Friday, October 18, 2013

আমি কেন উপাচার্য হতে পারলাম না! - রাজীব মীর



ঢাকা: শীতের নরম রোদ । বান্দরবানের সবুজ পাহাড়ে লিকলিকে সাপের মত বয়ে চলা পথ। বন্ধুর সে পথে বগা লেকে অভিযাত্রা। সতেরো জনের পারিবারিক ট্যুরে আমিই একমাত্র বহিরাগত সদস্য। চাঁন্দের গাড়ি দু’টি। আমি যে গাড়িতে সেখানে একজনকে একা পিছনের সিটে বসতে হবে,বসলামও। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে গাড়ি স্টার্ট করার আগেই ড্রাইভারের পাশের সিট আমার সাথে শেয়ার করলেন তিনি,পাছে আমি বিপন্ন বোধ করি। ভালো লাগায় চোখে পানি চলে এসেছিলো । কী অদ্ভুত এবং সূক্ষ্ম তাঁর মনোদৃষ্টি। বগা লেকের সে ভ্রমণও ছিল কঠিন এবং দুর্গম। পথ চলতে চলতে পরিবারের মধ্যেও ছোট ছোট বিষয়ে একজন মানুষ কতটা গণতান্ত্রিক হতে পারেন, অবলোকন করে বিস্ময়াভিভূত হয়েছিলাম।পাহাড়ের চূড়া,নদীর তীর,সমুদ্রসৈকত, হাওড়ের নৌকায় তার গোটা পরিবারের সহযাত্রী হয়েছি বহুবার। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড.মো. আনোয়ার হোসেন। বছর কয়েক আগেকার কথা। তার সাথে তখনও আমার পরিচয় হয়নি। অথচ টিভিতে একদিন পুলিশ বেষ্টিত তার কঠিন কষ্টকর মুখাবয়ব দেখে রক্তকণিকাগুলো অস্থির হয়ে উঠেছিলো। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে সেনা সদস্যদের অপ্রীতিকর ঘটনার সময় তিনি ছাত্রদের পক্ষে বলিষ্ঠ অবস্থান নেয়ায় কারা নির্যাতনের শিকার হন। এ অবস্থান নেয়াটা অত্যন্ত দুঃসাহসিক কাজ ছিল নিঃসন্দেহে।

ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতন্ত্রপ্রেমি শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নিজের অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি আমাদের বুকের মাঝেও স্থান করে নিয়েছিলেন। সেই সময়ের অগণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন এবং সে যাত্রায় মূলত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা পুনঃ বেগবান হয়েছিলো। মনে পড়ে, গত বিএনপি শাসনামলে শামসুন্নাহার হলের ভেতর ছাত্রীদের উপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে রাস্তায় বিক্ষোভ প্রকাশকালে পুলিশ তাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছিলো।

এতো সেদিনের কথা। কিন্তু বাংলাদেশের উষালগ্নে মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় বীর সেনানী যার গোটা পরিবার, দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটি যে পরিবারের কাছে ঋণী, স্বাধীনতার সোনালী স্বপন যার হৃদয়ে অঙ্কিত, যার ভ্রাতা বুক উঁচু করে মৃত্যুকে পরাজিত করেছেন।বলেছেন,‘নিঃশঙ্ক চিত্তের চেয়ে বড় কিছু নেই,’।

দেশ নিয়ে লড়বার জন্য যার স্বার্থচিন্তা কাজ করেনি, দেশকে গড়বার জন্য যার লাভালাভের বাসনা জাগেনি– তারই বিরুদ্ধে আজ মহা অভিযোগ, ‘আপনি সরুন’। তার অসততা রয়েছে,পক্ষপাত রয়েছে, তিনি প্রতিশ্রুতি রাখেন না’- যারা এ অভিযোগ এনেছেন পদাধিকার বলে তারা অনেক সম্মানিত, যোগ্য, জ্ঞানী এবং সম-সম্প্রদায়েরই কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

দীর্ঘদিন থেকে তারা তাই এই ব্যক্তির উপাচার্য পদকে বিপদে ফেলতে গোষ্ঠীগত ভাবে আত্ননিয়োগ করেছেন, ঘেরাও,অবস্হান ইত্যাদির মাধ্যমে তাঁর দিনের রুটিন কাজ আর রাতের স্বাভাবিক ঘুম হারাম করে দিয়েছেন। কিন্তু যেখানকার কথা বলছি, সেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এর আগের উপাচার্যকেও একই অবস্হার মধ্যে পড়তে হয়েছিলো এবং সরে যেতে হয়েছিলো। তার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অভিযোগের কমতি ছিলো না। সারা বছর আন্দোলনের জন্য পরিচিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শীর্ষ এ পদ এবং অবস্থানের জন্য লাগসই ভেবে ড.শরীফ এনামুলের স্থলে প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এনে এখানে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো। কিন্তু ড. শরীফ এনামুল কবীরের মত সুর্নিদ্দিষ্ট কোন অভিযোগ ব্যতিরেকে পুনরায় এখানে কিছু শিক্ষক কর্তৃক উপাচার্য খেদাও আন্দোলন শুরু হলো।

অধ্যাপক আনোয়ারের আত্নসম্মানবোধ অত্যন্ত প্রখর, তিনি একদিন হুট করে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে বসলেন। ব্যস,আর যায় কোথা! জাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীরা তাকে দিনরাত আটকে রাখলো, ছাড়বে না। অভূতপূর্ব সে শিক্ষার্থীপ্রিয়তা ও অফিস অবরুদ্ধতা ।

সরকারের বিশেষ অনুরোধে অনেকক্ষণ গোঁ ধরে থাকবার পর অবশেষে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা থেকে সরে আসলেন, স্বচক্ষে দেখেছি।

অল্প কিছুদিন যেতেই আবার গতানুগতিক একই আন্দোলন,সম্মানিত শিক্ষকগণের। কিছু অভিযোগ আছে, তারা দাবি প্রকাশ করলেন। উপাচার্য অস্বীকার করলেন না, দেখবেন বলে কথা দিলেন, কিন্তু তারা সেটি মানতে নারাজ, মাননীয় উপাচার্যকে দেখে নেয়ার হুমকি দিলেন এই বলে যে, ‘উপাচার্য হটো’। উপাচার্যের বিপক্ষে অভিযোগসমূহ সত্য হতেও পারে এটা আমরা খালি চোখে ভাবছিলাম কিন্তু অভিযোগের প্রকৃতির সাথে উপাচার্যের পদত্যাগের অনমনীয় দাবি কেন যেন অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হলো এবং উপাচার্য মহোদয়ের একটা জাতীয় দৈনিকের কলাম তা আরও স্পষ্ট করলো যে ‘ডাল মে কুচ কালা হে!’

ওখানকার শিক্ষকগণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোন শিক্ষককে তাদের মাথার উপর চাইবেন না, এটা তাদের অহংবোধে লাগে যে, হয়তো তারা বাইরে অযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছেন। লাগতে পারে, মেনে নিচ্ছি । কিন্তু সেটা তো অধ্যাপক আনোয়ারের সীমাবদ্ধতা বা দোষ নয়। সরকার তাকে একটি বিশেষ পরিস্থিতির বিষয় বিবেচনা করে সেখানে যেতে অনুরোধ করেছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের ধারাবাহিক ঐতিহ্যগত সংস্কৃতিকে সঙ্গ দেয়ার ক্ষমতাসমপন্ন প্রখর প্রগতিশীল এবং অত্যন্ত যোগ্য একজন সংবেদনশীল শিক্ষককে সেখানে নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো। ওখানকার শিক্ষকগণ অনেকেই উপাচার্য পদলোভী হবেন, এটা স্বাভাবিক। সে যোগ্যতা তাদের কারও কারও নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সৃজনশীলতাও থাকতে হবে তো, সেটা তাদের আন্দোলনে নেই, প্রকাশেও নেই; বড় একঘেয়ে মনে হচ্ছে। বরং উপাচার্য সেক্ষেত্রে অনেক সৃজনশীল, সস্ত্রীক মাদুর পেতে বসে গেছেন পাল্টা আন্দোলনে।

এর আগে তার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের লাগানো পদত্যাগের দাবি সম্বলিত ব্যানার বাতাসে ছিঁড়ে নিচে পড়ার পর তারা স্বামী-স্ত্রী নিজেরাই যথাস্থানে টানিয়ে দিয়েছেন, ভাবা যায়!

চলতি সংবাদ এই যে, উভয়পক্ষ মুখোমুখি বসে আছেন,সমাধান নাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ পড়াশুনা, সেটি এখন বন্ধ। চলছে, শিক্ষকদের আন্দোলন। তারা শুধু পদত্যাগ চান, কোনও ক্লাস কিংবা পরীক্ষা নয়। কিন্তু অবাক বিষয় হলো আন্দোলন বলতে সেখানে যাদেরকে বোঝানো হয়, সেই আনু মুহাম্মদ, মানস চৌধুরী, নাসিম আকতার হোসাইন কেউই এ উপাচার্য বিরোধী আন্দোলনে নেই। তারা এ আন্দোলনকে যৌক্তিক ভাবছেন না ,সম্পৃক্তও হচ্ছেন না !

আমি নিজে অধ্যাপক আনোয়ারের সাথে পরিচিত হই আশৈশব কৌতূহল বশে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যার একবার এক্সটারনাল মেম্বার হিসেবে গেলেন। প্রাণ রসায়নের সেই সময়ের চেয়ারপার্সন জনাব মু. গোলাম কবীর আমাকে এ দুর্লভ ব্যক্তির সাথে পরিচয়ের সুযোগ করে দেন । বিজ্ঞানের শিক্ষক হলেও আমার দু’একটি কবিতা তার মনে ধরে এবং ক্রমে আমি তার পরিবারের আপনজন হয়ে উঠি। ভরা পূর্ণিমায় আমার ডাক পড়ে,একসাথে পূর্ণিমা দেখি,গান গাই,গান শুনি।

বিশেষ কোন ভালো লাগার দিনে বাঁশিওয়ালা আসে, বাঁশি বাজে। গোটা পরিবার একসাথে উপভোগ করে। তাদের পারিবারিক বন্ধন তো অন্য রকম। ভাইবোনদের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক ঈর্ষণীয় রকমের ভালো। স্বামী-স্ত্রী দু’জনই তারা ভীষণ রোমান্টিক, অকল্পনীয়। বিজ্ঞানের কঠিন বিষয়ে যার অগাধ দখল, তার মুখে কবিতা,গান, চিত্রকলার দারুণ সব অভিব্যক্তি। সুন্দর বাচনভঙ্গি, স্পষ্ট উচ্চারণ আর তার দৃঢ় বাক্যপ্রয়োগ শুনে মন্ত্রমোহিত হতে হয়। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চে তার ভাষণ ছিলো অতুলনীয়, অত্যন্ত উদ্দীপক। সাদাসিধে জীবনে অভ্যস্ত সরল হাসিখুশি এ প্রাণবান মানুষ আজ সম্মানাক্রান্ত। একা লড়ছেন। বাংলার বীর কর্ণেল তাহেরকে যখন ফাঁসির দড়িতে ঝুলানো হয়, তখনও তিনি জেলের ভিতর একা দাঁড়িয়েছিলেন। আজও।

কিন্তু স্বাধীন দেশে এটা তো হওয়ার কথা নয়। শরীফ এনামূল কবীর, আনোয়ার…এর পরে কে? যারা আন্দোলন করছেন, তারা কি ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শী শিক্ষককে উপাচার্য হিসেবে চাচ্ছেন? যদি না চান তবে তাদের আন্দোলন কি দল নিরপেক্ষ উপাচার্য চেয়ে? তাদের দাবির সারাৎসার কিন্তু অস্পষ্ট। ইতিহাস তো বলে বাংলাদেশের সব সঙ্কটে অধ্যাপক আনোয়ার মিছিলের সর্বাগ্রে ছিলেন,কখনও পিছপা হননি। দেশের জন্য পারিবারিক আত্মত্যাগের দৃষ্টান্তেই বা তার মত আর কয়জনের আছে? উপাচার্য ভুল করতে পারেন না,করেননি বা করছেন না,এটা বলছি না। বলছি ত্যাগের ইতিহাস তো তার রক্তে, সেখানে যদি ছোট কোন ভুল থেকেও থাকে, প্রতিবাদ হবে না কেন ,অবশ্যই হবে। কিন্তু তাই বলে একবারে সরে যেতে হবে, এ দাবি খুব একটা জনগ্রহণযোগ্য হচ্ছে কি? কে আসবেন ওনার জায়গায়! ইতিহাসের আত্মত্যাগীকেই মেনে নিচ্ছেন না! কাকে মানবেন, কার আত্মত্যাগ তার সাথে তুলনীয়? যদি যোগ্যতার কথা আসে, অধ্যাপক আনোয়ারের সমান যোগ্য হয়তো কেউ থাকতে পারেন,আত্মত্যাগী কয়জন আছেন? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত উপাচার্যের বন্ধ্যাত্বের সংস্কৃতির অবসানও তো তারই অবদান! তিনিই তো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সময়ের প্রথম নির্বাচিত উপাচার্য। আমরা কি সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিনের মত কাউকে চাচ্ছি, যিনি দেশ তো দূরের কথা, নিজের সমর্থিত দলের জন্যও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন? নাকি এটা নিখাদ মন খারাপের আন্দোলন,আমি কেন উপাচার্য হতে পারলাম না! উপাচার্য হিসেবে উনি থাকবেন অথবা থাকতে পারবেন কি না জানি না, কিন্তু পদত্যাগের দাবির বিরুদ্ধে ওনার অবিচল অবস্থান তার দীর্ঘ সংগ্রামী সত্যের কথাই শুধু জানান দেয়। পালিয়ে আসা কোন বিপ্লবীর কাজ হতে পারে না, উনি এটা করবেনও না- আমি নিশ্চিত। উপাচার্য পদ ছেড়ে দিলেই উনি সম্মানিত আর ধরে রাখলে এটা উনাকে ছোট করবে, উচ্চতার পরিধি এভাবে অনুধাবনযোগ্য নয়।

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের দেশ,বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধার দেশ। অতএব, মুক্তিযোদ্ধা ড. আনোয়ার হোসেন আপনাকে বলছি, লড়াই করা আপনার ঐতিহাসিক দায়িত্ব, স্যার! দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল সচেতন শিক্ষার্থী ও অগণিত মানুষের জন্য অতীতের মত এখনও সত্যের হাল ধরে রাখুন, ছাড়বেন না! প্লিজ।
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

Sunday, October 13, 2013

ষড়যন্ত্রের রাজনীতির থলের বেড়ালটি বেরিয়ে আসছে - আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী



প্রবীণ এক বাম নেতার এই সাক্ষাতকারটি প্রথমে আমার চোখে পড়েনি। কোন প্রতিষ্ঠিত জাতীয় দৈনিকে সাক্ষাতকারটি বেরোয়নি। একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকে বেরিয়েছে, যেটি সচরাচর আমার চোখে পড়ে না। বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে শুনে সাক্ষাতকারটি পড়লাম। দৈনিকটির ৫ অক্টোবরের সংখ্যায় তা বেরিয়েছে। ছোট সাক্ষাতকার। তবু আমার জন্য খুবই আগ্রহোদ্দীপক। কারণ, তিনি আমার কলেজ জীবনের খুবই প্রিয় শিক্ষক। পরবর্তীকালে তিনি হন দেশের এক সময়ের বৃহত্তম বাম গণতান্ত্রিক সংগঠন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। এখন বিরানব্বই বছর বয়স। তাঁকে এখন বলা চলে আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির পিতামহ। তাঁকে আমি খুবই শ্রদ্ধা করি।
ন্যাপের সেই সুদিন এখন আর নেই। অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ এখনও দলের সভাপতি আছেন বটে, বয়সাধিক্যে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তবু এই বয়সেও তিনি তাঁর চিন্তা-চেতনা ও পরামর্শ দ্বারা দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করছেন। তাঁর কথা কেউ শুনছে কী শুনছে না, তার পরোয়া করছেন না। তিনি এখনও আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি বাতিঘর। ৫ অক্টোবর ঢাকার বহুল প্রচারিত দৈনিকটিতে আলাপচারিতা বিভাগে প্রকাশিত তাঁর দেয়া সাক্ষাতকারটিতেও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা সম্পর্কে তাঁর প্রকৃত সচেতনতার পরিচয় পাওয়া যায়। এ জন্যই সাক্ষাতকারটি আমি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে পড়েছি।
এই সাক্ষাতকারটি পড়তে গিয়ে আমি এমন একটি তথ্যের মুখোমুখি হয়েছি, যা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের মতো নব্বই-উর্ধ প্রবীণ রাজনৈতিক নেতার মুখ থেকে বের না হলে আমার পক্ষেও বিশ্বাস করা সহজ হতো না। এ কথা অস্বীকার করব না, আমি ড. কামাল হোসেন ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কঠোর সমালোচক। বিশেষ করে ড. কামাল হোসেনের। কারণ, তিনি এক সময় বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুই তাঁকে হাত ধরে টেনে এনে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেন। পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে তিনি বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার রাজনীতির অবশ্যই সমালোচনা, এমনকি বিরোধিতাও করতে পারেন। কিন্তু হাসিনার প্রতি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিদ্বেষে অন্ধ হয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শবিরোধী চক্রান্তের শিবিরে গিয়ে সরাসরি যোগ দিতে পারেন, এটা আমার কাছেও ছিল অকল্পনীয়।
ঢাকার দৈনিকটির ৫ অক্টোবরের সংখ্যায় প্রকাশিত ‘আলাপচারিতায়’ দেশের বয়োবৃদ্ধ প্রবীণতম নেতা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেছেন, ‘আমি যে রাজনীতি করি, তা ষড়যন্ত্রের রাজনীতি নয়। এটি সরল রাজনীতি। আমি ষড়যন্ত্রের মধ্যে নেই। ড. কামাল হোসেন এসেছিলেন আমার কাছে জাতীয় সরকারের রূপরেখা নিয়ে। আমার কাছে দোয়া চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি ষড়যন্ত্রের রাজনীতির মধ্যে নেই। আমি রাজি হইনি। আমার রাজনীতির অর্থ হচ্ছে সত্য কথা বলা, সড়ক দিয়ে হাঁটা এবং ডাল দিয়ে খাবার খাওয়া। ড. কামাল হোসেন ও নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের প্রধান হিসেবে কাজ করতে ইচ্ছুক। সে কারণে তাঁরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করছেন।’
অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের ‘আলাপচারিতায়’ এই বক্তব্যটি দেশের অনেক মানুষের কাছে ড. কামাল ও ড. ইউনূস জুটির বর্তমান কার্যকলাপ ও আচার-আচরণের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে দেবে। আমি নিজেও দীর্ঘদিন যাবত এই জুটির কার্যকলাপ ও বক্তৃতা-বিবৃতির সমালোচনা করলেও সবসময় ভেবেছি, এরা শেখ হাসিনার প্রতি প্রচ- বিরাগবশত দেশের গণতান্ত্রিক শিবিরের যে ক্ষতি করছেন, তা হয়ত নিজেরাও উপলব্ধি করছেন না। কিন্তু তাঁরা যে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থের কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত গোঁ চরিতার্থ করার জন্য সরাসরি ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে যোগ দিতে এবং এতটা নিচে নেমে যেতে পারেন, তা কল্পনাও করিনি। আওয়ামী লীগ রাজনীতির একটা বড় দুর্ভাগ্য, এই রাজনীতিতে এক মোশতাকের তিরোভাব না ঘটতেই আরেক মোশতাকের আবির্ভাব হয়।
একটি তথাকথিত ‘জাতীয় সরকারের রূপরেখা’ পকেটে নিয়ে ড. কামাল হোসেন দেশে যা করে বেড়াচ্ছেন, তা যে ‘ষড়যন্ত্রের রাজনীতি’ এটা বুঝতে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের মতো রাজনীতির বটবৃক্ষের কিছুমাত্র অসুবিধা হয়নি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ড. কামাল হোসেনকে বলে দিয়েছেন, ‘আমি ষড়যন্ত্রের মধ্যে নেই’ এবং তাদের ষড়যন্ত্রে দোয়া (সমর্থন) দিতেও রাজি নন। শুধু অধ্যাপক মোজাফ্ফর নন, ড. কামাল হোসেন নাকি তাঁর জাতীয় সরকারের রূপরেখা (যে সরকারে তিনি কিংবা ড. ইউনূস প্রধান হবেন) নিয়ে দেশের আরও কয়েকটি ডান এবং বাম গণতান্ত্রিক দলের নেতার দরজায় গিয়ে দোয়া লাভের জন্য ধর্ণা দিয়েছিলেন। তাঁরা সকলেই একবাক্যে না বলে দিয়েছেন।
শেষপর্যন্ত তিনি সম্ভবতঃ তাঁরই মতো জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত কয়েকজন নেতাকে তাঁর বিতর্কিত রাজনীতিতে সঙ্গী করতে পেরেছেন। এরা হলেন ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কাদের সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না প্রমুখ। এদের অধিকাংশই সচরাচর নির্বাচনে জেতেন না। কারও কারও জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। ড. কামাল হোসেনকে বঙ্গবন্ধু একবার বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদে জিতিয়ে এনেছিলেন। তারপর আর কোনও নির্বাচনে জেতেননি। শেখ হাসিনা তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে দাঁড় করিয়েছিলেন। সেখানেও বিএনপির বিচারপতি সাত্তারের কাছে হেরেছেন। গত নির্বাচনে তাঁর গণফোরামের প্রার্থীদের কারও জামানত রক্ষা পায়নি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের রেকর্ড তো অনুরূপ উজ্জ্বল। তেজারতিতে তিনি দক্ষ। তবুও রাজনীতিতে ঢোকার খুব শখ। কিন্তু রাজনৈতিক মূলধন কিছুই নেই। ছাত্রজীবন থেকে বাংলাদেশের কোনও রাজনৈতিক আন্দোলনের ত্রিসীমানায় তিনি ছিলেন না। গরিবের নামে ব্যবসা করে নিজে বিরাট ধনী হয়েছেন। গরিবের বাড়িতে ভুলেও যান না। তাঁর জেট সেট লাইফ। রাজারাজরাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ান। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের তিনি বিশ্বস্ত অনুচর।
ফলে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের প্রভুরা তাঁকে খুশি হয়ে অর্ধেক নোবেল পুরস্কার দিয়েছে এবং এখনও বড় বড় পুরস্কার দিচ্ছে। অর্ধেক নোবেলজয়ী হওয়ার পর আনন্দের এভারেস্ট চূড়ায় উঠে ওই নোবেল পুরস্কারকে মূলধন করে তিনি নূতন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দেন। এই দল গঠনের এক মাসের মধ্যে তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর দল শেষপর্যন্ত ‘কাকতাড়ুয়ার দল’ হয়ে দাঁড়াবে। তিনি রাজনীতি করার আগেই জনগণ কর্র্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে রাজনীতি ছাড়েন।
রাজনীতির সদর দরজা দিয়ে যাঁরা ক্ষমতায় যেতে পারেন না, তাঁরা পেছনের দরজা দিয়ে সেই ক্ষমতায় যেতে চাইবেন, তা আর এমন কী বিস্ময়ের ব্যাপার। তবে কামাল হোসেনদের ক্ষেত্রে বিস্ময়ের কথা এই যে, তাঁরা গণতন্ত্র, সুশাসন, স্বচ্ছ রাজনীতি এ সবের কথা বড় বেশি বলেন। গণতন্ত্র, সুশাসন ও স্বচ্ছ রাজনীতির পথ তো হচ্ছে জনগণের কাছে যাওয়া, স্বচ্ছ, বাস্তব ও সুস্থ কর্মসূচীর মাধ্যমে তাদের কাছে ক্ষমতায় যাওয়ার ম্যান্ডেট চাওয়া। সে জন্যে নির্বাচনে যাওয়া।
ড. কামাল হোসেনরা গণতন্ত্রের এই সদর দরজা দিয়ে না হেঁটে কেন পেছনের দরজা খুঁজছেন এবং তথাকথিত জাতীয় সরকারের একটি রূপরেখা (যেটি আসলে ষড়যন্ত্রের নীলনক্সা) পকেটে নিয়ে একশ্রেণীর প্রবীণ-নবীন রাজনীতিক নেতার বাড়িতে ধর্ণা দিয়ে তাদের দোয়া চেয়ে বেড়াচ্ছেন? জনগণ কর্তৃক বার বার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরই জাতীয় সরকার নামক একটি অনির্বাচিত সরকার গঠন দ্বারা পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার ভূতটি ড. কামাল হোসেনদের মাথায় চেপেছে।
মজার ব্যাপার এই যে, মাত্র গত ২৩ সেপ্টেম্বর (সোমবার) বরিশালে এক জনসভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘...এবার দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করে ছাড়ব।’ এটা খুবই ভাল কথা। দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করে যদি কামাল হোসেন সাহেবরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করতে পারেন, তাহলে তো বলব, তাঁরা গণতন্ত্রের পথেই হাঁটছেন। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও জাতীয় সরকার তো এক কথা নয়।
ড. কামাল হোসেনরা কোনটি চান? যদি সত্যিই তাঁরা বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সমর্থন করেন, তাহলে এই দাবি আদায়ের জন্য বিএনপি চলতি মাসেই যে আন্দোলন শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে, সে আন্দোলনে যোগ দিন। তা না করে পর্দার আড়ালে আবার জাতীয় সরকারের খেলা খেলছেন কেন? জনগণের কাছে না গিয়ে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের মতো প্রবীণ নেতাদের দরজায় গিয়ে গোপন ধর্ণা দিচ্ছেন কেন? আবার জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করে নিজে কিংবা ড. ইউনূসের সেই অনির্বাচিত জাতীয় সরকারের প্রধান হওয়ার আগাম ইচ্ছা ব্যক্ত করছেন কেন?
ড. কামাল হোসেন ও ড. ইউনূসের জুটির নেতৃত্বে চালিত তথাকথিত সুশীল সমাজের মনস্তত্ত্বটা বুঝতে কারোই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। জনগণের আস্থা তাদের ওপর নেই, জনগণ কখনই তাদের ভোট দেবে না এবং নির্বাচন এলে যত খারাপ বা মন্দ হোক আওয়ামী লীগ বা বিএনপিকেই তারা ভোট দেবে। দেশের মানুষ এই দল দুটিকে বোঝে। এই দুই দলের নেতারা যত অপরিশীলিত ভাষায় বক্তৃতা দেন, তার অর্থ তারা বোঝে। আর ড. কামাল হোসেন বা ড. ইউনূস সাহেবরা গণতন্ত্রের অভিধান থেকে যে সব ভাল ভাল কথা বেছে নিয়ে জনগণের নাগালের বাইরের এভারেস্ট চূড়া থেকে কথা বলেন, তার অর্থ তারা বোঝে না। সে সব কথায় আস্থা স্থাপনও করে না।
অনির্বাচিত জাতীয় সরকার গঠন ড. কামাল হোসেনের বহুদিনের একটি পেট থিয়োরি। বার বার নির্বাচনে দাঁড়িয়ে হেরে গিয়ে এবং জনগণকর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে প্রবল রাজনৈতিক হতাশা থেকে সম্ভবতঃ তাঁর মনে এই থিয়োরিটির জন্ম। বহুকাল আগে তিনি তাঁর ‘সুশীল সমাজ’ দ্বারা এই থিয়োরিটি একবার জনসমক্ষে এনেছিলেন। দেশের মানুষ এই গণঅধিকার বর্জিত সরকারের থিয়োরি গ্রহণ করেনি। তখন এক বাম রাজনীতিক প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, ‘গু মড়াবৎহসবহঃ, মড়ড়ফ ড়ৎ নধফ, রং নবঃঃবৎ ঃযধহ ঁহবষবপঃবফ মড়ড়ফ মড়াবৎহসবহঃ’ (আমার সরকার, ভালোমন্দ যা-ই হোক, অনির্বাচিত ভালো সরকারের চাইতে ভালো)।
নিজের পছন্দের, নিজের ভোটাধিকার দ্বারা গঠিত সরকার মন্দ হলেও জনগণ সেই সরকারই চায়। অন্যের পছন্দের এবং অন্যদের ইচ্ছায় গঠিত সরকার ভালো হলেও জনগণ তা পছন্দ করে না। এটা গণতন্ত্রের ইতিহাসের আদি সত্য।
ড. কামাল হোসেনদের অনেক বিদ্যাবুদ্ধি। কিন্তু এই সত্যটা তাঁরা বোঝেন না। আর বোঝেন না বলে জনগণের কাছে পৌঁছতেও পারেন না। এদিকে, ক্ষমতায় যাওয়ার অদম্য লিপ্সা তাদের তাড়িত করে বেড়ায়। তখন ক্ষমতার লোভে বিদেশী সাহায্য ও সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে গিয়ে তাঁরা দেশ এবং গণতন্ত্রের সমূহ সর্বনাশ করেন। আমার আশঙ্কা, ড. কামাল হোসেনদের বর্তমান ষড়যন্ত্রের রাজনীতি দেশের জন্য এক অকল্যাণকর পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে।
ঢাকার বহুল প্রচারিত দৈনিকটিতে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের আলাপচারিতার বক্তব্য পাঠের আগেই আমার এক লেখায় ড. কামাল হোসেন ও ড. ইউনূসের বর্তমান কার্যকলাপ সম্পর্কে আমার সন্দেহের কথা প্রকাশ করেছিলাম। লিখেছিলাম, বাংলাদেশে কারজাই অথবা জারদারি মার্কা একটি সরকার অনির্বাচিত জাতীয় সরকার হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার জন্য যে তৎপরতা চলছে, সেটি সফল করার লক্ষ্যে এই সুশীল চক্রের এক নেতা ইউরোপ-আমেরিকার রাষ্ট্র নেতাদের দরবারে তাদের সাহায্য ও সমর্থনের আশায় ধর্ণা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। অন্যদিকে, অন্য নেতা দেশের ভেতরে সেই জাতীয় সরকারের নীলনক্সায় রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বাইরে তাঁরা দেখাচ্ছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ে সমর্থন দানের জন্যই দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা করছেন।
এরা হয়ত ভাবতে পারেননি, দেশের বাম রাজনীতির এক বটবৃক্ষ নেতা এমন সোজা সরল ভাষায় তাদের গোপন তৎপরতার কথা ফাঁস করে দেবেন এবং তাকে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি আখ্যা দেবেন। ড. কামাল হোসেন জানেন কিনা জানি না, তিনি রাজনীতির রেসের মাঠে পরাজিত ও প্রত্যাখ্যাত ঘোড়ায় পরিণত হয়েছেন। বিদেশীরা তাঁকে নিয়ে খেলতে পারে, কিন্তু ক্ষমতায় বসাবে না। তিনি এখন তাদের বাতিল ও ব্যর্থ নেতাদের তালিকায় আছেন। তিনি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী থেকে কাদের সিদ্দিকী পর্যন্ত যাদের সঙ্গে জুটিয়েছেন তাঁরাও এই তালিকাভুক্ত নেতা। এই দলে নতুন মুখ ড. ইউনূসের। কিন্তু মাটিতে তাঁর পা নেই। তিনি শাখামৃগের মতন। শাখামৃগের ওপর কেউ নির্ভর করে না। তাকে কলা দেখিয়ে ব্যবহার করে মাত্র।

লন্ডন, ৮ অক্টোবর, মঙ্গলবার, ২০১৩

Monday, October 7, 2013

হেফাজতি জঙ্গী সংগঠক মুফতি ইজাহারের গ্রেনেড :টার্গেট প্রধানমন্ত্রী? -সুমি খান


১২ অক্টোবর চট্টগ্রাম সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২১ আগষ্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনা সহ ৪৮ বার তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে এ দেশে। এর পর ও প্রশাসনের জঙ্গী প্রীতি দেখে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না।
চট্টগ্রামের লালখানবাজারে হেফাজতের নায়েবে আমির,জমিয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল এবং নেজামে ইসলামী পার্টির সভাপতি মুফতি ইজাহারের জমিয়াতুল উলুম আল মাদ্রাসায় সোমবার সকাল পৌনে ১১টার দিকে বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত একজন রাতে মারা গেছে। একজনের হাতের পাঁচটি আঙ্গুল উড়ে গেছে। মাদ্রাসার ওই কক্ষটি থেকে তিনটি তাজা গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়েছে।
রাতে তাকে তার পুত্র হারুণ ইজাহার সহ পালাতে সহায়তা করার পর থানায় মামলা করা হলো, তল্লাশী করা হলো তার কক্ষ। ১১ বোতল এসিড সহ বেশকিছু বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর পর ও মুফতি ইজাহার ও তার ছেলে বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে ‘আইপিএস’ ‘ ইউপিএস’ বিস্ফোরণ সহ নানান গল্প ফেঁদে বসলেন! পুলিশ ও নীরবে মেনে নিলেন সব! এমন অথর্ব পুলিশ কর্তাদের পুষছে কেন প্রশাসন- সেটা একটা প্রশ্ন বটে। প্রশ্ন উঠে চট্টগ্রামের পুলিশ প্রশাসন কি জঙ্গী ইজাহারের কেনা ? এতোবড়ো গ্রেনেড বিষ্ফোরণের ঘটনার পর কেন তাকে সারাদিন আগলে আগলে রাখা হলো?
জঙ্গীবাদী হেফাজত নেতা মুফতি ইজাহার ‘তালেবান আফগানিস্তানের জান্নাত দেখে এলাম’শীর্ষক প্রবন্ধে ১৯৯৮ সালের অক্টোবর-নবেম্বর সংখ্যা ‘মাসিক দাওয়াত’ নামের ইসলামী পত্রিকায় নিজেই এক সময় আফগানিস্তানে তালেবানদের সঙ্গে কাজ করার কথা লিখেছিলেন । নিজেই গর্বের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন আফগানিস্তান সফর ও মোল্লা ওমরের সঙ্গে যোগাযোগের বিস্তারিত গল্প। র্যা ব সদর দপ্তরে ইজাহার কে আটক করে আনার পর জঙ্গী তৎপরতায় নেতৃত্বের স্বীকারোক্তি দিয়েছেন ইজাহার। তবু কোথায় প্রশাসনের অসহায়ত্ব? কার কাছে?
জঙ্গী তৎপরতার অভিযোগে কয়েকবার গ্রেফতার হয়েছেন মুফতি ইজাহার। রাউজানের একটি গোপন আস্তানায় জঙ্গী প্রশিক্ষণের অভিযোগে ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে তাকে সর্বশেষ গ্রেফতার করে টিএফআই সেলে জিজ্ঞাসাবাদ করে র্যা ব। র্যাসবের তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় চট্টগ্রামের রাউজান থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইন মামলায় মুফতি ইজাহারসহ হুজির আট প্রশিক্ষকের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশীট দেয়া হয়। আদালতে মামলার নথিতে তদন্ত কর্মকর্তা তখন উল্লেখ করেছিলেন, দেশে নাশকতামূলক কর্মকা- চালাতে হুজির প্রশিক্ষকের সহযোগিতা ও মদদ দিয়ে নগরীর লালখানবাজার আল জামেয়াতুল ইসলামিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল এবং নেজামে ইসলামী পার্টির সভাপতি মুফতি ইজহার রাউজানে দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিচালনা করছে। হুজির সদস্যদের এ ক্যাম্পে রাতের আঁধারে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ২০১০ সালের ১৩ ডিসেম্বর রাউজান গোদারপাড় পাহাড়ী এলাকা থেকে হুজির পাঁচ প্রশিক্ষককে গ্রেফতার করা হলে পরদিন সংবাদ সম্মেলন করে তাদের নির্দোষ দাবি করে মুক্তির দাবি জানান মুফতি ইজাহার। ওই দিনই লালখানবাজার মাদ্রাসা থেকে মুফতি ইজাহারকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে ঢাকায় র্যা বের ইন্টারোগেশন সেলে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আফগানিস্তানে তৎকালীন শাসক মোল্লা ওমরসহ তালেবানি নেতা ও ২১ আগষ্টের গ্রেনেড হামলার মুল আসামী মুফতি হান্নানের সঙ্গে তার যোগাযোগ থাকার কথা স্বীকার করেন। আফগানিস্তানে মোল্লা ওমরের সঙ্গে তার সাক্ষাত হওয়ার কথা জানান জিজ্ঞাসাবাদে। ঘটনাস্থলে তখন মুফতি ইজাহারসহ গ্রেফতার হওয়া হুজির প্রশিক্ষকরা বিস্ফোরক তৈরি ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কিছু প্রশিক্ষকের মাধ্যমে নিষিদ্ধ হুজির সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর প্রমাণও মেলে। এসবের ধারাবাহিকতায় সোমবারের বিষ্ফোরণের ঘটনা প্রমাণ করে আত্মঘাতী জঙ্গী সদস্যদের প্রশিক্ষিত করা হচ্ছিল বোমা তৈরির মাধ্যমে। এছাড়া মুফতি ইজহারের আরেক ছেলে মুসা বিন ইজহারও জঙ্গী সম্পৃক্ততার অভিযোগে আটক হয়েছিলেন।
এসব নিয়ে ১৯৯৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেছি, অনেক লেখা লিখি করেছি। বারবার প্রশাসন তাকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে – কিন্তু কেন? কার বা কিসের প্রভাবে? সারা জাতিকে এদের জঙ্গীবাদ আর বোমাবাজের হুমকির মুখে ঠেলে বিপন্ন করবেন ই যদি, পুলিশ প্রশাসনের কি দরকার? সোমবারের এই ভয়ংকর ঘটনার পর ও বালিতে মুখ গুঁজে আছে প্রশাসন । এর ভয়াবহ পরিণতি ঠেকাতে পারবেন তো তারা?

চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী তার জনসভায় অনেক বার বলেছেন, লালখানবাজারে উগ্রবাদী এ নেতার মাদ্রাসায় জঙ্গী প্রশিক্ষণ হয়। যেখান থেকে ২০ হাজার লোক আফগানিস্তান যুদ্ধে গেছে। ফিরে আসে ১০ হাজার। ইসলামী দলগুলোর পক্ষ থেকে ও তথ্য প্রমাণ নিয়ে একই অভিযোগ বহুবার তোলা হয়েছে। দু’একবার আটক হওয়া ছাড়া অপরাধের শাস্তির কোন উদাহরণ দেখেনি সাধারণ মানুষ।
কেবল আলোচনা নয় এবার পুরোপুরি ফেঁসে গেছেন উগ্রবাদী নেতা ও তার বিতর্কিত সেই মাদ্রাসা। যেখানে বিস্ফোরণে পাঁচ ছাত্রের গুরুতর আহত , পরবর্তীতে একজনের মৃত্যু ও গ্রেনেড উদ্ধারের ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। জেগে জেগে যেন ঘুমের ভান করছেন পুলিশ প্রশাসন।
অবিলম্বে ইজাহারসহ জঙ্গী নেতাদের আটক করে হেফাজতীদের মাদ্রাসায় অভিযান শুরুর দাবি তুলেছে ইসলামী দল ও সংগঠনগুলো। বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও বিস্ফোরক দলের তদন্তে বেরিয়ে পড়েছে আলামত। বিস্ফোরক দ্রব্যের কারণেই ওই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। আগামী ১২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামে সফর করবেন। এর আগে মাদ্রাসায় এ ধরনের বিস্ফোরক পাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করেছে জঙ্গীরা তাদের হত্যাযজ্ঞ সফলে তৎপর।মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে বিস্ফোরণস্থল পরীক্ষা করে পুলিশ জানিয়েছে, সেখানে বিস্ফোরকের ‘বড় ধরনের মজুদ’ ছিল। চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছেন, বিস্ফোরণ ঘটার পর দমকল বাহিনী আগুন নিভিয়েছে। ছাইয়ের নিচে বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরক পাওয়া গেছে। তিনি নিশ্চিত হয়ে বললেন সেখানে বিস্ফোরক দ্রব্যের বড় ধরনের মজুদ ছিল। হাতে তৈরি শক্তিশালী কিছু গ্রেনেড আছে, যা বেশ বিপজ্জনক স্বীকার করে তিনি সাংবাদিক দের চাপ এড়াতে বললেন, “সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে”।


মুফতি ইজহার ও তার দুই ছেলের বিরুদ্ধে জঙ্গী কর্মকান্ডের অভিযোগ সবার জানা। তবু ১২ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার বিকালে চট্টগ্রামের হেফাজতি ইসলাম নিয়ন্ত্রিত মাদ্রাসা সফরকরেন অস্ট্রেলিয়া দূতাবাসের ডেপুটি হাইকমিশনার টিম বলটনিকফ। ২০০৯ সালে মার্কিন দুতাবাসে হামলা করার প্রস্তুতিকালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আটককরেছিলেন ইজাহার। তবু বিদেশী দূতাবাসের প্রতিনিধি রা বিভিন্ন সময়ে সফর করেছে এই মাদ্রাসা।নেজামে ইসলামী পার্টির এই দুই সংগঠক ১৮ দলেরও নেতা। এ কারণেই হয়তো তাদের তোয়াজ করে চলে সবাই। যে কারণে দিনে দিনে এদের অপতৎপরতা বেড়েই চলেছে, যা আমাদের দেশের জন্যেই শুধু নয়, দক্ষিণ এশিয়া সহ সারা বিশ্বের জন্যেই উদ্বেগজনক।
হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা জঙ্গীবাদের দায়ে অভিযুক্ত মুফতি ইজহারের মাধ্যমে সম্প্রতি নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন হরকত-উল-জিহাদের মাঠে নামার খবর প্রকাশ হয়। ইজাহারের মাধ্যমে হেফাজতকে শক্তিশালী করার বিষয় নিয়ে হরকত-উল-জিহাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু নেতার বৈঠক হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। শীঘ্রই ওলামা সম্মেলনের নামে হেফাজতকে সক্রিয় করার কৌশল নিয়েছে জামায়াত। আহমদ শফী আমির থাকলেও হেফাজতকে নেতৃত্ব দেয়ার কাছে মূল দায়িত্ব পালন করছেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম। উদ্দেশ্য যে কোন ভাবে মহাজোট শাসন কালের পরিসমাপ্তি ঘটানো। সেটা যদি সম্ভব হয় বঙ্গবন্ধুর মতো তার কন্যা প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা কে হত্যার মধ্যে দিয়ে –তাহলে তো কেল্লাফতে!! যুদ্ধাপরাধের দায়ে কারাবন্দী দের পরিবার থেকে বড়ো অংকের টাকা ও তিনি নিয়েছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক সাইট ফেসবুক এবং ওয়েব সাইটে ছবি এবং তথ্য প্রচার হয়েছে।
হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমীর মুফতি ইজহারুল ইসলামের লালখান বাজার মাদ্রাসায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে আহত হাবিব (২৫) নামে এক ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার গভীর রাত দুইটার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এদিকে একই বিস্ফোরণে আহত নূরুন্নবী নামে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের এক ছাত্রের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বিস্ফোরণের পর আহত হাবীব হালিশহর জেনারেল হাসপাতাল নামে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে গোপনে চিকিৎসা নেওয়ার সময় সোমবার দুপুরে পুলিশের হাতে আটক হয়। আর নূরুন্নবীও চিকিৎসাধীন অবস্থায় আটক হয়।
ঘটনার পর পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার বোমা বিস্ফোরক দল ঘটনাস্থলে যায়। সেখান থেকে প্রথমে সীসাযুক্ত মার্বেল ও কাচের টুকরা উদ্ধার করা হয়। কিন্তু পুলিশ সীসাযুক্ত মার্বেল পাবার পরও সেখানে বিস্ফোরকের আলামত উদ্ধারের বিষয়টি চেপে যাবার চেষ্টা করেন। পুলিশ মাদ্রাসায় গেলেও মুফতি ইজহারুল ইসলাম মূল ফটকের সঙ্গে লাগানো বৈঠকখানায় বসে দীর্ঘক্ষণ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এসময় মুফতি ইজহার দাবি করেন, ল্যাপটপের চার্জার বিস্ফোরণে এ ঘটনা ঘটেছে। তিনি কোন ধরনের বোমা বানানোর কথা অস্বীকার করেন। সন্ধ্যা ৬টার দিকে মুফতি ইজহারুল ইসলামকে তার বৈঠকখানায় নামাজ পড়তে দেখা গেছে। এসময়ও তার বৈঠকখানার সামনে পুলিশের কোন নজরদারি দেখা যায়নি।ঘটনাস্থলে অবস্থান করে দেখা গেছে, পুলিশ অভিযান চালানোর জন্য ফোর্স জড়ো করতেই প্রায় আধঘণ্টা সময় পার হয়ে যায়। এর মাঝে নির্বিঘ্নে আত্মগোপনে চলে যান মুফতি ইজহার। এর আগে দুপুরেই মাদ্রাসা ছেড়ে পালিয়ে যান হারুন ইজহার।

সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে প্রায় ১০ প্লাটুন পুলিশ পুরো মাদ্রাসা ঘিরে অভিযান শুরু করে। প্রথমেই মাদ্রাসার শ্রেণীকক্ষে অভিযান শুরু করলেও বৈঠকখানার যেখানে দীর্ঘক্ষণ মুফতি ইজহারুল ইসলাম বসেছিলেন সেখানে পুলিশের কেউ যাননি।
রাত পৌনে ১০টা পর্যন্ত পুলিশ মাদ্রাসার সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে প্রতিটি ভবন, ছাত্রাবাস, মুফতি ইজহারের বাসায় অভিযান চালায়। মুফতি ইজহারের বাসা থেকে ১৮ বোতল পিউরিক এসিড জব্দ করা হয় বলে জানান নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) হারুন অর রশীদ হাজারী।

রাতে তিন ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান নাটক চালিয়েছে পুলিশ। এসময় জঙ্গী কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বহুল আলোচিত ইসলামী ঐক্যজোট নেতা মুফতি ইজহার ও তার ছেলে হারুন ইজহার পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। দিনভর মুফতি ইজহার মাদ্রাসার ভেতরে প্রকাশ্যে অবস্থান করলেও পুলিশ তাকে আটক কিংবা হেফাজতে নেয়ার কিংবা নজরদারিতে রাখার কোন পদক্ষেপই নেয়নি। অভিযোগ উঠেছে, দিনের আলোয় মুফতি ইজহারকে পালিয়ে যাবার সুযোগ করে দিয়ে রাতের আঁধারে পুলিশ তল্লাশি অভিযানের নামে নাটক করেছে।
যে পাঁচজনকে হ্যান্ডগ্রেনেড তৈরির কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক করেছে-তারা হলেন মাদ্রাসার প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক তফসির আহমেদ ,হেফজখানা শিক্ষা (আরবি) বিভাগের শিক্ষক মো.এছহাক, হাদিস মাধ্যামিক বিভাগের শিক্ষক আব্দুল মান্নান এবং কিতাব বিভাগ শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান ও বোর্ডিং সুপার মনির হোসেন।

মাসিক ‘দাওয়াত’ নামে একটি মাসিক ইসলামী পত্রিকায় সব সময়েই মুফতি ইজাহারসহ কয়েকজন উগ্রবাদী নেতা লেখালেখি করেন। দলটির কর্মসূচীও পাওয়া যায় এখানে। সেখানে নিজেই এক সময় আফগানিস্তানে তালেবানদের সঙ্গে কাজ করার কথা লিখেছিলেন উগ্রবাদী এ নেতা।
বাংলাদেশকে সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত করার নীলনক্সা বান্তবায়নে হেফাজতকে নেতৃত্ব দেয়ার মূল দায়িত্ব পালন করছেন মুফতি ইজাহারুল ইসলাম। ইসলামের বিভ্রান্তিমূলক বাণী দিয়ে উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে সক্রিয় করা হচ্ছে হেফাজতে ইসলামের মাধ্যমে। তাতে অন্যতম ভূমিকা পালন করছে হরকত-উল-জিহাদ (হুজি) কানেকশনে অভিযুক্ত মুফতি ইজাহারুল ইসলাম। হেফাজতে মুফতি ইজহার বরাবরের মতো তার নেপথ্য ‘খেলায়’ মহাসচিবসহ তিন শীর্ষ নেতাকে বহিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। গত কয়েক মাস ধরেই আন্দোলনের নামে সহিংস তান্ডবে সক্রিয় মুফতি ইজাহার ও তার দুই ছেলে মুসা এবং হারুন বিন ইজাহার। পটিয়া, হাটহাজারী সহ দেশের কওমী মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে সারাদেশ অস্থিতিশীল করা তার টার্গেট ।
কেন তাদের এতো প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে প্রশ্ন তুলেছেন তরিকত ফেডারেশনের নেতারা। বলেছেন, হেফাজত নেতারা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে ফায়দা লুটছে। এবার বেরিয়ে পড়েছে অপকর্ম। এদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য দেশবাসীতে মাঠে নামার আহ্বান জানিয়েছে তরিকত ফেডারেশন। একই দাবি নিয়ে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইসলামী ফ্রন্ট ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের নেতারা। ইসলামী ফ্রন্টের মহাসচিব ও আহলে সুন্নাতের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা এমএ মতিন বলেন, ধর্ম ব্যবসায়ী জঙ্গীদের আসল চেহারা বেরিয়ে গেছে। অবিলম্বে এই জঙ্গী নেতাকে আটক করতে হবে। ওদের কওমি মাদ্রাসায় জঙ্গী প্রশিক্ষণ হয়। সরকারকে অবিলম্বে অভিযান চালাতে হবে। তিনি বলেন, আমরা বহুবার বলেছি হেফাজত নেতারা জঙ্গী। এরা একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী। একই কথা বলেছেন, সম্মিলিত ইসলামী জোটের সভাপতি হাফেজ মাওলানা জিয়াউল হাসান। তিনি বলেন, হেফাজত নেতারা ১৩ দফার নামে ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করেছেন। এমন দাবি দেশের সাধারণ মানুষের ও ।
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসনের নাহয় মাথাব্যথা নেই । কিন্তু দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে শপথ করেছেন তারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের ই একজন। তার এবং তার জনগণের স্বার্থে প্রশাসন কি দায়িত্বে তৎপর হবেন? মুফতি ইজাহার , মুসা বিন ইজাহার এবং হারুণ বিন ইজাহার কে দ্রুততার সাথে গ্রেফতার না করলে ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনবেন এই নিদ্রাকাতর সর্বনাশা প্রশাসন!
০৮ অক্টোবর২০১৩
Sumikhan29bdj@gmail.com

Friday, October 4, 2013

জামাত নিষিদ্ধ করতে হবে- এদেশে তাদের রাজনীতি করার কোন সুযোগ দিতে পারো না তোমরা- জামাত প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীর পুত্র ফারুক মওদুদী



বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা করেছে যে জামায়াতে ইসলামী, সেই দলটি স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও কীভাবে এ দেশে রাজনীতি করতে পারে? প্রশ্ন তুলেছেন জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবুল আ'লা মওদুদীর ছেলে সৈয়দ হায়দার ফারুক মওদুদী। তিনি মনে করেন,জামাত নিষিদ্ধ করতে কোন দ্বিধা থাকা উচিত নয়। বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনীতি করার কোনো সুযোগ নেই। তোমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হামাত সহ চারটি দলকে নিষিদ্ধ করেছিলো। সেটাতে ফিরে যেতে হবে তোমাদের আবার।" তিনি ক্ষুব্ধ প্রশ্ন তোলেন," কিসের ভয় এতে?"
শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে ফারুক মওদুদী আরো বলেন, পাকিস্তান সৃষ্টির পর সে দেশে জামায়াত সুবিধা করতে পারেনি। দলটি হাল ফিরে পায় ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসনের সময়। সামরিক সরকার দলটিকে ফুলে-ফেঁপে উঠতে সাহায্য করে। উর্দুভাষী ফারুক মওদুদী ইংরেজী ভাষা কে ঘেন্না করেন। ঘেন্না করেন ইংরেজ দের-যাদের ষড়যন্ত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় জঙ্গীবাদের জন্ম ।
ইসলামি চিন্তাবিদ ফারুক মওদুদী ঢাকায় বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনীর উদ্যোগে ‘ধর্ম ও রাজনীতি: দক্ষিণ এশিয়া’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক গণবক্তৃতা ও দুই দিনের সম্মেলনে যোগ দিতে বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি বলেন, উপমহাদেশে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীর নয় সন্তানের কেউ-ই জামায়াতের রাজনীতিতে জড়াননি। তাদের পিতা নয় সন্তানের কাউকে মাদ্রাসায় পড়ান নি , জামায়াতের রাজনীতি থেকে ও দূরে থাকতে বলেছেন।
ফারুক মওদুদী জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সুবিধাবাদী চরিত্রের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ধর্মকেন্দ্রিক যত সহিংসতা হয়, সেখানে জামায়াতের কোনো নেতার সন্তান আছে বলে কি খবর পেয়েছেন? জামায়াতের নেতারা তাঁদের সন্তানদের কোনো বিপদের মুখে ফেলতে চান না। সব সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ।’ তিনি বলেন, পাকিস্তান স্বাধীন হোক, তা জামায়াতে ইসলামী চায়নি। মওদুদী পাকিস্তানের আন্দোলনকে ‘নাপাকিস্তান’ বলে আখ্যায়িত করেন। এরপর বাংলাদেশ সৃষ্টিরও বিরোধিতা করে দলটি।
ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ‘তথাকথিত জিহাদের’ বিরোধিতা করেন ফরুক মওদুদী। তিনি কাশ্মীরে জিহাদ সংঘটনে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামী বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় এবং হাজার হাজার নিরীহ মানুষের প্রাণহানির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পাকিস্তান জামায়াতের আক্রোশের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।একাত্তরের আগে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন ফারুক মওদুদী। তিনি তখন একটি বিমান সংস্থায় কাজ করতেন। চাকরি সূত্রে থেকেছেন ঢাকা, যশোর ও চট্টগ্রামে। এর পর আর বাংলাদেশে আসা হয়নি তার।এবার বাংলাদেশে এসে তার অনেক ভালো রাগছে জললেন। রাস্তায় কোলকাতা-ঢাকা বাস থেকে বিস্ময়ে হতবাক ফারুক মওদুদী প্রশ্ন করেন, " কোলকাতা থেকে সরাসরি বাস ট্রেন চলাচল আছে তোমাদের?"
তিনি মনে করেন জামাত ধর্মকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। এতে ইসলাম ধর্মের চরম অবমাননা হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ কে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান সৈয়দ হায়দার ফারুক মওদুদী।

