Monday, February 29, 2016

‘অপাপ নারী আমি এসেছি পাপের কূলে’ -সুমি খান


 রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীদের জন্যে সংকলনে প্রকাশের জন্যে এই লেখাটি কিছুটা সময়োপযোগী করার চেষ্টা করেছি। একজন সংবাদকর্মীর পেশাদারীত্বের প্রতিবন্ধকতার কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরলাম মাত্র।
চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন আশৈশব আমার আদর্শ। মনে পড়ে, সেই কিশোরীবেলা থেকেই দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত মোনাজাতউদ্দিনের রিপোর্ট নিয়ে বাবা-মায়ের উচ্ছ্বসিত মন্তব্য শুনতাম। আর মনে মনে ভাবতাম, একদিন আমিও এরকম করে রিপোর্ট করবো, দেশের প্রত্যন্ত জনপদের মানুষের সুখ-দু:খের কথা তুলে ধরবো পত্রিকার পাতায়। তখনো বুঝিনি, আমি এই সমাজের কাছে প্রথমত: মেয়েমানুষ - মোনাজাতউদ্দিনের মতো চারণ সাংবাদিক হবার বাস্তবতা আমার নেই।
১৯৮৫ সাল থেকে শুরু করলাম লেখালেখি। ।চট্টগ্রামের স্থানীয় দৈনিক আজাদী, পূর্বকোণে লিখলাম নারী অধিকার, মানবাধিকার, কালো মানুষের অধিকার নিয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মানুষের বিপ্লবের গণজাগরণের কবি বেঞ্জামিন মলয়ঁসে কে ১৯৮৫ সালে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। সেসময়ে স্কুলে পড়ি। মন থেকে মেনে নিতে পারলাম না বিপ্লবের কবি মলয়ঁসের ফাঁসির আদেশ।লিখলাম , বেঞ্জামিন মলয়ঁসে: মৃত্যুহীন প্রাণ
এর  কয়েকদিন আগে রাজধানীতে সোগেরা মোর্শেদ নামে একজনকে  ছিনতাইকারীরা  হত্যা করেছিলো। সেই ঘটনার প্রতিবাদে একটি লিখা দিয়েছিলাম। বলা প্রয়োজন,এই লেখাটি আমাকে লিখে দিয়েছিলেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আলেক্স আলীম। চিন্তাশীল অনুভূতিকে কাজে লাগানোর মোক্ষম উপায় সাংবাদিকতা। আমার কৈশোরের সেই স্বপ্নের কথা জানতেন তিনি। তাই সহযোগিতা করলেন লিখা শুরু করবার জন্যে। দৈনিক পূর্বকোণের  জুবলী রোড সিগনেট প্রেস অফিসে গিয়ে  নারী সহসম্পাদক ‌এর হাতে দিয়ে এলাম লেখাটি। তিনি লিখাটি চিঠিপত্র কলামে ছেপে দিলেন।
 আমার মতো এক কিশোরীর আবেগঘন প্রতিবাদী লেখাটি কলাম হিসেবে ছাপার যোগ্য মনে করেন নি হয়তো। মনে কিছুটা কষ্ট পেলাম।পূর্বকোণে আর লেখা দিলাম না; আজাদীতে লিখতে থাকলাম। বেঞ্জামিন মলয়ঁসে , ফরাসী বিপ্লবে নারীর অবদান,শ্রমজীবি নারীর শ্রমের অধিকার নিয়ে লিখতে থাকি। একসময়ে দৈনিক পূর্বকোণে লিখতে শুরু করি সাংবাদিক আবুল মোমেনের হাতে লিখা দিয়ে আসতাম।
১৯৯৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের তৎকালীন ডীন অধ্যাপক আবদুল মান্নান (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান )আমার ভাশুর। তাঁর প্রোমোশান উপলক্ষে বাড়িতে নেমন্তন্ন রক্ষা করতে এলেন অনেকে। তাদের মধ্যে দৈনিক ভোরের কাগজের তৎকালীন চট্টগ্রাম ব্যুরোচীফ আবুল মোমেন অন্যতম। তাকে  কাছে পেয়ে বললাম, মোমেন ভাই, জে এম সেন এর মতো দেশনেতার নামে চট্টগ্রামের একমাত্র এভেনিউ জানতে পারলাম বাবার কাছে। আমি বাবাকে সাথে নিয়ে দেখেছি,দুয়েকটি হিন্দু মালিকানাধীন দোকান ছাড়া অধিকাংশ দোকানের সাইনবোর্ডেই তার এই নামটি লিখা নেই। এভাবে জে এম সেনের কর্ম, নাম হারিয়ে যাচ্ছে। আমি কি একটা রিপোর্ট করতে পারি ,যদি অনুমতি দেন? আবুল মোমেন তার স্বভাবসুলভ স্মিত হেসে চোট্ট করে জবাব দিলেন, করো।তার কাছে কৃতজ্ঞ ,তিনি আমার রিপোর্টিং এর সুযোগ করে দিয়েছিলেন সেদিন।
আমার অসাধারণ উদ্যমী আর সাহসী বাবা সাইফুদ্দিন খান আমাকে নিয়ে প্রতিটা দোকান মালিক এবং কর্মচারীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। শেখালেন মানুষের সাথে মিশে কী করে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। কোতোয়ালী, লালদীঘি , আন্দরকিল্লা এসব জায়গা বাবার শৈশব, কৈশোর, ভাষা আন্দোলন , শ্রমিক আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি মিছিলের পায়ে পায়ে চেনা। চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থেকে আন্দরকিল্লা পর্যন্ত প্রতিটি দোকানে কথা বললাম। এই এলাকার একমাত্র পেট্রোলপাম্প এর মুসলমান মালিক ( নামটি মনে করতে পারছিনা, তিনি বেঁচে নেই) বললেন এদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অংশ হিসেবে কী করে ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবের অন্যতম সেনানী ব্যারিষ্টার যাত্রা মোহন সেন -জে এম সেনের নাম মুছে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র থেকে সাইনবোর্ডে তার নাম লিখা হয় না। অথচ চট্টগ্রামে তখন পর্যন্ত সেটাই একমাত্র এভেনিউ ছিল। যাই হোক্ জে এম সেনের ইতিহাস এবং জে এম সেন এভেনিউর ইতিহাস তুলে ধরলাম। একটি জাতীয় দৈনিক ভোরের কাগজের চলমান চট্টগ্রামে ১৯৯৩ সালের সম্ভবত: জুন মাসে প্রকাশিত হলো লেখাটি। এর পর নারী বানিজ্যব্যক্তিত্ব, শহীদ পরিবার সহ নানান বিষয় নিয়ে অব্যাহত থাকলো লিখালিখি। বিশ্বজিৎ চৌধুরী বিল করতেন একটা লেখাতে ১০০ টাকা । এসব নিয়ে কোন কথা বলা আমার স্বভাব বিরুদ্ধ। তাই রিপোর্টিং অব্যাহত রাখলাম। বসে থাকতাম রিপোর্টিং য়ের প্ল্যান আর আইডিয়া পাওয়ার জন্যে। না, সে আশার গুঁড়ে বালি। নিজেই ভাবতে থাকি কী করা যায়!
বাবার কাছে শুনেছি ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬২ সাল বাবার প্রথম কারাজীবন কেটেছে দেশের বিভিন্ন কারাগারে। এর পর আরো অনেকবার বাবা গ্রেফতার হয়েছেন। এখনো পংকজ ভট্টাচার্যের লেখায় তার কিছুটা পাওয়া যায়। কারাগার থেকেই বাবা বি.কম পাশ করেছেন।দেশের শীর্ষ অনেক রাজনীতিকের মতো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সাথে ও তার কারাগারে দেখা হয়েছে বলে শুনেছি। রাজবন্দী হিসেবে তারা বেশ সম্মানিত এবং প্রভাবশালী ছিলেন বলেই মনে হতো বাবার প্রাণোচ্ছ্বল গল্পে। তাই কারাগার নিয়ে আমার আলাদা আগ্রহ ছিল।
একদিন বললাম , কারাগার নিয়ে আমি একটা রিপোর্ট করতে চাই। বিশ্বজিৎ চৌধুরী সাথে সাথে বলে উঠলেন, কারাগারে আপনাকে ঢুকতে দেবে কেন? রিপোর্ট করতে চাইলেই তো আর করতে দেবে না
সামান্য একজন কন্ট্রিবিউটর হয়ে ও কোথা থেকে মনের জোর পেলাম জানি না। জবাবে কিছুটা দৃঢ়তার সাথে বললাম, আমি করে আনতে পারবো
গেলাম চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে। জেল সুপারের রুমের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম বন্দীরা কুয়া থেকে পানি নিয়ে গোসল করছে , হেঁটে বেড়াচ্ছে। বাবার কাছে নাশতার টেবিলে বা খাওয়ার টেবিলে শোনা গল্পগুলো মনে পড়লো।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার এবং জেল সুপার অনেক তথ্য দিলেন। সেসব নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করলাম। বিশ্বজিৎ চৌধুরী চলমান চট্টগ্রামের কাভার ষ্টোরী করলেন। বক্স করে চট্টগ্রাম কারাগারের ইতিহাস আলাদা করে দিলেন। সেটাতে আমার স্বামী আবদুল আলীমের নাম দিলেন। সেদিন প্রথম জানতে পারলাম এবং কিছুটা ধাক্কা খেলাম আমার কাজ অন্যের নামে প্রকাশ হতে পারে।এভাবে কেটে গেলো দিন।
১৯৯৩ সাল থেকেই প্রগতিশীল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাগুলোতে চাকরির চেষ্টা করেছি । ভোরের কাগজের কাজ গুলোর ব্যাপক প্রশংসা কাজের স্পৃহা বাড়িয়ে দিতো শতগুণ। কিন্তু চাকরি দেবার আগ্রহ দেখায়না নীতিনির্ধারকেরা।
নারী নেত্রী মালেকা বেগম কে সেই শৈশব থেকে দেখেছি মায়ের সাথে পথে প্রান্তরে নারী আন্দোলনের কাজে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের অন্য সব কেন্দ্রীয় নেত্রীদের মতো মালেকা বেগম ও সাধারণ সম্পাদিকা হিসেবে চট্টগ্রামে গেলে আমাদের বাসাতেই থাকতেন। আমার মা নূরজাহান খান ব্যাংকার ছিলেন। কোনরকমে অফিস পিরিয়ড শেষ হতে না হতেই মালেকা খালাম্মাকে সাথে নিয়ে মা বেরিয়ে পড়তেন । হেঁটে হেঁটে সারা শহরের নারীদের সংগঠিত করতেন। মালেকা খালাম্মার পায়ের চটির দিকে দেখতাম ধুলো- ময়লা মাখামাখি।রাজনৈতিক গল্প, একাত্তরের গল্প, সাংগঠনিক , পারিবারিক গল্প , আড্ডা হৈচৈ করে মা এবং মালেকা খালাম্মা ঘুমাতে যেতেন অনেক দেরিতে। মনে পড়ছে ,এসব করে ও মা আমাদের দেখা শোনা, মেহমান দের জন্যে উপাদেয় রান্না, কোনটাই বাদ দিতেন না। বাবা বেশ উৎসাহের সাথে অনেক বাজার করে আনতেন মেহমানদের জন্যে। ১৯৮৫ সালে প্রথম বান্দরবান যাই ।মালেকা খালাম্মা নিয়ে যান আমাদের। মালেকা খালাম্মার ছেলে সাশা, আমরা তিন ভাই বোন আর মা। খুব আনন্দ করেছিলাম।
১৯৯৩ সালের পর যখন ভোরের কাগজ বা প্রথম আলোর কোন প্রোগ্রামে আসতেন মালেকা খালাম্মা বা মতি চাচা ( প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান ), তখন তারা হোটেলে থাকতেন। ১৯৯৫ সালের পর আমার মা মালেকা খালাম্মাকে বলেছিলেন , আমাকে ভোরের কাগজের সাথে যুক্ত করতে। আমি দেখেছি, তিনি কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলতেন, এটা তো মোমেন ই পারে নূরজাহান আপা
এর পর একদিন মা আবুল মোমেন কে বললেন, মোমেন ভাই, সুমি তো আপনাদের সাথেই কাজ করছে অনেক দিন। আপনারা নতুন ভাবে পত্রিকা শুরু করছেন । ওকে কি আপনাদের কাজের সাথে নিতে পারেন? ওতো কাজ করে ।" আবুল মোমেন হেসে বললেন, কাজ একটু বেশী ই করে, কিন্তু এই মুহুর্তে তো সম্ভব না, দেখা যাক্ কী করা যায়। মাকে এভাবে বারবার বিব্রত হতে দেখে আমার খুব কষ্ট হলো। প্রথম আলো বাজারে এলো। একদিন আমি ই আগ্রহ প্রকাশ করলাম। আবুল মোমেন বললেন, চট্টগ্রামে মেয়েদের সাংবাদিকতা করার পরিবেশ নেই। তুমি ফ্রিল্যান্স করছো, করে যাও। বুঝলাম আমাকে সাংবাদিকতা করার পরিবেশ তৈরি করে নিতে হবে।
একটি কথা প্রসঙ্গক্রমে আনা প্রয়োজন। আমার বড়ো চাচা ডা. কামাল এ খান চট্টগ্রামের আন্দোলন, সংগ্রাম , ক্রীড়া জগৎ, সংস্কৃতিক জগতের নিবেদিতপ্রাণ প্রচারবিমুখ অসাধারণ এক ত্যাগী সংগঠক ছিলেন। দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের চট্টগ্রাম সফর মানেই আয়োজক এবং পৃষ্ঠপোষক ছিলেন আমাদের বাপ্পু ডা. কামাল এ খান। তার মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রগবেষক ওয়াহিদুল হক শিল্পকলা একাডেমীতে বলেছিলেন , ডা. কামাল এ খানের নামে মেলা হওয়া উচিত এমন নিষ্প্রাণ শোকসভা নয়
আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় বাপ্পুর প্রসঙ্গ আনবার কারণ হলো, ভোরের কাগজ এবং প্রথম আলো দুটি পত্রিকার নীতিনির্ধারক এবং সংবাদকর্মীরা শুরুর সময়ে চট্টগ্রামে প্রথম কিছুদিন অফিস হিসেবে বাপ্পুর চেম্বারেই বসেছেন। কথাটা এজন্যেই বলছি ,বাপ্পু মারা যাবার পর প্রথম আলোতে তার মৃত্যু সংবাদ প্রকাশ করার জন্যে আমাকে বেশ অনেক বার ফোন করতে হয়েছে ঢাকায়। বাপ্পুর পারিবারিক বন্ধু এবং তার অনেক অনুগ্রহের পাত্র হলে ও এই মানুষটির ত্যাগ এবং তিতিক্ষার কথা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার দায়িত্বশীলতা থেকে চট্টগ্রামের সংস্কৃতি সংগঠক এবং সাংবাদিকেরা অনেক দূরে । ডি. কামাল এ খানের মৃত্যুসংবাদ প্রকাশেও ভীষণ হীনমন্যতার প্রকাশ দেখলাম তাদের। সাংবাদিকদের পেশাদারীত্ব আর দায়বদ্ধতার এমন অভাব কাছে থেকে দেখতে হয়েছে আমাকে বার বার।
গোষ্ঠী চিন্তা আর ব্যক্তিকেন্দ্রীকতার উর্ধে উঠে একজন নিবেদিতপ্রাণ মানবাধিকার সংগঠকের স্মৃতির প্রতি সামান্যতম দায়িত্বশীলতার পরিচয় ও দিতে পারলেন না কেউ।আমাদের দুর্ভাগ্য।
যাই হোক্ এক সময়ে ঢাকায় এলাম । দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদকের কাছে গেলাম। বললাম আমি মোনাজাত উদ্দিনের মতো কাজ তুলে আনতে চাই প্রত্যন্ত জনপদ থেকে । সম্পাদক আহমেদুল কবীর চাচা তখন গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি । বাবা তার ভীষণ স্নেহভাজন অনুজ। তিনি নিয়মিত বাবাকে ফোন করতেন ল্যান্ড ফোনে। আমি রিসিভ করলে তার ভরাট কন্ঠ শুনে শ্রদ্ধায় নত হয়ে যেতাম।তাকে আমার চাকরির কথা বলতে পারলাম না কেন যেন। বাবা কেও বলি নি।১৯৯৯ সালে যুগান্তরের চট্টগ্রাম ব্যুরোপ্রধান জসীম চৌধুরী সবুজআমাকে বললেন, আপনি তো ভালো লিখেন, আমাদের পত্রিকায় আসেন
এ্যাপয়েন্টমেন্ট হলো ফিচার এ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। আরো একজনের একই সাথে এ্যাপয়েন্ট হলো, তাদের কারো আগে কোন রিপোর্টিং য়ের অভিজ্ঞতা নেই। তারা পুরুষ বলেই তাদের রিপোর্টার হিসেবেই চাকরি হলো। নভেম্বর ১৯৯৯ থেকে নভেম্বর ২০০০ ।
এর মধ্যে শিক্ষা বোর্ড এবং নারী নির্যাতন ইস্যুতে অনেক আলোচিত রিপোর্ট করেছি। অনেক রিপোর্ট বাস্কেটে ফেলে দেয়া হতো। এরকম একটি ঘটনা এসিড ছুঁড়ে মারা হয়েছিলো স্ত্রীকে। অপরাধী স্বামীর ছবি জোগাড় করেছি অনেক কষ্টে। দেখলাম সেই ছবি টি ব্যুরোচীফ তার টেবিলের পাশে বাস্কেটে ফেলে দিলেন। অপরাধ কী? এখনো জানি না।একবছরের মাথায় আমাকে যুগান্তর ছাড়তে বাধ্য করা হলো। এর কারণ টি এর আগে আরেকটি লেখায় আমি দিয়েছিলাম। তবু এখানে বলতে হচ্ছে-এক কিশোরী গৃহপরিচারিকা কে ধর্ষণ করে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার একটি বাড়ির ছাদ থেকে ফেলে দেয়া হয়েছিলো। সেই রিপোর্ট করে আমি সাংবাদিক সমাজের চোখে অপরাধ করেছিলাম। ধর্ষণকারীর ছোটভাই এবং ভাগ্নী জামাই তখন প্রভাবশালী সাংবাদিক। প্রেসক্লাবে আমার বিচার বসলো আবুল মোমেন এবং অন্যান্য সাংবাদিক দের নেতৃত্বে । যাই হোক্, সে সময়ে সাপ্তাহিক ২০০০ এর চট্টগ্রাম প্রতিনিধির দায়িত্ব পেলাম। প্রথম সারির পত্রিকার সাংবাদিকেরা ও অপেক্ষায় থাকতো আমি সপ্তাহশেষে কী রিপোর্ট দিচ্ছি। দিন রাত খাটনি আর পরিশ্রম করে সপ্তাহের কাভার স্টোরী করতাম। চট্টগ্রাম থেকে একমাসে ৩/৪টা কাভার স্টোরী আমার থাকতো। আমি কাজ করার আগে চট্টগ্রামে পত্রিকার সার্কুলেশন ৭৫/একশ কপি ছিল। আমার রিপোর্ট প্রকাশ হতে শুরু করলো আর ৫/৭ হাজার কপি পর্যন্ত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, জাপান সহ অনেক দেশে সাপ্তাহিক ২০০০ এর সার্কুলেশন । পাঠকদের অনেক চিঠি পাই। অস্ত্র , চোরাচালান , জঙ্গীবাদ, জামাত শিবিরের সন্ত্রাস নিয়ে একের পর এক অনুসন্ধানী প্রতাবেদন করতে থাকি। তরুণ প্রধান প্রতিবেদক গোলাম মোর্তোজা এবং আরো অপেক্ষাকৃত তরুণ নির্বাহী সম্পাদক মোহসিউল আদনান প্রচন্ড সম্মান করেন এবং সহযোগিতা করেন। সাপ্তাহিক ২০০০ চট্টগ্রাম অফিস করা হয় আমাদের বাসার ই একটি ছোট্টরুমে।
২০০২ এর ২৮ নভেম্বর বিকেল ৪টায় আমার অফিস থেকে কোতোয়ালী থানার ও সি রুহুল আমিন সিদ্দিকী এবং এসআই ইয়াসমিন বেগমের নেতৃত্বে একটি দল এসে আমাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। আমার ছোট ছেলেটার গায়ে সেদিন প্রচন্ড জ্বর। কনভেন্টে প্লে গ্রুপে পড়তো।  গেট পেরিয়ে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে একা একা পুলিশের গাড়ির পেছনে রাস্তায় চলে যায়, দুচোখে জলের ধারা। তার মাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছেতার কারণ কিছুই বুঝতে পারে নি আমার ছেলেটা।
 আমার বাবা বাষা সৈনিকনির্যাতিত মুক্তিযোদ্ধা। সেদিন দুপুরে একটু বিশ্রামে ছিলেন । হঠাৎ মায়ের চেঁচামেচি শুনে  অসুস্থ শরীরে লুঙ্গী-শার্ট পরা অবস্থায় পুলিশের জীপের পেছন পেছন সিএমপি হেডকোয়ার্টারের পাহাড়ে  ছুটে যান। এসি ডিবির রুমে ঢুকে আমাকে দেখে তৎকালীন এসি ডিবি শফিকুর রহমান কে বিনয়ের সাথে অসহায় হাসি মুখে নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন , আমি তো পাকিস্তান সরকারের সময়ে অনেক জেল খেটেছি, নির্যাতন সয়েছি। এখন স্বাধীন দেশ। আমার মেয়েটাকে কেন ধরে আনলেন?  জবাবে তিনি বললেন ,তিনি কিছুই জানেন না। মোর্তোজা ভাইকে মোবাইলে জানালাম। আমার হাতে তখনো মোবাইল ছিল, এর পরেই পুলিশ আমার মোবাইল সীজ করে নেয়। মোর্তোজা ভাই ঢাকা থেকে ফোন করে আমার গ্রেরফতারের বিষয়ে তথ্য জানতে চাইলে তৎকালীন এসি ডিবি আমার সামনেই তার রুমে  আমার অবস্থানের কথা  অস্বীকার করলেন। সাড়ে ১১ ঘন্টায় দফায় দফায় ইন্টারোগেশান হয়। সিদ্ধান্ত ছিল রাতেই আমাকে ঢাকায় জয়েন্ট ইন্টারোগেশান সেলে পাঠিয়ে দেয়া হবে। বাবা ইফতার নিয়ে গিয়েছিলেন, রাতের ভাত এবং পরনের কাপড় নিয়ে গিয়েছিলেন । হঠাৎ করে  রাত সাড়ে তিনটায় আমাকে ছেড়ে দেয়া হলো। কিসে যে  আমাকে সাইন করালো, জানিনা। তখন চোখে যেন অন্ধকার দেখছিলাম।
তার দুদিন আগে সাংবাদিক সালিম সামাদ, প্রিসিলা রাজ, চ্যানেল ফোরের জাইবা মালিক এবং লিও পোল্ডো গ্রেফতার হন ঢাকা এবং বেনাপোল সীমান্ত থেকে। তাদের সাথে আমার কোন চেনা পরিচয় না থাকলেও তাদের সাথে আমাকে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলায় জড়ানো হয়। সালিম ভাই পরে  আমাকে বলেছিলেন, ওনাদের কাছে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিলো –“ সুমি খান আপনাদের কাজের সহযোগী ছিল বলে  যদি স্বীকার করেন,আপনাদের মুক্তি দেয়া হবে। তখন সালিম ভাইয়ের সাথে আমার কোন পরিচয় ছিল না। তিনি  স্বাবাবিক বাবেই প্রশাসনের সেই অন্যায় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিস চৌধুরী বিবিসি এবং অন্যান্য মিডিয়াতে বলেছিলেন, সুমি খানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ আমাদের কাছে আছে । এবার ছেড়ে দিলেও তাকে আবার ধরা হবে।   
