই প্রশ্ন বা প্রসঙ্গই নেই জরিপে? আসলে বিএনপি’র নিরবতা নিয়ে জরিপে অহেতুক টানাটানির কারণ ‘‌‌‌‌‌‌প্রথম আলো’ না বললেও আমরা যে বুঝি না, তা কিন্তু নয়‍! রায় নিয়ে বিএনপি’র নীরবতার প্রসঙ্গ টেনে বিএনপিকে কিঞ্চিত বিব্রত করার মধ্য দিয়ে বন্ধুপ্রতীম জামায়াতকে একটু খুশী করাই ‘‌‌‌‌‌‌প্রথম আলো’র উদ্দেশ্য? বন্ধুর খারাপ সময়ে এরকম ছোট-ছোট ‘গিফট’ মন্দ নয়! ‘‌‌‌‌‌‌প্রথম আলো’কে বলতে চাই, বন্ধুকে ‘গিফট’ দেয়ার উদ্দেশ্যে, গণমানুষের প্রকৃত চিন্তাধারাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য অযাচিত-অপ্রয়োজনীয় চিন্তাকে সামনে টেনে আনার এই অপকৌশল নতুন কিছু নয়। কিন্তু এর পরিনাম কখনোই ভালো হয়নি, বরং বুমেরাং হয়েছে। স্বৈরাচার পতনের আন্দোলন তুঙ্গে থাকা অবস্থায় নিজের গদি বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে স্বৈরাচারী এরশাদ গণমানুষের আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার হীন উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতের বাবরী মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে ইস্যু বানিয়ে সারাদেশে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা লাগানোর যে চেষ্টা করেছিলেন- অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের মুসলমান সম্প্রদায় এরশাদের সেই সাজানো খেলায় অংশ না নিয়ে, বরং এরশাদের পালিত গুন্ডা-বাহিনীর হাত থেকে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বন্ধুদেরকে নিজেদের গৃহে আশ্রয় দিয়ে, স্বৈরাচারের ওই শেষ অপচেষ্টাটিও ভন্ডুল করে দিয়েছিলো। আর আন্দোলনের শেষদিকে স্বৈরাচারের সেই রায়ট-নাটক গণঅভ্যুত্থানের পালে যেন আরও বেশি হাওয়ার যোগানই দিয়েছিলো। ‘প্রথম আলো’তে কর্মরত পরম শ্রদ্ধাভাজন সিনিরয় সাংবাদিক ভাইদের সেই ঘটনাগুলো তো ঘন্টা-মিনিট-সেকেন্ডসহ মনে থাকার কথা! তবুও কেন তাঁরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ভবিষ্যত্ বিষয়ে বিএনপি’র যে সিদ্ধান্ত বা চিন্তাটি এদেশের প্রগতিশীল ও স্বাধীনতার পক্ষের প্রতিটি মানুষের এই মুহূর্তের প্রধানতম জিজ্ঞাসা- তার বিন্দুমাত্র ধারে-কাছে না গিয়ে, শুধুই জামায়াতকে খুশি করতে বিএনপি’র নিরবতা নিয়ে অহেতুক গবেষণায় মত্ত হলেন? এই বুঝি ‘যা কিছু ভালো তার সঙ্গে প্রথম আলো’র নমুনা?
বিশাল আরেকটি গলদ রেখে দিয়েছেন কৌশলী ‘প্রথম আলো’।
খুব কৌশলে কাজ সারলেও গলদটি রয়েই গেছে তাদের অগোচরে। সেটি হলো এই যে, ‘প্রথম আলো’র আগের জরিপটির মতো এবারের জরিপেও জামায়াত নিষিদ্ধের বিপক্ষে নাকি মত দিয়েছেন বেশিরভাগ মানুষ! মানবতাবিরোধী অপরাধ আইন অনুযায়ী, যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে শুধু কিছু ব্যাক্তির বিচার করাই নয়, বরং অপরাধের সঙ্গে জড়িত সংগঠনকেও বিচারের আওতায় আনা। মাত্র আট মাস আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদে পাশ হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধ আইনের সর্বশেষ সংশোধনটি আশা করি ‘প্রথম আলো’র বিজ্ঞতম সাংবাদিকবৃন্দ এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাননি! আর তাঁরা নিশ্চই এটাও ভোলেননি যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল একাধিক আসামীর রায় ঘোষণার সময় জামায়াতে-ইসলামী নামের রাজনৈতিক সংগঠনটিকেও একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ও সংশ্লিষ্ট বলে কঠোর ভাষায় মন্তব্যও করেছেন। কিন্তু ‘প্রথম আলো’র আগেরটি এবং এবারেরটি- এই দু’টো জরিপেই জামায়াত নিষিদ্ধ করা বিষয়ে মানুষের মতামত নেয়া হলেও, জামায়াত নিষিদ্ধের চেয়েও অনেক বেশি জরুরী এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়- যুদ্ধাপরাধের দায়ে মানবতাবিরোধী অপকর্মে জড়িত সংগঠন হিসেবে জামায়াতে-ইসলামীকে বিচারের মুখোমুখী করা নিয়ে কোনো মতামতই নেয়া হয়নি! এর কারণ কি হতে পারে? পাঠক, কষ্ট করে খুঁজতে হবে না, আমিই বলে দিচ্ছি- গত কয়েক মাসে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে ‘প্রথম আলো’র সংবাদ আর উপ-সম্পাদকীয়গুলো নেড়েচেড়ে দেখলে জামায়াতে-ইসলামীকে বিচারের মুখোমুখী করার প্রতি তেমন কোনো তাগাদাই চোখে পড়ে না। আবারও সেই একই ‘এরশাদীয়’ অপকৌশল! জামায়াতে-ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা বিষয়ে ‘প্রথম আলো’র জরিপে এই বিভ্রান্তিকর ‘হ্যাঁ-না’ ভোটাভুটির ফলাফল প্রকৃত অর্থে এই দাঁড়ালো যে- জামায়াত নিষিদ্ধের বিপক্ষে মত দেয়া যে ৭০ শতাংশ মানুষের কথা বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে কতজন যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতে-ইসলামীর বিচার চান, কিংবা জামায়াত নিষিদ্ধ করার বিষয়ে এই জরিপ করা সময় যেভাবে প্রশ্নটি করা হয়েছে- ঠিক সেভাবে সরাসরি সরকারের নির্বাহী আদেশে দলটিকে নিষিদ্ধ না করে বরং মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণের মাধ্যমে বাংলাদেশের মাটিতে ওই দলটির রাজনীতি করার অধিকার চিরদিনের জন্য তুলে নেয়ার পক্ষে কতজনের মত আছে, অথবা উচ্চ-আদালতের রায়ে যে উপায়ে জামায়াতে-ইসলামীকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হলো- সেরকম পদ্ধতি অবলম্বনে কিছু একটা সিদ্ধান্তে যাওয়া ওই ৭০ শতাংশ মানুষের মধ্যে কতজন আশা করছেন – এসবের প্রশ্নের একটিরও উত্তরও জানার ‍সুযোগ পাওয়া গেল না এই জরিপ থেকে। উপরন্তু, জনগণের যে বিশাল অংশটি যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতে-ইসলামীর বিচার আশা করেন এবং যাদের তীব্র দাবির প্রেক্ষিতে আইনটি সংশোধন করে ব্যাক্তির পাশাপাশি সংগঠনকেও মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় আনার সুযোগ সৃষ্টি করা হলো- তাদের সবাইকে সুকৌশলে খাটো করার এক নষ্ট-খেলা হয়ে গেলো এই জরিপের আড়ালে! ‘প্রথম আলো’ কি মনে করে যে, তারা যেটিকে প্রশ্ন কিংবা ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করে সেটির ওপর মতামত সংগ্রহের মাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে অনুপাত গুনে ছাপিয়ে দেবেন, সেটাকেই আমাদের ইস্যু হিসেবে মেনে নিতে হবে? আর অধিকাংশ জনগণের মগজে যেটি আসলেই ইস্যু হয়ে বসে আছে, সেটির কোনো খবরই থাকবে না? এমনটা মনে করলে সামনে চরম ধরা খেতে হবে, অতীতে যারা এমনটা ভেবেছে- প্রত্যেকে ধরা খেয়েছে, মনে করে দেখুন।
জরিপ ব্যবহার করে জামায়াত নিয়ে ধোঁয়া ছড়ানোর এখানেই শেষ নয়। জরিপের একটি অংশে মতামত নেয়া হয়েছে- যুদ্ধাপরাধের বিচারের রায়ের পর জামায়াতে ইসলামীর হরতাল ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে, যার বিপক্ষে ৮৬ শতাংশ এবং পক্ষে ১৩ শতাংশ মানুষ মত দিয়েছেন। এই সমীকরণ হয়তো বোকার মতো আমিও সাত-পাঁচ না বুঝে মেনেই নিতাম, যদি না চতুর ‘প্রথম আলো’ বিএনপি, আওয়ামী লীগ আর জাতীয় পার্টির পাশাপাশি নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ার পরও এবারের জরিপে জামায়াতে-ইসলামীর জনসমর্থন বিচারের বোকামিটুকু না করতো। করেছে, বেশ করেছে, আমি সূত্র পেয়ে গিয়েছি! জরিপের হিসাব অনুসারে, দলীয় সমর্থনের ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী’র সমর্থক যদি মাত্র ২.৯ শতাংশই হয়ে থাকেন, তাহলে জামায়াতের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সমর্থন করেন- এমন মানুষের সংখ্যা কেমন করে ১৩ শতাংশ হয়? জামায়াত সমর্থনকারী ২.৯ শতাংশ বাদে জামায়াতের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সমর্থন করা বাকি ১০.১ শতাংশ মানুষ কারা? তারা কি বিএনপিকে সমর্থন দেয়া সেই ৫০.৩ শতাংশের অংশ? কিন্তু এটা তো বাস্তবে হওয়ার কথা নয়! তাই যদি হবে, তাহলে তো একের পর এক জামায়াত নেতাদের রায় ঘোষণার পর জামায়াতে ইসলামীর হরতাল ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে বিএনপি’র কিছুটা হলেও অংশগ্রহণ দেখা যাওয়ার কথা ছিলো! কিন্তু তা তো মোটেও দেখা যায়নি, বরং ক্ষমতার জোটসঙ্গী হয়েও রায়ের ব্যাপারে নিশ্চুপ থেকে এবং হরতালে কোনো ধরনের সমর্থন ঘোষণা না দিয়ে, জামায়াতে-ইসলামীর সঙ্গে বিএনপি’র দীর্ঘ-প্রেমময় সম্পর্কটি অনেকটা যেন বিচ্ছেদেই রূপ নিয়েছে। হায় রে প্রগতিশীল ‘‌‌‌‌‌‌প্রথম আলো’... জামায়াতের পিঠ-বাঁচাতে আর জামায়াতের কাছে ভালো সাজতে এতটাই বুদ্ধিব্যায়!
সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে নয়, বরং দেশের একজন ক্ষুদ্র নাগরিক এবং বছরের পর বছর ধরে প্রতিদিন নগদ টাকায় দৈনিক ‘প্রথম আলো’ পত্রিকার একজন নিয়মিত ক্রেতা হিসেবে ‘‌‌‌‌‌‌প্রথম আলো’ কর্তৃপক্ষের কাছে আমি জানতে চাই- রাষ্ট্রের বা জনগণের ক্ষতি হয় ‌এমন যে কোনো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান অবলম্বন করা কি প্রতিটি গণমাধ্যমের জন্য আবশ্যক নয়? যদি তাই হবে, তবে জামায়াতে ইসলামীর ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের বিষয়টি জরিপে স্থান দিয়ে এর পক্ষ-বিপক্ষ যাচাইয়ে আপনাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি? যদি আরও বেশি মানুষ কিংবা ধরা যাক বেশিরভাগ মানুষই কোনো বিশেষ কারণে এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পক্ষে মতামত প্রদান করতো, তাহলে কি আপনারা এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে যৌক্তিক ও বৈধ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দিতেন? অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মানুষের মতামত জানার বা নেয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে, জামায়াতে-ইসলামীর ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পক্ষ-বিপক্ষ অনুসন্ধানে উদ্যোগী হয়ে আপনারা কী বোঝাতে চাইলেন? দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার জন্যই কি শুধু এটা করা? নাকি জামায়াতের হরতালে বিএনপি’র সমর্থন-অংশগ্রহণ না থাকায় জামায়াত প্রশ্নে বিএনপিকে খাটো করার এটিও আরেকটি অপকৌশল? অথবা নাকি জামায়াতের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মতো একটা জঘণ্য বিষয়ের পক্ষ-বিপক্ষ নির্ধারণ-চেষ্টার দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে এদেশের জনগণের মধ্যে বেড়ে ওঠা অন্য কোনো বিপরীত চিন্তাধারাকে উপহাস করার উদ্দেশ্যও লুকায়িত আছে এর মধ্যে? মাননীয় ‘প্রথম আলো’, তবে কি শেষ পর্যন্ত আপনারা স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে উপহাসে মেতে উঠলেন? জামায়াতের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পক্ষ-বিপক্ষ অনুসন্ধানের প্রকৃত কারণটির ব্যাখ্যা ‘প্রথম আলো’র কাছ থেকে না পেলে এগুলোই কারণ হিসেবে বুঝে নিতে হবে আমাদের।
পাঠক, এবার বলুন দেখি, যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং জামায়াতে-ইসলামীর রাজনীতি বিষয়ে ‘প্রথম আলো’র সাম্প্রতিক এই জরিপে এই যে এতগুলো বিভ্রান্তিকর তথ্যের কথা এতক্ষণ ধরে জানালাম -এর একটিও কি আদতেই জরিপে উঠে এসেছে? নাকি খুব কৌশলের সাথে উদ্দেশ্যমূলকভাবে উঠিয়ে আনা হয়েছে? রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে-ইসলামীর যেখানে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করারই কোনো বৈধতা নেই, সেখানে দলটির জনসমর্থন যাচাই, দলটিকে নিষিদ্ধ করা নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রশ্নের কৌশলী প্রয়োগে এটিকে নিষিদ্ধের বিপক্ষে একটি বড় সংখ্যা দাঁড় করানো এবং এর মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতকে বিচারের আওতায় আনার গণদাবি থেকে দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার অপচেষ্টা, বিএনপি’র প্রতি সমর্থন এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন করা- একই সঙ্গে এরকম দুটি সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক বিষয়ের পক্ষে দুটো বড় সংখ্যা প্রদর্শনের মাধ্যমে, প্রকৃতপক্ষে এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে বিভ্রান্তিকর চিন্তা ছড়ানো অপপ্রয়াস, জামায়াতের ক্ষুদ্র সমর্থন সত্ত্বেও তাদের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পক্ষে সমর্থকের চেয়ে চার-গুনেরও বেশি মানুষের মতামত প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রকারান্তরে জামায়াতকে ধ্বংসযজ্ঞে ইন্ধন যোগানো –এভাবে একটি মাত্র জরিপ-প্রক্রিয়ার ভেতরে দেশের সবচেয়ে ঘৃণ্য সংগঠন জামায়াতে-ইসলামীকে একইসাথে এতগুলো সুযোগ-সুবিধা পাঁচ বছর ক্ষমতার সঙ্গী বানিয়ে বিএনপিও দিতে পেরেছিলো কিনা সন্দেহ! ‘প্রথম আলো’র মতো জামায়াতের এমন ঘনিষ্ট বন্ধু আর কে আছে? জামায়াত, তোমার কি লাগে আর?
চিন্তা করুন পাঠক- কতটা হাস্যকর হলে এটা সম্ভব যে, জামায়াত আর যুদ্ধাপরাধী নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর খেলায় মত্ত থাকার ফলে চলমান সময়ে জনমনে শঙ্কা ছড়ানো অত্যন্ত জরুরী বেশ অনেকগুলো প্রসঙ্গ জরিপে টানাই হয়নি! এর মধ্যে হেফাজতে ইসলাম, নির্বাচনে ধর্মের অপব্যবহার, মহাজোট সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, ভারতসহ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক –এমন অনেকগুলো বিষয় জরিপে পুরোপুরি অনুপস্থিত! আবার, রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে জনমত যাচাই করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত এই জরিপে, ড. ইউনুস প্রসঙ্গে মানুষের মতামত ঠিকই নেয়া হয়েছে, এবং সেটিও একপাক্ষিক মতামত। জরিপে ড. ইউনুসের বিষয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়ে একটি অনুপাত খুঁজে বের করা হলেও, বিভিন্ন বিষয়ে সার্বিকভাবে কিংবা নির্দিষ্ট কোনো এক বা একাধিক বিষয়ে ড. ইউনুসের ভূমিকা-বক্তব্য-কীর্তি নিয়ে কোনো মত প্রকাশের সুযোগ জরিপে না থাকায়, ড. ইউনুসের ভূমিকা-বক্তব্য-কীর্তি বিষয়ে মানুষের মত বা চিন্তার অনুপাত জানার কোনো সুযোগই নেই। তবে কি ‘ড. ইউনুস সমস্ত ভালো-মন্দের উর্দ্ধে’ ধরে নিয়েই এই জরিপ চালানো হয়েছে?
আসলে সত্যি কথা হলো- ৩০০ আসনে ভিন্ন-ভিন্ন প্রার্থী নির্ভর নির্বাচনী ব্যবস্থায় দুই বা ততোধিক দলের জনপ্রিয়তা এবং ভূমিকা নিয়ে জরিপ করার গুরুত্ব খুব একটা বেশি নয়। নির্বাচন এলে জনগণ দল-বিবেচনায় কতটুকু, আর প্রার্থী-বিবেচনায় কতটুকু সিদ্ধান্ত নেন, তা এই জরিপ করার সময় বিবেচনাই করা হয়নি। বরং জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধ নিয়ে কোনো একটি বিশেষ মহলের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের একটি ধাপ হিসেবে বিবেচনায় নিলে, এই ধাপটি সফল করার প্রাণপন চেষ্টাই শুধু করা হয়েছে।
‘প্রথম আলো’র এরকম ভূমিকায় আমার কিংবা দেশের মানুষের বিন্দুমাত্র বিচলিত বা চিন্তিত হওয়ার কোনই কারণ নেই, কেননা ‘প্রথম আলো’ যে গোষ্ঠী বা মহলের হয়ে এই এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে- তারা ‘প্রথম আলো’কে না পেলে অন্য কাউকে দিয়ে এটা করাতোই, ‘প্রথম আলো’ এক্ষেত্রে একটি ‘মধ্য-স্বত্ত্বভোগী এজেন্সি’ ছাড়া আর তেমন কিছুই নয়, যে এজেন্সিটি এখন ওই গোষ্ঠী বা মহল দ্বারা পরিচালিত।
বরং এর চেয়ে অনেক বড় চিন্তার বিষয় হলো জরিপটি প্রকাশের পরদিন এটিকে নিয়ে ‘প্রথম আলো’য় প্রকাশিত একটি উপ-সম্পাদকীয়, যার লেখক ছিলেন বিশিষ্ট গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক সবার পরম শ্রদ্ধার ব্যাক্তি সৈয়দ আবুল মকসুদ। তাঁর এই উপ-সম্পাদকীয় নিয়ে আমাদের চিন্তিত-বিচলিত হওয়ার কারণ এই যে, ওই জরিপের মাধ্যমে জামায়াতে-ইসলামী এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সম্পূর্ণ বিভ্রান্তি সৃষ্টির যে হীন অপচেষ্টাগুলো করা হয়েছে, সেই সবগুলো অপচেষ্টার বৈধতা নিশ্চিত করার জন্য সৈয়দ আবুল মকসুদের একটি কলামই যে যথেষ্ট, যা সুচতুর-ধুর্ত ‘প্রথম আলো’ খুব ভালোমতো জানে এবং বোঝে। কিন্তু জাতির বিবেকের ভূমিকায় দৃশ্যমান শুভ্র-পোশাকের যে নীতিবাদ-সত্-ত্যাগী-স্পষ্টবাদী প্রিয় মানুষটি –সেই সৈয়দ আবুল মকসুদ কি কিছুই বোঝেন না? আর তাই শেষ পর্যন্ত আমরা আমাদের এই দুর্ভাগা জাতির বিবেক নিয়েই বিচলিত-চিন্তিত-শঙ্কিত হয়ে পড়ি, আমরা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে যাই, আমরা নীরবে চোখের জল মুছতে-মুছতে কোলাহলপূর্ণ শাহবাগ প্রজন্ম চত্তরের এক কোনে একাকীত্বের নিদর্শন হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাংলাদেশের অনেক সন্ধিক্ষণের নিরব-সাক্ষী ওই লম্বা তালগাছটার দিকে তাকিয়ে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি এই বাংলাদেশের এককীত্ব অনুভব করি, বাংলাদেশের জন্য মন খারাপ করি, আর তারপর সেই তালগাছটাকেই জড়িয়ে ধরে বলি, ‘কে বলেছে তুমি একা বাংলাদেশ? এই যে আমরা আছি তো!’
‘প্রথম আলো’, আপানাকে বলছি, শুনতে পাচ্ছেন? কান পেতে মন দিয়ে শুনে নিন... আপনার থাকার কোনই প্রয়োজন নেই, আপনি থাকুন আপনার প্রিয় এজেন্ডা-বন্ধুদেরকে নিয়ে, বাংলাদেশের জন্য আমরা এরকম পিঁপড়া কিংবা মাছি অথবা প্রজাপতির মতো অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাগল প্রেমিক ছিলাম, আছি, থাকবো।