Wednesday, October 2, 2013

সাম্প্রদায়িকতার কুৎসিত চেহারা- রুখসানা কাজল


শরত মানেই পুজোর গন্ধ। আকাশ বাতাস কাশবন নদী ও মানুষ- শরত এলেই রঙিন হয়ে উঠে। আমরা যে যেখানেই থাকি না কেন দুর্গা পুজো আমাদের এক করে তুলে। দূর শহর থেকে আমাদের মন চলে যায় পাড়ার ম-পে ম-পে।
আমি জানতে চাই, হ্যাঁরে এবার পুজোর থিম কি হবে রে? মেলা বসবে তো? কোন্ যাত্রা পার্টি আসছে? কি কি বই হবে জানিস কিছু? সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রাইজ কিন্তু ভাল হওয়া চাই! আর গান? কলকাতার সব পুজোর গান যেন থাকে! ম-প সাজানোতে সাবেকির পাশে নতুনত্ব ও রাখিস। আর লাইট? মানে আলোকসজ্জা-দেখিস আমাদের পাড়া যেন ফার্স্ট হয়!
আমার এত এত আবেগি প্রশ্নের কোন উত্তর নেই। মফস্বল শহরের সংবাদকর্মী ভাইটি উত্তর না দিয়ে মুখ নিচু করে বসে আছে অনেকক্ষণ। ওর মুখটা লাল। মুঠোফোনের গভীর কালো রঙে ডুবতে ডুবতে খুব আবছা করে জানায়: এবার আর পুজো হচ্ছে না দিদি। চমকে উঠি! আমার ঝলমলে শরত আকাশ মুহূর্ত মাত্র শ্রাবণের ঘন মেঘে ঢাকা পড়ে গেল।
যে ছোট্ট শহরটিতে আমার জন্ম, শরত এলেই যে শহরের হিন্দু-মুসলমান-খৃীষ্টান সবাই এই দুর্গা পুজোর মহাআনন্দ উৎসবে সব কিছু ভুলে মেতে ওঠে, এবার পুজো হচ্ছে না সে শহরে। আসছেন না সিংহ আরোহিনী মা দুর্গা দুর্গতিনাশিনী। আসছেন না লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক গণেশ। আসছে না মেলা, সার্কাস, নাগরদোলা, যাত্রাগান, গরম জিলেপি, পাঁপড়ভাজা, নানা রঙের নানা ঢংয়ের মাটির পুতুল। আমি মন খারাপের ঘোলা জলে হাবুডুবু খেয়ে জানতে চাইলাম: কেন রে? এবার কেন মূর্তি গড়া হবে না? ও বিষন্ন দুটি চোখ মেলে আমার দিকে তাকাল আর তখনই সেলুলয়েডের ফিতায় ভেসে উঠল দৃশ্যপট। মুহুর্মুহু নিঃশব্দতার চড় আমাকে ফেলে দিল অমার্জনীয় এক লজ্জায়। আমিও স্তব্ধ বেদনাকে সঙ্গী করে বসে থাকলাম ভাইয়ের পাশে। আমাদের কষ্ট এক, বেদনা এক- শুধু লজ্জা এসে বলে গেল- আজ থেকে দিদি মুসলিম আর তার ভাইটি হিন্দু!
এমন নয় যে, আমরা এর আগেও এ রকম পরিস্থিতিতে পড়িনি। পড়েছি। ইতিহাস সাক্ষী। কিন্তু বার বার কেন এমন লজ্জাজনক সময়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় আমাদের! কেন এই লজ্জা ঢাকতে বার বার বিচ্ছিন্ন হতে হয় আমাদের? কেন স্বভূমিতে আমরা বেঁচে থাকি মুখ ঢেকে, কেন কেউ কেউ স্বভূমি ছেড়ে চলে যায় চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে? ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাসরত প্রতিটি হিন্দু-মুসলিম-খৃীষ্টান-শিখ-বৌদ্ধ ধর্মের নাগরিকই কেন এই একই বেদনায় রঞ্জিত হয় বার বারÑ কখনও না কখনও?
১৯৪৭-এর ভয়াবহ দাঙ্গার স্মৃতি স্মরণে এখনও শিউরে উঠে হিন্দু মুসলিম অনেকেই। ইতিহাস খুব জটিল পথে ধায় আর রাজনীতি পা ফেলে আরও স্বার্থপর আলো আঁধারের গোলোক পথে। ’৪৭-এর দেশ ভাগ কি সাধারণ হিন্দু-মুসলিম জনগণ কখনও চেয়েছিল? কাদের স্বার্থে কেন হলো এই দেশ ভাগ? কেবলই ধর্মের জিরাফ এসে এঁকে দিল এক সীমারেখা আর আমরা ছিটকে গেলাম অখ- জন্মভূমির এ পারে, ও পারে!
দেশ ভাগ কেবল ধর্মীয় প্রভাবের ফলাফল নয়। এর পেছনে রয়েছে তৎকালীন রাজনৈতিক বোদ্ধা এবং প-িতদের স্বার্থপর চিন্তা ধারার এক জটিল মিথস্ক্রিয়া। হিন্দুর জন্য হিন্দু রাষ্ট্র, মুসলমানের জন্য মুসলিম রাষ্ট্রÑ এই দ্বি-জাতিতত্ত্বের উদ্ভাবক এবং ধারক পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মি. জিন্নাহ ব্যক্তিগত জীবনে কোন ধর্মগুরু ছিলেন না। এমন কি তিনি সরাসরি অনেক ধর্মীয় আচার-আচরণের ধারও ধারতেন না। মূলত তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ পাশ্চাত্য চাল-চলনে অভ্যস্ত তখনকার সমাজের একজন উঁচু তলার ব্যক্তি মাত্র। কংগ্রেসের তৎকালীন অনেক শীর্ষ নেতাও দেশ ভাগ নিয়ে আশ্চর্য নীরবতায় মৌনী ছিলেন। মূলত নেহেরু এবং জিন্নাহর ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ, রাজনৈতিক অভিপ্সা, নেহেরুর নেতৃত্বে কংগ্রেসের অতি দাদাগিরি মনোভাব ক্রমাগত মুসলিম লীগের নেতাদের ইন্ধন ও উৎসাহ যুগিয়েছে নতুন নতুন রাজনৈতিক রণকৌশল নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পরেও জিন্নাহ স্বতন্ত্র পাকিস্তানের কথা বলেননি। ১৯৬৯ সালে শিব রাও লিখেছেন যে, ১৯৩৭-এর নির্বাচনের অল্পকাল পরেই জিন্নাহ একটি প্রকাশ্য ঘোষণায় বলেন, ‘হিন্দু এবং মুসলিমদের মধ্যে একটি সম্মানজনক বোঝাপড়া হোক’ এই বিষয়ে কথা বলার জন্য প্রকাশ্যে মহাত্মা গান্ধীর কাছে সাহায্যের আবেদন রাখেন। কিন্তু গান্ধী অসহায়ের মতো হতাশার সঙ্গে সম্পূর্ণ অপারগতা প্রকাশ করেন। যদিও তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতি আন্তরিকভাবে বিশ্বস্ত ছিলেন, কিন্তু তৎকালীন কংগ্রেসের নেতৃত্বে তখন আর তার কোন প্রভাব ছিল না বললেই চলে। নেহেরুর চিন্তা, পথ, ভাষা এমনকি বাচনভঙ্গিতেও অখ- ভারত রক্ষার কোন সম্মানজনক সহিষ্ণুতাও প্রকাশ পায়নি কখনও। ১৯৩৭ সালের মার্চ মাসে নেহেরুর এক উগ্র মন্তব্য ভারতবর্ষের একই সূত্রে গ্রন্থিত অসাম্প্রদায়িক ইতিহাসকে অভিন্ন পথের পরিবর্তে দুটি ভিন্ন পথে প্রবাহিত করে দিয়েছিল। আত্মতৃপ্তি, রাজনৈতিক সাফল্য ও বিজয়, জনপ্রিয়তা, ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষার স্বপ্নে অন্ধ হয়ে কংগ্রেস ভারতের অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে তার আজ্ঞাবহ দল হিসেবে ভাবতে শুরু করে। নেহেরু অত্যন্ত আত্মঅহঙ্কারে বলেছিলেন, ‘ভারতে এখন কেবল দুটি শক্তি আছে : ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ আর ভারতীয় জাতীয়তাবাদ- কংগ্রেস যার প্রতিনিধি। পাল্টা জবাবে জিন্নাহ বলেছিলেন, না, ভারতে তৃতীয় আরও একটি শক্তি আছে- আর তা হচ্ছে মুসলমানরা।
মুসলিম লীগ এবং কংগ্রেস নেতাদের এই রাজনৈতিক পাশা খেলায় ভারতবর্ষের জনগণ ঘুঁটির মতো ব্যবহৃত হয়েছে। প্রাণ গিয়েছে। মান গিয়েছে, জমি-জিরেত, ধন, সম্পদ গিয়েছে। আর হারিয়ে গিয়েছে কোটি মানুষের আজন্মের ঠিকানা- বদলে গেছে জননী জন্মভূমির পবিত্র মানচিত্র।
ভারতবর্ষের মাটিতে, নদীতে, আকাশে, বাতাসে, মানুষের মনে জন্ম নিয়েছে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ। সেই বৃক্ষে ফুল হয়েছে, ফল ধরেছে, বীজ ছড়িয়ে গেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মাতরে। রাজনৈতিক নেতাদের চাপান-উতর রাজনীতির পাশা খেলায় ক্ষুদ্র বা বৃহৎ যে ভুলই হোক না কেন সেই ভুলের কঠিন সুদ গুনতে হয়েছে ভারতবর্ষের সাধারণ হিন্দু-মুসলমান জনগণকে। আর সেই বিষবৃক্ষের ফলে এত বিদ্বেষ যে অনাদিকালের ধর্মনিরপেক্ষতার নিরাপদ ভূমিতে গড়ে ওঠা ভারতীয় জাতীয় ঐক্যকে খ-বিখ- করে দিয়েছে নিষ্ঠুরের মতো।
দ্বি-জাতিতত্ত্বকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ১৯৭১ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের বিনিময়ে পাকিস্তান ভেঙ্গে সর্বপ্রথম সৃষ্টি হয় একটি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র- বাংলাদেশ। সংবিধানে গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে মূল স্তম্ভ করে স্বাধীন বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করলেও মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় হত্যা করা হয় স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বদলে যায় সংবিধান। বদলে যায় শাসক শ্রেণীর চরিত্র। তৈরি হয়ে যায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ধর্মীয় মৌলবাদী এক গোষ্ঠী। রাজনীতিতে সক্রিয় এই শ্রেণী বাঙালীর সংস্কৃতির স্থানে প্রচলন ঘটাতে চায় আরবীয় সংস্কৃতি। বাংলাদেশকে মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করতে এরা বদ্ধপরিকর। তাই মাঝে মাঝেই ঘটে যাচ্ছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। সংখ্যালঘুর ঘর পুড়ছে, প্রাণ যাচ্ছে, লুট হয়ে যাচ্ছে মন্দির ও নারী। সেখানে পুজো হয় কি করে? কোন মেয়ে কি এ রকম বিপন্ন বাবা মায়ের ঘরে বেড়াতে আসে সন্তানদের নিয়ে?
তাই এবার আর পুজো হবে না। সপ্তমী অষ্টমী নবমী জুড়ে দল বেঁধে আমাদের মতো মানুষদের ম-পে ম-পে ঘুরে ঘুরে প্রতিমা দেখা হবে না আর। দশমীর দুপুর থেকেই বিসর্জনের বেদনা এসে ছুঁয়ে দেবে না সব ধর্মের মায়েদের মন। পুজো মানেই তো ছুটি। বাবা মায়ের কাছে ক’দিনের জন্য বিবাহিত মেয়ের বেড়াতে আসা। সংসার জটিলতার ফাঁকে ভাবনাহীন নিটোল কয়েকটি দিন। কি চমৎকার একটি পারিবারিক মিলনের গল্প! অথচ সাম্প্রদায়িকতার কুৎসিত রঙে এমন মধুর একটি গল্পে আমরা কালি দিয়ে দিলাম!
কি আছে আমাদের সামনে?

এই রায়কে অভিনন্দন না জানিয়ে পারি না - আবদুল গাফফার চৌধুরী


লিখতে বসেছিলাম অর্ধনোবেল জয়ী ড. ইউনূসের নবতর কা-কীর্তি নিয়ে। গত সপ্তাহে ‘চতুরঙ্গের’ লেখায় সেই প্রতিশ্রুতিই দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ (মঙ্গলবার) ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিচারের রায় ঘোষিত হলে খুব সকালে (লন্ডন সময়) লেখার টেবিলে লিখতে বসেই তা জানতে পারব, তা আগে বুঝতে পারিনি। পরে বুঝলাম লন্ডনের সকাল মানে ঢাকার দুপুর। সুতরাং রায় ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লন্ডনে সকালেই সেটা জানার কোন অসুবিধা নেই। লেখার সাবজেক্ট তাই বদলাতে হলো।
যুদ্ধাপরাধ, হত্যা, গণহত্যাসংক্রান্ত তেইশটি অভিযোগ ছিল সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে। রায়ে বলা হয়েছে, তার মধ্যে নয়টিই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং তাঁকে মৃত্যুদন্দাদেশ দেয়া হয়েছে। এ রায়কে বেদনাক্রান্ত মনে অভিনন্দন জানাই। আমার অভিনন্দনকে বেদনাক্রান্ত আখ্যা দিলাম এ জন্য যে, এই পরিবারটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক প্রায় অর্ধশতকের। আবার এ রায়কে অভিনন্দন না জানিয়ে পারি না এ কারণে যে, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তাঁর পিতা ফজলুর কাদের চৌধুরীর সঙ্গে মিলে মানবতার বিরুদ্ধে যে জঘন্য অপরাধগুলো করেছেন, তার বিচার ও দ- না হলে এ দেশের মাটি থেকে মানবতা শব্দটিই বিদায় নিত।
সাকা চৌধুরীর মানবতাবিরোধী অসংখ্য গুরুতর অপরাধের মধ্যে কু-েশ্বরীর নূতন সিংহকে হত্যা মাত্র একটি। এ অসংখ্য অপরাধের জন্য সাকা চৌধুরী কখনও অনুতপ্ত হননি, বিবেকপীড়া অনুভব করেননি। বরং যে বঙ্গবন্ধু জেলে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত ফজলুল কাদের চৌধুরীর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবার ও পুত্রদের প্রতি সস্নেহ অভিভাবকত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেই বঙ্গবন্ধু সপরিবারে ঘাতকদের হাতে মর্র্মান্তিক মৃত্যুবরণের পর সাকা চৌধুরী সেই ঘাতক দলের সঙ্গে গিয়ে জুটেছিলেন।
তার পর গত প্রায় চার দশক ধরে রাজনীতি করার নামে তিনি যে একটার পর একটা নৃশংস কা- ঘটিয়েছেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকায় সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন, আচার-আচরণে খিস্তি-খেউড়, অভব্যতা ও অশ্লীলতার পরিচয় দেখিয়েছেন, তার কোন তুলনা নেই। তিনি শুধু কর্মকান্ডে সন্ত্রাসী নন, বাক্য সন্ত্রাসীও। তাঁর জন্য এ চরম দ-াদেশের রায় শুনে তাঁর হাতে নির্যাতিত, নিপীড়িত ও নিহত অসংখ্য মানুষের পরিবার-পরিজন যে তাদের দীর্ঘকালের ঘোষিত শোক ও বেদনায় কিছুটা হলেও সান্ত¡না পাবে, তাতে সন্দেহ নেই।
এ রায়ে দেশের মানুষের সঙ্গে আমিও সুখী। ঔঁংঃরপব যধং ফড়হবÑ ন্যায়বিচার করা হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি বেদনাসিক্ত। আমার এ পরস্পরবিরোধী মনোভাবের কারণ আমি ইতোমধ্যেই ব্যক্ত করেছি। এই পরিবারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘকালের। সাকা চৌধুরীর পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। যদিও তাঁর রাজনৈতিক মতের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল যোজনযোজন দূরের। এই দূরত্বকে অতিক্রম করে তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বঙ্গবন্ধুর মাধ্যমে।
ছাত্রজীবনে (কলকাতায়) বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ফজলুল কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালে যদিও দুজনের রাজনীতি বিপরীতমুখী হয়েছে; কিন্তু প্রাকযৌবনে দুজনেই ছিলেন অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লীগ-রাজনীতিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের যুবনেতা। সেই সূত্রে দুজনের মধ্যেই ঘনিষ্ঠতা। তাদের এই ব্যক্তিগত সম্পর্ক ফজলুল কাদের চৌধুরী আইয়ুব খানের মন্ত্রী থাকাকালেও নষ্ট হয়নি।
আজ ভাবতেও অবাক লাগে, ’৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কোলাবরেটর এবং অসংখ্য মানবতাবিরোধী অপরাধের নায়ক হিসেবে ফজলুল কাদের চৌধুরীর এবং তাঁর পুত্রের এমন চরম অধঃপতন ঘটতে পারে। চল্লিশের দশকে ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন অবিভক্ত ভারতের একজন জাঁদরেল ছাত্রনেতা। মুসলিম ছাত্রলীগ গঠিত হওয়ার আগে তিনি ছিলেন নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি। চল্লিশের দশকের গোড়ায় নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ‘অন্ধকূপ হত্যার’ মিথ্যা অভিযোগে ব্রিটিশ শাসকদের নির্মিত হলওয়ে মনুমেন্ট ভাঙ্গার জন্য যখন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে কলকাতায় বিরাট শোভাযাত্রা হয়, সেই শোভাযাত্রায় যে ক’জন মুষ্টিমেয় মুসলমান ছাত্র ছিলেন, তাদের মধ্যে দুজন ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান ও ফজলুল কাদের চৌধুরী। কিশোর বঙ্গবন্ধু তখন চোখের চিকিৎসার জন্য কলকাতায় ছিলেন।
এই ফজলুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকে তিনি তাঁর অত্যন্ত কঠোর ও কর্কশ স্বভাব সত্ত্বেও আমাকে কেন ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন, তা আমি জানি না। তিনি যখন আইয়ুব আমলে পাকিস্তান জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং কখনও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তখনও চাটগাঁয় এলে তিনি তাঁর টাইগার্স হিলের বাসায় আমাকে আমন্ত্রণ জানাতেন। আমি শেখ মুজিব এবং তাঁর ছয় দফার সমর্থক জেনেও কখনও অসন্তোষ প্রকাশ করেননি। তাঁর সুউচ্চ হিল ভবনের ছাদে তখন দেখতাম তাঁর দুই পুত্র সালাউদ্দিন ও গিয়াসউদ্দিন খেলা করছেন।
আইয়ুব মন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর ফজলুল কাদের চৌধুরী যখন তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ সম্পর্কে তদন্তের সময় ঢাকায় ইস্কাটনে নয় নম্বর দিলু রোডে অবস্থান করতেন, তখন প্রায়ই তাঁর সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাত হতো। তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এলেই পতেঙ্গার একগাদা লাল মিষ্টি তরমুজ নিয়ে আসতেন আমার স্ত্রীর জন্য। বলতেন, বৌমার জন্য এনেছি। আইয়ুব সরকারের হাতে তিনি নানাভাবে হেনস্থা হয়েছেন। বিস্ময়ের কথা এই যে, আইয়ুবের পতনের পর পতিত স্বৈরাচারী কনভেনশন মুসলিম লীগের সভাপতির পদ ছেড়ে দেন এবং ফজলুল কাদের চৌধুরীকে ডেকে নিয়ে কনভেনশন মুসলিম লীগের সভাপতির পদে বসান। তিনি ইসলামাবাদ থেকে ঢাকায় ফিরে এলে তাঁকে বলেছিলাম, এটা আপনি কী করলেন? ফজলুল কাদের চৌধুরী হেসে বলেছেন, ‘এখন আমি মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট হয়েছি, শীঘ্রই পাকিস্তানেরও প্রেসিডেন্ট হব।’ আমার মনে হয়েছিল, তিনি রাজনৈতিক ফ্যান্টাসিতে ভুগছেন।
ফজলুল কাদের চৌধুরীর মধ্যে ক্রুর এবং কোমল দুটো চরিত্রই ছিল। তাঁর পুত্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পিতার চরিত্রের শুধু ক্রুর দিকটা পেয়েছেন, কোমল দিকটা পাননি। পিতার মধ্যে যে ক্ষীণ দেশপ্রেম ছিল, সাকা চৌধুরীর মধ্যে তাঁর কণামাত্র নেই। নিজের কথাবার্তায় তিনি বহুবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁর আনুগত্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি নয়; তাঁর অনুগত্য এখনও পাকিস্তানের প্রতি। অনেকে সন্দেহ করেন, তাঁর রাজনীতির সঙ্গে ‘পাকিস্তান কানেকশন’ যুক্ত, এমনকি আইএসআইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও বিস্ময়ের কিছু নেই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও আদর্শ সম্পর্কে তিনি বিভিন্ন সময়ে যে সব মন্তব্য করেছেন, তাতে মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধ ছাড়াও দেশদ্রোহিতার অভিযোগেও তাঁকে বিচারে সোপর্দ করা যেত।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল কয়েকজনকেই মৃত্যুদন্ডাদেশ দিয়েছেন। একজনকে (গোলাম আযম) দিয়েছেন যাবজ্জীবন কারাদন্ড।
এই দন্ডিতেরা সকলেই ’৭১-এর ঘাতক দল জামায়াতের নেতা। এখন সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রাণদন্ডের আদেশ হওয়ায় বিএনপির একজন শীর্ষনেতা দন্ডাদেশ পেলেন। এই মামলাটির বৈশিষ্ট্য, জাতীয় সংসদের সদস্য থাকাকালেই বিএনপির এক শীর্ষনেতা যুদ্ধাপরাধে দন্ডিত হলেন এবং তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটিরও সদস্য।
এখন এই দন্ডিত নেতাকে দল থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা না দিয়ে বিএনপি যদি এই দন্ডাদেশপ্রাপ্ত নেতার সমর্থনে হরতাল ডাকে, জামায়াতকে সঙ্গী করে রাজপথে সন্ত্রাস সৃষ্টিতে নামে, তাহলে বিএনপিকেও কি যুদ্ধাপরাধীদের দল বলে গণ্য করা যাবে না? আর সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যদি মনে করে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াত নির্বাচনে প্রার্থী দাঁড় করানোর অযোগ্য, তাহলে একই ক্যাটাগরিতে কি বিএনপিও পড়ে যাবে না? অবশ্য এটা আইনগত বিষয়। আইন বিশেষজ্ঞরা এ সম্পর্কে ভাল বলতে পারবেন।
রায়টি ঘোষিত হওয়ার পর বিএনপি এখন পর্যন্ত (আমার এই লেখা যখন লিখছি) এ সম্পর্কে কোন আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি। কিন্তু তাদের প্রতিক্রিয়া বোঝা যায়, ঢাকায় হরতাল ডাকা ছাড়াই রাজপথে ভাংচুর, গাড়ি পোড়ানো শুরু করা দেখে। চট্টগ্রামে আজ (মঙ্গলবার) হরতাল ডাকা হয়েছে। ঢাকায় বিএনপির আইনজীবী খোন্দকার মাহবুব বলেছেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের যারা আজ বিচার করছে, বাংলার মাটিতে তাদের একদিন বিচার হবেই।’ এই মন্তব্য শুধু বিচারব্যবস্থার অবমাননা নয়, বিচারপতিদেরও হুমকি দেয়ার সমতুল্য। এই ধরনের আইনজীবীদের সম্পর্কে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কিনা, তা আইনমন্ত্রীকে বিবেচনা করতে হবে।
সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রদত্ত দ-াদেশ নিয়ে বিএনপি যদি রাজপথে আন্দোলনের নামে সন্ত্রাস সৃষ্টিতে নামে এবং তাতে জামায়াত ও শিবির যোগ দেয়, তাহলে দেশের রাজনীতির চিত্রটা আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে। রাজনীতির মাঠে একদিকে দেখা যাবে যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থকদের শিবির। অন্যদিকে দেখা যাবে এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দ- যারা সমর্থন করে সেই গণসমর্থিত গণতান্ত্রিক শিবির। সম্ভবত ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়েই বাংলাদেশের মাটিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক শক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির চূড়ান্ত যুদ্ধটা হবে। এই যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকার সুযোগটা ক্রমশই কমে আসছে।
ফজলুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে এককালে ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ঠ ছিলাম এবং সাকা চৌধুরীদেরও তাদের কিশোর কাল থেকে অত্যন্ত কাছ থেকে চিনি, এ জন্যই আজ সাকা চৌধুরীর মৃত্যুদ-াদেশে ব্যথা অনুভব না করে পারছি না। কিন্তু তাকে দ- দেয়া ছিল মানবতা ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রয়োজন। সুতরাং এই রায়কে মনের বেদনা সত্ত্বেও অভিনন্দন না জানিয়ে পারি না। বিএনপি বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের বিচার ও শাস্তি রোধ করতে পারেনি; ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দ-ও রোধ করতে পারবে না। মাঝখানে যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থন দিয়ে তারা দেশের মানুষের কাছে নিজেদের আসল চেহারা উন্মোচন করছেন। যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থনদানই যে দেশে যথাসময়ে একটি নির্বাচন হলে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সকল খোয়াব ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেবে এই সত্যটা তারা এখন বুঝতে পারছে না। -দৈনিক জনকন্ঠ

Tuesday, September 24, 2013

যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের প্রশ্নবিদ্ধ সহমর্মিতা - আঞ্জুমান ইসলাম ও ওমর শেহাব

সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৩

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (AI) বিশ্বের নামকরা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অন্যতম। এসব সংগঠনসহ বেশকিছু আন্তর্জাতিক এনজিও হঠাৎ করে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আইন ও বিচার ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বেশ উৎকণ্ঠা (!!!) প্রকাশ করে আসছে।ব্যাপারটি বেশ আশাজাগানিয়া হত যদি তারা এর পাশাপাশি বিশ্বজিৎ বা ত্বকী হত্যাকাণ্ড ও এর সুষ্ঠু বিচার নিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে চাপের মুখে রাখত কিংবা ফটিকছড়ি-রামুতে বর্বরোচিত তাণ্ডব বা বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উপর নিপীড়ন ও আগ্রাসনের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে না পারায় সরকারকে ব্যর্থতার দায়ে অভিযুক্ত করত।

কিন্তু তা না করে দেখা গেল গত এক বছরে তারা তাদের অধিকাংশ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের জন্মের সময়ে নির্বিচারে যারা যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে শুধুমাত্র তাদের ‘মানবাধিকার’ কোনোভাবে লঙ্ঘন হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে আলোকপাত করে। বিষয়টি আশ্চর্যজনক বটে!

