Tuesday, September 18, 2012

বাংলাদেশ পরপর তিনবার স্থিতিশীল অর্থনীতি সমেত বিএ৩ রেটিং পেয়েছে



ঢাকা: ঢাকা, সেপ্টেম্বর ১৮ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- আন্তর্জাতিক ঋণমাণ সংস্থা মুডি’স এর রেটিংয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি তৃতীয়বারের মতো বিএ-৩ রেটিং অর্জন করেছে, যা অর্থনীতির সুষ্ঠু ও জোরালো অগ্রগতির জন্য স্বীকৃতি।

তাৎক্ষণিক ঝুঁকি মোকাবেলায় অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির উপর ভিত্তি করে মুডি’স বাংলাদেশের সার্বভৌম রেটিং নির্ধারণ করেছে।

‘ঋণ পর্যালোচনা: বাংলাদেশ সরকার’ শীর্ষক মুডিসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দশকে বাংলাদেশ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার চলমান ধারা অর্জন করলেও রেটিংয়ে থাকা সবগুলো দেশের চেয়ে এর মাথাপিছু জিডিপি কম।

এ ছাড়াও প্রবাসী আয়ের উপর নির্ভরশীলতা ও স্বল্প বৈচিত্র্যের রপ্তানি খাত নিম্নমুখী বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০১১ সাল পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির চাপ বেড়েছে। তাছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার ভারসাম্যেও পতন অব্যাহত ছিল। সম্প্রতি এসব উপাদান নিয়ন্ত্রণে এলেও বছরে প্রায় ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যুত খাতের প্রতিবন্ধকতাগুলোর মৌলিক সমাধান করতে হবে।

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে; যথাসময়ে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

পর্যালোচনায় আরো বলা হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বাংলাদেশের রেটিংয়ের জন্য প্রতিবন্ধক। দুর্বল শাসন ব্যবস্থা বাংলাদেশের দক্ষতা উন্নয়নের পথে বাধা এবং তা বিনিয়োগের পথে ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিতে পারে বলে মনে করে মুডিস। তবে এপ্রিলে শুরু হওয়া আইএমএফের কর্মসূচি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গতি এনেছে।

এদিকে মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিগত বছরগুলোর মতো এ বছরও মুডিস মূল্যায়নে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে শুধু ভারত এক ধাপ এগিয়ে রয়েছে।


বিএ রেটিং প্রাপ্ত গ্রুপের দেশগুলোর গড় বার্ষিক মাথাপিছু আয় চার হাজার ৬২০ ডলার। সেই তুলনায় বাংলাদেশের গড় বার্ষিক মাথাপিছু আয় সাড়ে পাঁচগুণ কম। এতো কম আয়ের দেশ হয়েও বাংলাদেশের রেটিং ওই সব সমৃদ্ধ দেশের সমান।
আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা মুডিস প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। মঙ্গলবার মুডিস বাংলাদেশের ওপর তাদের বার্ষিক পর্যালোচনা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশ স্থিতিশীল অর্থনীতি সমেত বিএ৩ রেটিং পেয়েছে। পরপর তিনবার বাংলাদেশ একই রেটিং পেল।এই রেটিং বাংলাদেশের অর্থনীতির চলমান অগ্রগতি প্রকাশ করে।

শান্তি চুক্তির ফলে পাহাড়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বন্ধ হয়েছে , ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাতায়াত বেড়েছে ;আমি যখন আছি- তখন আপনাদের সমস্যা দেখব"-প্রধানমন্ত্রী


ঢাকা, সেপ্টেম্বর ১৮ -মঙ্গলবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে পার্বত্য জেলাগুলোর তিন সার্কেলের হেডম্যানদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় আশ্বাস দিয়েছেন । প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠা হওয়া প্রয়োজন। আমি যখন আছি- তখন আপনাদের সমস্যা দেখব।”

পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী এসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।

“আমি চাই- আপনাদের ঐতিহ্য, নিয়ম ও প্রথা যেন বজায় থাকে”, হেডম্যানদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন “আমি তো চাই- আপনাদের ঐতিহ্য, নিয়ম ও প্রথা যেন বজায় থাকে”,।
চিরদিন থাকব না। বার বার এই সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।” ভূমির মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে জমি রেজিস্ট্রির বিষয়ে মনোযোগী হওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

পাহাড়ের সমস্যা সমাধানে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই পার্বত্য শান্তি চুক্তি হয়েছিল স্মরণ করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “আপনাদের ভরসা থাকা উচিত- আমরা যখন শান্তি চুক্তি করেছি, তখন তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব আমাদের।”

“আগের সরকার সমস্যা জিইয়ে রেখে ফায়দা লুটতে চেয়েছিল। আর এই সমস্যা তাদেরই সৃষ্টি”, অভিযোগ করেন তিনি।

সবাইকে সহনশীল আচরণ করার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “নিজের দেশে কেন সংঘাত হবে? রক্ত ঝরবে?”কোনো গোষ্ঠী, সংস্থা বা উন্নয়ন সহযোগীর নাম উল্লেখ না করে শেখ হাসিনা বলেন, “আমাদেরও ছাড় দিতে হবে। আপনাদেরও দেখতে হবে, আপনারা কতোটা ছাড় দিতে পারেন। অনেকে বন্ধু সেজে কাছে আসবে। কিন্তু মঙ্গল হবে না।”


এর আগে চাকমা সার্কেলের প্রধান রাজা দেবাশীষ রায় পার্বত্য এলাকার খাজনা সীমিত পরিমাণে হলেও বাড়ানোর কথা বলেন। সার্কেল চিফ, হেডম্যান ও কারবারীদের ভাতা বাড়ানোর দাবি জানান খাগড়াছড়ি জেলার হেডম্যান শক্তিপদ চাকমা।

বান্দরবান জেলার হেডম্যান মাসৈড়ি মারমা পার্বত্য এলাকায় শিক্ষার প্রসার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে খাগড়াছড়ির ১৯ মৌজার হেডম্যান আন্নাইউ চৌধুরী ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি আইন সংশোধনসহ সবার পক্ষ থেকে বেশ কিছু দাবি-দাওয়া প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভাতা বৃদ্ধি করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।“কিঞ্চিৎ হলেও বাড়ানো হবে”, বলেন তিনি।

এর আগে গত ৬ জুলাই হেডম্যানদের সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী সার্কেল চিফদের মাসিক ভাতা এক হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার, হেডম্যানদের ভাতা বাড়িয়ে এক হাজার টাকা এবং কারবারিদের জন্য মাসিক পাঁচশ টাকা ভাতার ব্যবস্থা করার কথা বলেন


পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, “ভূমি কমিশনের বৈঠকে তো আপনাদের সমস্যার কথা বলতে হবে। যোগ না দিলে তো সমস্যা জানা যাবে না।” শান্তি চুক্তির ফলে পাহাড়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বন্ধ হয়েছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাতায়াত বেড়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

ঢাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম ভবনের কাজ দ্রুত শুরু করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরাকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

বিবাহ নিবন্ধন ঐচ্ছিক রেখে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন বিল পাস


হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিবাহ নিবন্ধনের বিধান ঐচ্ছিক রেখে ‘হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন বিল-২০১২’ সংসদে পাস হয়েছে। এ আইন কার্যকর হওয়ার আগে হিন্দু ধর্মমতে অনুষ্ঠিত বিয়ে এ আইনের অধীনে নিবন্ধন করা যাবে বলেও বিধান রাখা হয়েছে।মঙ্গলবার বিলটি জাতীয় সংসদে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের পক্ষে পাসের প্রস্তাব করেন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। পরে এটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। উল্লেখ্য, ভারতে ১৯৫৫ সালে ‘হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্ট’ প্রণীত হয়েছে।

গত ৩ জুলাই বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হয়। পরে এটি পরীক্ষা করে সংসদে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।হিন্দু বিবাহের দালিলিক প্রমাণ রাখা ও বিবাহ সংক্রান্ত প্রতারণা থেকে হিন্দু নারীদের রক্ষা করতে এ বিল পাস করা হয়েছে।

বিলের জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব উত্থাপনের সময় একমাত্র স্বতন্ত্র সদস্য মোহাম্মদ ফজলুল আজিম ‘ঐচ্ছিক’ বিধান বাদ দেওয়ার দাবি জানান। পরে সংশোধনী প্রস্তাব ওঠানোর সময়েও তিনি বিয়ের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার দাবি জানান। পরে সেটি কণ্ঠভোটে নাকচ হয়।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিবাহ তাদের শাস্ত্রমতে অনুষ্ঠিত ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর কোনো দালিলিক প্রমাণ থাকে না। দালিলিক প্রমাণ না থাকার কারণে বিবাহ পরবর্তী বিবাহ সংশ্লিষ্ট যে কোনো বিষয় মৌখিক সাক্ষ্য প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিবাহের যে কোনো পক্ষ বিশেষত: হিন্দু নারীরা বিভিন্নভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। তাদের সহজে আইনি সুরক্ষা প্রদান করা সম্ভব হয় না। বর্তমানে বিদেশ ভ্রমণ, অভিবাসন ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিবাহ নিবন্ধন সম্পর্কিত দালিলিক প্রমাণ একটি অপরিহার্য বিষয়।

আরো বলা হয়েছে, প্রতারণার সুযোগ বন্ধ করা এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা সৃষ্টির লক্ষ্যে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন প্রণয়ন করা সমীচীন। বিলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিবাহ ঐচ্ছিকভাবে নিবন্ধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি আইন প্রণয়নের জন্য হিন্দু সম্প্রদায় থেকে দাবিও উত্থাপিত হয়েছে।

বিলের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার সিটি করপোরেশন এলাকার ক্ষেত্রে সময় সময় নির্ধারিত এলাকা এবং সিটি করপোরেশন বহির্ভূত এলাকার ক্ষেত্রে প্রতিটি উপজেলা এলাকায় একজন ব্যক্তিকে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধক হিসেবে নিয়োগ দেবে।বিলের ৫ ধারায় বলা হয়েছে, অন্য কোনো আইনে যাই থাকুক না কেন, ২১ বছরের কম বয়স্ক কোনো হিন্দু পুরুষ বা ১৮ বছরের কম বয়স্ক কোনো হিন্দু নারী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে তা এ আইনের অধীন নিবন্ধনযোগ্য হবে না।

প্রস্তাবিত আইনের ৬ ধারায় বিবাহ নিবন্ধনের পদ্ধতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, হিন্দু ধর্ম, রীতিনীতি ও আচার অনুষ্ঠান অনুযায়ী হিন্দু বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর ওই বিবাহের দালিলিক প্রমাণ সুরক্ষার উদ্দেশ্যে যে কোনো পক্ষের নির্ধারিত পদ্ধতিতে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিবন্ধক নির্ধারিত পদ্ধতিতে বিবাহ নিবন্ধন করবেন।

Sunday, September 16, 2012

সমঝোতার ফলে দেশ অনিবার্য গৃহযুদ্ধ থেকে মুক্তি পেয়েছে :পিলখানা হত্যাকাণ্ড: জেরায় সাক্ষী প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির



পিলখানা হত্যা মামলায় সাক্ষী স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেছেন, সেদিন সমঝোতার ফলে দেশ অনিবার্য গৃহযুদ্ধ থেকে মুক্তি পেয়েছে। সমন্বয় না থাকায় সেদিনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি—জেরায় আসামিপক্ষের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এসব কথা বলেন।
রাজধানীর বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী মহানগর দায়রা জজ আদালতে গতকাল সোমবার প্রথমে জবানবন্দি দেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। পরে আসামিপক্ষের আইনজীবী তাঁকে জেরা করেন। এই মামলার সাক্ষী আওয়ামী লীগের সাংসদ মির্জা আজমও আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
জাহাঙ্গীর কবির জবানবন্দিতে বলেন, বাসা থেকে সচিবালয়ে যাওয়ার সময় সকাল ১০টার দিকে মৎস্য ভবনের কাছে টেলিফোনে জানতে পারেন, পিলখানায় গোলাগুলি হচ্ছে। এরপর তিনি যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের হুইপ মির্জা আজমকে ফোন করে প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন বাসভবন যমুনায় যাওয়ার অনুরোধ জানান। তিনিও গাড়ি ঘুরিয়ে যমুনায় যান।

পরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বেলা একটার দিকে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ও মির্জা আজমকে পিলখানায় গিয়ে বিডিআরের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান করা যায় কি না, সেই চেষ্টা করে দেখতে বলেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পালনে ব্রতী হয়ে তাঁরা পিলখানার উদ্দেশে রওনা হন। তিনি বলেন, ‘পিলখানার ফটকে গিয়ে মাইকে আমার ও মির্জা আজমের নম্বর জওয়ানদের দেই। আমরা সাদা পতাকা হাতে এগোতে থাকি। একপর্যায়ে তারা আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে, অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করে। কিন্তু গণতন্ত্রের স্বার্থে আমরা এগিয়ে যাই। জওয়ানরা আমাদের বলেন, “প্রধানমন্ত্রীকে পাঠান, তাঁর সঙ্গে কথা বলব। আমরা সেনাবাহিনীর চেয়েও শক্তিশালী। আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাব। ঢাকা শহর তামা করে দেব।” একপর্যায়ে আমাদের দিকে রাইফেল তাক করে বলে, “তোদের মেরে ফেলব।”’
জেরা: জবানবন্দির পর জাহাঙ্গীর কবিরকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলাম।
প্রশ্ন: যেসব সৈনিককে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসায় গিয়েছিলেন এবং হোটেল আম্বালায় আলোচনায় বসেছিলেন, তাঁদের কারও নাম কি আগে থেকে জানতেন?
নানক: না।
প্রশ্ন: গন্ডগোলের খবর পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর বাসায় ঢোকার আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারও কাছে কি ফোন করেছিলেন?
নানক: না, করিনি।
প্রশ্ন: যমুনায় যাওয়ার পর আপনার মোবাইলে বারবার ফোন আসছিল, এ কথা তদন্ত কর্মকর্তাকে বলেছিলেন, যা তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় নথিভুক্ত করেছেন।
নানক: এটা মনে নেই।
প্রশ্ন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিয়ে একটি ও সেনাবাহিনীর একটি তদন্ত কমিটি হয়েছিল, জানতেন?
নানক: সেনাবাহিনীরটা জানতাম।
প্রশ্ন: সেনাবাহিনীর তদন্ত কমিটি আপনাকে কি ডেকেছিল?
নানক: হ্যাঁ, আমি সেখানে জবানবন্দি দিয়েছি।
প্রশ্ন: সেনাবাহিনীর তদন্ত দলের কাছে সাক্ষাৎকার দিয়ে আসার পর অসুস্থ হয়ে সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন?
নানক: আমি কবে গেলাম বলেন? এটা সত্য নয়।
প্রশ্ন: ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় প্রধানমন্ত্রীর রাতের খাবারের দাওয়াত ছিল। ২৪ তারিখে সেটা বাতিল করা হয়েছিল, জানেন?
নানক: জানা নেই।
প্রশ্ন: বিদ্রোহ শুরুর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সাংসদ ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে সৈনিকদের দাবিদাওয়া নিয়ে কথা হয়েছিল?
নানক: জানা নেই।
প্রশ্ন: পিলখানার ভেতরে হত্যাযজ্ঞের খবর কখন পেয়েছিলেন?
নানক: ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেল পাঁচটার দিকে পিলখানার ভেতরে যাওয়ার পর হত্যাযজ্ঞের খবর জানতে পারি।
প্রশ্ন: বাইরে কিছু লোক মারা যাওয়ার খবর?
নানক: পিলখানার বাইরে কিছু বেসামরিক লোক, পুলিশ আহত হওয়ার খবর আগে পেয়েছিলাম।
প্রশ্ন: আপনি তো তদন্ত কর্মকর্তার কাছে ১৬১ ধারায় জবানবন্দিতে বলেছিলেন, ‘আমরা বাসার ভেতর গিয়ে দেখি, যমুনায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধানগণ এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কথা বলছেন।’
নানক: এটা স্মরণে নেই।
প্রশ্ন: প্রধানমন্ত্রী তো তাঁর বক্তৃতায় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন?
নানক: এটা ছিল শর্ত সাপেক্ষে।
প্রশ্ন: আপনারা যাঁদের মুক্ত করেছিলেন, তাঁদের নাম বলতে পারবেন?
নানক: না, মনে নেই।
প্রশ্ন: বিদ্রোহের পর ১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী সেনাকুঞ্জে দরবারে গিয়েছিলেন, জানেন?
নানক: আমি যাইনি।
প্রশ্ন: সেনাকুঞ্জে আপনার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
নানক: সেটা আমি জানি না।
মাসুদের জবানবন্দি: নানকের জেরা শেষে আদালত কিছু সময় মুলতবি হয়। এরপর বিমানবাহিনীর উইং কমান্ডার (বর্তমানে চীনে বাংলাদেশের দূতাবাসে সহকারী সামরিক উপদেষ্টা) সৈয়দ ফখরুদ্দিন মাসুদ জবানবন্দি দেন। মাসুদ বলেন, ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় একটি হেলিকপ্টার নিয়ে পিলখানার ওপর দিয়ে উড়ে যান। পরে তাঁকে বলা হয়, পিলখানা থেকে হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে গুলি হচ্ছে। তখন তিনি তিন হাজার ফুট ওপরে চলে যান।
আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ জানতে চান, হেলিকপ্টারে কজন বসতে পারেন? জবাবে মাসুদ বলেন, দুজন পাইলটসহ আটজনের বসার ব্যবস্থা আছে। আইনজীবী বলেন, ‘আপনারা হেলিকপ্টার থেকে পিলখানায় বৃষ্টির মতো গুলি করেছিলেন।’ সাক্ষী বলেন, ‘এটা সত্য নয়।’
পরে ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট মিনহাজুল মুনিরা জবানবন্দি শুরু করার কিছুক্ষণ পর আদালতের কার্যক্রম আগামীকাল বুধবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
প্রতিমন্ত্রী দ্রুত বক্তব্য দেওয়ায় বিচারক জহুরুল হক তাঁকে আস্তে বলার অনুরোধ করে বলেন, ‘ব্রিটিশ পদ্ধতিতে আদালত চলছে। মাননীয় মন্ত্রী দেখে যান, বিচারব্যবস্থা কীভাবে চলছে।’