এখন মনে মনে ভাবি, আমাকে বিনা কারণে নিগৃহীত করে হারিস চৌধুরী বা তার নেতারা কী পেয়েছিলেন? তারা আজ কোথায়? আমি তো আমার মতোই স্বাধীন সাংবাদিকতা পেশাতে আছি। এখনকার সাংবাদিকেরা ভাবতেও পারবেন না ২০০১ থেকে ২০০৫  জামাত বিএনপি শাসনামলে  নিরীহ সাধারণ মানুষ,সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবিদের নিগ্রহের সে কী ভয়াবহ সময় আমরা পার করেছি!!
 যাই হোক্ মুক্ত হবার পর জানতে পারি আমাকে ছেড়ে দেবার পেছনে সাপ্তাহিক ২০০০ সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী, অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, মাহফুজ আনাম, মতিয়া চৌধুরী এবং মালেকা বেগম এবং এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী সহ অনেকে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন । মালেকা বেগম খালাম্মা  আমার মাকে বলেছেন, নূরজাহান আপা, আপনি এখন সুমির মা শুধু নন, আপনি মহিলা পরিষদ নেত্রী। একটা মেয়েকে কিছুতেই রাতে থানায় রাখতে দেবেন না
আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আমাকে বললেন, আমি আইজি কে বলেছি, সুমি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সমন্বয়কারী। ওকে ১৯৯৫ সাল থেকে আমি চিনি। যদি ওর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ তোমরা প্রমাণ করতে না পারো, তোমাদের ছেড়ে দেয়া হবে না, মনে রেখো
২০০৪ সালের ২৭ এপ্রিল আমি একটি রিপোর্ট নিয়ে রাতের বেলা রিক্সায় করে এস এ পরিবহনে যাবার পথে অন্ধাকার রাস্তায় সন্ত্রাসীরা আক্রমন করে। আমি অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে ছিলাম। এলাকার ছেলেরা আমায় সেন্টার পয়েন্ট ক্লিনিকে নিয়ে যায় । সাংবাদিকেরা জানতে পেরে আমার বাসায় খবর দেয়।এর আগে থেকে ই আমাকে বেশ কয়েকটা চিঠিতে মৃত্যুপরোয়ানা জারি করে হুমকি দেয়া হয়। আমি মুখে এবং হাতে বেশ আহত হই। আমার বড়ো ছেলে অতুলন ভয়ে আমার দিকে তাকাতো না।আমার ছোট ছেলে গহন তার ছোট ছোট মাটির পুতুল গুলো এনে আমার মাথার কাছে বসে বসে আমাকে খেলতে বলতো, যেন এতে আমার মন ভালো হয়ে যায়। এর মধ্যে ৩ মে ২০০৪ প্রেস ফ্রিডম ডে। হঠাৎ দেখি সালিম সামাদ আমাকে দেখতে চট্টগ্রাম চলে গেছেন। সেদিন ঢাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি অতিথি। সব অনুষ্ঠান ফেলে তিনি বললেন, চট্টগ্রামে আমার বোন  সন্ত্রাসী দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, । প্রেস ফ্রিডম ডেতে তাকে আমার দেখে আসতে হবে। সেদিন ই প্রথম তাঁর সাথে পরিচয় এবং আপন বড়ো ভাই হিসেবেই যেন তাঁকে বিপদের সময়ে পাশে পেলাম। সেই থেকে আজো আমার এই ভাইটির প্রতি আমার এবং আমার পরিবারের প্রত্যেকের বিনম্র শ্রদ্ধা।
 হামলায় কয়েকটা দাঁত ভেঙ্গে  গিয়েছিলো ।  হাতের আঙ্গুল সোজা করতে পারতাম না। ভেবেছিলাম আর কখনো লিখতে পারবো না। দাঁতের চিকিৎসা চট্টগ্রামে করলাম।  কিন্তু হাতের কী হবে? এমন অচল হয়ে আজীবন বসে থাকতে তো পারবো না। যা দেখছি, যা দেখছি না-লিখতে তো হবে। কারো কাছে টাকা চাইতে ইচ্ছে হলো না। সোনালী ব্যাংকে ৩শ টাকার একটা ডিপিএস ছিল আমার । কাউকে কিছু না বলে সেই ডিপিএসএর থেকে ঋণ কতো পাবো খোঁজ নিলাম। ২৭ হাজার টাকা ঋণ পেলাম।  হাতের আর নার্ভের চিকিৎসা  নিতে মাদ্রাজ চলে গেলাম।মাদ্রাজে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাঠানোর কোন উপায় ছিল না। তাই গাড়ি বাড়া রেখে খরচ করতে হলো।  সেখানে এক বেলায় ১০ টাকা করে পেঁপে খেতাম। ১০০ টাকা রুম ভাড়া দিতাম।  মাদ্রাজে আমার হাতের  চিকিৎসা নেবার পর ধীরে ধীরে আমার আঙ্গুলগুলো স্বাভাবিকভাবে নাড়তে পারলাম।  আবার লিখালিখি শুরু করলাম ।আমার যেন পুনর্জন্ম হলো!
২০০৪ সালে চট্টগ্রামের জামাতের শীর্ষসন্ত্রাসী আহমইদ্যা প্রকাশ আহমদু বিএনপি নেতা  গয়েশ্ব্বর রায়ের হাতে ফুল দিয়ে বিএনপিতে যোগ দিলেন।  স্পর্ধার সাথে বললেন, জামাতের এক গুণ, ধর্মের নামে মানুষ খুন...! আহমেদুল হক চৌধুরী প্রকাশ আহমদ্যা জামাত সাংসদ শাহজাহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ৯০ দিন সময় বেঁধে  ঘোষণা দিলেন –“হয় শাহজাহান চৌধুরী থাকবে, নয়তো আহমদু থাকবে।
 এসময় আমি চট্টগ্রামের ত্রাস আহমেদুর ইন্টারভিউ নেবার চেষ্টা করি।
তার সাথে যোগাযোগ হয়। আমাকে সময় দিয়েছিলেন সন্ধ্যা ৭টায়, তার লোকজন রেকি করে আহমদুর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবার পর আহমদু আসেন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে।  সেই দিন এবং সেদিনের কথাগুলো আমি কখনো ভুলবো না। চট্টগ্রামের জনপ্রিয় সেই কাবাব হাউজের বাইরে দেখলাম ঢাকার সাংবাদিক নজরুল কবির তার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের নিয়ে কাবাব খেতে গেছেন। তার সাথে কুশল বিনিময় করে ভেতরে একটি টেবিলে বসলাম ভয়ংকর এ শীর্ষ সন্ত্রাসীর ইন্টারভিউ নিতে।  একেবারে স্যুটেড বুটেড ধবধবে যুবক আহমদুকে দেখে বোঝার উপায় নেই তার নামে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায় !আমি সময়ের মূল্য বুছে দ্রুত প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু করলাম। কোথ্থেকে তার  সন্ত্রাসী হিসেবে উথ্থান এবং কিভাবে তার অস্ত্রের সাথে সহবাস....?   আমার সাথে  খোলামেলা আলাপে আহমদু বললেন, তিনি  ক্লাস সেভেনে পড়ার সময়ে ফুলকুঁড়ি আসরের মাধ্যমে  ছাত্র শিবিরের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করে তার হাতে একে-৪৭ এর মতো ভয়ংকর অস্ত্র  তুলে  দিয়েছিলো জামায়াত নেতা শাহজাহান চৌধুরী।
 লম্বা , ফর্সা আকর্ষনীয় যুবক আহমেদু অকপটে বলে যান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির নেতা কর্মীদের খুন করে তাদের রক্তে হোলিখেলায় শিবির ক্যাডারদের মাতাল করেছেন জামায়াত নেতা এবং সাংসদ শাজহাজান চৌধুরী। বোরকা পরে অত্যাধুনিক অস্ত্র হাতে খুন করেছেন, এমন কয়েকটি খুনের বর্ণনাও দিলেন আহমদু । গয়েশ্বর রায়ের হাতে ফুলের মালা দিয়ে বিএনপিতে যোগদানের কয়েকটি ছবি ও তিনি আমাকে দিলেন। সাপ্তাহিক ২০০০ টপ কভার ষ্টোরি করলো । মার মার কাট কাট সার্কুলেশন। সেই সংখ্যাটি দেশে বিদেশে ব্যাপক চাহিদা ছিল। অনেকে ৪/৫ হাজার কপি কিনে নেন।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরের শুক্রবার জুমার নামাজের আগ মুহুর্তে র্যা।বের ক্রসফায়ারে বর্বরোচিত ভাবে হত্যা করা হয় আহমেদু কে। র্যা ব-৭ এর তৎকালীন পরিচালক কর্ণেল এমদাদ ( পরবর্তীতে বিডিআর বিদ্রোহে নিহত) কে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, " কেন আহমেদু কে হত্যা করা হলো ? " তিনি জবাব দিলেন," আপনাকে আহমইদ্যা যা ইন্টারভিউ দিয়েছে এর পর কী আর তাকে বাঁচিয়ে রাখা যায়?" প্রশ্ন করেছিলাম, " তাহলে আহমইদ্যাকে সন্ত্রাসের দীক্ষা যে দিয়েছে, তার মতো অসংখ্য কিশোর তরুণের হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে জামাত নেতা শাহজাহাস চৌধুরী - এই তথ্য নিশ্চিত হয়েই কি শাহজাহান চৌধুরীর জীবনের হুমকি কে সরিয়ে দিলেন?" হাসলেন কর্ণেল এমদাদ। সাপ্তাহিক ২০০০ পরের সংখ্যায় কর্ণেল এমদাদ এর সেই ইন্টারভিউ ছাপা হলো। আহমদুকে হত্যার পর  তার লাশের কাছে কাউকে যেতে দিলো না  তৎকালীন জামায়াত সাংসদ শাহজাহান চৌধুরী । কাউকে জানাজা পড়তে দিলেন না। গোষণা দিলেন, আহমদুর জানাজা গয়েশ্বর রায় পড়াবে । তবু এলাকায় রবীনহুড বা দস্যু বনহুরের মতো জনপ্রিয় আহমদু এবং তার শিষ্য মিনহাজের লাশের জানাজা, দাফন সবই করলেন এলাকার সাধারণ জনগণ।
বিএনপি নেতা এবং সংগঠক জামালউদ্দিন অপহরণ হলেন ২০০৩ সালের ২৬ জুলাই। তিনবছর পর তার কঙ্কাল উদ্ধার করা হয় ফটিকছড়ির জঙ্গল থেকে। এই তিন বছর নানান রকমের গল্প। আমার এক অজানা সোর্সের মাধ্যমে আমি সঠিক তথ্য গুলো পেয়ে যেতাম। জামালউদ্দিনের নবোতিপর  মা শুধু আমাকেই ইন্টারভিউ দিলেন। বললেন , আমাদের রাখালের ছেলে সরওয়ার জামাল নিজাম এমপি আমার ছেলেকে খুন করেছে। আমি ধারাবাহিক ভাবে জামালউদ্দিন অপহরণ এবং হত্যা নিয়ে রিপোর্ট করতে থাকি। সেই সংখ্যা গুলোর বেশ কাটতি হয় বারবার চেয়ে পাঠান অনেকে।
আক্রান্ত হবার পর চিকিৎসা করতে গেছি। সে সময়ে , সরওয়ার জামাল নিজাম  (তৎকালীন  সাংসদ) সাপ্তাহিক ২০০০ অফিসে ফোন করে গোলাম মোর্তোজাকে বললেন, আপনাদের চট্টগ্রাম প্রতিনিধি কী করে চট্টগ্রামে চলাফেরা করে আমি দেখে নেবো। এবার গোলাম মোর্তোজা বিশেষ প্রতিবেদন লিখলেন। সেখানে তিনি আশংকা প্রকাশ করে বললেন এভাবে প্রকাশ্যে আমাদের প্রতিবেদককে হুমকি দেবার কারণে আমরা তার নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত।  বার বার মনে হয়, সাপ্তাহিক ২০০০ এর তৎকালীন সম্পাদক শাহাদত চৌধুরীর নির্দেশনায় অনেক পেশাদারীত্ব ছিল, যা এখন আর কারো নেই।
এসবের পরও আমার কাজ থেমে থাকে নি। কিছু টি শংকা ছিল সন্তানদের নিয়ে। আমি চেষ্টা করতাম তাদের স্কুলে যাওয়া এড়িয়ে চলতে । যাতে আমাকে চিনে ফেলে আমার সন্তানদের উপর হুমকি বা আঘাত না আসে।
২০০৫ সালে তিনটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করি।সৎ সাংবাদিকতা এবং প্রেস ফ্রিডম এর জন্যে বিশ্বের একজনকেই ইনডেক্স গার্ডিয়ান হুগো ইয়ং এ্যাওয়ার্ড পুরস্কার দেয়া হয়। । লন্ডনের সিটি হলে ২০০৫ এর ৪ মার্চ আমাকে এই পুরস্কার দেয়া হয়। এর পর ই নিউইয়র্ক থেকে পেলাম ইন্টারন্যাশনাল উইমেন মিডিয়া ফাউন্ডেশন এর আই ডব্লিউ এম এফ ক্যারেজ এ্যাওয়ার্ড
কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিষ্ট ' সিপি জে  কারেজ এ্যাওয়ার্ড পেয়েছি তার আগেই। কিন্তু পুরস্কার পাওয়ার পর প্রধান প্রতিবেদক কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলেন বারবার ।একদিন বললেন, আপনি আমার সাথে কথা না বলে কারো সাথে কথা বলতে পারবেন না। কোন ইন্টারভিউ ও দিতে পারবেন না। কাজ করা কঠিন হয়ে গেলো । সিপি জে এ্যাওয়ার্ড নিতে অস্বীকার করলাম।  বিশ্বের প্রথম সারির সম্মানজনক এই পুরস্কার দাতা কর্তৃপক্ষকে বললাম ,"তোমরা এই পুরস্কার এর ঘোষণা দিও না। আমাকে কাজ করতে দাও। আমি কখনো কোথাও পুরস্কারের জন্যে আবেদন করিনি। পাঠকের স্বীকৃতি ই আমার পুরস্কার। "  তারা আর ঘোষণা দেন নি। তবে পরবর্তীতে আইডব্লিউ এমএফ কারেজ এ্যাওয়ার্ড নিতে গেছি যখন, তখন নিউইয়র্কে সিপিজে থেকে অশীতিপর এক বৃদ্ধা এসে আমার হাতে ৫ হাজার ডলারের একটি চেক দিয়ে যান আকুল হয়ে। বলেছিলেন, এই চেকটি নিয়ে একটু আমাদের উদ্ধারন করো।
 আমার এমন আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের ঘটনা নিয়ে নিয়ে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি টিপু সুলতান সেই থেকে এখনো অনুযোগ করে বলেন, সুমি আপাসিপিজের পক্ষ থেকে এতো বড়ো অনুষ্ঠান করে পুরস্কার দেয়া হয়, এতো বড়ো পুরস্কার, কেন আপনি নিলেন না? কাজটা একদম ঠিক করেন নাই।!  আমি হেসে উড়িয়ে দেই। টিপু ভাই চট্টগ্রামে গিয়ে আমাকে সাথে নিয়ে ২০০২ থেকে ২০০৫ অনেক মাদ্রাসার ভেতরে গিয়ে জঙ্গী রিপোর্ট করেছেন।  বাংলাদেশ থেকে আমি ছাড়া একমাত্র তিনিই সিপিজে কারেজ এ্যাওয়ার্ড পুরস্কার পেয়েছেন।
চট্টগ্রামে কাজের পরিবেশ না পেয়ে ২০০৬ সালে ঢাকায় চলে আসি ।২০০৬ সালের ডিসেম্বর থেকে একুশে টেলিভিশনের সাথে কাজ শুরু করি। ২০০৭ এর মার্চের ১৯ তারিখ সকালে ১৫ মার্চ এর তারিখে আমাকে এ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দিতে বাধ্য হয় এইচ আর প্রধান রুহুল আমিন। এ ধরণের ঘটনা ঢাকায় এসেও বার বার  আঘাত হেনেছে। সেসব পরে অন্য কোন দিন বলা যাবে ।
২০০৫ সালে ডেমোক্রেসী ওয়াচ থেকে আমার কাছে রিপোর্ট চেয়ে পাঠায়। আমি যথারীতি কোন পুরস্কারের জন্যে নিজের রিপোর্ট জমা দিতে অস্বীকার করি। পরে তারা ভীষণভাবে চেপে ধরে মানবাধিকার রিপোর্ট পাঠাতে বলে।সেদিন শেষ সময়। তাড়াহুড়ো করে জামালউদ্দিন অপহরণ মামলায় পুলিশ কাস্টডিতে নিহত ফটিকছড়ির কাশেম চেয়ারম্যানের ক্যাশিয়ার অমর কর এর বিষয়ে সাপ্তাহিক ২০০০য়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি দ্রুততার সাথে পাঠাই। প্রথম আলো , ভোরের কাগজ সহ সব পত্রিকার বাঘা বাঘা রিপোর্টাররা তাঁদের  প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। তাঁদের একজন অমর করের উপর প্রকাশিত প্রতিবেদন পাঠিয়েছিলন বলে আমাকে জানান।
একদিন বিকেলে ডেমোক্রেসী ওয়াচ থেকে আমিনুল এহসান আমাকে ফোন করে জানালেন চট্টগ্রাম বিভাগে 'শ্রেষ্ঠ মানবাধিকার রিপোর্ট এ্যাওয়ার্ড ' টি আমি অর্জন করেছি। ঢাকায় এসে এই রিপোর্ট নিতে গিয়ে পরিচয় হলো বিখ্যাত রিপোর্টার গৌরাঙ্গ নন্দীর সাথে। খুলনার শ্রেষ্ঠ  মানবাধিকার রিপোর্ট এর পুরষ্কার পেয়েছেন তিনি। এর কয়েকদিন পর ডেমোক্রেসী ওয়াচ থেকে এহসান ভাই ফোন করে বললেন, সুমি আপা, আপনি যে কিসের মধ্যে কাজ করছেন, আমরা কিছুটা বুঝতে পারছি। আমি একটু অবাক হলাম তার কথা শুনে। বললেন , চট্টগ্রামের রিপোর্টারদের  অনেকে  আমাদের ফোন করে বেশ রাগ করলেন। তাদের থেকে অনেক বকাঝকা  শুনতে হলো আমাদের ! তারা বলছে, চট্টগ্রামে সুমি খান ছাড়া আর রিপোর্টার নাই আপনাদের চেনা? মেয়েমানুষ বলেই তাকে পুরস্কারটা দিতে হলো? এহসান ভাই আরো বললেন তাকে কিভাবে বিব্রত করা হয়েছে আক্রমনাত্মক প্রশ্ন করে এবং মেয়েমানুষ কে পুরষ্কার দেবার মনগড়া অভিযোগে দায়ী করে। আমি মনে মনে এতো কষ্ট পেলাম, এতো হতাশ হলাম! এরা তো আমারই সহকর্মী! কেন এমন হতাশাজনক আচরণ এদের??
চট্টগ্রামে ২০০৪ সালের ২৪শে জুন থেকে সাড়ে ৩ বছর ধরে নিখোঁজ  বিএনপির  একনিষ্ঠ দাতা এবং নেতা  জামালউদ্দিনের অপহরণ এবং হত্যার চাঞ্চল্যকর ঘটনার মূল হোতা আরেক বিএনপি নেতা এবং সাংসদ সারোয়ার জামালের বিরুদ্ধে প্রথম তথ্যপ্রমাণ সহ  অনুসন্ধানী  স্কুপ প্রতিবেদন  প্রকাশ করেছিলাম সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকার প্রচ্ছদ কাহিনীতে। সাড়ে তিন বছরে নানান কল্প- গল্প ও প্রকাশ করেন অনেক সাংবাদিক। সাড়ে তিন বছর পর জামালউদ্দিনের কঙ্কাল  ফটিকছড়ির  গভীর জঙ্গলের কবর থেকে উত্তোলন করার পর র্যা ব হেফাজতে নেয়া হলে জামালউদ্দিনের স্ত্রী তাঁর পাশে আমাকে রাখেন।  কঙ্কালের সাথে কয়েকটা চুল পাওয়া যায়। চুলগুলো  লালচে ছিল, আমাকে বললেন, ওনার (জামালউদ্দিন) চুলে মেহেদি দেয়া ছিল, এই চুল গুলো লালচে না? সাড়ে তিন বছর এই নারী জানতেও পারেননি তাঁর স্বামীর কী পরিণতি হয়েছে ! আমার বুকের ভেতরও তখন  নাজমা বেগমের বুকের পদ্মার ভাঙনের ঢেউয়ের তোলপাড়। কী অপরাধ ছিল এই পরিবার টিরএই পরিবারের প্রতিটি সদস্য আমার প্রতিবেদনকে তাদের জীবনের চিত্র উঠে এসেছে বলে বিশ্বাস করতেন।এ কারণেই হয়তো নাজমা বেগম তাঁর অপারেশন টেবিলে শুয়েও পুত্রদের বলেছেন, আমার যদি কিছু হয়, তোরা সুমি খানকে দেখিস্...  একজন সাধারণ সংবাদকর্মী হিসেবে এই তো আমার অনেক বড়ো পাওয়া। জামালউদ্দিন অপহরণ এবং হত্যা প্রসঙ্গে শেষ পর্যন্ত আমার প্রতিবেদনগুলোই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। আশ্চর্যজনক ভাবে সেসময়ে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির থেকে সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ তথ্য পেতাম। সেসব প্রকাশ করতাম প্রতি সপ্তাহের সাপ্তাহিক ২০০০এর প্রচ্ছদে।
 চট্টগ্রামে বসবাসকারী  খ্যাতিমান কবি এবং সাংবাদিক ওমর কায়সার দীর্ঘদিন ভোরের কাগজের ব্যুরোপ্রধান ছিলেন। বর্তমানে দৈনিক প্রথম আলোর দায়িত্বশীল পদে আছেন। ১৯৯৩ সালে প্রথম যখন ভোরের কাগজে আমার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, তখন  আবুল মোমেন ব্যুরোচীফ এবং ওমর কায়সার ভোরের কাগজের সহ সম্পাদক । আমার লেখালিখি এবং সাংবাদিকতা ঠেকানোর অনেক ঘটনা পত্রিকার ভেতর থেকে তিনি দেখেছেন। তিনিও তো নীতিনির্ধারকদের একজন। তাই জানতাম না সেসব ঘটনা তিনি মনে রেখে আমার প্রতি আস্থা রেখেছেন। 
২০১০ সালের  শেষে কোন একদিন  ভোরের কাগজ অফিসে পুরনো ফাইল দেখতে গিয়ে ওমর কায়সার ভাইয়ের সাথে দেখা। তিনি তখন ব্যুরো চীফ। জামালউদ্দিন অপহরণ সহ চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর রিপোর্ট প্রসঙ্গে ওমর কায়সার ভাই আমাকে  বললেন, জামালউদ্দিন অপহরণের পর অনেক বড়ো বড়ো সাংবাদিকও  অনেক গল্প লিখেছে।একমাত্র তুমি জামালউদ্দিন অপহরণ এবং হত্যার ঘটনা নিয়ে ৩ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে সত্য উদ্ঘাটন করে গেছো।  আসলে কি জানো সুমিতুমি কখনো মিথ্যা বা ভিত্তিহীন  রিপোর্ট করো নাই ।এ কারণেই তুমি আজকে এতোদূর গেছো । শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক ওমর কায়সার ভাইয়ের কথায় সেদিন সত্যিই আমি অনেক আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছিলাম।