আরও আশ্চর্যজনক ব্যাপার হল প্রত্যেক যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায়ের আগে ও পরে প্রায় চার দশক ধরে যুদ্ধাপরাধীদের পৃষ্ঠপোষক জামায়াত-শিবির যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করে অমানবিক নৃশংসতা দেখাচ্ছে, সেগুলোকে ‘রাষ্ট্র, বিশেষ করে বিচার ব্যবস্থার প্রতি হুমকি’ বলে উল্লেখ না করে, শুধুমাত্র গোলাম আযমের রায়কে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ দেখানোর প্রতি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে।

বিয়াল্লিশ বছর ধরে বিচারের আশায় বুক বেঁধে মুক্তিযুদ্ধের যে ভিকটিমরা ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীদের ন্যায্য বিচার ও সাজা দেখার অপেক্ষায় আছেন– সেই নিপীড়িত নর-নারী, আত্মীয়-পরিজনদের উপর ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি পাশ কাটিয়ে প্রকারান্তরে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নেওয়া এসব মানবাধিকার সংস্থার ব্যাপারে আমরা তাই আগ্রহ বোধ করলাম। তাদের সাম্প্রতিক কিছু রিপোর্ট খুঁটিয়ে দেখলাম এবং যা পেলাম তা খুবই কৌতূহলোদ্দীপক।

উদাহরণ দেওয়া যাক। রাজাকার সাঈদীর যুদ্ধাপরাধের সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে ডিবি পুলিশ অপহরণ করেছে এ কথা কোত্থেকে জানল সে ব্যাপারে হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জিজ্ঞেস করলে ওরা ডেভিড বার্গম্যানের সূত্র দিয়ে থাকে।
ডেভিড বার্গম্যানকে জিজ্ঞেস করলে তিনি শুধুমাত্র সাঈদীর আইনজীবী ব্যরিস্টার রাজ্জাকের জুনিয়র হাসানুল বান্না সোহাগকে তার সূত্র হিসেবে উল্লেখ করেন। সোহাগের বস ব্যারিস্টার রাজ্জাককে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন এটি তাকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে!


২০১৩ সালের ২৯ এপ্রিল প্রকাশিত ওমর শেহাবের করা অ্যানালাইসিস “The missing links of the Bali abduction allegation”-এ এই দুর্বল সূত্রের দুষ্টচক্রটি (circle of reference) স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। পাঠক-পাঠিকাদের সুবিধার জন্য আমরা সেই প্রবন্ধ থেকে এই দুর্বল সূত্রের দুষ্টচক্রটির একটি ছবি তুলে ধরলাম।



সুখরঞ্জন বালীর কথিত অপহরণের ব্যাপারে কোন প্রতিষ্ঠান কাকে সূত্র হিসেবে উল্লেখ করছে তার ছবি। প্রশ্নবোধক চিহ্নটি হল একটি ভুতুড়ে সূত্র।
এখন দেখা যাক এই দুষ্টচক্রে অংশগ্রহণকারীদের কাজের সময়ের ব্যবধানের একটি ছবি।

সুখরঞ্জন বালীর কথিত অপহরণের সংবাদ প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রকাশিত প্রতিবেদনের সময়ের ব্যবধান ও তথ্যসূত্রের পরম্পরার একটি চিত্র।

বিদেশি মানবাধিকার ও দাতা সংস্থার এ ধরনের উন্নাসিক ও একপেশে আচরণ আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। আশার ব্যাপার হল গত বিয়াল্লিশ বছরে জাতি হিসেবে আমাদের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি তাদের এ বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে তাদের সেই তলাবিহীন ঝুড়ির তকমা আমরা অনেক আগেই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি– অধিকার, আইন, নৈতিকতা, সভ্যতা, সমাজ এসব ব্যাপারে তাদের অষুধ গেলাই আমাদের একমাত্র কাজ নয় বরং আমাদের কাছ থেকেও তাদের অনেক কিছু শেখার আছে।

উদাহরণস্বরূপ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কর্মকাণ্ডের পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের প্রথম সারির জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রতিবেদনের গুণগত মান যে কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সমমান এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিখ্যাত পত্রপত্রিকাগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে।

প্রসঙ্গক্রমে, ইকোনমিস্টের সেই প্রতিবেদনের কথা বলা যায় যেটিতে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে তুলনা করার জন্য বহুল-বিতর্কিত নাজি সেনাপতি আইখম্যানের বিচারের কথা তুলে ধরা হয়। যদিও আন্তর্জাতিক আইনের অনেক টেক্সট বইয়ে এ বিচারকে বরং মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবেই তুলে ধরা হয়।

একইভাবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর বৌদ্ধদের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের প্রামাণ্য ছবি উপগ্রহের মাধ্যমে তুলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রকাশ করলেও, কয়েকদিন পরে মাত্র কয়েকশ মাইল দূরে রামুতে মুসলমান সন্ত্রাসীরা বৌদ্ধমন্দির ও জনবসতিতে যখন স্মরণকালের ভয়াবহ সন্ত্রাসী আক্রমণ ঘটাল তখন আর তাদের উপগ্রহ ছবি তোলার জন্য আমাদের আকাশে আসেনি!

বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের বেশকিছু সংশয় দেখা দেওয়ায় আমরা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিলাম যে মানবাধিকার সংস্থা ও এর কর্মীরা আসলে একে অপরের থেকে কতটুকু বিচ্ছিন্ন ও প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করে যে একটি সংস্থার বা কর্মীর রিপোর্টের তথ্যকে আরেকটি সংস্থা তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। সে সঙ্গে বর্তমানের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার বিতর্কিত কাজকর্ম যা বিভিন্ন সময়ে উচ্চমহলে নাড়া ফেলেছে তা নিয়েও কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

এটা বলার অবকাশ রাখে না দুর্বল ও নির্যাতিত মানুষের পক্ষে নৈতিক সমর্থন দানের জন্যে ১৯৭৮ সালে রবার্ট বারনেস্টাইনের নেতৃত্ব হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর আগে অবশ্য হেলসিংকি ওয়াচ ( Helsinki Watch) নামের এ সংগঠনের কাজ শুরু হয় ১৯৭৫ সালে যার মূল উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ব্লকের কর্মকাণ্ড হেলসিংকি ঘোষণার (Helsinki Accord) সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনটিতে নৈতিক অবক্ষয় দেখা দেয়। প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান রবার্ট বারনেস্টাইন থেকে শুরু করে টাইম ম্যাগাজিনসহ উল্লেখযোগ্য প্রায় সব মিডিয়াই একমত হয় যে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠী বা দলের মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করার কারণে নিরপেক্ষতা হারিয়েছে।

কোনো দেশের “সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ততাবিহীনভাবে কাজ করার নীতি” নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও সৌদি সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অনুদান গ্রহণ করার অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদেরই প্রাক্তন প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট বারনেস্টাইনে দ্বারা।কাকতালীয়ভাবে এর পর থেকে মুসলিমপ্রধান দেশের, বিশেষ করে ইসলামিস্ট সংগঠনগুলোর কাছে ভীষণ গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের। এইচআরডব্লিউ প্রধান কেনেথ রথের কাছে নানান দেশ থেকে খোলা চিঠিও দেওয়া শুরু এই অভিযোগ করে যে কেন কেনেথ রথ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর পক্ষে কথা বলছেন।এমন অভিযোগও করা হয় যে ইসলামের নামে মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুড নারীদের স্বাধীন চলাফেরাতে যে বাধা দিচ্ছে তার পক্ষেই সাফাই গাইছেন কেনেথ রথ। শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিককালে নানান প্রশ্নবিদ্ধ মানুষকে অ্যাডভাইজরি বোর্ডে নিয়োগ দিয়ে যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে সংস্থাটি। আমেরিকান সেনাবাহিনীর প্রাক্তন সদস্য ও প্রকাশ্য নাৎসি সমর্থক মার্ক গার্লেস্কোকে (Marc Garlesko) সেখানে নিয়োগ দেওয়ার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে তাকে বরখাস্ত করতে বাধ্য হয় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।এখন আবার শাওয়ান জাবারীন (Shawan Jabarin), যাকে ইসরাইলি সুপ্রিম কোর্ট ‘ড. জেকিল ও মিস্টার হাইড’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, জাবারীন প্রকাশ্যে নিজেকে মানবাধিকারকর্মী বলে দাবি করলেও আসলে জঙ্গি গোষ্ঠীর সদস্য– এ নিয়োগকে বছর দুয়েক আগে বারনেস্টাইন রীতিমতো ‘হোঁচট খাওয়ার মতো’ বলে উল্লেখ করেছেন।ইরাকের রাসায়নিক অস্ত্র ও নার্ভ গ্যাস ব্যবহারের প্রমাণ আছে বলে রিপোর্ট প্রকাশ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যা প্রকারান্তরে বুশের ইরাক আক্রমণের পক্ষে রায় দেয়। তাদের দেওয়া সেই ঘোষণাটি পরবর্তীতে শতভাগ মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়। মিথ্যা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শুরু হওয়া ইরাক যুদ্ধের ৬ লাখ অকারণ মৃত্যুর (আমরা মনে করি এগুলো হত্যাকাণ্ড) দায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কখনওই স্বীকার করেনি।

এ বছর আবার কেনেথ রথ ও তার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ব্যাপারে অভিযোগ উঠেছে “Martin Ennals” মানবাধিকার পুরষ্কারের জন্যে ফাইনালিস্টদের তালিকায় ‘মনা সাইফ’ নামে জঙ্গি-সমর্থক বলে অভিযুক্ত একজনকে নমিনেশন দেওয়ার। এ রকম বহু একপেশে ও উদ্বেগজনক তথ্য যে কেউ পেতে পারেন “Controversies about HRW” লিখে ইন্টারনেটে সার্চ দিলেই।এছাড়া সচেতন স্বেচ্ছাসেবকরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে সবচেয়ে বড় বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়াতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সমালোচনা (Criticism of Human Rights Watch) শীর্ষক একটি সমৃদ্ধ নিবন্ধ লিখে রেখেছেন এবং নিয়মিত হালনাগাদ করে যাচ্ছেন।তাই এ বিষয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনায়যাব না।

কিন্তু কেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এ বর্তমান অবস্থান ও প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ড– বিশেষ করে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে অহেতুক সহমর্মিতা কি নিছকই কাকতালীয়?

একটু বিশদ অনুসন্ধানী তথ্য দিচ্ছি নিচে এসব মানবাধিকার সংস্থা, এনজিও ও সাংবাদিকের অর্থের উৎস ও পারস্পরিক সম্পৃক্ততা সম্পর্কে। এটি এখনও কোনো সম্পূর্ণ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নয়। আমরা এটিকে মনে করি কৌতূহলের প্রথম ধাপ। আমাদের বিশ্বাস এই তথ্যগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনগুলোর কাজকর্ম বিচারের সময় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন কিছু উপাদান যোগ করবে।

১৯৮৭ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তদানীন্তন এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর আরিয়াহ নাইয়ার তার ডেপুটি হিসেবে কেনেথ রথকে নিযুক্ত করেন। ১৯৯৩ সালে নাইয়ার হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ছাড়েন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী জর্জ সোরসের ওপেন সোসাইটি ইন্সটিটিউট (OSI)-এর প্রধান হিসেবে যোগ দিতে। আর নাইয়ারের স্থলাভিষিক্ত হন রথ। এখন পর্যন্ত কেনেথ রথই সংগঠনটির প্রধান।ওপেন সোসাইটি ইনস্টিটিউট হচ্ছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সবচেয়ে বড় অর্থ যোগানদানকারী সংস্থা। ২০১১ সালে আরিয়াহ নাইয়ার ওপেন সোসাইটি ইনস্টিটউটের পক্ষ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার অর্থসাহায্য করেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে। মজার ব্যাপার হল, নাইয়ারের স্ত্রী ইভেট নাইয়ার নোবেলবিজয়ী বাংলাদেশি ড. মুহম্মদ ইউনূসের গ্রামীণ ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের একজন।ওপেন সোসাইটি ইনস্টিটউটের প্রতিষ্ঠাতা জর্জ সোরস হচ্ছেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনের অ্যাডভাইসারি কমিটির সদস্য– আমেরিকা এবং ইউরোপ ও মধ্য এশিয়া।

কাকতালীয়ভাবে কি না আমরা জানি না, জর্জ সোরসেরই আরেকটি প্রতিষ্ঠান “সোরস ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট” গ্রামীণ টেলিকমকে ১০.৬ মিলিয়ন ডলার অর্থ প্রদান করে। গ্রামীণ ব্যাংকের দাতাগোষ্ঠীর মধ্যেও জর্জ সোরস ও তার প্রতিষ্ঠান ওপেন সোসাইটি ইনস্টিটউট অন্যতম এবং সোরস নিজেও মাইক্রো ক্রেডিট ও মাইক্রো ফিন্যান্সের একজন বিশাল প্রমোটার।/b>

জর্জ সোরস কতখানি ক্ষমতাধর তা বোঝানোর জন্যে বোধহয় একটি তথ্যই যথেষ্ট। সোরস হচ্ছেন পৃথিবীর প্রথম ২০ ধনীর একজন যিনি ক্লিনটন পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তার সোরস ফাউন্ডেশন ও ওপেন সোসাইটি ইনস্টিটউটের তরফ থেকে ক্লিনটন ফাউন্ডেশনকে প্রায় ছয় মিলিয়ন ডলার দান করেছেন তিনি শুধু ২০১২ সালেই।

অন্যদিকে ইউরোপভিত্তিক আরেকটি বিশাল দাতা সংস্থা হল সিগ্রিড রেয়্যুসিং ট্রাস্ট (Sigrid Rausing Trust)। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ১৯৯৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মোট ৯৪,১৮,৪০০ ডলার অনুদান পায় এই সংস্থাটির কাছ থেকে। সিগ্রিড রেয়্যুসিং (যার নামে সিগ্রিড রেয়্যুসিং ট্রাস্ট) নিজেই আবার ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড অব হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এমেরিটাস মেম্বার। মজার ব্যাপার হল সিগ্রিড রেয়্যুসিং ট্রাস্টের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে ‘বিশেষ সম্মানিত’ একজন হলেন কেনেথ রথ যিনি কিনা আবার ১৯৯৩ সাল থেকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর অর্থাৎ নির্বাহী পরিচালক!!!

সিগ্রিড রেয়্যুসিং ট্রাস্টের একজন ট্রাস্টি জশুয়া মেইলম্যান। এই মেইলম্যান কিন্তু হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একজন এমেরিটাস বোর্ড মেম্বার। জশুয়া মেইলম্যানের নাম এলে ড. ইউনূসের নাম একটু নিতেই হবে। কারণ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মেইলম্যান আর ড. ইউনূস অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। জশুয়া মেইলম্যান গ্রামীণ টেলিকমের সহপ্রতিষ্ঠাতা।
তার প্রতিষ্ঠিত অন্য সংস্থাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল টাইডস ফাউন্ডেশন, থ্রেশল্ড ফাউন্ডেশন ও মেইলম্যান ফাউন্ডেশন, সোস্যাল ভেঞ্চার নেটওয়ার্ক, যেগুলো থেকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নিয়মিত মোটা অঙ্কের অনুদান পায় এবং যার প্রায় প্রত্যেকটিই গ্রামীণ পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত।


ইদানিং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যে বিতর্কিত সাংবাদিক ব্যক্তিত্বের তথ্যসূত্র দিয়ে বাংলাদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে রিপোর্টগুলো করে, তিনি হলেন ডেভিড বার্গম্যান। প্রথমত ১৯৯৯ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত ডেভিড বার্গম্যান সেন্টার ফর কর্পোরেট অ্যাকাউন্টেবিলিটি (Centre for Corporate Accountability) বলে একটি সংগঠনের প্রধান ছিলেন। সংগঠনটি ২০০৫ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ পাউন্ড (প্রায় ২ কোটি টাকা) অনুদান পায় সিগ্রিড রেয়্যুসিং ট্রাস্ট থেকে।
এখানে আবার চলে আসে সেই ড. ইউনূসের নাম। ডেভিড বার্গম্যানের স্ত্রী সারা হোসেন এবং সে সঙ্গে ড. কামাল হোসেন অ্যান্ড এসোসিয়েটেস গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনূসের আইনজীবী। শুধু তাই-ই নয়, ড. কামাল হোসেনকে গ্রামীণ পরিবারের ‘বিশেষ’ বন্ধু হিসেবে ফ্রেন্ডস অব গ্রামীণ (Friends of Grameen)-এর তালিকায় অনারারি কমিটিতে (Honorary committee) উল্লেখ করা হয়েছে।


আবার আসা যাক অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ব্যাপারে। ২০০৬ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত এই তিন বছরেই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সাড়ে সাত লাখ পাউন্ড (১০ কোটি টাকা) অনুদান পায় সিগ্রিড রেয়্যুসিং ট্রাস্টের কাছ থেকে। সিগ্রিড রেয়্যুসিং নিজে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এমিরেটাস মেম্বারও।

অন্যদিকে জর্জ সোরস ও তার ওপেন সোসাইটি ইন্সটিউটের কাছ থেকেও নিয়মিতভাবে অনুদান পায় অ্যামনেস্টি। সিগ্রিড রেয়্যুসিং ট্রাস্ট আবার জর্জ সোরসের ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন সংস্থাকে আর্থিক অনুদান দেওয়ার পাশাপাশি অনেক প্রকল্পেই একে অপরের দাতা-সহযোগী হিসেবে কাজ করে।

২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে যখন অতিমাত্রায় গুম, খুন, আর সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়েছিল বাংলাদেশে। আর সে সময় কয়েকবার অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তদানীন্তন প্রধান আইরিন খান বাংলাদেশে ‘পারিবারিক’ সফরে এসেছিলেন। অথচ নিজের আপন চাচাতো বোনের শাশুড়ি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে ‘অফিসিয়াল’ মিটিং করে এ নিয়ে তাকে ‘শক্ত করে’ কিছু বলেননি।

বিমল কান্তি শীলসহ বাঁশখালির ভিকটিমদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করে তাদের হয়ে বিচার দাবি বা অন্যান্য বিচার-বহির্ভূত হত্যা বন্ধ বা তদানীন্তন বিরোধী দলীয় নেত্রীর উপর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ব্যাপারে সোচ্চার প্রতিবাদও করেননি আইরিন। শুধু তাই নয়, চাচাতো বোন যোবায়দা রহমানের স্বামী তারেক রহমান তখন ছিলেন ক্ষমতাসীন বিএনপির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট। বাংলাদেশ সফরের সময় তারেক রহমানের সঙ্গেও একটি ‘অফিসিয়াল’ সাক্ষাত করতে দেখা যায়নি আইরিন খানকে। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, আইরিন তখন তাদের সঙ্গে মিটিং না করলেও তারেক-যোবায়দা দেশছাড়ার পরপরই ‘অফিসিয়াল’ সফরে এসে ২০০১ থেকে ২০০৬-এ ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকারকে চাপ দেওয়া শুরু করলেন।

উপরের আলোচনাতে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ব্যাপারে খুবই ছোট্ট একটা চিত্র আমরা তুলে ধরলাম যাতে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন রকম আর্থিক ও আদর্শগত স্বার্থ দ্বারা প্রতিষ্ঠানগুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। (খুব সরলভাবে বললেও) এটা স্পষ্ট যে প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জড়িত মানুষরাও সমালোচনার উর্ধ্বে নন।

তাই আজকে আসলেই সময় এসেছে এটা ভেবে দেখার যে মানবাধিকার সংস্থা থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ সংক্রান্ত রিপোর্টগুলো কতটুকু নিরেপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি বা প্রেক্ষাপট থেকে লেখা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ যোগসূত্রগুলো হয়তো নিদেনপক্ষে ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।আর আমাদের ভাগ্য খুব খারাপ হলে, হতে পারে যে সূত্রগুলো সব আসলে একই সূতোয় গাঁথা!

যেটাই হোক না কেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে তাই আমরা অনুরোধ করব, বাংলাদেশের বাইরে থেকে প্রকাশিত হলেই বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার বরাত দিয়ে বললেই কোনো সংবাদ বা মন্তব্যকে ঢালাওভাবে স্বার্থহীন, নিরপেক্ষ বা স্বাধীন বলে রায় না দিয়ে দায়িত্বশীলতার খাতিরে আগে একটু যাচাই করে দেখুন, আসলেই তাতে কতটুকু পেশাদার ও নিরপেক্ষ মতামতের প্রতিফলন ঘটেছে।

একটি বিষয় সবসময় মনে রাখতে হবে, যে দেশের জন্ম মানবসভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ গণহত্যা দিয়ে, যে দেশের রাষ্ট্রভাষা জনসংখ্যার বিচারে গোটা বিশ্বে সপ্তম– সে দেশের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও অর্জনগুলোও কিন্তু কম আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়।

ড. আঞ্জুমান ইসলাম : পানি পরিশোধন ও পরিবেশ প্রকৌশলী। ওমর শেহাব : ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড, বাল্টিমোর কাউন্টিতে কম্পিউটার সায়েন্সে পিএইচ-ডি অধ্যয়নরত।
বিডিনিউজ

Monday, September 23, 2013

শেখ হাসিনা, প্রাইম মিনিস্টার অব বাংলাদেশ- ওয়ান অব দ্য মোস্ট পাওয়ারফুল উইমেন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড: স্যার ডেভিড ফ্রস্টের শেষ সাক্ষাৎকার


সমসাময়িক পরিস্থিতি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের অবদান, রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য তুলে ধরেছে কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল জাজিরা। শুক্রবার রাত দু'টায় খ্যাতিমান ব্রিটিশ সাংবাদিক স্যার ডেভিড ফ্রস্টের নেয়া এ সাক্ষাৎকারটি প্রচার করা হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সাক্ষাৎকারগ্রহণে অনন্য কীর্তিধারী কীর্তিমান এই সাংবাদিকের নেয়া কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের সর্বশেষ আলেখ্য ছিল এটি । বাংলাদেশের স্বাধীনতার নায়ক বঙ্গবন্ধু শীর্ষক তথ্যচিত্রের অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধুতনয়া শেখ হাসিনা ও দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারও নেন প্রখ্যাত এই সাংবাদিক। ১০ থেকে ১২ জুনের মধ্যে ধারণ করা এই সাক্ষাৎকারে উঠে আসে দেশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভাবনা, দেশের সমসাময়িক পরিস্থিতি, বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, নির্বাচন ও রাজনীতির নানা কথা।
তথ্যচিত্রে বঙ্গবন্ধুর কিছু দুর্লভ ফুটেজ স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে বিমান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর পা রাখার ফুটেজও আছে। ফ্রস্টই প্রথম বিদেশী সাংবাদিক, যিনি স্বাধীন বাংলাদেশের নেতা হিসেবে দেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধুর প্রথম সাক্ষাৎকার নেন। তথ্যচিত্রের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে ডেভিড ফ্রস্ট হাইকমিশনার ও তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েকবার বৈঠক করেছিলেন। দীর্ঘ ৪৭ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের এ তথ্যচিত্রের শুরুতেই বলা হয়, শেখ হাসিনা, প্রাইম মিনিস্টার অব বাংলাদেশ। ওয়ান অব দ্য মোস্ট পাওয়ারফুল উইমেন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ডেভিড ফ্রস্টের নাম। স্বাধীনতাযুদ্ধের পর পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎকার নেন তিনি। ওই সাক্ষাৎকারেই এদেশবাসীর ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দেন বঙ্গবন্ধু। সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হওয়ার বিষয়টি। সাক্ষাৎকার নিতে কখনও বঙ্গবন্ধুর অফিসে, কখনও তার বিখ্যাত সেই ছোট্ট নীল সরকারি গাড়িতে, কখনও ৩২ নম্বর বাড়ির শোয়ার ঘরে, বারান্দায় বা লনে গেছেন ফ্রস্ট। বঙ্গবন্ধুও ব্যস্ততার মধ্যে ডেভিড ফ্রস্টের সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। ওই সাক্ষাৎকারটি বিবিসিতে প্রচারিত হওয়ার পর পরই সারাবিশ্বে বাংলাদেশের ইমেজ নতুনভাবে সৃষ্টি হয়।
এবার বাংলাদেশের মাটিতে এসে প্রথমেই ব্রিটিশ এ প্রবীণ সাংবাদিক ছুটে যান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে। এ বাড়িতেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে স্বাধীনতার পরাজিত শত্র“দের হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন বঙ্গবন্ধু। সেখানে এখনও জাতির পিতার রক্তের দাগ লেগে আছে, বীভৎস হত্যাযজ্ঞের আলামতগুলো এখনও স্পষ্ট। ডেভিড ফ্রস্ট ঘুরে ঘুরে সেই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের আলামত প্রত্যক্ষ করেন এবং তার সঙ্গে থাকা আল জাজিরার প্রতিনিধিরা ডকুমেন্টারির জন্য প্রয়োজনীয় ফুটেজও সংগ্রহ করেন।
এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে হেলিকপ্টারযোগে টুঙ্গিপাড়ায় যান ডেভিড ফ্রস্ট। যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেখানে গিয়েই প্রধানমন্ত্রীর পর বঙ্গবন্ধুর মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি। এরপর বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত বাসভবনে প্রায় আড়াই ঘণ্টা অবস্থানকালে ব্রিটিশ এ সাংবাদিক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। শুক্রবার রাত দুটার দিকে আল জাজিরাতে প্রচারিত হয় এক ঘণ্টার এ সাক্ষাৎকার।

ডেভিড ফ্রস্ট : যুক্তরাজ্যের কেন্টে ১৯৩৯ সালের ৭ এপ্রিল জন্ম নেন ডেভিড ফ্রস্ট। দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে সাংবাদিকতা, টেলিভিশন উপস্থাপনা, রম্য লেখনীসহ বিভিন্নধর্মী কার্যক্রমে জড়িত ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন বিবিসিতে কাজ করার পর ২০০৬ সালে কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল জাজিরার জন্মলগ্নে এর সঙ্গে যুক্ত হন ফ্রস্ট। তিনিই একমাত্র টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, যিনি ১৯৬৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনরত আটজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। পাশাপাশি ১৯৬৯ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে দায়িত্বে থাকা সাত মার্কিন প্রেসিডেন্টেরও সাক্ষাৎকার নেয়ার অনন্য কীর্তি স্থাপন করেন তিনি। ৩১ আগস্ট চৌকস এই সাংবাদিকের মৃত্যু হয়।

সিরিয়ায় ‘যৌন জিহাদ’ করছেন তিউনিসিয়ার নারীরা!


তিউনিসিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লতিফ বেন জেদদৌ বলেছেন, তাঁর দেশ থেকে বহু নারী সিরিয়ায় পাড়ি জমিয়ে সেখানকার সরকারবিরোধী ইসলামপন্থীদের ‘জিহাদে’ যোগ দিয়েছেন। তবে ওই নারীরা অস্ত্র নিয়ে লড়াই চালাচ্ছেন না। ‘জিহাদ-আল নিকাহ’ হিসেবে পরিচিত যুদ্ধকালীন সাময়িক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তাঁরা মুজাহিদদের ‘উদ্দীপ্ত’ করে পরোক্ষভাবে ‘জিহাদ’ করছেন। ‘হাফিংটন পোস্ট’-এর এক প্রতিবেদনে এ খবর জানানো হয়েছে।
পার্লামেন্ট অধিবেশনে দেওয়া বক্তৃতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেন জেদদৌ বলেন, ‘তিউনিসিয়া থেকে সিরিয়ায় যাওয়া ওইসব নারী ২০, ৩০, ১০০ জনের সঙ্গে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হচ্ছেন। জিহাদ আল নিকাহর নামে অবাধ যৌনাচার শেষে গর্ভবর্তী হয়ে দেশে ফিরছেন।’ তবে সিরিয়ার জিহাদিদের ঔরসজাত সন্তান পেটে নিয়ে এ পর্যন্ত কতজন তিউনিসিয়ায় ফিরেছেন, সে ব্যাপারে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
সুন্নি সালাফিপন্থী কিছু আলেমের মতে, যুদ্ধকালীন সাময়িক বিবাহ বা ‘জিহাদ আল নিকাহ’ বৈধ। এই ধরনের ‘জিহাদি বিবাহ’তে কোনো মুসলিম নারী কোনো মুজাহিদকে বিয়ে করে তাঁর যৌনসঙ্গী হতে পারেন। আবার দ্রুতই তাঁরা বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন। এই ধরনের সাময়িক বিয়ের মাধ্যমে একজন নারী এক দিনে একাধিক পুরুষের শয্যাসঙ্গী হতে পারেন। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে বিদ্রোহীদের দলে যোগ দিতে তিউনিশিয়ার বিপুলসংখ্যক তরুণ এখন সীমান্ত পাড়ি দিতে চান। এমন ছয় হাজার তরুণকে গত মার্চে আটকানো গেছে বলে জানান তিউনিশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মিডিয়ার খবর থেকে জানা যায়, গত ১৫ বছরে তিউনিশিয়ার কমপক্ষে এক হাজার তরুণ জিহাদিদের দলে যোগ দিয়েছেন। তাঁরা আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ায় গেছেন। মূলত তাঁরা তুরস্ক ও লিবিয়া হয়ে ওই দেশগুলোতে গিয়ে জিহাদিদের সঙ্গে ভিড়েছেন।

Friday, September 20, 2013

আমার বাবা কর্নেল তাহের : জয়া তাহের


আমাকে যখনই কেউ জিজ্ঞাসা করেন, কর্নেল তাহেরের মেয়ে হিসেবে আপনার অনুভূতি কি? আমার চোখের সামনে এক নিমেষেই ভেসে ওঠে ৪০ বছরের অসংখ্য স্মৃতি। আমি অপ্রস্তুত হয়ে যাই। কিছুই আর বলা হয়ে ওঠে না। এ অনুভূতি এক লাইনে বলবার নয়।

আমি ফিরে যাই, আমাদের সেই নারায়ণগঞ্জের বাসায়। শীতলক্ষ্যা নদীর পাশে বড় দোতলা বাড়ি। দোতলায় নদীর দিকে মুখ করে ছিলো পাশাপাশি দু’টি রুম। একটিতে আম্মা যিশু ও মিশুকে (আমার দুভাই) নিয়ে ঘুমাতেন। আর আরেকটিতে আমি বাবার সঙ্গে ঘুমাতাম। আমি সকাল বেলা ঘুম ভেঙ্গেই দেখতে পেতাম, নীল আকাশ।

ঘর থেকে বের হলেই ছিল ঝুলন্ত বারান্দা। বাবা গাড়িতে করে এলেই আমি দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতাম।
সময়টা ছিল ১৯৭৪ সাল। আমি তখন ছিলাম ৪ বছরের। যিশু ২ বছর ও মিশু ৯ মাস।

মাঝে মাঝে রাতের বেলা বাবা-মা বাড়ির লনে ঘুরে বেড়াতেন। আর আমি তাদের পাশে পাশে ঘুরতাম। নিচতলায় ছিলো বসার ঘর আর ডাইনিং রুম। বসার রুমে ছিল সারি সারি বই। ঢাকার এলিফ্যান্ট রোড থেকে আমার ইউসুফ চাচা তার ছেলে শ্রাবণকে নিয়ে বেড়াতে আসতেন। বাবা একপা নিয়েই দৌড়ে আমাদের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন।

একদিন খাবার টেবিলে বাবা বললেন, ‘দেখো তো তোমার জন্য নিচে কি অপেক্ষা করছে?’ আমি খাবার টেবিলের নিচে হামাগুড়ি দিয়ে দেখি, একটা বিড়াল। বিড়ালটা বহুদিন আমার সঙ্গে ছিলো। আমরা প্রায়ই ঢাকায় যেতাম। আমি প্রতিবার গাড়িতে বমি করতে করতে ফেরত আসতাম। বাবা বলতেন, ‘কবে যে আমার মেয়েটা ঠিক হবে........’

বাসার পাশেই ছিল বড় পাট গুদাম। যেখানে বানর থাকতো। বানররা কলা খেতে প্রায়ই আমাদের বাগানে চলে আসতো। আমাদের বাসায় কাজ করতো মনিকা নামের একজন মেয়ে। আমাকে একা পেলেই খুব সাজাতো। আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ছিলো তখন।

তারপর হঠাৎ একদিন বাবা বাসায় আসা বন্ধ করলেন। তার কিছুদিন পরই এক জিপ ভর্তি মানুষ রাইফেলের ফাঁকা আওয়াজ করতে করতে বাড়ির চারপাশে টহল দিতে শুরু করে। তারও কিছুদিন পর আমাদেরকে বাসা ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আম্মা একটা স্যুটকেসে আমাদের সবকিছু নিয়ে কিশোরগঞ্জে নানার বাসায় চলে আসেন।

সবার কাছ থেকে জানতে পারি, বাবা জেলে। তারও অনেক মাস পরে হঠাৎ করে আমাদেরকে জেলখানায় বাবার সঙ্গে দেখা করতে বলা হলো। আম্মা যিশু আর আমাকে নিয়ে ঢাকায় এলেন। মিশু খুব ছোট বলে নানুর কাছে রয়ে গেল। জেলখানার বাইরে দাঁড়িয়ে আমার খুব লজ্জা করছিলো বাবার সঙ্গে দেখা করতে। বাবা আমাকে আর যিশুকে কলা খেতে দিয়েছিলেন। বাবার সঙ্গে সেই আমার শেষ দেখা।

১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই ভোর রাতে বাবার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। আমাদের একটা হেলিকপ্টার দিয়ে পাঠানো হয় আমাদের গ্র্রামের বাড়ি কাজলায়। সংগে ছিলো দাদুমনি, জলি ফুফু, আম্মা, আম্মার কোলে যিশু, ছোট মামা, বড় চাচা, চাচী। যে কাপড় দিয়ে বাবাকে ঢাকা ছিলো তা পুরোপুরি বাবার শরীর ঢাকতে পারছিল না। চুল আর পা বেরিয়ে ছিলো। আমি হেলিকপ্টারের জানালা দিয়ে ছোট হতে যাওয়া মানুষগুলোকে দেখছিলাম। সেই আমার প্রথম হেলিকপ্টারে চড়া।

কাজলায় স্কুল মাঠে বাবাকে নামানো হয়। আমরা অপেক্ষা করি আমাদের আরেক মুইনুদ্দিন দাদার শ্যামগঞ্জের বাসায়। দুপুর বেলা বাবাকে গোসল করানোর পর ছোট মামা কাঁদতে কাঁদতে আমাকে উঁচু করে বাবার মুখ দেখান। আমি দেখতে পাই শান্ত একটা মুখ। আমার তারপরও বিশ্বাস হয়নি, বাবা মারা গেছেন। কল্পনা করেছি কতবার, বোধহয় ওটা সাজানো কোনো ডামি ছিলো। বাবাকে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি হয়তোবা কোথাও হাঁটছি, আমাকে পেছন থেকে চমকে দিয়ে ফিরে আসবেন বাবা।

সেই কাজলায় রয়ে গেলাম আমরা একমাস। প্রতিদিন আমরা কবরে যেতাম। কবরের পাশে ঘাঁটি গেড়ে ছিল একদল সশস্ত্র পুলিশ। তারা কবরটা একমাস ধরে পাহারা দিয়েছিলেন। আজ ভাবলেও তা হাসি পায়।

সেখান থেকে আমরা চলে আসি কিশোরগঞ্জে। নানা ছিলেন কিশোরগঞ্জের নামকরা ডাক্তার। তার কিছুদিন পরে আমরা ঢাকায় আসি। উঠি মোহাম্মদপুরে বড় চাচার বাসায়। আম্মা চাকরিতে যোগ দেন। তার কয়েক মাস পরে মোহাম্মদপুরে একটি সরকারি কোয়ার্টার পান আম্মা। দুই রুমের একটি ড্যাম্প পরা বাসাটার আশেপাশে ছিল বস্তি। যার থেকে অনবরত ভাবে ভেসে আসতো গালিগালাজ। আম্মা প্রতিদিন হেঁটে গিয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করতেন।

আমাকে ভর্তি করানো হয় কাছের একটি স্কুলে। মিশু রয়ে যায় নানুর কাছে। আরও পরে যিশুকে পাঠানো হয় হোস্টেলে। আমাদের একটি সাজানো সংসার যেন এক নিমিষেই এক কালবৈশাখী ঝড়ে ভেঙে খান খান হয়ে যায়।

যিশু যেদিন প্রথম হোস্টেলে যায়, আম্মা কেঁদেছিলেন আকুল হয়ে। জলি ফুফু ও ডলি ফুফু তাদের স্কলারশিপের সামান্য কিছু টাকা দিয়ে নিয়ে এসেছিলেন যিশুর জন্য নতুন জামা, জুতা। যিশুর পড়াশোনার দায়িত্বভার নিয়েছিলেন আমার লন্ডনে বসবাসরত বড় মামা। আমাদের পুরো পরিবারের কারোরই তেমন কোনো টাকা-পয়সা ছিল না। কিন্তু এক বিশাল বন্ধনে আমরা ছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকারাবদ্ধ।

প্রতি বছর আমরা যখন কিশোরগঞ্জে যেতাম, আম্মা মিশুকে নিয়ে শুতে চাইতেন। আস্তে আস্তে বলতেন, আমাকে মা বলো, মিশু কিছুতেই বলতো না। মিশু তখন নানুকে মা ভাবতো। তারপর বছর গড়িয়ে মিশুও আমাদের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসে, যখন তার বয়স ৫ বছর। আম্মার সামান্য বেতনটুকুই ছিল আমাদের একমাত্র সম্বল।

ওই সময় জাসদের অধিকাংশ নেতাকর্মীসহ আমাদের সব চাচারা জেলে ছিলেন। আমাদের বাসার সামনে একটা সাদা গাড়ি সারাদিন বসে থাকতো। পরে জেনেছি, তারা ছিলেন স্পাই। আমাদের সব গতিবিধি লক্ষ্য করতেন। আমাদের বাসায় কেউ আসতে পারতেন না। যারা আসতেন তারাও লুকিয়ে আসতেন।

আমরা জেলখানায় ইউসুফ চাচা, বেলাল চাচা, মনু চাচা ও অন্যান্য নেতাকর্মীদের দেখতে যেতাম। আমি প্রতিবার মন খারাপ করে যেতাম। মনে হতো, যদি বাবা থাকতেন। হতোই বা সারা জীবন জেলে, তাওতো দেখা হতো। আমার তখন বোঝার যথেষ্ট বয়স হয়েছে।

১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর চাচারা ও অন্যান্য নেতাকর্মীরা জেল থেকে ছাড়া পেতে শুরু করেন। জাসদ তখন বিরাট এক শক্তি। আমাদের ছোট বাড়িটায় মানুষ গম গম করতো। কত ধরনের মানুষ যে আসতো তখন। তাদের সবার স্বপ্ন ছিলো একই। এক সুস্থ সমাজ ব্যবস্থা যেখানে সবার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। আমার খুব বেশি ভাল লাগতো তাদেরকে। তারা যে স্বপ্নের কথা বলতেন, তা আমি মনোমুগ্ধের মতন শুনতাম। তারা বেশির ভাগ ছিলেন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট- বুয়েট, মেডিকেল বা ইউনির্ভাসিটির ছাত্র-ছাত্রী। তারা ছিলেন টগবগে সাহসী কিছু তরুণ-তরুণ । সে সময় তাদেরকে একটি শুকনো বিস্কিট আর চা ছাড়া আমাদের দেবার আর কিছুই ছিল না।
আমার খুব বেশি মায়া লাগতো। আম্মার কাছে শুনতাম, তাদের বেশির ভাগই অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলেমেয়ে। একটা নষ্ট সমাজ বদলে দেবার স্বপ্নে তারা সকল কিছু ছেড়ে এসেছিলেন। হাজারো মানুষের মশাল মিছিল হতো তখন।

বেলাল চাচা আমাদের শিখিয়ে ছিলো একটা গান-
‘বন্ধু, বলতে পারো, সামনের পৃথিবীটা কার
শ্রমিক না মজুর, না সর্বহারার
আজকে এসেছে দিন একভাবে
আসবে আবার দিন নতুন করে
সেদিন আবার নতুন করে বিচার হবে
বন্ধু..................’

নিশ্চয় বেলাল চাচার কোনো অবসরে মনে পড়বে সেসব কথা। আমরা কাজলায় রাতের বেলায় আগুনের পাশে গোল হয়ে বসে সুর করে সেই গান গাইতাম।

মনে হয় এইতো সেদিন, রমনার বটমূলে নেমেছিলো হাজারো মানুষের ঢল। আমরা পৌঁছা মাত্র মেজর জলিলচাচা মঞ্চ থেকে ফুল নিয়ে আমার হাতে দিলেন। ‘কর্ণেল তাহের লাল সালাম’ এর প্রতিধ্বনিতে আকাশ বাতাস প্রলম্বিত হয়ে উঠত যেন। আমি সেদিন তাদের প্রত্যেকের চোখের তারায় দেখেছিলাম কর্নেল তাহেরকে।

তারপর কি হলো! যেসব নেতা একদিন স্ত্রী, সন্তান, বাবা, মা, ভাই, বোন কারো কথা চিন্তা না করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এক নতুন সমাজ গঠনের দায়িত্বে, তাদের অনেকেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, ক্ষমতা, লোভ, লালসার কাছে বিক্রি হতে থাকলেন! আন্দোলন পড়লো মুখ থুবড়ে। যে নেতারা একদিন মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তাদের অনেকেই মাঝপথে যেন সেটাই ভুলে গেলেন!

আর শত শত কর্মী যারা বিশ্বাস করেছিলেন, তাদের নেতাদের কথা- তাদের কেউ কেউ হতাশার গভীরে নিমজ্জিত হয়ে অন্ধকার জগতে চলে গেলেন। কেউ কেউ পাড়ি জমালেন বিদেশে। কেউ কেউ, নীতি আদর্শ বিসর্জন দিয়ে সেই নেতাদেরই তোষামোদ করে টিকে থাকার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন। কেউ কেউ ভাঙ্গা মন নিয়ে আবারো ঘরে ফিরে গেলেন।

তাদের সেই ভাঙ্গা মন আর কোনো দিন জোড়া লাগেনি। আর দুই একজনকে আমি হঠাৎ হঠাৎ দেখি- তাদের চশমা হয়েছে ভারি, চুলে পাক ধরেছে। তারা মানাতে পারেননি কোনো কিছুর সঙ্গেই। বড় একা.......

যে কর্নেল তাহের মৃত্যুর আগে তার শেষ চিঠিতে লিখে গেছেন, ছোট ছোট উলঙ্গ শিশুদের নিরাপদ বাসস্থানের কথা, তাদের জীবনেও কোনো পরিবর্তন আসেনি। ছোট ছোট শিশুরা আজও রাস্তায়।

আর আমি- বহু বছর এক তীব্র রাগ, হতাশা, ঘৃণা বুকে পুষে ছিলাম। আম্মা যখন দেশ বদলের আশার কথা বলতেন, তাকে তীব্র অপমানে বিদ্ধ করতে আমার এক বিন্দু বাঁধতো না। পালিয়েছি আমি সকল কিছু থেকে। রাজনৈতিক খবরে আমার ছিল উদাসীনতা। হঠাৎ করে কি ভেবে যেন কর্নেল তাহের সংসদের নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করি। আসা শুরু হয় শত শত চিঠি। প্রতিদিন.......

অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, চিঠির লেখকদের বেশিরভাগই এই প্রজন্মের তরুণ-তরুণী। তারা জানতে চান কর্নেল তাহেরকে। তারা সচেতন বুদ্ধিমান বলিষ্ঠ নাগরিক। তাদেরকে মিথ্যা দিয়ে ভোলানো এতো সহজ নয়। নেতা চিনতে তাদের কোনো ভুল হয় না।

সেদিন রমনার বটমূলে হাজারো মানুষের ঢলে আমি কর্নেল তাহেরের মুখ দেখেছিলাম। আমি আজ আর কর্নেল তাহেরকে তাদের মাঝে দেখতে পাই না। কর্নেল তাহের তাদের ছেড়ে চলে গেছেন বহু আগে। ছড়িয়ে গেছে গোটা দেশময়।

আজো তাই নতুন যুগের তরুণেরা মনে করেন, বলিভিয়ার চে’ গুয়েভারা যেন বাংলাদেশের কর্ণেল তাহের। তাদের বুকে দেখি, কর্নেল তাহেরের সম্বলিত টি-শার্ট। তারা জেনে গেছেন, বাংলার ইতিহাসে ক্ষুদিরাম-সূর্য সেনের মতো কর্নেল তাহেরও কোনো অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করেননি। তাদের বুকে গেঁথে গেছে তাহেরের শেষ চিঠির কয়েকটি শব্দ-

‘নিঃশঙ্ক চিত্তের চেয়ে জীবনে আর বড় কোনো সম্পদ নেই’
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

Thursday, September 19, 2013

বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ, এখানে কেউ ফতোয়া দেবেন না মমতাজ লতিফ


কী যে হলো, হঠাৎ একদল হুজুর সংবাদ সম্মেলন করে ‘ফতোয়া’ জারি করে বসলেন। কই এর আগে কোন মৌলানা দলকে তো কখনই ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যাকারী, বাঙালী নারীর ধর্ষক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতা বা ডাক্তার, প্রকৌশলী, সেনা, পুলিশ, মুক্তিযোদ্ধাদের পরিকল্পিত হত্যাকা-ের হোতাদের বিরুদ্ধে ‘তারা কাফের, তারা জেনাকারী, হত্যাকারী হিসেবে যে স্বাধীনতার তারা বিরুদ্ধাচারণ করেছে, সেই স্বাধীন দেশে তাদের ঠাঁই হবে না,’ বলে এমন কোন ফতোয়া দিতে শুনিনি। তারা তো ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বা মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় অপরাধীÑ ফতোয়া যদি কেউ দিতে উদ্বুদ্ধ হতেন, তবে এদের ফতোয়া দিয়ে রাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের দাবি করতেন। মাঝখান থেকে তসলিমা নাসরিন বা দাউদ হায়দারকে তালেবানপন্থী একদল কট্টর জঙ্গীবাদী মোল্লা দেশছাড়া করেছিল যে দেশের স্বাধীনতায় ওই মোল্লার দলের কোন অবদান ছিল না। তরিকত ফাউন্ডেশন যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতের সংবিধানবিরোধী অবস্থান ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম নিষিদ্ধের জন্য রিট পিটিশন করে হাইকোর্টের কাছ থেকে একটি কাক্সিক্ষত ঐতিহাসিক রায় জনগণকে উপহার দিয়েছে, এজন্য তাঁরা ধন্যবাদার্হ।
কিন্তু স্মরণ রাখতে হবে, মুসলিম দেশগুলোতে বা ভারতেও মুসলিম নারীরাই মুসলিম পুরুষের অন্যায় ফতোয়ার শিকার হয়েছে। আশ্চর্য হলেও সত্য এই যে, এই মৌলানারা কোন নারীর সন্তান, কোন নারীর কাছ থেকে তাঁরা বিবাহিত জীবনের আনন্দ লাভ করেছেন, কেউ বা প্রেম লাভ করেছেন, তাঁদের সবারই আছে পুত্র ও কন্যা, বোন, খালা, চাচি, ফুফু। নয় কি? তারপরও দেখা গেল, শ্বশুরের দ্বারা ধর্ষিতা নারীটি তার স্বামীর (স্বামীর মতে) সঙ্গে থাকতে চাইলেও ফতোয়াবাজ মৌলানারা শ্বশুরের সঙ্গে থাকার আদেশ দেয়। রাজিব গান্ধীর উদ্যোগে মুসলিম নারীদের সমঅধিকারের আইনটি দিল্লীভিত্তিক মুসলিম মৌলানাদের দলের প্রবল বাধার কারণে সংসদে পাস হতে পারেনি। শ্বশুর দ্বারা পুত্রবধূ ধর্ষণের চেষ্টা বা ধর্ষণ, এমনকি এ কাজে শাশুড়ি বাধ্য হয়ে স্বামীর হুকুম পালনে সহায়তা করেছেÑএমন অসংখ্য উদাহরণ পর্দার অন্তরালে সঞ্চিত আছে-এ কথা মৌলানারাসহ জনগণ ভালভাবেই জানেন।
এ গেল এক ধরনের নারী নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ফতোয়ার ব্যবহার। ফতোয়ার দ্বিতীয় অপব্যবহার অতি উচ্চমাত্রায় হচ্ছেÑএটি হলো, ‘হিল্লা বিয়ে’ ও ‘তালাক’ হওয়া সম্পর্কিত। এ আলোচনায় যাওয়ার আগে আমি দেশের সব বড় আলেম-মৌলানাদের কাছে একটি প্রশ্ন করব, এই একবিংশ শতাব্দীতে যেখানে খ্রিস্টান, ভারতে হিন্দু নারীরা ‘তালাক’-এর ক্ষেত্রে কোন রকম ‘হিল্লা বিয়ে’ নামের সম্পূর্ণ অমানবিক ঘৃণ্য নারীর জন্য দ্বিতীয় প্রকৃতির ধর্ষণের ব্যবস্থা করে যেসব মৌলানা, তাদের বিরুদ্ধে আপনারা কখনও ফতোয়া দিয়েছেন কি? অথবা তাদেরকে বিচারে সোপর্দ করেছেন কি? জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে বিচারপতি গোলাম রব্বানী ও বিচারপতি নাজমুন নাহার ফতোয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একটি ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিলেন, যেটি খুব সম্ভব আপীল বিভাগে এখনও আটকে আছে। মৌলানাদের নিজ কন্যাদের ও বোনদের আইয়ামে জাহিলিয়া যুগের পুরুষের ইচ্ছায় বিবাহিতা নারীকেও অন্য পুরুষের কাছে ‘আইনী’ভাবে ধর্ষিতা হবার ধর্মের নামে সমাজে প্রচলিত অপরাধমূলক ফাক-ফোঁকরগুলো বন্ধ করতে এগিয়ে আসতে হবে। এটা বলাবাহুল্য। গ্রামেগঞ্জে এই ‘তালাক’ নিয়ে ‘হিল্লা’ বিয়ের মাধ্যমে ধর্ষণ হচ্ছে, তা বন্ধ করা মৌলবী-মোল্লাদের একটি অন্যতম দায়িত্ব। তাঁরা সে দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসবেন এবং অন্তত, কন্যা ও বোনদের নারী নির্যাতক ফতোয়াবাজদের হাত থেকে রক্ষা করবেন, অন্যকিছু করার আগে এটাই তাঁদের জন্য কর্তব্য হিসেবে অগ্রগণ্য।
এছাড়াও মৌলানাদের একটি বড় দায়িত্ব হচ্ছে, দেশের সংখ্যালঘুদের সংখ্যাগুরুর দ্বারা নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ এর শিকার হওয়া, তাদের বসত-জমি-জীবিকা দখল হওয়া থেকে রক্ষা এবং সর্বোপরি তাদের প্রাণের নিরাপত্তা প্রদান যে সংখ্যাগুরুর দায়িত্ব, এই তথ্য প্রচারের মাধ্যমে সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করা, পাড়া-মহল্লায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা। ইসলামের নবী সঠিকভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে সংখ্যাগুরুর হাতে ‘আল্লাহর আমানত’ হিসেবে গণ্য করতে বলেছেন। তাদের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব সংখ্যাগুরুর হাতেই, এ কথা মৌলানাদের উপলব্ধি করতে হবে এবং একই সাথে ইসলাম ধর্মের এ মহৎ সুশিক্ষার পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে। মৌলানা সাহেবরা দেশের সংখ্যালঘুর, হিন্দু আদিবাসী ভূমিগ্রাসকারীদের বিরুদ্ধে ফতোয়া নয়, সামাজিক বয়কট, তাদের বিচারে সোপর্দ করতে এগিয়ে আসবেন, এটিই জনগণের প্রত্যাশা।
মৌলানা সাহেবরা কোথায় আমেরিকায় বাংলাদেশের একজন ব্যক্তি ওই দেশের একটি অঙ্গরাষ্ট্রের আইনী অধিকার সমকামী বিবাহ সম্পর্কে তাঁর ‘ব্যক্তিগত মত’ প্রকাশ করেছেন বলে তাঁকে ‘দেশ ছাড়া’ করবার ফতোয়া দেবার প্রয়োজন ছিল না। মানবাধিকারে ব্যক্তিগত মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে উচ্চ স্থান দেয়া হয়। একটা কথা না বললে এ বিষয়টা পরিষ্কার হবে না। পশ্চিমা দেশগুলোতে ধর্ম ব্যক্তির চর্চার বিষয় কিন্তু রাষ্ট্র সব ধর্মের এবং আস্তিক-নাস্তিক সবার জন্য অধিকার রক্ষার জন্য আইন তৈরি করে। যদিও আমেরিকা বা ইউরোপের দেশগুলোতে সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র কোন ধারা যুক্ত নেই। সত্যি বলতে, ওদের ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মানবাধিকার চর্চার ব্যাপক বিস্তৃতির সুযোগে আমাদের দেশের বা এশিয়া, আফ্রিকার সন্ত্রাসী, খুনী, জঙ্গী জেহাদীরা পশ্চিমা দেশেই ঠাঁই গেড়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী, তাদের সন্তানরা ’৭১-এ অনেক যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সন্তানেরা তো পশ্চিমা দেশেই বসবাস করছে। জঙ্গী জেহাদীরা মালয়েশিয়াতেও বসবাস করছে যাদের অনেকেরই টার্গেট ওখান থেকে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া পাড়ি দেয়া। এই জঙ্গীদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ বেশি জরুরী।
আমাদের তদানীন্তন শাসকদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ময়মনসিংহে সে সময়ে সিনেমা হলে জঙ্গীদের বোমা হামলা, ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের ওপর হাওয়াভবনে পরিকল্পিত শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত গ্রেনেড হামলাকে পর্যন্ত অবিশ্বাস্য জেনেও আওয়ামী লীগের দ্বারাই সেসব সংঘটিত বলে যে মিথ্যা ভিত্তিক অপরাজনীতি, দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি করেছিল, সেই মিথ্যা পশ্চিমারা বলে না। কিন্তু তাদের কোন মিত্রকে যদি কখনোও আত্মবিশ্বাসী, আত্মনির্ভরশীল, নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিতে দেখে, তাহলে যুদ্ধাস্ত্র যাদের ব্যবসার প্রথম পণ্য, সেই পশ্চিমারা তাকে কিভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ সাদ্দাম ও গাদ্দাফী। এমন কি আফগানিস্তানে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো ধ্বংস করার জন্য তারা জন্ম দিয়েছিল ও বিকশিত করেছিল সস্ত্রাস, জঙ্গী দল আল কায়েদা, তালেবান ও লাদেনকে! সে অবমুক্ত দৈত্যকে আবার পরে তাদেরই হত্যা করতে হয়েছে ও হচ্ছে! দুনিয়ার তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ-সব কিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পশ্চিমারা এক পুতুল খেলায় রত, যে খেলায় কোন একভাবে দরিদ্র দেশগুলোকেও খেলতে হচ্ছে! তবে পশ্চিমা সাধারণ নাগরিকরা যুদ্ধ ও এসবের বিরুদ্ধবাদী এবং ওদের ব্যক্তি স্বাধীনতা, বাক-স্বাধীনতা ও মানবাধিকার প্রীতি এসবের প্রতি গভীর আস্থা না থাকলে আজ আমাদের লেখক তসলিমা নাসরিন, দাউদ হায়দার, সালমান রুশদীরা প্রাণে বাঁচতে পারত না। খেয়াল করে দেখুন, এই মুরতাদ, কাফের নাম দিয়ে মুসলমান উগ্র জেহাদী মৌলানারাই তাদের কতল করবে বলে ঘোষণা দিচ্ছে-যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ! মসুলমান ছাড়া অন্য কোন ধর্মীয় সম্প্রদায় সারা দুনিয়ায় কোন কবি লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীকে কত্্ল্যোগ্য দাবি করেনি! এমন কি এখনকার জঙ্গী, ইংরেজী মাধ্যমে শিক্ষিত তরুণরাও মুক্তিযুদ্ধপন্থী এখন প্রগতিশীল ব্লগারদের কতল্যোগ্য ঘোষণা করছে, কত্লও করছে!
’৭১-সালের রাজাকার গোলাম আযম, নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদীদের উত্তরসূরী বর্তমান যুগের ইংরেজী মাধ্যমে শিক্ষিতদের মধ্যেও যদি জঙ্গী খুনী জন্ম নিতে পারে, মাদ্রাসায় তো কিছু সংখ্যক জন্ম নিচ্ছেই-তাহলে মৌলানারা এই জল্লাদ-সৃষ্টিকারী মসুলিম মৌলানাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ও সংশোধনমূলক প্রচার কর্মকা- শুরু করবেন।- এটাই অনেক বেশি কাক্সিক্ষত ও প্রয়োজনীয়। পশ্চিমাদের ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সম্মান করার ফলে একজন শিশুকে মা-বাবা জন্মদান করে তবে মালিক হতে পারে না, সে নির্যাতিত হলে পুলিশ ঐ মা, বাবা রাষ্ট্রের স্বাধীন নাগরিক সন্তানের দেখভালের উপযুক্ত নয় গণ্য করে শিশুকে নিজেদের তত্ত্বাবধানে নিয়ে যায়!
সবশেষে ছোট্ট করে বলতে চাই- সমকামিতা-দোষে দুষ্ট পৃথিবীর সব দেশের সব সমাজ। আমাদের কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এসবের হোস্টেল, আরও নানা স্থানকে সমকামিতার কেন্দ্রস্থল বলে চুপিসারে মানুষ সমালোচনা করে। পশ্চিমারা ওটাকে ব্যক্তির নিজস্ব অভিরুচি হিসেবে মান্য করে, সেটাকে গোপন বিষয়ে পরিণত না করতে বিবাহের আইন পাস করেছে আমেরিকার কোন কোন অঙ্গরাষ্ট্র। কে কোথায় এ বিষয়ে একমত পোষণ করল তাতে আপনাদের–আমাদের কোন ক্ষতি হবে না। আর যদি আপনারা সত্যিই ধর্ষক, সমকামী, বহু বিবাহকারী, যৌতুকদাবিকারী, নারী হত্যাকারী এবং প্রগতিশীল তরুণ-তরুণী হত্যাকারীদের দেশছাড়া করার ঘোষণা দিয়ে দাবি আদায়ের আইনসম্মত কর্মসূচী গ্রহণ করেন, তাহলে সত্যিই দেশ ও জাতির অগ্রগতি ও উন্নয়নে আপনাদের মৌলানাদের বিপুল ভূমিকা শ্রদ্ধা অর্জন করবে।

Wednesday, September 18, 2013

অগ্নিবীণার দুর্দম বাদক- বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পদক তোমাদের কপালে জোটেনি-কোটি জনগণের লক্ষ সালাম:হাসান মাহমুদ


একাত্তরের মার্চ-এপ্রিলে পাকিস্তানি সৈন্যদের আকস্মিক আক্রমণে ছিন্নভিন্ন পূর্ব পাকিস্তান, ইতিহাসের অন্যতম নিষ্ঠুর গণহত্যা-গণধর্ষণে রক্তে আর্তনাদে ভেসে যাচ্ছে দেশ। বহু মাইল স্রেফ পায়ে হেঁটে সীমানা পেরোচ্ছে লক্ষ লক্ষ আতংকিত গ্রামবাসী বুড়ো বাবা-মা’কে নিয়ে বাচ্চা কোলে নিয়ে। গ্রামবাংলার ধুলিধুসরিত পথে হাতে মাথায় ঘটি-বাটি নিয়ে গরু-ছাগলের রশি ধরে হাজার হাজার পথযাত্রীর ভীড়ে রাস্তায় বৃদ্ধার মৃত্যু রাস্তায় জন্মানো বাচ্চা। কে বিশ্বাস করবে সেই দাবানলের মধ্যে একাত্তরের এপ্রিলে রাজশাহীর ওপারে মুর্শিদাবাদ শরণার্থী শিবিরে এক কাপড়ে উপস্থিত এক পাঞ্জাবী তরুণ! চারদিকে তুমুল হৈ হৈ, ছুটে এসেছে ভারতীয় সৈন্যেরা। কি? না, আমার বাড়ী লাহোর কিন্তু আমি শরণার্থী, আমাকে খেতে দাও থাকতে দাও। ভাঙ্গা-বাংলায় কথা বলছে সে।

‘‘তারপরে কেটে গেছে কত শত কাল, তবু যেন মনে হয় সেদিন সকাল’’।
সাঁইত্রিশ বছর আগে ঘটনার ঘনঘটায় উন্মত্ত জীবন আজ গল্প হয়ে গেছে। বয়সের সব ঝড় বোধহয় এভাবেই থেমে যায় একদিন।

কটা বেড়াল-চোখ কাঁচা সোনা রঙ্গের সুঠাম সুদর্শন তরুণ আনোয়ার শাহেদ খান। যেন সিনেমার নায়ক। সাতষট্টি সালে ইÏটারউইং স্কলারশীপ নিয়ে লাহোর থেকে ফিজিক্স-এ অনার্স পড়তে এসেছিল, থাকত ফজলুল হক হলে। আমি তখন বায়োকেমিষ্ট্রিতে - ওই ফজলুল হক হলেই। কি করে যেন বন্ধুত্ব হল নিবিড়, নিবিড় থেকে নিবিড়তর। খেয়াল করতাম আমার কাছে কাছে থেকে অনুসন্ধিৎসু চোখে সে নিরীক্ষণ করছে আমাদের ওপরে পশ্চিমের নিপীড়ন আর শোষণ। আমি তখন ছাত্রলীগের চির-দুর্ভেদ্য দূর্গ ফজলুল হক হল ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি এবং হল-সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক, উন্মত্ত দিন কাটছে রাস্তায় শ্লোগানে মিছিলে, বাংলাদেশের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে ইতিহাস। কাছে থেকে থেকে দেখে দেখে আনোয়ার বুঝতে পারছে কেন আমাদের ছয় দফা, কেন ওদের এত উন্নতি আর আমাদের এত অবনতি। তার শের-শায়েরীর কাব্যিক মন ঠিকই ধরেছে ইসলামের নামে পাকিস্তানী রাজনীতির বিভৎস ঠকবাজী। তারপর সত্তরের নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে এল বিসুভিয়াসের বিস্ফোরণে। ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনষ্টিটিউটে আমি আওয়ামী লীগের পোলিং এজেন্ট আমার সাথে উপস্থিত থেকে আনোয়ার স্বচক্ষে দেখল জনতার ভৈরব গর্জন। মৃদু হেসে পরিহাস করে বলল - ‘‘আব হাম্‌ আপকো অওর রোক্‌ নেহি সাক্‌তে’’ - আর আমরা আপনাদের ঠেকাতে পারব না।

তারপর সে স্বচক্ষে দেখল পঁচিশে মার্চের তান্ডব, জানল গণহত্যা, গণধর্ষণ। সময়ের জঠরে তখন জন্ম-যন্ত্রণায় নড়ে উঠছে পাকিস্তানের মাটিতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অবিশ্বাস্য ভ্রূণ। পঁচিশে মার্চে বাজপাখীর আক্রমণে মুরগীর বাচ্চার মতন জাতি ছিটকে গেল চতুর্দিকে। সবাই ছুটল গ্রাম-জননীর সুবিশাল আশ্রয়ে, জননীও আগ্রহী হাত বাড়িয়ে কোটি সন্তানকে তুলে নিল তার কোলে। কিন্তু আনোয়ার যাবে কোথায়? এখানে তো ওর কেউ নেই, দেশটা ওর চেনাও নেই। কেউ কেউ বলল আর্মির ব্যারাকে যেতে - ওটাই ওর নিরাপদ জায়গা। কিন্তু প্রাণের নিরাপত্তার চেয়েও সৈন্যদের প্রতি ঘৃণা তখন তার অনেক বেশী। আরেক বন্ধুর বাবা তখন রাজশাহীতে চাকরী করেন, সিলেটে বাড়ী। তার সাথে কোনমতে রাজশাহী পৌঁছুল আনোয়ার, তারপরে ঘাতক সৈন্যদলের ধাক্কায় সবাই সীমানা পেরিয়ে ভারতের মুর্শিদাবাদে শরণার্থী শিবির। মে মাসে সেনাপ্রহরায় রাজশাহী ফেরা, সেনাপ্রহরায় ঢাকা এবং পরের মাসে সটান লাহোরে বাবা-মায়ের কোলে।

তারপর সে আমাদের পক্ষে হাতে তুলে নিল তার যুদ্ধের অস্ত্র, কলম। ইতিহাসে এই একটা অস্ত্র অসাধ্যসাধন করেছে বারবার। অত্যাচারীরা যে অস্ত্রকে সবচেয়ে বেশী ভয় করেছে তা হল এই, - কলম। আমাদের জীবন-মরণ মুক্তিযুদ্ধের অজানা অধ্যায় শুরু হল পাকিস্তানেও। ‘‘পদ্মা সুরখ হ্যায়’’ (রক্তাক্ত পদ্মা) নামে পশ্চিমা প্রাসাদ-ষড়যন্ত্রের পঁচিশ বছরের ঠকবাজী ও একাত্তরের গণহত্যা-গণধর্ষণের ওপর আনোয়ারের চাক্ষুষ নিবন্ধ ছাপা হচ্ছ্রে প্রতিদিন একসাথে লাহোরের দৈনিক মুসাওয়াত ও করাচীর দৈনিক ডন’-এর গুজরাটি সংস্করণে, ক্রমাগত তিরিশ দিন। হৈ হৈ পড়ে গেল দেশে। জামাতিরা ওকে কতল করার খোলাখুলি ঘোষণা দিয়ে দিল - সগর্জনে ছুটল ওকে কতল করতে। ছুটে এল সামরিক সরকারের পুলিশ আর গোয়েন্দা, নিজদেশে পরবাসী আনোয়ার লুকিয়ে গেল আন্ডারগ্রাউন্ড।

আমাদের তবু দেশ ছিল গ্রাম ছিল, স্বাধীন বাংলা সরকার ছিল বেতার ছিল, চারদিকে সংগ্রামী জাতি আর মুক্তিযোদ্ধার উপস্থিতি ছিল, আন্তর্জাতিক সমর্থন ছিল, শেষ সম্বল হিসেবে ভারতে আশ্রয় ছিল, ওর কি ছিল চতুর্দিকে অগণিত শত্রু ছাড়া? আকস্মিক আক্রান্ত হয়ে আমাদের তো যুদ্ধ ছাড়া উপায় ছিলনা, কিন্তু ওকে তো কেউ বাধ্য করেনি স্বজাতিরই বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে নামতে! এমনকি আমাদের সাথে ওর তো যোগাযোগও ছিলনা! তবু লড়ল আনোয়ার, পাকিস্তানের বুকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নিঃসঙ্গ একা। হিংস্র সরকারের গণহত্যা-গণধর্ষণ তুলে ধরা, বাবা-মা ভাইবোন থেকে দুরে - চাকরী নেই উপার্জন নেই খাবার নেই থাকার জায়গা নেই - একে আমি ‘‘পাকিস্তানের মাটীতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’’ বলব না তো কি বলব?

এ হল লাহোর। আর করাচীর মখ্‌দুম?

একাত্তরের প্রথম দিকে জাহিদ মখদুম করাচীর প্রাণবন্ত তুখোড় ছাত্রনেতা। নির্বাচনে আমাদের বিজয়ের বিরুদ্ধে ভুট্টো-ইয়াহিয়ার ষড়যন্ত্র টের পেয়েই সে ছাত্রসমাজকে নিয়ে যুদ্ধে নামল। মিটিং মিছিলের শ্লোগান, দেয়ালে দেয়ালে হাজারো পোষ্টার, সংসদের সামনে বিক্ষোভ, চীৎকারে উত্তেজনায় কাঁপিয়ে তুলল করাচী। একের পর এক বিদ্রোহী নিবন্ধ লিখতে লাগল সিন্ধী দৈনিক ‘‘ইবারত’’-এ। দেশ-শাসন করার জন্য তোমাদের সৈন্যদলে নেয়া হয়নি, জনগণের পয়সায় হাতে অস্ত্র দেয়া হয় নি। নির্বাচনে পুর্ব পাকিস্তান জিতেছে, লক্ষ্মী ছেলের মতো তাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যাও। প্রমাদ গুনল ভুট্টো, প্রমাদ গুনল সরকার। এদিকে শুরু হয়ে গেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আক্রমণ, ধীরে ধীরে কাদায় পড়ছে নাপাক বাহিনী। ওদিকে সমন জারী হল গ্রেপ্তারের, পালাতে গিয়ে ধরা পড়ল মখদুম। তারপর লারকানা, জেকোবাবাদ, শুক্কুর আর হায়দ্রাবাদ কারাগারে তার শরীরের ওপর নেমে এল কেয়ামত। স্বীকার করো তুমি ভারতের গুপ্তচর, টাকাপয়সার লেনদেন আছে। স্বীকার করো তোমার সাথে বাংলার মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন যোগসুত্র আছে। লোহার রডের প্রহার, ইলেক্ট্রিক শক্‌, অন্ধকার সলিটারি কনফাইনমেÏেট ঘুমহীন, কখনো খাবারহীন পানিহীন বন্দী জাহিদ মখদুম। কতোদিন? মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয়মাসের পরেও কিছুদিন। অথচ ‘‘ভুল করেছি’’-র মুচলেকা সই করলেই তাকে ছেড়ে দেয়া হত - তার উঁচু সে মাথা সে কখনো নোয়ায় নি।

একেও আমি ‘‘পাকিস্তানের মাটীতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’’ বলব না তো কি বলব?

শুধু ওরাই নয়, খুঁজলে কাশ্মীরের হাশিম আর আশরাফ, করাচীর গোলাম মুহাম্মদ ল’ুন কিংবা মকবুল বাট-এর মতো অনেক নামই পাওয়া যাবে। একাত্তরে আমাদের সমর্থন করে চাকরী হারিয়েছেন উচ্চপদস্থ সরকারী আমলা শাফা’য়াত হাসনায়েন। স্বাধীনতার পরে ঢাকায় ছুটে এসেছিলেন পাকিস্তানের কিংবদন্তী পুরুষ ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ - ক্ষমা চেয়ে গেছেন। ওদের লেখক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবি-সুশীল সমাজ অনেকবারই ক্ষমা চেয়েছে আমাদের কাছে। সেদিনও চাইলেন টরেন্টো আন্তর্জাতিক শহীদ মিনারের অনুষ্ঠানে ক্যানাডা লেখক-সংস্থার কর্তাব্যক্তি মুনীর সামী। বললেন,‘‘যে দানবের হাত পা’ ভেঙ্গে তোমরা বেরিয়ে গেছ সেই একই দানবের যাঁতাকলে আমরা এখনও পিষ্ট হচ্ছি। জানিনা পাকিস্তানের কপালে কি আছে’’।

‘‘মানুষের মন চায় মানুষেরই মন’’ - কবিগুরু। তাইতো আন্তর্জাতিক সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে এতো দেয়া নেয়া, তাইতো বম্বের সিনেমায় অভিনয় করেন পাকিস্তানী সালমা আগা, ‘‘শত্রুর দেশে’’ কনসার্ট করেন মেহদি হাসান আর তাঁর সম্পর্কে সে দেশের উচ্চতমা পদ্মশ্রী বলেন - ‘‘উন্‌কা গলে মে ভগওয়ান ঝরতা হ্যায়’’ (‘‘উনার কন্ঠে স্রষ্টা উৎসারিত হন’’ - লতা মুঙ্গেশকর) ।
তাইতো আমাদের মুক্তিযুদ্ধে জর্জ হ্যারিসন গানে গানে টাকা তোলেন, ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের মন্ত্রণাসভা বসে এলিফ্যান্ট রোডের বাটা’র ম্যানেজার অডারল্যান্ড সাহেবের বাসায়। তাইতো বাংলার গায়ক সুমন চ্যাটার্জী সুদুর নিকারাগুয়া’র স্যান্দিনিস্তা গণযুদ্ধে জীবনের ঝুঁকি নেয় এস-এল-আর হাতে, রবিশংকরের সেতারে ক্যারিবিয়ান পল্লীসংগীত আর পশ্চিমা কর্ড, হলিউডের ছবিতে জাকির হূসেন আর মেঘ রাগিনীর সা-রে-মা-পা-ণি-র্সা আর চীনা ভাষায় গেয়ে ওঠেন বাঙ্গালীনি সাবিনা ইয়াসমিন। আশ্চর্য্য নয় ? এত আগুনের মধ্যেও পুরষ্কারপ্রাপ্ত ইসরাইলী ডিরেক্টর অ্যামস্‌ গিতাই-এর ছবিতে অভিনয় করেন পুরষ্কারপ্রাপ্ত প্যালেষ্টাইনী অভিনেতা ইউসুফ আবু ওয়ার্দা, ইসরাইল-প্যালেষ্টাইনের নাট্যকর্মীরা একসাথে নাটক করেন। তাইতো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মুসলিম ‘‘বৌদি’’ আর হিন্দু ‘‘মায়ের সম্মান রক্ষায় বুকের রক্ত ঢেলে হিন্দু আর মুসলিম যুবক ইতিহাসে রেখে যায় মহামিলনের আর্ত আহ্বান।

এরই নাম মানবতার শক্তি, সংস্কৃতির শক্তি। তাই তো ইতিহাসের প্রতিটি বার্লিন-প্রাচীর এত ভঙ্গুর, এত ক্ষণস্থায়ী। এপারে এক ফোঁটা রক্তের পাশাপাশি ওপারে এক ফোঁটা অশ্রু গড়ায় এটা ইতিহাসের সত্য - তা সে বার্লিনই হোক, ইংল্যান্ড -আয়ার্ল্যান্ড হোক, বিভক্ত বাংলা-পাঞ্জাব-কাশ্মীরই হোক, ইসরাইল-প্যালেষ্টাইনই হোক বা পাকিস্তান-বাংলাদেশই হোক। পিন্ডির অলিগলির ঠেলাগাড়ীতে ফল-সব্জী নিয়ে যে ঘর্মাক্ত লোকটা হাঁক দিয়ে বিক্রী করে বেড়ায় সে আমাদের শত্রু নয়। কোহাটের পাহাড়ে যে লোকটা পাথর ভাঙ্গে, যে নারীরা বাচ্চার হাত ধরে ঝিলাম-চেনাব-বিয়াস-সিন্ধু থেকে কাঁখে কলসীভরা পানি টানে তারা আমাদের শত্রু নয়। পাকিস্তানের মসজিদে নামাজে ব্রাশ ফায়ারে যারা রক্তাক্ত মরে পড়ে থাকে তাদের সাথে আমাদের নয়শ’ কুড়িটি বধ্যভুমির তফাৎ সামান্যই। আমাদের সবার শত্রু এক, এবং তারা কারা তা আমরা ভালো করেই জানি। এবং একাত্তরে তাদের পদলেহী ‘‘হাস্যমুখে দাস্যসুখে বিনীত জোড়কর, প্রভুর পদে সোহাগমদে দোদুল কলেবর’’ (কবিগুরু) বাংলাদেশী পিশাচরা কারা তা এদিকে আমরাও জানি ওদিকে আনোয়ার-মখদুমরাও জানে।

এ দানবকে পরাস্ত করা কঠিন, হিমালয়-বিজয় বা উত্তাল সমুদ্র-বিজয়ের মতই কঠিন। সুদুর নিউজিল্যান্ডের এডমন্ড হিলারি’র সাথে সুদুর নেপালের তেনজিং নোরপে’র মিলন ছাড়া এ দুর্গম হিমালয়-বিজয় অসম্ভব। সুদুর পর্তুগালের ভাস্কো-ডা গামা’র সাথে সুদুর ইয়েমেনী সমুদ্র-বিশারদ আবদুল মজিদের মিলন ছাড়া এ দুর্দান্ত সমুদ্র-বিজয় অসম্ভব। আজ যখন দানবের হাতে আছে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র মানবের সংগ্রামও তাই আন্তর্জাতিক না হয়ে উপায় নেই। তাই যখন আমাদের সাথে পাকিস্তানেও দাবী ওঠে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই তখন মনে পড়ে সেই একাত্তরেই কয়েকজন পাকিস্তানী বাংলাদেশের অবিশ্বাস্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিল ওই পাকিস্তানের মাটিতেও, - ক’জন জানে!

অগ্নিবীণার দুর্দম বাদক! অসাধ্যসাধনের অদম্য সাধক!! বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পদক তোমাদের কপালে জোটেনি কিন্তু কোটি জনগণের তরফ থেকে তোমাদের লক্ষ সালাম।