Saturday, June 22, 2013

PEW জরীপ - বাংলাদেশের শরিয়াকরণ - ১০নং মহাবিপদ সংকেত?- হাসান মাহমুদ


কোনো জরীপই এবসলিউট নয়, কিন্তু নিরপেক্ষ,বস্তুনিষ্ঠ ও একাডেমিক হিসেবে PEW-এর খ্যাতি আছে। গত সপ্তাহে PEW একটা জরীপ প্রকাশ করেছে, নাম The World’s Muslims: Religion, Politics andSociety (বিশ্বমুসলিম - ধর্ম, রাজনীতি ও সমাজ)।
এ জরীপের ওপর কিছু প্রশ্ন পাঠিয়েছি ওদেরকে, এলে সবাইকে জনাব। এতে বাংলাদেশও আছে, আমি প্রধান ৫টি প্রশ্নোত্তর দেখাচ্ছি:-

**প্রথম ৩টি জরীপ সাধারণ মুসলিমের মধ্যে:-

১.শারিয়া আইন হল আল্লাহ'র নাজিলকৃত আয়াত -সর্বোচ্চ - জর্ডন ৮১%, সর্বনিম্ন - আলবেনিয়া ২৪%, বাংলাদেশ ৬৫%, পাকিস্তান ৮১%

২.শারিয়া আইন একটাই, বিভিন্ন নয় বলে মনে করেন - সর্বোচ্চ - তাজিকিস্তান ৭০%, সর্বনিম্ন– তিউনিশিয়া ২০%, বাংলাদেশ ৫৭%, পাকিস্তান ৬১%

৩.নিজের দেশে শারিয়া আইন চান - সর্বোচ্চ - আফগানিস্তান ৯৯%, সর্বনিম্ন আজারবাইজান ০৮%, বাংলাদেশ ৮২%, পাকিস্তান ৮৪%

**পরের জরীপগুলো শুধুমাত্র শারিয়া সমর্থকদের মধ্যে:-

৪. ব্যাভিচারীকে প্রস্তরাঘাতে মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করেন - সর্বোচ্চ- পাকিস্তান ৮৯%, সর্বনিম্ন- বসনিয়া ২১%
বাংলাদেশ ৫৫%
৫. মুরতাদ অর্থাৎ ইসলাম-ত্যাগীদের মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করেন - সর্বোচ্চ - আফগানিস্তান ৭৯%, সর্বনিম্ন - কাজাখস্তান ০৪%, বাংলাদেশ ৪৪%, পাকিস্তান ৭৬%
অনেকে বলবেন - "যা: বাংলাদেশ হবে শরিয়া রাষ্ট্র!! উন্মাদের প্রলাপ !!" একথা আমাকে ১৯৭৫ সালের দিকে বলেছিল পাকিস্তানীরা ও ইরানীরাও, আবুধাবীতে। পরে যখন গঠনতান্ত্রিকভাবে ওগুলো শারিয়া-দেশ হয়ে গেল ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে, ওরা শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকেছে আর এখন মোল্লাতন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসার প্রাণান্ত চেষ্টায় রক্ত ঢেলে চলেছে। তাই ভুল যদি করতেই হয় চলুন আমরা দড়িকে সাপ মনে করার ভুল করি, সাপকে দড়ি ভাবার মত ব্লান্ডার না করি। আমাদের শরিয়া-করণ হচ্ছে রাজনীতি নিরপেক্ষ পদ্ধতিতে যা ওদের চেয় ভিন্ন। অর্থাৎ শারিয়া-পন্থীরা ক্ষমতায় থাকুক বা না থাকুক গত বহু বছর ধরে এই প্রক্রিয়ায় দেশ শারিয়ার দিকে এগিয়ে গেছে। আমরা পছন্দ করি বা না করি এর প্রচণ্ড প্রভাব এর মধ্যেই আমরা দেখছি। ক্রমাগত দুর্বল সরকারের ওক্রমবর্ধমান দুর্র্নীতির সুযোগে ধীরে ধীরে তাঁদের প্রস্তাবিত "ইসলামী" সমাধান জনগনের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। শারিয়া সম্বন্ধে জনগণ কিছু জানেই না। তবু বহু লোক শারিয়ার রক্ষাকর্তা হয়ে গেছেন, তাঁদের অনেকেই আবার জামাত-বিরোধীও।

ছোটবেলায় দেখেছি রোজার মধ্যে হোটেলগুলো চাদর দিয়ে ঢাকা থাকত। অমুসলিমেরা তো বটেই কোন কোন মুসলমানও বাইরে খেত তাতে আকাশ ভেঙ্গে পড়ত না। এখন বাইরে কাউকে খেতে দেখলে সাধারণ মানুষের একাংশ হিংস্র হয়ে ওঠে। আমার এক বন্ধু বাসে করে যাচ্ছিল, সে দেখল গাড়িতে ভ্যাপসা গরমের দুপুরে এক যাত্রী পানি খেয়েছে বলে বাসের ড্রাইভার বাস থামিয়ে তাকে অপমান করে পথের মধ্যে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল।
নানা-নানীর কোলে মানুষ, এখন ঢাকায় বসবাসকারী একজনের কন্যার প্রথম আকিকা-উৎসবের সাতদিন আগে গ্রামের বাড়ীতে নানা মারা গেলে সাধারণ মানুষ এসে দাবী করেছে শারিয়া মোতাবেক নানী চার মাস ঘরে থাকবে, নিজের নাতির বাসা হলেও ঢাকায় যেতে পারবে না।
পঙ্গু হয়ে কয়েক বছর শয্যাগত একজনের মৃত্যু হলে সাধারণ মানুষ দাবী করেছে কাফফারা না দিলে তাঁর জানাজা হবে না কারণ তিনি এত বছর নামাজ পড়েন নি।
কোনো এক কলেজের শিক্ষক ছাত্রীদের বোরখা পড়তে বাধ্য করলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও হাইকোর্টকে এগিয়ে আসতে হয়,শিক্ষা মন্ত্রণালয় কঠোর নির্দেশ দিয়ে বলেছে,কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাউকে বোরকা পরতে বাধ্য করা যাবে না - জনকন্ঠ ২৬শ আগস্ট ২০১২।
রংপুরে এক এস-আই ১৯জন মেয়েকে থানায় ধরে নিয়ে আসে বোরখানা পড়ে পার্কে গিয়েছিল বলে। সেখানেও কোর্টকে এগিয়ে এসে সেই পুলিশকে তলব করে ও এ ধরণের অপকর্মকে নিষিদ্ধ করে - জনকন্ঠ ০৩ মার্চ ২০১০।
এরকম অজস্র উদাহরণ প্রমাণ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে শারিয়া আইন মেনে চলার উগ্র প্রবণতা ধীরে ধীরে বেড়ে যাচ্ছে। কি কি পদ্ধতিতে এটা হচ্ছে সেদিকে এবার তাকানো যাক।
অসংখ্য মওলানা-মুফতি-মোল্লা নিয়ে দেশজুড়ে যে অনিয়ন্ত্রিত আলেম-সমাজ গড়ে উঠছে তাঁদের প্রায় সবাই নারী-নীতির বিরোধী। এঁদের যোগ্যতার কোন দৃশ্যমান মাপকাঠি নেই, জাতির বা সরকারের কাছে জবাবদিহিতাও নেই। এঁদের বেশীরভাগই আধুনিক রাষ্ট্রপরিচালনার কিছুই জানেন না কিন্তু অবলীলায় বিশ্বের তাবৎ সমস্যার সমাধান পেশ করে থাকেন।
দেশে শরিয়াপন্থীদের শত শত একাগ্র, কর্মতৎপর ও ধনী সংগঠন জাতির চোখের সামনে ধরে রেখেছে শুধুমাত্র ওদেরই ইসলামি-ব্যাখ্যা। ওদের বিপক্ষে সুফী ইসলামী ধর্মতত্বের বইগুলো প্রচার প্রসারের সংগঠন নেই বললেই চলে।
ওদের আছে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান মসজিদ, প্রতি শুক্রবারে জনতাকে প্রভাবিত করার সুযোগ যা তারা পুরোটাই নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও নেবে।
আলিয়া,কওমি,ফোরকানিয়া,হাফিজিয়া ইত্যাদি মাদ্রাসার সংখ্যা হবে কমপক্ষে তিন লাখ–(জনকন্ঠ ১৫ মে ২০১৩ - মুনতাসীর মামুন)।
প্রতি বছর এরা সমাজে ঢেলে দিচ্ছে লক্ষ লক্ষ শরিয়া-সমর্থক যারা উবে যায় না, সরকারী চাকুরী ও সামরিক বাহিনী সহ সমাজের প্রতি স্তরে তাদের প্রভাব খাটাতে থাকে। প্রাথমিক পরীক্ষায় পাশ করার জন্য তাদের বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় বলে খবর উঠেছে। ক’বছরে এ সংখ্যা যা দাঁড়াবে তার প্রভাব জাতি এড়িয়ে যেতে পারবে না।
মধ্যপ্রাচ্যে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশী দেশে বানিয়েছেন অসংখ্য মাদ্রাসা। মাদ্রাসা আসলে শারিয়াপন্থীদের সংখ্যা বাড়ানো ছাড়া আর কিছুই নয়। সে পরিকল্পনা এখন বেশ সফল, এক নিমেষে বহু হাজার যুদ্ধংদেহী তরুণকে রাস্তায় নামানোর প্রচণ্ড ষ্ট্রীট পাওয়ারের অধিকারী ওরা। গত ৫ই এপ্রিল ২০১৩ ঢাকাত শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের লক্ষ লোকের সমাবেশ তার প্রমাণ। এ বাহিনী আগামীতে অনেক বাড়বে এবং সর্বত্র এর চাপ অনুভুত হবে। এ চাপ ঠেকানোর পদ্ধতি এখনও বাংলাদেশে অনুপস্থিত।
ওদের আছে নিজস্ব দলীয় পত্রিকা এবং সেগুলোতে ইসলামের নামে গোয়েবল্‌সীয় পদ্ধতিতে প্রচারিত হচ্ছে শারিয়া-প্রচার। পক্ষান্তরে ইসলামি দলিলের ভিত্তিতে ওদের প্রচারণার ভিত্তিহীনতা, কোরাণ-বিরোধীতা, ইসলাম-বিরোধীতা ও অসততাকে তুলে ধরার তেমন কোন পত্রিকা নেই। চেষ্টা করে দেখা গেছে অনেক সেকুলার পত্রিকাও এসব দলিল জাতির সামনে তুলে ধরতে ভয় পায়।
এটাও শারিয়াপন্থীদের আর একটা বিরাট সাফল্য।এরা জনগণ, সরকার, মিডিয়া, টিভি-রেডিয়ো-সংবাদপত্র প্রকাশনা সহ সারা জাতিকে ভয় পাওয়াতে সক্ষম হয়েছে। এটা আরো বাড়বে বৈ কমবে না।
২০০৬ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারী ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনষ্টিটিউট-এ জামাত ঘোষণা দিয়েছে দেশ জুড়ে মহাশারিয়া কোর্টের জটাজাল বানানো হবে। গ্রাম উপজেলার নিয়ন্ত্রনে, উপজেলা জেলার নিয়ন্ত্রনে, এভাবে আটষট্টি হাজার শারিয়া-কোর্টের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকবে ঢাকার বায়তুল মোকাররমের খতিবের হাতে। অর্থাৎ আটষট্টি হাজার শারিয়া-কোর্টের জালে মাছের মত আটকে যাবে দেশের ভবিষ্যৎ।
সমান্তরাল বিচার ব্যবস্থা রাষ্ট্রদ্রোহীতার পর্যায়ে পড়ে কিন্তু সম্ভবতঃ এর নাম দেয়া হবে ইসলাম পরামর্শ ব্যবস্থা, মানুষ ইচ্ছে হলে নিক ইচ্ছে না হলে না নিক্‌! ওদিকে টহল দিয়ে বেড়াবে বেসরকারী শারিয়া-পুলিশ, ‘‘স্বেচ্ছাসেবক’’ নাম নিয়ে। গালগল্প নয়, অন্যান্য শারিয়া-দেশে নামাজ-রোজা-দাঁড়ী-বোরখা নিয়ে ভয়াবহ দোজখ সৃষ্টি করেছে এই হিংস্র শারিয়া-বাহিনী। কেউ শারিয়া কোর্টে না গিয়ে দেশের কোর্টে গেলেই ছুটে আসবে মুরতাদ-ফতোয়ার চাবুক। স্বাধীন-চিন্তা ও ভিন্নমতের ওপরে নেমে আসবে ব্ল্যাসফেমি আইনের খড়্গ, জনগণের সাধ্য হবেনা তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। বন্ধু তো দুরের কথা ভাই ভাইয়ের কাছেও মন খুলে কথা বলতে ভয় পাবে মানুষ। গল্প নয়, এরকম হয়েছে অন্যান্য দেশে।
এর মধ্যেই বিভিন্ন ব্যাপারে সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বায়তুল মুকাররমে গিয়ে গুরুত্বপুর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যা তাঁরা ইমাম-খতিবদের ডেকে সেক্রেটারিয়েটেই নিতে পারতেন। এভাবে সুযোগ দিতে থাকলে ইরাণের শুরায়ে নিগাহ্‌বান-এর মত বায়তুল মুকাররমকে ছায়া-সংসদ করে তোলা হবে, সরকার সেটা ঠেকাতে চাইবে না, চাইলেও পারবে না।
আমাদের বুদ্ধিজীবি ও সুশীল সমাজও সুশীল বালকের মত ইসলামকে ব্যাখ্যা অধিকার ওদের হাতে ছেড়ে দিয়ে বসে আছেন। তাঁরা বিশ হাজার পৃষ্ঠার বই পড়ে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-অর্থনীতিবিদ হবেন কিন্তু দশ হাজার পৃষ্ঠার ইসলামি দলিল পড়ার সময় নেই। তাঁরা ভোগেন ভয়ংকর অহংরোগ, গর্ব, একগুঁয়েমী, ‘‘একলা চলো’’ নীতি ও সাংগঠনিক ব্যর্থতায়। টাকার জোর বা আন্তর্জাতিক সমন্নয়ও তাঁদের নেই।
ইসলামী টিভি চ্যানেল তো আছেই, অন্যান্য প্রায় প্রতিটি টিভি চ্যানেলে এক একেকটা করে ইসলামী প্রোগ্রাম চলে, প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রে ইসলামী অংশ থাকে। এদের প্রত্যেকটিই শারিয়া-পন্থী। তাঁরা কোরানের অপব্যাখ্যা করে ও নারী-বিরোধী হাদিসগুলো উদ্ধৃতি দিয়ে নারী-বিরোধী শরিয়া আইনগুলোকে ইসলামের নামে বৈধতা দেন। গ্রাম গঞ্জের অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত জনগনের ওপরে এসবের প্রভাব প্রচণ্ড ।
আ-লীগ সরকারী ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবে - দৈনিক ইনকিলাব ২০শে আগষ্ট ২০১১)।
যে বাংলাদেশে একটা বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় নেই, যে বাংলাদেশে কয়েকটা বেসরকারী ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, প্রতিষ্ঠিত ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শারিয়াবাজদের নিয়ন্ত্রনে, সেগুলোতে আমাদের সুফি ইসলামকে পরাজিত করে নির্ভেজাল মওদুদিবাদ পড়ানো হয়। সরকারী ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়টাও ওদের হাতেই যাবে। অজস্র মাদ্রাসার সাথে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়টাও পরের প্রজন্মের একটা বড় অংশকে পথভ্রষ্ট করবে যারা সমাজে প্রবেশ করবে ও সমাজকে প্রবলভাবে প্রভাবাম্বিত করবে।
হাইকোর্টে ফতোয়ার বিরুদ্ধে রায় বাতিল করে সুপ্রীম কোর্টের রায় - ফতোয়া বৈধ, "শুধুমাত্র বিজ্ঞ মুফতিরাই ফতোয়া দিতে পারবেন" ইনকিলাব ১৪ মে ২০১১।
এটা যে জাতির বিরুদ্ধে কতবড় বিশ্বাসঘাতকতা তা সময়ই বলবে। "বিজ্ঞ মুফতি" কাকে বলে সেটা কে ঠিক করবে?
আলেমরা নাকি "সরাসরি আল্লাহ'র দ্বারা সরাসরি ফতোয়া দিবার অধিকার প্রাপ্ত" (ইনকিলাব ২০শে আগষ্ট ২০১১)।"আলেম" কাহাকে বলে সেটাই ঠিক করা গেলনা গত ১৪০০ বছরে, - লাখো "আলেম"রা পরস্পরের সাথে শুধু গালাগালি হানাহানি কামড়া-কামড়ি করে বিশ্ব-মুসলিমকে শুধু বিভক্তই করেন নি বরং অজস্র হত্যা গণহত্যা ঘটিয়েছেন ওই ফতোয়ার অস্ত্রে, এসব জাতিকে জানানো দরকার।
ওই রায়ে বসতে পারার প্রথম সুযোগেই শোবার দাবী এসেছে ন্যাশন্যাল ফতোয়া বোর্ড গঠনের।
বায়তুল মুকাররমের খতিবকে প্রধান বিচারপতির সাংগঠনিক মর্যাদা দিতে হবে এ দাবী বহু আগে থেকেই ছিল।
সব মিলিয়ে আমরা দেখছি সরকারে থাকলে তো কথাই নেই, না থাকলেও বা আংশিকভাবে থাকলেও তাঁরা গ্রাম গঞ্জে এক অদৃশ্য "ইসলামী সরকার" চালাবার কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। উনাদের দাবীতে অনেক কিছুই আছে, নেই শুধু নারীর কন্ঠ। গত ১৪০০ বছরে একজনও নারী শরিয়া-ইমাম নেই, নারীর ইচ্ছে অনিচ্ছের প্রতিফলন নেই, নেই নারীর জীবনে এসব আইনের প্রভাবের ওপর কোনো সমীক্ষা। হাতীর দুই দাঁত - একপাটি দেখা যায় যা তাকে সুন্দর করে তোলে। আর একপাটি দাঁত আছে লুকোনো, চিবিয়ে হাড় ভাঙ্গার জন্য। শারিয়াপন্থীদেরও ঠিক তাই;চোখের সামনে ধরা আছে মুখমিষ্টি "মায়ের পায়ের নীচে বেহেশত" আর লুকোনো আছে ভয়াবহ নারী বিরোধী আইন। জাতির সুশীল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সমাজের এখনই উচিত নারীনীতি কেন ইসলাম-সমর্থিত, এর বিরোধীতা কেন ইসলাম-বিরোধী, অন্যান্য মুসলিম দেশে মওলানাদের সমর্থনে কি ইসলামি পদ্ধতিতে সাংবিধানিকভাবে নারীনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সে ব্যাপারে কিছু পড়াশুনা করা এবং বিভিন্ন মাধ্যমে তা জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া।
কিছুটা দেরী হয়েছে কিন্তু এটা এখনও সম্ভব এবং এর বিকল্প নেই।

হাসান মাহমুদ
১৫ই মে, ৪৩ মুক্তিসন (২০১৩)

অত্যাচার করে শিবির উচ্ছেদ হবে না -হাসান মাহমুদ



শিবিরের ওপর সরকারের চণ্ডতার বিরুদ্ধে আমার গত লেখাটা দেখে অনেকে আমার সমালোচনা করেছেন। আমি অবাক হইনি, চারদিকে ঘৃণার যে টর্নেডো চলছে তাতে বোধহয় আমাদের উপলব্ধির সূক্ষতা নষ্টই হয়ে গেছে। গত কয়েক দশকে ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের অনেক নেতা-নেত্রীদের টেন্ডার, ভর্তি, সিট ও যৌন-বাণিজ্য বহুবার কাগজে উঠেছে। সাথে আছে হল দখল ও অস্ত্রের সন্ত্রাস। লীগ-দল সেটা করেছে ব্যক্তিস্বার্থে, সেগুলো অন্যায় তা জেনে শুনেই ও নিজের বিবেকের কাছে অপরাধী হয়েই। কিন্তু শিবির ভর্তি, টেন্ডার, সিট ও যৌন-বাণিজ্য করেছে বলে অভিযোগ নেই। ওরা করেছে প্রধানত: হল দখল ও অস্ত্রের সন্ত্রাস, তাদের আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য। মনের কাছে ওরা অপরাধী তো নয়ই বরং ইসলামের সেবা করছে মনে করে গর্বিত।

এটা বুঝতে কি মহাপণ্ডিত হতে হয় শিবিরের সাথে জাতির বড় একটা অংশের বিরোধটা ধর্মতাত্ত্বিক ? অত্যাচার করে ধর্মবিশ্বাস দমন -কোনদিন ইতিহাসে হয়েছে তা ? হয়নি। ধর্মতাত্ত্বিক সমস্যার ধর্মতাত্ত্বিক সমাধান করার চেষ্টা না করে সরকার অত্যাচার-নিপীড়নের পথধরেছে। যে বিপুল সংখ্যায় শিবিরদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তা হাস্যকর ওঅবাস্তব। অত লোককে গ্রেপ্তার করাও সম্ভব নয়, আমাদের কারাগারেও অত জায়গা নেই আর অত মামলা চালানোর ক্ষমতাও আমাদের বিচার বিভাগের নেই।

রিম্যান্ড মানেই নির্মম প্রহার। শিবিরের সভাপতি শক্ত সমর্থ যুবক, রিম্যান্ড-এর পরে বোধ হয় দুদিন তাকে আদালতে আনা হয়েছিল,শেষের দিন সে ছিল হুইল চেয়ারে প্রায় অজ্ঞান, ওই অবস্থায় তার হাতে পায়ে ডান্ডাবেড়ী পরানো। নিশ্চয় অন্যান্যদেরও একই অবস্থা। আমি বহু বছর বিদেশে আছি, কোনো সভ্য সমাজে এমন বর্বরতা চিন্তাও করা যায় না। এর উদ্দেশ্য ছিলশিবির উচ্ছেদ, এই তো? তা, সেটা হয়েছে বিন্দুমাত্র? হয়নি। ওদের আদর্শ বদলেছে? বদলায় নি। ওরা শিবির করা ছেড়েছে? ছাড়েনি। ওদের অবস্থা দেখে অন্যেরা শিবির করা ছেড়েছে? ছাড়েনি বরং ওদের প্রতিটি সদস্যের ধর্মীয় আবেগ আরো শক্তিশালী হয়েছে। হিংসার যে রাজনীতি আগে থেকে চালু ছিল সেটা দ্বিগুন জ্বলে উঠেছে - ওই আগুনে দেশ ও আওয়ামী লীগ জ্বলে পুড়ে খাক না হয়ে যায়।

সমাজের সরকারের প্রতিটি স্তরে যে ভয়াবহ অনাচার দুর্নীতি তার বিকল্প তরুণ রক্ত খুঁজবেই। জামাত সেটাই ওদের দেয় - মোহময় আপাত: আকর্ষণীয় মৌদুদীবাদ। চারদিকে এত অত্যাচার অনাচারে বিপর্যস্ত মনে ইসলামী রাষ্ট্র, আল্লাহ'র আইন,রসুলের আদর্শ এসব শব্দের আকর্ষণ অপ্রতিরোধ্য। যত অত্যাচার হবে ওদের ইসলামী আবেগ তত শক্তিশালী হবে। শিবির জানে না মৌদুদীবাদ মুখে যত চটকদার আকর্ষণীয় কথাই বলুক সে মানবাধিকার আর ইসলাম-বিরোধী। ওর বিপক্ষে মুসলিম স্কলারদের রিসার্চ(নবম শতাব্দীর হাতিম আল রাজী থেকে শুরু করে এখনকার ড: আবদুল্লা আন নাইম, ড: বাসাম তিবি, ড: ফাদেল এবং আরো অনেকে) পড়ার সুযোগইশিবিরিকে দেয়া হয় না। কিন্তু এখন ইন্টারনেটের যুগ, কোরান-রসুল ও ঐতিহাসিক তত্ত্ব-তথ্য ধরে ধরে মৌদুদিবাদের ইসলাম-বিরোধীতা তুলে ধরলে এ ভুল ওদের কিংবা পরের প্রজন্মের অনেকেরই একদিন ভাঙবেই। একটা জাতির জন্য ওই সময়টা কিছুই নয়। যাঁরা আজ ছ'মাস পরের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছেন তাঁদের জানা দরকার জামাত তিরিশ বছরের শুধু প্ল্যানই করেনি, লক্ষ্য অর্জনের রোডম্যাপও করে রেখেছে এবং ধীর কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপে সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শিবিরের ধর্মীয় আবেগ তার প্রধান অস্ত্র।

জামাত-শিবিরের উচ্ছেদ আমার চেয়ে বেশী কেউ চায় না। কিন্তু সেটা মানুষ উচ্ছেদ বা নাগরিকঅধিকার লঙ্ঘন করে নয়, রিম্যান্ড-এর নৃশংস অত্যাচার বা মামলার হয়রানী করে নয়। সেটা ইসলামের নামে ওদের অপতত্ত্বের উচ্ছেদ। কোরান-রসুল এবং ইতিহাসের শিক্ষা থেকে সেটা যথেষ্টই সম্ভব।

- See more at: http://www.hasanmahmud.com/2012/index.php/all-articles/articles-in-bangla/islamic/94-%E0%A6%85%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A7%87-%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B0-%E0%A6%89%E0%A6%9A%E0%A7%8D%E0%A6%9B%E0%A7%87%E0%A6%A6-%E0%A6%B9%E0%A6%AC%E0%A7%87-%E0%A6%A8%E0%A6%BE#sthash.GLmIN8yf.dpuf

Monday, June 17, 2013

সাম্প্রদায়িকতা র প্রশ্রয়দাতা আমরা- সুমি খান


সাম্প্রদায়িকতা প্রশ্রয় দিয়ে আমরা দেশের সাধারণ নিরীহ জনগণ কে বিভ্রান্ত হতে বাধ্য করছি না কি? কেউ নগদ টাকার লোভে, কেউ না পাওয়ার বেদনায় ( অনেক পাওয়র পর ও) হাসিনা বিরোধিতা বা আওয়ামী বিরোধিতার নামে। এর প্রমাণ চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। এর খেসারত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের বোমাবাজী দিয়ে আনন্দউল্লাস! আওয়ামী লীগের ভেতরের উগ্র ডানপন্থী দের আত্মঘাতী ভূমিকা তো আছেই।
বামদলের ভূমিকা নিয়ে আত্মশ্লাঘায় ভুগছেন তারা? যুদ্ধাপরাধী এবং তার দোসর দের ঠেকাতে সুদূর প্রসারী কোন কাজ কি করেছেন তারা ?

Saturday, June 8, 2013

নারীর মানবাধিকার -চলচ্চিত্রে স্পর্ধিত উপস্থাপন :আমার দোসর ঋতুপর্ণ ঘোষ, সেলাম ! - সুমি খান


সুমি খান
৯ জুন ২০১৩ সকাল ১০টা

আমার দোসর ঋতুপর্ণ ঘোষ, গুরু সেলাম তোমায় !!
নারীর মানবাধিকার হননে পুরুষতান্ত্রিকতার ভয়ংকর শোষণের নির্মম চিত্র- মাত্র ১২টি হলেও প্রতিটি চলচ্চিত্রে কী অসাধারণ স্পর্ধিত উপস্থাপন!! কে, কবে করেছে জানি না। বড়ো ক্ষুদ্র মানুষ আমি। চলচ্চিত্র সমালোচক নই। সাধারণ একজন দর্শক মাত্র। মেঘপিয়নের সাথে সাথে মন আজ ছুটে চলেছে তাকে হারিয়ে বেদনায় ডুবেছি বারবার! তার সম্মানে আমার অনুভূতি গুলো লিখতো বসে গেলাম নিজের অজান্তেই!
কবেকার কথা মনে নেই- ১৯৯৮-৯৯ সালের কোন একদিন বিষন্ন দুপুরে হঠাৎ টেলিভিশনে 'দহন' ছবি টা দেখলাম।ছবির নায়িকা ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত রমিতা চরিত্রে অভিনয় করছিলেন। পূজোর বাজার করতে গিয়ে বখাটেদের হাতে লাঞ্ছিত হলো । ইন্দ্রানী হালদার সাহসী সাংবাদিক ঝিনুকের চরিত্রে অভিনয় করলেন। সেই বখাটেদের বাঁচাতে প্রশাসনের সাথে একাট্টা হলো স্বামী পলাশ এবং তার পরিবার। তাদের লান্ছনা আর অপমানের শিকার হলো রমিতা এবং ঝিনুক। বখাটে দের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দিতে ঝিনুকের প্রেমিক ও সমর্থন দিলো না। বেদনাহত ঝিনুককে তার ঠাকুরমা (কিংবদন্তী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সুচিত্রা সেন) মানসিক সমর্থন দিলেন। রাতের পর রাত পলাশ ও নিষ্ঠুর ভাবে ধর্ষণ করতে স্ত্রী রমিতাকে ! রকবাজ বখাটে দের সাথে একই ছাদের নিচে একই বিছানার শয্যাসঙ্গী স্বামীটিও একাত্ম হয়ে গেলো! বুকের ভেতর টা চমকে উঠেছিলো। মনে হলো, নারীর মানবাধিকার হননে পুরুষতান্ত্রিকতার ভয়ংকর এই শোষণ কী অসাধারণ উপস্থাপন! কেউ কখনো পারে নি!! নিজে পুরুষ হয়ে কিছু পুরুষের অন্যায় আর বর্বরতার বিরুদ্ধে সাহসিকতার সাথে জেগে ওঠা!! আধুনিকতা বলে একেই!
'দহন' এর পর 'বাড়িওয়ালী' , 'তিতলী', অন্তরমহল', 'চোখের বালি' ..আরো কয়েকটি ছবি দেখলাম! বারবার হাজারবার! মুগ্ধতায়, মোহময়তায় ভাসলাম! উজ্জীবিত হলাম সাহসে- নিজের প্রতি, নিজের শরীরের প্রতি সম্মান বোধে!যে শরীর টি কে নশ্বর বলে কখনো গুরুত্বই দেইনি! এই শরীরের অপরূপ সৌন্দর্য থাকতে পারে, তার প্রতি কেউ অসম্মান করতে পারে- এই বোধটাই তেমন অনুভব করিনি যেই আমি এতোদিন! তাকেই ঘা মেরে জাগিয়ে দিলেন ঋতুপর্ণ! অধিকারবোধ শুধু নয়, নিজের আত্মসম্মানবোধ! নিজের বেদনার দোসর হলাম যেন প্রথমবারের মতো! আর সেই দিন থেকেই মনে মনে এই মানুষটি আমার দোসর হয়ে গেলেন ।

তিনি নিজে সমকামী ছিলেন। সেটা তার একান্তই নিজস্ব ব্যাপার। এ্তই বাস্রতবতা তার বাবা-মা, তার পরিবার খুব সহজে মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু সমাজ তার উপর তার মতো প্রান্তিক মানুষগুলোর উপর এক ধরণের ভায়োলেন্স চাপিয়ে দেয়- যার কোন অধিকার এই সমাজের নেই। এবং সেটা নিয়ে হতাশার কিছুই নেই! বিভিন্ন সময়ে দৃঢ়তার সাথে এ কথা গুলো তুলে ধরেছেন তিনি। বিকল্প যৌনতা নিয়ে তার সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র 'চিত্রাঙ্গদা' প্রসঙ্গে আলোচনায় বলেছিলেন, এই অস্তিত্ব মেনে নিতে পারে না আমাদের নির্বোধ সমাজ। এই যুদ্ধে কেউ 'বেচারা' নয়, কেউ তার হাত ধরে পার করে দেবে- এমন অলীক আশা নিয়ে বেঁচে থাকলে বা বসে থাকলে- সেই জীবনের অধিকারী ই সে নয়!'কোন রোমান্টিক সঙ্গী পেলাম না এই জীবনে'- এটা কোন দীর্ঘশ্বাস হতেই পারে না । হোঁচট খেতে খেতে হলে ও তার নিজের জীবন এগিয়ে নিয়ে যাবার দায় তার নিজের!বলেছেন,এই ভায়োলেন্স একতরফা নয়- দু'দিক থেকেই আসছে! কী চমৎকার আত্মবিশ্বাসী কথা! বোঝালেন, আমি কিভাবে বাঁচছি, সেটা বড়ো কথা নয়, আমি কিভাবে বাঁচতে চাই- আমার প্রত্যাশা কি- সেটাই বড়ো কথা!
অন্জন দত্তের কথায় বলি," পৃথিবীতে অনেক সমকামী চিত্র পরিচালক আছেন, অনেক সফল তারা। কিন্তু কে কবে নারী -পুরুষের সেক্সুয়েল সম্পর্ক এবং তার সংকট নিয়ে এতোটা খোলামেলা কথা বলেছে? আমার শরীরের ভালো মন্দ, আমার শরীরের সৌন্দর্য, আমার সৌন্দর্যের প্রতি সম্মানবোধ আর অকৃত্রিম ভালোবাসা থাকবে কারো- এই বিষয়গুলো ভাবার দুয়ার খুলে দিলেন তিনি।রবীন্দ্রনাথের 'নারী অর্ধ নারীশ্বর'বিবেচনার সময় এসে গেছে। একচ্ছত্র অধিকার আমার ! বিয়ের সার্টিফিকেট বা কাবিননামা কবুল করে একজন নারী তার স্বামীর কাছে বিক্রি হয়ে যায় না। মন প্রাণ দিয়ে ভালোবেসে দু'জনে দু'জনার হতে হবে। তবেই শরীর- মন একাকার হয়ে একাত্ম হবে! এতোটা ভাবিয়েছে কে আর? কেন বলবে কেউ?


সমাজের ভ্রুকুটির মুখোমুখি হবার সাহস কার ই বা আছে? ক'জনের আছে? ব্যক্তিকেন্দ্রীকতার সুখ- আনন্দ বর্জন করে একাকিত্ম বরণ করেছিলেন। এমন পরিচালক- যার নিবিড় ভালোবাসায় ভেসেছে সবাই! যদিও তার চারিদিক বড়ো প্রতিকূল ছিল। এই প্রতিকূলতা তিনি নিজেই তৈরি করেছিলেন, নজরুলের ভাষায়, আদি শৃঙ্খল সনাতন শাস্ত্র আচার ভাঙ্গবার জন্যে । রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়, "অহো, কী দু:সহ স্পর্ধা !!"
নারী, নারীর শরীর কে সম্মান করতে গিয়ে লম্বা চুলের বিনুনীর উইগ পরলেন। অপরূপ সাজে নিজেকে সজ্জিত করলেন।নানান রূপে তার প্রতিটি অনুষ্ঠান কী প্রাণবন্ত!
নারীর রূপ ধারণ করলেন দু:সাহসিকতার সাথে। এসব করতে গিয়ে সমাজের গঞ্জনা- যন্ত্রনা সয়ে যাওয়ার যে সাহস, যে ক্ষ্যাপামী তিনি দেখিয়েছেন- এমনটি তার মতো কারো নেই, ছিল না। আরো অনেক অনেক দিন তার বেঁচে থাকা দরকার ছিল।
ঋতুপর্ণ ঘোষের অকাল প্রয়াণ সবাইকে ভাবাচ্ছে- হয়তো আরো কেউ এবার এগিয়ে আসবে প্রতিভা নিয়ে, সাহস নিয়ে। তার মতো আগুনে পুড়ে সোনা হয়ে আমাদের কথা বলবেন কেউ- অপেক্ষায় রইলাম।

তবে আমরা ঋতু'দা এবং তার অসাধারণ সৃষ্টি কে চিরকাল চিরদিন আমাদের দোসর বলেই জানবো।
বাংলাদেশে গত কিছুদিন ইউটিউব না থাকার কারণে এতো এতো ক্ষতি হয়েছে আমাদের- কতোটা বলা যায়? তাই বেশ দেরি হয়ে গেলো। তবু ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রয়াণ এবং তাকে নিয়ে আলোচনা সব নিয়ে বসলাম কাল সন্ধ্যা থেকে। আজ আমার বন্ধুদের সাথে ও শেয়ার করছি।
এ বিষয়ে আরো লিখবো। শুরু করলাম আজ। প্রিয় বন্ধুরা , আপনাদের অংশগ্রহণ কামনা করছি!

Wednesday, June 5, 2013

বাংলা ভাষায় প্রথম মুদ্রিত বই -শাম্ স নূর


ভাষা মানুষের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। অন্যভাবে বলা যায়, মুখ দিয়ে শব্দ করে ভাব প্রকাশের পদ্ধতিই হল ভাষা। বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা। এ ভাষায় আমরা কথা বলি, পড়ি, লিখি, আবার স্বপ্নও দেখি। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, আমাদের এ প্রাণের ভাষার প্রথম বই কোনটি?




‘চর্যাপদ’ বাংলা ভাষার সবচেয়ে পুরনো সাহিত্য নিদর্শন, মানে সবচেয়ে পুরনো বই। বাংলা ভাষার এর আগের আর কোনো লিখিত রূপ পাওয়া যায়নি। তবে চর্যাপদ ছাপানো কোনো বই ছিল না, ছিল একটা হাতে লেখা গানের সংকলন। চর্যাপদ যখন লেখা হয়েছিল, তখন পৃথিবীতেই ছাপাখানার প্রচলন হয়নি। তখন পুঁথি বানানো হত তালপাতা বা অন্য কোনো পাতা দিয়ে। তার উপর হাতে লেখা হত। তাড়াতাড়ি লেখার জন্য পুঁথিতে একটা মজাও ছিল; পুঁথিতে বাক্যের শব্দগুলোর মধ্যে কোনো ফাঁকা রাখা হত না। ওভাবে জড়িয়ে জড়িয়ে লিখলে সময় কম লাগত।
চর্যাপদ কবে রচিত হয়েছিল, এ ব্যাপারে বাংলা ভাষার জাঁদরেল পণ্ডিতরা একদমই একমত হতে পারেননি। একেক জন পণ্ডিত একেক মন্তব্য করেছেন। কারও মতে চর্যাপদ ৬৫০-৯০০ খ্রিস্টাব্দে লিখিত, কারও মতে ১০০০-১২০০ সালে; এমনি একেক জনের একেক মত। সবার মত মিলিয়ে অনুমান করা হয়, চর্যাপদ রচিত হয়েছিল ৮৫০-১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে।

এই বইটি কিন্তু হারিয়েই গিয়েছিল। ১৯০৭ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদের একটি খণ্ডিত পুঁথি খুঁজে বের করেন। তাও আবার নেপালের রাজদরবারের লাইব্রেরি থেকে! বাংলা ভাষার সবচেয়ে পুরনো এই বইটি নিয়ে কিডজে একটি ফিচার প্রকাশিত হয়েছিল। নিচে ফিচারটির লিঙ্ক দেওয়া হল।

সবচেয়ে পুরনো বাংলা বই: চর্যাপদ
http://kidz.bdnews24.com/mainStory.php?mainstoryid=205

এ তো গেল বাংলা ভাষার সবচেয়ে পুরনো বইয়ের গল্প। এবার আসা যাক, বাংলা ভাষার প্রথম মুদ্রিত বইয়ের গল্পে।

যতদূর জানা যায়, পৃথিবীর প্রথম বাংলা হরফে মুদ্রিত বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৬৮২ সালে। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। তবে বইটি পুরো পাওয়া যায়নি, বইটির কিছু ছেঁড়া পাতা পাওয়া গিয়েছিল। এটিকেই বলা যায় সবচেয়ে পুরনো বাংলা মুদ্রণের নমুনা। এতে যে তামার মুদ্রণের নমুনা পাওয়া যায়, তার বর্ণগুলো ছিল তামার পাত থেকে মুদ্রিত। অর্থাৎ তখনও ঢালাই করা বাংলা বর্ণের প্রচলন হয়নি।


এরপর ১৭২৫ সালে জার্মানিতে সম্ভবত আরেকটি বাংলা বই ছাপা হয়েছিল। সেটিও পাওয়া যায়নি। ছেঁড়া পাতা ইত্যাদি নমুনা পাওয়া গেছে। সেসব থেকেই বইটির কথা জানা গেছে।

বাংলায় লেখা সবচেয়ে পুরনো যে মুদ্রিত বইটি পাওয়া গেছে, তার নাম-- ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’।
লিখেছিলেন মনোএল দ্য আসসুম্পসাঁও। তবে বইটি বাংলা বর্ণে নয়, মুদ্রিত হয়েছিল রোমান হরফে। বইটি লেখা হয়েছিল ১৭৩৩ খ্রিস্টাব্দে। তবে স্পেনের লিসবন থেকে ছেপে বের হয় ১৭৪৩ সালে।


এখন পর্যন্ত যে তিনটি মুদ্রিত বাংলা বইয়ের গল্প বললাম, তিনটি-ই ছাপা হয় বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার বাইরে। মানে বাংলা ভাষাভাষীদের অঞ্চলের বাইরে। হয়তো এ কারণেই এই বইগুলো সম্পর্কে তেমন কিছু জানাও যায়নি। আর যা তথ্য পাওয়া গেছে, তা দিয়ে এদের প্রথম বাংলা মুদ্রিত গ্রন্থের সম্মানও দেওয়া যায় না। কারণ, প্রথম দুটো তো পাওয়া-ই যায়নি। আর শেষেরটি বাংলা ভাষায় লেখা বটে, কিন্তু বাংলা বর্ণমালাতে মুদ্রিত নয়।



বাংলা ভাষায় প্রথম মুদ্রিত বই হিসেবে স্বীকৃত দেওয়া হয় A Grammer of the Bengali Language (অ্যা গ্রামার অব দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ বা বাংলা ভাষার ব্যাকরণ) গ্রন্থটিকে। বইটি লিখেছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারি ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড। প্রকাশিত হয় ১৭৭৮ সালে। বইটিতে মোট পৃষ্ঠা ছিল ২১৬টি। আংশিক বাংলা হরফে ছাপা এই বইটি পশ্চিমবঙ্গের হুগলি থেকে কাঠের হরফে ছাপা হয়। কাঠের হরফগুলো তৈরি করেছিলেন ইংরেজ পণ্ডিত ও গ্রন্থকার চার্লস উইলকিনস। বাংলা অক্ষরের জন্য তাকে সহায়তা করেছিলেন পঞ্চানন কর্মকার। বিডিনিউজ

Friday, May 31, 2013

চির তরুণ থাকার কিছু উপায় - জলচিকিৎসা


১• খুব ধীরে ধীরে চেষ্টা করতে করতে কয়েক মাসের মধ্যে সকালে ঘুম থেকে উঠে চার গ্লাস পানি খাওয়ার অভ্যাস করুন। এর পর বাথরুমে যান।

২• বাথরুম থেকে ফিরে এসে আরও এক গ্লাস পানি খান এবং তার পর খান দুধ ছাড়া খুব হালকা এক কাপ চা। আপনার ওজন বেশির দিকে হলে চিনি খাওয়া ছেড়ে দিন। চা কখনোই অতিরিক্ত গরম খাবেন না।

৩• সারা দিনে ৮ থেকে ১২ গ্লাস বাড়তি পানি খাবেন। উপরোক্ত রং চা দিনে কমপক্ষে চার কাপ খাবেন।

৪• ওপরের নিয়মে পানি খাওয়ার নাম হচ্ছে হাইড্রোথেরাপি বা জলচিকিৎসা । মূলত এটি হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার বছরের প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসা। আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে- ঘুম থেকে উঠে ধীরে ধীরে চার গ্লাস পানি খাওয়ার অভ্যাস করলে প্রায় ৩৬ ধরণের রোগ হয় না এবং হলেও সেরে যায়।

৫• অপর পক্ষে, দুধহীন এবং দুধ-চিনি-হীন হালকা গরম চা হচ্ছে আড়াই হাজার বছর আগের একটি চায়নিজ হারবাল মেডিসিন। সেকালে এই চা দিয়ে হার্ট, ব্লাড প্রেসার (উচ্চ রক্তচাপ) ও পেটের নানা রকম রোগের চিকিৎসা করা হতো। আবার আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে- চায়ে রয়েছে অ্যান্টিঅিডেন্ট, যা ক্যান্সার প্রতিরোধে নিশ্চিত অবদান রাখে। এ ছাড়াও অন্য বহুগুণ রয়েছে চায়ে। তবে যে চা-টা প্রক্রিয়াজাত হয়নি, সে চায়ের গুণাগুণই অপেক্ষাকৃত ভালো।

৬• ভিটামিন সি একটি বৈপ্লবিক খাদ্যপ্রাণ। অসংখ্য এর গুণাগুণ। জানা গেছে, দিনে ১ হাজার মিলিগ্রাম ভিটামিন সি খেলে মানুষ চির তরুণ থাকে। তবে ট্যাবলেট খেলে কিছুই উপকার পাওয়া যায় না। খেতে হবে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ তাজা ফলমূল। প্রতিদিনই খেতে হবে। ভিটামিন সি ও ক্যান্সার ঠেকাতে সাহায্য করে।

৭• আমলকি, সব ধরনের লেবু, টমেটো, কমলা, পেয়ারা, নানা রকম টক স্বাদের ফলে বিভিন্ন মাত্রায় ভিটামিন সি রয়েছে।

৮• রেডমিট অর্থাৎ গরু, মহিষ, খাসি, ভেড়া ইত্যাদির মাংস খাওয়া ছেড়ে দিতে হবে। ফার্মের মুরগিও চলবে না। শুধু চর্বিহীন বাচ্চা মুরগির মাংস খাওয়া চলতে পারে।

৯• প্রচুর পরিমাণে আধা-সেদ্ধ শাক-সবজি, তরিতরকারি এবং খুব অল্প পরিমাণে ভাত-রুটি, এই হওয়া উচিত আপনার দৈনন্দিন মূল খাদ্য।
ভাজাভুজি খাবেন না। অতিরিক্ত তেল, চর্বি, ঘি, মাখন খাবেন না। মসলার বিভিন্ন ভেষজ গুণ আছে, তবুও রান্নায় খুব বেশি মসলা ব্যবহার করবেন না।

১০• সালাদ হিসাবে প্রতিদিন বেশি করে খাবেন কাঁচা লেটুস পাতা, পুদিনা পাতা, টমেটো ইত্যাদি।

১১• বিধিনিষেধ না থাকলে সকালে খালি পেটে এক চামচ মধু খাবেন।

১২• ছোট-বড় সব ধরনের মাছ খাবেন। সমুদ্রের মাছ খাওয়া অভ্যাস করতে পারলে তো খুবই ভালো। কেননা, ওটা মহৌষধ। গাদা-গাদা মাছের কাটা খাওয়া ঠিক নয়। ওতে পাকস্থলিতে পাথর হতে পারে।

১৩• সূর্যমূখী ফুলের বীজ হচ্ছে হার্টের ভেষজ ওষুধ। রান্নায় সূর্যমূখী তেল ব্যবহার করলে হার্টের সুরক্ষা যেমন হয়, তেমনি হার্টের অসুখ থাকলে তা সারাতে সাহায্য করে।

১৪• প্রতিদিন অল্প একটু টক দই খাওয়ার অভ্যাস করুন। টক দই উচ্চ রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করে।

Wednesday, May 29, 2013

এক অজানা কুটকৌশলের অংশ হলেন ১৬ জন সম্পাদক:এটা কি আরও একটি দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্রের পদধ্বনি?


এক অজানা কুটকৌশলের অংশ হলেন ১৬ জন সম্পাদক……
by Bangladeshi Eyes
এটা কি আরও একটি দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্রের পদধ্বনি?

গত ১৮ মে দেশের প্রথম সারির পনেরটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক সুনির্দিষ্ট ফৌজদারী অপরাধে গ্রেফতারকৃত দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মুক্তির দাবিতে যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। এমন বিবৃতিতে বিস্মিত হয়েছেন দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ। আসুন দেখে নেই কারা এই দেশপ্রেমিক সুশীল সমাজঃ




তাদের সংবাদ পত্রেই বিভিন্ন সময়ে মাহমুদুর রহমান এর কালো চরিত্রের প্রকাশ

অথচ এই সম্পাদকদের সংবাদপত্রেই বিভিন্ন সময়ে মাহমুদুর রহমান এর কালো চরিত্র উঠে এসেছে তার একটি সঙ্কলন নিম্নে দেয়া হল ।

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোরডটকমঃ

১. তারিখঃ 22 Apr 2013 04:08:41 PM Monday BdST

URL:http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=c65002e11643db1d80afe5f0486e74fd&nttl=22042013190863






দৈনিক প্রথম আলোঃ

২. তারিখঃ রোববার ২৬ নভেম্বর , ২০০৬






দৈনিক যুগান্তরঃ

৩. দৈনিক যুগান্তর বের করেছিল মাহমুদূর ভাইজান এর আমলনামা যার শোক এ তারা এখন পক্ষাঘাতগ্রস্ত




সাম্প্রদায়িক উস্কানিদাতা মাহমুদুর রহমানের মুক্তি দাবি এবং আমার দেশ পত্রিকার ছাপাখানা খুলে দেবার অদ্ভুত দাবি জানানো সম্পাদকগণ নিজেরাই সাংবাদিকতার মুল আদর্শকে কলঙ্কিত করেছেন। এক মাহমুদুর রহমানের অপরাধের বিরোধিতা না করে তার পক্ষাবলম্বন করে তারা নিজেরাই এই অপরাধের অংশীদার হয়েছেন। এখন এই অপরাধকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বিভিন্ন পর্যায়ের দৌড়ঝাঁপ এবং সর্বশেষ “সম্পাদক পরিষদ (Editors Council)”গঠন তাদের উদ্দেশ্যমূলক কার্যকলাপের ইঙ্গিত দেয়। যদিও তারা বলছেন-সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার সুরক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন, সাংবাদিকতার পেশাগত মানোন্নয়ন ও সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এই পরিষদ গঠনের উদ্দেশ্য। কিন্তু ইতোমধ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলতে তারা যেভাবে মাহমুদুর রহমানকে বাঁচার মিশনকে দেখছেন সেক্ষেত্রে স্বভাবত আমরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারছি না। আমরা মনে করি কোন সুস্থ এবং প্রকৃত সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য কোনক্রমেই সাম্প্রদায়িক উস্কানি এবং উস্কানিদাতাদের রক্ষা করা নয়।

(বিঃদ্রঃ পাঠকবৃন্দ এই বংশ কিন্তু বিএন পি – জামাত কিংবা আওয়ামীলীগ বংশ নয়।বিশ্বের গদফাদার নিজেকে অসীম ক্ষমতাবান ভাবা এই বংশের পরিচয় আমাদের সামনে খুব দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে উঠবে যার কথা শুনলে হয়তো আঁতকে উঠবেন অনেকেই ।)

তার আগে জেনে নিই কে এই মাহমুদুর রহমান?


শুরুতেই একটি তথ্য দিই। মাহমুদুর রহমানের স্ত্রী ফিরোজা খান জামায়াত ইসলামের রুকন ছিলেন। আপনি ভাবছেন জামায়াতেতো মহিলা নেত্রীই নেই, রুকন আসলো কোত্থেকে! রুকন হচ্ছে জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামোর একটি ধাপের নাম। সমর্থক-কর্মী-সাথী-রুকন। রুকন হচ্ছে সর্বোচ্চ পর্যায়। ইসলামী ছাত্রী সংস্থা যেমন ছাত্রশিবিরের নারী উইং, ঠিক তেমনি জামায়াতেরও নারী উইং আছে।
১৯৫৩ সালে কুমিল্লায় জন্মগ্রহণকারী জঙ্গীবাদের মিডিয়া গুরু মাহমুদুর রহমান বুয়েট থেকে পাশ করা একজন মেধাবী পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত বঙ্গসন্তান(J)। জ্বলতে জ্বলতে জ্বলন্ত এই সম্পাদক সাহেব ডিগ্রি নিয়েছেন গ্লাস ও সিরামিকস বিষয়ে (এজন্য অবশ্য গ্লাস আর বোতল এর সাথে তার অকৃত্তিম ভালোবাসার সম্পর্ক ) ।

প্রথম চাকুরী একটি ব্রিটিশ অক্সিজেন কম্পানিতে। পেশাগত উত্থান ঘটে দেশের অন্যতম শিল্প গ্রুপ বেক্সিমকোকে দিয়ে। বিয়ে করেন বিএনপির সাবেক মন্ত্রী হারুন অর রশিদ খান মন্নু’র মেয়েকে।

শশুরের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান মন্নু সিরামিকসে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ নেন। অর্থ আত্মসাতের কারণে জামাইকে বের করে দেন শশুর হারুন অর রশিদ খান মন্নু। বেক্সিমকো গ্রুপের শাইনপুকুর সিরামিকসে সাধারণ এক্সিকিউটিভ পদে যোগদান করে চতুর মাহমুদুর রহমান এক সময় হয়ে যান প্রধান নির্বাহী। এই দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ঘটে যায় আসল ঘটনা।

গত বিএনপি সরকারের আমলে একজন কাঁচ ও সিরামিকস বিষয়ে ডিগ্রীধারী মাহমুদুর রহমান হয়ে যান জাতীয় বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান! দেশে তখন তুমুল বেসরকারিকরণের কাজ চলছে। এমতাবস্থায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে মাহমুদুর রহমানের মত অযোগ্য, অনভিজ্ঞ লোকের হাতে দায়িত্ব দেয়ার ঘটনায় সবাই চমকে যান। এখনো বিনিয়োগ বোর্ডের তৎকালীন কর্মকর্তাগণ সেই স্মৃতিচারণ করেন। তাদের কাছে এটি একটি মুখরোচক গল্প। চরম অর্থলিপ্সু এই জাতীয় প্রতারক নিয়ম ভেঙে বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়েও বেক্সিমকো থেকে আর্থিক সুবিধাদি অর্থাৎ বেতন ভাতা গ্রহণ করতেন।

মাহমুদুর ভাইজান এর প্রানের সখা মতি ভাই ই তখন এই বিষয়ে দেশবাসীকে জানিয়েছিলেন:




বিএনপির শেষভাগে বিভিন্ন দুর্নীতি কেলেংকারিতে জড়িয়ে পদত্যাগে বাধ্য হন তৎকালীন জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন। কোন এক অজানা ক্যারিশমায়, অদৃশ্য এক শক্তির বলে প্রতিমন্ত্রীর বিকল্প হিসেবে জ্বালানী উপদেষ্টা নিয়োজিত হন বর্তমানে দেশের দুর্ধর্ষ সম্পাদক কারারুদ্ধ মাহমুদুর রহমান। একজন কেমিকৌশলী একাধারে বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ, পরবর্তীতে জ্বালানী বিশেষজ্ঞও। যিনি জাতির জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা! বিষয়টা এমনও না যে মাহমুদুর রহমান যথেষ্ট মেধাবী। আসলে ধুরন্ধর আর মেধাবী এক কথা নয়। ছিলো না কোন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। বিএনপি সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় যে যে গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি দায়িত্ব পালন করেন, কোন দায়িত্বেরই বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান তার ছিলো না। তাহলে কিভাবে তিনি এসব দায়িত্বের দায়িত্ববানের পদ অলংকৃত করেন? এক সময় তা অজানা থাকলেও এখন আর অজানা নয়।
ঘটনার পরিক্রমায় ২০০৬ সালে আবারো হোঁচট খেলো গণতন্ত্র। চাঞ্চল্যকর ওয়ান ইলাভেনের পর তত্বাবধায়ক সরকারের নামে ক্ষমতায় বসে সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দিন সরকার। দুর্নীতির অভিযোগে একের পর এক গ্রেফতার হতে থাকেন দেশের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদরা। শুরু হলো রহস্যজনক মাইনাস টু ফর্মূলার বাস্তবায়ন চেষ্টা। মজার ব্যাপার হলো মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে ফুলবাড়িয়া কয়লা খনি সংক্রান্ত দুর্নীতি, বিনিয়োগ বোর্ডে জরিপ প্রতিবেদন দাখিলে অনিয়ম, জনতা ব্যাংক থেকে অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে ক্ল্যাসিক মেলাইন ইন্ড্রাস্টিকে ঋণ পাইয়ে দেয়া, বিনিয়োগ বোর্ডের দায়িত্ব পালনকালে ব্যাপক দুর্নীতির ফলে বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়া, অবৈধ আর্থিক লেনদেন সহ অসংখ্য সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তত্বাবধায়ক সরকার এই মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করেনি। অথচ বাসায় দুই বোতল বিদেশি মদ পাওয়ার কারণে সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে গ্রেফতার করা হয়। বেগুন চুরি করে বেচারাকে বনবাসে চলে যেতে হলো, অথচ পুকুর চুরি করে সেই পুকুর পাড়ে বসে বসে দখিনা বাতাস খাওয়ার পরও ফখরুদ্দিনের সেনা-পুলিশ তাকে গ্রেফতার করার জন্য দেখেনি। এবার নিশ্চয় কিছুটা বুঝা যাচ্ছে কোন ক্ষমতাবলে একজন কেমিকৌশলী বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান হন আবার জ্বালানী উপদেষ্টাও হন!

ওহ ভালো কথা। সিরামিকস প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করার সময় সিরামিস ব্যবসার প্রেমে পড়েন প্রেমিক মাহমুদুর রহমান। আরটিসান সিরামিকস নামে একটি প্রতিষ্ঠানেরও মালিক হয়ে যান এরই মধ্যে।

২০০৬ সালের ২৪ নভেম্বর রাতে উত্তরায় এই সিরামিকস প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে কয়েকজন উচ্চপদস্থ আমলা, রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদকসহ (১৫জন ভাসুর সম্পাদকের কয়েকজন ছিলেন) সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে এক গোপন ষড়যন্ত্রে বসেন। যেটাকে আমরা টিভি ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইটের সামনে ফাইল ও ব্লেজারে চেহারা ঢাকা বহুল আলোচিত উত্তরা ষড়যন্ত্র হিসেবে চিনে থাকি। ব্যাপারটা অলৌলিক বটে। এই ষড়যন্ত্র মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার ঘটনা ছিলো দুর্দান্ত রহস্যজনক এক ঘটনা।

এই সম্পর্কিত সংবাদঃ

URL:

http://www.amarblog.com/montrok/posts/167833

http://www.dailyjanakantha.com/news_view.php?nc=15&dd=2010-06-10&ni=21236

এবং অতীতের খবর তারিখঃ
দৈনিক জনকন্ঠ (২৬ নভেম্বর , ২০০৬)



দৈনিক যুগান্তর (২৬ নভেম্বর , ২০০৬)




দৈনিক প্রথম আলো (২৬ নভেম্বর, ২০০৬)




এটি একটি কৌশল ভিন্ন অন্য কিছু না। সেই থেকে এই পর্যন্ত এরকম বহু কৌশলে ব্যবহৃত হয়েছেন বুদ্ধিবেশ্যা মাহমুদুর রহমান। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এরকম একটি ষড়যন্ত্র প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার পরও মাহমুদুর রহমানের কিছুই হয়নি।



আনসারুল্লাহ বাংলা টীমের হাতে ব্লগার রাজীব হায়দার খুন হওয়ার সাথে সাথে মাহমুদুর রহমান নিহত রাজীবকে নাস্তিক হিসেবে হাজির করে ব্লগের বিভিন্ন স্রষ্টায় অবিশ্বাসী লেখকদের লেখা পত্রিকায় ছাপিয়ে দেশের শান্তিপ্রিয় মুসলমানদেরকে উত্তপ্ত করার চেষ্টা করে।

দৈনিক আমারদেশ ব্লগারদের এই আন্দোলনকে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির মাধ্যমে বানচালের মূল কাজ শুরু করে ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে। ওই সময় দৈনিক আমারদেশ এর কয়েকটি সংবাদ শিরোণাম উল্লেখ করি-



ধারবাহিকভাবে এরকম আরো অনেক সংবাদই দৈনিক আমার দেশ করেছে। এবং আক্ষরিক অর্থে হেফাজতে ইসলামীর সহায়তায় দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করে একটি দুর্বিসহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হন মাহমুদুর রহমান। আচমকা বাংলাদেশে বসে আফগানিস্তানের স্বাদ পেতে থাকে সাধারণ মানুষ। চারিদিকে ব্লাসফেমী, নারীকে গৃহবন্দী, শরীয়াহ আইনের হুমকী ধামকি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ছাপিয়ে বিজ্ঞাপনের মত ছড়াতে থাকে তথাকথিত নাস্তিক ব্লগারদের ফাঁসির দাবি। প্রকাশ্যে লিফলেট বিলি করে ব্লগারদের হত্যা করার প্ররোচনা চলতে থাকে।

তো তারা কেন এই দেশের ধর্মভিত্তিক সন্ত্রাসের চাষ করবে?

ঠিক এই কামড়ের শুরুটা করলো দৈনিক প্রথম আলো। বিক্রি হয়ে গেল তারা ।বিক্রি হল মতি ভাই।

তিন হাজার মানুষের উপর আজগুবি এক অসংলগ্ন তথ্যের জরিপ চালিয়ে ফলাফল প্রকাশ করলো। যে ফলাফল আমাদেরকে জানালো দেশের ৯০ ভাগ জনগণ তত্বাবধায়ক সরকার চায়। জানালো অর্ধেকের বেশি মানুষ চায় না জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হোক। অর্ধেকের কম মানুষ গণজাগরণ মঞ্চকে সমর্থন করে। পাঁচ ভাগের একভাগ মানুষ নাকি গণজাগরণ মঞ্চের নামই শোনেনি! তো, প্রকল্প উদ্বোধনের পরতো একটু নাচানাচি করতেই হয়। ঠিক তখনই সব জড়তা কাটিয়ে প্রগতিশীলতার ধ্বজাধারী দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের নেতৃত্বে ১৫ জন সুবিবেচক নামলেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আয়োজক মাহমুদুর রহমানের মুক্তির আন্দোলনে। এসব কিছুর আগে একটু নমুনা দেখিয়েছিলো গণজাগরণ মঞ্চ নিয়ে হাসানাত আবদুল হাই নামক এক লেখকের একটি চরম মাত্রার অশ্লীল গল্প। প্রতিবাদের ঝড় উঠলে তাড়াতাড়ি ক্ষমা চেয়ে নেয় প্রথম আলো সম্পাদক। এটা এই ব্যক্তির অভ্যাস। ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারটা খুব পছন্দ করেন। তিনি ক্ষমা চেয়েছেন ধর্মান্ধদের কাছে, চেয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কাছে, এবার চাইলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রজন্মের কাছে। আরো কার কার চাইবে কে জানে!

১/১১ পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে কিছু কিছু সম্পাদক অতি উৎসাহী হয়ে উস্কানি দিচ্ছিলেন বিভিন্নভাবে। সে সময় তারা তেমনভাবে সংঘবদ্ধ ছিলেন না বলে অনেক কিছুই সম্ভব হয় নি। কিন্তু এবার যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে এবং জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধের দাবি জোরালোভাবে উঠেছে তখন বিএনপি নিজেরাই জামায়াত-শিবিরকে বাঁচাবার মিশনে আছে। সেই সাথে আছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কিত বিষয়ে রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত হবার আশংকাসহ অন্যান্য বিষয় তখন গত বারের সে সুযোগ তারা কি নিতে চাইছে অন্যভাবে;সংঘবদ্ধ হয়ে?

সাংবাদিক না হয়েও যিনি হুট করে সম্পাদক বলে দাবি করতেন সেই মাহমুদুর রহমানের মুক্তি দাবি জানানো যদি তাদের মিশনের প্রথম পদক্ষেপ হয়ে থাকে তবে পরের পদক্ষেপ কি হতে পারে তা নিয়ে আতংকিত হওয়া ছাড়া উপায় নাই!
http://mitthachar.wordpress.com/2013/05/29/%E0%A6%8F%E0%A6%95-%E0%A6%85%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A6%95%E0%A7%81%E0%A6%9F%E0%A6%95%E0%A7%8C%E0%A6%B6%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%85%E0%A6%82%E0%A6%B6-%E0%A6%B9%E0%A6%B2/

খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন যে কারণে তালুকদার খালেককে সমর্থন করি : মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান


খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আমার সম্মিলিত নাগরিক কমিটির সদস্য থাকা নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় বিভিন্নভাবে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এসব সংবাদের মূল বক্তব্য হলো- আমার এখানে থাকা সমীচীন হয়নি। পত্রিকাগুলো আইনের কোন ব্যাখ্যা প্রদান করেনি বা নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘিত হয়েছে কি-না তাও উল্লেখ করেনি। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আচরণ বিধিমালা-২০১০-এর ১৪ অনুচ্ছেদের ক, খ ও গ- এ সরকারী সুবিধাভোগী কতিপয় ব্যক্তি ও সরকারী সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত বিধি-নিষেধের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। এর কোনটির মধ্যে উপাচার্যের পদ বা স্বায়ত্ত-শাসিত প্রতিষ্ঠান প্রধানের প্রসঙ্গ নেই। তবুও আমি আইনের কোন ব্যাখ্যায় না গিয়ে বা কারও সঙ্গে বিতর্কে না জড়িয়ে কেন আমি তালুকদার আব্দুল খালেককে সমর্থন করি তার দু’একটি কারণ শুধু উল্লেখ করতে চাই।
বাবার কর্মসূত্রে খুলনার সঙ্গে আমার পরিচয়। এর পর কোন্ সময় থেকে যেন খুলনা আমার শেকড়ের মতো হয়ে ওঠে। ছাত্র জীবনের একটা বড় সময় কেটেছে খুলনায়। ১৯৮১-৮৯ এই দীর্ঘ ৯ বছর পড়াশোনার সূত্রে খুলনায় থেকেছি। ছাত্র রাজনীতির সুবাদে খুলনার আওয়ামী লীগের অনেকের সঙ্গে তখন থেকে সখ্য। পরবর্তীতে অনেক বছর একাধিক্রমে রাজশাহী অবস্থান করায় খুলনার অনেকের স্মৃতি থেকে আমি হারিয়ে যাই। কিন্তু বেগম মুন্নুজান সুফিয়ান আমাকে ভোলেননি। তালুকদার আব্দুল খালেককে সেই ৮০-র দশকে যেমন দেখেছি; এখনও তেমনি কথার চেয়ে তাঁর কাজ বেশি। ১৯৮৪ সালে খুলনার পিকচার প্যালেস মোড়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের দু’টি মিছিলের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে আওয়ামী লীগের মহানগর ও জেলা কমিটির জরুরী সভা বসে। আহতদের পক্ষে থানায় মামলা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু কে মামলা করতে যাবে কর্মীদের পক্ষে এই নিয়ে গড়িমসি শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত তালুকদার আব্দুল খালেকই আহতদের পক্ষে থানায় যান। সম্ভবত তিনি তখন মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। এখনও সেই আগের মতো জীবনী শক্তি তাঁর মধ্যে। মেয়র থাকাকালে ফজরের নামাজের পরেই তিনি বেরিয়ে পড়তেন নগরীর নির্মীয়মাণ রাস্তা পরিদর্শনে। তার গাড়িতে একটা শাবল থাকত। তার অগোচরে যদি কোন রাস্তার পিচঢালাই হয়ে থাকে তাহলে শাবল দিয়ে খুঁড়িয়ে রাস্তার পিচঢালাইটা যথারীতি হয়েছে কি-না তা তিনি পর্যবেক্ষণ করতেন। খুলনা শহরে চলতে গিয়ে অনেক সময়েই দেখেছি প্রখর রোদে তিনি দাঁড়িয়ে রাস্তার কাজ তদারকি করছেন। এসব দেখে মনে হয়েছে এখনও জনগণের জন্য কাজ করার মতো রাজনীতিবিদ আছেন। অনেকের কাছেই শুনেছি যে, অনেক ঠিকাদার তালুকদার আব্দুল খালেকের ওপর নাখোশ। কারণ তারা সিটি কর্পোরেশনের কাজে বেশি লাভ করতে পারেননি। তালুকদার আব্দুল খালেকের অন্য যে বড় গুণ তা হলো তার সময়ানুবর্তিতা। তাঁর সঙ্গে অনেক সভায় বসেছি। দেখেছি ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তিনি তাল মিলিয়ে চলেন। আমি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণের পরই তিনি আমাকে টেলিফোনে শুভেচ্ছা জানান। পাশাপাশি ঐ মুহূর্তেই একটি কথা বলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান নির্মাণ কাজগুলো যেন ভালভাবে সম্পন্ন হয়। আমি অভিভূত হই। চেষ্টা করব বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করি।
যেসব মানুষ পাঁচ বছর আগে খুলনায় এসেছেন, তারা যে কেউ এখন খুলনায় এলে তাদের চোখে বড় ধরনের পরিবর্তন ধরা পড়বে। রাস্তাগুলো প্রশস্ত, পূর্বের তুলনায় উঁচু এবং বেশিরভাগ রাস্তাই ঝকঝকে। কোন ময়লা-আবর্জনা নেই। এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন যেমন নগরবাসীকে ঝলমলে রাজশাহী উপহার দিয়েছেন, নগর ভবনের পশ্চিম পার্শ্ব থেকে মেডিক্যাল কলেজের পূর্বপার্শ্ব হয়ে একেবারে পদ্মা নদী পর্যন্ত রাস্তা প্রশস্ত করেছেন; তালুকদার আব্দুল খালেকও সোনাডাঙ্গা এলাকা ও গোয়ালখালী মোড় এলাকার বেশ কিছু রাস্তা করতে গিয়ে ভাঙ্গা-গড়ার দুঃসাহসী কাজ করেছেন। ব্যক্তিগত সততা না থাকলে এ ধরনের দুঃসাহসী কাজ করা যায় বলে মনে হয় না। এর পাশাপাশি ড্রেন নির্মাণের জন্য বিপুল অঙ্কের অর্থের টেন্ডার হয়েছে বলে শুনেছি।
খুলনা শহরের পশ্চিম প্রান্তে ময়ূর নদী। এর পাশেই ’৭১-এর বধ্যভূমিখ্যাত গল্লামারী যেখানে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত। এই ময়ূর নদীতে ’৭১-এ অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি গল্লামারীতে শহীদদের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য সুবিশাল স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেছেন; অন্যদিকে ময়ূর নদী সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছেন। ময়ূর নদীকে ঘিরে একটা লিনিয়র পার্ক তৈরির জন্য ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। আমরা যারা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছি প্রতিদিনই ময়ূর নদীর ওপরে নির্মিত গল্লামারী ব্রিজ দিয়ে যখন পার হই, তখন ’৭১ আমাদের মনোজগতে এসে হাজির হয়। সে কারণে যখন প্রত্যক্ষ করি যে, খুলনার সকল খাল উদ্ধারের অভিযানসহ তিনি ময়ূর নদীকে আলাদাভাবে প্রাধান্য দেন তখন আবেগপ্রবণ না হয়ে পারি না।
তাঁর সম্পদ বিবরণী নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। পাঁচ বছর পূর্বে তিনি যে সম্পদের মালিক ছিলেন সে তুলনায় এখন সম্পদ বৃদ্ধির হার অনেক বেশি। এ বিষয়ে তিনি সরাসরি বলেছেন যে, তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদার মেয়র এবং তাঁর স্ত্রী হাবিবুন্নাহার রামপাল মংলা আসনের সংসদ সদস্য। তাঁদের দু’জনের বেতন-ভাতা আয়ের অংশ। তাঁর নিজস্ব ব্যবসাও রয়েছে। বৈধভাবেই তিনি অর্থ উপার্জন করেছেন। এ বিষয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে তিনি আরও বলেছেন যে, যদি কেউ প্রমাণ করতে পারে যে, দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি একটি পয়সা উপার্জন করেছেন, তাহলে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন। তাঁর এই অপরিসীম সাহস আমাকে মুগ্ধ করে।
তালুকদার আব্দুল খালেক কয়েক কোটি টাকার দেনা নিয়ে মেয়র হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন। তাঁর দায়িত্ব পরিত্যাগের সময়ে তিনি উদ্বৃত্ত রেখে এসেছেন বলে জানিয়েছেন। সিটি কর্পোরেশনে গিয়ে খবর নিলে নিশ্চয়ই এর সত্যতা জানা যাবে। তিনি একজন সাধারণ গ্রাজুয়েট। কিন্তু তাঁর সৃজনশীলতা প্রশংসার দাবি রাখে। মেয়র হিসেবে তিনিই প্রথম মেয়র পদক চালু করেন। শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, ক্রীড়া, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ প্রভৃতি বিষয়ে অনন্য অবদানের জন্য তিনি প্রতিবছর এই পদক প্রদান করেছেন। গুণী মানুষদেরকে এ ধরনের সম্মাননা প্রদান অবশ্যই উন্নত রুচির পরিচায়ক।
খুলনা শহর এক সময়ে সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে বিবেচিত হতো। এ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম, কমরেড রতন সেন, এসএমএ রব, সরদার আব্দুর রাজ্জাক, সাংবাদিক মানিক সাহা, হুমায়ুন কবির বালু, মোসলেম উদ্দিন, শেখ আবুল কাশেম দিন-দুপুরে সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হন। এজন্য তৎকালীন সময়ে বাইরের কোন লোক খুলনায় আসতে ভীতি অনুভব করত। এমনকি তালুকদার আব্দুল খালেকের জীবনও বিপন্নের মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু তালুকদার খালেক মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই সন্ত্রাসীদের জনপদ খুলনা পরিণত হয় অনেকটা নিরাপদ শহর হিসেবে। তাঁর দায়িত্বপালনকালীন সময়ে পূর্বের তুলনায় মানুষ সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়নি। নগরবাসী নির্বিঘেœ জীবনযাপনের সুযোগ পেয়েছে। খুলনা শহরের প্রতিটি মোড়ে রাত ১২-১টায় মানুষের ভিড় লক্ষ করা যায়। এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে তালুকদার আব্দুল খালেকের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়।
তালুকদার আব্দুল খালেক মেয়রের অফিসকে আওয়ামী লীগের অফিস বানাননি। সেখানে যে কোন দল-মতের লোকই সমানভাবে যেতে পারত। সিটি কর্পোরেশনের অফিসকে তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ রাখার চেষ্টা করেছেন।
আমার অনেক লেখায় আমি আওয়ামী লীগের সমালোচনা করেছি। কালের কণ্ঠে একটি লেখায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহ্জাহান খানের আমি কঠোর সমালোচনা করেছি। তখন কেউ আমার সমালোচনা করেননি। কিন্তু একটি অরাজনৈতিক নির্বাচনে একজন সৎ মানুষকে সমর্থন করার সময় কেন সমালোচনা হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়েরই ২-৩ শিক্ষক ঐক্যবদ্ধ নাগরিক কমিটিতে কাজ করছেন। তাদের কর্মকা- নিয়ে কেউ প্রশ্ন উত্থাপন করছেন না। যদিও ঐ নাগরিক কমিটির যেসব বক্তব্য কাগজে এসেছে তার সবই প্রায় সাম্প্রতিক রাজনৈতিক। অরাজনৈতিক নির্বাচনে রাজনৈতিক বক্তব্য আইনের লঙ্ঘন। এমনকি সাম্প্রদায়িকতা উস্কে দেয়ার মতো কথাবার্তাও রয়েছে তাদের বক্তব্যে। কিন্তু তালুকদার আব্দুল খালেকের সমর্থনে গঠিত সম্মিলিত নাগরিক কমিটি কোন রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান করছে না। শুধু তালুকদার আব্দুল খালেকের কর্মতৎপরতা ও মানুষ হিসেবে তার বৈশিষ্ট্যের কথা বলছে। নগরবাসী এসব বিষয় গ্রহণ করতেও পারে নাও পারে। তবুও তালুকদার আব্দুল খালেকের প্রতি নিরন্তর শুভেচ্ছা।

লেখক : ভিসি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
দৈনিক জনকন্ঠ

Tuesday, May 28, 2013

দোষ মন্ত্রীর নয়, মন্ত্রণালয়ের:প্রভাষ আমিন




বিএনপি আবারও প্রমাণ করলো তারা সত্যিকার অর্থেই জনগণের দল। নইলে তারা যেখানে টানা হরতাল দিতে পারে, সেখানে তারা কেন মাঝখানে দু’দিন বিরতি দিল? জনগণের জন্য। বিভিন্ন বইয়ে পড়েছি, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদাররাও কারফিউর মাঝে বিরতি দিতো, যাতে মানুষ জরুরি কাজকর্ম সেরে রাখতে পারে। ধন্যবাদ প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, আমাদের সুবিধা-অসুবিধার কথা এমন অন্তর দিয়ে ভাবার জন্য। রোববার সারাদেশে নামকাওয়াস্তে হরতাল পালিত হলো, বুধবার আবার পালিত হবে। জনগণ স্বতঃস্ফুর্তভাবে হরতাল পালন করে। কারণ শামসুজ্জামান দুদুর ছাড়া বিএনপির আর কোনো নেতাকর্মীর হরতাল নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, বুধবারের হরতালে বিএনপির একজন নেতাও মাঠে নামবেন না। শুধু জনগণকে ধন্যবাদ দেয়ার জন্য অফিসে বসে থাকবেন দুদু।
অবশ্য দুদুকে এখন দলের নেতা না বলে, বিএনপি অফিসের কেয়ারটেকার বলাই ভালো। কেন হরতাল ডাকা হয়, এতে কার ক্ষতি, কার লাভ? কে জানে। আমার ধারণা বিএনপি নেতারাও জানেন না। যাদের বেকায়দায় ফেলার জন্য এই হরতাল, সেই সরকার থোড়াই কেয়ার করে বিরোধী দলকে। তবে সরকারের ক্ষতি না হলেও বিএনপির ক্ষতি হয়েছে। তার সফরের সময়ে বিএনপি হরতাল ডাকায় রাগ করে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের কর্মসূচি বাতিল করেছেন বাংলাদেশ সফরে আসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের রাজনীতি-বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি আর শারমেন। বিএনপির হরতালে তিনি বিস্ময় ও হতাশা ব্যক্ত করেছেন। আমরাও হতাশ। একদম মেয়েলি অভিমান- আমার সফরের সময় হরতাল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একজন নারীর কাছে বঙ্গ ললনাদের মতো মেয়েলি অভিমান আশা করিনি। মার্কিন সৈন্যরা যেখানে আফগানিস্তানে লড়ছেন তালেবানদের বিরুদ্ধে, সেখানে একজন আন্ডার সেক্রেটারি কিনা হরতালের ভয়ে কুপোকাত। তবে আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দল বিএনপি এসবে থোড়াই কেয়ার করে। বিএনপি জনগণের দল, জনগণের অধিকার আদায়ে তারা হরতাল ডাকে। সেই হরতাল বিদেশি প্রভূদের সফরের সময় বাতিল করতে হবে কেন? হরতাল চলছে, চলবে। কে আসলো-গেল, কবে এইচএসসি পরীক্ষা এসব ভাবতে বিরোধী দলের বয়েই গেছে। এসব তো সরকারি দলের ভাবনা, দেশ তো তারাই চালাচ্ছে, বদনাম হলে তো তাদেরই হবে।
বলছি বটে বিএনপি হরতাল ডেকেছে। তবে আমি বিশ্বাস করি এবারের হরতাল দুটি ডেকেছেন মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর। বলা ভালো, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সৌজন্যে বিরোধী দলের ডাকা হরতাল। একটি গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক দলগুলোকে যদি সভা-সমাবেশ করতে দেয়া না হয়, তাহলে তারা হরতাল ডাকবে না তো কি বসে বসে আঙুল চুষবে? বিএনপি আগে অনেক অপ্রয়োজনীয় হরতাল করেছে। কিন্তু তাদের এবারের হরতাল দুটি বাধ্য হয়ে দেয়া, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের বাধ্য করেছেন। এরকম পরিস্থিতিতেই অনন্যোপায় হয়ে হরতাল ডাকতে হয়। তবে বহুল ব্যবহারে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের এই শেষ অস্ত্রটি অনেক আগেই ভোতা এবং অকার্যকর হয়ে গেছে। তাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সৌজন্যে ডাকা এই হরতালেও জনগণের ভোগান্তি ছাড়া আর কিছু হবে না।
আমি বরাবরই বিশ্বাস করি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ। দোষ প্রতিষ্ঠানের নয়, ব্যক্তির। যেমন আমার দেশ আতাউস সামাদের সময় একরকম ছিল, মাহমুদুর রহমানের সময় হয়ে গেছে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ানোর লিফলেট। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে এই ধারণাটি আমার ভেঙে গেছে। এখানে আসলে ব্যক্তি সমস্যা নয়, সমস্যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণলয়ের। নইলে সব আমলের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীরই একই সমস্যা থাকবে কেন?
এরশাদ পতনের পর বিএনপির প্রথম দফায় একদিন সন্ধ্যায় পুলিশ প্রেস ক্লাবের ভেতরে ঢুকে সাংবাদিকদের বেপরোয়া মারধোর করেছিল। তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মতিন চৌধুরী বললেন, পুলিশ সাংবাদিকদের দেখতে পায়নি। সন্ধ্যায় প্রেস ক্লাবের মতো উন্মুক্ত স্থানে পুলিশ দেখতে পায়নি, এটা কেউ বিশ্বাস করেনি। পরে তার নামই হয়ে গিয়েছিল রাতকানা পুলিশের মন্ত্রী। এরপর আওয়ামী লীগ আমল কেটেছে মোহাম্মদ নাসিমের তর্জন গর্জনেÑ প্রয়োজনে কবর থেকে সন্ত্রাসী ধরে আনা হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর বিএনপি এক আমলেই মাশাল্লাহ দুই জন ‘আল্লার মাল’ উপহার দিলো। অরিজিনাল ‘আল্লার মাল আলতাফ হোসেন চৌধুরী’, যিনি সন্ত্রাসীদের গুলিতে বাবার কোলে থাকা শিশু নওশিনের মৃত্যুর পর সেই শোকাহত বাবাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন এই বলে, ‘আল্লার মাল আল্লা নিয়ে গেছে’। এই আল্লার মালকেও বেগম খালেদা জিয়া সরিয়ে নেয়ার পর স্বরূপে আবির্ভূত হন ততদিন আড়ালে থাকা লুৎফুজ্জামান বাবর। তার জেল দেয়া চুলের স্টাইল, অসাধারণ ইংরেজি জ্ঞান তাকে দিয়েছে অমরত্ব। যদিও অলওয়েজ ‘লুকিং ফর শত্রুজ’ বাবরের গুণের কদর দিতে পারেনি বর্তমান সরকার। আগের সরকারের প্রায় সবাই ছাড়া পেয়ে গেলেও এই বেচারা ২১ আগস্ট আর ১০ ট্রাকের পাল্লায় পড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম করতে করতে ক্লান্ত বিধ্বস্ত। এরপর বর্তমান সরকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয় মাঠের সৈনিক সাহারা খাতুনকে। তার বাণী শুনতে সাংবাদিকদের প্রায়শই উত্তরখান, দক্ষিণখানের কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কাভার করতে যেতে হতো। সাগর-রুনীর খুনীদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়ে তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হন। কারণ তিনি প্রমাণ করেছেন, রাজনীতিবিদরা প্রতিশ্রুতি দেয় তা ভঙ্গ করার জন্যই। এরপর ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার সময় ঘরে তালা দিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলে তাকেই প্রায় বাড়ি চলে যেতে হয়। প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের সপ্তাহে একাধিকবার উত্তরখান যাওয়ার বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি দিয়েছেন। টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর বক্তব্য শোনার আগ্রহ কারো নেই। না সাংবাদিকের, না দর্শকদের। সাহারা খাতুন টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর এক সম্পাদক টক শোতে বলেছিলেন, নতুন মন্ত্রী এসএমএস করতে পারেন না।
এরপর আমরা পেলাম ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীরকে। সুশিক্ষিত, সারাজীবন দক্ষতার সঙ্গে সরকারি চাকরি করেছেন। শুধু তিনি নন, তার পুরো পরিবারই দেশজুড়ে পরিচিত, সম্মানিত। সত্যিকারের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান তিনি। আমি ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীরের একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত। যেভাবে তিনি একটিও ইংরেজি শব্দ উচ্চারণ না করে অনর্গল বাংলা বলে যেতে পারেন, তা রীতিমতো অনুকরণীয়। কিন্তু আমি অনেক চেষ্টা করেও তা অনুকরণ করতে পারিনি। দুয়েকটা ইংরেজি শব্দ ঢুকেই যায়। আমি হলফ করে বলতে পারি, এমন সুশীল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ আগে কখনো পায়নি। বেস্ট অব দ্য বেস্টস। সেরাদের সেরা। কিন্তু এখন দেখছি তিনি সব দিক দিয়েই বেস্ট। সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর তার নাড়াচাড়া তত্ত্ব তো ওয়ার্ল্ড ক্লাসিক জোকসে ঠাঁই পাওয়ার যোগ্য।
কিন্তু সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে তিনি যা বলেছেন, আমার মাথা পুরা আউলাইয়া গেছে। বাংলাদেশে এখন সভা-সমাবেশ করা যাবে কি যাবে না, এটা জানতে গত দু’দিনে খোঁজ-খবর করতে গিয়ে, নানা পত্রিকা পড়ে আমার পাগল হওয়ার দশা। কোনটা বিশ্বাস করবো, কারটা বিশ্বাস করবো- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সকালের কথা না বিকেলের কথা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখের কথা না স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্পষ্টীকরণ বিবৃতি? নাকি সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বক্তব্য? নাকি পুলিশের আইজি? একবার ভেবেছিলাম গুগলে সার্চ দেই। খোঁজ-খবর নিয়ে যা জানলাম এখন বাংলাদেশে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেই, নেই কোনো প্রজ্ঞাপনও। তারপরও সরকার বেআইনিভাবে, অসাংবিধানিকভাবে, কোনো যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা ছাড়াই সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। একবার শুনি সারা বাংলাদেশে, একবার শুনি ঢাকায়; একবার শুনি এক মাস, একবার শুনি অনির্দিষ্টকাল! কোনটা বিশ্বাস করবো? পাগল হতে আর কি লাগে।
প্রিয় পাঠক, চলুন একটু ঘটনাক্রম অনুসরণ করে আসি, দেখি জিলাপির প্যাচ খোলে কিনা। ১৯ মে দুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চট্টগ্রামের মিরসরাইতে জোরারগঞ্জ থানা উদ্বোধন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, “শান্তিপূর্ণ সমাবেশকে আমরা উৎসাহিত করি। যারা আজ সমাবেশের অনুমতি না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, তাদের মনে রাখা দরকার, সমাবেশের অনুমতি নিয়ে দুর্বৃত্তদের হাতে তুলে দেন, জনসাধারণের ওপর অত্যাচার করেন, নির্যাতন করেন, গাড়ি পোড়ান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জিনিসপত্র নষ্ট করেন, দোকান লুট করেন; তাদের যুক্তিসংগত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে আমরা সমাবেশ করার অধিকার স্বীকার করা সত্ত্বেও আগামী এক মাস পর্যন্ত কোনো দলকেই কোনো সমাবেশ করতে দেব না।” মনে রাখুন এখানে ঢাকা না সারাদেশ তা বলা হয়নি। এখানে সুনির্দিষ্টভাবে একমাস বলা হয়েছে। এবার শুনি রাতে বিবিসিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী বলছেন, “রাজনৈতিক দলগুলো শান্তিপূর্ণভাবে সভা-সমাবেশ করবে, এমন নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত রাজধানীতে কোনো দলকেই সভা-সমাবেশ করতে দেয়া হবে না। ঢাকাকে নিরাপদ রাখার জন্য এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ নিষেধাজ্ঞা হবে অনির্দিষ্টকালের জন্য।”
প্রিয় পাঠক, আবার আপনাদের মনে রাখার কষ্ট দেবো। বেশি না, মাত্র দুটি পয়েন্ট। এখানে আমরা পেলাম, সারাদেশ নয়, এই নিষেধাজ্ঞা শুধু ঢাকাতে। আর এক মাস নয়, এই নিষেধাজ্ঞা অনির্দিষ্টকালের জন্য। এবার আমরা একটু ঘুরে আসি ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ব্রিফিং থেকে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “সব সময় সাংবিধানিক অধিকার বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। সাম্প্রতিক মহাসেনের প্রভাবে মৃত্যুর হার বেশি না হলেও অনেক বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। সেখানে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দেশে একটি স্বাভাবিক পরিস্থিতি প্রয়োজন। এ জন্য এক মাস সভা-সমাবেশ করতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।” এখানে আবার একটু থামতে হবে। সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ, তবে অনির্দিষ্টকাল নয়, এক মাসের জন্য। আর নিষিদ্ধ করার কারণ অন্যকিছু নয়, ঘূর্ণিঝড় মহাসেন। তবে এই নিষেধাজ্ঞা ঢাকা না সারাদেশ তা পরিষ্কার নয়। সারাদিন এত বিভ্রান্তির পর রাত ১১টায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আসে স্পষ্টীকরণ বিজ্ঞপ্তি। আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচি, এবার নিশ্চয়ই সব ফকফকা হয়ে যাবে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় “জোরারগঞ্জ থানা উদ্বোধন করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ঘূর্ণিঝড় পরিস্থিতিতে যদি কোনো রাজনৈতিক দল এমন কোনো কর্মসূচি দেয় যাতে জনগণের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা নাশকতার আশঙ্কা থাকে বা সেরূপ লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়, তবে দেশের আইন-শৃঙ্খলা সমুন্নত রাখার স্বার্থে সেসব দলের সভা-সমাবেশের কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেবে না সরকার। তবে সাধারণ সমাবেশ করার ব্যাপারে কোনো আপত্তি নেই। এটা কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং জনগণের জানমাল রক্ষার্থে পূর্বসতর্কীকরণ ব্যবস্থা। এ ব্যাপারে বিভ্রান্তির কোনো অবকাশ নেই।” হায় স্পষ্টীকরণ বিজ্ঞপ্তি! স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্পষ্টীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে কিছুই স্পষ্ট তো হলোই না, বরং আরো ধোয়াটে হলো পরিস্থিতি। বিভ্রান্তির অবকাশ নেই, বলা হলেও বিভ্রান্তি আরো বাড়লো শুধু। কারণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিরসরাই এবং বিবিসিতে একবারও ঘূর্ণিঝড়ের কথা না বললেও মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে সভা-সমাবেশ না করতে না দেয়ার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলো, তার আগেই ভারতে পালিয়ে যাওয়া মহাসেনকে। আবার সৈয়দ আশরাফ ঘূর্ণিঝড়ের কারণে এক মাসের নিষেধাজ্ঞার কথা বললেও মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে কোনো সময় বেঁধে দেয়ার কথা তো বলা হলোই না, বরং বলা হলো এটি কোনো নিষেধাজ্ঞাই নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একবার এক মাস, একবার অনির্দিষ্টকাল বললেও মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হলো, এটি নিষেধাজ্ঞাই নয়। আর পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার সাংবাদিকদের বললেন, তিনি এ ব্যাপারে কোনো দাপ্তরিক আদেশ পাননি। এবার বলুন, কারটা বিশ্বাস করবেন, কোনটা বিশ্বাস করবেন? আমার মতো আপনাদের মাথাও নিশ্চয়ই এলোমেলো হয়ে গেছে।
যে যাই বলুক, আমরা দেখছি আইজির বক্তব্যই এখন পর্যন্ত ঠিক। সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো দাপ্তরিক আদেশ, মানে প্রজ্ঞাপন পাননি দেশবাসী। আসলে প্রজ্ঞাপন আসবে কোত্থেকে, এভাবে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার কোনো এখতিয়ারই নেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। কারণ সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী “জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।” সংবিধানের ১৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা জারি না করা পর্যন্ত সভা-সমাবেশ করার অধিকার হরণের অধিকার কারো নেই। ঢাকায় সভা-সমাবেশ করতে হলে ডিএমপি অ্যাক্ট অনুযায়ী আবেদন করতে হয়। অনুমতি দেবেন কি দেবেন না, তার এখতিয়ার ডিএমপি কমিশনারের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নয়। তাই সভা-সমাবেশ একমাসের জন্য বা অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করার কথা বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসলে ডিএমপি কমিশনারের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করেছেন। নইলে এই বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তের দু’দিন পর মিরপুরে নিরীহ বামদের সমাবেশেও কেন পুলিশ বাধা দেবে এবং তাদের ১৫ নেতা-কর্মীকে আটক করে থানায় নিয়ে যাবে? পরে আবার মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেবে? সভা-সমাবেশ করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা করছেন, তা স্রেফ গায়ের জোরে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ১৯ মে এই নিষেধাজ্ঞার কথা বললেও আসলে ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে ব্যাপক তাণ্ডবের পর থেকেই ঢাকায় কোনো সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি। এর মধ্যে বিএনপি দু’বার সমাবেশের অনুমতি চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পর বিএনপির এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, তারা আর অনুমতির জন্য বসে থাকবে না। কিন্তু আমরা জানি, সরকারের অনুমতি ছাড়া তীব্র আন্দোলন করার হ্যাডম অন্তত বিএনপির নেই। তাই তারা ঝুঁকিমুক্ত কর্মসূচি ডেকে ক্ষান্ত দিয়েছে। হরতাল ডেকে ঘরে বসে থাকলেই হলো।
শুধু বিএনপি নয়, আওয়ামী লীগসহ দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। আপনারা ঠিকই পড়েছেন, সরকারি দল আওয়ামী লীগও এই সিদ্ধান্তে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। এই বিষয়ে সরকারের ৫ রকমের বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম দিয়েছেন ষষ্ঠ লাইন। তিনি বলেছেন, “সভা-সমাবেশ বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়।” তিনি রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু কাঁঠাল গাছে আম চেয়ে তো লাভ নেই। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যারিয়ার আমলা, তার কাছে রাজনৈতিক সমাধান আশা করা কেন? আর সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার জন্য যে যুক্তি দেয়া হয়েছে তা কোনো যুক্তি নয়, অজুহাত। ঘূর্ণিঝড় মহাসেন যে তীব্রতায় আঘাত হানার আশঙ্কা ছিল, আল্লাহর রহমতে তা হয়নি। পটুয়াখালিতে হালকা ছোবল হেনেই পালিয়েছে মহাসেন। পটুয়াখালির ত্রাণ কার্যক্রমের অজুহাতে ঢাকায় এক মাসের জন্য সমাবেশ নিষিদ্ধ কেন? এর আগে বাংলাদেশে কখনো ঘূর্ণিঝড়ের কারণে রাজনৈতিক তৎপরতা সীমিত করা হয়নি। আর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ- এসব তো আমাদের রাজনীতির অনুসঙ্গ। যখন কেউ ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগ করবে তখন সরকারের দায়িত্ব তা প্রতিহত করা। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করবে, ততক্ষণ তাতে বাধা দেয়া বা অনুমতি না দেয়ার কোনো সুযোগ কারো নেই, অন্তত সংবিধান সে সুযোগ দেয়নি। সুনির্দিষ্ট কোনো সমাবেশে যদি সহিংসতার সুনির্দিষ্ট কোনো গোপন খবর থাকে, তবে সে সমাবেশের জন্য অনুমতি না দিলেই হলো। সমাবেশ নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য দেখাতে পারেননি। এক সংগঠনের শৃঙ্খলা-বিরোধী কাজের দায় সব সংগঠনকে নিতে হবে কেন? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেসব অভিযোগ করেছেন, তার সবগুলোই স্পষ্টত ৫ মে হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবের ইঙ্গিতবাহী। তাহলে হেফাজতকে সভা-সমাবেশের অনুমতি না দিলেই হলো। তাই বলে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, নিরীহ বাম সবাইকে এক পাল্লায় মাপতে হবে কেন? সমাবেশ করতে অনুমতি লাগবে এবং মারামারি করা যাবে না- এটা তো নতুন কোনো কথা নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী এক মাস পরে কি দেশে অনুমতি ছাড়াই সমাবেশ করা যাবে? সমাবেশের অনুমতি নিয়ে মারামারি করা যাবে?
এই লেখার প্রস্তুতি হিসেবে নানা জায়গায় ফোন করে আর বিভিন্ন পত্রিকা পড়ে যতটুকু জানতে পেরেছি, প্রধানমন্ত্রী বাণিজ্যিক ও স্পর্শকাতর এলাকায় সমাবেশ করতে না দেয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাছাড়া ব্যস্ত এলাকা বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সমাবেশ সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ধরে আনতে বললে বেঁধে আনার নীতিতে বিশ্বাসী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সমাবেশ নিষিদ্ধই করে দিয়েছেন। আর মারামারি হতে পারে- এমন আশঙ্কায় সমাবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়া তো মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার শামিল। সড়ক দুর্ঘটনা হতে পারে, তাই রাস্তায় না বেরোনো তো কোনো সমাধান হতে পারে না। অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, সামনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গোলাম আযমসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় হতে পারে ট্রাইব্যুনালে। সে জন্যই সরকার বাড়তি সতর্ক। একবার যেহেতু নিষিদ্ধ করা গেছে, সরকার হয়তো রমজানের আগে আর কোনো সমাবেশের অনুমতি দেবে না। সতর্কতায় আপত্তি নেই। কিন্তু সে ক্ষেত্রে সরকার সমাবেশের অনুমতি দেয়ার বিষয়টি কেইস বাই কেইস বিবেচনা করলেই পারতো। আর অনুমতি না দিলে তা ফলাও করে বলতে হবে কেন? প্রত্যেক ক্ষেত্রে আবেদন প্রত্যাখ্যান করলেই আর বিষয়টি নিয়ে এত হইচই হতো না। ‘আই ডোন্ট নো’ অর্থ যে ‘আমি জানি না’, এটা সবাই জানেন। এটা চিৎকার করে বলার কিছু নেই। এরশাদের আমলে আমরা দেখেছি রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ, সীমিত আকারে রাজনীতি করা যাবে, ঘরোয়া রাজনীতির অনুমতি- ইত্যাদি ধরনের টার্ম। আবার সেই স্মৃতি ফিরে আসছে। আমাকে গালি দেয়া যাবে, কিন্তু ঘরে বসে। আরে যে আমাকে গালি দেবে, সে কি আর আমার কথা শুনে দেবে?
বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আমার অনুরাগের কথা আগেই বলেছি। আরেকটি কারণে আমি তার ভক্ত হয়ে গেছি। তাহলো, গণমাধ্যমকে মোকাবেলার সাহস। যখনই কোনো বিতর্কিত কিছু করেন, তখনই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন চ্যানেলের টক শো’তে অংশ নেন। আগের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কখনোই টিভিতে যাওয়ার সাহস দেখাননি। গত বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গিয়েছিলেন ‘একাত্তর’ টিভিতে। শুরুর দিকের কিছুটা মিস করলেও অনুষ্ঠানে তার কথা শুনতে শুনতে আমার অনেক কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। তিনি বলছিলেন, “একটি গণতান্ত্রিক সরকারকে হটাতে আপনারা আলটিমেটাম দেবেন, ভাঙচুর করবেন; সরকার তা মেনে নেবে না।” হায় হায়, এ যে দেখছি ভূতের মুখে রাম নাম। জনাব মহিউদ্দিন খান আলমগীর যখন সচিবের দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় সরকার হটাতে দলবল নিয়ে জনতার মঞ্চে যোগ দিয়েছিলেন, তখনকার বিএনপি সরকার কি গণতান্ত্রিক ছিল না? তিনি আরো বলেছেন, কোনো রাজনৈতিক দল সমাবেশের অনুমতি নিয়ে গাড়ি ভাঙচুর করবে, আগুন দেবে, তা মেনে নেয়া যায় না। খুব ঠিক কথা। তবে তার কথা শুনে মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশের ইতিহাস তখন থেকেই শুরু হয়েছে, এর কোনো অতীত নেই। আওয়ামী লীগ যেন গান্ধীবাদী দল। বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ, বর্তমানে বিএনপি যা করছে তার চেয়ে অনেক বেশি তীব্র ও সহিংস আন্দোলন করেছে। এখন বিএনপি যে দাবিতে, মানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করছে, একসময় আওয়ামী লীগ ঠিক একই দাবিতে এর চেয়ে অনেক বেশি সহিংস আন্দোলন করেছিল। এক দলের সহিংসতার ইতিহাস, আরেক দলের সহিংসতাকে জায়েজ করে না। কিন্তু তাই বলে আওয়ামী লীগের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে অন্তত এমন কথা মানায় না। অবশ্য জিয়াউর রহমানের খাল কাটা আন্দোলনের দোসর নব্য আওয়ামী লীগার মহিউদ্দিন খান আলমগীর যদি আওয়ামী লীগের অতীত অপকর্মের দায়-দায়িত্ব নিতে না চান, তাকে ঠিক দোষ দেয়া যাবে না। একটি সহিংসতামুক্ত, ভাঙচুরমুক্ত, হরতালমুক্ত, সমাবেশমুক্ত নতুন যে বাংলাদেশের স্বপ্ন তিনি দেখছেন; তাতে তাকে অভিনন্দন জানাতেই হয়। একই অনুষ্ঠানে বাসা থেকে তার সাথে যোগ দিয়েছিলেন বিএনপি সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। স্টুডিওতে যতক্ষণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথা বলছিলেন, তিনি তা বলছিলেন নির্বিঘ্নেই। কিন্তু যখনই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক সামিয়া রহমান ব্যারিস্টার খোকনের বক্তব্য জানতে চাইছিলেন, তখনই ঘটছিল বিপত্তি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যারিস্টার খোকনের বক্তব্য শেষ করার সুযোগ না দিয়েই তাৎক্ষণিকভাবে তার প্রতিটি বক্তব্যের প্রতিবাদ করছিলেন। তাতে আমরা শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কিছু আবছা আবছা কথা শুনেছি, ব্যারিস্টার খোকনের কোনো কথাই শুনতে পাইনি। কিন্তু অনুষ্ঠানের শেষ দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সঞ্চালককে বলছিলেন, “আমিই এই অনুষ্ঠানের মুখ্য আলোচক, আমি কোনো বাচালের সঙ্গে কথা বলবো না।” মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। একই অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার দলের নেতা ও মোহাম্মদ নাসিমকে ‘মুখর পুরুষ’হিসেবে অভিহিত করেছেন। মজা করে তিনি এও বলেছেন, মুখরা রমণী বশীকরণের মন্ত্র জানা থাকলেও মুখর পুরুষ বশ করার মন্ত্র তার জানা নেই। হা-হা-হা। তারা দু’জনেই আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। দুজনই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী- একজন বর্তমান, অন্যজন সাবেক। তাদের মধ্যে এমন রসিকতার সম্পর্ক থাকতেই পারে। তবে অনেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে মুখরা রমণী বশীকরণের মন্ত্রটি জানতে চাইতে পারেন। যিনি মুখরা রমণী বশ করতে পারেন, বিরোধী দলকে দমন করা তার কাছে নস্যি। দায়িত্ব পালনকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা পুলিশের জন্য অনেক কিছু করেন। তারপরও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা সবসময় পুলিশের প্রিয় টার্গেট। কেন জানি না। আশা করি ভবিষ্যতে পুলিশ ভাইয়েরা এ ধরনের নিমকহারামী করবেন না। তবে মহিউদ্দিন খান আলমগীর সুশীল ঘরানার মন্ত্রী। পুলিশ হয়তো ভবিষ্যতে টার্গেট বানানোর জন্য তাকে রাজপথে খুঁজেই পাবেন না।
আমি আগেই বলেছি, দোষ আসলে ব্যক্তির নয়, দোষ মন্ত্রণালয়ের, দোষ চেয়ারের। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মচারিরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তার চেয়ারটি সোনা-রুপার পানি দিয়ে ধুয়ে দিতে পারেন, তাতে যদি দোষ কিছুটা কমে। আমার আবেদন, প্রায় অসীম ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তিনি চাইলে যাকে ইচ্ছা তাকে রাষ্ট্রপতি বানাতে পারেন, স্পিকার বানাতে পারেন, মন্ত্রী বানাতে পারেন, দপ্তরবিহীন মন্ত্রী বানাতে পারেন, মন্ত্রিত্ব কেড়ে নিতে পারেন। তবে শেষ বেলার মন্ত্রী গুণী পুরুষ ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীরকে বাদ দেয়ার দাবি করছি না আমি। বরং তাকে পরিকল্পনা, টেলিযোগাযোগ, পাট, ডাক- এ ধরনের অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। তার সুশীলত্ব আর শুদ্ধ বাংলার বক্তৃতার সাথে আর যাই হোক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের মতো কঠিন বিষয়টি যায় না। তিনি যেভাবে একের পর এক নতুন নতুন তত্ত্ব নিয়ে হাজির হচ্ছেন, এখনই না বদলালে এই সরকারকে ডোবাতে আর কাউকে লাগবে না।
পুনশ্চ : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জ্ঞানের এত প্রশংসায় অন্য মন্ত্রীদের মন খারাপ হতে পারে। পরে খুঁজে দেখলাম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একা নন, মন্ত্রিসভায় জ্ঞানী লোক অনেক আছেন। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তো বলেই দিয়েছেন দেশের প্রথম সারির ১৬ সম্পাদক না বুঝে বিবৃতি দিয়েছেন। তার মানে সম্পাদকরা কিছু বোঝেন না, উনি সব বোঝেন। অর্থমন্ত্রীর জ্ঞানের ফিরিস্তি দিতে গেলে আলাদা মহাকাব্য লিখতে হবে। এরশাদেরও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা এই মন্ত্রী শেয়ার বাজার ছাড়া দুনিয়ার আর সবকিছু বোঝেন। এরশাদের অর্থমন্ত্রী ছিলেন বলে কেউ আবার ওনাকে দল বদলের অভিযোগে অভিযুক্ত করবেন না। তিনি এখন মহাজোট সরকারের অর্থমন্ত্রী, যে মহাজোটে এরশাদও আছেন। তার সর্বশেষ বাণী হলো, “গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক মানের বেতন দিলে নাকি তাদের বেতন তার (অর্থমন্ত্রী) সমান হয়ে যাবে।” কী সাংঘাতিক সুখবর। যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন, যাদের সৌজন্যে অর্থমন্ত্রী প্রতিবছর রেকর্ডভাঙা বাজেট দিচ্ছেন, তাদের বেতন যদি একটু বাড়ে ওনার এত লাগে কেন? চাকরি ছাড়া আমার আয়ের আর কোনো উৎস নেই। কিন্তু সারা জীবন দেশে-বিদেশে বড় বড় চাকরি করা আবুল মাল আব্দুল মুহিত আমার চেয়ে কম আয়কর দেন। তার আয় কি তাহলে এতই কম, গার্মেন্টস শ্রমিকদের কাছাকাছি, যে চাইলেই তারা অর্থমন্ত্রীকে ছুঁয়ে ফেলতে পারেন। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে হিংসা না শঙ্কা কোনটা বেশি বোঝা গেল না। তবে আমি মনে করি আমাদের মন্ত্রিসভার সবচেয়ে জ্ঞানী মন্ত্রীর নাম পাটমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী। বাংলাদেশের ‘সোনালি আঁশ’ পাট যখন কৃষকের গলার ফাঁস, তখন তিনি চিন্তিত যুক্তরাষ্ট্রে ট্রেড ইউনিয়ন থাকা না থাকা নিয়ে। আর তিনি বাসায় শুয়ে চিন্তা করেননি। উদ্যমী মন্ত্রী রীতিমতো চিঠি লিখে তার সে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে। সবসময় যুক্তরাষ্ট্র আমাদের জন্য ভাববে কেন, আমাদের মন্ত্রীরাও তাদের দেশে ট্রেড ইউনিয়ন থাকা না থাকা নিয়ে উদ্বিগ্ন। ভাবতে ভালো লাগছে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কেমন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলা ভাই ভাই মনে হচ্ছে। তবে বাঙালির যা স্বভাব, কেউ এগিয়ে যেতে চাইলে অন্যরা পেছন থেকে তাকে টেনে ধরে রাখেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোথায় পাটমন্ত্রীর পাশে দাঁড়াবেন, তা না করে, তিনি বলে দিলেন, এটা তার ব্যক্তিগত মত। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি এর দায়িত্ব নিচ্ছেন না। এটা খুব অন্যায়। তবে এ প্রসঙ্গে আমার কেন জানি, আদার বেপারির জাহাজের খবর- এই বাগধারাটি মনে পড়ে যাচ্ছে। মন্ত্রীদের জ্ঞানের এই বহর দেখে আমার একটি ধারণা বদলে গেছে। মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকের ছবি দেখলে আমার এখন সিপিডির গোলটেবিল বৈঠকের কথা মনে পড়ে যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কিভাবে যে এত জ্ঞানী-গুণীদের সামলান। আল্লাহ মালুম।

প্রভাষ আমিন
probhash2000@gmail.com

কমরেড নিবেদিতা নাগ আমাদের প্রেরণা : শাহ্‌রিয়ার কবির




তিন বছর একরকম শয্যাশায়ী থাকার পর পরপারে পা‍ড়ি দিয়েছেন আমাদের প্রিয় নিবেদিতাদি, বাংলাদেশের ও পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব কমরেড নিবেদিতা নাগ। ৫ই মে ২০১৩ তারিখে কলকাতার হাসপাতাল মৃত্যুবরণের সময় তাঁর বয়স ছিল ৯৫।
পরিণত বয়সে মৃত্যু হলেও আমরা চেয়েছিলাম তিনি শতায়ু হবেন। অনেক দিন কলকাতা যাই না। ভেবেছিলাম ৪ঠা আগস্ট তাঁর ৯৫তম জন্মবার্ষিকীর দিন পার্ক সার্কাস-এর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে অভিবাদন জানাবো। তাঁকে নিয়ে যে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলাম তার কাজও এবার শেষ করবো। আমাদের সে সুযোগ না দিয়ে তিনি চলে গেলেন। তাঁকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্রের পরিকল্পনা প্রচারবিমুখ নিবেদিতাদি সমর্থন না করলেও মেনে নিয়েছিলেন তাঁর প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দাবির কারণে।

অবিভক্ত বাংলার সাম্যবাদী আন্দোলনে কমরেড নিবেদিতা নাগ এক বিশিষ্ট নাম। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোগামী নেতা কমরেড নেপাল নাগের স্ত্রী হিসেবে নন, নিজের যোগ্যতায় সাম্যবাদী আদর্শের প্রতি অবিচল আস্থা রেখে অপরিসীম শ্রম ও ত্যাগের বিনিময়ে তিনি শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন ও সংগ্রামে নিজের বিশিষ্ট স্থানটি নির্দিষ্ট করেছেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল অবধি বিস্তৃত মহান ভাষা আন্দোলনে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশে তাঁকে নাগরিক সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন কলকাতায়। কমিউনিস্ট পার্টির একজন সদস্য হিসেবে তিনি যুদ্ধরত কমরেডদের এবং নির্যাতনের ‍‌শিকার দুর্গত মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।

কমরেড নিবেদিতা নাগ জন্মেছেন ৪ঠা আগস্ট ১৯১৮তারিখে, বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের আমলাপাড়ায় মাতামহ আনন্দ রায়ের বাড়িতে। মা অমিয়াবালা চৌধুরী ছিলেন স্কুল শিক্ষয়িত্রী। বাবা অধ্যাপক সঞ্জীবকুমার চৌধুরী শিক্ষকতা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সম্পন্ন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন তিনি, বেড়ে উঠেছেন এক বিপ্লবী পরিবেশে। পিতা ছিলেন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল অভিযানের মহানায়ক সূর্য সেনের সহপাঠী। তাঁর কাকারা সবাই ছিলেন সূর্য সেনের বিপ্লবী দলের সদস্য। চট্টগ্রামের সুচিয়া গ্রামে তাঁর ‍‌পৈত্রিক বাড়ি ছিল বিপ্লবীদের গোপন কর্মকাণ্ডের অন্যতম ঘাঁটি। স্কুলে থাকতেই নিবেদিতা বিপ্লবীদের সাহায্যের জন্য চাঁদা তুলতেন, গোপন চিঠিপত্র আদানপ্রদান করতেন, এমনকি বাড়িতে বিপ্লবীদের অস্ত্রও লুকিয়ে রাখতেন।

স্কুল ছাত্রী নিবেদিতা‍‌কে বিপজ্জনক মনে হওয়াতে দু বছরের জন্য তাঁকে চট্টগ্রাম থেকে বহিষ্কার করা হয়, যে কারণে নারায়ণগঞ্জে মায়ের পৈত্রিক বাড়িতে থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯৩৪ সালে। ১৯৩৭ সালে কলকাতায় বেথুন কলেজে পড়ার সময় তিনি সর্বভারতীয় ছাত্র ফেডারেশনে যোগদান করেন। সংগঠনের ডাকে ধর্মঘট সংঘটিত করতে গিয়ে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন। ’৩৮ সালে চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ থেকে বি এ পাস করেন। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে এম এ পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, অসুস্থতার জন্য এক বছর পরীক্ষা দিতে পারেননি। ১৯৪১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সান্নিধ্য লাভ করেন, যিনি পরবর্তী জীবনে তাঁকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করেছেন।

কমরেড নিবেদিতা নাগ ১৯৪৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ’৪৩ সালে ঢাকা জেলা মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবাধীন নারী সংগঠনে কাজ করতে গিয়ে তিনি সহযোদ্ধা ‍হিসেবে পেয়েছেন আশালতা সেন, লীলা রায়, মণিকুন্তলা সেন ও সুফিয়া কামালের মতো বরেণ্য নেত্রীদের। পার্টির কাজে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন য‌ুঁইফুল রায়, অণিমা সিংহ, কনক মুখোপাধ্যায়, নিরুপমা গুপ্ত, অমিয়া দত্ত, হেলেনা বসু, নীলিমা বসু, শান্তি দত্ত, ডলি বসু, পঙ্কজ আচার্য প্রমুখ কমিউনিস্ট নেত্রীদের।

১৯৪৩-এর ১৭ই মে কমরেড নেপাল নাগকে তিনি বিয়ে করেন পরিবারের অমতে। ততদিনে তিনি স্থির করেছেন বাকি জীবন পার্টির কাজে আত্মনিয়োগ করবেন। নেপাল নাগ তখন ঢাকার কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং নারায়ণগঞ্জে শ্রমিক আন্দোলনের পুরোগামী নেতা হিসেবে পার্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন। স্বামী স্ত্রী দু’জন পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হওয়ার কারণে চরম আর্থিক অনটনে তাঁদের দিন‍ কেটেছে। শৈশবে ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো খেতে দিতে পারেননি কিন্তু পার্টির কাজ এবং কমরেডদের অফুরন্ত ভালোবাসা তাঁদের সেই অভাব পূরণ করেছে। তিনি সব সময় বলেন চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে কমিউনিস্ট পার্টির কমিউন জীবন ও কমরেডদের সান্নিধ্য তাঁর অভিজ্ঞতাকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে।

১৯৪৮ সালে বাংলাদেশে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্ব থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের সদস্য হিসেবে এর সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। গোপন কমিউনে হাতে লিখে স্টেনসিল কেটে সাইক্লোস্টাইলে ইশ‍্‌‌‍‌তেহার ছেপে বিলি করেছেন, রাতের অন্ধকারে দেওয়ালে পোস্টার লাগিয়েছেন; অমানুষিক পরিশ্রমে শরীর বার বার বিদ্রোহ করেছে কিন্তু কাজ থেমে থাকেনি।

’৪৯ সালে জেলে গিয়েছেন, পার্টির নির্দেশে বন্দী নির্যাতনের প্রতিবাদে কারাগারের ভেতর অনশন করতে গিয়ে নিজেও নির্যাতনের ‍‌শিকার হয়েছেন, তারপরও কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হননি।

স্বামী-স্ত্রী দু’জন পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হলে সন্তানদের ঠিকমতো লালন-পালন সম্ভব হয় না। নেপাল-নিবেদিতা দম্পতির দুই পুত্র কন্যা সুজয় ও সুমিতাকে আ‍‌শৈশব অপুষ্টির শিকার হয়ে নানা ধরনের অসুখে ভুগতে হয়েছে। ’৫৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে মস্কো যাওয়ার আগে তাদের ঠিকমতো চিকিৎসাও হয়নি। ফলে অন্য সব সর্বক্ষণের পার্টি দম্পতিদের ক্ষেত্রে যা হয়েছে — নিবেদিতা নাগ কমিউন জীবন থে‍‌কে বেরিয়ে এসে স্কুলে চাকরি নিয়েছেন। এর আগে অবশ্য নারায়ণগঞ্জে তোলারাম কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন এবং এই কলেজের প্রতিষ্ঠা অধ্যক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০০ সালে তিনি যখন দীর্ঘকাল পর বাংলাদেশে আসেন তখন নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজের শিক্ষক ও ছাত্ররা তাঁর জন্য বিশাল সংবর্ধনার আয়োজন করেছিল। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর কলকাতার বাড়ি ছিল কমিউনিস্ট মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি।

তাঁর পার্টি জীবন ও কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে ঢাকা ও কলকাতায়। দীর্ঘ পার্টি জীবনে বহু বিপ্লবী নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সংস্পর্শে এসেছেন তিনি। স্থায়ীভাবে ঢাকা ছেড়েছেন প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে। তারপরও ২০০০ সালে তাঁকে নিজেদের কাছে পেয়ে ঢাকার সুহৃদ, স্নেহভাজন ও শুভানুধ্যায়ীরা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন। বিভিন্ন সংবর্ধনা সভায় তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল সেই সব দিনের স্মৃতিচারণ করেছেন।

বড়দা শহীদুল্লা কায়সার ছিলেন তাঁর অনুজপ্রতিম সহযোদ্ধা। ভাষা আন্দোলনের সময় একই কমিউনে ছিলেন তাঁরা। বড়দার প্রতি তাঁর স্নেহ ও ভালোবাসার ভাগ থেকে আমিও বঞ্চিত হইনি। ২০০২-এর জানুয়ারিতে প্রথমবার কারাগার থেকে মুক্তির পর কলকাতার ইংরেজি দৈনিক ‘স্টেটসম্যান’-এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনে আমার প্রতি তাঁর অপত্য স্নেহ ব্যক্ত করেছিলেন — ‘শাহরিয়ার আমার সন্তানের মতো। ওর গ্রেপ্তারের সংবাদে আমি অসুস্থ হয়ে শয্যা গ্রহণ করেছিলাম। আজ ওর মুক্তির সংবাদ শুনে আমি সুস্থ হয়ে গেছি।’ তাঁর কলকাতার বাড়িটি আমার মতো অনেকের কাছে তীর্থ সমান। তাঁর সান্নিধ্য আজও যে কারো জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও প্রেরণাদায়ক।

তাঁর অনুজপ্রতিম সহযোদ্ধা কনক মুখোপাধ্যায়ের অনুরোধে পার্টির পত্রিকায় নিবেদিতা নাগ নিয়মিত লিখছেন চল্লিশের দশক থেকে। পার্টির পত্রিকার বাইরেও লিখেছেন তিনি, প্রথম জীবনে বেতারের জন্য কথিকা লিখে ঢাকার রক্ষণশীলদের সমূহ উষ্মার কারণ হয়েছিলেন। ’৩৯ সালে ঢাকা বেতারে তাঁর প্রথম ইংরেজি কথিকা প্রচারের পর সেই সময়ের দৈনিক ‘চাবুক’ প্রথম পাতায় শিরোনাম করেছিল ‘অবশেষে ভদ্রঘরের মেয়েরাও রেডিওতে নামিয়াছেন!’

তিনি যখন ২০০০ সালে ঢাকা এসেছিলেন নেদারল্যান্ডের একটি আর্কাইভের জন্য তাঁর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলাম। এরই ভিত্তিতে আমাদের চাপে পড়ে তিনি লিখেছিলেন ‘ঢাকা থেকে কলকাতা: নয় দশকের স্মৃতি’।
তিনি কায়িকভাবে না থাকলেও তাঁর কর্মে এবং আমাদের স্মৃতিতে সব সময় সজীব থাকবেন। তিনি বেঁচে থাকবেন আমাদের প্রগতির আন্দোলনের অফুরন্ত প্রেরণা হয়ে।

Monday, May 27, 2013

• প্রসঙ্গ প্রভাষ আমিনের লেখা: “প্রিয় সম্পাদকবৃন্দ, আপনাদের দাবি প্রত্যাহার করুন” : পুলক ঘটক


আমি প্রভাষ আমিনের একজন অনুরাগী পাঠক। তিনি আমাকে বলেছেন তার লেখার উপর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে। দুর্বল হাতে একজন দক্ষ লেখকের কর্মের সমালোচনায় ভয় পাই। কিন্তু নিজের ভাললাগা মন্দলাগার উপর জোর খাটেনা। সেটা স্বাভাবিক স্রোতে বেরিয়ে আসে। প্রভাষদা’র এই লেখাটা আমার ভাল লাগেনি। তার লেখার যে ধার তা এখানে তা অনুপস্থিত। ১৬ সম্পাদকের বন্দনাগীতি দীর্ঘ করে তিনি নিজের মূল উপস্থাপনাকে লঘু করে ফেলেছেন। প্রভাষ আমিনের বক্তব্যের মুল অংশের সাথে আমার ভিন্নমত নেই।
বিবৃতিদাতাদের সম্পর্কে প্রভাষ আমিন বলেছেন, “তালিকার সবাই আমার পরম শ্রদ্ধেয়।” তার এই বক্তব্য সত্য বলে আমার মনে হয় না। এদের কয়েকজনকে তিনি শ্রদ্ধা করেন, আমিও করি। তবে আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি এদের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি আছেন যাদের তিনি মোটেই শ্রদ্ধা করেন না। এই ১৬ জনের মধ্যে (প্রভাষদার জ্ঞাতসারেই) এমন লোক আছেন যার পেশাগত উত্থানের পেছনে পেশাদারিত্ব, দক্ষতা এবং সততার চেয়ে অন্য কিছু বিষয় মুখ্য ছিল - যা শ্রদ্ধা করার মত নয়। এই ১৬ জনের মধ্যে এমন সম্পাদকও আছেন যিনি অপ-সাম্প্রদায়িকতায় মাহমুদুর রহমানের অগ্রপথিক। প্রভাষ আমিন ভাল করেই জানেন যে এই ১৬ জনের কয়েকজন মাহমুদুর রহমানের মতই তাদের নিজ নিজ পত্রিকাকে সাম্প্রদায়িকতা ও গণহত্যার উস্কানিযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। প্রভাষ আমিন আরও একশ’ বার লিখলেও একথা তার বন্ধুরা বিশ্বাস করবে না যে তিনি ওদের শ্রদ্ধা করেন। এ কথা লিখে তিনি বস্তুনিষ্ঠতা বিসর্জন দিয়ে, তার ব্যক্তি নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পেয়েছেন।
সবাইকে অতি শ্রদ্ধা করতে গিয়ে তিনি “সস্তা জনপ্রিয়তাবাদী” রাজনীতিকের মত Populist Policy’র আশ্রয় নিয়েছেন। কেবল ভাবিকে সন্তুষ্ট করার জন্য তার ময়লামাখা বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নিয়ে “বাবা সোনা,” “মা সোনা” বলার মানে হয় না। মানে হয়তো হয়; কিন্তু সেটা ভিন্ন রকমের।
একথায় কেউ যেন মনে করবেন না যে, আমি প্রভাষদার লেখার উদ্দেশ্য মহত্ত নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছি। তিনি কল্যানকামী এতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। ইদানিং মিডিয়ায় ”নিরপেক্ষবাদের” জয়জয়কার- যে নিরপেক্ষবাদ আসলে “এ পক্ষেও থাকব, ওপক্ষেও থাকব; এদিক থেকেও নেব ও দিক থেকেও খাব” এধরণের মতবাদ বৈ ভিন্ন কিছু নয় । বর্তমান সময়ে এই “নিরপেক্ষ” ভাবমূর্তি অনেকেরই আত্ম-প্রতিষ্ঠার চাবিকাঠি। এই মিথ্যা নিরপেক্ষবাদি অতিকথনের কবলে একজন ভালমানুষও পড়তে পারে। আমার ধারণা এধরণের একটা পরিবেশে প্রভাষ আমিন তার ব্যক্তিগত নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে বস্তুনিষ্ঠতা হারিয়ে বসেছেন।
১৬ সম্পাদকের বিবৃতিতে প্রভাষ আমিন ভবিষ্যত সম্পাদক ফোরামের যে ভ্রুণ দেখতে পেয়েছেন তা ইতোমধ্যে বৃক্ষ্য ছানারুপে আর্বিভূত হয়েছে। আরও কিছু মুখ যুক্ত করে সম্পাদকদের একটা পরিষদ হয়েছে। এই সম্পাদক পরিষদের সভাপতি মাহমুদুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক ইনকিলাবের বাহাউদ্দিন হতে পারতেন। তারা এখনও হননি, ভবিষ্যতে হয়তো হবেন।
প্রভাষ আমিন লিখেছেন, “আমাদের সব প্রাপ্তি যখন দলবাজির চোরাবালিতে হারিয়ে যায়, তখন এই ফোরামটি হতে পারে দলনিরপেক্ষতার বাতিঘর, আমাদের সবার আশ্রয়, জাতির সত্যিকারের বিবেক। গণমাধ্যমের প্রধানদের এই ফোরামটির সঙ্গে নিত্যদিন জনগণের সরাসরি যোগাযোগ। তাই আমাদের সরকারি দল, বিরোধী দল এদের সঙ্গে পরামর্শ করেই তাদের কর্মপন্থা ঠিক করতে পারেন। কী করলে জনগণের ভালো হবে, জনগণ খুশী হবে, তাদের চেয়ে ভালো আর কে জানেন।”
তার এই বক্তব্যের প্রায় প্রতিটি শব্দের সাথে আমি দ্বিমত পোষণ করছি। কেবল দ্বিমত নয় তীব্র আপত্তি জ্ঞাপন করছি। প্রতিটি লাইন খন্ডন করার জন্য কথা বাড়ানো যুক্তিসঙ্গত হবেনা। কারণ এগুলো স্বতঃখন্ডিত। বাঙ্গালীর জাতীয় মানষ এই ১৬ জনের হাতে গড়ে উঠেনি। এদের কয়েকজন কিছু সময় ভাল অবদান রেখেছেন - বাকিরা সময়ে, অসময়ে, সবসময়ে মাহমুদুরীয় ভূমিকা পালন করেছেন। ঐক্যবদ্ধ বিবৃতিটি ১৬ জনকেই উগ্রসাম্প্রদায়িক মাহমুদুরের পক্ষে নিয়ে গেছে -প্রতিক্রিয়াশীল অংশটিকে প্রগতির পক্ষে একটি কথাও উচ্চারণ করাতে পারেনি। তাদের যৌথ বিবৃতিতে মাহমুদুরের গ্রেফতারের বিরোধিতা আছে- মাহমুদুরের অপকর্মের সমালোচনায় একটি শব্দও নেই। স্বেক্ষেত্রে তারা ঐকমত্য পোষণ করতে পারেন নি।
“সরকারি দল, বিরোধী দল এদের সঙ্গে পরামর্শ করেই তাদের কর্মপন্থা ঠিক করতে পারেন।” হায়, হায়....... এরা থাকতে সরকারি দল বা বিরোধী দলের আর দরকার কি ? সংবাদপত্র নীতিমালায় অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের অবশ্যই সুপারিস থাকবে। তবে কাজটি করতে হবে রাষ্ট্রকেই।
“বিভিন্ন নামে সংবাদপত্রের মালিক-সম্পাদকদের একাধিক সংগঠন আছে। তারা সংবাদপত্রের ছুটি, নিউজপ্রিন্টের দাম, বিজ্ঞাপনের মূল্য, ওয়েজবোর্ড- এই ধরনের নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়েই শুধু মাথা ঘামান,” প্রভাষদার এই বক্তব্য দিবালোকের মতই উজ্জ্বল। “কিন্তু এই বিবৃতিতে যে ফোরামের ভ্রুণ লুকিয়ে আছে তা আরো বৃহত্তর বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পারে। নির্ধারক হতে পারে সাংবাদিকতার মানদণ্ডের,” এই বক্তব্য আমাকে আশ্বান্বিত করার পরিবর্তে শংকিত করেছে।
কোনো ভাল কাজে ৫জন গুরুত্বহীন মানুষের একত্রিত হওয়াটাও আনন্দদায়ক। খারাপ কাজে কিংবা একজন র্দুবৃত্তের মুক্তির দাবিতে ১৬ বিশিষ্টজনের একমত হতে পারাটা মোটেই আনন্দদায়ক নয়। এটা আমাদের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য একটা অশনি সংকেত।
"এই তালিকায় ইত্তেফাক, জনকণ্ঠ, ভোরের কাগজ, সংগ্রাম, দিনকাল-এর মত মূলধারার বাকি কয়েকটি পত্রিকার সম্পাদকদের যুক্ত করে নিলেই এটি হতে পারে দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফোরাম।" -তার এই বক্তব্যের সাথে আমি মোটামুটি একমত। আদর্শহীন এধরণের ঐক্য দেশের জন্য ভাল কিছু দেয়ার পরিবর্তে ব্যাক্তি বা গোষি্ঠ স্বার্থে বড় ভুমিকা রাখতে পারে। নানা বিষয়ে ভিন্নমত থাকলেও একসাথে মদ খাওয়ার ব্যাপারে আমরা জোট পাকাতেই পারি।
এই সম্পাদকবৃন্দ হয় সংবাদপত্রের মালিক, নয়তো মালিকের প্রতিভূ। মালিক শ্রেণীর যে কোনও ধরনের ঐক্য কায়েমি স্বার্থকে সংরক্ষণ করে কিংবা নতুন কায়েমি স্বার্থের জন্ম দেয়। জনকল্যানের বিরুদ্ধেই থাকে তার অবস্থান। মালিক-সম্পাদকদের এধরণের অনেকগুলো সংগঠন এবং তাদের এযাবতকালের কর্মকান্ডের কিছুটা উল্লেখ তিনি নিজেই করেছেন। তাদের শ্রেণী স্বার্থের বাইরে তারা কিছুই করবেনন।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। প্রভাষদা হয়ত বলবেন “সম্পাদকদের উপর শ্রদ্ধা হারানো পাপ।” আমিও আপাতত: আশাবাদি হয়ে সম্পাদকদের এই ফোরামকে স্বাগত জানাচ্ছি। তবে আমার মনে হয় মালিকদের ঐক্যের চেয়ে বেশী জরুরী সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ ইউনিয়ন। এদের একজন সম্পাদকও কি এক্ষেত্রে সহায়ক হবেন? সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে অগ্রণী ভূমিকা নেবেন? আমি আশাবাদি হতে চাই।
আমার দেশ বন্ধের মধ্যদিয়ে আমাদের অনেক সহকর্মির রুট-রুজি’র উপর আঘাত এসেছে। সংবাদপত্রটি আবার প্রকাশিত হোক সেটা মনে প্রাণে চাই। কিন্তু একটি কথা মনে রাখতে হবে। সংবাদপত্র কর্মসংস্থানের প্রতিষ্ঠান হলেও বিড়ি তৈরির কারখানার মত নয়। আমার দেশ বের হলেও সেটা যেন ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টির উস্কানি যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
মাহমুদুর রহমানের মুক্তি নয়, সাম্প্রদায়িক বিষবাস্প ছড়ানোর অন্যতম হোতা এই ভয়ঙ্কর গণদুষমনের হাত থেকে মানুষের জান-মাল রক্ষার প্রয়োজনে আমি তাকে কারারুদ্ধ রেখে বিচার করার পক্ষে। দু’ চারটে খুনের কোনও আসামী জামিনে ছাড়া পেলে মিডিয়াগুলো সমালোচনায় সোচ্চার হয়ে উঠে। বর্তমানে শতাধিক খুণ, অগ্নিসংযোগ, মন্দির-বিগ্রহ ভাঙ্গার মূল মদদ দাতার মুক্তির দাবিতে সেই মিডিয়ার কর্ণধাররা একত্রিত হয়েছেন। সাম্প্রদায়িক, “অসাম্প্রদায়িক” নির্বিশেষে ১৬-সম্পাদক একাট্টা। দাবি, মাহমুদুর রহমানকে মুক্তি দিতে হবে।
এই সম্পাদকবৃন্দ আমাদের (কামলা সাংবাদিকদের) দ্বন্ড-মুন্ডের বিধাতা। এদের সবার রোষানলে পরলে আর চাকরি করার জায়গা থাকেনা। তবুও বলব, মাহমুদুর রহমানের বিচারের দাবি উঠেছিল গণ-জাগরণ মঞ্চ থেকে। সেই দাবির সঙ্গে ছিলাম, আছি থাকব।

১৫ সম্পাদকের মাহমুদুর রহমানের পক্ষ নেয়া :স্বদেশ রায়


দেশের নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শাহবাগকে কেন্দ্র করে একত্র হবার পর বাংলাদেশের সমগ্র সমাজ ও রাজনৈতিক জীবনে অনেক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। দৃশ্যত মনে হতে পারে এটা বিস্ময়কর, কিন্তু বাস্তবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ ১৯৭৫-এর পনেরো আগস্টের পর থেকে আপোসকামী এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের দাপটে যে নষ্ট সমাজ গড়ে উঠেছে এ দেশে, শাহবাগই প্রথম তাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই এখন এ সমাজে অনেক কিছু ঘটবে। যার কোন কিছুতেই বিস্মিত হবার কোন কারণ নেই। বরং শুধু এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কঠিন নিক্তিতে ফেলে পরিমাপ করতে হবে কোনটি সঠিক আর কোনটি সঠিক নয়।
দেশের স্বাধীনতার সপক্ষের মানুষ এবং নতুন প্রজন্মের ৫ থেকে ৬ কোটি তরুণ-তরুণী মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করে শাহবাগকে প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে সত্য, কিন্তু শাহবাগ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এই জাগ্রত রূপ বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে অনেককে। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ যাদের নেতা শেখ হাসিনা পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছেন, এখন আর আমার মারা গেলেও কোন দুঃখ নেই। কারণ দেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পরিচালিত হবে। তারপরও বলতে পারি, অনেক আওয়ামী লীগার ও আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে তারা ঠিক শতভাগ পছন্দ করতে পারছেন না শাহবাগের জাগরণকে। কারণ তাদের কাছে মনে হচ্ছে, এটা তারা এতদিন যে পথে চলছিল ওই পথে একটি বাধা হবে। সত্যি এটা বাধা হবে। কারণ শাহবাগের তরুণদের দাবি, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে বাংলাদেশে। অর্থাৎ এ দেশের মানুষের জন্য অর্থনীতি গড়তে হবে। গত প্রায় ৩৯ বছর ধরে জামায়াতে ইসলামী যে লাখ লাখ কোটি টাকার মৌলবাদী অর্থনীতি গড়ে তুলেছে ওই অর্থনীতি কোন মতেই টিকে থাকতে দেয়া হবে না। সেটাকে বন্ধ করে দিতে হবে। এটা আওয়ামী লীগের একটি অংশের জন্য খুবই সমস্যার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ওই অংশটি মৌলবাদীদের সঙ্গে মিলিতভাবে ব্যবসাবাণিজ্য করে। তাই এখানে তাদের স্বার্থে হাত পড়েছে। এছাড়া আরেকটি গ্রুপ আছে আওয়ামী লীগে যারা দীর্ঘদিন মৌলবাদী ও ধর্ম ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আপোস করে করে এখন আর ঠিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর শতভাগ বিশ্বাস রাখতে পারছে না। তারা মনে করছে দেশের মানুষও তাদের মতো গত ৩৯ বছরে পরিবর্তন হয়ে গেছে। তাই তারা একটি দোদুল্যমানতায় আছে। এবং এ ক্ষেত্রে তাদেরকে সব থেকে বেশি প্রভাবিত করছে তথাকথিত সুশীল সমাজ মিডিয়ার মাধ্যমে। কারণ এই সব আওয়ামী লীগ নেতার উপলব্ধি করার ক্ষমতা নেই যে, এই তথাকথিত সুশীল সমাজ পাকিস্তান আমলে আইউব-মোনায়েমের মাধ্যমে সৃষ্ট এবং বাংলাদেশে জিয়া ও এরশাদের মাধ্যমে সৃষ্ট। তাই এরা শেষ বিচারে ধর্ম ব্যবসায়ী ও মৌলবাদীদের পক্ষে থাকবে।
আওয়ামী লীগের বিপরীতে বাংলাদেশে বিএনপি। বিএনপি এখন তাদের সকল পর্দা ফেলে দিয়ে প্রকাশ্যে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে একাত্ম হয়েছে। কারণ তরুণ প্রজন্মের মিরপুর ঘোষণার পরে বিএনপির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে গেছে, যদি না এ দেশে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির অস্তিত্ব তারা টিকিয়ে রাখতে পারে। কারণ তরুণ প্রজন্ম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে অনান্য স্বাধীন দেশের মতো বাংলাদেশের সরকার ও বিরোধী দলকে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের হতে হবে। বিএনপি জিয়াউর রহমান নামক মুক্তিযুদ্ধের একটি পর্দা পরে থাকে ঠিকই, কিন্তু তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিরই প্রতিনিধিত্ব করে। তাই বর্তমানে যে অবস্থানে বিএনপি আছে ওই অবস্থানে থাকলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এ দেশে জয়লাভ করলে বিএনপির স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটবে। ঠিক তেমনিভাবে স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটবে মৌলবাদী অর্থনীতিসহ তথাকথিত সুশীল সমাজের। যারা আউয়ুব, জিয়া ও এরশাদ দ্বারা গঠিত।
মুক্তিযুদ্ধের এই জাগ্রত চেতনাকে রুখে দিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি হবার পর থেকেই সব থেকে ন্যক্কারজনক ভূমিকা নেয় পত্র-পত্রিকার মধ্যে আমার দেশ। এবং তার তথাকথিত বা বাইচান্স সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। এই পত্রিকাটি যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য কী কী করেছে তা গত কয়েক মাস দেশের মানুষ দেখেছে। তারপরে দেখেছে কিভাবে তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের তরুণ সমাজকে নাস্তিক ও নষ্ট প্রজন্ম হিসেবে উপস্থিত করার জন্য, মিথ্যে বিষয় উপস্থাপন করেছে। এবং কিভাবে একের পর এক মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে দেশের স্বাধীনতার চেতনার বিরুদ্ধে ও যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে কীভাবে কাজ করেছে। পৃথিবীর কোথাও কোন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে এভাবে প্রচারণা চালানো যায় না। কোন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সেটাকে গ্রহণ করে না। কোন গণতন্ত্র সে সুযোগ দেয় না। কিন্তু সেই কাজ মাহমুদুর রহমান করেছে। সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে দাঙ্গা বাধিয়েছে। হিন্দুদের বাড়ি-ঘর-মন্দির ভাঙচুর করানোতে উস্কানি দিয়েছে। যে কারণে দেশের মানুষের স্বার্থে, স্বাধীনতার চেতনার স্বার্থে ও সমাজের শান্তির স্বার্থে তাকে গ্রেফতার করার সঙ্গত দাবি ওঠে নানান মহল থেকে। কিন্তু সরকার প্রথমে তাতে কান দেয়নি। যার ফলে মাহমুদুর রহমান দেশের ও দেশের মানুষের অনেক ক্ষতি করতে সমর্থ হন। যাহোক, সরকার শেষ অবধি তাকে গ্রেফতার করছে।
এখন মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করার পর সম্পাদকের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বার্থের নামে তাকে মুক্তি দেবার দাবি জানিয়েছে দেশের ১৫ বিশিষ্ট সম্পাদক। যার ভিতর ইনকিলাব ও নয়া দিগন্ত পত্রিকার সম্পাদক আছে। এ দুটি পত্রিকাও মূলত আমার দেশ যে কাজ করে সেই কাজই করে চলেছে। আমার দেশ যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে যা করেছে তারপরও এদেশে তার প্রকাশনা অব্যাহত ছিল। গণতন্ত্রের পীঠস্থান ব্রিটেনেও এমন পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি দেবে কিনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে এই পত্রিকা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এই দুটি বিষয় নিয়ে মনে হয় ১৫ সম্পাদকের এই বিবৃতির পর এ সমাজে নতুন করে ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে। কারণ এখানে সকলেই যে মাহমুদুর রহমানের কীর্তিকে জায়েজ করার জন্য এ কাজ করেছেন এটা সাংবাদিক হিসেবে আমার পক্ষে বিশ্বাস করা কষ্ট। যেমন যে পত্রিকা গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে একটি সংখ্যায় হাসনাত আবদুল হাই ও অদিতি ফাল্গুনিকে দিয়ে নোংরা গল্প লিখিয়েছে। যাদের জনমত জরিপে হেফাজতীদের উত্থান, জামায়াতের তা-ব, বিরোধী দলের কর্মীদের দ্বারা হিন্দুদের বাড়ি-ঘর ও মন্দির ভাঙ্গা এমনকি হিন্দুদের অস্ত্রের মুখে মিছিলে নিয়ে তাদের দিয়ে নারায়ে তকবির/আল্লাহু আকবার বলানোÑএ সব নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। এসব পত্রিকার কর্ণধাররা মাহমুদুর রহমানকে সমর্থন করবেন। তাছাড়া যারা একাত্তরে রাজাকার ছিলেন পাকিস্তান বেতারে ‘প্লেন ট্রুথ’ লিখতেন। বঙ্গবন্ধু এসে তাকে প্রেস সেক্রেটারি করার পর শুধু প্লেন ট্রুথ লেখা নয়, তিনি পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর মনোরঞ্জনের জন্য আর কি কি করেছিলেন সেগুলো দৈনিক গণকণ্ঠে ছাপা হলে বঙ্গবন্ধু তাকে সরিয়ে দিতে বাধ্য হন। তারা আজ যতই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা বা সম্পাদক হন না কেন, তারা কিন্তু শেষ বিচারে মাহমুদুর রহমানের পক্ষেই থাকবেন। কারণ যে রাজাকার তিনি যুদ্ধাপরাধী রক্ষাকারীর পক্ষেই থাকবেন। তাই তাদের নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হচ্ছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে আমরা কতদূর যাব সেটা এখনই মনে হয় ভেবে দেখার দরকার। যেমন আজ অনেক গণতান্ত্রিক দেশে অনেক নির্বাহী কাজে বিচার বিভাগ বার বার হস্তক্ষেপ করাতে সে সব দেশ নতুন করে ভাবছে কোর্টের হাত কতদূর যাবে? ঠিক তেমনি আমাদেরও ভেবে দেখার সময় এসেছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে আমরা কতদূর যেতে পারি। ভিন্ন মত আর দেশদ্রোহিতা বা দেশের ভিতর অস্থিরতা সৃষ্টি করার জন্য প্রচারণা চালানো কি একই বিষয়? ভিন্ন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য মিথ্যা প্রচারণা চালানো কি একই বিষয়?
মাহমুদুর রহমান যেটা করেছেন সেটা কিন্তু তিনি দেশের কোন একটি মতের সঙ্গে ভিন্ন মতপ্রকাশ করেননি। তিনি মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে সমাজে অস্থিরতা ও হত্যা-খুনের উস্কানি দিয়েছেন। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা ও সে বিচারে বাধা দেবার জন্য যা যা করা দরকার সব করেছেন। তিনি দেশকে লাদেনের অনুসারীদের দিয়ে তালেবানী রাষ্ট্র বানানোর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। তাদেরকে তার পত্রিকার মাধ্যমে ও সশরীরে উপস্থিত হয়ে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন। এখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে আমাদের অনেক সম্মানিত সম্পাদক কি সেখানে যাবেন? যে মত দেশের স্বাধীনতার চেতনার বিরুদ্ধে, যুদ্ধাপরাধী রক্ষার পক্ষে সর্বোপরি সেটা মতামত নয় সেটা দেশের অস্তিত্বের ও সমাজের শান্তির বিরুদ্ধে প্রচারণা।
আমার দেশের এই মিথ্যা প্রচারণার মুখোশ সত্যিকার অর্থে যদি কোন মিডিয়া উন্মোচন করে থাকে সেটা এ দেশের সর্বাধিক প্রচারিত ইংরেজী দৈনিক ডেইলি স্টার। ফটোশপের মাধ্যমে মিথ্যা ছবি প্রকাশ করে আমার দেশ কি করেছে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ার মতো রিপোর্ট করেছে ডেইলি স্টার। শুধু যে এটা উন্মোচন করেছে তা নয়, এই সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেক অন্ধকার সময়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যেমন ২০০১ সালে যখন হিন্দুদের ওপর হাবিয়া দোযখ নেমে আসে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মাধ্যমে। সে সময়ে বিদেশীরা কিন্তু প্রথমে বিশ্বাস করছিল না। কারণ ওই ঘটনাগুলো কেবল বাংলা পত্রিকা দৈনিক জনকণ্ঠ ছাপছিল। সেদিন প্রথম আলো ধর্ষিতা পূর্ণিমার প্রেস কনফারেন্সের খবরও ছাপেনি। ওই দুঃসময়ে ডেইলি স্টার তাদের শুত্রুবারের ম্যাগাজিনটাই করে ওই এথনিক ক্লিনজিংয়ের ওপর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দিয়ে। এর পরে অবশ্য বিদেশীরা বিশ্বাস করে ঘটনা। তারা সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকায় যায় এবং ঘটনার ভয়াবহতা দেখে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এরপর কিছুটা রক্ষা পায় বাংলাদেশের হিন্দু সমাজ। শুধু তাই নয়, গণজাগরণ মঞ্চ নিয়ে ডেইলি স্টারের ভূমিকা ছিল অনবদ্য। পাশাপাশি সাঈদীর রায়ের পর হিন্দুদের ওপর যে অত্যাচার ও হত্যা নির্যাতন নেমে আসে সেখানে ডেইলি স্টার ছিল অগ্রণী ভূমিকায় সত্য তুলে ধরতে। তাই এর পর ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম যুদ্ধাপরাধী রক্ষাকারীর পক্ষে দাঁড়িয়েছেন ওই বিবৃতিতে সই করে এটা সাংবাদিক হিসেবে বলতে পারি না। তাছাড়া মাহফুজ আনামের ওপর বিশ্বাস রাখা যায়। কারণ তার পিতা আবুল মনসুর আহমদ। যিনি আওয়ামী লীগের মন্ত্রী হিসেবে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে এই কৃষি বাংলাকে শিল্প বাংলার পথে তুলে আনার অন্যতম রূপকার। তাই মাহফুজ আনাম এক জেনারেশন নন। তার অতীত আছে। বর্তমান আছে। তার মেয়ের দিকে তাকালে বলা যায় তার পরবর্তী প্রজন্মও আছে।
তাই স্বাভাবিকভাবে এই বিবৃতিটি ছাপার পর প্রশ্ন উঠেছে, অনেকেই সই করতে পারেন। যারা ’৭১-এ রাজাকার ছিলেন তারা সই করতে পারেন। যারা সুবিধাবাদী তারা সই করতে পারেন এ বিবৃতিতে। কিন্তু মাহফুজ আনাম বা তার মতো যারাÑতারা নিশ্চয়ই কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি চিন্তা করে করেছেন।
আমরা যারা সাংবাদিক, যে কোন অবস্থায়, যে কোন মূল্যে আমরা মতপ্রকাশের পক্ষে থাকব। কিন্তু আমাদের কি ভেবে দেখতে হবে না, আমাদের মতপ্রকাশ যেন আমার দেশ সৃষ্টির মাতৃজনন কোষ অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস না করে। আমার মতপ্রকাশ যেন কোন মতেই দেশ ধ্বংসকারী মৌলবাদীদের হাতকে শক্তিশালী না করে। আমেরিকা এখনও জেফারসনের কথা মানে, এখনও সেখানে প্রথম পছন্দ স্বাধীন সংবাদপত্র। তারপরও আমেরিকা কি লাদেনের কোন অনুচরকে সম্পাদক করে সেখানে লাদেনের মত প্রকাশ করার জন্য কোন পত্রিকা ছাপার অনুমতি দেবে? আর যদি লাদেনের কোন অনুচর সে কাজ করে তাহলে তাকে কি গ্রেফতার করবে না? আর তার গ্রেফতারের পর কি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, বস্টন গ্লোব, নিউইয়র্ক পোস্ট, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর, শিকাগো টাইমসের সম্পাদকরা লাদেনের ওই অনুচরের মুক্তি দাবি করে বিবৃতি দেবেন? মাহমুদুর রহমান যে গোলাম আযম বা জামায়াতের একজন অনুচর ও তাদের জন্য, যুদ্ধাপরাধীদের জন্য কাজ করছেন সেটা প্রমাণিত হয়ে গেছে গণজাগরণ মঞ্চ সৃষ্টি হবার পর। এরপর কি ভেবে দেখব না মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে আমরা কতদূর যাব? গণজাগরণ মঞ্চ সৃষ্টির পর এখন বাংলাদেশের সব রাজকার-আলবদর ও তাদের সন্তানরা এক হবে। কিন্তু তাই বলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে তাদের পক্ষে দাঁড়াতে হবে? এমনকি যারা এই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অংশ, এই দেশের অন্যতম জাতীয় নেতাদের সন্তান তারাও গোলাম আযমের অনুচরের পক্ষে যাবেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে কোন একটি মরীচিকাকে সামনে রেখে?
দেশে ৩৯ বছর পর তরুণ প্রজন্ম স্বাধীনতার চেতনাকে বুকে ধারণ করে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে চূড়ান্ত আঘাতের প্রস্তুতি নিয়েছে। এ সময়ে সবারই কি একটু সচেতন হওয়া উচিত নয়? কারণ স্বাধীনতাবিরোধীরা ৩৯ বছরে অনেক অর্থবিত্ত, অনেক শক্তি সঞ্চয় করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ১৯৭১-এর মতো তরুণরা শুধু প্রাণকে পুঁজি করে নেমেছে। এ সময়ে বড় অবস্থানে বসে যদি ভুল হয়, লোভের কাছে পরাজয় হয়, সেটা হয়তো তরুণ প্রজন্মের বিজয়কে ঠেকাতে পারবে না কিন্তু কিছুটা হলেও কাঁটার ক্ষত বাড়াবে। রক্ত ঝরাতে কিছুটা হলেও সাহায্য করবে স্বাধীনতাবিরোধীদের। সূত্র:দৈনিক জনকন্ঠ