ফেরদৌস আরেফীন,এডিটরিয়ার কোঅর্ডিনেটর, সময় টিভি
arefin78@gmail.com

Friday, October 18, 2013

আমি কেন উপাচার্য হতে পারলাম না! - রাজীব মীর



ঢাকা: শীতের নরম রোদ । বান্দরবানের সবুজ পাহাড়ে লিকলিকে সাপের মত বয়ে চলা পথ। বন্ধুর সে পথে বগা লেকে অভিযাত্রা। সতেরো জনের পারিবারিক ট্যুরে আমিই একমাত্র বহিরাগত সদস্য। চাঁন্দের গাড়ি দু’টি। আমি যে গাড়িতে সেখানে একজনকে একা পিছনের সিটে বসতে হবে,বসলামও। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে গাড়ি স্টার্ট করার আগেই ড্রাইভারের পাশের সিট আমার সাথে শেয়ার করলেন তিনি,পাছে আমি বিপন্ন বোধ করি। ভালো লাগায় চোখে পানি চলে এসেছিলো । কী অদ্ভুত এবং সূক্ষ্ম তাঁর মনোদৃষ্টি। বগা লেকের সে ভ্রমণও ছিল কঠিন এবং দুর্গম। পথ চলতে চলতে পরিবারের মধ্যেও ছোট ছোট বিষয়ে একজন মানুষ কতটা গণতান্ত্রিক হতে পারেন, অবলোকন করে বিস্ময়াভিভূত হয়েছিলাম।পাহাড়ের চূড়া,নদীর তীর,সমুদ্রসৈকত, হাওড়ের নৌকায় তার গোটা পরিবারের সহযাত্রী হয়েছি বহুবার। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড.মো. আনোয়ার হোসেন। বছর কয়েক আগেকার কথা। তার সাথে তখনও আমার পরিচয় হয়নি। অথচ টিভিতে একদিন পুলিশ বেষ্টিত তার কঠিন কষ্টকর মুখাবয়ব দেখে রক্তকণিকাগুলো অস্থির হয়ে উঠেছিলো। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে সেনা সদস্যদের অপ্রীতিকর ঘটনার সময় তিনি ছাত্রদের পক্ষে বলিষ্ঠ অবস্থান নেয়ায় কারা নির্যাতনের শিকার হন। এ অবস্থান নেয়াটা অত্যন্ত দুঃসাহসিক কাজ ছিল নিঃসন্দেহে।

ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতন্ত্রপ্রেমি শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নিজের অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি আমাদের বুকের মাঝেও স্থান করে নিয়েছিলেন। সেই সময়ের অগণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন এবং সে যাত্রায় মূলত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা পুনঃ বেগবান হয়েছিলো। মনে পড়ে, গত বিএনপি শাসনামলে শামসুন্নাহার হলের ভেতর ছাত্রীদের উপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে রাস্তায় বিক্ষোভ প্রকাশকালে পুলিশ তাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছিলো।

এতো সেদিনের কথা। কিন্তু বাংলাদেশের উষালগ্নে মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় বীর সেনানী যার গোটা পরিবার, দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটি যে পরিবারের কাছে ঋণী, স্বাধীনতার সোনালী স্বপন যার হৃদয়ে অঙ্কিত, যার ভ্রাতা বুক উঁচু করে মৃত্যুকে পরাজিত করেছেন।বলেছেন,‘নিঃশঙ্ক চিত্তের চেয়ে বড় কিছু নেই,’।

দেশ নিয়ে লড়বার জন্য যার স্বার্থচিন্তা কাজ করেনি, দেশকে গড়বার জন্য যার লাভালাভের বাসনা জাগেনি– তারই বিরুদ্ধে আজ মহা অভিযোগ, ‘আপনি সরুন’। তার অসততা রয়েছে,পক্ষপাত রয়েছে, তিনি প্রতিশ্রুতি রাখেন না’- যারা এ অভিযোগ এনেছেন পদাধিকার বলে তারা অনেক সম্মানিত, যোগ্য, জ্ঞানী এবং সম-সম্প্রদায়েরই কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

দীর্ঘদিন থেকে তারা তাই এই ব্যক্তির উপাচার্য পদকে বিপদে ফেলতে গোষ্ঠীগত ভাবে আত্ননিয়োগ করেছেন, ঘেরাও,অবস্হান ইত্যাদির মাধ্যমে তাঁর দিনের রুটিন কাজ আর রাতের স্বাভাবিক ঘুম হারাম করে দিয়েছেন। কিন্তু যেখানকার কথা বলছি, সেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এর আগের উপাচার্যকেও একই অবস্হার মধ্যে পড়তে হয়েছিলো এবং সরে যেতে হয়েছিলো। তার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অভিযোগের কমতি ছিলো না। সারা বছর আন্দোলনের জন্য পরিচিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শীর্ষ এ পদ এবং অবস্থানের জন্য লাগসই ভেবে ড.শরীফ এনামুলের স্থলে প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এনে এখানে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো। কিন্তু ড. শরীফ এনামুল কবীরের মত সুর্নিদ্দিষ্ট কোন অভিযোগ ব্যতিরেকে পুনরায় এখানে কিছু শিক্ষক কর্তৃক উপাচার্য খেদাও আন্দোলন শুরু হলো।

অধ্যাপক আনোয়ারের আত্নসম্মানবোধ অত্যন্ত প্রখর, তিনি একদিন হুট করে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে বসলেন। ব্যস,আর যায় কোথা! জাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীরা তাকে দিনরাত আটকে রাখলো, ছাড়বে না। অভূতপূর্ব সে শিক্ষার্থীপ্রিয়তা ও অফিস অবরুদ্ধতা ।

সরকারের বিশেষ অনুরোধে অনেকক্ষণ গোঁ ধরে থাকবার পর অবশেষে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা থেকে সরে আসলেন, স্বচক্ষে দেখেছি।

অল্প কিছুদিন যেতেই আবার গতানুগতিক একই আন্দোলন,সম্মানিত শিক্ষকগণের। কিছু অভিযোগ আছে, তারা দাবি প্রকাশ করলেন। উপাচার্য অস্বীকার করলেন না, দেখবেন বলে কথা দিলেন, কিন্তু তারা সেটি মানতে নারাজ, মাননীয় উপাচার্যকে দেখে নেয়ার হুমকি দিলেন এই বলে যে, ‘উপাচার্য হটো’। উপাচার্যের বিপক্ষে অভিযোগসমূহ সত্য হতেও পারে এটা আমরা খালি চোখে ভাবছিলাম কিন্তু অভিযোগের প্রকৃতির সাথে উপাচার্যের পদত্যাগের অনমনীয় দাবি কেন যেন অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হলো এবং উপাচার্য মহোদয়ের একটা জাতীয় দৈনিকের কলাম তা আরও স্পষ্ট করলো যে ‘ডাল মে কুচ কালা হে!’

ওখানকার শিক্ষকগণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোন শিক্ষককে তাদের মাথার উপর চাইবেন না, এটা তাদের অহংবোধে লাগে যে, হয়তো তারা বাইরে অযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছেন। লাগতে পারে, মেনে নিচ্ছি । কিন্তু সেটা তো অধ্যাপক আনোয়ারের সীমাবদ্ধতা বা দোষ নয়। সরকার তাকে একটি বিশেষ পরিস্থিতির বিষয় বিবেচনা করে সেখানে যেতে অনুরোধ করেছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের ধারাবাহিক ঐতিহ্যগত সংস্কৃতিকে সঙ্গ দেয়ার ক্ষমতাসমপন্ন প্রখর প্রগতিশীল এবং অত্যন্ত যোগ্য একজন সংবেদনশীল শিক্ষককে সেখানে নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো। ওখানকার শিক্ষকগণ অনেকেই উপাচার্য পদলোভী হবেন, এটা স্বাভাবিক। সে যোগ্যতা তাদের কারও কারও নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সৃজনশীলতাও থাকতে হবে তো, সেটা তাদের আন্দোলনে নেই, প্রকাশেও নেই; বড় একঘেয়ে মনে হচ্ছে। বরং উপাচার্য সেক্ষেত্রে অনেক সৃজনশীল, সস্ত্রীক মাদুর পেতে বসে গেছেন পাল্টা আন্দোলনে।

এর আগে তার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের লাগানো পদত্যাগের দাবি সম্বলিত ব্যানার বাতাসে ছিঁড়ে নিচে পড়ার পর তারা স্বামী-স্ত্রী নিজেরাই যথাস্থানে টানিয়ে দিয়েছেন, ভাবা যায়!

চলতি সংবাদ এই যে, উভয়পক্ষ মুখোমুখি বসে আছেন,সমাধান নাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ পড়াশুনা, সেটি এখন বন্ধ। চলছে, শিক্ষকদের আন্দোলন। তারা শুধু পদত্যাগ চান, কোনও ক্লাস কিংবা পরীক্ষা নয়। কিন্তু অবাক বিষয় হলো আন্দোলন বলতে সেখানে যাদেরকে বোঝানো হয়, সেই আনু মুহাম্মদ, মানস চৌধুরী, নাসিম আকতার হোসাইন কেউই এ উপাচার্য বিরোধী আন্দোলনে নেই। তারা এ আন্দোলনকে যৌক্তিক ভাবছেন না ,সম্পৃক্তও হচ্ছেন না !

আমি নিজে অধ্যাপক আনোয়ারের সাথে পরিচিত হই আশৈশব কৌতূহল বশে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যার একবার এক্সটারনাল মেম্বার হিসেবে গেলেন। প্রাণ রসায়নের সেই সময়ের চেয়ারপার্সন জনাব মু. গোলাম কবীর আমাকে এ দুর্লভ ব্যক্তির সাথে পরিচয়ের সুযোগ করে দেন । বিজ্ঞানের শিক্ষক হলেও আমার দু’একটি কবিতা তার মনে ধরে এবং ক্রমে আমি তার পরিবারের আপনজন হয়ে উঠি। ভরা পূর্ণিমায় আমার ডাক পড়ে,একসাথে পূর্ণিমা দেখি,গান গাই,গান শুনি।

বিশেষ কোন ভালো লাগার দিনে বাঁশিওয়ালা আসে, বাঁশি বাজে। গোটা পরিবার একসাথে উপভোগ করে। তাদের পারিবারিক বন্ধন তো অন্য রকম। ভাইবোনদের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক ঈর্ষণীয় রকমের ভালো। স্বামী-স্ত্রী দু’জনই তারা ভীষণ রোমান্টিক, অকল্পনীয়। বিজ্ঞানের কঠিন বিষয়ে যার অগাধ দখল, তার মুখে কবিতা,গান, চিত্রকলার দারুণ সব অভিব্যক্তি। সুন্দর বাচনভঙ্গি, স্পষ্ট উচ্চারণ আর তার দৃঢ় বাক্যপ্রয়োগ শুনে মন্ত্রমোহিত হতে হয়। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চে তার ভাষণ ছিলো অতুলনীয়, অত্যন্ত উদ্দীপক। সাদাসিধে জীবনে অভ্যস্ত সরল হাসিখুশি এ প্রাণবান মানুষ আজ সম্মানাক্রান্ত। একা লড়ছেন। বাংলার বীর কর্ণেল তাহেরকে যখন ফাঁসির দড়িতে ঝুলানো হয়, তখনও তিনি জেলের ভিতর একা দাঁড়িয়েছিলেন। আজও।

কিন্তু স্বাধীন দেশে এটা তো হওয়ার কথা নয়। শরীফ এনামূল কবীর, আনোয়ার…এর পরে কে? যারা আন্দোলন করছেন, তারা কি ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শী শিক্ষককে উপাচার্য হিসেবে চাচ্ছেন? যদি না চান তবে তাদের আন্দোলন কি দল নিরপেক্ষ উপাচার্য চেয়ে? তাদের দাবির সারাৎসার কিন্তু অস্পষ্ট। ইতিহাস তো বলে বাংলাদেশের সব সঙ্কটে অধ্যাপক আনোয়ার মিছিলের সর্বাগ্রে ছিলেন,কখনও পিছপা হননি। দেশের জন্য পারিবারিক আত্মত্যাগের দৃষ্টান্তেই বা তার মত আর কয়জনের আছে? উপাচার্য ভুল করতে পারেন না,করেননি বা করছেন না,এটা বলছি না। বলছি ত্যাগের ইতিহাস তো তার রক্তে, সেখানে যদি ছোট কোন ভুল থেকেও থাকে, প্রতিবাদ হবে না কেন ,অবশ্যই হবে। কিন্তু তাই বলে একবারে সরে যেতে হবে, এ দাবি খুব একটা জনগ্রহণযোগ্য হচ্ছে কি? কে আসবেন ওনার জায়গায়! ইতিহাসের আত্মত্যাগীকেই মেনে নিচ্ছেন না! কাকে মানবেন, কার আত্মত্যাগ তার সাথে তুলনীয়? যদি যোগ্যতার কথা আসে, অধ্যাপক আনোয়ারের সমান যোগ্য হয়তো কেউ থাকতে পারেন,আত্মত্যাগী কয়জন আছেন? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত উপাচার্যের বন্ধ্যাত্বের সংস্কৃতির অবসানও তো তারই অবদান! তিনিই তো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সময়ের প্রথম নির্বাচিত উপাচার্য। আমরা কি সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিনের মত কাউকে চাচ্ছি, যিনি দেশ তো দূরের কথা, নিজের সমর্থিত দলের জন্যও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন? নাকি এটা নিখাদ মন খারাপের আন্দোলন,আমি কেন উপাচার্য হতে পারলাম না! উপাচার্য হিসেবে উনি থাকবেন অথবা থাকতে পারবেন কি না জানি না, কিন্তু পদত্যাগের দাবির বিরুদ্ধে ওনার অবিচল অবস্থান তার দীর্ঘ সংগ্রামী সত্যের কথাই শুধু জানান দেয়। পালিয়ে আসা কোন বিপ্লবীর কাজ হতে পারে না, উনি এটা করবেনও না- আমি নিশ্চিত। উপাচার্য পদ ছেড়ে দিলেই উনি সম্মানিত আর ধরে রাখলে এটা উনাকে ছোট করবে, উচ্চতার পরিধি এভাবে অনুধাবনযোগ্য নয়।

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের দেশ,বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধার দেশ। অতএব, মুক্তিযোদ্ধা ড. আনোয়ার হোসেন আপনাকে বলছি, লড়াই করা আপনার ঐতিহাসিক দায়িত্ব, স্যার! দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল সচেতন শিক্ষার্থী ও অগণিত মানুষের জন্য অতীতের মত এখনও সত্যের হাল ধরে রাখুন, ছাড়বেন না! প্লিজ।
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

Sunday, October 13, 2013

ষড়যন্ত্রের রাজনীতির থলের বেড়ালটি বেরিয়ে আসছে - আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী



প্রবীণ এক বাম নেতার এই সাক্ষাতকারটি প্রথমে আমার চোখে পড়েনি। কোন প্রতিষ্ঠিত জাতীয় দৈনিকে সাক্ষাতকারটি বেরোয়নি। একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকে বেরিয়েছে, যেটি সচরাচর আমার চোখে পড়ে না। বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে শুনে সাক্ষাতকারটি পড়লাম। দৈনিকটির ৫ অক্টোবরের সংখ্যায় তা বেরিয়েছে। ছোট সাক্ষাতকার। তবু আমার জন্য খুবই আগ্রহোদ্দীপক। কারণ, তিনি আমার কলেজ জীবনের খুবই প্রিয় শিক্ষক। পরবর্তীকালে তিনি হন দেশের এক সময়ের বৃহত্তম বাম গণতান্ত্রিক সংগঠন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। এখন বিরানব্বই বছর বয়স। তাঁকে এখন বলা চলে আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির পিতামহ। তাঁকে আমি খুবই শ্রদ্ধা করি।
ন্যাপের সেই সুদিন এখন আর নেই। অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ এখনও দলের সভাপতি আছেন বটে, বয়সাধিক্যে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তবু এই বয়সেও তিনি তাঁর চিন্তা-চেতনা ও পরামর্শ দ্বারা দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করছেন। তাঁর কথা কেউ শুনছে কী শুনছে না, তার পরোয়া করছেন না। তিনি এখনও আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি বাতিঘর। ৫ অক্টোবর ঢাকার বহুল প্রচারিত দৈনিকটিতে আলাপচারিতা বিভাগে প্রকাশিত তাঁর দেয়া সাক্ষাতকারটিতেও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা সম্পর্কে তাঁর প্রকৃত সচেতনতার পরিচয় পাওয়া যায়। এ জন্যই সাক্ষাতকারটি আমি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে পড়েছি।
এই সাক্ষাতকারটি পড়তে গিয়ে আমি এমন একটি তথ্যের মুখোমুখি হয়েছি, যা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের মতো নব্বই-উর্ধ প্রবীণ রাজনৈতিক নেতার মুখ থেকে বের না হলে আমার পক্ষেও বিশ্বাস করা সহজ হতো না। এ কথা অস্বীকার করব না, আমি ড. কামাল হোসেন ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কঠোর সমালোচক। বিশেষ করে ড. কামাল হোসেনের। কারণ, তিনি এক সময় বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুই তাঁকে হাত ধরে টেনে এনে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেন। পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে তিনি বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার রাজনীতির অবশ্যই সমালোচনা, এমনকি বিরোধিতাও করতে পারেন। কিন্তু হাসিনার প্রতি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিদ্বেষে অন্ধ হয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শবিরোধী চক্রান্তের শিবিরে গিয়ে সরাসরি যোগ দিতে পারেন, এটা আমার কাছেও ছিল অকল্পনীয়।
ঢাকার দৈনিকটির ৫ অক্টোবরের সংখ্যায় প্রকাশিত ‘আলাপচারিতায়’ দেশের বয়োবৃদ্ধ প্রবীণতম নেতা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেছেন, ‘আমি যে রাজনীতি করি, তা ষড়যন্ত্রের রাজনীতি নয়। এটি সরল রাজনীতি। আমি ষড়যন্ত্রের মধ্যে নেই। ড. কামাল হোসেন এসেছিলেন আমার কাছে জাতীয় সরকারের রূপরেখা নিয়ে। আমার কাছে দোয়া চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি ষড়যন্ত্রের রাজনীতির মধ্যে নেই। আমি রাজি হইনি। আমার রাজনীতির অর্থ হচ্ছে সত্য কথা বলা, সড়ক দিয়ে হাঁটা এবং ডাল দিয়ে খাবার খাওয়া। ড. কামাল হোসেন ও নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের প্রধান হিসেবে কাজ করতে ইচ্ছুক। সে কারণে তাঁরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করছেন।’
অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের ‘আলাপচারিতায়’ এই বক্তব্যটি দেশের অনেক মানুষের কাছে ড. কামাল ও ড. ইউনূস জুটির বর্তমান কার্যকলাপ ও আচার-আচরণের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে দেবে। আমি নিজেও দীর্ঘদিন যাবত এই জুটির কার্যকলাপ ও বক্তৃতা-বিবৃতির সমালোচনা করলেও সবসময় ভেবেছি, এরা শেখ হাসিনার প্রতি প্রচ- বিরাগবশত দেশের গণতান্ত্রিক শিবিরের যে ক্ষতি করছেন, তা হয়ত নিজেরাও উপলব্ধি করছেন না। কিন্তু তাঁরা যে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থের কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত গোঁ চরিতার্থ করার জন্য সরাসরি ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে যোগ দিতে এবং এতটা নিচে নেমে যেতে পারেন, তা কল্পনাও করিনি। আওয়ামী লীগ রাজনীতির একটা বড় দুর্ভাগ্য, এই রাজনীতিতে এক মোশতাকের তিরোভাব না ঘটতেই আরেক মোশতাকের আবির্ভাব হয়।
একটি তথাকথিত ‘জাতীয় সরকারের রূপরেখা’ পকেটে নিয়ে ড. কামাল হোসেন দেশে যা করে বেড়াচ্ছেন, তা যে ‘ষড়যন্ত্রের রাজনীতি’ এটা বুঝতে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের মতো রাজনীতির বটবৃক্ষের কিছুমাত্র অসুবিধা হয়নি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ড. কামাল হোসেনকে বলে দিয়েছেন, ‘আমি ষড়যন্ত্রের মধ্যে নেই’ এবং তাদের ষড়যন্ত্রে দোয়া (সমর্থন) দিতেও রাজি নন। শুধু অধ্যাপক মোজাফ্ফর নন, ড. কামাল হোসেন নাকি তাঁর জাতীয় সরকারের রূপরেখা (যে সরকারে তিনি কিংবা ড. ইউনূস প্রধান হবেন) নিয়ে দেশের আরও কয়েকটি ডান এবং বাম গণতান্ত্রিক দলের নেতার দরজায় গিয়ে দোয়া লাভের জন্য ধর্ণা দিয়েছিলেন। তাঁরা সকলেই একবাক্যে না বলে দিয়েছেন।
শেষপর্যন্ত তিনি সম্ভবতঃ তাঁরই মতো জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত কয়েকজন নেতাকে তাঁর বিতর্কিত রাজনীতিতে সঙ্গী করতে পেরেছেন। এরা হলেন ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কাদের সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না প্রমুখ। এদের অধিকাংশই সচরাচর নির্বাচনে জেতেন না। কারও কারও জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। ড. কামাল হোসেনকে বঙ্গবন্ধু একবার বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদে জিতিয়ে এনেছিলেন। তারপর আর কোনও নির্বাচনে জেতেননি। শেখ হাসিনা তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে দাঁড় করিয়েছিলেন। সেখানেও বিএনপির বিচারপতি সাত্তারের কাছে হেরেছেন। গত নির্বাচনে তাঁর গণফোরামের প্রার্থীদের কারও জামানত রক্ষা পায়নি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের রেকর্ড তো অনুরূপ উজ্জ্বল। তেজারতিতে তিনি দক্ষ। তবুও রাজনীতিতে ঢোকার খুব শখ। কিন্তু রাজনৈতিক মূলধন কিছুই নেই। ছাত্রজীবন থেকে বাংলাদেশের কোনও রাজনৈতিক আন্দোলনের ত্রিসীমানায় তিনি ছিলেন না। গরিবের নামে ব্যবসা করে নিজে বিরাট ধনী হয়েছেন। গরিবের বাড়িতে ভুলেও যান না। তাঁর জেট সেট লাইফ। রাজারাজরাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ান। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের তিনি বিশ্বস্ত অনুচর।
ফলে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের প্রভুরা তাঁকে খুশি হয়ে অর্ধেক নোবেল পুরস্কার দিয়েছে এবং এখনও বড় বড় পুরস্কার দিচ্ছে। অর্ধেক নোবেলজয়ী হওয়ার পর আনন্দের এভারেস্ট চূড়ায় উঠে ওই নোবেল পুরস্কারকে মূলধন করে তিনি নূতন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দেন। এই দল গঠনের এক মাসের মধ্যে তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর দল শেষপর্যন্ত ‘কাকতাড়ুয়ার দল’ হয়ে দাঁড়াবে। তিনি রাজনীতি করার আগেই জনগণ কর্র্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে রাজনীতি ছাড়েন।
রাজনীতির সদর দরজা দিয়ে যাঁরা ক্ষমতায় যেতে পারেন না, তাঁরা পেছনের দরজা দিয়ে সেই ক্ষমতায় যেতে চাইবেন, তা আর এমন কী বিস্ময়ের ব্যাপার। তবে কামাল হোসেনদের ক্ষেত্রে বিস্ময়ের কথা এই যে, তাঁরা গণতন্ত্র, সুশাসন, স্বচ্ছ রাজনীতি এ সবের কথা বড় বেশি বলেন। গণতন্ত্র, সুশাসন ও স্বচ্ছ রাজনীতির পথ তো হচ্ছে জনগণের কাছে যাওয়া, স্বচ্ছ, বাস্তব ও সুস্থ কর্মসূচীর মাধ্যমে তাদের কাছে ক্ষমতায় যাওয়ার ম্যান্ডেট চাওয়া। সে জন্যে নির্বাচনে যাওয়া।
ড. কামাল হোসেনরা গণতন্ত্রের এই সদর দরজা দিয়ে না হেঁটে কেন পেছনের দরজা খুঁজছেন এবং তথাকথিত জাতীয় সরকারের একটি রূপরেখা (যেটি আসলে ষড়যন্ত্রের নীলনক্সা) পকেটে নিয়ে একশ্রেণীর প্রবীণ-নবীন রাজনীতিক নেতার বাড়িতে ধর্ণা দিয়ে তাদের দোয়া চেয়ে বেড়াচ্ছেন? জনগণ কর্তৃক বার বার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরই জাতীয় সরকার নামক একটি অনির্বাচিত সরকার গঠন দ্বারা পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার ভূতটি ড. কামাল হোসেনদের মাথায় চেপেছে।
মজার ব্যাপার এই যে, মাত্র গত ২৩ সেপ্টেম্বর (সোমবার) বরিশালে এক জনসভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘...এবার দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করে ছাড়ব।’ এটা খুবই ভাল কথা। দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করে যদি কামাল হোসেন সাহেবরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করতে পারেন, তাহলে তো বলব, তাঁরা গণতন্ত্রের পথেই হাঁটছেন। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও জাতীয় সরকার তো এক কথা নয়।
ড. কামাল হোসেনরা কোনটি চান? যদি সত্যিই তাঁরা বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সমর্থন করেন, তাহলে এই দাবি আদায়ের জন্য বিএনপি চলতি মাসেই যে আন্দোলন শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে, সে আন্দোলনে যোগ দিন। তা না করে পর্দার আড়ালে আবার জাতীয় সরকারের খেলা খেলছেন কেন? জনগণের কাছে না গিয়ে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের মতো প্রবীণ নেতাদের দরজায় গিয়ে গোপন ধর্ণা দিচ্ছেন কেন? আবার জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করে নিজে কিংবা ড. ইউনূসের সেই অনির্বাচিত জাতীয় সরকারের প্রধান হওয়ার আগাম ইচ্ছা ব্যক্ত করছেন কেন?
ড. কামাল হোসেন ও ড. ইউনূসের জুটির নেতৃত্বে চালিত তথাকথিত সুশীল সমাজের মনস্তত্ত্বটা বুঝতে কারোই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। জনগণের আস্থা তাদের ওপর নেই, জনগণ কখনই তাদের ভোট দেবে না এবং নির্বাচন এলে যত খারাপ বা মন্দ হোক আওয়ামী লীগ বা বিএনপিকেই তারা ভোট দেবে। দেশের মানুষ এই দল দুটিকে বোঝে। এই দুই দলের নেতারা যত অপরিশীলিত ভাষায় বক্তৃতা দেন, তার অর্থ তারা বোঝে। আর ড. কামাল হোসেন বা ড. ইউনূস সাহেবরা গণতন্ত্রের অভিধান থেকে যে সব ভাল ভাল কথা বেছে নিয়ে জনগণের নাগালের বাইরের এভারেস্ট চূড়া থেকে কথা বলেন, তার অর্থ তারা বোঝে না। সে সব কথায় আস্থা স্থাপনও করে না।
অনির্বাচিত জাতীয় সরকার গঠন ড. কামাল হোসেনের বহুদিনের একটি পেট থিয়োরি। বার বার নির্বাচনে দাঁড়িয়ে হেরে গিয়ে এবং জনগণকর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে প্রবল রাজনৈতিক হতাশা থেকে সম্ভবতঃ তাঁর মনে এই থিয়োরিটির জন্ম। বহুকাল আগে তিনি তাঁর ‘সুশীল সমাজ’ দ্বারা এই থিয়োরিটি একবার জনসমক্ষে এনেছিলেন। দেশের মানুষ এই গণঅধিকার বর্জিত সরকারের থিয়োরি গ্রহণ করেনি। তখন এক বাম রাজনীতিক প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, ‘গু মড়াবৎহসবহঃ, মড়ড়ফ ড়ৎ নধফ, রং নবঃঃবৎ ঃযধহ ঁহবষবপঃবফ মড়ড়ফ মড়াবৎহসবহঃ’ (আমার সরকার, ভালোমন্দ যা-ই হোক, অনির্বাচিত ভালো সরকারের চাইতে ভালো)।
নিজের পছন্দের, নিজের ভোটাধিকার দ্বারা গঠিত সরকার মন্দ হলেও জনগণ সেই সরকারই চায়। অন্যের পছন্দের এবং অন্যদের ইচ্ছায় গঠিত সরকার ভালো হলেও জনগণ তা পছন্দ করে না। এটা গণতন্ত্রের ইতিহাসের আদি সত্য।
ড. কামাল হোসেনদের অনেক বিদ্যাবুদ্ধি। কিন্তু এই সত্যটা তাঁরা বোঝেন না। আর বোঝেন না বলে জনগণের কাছে পৌঁছতেও পারেন না। এদিকে, ক্ষমতায় যাওয়ার অদম্য লিপ্সা তাদের তাড়িত করে বেড়ায়। তখন ক্ষমতার লোভে বিদেশী সাহায্য ও সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে গিয়ে তাঁরা দেশ এবং গণতন্ত্রের সমূহ সর্বনাশ করেন। আমার আশঙ্কা, ড. কামাল হোসেনদের বর্তমান ষড়যন্ত্রের রাজনীতি দেশের জন্য এক অকল্যাণকর পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে।
ঢাকার বহুল প্রচারিত দৈনিকটিতে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের আলাপচারিতার বক্তব্য পাঠের আগেই আমার এক লেখায় ড. কামাল হোসেন ও ড. ইউনূসের বর্তমান কার্যকলাপ সম্পর্কে আমার সন্দেহের কথা প্রকাশ করেছিলাম। লিখেছিলাম, বাংলাদেশে কারজাই অথবা জারদারি মার্কা একটি সরকার অনির্বাচিত জাতীয় সরকার হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার জন্য যে তৎপরতা চলছে, সেটি সফল করার লক্ষ্যে এই সুশীল চক্রের এক নেতা ইউরোপ-আমেরিকার রাষ্ট্র নেতাদের দরবারে তাদের সাহায্য ও সমর্থনের আশায় ধর্ণা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। অন্যদিকে, অন্য নেতা দেশের ভেতরে সেই জাতীয় সরকারের নীলনক্সায় রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বাইরে তাঁরা দেখাচ্ছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ে সমর্থন দানের জন্যই দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা করছেন।
এরা হয়ত ভাবতে পারেননি, দেশের বাম রাজনীতির এক বটবৃক্ষ নেতা এমন সোজা সরল ভাষায় তাদের গোপন তৎপরতার কথা ফাঁস করে দেবেন এবং তাকে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি আখ্যা দেবেন। ড. কামাল হোসেন জানেন কিনা জানি না, তিনি রাজনীতির রেসের মাঠে পরাজিত ও প্রত্যাখ্যাত ঘোড়ায় পরিণত হয়েছেন। বিদেশীরা তাঁকে নিয়ে খেলতে পারে, কিন্তু ক্ষমতায় বসাবে না। তিনি এখন তাদের বাতিল ও ব্যর্থ নেতাদের তালিকায় আছেন। তিনি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী থেকে কাদের সিদ্দিকী পর্যন্ত যাদের সঙ্গে জুটিয়েছেন তাঁরাও এই তালিকাভুক্ত নেতা। এই দলে নতুন মুখ ড. ইউনূসের। কিন্তু মাটিতে তাঁর পা নেই। তিনি শাখামৃগের মতন। শাখামৃগের ওপর কেউ নির্ভর করে না। তাকে কলা দেখিয়ে ব্যবহার করে মাত্র।