তাতে কী, বারবার একই ভাবে আমাকে হতাশ হতে হয়েছে। কাজ করাই যেন অপরাধ। হঠাৎ কোন এক সকালে বা কোন এক সন্ধ্যায় হাতে চিঠি ধরিয়ে বলা হয়েছে আর যেন সেই অফিসে না আসি। কেন যে এভাবে বারবার  কর্মহীন হতে হয়েছে, সেএসব অনুসন্ধানেই নেমেছি এখন। এটাই আমার প্রধান কাজ এখন। কারণ, বিনা অপরাধে মিথ্যা দায়ে আমাকে  দায়ী করা হয়েছে। বারবার নিজেকে প্রশ্ন করেছি, পেশাদারীত্ব রক্ষা করতে গিয়ে কেন আমাকে এভাবে মিথ্যা দোষে দোষী করা হয়অথচ কখনো কারো সাথে প্রতিযোগিতায় নামিনি। কারো কোন কাজে ডিসটার্ব করি নি কখনো। নিভৃতে  সংবাদকর্মী হিসেবে আমার কাজ আমি করে গেছি। তবু কেন কোন কোন গোষ্ঠী আমার উপর এতো ক্ষুব্ধকয়েকদিন আগে তথ্য মন্ত্রনালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রেস সেক্রেটারীর সাথে হঠাৎ দেখা। প্রচন্ড ব্যক্তিত্বশালী এই ব্যক্তিটি আমার সাপ্তাহিক সূর্যবার্তার ডিক্রারেশান দিয়েছিলেন। তিনি জানতে চাইলেন, আমি কোথায় কাজ করছি। বললাম আমার অবস্থান।জানতে চাইলেন কোন টিভি বা পত্রিকায় কেন কাজ করছি না। বললাম, আমি সত্যিউ জানিনা এর জবাব। তিনি বললেন, সত্যি কথা হলো, কারো কারো যোগ্যতাই অপরাধ হয়ে যায়। আপনার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। ... এ কথাগুলো  সহকর্মী এবং সহপাঠীদের উদ্দেশ্যে স্বগতোক্তির মতো বলে যাওয়া । নিজের ভুল ত্রুটি, ব্যর্থতা অনুসন্ধান করা। মনে মনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের সাথে মিলিয়ে গেয়ে উঠি, ওহে অপাপনারী আমি এসেছি পাপের কূলে, প্রভূ দয়া কোরো হে, দয়া কোরো হে, দয়া করে লও তুলে...!! এর মধ্যে  সূর্যবার্তা ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে বিকশিত করার প্রচেষ্টায় নিজেকে নিয়োজিত করেছি। এ কাজে সকলের আন্তরিক সহযোগিতা গড়ে তুলবে পেশাদার সাংবাদিকতার নবপ্রজন্ম। শুভ কামনা থাকলো সকল সাংবাদিক সহকর্মীর প্রতি। ০১ মার্চ ২০১৬নিউ ইস্কাটন, ঢাকা।