শিক্ষানীতির জন্য ছাত্রসমাজের সংগ্রামের ৫০ বছর নুরুল ইসলাম নাহিদ |




আজ ১৭ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের শিক্ষানীতির জন্য গৌরবময় সংগ্রামের অর্ধশতাব্দী পূর্ণ হলো। ১৯৬২ সালের সেই গৌরবের দিনটি আমরা প্রতিবছর ‘শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছি।
ষাটের দশকে আমাদের দেশের গৌরবময় ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র সংগঠনগুলোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক শাসক আইয়ুব খানের চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষানীতি প্রতিরোধ করা এবং একটি গণমুখী, অগ্রসরমাণ, বিজ্ঞানমনস্ক, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, আধুনিক শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা কায়েম করা। ১৯৬২ সালে তথাকথিত জাতীয় শিক্ষানীতি, ১৯৬৪ সালে হামুদুর রহমান কমিশনের শিক্ষানীতি, ১৯৬৯ সালে এয়ার মার্শাল নূর খানের নেতৃত্বে শিক্ষানীতি—সবই তৎকালীন ছাত্র আন্দোলনের মুখে বাতিল করতে পাকিস্তানি সরকার বাধ্য হয়েছিল।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে একটি শিক্ষানীতি প্রণয়নের কাজ প্রায় চূড়ান্ত করে আনলেও তাঁকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যার পর, তা আর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এরপর প্রায় তিন দশক ধরে পাঁচ-ছয়টি শিক্ষানীতি প্রণয়নের চেষ্টা করা হলেও কোনোটির বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০’ প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করে চলেছে। বাষট্টির গৌরবময় ছাত্র আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে আমি শিক্ষানীতির আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলাম। আজ অর্ধশতাব্দী পর সফল শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গেও আমি সরাসরি সম্পৃক্ত আছি। আজকের এই শিক্ষা দিবসে গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি সেদিনের শহীদ বাবুল, মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহসহ শিক্ষা আন্দোলনের সব নেতা-কর্মীকে।
জাতীয় শিক্ষানীতি দু-এক বছরের মধ্যেই সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করার বিষয় নয়। ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিছু বাস্তবায়িত হয়েছে, অনেকগুলো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াধীন। ২০১১ সালের মধ্যে সব শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তি এবং ২০১৮ সালে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১১ সালের মধ্যেই ৯৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ শিশুকে বিদ্যালয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। অন্যটির জন্য বহু কার্যক্রম ও প্রস্তুতি চলছে।
অনেকে বলেন, শিক্ষানীতি তো বাস্তবায়িত হলো না। তাঁদের ধারণা, কোনো এক সরকারি ঘোষণায় এক দিনে সবকিছু বাস্তবায়িত হয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের এই দরিদ্র দেশে প্রায় সাড়ে তিন কোটি শিক্ষার্থী। মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নিরক্ষর, বহু ধারার শিক্ষাপদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। দুনিয়ার মধ্যে শিক্ষায় সবচেয়ে কম অর্থ বরাদ্দ করা হয় যেসব দেশে, বাংলাদেশ তার অন্যতম। পুরোনো পদ্ধতি, পুরোনো পাঠ্যক্রম, পুরোনো ধ্যান-ধারণার অধিকাংশ শিক্ষক, সুযোগ-সুবিধার অভাব, বিভিন্ন পর্যায়ের ক্ষমতাবানদের চাপ এবং তার ফলে যথাস্থানে উপযুক্ত লোক নিয়োগদানে বাধা, এমনকি আইন ও বিধিমতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি করাও বড় বাধা ইত্যাদি হাজার সমস্যা কাটিয়ে ওঠা এবং একদিকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, অন্যদিকে দক্ষ জনবল, দক্ষ শিক্ষক, দক্ষ পরিচালকসংকট ইত্যাদি তো সচেতন মহলের একেবারেই অজানা নয়।
এসব বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে সীমাবদ্ধ সম্পদের ব্যবহার করে আমাদের এগোতে হচ্ছে। অতীতের অনিয়ম, দুর্নীতি, বিশৃঙ্খলা ও জঞ্জাল পরিষ্কার করে একটি স্বচ্ছ, দক্ষ, গতিশীল ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলার কাজ শুরু থেকেই আমরা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের অনেক ত্রুটি, সীমাবদ্ধতা ও বাধা রয়েছে, তা আমরা বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা থেকে সংশোধন করে সঠিক পথে এগিয়ে যাচ্ছি।
নিচে বর্তমান সরকারের সময়ে শিক্ষা খাতে অগ্রগতির কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো:
১. সব মত-পথ, শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে প্রচার, আলোচনা, সভা-সেমিনার, ওয়েবসাইটে মতামত, লিখিত মতামত গ্রহণ ইত্যাদির মাধ্যমে জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়ন করা সম্ভব হয়েছে। এই প্রথম একটি জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে।
২. ২০১১ সালের মধ্যে প্রাথমিক স্তরে ৯৯ দশমিক ৪৭ শতাংশের বেশি শিশু স্কুলে ভর্তি করা সম্ভব হয়েছে। ঝরে পড়ার হার ৪৮ শতাংশ থেকে কমে ২১ শতাংশে নেমে এসেছে।
৩. আন্তর্জাতিকভাবে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের নির্ধারিত বছর ২০১৫ সাল। কিন্তু আমরা তার অনেক আগেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ছেলে ও মেয়েদের সংখ্যাসমতা অর্জন করেছি এবং তা এখন স্থিতিশীল। উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। শিক্ষায় ছেলেমেয়েদের সমতা অর্জন এখন সারা বিশ্বে বাংলাদেশ আদর্শ (মডেল) দেশ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
৪. ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক, ইবতেদায়ি, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, দাখিল মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের হাতে ১ জানুয়ারি মোট ৬৫ কোটির অধিক পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এর আগে শুধু প্রাথমিক স্তরে ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া হতো। তা-ও মার্চ-এপ্রিলের আগে সম্ভব হতো না। ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারিতে নতুন পাঠক্রম (কারিকুলাম) অনুযায়ী লিখিত প্রায় ২৭ কোটি বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে।
৫. বর্তমানে যেসব পাঠ্যপুস্তক পড়ানো হয়, তা লেখা হয়েছে ১৬ বছর আগে। ইতিমধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞান বিশেষ করে প্রযুক্তির জগতে অভাবনীয় বিপ্লব ঘটে গেছে। এর প্রভাব আমাদের পাঠ্যপুস্তকে নেই। আমরা পাঠ্যক্রম যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নিয়েছি। গত বছর নতুন পাঠক্রমে সাতটি নতুন বই দিয়েছি। ২০১৩ সালে আরও ৮৬টি নতুন পাঠক্রমের বই তুলে দেওয়ার কাজ চলছে।
৬. সারা দেশে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষা, অষ্টম শ্রেণী শেষে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও মাদ্রাসায় জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুলে ধরে রাখা, সারা দেশে সমমান অর্জনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখন আর ভিন্নভাবে বৃত্তি পরীক্ষা দিতে হচ্ছে না। পরীক্ষার সংখ্যাও কমে গেছে।
৭. এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা এগিয়ে এনে সুনির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। এখন প্রতিবছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়। এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু করা হয় ১ এপ্রিল। এসব পরীক্ষার ফলাফল ৬০ দিনের মধ্যে প্রকাশ করা এখন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে শুরু। ফলাফল ৩০ দিনের মধ্যে। প্রথম বছর মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে ফল প্রকাশ, পরে ইন্টারনেট, টেলিকনফারেন্স এবং এ বছর পেপারলেস অনলাইনে এসএসসি-এইচএসসির ফল প্রকাশিত হয়েছে।
৮. পাসের হার সারা দেশে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডসহ ১০টি শিক্ষা বোর্ডের গড় পাসের হার ৮৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পাওয়া কৃতী শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও প্রতিবছর বেড়ে চলেছে।
৯। অনুরূপভাবে এ বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায়ও পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর হার লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে।
১০. সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান ও পরীক্ষার ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে মান বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের যেকোনো বিষয় যৌক্তিকভাবে বোঝা ও উপস্থাপনের দক্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধীরে ধীরে একটি যুক্তিনির্ভর সমাজ তৈরি হচ্ছে।
১১. প্রায় ১২ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষক-প্রশিক্ষককে দেশে ও বিদেশে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
১২. স্কুলে ১ জানুয়ারি এবং কলেজে ১ জুলাই ক্লাস চালু করা সম্ভব হয়েছে। আগে ফেব্রুয়ারি-মার্চের আগে নিয়মিত ক্লাস শুরু হতো না।
১৩. প্রায় ৭৮ লাখ প্রাথমিক ও প্রায় ৪০ লাখ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। মেধা তালিকায় প্রায় ১ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়া হয়। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তার লক্ষ্যে ‘প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠন করা হয়েছে।
১৪. প্রাথমিক স্তরে ৮৭ হাজারেরও বেশি শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে প্রায় দুই হাজার এবং স্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজ পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নতুনভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
১৫. ৪৪ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। মাধ্যমিক, মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রায় আট হাজার নতুন ভবনের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়েছে অথবা চলছে। সরকারি উচ্চবিদ্যালয়গুলোতে দুই শিফট খোলা হয়েছে।
১৬. উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা হয়েছে। নতুন আরও আটটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন পেয়ে চালু হয়ে গেছে।
১৭. বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণার জন্য দেশের ২৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৬টি গবেষণা উপপ্রকল্পে ১৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের গবেষণায় এর আগে এত বেশি বরাদ্দ আর কখনো দেওয়া সম্ভব হয়নি।
১৮. কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার উন্নয়ন ও প্রসারে ব্যাপক প্রচার, জনমত গড়ে তোলাসহ বহু বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীসংখ্যা অনেক বেড়েছে এবং মানও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
১৯. ২০ হাজার ৫০০ স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস চালু করার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। তৈরি করা হচ্ছে ডিজিটাল কন্টেন্ট।
২০. কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি হাতে-কলমে শিক্ষাদানের জন্য ১৭টি মাইক্রোবাসে মোবাইল কম্পিউটার ল্যাব এক বছর ধরে দেশের পশ্চাৎপদ অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে।
২১. শিক্ষা বোর্ডে শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন, পরীক্ষার ফরম পূরণ প্রভৃতি কাজ এখন অনলাইনে হয়ে যাচ্ছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার যাবতীয় কাজ, নিয়োগ, মন্ত্রণালয়ের সব সিদ্ধান্ত, পরিপত্র, সার্কুলার, প্রজ্ঞাপন, বদলি, প্রমোশন, ছুটি, অবসরভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্ট এখন বেসরকারি শিক্ষকদের অনলাইনে আবেদন গ্রহণসহ বিভিন্ন বিষয় অনলাইনে মুহূর্তের মধ্যেই সবাই জানতে পারছেন।
২২. ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরার জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক নির্যাতন বন্ধের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
২৩. বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু প্রভৃতি বিষয়ে যেসব মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ও ইতিহাস চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ শুদ্ধ করে সঠিক তথ্য ও ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে যথাযথভাবে স্থাপন করা হয়েছে।
২৪. ভর্তি-বাণিজ্য, কোচিং-বাণিজ্য বন্ধ করার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
২৫. মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের জন্য মাদ্রাসায় ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা, জ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
২৬. দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। অপচয় ও অপব্যবহার বন্ধের জন্য সদা সচেতনতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। শুরু থেকেই আমি বলে আসছি, জনগণের সীমিত সম্পদ দিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। তাই এক টাকা দিয়ে দুই টাকার কাজ করতে হবে, এ জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে।
৩২। প্রথম থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলার উন্নয়ন ও প্রসারের জন্য শিক্ষা বোর্ডগুলোর তত্ত্বাবধানে বছরে দুবার স্কুল-মাদ্রাসা থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হচ্ছে। শারীরিক-মানসিক বিকাশের জন্য এটা জরুরি।
৩৩। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রচলিত নানা অনিয়ম, অসংগতি দূর করা এবং আরও উন্নত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য, বিশেষ করে শিক্ষানীতি যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য ‘নতুন শিক্ষা আইন’ প্রণয়ন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
এখানে সংক্ষেপে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের বিগত সাড়েতিন বছরে শিক্ষা খাতে সাধিত কতিপয় অগ্রগতির বিষয় উল্লেখ করা হলো। সহজেই এ রকম তালিকা বহু গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। এ ধরনের বহু কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ সবকিছুই জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এর বাস্তবায়ন। জাতীয় শিক্ষানীতিতে শিক্ষার লক্ষ্য এবং মৌলিক নীতিগুলো ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্য ও নীতি বাস্তবতার ভিত্তিতে সৃজনশীলভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এটাই সঠিক পন্থা। শুধু স্লোগান দিয়ে নয়, এর ফলাফল দেখেই বিচার করতে হবে। এভাবেই শিক্ষা দিবসের লক্ষ্য ও তাৎপর্য অর্জন সম্ভব।
নুরুল ইসলাম নাহিদ: শিক্ষামন্ত্রী। প্রথম আলো

নো ইজি ডে :লাদেন হত্যার প্রত্যক্ষ বয়ান-৪: হ্যাঁ, ওসামা বিন লাদেন : মশিউল আলম



আকাশে চাঁদ নেই, অ্যাবোটাবাদ শহরে লোডশেডিং চলছে। সর্বাধুনিক সমরপ্রযুক্তিতে সুসজ্জিত মার্কিন কমান্ডো বাহিনী পুরো অভিযান চালাচ্ছে পিচকালো আঁধারে নিমজ্জিত বাড়িটির ভেতরে। অভিযানে অংশগ্রহণকারী ২৪ জন কমান্ডো, অভিযান পরিচালনাকারী অফিসার ও সিআইএর লোকজন পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন বেতারযন্ত্রের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে, যেটাকে বলা হচ্ছে ‘ট্রুপ নেট’।
অন্ধকার আকাশের কোথাও চিলের মতো চক্কর খাচ্ছে চালকবিহীন বিমান (ড্রোন), সেখান থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে পুরো অভিযানের ভিডিওচিত্র। ওয়াশিংটন ডিসিতে বসে অভিযান পর্যবেক্ষণ করছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারিসহ পেন্টাগন-সিআইএর কর্তারা। লাদেনকে হত্যা করা হয়েছে—অভিযান পরিচালনাকারীর মুখ থেকে তাঁরা এই নিশ্চিত ঘোষণা শোনার জন্য উদগ্রীব।
কিছুক্ষণ আগেই নিথর হয়ে গেছে লাদেনের বিধ্বস্ত-রক্তাক্ত দেহটি; মেঝেতে নিজের রক্তের ধারায় ডুবে যাচ্ছে তাঁর লাশ। খাটে নিজের একটি পায়ের কবজি চেপে ধরে পাগলের মতো চিৎকার করছে একটি মেয়ে; দূরের এক কোণে, ব্যালকনিতে যাওয়ার স্লাইডিং কাচের দরজার গোড়ায় গুটিসুটি বসে আছে তিনটি ভয়ার্ত, নির্বাক শিশু।
ম্যাট বিসোনেট লিখছেন, ‘লাশের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ওয়াল্ট। এখনো অন্ধকার, লোকটির মুখ দেখে তাকে চেনা যাচ্ছে না।..আমি আমার হেলমেটের রেইল সিস্টেমের সঙ্গে লাগানো লাইটটি জ্বালালাম।... বাড়ির সব জানালায় পর্দা টানা, বাইরে থেকে কেউ আমাদের দেখতে পাচ্ছে না, সুতরাং এখন আলো জ্বালানো চলে।
‘..বুলেটের আঘাতে চুরমার হয়ে গেছে লোকটির মুখমণ্ডল। কপালের ডান পাশে একটা গর্ত, মাথার ডান অংশটি উড়ে গেছে। ঝাঁজরা হয়ে গেছে বুকের বুলেটবিদ্ধ জায়গাগুলো। সে পড়ে আছে, রক্তের ধারা বেড়ে চলেছে তার চারপাশে। আমি উবু হয়ে আরও কাছে থেকে তাকে দেখার জন্য তাকালাম, আমার পাশে টমও তাই করল।’
‘টম বলল, “আমার মনে হচ্ছে, এ সে-ই।” কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে কথা বেতারে জানিয়ে দিল না টম, কারণ ও জানে এই খবর ওয়াশিংটনে পৌঁছে যাবে বিদ্যুৎ-স্ফুলিঙ্গের মতো। আমরা জানি, প্রেসিডেন্ট ওবামা শুনছেন। সুতরাং আমাদের কোনো ভুল না হয়ে যায়।
‘আমি আমার মাথার ভেতরের চেকলিস্টগুলো একবার উল্টেপাল্টে দেখে নিলাম: লোকটা বেশ দীর্ঘ। প্রায় ছয় ফুট চার ইঞ্চি। ঠিক আছে, মিলে যাচ্ছে। তিনতলায় পুরুষ লোক থাকার কথা মাত্র একজন, তিনি লাদেন। মিলে যাচ্ছে। দুই বার্তাবাহক যে দুই জায়গায় থাকবেন বলে সিআইএ আমাদের বলেছিল, তাঁরা ঠিক সেই দুই জায়গাতেই ছিলেন। মিলে যাচ্ছে।
‘যতই তাঁর মুখের দিকে দেখি, আমার চোখ আকৃষ্ট হয় নাকটির দিকে। নাকটি অক্ষত আছে, আমার চেনা চেনা মনে হচ্ছে। কিট থেকে বুকলেট বের করে কমপোজিট ফটোগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে লাগলাম। লম্বা নাকটি মিলে যাচ্ছে। দাড়ি ঘনকালো, আমি যেমন ভেবেছিলাম, সে রকম পাকা চুল একটাও চোখে পড়ল না।...
‘রাবারের গ্লাভস হাতে ক্যামেরা বের করে ছবি তুলতে শুরু করলাম, ওয়াল্ট তৈরি হতে লাগল কয়েক সেট ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের জন্য।..খাটের ওপর যন্ত্রণায় চিৎকার করছিলেন যে মহিলা, তাঁর পায়ের জখমের শুশ্রূষা করছিল উইল, ও আরবি বলতে পারে। আমরা পরে জেনেছি, মহিলার নাম আমাল আল-ফাতাহ, লাদেনের পঞ্চম স্ত্রী। আমি জানি না কখন কীভাবে তিনি জখম হয়েছেন, কিন্তু জখমটা খুবই সামান্য। সম্ভবত বুলেটের টুকরা বা ভাঙা কোনো কিছুর টুকরার আঘাত লেগেছে তাঁর পায়ের কবজিতে..।”
ঘটনার পরদিন লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকার এক প্রতিবেদনে পাকিস্তানি সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে লেখা হয়, মহিলার নাম আমাল আহমেদ আল-সাদাহ, বয়স ২৯, একজন ইয়েমেনি, লাদেনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় আফগানিস্তানে, ১১ বছর আগে। তিনি তাঁর পঞ্চম স্ত্রী। হোয়াইট হাউসের সূত্রে গার্ডিয়ান লেখে, তিনি পায়ে বুলেটবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। পত্রিকাটির একই প্রতিবেদনে লেখা হয়, ওই ঘরেই আহত হয়েছিল লাদেনের ১২ বছর বয়সী মেয়ে সাফিনা/সাফিয়া বা আয়েশা। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে লেখা হয়, মেয়েটির জখম ছিল পায়ের গোড়ালিতে; মার্কিন কমান্ডোরা লাদেনের শোবার ঘরে ঢোকার আগে সম্ভবত গ্রেনেড ছুড়েছিলেন।
লাদেনের মুখমণ্ডলের ছবি তোলার চেষ্টা করছেন ম্যাট। তিনি লিখছেন, ‘ওয়াল্ট তার কিট থেকে ক্যামেলব্যাক হোস টেনে বের করে লোকটার মুখে পানি ছুড়তে লাগল। আমি খাট থেকে একটা কম্বলের এক অংশ ব্যবহার করে তাঁর মুখমণ্ডল থেকে রক্ত মুছে দিতে শুরু করলাম। প্রতি ঘর্ষণে মুখটি আরও পরিচিত মনে হতে লাগল। আমি তাঁকে যে রকম বয়স্ক ভেবেছিলাম, তার চেয়ে বেশ কম বয়সী দেখাচ্ছিল তাঁকে। তাঁর দাড়ি কালো, মনে হয় কলপ লাগানো হয়েছে।’
অভিযানের প্রস্তুতির সময় এক রাতে ম্যাট, ওয়াল্ট ও চার্লির মধ্যে গল্প হচ্ছিল: লাদেনকে পাওয়া গেলে তাঁর শরীরের কোন অংশে গুলি করা উচিত হবে, কার কী মত। ম্যাট লিখছেন: “‘ওয়াল্ট বলেছিল, ‘চেষ্টা কোরো, [মুদ্রণ-অযোগ্য] ..টার মুখমণ্ডলে গুলি না করার। কারণ, ওর ছবি সবাই দেখতে চাইবে।’ চার্লি বলেছিল, “কিন্তু যদি অন্ধকার থাকে, আর আমি ওর মাথা ছাড়া আর কিছুই দেখতে না পাই, তা হলে আত্মঘাতী বোমায় মরার অপেক্ষা করব না।” আমি বলেছিলাম, ‘..সুযোগ যদি পাওয়া যায়, আমি বলব, বুকে গুলি চালানোই ঠিক হবে।’
ম্যাট দেখতে পেলেন, সেই এখন মুখটা সত্যিই বিধ্বস্ত। ছবি তোলার জন্য রক্ত পরিষ্কার করতে করতে তিনি ভাবছেন: ‘এ রকম জঘন্য একটা মুখ এমন কাছে থেকে দেখা কী অদ্ভুত! গত এক দশক ধরে আমরা যুদ্ধ করে চলেছি যে লোকটার কারণে, সে এখন আমার সামনে পড়ে আছে। ছবি তোলার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দাগি আসামির মুখমণ্ডলের রক্ত পরিষ্কার করার চেষ্টা কেমন পরাবাস্তব মনে হচ্ছে!...এখন আমার দরকার ভালো মানের কিছু ছবি...
‘কম্বল সরিয়ে রেখে আমি আমার ক্যামেরাটা টেনে বের করলাম। এই ক্যামেরায় গত কয়েক বছরে শত শত ছবি তুলেছি আমি।..প্রথমে তুললাম পুরো শরীরের ছবি। তারপর হাঁটু গেড়ে তাঁর মাথার কাছে বসে তুললাম মুখের কয়েকটি ছবি। তাঁর দাড়ি ডানে ও বাঁয়ে সরিয়ে প্রোফাইলের কয়েকটি ছবি নিলাম। আমি আসলে চাচ্ছিলাম তাঁর নাকের ওপর ফোকাস করতে...আমি ওয়াল্টকে বললাম, “ওর ভালো চোখটা খুলে ধরো।” ওয়াল্ট নিচু হয়ে তাঁর চোখের পাতা টেনে ধরল, খুলে গেল প্রাণহীন খয়েরি চোখটি। আমি জুম ইন করে চোখের একটা ছবি নিলাম।...’
নিহত লাদেনের ছবি যুক্তরাষ্ট্র সরকারিভাবে প্রকাশ করেনি। কিন্তু ইন্টারনেটে অনেক ছবি বেরিয়ে পড়েছিল। সেগুলোর অধিকাংশই নকল, বানানো ছবি। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ফ্রিডম অব ইনফরমেশন আইন ব্যবহার করে নিহত লাদেনের ছবি প্রকাশ করার জন্য আবেদন করেছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ছবি প্রকাশের অনুমতি দেননি এই যুক্তি দেখিয়ে যে তার ফলে আমেরিকার প্রতি বিদ্বেষ বেড়ে যাবে। ম্যাট বিসোনেট (মার্ক ওয়েন) তাঁর নো ইজি ডে বইটিতেও কোনো আলোকচিত্র প্রকাশ করেননি।
তিনতলায় লাদেনের শোবার ঘরে ম্যাট যখন নিহত লাদেনের ছবি তোলায় ব্যস্ত, তখন বাইরে অভিযান শেষ করে কমান্ডোদের আফগানিস্তান ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। কিন্তু সেখানে একটা বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। এই লেখার আগের পর্বগুলোতে উল্লেখ করা হয়নি যে কমান্ডোদের বহনকারী দুটি ‘ব্ল্যাক হক’ হেলিকপ্টারের একটি নামার সময় লাদেনের বাড়ির বাইরের প্রাচীরের সঙ্গে তার পুচ্ছদেশের আঘাত লেগে ক্র্যাশ করে। সেটি অচল হয়ে সেখানেই পড়ে আছে। কমান্ডোদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অবশিষ্ট হেলিকপ্টারটি যথেষ্ট নয়। তাই তাঁদের নিতে আসছে একটি চিনুক হেলিকপ্টার। কিন্তু তার আগে অচল হেলিকপ্টারটিতে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। বাইরে সেসব আয়োজন চলছে, ম্যাট বিসোনেট তাঁর হেলমেটের সঙ্গে যুক্ত ‘ট্রুপ নেটের’ মাইক্রোফোনে অন্য কমান্ডোদের কথাবার্তা শুনছেন, আর লাদেনের ছবি
তুলছেন। দ্বিতীয় দফায় তিনি ছবি তুললেন, সিল বাহিনীর ক্যামেরায়।
ওপাশে তাঁর সহযোদ্ধা ওয়াল্ট সংগ্রহ করছেন লাদেনের ডিএনএ নমুনা: ‘ওয়াল্ট লাদেনের রক্তে তুলা চুবিয়ে নিল, আর কিছু তুলা তাঁর মুখে গুঁজে দিয়ে নিল লালার নমুনা। অবশেষে ও বের করল সিআইএর দেওয়া স্প্রিং লাগানো একটা সিরিঞ্জ, অস্থিমজ্জার নমুনা সংগ্রহের জন্য। ঊরুর হাড়ে এই সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে অস্থিমজ্জার নমুনা কীভাবে সংগ্রহ করতে হয় তা আমাদের শেখানো হয়েছে। ওয়াল্ট লাদেনের ঊরুতে সিরিঞ্জ ঢোকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সুঁই কিছুতেই হাড়ের ভেতরে ঢুকছে না...’
অভিযানের এ পর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি তখনো বাকি। সেটি করার চেষ্টা করছেন ম্যাটের আরবি-জানা সহযোদ্ধা উইল। মেঝেতে যে লাশটি পড়ে আছে, সেটি যে সত্যিই ওসামা বিন লাদেনের, এটা নিশ্চিত করতে হবে। ম্যাট লিখছেন, ‘লাদেনের স্ত্রী আমাল পায়ের জখম নিয়ে এখন ছটফট করে চলেছেন, তিনি কোনো কথা বলতে নারাজ। অন্য মহিলার চোখ দুটি কান্নায় ফুলে উঠেছে, উইল আরবিতে তাঁকে বারবার জিজ্ঞেস করছে, মৃত লোকটি কে? কিন্তু মহিলা কিছু বলছেন না, শক্ত হয়ে আছেন।
“তাঁর নাম কী?”
‘মহিলা বললেন, “শেখ।”’
‘উইল বলল, “শেখ কে?” মহিলা আরও কয়েকটি ডাক নাম বা ছদ্মনাম বললেন। উইল তখন সেখান থেকে গেল ব্যালকনিতে, শিশুদের কাছে। ওরা তখনো সেখানে দেয়ালের পাশে চুপ করে বসে আছে। উইল হাঁটু গেড়ে ওদের সামনে বসে একটি মেয়েকে বলল, “কে এই লোক?”
‘মেয়েটি মিথ্যা বলতে জানে না, সে বলল, “ওসামা বিন লাদেন।”
‘উইলের মুখে হাসি ফুটে উঠল। ও মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি সত্যিই জানো তো, এটা ওসামা বিন লাদেন?”
মেয়েটি বলল, “হ্যাঁ।”
‘...ব্যালকনি থেকে ফিরে আসার সময় উইল হলওয়েতে লাদেনের এক স্ত্রীর হাত চেপে ধরে জোরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, “এখন তামাশা বন্ধ করেন!”
আগের চেয়ে কঠোর কণ্ঠে সে জিজ্ঞেস করল, “শোবার ঘরে লোকটি কে?”
মহিলা কাঁদতে শুরু করলেন। ভীষণ ভয় পেয়ে বললেন, “ওসামা।”
উইল বলল, “ওসামা কী?”
মহিলা বললেন, “ওসামা বিন লাদেন।”’
মশিউল আলম: সাংবাদিক।#প্রথম আলো

Monday, September 10, 2012

কোকোকে বিশ্বের শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের অন্যতম ঘোষণা


২৯-৩১ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস ডিপার্টমেন্টে জাতিসংঘের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমঝোতার উপর অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বিভিন্ন রাষ্ট্রের শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের প্রোফাইল তুলে ধরা হয় যার মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে আরাফাত রহমান কোকো।

কোকো সম্পর্কে সিঙ্গাপুরে ২০ কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের অপরাধ ও ৩৮.৮৩ কোটি টাকা জরিমানার বিষয়টি উল্লেখ করা হয।
যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে টেলিকমিউনিকেশন ও বন্দরসংক্রান্ত প্রকল্পে বৈদেশিক দুর্নীতি ও এফসিপিএ লঙ্ঘন করে ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচারের অভিযোগে নন-কনভিকশনভিত্তিক বাজেয়াপ্তকরণ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১২ অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত রিজিওনাল রিভিউ গ্রুপের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের এ সম্মেলনে বাংলাদেশ আরাফাত রহমান কোকোর সিঙ্গাপুরে পাচার করা অর্থ ফেরত পেতে সরকারের প্রচেষ্টাসহ জঙ্গি অর্থায়ন, সন্ত্রাস দমন, সীমান্ত সন্ত্রাস ও হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে।

Saturday, September 8, 2012

পাকিস্তানে কোরান পোড়ানোয় অভিযুক্ত কিশোরী রিমশা মাসিহর জামিন :মসজিদের ইমাম খালিদ চিস্তি কোরানের কয়েকটি ছেঁড়া পৃষ্ঠা এই মেয়েটির ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছিল



পাকিস্তানে ব্লাসফেমি বা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে খ্রিস্টান কিশোরী রিমশা মাসিহকে তিন সপ্তাহ ধরে আটকে রাখা হয়েছে , রিমশার বয়েস ১৪।
রিমশাকে এখন বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।চিকিৎসকদের রিপোর্টে সে নেহায়েতই শিশু এবং মানসিকভাবে কিছুটা প্রতিবন্ধী প্রমাণ হবার পরেও তাকে জেলে আটক রাখা হয়। মানবাধিকার গোষ্ঠিগুলো রিমশাকে জামিনে মুক্তি দেবার আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।

এই মামলাকে ঘিরে পাকিস্তানে আবারও ব্লাসফেমি আইনের অপব্যবহার নিয়ে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে এবং মানবাধিকার কর্মীরা আইনটি বাতিলের দাবি জানাচ্ছেন।

তাকে শুক্রবার জামিন দিয়েছে দেশটির একটি আদালত। কিশোরী রিমশা মাসিহর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে সে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরান পুড়িয়ে ফেলেছে। তাকে গ্রেফতারের পর কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী অভিযোগ করেন একটি মসজিদের ইমাম খালিদ চিস্তি কোরানের কয়েকটি ছেঁড়া পৃষ্ঠা এই মেয়েটির ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছিল ।

এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ওই এলাকার একজন ইমাম নিজেই যেহেতু ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেবার মত কাজ করেছেন এখন তাকেই অভিযুক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত। এই সংগঠন রিমশার জামিনের অর্থ প্রায় ১৮ হাজার মার্কিন ডলার দেবার দায়িত্ব নিয়েছে। রিমশার ভবিষ্যত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন মানবাধিকার কর্মীরা ।কারণ অতীতে ব্লাসফেমি অপরাধে অভিযুক্তদের উগ্রপন্থীদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে। তার বিরুদ্ধে কোরানের পৃষ্ঠা পোড়ানোর যে অভিযোগ আনা হয়েছে তার সাজা যাবজ্জীবন কারাদন্ড হতে পারে।তার এক মুসলিম প্রতিবেশী তার বিরুদ্ধে কোরান পোড়ানোর এই অভিযোগ আনলে তাকে গ্রেপ্তার করে তার বিরুদ্ধে ব্লাসফেমি আইনে অভিযোগ আনা হয়।

Saturday, September 1, 2012

মাধ্যমিকের বই ছাপাতে ২১ কোটি ৭৩ লাখ ৪৩ হাজার টাকা কম খরচ





আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য মাধ্যমিক স্তরের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপার খরচ ধরা হয়েছিলো ৯৩ কোটি ৯৭ লাখ সাড়ে ৬৬ হাজার টাকা। কিন্তু সরকার অনুমোদিত দরপত্র অনুযায়ী খরচ পড়বে ৭২ কোটি ২৪ লাখ সাড়ে ২৩ হাজার কোটি টাকা। প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ২১ কোটি ৭৩ লাখ ৪৩ হাজার টাকা খরচ কম হচ্ছে। খরচ কমের শতকরা হার ২৩ দশমিক ১৩ ভাগ।
বৃহস্পতিবার সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ২০১৩ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক (বাংলা ও ইংরেজি ভার্সন) এবং এসএসসি ভোকেশনাল স্তরের বিনামূল্যের পাঠ্যবই কাগজসহ মূদ্রণ, বাধাঁই ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত পরিবহনের দরপত্র অনুমোদন করেছে। প্রাক্কলিত দরের চেয়ে দরপত্রে অংশগ্রহনকারীদের মধ্য থেকে যোগ্য হিসেবে চিহ্নিতদের উল্লেখিত দর কম হওয়ার কারন হিসেবে বলা হয়েছে, প্রতিবছর আলাদাভাবে কাগজ কেনা হয়। আর বাধাঁই মূদ্রন ও পরিবহনের কাজ আলাদাভাবে করা হয়। এবার এদুটি কাজ একত্রে করা হচ্ছে। আলাদাভাবে কাগজ না কেনার কারনে খরচ কমেছে।
জানা গেছে, এবছরের বাজেটে বিনামূল্যে পাঠ্যবই ছাপা ও বিতরনের জন্য ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
মাধ্যমিকের তিন কোটি ২৯ লাখ১৯ হাজার ৯৮৩ কপি বই ছাপার জন্য মোট ৪৯ টি লটে দরপত্র আহবান করা হয়। দরপত্র জমা পড়ে ১৭০ টি। এরমধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচিত ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের অনুকুলে মাধ্যমিকের বইয়ের জন্য মোট ৭২ কোটি ২৪ লাখ সাড়ে ২৩ হাজার কোটি টাকার ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, প্রাক্কলিত দরের চেয়ে যোগ্য হিসেবে বিবেচিত দরদাতাদের দর গড়ে ২৩.১৩% কম। লটপ্রতি সবচেয়ে বেশি দর কমেছে ২৭.১১%, আর সবচেয়ে কম কমেছে ১৬.৬১%।
দরদাতাদের মধ্যে একই প্রতিষ্ঠান একাধিক লটে নিম্ন দরদাতা হয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম প্রমা, প্রিয়াংকা, আনন্দ চারটি করে লটের নিম্ন দরদাতা। দরদাতাদের বৈধতার মেয়াদ থাকবে আগামী ২০ নভেম্বর পর্যন্ত।

Thursday, August 30, 2012

যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রবাসী বাংলাদেশি মো. আলী ইমামকে কানাডার বর্ডার সার্ভিস এজেন্সি চিহ্নিত অপরাধীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে


মনট্রিয়ল, ২৬ আগষ্ট- যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রবাসী এক বাংলাদেশিকে কানাডার বর্ডার সার্ভিস এজেন্সি (সিবিএসএ) তাদের চিহ্নিত অপরাধীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। ওই ব্যক্তির নাম মো. আলী ইমাম (৫৯)। কানাডায় বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে পাঁচজনকে গত বৃহস্পতিবার 'ওয়ান্টেড' তালিকাভুক্ত করে সংস্থাটি। বাকি চারজন জ্যামাইকা, ইকুয়েডর ও আজারবাইজানের নাগরিক। তাঁরাও বিভিন্ন অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত।
দৈনিক ন্যাশনাল পোস্ট জানিয়েছে, অভিযুক্ত আলী ইমাম মন্ট্রিয়েল শহরে বসবাস করতেন। বর্ডার সার্ভিসের তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে তিনি আত্মগোপন করেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ করার বিষয়টি অবহিত হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে কানাডা জুড়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তবে তাঁর অপরাধের বিশদ বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। পুলিশ তাঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। ধরা পড়লে তাঁকে কানাডা থেকে বের করে দেওয়া হবে। এ ছাড়া অন্য শাস্তিও হতে পারে।
তালিকাভুক্ত অন্য চার অভিযুক্ত হচ্ছেন জ্যামাইকার নাগরিক ডারব্যান্ট ডেভ জ্যাক ও ডোনোভান সিনক্লেয়ার, ইকুয়েডরের মার্কোস ইয়ামিল ডি মোলিনা ও আজারবাইজানের ফরিদ ইউসুপোভ। তাঁরা বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করে দেশ থেকে পালিয়ে কানাডায় এসে নির্বাসিত জীবন যাপন করছিলেন।
সিবিএসএ গত জুলাই মাসে তাদের ওয়েবসাইটে চিহ্নিত অপরাধীদের যে তালিকা প্রকাশ করে, তাতে মো. আলী ইমামসহ বেশ কিছু বিদেশির নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। এই তালিকা অনুসরণ করে কানাডার ফেডারেল ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি ২৭ জন বিদেশিকে চিহ্নিত করে। তাঁদের মধ্যে ১৯ জনকে এরই মধ্যে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আলী ইমামসহ অন্যদের ঘোষিত ঠিকানায় খুঁজে না পাওয়ায় গত বৃহস্পতিবার নতুন করে ওই পাঁচজনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
কানাডা বর্ডার সার্ভিস এজেন্সির ওয়েবসাইটে আলী ইমাম সম্পর্কে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তাতে তাঁর নাম মো. আলী ইমাম। এ ছাড়া তিনি সে দেশে ইমাম এ হোসাইন, আলী মোহাম্মদ ইমাম, ইমাম আলী ইত্যাদি নামেও পরিচিত। বসবাস করতেন মন্ট্রিয়েল শহরে। তাঁকে শনাক্ত করার বিশেষ কোনো চিহ্ন বা তথ্য কানাডা পুলিশের কাছে নেই। তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়েছে, 'এই ব্যক্তিকে কানাডা থেকে বের করে দেওয়ার জন্য দেশজুড়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলো। এটা প্রতীয়মান হয়েছে যে তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধ অপরাধ অথবা আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে মানবতা ও আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করেছেন। তাই তিনি কানাডায় আর গ্রহণীয় নন।'
তবে সমালোচকরা কানাডা সরকারের এই উদ্যোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অপরাধের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির লোক দেখানো কড়া পদক্ষেপ হিসেবে সমালোচনা করেছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও এতে আপত্তি জানিয়ে বলেছে, যুদ্ধাপরাধী হিসেবে কাউকে শনাক্ত করা হলে তাঁকে দেশে ফেরত না পাঠিয়ে কানাডাতেই বিচারের মুখোমুখি করা উচিত।

Friday, August 24, 2012

সাগর-রুনি হত্যায় একাধিক ব্যক্তি অংশ নেয়-রুনির টি-শার্টে ভিন্ন ডিএনএ শনাক্ত: র‌্যাব


ঢাকা: সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডে একাধিক ব্যক্তির অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে র‌্যাব। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি ও সংগ্রহ করা আলামত পরীক্ষা করে এমনটি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

শুক্রবার বিকেলে র‌্যাব সদর দফতরে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম বিষয়ক পরিচালক কমান্ডার এম সোহায়েল এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরীক্ষাগারে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি ও মেহেরুন রুনির টি-শার্টের পরীক্ষার পর একাধিক ব্যক্তির ডিএনএ সনাক্ত হওয়ায় ওই হত্যাকাণ্ডে যে একাধিক ব্যক্তি জড়িত, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে রুনির টি-শার্ট থেকে একজনের ডিএনএ সনাক্ত হয়েছে। এছাড়া দু’টি ছুরির একটিতে চার জনের আঙ্গুলের ছাপ এবং অন্যটিতে একাধিক ব্যক্তির হাতের ছাপ পরীক্ষায় ধরা পড়েছে।

সোহায়েল জানান, এ পরীক্ষার প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, হত্যাকাণ্ডে একাধিক ব্যক্তি জড়িত। তিনি বলেন, আগামী এক মাসের মধ্যে আলামত পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হাতে এলে সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তে বড় ধরনের অগ্রগতি হবে।

তিনি আরও জানান, পরীক্ষার জন্য গত মাসেও কিছু আলামত যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে রুনির চুল, টিস্যু এবং সাগরের রক্তমাখা জামা রয়েছে। সাগর সরওয়ার ও ছেলে মেঘের ডিএনএ পরীক্ষাও চলছে যুক্তরাষ্ট্রের ফোকল্যান্ডের ফরেনসিক ও ডিএনএ ল্যাবে।

হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষার জন্য দুই দফায় যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। এরপর গত ১২ জুন প্রথম দফায় পাঠানো হয় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ছুরি, ছুরির বাঁট, সাগরের মোজা, পরনের প্যান্ট, রুনির পরনের প্যান্ট।

গত ১৭ জুলাই দ্বিতীয় দফায় পাঠানো হয় হত্যাকাণ্ডের সময় যে কাপড় দিয়ে সাগরের হাত ও পা বাঁধা হয়েছিল, সেই কাপড় এবং রুনির টি-শার্ট।

উল্লেখ্য, গত ১০ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় নির্মমভাবে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। পরদিন ভোরে তাদের ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার সময় তাদের শিশু সন্তান মেঘও বাসায় ছিল। ঘটনার পর সাগর-রুনি হত্যা মামলা তদন্তের ভার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে ছিল।

তিন মাসেও মামলার কোনো কিনারা করতে না পেরে ডিবি তদন্তে নিজেদের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে ১৯ মে র‌্যাব সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তের দায়িত্ব নেয়। এরপর গত ২৬ মে ভিসেরা আলামতের জন্য সাগর-রুনির লাশ কবর থেকে উত্তোলন করা হয়। তবে তাদের শরীরে বিষক্রিয়ার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরীক্ষাগারে নিহত সাংবাদিক মেহেরুন রুনির ডিএনএ শনাক্ত করা হয়েছে। তার গেঞ্জিতে (টি শার্ট) ভিন্ন ডিএনএ পাওয়া গেছে। খুন হওয়ার সময় মেহেরুন রুনির পরনে যে টি-শার্ট ছিল, তা থেকে সংগৃহীত উপাদান পরীক্ষা করে এক ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ-বৃত্তান্ত (প্রোফাইল) পাওয়া গেছে।

আর ওই ডিএনএ কোনো খুনীর হতে পারে বলে ধারণা করছে মামলার তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ র‌্যাব। এদিকে রুনির স্বামী সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও ছেলে মেঘের ডিএনএ পরীক্ষা চলছে বলে জানা গেছে।

গত সাড়ে ছয় মাসেও সাংবাদিক দম্পতির হত্যাকাণ্ডের কোন রহস্য উদঘাটন না হওয়ায় এখন একমাত্র ভরসা করা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফোকল্যান্ডের ফরেনসিক ও ডিএনএ ল্যাবের পরীক্ষাকেই।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রাসায়নিক ও একটি ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল আসার পর র‌্যাব খুনিদের শনাক্ত করতে মাঠে নামবে বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার এম সোহায়েল। রোডম্যাপ অনুযায়ী সাগর রুনি হত্যা মামলা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে র্যাবের পক্ষ থেকে তদন্ত করা হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগার থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, বেশির ভাগ নমুনাতেই একাধিক ব্যক্তির ছাপ রয়েছে। এর মধ্যে রুনির টি-শার্ট থেকে একজনের পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের সময় যে ধস্তাধস্তি হয়েছে, তাতেই রুনির টি-শার্টে ওই ব্যক্তির চুল ও হাতের ছাপ লাগে। সাগরের হাত ও পা বাঁধার কাপড়ের নমুনা থেকেও অন্য কারও ডিএনএ শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এসব নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য দুই দফায় যুক্তরাষ্ট্রের রাসায়নিক ও ডিএনএ পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। এরপর গত ১২ জুন প্রথম দফায় পাঠানো হয় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত একটি ছুরি, ছুরির বাঁট, সাগরের মোজা, একটি কম্বল, সাগরের পরনের প্যান্ট, রুনির পরনের প্যান্ট ও অন্য কাপড়ের নমুনা। গত ১৭ জুলাই দ্বিতীয় দফায় পাঠানো হয় হত্যাকাণ্ডের সময় যে কাপড় দিয়ে সাগরের হাত ও পা বাঁধা হয়েছিল, সেই কাপড় এবং রুনির টি-শার্ট।

সূত্র জানায়, সাগর-রুনীর ডিএনএ পরীক্ষা রিপোর্টই এখন তদন্তের শেষ ভরসা। এ রিপোর্ট অনুযায়ী খুনিদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে। যখন কোন খুনি শনাক্ত করা সম্ভব হয় না, তখন ক্রাইম সিনই একমাত্র বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সাগর রুনির ক্রাইম সিনকে সেভাবে সংরক্ষণ করতে পারেনি পুলিশ। সিআইডি ও ডিবি বিশেষজ্ঞ দলও ঘটনাস্থলে গিয়ে ক্রাইম সিন রক্ষা করতে পারেনি।

উল্লেখ্য, গত ১১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া ফ্ল্যাট থেকে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। বাসায় ছিল তাদের একমাত্র সন্তান মেঘ। প্রথমে সাগর রুনি হত্যা মামলা তদন্তের ভার ডিবির হাতে ছিল। তিন মাস ডিবি এ মামলায় তেমস কিছু করতে না পারায় হাইকোর্টের নির্দেশে ১৯ মে র্যাব সাগর রুনি হত্যা মামলার তদন্ত শুরু করে।

সাগর রুনির ক্রাইম সিন নষ্ট হওয়ায় র্যাবের পক্ষে খুনি শনাক্তকরণ নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। গত ২৬ এপ্রিল ভিসেরা আলামতের জন্য দুজনের লাশ কবর থেকে উত্তোলন করা হয়। তদন্ত শুরুর পর এখনো এ মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। তবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে চারজনকে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার করে।


Friday, August 17, 2012

ঈদের ঘরমুখো মানুষজনকে পরিবহনে সরকারি, নৌবাহিনীর জাহাজ, নানান জলযান, সেনাবাহিনীর গাড়ি, বিশ্ববিদ্যালয় সহ নানান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাস-গাড়ি ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে

অস্ট্রেলিয়ার চাকরিতে কোন উৎসব বোনাস নেই। চাকরিতে বছরে ছ’সপ্তাহের পেইড হলিডে আছে। অসুস্থতার ছুটি না নিলে বার্ষিক এই পেইড হলিডে সাত সপ্তাহে দাঁড়ায়! কাজ না করেই বেতন! আবার ছুটি না নিলে বছরের নির্দিষ্ট সময় পরে সংশ্লিষ্টরা এ টাকাটি নগদ তুলে নিতে পারেন। এটিকেই বোনাস মনে করেন এদেশের মানুষজন! খ্রীস্টান প্রধান এ দেশটির বেশিরভাগ মানুষ ক্রিসমাসের আগে ইংরেজি নববর্ষ মিলিয়ে এই হলিডে নিতে চান। কিন্তু এই হলিডে কাটাতে এদের তেমন কেউ গ্রামের বাড়িতে যান না। এরা ছোটেন দেশবিদেশের নানান টুরিস্ট জোন-স্পটে। এরজন্যে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু করে জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বিমানের টিকেটের দাম থাকে স্বাভাবিকের চেয়ে দেড়-দু’গুণ বেশি। বছরের এই সময়টায় এদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রায় দু’মাসের ছুটি থাকে। আমাদের দেশের মতো পরিবারগুলো বছরের এই সময়টাতেই দেশে বেড়াতে যেতে চান। কিন্তু বিমান টিকেটের উচ্চমূল্য মেটাতে সক্ষমরাই এটা পারেন! আবার দেশে যাওয়া মানে একটি পরিবারের দশ-পনের হাজার ডলারের ধাক্কা! এদেশের খুব কম মানুষের এত টাকা হাতে জমা থাকে। অনেক ক্রেডিটকার্ডের ওপর ভরসা করে চলে যান। পরে ক্রেডিট কার্ডের এসব বকেয়া আর সুদ সামাল দিতে গিয়ে এখানে ফেরার পর সংশ্লিষ্টদের দিন-রাত অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। এসবই এসব দেশের বাস্তবতা। টাকা দেন, বোনাস দেন, বখশিস দেন, বাড়ি যামু’ বলে আন্দোলন-অবরোধ করার সুযোগই এখানে নেই। সেভাবে বিষয়টি এদেশে কেউ ভাবেনওনা!
ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর ঢাকাকে প্রায় খালি করে আমাদের দেশের লোকজন গ্রামের বাড়ি যান। এ নিয়ে নানান দূর্ভোগের সচিত্র খবর ছাপা-প্রকাশ হয় দেশের মিডিয়ায়। দেশের পরিবহন ব্যবস্থাটি ভেতর থেকে এমনিতই নড়বড়ে। একসঙ্গে এত মানুষজনকে পরিবহনের মতো অবকাঠামোও দেশের নেই। এবার নানা টিভির রিপোর্ট দেখে দেখে মনে হলো এতগুলো টিভি চ্যানেলের প্রতিযোগিতামূলক রিপোর্টিং, এত ক্যামেরার কারনে অনেককিছুর জবাবদিহিও আগের চেয়ে বেড়েছে। দেশের ইতিহাসের ব্যতিক্রমী যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সক্রিয় সরেজমিন ছোটাছুটির কারনেও পরিস্থিতির তুলনামূলক উন্নতি ঘটেছে। আমার মনে হয়েছে পুরো বিষয়টি নিয়ে নতুন কিছু ভাবার আছে সরকারের। যেমন ঈদের ঘরমুখো মানুষজনকে পরিবহনে সরকারি সব ধরনের যানবাহন, নৌবাহিনীর জাহাজ সহ নানান জলযান, সেনাবাহিনীর গাড়িরবহর, বিশ্ববিদ্যালয় সহ নানান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাস-গাড়িসমূহ ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এসব পরিবহন ব্যবহারকারীরা সরকার নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধ করবেন। এতে চলতি ভোগান্তির কিছুটা হলেও লাঘব হবে। সরকারি দায়িত্বশীলরা কি বিষয়টি নিয়ে ভাববেন?

Wednesday, August 15, 2012

মাদারীপুরে নবজাতকের হাত ভেঙে দিলেন নার্স!

মাদারীপুরে মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের (মাতৃমঙ্গল) এক নার্স ছুড়ে ফেলে দিয়ে এক নবজাতকের হাত ভেঙে দিয়েছেন বলে পরিবার থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নবজাতক ১৩ দিন ধরে অসুস্থ হয়ে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।

মাদারীপুর সদর হাসপাতাল, নবজাতকের মা রোজিনা বেগম ও নানী সুফিয়া বেগম বাংলানিউজকে জানান, মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের সস্তাল গ্রামের কৃষক আমিন তালুকদারের স্ত্রী রোজিনা বেগমের ২ আগস্ট প্রসবব্যথা শুরু হলে মাদারীপুর সদরের মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়।

সেখানে দায়িত্বরত ডাক্তার ও নার্স রোজিনাকে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানোর কথা বলেন।

কিন্তু রোজিনা অপারেশন করবেন না বলে জানান। এতে নার্স ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে রুম থেকে বের করে দেন। কোনো উপায় না পেয়ে রোজিনা হাসপাতালের নিচে বসে অপেক্ষা করতে থাকেন।

একপর্যায়ে নার্স বাধ্য হয়ে তাকে লেবার রুমে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর তিনি অপারেশন ছাড়াই স্বাভাবিক নিয়মেই একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন।

দায়িত্বরত নার্স প্রথমে সন্তানকে তার মায়ের পাশে দেন। পরে শিশুটিকে মৃত বলে পাশের একটি বেডে ছুড়ে ফেলে দেন।

এসময় নবজাতক নড়ে উঠলে তাকে ফের মায়ের কাছে দেওয়া হয়। ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য দ্রুত মা ও শিশু সুস্থ আছে বলে ৯শ টাকা বকশিস রেখে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।

বাড়িতে যাওয়ার পর রোজিনা টের পান তার সন্তানের হাত ভাঙা। ২ দিন পর ওই শিশুকে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এবিষয়ে রোজিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাংলানিউজকে জানান, এটাই তাদের প্রথম সন্তান। তার স্বামী মানুষের জমিতে কৃষি কাজ করেন। মাতৃমঙ্গলের নার্স তাকে অপারেশনের কথা বললে টাকার কথা চিন্তা করে তিনি রাজি হননি।

পরে অপারেশন ছাড়াই তিনি একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। তাদের কথা মতো অপারেশন না করায়, নার্স ক্ষিপ্ত হয়ে তার ছেলেকে মৃত বলে ছুড়ে ফেলে দেয়। এতে তার সন্তানের ডান হাত ভেঙে যায়। এসময় তারা এ ঘটনার জন্য তার কাছে ক্ষমাও চায়।

ডাক্তার ও নার্সের নাম জানতে চাইলে রোজিনা বলতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমি কীভাবে তাদের নাম বলবো? মাত্র কয়েক ঘন্টা সেখানে ছিলাম।‘

রোজিনা অভিযোগ করে জানান, নার্সের জন্যই তার ছেলের হাত ভেঙে গেল। অথচ তারা ছেলেকে কোনো চিকিৎসা বা পরামর্শ না দিয়েই ৯শ টাকা বকশিস রেখে দ্রুত তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।

তবে এ ব্যাপারে রোজিনার স্বামী দুই/একদিনের মধ্যে মাদারীপুর সদর থানায় মামলা করবে বলে জানান তিনি।
মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা গোপাল চন্দ্র সূত্রধরের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ওই সময় আমি ছুটিতে ছিলাম। তাই, এই ঘটনাটি আমার জানা নেই। তবে নার্সরা ইচ্ছে করে এ ঘটনা ঘটাতে পারেননা। হয়ত ভুল করে এ ঘটনা ঘটতে পারে।‘

মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বাংলানিউজকে জানান, এ ব্যাপারে থানায় কেউ এখনও অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কবর প্রথম বাঁধাই করে অবিসংবাদিত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ছিলেন এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী



 সুমি খান: “ যে নেতার নির্দেশে এ দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো , তাকে সপরিবারে  নির্মম হত্যার পর তার অস্তিত্ব মুছে ফেলার চক্রান্ত করেছিলো খুনিরা। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা কর্মীর মতো আমিও গ্রেফতার হই, ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে আমাকে। কোন্ সালে সেটা মনে নেই, দেশে একটু মুক্ত চলাচলের  সুযোগ পেতেই বঙ্গবন্ধুর কবর জেয়ারত করতে ছুটে গিয়েছিলাম টুঙ্গিপাড়া । কবরের অবস্থা দেখে  মনে হলো  পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে এই কবর টি  সংরক্ষণ করা জরুরী।”
পনেরোই আগষ্ট সকালে চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সভাপতি এ বি মহিউদ্দিন চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর সাথে জড়িয়ে তার স্মৃতি তুলে ধরলেন আমাদের সময়ের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে ।  প্রথমেই অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেন সাম্প্রতিক সময়ে অনেক কথাই মনে রাখতে পারছেন না বলে। পর মুহুর্তেই ধীরে ধীরে মনে করলেন সেই ঐতিহাসিক দিনটির অনেক কথা।
“ টুঙ্গিপাড়া থেকে গোপালগঞ্জ অনেক দূরে। রাস্তা খুব খারাপ ছিল তখন, ইট, সিমেন্ট , রাজমিস্ত্রি- কিছুই তো নেই।  তবু মন মানলোনা। আমার   সাথে চট্টগ্রামের কাট্টলীর কয়েকজন নেতা কর্মী ছিল। তাদের সাথে নিয়ে গোপালগঞ্জ থেকে ইট আর সিমেন্ট আনলাম।  কোনভাবে ইট সিমেন্টের গাঁথুনি তুলে আমাদের প্রিয় নেতার  কবর বাঁধাই করে দিলাম  নিজেরাই। আমরা তো মিস্ত্রি নই, প্ল্যাষ্টার করতে পারলাম না।”  ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ঢাকায় ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার কথা ছিল তার ও । সকালে রেডিও খুলতেই মেজর ডালিমের বেতার ঘোষণার মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। বললেন, যে নেতার নির্দেশে এ দেশের তরুণ সমাজ মোহমুগ্ধ হয়ে সাহস করে  মাঠে  নেমেছে, সেই নেতাকে নির্মম ভাবে হত্যার ঘটনা প্রচন্ড ক্ষুব্ধ করে দেয় সেদিনের তরুণ শ্রমিক নেতা এবং সংগঠক  মহিউদ্দিন চৌধুরীকে। ১৬ আগষ্ট চট্টগ্রামে এসে নেতাকর্মীদের সংগঠিত করতে লালখানবাজার যাওয়ার পথে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের  সদস্যেরা গ্রেফতার করে নিয়ে যায় তাকে। এর পর তাকে পাঠানো হলো রাজশাহী জেলে। প্রায় ৬ মাস পর জামিনে মুক্ত হয়ে চট্টগ্রাম আসেন । সীমান্ত পেরিয়ে আগরতলা চলে যান।সেখান থেকে কোলকাতা যান এবং জীবিকার প্রয়োজনে নানান কাজের সাথে  যুক্ত হন। এর কিছুদিন পর দেশে ফেরার সাথে সাথে  আবার শুরু হয় নির্যাতন। বললেন, আমরা যারা বঙ্গবন্ধুর খুনি সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ছিলাম, তাদের মধ্যে সুলতানুল কবির, পুলিন দে, আব্দুল্লাহ আল হারুণ, ডা. আফসারুল আমিন, লোকমান সহ অনেক কে  ক্যান্টনমেন্টে  ধরে নিয়ে খুব নির্যাতন করা হতো। স্বাধীনতা বিরোধী চক্র এবং সেনাবাহিনীর পাকিস্তানঘেঁষা ব্যক্তিদের সমন্বয়ে  বাংলাদেশ বিরোধী সাম্প্রদায়িক একটি দল গঠন করা হলো। আমাদের দলের মধ্যেও বিভেদ সৃষ্টি হলো।মুক্তিযুদ্ধেও পর সুবিধাভুক্ত গোষ্ঠিীর কারণে যারা অভিমান করে বা  কোন কারণে ভুল বুঝে দল থেকে দূরে সরে গেছে তাদের  কারো কারো সাথে সংঘবদ্ধ হয়ে একটি  অতিবাম সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হলো। সদ্যস্বাধীন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত  বাংলাদেশ কে বঙ্গবন্ধু যেভাবে গড়ে তুলছিলেন,তা ধ্বংস করার জন্যে আন্তর্জাতিক চক্রান্তে অংশ নিলো সেই অতিবাম গোষ্ঠী। এগ্রেসিভ হয়ে একের পর এক বিভিন্ন নাশকতা মূলক কাজ করে সংকটে ফেলেছে বঙ্গবন্ধুকে।”
মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি বারবার বঙ্গবন্ধু , তার কন্যা শেখ হাসিনা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে । সবরকম দুর্নীতি এবং জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি সোচ্চার।  তার মতে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিশাল অপশক্তি ওঁৎ পেতে আছে। এই শক্তি প্রতিরোধ করতে হবে। দলের নেতা কর্মীদের সতর্ক থাকতে হবে যাতে তারা এমন কোন কাজ না করে, যা বর্তমান সরকারের জনকল্যাণ মুখী  ভূমিকাকে সংকটে ফেলতে পারে।
 চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের অন্ত:র্কোন্দল মিটাতে সম্প্রতি নুরুল ইসলাম বিএসসি এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ডা. আফসারুল আমিনের  বাসায় গেছেন এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ।বললেন, বড় দলে মত বিরোধ হয়, আবার মিটে যায়। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তিনবার নির্বাচিত মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী  পদ্মা সেতু  প্রসঙ্গে বলেন, বিশ্বের অনেক বড়ো শক্তির বিরোধিতার পরও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা এ দেশ স্বাধীন করেছি। প্রয়োজনে এক মুঠো ভাত কম খেয়ে হলেও আমরা ১৪ কোটি মানুষ নেত্রীর পদক্ষেপে একাত্ম।আমরা ভিক্ষুক হয়ে বাঁচতে রাজী না।জনগণের কথা ভেবে দেশের সন্তান হিসেবে ড. ইউনুস কে  পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান মহিউদ্দিন চৌধুরী। সুমি খান ১৫/০৮/১২

Tuesday, August 14, 2012

আমাদের ছোট রাসেল সোনা -শেখ হাসিনা


রাসেল, রাসেল তুমি কোথায়?

রাসেলকে মা ডাকে, আসো,খাবে না, খেতে আসো। 
মা মা মা, তুমি কোথায় মা?
মা যে কোথায় গেল--মাকে ছাড়া রাসেল যে ঘুমাতে চায় না ঘুমের সময় মায়ের গলা ধরে ঘুমাতে হবে।
মাকে ও মা বলে যেমন ডাক দিত, আবার সময় সময় আব্বা বলেও ডাকত।

আব্বা ওর জন্মের পরপরই জেলে চলে গেলেন। ৬ দফা দেওয়ার কারণে আব্বাকে বন্দি করল পাকিস্তানি শাসকরা। রাসেলের বয়স তখন মাত্র দেড় বছরের কিছু বেশি। কাজেই তার তো সব কিছু ভালোভাবে চেনার বা জানারও সময় হয়নি। রাসেল আমাদের সবার বড় আদরের;  সবার ছোট বলে ওর আদরের কোনও সীমা নেই। ও যদি কখনও একটু ব্যথা পায় সে ব্যথা যেন আমাদের সবারই লাগে। আমরা সব ভাইবোন সব সময় চোখে চোখে রাখি, ওর গায়ে এতটুকু আঁচড়ও যেন না লাগে। কী সুন্দর তুলতুলে একটা শিশু। দেখলেই মনে হয় গালটা টিপে আদর করি।

১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর রাসেলের জন্ম হয় ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাসায় আমার শোয়ার ঘরে। দোতলা তখনও শেষ হয়নি। বলতে গেলে মা একখানা করে ঘর তৈরি করেছেন। একটু একটু করেই বাড়ির কাজ চলছে। নিচতলায় আমরা থাকি। উত্তর-পূর্ব দিকের ঘরটা আমার ও কামালের। সেই ঘরেই রাসেল জন্ম নিল রাত দেড়টায়। আব্বা নির্বাচনী মিটিং করতে চট্টগ্রাম গেছেন। ফাতেমা জিন্নাহ প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। সর্বদলীয় ঐক্য পরিষদ আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে একটা মোর্চা করে নির্বাচনে নেমেছে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরু্দ্ধে সব রাজনৈতিক দল। তখনকার দিনে মোবাইল ফোন ছিল না। ল্যান্ডফোনই ভরসা। রাতেই যাতে আব্বার কাছে খবর যায় সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাসেলের জন্মের আগের মুহূর্তগুলো ছিল ভীষণ উৎকণ্ঠার। আমি, কামাল, জামাল, রেহানা ও খোকাকাকা বাসায়। বড় ফুফু ও মেজ ফুফু মার সাথে। একজন ডাক্তার এবং নার্সও এসেছেন। সময় যেন আর কাটে না। জামাল আর রেহানা কিছুক্ষণ ঘুমায় আর জেগে ওঠে। আমরাও ঘুমে ঢুলঢুলু চোখে জেগে আছি নতুন অতিথির আগমনবার্তা শোনার অপেক্ষায়। মেজ ফুফু ঘর থেকে বের হয়ে এসে খবর দিলেন আমাদের ভাই হয়েছে। খুশিতে আমরা আত্মহারা। কতক্ষণে দেখব। ফুফু বললেন, তিনি ডাকবেন। কিছুক্ষণ পর ডাক এলো। বড় ফুফু আমার কোলে তুলে দিলেন রাসেলকে। মাথাভরা ঘন কালো চুল। তুলতুলে নরম গাল। বেশ বড়সড় হয়েছিল রাসেল। মাথার চুল একটু ভেজা মনে হলো। আমি আমার ওড়না দিয়েই মুছতে শুরু করলাম। তারপরই এক চিরুনি নিলাম মাথার চুল আচড়াতে। মেজ ফুফু নিষেধ করলেন, মাথার চামড়া খুব নরম তাই এখনই চিরুনি চালানো যাবে না। হাতের আঙ্গুল বুলিয়ে সিঁথি করে দিতে চেষ্টা করলাম।

আমাদের পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট রাসেল। অনেক বছর পর একটা ছোট বাচ্চা আমাদের ঘর আলো করে এসেছে, আনন্দের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। আব্বা বার্ট্র্যান্ড রাসেলের খুব ভক্ত ছিলেন, রাসেলের বই পড়ে মাকে ব্যাখ্যা করে শোনাতেন। মা রাসেলের ফিলোসফি শুনে শুনে এত ভক্ত হয়ে যান যে নিজের ছোট সন্তানের নাম রাসেল রাখলেন। ছোট্ট রাসেল আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। মা রাসেলকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সংসারের কাজ করতেন, স্কুল বন্ধ থাকলে তার পাশে শুয়ে আমি বই পড়তাম। আমার চুলের বেণি ধরে খেলতে খুব পছন্দ করতো ও। আমার লম্বা চুলের বেণিটা ওর হাতে ধরিয়ে দিতাম। ও হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে হাসতো। কারণ নাড়াচাড়ায় মুখে চুল লাগতো তাতে খুব মজা পেত।

জন্মের প্রথম দিন থেকেই ওর ছবি তুলতাম, ক্যামেরা আমাদের হাতে থাকতো। কত যে ছবি তুলেছি। ওর জন্য আলাদা একটা অ্যালবাম করেছিলাম যাতে ওর জন্মের দিন, প্রথম মাস, প্রতি তিন মাস, ছয় মাস অন্তর ছবি অ্যালবামে সাজানো হতো। দুঃখের বিষয় ওই ফটো অ্যালবামটা অন্যসব জিনিসপত্রের সঙ্গে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী লুট করে নেয়। হারিয়ে যায় আমাদের অতি যত্নে তোলা আদরের ছোট্ট ভাইটির অনেক দুর্লভ ছবি।

বাসার সামনে ছোট্ট একটা লন। সবুজ ঘাসে ভরা। আমার মা খুবেই যত্ন নিতেন বাগানের। বিকেলে আমরা সবাই বাগানে বসতাম। সেখানে একটা পাটি পেতে ছোট্ট রাসেলকে খেলতে দেওয়া হতো। একপাশে একটা ছোট্ট বাঁশ বেঁধে দেওয়া ছিল, সেখানে রাসেল ধরে ধরে হাঁটতে চেষ্টা করতো। তখন কেবল হামাগুড়ি দিতে শুরু করেছে। আমরা হাত ধরে হাঁটাতে চেষ্টা করতাম। কিন্তু কিছুতেই হাঁটতে চাইতো না। ওর স্বাস্থ্য খুব ভালো ছিল। বেশ নাদুস-নুদুস একটা শিশু। আমরা ভাইবোন সব সময় ওকে হাত ধরে হাঁটাতাম। একদিন আমার হাত ধরে হাঁটছে। ওর যেন হাঁটার ইচ্ছা খুব বেড়ে গেছে। সারা বাড়ি হাত ধরে ধরে হাঁটছে। হাঁটাতে হাঁটতে পেছনের বারান্দা থেকে সামনের বারান্দা হয়ে বেশ কয়েকবার ঘুরলো। এই হাঁটার মধ্যে আমি মাঝে মাঝে চেষ্টা করছি আঙ্গুল ছেড়ে দিতে, যাতে নিজে হাঁটতে পারে। কিন্তু সে বিরক্ত হচ্ছে, আর বসে পড়ছে, হাঁটবে না আঙ্গুল ছাড়া। তার সাথে হাঁটতে হাঁটতে আমি বরাবরই চেষ্টা করছি যদি নিজে হাঁটে। হঠাৎ সামনের বারান্দায় হাঁটতে হাঁটতে আমার হাত ছেড়ে নিজে হাঁটতে শুরু করলো। হাঁটতে হাঁটতে চলছে। আমি পেছনে পেছনে যাচ্ছি। সেই প্রথম হাঁটা শুরু করল। আমি ভাবলাম কতটুকু হেঁটে আবার আমার হাত ধরবে। কিন্তু যতই হাঁটছি দেখি আমার হাত আর ধরে না, চলছে তো চলছেই, একেবারে মাঝের প্যাসেজ হয়ে পেছনের বারান্দায় চলে গেছে। আমি তো খুশিতে সবাইকে ডাকাডাকি শুরু করেছি যে, রাসেল সোনা হাঁটতে শিখে গেছে। একদিনে এভাবে কোনও বাচ্চাকে আমি হাঁটতে দেখিনি। অল্প অল্প করে হেঁটে হেঁটে তবেই বাচ্চারা শেখে। কিন্তু ওর সবকিছু যেন ছিল ব্যতিক্রম। ও যে খুবই মেধাবী তার প্রমাণ অনেকভাবে আমরা পেয়েছি। আমকে হাসুপা বলে ডাকত। কামাল ও জামালকে ভাই বলত আর রেহানাকে আপু। কামাল ও জামালের নাম কখনও বলতো না।আমরা অনেক চেষ্টা করতাম নাম শেখাতে, মিষ্টি হেসে মাথা নেড়ে বলতো ভাই। দিনের পর দিন আমরা যখন চেষ্টা করে যাচ্ছি- একদিন বলেই ফেলল ‘কামমাল’, ‘জামমাল’। তবে সব সময় ভাই বলেই ডাকত।

চলাফেরায় বেশ সাবধানি কিন্তু সাহসী ছিল, সহসা কোনও কিছুতে ভয় পেতো না। কালো কালো বড় পিপড়া দেখলে ধরতে যেত। একদিন একটা বড় ওলা (বড় কালো পিঁপড়া) ধরে ফেললো আর সাথে সাথে কামড় খেল। ছোট্ট আঙ্গুল কেটে রক্ত বের হলো। সাথে সাথে ওষুধ দেওয়া হলো। আঙ্গুলটা ফুলে গেছে। তারপর থেকে আর পিঁপড়া ধরতে যেত না। কিন্তু ওই পিঁপড়ার একটা নাম নিজেই দিয়ে দিল। কামড় খাওয়ার পর থেকেই কালো বড় পিপড়া দেখলেই বলতো ‘ভুট্টো’। নিজে থেকেই নামটা দিয়েছিল।

রাসেলের কথা ও কান্না টেপরেকর্ডারে টেপ করতাম। তখনকার দিনে বেশ বড় টেপরেকর্ডার ছিল। এর কান্না মাঝে মাঝে ওকেই শোনাতাম। সব থেকে মজা হতো ও যদি কোনও কারণে কান্নাকাটি করতো, আমরা টেপ ছেড়ে দিতাম, ও তখন চুপ হয়ে যেত। অবাক হতো মনে হয়। একদিন আমি রাসেলের কান্না টেপ করে বারবার বাজাচ্ছি, মা ছিলেন রান্নাঘরে। ওর কান্না শুনে মা ছুটে এসেছেন। ভেবেছিলেন ও বোধহয় একা, কিন্তু এসে দেখেন আমি টেপ বাজাচ্ছি আর ওকে নিয়ে খেলছি। মার আর কী বলবেন। প্রথমে বকা দিলেন, কারণ মা খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন ও একা আছে মনে করে। তারপর হেসে ফেললেন ওর টেপ করা কান্না শুনে। আমি ওকে দিয়ে কথা বলিযে টেপ করতে চেষ্টা করছিলাম।

আব্বা যখন ৬-দফা দিলেন তারপরই তিনি গ্রেফতার হয়ে গেলেন। রাসেলের মুখে হাসিও মুছে গেল। সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে রাসেল আব্বাকে খুঁজত। রাসেল যখন কেবল হাঁটতে শিখেছে, আধো আধো কথা বলতে শিখেছে, আব্বা তখনই বন্দি হযে গেলেন। মা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আব্বার মামলা-মকদ্দমা সামলাতে, পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। সংগঠনকে সক্রিয় রেখে আন্দোলন-সংগ্রাম চালাতেও সময় দিতে হতো। আমি কলেজে পড়ি, সাথে সাথে রাজনীতিতে সক্রিয় হযে কাজ শুরু করি। কামাল স্কুল শেষ করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়। সেও রাজনীতিতে যোগ দেয়। জামাল ও রেহেনা স্কুলে যায়। আব্বা গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই রাসেলের খাওয়া-দাওয়া একরকম বন্ধ হয়ে যায়। কিছু খেতে চাইতো না। ওকে মাঝে মাঝ ছোট ফুফুর বাসায় নিয়ে যেতাম। সেখানে গেলে আমার ছোট ফুফার সাথে বসে কিছু খেতে দিতেন। ছোট ফুফা ডিম পোচের সাথে চিনি দিয়ে রাসেলকে খেতে দিতেন। ঢেঁড়স ভাজির সাথেও চিনি দিয়ে রুটি খেতেন, রাসেলকেও খাওয়াতেন। আমাদের বাসায় আম্বিয়ার মা নামে এক বুয়া ছিল, খুব আদর করতো রাসেলকে। কোলে নিয়ে ঘুরে ঘুরে খাবার খাওয়াতো।

আমাদের বাসায় কবুতরের ঘর ছিল। বেশ উঁচু করে ঘর করা হয়েছিল। অনেক কবুতর থাকতো সেখানে। মা খুব ভোরে উঠতেন, রাসেলকে কোলে নিয়ে নিচে যেতেন এবং নিজের হাতে কবুতরদের খাবার দিতেন। রাসেল যখন হাঁটতে শেখে তখন নিজেই কবুতরের পেছনে ছুটত, নিজে হাতে করে তাদের খাবার দিত। আমাদের গ্রামের বড়িতেও কবুতর ছিল। কবুতরের মাংস সবাই খেত। বিশেষ করে বর্ষকালে যখন অধিকাংশ জমি পানির নিচে থাকতো তখন তরকারি ও মাছের বেশ অভাব দেখা দিত। তখন প্রায়ই কবুতর খাওয়ার রেওয়াজ ছিল। সকালের নাস্তার জন্য পরোটা ও কবুতরের মাংস ভুনা সবার প্রিয় ছিল। তাছাড়া কারও অসুখ হলে কবুতরের মাংসের ঝোল খাওয়ানো হতো। ছোট ছোট বাচ্ছাদের কবুতরের স্যুপ করে খাওয়ালে রক্ত বেশি হবে, তাই বাচ্চাদের নিয়মিত কবুতরের স্যুপ খাওয়াতো। রাসেলকে কবুতর দিলে কোনও দিন খেত না। এত ছোট বাচ্চা কিভাবে যে টের পেত কে জানে। ওকে আমরা অনেকভাবে চেষ্টা করেছি। ওর মুখের কাছে নিলেও খেত না। মুখ ফিরিয়ে নিত। শত চেষ্টা করলেও কোনোদিন কেউ ওকে কবুতরের মাংস খাওয়াতে পারে নি।

আব্বার সঙ্গে প্রতি ১৫ দিন পর আমরা দেখা করতে যেতাম। রাসলকে নিয়ে গেলে আর আসতে চাইতো না। খুবই কান্নাকাটি করতো। ওকে বোঝানো হয়েছিল যে আব্বার বাসা জেলখান আর আমরা আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছি। আমরা  বাসায় ফেরত যাবো। বেশ কষ্ট করেই ওকে বাসায় ফেরত আনা হতো। আর আব্বার মনের অবস্থা কী হতো তা আমরা বুঝতে পারতাম। বাসায় আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা ওকে বোঝাতো এবং মাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। মাকেই আব্বা বলে ডাকতো।

১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি আব্বাকে আগরতলা মামলায় আসামি করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে বন্দি করে রাখে। ছয় মাস আব্বার সঙ্গে দেখা হয়নি। আমরা জানতেও পারিনি আব্বা কেমন আছেন, কোথায় আছেন। রাসেলের শরীর খারাপ হয়ে যায়। খাওয়া-দাওয়া নিয়ে আরও জেদ করতে শুরু করে। ছোট্ট বাচ্চা মনের কষ্টের কথা মুখ ফুটে বলতেও পারে না, আবার সহ্যও করতে পারে না। কী যে কষ্ট ওর বুকের ভেতরে তা আমরা বুঝতে পারতাম।

কলেজ শেষ করে ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। মা আব্বার মামলা ও পার্টি নিয়ে ব্যস্ত। প্রায়ই বাসার বাইরে যেতে হয়। মামলার সময় কোর্টে যান। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন জেরদার করার জন্য ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ১৯৬৮ সালে ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলন নিয়ে সবাই ব্যস্ত। আন্দোলন সংগ্রাম তখন জোরদার হয়েছে। রাসলকে সময় দিতে পারি না বেশি। আম্বিয়ার মা সব সময় দেখে রাখতো। এমনি খাবার খেতে চাইত না কিন্তু রান্নাঘরে যখন সবাই খেত তখন সবার সঙ্গে বসতো। পাশের ঘরে বসে লাল ফুল আঁকা থালায় করে পিঁড়ি পেতে বসে কাজের লোকদের সঙ্গে ভাত খেতে পছন্দ করতো।

আমাদের একটা পোষা কুকুর ছিল; ওর নাম টিম। সবার সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব ছিল। ছোট্ট রাসেলও টমিকে নিয়ে খেলতো। একদিন খেলতে খেলতে হঠাৎ টমি ঘেউ ঘেউ করে ডেকে ওঠে, রাসেল ভয় পেয়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে রেহানার কাছে এসে বলে, টমি বকা দিচ্ছে। তার কথা শুনে আমরা তো হেসেই মরি। টমি আবার কিভাবে বকা দিল। কিন্তু রাসেলকে দেখে মনে হলো বিষয়টা নিয়ে সে বেশ বেশ গম্ভীর। টমি তাকে বকা দিয়েছে এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না, কারণ টমিকে সে খুব ভালোবাসতো। হাতে করে খাবার দিত। নিজের পছন্দমতো খাবারগুলো টমিকে ভাগ দেবেই, কাজেই সেই টমি বকা দিলে দুঃখ তো পাবেই।

১৯৬৯ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি প্রায় তিন বছর পর আব্বা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যখন মুক্তি পান তখন রাসেলের বয়স চার বছর পার হয়েছে। কিন্তু ভীষণ রোগা হয়ে গিয়েছিল বলে আরও ছোট্ট দেখাতো।

ওর মধ্যে আর একটি জিনিস আমরা লক্ষ্য করলাম। খেলার ফাঁকে ফাঁকে কিছুক্ষণ পরপরই আব্বাকে দেখে আসত। আব্বা নিচে অফিস করতেন। আমরা তখন দোতলায় উঠে গেছি। ও সারাদিন নিচে খেলা করত। আর কিছুক্ষণ পরপর আব্বাকে দেখতে যেত। মনে মনে বোধহয় ভয় পেত যে আব্বাকে বুঝি আবার হারায়।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন অসহযোগ আন্দোলন চলছে, তখন বাসার সামনে দিয়ে মিছিল যেত আর মাঝে মধ্যে পুলিশের গাড়ি চলাচল করত। দোতলায় বারান্দায় রাসেল খেলা করত, যখনই দেখত পুলিশের গাড়ি যাচ্ছে তখনই চিৎকার করে বলত, ‘ও পুলিশ কাল হরতাল’। যদিও ওই ছোট্ট মানুষের কণ্ঠস্বর পুলিশের কানে পৌঁছত না কিন্তু রাসেল হরতালের কথা বলবেই। বারন্দায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ‘হরতাল হরতাল’ বলে চিৎকার করত। স্লোগান দিন ‘জয় বাংলা’। আমরা বাসায় সবাই আন্দোলনের ব্যাপারে আলোচনা করতাম, ও সব শুনত এবং নিজেই আবার তা বলত।

১৯৭১ সালের পঁচিশ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হামলা চালালে আব্বা স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ছাব্বিশ মার্চ প্রথম প্রহরের পরপরই আব্বাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। পরদিন আবার আমাদের বাসা আক্রমণ করে। রাসেলকে নিয়ে মা ও জামাল পাশের বাসায় আশ্রয় নেন। কামাল আমাদের বাসার পেছনে জাপানি কনস্যুলেটের বাসায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। কামাল মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চলে যায়। আমার মা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হন। আমাদের ধানমণ্ডির ১৮ নম্বর সড়কে (পুরাতন) একটা একতলা বাসায় বন্দি করে রাখে।

ছোট্ট রাসেলও বন্দি জীবনযাপন করতে শুরু করে। ঠিকমতো খাবার-দাবার নেই। কোনো খেলনা নেই, বইপত্র নেই, কী কষ্টের দিন যে ওর জন্য শুরু হলো। বন্দিখানায় থাকতে আব্বার কোনও খবরই আমরা জানি না। কোথায় আছেন কেমন আছেন কিছুই জানি না। প্রথম দিনে রাসেল আব্বার জন্য খুব কান্নাকাটি করত। তার ওপর আদরের কামাল ভাইকে পাচ্ছে না, সেটাও ওর জন্য কষ্টকর। মনের কষ্ট কীভাবে চেপে রাখবে আর কীভাবেই বা ব্যক্ত করকে। চোখের কোণে সব সময় পানি। যদি জিজ্ঞাসা করতাম, ‘কি হয়েছে রাসেল?’ বলত ‘চোখে ময়লা’।

ওই ছোট্ট বয়সে সে চেষ্টা করত মনের কষ্ট লুকাতে। মাঝে মধ্যে রমার কাছে বলত। রমা ছোট থেকেই আমাদের বাসায় থাকতো, ওর সাথে খেলতো। পারিবারিকভাবে ওদের বংশ পরম্পরায় আমাদের বাড়িতে বিভিন্ন কাজ করত। ওকে মাঝে মধ্যে দুঃখের কথা বলত। ওর চোখে পানি দেখলে যদি জিজ্ঞেস করতাম, বলত চোখে কী হয়েছে। অবাক লাগত এটুকু একটা শিশু কীভাবে নিজের কষ্ট লুকাতে শিখল। আমরা বন্দিখানায় সব সময় দুঃশ্চিন্তায় থাকতাম, কারণ পাকবাহিনী মাঝে মধ্যেই ঘরে এসে সার্চ করত। আমাদের নানা কথা বলত। জামালকে বলত, তোমাকে ধরে নিয়ে শিক্ষা দেব। রেহানাকে নিয়েও খুব চিন্তা করতো। জয় এরই মধ্যে জন্ম নেয়। জয় হওয়ার পর রাসেল যেন একটু আনন্দ পায়। সারাক্ষণ জয়ের কাছে থাকত। ওর খোঁজ নিতো।

যখন ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধ শুরু হয় তখন তার জয়কে নিয়েই চিন্তা। এর কারণ হলো, আমাদের বাসার ছাদে বাংকার করে মেশিনগান বসানো ছিল, দিন-রাতই গেলাগুলি করত। প্রচণ্ড আওয়াজ হতো। জয়কে বিছানায় শোয়াতে কষ্ট হতো। এটুকু ছোট্ট বাচ্চা মাত্র চার মাস বয়স, মেশিগানের গুলিতে কেঁপে কেঁপে উঠত।

এরপর শুরু হল এয়ার রেইড। আক্রমণের সময় সাইরেন বাজত। রাসেল এ ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিল। যখনই সাইরেন বাজত বা আকাশে মেঘের মতো আওয়াজ হত, রাসেল তুলা নিয়ে এসে জয়ের কানে গুঁজে দিত। সব সময় পকেটে তুলা রাখত।

সে সময় খাবারের কষ্টও ছিল, ওর পছন্দের কোনো খাবার দেওয়া সম্ভব হতো না। দিনের পর দিন বন্দি থাকা, কোনো খেলার সাথি নেই। পছন্দমতো খাবার পাচ্ছে না, একটা ছোট বাচ্চার জন্য কত কষ্ট নিয়ে দিনের পর দিন কাটাতে হয়েছে তা কল্পনাও করা যায় না।

রাসেল অত্যন্ত মেধাবী ছিল। পাকসেনারা তাদের অস্ত্রশস্ত্র পরিস্কার করত। ও জানালায় দাঁড়িয়ে সব দেখত। অনেক অস্ত্রের নামও শিখেছিল। যখন এয়ার রেইড হতো তখন পাকসেনারা বাংকারে ঢুকে যেত আর আমরা তখন বারান্দায় বের হওয়ার সুযোগ পেতাম। আকাশে যুদ্ধবিমানের ‘ডগ ফাইট’ দেখারও সুযোগ হয়েছিল। প্লেন দেখা গেলেই রাসেল খুশি হয়ে হাতে তালি দিত।

ষোল ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে সারেন্ডার হয়, পাকিস্তান যুদ্ধে হেরে যায়, বাংলাদেশ মুক্ত হয়। আমরা সেদিন মুক্তি পাইনি। আমরা মুক্তি পাই ১৭ ডিসেম্বর সকালে। যে মুহূর্তে আমরা মুক্ত হলাম এবং বাসার সৈনিকদের ভারতীয় মিত্রবাহিনী বন্দি করল, তারপর থেকে আমাদের বাসায় দলে দলে মানুষ আসতে শুরু করল। এর মধ্যে রাসেল মাথায় একটা হেলমেট পরে নিল, সাথে টিটোও একটা পরল। দুইজন হেলমেট পরে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা শুরু করল। আমরা তখন একদিকে মুক্তির আনন্দে উদ্বেলিত আবার আব্বা, কামাল, জামালসহ অগণিত মানুষের জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। কে বেঁচে আছে কে নেই কিছুই তো জানি না। এক অনিশ্চয়তার ভার বুকে নিয়ে বিজয়ের উল্লাস করছি। চোখে পানি, মুখে হাসি--এই ক্ষণগুলো ছিল অদ্ভুত এক অনুভূতি নিয়ে, কখও হাসছি কখনও কান্নাকাটি করছি। আমাদের কাঁদতে দেখলেই রাসেল মন খারাপ করত। ওর ছোট্ট বুকের ব্যথা আমরা কতটুকু অনুভব করতে পারি? এর মধ্যে কামাল ও জামাল রণাঙ্গন থেকে ফিরে এসেছে। রাসেলের আনন্দ ভাইদের পেয়ে, কিন্তু তখন তার দু’চোখ ব্যথায় ভরা, মুখফুটে বেশি কথা বলত না। কিন্তু ওই দুটো চোখ যে সব সময় আব্বাকে খঁজে বেড়াচ্ছে তা আমি অনুভব করতে পারতাম।

আমরা যে বাসায় ছিলাম তার সামনে বাড়িভাড়া নেওয়া হলো। কারণ এত মানুষ আসছে যে বসারও জায়গা দেওয়া যাচ্ছে না। এদিকে আমাদের ৩২ নম্বর ধানমণ্ডির বাসা লুটপাট করে বাথরুম, দরজা-জানলা সব ভেঙে রেখে গেছে পাকসেনারা। মেরামত না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকতে হবে।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি আব্বা ফিরে এলেন বন্দিখানা থেকে মুক্তি পেয়ে। আমার দাদা রাসেলকে নিয়ে এয়ারপোর্ট গেলেন আব্বাকে আনতে। লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল সেদিন, আব্বা প্রথম গেলেন তার প্রিয় মানুষের কাছে। তারপর এলেন বাড়িতে। আমরা সামনের বড় বাড়িটায় উঠলাম। ছোট যে বাসাটায় বন্দি ছিলাম সে বাসাটা দেশ-বিদেশ থেকে সব সময় সাংবাদিক ফটোগ্রাফার আসত আর ছবি নিত। মাত্র দুটো কামরা ছিল। আব্বার থাকার মতো জায়গা ছিল না এবং কোনও ফার্নিচারও ছিল না। যা হোক, সব কিছু তড়িঘড়ি করে জোগাড় করা হলো।

রাসেলের সব থেকে আনন্দের দিন এলো যেদিন আব্বা ফিরে এলেন। এক মুহূর্তে যেন আব্বাকে কাছছাড়া করতে চাইত না। সব সময় আব্বার পাশে পাশে ঘুরে বেড়াত। ওর জন্য ইতোমধ্যে অনেক খেলনাও আনা হয়েছে। ছোট সাইকেলও এসেছে, কিন্তু কিছুক্ষণ পরপরই ও আব্বার কাছে চলে যেত।

ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা ৩২ নম্বর সড়কে আমাদের বাসায় ফিরে এলাম। বাসাটা মেরামত করা হয়েছে। রাসেলের মুখে হাসি, সরা দিন খেলা নিয়ে ব্যস্ত। এর মাঝে গণভবনও মেরামত করা হয়েছে। পুরনো গণভন বর্তমানে সুগন্ধাকে প্রধানমন্ত্রীর কর্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এবার গণভবন ও তার পাশেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কার্যক্রম শুরু করা হলো। গণভবন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসস্থান আর এর পাশেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে, ভেতর থেকে রাস্তা ছিল, হেঁটেই কার্যালয়ে যাওয়া যেত।

আব্বা প্রতিদিন সকালে অফিসে আসতেন, দুপুরে গণভবনে বিশ্রাম নিতেন, এখানেই খাবার খেতেন। বিকেলে হাঁটতেন আর এখানেই অফিস করতেন।

রাসেল প্রতিদিন বিকেলে গণভবনে আসত। তার সাইকেলটাও সাথে আসত। রাসেলের মাছ ধরার খুব শখ ছিল। কিন্তু মাছ ধরে আবার ছেড়ে দিতো। মাছ ধরবে আর ছাড়বে এটাই তার খেলা ছিল। একবার আমরা সবাই মিলে নাটোরে উত্তরা গণভবনে যাই। সেখানেও সারা দিন মাছ ধরতেই ব্যস্ত থাকতো।

রাসেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি স্কুলে ভর্তি হয়। তবে স্কুলে যেতে মাঝে মধ্যেই আপত্তি জানাত। তখন আমরা ছোটবেলা থেকে যে শিক্ষকের কাছে পড়েছি তার কাছে পড়বে না। তখন ও স্কুলে ভর্তি হয় নি এটা স্বাধীনতার আগের ঘটনা, তার পছন্দ ছিল ওমর আলীকে। বগুড়ায় বাড়ি। দি পিপল পত্রিকার অ্যাডে কণ্ঠ দিয়েছিল, টেলিভিশনে ইংরেজি খবর পড়ত। মাঝে মধ্যে আমাদের বাসায় আসত, তখন রাসেলের জন্য অনেক ‘কমিক’ বই নিয়ে আসত এবং রাসেলকে পড়ে শোনাত। যা হোক স্বাধীনতার পরে একজন ভদ্র মহিলাকে রাসেলের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো। রাসেলকে পড়ানো খুব সহজ কথা ছিল না। শিক্ষককে তার কথাই শুনতে হতো। প্রতিদিন শিক্ষয়িত্রীকে দুটো করে মিষ্টি খেতে হবে। আর এ মিষ্টি না খেলে সে পড়বে না। কাজেই শিক্ষিকাকে খেতেই হতো। তা ছাড়া সব সময় তার লক্ষ্য থাকত শিক্ষিকার যেন কোনও অসুবধা না হয়। মানুষকে আপ্যায়ন করতে খুই পছন্দ করত।

টুঙ্গিপাড়া গ্রামের বাড়িতে গেলে তার খেলাধুলার অনেক সাথি ছিল। গ্রামের ছোট ছোট অনেক বাচ্চাদের জড়ো করত। তাদের জন্য ডামি বন্দুক বানিয়ে দিয়েছিল। সেই বন্দুক বানিয়ে দিয়েছিল। সেই বন্দুক হাতে তাদের প্যারেড করাত। প্রত্যেকের জন্য খাবার কিনে দিত। রাসেলের খুদে বাহিনীর জন্য জামা-কাপড় ঢাকা থেকেই কিনে দিতে হতো। মা কাপড়-চোপড় কিনে চুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যেতেন। রাসেল সেই কাপড় তার খুদে বাহিনীকে দিত। সব সময় মা কাপড়-চোপড় কিনে আলমারিতে রেখে দিতেন। নাসের কাকা রাসেলকে এক টাকা নোটের বাণ্ডিল দিতেন। খুদে বাহিনীকে বিস্কুট লজেন্স কিনে খেতে টাকা দিত। প্যারেড শেষ হলেও তাদের হাতে টাকা দিত। এই খুদে বাহিনীকে নিয়ে বাড়ির উঠোনেই খেলা করতো। রাসলেকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করতো, বড় হয়ে তুমি কি হবে? তাহলে বলতো, আমি আর্মি অফিসার হব।

ওর খুব ইচ্ছা ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দেবে। মুক্তিযুদ্ধের চলাকালীন থেকেই ওর ওই ইচ্ছা। কামাল ও জামাল মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর সব গল্প বলার জন্য আবদার করতো। খুব আগ্রহ নিয়ে শুনতো।

রাসেল আব্বাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করতো। আব্বাকে মোটেই ছাড়তে চাইতো না। যেখানে যেখানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব আব্বা সেখানে তাকে নিয়ে যেতেন। মা ওর জন্য প্রিন্স স্যুট বানিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ আব্বা প্রিন্স স্যুট যেদিন পরতেন রাসেলও পরতো। কাপড়-চোপড়ের ব্যাপারে ছোটবেলা থেকেই তার নিজের পছন্দ ছিল। তবে একবার একটা পছন্দ হলে তা আর ছাড়তে চাইতো না। ওর নিজের আলাদা একটা ব্যক্তিত্ব ছিল। নিজের পছন্দের ওপর খুব বিশ্বাস ছিল। খুব স্বাধীন মত নিয়ে চলতে চাইতো। ছোট মানুষটার চরিত্রের দৃঢ়তা দেখে অবাক হতে হতো। বড় হয়ে সে যে বিশেষ কেউ একটা হবে তাতে কোনও সন্দেহ ছিল না।

জাপান থেকে আব্বার রাষ্ট্রীয় সফরের দাওয়াত আসে। জাপানিরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দেয়। শরণার্থীদের সাহায্য করে জাপানের শিশুরা তাদের টিফিনের টাকা দেয় আমাদের দেশের শিশুদের জন্য।

সেই জাপান যখন আমন্ত্রণ জানায় তখন গোটা পরিবারকেই আমন্ত্রণ দেয় বিশেষভাবে রাসেলের কথা উল্লেখ করে। রাসেল ও রেহানা আব্বার সাথে জাপান যায়। রাসেলের জন্য বিশেষ কর্মসূচিও রাখে জাপান সরকার। খুব আনন্দ করেছিল রাসেল সেই সফরে। তবে মাকে ছেড়ে কোথাও ওর থাকতে কষ্ট হয়। সারাদিন খুব ব্যস্ত থাকতো কিন্তু রাতে আব্বার কাছেই ঘুমাতো। আর তখন মাকে মনে পড়ত। মার কথা মনে পড়লেই মন খারাপ করতো। আব্বার সঙ্গে দেশেও বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগ দিতো। আব্বা নেভির কর্মসূচিতে যান। সমুদ্রে জাহাজ কমিশন করতে গেলে সেখানে রাসেলকে সাথে নিয়ে যান। খুব আনন্দ করেছিল ছোট্ট রাসেল।

রাসেলের একবার খুব বড় অ্যাকসিডেন্ট হলো। সে দিনটার কথা এখনও মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে। রাসেলের একটা ছোট মপেট মোটরসাইকেল ছিল আর একটা সাইকেলও ছিল। বাসায় কখনও রাস্তায় সাইকেল নিয়ে চলে যেত। পাশের বাড়ির ছেলেরা ওর সঙ্গে সাইকেল চালাতো। আদিল ও ইমরান দুই ভাই এবং রাসেল একসঙ্গে খেলা করতো। একদিন মপেট চালানোর সময় রাসেল পড়ে যায় আর ওর পা আটকে যায় সাইকেলের পাইপে। বেশ কষ্ট করে পা বের করে। আমি বাসার উপর তলায় জয় ও পুতুলকে নিয়ে ঘরে। হঠাৎ রাসেলের কান্নার আওয়াজ পাই। ছুটে উত্তর-পশ্চিমের খোলা বারান্দায় চলে আসি, চিৎকার করে সবাইকে ডাকি। এর মধ্যে দেখি কে যেন ওকে কোলে নিয়ে আসছে। পায়ের অনেকখানি জায়গা পুড়ে গেছে। বেশ গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হযেছে। ডাক্তার এসে ওষুধ দিল। অনেকদিন পর্যন্ত পায়ের ঘা নিয়ে কষ্ট পেয়েছিল। এর মধ্যে আব্বা অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাশিয়া যান চিকিৎসা করাতে।

সেখানে রাসেলের পায়ে চিকিৎসা হয়। কিন্তু সারতে অনেক সময় নেয়। আমাদের সবার আদরের ছোট ভাইটি। ওর ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। খুবই সাবধানী ছিল। আর এখন এতো কষ্ট পাচ্ছে।

১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে কামাল ও জামালের বিয়ে হয়। হলুদ ও বিয়ের অনুষ্ঠানে আমরা অনেক মজা করি। বাইরে চাকচিক্য বেশি ছিল না কিন্তু ভেতরে আমরা আত্মীয়-স্বজন মিলে অনেক আনন্দ করি। বিশেষ করে হলুদের দিন সবাই খুব রং খেলে। রাসেল ওর সমবয়সীদের সাথে রং খেলে। বিয়ের সময় দুই ভাইয়ের পাশে পাশেই থাকে। দুই ভাইয়ের বিয়ে কাছাকাছি সময়ই হয়। কামালের ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই, আর জামালের ১৭ জুলাই বিয়ে হয়। রাসেল সব সময় ভাবিদের পাশে ঘুর ঘুর করতো, আর কী লাগবে খুব খেয়াল রাখতো।

৩০ জুলাই আমি জার্মানিতে স্বামীর কর্মস্থলে যাই। রাসেলের খুব মন খারাপ ছিল। কারণ সে জয়ের সাথে এক সঙ্গে খেলতো। সব থেকে মজা করতো যখন রাসেল জয়ের কাছ থেকে কোনও খেলনা নিতে চাইতো তখন জয়কে চকলেট দিত। আর চকলেট পেয়ে জয় হাতের খেলনা দিয়ে দিত, বিশেষ করে গাড়ি। রাসেল গাড়ি নিয়ে খেলতো, জয়ের যেই চকলেট শেষ হয়ে যেত তখন বলত চকলেট শেষ, গাড়ি ফেরত দাও। তখন আবার রাসেল বলতো চকলেট ফেরত দাও, গাড়ি ফেরত দেব। এই নিয়ে মাঝে মধ্যে দু`জনের মধ্যে ঝগড়া লেগে যেত, কান্নাকাটি শুরু হতো। মা সবসময় আবার জয়ের পক্ষ নিতেন।

রাসেল খুব মজা পেত। পুতুলের খেলার জন্য একটা ছোট্ট খেলনা পুতুল ও প্রাম ছিল, ওই প্রাম থেকে খেলার পুতুল সরিয়ে পুতুলকে বসিয়ে ঠেলে নিয়ে বেড়াত। পুতুল এত ছোট ছিল যে, খেলার প্রামে ভালোই বসে থাকতো। রাসেল খুব মজা করে জয়-পুতুলকে নিয়ে খেলত। আমি জার্মানি যাওয়ার সময় রেহানাকে আমার সাথে নিয়ে যাই। রাসেলকে সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু ওর জন্ডিস হয়, শরীর খারাপ হয়ে পড়ে। সে কারণে মা ওকে আর আমাদের সাথে যেতে দেননি। রাসেলেকে সেদিন আমাদের সাথে নিয়ে যেতে পারতাম তা হলে ওকে আর হারাতে হতো না।

১৯৭৫ সালের পনের আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেট কেড়ে নিল ছোট্ট রাসেলকে। মা, বাবা, দুই ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, চাচা সবার লাশের পাশ দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে সবার শেষে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করল রাসেলকে। ওই ছোট্ট বুকটা কি তখন ব্যথায় কষ্টে বেদনায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যাদের সান্নিধ্যে স্নেহ-আদরে হেসে খেলে বড় হয়েছে তাদের নিথর দেহগুলো পড়ে থাকতে দেখে ওর মনের কী অবস্থা হয়েছিল- কী কষ্টই না ও পেয়েছিল- কেন কেন কেন আমার রাসেলকে এত কষ্ট দিয়ে কেড়ে নিল? আমি কি কোনোদিন এই `কেন`র উত্তর পাব

Thursday, August 9, 2012

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রকৃত নায়ক: মাহমুদুল বাসার




১৫ আগষ্ট, জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে সপরিবারে, সপরিজনে হত্যা করা হয়। পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম হত্যাকান্ডের অন্যতম একটি ১৫ আগষ্টের হত্যাকান্ড। বাংলাদেশের একদল বিভ্রান্ত সেনাসদস্য এই হত্যা সংঘটিত করেছে। এরা ছিলো ক্রীড়নক। দেশি-বিদেশি শক্তিশালী ষড়যন্তকারী একটি চক্র এই হত্যার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে নিজ হাতে হত্যা করেছিল মোহাম্মাদী বেগ, তার অর্থ এই নয়, মোহাম্মাদী বেগই সিরাজ হত্যার আসল ব্যাক্তি। ঠিক তেমনি ডালিম, ফারুক, রশীদ, মেজর নূর বঙ্গবন্ধু হত্যা-নাটকের মূল চরিত্র নয়।
সিরাজ হত্যার মূল পরিকল্পক ছিলো ব্রিটিশ বেনিয়া শক্তির প্রতিনিধি লর্ড ক্লাইভ। বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল পরিকল্পক ছিলো মর্কিন প্রতিনিধি তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. কিসিঞ্জার এবং তার দোসর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভূট্টো।
এরা দুজনই বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কাছে ১৯৭১ সালে পরাজিত হয়েছিলেন। খুব অপমানিত হয়েছিলেন এরা। একটা শানিত অপমানিত বোধ থেকে কিসিঞ্জার ও ভূট্টো বঙ্গবন্ধু হত্যার নীলনক্শা প্রণয়ন করেন। বঙ্গবন্ধুকে বাঁকা নজরে দেখতেন খন্দকার মোস্তাক এবং জিয়াউর রহমান। এর প্রমাণ ইতিহাসে আছে। দুজনই ছিলেন ক্ষমতা লিপসু, উচ্চাভিলাষী এবং ঘড়যন্ত্রকারী, এর প্রমাণও ইতিহাসে আছে।
মোস্তাক চেয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক হতে তারপর মুজিব নগর সরকারের প্রদানমন্ত্রী হতে। পারেননি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম কালুর ঘাট বেতারে নিজেকে অস্থায়ী সরকারের প্রধান বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তুমুল প্রতিবাদের মুখে তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এর পর কলকাতা যেয়ে তিনি ড. আনিসুজ্জামানের কাছে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আশ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। ড. আনিসুজ্জামানের “আমার একাত্তর” বইতে তা লেখা আছে। ১৯৭১ সালে খন্দকার মোস্তাক পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন করার যে চক্রন্ত করেছিলেন, এর সঙ্গে জিয়াউর রহমানও জড়িত ছিলেন। 
মোস্তাক এবং জিয়া দু’জনই বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছেন। একজন রাজনৈতিক অঙ্গনে বসে, অন্যজন সেনাবাহিনীর পরিমন্ডলে বসে। যতদিন বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় ছিলেন, ততদিন দ’জনই বঙ্গবন্ধুর কাছাকাছি থেকে নিখুঁত অভিনয় করেছেন। যাতে আঘাতটা ভেতর থেকে করতে পারেন।
ড. ওয়াজেদের বই পড়ে জানা যায় যে, মোস্তাকের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর প্রবল তর্ক হয়েছে বাব্দশাল গঠন নিয়ে। তারপরও মোস্তাক তাজউদ্দিন, জেনারেল ওসমানী, ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনের মত মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেননি। জিয়া বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী তার “ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা” বইতে জানিয়েছেন যে, তিনি যখন প্রতিদিন বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী লেখার ডিক্টেশন নিতে যেতেন ৩২ নাম্বার ধানমন্ডিতে, তখন প্রায়ই দেখা হোত জিয়ার সঙ্গে, তিনিও নিয়মিত বঙ্গবন্ধু ভবনে যেতেন। বঙ্গবন্ধুর সামনে জিয়াউর রহমান নতজানু হয়ে বঙ্গবন্ধুকে তোষামোদ করে কথা বলতেন। খামাখা অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলতেন, “আগে আমার বুকেগুলি লাগবে, তারপর বঙ্গবন্ধুর বুকে লাগবে”। (অধ্যাপক আবু সাইয়িদÑ বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডঃ ফ্যাক্টস্ এ্যান্ড ডকুমেন্টস্)।
১৯৭৫ সালের প্রথম দিকে বঙ্গবন্ধুর খুনীরা জিয়ার সঙ্গে গোপনে দেখা করেন। তারা জিয়ার কাছে বঙ্গবন্ধু সরকার উৎখাতের প্রস্তাব করেন। জিয়া বলেন, “আমি এ সবে থাকতে পারি না, তোমরা জুনিয়ররা এ সব করলে করতে পারো”। অর্থাৎ তোমরা এগিয়ে যাও; আমি আছি পেছনে।
বঙ্গবন্ধুর শিক্ষক, দার্শনিক ও অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান (শফিক রহমানের পিতা) একটি বই লিখেছেন, নাম “শতব্দীর স্মৃতি”। সেখানে স্মৃতিচারণায় সাইদুর রহমান বলেছেন যে, ১৯৭৪ সালে তার ভায়রার বাসায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার দেখা হয়। জিয়া তার কাছে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে সাংঘাতিক ক্ষোভ প্রকাশ করেন ও বিেেষাদগার করেন।
অথচ প্রজাতন্ত্রের সেবক হয়ে জাতির পিতার বিরুদ্ধে এবং সরকার প্রধানের বিরুদ্ধে এমন ক্রদ্ধতা প্রকাশ করতে পারেন না। জিয়ার সৎ সাহস থাকলে তিনি চাকুরি থেকে পদত্যাগ  করে রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারতেন।
জিয়ার কুটিল চেহারা চেনার জন্য নিরন্তর গবেষণা করা উচিত। আমার বন্ধু সাংবাদিক স্বদেশ রায় একবার বলেছিলেন যে, তিনি “মেজর জেনারেল গনতন্ত্র” নাম দিয়ে জিয়াউর রহমানের ওপর বই লিখবেন। লিখেছেন কিনা জানিনা।
আপাতত মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম প্রণীত “লক্ষ প্রানের বিনিময়ে”, সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্তের “ইতিহাসের ছায়াচছন্ন প্রহর ও বঙ্গবন্ধু” বই দুটো পড়লে জিয়ার আসল স্বরূপ চেনা যাবে। ইতিহাসের তিনি একজন খল নায়ক। তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনীদের উস্কানী দিয়েছিলেন এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টের পর সেনা অভ্যন্তরে ফারুক ও রশীদদের ডিফেন্স দিয়েছিলেন। তখন সেনা বাহিনীর মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যার মত নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া গড়ে ওঠার বিপক্ষে তিনি জোরালো ভূমিকা রেখেছিলেন। এ ছাড়া জিয়া সেনাবাহিনীতে বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে লবিং করে ১৫ আগষ্ট হত্যাকান্ডের পরিবেশ তৈরি করে রেখেছিলেন।
জিয়া ও মোস্তাক দুজনই মতলববাজ ও সম্প্রোদায়িক। একটি সেক্যুলার রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তারা বঙ্গবন্ধুকে মেনে নিতে পারেননি। তাই দেখা গেলো, জিয়া ১৫ আগষ্ট সকালে নির্বিকার ভাবে, উৎফুল্ল মনে সেভ করতে বসেছেন। খবর এলো রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বললেন, ‘সো হোয়াটা।’ ঐদিন তিনি সেনা ছাউনিতে গিয়ে খুনী ফারুককে বললেন, ঋধৎঁয়ব পড়সব ঃড় সব ধহফ শরংং সব, ুড়ঁ যধাব ফড়হব ধ মৎবধঃ লড়ন, (বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডঃ ফ্যাক্টস্ এ্যান্ড ডকুমেন্টস্)।
জিয়া ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে যে ঘোষণাটি পাঠ করেছিলেন তার পুরস্কার দিতে বঙ্গবন্ধু কর্পণ্য করেন নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন না। তাই তাকে সেনাবাহিনীর প্রধান না বানিয়ে জেনারেল শফিউল্লাহকে বানিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু জিয়াকে তেম আমল দিতেন না। একবার বলেছিলেন “আমাদের জিয়া বড় মুক্তিযোদ্ধা, কেবল আমার বিরুদ্ধে একটু আধটু ষড়যন্ত্র করে।” অর্থাৎ জিয়ার চোখের ভাষা বঙ্গবন্ধু বুঝতেন, তাই গুরুত্ব দিতেন না। এই ক্ষোভ জিয়ার মনে সাপের বিষের মত কাজ করেছিলো।
বঙ্গবন্ধু গবেষক, লন্ডন প্রবাসী লেখক আব্দুল মতিন “বিজয় দিবসের পর ও বঙ্গবন্ধ”ু বইতে দেখিয়েছেন, কেনো জেনারেল ওসমানী জিয়াকে গুলি করে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের হস্তক্ষেপে তার মীমাংসা হয়। আব্দুল মতিন আরো জানিয়েছেন যে, জিয়া ভারতের কয়েকটি শরনার্থী শিবিরে ভারত সরকার এবং বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়েছেন।
ধূর্ত, চতুর, উচ্চাভিলাষী জিয়া জেনারেল শফিউল্লাহ্র দৌর্বল্যেরও সুযোগ নেন।  ’৭৫ পরবর্তী রাজনীতিতে তিনি হযরত মাবিয়া ও স¤্রাট আওরঙ্গ জেবের মত দক্ষতার সঙ্গে ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট কাজে লাগান। কিছুদিন আগে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদড় ড. মুনতাসীর মামুন একটি কলামে বলেছেন, দেশে এখন ৫০% পাকিস্তান সমর্থিত লোকজন আছে। 
এই কৃতিত্ব জিয়াউর রহমানের। পাকিস্তান সমর্থিত লোকজন, আমেলা-আর্মি ও এলিটদের নিয়ে তিনি দল গঠন করেছেন। তিনি যেভাবে ১৯৭১ সালের ম্যান্ডেট পরিবর্তন করেছেন তা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা না করে সম্ভব ছিলো না। তার রাজত্বে ফারুক রশীদরা “ফ্রিডুম পার্টি” নাম দিয়ে দলগঠন করে “কুড়াল” মার্কা নিয়ে বন্দুক উঁচিয়ে রাজনীতি করেছে। এই আস্কারা জিয়াউর রহমান দিয়েছেন। এখনো তার স্ত্রী এবং তার দল যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থন করে যাচ্ছেন। 
অনেকে বলেন, দুই নেত্রীর সমঝোতার দরকার। বেগম জিয়া যদি ১৫ আগষ্টের মত জাতীয় শোক দিবসে কাল্পনিক জন্মদিন পালন করেন তাহলে সমঝোতা হবে কেমন করে? এই আদর্শিক সংঘাত সহজে মিটবে বলে মনে হয় না।
১৯৭৮ সালে এক কলামে আব্দুল গফ্ফার চৌধুরী বলেছিলেন, “জিয়াউর রহমানই বঙ্গবন্ধু হত্যার পালের গোদা।”
গবেষকদের উচিত শুধু চোখের পানি না ফেলে এই পথে আরো গবেষণা করা।

মাহমুদুল বাসার প্রবোন্ধিক
গবেষক।