লন্ডন, ৮ অক্টোবর, মঙ্গলবার, ২০১৩

Monday, October 7, 2013

হেফাজতি জঙ্গী সংগঠক মুফতি ইজাহারের গ্রেনেড :টার্গেট প্রধানমন্ত্রী? -সুমি খান


১২ অক্টোবর চট্টগ্রাম সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২১ আগষ্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনা সহ ৪৮ বার তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে এ দেশে। এর পর ও প্রশাসনের জঙ্গী প্রীতি দেখে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না।
চট্টগ্রামের লালখানবাজারে হেফাজতের নায়েবে আমির,জমিয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল এবং নেজামে ইসলামী পার্টির সভাপতি মুফতি ইজাহারের জমিয়াতুল উলুম আল মাদ্রাসায় সোমবার সকাল পৌনে ১১টার দিকে বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত একজন রাতে মারা গেছে। একজনের হাতের পাঁচটি আঙ্গুল উড়ে গেছে। মাদ্রাসার ওই কক্ষটি থেকে তিনটি তাজা গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়েছে।
রাতে তাকে তার পুত্র হারুণ ইজাহার সহ পালাতে সহায়তা করার পর থানায় মামলা করা হলো, তল্লাশী করা হলো তার কক্ষ। ১১ বোতল এসিড সহ বেশকিছু বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর পর ও মুফতি ইজাহার ও তার ছেলে বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে ‘আইপিএস’ ‘ ইউপিএস’ বিস্ফোরণ সহ নানান গল্প ফেঁদে বসলেন! পুলিশ ও নীরবে মেনে নিলেন সব! এমন অথর্ব পুলিশ কর্তাদের পুষছে কেন প্রশাসন- সেটা একটা প্রশ্ন বটে। প্রশ্ন উঠে চট্টগ্রামের পুলিশ প্রশাসন কি জঙ্গী ইজাহারের কেনা ? এতোবড়ো গ্রেনেড বিষ্ফোরণের ঘটনার পর কেন তাকে সারাদিন আগলে আগলে রাখা হলো?
জঙ্গীবাদী হেফাজত নেতা মুফতি ইজাহার ‘তালেবান আফগানিস্তানের জান্নাত দেখে এলাম’শীর্ষক প্রবন্ধে ১৯৯৮ সালের অক্টোবর-নবেম্বর সংখ্যা ‘মাসিক দাওয়াত’ নামের ইসলামী পত্রিকায় নিজেই এক সময় আফগানিস্তানে তালেবানদের সঙ্গে কাজ করার কথা লিখেছিলেন । নিজেই গর্বের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন আফগানিস্তান সফর ও মোল্লা ওমরের সঙ্গে যোগাযোগের বিস্তারিত গল্প। র্যা ব সদর দপ্তরে ইজাহার কে আটক করে আনার পর জঙ্গী তৎপরতায় নেতৃত্বের স্বীকারোক্তি দিয়েছেন ইজাহার। তবু কোথায় প্রশাসনের অসহায়ত্ব? কার কাছে?
জঙ্গী তৎপরতার অভিযোগে কয়েকবার গ্রেফতার হয়েছেন মুফতি ইজাহার। রাউজানের একটি গোপন আস্তানায় জঙ্গী প্রশিক্ষণের অভিযোগে ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে তাকে সর্বশেষ গ্রেফতার করে টিএফআই সেলে জিজ্ঞাসাবাদ করে র্যা ব। র্যাসবের তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় চট্টগ্রামের রাউজান থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইন মামলায় মুফতি ইজাহারসহ হুজির আট প্রশিক্ষকের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশীট দেয়া হয়। আদালতে মামলার নথিতে তদন্ত কর্মকর্তা তখন উল্লেখ করেছিলেন, দেশে নাশকতামূলক কর্মকা- চালাতে হুজির প্রশিক্ষকের সহযোগিতা ও মদদ দিয়ে নগরীর লালখানবাজার আল জামেয়াতুল ইসলামিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল এবং নেজামে ইসলামী পার্টির সভাপতি মুফতি ইজহার রাউজানে দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিচালনা করছে। হুজির সদস্যদের এ ক্যাম্পে রাতের আঁধারে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ২০১০ সালের ১৩ ডিসেম্বর রাউজান গোদারপাড় পাহাড়ী এলাকা থেকে হুজির পাঁচ প্রশিক্ষককে গ্রেফতার করা হলে পরদিন সংবাদ সম্মেলন করে তাদের নির্দোষ দাবি করে মুক্তির দাবি জানান মুফতি ইজাহার। ওই দিনই লালখানবাজার মাদ্রাসা থেকে মুফতি ইজাহারকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে ঢাকায় র্যা বের ইন্টারোগেশন সেলে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আফগানিস্তানে তৎকালীন শাসক মোল্লা ওমরসহ তালেবানি নেতা ও ২১ আগষ্টের গ্রেনেড হামলার মুল আসামী মুফতি হান্নানের সঙ্গে তার যোগাযোগ থাকার কথা স্বীকার করেন। আফগানিস্তানে মোল্লা ওমরের সঙ্গে তার সাক্ষাত হওয়ার কথা জানান জিজ্ঞাসাবাদে। ঘটনাস্থলে তখন মুফতি ইজাহারসহ গ্রেফতার হওয়া হুজির প্রশিক্ষকরা বিস্ফোরক তৈরি ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কিছু প্রশিক্ষকের মাধ্যমে নিষিদ্ধ হুজির সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর প্রমাণও মেলে। এসবের ধারাবাহিকতায় সোমবারের বিষ্ফোরণের ঘটনা প্রমাণ করে আত্মঘাতী জঙ্গী সদস্যদের প্রশিক্ষিত করা হচ্ছিল বোমা তৈরির মাধ্যমে। এছাড়া মুফতি ইজহারের আরেক ছেলে মুসা বিন ইজহারও জঙ্গী সম্পৃক্ততার অভিযোগে আটক হয়েছিলেন।
এসব নিয়ে ১৯৯৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেছি, অনেক লেখা লিখি করেছি। বারবার প্রশাসন তাকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে – কিন্তু কেন? কার বা কিসের প্রভাবে? সারা জাতিকে এদের জঙ্গীবাদ আর বোমাবাজের হুমকির মুখে ঠেলে বিপন্ন করবেন ই যদি, পুলিশ প্রশাসনের কি দরকার? সোমবারের এই ভয়ংকর ঘটনার পর ও বালিতে মুখ গুঁজে আছে প্রশাসন । এর ভয়াবহ পরিণতি ঠেকাতে পারবেন তো তারা?

চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী তার জনসভায় অনেক বার বলেছেন, লালখানবাজারে উগ্রবাদী এ নেতার মাদ্রাসায় জঙ্গী প্রশিক্ষণ হয়। যেখান থেকে ২০ হাজার লোক আফগানিস্তান যুদ্ধে গেছে। ফিরে আসে ১০ হাজার। ইসলামী দলগুলোর পক্ষ থেকে ও তথ্য প্রমাণ নিয়ে একই অভিযোগ বহুবার তোলা হয়েছে। দু’একবার আটক হওয়া ছাড়া অপরাধের শাস্তির কোন উদাহরণ দেখেনি সাধারণ মানুষ।
কেবল আলোচনা নয় এবার পুরোপুরি ফেঁসে গেছেন উগ্রবাদী নেতা ও তার বিতর্কিত সেই মাদ্রাসা। যেখানে বিস্ফোরণে পাঁচ ছাত্রের গুরুতর আহত , পরবর্তীতে একজনের মৃত্যু ও গ্রেনেড উদ্ধারের ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। জেগে জেগে যেন ঘুমের ভান করছেন পুলিশ প্রশাসন।
অবিলম্বে ইজাহারসহ জঙ্গী নেতাদের আটক করে হেফাজতীদের মাদ্রাসায় অভিযান শুরুর দাবি তুলেছে ইসলামী দল ও সংগঠনগুলো। বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও বিস্ফোরক দলের তদন্তে বেরিয়ে পড়েছে আলামত। বিস্ফোরক দ্রব্যের কারণেই ওই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। আগামী ১২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামে সফর করবেন। এর আগে মাদ্রাসায় এ ধরনের বিস্ফোরক পাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করেছে জঙ্গীরা তাদের হত্যাযজ্ঞ সফলে তৎপর।মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে বিস্ফোরণস্থল পরীক্ষা করে পুলিশ জানিয়েছে, সেখানে বিস্ফোরকের ‘বড় ধরনের মজুদ’ ছিল। চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছেন, বিস্ফোরণ ঘটার পর দমকল বাহিনী আগুন নিভিয়েছে। ছাইয়ের নিচে বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরক পাওয়া গেছে। তিনি নিশ্চিত হয়ে বললেন সেখানে বিস্ফোরক দ্রব্যের বড় ধরনের মজুদ ছিল। হাতে তৈরি শক্তিশালী কিছু গ্রেনেড আছে, যা বেশ বিপজ্জনক স্বীকার করে তিনি সাংবাদিক দের চাপ এড়াতে বললেন, “সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে”।


মুফতি ইজহার ও তার দুই ছেলের বিরুদ্ধে জঙ্গী কর্মকান্ডের অভিযোগ সবার জানা। তবু ১২ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার বিকালে চট্টগ্রামের হেফাজতি ইসলাম নিয়ন্ত্রিত মাদ্রাসা সফরকরেন অস্ট্রেলিয়া দূতাবাসের ডেপুটি হাইকমিশনার টিম বলটনিকফ। ২০০৯ সালে মার্কিন দুতাবাসে হামলা করার প্রস্তুতিকালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আটককরেছিলেন ইজাহার। তবু বিদেশী দূতাবাসের প্রতিনিধি রা বিভিন্ন সময়ে সফর করেছে এই মাদ্রাসা।নেজামে ইসলামী পার্টির এই দুই সংগঠক ১৮ দলেরও নেতা। এ কারণেই হয়তো তাদের তোয়াজ করে চলে সবাই। যে কারণে দিনে দিনে এদের অপতৎপরতা বেড়েই চলেছে, যা আমাদের দেশের জন্যেই শুধু নয়, দক্ষিণ এশিয়া সহ সারা বিশ্বের জন্যেই উদ্বেগজনক।
হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা জঙ্গীবাদের দায়ে অভিযুক্ত মুফতি ইজহারের মাধ্যমে সম্প্রতি নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন হরকত-উল-জিহাদের মাঠে নামার খবর প্রকাশ হয়। ইজাহারের মাধ্যমে হেফাজতকে শক্তিশালী করার বিষয় নিয়ে হরকত-উল-জিহাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু নেতার বৈঠক হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। শীঘ্রই ওলামা সম্মেলনের নামে হেফাজতকে সক্রিয় করার কৌশল নিয়েছে জামায়াত। আহমদ শফী আমির থাকলেও হেফাজতকে নেতৃত্ব দেয়ার কাছে মূল দায়িত্ব পালন করছেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম। উদ্দেশ্য যে কোন ভাবে মহাজোট শাসন কালের পরিসমাপ্তি ঘটানো। সেটা যদি সম্ভব হয় বঙ্গবন্ধুর মতো তার কন্যা প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা কে হত্যার মধ্যে দিয়ে –তাহলে তো কেল্লাফতে!! যুদ্ধাপরাধের দায়ে কারাবন্দী দের পরিবার থেকে বড়ো অংকের টাকা ও তিনি নিয়েছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক সাইট ফেসবুক এবং ওয়েব সাইটে ছবি এবং তথ্য প্রচার হয়েছে।
হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমীর মুফতি ইজহারুল ইসলামের লালখান বাজার মাদ্রাসায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে আহত হাবিব (২৫) নামে এক ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার গভীর রাত দুইটার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এদিকে একই বিস্ফোরণে আহত নূরুন্নবী নামে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের এক ছাত্রের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বিস্ফোরণের পর আহত হাবীব হালিশহর জেনারেল হাসপাতাল নামে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে গোপনে চিকিৎসা নেওয়ার সময় সোমবার দুপুরে পুলিশের হাতে আটক হয়। আর নূরুন্নবীও চিকিৎসাধীন অবস্থায় আটক হয়।
ঘটনার পর পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার বোমা বিস্ফোরক দল ঘটনাস্থলে যায়। সেখান থেকে প্রথমে সীসাযুক্ত মার্বেল ও কাচের টুকরা উদ্ধার করা হয়। কিন্তু পুলিশ সীসাযুক্ত মার্বেল পাবার পরও সেখানে বিস্ফোরকের আলামত উদ্ধারের বিষয়টি চেপে যাবার চেষ্টা করেন। পুলিশ মাদ্রাসায় গেলেও মুফতি ইজহারুল ইসলাম মূল ফটকের সঙ্গে লাগানো বৈঠকখানায় বসে দীর্ঘক্ষণ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এসময় মুফতি ইজহার দাবি করেন, ল্যাপটপের চার্জার বিস্ফোরণে এ ঘটনা ঘটেছে। তিনি কোন ধরনের বোমা বানানোর কথা অস্বীকার করেন। সন্ধ্যা ৬টার দিকে মুফতি ইজহারুল ইসলামকে তার বৈঠকখানায় নামাজ পড়তে দেখা গেছে। এসময়ও তার বৈঠকখানার সামনে পুলিশের কোন নজরদারি দেখা যায়নি।ঘটনাস্থলে অবস্থান করে দেখা গেছে, পুলিশ অভিযান চালানোর জন্য ফোর্স জড়ো করতেই প্রায় আধঘণ্টা সময় পার হয়ে যায়। এর মাঝে নির্বিঘ্নে আত্মগোপনে চলে যান মুফতি ইজহার। এর আগে দুপুরেই মাদ্রাসা ছেড়ে পালিয়ে যান হারুন ইজহার।

সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে প্রায় ১০ প্লাটুন পুলিশ পুরো মাদ্রাসা ঘিরে অভিযান শুরু করে। প্রথমেই মাদ্রাসার শ্রেণীকক্ষে অভিযান শুরু করলেও বৈঠকখানার যেখানে দীর্ঘক্ষণ মুফতি ইজহারুল ইসলাম বসেছিলেন সেখানে পুলিশের কেউ যাননি।
রাত পৌনে ১০টা পর্যন্ত পুলিশ মাদ্রাসার সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে প্রতিটি ভবন, ছাত্রাবাস, মুফতি ইজহারের বাসায় অভিযান চালায়। মুফতি ইজহারের বাসা থেকে ১৮ বোতল পিউরিক এসিড জব্দ করা হয় বলে জানান নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) হারুন অর রশীদ হাজারী।

রাতে তিন ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান নাটক চালিয়েছে পুলিশ। এসময় জঙ্গী কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বহুল আলোচিত ইসলামী ঐক্যজোট নেতা মুফতি ইজহার ও তার ছেলে হারুন ইজহার পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। দিনভর মুফতি ইজহার মাদ্রাসার ভেতরে প্রকাশ্যে অবস্থান করলেও পুলিশ তাকে আটক কিংবা হেফাজতে নেয়ার কিংবা নজরদারিতে রাখার কোন পদক্ষেপই নেয়নি। অভিযোগ উঠেছে, দিনের আলোয় মুফতি ইজহারকে পালিয়ে যাবার সুযোগ করে দিয়ে রাতের আঁধারে পুলিশ তল্লাশি অভিযানের নামে নাটক করেছে।
যে পাঁচজনকে হ্যান্ডগ্রেনেড তৈরির কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক করেছে-তারা হলেন মাদ্রাসার প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক তফসির আহমেদ ,হেফজখানা শিক্ষা (আরবি) বিভাগের শিক্ষক মো.এছহাক, হাদিস মাধ্যামিক বিভাগের শিক্ষক আব্দুল মান্নান এবং কিতাব বিভাগ শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান ও বোর্ডিং সুপার মনির হোসেন।

মাসিক ‘দাওয়াত’ নামে একটি মাসিক ইসলামী পত্রিকায় সব সময়েই মুফতি ইজাহারসহ কয়েকজন উগ্রবাদী নেতা লেখালেখি করেন। দলটির কর্মসূচীও পাওয়া যায় এখানে। সেখানে নিজেই এক সময় আফগানিস্তানে তালেবানদের সঙ্গে কাজ করার কথা লিখেছিলেন উগ্রবাদী এ নেতা।
বাংলাদেশকে সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত করার নীলনক্সা বান্তবায়নে হেফাজতকে নেতৃত্ব দেয়ার মূল দায়িত্ব পালন করছেন মুফতি ইজাহারুল ইসলাম। ইসলামের বিভ্রান্তিমূলক বাণী দিয়ে উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে সক্রিয় করা হচ্ছে হেফাজতে ইসলামের মাধ্যমে। তাতে অন্যতম ভূমিকা পালন করছে হরকত-উল-জিহাদ (হুজি) কানেকশনে অভিযুক্ত মুফতি ইজাহারুল ইসলাম। হেফাজতে মুফতি ইজহার বরাবরের মতো তার নেপথ্য ‘খেলায়’ মহাসচিবসহ তিন শীর্ষ নেতাকে বহিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। গত কয়েক মাস ধরেই আন্দোলনের নামে সহিংস তান্ডবে সক্রিয় মুফতি ইজাহার ও তার দুই ছেলে মুসা এবং হারুন বিন ইজাহার। পটিয়া, হাটহাজারী সহ দেশের কওমী মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে সারাদেশ অস্থিতিশীল করা তার টার্গেট ।
কেন তাদের এতো প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে প্রশ্ন তুলেছেন তরিকত ফেডারেশনের নেতারা। বলেছেন, হেফাজত নেতারা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে ফায়দা লুটছে। এবার বেরিয়ে পড়েছে অপকর্ম। এদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য দেশবাসীতে মাঠে নামার আহ্বান জানিয়েছে তরিকত ফেডারেশন। একই দাবি নিয়ে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইসলামী ফ্রন্ট ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের নেতারা। ইসলামী ফ্রন্টের মহাসচিব ও আহলে সুন্নাতের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা এমএ মতিন বলেন, ধর্ম ব্যবসায়ী জঙ্গীদের আসল চেহারা বেরিয়ে গেছে। অবিলম্বে এই জঙ্গী নেতাকে আটক করতে হবে। ওদের কওমি মাদ্রাসায় জঙ্গী প্রশিক্ষণ হয়। সরকারকে অবিলম্বে অভিযান চালাতে হবে। তিনি বলেন, আমরা বহুবার বলেছি হেফাজত নেতারা জঙ্গী। এরা একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী। একই কথা বলেছেন, সম্মিলিত ইসলামী জোটের সভাপতি হাফেজ মাওলানা জিয়াউল হাসান। তিনি বলেন, হেফাজত নেতারা ১৩ দফার নামে ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করেছেন। এমন দাবি দেশের সাধারণ মানুষের ও ।
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসনের নাহয় মাথাব্যথা নেই । কিন্তু দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে শপথ করেছেন তারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের ই একজন। তার এবং তার জনগণের স্বার্থে প্রশাসন কি দায়িত্বে তৎপর হবেন? মুফতি ইজাহার , মুসা বিন ইজাহার এবং হারুণ বিন ইজাহার কে দ্রুততার সাথে গ্রেফতার না করলে ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনবেন এই নিদ্রাকাতর সর্বনাশা প্রশাসন!
০৮ অক্টোবর২০১৩
Sumikhan29bdj@gmail.com

Friday, October 4, 2013

জামাত নিষিদ্ধ করতে হবে- এদেশে তাদের রাজনীতি করার কোন সুযোগ দিতে পারো না তোমরা- জামাত প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীর পুত্র ফারুক মওদুদী



বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা করেছে যে জামায়াতে ইসলামী, সেই দলটি স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও কীভাবে এ দেশে রাজনীতি করতে পারে? প্রশ্ন তুলেছেন জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবুল আ'লা মওদুদীর ছেলে সৈয়দ হায়দার ফারুক মওদুদী। তিনি মনে করেন,জামাত নিষিদ্ধ করতে কোন দ্বিধা থাকা উচিত নয়। বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনীতি করার কোনো সুযোগ নেই। তোমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হামাত সহ চারটি দলকে নিষিদ্ধ করেছিলো। সেটাতে ফিরে যেতে হবে তোমাদের আবার।" তিনি ক্ষুব্ধ প্রশ্ন তোলেন," কিসের ভয় এতে?"
শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে ফারুক মওদুদী আরো বলেন, পাকিস্তান সৃষ্টির পর সে দেশে জামায়াত সুবিধা করতে পারেনি। দলটি হাল ফিরে পায় ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসনের সময়। সামরিক সরকার দলটিকে ফুলে-ফেঁপে উঠতে সাহায্য করে। উর্দুভাষী ফারুক মওদুদী ইংরেজী ভাষা কে ঘেন্না করেন। ঘেন্না করেন ইংরেজ দের-যাদের ষড়যন্ত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় জঙ্গীবাদের জন্ম ।
ইসলামি চিন্তাবিদ ফারুক মওদুদী ঢাকায় বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনীর উদ্যোগে ‘ধর্ম ও রাজনীতি: দক্ষিণ এশিয়া’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক গণবক্তৃতা ও দুই দিনের সম্মেলনে যোগ দিতে বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি বলেন, উপমহাদেশে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীর নয় সন্তানের কেউ-ই জামায়াতের রাজনীতিতে জড়াননি। তাদের পিতা নয় সন্তানের কাউকে মাদ্রাসায় পড়ান নি , জামায়াতের রাজনীতি থেকে ও দূরে থাকতে বলেছেন।
ফারুক মওদুদী জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সুবিধাবাদী চরিত্রের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ধর্মকেন্দ্রিক যত সহিংসতা হয়, সেখানে জামায়াতের কোনো নেতার সন্তান আছে বলে কি খবর পেয়েছেন? জামায়াতের নেতারা তাঁদের সন্তানদের কোনো বিপদের মুখে ফেলতে চান না। সব সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ।’ তিনি বলেন, পাকিস্তান স্বাধীন হোক, তা জামায়াতে ইসলামী চায়নি। মওদুদী পাকিস্তানের আন্দোলনকে ‘নাপাকিস্তান’ বলে আখ্যায়িত করেন। এরপর বাংলাদেশ সৃষ্টিরও বিরোধিতা করে দলটি।
ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ‘তথাকথিত জিহাদের’ বিরোধিতা করেন ফরুক মওদুদী। তিনি কাশ্মীরে জিহাদ সংঘটনে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামী বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় এবং হাজার হাজার নিরীহ মানুষের প্রাণহানির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পাকিস্তান জামায়াতের আক্রোশের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।একাত্তরের আগে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন ফারুক মওদুদী। তিনি তখন একটি বিমান সংস্থায় কাজ করতেন। চাকরি সূত্রে থেকেছেন ঢাকা, যশোর ও চট্টগ্রামে। এর পর আর বাংলাদেশে আসা হয়নি তার।এবার বাংলাদেশে এসে তার অনেক ভালো রাগছে জললেন। রাস্তায় কোলকাতা-ঢাকা বাস থেকে বিস্ময়ে হতবাক ফারুক মওদুদী প্রশ্ন করেন, " কোলকাতা থেকে সরাসরি বাস ট্রেন চলাচল আছে তোমাদের?"
তিনি মনে করেন জামাত ধর্মকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। এতে ইসলাম ধর্মের চরম অবমাননা হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ কে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান সৈয়দ হায়দার ফারুক মওদুদী।

Wednesday, October 2, 2013

সাম্প্রদায়িকতার কুৎসিত চেহারা- রুখসানা কাজল


শরত মানেই পুজোর গন্ধ। আকাশ বাতাস কাশবন নদী ও মানুষ- শরত এলেই রঙিন হয়ে উঠে। আমরা যে যেখানেই থাকি না কেন দুর্গা পুজো আমাদের এক করে তুলে। দূর শহর থেকে আমাদের মন চলে যায় পাড়ার ম-পে ম-পে।
আমি জানতে চাই, হ্যাঁরে এবার পুজোর থিম কি হবে রে? মেলা বসবে তো? কোন্ যাত্রা পার্টি আসছে? কি কি বই হবে জানিস কিছু? সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রাইজ কিন্তু ভাল হওয়া চাই! আর গান? কলকাতার সব পুজোর গান যেন থাকে! ম-প সাজানোতে সাবেকির পাশে নতুনত্ব ও রাখিস। আর লাইট? মানে আলোকসজ্জা-দেখিস আমাদের পাড়া যেন ফার্স্ট হয়!
আমার এত এত আবেগি প্রশ্নের কোন উত্তর নেই। মফস্বল শহরের সংবাদকর্মী ভাইটি উত্তর না দিয়ে মুখ নিচু করে বসে আছে অনেকক্ষণ। ওর মুখটা লাল। মুঠোফোনের গভীর কালো রঙে ডুবতে ডুবতে খুব আবছা করে জানায়: এবার আর পুজো হচ্ছে না দিদি। চমকে উঠি! আমার ঝলমলে শরত আকাশ মুহূর্ত মাত্র শ্রাবণের ঘন মেঘে ঢাকা পড়ে গেল।
যে ছোট্ট শহরটিতে আমার জন্ম, শরত এলেই যে শহরের হিন্দু-মুসলমান-খৃীষ্টান সবাই এই দুর্গা পুজোর মহাআনন্দ উৎসবে সব কিছু ভুলে মেতে ওঠে, এবার পুজো হচ্ছে না সে শহরে। আসছেন না সিংহ আরোহিনী মা দুর্গা দুর্গতিনাশিনী। আসছেন না লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক গণেশ। আসছে না মেলা, সার্কাস, নাগরদোলা, যাত্রাগান, গরম জিলেপি, পাঁপড়ভাজা, নানা রঙের নানা ঢংয়ের মাটির পুতুল। আমি মন খারাপের ঘোলা জলে হাবুডুবু খেয়ে জানতে চাইলাম: কেন রে? এবার কেন মূর্তি গড়া হবে না? ও বিষন্ন দুটি চোখ মেলে আমার দিকে তাকাল আর তখনই সেলুলয়েডের ফিতায় ভেসে উঠল দৃশ্যপট। মুহুর্মুহু নিঃশব্দতার চড় আমাকে ফেলে দিল অমার্জনীয় এক লজ্জায়। আমিও স্তব্ধ বেদনাকে সঙ্গী করে বসে থাকলাম ভাইয়ের পাশে। আমাদের কষ্ট এক, বেদনা এক- শুধু লজ্জা এসে বলে গেল- আজ থেকে দিদি মুসলিম আর তার ভাইটি হিন্দু!
এমন নয় যে, আমরা এর আগেও এ রকম পরিস্থিতিতে পড়িনি। পড়েছি। ইতিহাস সাক্ষী। কিন্তু বার বার কেন এমন লজ্জাজনক সময়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় আমাদের! কেন এই লজ্জা ঢাকতে বার বার বিচ্ছিন্ন হতে হয় আমাদের? কেন স্বভূমিতে আমরা বেঁচে থাকি মুখ ঢেকে, কেন কেউ কেউ স্বভূমি ছেড়ে চলে যায় চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে? ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাসরত প্রতিটি হিন্দু-মুসলিম-খৃীষ্টান-শিখ-বৌদ্ধ ধর্মের নাগরিকই কেন এই একই বেদনায় রঞ্জিত হয় বার বারÑ কখনও না কখনও?
১৯৪৭-এর ভয়াবহ দাঙ্গার স্মৃতি স্মরণে এখনও শিউরে উঠে হিন্দু মুসলিম অনেকেই। ইতিহাস খুব জটিল পথে ধায় আর রাজনীতি পা ফেলে আরও স্বার্থপর আলো আঁধারের গোলোক পথে। ’৪৭-এর দেশ ভাগ কি সাধারণ হিন্দু-মুসলিম জনগণ কখনও চেয়েছিল? কাদের স্বার্থে কেন হলো এই দেশ ভাগ? কেবলই ধর্মের জিরাফ এসে এঁকে দিল এক সীমারেখা আর আমরা ছিটকে গেলাম অখ- জন্মভূমির এ পারে, ও পারে!
দেশ ভাগ কেবল ধর্মীয় প্রভাবের ফলাফল নয়। এর পেছনে রয়েছে তৎকালীন রাজনৈতিক বোদ্ধা এবং প-িতদের স্বার্থপর চিন্তা ধারার এক জটিল মিথস্ক্রিয়া। হিন্দুর জন্য হিন্দু রাষ্ট্র, মুসলমানের জন্য মুসলিম রাষ্ট্রÑ এই দ্বি-জাতিতত্ত্বের উদ্ভাবক এবং ধারক পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মি. জিন্নাহ ব্যক্তিগত জীবনে কোন ধর্মগুরু ছিলেন না। এমন কি তিনি সরাসরি অনেক ধর্মীয় আচার-আচরণের ধারও ধারতেন না। মূলত তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ পাশ্চাত্য চাল-চলনে অভ্যস্ত তখনকার সমাজের একজন উঁচু তলার ব্যক্তি মাত্র। কংগ্রেসের তৎকালীন অনেক শীর্ষ নেতাও দেশ ভাগ নিয়ে আশ্চর্য নীরবতায় মৌনী ছিলেন। মূলত নেহেরু এবং জিন্নাহর ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ, রাজনৈতিক অভিপ্সা, নেহেরুর নেতৃত্বে কংগ্রেসের অতি দাদাগিরি মনোভাব ক্রমাগত মুসলিম লীগের নেতাদের ইন্ধন ও উৎসাহ যুগিয়েছে নতুন নতুন রাজনৈতিক রণকৌশল নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পরেও জিন্নাহ স্বতন্ত্র পাকিস্তানের কথা বলেননি। ১৯৬৯ সালে শিব রাও লিখেছেন যে, ১৯৩৭-এর নির্বাচনের অল্পকাল পরেই জিন্নাহ একটি প্রকাশ্য ঘোষণায় বলেন, ‘হিন্দু এবং মুসলিমদের মধ্যে একটি সম্মানজনক বোঝাপড়া হোক’ এই বিষয়ে কথা বলার জন্য প্রকাশ্যে মহাত্মা গান্ধীর কাছে সাহায্যের আবেদন রাখেন। কিন্তু গান্ধী অসহায়ের মতো হতাশার সঙ্গে সম্পূর্ণ অপারগতা প্রকাশ করেন। যদিও তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতি আন্তরিকভাবে বিশ্বস্ত ছিলেন, কিন্তু তৎকালীন কংগ্রেসের নেতৃত্বে তখন আর তার কোন প্রভাব ছিল না বললেই চলে। নেহেরুর চিন্তা, পথ, ভাষা এমনকি বাচনভঙ্গিতেও অখ- ভারত রক্ষার কোন সম্মানজনক সহিষ্ণুতাও প্রকাশ পায়নি কখনও। ১৯৩৭ সালের মার্চ মাসে নেহেরুর এক উগ্র মন্তব্য ভারতবর্ষের একই সূত্রে গ্রন্থিত অসাম্প্রদায়িক ইতিহাসকে অভিন্ন পথের পরিবর্তে দুটি ভিন্ন পথে প্রবাহিত করে দিয়েছিল। আত্মতৃপ্তি, রাজনৈতিক সাফল্য ও বিজয়, জনপ্রিয়তা, ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষার স্বপ্নে অন্ধ হয়ে কংগ্রেস ভারতের অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে তার আজ্ঞাবহ দল হিসেবে ভাবতে শুরু করে। নেহেরু অত্যন্ত আত্মঅহঙ্কারে বলেছিলেন, ‘ভারতে এখন কেবল দুটি শক্তি আছে : ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ আর ভারতীয় জাতীয়তাবাদ- কংগ্রেস যার প্রতিনিধি। পাল্টা জবাবে জিন্নাহ বলেছিলেন, না, ভারতে তৃতীয় আরও একটি শক্তি আছে- আর তা হচ্ছে মুসলমানরা।
মুসলিম লীগ এবং কংগ্রেস নেতাদের এই রাজনৈতিক পাশা খেলায় ভারতবর্ষের জনগণ ঘুঁটির মতো ব্যবহৃত হয়েছে। প্রাণ গিয়েছে। মান গিয়েছে, জমি-জিরেত, ধন, সম্পদ গিয়েছে। আর হারিয়ে গিয়েছে কোটি মানুষের আজন্মের ঠিকানা- বদলে গেছে জননী জন্মভূমির পবিত্র মানচিত্র।
ভারতবর্ষের মাটিতে, নদীতে, আকাশে, বাতাসে, মানুষের মনে জন্ম নিয়েছে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ। সেই বৃক্ষে ফুল হয়েছে, ফল ধরেছে, বীজ ছড়িয়ে গেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মাতরে। রাজনৈতিক নেতাদের চাপান-উতর রাজনীতির পাশা খেলায় ক্ষুদ্র বা বৃহৎ যে ভুলই হোক না কেন সেই ভুলের কঠিন সুদ গুনতে হয়েছে ভারতবর্ষের সাধারণ হিন্দু-মুসলমান জনগণকে। আর সেই বিষবৃক্ষের ফলে এত বিদ্বেষ যে অনাদিকালের ধর্মনিরপেক্ষতার নিরাপদ ভূমিতে গড়ে ওঠা ভারতীয় জাতীয় ঐক্যকে খ-বিখ- করে দিয়েছে নিষ্ঠুরের মতো।
দ্বি-জাতিতত্ত্বকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ১৯৭১ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের বিনিময়ে পাকিস্তান ভেঙ্গে সর্বপ্রথম সৃষ্টি হয় একটি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র- বাংলাদেশ। সংবিধানে গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে মূল স্তম্ভ করে স্বাধীন বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করলেও মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় হত্যা করা হয় স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বদলে যায় সংবিধান। বদলে যায় শাসক শ্রেণীর চরিত্র। তৈরি হয়ে যায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ধর্মীয় মৌলবাদী এক গোষ্ঠী। রাজনীতিতে সক্রিয় এই শ্রেণী বাঙালীর সংস্কৃতির স্থানে প্রচলন ঘটাতে চায় আরবীয় সংস্কৃতি। বাংলাদেশকে মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করতে এরা বদ্ধপরিকর। তাই মাঝে মাঝেই ঘটে যাচ্ছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। সংখ্যালঘুর ঘর পুড়ছে, প্রাণ যাচ্ছে, লুট হয়ে যাচ্ছে মন্দির ও নারী। সেখানে পুজো হয় কি করে? কোন মেয়ে কি এ রকম বিপন্ন বাবা মায়ের ঘরে বেড়াতে আসে সন্তানদের নিয়ে?
তাই এবার আর পুজো হবে না। সপ্তমী অষ্টমী নবমী জুড়ে দল বেঁধে আমাদের মতো মানুষদের ম-পে ম-পে ঘুরে ঘুরে প্রতিমা দেখা হবে না আর। দশমীর দুপুর থেকেই বিসর্জনের বেদনা এসে ছুঁয়ে দেবে না সব ধর্মের মায়েদের মন। পুজো মানেই তো ছুটি। বাবা মায়ের কাছে ক’দিনের জন্য বিবাহিত মেয়ের বেড়াতে আসা। সংসার জটিলতার ফাঁকে ভাবনাহীন নিটোল কয়েকটি দিন। কি চমৎকার একটি পারিবারিক মিলনের গল্প! অথচ সাম্প্রদায়িকতার কুৎসিত রঙে এমন মধুর একটি গল্পে আমরা কালি দিয়ে দিলাম!
কি আছে আমাদের সামনে?