Wednesday, February 3, 2016

মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল ওসামা বিন লাদেন

ওয়েব ডেস্ক: মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল ওসামা বিন লাদেন। ভয় পেয়ে গিয়েছিল ওসামা।  ও বুঝতে পারে, আমরা ওকে মারতে গিয়েছি। এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করলেন ইউএস নেভি সিল রব ও নিল। এই রব ও নিলই সম্প্রতি দাবি করেন, গোপন অপারেশন শেষে তিনিই আল কায়দার শীর্ষ নেতা লাদেনের মাথায় গুলি করেন। প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের ১ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে এক বাড়িতে আমেরিকার কমান্ডো বাহিনী নেভি সিল গুলি করে হত্যা করে আল কায়দা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে। ক দিন আগে রব ও নিল দাবি করেন, সেই অপারেশনে লাদনকে তিনিই গুলি করেন। বছর ৩৮-এর রব ১৬ বছর ধরে নেভি সিল-এর বিশেষ দায়িত্ব পালন করার পর অবসর নিয়েছেন।
রবারের বাবা জানিয়েছিলেন, সেদিন অ্যাবোটাবাদে ওসামার বাড়িতে মোট ২৩ জন নেভি সিল অফিসার হানা দিয়েছিলেন।

Sunday, November 15, 2015

আরও সুসংহত ও সুস্থির অর্থনীতির প্রত্যাশায়-ড. আতিউর রহমান


জানুয়ারী ১, ২০১৫
বছরের শেষ দিনে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৪ সালের অর্থনীতির একটি মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে। সংক্ষিপ্ত বলে তাতে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা সম্ভব হয়নি। তাই এই কলামে আরও সুবিস্তারিতভাবে গেল বছরের অর্থনৈতিক চালচিত্র এবং আগামী বছরের সম্ভাবনার কথা বলতে চাই।

২০১৩ সালের যাত্রা শুরু হয়েছিল হরতাল-অবরোধের মধ্য দিয়ে। সে বছরের প্রায় পুরো সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এ জন্যে ২০১৪এর বড় অংশ জুড়ে মন্থর বিনিয়োগ ছিল আলোচিত বিষয়। এসব কারণে বছরের শুরুতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রশ্নে কিছুটা অনিশ্চয়তা লক্ষ্য করা যায়। অর্থনীতির সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় বাস্তবসম্মত নানা ধরনের বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপ। তবে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক সুস্থিতির প্রভাবে বছর শেষে অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতির সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় বাস্তবসম্মত বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপ

অর্থনীতির সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় বাস্তবসম্মত বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপ

আর্থিক খাতের অধিকাংশ সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেলেও সব মিলিয়ে ২০১৪ সাল ছিল মিশ্র ফলাফলের বছর। সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে গত পাঁচ বছরের ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালেও বাংলাদেশ ব্যাংক বিচক্ষণ মুদ্রানীতি গ্রহণ করে।

পাশাপাশি অব্যাহত থাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং কার্যক্রম। ফলে প্রবৃদ্ধির ভিত্তিভূমি হয় প্রসারিত– যা টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যে অপরিহার্য। জনগোষ্ঠীর সবাইকে জাতীয় উৎপাদনে সম্পৃক্ত করা এবং দরিদ্রের আর্থিক ক্ষমতায়নই হচ্ছে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিংয়ের মূল উদ্দেশ্য। অর্থনীতি এর সুফল ইতোমধ্যে পেতে শুরু করেছে। গেল বছরের শেষ দিকে বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধির ধারা জোরালোভাবে ফিরে এসেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে এসেছে নব উদ্যম। ভোক্তা ও ব্যবসায়িক আস্থায় এসেছে নতুন গতি। তার ঊর্ধ্বমুখী ঢেউ লেগেছে আমদানি ও রপ্তানিতে। বেড়েছে রেমিট্যান্স। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদে সৃষ্টি হয়েছে নতুন রেকর্ড।

আরও লক্ষ্যণীয় ছিল ঋণের সুদের হার ও মূল্যস্ফীতির নিম্নগতি। যদিও এই নিম্নগতি ছিল ধীর, তবু ক্রমাগত মূল্যহ্রাস ভোগ ও বিনিয়োগ উদ্বুদ্ধ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা সরবরাহে যথেষ্ট সতর্ক অবস্থানে ছিল বলেই প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির সন্তোষজনক সংখ্যা বেরিয়ে এসেছে। কর্মসংস্থান হয়েছে ঊর্ধ্বমুখী। জীবনের আয়ুষ্কাল, দারিদ্র্যের হার, মাথাপিছু আয়, প্রকৃত মজুরির মতো অনেক সূচকেই চোখে পড়েছে ইতিবাচক পরিবর্তন।

সামষ্টিক অর্থনীতি

অর্থবছর ২০০৯-এ মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৫.১৪ শতাংশ, সেখানে অর্থবছর ২০১৪-এ ৬.১২ শতাংশসহ গত পাঁচ অর্থবছরে গড়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.১৪ শতাংশ। রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং মূল্যস্ফীতি সহনীয় মাত্রায় থাকলে ২০১৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশ ওপরে থাকবে বলে আশা করা যায়।
জনগোষ্ঠীর সবাইকে জাতীয় উৎপাদনে সম্পৃক্ত করা ও দরিদ্রের আর্থিক ক্ষমতায়নই অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিংয়ের মূল উদ্দেশ্য

জনগোষ্ঠীর সবাইকে জাতীয় উৎপাদনে সম্পৃক্ত করা ও দরিদ্রের আর্থিক ক্ষমতায়নই অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিংয়ের মূল উদ্দেশ্য

মূল্যস্ফীতির হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। জুন ২০১৩ শেষে গড় বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.৭ শতাংশ, সেখানে জুন ২০১৪ শেষে তা কমে দাঁড়ায় ৭.৪ শতাংশ। আর নভেম্বর ২০১৪ শেষে আরও কমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৭.১ শতাংশ।

অর্থবছর ২০০৯-এ মোট আমদানি ব্যয় হয়েছিল প্রায় তেইশ বিলিয়ন ডলার। সেখানে গত অর্থবছরে আমদানি ব্যয় হয়েছে প্রায় সাঁইত্রিশ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরে আমদানি বৃদ্ধির হার দশ ভাগের ওপর থাকবে বলে ধারণা করা যায়। বছরের শেষভাগে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন উপকরণাদি আমদানির ঊর্ধ্বমুখী ধারা সামনের মাসগুলোতে উৎপাদন প্রবৃদ্ধি জোরদার করার শক্ত পাটাতন তৈরি করছে। হালে এলসি খোলা ও এলসি মেটানো দুই-ই বাড়ছে। চলতি হিসাবে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিলেও তা একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্যে স্বাভাবিক।

অর্থবছর ২০০৯-এ মোট রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ষোল বিলিয়ন ডলার। সেখানে গত অর্থবছরে রপ্তানি আয় হয়েছে ত্রিশ বিলিয়ন ডলার। তবে রপ্তানি বৃদ্ধির হার চলতি অর্থবছরে খানিকটা মৃদু হবে বলে অনুমান করা যায়। মন্দা-পরবর্তী ইউরোপ ও আমেরিকার দুর্বল চাহিদা এর মূল কারণ।
২০১৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশ ওপরে থাকবে বলে আশা করা যায়

২০১৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশ ওপরে থাকবে বলে আশা করা যায়

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধিও বেশ লক্ষ্যণীয়। অর্থবছর ২০০৯-এ রেমিট্যান্স এসেছিল দশ বিলিয়ন ডলার। সেখানে গত অর্থবছরে এসেছে চৌদ্দ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ অর্থবছর এ সময়ে রেমিট্যান্স আয় বেড়েছে প্রায় দেড়গুণ। ২০১৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধিও দশ শতাংশের ওপর থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স বাড়ার প্রভাবেই বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বেড়ে চলেছে। দেশের তেতাল্লিশ বছরের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে এই মজুদ বাইশ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে– যা দিয়ে সাত মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।

টাকার মূল্যমান এ বছরও স্থিতিশীল অবস্থানে ছিল। ২০১৪এর ডিসেম্বরের শেষে বিনিময় হার ছিল ডলার প্রতি প্রায় আটাত্তর টাকা।

জনগণের প্রকৃত আয় বাড়ায় গত অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৯০ ডলার। গত ছয় বছরে মাথাপিছু আয় বেড়েছে দ্বিগুণ। একজন শ্রমজীবী এখন একদিনের মজুরি দিয়ে ১০-১১ কেজি চাল কিনতে পারে। ছয় বছর আগেও বড়জোর তিন কেজি কিনতে পারত। তিন কেজি চাল হলেই তাদের দিন চলে যায়। ফলে বর্তমানে বাকি অর্থ দিয়ে তারা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারে। সামগ্রিকভাবে বেড়েছে মানুষের জীবনযাত্রার মান।

ব্যাংকিং খাত

গত পাঁচ বছরে ব্যাংকগুলোর মুনাফার একটি বড় অংশ মূলধনে স্থানান্তর হবার কারণে ব্যাংকিং খাতের মূলধন-ভিত্তি শক্তিশালী হয়েছে। ব্যাংকগুলো সেপ্টেম্বর ২০১৪ প্রান্তিকে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের প্রায় এগার শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। ২০০৮ শেষে ব্যাংকগুলোর সংরক্ষিত মূলধন ছিল একুশ হাজার কোটি টাকা, যা সেপ্টেম্বর ২০১৪ শেষে দাঁড়ায় পঁয়ষট্টি হাজার কোটি টাকা।
টাকার মূল্যমান এ বছরও স্থিতিশীল অবস্থানে ছিল

টাকার মূল্যমান এ বছরও স্থিতিশীল অবস্থানে ছিল

২০০৮ সালে ব্যাংকিং খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ছিল মোট ঋণের ১০.৮ শতাংশ। সেপ্টেম্বর ২০১৪ প্রান্তিকে শ্রেণীকৃত ঋণের হার দাঁড়ায় ১১.৬ শতাংশ, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১২.৭৯ শতাংশ। ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিংয়ের নীতিমালা বিশ্বমানে উন্নীত করা, গুণমানের ঋণ প্রদান ও ঋণ শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার প্রভাবে শ্রেণিকৃত ঋণের হার কিছুটা বেড়েছে। ব্যাংকগুলোকে ঋণ আদায়ে আরও মনোযোগী হতে ক্রমাগত নির্দেশ দেওয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সময়োপযোগী নীতি প্রণয়নের কারণে ২০১৪এর শেষ প্রান্তিকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার কমে আসবে বলে আশা করা যায়।

এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকেও বেশ খানিকটা চাপ নিতে হচ্ছে। এ দিকটায় বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো রকম ছাড় দেবে না। অবশ্যই ব্যাংকগুলোকে সর্বক্ষণ গুণমানের ঋণ দেবার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। নিয়ম-নীতি সংস্কার করে হয়তো ভালো গ্রাহকদের কিছুটা সুবিধা দেওয়া হতে পারে। কিন্তু মন্দ গ্রাহকদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে দ্বিধা করবে না বাংলাদেশ ব্যাংক।

সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থানীয় ও বৈদেশিক অর্থায়ন সুলভ রাখার ব্যবস্থা নিয়েছে। এদিকে ব্যাংক ঋণের সুদহারও ধীরে ধীরে কমে আসছে। অক্টোবর ২০১৪ শেষে ঋণের গড় সুদহার ছিল সাড়ে বার শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ কম। আমানতের সুদহারের চেয়ে ঋণের সুদহার অধিকমাত্রায় কমায় আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান বা স্প্রেড কমে অক্টোবর ২০১৪ শেষে দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ শতাংশীয় পয়েন্ট।

অক্টোবর ২০১৪ শেষে বেসরকারি খাতে প্রকৃত ঋণপ্রবাহ বেড়েছে বার শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল এগার শতাংশ। ২০০৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত বৈদেশিক উৎস থেকে আসা বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬.২ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ২০১৪তে বৈদেশিক ঋণ অনুমোদন করা হয় প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার। এটি আগের বছরের তুলনায় ৫৬ শতাংশ বেশি।

অক্টোবর ২০১৪ শেষে ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্য (ট্রেজারি বিল, বন্ডে বিনিয়োগসহ) ছিল প্রায় এক লক্ষ বিশ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অলস তারল্য ছিল মাত্র তিন হাজার তিনশ কোটি টাকা। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ও শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ বাড়ায় আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে তারল্য চাপ কিছুটা বেড়েছে। ফলে পুরো বছর কলমানি সুদের হার কম থাকলেও বছরের শেষ দিকে কলমানি সুদের হার কিছুটা বেড়েছে।

২৩ ডিসেম্বর, ২০১৪ কলমানি সুদের গড় হার ছিল ৮.৩ শতাংশ। অক্টোবর ২০১৪এর শেষে আমানত ১৩ শতাংশ বেড়ে ৬ লক্ষ ৯৩ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়, যা জিডিপি’র প্রায় ষাট ভাগ। এটি ব্যাংকিং খাতের ওপর মানুষের আস্থার পরিচায়ক।
একজন শ্রমজীবী এখন একদিনের মজুরি দিয়ে ১০-১১ কেজি চাল কিনতে পারে

একজন শ্রমজীবী এখন একদিনের মজুরি দিয়ে ১০-১১ কেজি চাল কিনতে পারে

সরকার এখন ব্যাংক থেকে আগের চেয়ে কম হারে ঋণ নিচ্ছে যা রাজস্ব ক্ষমতায়নের প্রতিফলক। অক্টোবর ২০১৪ শেষে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারি খাতে প্রকৃত ঋণ বেড়েছে মাত্র আড়াই শতাংশ, যা আগের বছর একই সময়ে ছিল সতের শতাংশ। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১২,৮০৯ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চুয়াল্লিশ শতাংশ বেশি।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি

বাংলাদেশ ব্যাংক গত পাঁচ বছরের ধারাবাহিকতায় ২০১৪তেও সামাজিক দায়বোধ প্রণোদিত অর্থায়ন বিশেষ করে কৃষি, এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ) ও পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন বাড়ানোর কৌশল অব্যাহত রাখে। পাশাপাশি গ্রহণ করে নিম্নআয়ের মানুষদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রম। এর ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ছে. যা প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে।

২০১৪এর সেপ্টেম্বর শেষে দেশে মোট ব্যাংক শাখার সংখ্যা দাঁড়ায় ৮,৮৪৯টি, যার সাতান্ন ভাগই পল্লী শাখা। গত পাঁচ বছরে ব্যাংক শাখা বেড়েছে প্রায় সতের শতাংশ। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় কৃষকদের ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুফল ভোগকারী হতদরিদ্র মানুষ, অসহায় মুক্তিযোদ্ধা, গার্মেন্টস শ্রমিক সব মিলে এসব ব্যাংক হিসাব সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১.৪৩ কোটি, যার প্রায় সত্তর ভাগ হিসাবই কৃষকদের।

এ বছর ভাগ্যবিড়ম্বিত কর্মজীবী পথশিশুদের নামেও ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কৃষক ও অসহায় মানুষদের ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব সচল রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০ কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালু করে। ৩১টি ব্যাংক এ তহবিলের সুবিধা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। সেপ্টেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত ‘স্কুল ব্যাংকিং’ এর আওতায় স্কুল ছাত্রছাত্রী ব্যাংক হিসাব সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় আট লাখ এবং এসব হিসাবে জমার পরিমাণ দাঁড়ায় ৬১২ কোটি টাকা।

অর্থবছর ২০০৯-এ কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছিল নয় হাজার তিনশ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ষোল হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ কৃষিঋণ বছরে গড়ে প্রায় ১২ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। আগে বর্গাচাষিরা ব্যাংক ঋণ পেত না। এ উপেক্ষিত বর্গাচাষিদের সহজ শর্তে কৃষিঋণ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সালে ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করে। এ প্রকল্পের আওতায় গত পাঁচ বছরে ৯ লাখ ৩৮ হাজার বর্গাচাষিকে দেড় হাজার কোটি টাকা অর্থায়ন করা হয়েছে।
ভাগ্যবিড়ম্বিত কর্মজীবী পথশিশুদের নামেও ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে

ভাগ্যবিড়ম্বিত কর্মজীবী পথশিশুদের নামেও ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে

নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতে অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব প্রদান অব্যাহত রেখেছে। ২০১০ সাল থেকে শুরু করে ব্যাংকগুলো সেপ্টেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত বাইশ লাখ উদ্যোক্তাকে তিন লাখ চৌত্রিশ হাজার কোটি টাকা এসএমই ঋণ দিয়েছে– যার মধ্যে নারী উদ্যোক্তা পাঁচ শতাংশ। নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে এ বছর ১০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে। এসএমই খাতের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের ১৫ শতাংশ বরাদ্দ রেখে বানানো হয়েছে ‘নারী উদ্যোক্তা তহবিল’।

এসএমই খাতে গত পাঁচ বছরে দেশে আড়াই লাখের বেশি নতুন উদ্যোক্তাকে পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এ সময়ে এ খাতে আমরা পেয়েছি পনের লাখের মতো নতুন কর্মসংস্থান।

কম খরচে ও দ্রুততার সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণের কাছে টাকা পাঠানোর জন্যে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ঘটেছে এক বিপ্লব। মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব দ্বিগুণ বেড়ে ২০১৪ এর নভেম্বরে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৩৩ লাখ। উনিশটি ব্যাংক ৫ লাখ ১৯ হাজার এজেন্টের মাধ্যমে এ সেবা দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে শহরের কর্মজীবী মানুষ মোবাইলের মাধ্যমে গ্রামে তাদের পরিবার-পরিজনদের কাছে টাকা পাঠায়। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে গড়ে প্রতিদিন তিনশ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এ বছর ‘অ্যালায়েন্স ফর ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন পলিসি পুরস্কার’-এ ভূষিত হয়েছে।

বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থবছর ২০১০-এ প্রথম ‘গ্রিন ব্যাংকিং’ ধারণা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব অর্থায়নযোগ্য খাতে ২০০ কোটি টাকার একটি তহবিল চালু করে। এ তহবিল থেকে নভেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত ১৬৪ কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন করা হয়েছে। গত অর্থবছরে পরিবেশবান্ধব ইটভাটা স্থাপনে এডিবি’র অর্থায়নে ৪০০ কোটি টাকার আরেকটি তহবিল গঠন করা হয়।

দেশের আনাচে কানাচে ব্যাংকের অনুরূপ প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা পৌঁছাতে ২০১৪তে ‘এজেন্ট ব্যাংকিং’ নীতিমালা প্রণয়ন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই মধ্যে ৫টি ব্যাংককে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
কৃষিঋণ বছরে গড়ে প্রায় ১২ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে

কৃষিঋণ বছরে গড়ে প্রায় ১২ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে

বাংলাদেশ ব্যাংক সিএসআর কর্মকাণ্ডে (সামাজিক দায়বদ্ধতা) সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে উদ্বুদ্ধ করেছে। সিএসআর খাতে ২০০৯ সালে ব্যাংকগুলোর ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৫৫ কোটি টাকা, গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে আটগুণ বেড়ে তা ৪৪৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নীতিমালায় সিএসআর ব্যয়ের ৩০ শতাংশ শিক্ষা ও ২০ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করতে হবে। সিএসআর ব্যয়ের নামে কোনো ব্যাংক জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসে অর্থায়ন করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান হয়েও বাংলাদেশ ব্যাংক গত অর্থবছরে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল’ নামে একটি তহবিল গঠন করে।

প্রযুক্তি প্রসারণ ও বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন সহজীকরণ

সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেকে একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাইজড প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলছে। দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকেও করেছে ডিজিটাইজড। বর্তমানে প্রায় নব্বই শতাংশ ব্যাংক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। অনলাইন সিআইবি সেবা, অটোমেটেড ক্লিয়ারিং হাউজ ও ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক চালুর পর ব্যাংকিং লেনদেনে গতি বাড়াতে ‘রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস)’ সিস্টেম বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে।

ই-ব্যাংকিং ও ই-কমার্স প্রসারেও সহযোগিতা করে চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের ভেতরে দুই হাজারেরও বেশি ই-কমার্স ঠিকানা কাজ করছে। অনলাইন কেনাকাটার দ্রুত প্রসারে অর্থনীতি গতিশীল হচ্ছে। বিদেশে ভ্রমণ, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, চিকিৎসা ব্যয়, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা গ্রহণ, আমদানি-রপ্তানিসহ ব্যবসায়িক প্রয়োজন ইত্যাদির জন্য পূর্বানুমোদন গ্রহণের আবশ্যকতা প্রত্যাহার করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন বিদেশি নাগরিক ও অনিবাসী বাংলাদেশিরা অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোতে সহজেই বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব খুলতে ও পরিচালনা করতে পারেন।

রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার দেড় বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বিদেশী পেশাজীবী বা বৈজ্ঞানিক সংস্থার সদস্য ফি, বিদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিভিন্ন ফি, হোটেল বুকিং এবং অনলাইনে সফট্ওয়্যার, অ্যাপস, ই-বুকসহ অন্যান্য পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধ সহজ করা হয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডধারী না হয়েও ‘ভারচুয়াল কার্ড’ ব্যবহার করে সাধারণ জনগণও বিদেশে এরূপ ফি অনলাইনে পরিশোধ করতে পারছেন।
এসএমই খাতের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের ১৫ শতাংশ বরাদ্দ রেখে বানানো হয়েছে ‘নারী উদ্যোক্তা তহবিল’

এসএমই খাতের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের ১৫ শতাংশ বরাদ্দ রেখে বানানো হয়েছে ‘নারী উদ্যোক্তা তহবিল’

নজরদারি জোরদারকরণ

ব্যাংকিং খাতের আর্থিক জালিয়াতি বন্ধ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারসহ নজরদারি আরো জোরদার করেছে– যাতে অনুরূপ ব্যাংকিং অনিয়মের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। প্রাসঙ্গিক ড্যাশবোর্ড চালু করে নজরদারির গুণমানে ব্যাপক উন্নতি আনা হয়েছে।

সর্বোপরি, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের উন্নয়নমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকা- দেশে আর্থিক খাতের সুস্থিতি বৃদ্ধিতে কাজ করছে। এ কারণেই বিশ্বব্যাপী মন্দা ও জাতীয় নানা বাধার মাঝেও বাংলাদেশ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এ বছরসহ গত ছয় বছর ধরে বেশ সাফল্যের ধারাতেই রয়েছে। সম্প্রতি আইএমএফ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘স্থিতিশীল’ ও আর্থিক খাতের পরিস্থিতিকে ‘সুদৃঢ়’ বলে তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে।

২০১৪এর শেষ পর্বে অভ্যন্তরীণ চাহিদার যে নতুন প্রণোদনা সৃষ্টি হয়েছে তা অব্যাহত থাকলে ২০১৫ অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ বা তদূর্ধ্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন হবে না। তবে মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে কিছু ঝুঁকি থাকবে। এর কারণ ত্রিবিধ: সরকারি নতুন বেতন কাঠামো, মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতায় তেলের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা ও চাহিদাতাড়িত ঊর্ধ্বচাপ। এগুলো মাথায় রেখেই বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী মুদ্রানীতি সাজাবে– যাতে ২০১৫ এর অর্থবছর শেষে লক্ষ্যমাত্রার ৬.৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি অর্জন করা সম্ভব হয়।

গেল বছরে অবকাঠামো ও রাজস্ব আহরণের গতি আরও বাড়ানোর সুযোগ ছিল। এ দুটো দিকে ২০১৫তে জোর নজর দিতে হবে। তেলের দাম কমে যাবার ফলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জন্যে বরাদ্দ রাজস্বে ঘাটতি কিছুটা কমবে। তাই বলে এ নিয়ে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। বরং রাজস্ব আহরণের গতি বাড়াতে হবে আরও সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্যে। গভীর সমুদ্র বন্দর, চার লেনের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, মেট্রোরেলসহ বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে চাই বাড়তি রাজস্ব। এনবিআর-কে ডিজিটাইজ করে, বাড়তি জনসম্পদ দিয়ে, প্রয়োজনীয় সংস্কার করে রাজস্ব আহরণের মাত্রা ও গতি বাড়াতে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে।

নজর দিতে হবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন ও বড় বড় শহরের ট্রাফিক মোকাবেলার দিকে। কারণ প্রতিটি বড় শহর একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্যে একটি একটি ‘প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র’ হিসেবে কাজ করে।
বিশ্বব্যাপী মন্দা ও জাতীয় নানা বাধার মাঝেও বাংলাদেশ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ছয় বছর ধরে সাফল্যের ধারাতেই রয়েছে

বিশ্বব্যাপী মন্দা ও জাতীয় নানা বাধার মাঝেও বাংলাদেশ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ছয় বছর ধরে সাফল্যের ধারাতেই রয়েছে

উপরন্তু, আর্থিক খাতে সুশাসন ও ঋণ-শৃঙ্খলা সুপ্রতিষ্ঠিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিনিয়োগ আস্থা চাঙ্গা করবে। এরই মধ্যে সংশোধিত ব্যাংকিং কোম্পানি আইনের বলে প্রধান নির্বাহী অপসারণ এবং পাশাপাশি দক্ষদের সুরক্ষা প্রদান এবং পর্ষদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এসবই করা হয়েছে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন বাড়ানোর লক্ষ্যে।

নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি হবে ২০১৫এর জন্যে আর্থিক খাতের অন্যতম লক্ষ্য। আর তা করা হচ্ছে বলেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাও বাড়ছে। এর সঙ্গে বহির্বাণিজ্যের প্রসার যেভাবে ঘটছে তাতে মনে হয় নতুন এই বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটাই স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে। তাছাড়া, দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করে সবার জন্য সমৃদ্ধি অর্জনের পথে সরকারের দূরদর্শী দিক-নির্দেশনা ও বিচক্ষণ নেতৃত্বে অগ্রযাত্রার সহায়ক ভূমিকা পালনে বাংলাদেশ ব্যাংক সক্রিয় রয়েছে এবং সদা সক্রিয় থাকবে।

বাংলাদেশের মানুষের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শত বাধা বিপত্তিতেও ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি এবং যে কোনো পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়ানোর বুদ্ধিমত্তা। একেই বলে সহনশক্তি বা রেজিলিয়েন্স। জাতি হিসেবে এটিই আমাদের বড় শক্তি। এর প্রমাণ আমরা অতীতে বহুবার পেয়েছি। বিশৃঙ্খল ২০১৩এর পরেও বিশ্বব্যাপী উৎকণ্ঠা ও নেতিবাচক মন্তব্য অসার প্রমাণ করে বাংলাদেশ ২০১৪ অর্থবছরে ৬.১ ভাগের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। স্থিতিশীলতা অব্যাহত থাকলে আমাদের ক্রমবর্ধমান প্রবৃদ্ধির এই ধারা সারাবিশ্বে দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য হবে।

আমার বিশ্বাস, ২০১৫ সালে আমাদের অর্থনীতি আরও সুসংহত হবে। আরও সুস্থির হবে। শুভ নববর্ষ।

Sunday, November 8, 2015

ঘাতক কাঁটা তুলতে হবে -সুমি খান



মশাল যদি নিভেও যায়-
বুকের ভেতর জ্বলা আগুন
এই মশালে জ্বেলে যাই !
রাজীব -অভি- নিলয়- দীপন
নতুন সকাল ডেকে যায়
 ঘাতক কাঁটা তুলতে হবে -
তোদেরকে আজ বলে যাই!!

(সকাল ৮টা ১০ মিনিট)
৯ নভেম্বর, ২০১৫

Saturday, November 7, 2015

আমরা নিশ্চয়ই নন্দলাল হতে চাই না-, সাহসে ভর করে চলতে হবে-প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

_hasinaসংলাপে বসতে চান খালেদা। এ প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বললেন, "যেদিন খালেদা জিয়া বলবেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তিনিও চান,সেদিন সংলাপে বসবো। কারণ, এই ঘাতকেরা আমাদের মা-বোনদের ধর্ষণ করেছে,গণহত্যা করেছে ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ যখন সুখে আছে তখনই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে। এগুলো আর্টিফিসিয়ালি করা হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ এমন না। ইমামবারাতে শিয়া-সুন্নি সংঘর্ষ লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আমাদের কাছে বেশকিছু তথ্য এসেছে। এসব ব্যাপারে অর্থায়ন ও নির্দেশনা আমরা খুঁজে দেখছি। তিনি বলেন, আমরা বেতন বৃদ্ধি করলাম। মাথাপিছু আয় ৬০০ ডলার থেকে ১৪০০ তে উন্নীত করেছি।

বিএনপির জাতীয় ঐক্যমতের প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাজনীতি করলেও আমি মানুষ। কাউকে যদি মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে আপনি কী তার কাছে যাবেন। কেউ যদি ফোনে ঝারি মারে তাহলে কী আপনি কথা বলবেন? আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। আমি তাকে (খালেদা জিয়া) ফোন করি। তার ছেলে মারা গেলো, আমি গেলাম তিনি আমাকে ঢুকতে দিলেন না। একজন খুনির সঙ্গে আমাকে বসতে হবে। যার হাত দিয়ে মানুষ খুন হয় তার সঙ্গে বসার ইচ্ছে নেই। রবিবার বেলা সাড়ে ১১টায় গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। সদ্য সমাপ্ত নেদারল্যান্ড সফরের অর্জন ও সফলতা নিয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। তিনদিনের সফর শেষে গত শুক্রবার বিকালে ঢাকায় ফেরেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেন,  বাংলাদেশে আইএস আছে। এটা যদি স্বীকার করানো যায় তবে বাংলাদেশের উপর  হামলে পড়তে সুবিধা হবে। অনেকে এই ধরনের চিন্তা করছে। বাংলাদেশ অনিরাপদ হয়ে পড়েছে এই স্বীকৃতি আদায় করতে পারে তাহলে কী হবে ভাবতে পারেন। সিরিয়া, পাকিস্তানের মতো আমাদের সর্বনাশ করার আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। আমি ভেবে পাইনা ,একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানকে হত্যা করছে। সারা  বিশ্বে এটা হচ্ছে। কেন এটা হবে?প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন,  এর পেছনে কারা? সুতাটা কার হাতে?’
নেদারল্যান্ডের সাথে চুক্তি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন,‘ডেল্টা প্ল্যান অনেক আগেই গ্রহণ করেছি। তবে চাক্ষুষ প্রমাণ পেয়ে কাজ করা হচ্ছে, সেটাই  বড় কথা। আমাদের আছে ১২শ' নদী। আরো ছোট ছোট নদীগুলোকে ড্রেজিং করার আওতায় আনতে হবে। আমাদের সম্ভাবনা নেদারল্যান্ডস এর চেয়ে  বেশী বলে মনে করি। আমরা যে বিশাল সমুদ্রসীমা পেয়েছি , সেটাকে কাজে লাগাতে হবে।’তিনি বলেন, আমাদের পরিকল্পনা চলমান থাকবে। অনেক পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নেদারল্যান্ডস এর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উষ্ণ ও আন্তরিক। নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন ও সহযোগিতার জন্য তাকে অনুরোধ করি। উল্লেখ্য, ডাচ প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটের আমন্ত্রণে গত মঙ্গলবার এই সফরে যান প্রধানমন্ত্রী। এ সফরে ইউরোপের দেশটির সঙ্গে চারটি চুক্তি সই হয়েছে।
গণভবনে এই সাংবাদিক সম্মেলনে  প্রধানমন্ত্রীকে এটিএন বাংলার বার্তাপ্রধান জ.ই.মামুন বললেন," আপনি রাষ্ট্রের প্রধান আপনার নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনা এবং এর সাফল্যে আমরা গর্ব বোধ করি। কিন্তু একের পর এক হুমকি এবং হত্যার কারণে আমরা 'অনিরাপদ' বোধ করছি। আমার পুলিশ 'অনিরাপদ 'বোধ করে।  " প্রধানমন্ত্রী এর জবাবে দৃঢ়তার সাথে বললেন,   কথায় বলে, 'বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘে খায়'- দেখছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে হরতাল ও আহ্বান করা হয়েছে। এই চক্রান্তের অংশ প্রকাশক, সাংবাদিকদের হুমকি। নিরাপত্তা আমরা দিচ্ছি;তা দিয়ে যাবো। তবে জানেন তো, সব তালিকার শীর্ষে আমি আছি। এখন নাহয় প্রধানমন্ত্রী , তাই নিরাপত্তা আছে । একসময়ে তো  আমার থাকার বাড়ি ছিলনা, চলাফেরা করার গাড়ি ছিল না; জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ১৯৮১ সালে দেশে এসেছি। সে সময়ে আমাকে বলা হয়েছিলো, আমি  এয়ারপোর্টে নামার সাথে সাথে আমাকে গুলি করে ফেলে দেয়া হবে;পরোয়া করিনি। বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক দেশ, সেক্যুলার দেশ। এখানে সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্যে ষড়যন্ত্র চলছে। আমরা নিরাপত্তা দেবার চেষ্টা করছি, জানেন। কারা একের পর এক ঘটনা ঘটাচ্ছে, তাদের চিহ্ণিত করে রুখে দাঁড়াতে জনগণকে সচেতন করুন। আমরা সেক্যুলার ডেমোক্রেসিতে বিশ্বাস করি। আমি একটা ধর্ম পালন করি। আমার এ ধর্ম নিয়ে যদি কেউ বিকৃত লেখা লিখে, তাদের লাগবেই । সতর্ক করা হয়েছে, কারো ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে এমন লেখা লিখবেন না। কেউ ধর্ম না মানলে তার ব্যাপার। অন্যের ধর্মে আঘাত দিতে পারেন না। বিকৃত লেখা এক ধরণের বিকৃতি ;বিকৃত মানসিকতা। আমি খোলামেলা কথা বলি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি সব ধর্মকে সম্মান করি। গীর্জা, মসজিদ, প্যাগোডাতে গেছি। আমার ধর্মপালনে কোন ব্যাঘাত এতে হয়নি।
সকল ধর্মের প্রতি সম্মান রাখার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সেক্যুলারিজম মানে অন্যকে আঘাত দেয়া নয়, অন্য ধর্মের প্রতি সম্মান জানানো। ষড়যন্ত্র করে পুলিশকে মারা হচ্ছে। পুলিশ কনস্টেবল ইব্রাহিমকে মারার পর জানা গেলো আশুরার সময়ে কী নাশকতার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। আপনার নিরাপত্তা রাষ্ট্র যেমন দেবে, নিজেকে ও সচেতন হতে হবে। আমরা নিশ্চয়ই নন্দলাল হতে চাই না, (হেসে)"নন্দলালা একদা করিলো পণ, যে করেই হোক্, রাখিবো এই জীবন!" প্রশ্ন -আপনাকে 'লেডি হিটলার ' বলেছেন খালেদা জিয়া লন্ডনে বসে। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য!-" এএই বক্তব্যের মধ্যে দিয়েই প্রকাশ পায় , তিনি কী করছেন ? আর যে মন্তব্য তিনি করলেন, সেটাই যদি হবে, তাহলে আর সংলাপে বসতে চান কেন? আমি বুঝতে পারি না , এতো দুর্নীতি , এতো হত্যা, এতিমের অর্থ আত্মসাৎ, ২১শে আগষ্টের গ্রেনেড হামলা, তার পর ও তার (খালেদা জিয়া) প্রতি  এতো 'দুর্বলতা' কেন? এদের হাতে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা কর্মী নিহত হয়েছে। কক্সবাজারে হত্যা করে এসিড ঢেলে দিয়েছে, যাতে মুখ চেনা না যায়। এ নিয়ে কারো যেন কোন বক্তব্য নেই। আওয়ামী লীগের লোক মারা গেলে আমরাই কাঁদি, কোন জ্ঞানী গুণীর কান্নাকাটি নেই, আমরা ই কাঁদি। অনেকে দলে  যোগ দেয় খুন করার জন্যে। জামাত বিএনপি কোন ভালো কাজ করে নি, দলে অনেক লোক আছে নতুন করে এদের দরকার নেই। এরা দলে এসেই কোন খুন করে প্রচার করে 'আওয়ামী লীগ খুন করেছে'। আমি জামাত-বিএনপি কে দলে নেবার বিরোধী। প্রকাশক, লেখক দের হত্যা করছে এরাই । সাহসে ভর করে চলতে হবে। আ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল অত্যন্ত গর্হিত কাজ করেছে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে। মানিলন্ডারিং করে এতো টাকা হয়েছে ওদের (জামাত-বিএনপি) !আ্যামনেষ্টি টাকার বিনিময়ে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে কথা বলছে। কে কী বলছে, তাতে কিছু আসে যায় না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই বললেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা !বেলা ১২টা ১০ থেকে ১২টা ৪২ মিনিটপর্যন্ত এ সংবাদ সম্মেলনে স্বতঃস্ফুর্তভাবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

Sunday, October 18, 2015

ছোট্ট আমি তুমি


দিক ভেসেছে
কূল ভেসেছে
নিদ টুটেছে
ডাগর চোখের পাতায়-
মিঠে প্রেম
আর
মিঠে ভালোবাসায়-
কবে কখন কোন জনমে -
বৃষ্টি খেলার
নৌকা ভেলায়
শিউলি ফুলের
ঝরে পড়ায়
শেষ বিকেলের
কনে দেখা আলোয়-
শেকলের বন্ধনে
বন্দীত্বের শৃঙ্খলে-




রাত ১১টা
১৮ অক্টোবর , ২০০৫

 

Monday, September 14, 2015

আইএস-এর টার্গেটে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ?-সুমি খান

বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট-এর (আইএস বা আইসিস) সঙ্গে সরাসরি জড়িত একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই ব্রিটিশ নাগরিক ইরাক ও সিরিয়া ভিত্তিক আইএস-এর সঙ্গে জড়িত বলে দাবি পুলিশের৷ সামিউন ওরফে ইবনে হামদান নামের এই তরুণকে গোয়েন্দারা গ্রেপ্তার করেন রবিবার রাতে৷ তার কাছ থেকে মোবাইল ফোন এবং জঙ্গি তত্‍পরতায় জড়িত থাকার প্রমাণ সম্বলিত কিছু কাগজ-পত্রও উদ্ধার করা হয়েছে৷ জানা গেছে, সামিউনকে গ্রেপ্তার করা হয় এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া হাফিজুর রহমান নামে আরেকজনের তথ্যের ভিত্তিতে৷ তার তথ্যমতে, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক সামিউন বাংলাদেশে আইএস-এর তত্‍পরতা জোরদার করার কাজ করছিল৷

গত কয়েক সপ্তাহে আইএস-এর সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আরো কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ৷ গত বুধবার ঢাকা থেকে জঙ্গি তত্‍পরতায় জড়িত থাকার অভিযোগে মো. আসিফ আদনান ও মো. ফজলে এলাহী তানজিল নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়৷ এদের মধ্যে আদনান সুপ্রিম কোর্টের সাবেক এক বিচারপতির ছেলে এবং তানজিলের মা যুগ্ম সচিব৷ তারা নাকি ‘জিহাদে' অংশ নিতে তুরস্ক ও সিরিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল৷


 গত কয়েক সপ্তাহে আইএস-এর সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আরো কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ
গোয়েন্দারা গত ১৯শে সেপ্টেম্বর নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবি-র ভারপ্রাপ্ত আমির আব্দুল্লাহ আল তাসনিম ওরফে নাহিদসহ সাতজনকে আটক করেন৷ তারাও আইএস-এর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল বলে গ্রেপ্তারের পর সংবাদমাধ্যমকে জানান গোয়েন্দারা৷

মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘বাংলাদেশে আইএস-এর অনুসারীদের তত্‍পরতা তাদের নজরে আসছে৷ কোণঠাসা হয়ে যাওয়া জঙ্গি সংগঠনগুলোর সদস্যরা ইরাক এবং সিরিয়ার ঘটনায় এখন নতুন করে আইএস-এর দিকে ঝুকছে৷ তারা উদ্বুদ্ধ হচ্ছে৷''
তিনি জানান, ‘‘এর আগে আইএস-এর সঙ্গে যোগাযোগ আছে বা যোগাযোগের চেষ্টা করছেন এমন কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে৷ আর রবিবার আইএস-এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত একজনকে আটক করা হলো৷''

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, ‘‘আটক সামিউনের কাছ থেকে তার ব্রিটিশ পাসপোর্ট, এটিএম কার্ড এবং ৬টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে৷ তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে যে, সে সিরিয়ায় আইএস-এর সদস্য হিসেবে যুদ্ধ করেছে৷ তার মোবাইল ফোনের এসএমএস থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া গেছে৷''
মাসুদুর রহমান জানান, ‘‘এর আগে আটক হওয়া দু'জন জঙ্গি তাদের জানিয়েছেন সামিউন বাংলাদেশে বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে আসে৷ আইএস-এর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্যই সে বাংলাদেশে এসে কাজ শুরু করে৷ শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে আসার আগে থেকেই সে এখানকার জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলে৷''

তিনি জানান, ‘‘সামিউনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসবাদ করা হবে৷ আর তখনই জানা যাবে আইএস বাংলাদেশে আদৌ কোনো শক্ত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পেরেছে কিনা৷''

Saturday, August 29, 2015

আলবদররা কী করেছিল?-মুনতাসির মামুন

হবে কী হবে না? হ্যামলেটের সেই বিখ্যাত উক্তির মতো-‘টুবি অর নট টু বি’। মুজাহিদের দন্ডের দু’একদিন আগে থেকে এ প্রশ্নটিই ঘুরপাক খাচ্ছিল বিভিন্ন মহলে। উন্নয়নের ধাক্কায় যখন রাস্তাঘাট বিপর্যস্ত, মানুষ ঘর্মাক্ত ও বিরক্ত তখনও এ প্রশ্ন ছিল অনেকের মুখে। আমাকে ফোন করে জানতে চেয়েছেন অনেকে, যেন আমি সবজান্তা। আমি পরে নিজেকে প্রশ্ন করেছি, এ উদ্বেগ কেন সবার মাঝে? মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের দণ্ড হওয়ার পর আপীল বিভাগে গেলে কেন এ প্রশ্ন ওঠে? এর অর্থ মানুষের সম্পূর্ণ আস্থা নেই। না থাকার কারণ কি? কারণ, পূর্ববর্তী কয়েকটি রায়ে ইতিহাস অমান্য করে দণ্ড হ্রাস বা মওকুফ। আইন দিয়ে ইতিহাস ঠেকানো কেউ পছন্দ করেনি একমাত্র জামায়াত-বিএনপি ছাড়া। এ বিষয়টি আইনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সবার ভেবে দেখা উচিত। পদে গেলে পদ এক সময় সবাইকে হারাতে হয়। তখন? উচ্চ আদালতের অনেক বিচারককে প্রকাশ্যে কেন দেখা যায় না পদ হারানোর পর। এর মধ্যে প্রধান বিচারপতিই আছেন কয়েকজন। সাম্প্রতিককালে একমাত্র বিচারপতি খায়রুল হক-ই দিব্যি হেসে খেলে অবসরোত্তর জীবন যাপন করছেন। কেন?
এসব প্রশ্ন আরও তীক্ষè হয়েছিল বিচারপতি শামসুদ্দীন চৌধুরীকে এই বেঞ্চে না রাখার কারণে। তার ভক্তের সংখ্যা যেমন প্রচুর, তাকে অপছন্দ করেন এমন সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে তার অবিচল পক্ষপাত অনেককে বিচলিত করে।
 এখানেই প্রশ্ন আসে আইন ও ইতিহাস নিয়ে। প্রশ্ন ওঠে বিচারের সব পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এবং সেই দৃষ্টিভঙ্গি আইন ও ইতিহাসকে পর্যুদস্ত করছে কিনা তা নিয়ে। সে আলোচনা পরে।

‘যুদ্ধাপরাধ আবার কী? বাংলাদেশে কোন যুদ্ধাপরাধী নেই।’ ২০০১ সালে মুজাহিদ এ রকম ঔদ্ধত্যভরেই কথা বলতেন। তার দাম্ভিকতা ঔদ্ধত্য কখনই কেউ পছন্দ করেনি। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের মধ্যে একমাত্র সাকাচৌ-ই এ বিষয়ে তার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেন। মুজাহিদকে আমার সব সময় মানবতাবিরোধী অপরাধীদের মধ্যে সবচেয়ে ঠা-া মাথার ও ধূর্ত মনে হয়েছে। অবশ্য, বলতে পারেন এ ধরনের অপরাধীরা ঠা-া মাথার না হলে এত হত্যাকা- বা ধর্ষণ কিভাবে করেছিলেন? খালেদা জিয়া মুজাহিদকে খুব পছন্দ করতেন। কখনও নির্বাচনে না জিতলেও খালেদা ২০০১ সালে মুজাহিদকে সমাজকল্যাণমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। একটি বিষয় লক্ষণীয়, খালেদা জামায়াতের যে দু’জনকে মন্ত্রী বানিয়েছিলেন নিজামী ও মুজাহিদ তারা দু’জনই ছিলেন ১৯৭১ সালে আলবদর কমান্ডার ও উপ-কমান্ডার। রক্তের প্রতি খালেদার এক অদম্য আসক্তি আছে। তার প্রমাণ ২০০১-৬ ও ২০১৩-১৪ সালের ঘটনাবলি। কত মানুষ যে পুড়িয়েছেন তিনি! রক্তের প্রতি আসক্তির কারণেই ঐ দু’জনকে মন্ত্রী করেছিলেন। মুজাহিদ সমাজকল্যাণমন্ত্রী হয়ে সারাদেশে সরকারী টাকায় জামায়াতী প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করেছিলেন। আজ যে বিতর্ক উঠছে বিএনপি জামায়াত ছাড়বে কিনা তার উত্তর- না। আমরা ইতিহাস না জেনে বিতর্ক করি। জিয়াউর রহমান খুনীদের মাঠে এনেছিলেন তাদের ত্যাগ করার জন্য নয়, তার গুন্ডাবাহিনী হিসেবে কাজ করার জন্য। জামায়াত বিএনপির গুণ্ডা বাহিনী হিসেবে কাজ করবে, আর গডমাদার তাকে প্রটেকশন দেবেন। এটি বাস্তব ও সাধারণ সত্য।

 আলবদর আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ১৯৭১ সালে তার বাহিনী নিয়ে প্রথমে অসম পরে দিল্লী জয় করতে চেয়েছিলেন। কেন পারেননি সে প্রসঙ্গ পরে। পালিয়েছিলেন নেপাল, তারপর পাকিস্তান। আলবদর বন্ধু জিয়াউর রহমানের আমলে ফিরে আসেন দেশে। জেনারেল জিয়ার স্ত্রীর আমলে মন্ত্রী। ট্রাইব্যুনালে বিচারের সময় দেখেছি কাঠের বেষ্টনীতে বসে। এত উত্থান পতন একজনের জীবনে খুব কমই আসে। ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা যখন রায় পড়ছিলেন তখন মনে হয়েছিল এই আলবদর কমান্ডারকে ১৯৭১ সালে আমরা বলতাম আজরাইল।
 মুজাহিদের পুরো পরিবার রাজাকার। তার পিতা শান্তি কমিটির সদস্য হিসেবে মানুষজন হত্যা, লুটপাট করেছেন। তার পুত্র পৃথিবীর ইতিহাসে হিংস্রতম একটি বদর বাহিনীর উপপ্রধান ছিলেন। বদর বাহিনী যা করেছে তার জন্য মৃত্যুদন্ডও যথেষ্ট শাস্তি নয়।

 ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী বাহিনীর সহযোগী হিসেবে বদর বাহিনীর সৃষ্টি হয়। জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ রূপান্তরিত হয় আলবদর বাহিনীতে। এর বাইরেও যে কিছু লোকজন আলবদর বাহিনীতে যোগ দেয়নি তা নয়। ইসলামী ছাত্রসংঘের (সারা পাকিস্তান) প্রধান মতিউর রহমান নিজামী নিযুক্ত হন আলবদর বাহিনীর প্রধান। মুজাহিদ ছাত্র সংঘের হোমরা চোমরা ছিলেন। ১৯৭১ সালেই তিনি পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের প্রধান হন, সে হিসেবে আলবদরদের উপকমান্ডার। বস্তুত মাঠে মুজাহিদের দাপটই ছিল বেশি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগ করা হয়েছিল। আসলে এত অভিযোগের দরকার ছিল না। বুদ্ধিজীবী হত্যায় জড়িত ও নেতৃত্বদানের কারণেই তিনি মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হতেন। আলবদর নেতা হিসেবে হত্যার পরিকল্পনা পন্থা সবই তার নির্দেশে হতো। মুজাহিদের মতো হিংস্র মানুষ খুব কমই দেখা মেলে। তার সেই হিংস্রতা বয়সের কারণেও হ্রাস পায়নি। তার অবয়ব দেখলেই তা অনুমান করা যায়।
 প্রত্যেক আলবদরই যুদ্ধাপরাধী। তারা ছিল পাকিস্তানী বাহিনীর সহযোগী শক্তি, তবে সরাসরি অধীনস্থ। তারা কখনও কখনও স্বাধীনভাবে কাজ করলেও পাকিস্তানী সেনা কমান্ডের অনুমতি ছাড়া সাধারণত কাজ করতে পারত না। তাদের প্রশিক্ষণ, বেতন, অস্ত্রশস্ত্র সব পাকিস্তানী বাহিনীই যোগাত। সুতরাং ১৯৭১ সালের খুন, ধর্ষণ, হত্যা, লুট, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতির দায়দায়িত্ব তাদের ওপরও বর্তায়। পাকিস্তান বাহিনীর ওপর নির্ভরতা ও তাদের হয়ে কাজ করার প্রমাণ এখনও পাওয়া যাচ্ছে। মনসুর খালেদের বইয়ের একটি অধ্যায় আছে ‘আলবদরদের অবদান’। তিনি বিভিন্ন সাক্ষাতকার, পত্রপত্রিকা থেকে আলবদর সম্পর্কে পাকিস্তানীদের বিবৃতি, বক্তৃতা সঙ্কলন করেন।
 এসব পাকিস্তান সরকার ও পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততাই তুলে ধরে এবং এগুলো যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ।

 মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ‘অপারেশন সার্চ লাইটের’ সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বেসামরিক প্রশাসনের দেখাশোনাও তিনি করতেন। বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য তিনি দায়ী এ কথা অনেকেই বলেছেন। আমি ও মহিউদ্দিন আহমদ যখন তার সাক্ষাতকার নিই রাওয়ালপিন্ডিতে, তখন তিনি ১৯৭১ সালের গণহত্যার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, (১৯৯৮) আমাকে যে রাজাকার, আলবদর, আলশামস সবকিছু ছিল নিয়াজীর নিয়ন্ত্রণে। তিনি এর কিছুই জানেন না। ৯-১০ ডিসেম্বরের একটি ঘটনার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়-
‘শুনুন, জেনারেল শামসের ছিলেন পিলখানার দায়িত্বে। তিনি আমাকে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেন। তিনি জানান, আমাদেরকে জেনারেল নিয়াজীর সঙ্গে দেখা করতে হবে। জেনারেল নিয়াজীর সঙ্গে সাধারণত আমাদের কোন বৈঠক হয় না। জেনারেল শামসেরকে বললাম, ঠিক আছে যাব। পিলখানায় পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। সেখানে দেখলাম কিছু গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে কেন? তিনি বললেন, বিশেষ উদ্দেশ্যে আমরা জেনারেল নিয়াজীর কাছে যাচ্ছি, সে জন্যই গাড়িগুলো এখানে। তারপর বললেন, কয়েকজন লোককে গ্রেফতার করতে হবে। জিজ্ঞেস করলাম, কেন? বললেন, কথাটা নিয়াজীকেই তুমি জিজ্ঞেস কর। এতে তোমার মত কি? আমি বললাম, স্যার, এখন কাউকে গ্রেফতারের সময় নয়, বরং এখন কত লোক আমাদের সঙ্গে আছে সেটিই দেখার বিষয়।’

এই যে গ্রেফতার ও গাড়িগুলোর কথা বলা হচ্ছে, এখানেই ইঙ্গিত আছে আলবদরদের। আলবদররা তখন বিভিন্ন এলাকায় হানা দিয়ে মানুষ তুলে নিচ্ছে। এ গাড়িগুলো আলবদরদের দেয়া হতো মানুষজনকে তুলে নেয়ার জন্য।

 আমাকে যখন জেনারেল ফরমান এ কথাগুলো বলেন, তখন বোধহয় তিনি ভুলে গেয়েছিলেন ১৯৮৩ সালে দৈনিক জং ও দৈনিক নওয়ায়ে ওয়াক্তে এক সাক্ষাতকারে তিনি কি বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আলবদর ও আলশামসের কার্যকলাপের আমি প্রত্যক্ষ দর্শক। এই দুটি সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মোকাবেলায় তাদের জান কুরবান করেছিল।’

জেনারেল নিয়াজী কিন্তু ব্যাপারটা অস্বীকার করেননি। আমাকে তিনি বলেছিলেন (১৯৯৮) ‘আলবদর, আলশামস আমারই সৃষ্টি। এ প্রক্রিয়াটি আমি শুরু করি মে মাস থেকে। ওরা সরাসরি আমার কমান্ডে ছিল।’

২১ মে ১৯৭১ সালে আলবদর বাহিনীর যাত্রা শুরু। যে মেজর রিয়াজ এদের সংগঠিত করেছিলেন। তিনি মনসুরকে জানিয়েছিলেন- ‘তারা বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের অখ-তা ও প্রতিরক্ষাকে ঈমানের অংশ ও দ্বীনের দাবি বলে মনে করতেন। ’
ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিক সালিকের নাম আমাদের পরিচিত। ঢাকায় ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন। বইও লিখেছেন। ‘ম্যায়নে ঢাকা ডুবতে দেখা’ গ্রন্থে তিনি লিখেছিলেন, ‘আলবদর আলশামস ও রাজাকাররা পাকিস্তানের জন্য তাদের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। যে কোন আদেশ তারা সম্পূর্ণভাবে পালন করত।’

ভাল বলেছেন আলবদরদের সুপার বস আবুল আলা মওদুদী। ১৯৭৩ সালে করাচীর দৈনিক জসরত পত্রিকায় তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে যখন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে তখন আলবদররা পাকিস্তানের ঐক্যের পক্ষে কাজ করছিল। আর যখন পাকিস্তানী বাহিনী দুষ্কৃতকারী ও ভারতীয় বাহিনীর গেরিলাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় তখন এই তরুণরা পাক বাহিনীর পুরোপুরি সহযোগিতা করে। এমনকি সেনাবাহিনীর সাফল্য এই তরুণদের ওপর নির্ভর করেই অর্জিত হচ্ছিল। কেননা সেনাবাহিনীর বিরাট অংশ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের। তারা পূর্ব পাকিস্তানের রাস্তা-ঘাট ও ভাষা জানত না বা চিনত না। ওই সময়ে এই তরুণরা ইসলামের প্রতি ভালবাসা ও দেশপ্রেমে উদ্বেলিত হয়ে সামনে এগিয়ে যায় এবং তারা ভারতীয় বাহিনীর আগ্রাসী হামলা প্রতিহত করার জন্য স্বদেশী বাহিনীকে পূর্ণরূপে সাহায্য করে। তারা প্রচুর কুরবানী স্বীকার করে। এরাই ছিল সেই নওজোয়ান যারা পাক বাহিনীর অগ্রপথিক ছিল। তাদের মধ্য থেকে প্রায় ৫ হাজার ওই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে শহীদ হয়েছেন আর যারা জীবিত রয়ে গেছেন তারা আপন বাঙালি ভাইদের হাতে এখন শহীদ হচ্ছেন।’

৫০০০ আলবদর নিহত হলে তো আমরা বেঁচে যেতাম। নিহতের সংখ্যা অনেক কম। আর বাংলাদেশ হওয়ার পর তাদের কোথায় নিধন করা হয়েছে? হয়নি। তবে, ধরে নিতে হবে পাকিস্তানীরা বিশেষ করে পাকিস্তানের জেনারেল ও ‘মৌলানা’রা মিথ্যা বলায় অভ্যস্ত।

 মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত যাদের বিচার হয়েছে তাদের অধিকাংশই আলবদর বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কারণ, তখন তারা তরুণ হিসেবে ইসলামী ছাত্রসংঘের সঙ্গে জড়িত হয়ে গিয়েছিলেন। আর পুরো ছাত্রসংঘ রূপান্তরিত হয়েছিল আলবদরে। মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন আলবদর প্রধান, মুজাহিদ উপ-প্রধান, কামারুজ্জামান ছিলেন শেরপুরের কমান্ডার। নয়াদিগন্ত পত্রিকার মালিক মীর কাসিম ছিলেন চট্টগ্রামের, কাদের মোল্লা ছিলেন মিরপুরের।
 সশস্ত্র আলবদররা রাজাকার, শান্তি কমিটি থেকেও ছিল বেশি সংগঠিত,অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ও বেশি হিংস্র। বস্তুত, যুদ্ধাপরাধী যতজন গ্রেফতার হয়েছেন তার মধ্যে মুজাহিদ ছিলেন সবচেয়ে হিংস্র। ১৯৭১ সালে তিনি বলেছিলেন- ‘পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘ পৃথিবীতে হিন্দুস্থানের কোন মানচিত্র স্বীকার করে না। ইসলামী ছাত্রসংঘ ও আলবদর বাহিনীর কাফেলা দিল্লীতে উপনীত না হওয়া পর্যন্ত ছাত্রসংঘের একটি কর্মীও বিশ্রাম গ্রহণ করবে না।
 এখন থেকে দেশের কোন পাঠাগার, গ্রন্থাগার, পুস্তক বিক্রয় কেন্দ্র বা দোকানে পাকিস্তানের আদর্শবিরোধী কোন পুস্তক রাখা চলিবে না। কোন স্থান, গ্রন্থাগার ও দোকানে পাকিস্তানের আদর্শ ও সংহতিবিরোধী পুস্তক দেখা গেলে তা আগুনে পোড়ানো হবে।’

আগে যে বলেছি, আলবদরের সর্বোচ্চ শাস্তিও যথেষ্ট নয় তার একটি কারণ আছে। একজন মানুষ আরেকজনকে খুন করতে পারে গুলি করে, ছুরিকাঘাত করে ও নানাভাবে। কিন্তু ঢাকার আলবদররা মুজাহিদের নির্দেশে সাত মসজিদ রোডের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে মানুষজনকে জড়ো করত এবং নানাবিধ অত্যাচার করত, তারপর হত্যা করত বিচিত্র সব উপায়ে। আজ অনেক তরুণ যখন জামায়াতের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে তখন বলতে ইচ্ছে হয় এদের পিতা-মাতাকে মুজাহিদদের হাতে তুলে দিলে কেমন হয়? বা বিএনপির যেসব তরুণ জামায়াতের তরুণদের সঙ্গে গলাগলি করে গাড়ি পোড়ায়, পুলিশ হত্যা করে তাদের বা তাদের পিতা-মাতাকে আলবদরদের হাতে তুলে দিলে বা তাদের হাতে মৃত্যু হলে তারা জামায়াত সমর্থন করত?

আলবদররা কী করেছিল? এ প্রশ্ন শুনে অনেকে বলতে পারেন সবাই যা জানে সে বিষয়ে প্রশ্নের তাৎপর্য কী? আলবদর পাকিস্তানীদের সাহায্য করেছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ব্যক্তিদের দমনে। এ কারণে, একদিকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলে গেরিলা/সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। অন্যদিকে, নিরীহ বাঙালিদের বাড়িঘর লুট করেছে, হত্যা করেছে ও ধর্ষণ করেছে। এথনিক ক্লিনজিংয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু, আলবদর আরেকটি কাজ করেছে। তা হলো, সুনির্দিষ্টভাবে বুদ্ধিজীবী/পেশাজীবীদের হত্যা করেছে। আলবদর বাহিনী গঠন হওয়ার পর থেকেই এ হত্যাকা- পরিচালিত হয়েছে, তবে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে অপহরণ ও হত্যাকা- তুঙ্গে ওঠে। সারা বাংলাদেশে একযোগে বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ ও হত্যা করা হয় পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে। অপহরণের পর নিষ্ঠুরভাবে অত্যাচার চালানো হয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, আলবদর হোক, রাজাকার হোক, মানুষ কি মানুষের ওপর এমন অত্যাচার করতে পারে? ১৯৭১-৭২ সালের দৈনিক পত্রপত্রিকাগুলো দেখলে আলবদরদের নিষ্ঠুরতার অনেক খবর জানা যাবে।
 রায়েরবাজার ও মিরপুরের বধ্যভূমি যা আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৬ ডিসেম্বর, আলবদরদের নৃশংসতার প্রতীক। দুয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক- ‘আর একটু এগিয়ে যেতেই সামনে বড় বড় দুটো মস্ত মানুষ, নাক কাটা, কান কাটা, মুখের কাছ থেকে কে যেন খামচিয়ে মাংস তুলে নিয়েছে হাত-পা বাঁধা।...’

 ‘আর একটু এগিয়ে যেতেই বাঁ হাতের যে মাটির ঢিবিটা ছিল তারই পাদদেশে একটি মেয়ের লাশ। মেয়েটির চোখ বাঁধা । মুখ ও নাকের কোন আকৃতি নেই, কে যেন অস্ত্র দিয়ে তা কেটে খামচিয়ে তুলে নিয়েছে। স্তনের একটি অংশ কাটা.. মেয়েটি সেলিনা পারভীন। শিলালিপির এডিটর।...
‘মাঠের পর মাঠ চলে গিয়েছে। প্রতিটি ফলার পাশে পাশে হাজার হাজার মাটির ঢিবির মধ্যস্থ কঙ্কাল সাক্ষ্য দিচ্ছে কত লোক যে এই মাঠে হত্যা করা হয়েছে।’

 ‘ঢাকার রায়েরবাজারের বধ্যভূমি দেখে এসে এই প্রতিবেদন লিখেছিলেন অধ্যাপিকা হামিদা রহমান। হামিদা রহমান ডা. ফজলে রাব্বীর লাশ দেখে লিখেছিলেন-‘ডা. রাব্বীর লাশটা তখনও তাজা, জল্লাদ বাহিনী বুকের ভিতর থেকে কলিজাটা তুলে নিয়েছে। তারা জানত যে, তিনি চিকিৎসক ছিলেন। তাই তাঁর হৃৎপি-টা ছিঁড়ে ফেলেছে। চোখ বাঁধা অবস্থায় কাত হয়ে দেহটা পড়ে আছে। পাড় থেকে ধাক্কা দিয়ে গর্তের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে। রাব্বী সাহেবের পা দুখানা তখনও জ্বলজ্বল করে তাজা মানুষের সাক্ষ্য দিচ্ছে। নাক, মুখ কিছুই অক্ষত ছিল না। দস্যু হায়েনার নখের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত।... সামনে চেয়ে দেখি, নিচু জলাভূমির ভিতর এক ভয়াবহ বীভৎস দৃশ্য। সেখানে এক নয়, দুই নয় একেবারে বারো/তেরোজন সুস্থ সবল মানুষ। একের পর এক শুয়ে আছে।’

মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ বলেছিলেন ‘হানাদার পাক বাহিনীর সহযোগী আলবদররা পাক সেনাদের আত্মসমর্পণের পর যখন পালিয়ে যায় তখন তাদের হেড কোয়ার্টারে পাওয়া গেল এক বস্তা বোঝাই চোখ। এ দেশের মানুষের চোখ। আলবদরের খুনীরা তাদের হত্যা করে চোখ তুলে বস্তা বোঝাই করে রেখেছিল।’ [দৈনিক পূর্বদেশ, ১৯.১.১৯৭২] উল্লেখ্য, ডা. আলীম চৌধুরীর চোখ আলবদররা উৎপাটন করেছিল।

মওলানা তর্কবাগীশ আরও বলেছিলেন, ‘খুনীদের নামে এই বাহিনীর নাম দেয়া হলো আলবদর বাহিনী। এ কি কোন মনঃপূত নাম? যে বদর যুদ্ধ ছিল আদর্শের জন্য, ইসলামের প্রথম লড়াই, সেই যুদ্ধের সঙ্গে কি কোন সংযোগ এই নৃশংসতার মধ্যে ছিল? হানাদারদের সহযোগী এই বদর বাহিনী শুধু ইসলামের শত্রু নয়। এরা হলো জালেম।’

 আলবদর কমান্ডার মুজাহিদের ফাঁসির রায় বহাল রেখেছে ট্রাইব্যুনাল। রায়ে এটি সর্বোচ্চ শাস্তি হলেও ৭১-এ তার অপরাধের পরিধি এতই ব্যাপক ছিল যে, কেবল ফাঁসিই তার জন্য যথেষ্ট নয়-সাংবাদিক আনিসুর রহমান শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি দেখে এসে বলেছিলেন- ‘ইতিহাসে পৈশাচিকভাবে হত্যার অনেক কাহিনী পড়েছি। কিন্তু শিয়ালবাড়িতে ওই পিশাচরা যা করেছে এমন নির্মমতার কথা কি কেউ পড়েছেন বা দেখেছেন? কসাইখানায় কসাইকে দেখেছি জীবজন্তুর গোস্তকে কিমা করে দিতে। আর শিয়ালবাড়িতে গিয়ে দেখলাম কিমা করা হয়েছে মানুষের হাড়। একটা মানুষকে দু’টুকরো করলেই যথেষ্ট পাশবিকতা হয়, কিন্তু তাকে কিমা করার মধ্যে কোন্ পাশবিকতার উল্লাস?

... সত্যি আমি যদি মানুষ না হতাম, আমার যদি চেতনা না থাকত, এর চেয়ে যদি হতাম কোন জড় পদার্থ তাহলে শিয়ালবাড়ির ওই বধ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে মানুষ নামধারী এই দ্বিপদ জন্তুদের সম্পর্কে এতটা নিচু ধারণা করতে পারতাম না। মানুষ যত নিচই হোক, তবুও ওদের সম্পর্কে যে সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধ ছিল তা একেবারেই উবে যেত না, আর মানুষ কেন, কোন প্রাণীই কি পারে এত নির্মম, এত বর্বর, এতটা বোধহীন হতে?... শেষ পর্যন্ত আর দেখতে চাই না বলে মাটি, ভুল বললাম মানুষের হাড়ের ওপর বসে পড়তে হয়েছে। সারা এলাকায় মানুষের হাড় ছাড়া অবিমিশ্র মাটি কোথায়?’
আমরা শিয়ালবাড়ির যে বিস্তীর্ণ বন-বাদাড়পূর্ণ এলাকা ঘুরেছি তার সর্বত্রই দেখেছি শুধু নরকঙ্কাল আর নরকঙ্কাল। পা বাঁচিয়েও হাড়হীন মাটির ওপর পা ফেলতে পারিনি। দেখেছি কুয়ায় কুয়ায় মানুষের হাড়।’ [দৈনিক পূর্বদেশ, ৮.১.১৯৭২]
আলী আকবর টাবী দৈনিক আজাদ উদ্ধৃত করে লিখেছেন, গ্রেফতারকৃত এক আলবদর স্বীকার করেছিল- ‘আর এক সপ্তাহ সময় পেলেই আলবদর বাহিনী সকল বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে ফেলত।’ 

'তুতো ভাই -তুতো বোন'- সুমি খান

'তুতো ভাই -তুতো বোন
 পিঠ চাপড়ানো,
ক্ষমতার পাছে পাছে
শুধু দৌড়ানো-
মুখোশটা সরালেই
আগে পরে 'তুতো'রা ই
লেন দেনে মদ -নারী-
নাচানাচি-বেশ !
বাহবা  বাহবা-
 বেশ বেশ বেশ!

খর্ব চিত্তে অর্থ বিত্তে
যতোই লুটোপোটি -
স্বচ্ছ চিত্তে ঘেন্না পিত্তে
 কেবল থুথু ছিটি!


দশদিক দেখিয়া বলি,
শোন পূণ্যবান
আবদেল মান্নানের কথা অমৃতসমান-
"সমান সমান না হলে কি লড়াই জমে আচ্ছা?
ও শুযোরের বাচ্চা!"

২৯ আগষ্ট ২০০৪
রাত ১১টা ১০ মিনিট