এই রায়কে অভিনন্দন না জানিয়ে পারি না - আবদুল গাফফার চৌধুরী


লিখতে বসেছিলাম অর্ধনোবেল জয়ী ড. ইউনূসের নবতর কা-কীর্তি নিয়ে। গত সপ্তাহে ‘চতুরঙ্গের’ লেখায় সেই প্রতিশ্রুতিই দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ (মঙ্গলবার) ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিচারের রায় ঘোষিত হলে খুব সকালে (লন্ডন সময়) লেখার টেবিলে লিখতে বসেই তা জানতে পারব, তা আগে বুঝতে পারিনি। পরে বুঝলাম লন্ডনের সকাল মানে ঢাকার দুপুর। সুতরাং রায় ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লন্ডনে সকালেই সেটা জানার কোন অসুবিধা নেই। লেখার সাবজেক্ট তাই বদলাতে হলো।
যুদ্ধাপরাধ, হত্যা, গণহত্যাসংক্রান্ত তেইশটি অভিযোগ ছিল সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে। রায়ে বলা হয়েছে, তার মধ্যে নয়টিই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং তাঁকে মৃত্যুদন্দাদেশ দেয়া হয়েছে। এ রায়কে বেদনাক্রান্ত মনে অভিনন্দন জানাই। আমার অভিনন্দনকে বেদনাক্রান্ত আখ্যা দিলাম এ জন্য যে, এই পরিবারটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক প্রায় অর্ধশতকের। আবার এ রায়কে অভিনন্দন না জানিয়ে পারি না এ কারণে যে, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তাঁর পিতা ফজলুর কাদের চৌধুরীর সঙ্গে মিলে মানবতার বিরুদ্ধে যে জঘন্য অপরাধগুলো করেছেন, তার বিচার ও দ- না হলে এ দেশের মাটি থেকে মানবতা শব্দটিই বিদায় নিত।
সাকা চৌধুরীর মানবতাবিরোধী অসংখ্য গুরুতর অপরাধের মধ্যে কু-েশ্বরীর নূতন সিংহকে হত্যা মাত্র একটি। এ অসংখ্য অপরাধের জন্য সাকা চৌধুরী কখনও অনুতপ্ত হননি, বিবেকপীড়া অনুভব করেননি। বরং যে বঙ্গবন্ধু জেলে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত ফজলুল কাদের চৌধুরীর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবার ও পুত্রদের প্রতি সস্নেহ অভিভাবকত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেই বঙ্গবন্ধু সপরিবারে ঘাতকদের হাতে মর্র্মান্তিক মৃত্যুবরণের পর সাকা চৌধুরী সেই ঘাতক দলের সঙ্গে গিয়ে জুটেছিলেন।
তার পর গত প্রায় চার দশক ধরে রাজনীতি করার নামে তিনি যে একটার পর একটা নৃশংস কা- ঘটিয়েছেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকায় সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন, আচার-আচরণে খিস্তি-খেউড়, অভব্যতা ও অশ্লীলতার পরিচয় দেখিয়েছেন, তার কোন তুলনা নেই। তিনি শুধু কর্মকান্ডে সন্ত্রাসী নন, বাক্য সন্ত্রাসীও। তাঁর জন্য এ চরম দ-াদেশের রায় শুনে তাঁর হাতে নির্যাতিত, নিপীড়িত ও নিহত অসংখ্য মানুষের পরিবার-পরিজন যে তাদের দীর্ঘকালের ঘোষিত শোক ও বেদনায় কিছুটা হলেও সান্ত¡না পাবে, তাতে সন্দেহ নেই।
এ রায়ে দেশের মানুষের সঙ্গে আমিও সুখী। ঔঁংঃরপব যধং ফড়হবÑ ন্যায়বিচার করা হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি বেদনাসিক্ত। আমার এ পরস্পরবিরোধী মনোভাবের কারণ আমি ইতোমধ্যেই ব্যক্ত করেছি। এই পরিবারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘকালের। সাকা চৌধুরীর পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। যদিও তাঁর রাজনৈতিক মতের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল যোজনযোজন দূরের। এই দূরত্বকে অতিক্রম করে তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বঙ্গবন্ধুর মাধ্যমে।
ছাত্রজীবনে (কলকাতায়) বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ফজলুল কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালে যদিও দুজনের রাজনীতি বিপরীতমুখী হয়েছে; কিন্তু প্রাকযৌবনে দুজনেই ছিলেন অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লীগ-রাজনীতিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের যুবনেতা। সেই সূত্রে দুজনের মধ্যেই ঘনিষ্ঠতা। তাদের এই ব্যক্তিগত সম্পর্ক ফজলুল কাদের চৌধুরী আইয়ুব খানের মন্ত্রী থাকাকালেও নষ্ট হয়নি।
আজ ভাবতেও অবাক লাগে, ’৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কোলাবরেটর এবং অসংখ্য মানবতাবিরোধী অপরাধের নায়ক হিসেবে ফজলুল কাদের চৌধুরীর এবং তাঁর পুত্রের এমন চরম অধঃপতন ঘটতে পারে। চল্লিশের দশকে ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন অবিভক্ত ভারতের একজন জাঁদরেল ছাত্রনেতা। মুসলিম ছাত্রলীগ গঠিত হওয়ার আগে তিনি ছিলেন নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি। চল্লিশের দশকের গোড়ায় নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ‘অন্ধকূপ হত্যার’ মিথ্যা অভিযোগে ব্রিটিশ শাসকদের নির্মিত হলওয়ে মনুমেন্ট ভাঙ্গার জন্য যখন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে কলকাতায় বিরাট শোভাযাত্রা হয়, সেই শোভাযাত্রায় যে ক’জন মুষ্টিমেয় মুসলমান ছাত্র ছিলেন, তাদের মধ্যে দুজন ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান ও ফজলুল কাদের চৌধুরী। কিশোর বঙ্গবন্ধু তখন চোখের চিকিৎসার জন্য কলকাতায় ছিলেন।
এই ফজলুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকে তিনি তাঁর অত্যন্ত কঠোর ও কর্কশ স্বভাব সত্ত্বেও আমাকে কেন ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন, তা আমি জানি না। তিনি যখন আইয়ুব আমলে পাকিস্তান জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং কখনও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তখনও চাটগাঁয় এলে তিনি তাঁর টাইগার্স হিলের বাসায় আমাকে আমন্ত্রণ জানাতেন। আমি শেখ মুজিব এবং তাঁর ছয় দফার সমর্থক জেনেও কখনও অসন্তোষ প্রকাশ করেননি। তাঁর সুউচ্চ হিল ভবনের ছাদে তখন দেখতাম তাঁর দুই পুত্র সালাউদ্দিন ও গিয়াসউদ্দিন খেলা করছেন।
আইয়ুব মন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর ফজলুল কাদের চৌধুরী যখন তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ সম্পর্কে তদন্তের সময় ঢাকায় ইস্কাটনে নয় নম্বর দিলু রোডে অবস্থান করতেন, তখন প্রায়ই তাঁর সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাত হতো। তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এলেই পতেঙ্গার একগাদা লাল মিষ্টি তরমুজ নিয়ে আসতেন আমার স্ত্রীর জন্য। বলতেন, বৌমার জন্য এনেছি। আইয়ুব সরকারের হাতে তিনি নানাভাবে হেনস্থা হয়েছেন। বিস্ময়ের কথা এই যে, আইয়ুবের পতনের পর পতিত স্বৈরাচারী কনভেনশন মুসলিম লীগের সভাপতির পদ ছেড়ে দেন এবং ফজলুল কাদের চৌধুরীকে ডেকে নিয়ে কনভেনশন মুসলিম লীগের সভাপতির পদে বসান। তিনি ইসলামাবাদ থেকে ঢাকায় ফিরে এলে তাঁকে বলেছিলাম, এটা আপনি কী করলেন? ফজলুল কাদের চৌধুরী হেসে বলেছেন, ‘এখন আমি মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট হয়েছি, শীঘ্রই পাকিস্তানেরও প্রেসিডেন্ট হব।’ আমার মনে হয়েছিল, তিনি রাজনৈতিক ফ্যান্টাসিতে ভুগছেন।
ফজলুল কাদের চৌধুরীর মধ্যে ক্রুর এবং কোমল দুটো চরিত্রই ছিল। তাঁর পুত্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পিতার চরিত্রের শুধু ক্রুর দিকটা পেয়েছেন, কোমল দিকটা পাননি। পিতার মধ্যে যে ক্ষীণ দেশপ্রেম ছিল, সাকা চৌধুরীর মধ্যে তাঁর কণামাত্র নেই। নিজের কথাবার্তায় তিনি বহুবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁর আনুগত্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি নয়; তাঁর অনুগত্য এখনও পাকিস্তানের প্রতি। অনেকে সন্দেহ করেন, তাঁর রাজনীতির সঙ্গে ‘পাকিস্তান কানেকশন’ যুক্ত, এমনকি আইএসআইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও বিস্ময়ের কিছু নেই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও আদর্শ সম্পর্কে তিনি বিভিন্ন সময়ে যে সব মন্তব্য করেছেন, তাতে মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধ ছাড়াও দেশদ্রোহিতার অভিযোগেও তাঁকে বিচারে সোপর্দ করা যেত।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল কয়েকজনকেই মৃত্যুদন্ডাদেশ দিয়েছেন। একজনকে (গোলাম আযম) দিয়েছেন যাবজ্জীবন কারাদন্ড।
এই দন্ডিতেরা সকলেই ’৭১-এর ঘাতক দল জামায়াতের নেতা। এখন সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রাণদন্ডের আদেশ হওয়ায় বিএনপির একজন শীর্ষনেতা দন্ডাদেশ পেলেন। এই মামলাটির বৈশিষ্ট্য, জাতীয় সংসদের সদস্য থাকাকালেই বিএনপির এক শীর্ষনেতা যুদ্ধাপরাধে দন্ডিত হলেন এবং তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটিরও সদস্য।
এখন এই দন্ডিত নেতাকে দল থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা না দিয়ে বিএনপি যদি এই দন্ডাদেশপ্রাপ্ত নেতার সমর্থনে হরতাল ডাকে, জামায়াতকে সঙ্গী করে রাজপথে সন্ত্রাস সৃষ্টিতে নামে, তাহলে বিএনপিকেও কি যুদ্ধাপরাধীদের দল বলে গণ্য করা যাবে না? আর সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যদি মনে করে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াত নির্বাচনে প্রার্থী দাঁড় করানোর অযোগ্য, তাহলে একই ক্যাটাগরিতে কি বিএনপিও পড়ে যাবে না? অবশ্য এটা আইনগত বিষয়। আইন বিশেষজ্ঞরা এ সম্পর্কে ভাল বলতে পারবেন।
রায়টি ঘোষিত হওয়ার পর বিএনপি এখন পর্যন্ত (আমার এই লেখা যখন লিখছি) এ সম্পর্কে কোন আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি। কিন্তু তাদের প্রতিক্রিয়া বোঝা যায়, ঢাকায় হরতাল ডাকা ছাড়াই রাজপথে ভাংচুর, গাড়ি পোড়ানো শুরু করা দেখে। চট্টগ্রামে আজ (মঙ্গলবার) হরতাল ডাকা হয়েছে। ঢাকায় বিএনপির আইনজীবী খোন্দকার মাহবুব বলেছেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের যারা আজ বিচার করছে, বাংলার মাটিতে তাদের একদিন বিচার হবেই।’ এই মন্তব্য শুধু বিচারব্যবস্থার অবমাননা নয়, বিচারপতিদেরও হুমকি দেয়ার সমতুল্য। এই ধরনের আইনজীবীদের সম্পর্কে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কিনা, তা আইনমন্ত্রীকে বিবেচনা করতে হবে।
সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রদত্ত দ-াদেশ নিয়ে বিএনপি যদি রাজপথে আন্দোলনের নামে সন্ত্রাস সৃষ্টিতে নামে এবং তাতে জামায়াত ও শিবির যোগ দেয়, তাহলে দেশের রাজনীতির চিত্রটা আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে। রাজনীতির মাঠে একদিকে দেখা যাবে যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থকদের শিবির। অন্যদিকে দেখা যাবে এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দ- যারা সমর্থন করে সেই গণসমর্থিত গণতান্ত্রিক শিবির। সম্ভবত ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়েই বাংলাদেশের মাটিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক শক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির চূড়ান্ত যুদ্ধটা হবে। এই যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকার সুযোগটা ক্রমশই কমে আসছে।
ফজলুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে এককালে ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ঠ ছিলাম এবং সাকা চৌধুরীদেরও তাদের কিশোর কাল থেকে অত্যন্ত কাছ থেকে চিনি, এ জন্যই আজ সাকা চৌধুরীর মৃত্যুদ-াদেশে ব্যথা অনুভব না করে পারছি না। কিন্তু তাকে দ- দেয়া ছিল মানবতা ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রয়োজন। সুতরাং এই রায়কে মনের বেদনা সত্ত্বেও অভিনন্দন না জানিয়ে পারি না। বিএনপি বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের বিচার ও শাস্তি রোধ করতে পারেনি; ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দ-ও রোধ করতে পারবে না। মাঝখানে যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থন দিয়ে তারা দেশের মানুষের কাছে নিজেদের আসল চেহারা উন্মোচন করছেন। যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থনদানই যে দেশে যথাসময়ে একটি নির্বাচন হলে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সকল খোয়াব ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেবে এই সত্যটা তারা এখন বুঝতে পারছে না। -দৈনিক জনকন্ঠ

Tuesday, September 24, 2013

যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের প্রশ্নবিদ্ধ সহমর্মিতা - আঞ্জুমান ইসলাম ও ওমর শেহাব

সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৩

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (AI) বিশ্বের নামকরা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অন্যতম। এসব সংগঠনসহ বেশকিছু আন্তর্জাতিক এনজিও হঠাৎ করে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আইন ও বিচার ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বেশ উৎকণ্ঠা (!!!) প্রকাশ করে আসছে।ব্যাপারটি বেশ আশাজাগানিয়া হত যদি তারা এর পাশাপাশি বিশ্বজিৎ বা ত্বকী হত্যাকাণ্ড ও এর সুষ্ঠু বিচার নিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে চাপের মুখে রাখত কিংবা ফটিকছড়ি-রামুতে বর্বরোচিত তাণ্ডব বা বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উপর নিপীড়ন ও আগ্রাসনের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে না পারায় সরকারকে ব্যর্থতার দায়ে অভিযুক্ত করত।

কিন্তু তা না করে দেখা গেল গত এক বছরে তারা তাদের অধিকাংশ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের জন্মের সময়ে নির্বিচারে যারা যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে শুধুমাত্র তাদের ‘মানবাধিকার’ কোনোভাবে লঙ্ঘন হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে আলোকপাত করে। বিষয়টি আশ্চর্যজনক বটে!

আরও আশ্চর্যজনক ব্যাপার হল প্রত্যেক যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায়ের আগে ও পরে প্রায় চার দশক ধরে যুদ্ধাপরাধীদের পৃষ্ঠপোষক জামায়াত-শিবির যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করে অমানবিক নৃশংসতা দেখাচ্ছে, সেগুলোকে ‘রাষ্ট্র, বিশেষ করে বিচার ব্যবস্থার প্রতি হুমকি’ বলে উল্লেখ না করে, শুধুমাত্র গোলাম আযমের রায়কে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ দেখানোর প্রতি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে।

বিয়াল্লিশ বছর ধরে বিচারের আশায় বুক বেঁধে মুক্তিযুদ্ধের যে ভিকটিমরা ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীদের ন্যায্য বিচার ও সাজা দেখার অপেক্ষায় আছেন– সেই নিপীড়িত নর-নারী, আত্মীয়-পরিজনদের উপর ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি পাশ কাটিয়ে প্রকারান্তরে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নেওয়া এসব মানবাধিকার সংস্থার ব্যাপারে আমরা তাই আগ্রহ বোধ করলাম। তাদের সাম্প্রতিক কিছু রিপোর্ট খুঁটিয়ে দেখলাম এবং যা পেলাম তা খুবই কৌতূহলোদ্দীপক।

উদাহরণ দেওয়া যাক। রাজাকার সাঈদীর যুদ্ধাপরাধের সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে ডিবি পুলিশ অপহরণ করেছে এ কথা কোত্থেকে জানল সে ব্যাপারে হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জিজ্ঞেস করলে ওরা ডেভিড বার্গম্যানের সূত্র দিয়ে থাকে।
ডেভিড বার্গম্যানকে জিজ্ঞেস করলে তিনি শুধুমাত্র সাঈদীর আইনজীবী ব্যরিস্টার রাজ্জাকের জুনিয়র হাসানুল বান্না সোহাগকে তার সূত্র হিসেবে উল্লেখ করেন। সোহাগের বস ব্যারিস্টার রাজ্জাককে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন এটি তাকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে!


২০১৩ সালের ২৯ এপ্রিল প্রকাশিত ওমর শেহাবের করা অ্যানালাইসিস “The missing links of the Bali abduction allegation”-এ এই দুর্বল সূত্রের দুষ্টচক্রটি (circle of reference) স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। পাঠক-পাঠিকাদের সুবিধার জন্য আমরা সেই প্রবন্ধ থেকে এই দুর্বল সূত্রের দুষ্টচক্রটির একটি ছবি তুলে ধরলাম।



সুখরঞ্জন বালীর কথিত অপহরণের ব্যাপারে কোন প্রতিষ্ঠান কাকে সূত্র হিসেবে উল্লেখ করছে তার ছবি। প্রশ্নবোধক চিহ্নটি হল একটি ভুতুড়ে সূত্র।
এখন দেখা যাক এই দুষ্টচক্রে অংশগ্রহণকারীদের কাজের সময়ের ব্যবধানের একটি ছবি।

সুখরঞ্জন বালীর কথিত অপহরণের সংবাদ প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রকাশিত প্রতিবেদনের সময়ের ব্যবধান ও তথ্যসূত্রের পরম্পরার একটি চিত্র।

বিদেশি মানবাধিকার ও দাতা সংস্থার এ ধরনের উন্নাসিক ও একপেশে আচরণ আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। আশার ব্যাপার হল গত বিয়াল্লিশ বছরে জাতি হিসেবে আমাদের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি তাদের এ বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে তাদের সেই তলাবিহীন ঝুড়ির তকমা আমরা অনেক আগেই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি– অধিকার, আইন, নৈতিকতা, সভ্যতা, সমাজ এসব ব্যাপারে তাদের অষুধ গেলাই আমাদের একমাত্র কাজ নয় বরং আমাদের কাছ থেকেও তাদের অনেক কিছু শেখার আছে।

উদাহরণস্বরূপ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কর্মকাণ্ডের পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের প্রথম সারির জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রতিবেদনের গুণগত মান যে কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সমমান এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিখ্যাত পত্রপত্রিকাগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে।

প্রসঙ্গক্রমে, ইকোনমিস্টের সেই প্রতিবেদনের কথা বলা যায় যেটিতে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে তুলনা করার জন্য বহুল-বিতর্কিত নাজি সেনাপতি আইখম্যানের বিচারের কথা তুলে ধরা হয়। যদিও আন্তর্জাতিক আইনের অনেক টেক্সট বইয়ে এ বিচারকে বরং মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবেই তুলে ধরা হয়।

একইভাবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর বৌদ্ধদের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের প্রামাণ্য ছবি উপগ্রহের মাধ্যমে তুলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রকাশ করলেও, কয়েকদিন পরে মাত্র কয়েকশ মাইল দূরে রামুতে মুসলমান সন্ত্রাসীরা বৌদ্ধমন্দির ও জনবসতিতে যখন স্মরণকালের ভয়াবহ সন্ত্রাসী আক্রমণ ঘটাল তখন আর তাদের উপগ্রহ ছবি তোলার জন্য আমাদের আকাশে আসেনি!

বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের বেশকিছু সংশয় দেখা দেওয়ায় আমরা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিলাম যে মানবাধিকার সংস্থা ও এর কর্মীরা আসলে একে অপরের থেকে কতটুকু বিচ্ছিন্ন ও প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করে যে একটি সংস্থার বা কর্মীর রিপোর্টের তথ্যকে আরেকটি সংস্থা তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। সে সঙ্গে বর্তমানের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার বিতর্কিত কাজকর্ম যা বিভিন্ন সময়ে উচ্চমহলে নাড়া ফেলেছে তা নিয়েও কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

এটা বলার অবকাশ রাখে না দুর্বল ও নির্যাতিত মানুষের পক্ষে নৈতিক সমর্থন দানের জন্যে ১৯৭৮ সালে রবার্ট বারনেস্টাইনের নেতৃত্ব হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর আগে অবশ্য হেলসিংকি ওয়াচ ( Helsinki Watch) নামের এ সংগঠনের কাজ শুরু হয় ১৯৭৫ সালে যার মূল উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ব্লকের কর্মকাণ্ড হেলসিংকি ঘোষণার (Helsinki Accord) সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনটিতে নৈতিক অবক্ষয় দেখা দেয়। প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান রবার্ট বারনেস্টাইন থেকে শুরু করে টাইম ম্যাগাজিনসহ উল্লেখযোগ্য প্রায় সব মিডিয়াই একমত হয় যে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠী বা দলের মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করার কারণে নিরপেক্ষতা হারিয়েছে।

কোনো দেশের “সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ততাবিহীনভাবে কাজ করার নীতি” নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও সৌদি সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অনুদান গ্রহণ করার অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদেরই প্রাক্তন প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট বারনেস্টাইনে দ্বারা।কাকতালীয়ভাবে এর পর থেকে মুসলিমপ্রধান দেশের, বিশেষ করে ইসলামিস্ট সংগঠনগুলোর কাছে ভীষণ গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের। এইচআরডব্লিউ প্রধান কেনেথ রথের কাছে নানান দেশ থেকে খোলা চিঠিও দেওয়া শুরু এই অভিযোগ করে যে কেন কেনেথ রথ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর পক্ষে কথা বলছেন।এমন অভিযোগও করা হয় যে ইসলামের নামে মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুড নারীদের স্বাধীন চলাফেরাতে যে বাধা দিচ্ছে তার পক্ষেই সাফাই গাইছেন কেনেথ রথ। শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিককালে নানান প্রশ্নবিদ্ধ মানুষকে অ্যাডভাইজরি বোর্ডে নিয়োগ দিয়ে যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে সংস্থাটি। আমেরিকান সেনাবাহিনীর প্রাক্তন সদস্য ও প্রকাশ্য নাৎসি সমর্থক মার্ক গার্লেস্কোকে (Marc Garlesko) সেখানে নিয়োগ দেওয়ার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে তাকে বরখাস্ত করতে বাধ্য হয় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।এখন আবার শাওয়ান জাবারীন (Shawan Jabarin), যাকে ইসরাইলি সুপ্রিম কোর্ট ‘ড. জেকিল ও মিস্টার হাইড’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, জাবারীন প্রকাশ্যে নিজেকে মানবাধিকারকর্মী বলে দাবি করলেও আসলে জঙ্গি গোষ্ঠীর সদস্য– এ নিয়োগকে বছর দুয়েক আগে বারনেস্টাইন রীতিমতো ‘হোঁচট খাওয়ার মতো’ বলে উল্লেখ করেছেন।ইরাকের রাসায়নিক অস্ত্র ও নার্ভ গ্যাস ব্যবহারের প্রমাণ আছে বলে রিপোর্ট প্রকাশ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যা প্রকারান্তরে বুশের ইরাক আক্রমণের পক্ষে রায় দেয়। তাদের দেওয়া সেই ঘোষণাটি পরবর্তীতে শতভাগ মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়। মিথ্যা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শুরু হওয়া ইরাক যুদ্ধের ৬ লাখ অকারণ মৃত্যুর (আমরা মনে করি এগুলো হত্যাকাণ্ড) দায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কখনওই স্বীকার করেনি।

এ বছর আবার কেনেথ রথ ও তার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ব্যাপারে অভিযোগ উঠেছে “Martin Ennals” মানবাধিকার পুরষ্কারের জন্যে ফাইনালিস্টদের তালিকায় ‘মনা সাইফ’ নামে জঙ্গি-সমর্থক বলে অভিযুক্ত একজনকে নমিনেশন দেওয়ার। এ রকম বহু একপেশে ও উদ্বেগজনক তথ্য যে কেউ পেতে পারেন “Controversies about HRW” লিখে ইন্টারনেটে সার্চ দিলেই।এছাড়া সচেতন স্বেচ্ছাসেবকরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে সবচেয়ে বড় বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়াতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সমালোচনা (Criticism of Human Rights Watch) শীর্ষক একটি সমৃদ্ধ নিবন্ধ লিখে রেখেছেন এবং নিয়মিত হালনাগাদ করে যাচ্ছেন।তাই এ বিষয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনায়যাব না।

কিন্তু কেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এ বর্তমান অবস্থান ও প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ড– বিশেষ করে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে অহেতুক সহমর্মিতা কি নিছকই কাকতালীয়?

একটু বিশদ অনুসন্ধানী তথ্য দিচ্ছি নিচে এসব মানবাধিকার সংস্থা, এনজিও ও সাংবাদিকের অর্থের উৎস ও পারস্পরিক সম্পৃক্ততা সম্পর্কে। এটি এখনও কোনো সম্পূর্ণ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নয়। আমরা এটিকে মনে করি কৌতূহলের প্রথম ধাপ। আমাদের বিশ্বাস এই তথ্যগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনগুলোর কাজকর্ম বিচারের সময় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন কিছু উপাদান যোগ করবে।

১৯৮৭ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তদানীন্তন এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর আরিয়াহ নাইয়ার তার ডেপুটি হিসেবে কেনেথ রথকে নিযুক্ত করেন। ১৯৯৩ সালে নাইয়ার হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ছাড়েন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী জর্জ সোরসের ওপেন সোসাইটি ইন্সটিটিউট (OSI)-এর প্রধান হিসেবে যোগ দিতে। আর নাইয়ারের স্থলাভিষিক্ত হন রথ। এখন পর্যন্ত কেনেথ রথই সংগঠনটির প্রধান।ওপেন সোসাইটি ইনস্টিটিউট হচ্ছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সবচেয়ে বড় অর্থ যোগানদানকারী সংস্থা। ২০১১ সালে আরিয়াহ নাইয়ার ওপেন সোসাইটি ইনস্টিটউটের পক্ষ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার অর্থসাহায্য করেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে। মজার ব্যাপার হল, নাইয়ারের স্ত্রী ইভেট নাইয়ার নোবেলবিজয়ী বাংলাদেশি ড. মুহম্মদ ইউনূসের গ্রামীণ ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের একজন।ওপেন সোসাইটি ইনস্টিটউটের প্রতিষ্ঠাতা জর্জ সোরস হচ্ছেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনের অ্যাডভাইসারি কমিটির সদস্য– আমেরিকা এবং ইউরোপ ও মধ্য এশিয়া।

কাকতালীয়ভাবে কি না আমরা জানি না, জর্জ সোরসেরই আরেকটি প্রতিষ্ঠান “সোরস ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট” গ্রামীণ টেলিকমকে ১০.৬ মিলিয়ন ডলার অর্থ প্রদান করে। গ্রামীণ ব্যাংকের দাতাগোষ্ঠীর মধ্যেও জর্জ সোরস ও তার প্রতিষ্ঠান ওপেন সোসাইটি ইনস্টিটউট অন্যতম এবং সোরস নিজেও মাইক্রো ক্রেডিট ও মাইক্রো ফিন্যান্সের একজন বিশাল প্রমোটার।/b>

জর্জ সোরস কতখানি ক্ষমতাধর তা বোঝানোর জন্যে বোধহয় একটি তথ্যই যথেষ্ট। সোরস হচ্ছেন পৃথিবীর প্রথম ২০ ধনীর একজন যিনি ক্লিনটন পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তার সোরস ফাউন্ডেশন ও ওপেন সোসাইটি ইনস্টিটউটের তরফ থেকে ক্লিনটন ফাউন্ডেশনকে প্রায় ছয় মিলিয়ন ডলার দান করেছেন তিনি শুধু ২০১২ সালেই।

অন্যদিকে ইউরোপভিত্তিক আরেকটি বিশাল দাতা সংস্থা হল সিগ্রিড রেয়্যুসিং ট্রাস্ট (Sigrid Rausing Trust)। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ১৯৯৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মোট ৯৪,১৮,৪০০ ডলার অনুদান পায় এই সংস্থাটির কাছ থেকে। সিগ্রিড রেয়্যুসিং (যার নামে সিগ্রিড রেয়্যুসিং ট্রাস্ট) নিজেই আবার ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড অব হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এমেরিটাস মেম্বার। মজার ব্যাপার হল সিগ্রিড রেয়্যুসিং ট্রাস্টের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে ‘বিশেষ সম্মানিত’ একজন হলেন কেনেথ রথ যিনি কিনা আবার ১৯৯৩ সাল থেকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর অর্থাৎ নির্বাহী পরিচালক!!!

সিগ্রিড রেয়্যুসিং ট্রাস্টের একজন ট্রাস্টি জশুয়া মেইলম্যান। এই মেইলম্যান কিন্তু হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একজন এমেরিটাস বোর্ড মেম্বার। জশুয়া মেইলম্যানের নাম এলে ড. ইউনূসের নাম একটু নিতেই হবে। কারণ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মেইলম্যান আর ড. ইউনূস অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। জশুয়া মেইলম্যান গ্রামীণ টেলিকমের সহপ্রতিষ্ঠাতা।
তার প্রতিষ্ঠিত অন্য সংস্থাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল টাইডস ফাউন্ডেশন, থ্রেশল্ড ফাউন্ডেশন ও মেইলম্যান ফাউন্ডেশন, সোস্যাল ভেঞ্চার নেটওয়ার্ক, যেগুলো থেকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নিয়মিত মোটা অঙ্কের অনুদান পায় এবং যার প্রায় প্রত্যেকটিই গ্রামীণ পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত।


ইদানিং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যে বিতর্কিত সাংবাদিক ব্যক্তিত্বের তথ্যসূত্র দিয়ে বাংলাদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে রিপোর্টগুলো করে, তিনি হলেন ডেভিড বার্গম্যান। প্রথমত ১৯৯৯ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত ডেভিড বার্গম্যান সেন্টার ফর কর্পোরেট অ্যাকাউন্টেবিলিটি (Centre for Corporate Accountability) বলে একটি সংগঠনের প্রধান ছিলেন। সংগঠনটি ২০০৫ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ পাউন্ড (প্রায় ২ কোটি টাকা) অনুদান পায় সিগ্রিড রেয়্যুসিং ট্রাস্ট থেকে।
এখানে আবার চলে আসে সেই ড. ইউনূসের নাম। ডেভিড বার্গম্যানের স্ত্রী সারা হোসেন এবং সে সঙ্গে ড. কামাল হোসেন অ্যান্ড এসোসিয়েটেস গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনূসের আইনজীবী। শুধু তাই-ই নয়, ড. কামাল হোসেনকে গ্রামীণ পরিবারের ‘বিশেষ’ বন্ধু হিসেবে ফ্রেন্ডস অব গ্রামীণ (Friends of Grameen)-এর তালিকায় অনারারি কমিটিতে (Honorary committee) উল্লেখ করা হয়েছে।


আবার আসা যাক অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ব্যাপারে। ২০০৬ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত এই তিন বছরেই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সাড়ে সাত লাখ পাউন্ড (১০ কোটি টাকা) অনুদান পায় সিগ্রিড রেয়্যুসিং ট্রাস্টের কাছ থেকে। সিগ্রিড রেয়্যুসিং নিজে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এমিরেটাস মেম্বারও।

অন্যদিকে জর্জ সোরস ও তার ওপেন সোসাইটি ইন্সটিউটের কাছ থেকেও নিয়মিতভাবে অনুদান পায় অ্যামনেস্টি। সিগ্রিড রেয়্যুসিং ট্রাস্ট আবার জর্জ সোরসের ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন সংস্থাকে আর্থিক অনুদান দেওয়ার পাশাপাশি অনেক প্রকল্পেই একে অপরের দাতা-সহযোগী হিসেবে কাজ করে।

২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে যখন অতিমাত্রায় গুম, খুন, আর সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়েছিল বাংলাদেশে। আর সে সময় কয়েকবার অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তদানীন্তন প্রধান আইরিন খান বাংলাদেশে ‘পারিবারিক’ সফরে এসেছিলেন। অথচ নিজের আপন চাচাতো বোনের শাশুড়ি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে ‘অফিসিয়াল’ মিটিং করে এ নিয়ে তাকে ‘শক্ত করে’ কিছু বলেননি।

বিমল কান্তি শীলসহ বাঁশখালির ভিকটিমদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করে তাদের হয়ে বিচার দাবি বা অন্যান্য বিচার-বহির্ভূত হত্যা বন্ধ বা তদানীন্তন বিরোধী দলীয় নেত্রীর উপর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ব্যাপারে সোচ্চার প্রতিবাদও করেননি আইরিন। শুধু তাই নয়, চাচাতো বোন যোবায়দা রহমানের স্বামী তারেক রহমান তখন ছিলেন ক্ষমতাসীন বিএনপির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট। বাংলাদেশ সফরের সময় তারেক রহমানের সঙ্গেও একটি ‘অফিসিয়াল’ সাক্ষাত করতে দেখা যায়নি আইরিন খানকে। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, আইরিন তখন তাদের সঙ্গে মিটিং না করলেও তারেক-যোবায়দা দেশছাড়ার পরপরই ‘অফিসিয়াল’ সফরে এসে ২০০১ থেকে ২০০৬-এ ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকারকে চাপ দেওয়া শুরু করলেন।

উপরের আলোচনাতে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ব্যাপারে খুবই ছোট্ট একটা চিত্র আমরা তুলে ধরলাম যাতে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন রকম আর্থিক ও আদর্শগত স্বার্থ দ্বারা প্রতিষ্ঠানগুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। (খুব সরলভাবে বললেও) এটা স্পষ্ট যে প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জড়িত মানুষরাও সমালোচনার উর্ধ্বে নন।

তাই আজকে আসলেই সময় এসেছে এটা ভেবে দেখার যে মানবাধিকার সংস্থা থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ সংক্রান্ত রিপোর্টগুলো কতটুকু নিরেপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি বা প্রেক্ষাপট থেকে লেখা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ যোগসূত্রগুলো হয়তো নিদেনপক্ষে ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।আর আমাদের ভাগ্য খুব খারাপ হলে, হতে পারে যে সূত্রগুলো সব আসলে একই সূতোয় গাঁথা!

যেটাই হোক না কেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে তাই আমরা অনুরোধ করব, বাংলাদেশের বাইরে থেকে প্রকাশিত হলেই বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার বরাত দিয়ে বললেই কোনো সংবাদ বা মন্তব্যকে ঢালাওভাবে স্বার্থহীন, নিরপেক্ষ বা স্বাধীন বলে রায় না দিয়ে দায়িত্বশীলতার খাতিরে আগে একটু যাচাই করে দেখুন, আসলেই তাতে কতটুকু পেশাদার ও নিরপেক্ষ মতামতের প্রতিফলন ঘটেছে।

একটি বিষয় সবসময় মনে রাখতে হবে, যে দেশের জন্ম মানবসভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ গণহত্যা দিয়ে, যে দেশের রাষ্ট্রভাষা জনসংখ্যার বিচারে গোটা বিশ্বে সপ্তম– সে দেশের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও অর্জনগুলোও কিন্তু কম আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়।

ড. আঞ্জুমান ইসলাম : পানি পরিশোধন ও পরিবেশ প্রকৌশলী। ওমর শেহাব : ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড, বাল্টিমোর কাউন্টিতে কম্পিউটার সায়েন্সে পিএইচ-ডি অধ্যয়নরত।
বিডিনিউজ

Monday, September 23, 2013

শেখ হাসিনা, প্রাইম মিনিস্টার অব বাংলাদেশ- ওয়ান অব দ্য মোস্ট পাওয়ারফুল উইমেন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড: স্যার ডেভিড ফ্রস্টের শেষ সাক্ষাৎকার


সমসাময়িক পরিস্থিতি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের অবদান, রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য তুলে ধরেছে কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল জাজিরা। শুক্রবার রাত দু'টায় খ্যাতিমান ব্রিটিশ সাংবাদিক স্যার ডেভিড ফ্রস্টের নেয়া এ সাক্ষাৎকারটি প্রচার করা হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সাক্ষাৎকারগ্রহণে অনন্য কীর্তিধারী কীর্তিমান এই সাংবাদিকের নেয়া কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের সর্বশেষ আলেখ্য ছিল এটি । বাংলাদেশের স্বাধীনতার নায়ক বঙ্গবন্ধু শীর্ষক তথ্যচিত্রের অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধুতনয়া শেখ হাসিনা ও দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারও নেন প্রখ্যাত এই সাংবাদিক। ১০ থেকে ১২ জুনের মধ্যে ধারণ করা এই সাক্ষাৎকারে উঠে আসে দেশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভাবনা, দেশের সমসাময়িক পরিস্থিতি, বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, নির্বাচন ও রাজনীতির নানা কথা।
তথ্যচিত্রে বঙ্গবন্ধুর কিছু দুর্লভ ফুটেজ স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে বিমান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর পা রাখার ফুটেজও আছে। ফ্রস্টই প্রথম বিদেশী সাংবাদিক, যিনি স্বাধীন বাংলাদেশের নেতা হিসেবে দেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধুর প্রথম সাক্ষাৎকার নেন। তথ্যচিত্রের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে ডেভিড ফ্রস্ট হাইকমিশনার ও তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েকবার বৈঠক করেছিলেন। দীর্ঘ ৪৭ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের এ তথ্যচিত্রের শুরুতেই বলা হয়, শেখ হাসিনা, প্রাইম মিনিস্টার অব বাংলাদেশ। ওয়ান অব দ্য মোস্ট পাওয়ারফুল উইমেন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ডেভিড ফ্রস্টের নাম। স্বাধীনতাযুদ্ধের পর পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎকার নেন তিনি। ওই সাক্ষাৎকারেই এদেশবাসীর ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দেন বঙ্গবন্ধু। সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হওয়ার বিষয়টি। সাক্ষাৎকার নিতে কখনও বঙ্গবন্ধুর অফিসে, কখনও তার বিখ্যাত সেই ছোট্ট নীল সরকারি গাড়িতে, কখনও ৩২ নম্বর বাড়ির শোয়ার ঘরে, বারান্দায় বা লনে গেছেন ফ্রস্ট। বঙ্গবন্ধুও ব্যস্ততার মধ্যে ডেভিড ফ্রস্টের সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। ওই সাক্ষাৎকারটি বিবিসিতে প্রচারিত হওয়ার পর পরই সারাবিশ্বে বাংলাদেশের ইমেজ নতুনভাবে সৃষ্টি হয়।
এবার বাংলাদেশের মাটিতে এসে প্রথমেই ব্রিটিশ এ প্রবীণ সাংবাদিক ছুটে যান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে। এ বাড়িতেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে স্বাধীনতার পরাজিত শত্র“দের হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন বঙ্গবন্ধু। সেখানে এখনও জাতির পিতার রক্তের দাগ লেগে আছে, বীভৎস হত্যাযজ্ঞের আলামতগুলো এখনও স্পষ্ট। ডেভিড ফ্রস্ট ঘুরে ঘুরে সেই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের আলামত প্রত্যক্ষ করেন এবং তার সঙ্গে থাকা আল জাজিরার প্রতিনিধিরা ডকুমেন্টারির জন্য প্রয়োজনীয় ফুটেজও সংগ্রহ করেন।
এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে হেলিকপ্টারযোগে টুঙ্গিপাড়ায় যান ডেভিড ফ্রস্ট। যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেখানে গিয়েই প্রধানমন্ত্রীর পর বঙ্গবন্ধুর মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি। এরপর বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত বাসভবনে প্রায় আড়াই ঘণ্টা অবস্থানকালে ব্রিটিশ এ সাংবাদিক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। শুক্রবার রাত দুটার দিকে আল জাজিরাতে প্রচারিত হয় এক ঘণ্টার এ সাক্ষাৎকার।

ডেভিড ফ্রস্ট : যুক্তরাজ্যের কেন্টে ১৯৩৯ সালের ৭ এপ্রিল জন্ম নেন ডেভিড ফ্রস্ট। দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে সাংবাদিকতা, টেলিভিশন উপস্থাপনা, রম্য লেখনীসহ বিভিন্নধর্মী কার্যক্রমে জড়িত ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন বিবিসিতে কাজ করার পর ২০০৬ সালে কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল জাজিরার জন্মলগ্নে এর সঙ্গে যুক্ত হন ফ্রস্ট। তিনিই একমাত্র টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, যিনি ১৯৬৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনরত আটজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। পাশাপাশি ১৯৬৯ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে দায়িত্বে থাকা সাত মার্কিন প্রেসিডেন্টেরও সাক্ষাৎকার নেয়ার অনন্য কীর্তি স্থাপন করেন তিনি। ৩১ আগস্ট চৌকস এই সাংবাদিকের মৃত্যু হয়।

সিরিয়ায় ‘যৌন জিহাদ’ করছেন তিউনিসিয়ার নারীরা!


তিউনিসিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লতিফ বেন জেদদৌ বলেছেন, তাঁর দেশ থেকে বহু নারী সিরিয়ায় পাড়ি জমিয়ে সেখানকার সরকারবিরোধী ইসলামপন্থীদের ‘জিহাদে’ যোগ দিয়েছেন। তবে ওই নারীরা অস্ত্র নিয়ে লড়াই চালাচ্ছেন না। ‘জিহাদ-আল নিকাহ’ হিসেবে পরিচিত যুদ্ধকালীন সাময়িক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তাঁরা মুজাহিদদের ‘উদ্দীপ্ত’ করে পরোক্ষভাবে ‘জিহাদ’ করছেন। ‘হাফিংটন পোস্ট’-এর এক প্রতিবেদনে এ খবর জানানো হয়েছে।
পার্লামেন্ট অধিবেশনে দেওয়া বক্তৃতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেন জেদদৌ বলেন, ‘তিউনিসিয়া থেকে সিরিয়ায় যাওয়া ওইসব নারী ২০, ৩০, ১০০ জনের সঙ্গে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হচ্ছেন। জিহাদ আল নিকাহর নামে অবাধ যৌনাচার শেষে গর্ভবর্তী হয়ে দেশে ফিরছেন।’ তবে সিরিয়ার জিহাদিদের ঔরসজাত সন্তান পেটে নিয়ে এ পর্যন্ত কতজন তিউনিসিয়ায় ফিরেছেন, সে ব্যাপারে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
সুন্নি সালাফিপন্থী কিছু আলেমের মতে, যুদ্ধকালীন সাময়িক বিবাহ বা ‘জিহাদ আল নিকাহ’ বৈধ। এই ধরনের ‘জিহাদি বিবাহ’তে কোনো মুসলিম নারী কোনো মুজাহিদকে বিয়ে করে তাঁর যৌনসঙ্গী হতে পারেন। আবার দ্রুতই তাঁরা বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন। এই ধরনের সাময়িক বিয়ের মাধ্যমে একজন নারী এক দিনে একাধিক পুরুষের শয্যাসঙ্গী হতে পারেন। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে বিদ্রোহীদের দলে যোগ দিতে তিউনিশিয়ার বিপুলসংখ্যক তরুণ এখন সীমান্ত পাড়ি দিতে চান। এমন ছয় হাজার তরুণকে গত মার্চে আটকানো গেছে বলে জানান তিউনিশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মিডিয়ার খবর থেকে জানা যায়, গত ১৫ বছরে তিউনিশিয়ার কমপক্ষে এক হাজার তরুণ জিহাদিদের দলে যোগ দিয়েছেন। তাঁরা আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ায় গেছেন। মূলত তাঁরা তুরস্ক ও লিবিয়া হয়ে ওই দেশগুলোতে গিয়ে জিহাদিদের সঙ্গে ভিড়েছেন।

Friday, September 20, 2013

আমার বাবা কর্নেল তাহের : জয়া তাহের


আমাকে যখনই কেউ জিজ্ঞাসা করেন, কর্নেল তাহেরের মেয়ে হিসেবে আপনার অনুভূতি কি? আমার চোখের সামনে এক নিমেষেই ভেসে ওঠে ৪০ বছরের অসংখ্য স্মৃতি। আমি অপ্রস্তুত হয়ে যাই। কিছুই আর বলা হয়ে ওঠে না। এ অনুভূতি এক লাইনে বলবার নয়।

আমি ফিরে যাই, আমাদের সেই নারায়ণগঞ্জের বাসায়। শীতলক্ষ্যা নদীর পাশে বড় দোতলা বাড়ি। দোতলায় নদীর দিকে মুখ করে ছিলো পাশাপাশি দু’টি রুম। একটিতে আম্মা যিশু ও মিশুকে (আমার দুভাই) নিয়ে ঘুমাতেন। আর আরেকটিতে আমি বাবার সঙ্গে ঘুমাতাম। আমি সকাল বেলা ঘুম ভেঙ্গেই দেখতে পেতাম, নীল আকাশ।

ঘর থেকে বের হলেই ছিল ঝুলন্ত বারান্দা। বাবা গাড়িতে করে এলেই আমি দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতাম।
সময়টা ছিল ১৯৭৪ সাল। আমি তখন ছিলাম ৪ বছরের। যিশু ২ বছর ও মিশু ৯ মাস।

মাঝে মাঝে রাতের বেলা বাবা-মা বাড়ির লনে ঘুরে বেড়াতেন। আর আমি তাদের পাশে পাশে ঘুরতাম। নিচতলায় ছিলো বসার ঘর আর ডাইনিং রুম। বসার রুমে ছিল সারি সারি বই। ঢাকার এলিফ্যান্ট রোড থেকে আমার ইউসুফ চাচা তার ছেলে শ্রাবণকে নিয়ে বেড়াতে আসতেন। বাবা একপা নিয়েই দৌড়ে আমাদের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন।

একদিন খাবার টেবিলে বাবা বললেন, ‘দেখো তো তোমার জন্য নিচে কি অপেক্ষা করছে?’ আমি খাবার টেবিলের নিচে হামাগুড়ি দিয়ে দেখি, একটা বিড়াল। বিড়ালটা বহুদিন আমার সঙ্গে ছিলো। আমরা প্রায়ই ঢাকায় যেতাম। আমি প্রতিবার গাড়িতে বমি করতে করতে ফেরত আসতাম। বাবা বলতেন, ‘কবে যে আমার মেয়েটা ঠিক হবে........’

বাসার পাশেই ছিল বড় পাট গুদাম। যেখানে বানর থাকতো। বানররা কলা খেতে প্রায়ই আমাদের বাগানে চলে আসতো। আমাদের বাসায় কাজ করতো মনিকা নামের একজন মেয়ে। আমাকে একা পেলেই খুব সাজাতো। আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ছিলো তখন।

তারপর হঠাৎ একদিন বাবা বাসায় আসা বন্ধ করলেন। তার কিছুদিন পরই এক জিপ ভর্তি মানুষ রাইফেলের ফাঁকা আওয়াজ করতে করতে বাড়ির চারপাশে টহল দিতে শুরু করে। তারও কিছুদিন পর আমাদেরকে বাসা ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আম্মা একটা স্যুটকেসে আমাদের সবকিছু নিয়ে কিশোরগঞ্জে নানার বাসায় চলে আসেন।

সবার কাছ থেকে জানতে পারি, বাবা জেলে। তারও অনেক মাস পরে হঠাৎ করে আমাদেরকে জেলখানায় বাবার সঙ্গে দেখা করতে বলা হলো। আম্মা যিশু আর আমাকে নিয়ে ঢাকায় এলেন। মিশু খুব ছোট বলে নানুর কাছে রয়ে গেল। জেলখানার বাইরে দাঁড়িয়ে আমার খুব লজ্জা করছিলো বাবার সঙ্গে দেখা করতে। বাবা আমাকে আর যিশুকে কলা খেতে দিয়েছিলেন। বাবার সঙ্গে সেই আমার শেষ দেখা।

১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই ভোর রাতে বাবার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। আমাদের একটা হেলিকপ্টার দিয়ে পাঠানো হয় আমাদের গ্র্রামের বাড়ি কাজলায়। সংগে ছিলো দাদুমনি, জলি ফুফু, আম্মা, আম্মার কোলে যিশু, ছোট মামা, বড় চাচা, চাচী। যে কাপড় দিয়ে বাবাকে ঢাকা ছিলো তা পুরোপুরি বাবার শরীর ঢাকতে পারছিল না। চুল আর পা বেরিয়ে ছিলো। আমি হেলিকপ্টারের জানালা দিয়ে ছোট হতে যাওয়া মানুষগুলোকে দেখছিলাম। সেই আমার প্রথম হেলিকপ্টারে চড়া।

কাজলায় স্কুল মাঠে বাবাকে নামানো হয়। আমরা অপেক্ষা করি আমাদের আরেক মুইনুদ্দিন দাদার শ্যামগঞ্জের বাসায়। দুপুর বেলা বাবাকে গোসল করানোর পর ছোট মামা কাঁদতে কাঁদতে আমাকে উঁচু করে বাবার মুখ দেখান। আমি দেখতে পাই শান্ত একটা মুখ। আমার তারপরও বিশ্বাস হয়নি, বাবা মারা গেছেন। কল্পনা করেছি কতবার, বোধহয় ওটা সাজানো কোনো ডামি ছিলো। বাবাকে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি হয়তোবা কোথাও হাঁটছি, আমাকে পেছন থেকে চমকে দিয়ে ফিরে আসবেন বাবা।

সেই কাজলায় রয়ে গেলাম আমরা একমাস। প্রতিদিন আমরা কবরে যেতাম। কবরের পাশে ঘাঁটি গেড়ে ছিল একদল সশস্ত্র পুলিশ। তারা কবরটা একমাস ধরে পাহারা দিয়েছিলেন। আজ ভাবলেও তা হাসি পায়।

সেখান থেকে আমরা চলে আসি কিশোরগঞ্জে। নানা ছিলেন কিশোরগঞ্জের নামকরা ডাক্তার। তার কিছুদিন পরে আমরা ঢাকায় আসি। উঠি মোহাম্মদপুরে বড় চাচার বাসায়। আম্মা চাকরিতে যোগ দেন। তার কয়েক মাস পরে মোহাম্মদপুরে একটি সরকারি কোয়ার্টার পান আম্মা। দুই রুমের একটি ড্যাম্প পরা বাসাটার আশেপাশে ছিল বস্তি। যার থেকে অনবরত ভাবে ভেসে আসতো গালিগালাজ। আম্মা প্রতিদিন হেঁটে গিয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করতেন।

আমাকে ভর্তি করানো হয় কাছের একটি স্কুলে। মিশু রয়ে যায় নানুর কাছে। আরও পরে যিশুকে পাঠানো হয় হোস্টেলে। আমাদের একটি সাজানো সংসার যেন এক নিমিষেই এক কালবৈশাখী ঝড়ে ভেঙে খান খান হয়ে যায়।

যিশু যেদিন প্রথম হোস্টেলে যায়, আম্মা কেঁদেছিলেন আকুল হয়ে। জলি ফুফু ও ডলি ফুফু তাদের স্কলারশিপের সামান্য কিছু টাকা দিয়ে নিয়ে এসেছিলেন যিশুর জন্য নতুন জামা, জুতা। যিশুর পড়াশোনার দায়িত্বভার নিয়েছিলেন আমার লন্ডনে বসবাসরত বড় মামা। আমাদের পুরো পরিবারের কারোরই তেমন কোনো টাকা-পয়সা ছিল না। কিন্তু এক বিশাল বন্ধনে আমরা ছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকারাবদ্ধ।

প্রতি বছর আমরা যখন কিশোরগঞ্জে যেতাম, আম্মা মিশুকে নিয়ে শুতে চাইতেন। আস্তে আস্তে বলতেন, আমাকে মা বলো, মিশু কিছুতেই বলতো না। মিশু তখন নানুকে মা ভাবতো। তারপর বছর গড়িয়ে মিশুও আমাদের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসে, যখন তার বয়স ৫ বছর। আম্মার সামান্য বেতনটুকুই ছিল আমাদের একমাত্র সম্বল।

ওই সময় জাসদের অধিকাংশ নেতাকর্মীসহ আমাদের সব চাচারা জেলে ছিলেন। আমাদের বাসার সামনে একটা সাদা গাড়ি সারাদিন বসে থাকতো। পরে জেনেছি, তারা ছিলেন স্পাই। আমাদের সব গতিবিধি লক্ষ্য করতেন। আমাদের বাসায় কেউ আসতে পারতেন না। যারা আসতেন তারাও লুকিয়ে আসতেন।

আমরা জেলখানায় ইউসুফ চাচা, বেলাল চাচা, মনু চাচা ও অন্যান্য নেতাকর্মীদের দেখতে যেতাম। আমি প্রতিবার মন খারাপ করে যেতাম। মনে হতো, যদি বাবা থাকতেন। হতোই বা সারা জীবন জেলে, তাওতো দেখা হতো। আমার তখন বোঝার যথেষ্ট বয়স হয়েছে।

১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর চাচারা ও অন্যান্য নেতাকর্মীরা জেল থেকে ছাড়া পেতে শুরু করেন। জাসদ তখন বিরাট এক শক্তি। আমাদের ছোট বাড়িটায় মানুষ গম গম করতো। কত ধরনের মানুষ যে আসতো তখন। তাদের সবার স্বপ্ন ছিলো একই। এক সুস্থ সমাজ ব্যবস্থা যেখানে সবার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। আমার খুব বেশি ভাল লাগতো তাদেরকে। তারা যে স্বপ্নের কথা বলতেন, তা আমি মনোমুগ্ধের মতন শুনতাম। তারা বেশির ভাগ ছিলেন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট- বুয়েট, মেডিকেল বা ইউনির্ভাসিটির ছাত্র-ছাত্রী। তারা ছিলেন টগবগে সাহসী কিছু তরুণ-তরুণ । সে সময় তাদেরকে একটি শুকনো বিস্কিট আর চা ছাড়া আমাদের দেবার আর কিছুই ছিল না।
আমার খুব বেশি মায়া লাগতো। আম্মার কাছে শুনতাম, তাদের বেশির ভাগই অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলেমেয়ে। একটা নষ্ট সমাজ বদলে দেবার স্বপ্নে তারা সকল কিছু ছেড়ে এসেছিলেন। হাজারো মানুষের মশাল মিছিল হতো তখন।

বেলাল চাচা আমাদের শিখিয়ে ছিলো একটা গান-
‘বন্ধু, বলতে পারো, সামনের পৃথিবীটা কার
শ্রমিক না মজুর, না সর্বহারার
আজকে এসেছে দিন একভাবে
আসবে আবার দিন নতুন করে
সেদিন আবার নতুন করে বিচার হবে
বন্ধু..................’

নিশ্চয় বেলাল চাচার কোনো অবসরে মনে পড়বে সেসব কথা। আমরা কাজলায় রাতের বেলায় আগুনের পাশে গোল হয়ে বসে সুর করে সেই গান গাইতাম।

মনে হয় এইতো সেদিন, রমনার বটমূলে নেমেছিলো হাজারো মানুষের ঢল। আমরা পৌঁছা মাত্র মেজর জলিলচাচা মঞ্চ থেকে ফুল নিয়ে আমার হাতে দিলেন। ‘কর্ণেল তাহের লাল সালাম’ এর প্রতিধ্বনিতে আকাশ বাতাস প্রলম্বিত হয়ে উঠত যেন। আমি সেদিন তাদের প্রত্যেকের চোখের তারায় দেখেছিলাম কর্নেল তাহেরকে।

তারপর কি হলো! যেসব নেতা একদিন স্ত্রী, সন্তান, বাবা, মা, ভাই, বোন কারো কথা চিন্তা না করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এক নতুন সমাজ গঠনের দায়িত্বে, তাদের অনেকেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, ক্ষমতা, লোভ, লালসার কাছে বিক্রি হতে থাকলেন! আন্দোলন পড়লো মুখ থুবড়ে। যে নেতারা একদিন মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তাদের অনেকেই মাঝপথে যেন সেটাই ভুলে গেলেন!

আর শত শত কর্মী যারা বিশ্বাস করেছিলেন, তাদের নেতাদের কথা- তাদের কেউ কেউ হতাশার গভীরে নিমজ্জিত হয়ে অন্ধকার জগতে চলে গেলেন। কেউ কেউ পাড়ি জমালেন বিদেশে। কেউ কেউ, নীতি আদর্শ বিসর্জন দিয়ে সেই নেতাদেরই তোষামোদ করে টিকে থাকার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন। কেউ কেউ ভাঙ্গা মন নিয়ে আবারো ঘরে ফিরে গেলেন।

তাদের সেই ভাঙ্গা মন আর কোনো দিন জোড়া লাগেনি। আর দুই একজনকে আমি হঠাৎ হঠাৎ দেখি- তাদের চশমা হয়েছে ভারি, চুলে পাক ধরেছে। তারা মানাতে পারেননি কোনো কিছুর সঙ্গেই। বড় একা.......

যে কর্নেল তাহের মৃত্যুর আগে তার শেষ চিঠিতে লিখে গেছেন, ছোট ছোট উলঙ্গ শিশুদের নিরাপদ বাসস্থানের কথা, তাদের জীবনেও কোনো পরিবর্তন আসেনি। ছোট ছোট শিশুরা আজও রাস্তায়।

আর আমি- বহু বছর এক তীব্র রাগ, হতাশা, ঘৃণা বুকে পুষে ছিলাম। আম্মা যখন দেশ বদলের আশার কথা বলতেন, তাকে তীব্র অপমানে বিদ্ধ করতে আমার এক বিন্দু বাঁধতো না। পালিয়েছি আমি সকল কিছু থেকে। রাজনৈতিক খবরে আমার ছিল উদাসীনতা। হঠাৎ করে কি ভেবে যেন কর্নেল তাহের সংসদের নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করি। আসা শুরু হয় শত শত চিঠি। প্রতিদিন.......

অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, চিঠির লেখকদের বেশিরভাগই এই প্রজন্মের তরুণ-তরুণী। তারা জানতে চান কর্নেল তাহেরকে। তারা সচেতন বুদ্ধিমান বলিষ্ঠ নাগরিক। তাদেরকে মিথ্যা দিয়ে ভোলানো এতো সহজ নয়। নেতা চিনতে তাদের কোনো ভুল হয় না।

সেদিন রমনার বটমূলে হাজারো মানুষের ঢলে আমি কর্নেল তাহেরের মুখ দেখেছিলাম। আমি আজ আর কর্নেল তাহেরকে তাদের মাঝে দেখতে পাই না। কর্নেল তাহের তাদের ছেড়ে চলে গেছেন বহু আগে। ছড়িয়ে গেছে গোটা দেশময়।

আজো তাই নতুন যুগের তরুণেরা মনে করেন, বলিভিয়ার চে’ গুয়েভারা যেন বাংলাদেশের কর্ণেল তাহের। তাদের বুকে দেখি, কর্নেল তাহেরের সম্বলিত টি-শার্ট। তারা জেনে গেছেন, বাংলার ইতিহাসে ক্ষুদিরাম-সূর্য সেনের মতো কর্নেল তাহেরও কোনো অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করেননি। তাদের বুকে গেঁথে গেছে তাহেরের শেষ চিঠির কয়েকটি শব্দ-

‘নিঃশঙ্ক চিত্তের চেয়ে জীবনে আর বড় কোনো সম্পদ নেই’
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম