Friday, October 17, 2014

সাঁইত্রিশ বছর পরে -সৈয়দা রাজিয়া বেগম




তুমি বেঁচে থাকলে আজ সত্তর বছর পূর্ণ হতো তোমার। আমি, চন্দ্রা, চয়ন, নীলিম, কাজলী আর ওদের ছেলেমেয়ে কুঞ্জ, কবরী, মেঘা আর রৌদ্র উৎসবের সুরভিতে জন্মদিনের আয়োজন করে তোমাকে না জানিয়ে সারপ্রাইজ দিতাম। কিন্তু তা হলো না। মনের কোটরে শতসহস্র জলকণা প্রপাতের মতো অনর্গল ঝরছে চোখ বেয়ে। তুমি নেই। কিন্তু নিঃশব্দ স্মৃতিরা আছে চারপাশে। এই যে সব স্মৃতিমুখর। তার অর্থ কী এই যে তুমি আছ? কী জানি! শরীরটার অনুপস্থিতি বিশাল দেয়ালের মধ্যে আড়াল পড়ে গেছে যেন। চোখে ভাসে তোমার হাসি, কথা, সম্পূর্ণ তুমি। কেবল একটা কাঠামো। আর সেই অবয়ব সাঁইত্রিশ বছর ধরে আমাকে কাঁদাচ্ছে। একেবারে নিভৃতে, সবার অলক্ষ্যে, রাতের বিছানায়।
 সেই ভয়াবহ রাতটি আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তোমাকে যখন পাকিস্তানী সৈন্যরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল তখন আমরা রাতের খাবার খাচ্ছিলাম। রাত তখন ন’টা। এমন কিছু রাত নয়। কিন্তু ওই দিনগুলোতে সকাল-দুপুর-বিকেল সব সময়ই রাতের নিস্তব্ধতা। বিভীষিকা সর্বক্ষণ মনকে নিঃসাড় করে রাখত। তাই রাত ন’টায় যখন দরজার বেল বেজে উঠল। আমরা দ’জনই ভয়ে আতঙ্কে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। অনবরত বেজে চলেছে বেল । তুমি দরজা খোলার জন্য এগিয়ে গেলে আমি তোমার হাত চেপে ধরে পথ আগলে দাঁড়িয়েছিলাম। খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলেছিলাম, ‘এত রাতে আর কে আসবে? নিশ্চয়ই আর্মিরা এসেছে। তুমি দরজা খুলতে পারবে না।’ তুমি বলেছিলে ‘তাতে কী? আমরা তো কোন অন্যায় করেনি। যদি আর্মিই এসে থাকে। শুনি কী বলতে চায়।’ আমার কোন অনুরোধ- নিষেধ তুমি শুনলে না। এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলে।
 আমার কথাই ঠিক হলো। বন্দুক হাতে কয়েকজন সৈন্য। ওদের সঙ্গে তিনতলার ভাড়াটে ফজলু হাওলাদার। কিছুদিন ধরেই ফজুল হাওলাদারের কথাবার্তা, চালচলনে পরিবর্তন দেখেছিলাম। তিনতলার ব্যালকনিতে একটা পাকিস্তানী পতাকা টাঙিয়ে রেখেছিল। একতলার ভাড়াটে হুমায়ূন ভাই এবং আমাদের পরামর্শ দিয়েছিল পাকিস্তানী পতাকা ওড়াতে । বলেছিল ‘এ দেশটা পাকিস্তানই থাকবে। আলাদা করার সাধ্য কারো নেই।’ সঙ্গে সঙ্গে আমরা তার কথার প্রতিবাদ করেছিলাম, বলেছিলাম ‘সাতই মার্চের দিন থেকে পাকিস্তানকে আমরা পরিত্যাগ করেছি। আর কিছুদিন অপেক্ষা করুন দেশ স্বাধীন হবেই হবে।’
আমাদের কথায় তার চোখে ফুটে উঠেছিল হিংস্র বিরক্তি। তারপর খুব থেমে থেমে বলেছিল ‘একটা ভুল অনেক ভুলের জন্ম দেয়। একটা কথা অনেক কথার সাক্ষী হয়। আপনারা নিজেরাই নিজেদের বিপদের গর্ত খুঁড়লেন। এই কথাগুলো বলে সেদিন ফজুল হাওলাদার ভীষণ তেজী পায়ের চাপে মাটি আন্দোলিত করে চলে গিয়েছিল। আমরা ফজুল হাওলাদারের সেদিনকার কথাকে ঔদ্ধত্য বলে মনে করিনি। একবারও ভাবিনি ভয়ঙ্কর রাজাকারের তালিকায় নাম লিখিয়ে পাকিস্তান আর্মিদের দোসর হয়েছে। ওদের হাতে হাত রেখে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ মানুষদের ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেছে। হায়েনারে পথ চিনিয়ে ঠিকানা হাতে তুলে দিয়ে হত্যা করেছে গৌরবে ভাস্বর জ্ঞানী-গুণী, মেধাবী সম্পদদের। জেনেছিলাম তোমাকে নিয়ে যাবার পরে। ফজুল হাওলাদার বলেছিল ‘ক্যাপ্টেন আসলাম এই সৈন্যদের পাঠিয়েছেন। আপনাকে উনি সালাম দিয়েছেন।। ওরা বাসা চেনে না বলে সৈন্যদের আমি নিয়ে এসেছি।’
তখনও তোমার হাতে ভাত মাখানো তরকারির ঝোল লেগে আছে। একবার তুমি বলেছিল ‘খাবার রেখে উঠে এসেছি। খেয়ে নিয়ে আমি নিজেই ক্যাম্পে চলে যাব। জানতে পারি কেন ওনার আমাকে প্রয়োজন হলো? হাওলাদার বলেছিল তেমন কিছু না। আপনার মতো কীর্তিমান মানুষের সঙ্গে কাপ্টেন আসলামের পরিচিত হবার ইচ্ছা। হাতাটা ধুয়ে নিয়ে চলুন। ফিরে এসে খেয়ে নেবেন। মাত্র তো কিছুক্ষণের আলাপ।
 ঘটনার পরম্পরা তুমি ঠিকই অনুমান করেছিল। ভেতরে গিয়ে হাত ধোবার সময় আমাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিল ‘আজ রাতের মধ্যে আমি না ফিরে এলে কাল সকালেই এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেও।’ তারপর ঘুমন্ত চন্দ্রা আর চয়নকে বুকে জড়িয়ে আদর করলে আমার পিঠে হাত রেখে বলেছিলে ‘ওদের সব দায়িত্ব তোমার। ওদের মানুষ করবে দেশপ্রেমের জাগৃতি মনে গেঁথে দিয়ে। তোমাদের আমি আল্লাহ্র প্রযতেœ রেখে গেলাম।’ হৃদয় নিংড়ানো কষ্টে ভেঙ্চেুরে আমি অস্ফুট স্বরে বলেছিলাম ‘ওদের সঙ্গে গেলে তোমাকে আর আমি ফেরত পাব না পেছনের পাঁচিল টপকে তুমি পালিয়ে যাও।’ আমার কথায় তুমি হাসলে। বললে ‘তিনতলা থেকে তো নামতে হবে। তারপর না পাঁচিল টপকানো।’ ততক্ষণে আমার শরীর অবশ হয়ে গেছে যেন। কোন শক্তি ছিল না। না মনে না শরীরে। এক রকম চৈতন্যহীন স্থবির পাথর তখন আমি।’
ঘরে ঘরে ছিনতাই হাচ্ছিল মানুষ। একবার ধরে নিয়ে গেলে কেউই আর ফেরত আসেনি। তুমিও আসোনি। এলে না আর। সেই গুমোট অসহায় রাতটিতে তুমি বলেছিলে ‘রাতে না ফিরে এলে পরদিন সকালেই চন্দ্রা আর চয়নকে নিয়ে আমি যেন এ বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ঠাঁই খুঁজে নিই। তুমি তো জান না ততক্ষণে অরক্ষতি হয়ে উঠেছে ঢাকাসহ সর্বত্র। আমি নিঝঝুম স্তব্ধতায়, জৈতন্যে ঘোরলাগা অবসাদ নিয়ে তোমার প্রতীক্ষায় বসে রইলাম। সকাল ফুটলে টেলিফোন করেছিলাম বড় আপা ছোট আপাকে। ওরা দুলাভাইদের নিয়ে চলে এসেছিল। সব কিছু শুনে দুলাভাইরা তোমাকে খুঁজতে বেড়িয়েছিল। একনাগাড়ে দশদিন ওরা চষে বেড়িয়েছে সমস্ত ঢাকা শহর। কোন সন্ধান পায়নি তোমার। সকালে এও শুনেছিলাম হুমায়ূন ভাইকেও ওই রাতে পাশ-রা ধরে নিয়ে গেছে। বুঝলাম, হিংস্র হায়েনা হাওলাদার সেদিনকার কথার প্রতিশোধ ঠিকই নিয়ে ছাড়ল।
 দশদিন এক পৃথিবী শোকের কাঁথায়মুড়ে যখন চেতনা বিলুপ্ত হচ্ছিল বার বার তখন জোর করে দরজায় তালা লাগিয়ে ছোটো আপার বাসায় আমাদের নিয়ে গেল। আমরা দিনরাত একাকার হয়ে থেকেছে। চন্দ্রা আর চয়ন বার বার তোমার কথা জানতে চায়। কোন উত্তরই ফোটেনি আমার ঠোঁটে। ছোটো আপা ওদের আদর করে কাছে বসিয়ে বলেছে ‘দেশ স্বাধীন হলে নিশ্চয়ই তোমাদের বাবা ফিরে আসবে।’ এত কঠিন কথার অর্থ সেদিন ওরা বোঝেনি। বুঝেছিল অনেক পরে।


 দেশ স্বাধীন হলো। বিজয়ের কলরোলে অনেক দুঃখের গাথাও আনন্দের মিছিলে জড়ো হলো। মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে এসেছিল বিজয়ীর হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে। কিন্তু ওদের হাসি আনন্দের আলোময় মুখ নিভে গেল। ওরা দেখল পিশাচ ঘাতকরা হত্যা করেছে ওদের আপনজনদের, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ঝলসে দিয়েছে বাড়িঘর। বিরান শূন্যতায় তখন মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর বেয়ে নেমেছে কান্নার ধারা। যারা নিরপরাধ তাদের কেন নৃশংস নিপীড়নে মেরে ফেলল? কার কাছে চাইব এর উত্তর? কতিপয় দোসর, যারা এই নির্মম মৃত্যুর পতাকা উড়িয়েছে। তাদের শাস্তির দাবি ওঠে। আপনজন, বাড়িঘর সর্বস্ব খুইয়ে নির্বাক তখন মুক্তিযোদ্ধারা।


 আমার মন অসহিষ্ণু দুশ্চিন্তায় কেঁপে কেঁপে উঠত। জোর করে মন থেকে সরিয়ে দিতাম অজগর দুঃস্বপ্ন এক মন ভাবত অবশ্যই একদিন তুমি ফিরে আসবে। অন্য মন অস্বস্তিকর ভাবনার ঢেউয়ে হাবুডুবু খেত। বুকের খাঁচায় নিঃশ্বাস আটকে যেত। মনে হতো তুমি নেই। কখনও, কোনদিনও ফিরবে না তোমার সুখী গৃহকোণে। শেষের শ্বাসরুদ্ধ ভাবনাই সঠিক হলো। তুমি ফিরে এলে না কিংবা কেউ তোমাকে ফিরেয়েও দিয়ে গেল না। তুমি হলে চিরকালের জন্য নিরুদ্দেশ।


 মাস দুই পরে মিরপুর বধ্যভূমি থেকে আরও অনেকের সঙ্গে তোমাকেও শনাক্ত করা গেল। নিশ্চিত মৃত্যুর সঠিক সংবাদ। তুমি ছবি হয়ে শোকের ঠিকানায় বসতি করলে। অন্য সবার মতো তোমাকেও কবরস্থ করা হলো। তোমার নামের সূচনায় যোগ হলো শহীদ। তিরিশ লাখ শহীদের কাতারে তুমি ঠাঁই করে নিলে। আর আমরা হয়ে গেলাম শহীদ পরিবার। স্বাধীনতা, দেশবিজয়ে তোমার অংশীদারিত্ব এ তো আমাদের বড় অর্জন।
 যাদের সঙ্গে ছিল তোমার অবসরের আড্ডা দেয়ার সখ্য। তাদের সঙ্গে আমারও ছিল একই রকম বন্ধুত্ব। তুমিই আমাকে জোর করে তোমাদের আড্ডায় নিয়ে যেতে। তুমি চলে যাবার পর ওই আড্ডা আমাকে আর মনোযোগী করেনি। ব্যস্ততা বেড়ে গেল। রবং বলা ভাল ব্যস্ততা বাড়িয়ে দিলাম।


সাংবাদিকতা পেশা আমার। সঙ্গে ছিল লেখালেখির চুম্বক আকর্ষণ। তুমি নেই। আমাদের তিনজনের জীবন তো সচল। চন্দ্রা আর চয়ন অবুঝ দু’টি শিশু। ওদের প্রয়োজন-অপ্রয়োজন সবটা দেখভাল করার দায়িত্ব তো তখন একলা আমার। উপার্জনের সিংহভাগ তো রাতারাতি বিয়োগ হয়ে গেল। সব কিছু মিলিয়ে আমি তখন উদ্বেগের কাঁটায় এফোঁড়-ওফোঁড় হচ্ছি। আড্ডার কোন কোন বন্ধু সেই সময় চন্দ্রা, চয়ন আর আমার দায়িত্ব নেবার আগ্রহ দেখিয়েছিল। না, অবশ্য তা তারা করেনি। আমার সিদ্ধান্তটুকুই শুধু জানতে চেয়েছিল। আমিও নীরব থাকা যুক্তিযুক্ত মনে করে ধীরে ধীরে দূরত্ব টেনে দিয়েছি। বন্ধ করেছি বন্ধুত্বের আগল। ওরা অবশ্য পরে আমার কাছে মার্জনা চেয়েছে। আমি অবশ্য কোন রকম প্রতিক্রিয়া দেখাইনি। শুধু সাময়িক যোগাযোগের দোরটা আলগা করেছি।

 কিন্তু তারপরেও বন্ধুত্বের নির্মল সুবাসটুকু আর নেই। কখন যে তা হারাল তা মনেও করতে পারি না। তবে ওরা যে যার মতো ঘরনী খুঁজে নিয়েছে।


 সাঁইত্রিশ বছর তুমি ছাড়া আমার দিন মাস বছর কেটেছে। চন্দ্রা আর চয়নকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছি। ওদের দু’জনের জীবন ঘিরে যারা আছে তাদের নিয়েই আমার অফুরন্ত উদ্বেল সময় কেটে যায়। এতসব কিছুর পরেও তোমার অভাব অনুপস্থিতি ঘরের চারপাশে। রাস্তায় বেরুলে। কোন আনন্দ অনুষ্ঠানে গেলে অনেক বেশি দুঃখময়তা ছুঁয়ে যায়।তুমি একজন মাত্র মানুষ। সেই কবে নেই হয়ে গেছ কিন্তু আজও আছ যেন তাজা সজীব প্রাণ নিয়ে আমার মনে। আমার ভাবনায়। আচ্ছা বল তো এত দীপ্ত হয়ে থাকলে কী করে?
এই এত বছর যুগ অতিক্রম করে এসে, আমিও যখন ষাটোর্ধ বয়সের সোপানে তখন নিজেকে খুব অসহায় লাগে। আমি জানি না ডিসেম্বরের চৌদ্দ তারিখ, স্পষ্ট হয়ে থাকা একাত্তর। এর পর থেকে দীর্ঘ সাঁইত্রিশ বছর। কোন্ মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে তুমি হাড়া আমি একলা হাতে সব গোছাতে পারলাম! কোথাও কোন অনিয়ম কিংবা প্রতিবন্ধকতা যে আসেনি তা তো নয়। কেমন করে যে তার হাল ধরেছিলাম আজ আর তা বলতে পারব না। বোধকরি বেহুঁশ ছিলাম আমি। তোমার শেষ কথাগুলোই যেন আমার শক্তি আর প্রেরণা হয়েছিল।


একাত্তরে আমি ছিলাম তেইশ বছরের একজন তরুণী আর ছিল অবুঝ দুটি সন্তান। কত আগ্রহ-ইচ্ছা-অনুরোধ চারপাশ থেকে এসেছে কেমন করে যেন সব অবজ্ঞা করেছি। ঠেলে দিয়েছি কচুরিপানা সরাবার মতো করে। কখনই অনুভব করিনি আমার একজন সঙ্গী চাই। আমার এই অনমনীয় একরোখা সিদ্ধান্তের তামাশা দেখে অনেকে আশ্চর্য হয়েছে। আবার অনেকে আমাকে নির্বোধও মনে করেছে। আবার অনেকের চোখে-মুখে দেখেছি প্রগাঢ় শ্রদ্ধার আলোময়তা। আমার কেবলই মনে হয়েছে, আমার কোন অপূর্ণতা নেই। কিংবা কখনই ভাবিনি আমি সঙ্গীহীন একা। তবু কারো কারো পরামর্শে বিনীতকণ্ঠে রেখেছি। বলেছি যেদিন আমি বুঝব ক্লান্তি নেমেছে মনে শরীরে। কিংবা তোমার স্মৃতি আবছা হয়ে উঠছে। সেদিন আমি ভাবব। কোন দ্বিতীয় চিন্তা।

আজ পর্যন্ত কোন ক্লান্তি, বিরক্তি, অর্পূণতার ছোঁয়া লাগেনি। আমার মনে কিংবা শরীরে। তবে আর কি প্রয়োজন? আমি যদি আমার জীবনের কোন কষ্ট, দুঃখকে প্রশ্রয় না দিই। তার দায়দায়িত্ব তো আমারই। আমি যদি মনে করি আমি ভাল আছি। বেশ আছি। তবে অন্যের অস্বস্তি কেন? কিন্তু না, আমার ভাবনা আমার থাকে না। আমার আমিত্বকে কেড়ে নিয়ে আবর্জনায় ছুড়ে দেবার লোকেরও অভাব হয় না। তাই তো জীবনের একটা স্বস্তির বয়সে এসে শুনতে হয় দাগ দেয়া কথার অশালীন কথোপকথন। আমি নাকি আমার চরিত্রকে দূষিত করেছি। বিভিন্ন পুরুষের সংস্রবে সময় উদ্যাপন করেছি। আমি কি এতটাই হীন ছিলাম? তুমিই বলো, এসব কথা বলা মানে কি আমার অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জ করা হয় না?
আমি যদি চাইতাম কিংবা যদি ইচ্ছা হতো তাহলে তো সেই সুনীল বয়সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে একটা আবহ তৈরি করতে পারতাম। তখন তো কারোই কিছু বলার থাকত না। দোষেরও কিছু থাকত না। আমি আমার মতো জীবন গুছিয়ে নিতাম।কিন্তু তা আমি করিনি। করিনি এজন্য যে, আমি তাগিদ অনুভব করিনি। আর তাই চাবুকের আগায় মন বিদ্ধ করে পার করেছি অসম সময়। আমি ভীষণ এক গর্ববোধে উজ্জ্বল থেকেছি একজন শহীদের স্ত্রী হিসেবে। এত সম্মান, এত শ্রদ্ধা, এত অনুরাগ পাবার চেয়ে কি দ্বিতীয় চিন্তায় নিজেকে জড়ানোটা অনেক সুখের হতো? নাকি বিয়ে নামক একটি বন্ধন আমাকে সুখী মানুষ করে তুলতে পারত? চন্দ্রা আর চয়ন যখন বড় হলো তখন ওরাও বন্ধুর মতো আমাকে বলেছিল তুমি কেন আমাদের কথা ভেবে তোমার জীবনকে অনাড়ম্বর রাখলে? ওদের জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম ‘তোমরা দুজন আমার সন্তান। আমি জীবনে কাউকে গ্রহণ করলে তোমরা আমার সন্তানই থাকতে। তখন থেকে তোমাদের সঙ্গে আমার সম্পর্কের বিচ্যুতি ঘটত না। তবে তোমাদের কথা ভেবেই যে আমি নতুন কোন সঙ্গী নিইনি এও যেমন সত্যি ঠিক তেমনি তোমার বাবার সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক কিংবা তার প্রতি আমার যে ভালবাসা সেখানে কোন রকম ইটের গাঁথুনি তুলতে চাইনি। আমার কথায় চন্দ্রা আর চয়ন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওদের ঠোঁটে আর কোন কথা জোগায়নি। শুধু চন্দ্রা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কিছুক্ষণ কেঁদেছিল। চয়ন চলে গিয়েছিলো ওর ঘরে।


 আমি চন্দ্রা-চয়নকে নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন আনন্দের জগতে দিবারাত্রি কাটিয়েছি। কোন সময় কখনই দীর্ঘশ্বাস পড়েনি আমার। সেই আমি আকস্মিক বাজ পড়ার আদিগন্ত ঝলসানো মানুষ হয়ে গেলাম সেদিন। আমার এক সহকর্মী বন্ধু এক অদ্ভুত গা ঘিন্ঘিন্ খবরটি শোনাল । দেখলাম ওর চোখে-মুখে আগুনের জ্বলন্ত আভা। ও আমার বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকা মুখের রেখা দেখে কেঁদে ফেলে বলেছিল “যারা এসব কথা ভাবে এবং বলে তাদের আমি স্পষ্ট জবাব দিয়ে এসেছি। ওরা বুঝেছে সব কথা সব কুৎসিত ভাবনা সবার জন্য নয়। ওরা অবশ্য কথাগুলো বলার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে। কিন্তু আমার অবাক লাগে, আমার ভাবতেও কষ্ট হয়, মানুষ এত হীন চিন্তা করে কিভাবে? মানুষের জীবন থেকে কি মূল্যবোধের একেবারেই পচন ধরেছে?”


সাঁইত্রিশ বছরে যে চোখের পানি চন্দ্রা আর চয়নের মুখের দিকে তাকিয়ে ঝরতে দিইনি। ওই কথা শোনার পর ক’দিন ঝরেছে আষাঢ় শ্রাবণের ধারা। কেবল মনে হয়েছে ছিঃছিঃ! আমার সব অর্জন কি তাহলে মিথ্যা হয়ে গেল? আমার চুম্বক সময়গুলোকে থেঁতলে যে আমি সদর্পে সড়ক অতিক্রম করেছি, সেই আমাকে কেন এত নোরাং আবর্জনায় ছুড়ে ফেলা হচ্ছে? কারা করছে এসব? যারা আমার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তারাই কি এ রকম জঘন্য প্রচারণা করছে? আমি তো অনায়াসে একজন পুরুষকে আমার সঙ্গী করতে পারতাম। পারতাম তাকে সমাজের চত্বরে দাঁড় করিয়েও দিতে। অপরিচয়ের দূরত্বের আবরণে নয়, সর্বসম্মুখে পরিচয়ের সুতায় গ্রন্থিবন্ধ করেই। কিন্তু সে রকম কোন প্রত্যাশা, আকাঙক্ষা, ইচ্ছা আমার ছিল না। একেবারেই আমি আমার মতো করে সময় পার করেছি। কোন অনাচারের পথে আমি পা রাখিনি বা হাঁটিনি । এখন তুমিই বলো, এ অপমান আমি সইব কি করে? এক মিথ্যা শত মুখে আছাড় খেয়ে তো সত্যিই হয়ে যায়। কতজনকে আমি জবাবদিহির জবাব দেব! আবার বেশিরভাগ তো কোন প্রশ্ন করবে না। কিংবা জানার আগ্রহও দেখাবে না। কিন্তু মনে মনে স্থির সিদ্ধান্ত তৈরি করে নেবে। বলো, সাঁইত্রিশ বছর পরে কেন আমি এভাবে হোঁচট খাচ্ছি?


একজন নারীর চরিত্রকে পুঁজি করার দিন কবে আমাদের সমাজ থেকে দূর হবে? কত অনায়াসে একজন নারীকে আঁস্তাকুড়ে ছুড়ে দেয়া হয়। তবে তোমাকে বলে রাখছি, আমিও লড়াইয়ের মুখোমুখি দাঁড়াব। আমিও দেখব সত্যকে মিথ্যা ঠেকাতে পারে কিনা?
আজ তোমার জন্মতিথি। একজন শহীদের জন্মতারিখ। আমার একান্ত একজন মানুষের পৃথিবীতে আসবার দিন। এই তারিখটিই আমি মনে রাখতে চাই। ভুলে যেতে চাই ডিসেম্বরের চৌদ্দ তারিখটিকে। বার বার মনে পড়ছে তোমার সঙ্গে পরিচয়ের দিনটি। ওই তারিখটি আমার জীবনে অনন্য, অসামান্য। এত বছর সাথী হয়ে থেকেছে। জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত থাকবে আলোর ঠিকানা হয়ে।


 তোমার চলে যাবার পর থেকে প্রতিবছর এসেছে তোমার জন্মদিনটি। পৃথিবী যতদিন পূর্ণাঙ্গ থাকবে তোমার জন্মতারিখটিও আসবে নিয়মমতো। আমার মনের নিবিড় স্পর্শ নিয়ে তারিখটি আমাকেই আবার সাহস জোগাবে। তাই তো তোমার জন্মদিনটিতে আমার মানসিক আঘাতের ক্ষতচিহ্নগুলো ভরাট করার জন্যই তোমাকে সব কথা বলতে ইচ্ছা হলো। তোমাকে ছাড়া আমি কার কাছে বলব বলো? শুধু তোমাকেই আমি আমার আনন্দ-দুঃখ-ব্যথা-বেদনা-অপমান-সফলতা- সম্মানের কথা বলি আপনমনে। আজও বললাম। তুমি যত দূরেই থাক না কেন। আমার আগামীদিনগুলোর জন্য তো তুমিই দিশা হয়ে থাকবে। দেবে আমাকে সাহসে শক্তির প্রেরণা। কারণ তুমিই তো আমার মনোবলের হাতিয়ার। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মনে যদি সূক্ষ্ম এতটুকু সন্দেহের আঁচড় থেকেও থাকে, তুমি তাকে অবজ্ঞা করে আমার সহায় হবে। আমার মাথা উঁচু করে বিস্তৃত আকাশ দেখার অধিকার এখানেই।

Wednesday, October 15, 2014

স্মৃতির মিনার রক্ষায় ১৪ কোটি পরিবার খাড়া রয়েছি তো ! -সুমি খান

 কবি আলাউদ্দিন আল আজাদের ভাষায় বলি, স্মৃতির মিনার ভেঙ্গেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু ? খাড়া রয়েছি তো আট কোটি পরিবার! বায়ান্ন একাত্তরের কুলাঙ্গারদের ঠেকাতে সেই আটকোটি পরিবার এখন ১৪ কোটি পরিবার। একাত্তরের শকুনদের নিয়ত ব্যবচ্ছেদের পর ও বাংলা মায়ের সন্তান এই ১৪ কোটি পরিবার জেগে আছে ! কুলাঙ্গার জারজদের প্রতিরোধ করবে তারা প্রাণ দিয়ে। আর তাই শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষায় চেতনার অগ্নিমশাল জ্বেলে জেগে আছে যারা তাদের অভিবাদন।
শুভবুদ্ধির উদয় যে মাঝে মাঝে হয়, এটা তারই প্রমাণ । পিয়াস করিমের লাশ আর শহীদমিনারে নিলো না তার পরিবার। তবে বনানীতে শেষ স্থান হলো এই রাজাকারপুত্র এবং রাজাকার ত্রাতার! কী দুর্ভাগ্য আমাদের!  এই লেখাটি ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে লিখেছি। মনের ভার হাল্কা করা আর চেতনা শানিত করার ধারাবাহিকতায়।
 এক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পিয়াস করিম যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবির এ রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে যে আধাঘোষিত যুদ্ধ শুরু করেছে, সেটাকে তার প্রতিটি শব্দ এবং বাক্যে সমর্থন জানিয়েছেন। তারা যখন এমনকি শহীদ মিনারও পুড়িয়ে দিয়েছে সেটাকেও সমর্থন করে গেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক  উপাচার্য (ভিসি) ড. এমাজউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, শহীদ মিনার প্রতিবাদের প্রতীক। পিয়াস করিমের মতো ব্যক্তির লাশ যদি শহীদ মিনারে রাখতে না দেওয়া হয় তবে শহীদ মিনারের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাবে।  হাস্যকর বটে! শহীদ মিনারের ইতিহাস যারা জানে, যারা শ্রদ্ধা করে , তাদের আগ্রহ চিরঞ্জীব । যাদের শুধু রাজনীতি করার জন্যে শহীদ মিনারকে দরকার, তাদের আগ্রহ কমাই মঙ্গল!

 বাংলানিউজে চ্যানেল আইয়ের বার্তাসম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ জুয়েল লিখেছেন, একাত্তরে কামানের গোলা দিয়ে শহীদ মিনার গুঁড়িয়ে দেয়া, হত্যা-গণহত্যা-ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ আর ওই অপরাধের বিচার শুরু হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে রাস্তায় নাশকতা এবং টেলিভিশনের পর্দায় বক্তৃতা একই চেতনা থেকে উৎসারিত।এখন সেই অপচেতনার মানুষকে কেনো শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে হবে?পিয়াস করিমকে শহীদ মিনারে নেওয়া হবে.তখনি প্রতিবাদ শুরু হলো।ঘোষণার উদ্দেশ্যই ছিলো গোলমাল পাকানো। এবং সেই উত্তেজনাটা তারা এরইমধ্যে সৃষ্টি করতে পেরেছেন। এর মধ্যে সরকার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে জড়ানোর একটা চেষ্টাও হচ্ছে। সরকারকে জড়ানোর চেষ্টার কারণ, সরকারের জন্য বিব্রতকর এবং বিরক্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এর মধ্যে টেনে আনার কারণ যে, এ বিশ্ববিদ্যালয় সেই চেতনার উত্তরাধিকার যে চেতনার পথ ধরে শহীদ মিনার আর যে চেতনার বিরোধী পিয়াস করিম।
  জুয়েল ভাইয়ের সাথে আমি শতভাগ একমত। আমারো প্রশ্ন , কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক কিংবা সৃজনশীল  কিছু কি তার ছিল? শুধুই টক-শো করে আলোচিত পিয়াস করিমকে টক-শো করা অন্যদের কেউ কেউ এখন এমন পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন যে, যেনো তার নাম বলতে হবে পিয়াসটটল কিংবা পিয়াসটিস-চমৎকার লিখেছেন জাহিদ নেওয়াজ জুয়েল। জামাতপন্থীরা  নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থেই বিষয়টাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সবকিছুর মূলে কিন্তু গর্ত থেকে জামায়াতকে বের করে আনার ফন্দিফিকির,যেটা জীবনের শেষ পাঁচ বছর ভালোভাবেই করে গেছেন পিয়াস করিম।
এ দেশের সাধারণ মানুষের একজন আমি সুমি খান  খুনপিয়াসী জামাতের মুখপাত্র পিয়াস করিমদের মিথ্যাচারের স্বাধীনতা ঠেকাতেই লড়াই করি উত্তরাধিকার সূত্রে। কারণ আমার ধমণীতে শহীদের রক্ত। এ রক্ত কোনদিনো পরাভব মানে নি, কখনো মানবে ও না।একই সাথে জামাতের নব্য দোসর বামদলের একাংশের ভূমিকা নিয়ে জনগণের অবস্থান তুলে ধরতেই আমার এ লেখার অবতারণা।
এদেশে বামদল শতধা বিভক্ত। তবে একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের লাশ নিয়ে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় আবারো প্রমাণ হলো মুক্তিযুদ্ধের বেসাতিতে জামায়াত বিএনপির সাথে বামদল গুলোর একটি অংশ চেতনাগতভাবে সম্পৃক্ত। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে রাষ্ট্রক্ষমতায় যে সরকার তাদের জবাবদিহিতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আমারো। কিন্তু তাই বলে সরকার বিরোধিতার নামে যুদ্ধাপরাধী শক্তির সাথে  একাত্মতা ?? এই চিত্র সুস্পষ্ট ভাবে প্রমাণ করে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত অন্ধকারের শক্তির কালোটাকার স্রোতে ভেসে যাওয়ায় তারা নির্লজ্জ।
ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম জেলার সাবেক নেতা তৌহিদ টিপু লিখেছেন. পিয়াস করিমের লেখা ও বক্তব্যের সাথে আমি চূড়ান্তভাবে ভিন্নমত পোষণ করি। কিন্তু আমি তাঁর লাশটিকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য শহীদ মিনারে জায়গা দিতে চাই। সসম্মানে। যদি তাঁর সেটিই ইচ্ছা হয়ে থাকে। কারণ আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই আমি পিয়াস করিমদেরও বলার স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছি। আমার শত্রুকে দেখার দৃষ্টি জামায়াত কিংবা হেফাজত কিংবা আওয়ামীলীগ কিংবা বিএনপির মতো না। আমার শিক্ষায় এটাই কমিউনিজম।  কমিউনিজমের কী হাস্যকর আর বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা!!এরা কোন রাজনীতির ধারক? যারা নিজেদের আত্মপরিচয় রক্ষা করতেই চরম ভাবে ব্যর্থ!
 
এ প্রসঙ্গে অতিবামদের গুরু ফরহাদ মজহারের একটি উক্তি উল্লেখ করতে হয়।ফরহাদ মজহার তার মোকাবেলা বইয়ে লিখেছেন, বাংলাদেশে  কমিউনিজমের ব্যর্থতার কারণ তথাকথিত বামপন্থীরা, যারা এখনো বুঝেন না মার্কসবাদের অ, আ, ক, খ.... যারা মার্কসবাদ ও কমিউনিজমের মুখোশ পড়ে পুঁজির পাহাড় গড়ে তুলছেন সাধারণ মানুষের চোখে ধুলা দিয়ে...!! মেহনতী মানুষের ঘাম আর শ্রমের সাথে একাত্ম হয়ে কার্ল মার্কস, ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস এবং মহামতি লেনিন যে মহান মতাদর্শের প্রবর্তন করেছিলেন। লেনিন তাঁর জীবদ্দশাতেই  কমিউনিষ্টদের হঠকারী এবং স্ববিরোধী ভূমিকার কড়া সমালোচনা করে গেছেন। সেসব পরবর্তীতে লিখবার ইচ্ছে রইলো। তবে বলতে বাধ্য হচ্ছি, বাংলাদেশে তার ঝান্ডাবাহীরা হঠকারী ভূমিকা পালন করছেন। এদের হঠকারী ভূমিকা কয়েকটি প্রজন্মকে কলুষিত করছে। এর পরিণতি নি:সন্দেহে ভয়াবহ্ এবং দুর্ভাগ্যজনক।

এসব কোনভাবেই  আমার একার কথা নয়। সাধারণ মানুষের সাথে মিশলে কমিউনিষ্ট নেতারা নিজেদের এ হতাশাজনক চিত্র অনুধাবন করতে পারতেন। তাদের জনবিচ্ছিন্নতার আরেকটি প্রমাণ , নিজেদের বাস্তবতা সম্পর্কে তারা অন্ধকারেই আছেন। শুধুমাত্র যাদুর বাক্স আর চাটুকার ঘিরে থাকলে যা হয়। ছাত্রইউনিয়নের ছাত্রনেতারা ফেসবুকে যেসব কথা পোস্ট করেন- এতে প্রকাশ হয়, দেশের পরবর্তী প্রজন্মের একটি অংশ (ক্ষুদ্র হলেও মেধাবী অংশ) সরকার বিরোধিতার নামে নিজেদের অজান্তে একাত্তরের পরাজিত শক্তির সাথে একাত্ম হচ্ছে। তিরিশ লাখ শহীদের রক্ত এবং লক্ষ লক্ষ নির্যাতিতের বেদনা আর লাঞ্ছনায় গড়া এই দুর্ভাগা দেশটির জন্যে নি:সন্দেহে  তা অশনি সংকেত।
 যাকে গুরু বলে এই প্রজন্মের সাংবাদিকেরা মানেন,মেধাবী কৃতি সাংবাদিক জাফর ওয়াজেদ ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন আমাদের প্রজন্মকে।আর তাই  আমি ব্যক্তিগত ভাবে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায় আভূমি নত হই। একটি পোস্টে বঙ্গবন্ধুকে উদ্ধৃত করে  জাফর ওয়াজেদ লিখেছেন, "আমাদের বুদ্ধিজীবিদের দায়িত্ব ছিল,স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের জীবনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো যে গণতান্ত্রিক,প্রগতিশীল ও সর্বাংশে গণমুখী সরকার গঠিত হয়েছিল তার বাণী,তার তাৎপর্যবাংলাদেশের মানুষের ঘরে ঘরে পৌছেঁ দেওযা। সে দায়িত্ব পালনে তারা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন। যে কোন কারণেই হোক, শিক্ষিত সুবিধাবাদী শ্রেণীর একাংশ, বিশেষতঃ সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবি মহলের একটি বড়ো অংশ ১৯৭২এর শেষভাগ থেকে শুরু করে সাধ্যমত বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও বিষোদগার করেছেন।একটা সদ্য স্বাধীন দেশের বুদ্ধিজীবিদের পক্ষে এমন আচরণ স্বাধীনতার পিঠে ছুরিকাঘাতের মতোই নিকৃষ্ট কাজ।বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পরেও আমাদের দেশের ব্যাপক সংখ্যক সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবিরা বঙ্গবন্ধুর অনুসৃত নীতির তাৎপর্য ও বাংলাদেশের বিকাশের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর অনুসৃত পদ্ধতির তাৎপর্য অনুধাবন করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না।"
 এ প্রসঙ্গে একটি ইতিহাস উল্লেখ করা প্রয়োজন।১৯৭৪ সালে আবদুল গাফফার চৌধুরী লন্ডনে প্রথম থাকতে গিয়ে সেই সময় দেশের প্রথম সারির চারজনের অন্যতম কৃতি চাটার্ড এ্যাকাউন্টেন্ট ওসমান কায়সার চৌধুরীর  বাসায় ছিলেন। সম্পর্কে তিনি আমার মামা । দেশের বুদ্ধিজীবি এবং সাংবাদিকদের হঠকারীতায় মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির তান্ডব এবং ষড়যন্ত্র নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে মামা  আমাকে সেই সময়ের একটি গল্প বললেন। গাফফার চৌধুরী ১৯৭৫ সালের শুরুর দিকে কোন এক সময়ে খবর পেলেন  সালভাদর আলেন্দের স্ত্রী হোর্তেনসিয়া বুসি কোলকাতায় যাচ্ছেন। সাথে সাথে কোলকাতা গেলেন তিনি। আলেন্দের স্ত্রী গাফফার চৌধুরীকে বললেন,‍‍ ‍‍ দ্যাখো, তোমাদের দেশের যে অবস্থা আমি বাইরে থেকে দেখতে পাচ্ছি, সব আমাদের দেশের চিত্রের পুনরাবৃত্তি।মুজিব এবং তার পরিবার নিয়ে এই যে প্রোপাগান্ডা  সবই সিআইএর কাজ। তোমরা সাবধান হো , মুজিবকে হত্যা করা হবে।  মায়ের কাছে শুনেছি, এর আগেই বঙ্গবন্ধুকে হুমকি দেয়া হয়েছিলো, তোমাকে আলেন্দের মতো করে হত্যা করা হবে।‍ যা বলছিলাম, আবদুল গাফফার চৌধুরী নাকি আলেন্দের স্ত্রী হোর্তেনসিয়া বুসির এ  আশঙ্কার কথা শুনে হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, মাদাম, আপনি জানেন না, বঙ্গবন্ধু হেঁটে গেলে বুলেট ও থমকে যায়। বাংলাদেশের জাতির পিতা, বঙ্গবন্ধুকে খুন করার সাহস কেউ  করবে না। ১৫ই আগষ্টে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর আবদুল গাফফার চৌধুরী নাকি এ গল্প ওসমান কায়সার চৌধুরীকে বলেছিলেন। সেক্টর কমান্ডার ও যখন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ নিয়ে মিথ্যাচার করে, সেই লেখা গণমাধ্যম গুরুত্বের সাথে প্রচার করে , মামা উদ্বেগের সাথে আমাকে এই ইতিহাস বললেন। মামার আশংকার সত্যতা দৃশ্যমান।
 
বর্তমান প্রেক্ষিতে  আবার বলতে হয়,পিয়াস করিম একজন শিক্ষক মাত্র। তার রাজনীতি তার দুর্মর স্বভাবের কথা একপাশে সরিয়ে দেখলেও তাকে কি এমন কিছু ভাবা যায়- যার লাশ শহীদ মিনারে নিতে হবে ? কোন্ যুক্তিতে ?কেন?
 এবার আসা যাক শহীদ মিনার প্রশ্নে। শহীদ মিনার বাঙ্গালীর আত্মপরিচয়ের ভিত। সেই ভিত যাদের কারণে বারবার হুমকির মুখে , যারা বারবার শহীদ মিনার ভেঙ্গে দিয়েছে, যারা বায়ান্ন একাত্তরের আত্মদানকে চরম অশ্রদ্ধার চোখে দেখে এসেছে-সেই কুলাঙ্গারদের শহীদ মিনারে যেতে হবে কেন? তাদের ঠেকাতেই ১৪ কোটি পরিবার খাড়া রয়েছি তো !
 
বুধবার রাতে একটি টকশোতে দেখলাম  ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সংগঠক বাপ্পাদিত্য বসু বললেন, পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে না নেবার জন্যে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে দাবি জানিয়েছেন ।  এ কথা বলার সাথে সাথে পিয়াস করিমের সহচর তথাকথিত বুদ্ধিজীবি সুশীলদের একজন ডা, জাফরুল্লাহ বললেন, তাহলে তো বুঝতে পারছি , পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে নেবার অনুমতি না দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যই নোংরা খেলা খেলছেন ।"  রুহুল কবির রিজভী বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে নাকি ছাত্রসমাজকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে ! রুহীন হোসেন প্রিন্স বললেন, নীতিহীন রাজনৈতিক দল গুলো লাশ নিয়ে রাজনীতি করছেন। পিয়াস করিম মুক্তিযুদ্ধের সময়ে রাজাকার ছিলেন না। দেশটা কোথায় চলে যাচ্ছে বলে খুব আফসোস করলেন! প্রিন্স ভাই এবং ডা. জাফরুল্লাহর সাথে রিজভীর কথা একই সুতোয় গাঁথা এবং খুবই হাস্যকর ।
 
রুহীন হোসেন প্রিন্স আমাদের নেতা ছিলেন একসময়। তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি,  রুহীন হোসেন প্রিন্স ভাই, নিজের দিকে তাকাবেন?নিজেরা কোথায় নামছেন খেয়াল করেছেন? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফিরিয়ে আনার ইস্যুতে পিয়াস করিম ইস্যু নয়?  এটা যদি মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে রাজনীতি হয়, কারা করছে ? সেটাই যদি না বুঝতে পারেন , আপনার রাজনৈতিক দূরদর্শীতা সত্যি্ই সন্দেহ জাগায়। পিয়াস করিম বরাবরই মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে চরম অবমাননামূলক কথা বলে গেছেন।  তার অবস্থান নিয়ে কোন আপত্তি নেই আপনাদের? ডা.জাফরুল্লাহ হতাশা প্রকাশ করলেন গণজাগরণ মঞ্চকে সঠিক পথ দেখানো উচিত ছিল বলে।গণজাগরণ মঞ্চকে ডা.জাফরুল্লাহ দেখাবেন সঠিক পথ? যিনি বরাবরই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করে এসেছেন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হযে ক্ষমাও চাইতে বাধ্য হয়েছেন। আরেকটি টকশোতে উপস্থাপক আফসোস করলেন    আজকাল নাকি মানুষের সহনশীলতার খুব  অভাব। চরমপন্থী অতিবাম এই উপস্থাপক ভুলে গেছেন, হাওয়া ভবনের আশীর্বাদে তাদের মতো যারা চোখের পলকে  সাধারণ এক ছা-পোষা সংবাদকর্মী থেকে মিলিয়নীয়ারে পরিণত হয়েছেন, মানুষের সহনশীলতা আছে বলেই তাদের সেই যাদুর বাক্স থেকে এখনো টেনে নামানো হচ্ছে না। এই উপস্থাপক  এবং প্রিন্স বাম রাজনীতির পরস্পর বিরোধী শক্তির ধারক হলেও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রশ্নে এই উপস্থাপক এবং রুহিন হোসেন প্রিন্স পরাজিত শক্তি!
‍‍একাত্তরের চেতনা পরাজিত হয়নি হবে না-যতোক্ষণ চেতনার অগ্নিমশাল উজ্জ্বল থাকবে- মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে আপোষ নেই - সত্যি বলেছেন বাপ্পাদিত্য বসু।
 বাংলানিউজে চ্যানেল আইয়ের বার্তা সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ জুয়েলের অসাধারণ  লেখনিটি পড়লাম আজ ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায়। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, চেতনা আর ন্যায়ের প্রশ্নে  আমাদের কী ভূমিকা আমাদের হওয়া উচিত। নৈতিকতা এবঙ চেতনার বিকাশে এই লেখার ব্যাপক প্রচার জরুরী।  অভিবাদন জুয়েল ভাইকে। তার লেখার কিছু উদ্ধৃতি এ লেখার শুরুতে দিয়েছি। আরো কিছু তুলে ধরছি।
৮৬ বছর বয়সী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে যে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ড. পিয়াস করিমের বাবা অ্যাডভোকেট এম এ করিম তুলে দিয়েছিলেন, সে কারণে নিশ্চয়ই তখনকার কিশোর পিয়াস করিমকে দায়ী করা যায় না।
একাত্তরের এপ্রিলে ৮৬ বছর বয়সী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়ার পর প্রথমেই যে তার দু'
হাত এবং পরে হাঁটু ভেঙ্গে দেওয়া হলো
, সেজন্য নিশ্চয়ই পিয়াস করিমকে দোষী করা যায় না। তার মরদেহ শহীদ মিনারে নিতে সমস্যা কোথায়?

চেতনাগত এবং দর্শনগত জায়গায়। নানা মতাদর্শের পথ মাড়িয়ে পিয়াস করিম শেষ পর্যন্ত যে দর্শন ফেরি করে গেছেন সেটা ওই শহীদ মিনারের মতাদর্শের পরিপন্থী।


নানা ঘাটের জল খেলেও পিয়াস করিম তার বয়সের বিবেচনায় অপূর্ণ জীবনের শেষদিকে এসে তার প্রয়াত পিতার মতোই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরোধিতা করে গেছেন। পাকিস্তানি মতাদর্শের ভিত্তিমূলে আঘাত করার কারণে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত  পিয়াসের পিতা এম করিমের শত্রু হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন সেই পাকিস্তানি আদর্শকেই বুকে ধারণ করেছেন পিয়াস করিম।এখন পাকিস্তানি মতাদর্শকে লালন করা পিয়াস করিমের শেষ শ্রদ্ধার জায়গা কিভাবে হতে পারে শহীদ মিনার?তবে পিয়াস করিমের মরদেহ ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুলে ফুলে ঢেকে দেওয়ার আয়োজনের বিরোধিতাকে কোনো কোনো সুশীল পরমতসহিষ্ণুতার অভাব বলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এটা কি পরমতসহিষ্ণুতার অভাব? নাকি চেতনাগত অবস্থান? পরমত ছিলো সেটা যেটা তিনি দিনের পর দিন টেলিভিশনে বলে গেছেন।

 সেখানে বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু তার কণ্ঠ কি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে? না। তাই তার মরদেহ শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়ার বিরোধিতাকে যারা পরমতসহিষ্ণুতার অভাব বলার চেষ্টা করছেন, হয় তারা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে অথবা এটা তাদের ইচ্ছা করে এক শয়তানি।

আসলে পিয়াস করিমের মরদেহ শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণার মধ্যেই একটা শয়তানি আছে। যেটা তিনি শুরু করেছিলেন শাহবাগে গণজাগরণের পর। এবং তখনই প্রমাণ হয় যে, তিনি তার প্রয়াত পিতার শুধু রক্তেরই না; চেতনারও উত্তরাধিকার।সেই চেতনা হচ্ছে শহীদ মিনারের বিরুদ্ধে, সেই চেতনা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে। তা হলে তাকে কেনো শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা?

সেটা আসলে এজন্য যে গণজাগরণের পর মিথ্যা প্রচারে যেভাবে জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে, হেফাজতকে গর্ত থেকে বেরিয়ে আসার পথ করে দেওয়া হয়েছে; এখন একইভাবে তাকে শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে একটা পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে। তাকে শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা যে বাধা দেখবে, এটা জেনেই এর উদ্যোক্তারা এরকম একটা ঘোষণা দিয়েছেন।

 
 ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে ব্যালেন্স করার নামে গণমাধ্যমে  রাজাকার পুনর্বাসন নীতি নিয়ে। নাহিদ এনাম  তার পোস্টে লিখেছেন ,যতদিন এদেশের টিভি চ্যানেলগুলো রাজাকার আর ধর্ম ইস্যু নিয়ে টক শো বন্ধ না করবে ততদিন এরা সরাসরি বাংলাদেশের সমাজ শত্রু হিসেবেই চিহ্নিত এরা অনুষ্ঠান জমিয়ে তোলার তাগিদে রাজাকার সমর্থক এবং ধর্মীয় উগ্রবাদীদের দ্বারা সমাজের সাধারন মানুষের মনের ভেতর বিষ ছড়িয়ে দিতে সবথেকে বেশি ভয়ংকর ভুমিকা রাখছে।
নাজমুল আহসান রাসেল ফেসবুকে  লিখেছেন পিয়াস করিমরা যাদের পক্ষে বলে গেছেন তাদের বলার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে  আমরা লড়াই করি । সক্ষম হলে শক্তি হলে ওদের টুটি টিপে ধরা হবে  হাবিব উল্লাহ লিখেছেন পিয়াস করিম পারিবারিক ভাবেই স্বাধিনতা বিরোধী বলয়ে বড় হয়েছেন। বাবা এমএ করিম ও নানা জহিরুল হক (লিল মিয়া) ছিল কুমিল্লায় শান্তি কমিটির নেতা। দালালি গুরুতর পর্যায়ে যাওয়ায় একাত্তর সালে লিল মিয়া এবং এমএ করিমের বাসায় গ্রেনেড হামলা করে মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযুদ্ধের পর এমএ করিমকে দালালির অপরাধে দালাল আইনে গ্রেফতার করা হয় এবং অনেকদিন সে কুমিল্লা কারাগারে বন্দী থাকে। এসময় ধূর্ত পিয়াস করিম তার বাবাকে বাঁচাতে ছাত্রলীগে যোগ দেয়। পরবর্তিতে যোগ দেয় বাম রাজনীতিতে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার পর একসময় তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটিরও সদস্য ছিলেন। মুলত আনু মোহাম্মদের এই তেল-গ্যাস কমিটির ছায়াতলেই টকশো করার সুযোগ পান। এরপর থেকেই তিনি বিভিন্ন চ্যানেলের টকশোর পরিচিত মূখ হয়ে ওঠেন, পরে তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির কথা ভুলেগিয়ে বিএনপি-জামাত তোষন শুরু করেন।তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি কি ভন্ডের দলে পরিণত হয়ে গেছে...।। তাই এই লেখা লিখলেন...। নাজমুল আহসান লিখেছেন , ভিন্নমত নিয়ে , মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে দুই দিন ধরে বেশআলাপ হচ্ছে এবং সেটা হচ্ছে পিয়াস করিমকে ঘিরে। নির্দিষ্ট ভাবে যদি বলি এই ক্ষেত্রে একটা মহল বেশ চতুরটার সাথে এই দুইটা শব্দ পিয়াস করিমকে নিয়ে আলোচনার শুরুতেই ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে । যারা ঢুকিয়েছে তারা কিছুটা সফল । যারা ঢুকিয়েছে তাদের সাথে পিয়াস করিমের ব্যাক্তিগত সম্পর্ক যেমনি রয়েছে তেমনি রাজনৈতিক দুই একটি এজেন্ডায়ও মিল রয়েছে । একটু খেয়েল করলেই এরা কারা বুঝতে পারবে । পিয়াস করিমের মত বন্ধুকে হারানোর বেদনা , সম্মান প্রকাশ করার জন্যে এই মুহূর্তে পিয়াস করিম এই দুইটি শব্দই রেখে গেছে স্বভাবতই আমাদের এই দুইটা শব্দের প্রতি দুর্বলতা থাকাটাই স্বাভাবিক । কিন্তু আমি প্রশ্ন রাখতে চাই ,জামাত ইসলামী ৭১'র বিরোধিতা করছিলো তার আদর্শের জায়গা থেকে , এখনও সেইটার জন্য তারা ফাইট দিচ্ছে । আপনারা কি এইটাকে ভিন্নমত হিসেবে কিছুটা মার্জনার চোখে দেখবেন ? বা যারা আজ পিয়াস করিমের বক্তব্যকে ভিন্নমত , মতের স্বাধীনতা বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে তারা একটু পরিষ্কার করবে পিয়াস করিমের কোন বক্তব্যগুলিকে ভিন্নমত হিসেবে সম্মান দেখাচ্ছেন ? খালি দুইটা শব্দ বলে দিলেইতো হলনা । টিপুর কাছে প্রশ্ন সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার ইতিহাস এই ভিন্নমত চর্চার ক্ষেত্রে কি সাক্ষ্য দেয় ? কী শিক্ষা দেয় ? আমার ব্যাক্তিগত মত হল, ভিন্নমত হবে বটম লাইন ধরে , বটম লাইন মিস করে যে কোন চক্রান্তমূলক , ষড়যন্ত্র মূলক , স্বাধীনতা বিরোধী , শত্রুর হয়ে দালালী ..................... শক্ত হাতে দমন করতে হবে । এখানে ভাবাবেগের কোন জায়গা নাই । আরেকটা বিষয় আমাকে রীতিমত বিনোদন দিচ্ছে সেটা হল বস্তুবাদীদেরও বলতে শুনছি মৃত্যুর পর মানুষ সব কিছুর উর্ধ্বে উঠে যায় ... প্রশ্ন ... পিয়াস করিম কি মরে গিয়েও সব কিছুর উর্ধ্বে উঠতে পারছেন ? মাহাফুজুল্লাহরাও এখন লাশ নিয়ে হুংকার দিচ্ছেন । আমার একটা জিনিস খটকা লাগছে হেফাজতের সমর্থকদের আবার শহীদ মিনারে যাওয়ার ইচ্ছা হয় কিভাবে ? এইখানে কোন রাজনীতি নাইতো ?  আমাদের সমস্যা হল আমারা কোন না কোন ভাবে দ্বিদলীয় ফাঁদে পাড়া দিবই । পিয়াস করিম নিজেই নিজেকে শহীদ মিনারের অযোগ্য অপ্রাসাংগিক করে গেছে , এই দায় দায়িত্ব তার । শেষে আরেকটা কথা বলে যাই পিয়াস করিম যদি সত্যি সত্যি তার মৃত্যুর পর শহীদ মিনারে নেয়ার ইচ্ছার কথা বলে যান তাহলে আরও বেশী করে তার বক্তব্যগুলি যে ভিন্নমত ছিলোনা কমপ্লিটলি ইন্টেনশনালি ব্যাক্তি স্বার্থে , ক্ষমতা , লোভ ,যশ এর স্বার্থে বলছেন সেটাই প্রমানিত হয় । আসলে আমরা অতিমাত্রায় শান্তিপূর্ণ পথে আগাচ্ছিতো তাই একটু ভাবাবেগে পেয়ে বসে । আমাদের মনটা অনেক নরম হয়ে গেছে । কমিউনিজম এই ব্যাপারে কি বলে টিপু ?  
 
নাজমুল হাসানের  এ প্রশ্ন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রত্যেকেরই ।

 চোখে কলুর বলদের যে ঠুলি রুহিস হোসেন  প্রিন্স পরেছেন বা তরুণদের পরাচ্ছেন এর পরিণতি ভয়াবহ।

এই দেশকে যারা বরাবরই  মৃত্যুউপত্যকায় পরিণত করতে চেয়েছে,


সেই অন্ধকারের শক্তির সাথে হাত মিলিয়েছেন আপনারা গুটিকয়েক ব্যক্তি বা দল।

 এর দায় আপনাদেরই বইতে হবে। তবে মনে রাখবেন, সেই পরিণতি ঠেকাতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সাধারণ মানুষ একাত্ম। 

 শরীরে এক বিন্দু রক্ত থাকতে ১৪ কোটি মানুষের স্মৃতির মিনার আমার অস্তিত্বের প্রতীক আমার চেতনার অগ্নিমশাল শহীদমিনার  খুনি, ধর্ষক রাজাকারের তালুক হতে দেবোনা কখনো!  এ ব্যাপারে গণমাধ্যম নিশ্চয়ই তাদের ভূমিকা অনেক জবাবদিহিমূলক করবে।

 
sumikhan29bdj@gmail.com



Monday, October 13, 2014

‘চ্যানেল আই’এর ষোল বছর, ‘সোলবা সাল’-মহিউদ্দিন আহমদ


অক্টোবর ১৩, ২০১৪ বMohiuddin Ahmedব্যক্তিমালিকানায় বাংলাাদেশে যে ছাব্বিশ-সাতাশটি টিভি চ্যানেল আছে তার শীর্ষস্থানীয় চার-পাঁচটি চ্যানেলের একটি হচ্ছে ‘চ্যানেল আই’। এই চ্যানেলটি ১ অক্টোবর তার ষোড়শ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী মহাধুমধামের সঙ্গেই পালন করল। বস্তত এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শুরু হয় দশ-বার দিন আগেই। তখন প্রতিদিন ‘চ্যানেল আই’এর আয়োজনে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই আলোচনাগুলোর একটি ছিল টক শোগুলোর গুরুত্ব এবং যথার্থতা নিয়ে। ঢাকার কিছু ডাকসাইটে সিভিল সোসাইটির সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা এখানে বক্তব্য দিয়েছেন।
অনুষ্ঠানটি আমি দেখিনি; তবে পরদিন দৈনিক ‘প্রথম আলো’তে এই আলোচনা সভার উপর যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে তার সঙ্গে আমি একমত, যেহেতু আমাদের জাতীয় সংসদটি অকার্যকর সেইহেতু টক শোগুলো এবং ‘বিবিসি বাংলা’র সাপ্তাহিক বাংলাদেশ সংলাপ জাতীয় অনুষ্ঠান সংসদের অভাবটি পূরণ করে দিচ্ছে। কখনও কখনও আবার এমনও মনে হয় জাতীয় সংসদের বিতর্কের চাইতে এগুলো অনেক বেশি কার্যকর। জাতীয় সংসদে গালাগাল এবং বন্দনাই বেশি হয়। কিন্তু টক শোতে পক্ষ-প্রতিপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে উপস্থিত রাখার চেষ্টা হয়; এখানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পাওয়া যায়, জাতীয় সংসদের বর্তমান অবস্থায় যা সম্ভব নয়।
এই পর্যায়ে একটি ডিসক্লেইমার; টক শোতে আমি যাই না, দেখিও না এসব প্রোগ্রাম। রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। রাত ৮টার পর সাধারণত টেলিফোনও ধরি না। আর যে কোনো টিভি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার সম্মানী হিসেবে আমি একটি মিনিমাম পরিমাণের টাকা নিয়ে থাকি।
আমার কোনো গাড়ি নেই, আমাকে নিতে হলে আমাকে নিয়ে যেতে হয়, দিয়েও যেতে হয়। তারপর রাত ১০টার পর হলে, ‘সরি, থ্যাংক ইউ’। এতসব শর্ত মেনে আমাকে দাওয়াত করার দরকার কী? আমার চাইতে যোগ্য লোক এই ঢাকা শহরে অনেক, অনেক পাওয়া যায়। যেমন একটু আগেই বলেছি, আমি টিভি টক শো দেখি না, টক শোতে অংশগ্রহণ করি না। তারপরও আমি মনে করি, যে কোনো সরকারের আমলে সরকার পক্ষের লোকজনের কিছুটা জবাবদিহিতা, কিছুটা ভাষ্য, কিছুটা আত্মপক্ষ সমর্থন এখানে আদায় করা যায়। ‘বিবিসি বাংলা’র বাংলাদেশ সংলাপ এই ক্ষেত্রে একটি প্রবল ভূমিকা রেখে চলেছে।
দুই
বাংলাদেশের এই টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর কয়েকটি কোনোভাবে শুধু বেঁচেই আছ। তবে শীর্ষস্থানের চ্যানেল কোনটি– ‘চ্যানেল আই’, ‘এটিএন নিউজ’, ‘এনটিভি’, নাকি ‘চ্যানেল ৭১’– তা সঠিকভাবে জানার উপায় এই বাংলাদেশে এখনও গড়ে ওঠেনি। টিভি চ্যানেল মালিকদের এখানে সাংঘাতিক ব্যর্থতা।
পত্রপত্রিকার প্রকৃত প্রচারসংখ্যা দিয়ে একটি পত্রিকার পাঠকপ্রিয়তা যাচাই করা যায়। কিন্তু এখানে যে গভীর ও ব্যাপক দুর্নীতি চলছে তা সম্যক জানে আমাদের তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর। তারা সঠিক প্রচারসংখ্যা জানার জন্য কখনও কখনও গভীর রাতে পুলিশ, র‌্যাবের মতো পত্রিকা অফিসে আচমকা পরিদর্শনে যায়। যখন ছাপাখানায় পত্রিকা ছাপা হতে থাকে তখন আসল প্রচারসংখ্যা জানার কথা। কিন্তু এখানেও নানা রকমের অনিয়ম বেনিয়ম এবং দুর্নীতির অবিশ্বাস্য রেওয়াজ চালু আছে।
দুনিয়ার উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে পত্রিকা অফিসে টেলিফোন করলেই সেই পত্রিকার প্রচারসংখ্যা জানা যায়। কিন্তু আমাদের দেশে ‘নো’, ‘নেভার’। পত্রিকার প্রকৃত প্রচারসংখ্যা মালিক-সম্পাদকরা ‘অতিগোপনীয়’ হিসেবে গণ্য করেন। এই ক্ষেত্রে দৈনিক ‘প্রথম আলো’ একমাত্র ব্যতিক্রম।
পত্রিকার প্রচারসংখ্যার উপর নির্ভর করে বিজ্ঞাপন রেট; যে পত্রিকার যত বেশি প্রচার সংখ্যা, তার রেট তত বেশি। সুতরাং প্রচারসংখ্যা বেশি দেখাতে পারলে রেটও বেশি হবে, বিজ্ঞাপন থেকে আয়ও বেশি আসবে। আমাদের পত্রপত্রিকার মালিক-সম্পাদকদের বেশিরভাগই এই দুর্নীতি প্রকাশ্যেই করে চলেছেন।
টেলিভিশনের জনপ্রিয়তা যাচাই করা হয় টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট– ‘টিআরপি’ দিয়ে। তো, বাংলাদেশের বর্তমান চ্যানেলগুলোর টিআরপি নিয়ে ‘এটিএন নিউজ’এর প্রভাষ আমিন কী লিখেছেন, তা নিচে উদ্ধৃত করছি। দৈনিক ‘ইত্তেফাক’এর গত রোজার ঈদ সংখ্যা ২০১৪এ ‘‘বাঘের ওপর টাগ” শিরোনামে আমাদের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ওপর প্রকাশিত খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখার এটি শেষ প্যারাগ্রাফ:
‘‘টেলিভিশন মালিকদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানোর আরেকটি কায়দা হচ্ছে টিআরপি । ‘সিরিয়াস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে টেলিভিশন স্টেশনগুলোর দর্শকপ্রিয়তা যাচই করে। টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ এবং বিজ্ঞাপনদাতারা অনেক টাকা দিয়ে এই টিআরপি রিপোর্ট কেনে। কিন্তু সাধারণ দর্শকরা এই টিআরপি রিপোর্ট দেখার সুযোগ পান না। বিজ্ঞাপনদাতারা এই টিআরপি রিপোর্ট দেখার সুযোগ পান না। বিজ্ঞাপনদাতারা এই টিআরপি রিপোর্ট দেখেই বিজ্ঞাপন দেন। তাই এই টিআরপি রিপোর্ট টিভি স্টেশনগুলোর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এই মহাগুরুত্বপূর্ণ টিআরপি রিপোর্ট কীভাবে তৈরি হয় শুনলে আপনারা হাসতে হাসতে মরে যাবেন। ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে মাত্র ২৬০টি বাসার দর্শকদের পছন্দ মনিটর করেই তৈরি হয় এই টিআরপি । তাও কোন ২৬০টি বাসা তা ‘সিরিয়াস’ ছাড়া আর কেউ জানে না। ভুতুড়ে সেই ২৬০ জন দর্শকই নির্ধারণ করেন টিভি স্টেশনের ভাগ্য এবং এই ২৬০ জনের সবাই ঢাকার। তার মানে ঢাকার বাইরের মানুষ টিভি দেখল কী দেখল না তাতে টিভি স্টেশনের মালিকদের কিছুই যায় আসে না।
হাস্যকর বললাম এই কারণে যে, প্রতি সপ্তাহেই টিআরপি রিপোর্ট দেখার সুযোগ হয় আমার। এমন অনেক টিভি টিআরপি রেটিংয়ে এগিয়ে থাকে, যা আপনারা হয়তো কখনওই দেখেননি। অভিযোগ আছে ‘সিরিয়াস’ প্রায়শই এই টিআরপি রিপোর্ট ম্যানিপুলেট করেন। ‘সিরিয়াস’কে সন্তষ্ট করতে পারলে দর্শক দেখুন আর না দেখুক যে কোনো টিভি টিআরপি তে এগিয়ে থাকতে পারে।’’
এই পর্যায়ে ‘চ্যানেল আই’এর কাছে আমার প্রথম প্রস্তাব, কোন চ্যানেলের কী সঠিক রেটিং পয়েন্ট দর্শকদের তা নিয়মিত জানানোর ব্যবস্থা করুন। ‘চ্যানেল আই’ দেশের প্রথম ডিজিটাল চ্যানেল, এই আত্মপ্রচারগুলো আজ বৃহস্পতিবার ২ অক্টোবরও অনেকবার শুনেছি; এই চ্যানেল অনেক কিছু আমাদের ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে চালু করেছে, আমাদের ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে সমৃদ্ধও করেছে। তো, দয়া করে এখন ইলেকট্রনিক মিডিয়ারই এক সাংবাদিক প্রভাষ আমিনের পর্যবেক্ষণ এবং মন্তব্যগুলো যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সঠিক বস্তুনিষ্ঠ টিআরপি সাপ্তাহিক ভিত্তিতে প্রকাশ্যে চালু করুন।
আমরা ‘চ্যানেল আই’এর সঙ্গে কামাল মজুমদারের ‘মোহনা’ টিভিকে তুলনা করে দেখতে চাই কে কোন অবস্থানে আছে। ‘মোহনা’ টিভি কি কেউ দেখে? এই চ্যানেলের মালিক, আওয়ামী লীগের সাংঘাতিকভাবে বিতর্কিত এক সংসদ সদস্য কামাল মজুমদার নাকি টিভি নাটক এবং অন্যান্য প্রোগ্রামের বকেয়া কোটি কোটি টাকা কয়েক বছর ধরে পরিশোধ করছেন না।
‘চ্যানেল আই’এর দায়িত্বটা এখানে অনেক বেশি। এর মালিকদের একজন, উন্নয়নকর্মী, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ হচ্ছেন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল উওনার্স’– অ্যাটকো এর মহাসচিব। ‘অ্যাটকো’ এর সভাপতি ‘এনটিভি’র মালিক জনাব মোসাদ্দেক আলী ফালু। দু’জনের চ্যানেল দুটোই জনপ্রিয়তা এবং টিআরপি রেটিংয়ে শীর্ষের কয়েকটি চ্যানেলের দুটি।
এখানে আরও উল্লেখ করি, পশ্চিমা দেশে টিভির রেটিং প্রফেশনালিই করা হয়ে থাকে। পত্রপত্রিকায় কোন টিভি চ্যানেলের প্রোগ্রামের জনপ্রিয়তা কেমন তা নিয়মিতই ছাপা হয়। বিশ্ববিখ্যাত টক শো হোস্ট ল্যারি কিং ‘সিএনএন’ থেকে অবসরে যাওয়ার পর তার জায়গায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ টিভি-ব্যক্তিত্বৃ পিয়ার্স মরগ্যানকে। কিন্তু তিন বছর ধরে ‘সিএনএন’ মালিকপক্ষ লক্ষ করল, পিয়ার্সের এই অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা কমে যাচ্ছে। সুতরং মাস কয়েক আগে ‘সিএনএন’ থেকে তাঁকে বিদায় দেওয়া হয়েছে।
তিন
বুধবার ১ অক্টোবর ভোর ৪-৩০ থেকে আমি ‘চ্যানেল আই’ দেখা শুরু করি এবং মাঝে মাঝে কয়েক মিনিটের বিরতিসহ সকাল ১১টা পর্যন্ত একটানা দেখি। বুঝলাম, রাত ১২টায় জন্মদিনের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। ড. কামাল হোসেন, বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদসহ আরও কয়েকজন কেক কাটলেন, তাদের সকলকে চিনলামও। কিন্তু বিএনপি থেকে কে একজন থাকলেন, তাকে আগে কোথায়, কোনো টিভিতে বা পত্রিকার পাতায় দেখেছি তা মনে পড়ল না।
সকাল ৭টায় যখন দিনের পত্রিকাগুলো হাতে নিলাম, দেখলাম ‘চ্যানেল আই’এর জন্মদিন উপলক্ষে যে ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়েছে সেখানে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং তথ্যমন্ত্রীর বাণী আছে। কিন্তু কোনো বাণী নেই বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বা জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদের।
তাহলে মানে কী দাঁড়াল? বিএনপি কি এখন ‘চ্যানেল আই’কে নিরপেক্ষ মনে করে না? তাই বিএনপির এই বয়কট, এই বর্জন?
কিন্তু সেই ২০০৩ বা ২০০৪ সালে যখন বিএনপির ‘যুবরাজ’ তারেক রহমান বাংলাদেশের জেলাগুলো সফরে বের হলেন, তখন এই ‘চ্যানেল আই’তে সালেহ বিল্পব নামের এক ছোকরা রিপোর্টার যে উচ্ছাসের আতিশয্য দেখাল তার রিপোর্টগুলোতে, তখন একটি কলাম লিখেছিলাম আমি। সালেহ বিপ্লবকে কেন আমি ‘ছোকরা বিপ্লব’ বলে আমার কলামে বর্ণনা করলাম, তার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন পরে শাইখ সিরাজ, এক অনুষ্ঠানে।
তো, শাইখ সিরাজ, ফরিদুর রেজা সাগররা বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে আছেন বলেও তো মনে হয় না। ‘চ্যানেল আই’ যদি আওয়ামী লীগের সঙ্গেই থাকত, তাহলে শাইখ সিরাজ ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ নামের চ্যাানেলটি পেতেন। কয়েক বছর ধরে শুনে আসছি, তিনি অনেক বছর ধরে এমন একটি চ্যানেলের জন্য চেষ্টা করে আসছেন, কিন্তু সফল হচ্ছেন না।
বরং দ্বিতীয় চ্যানেল জোগাতে সফল হলেন ‘ডক্টর’ মাহফুজুর রহমান। তার ‘এটিএন বাংলা’ আগে থেকেই তো ছিল, অতিরিক্ত তিনি পেলেন ‘এটিএন নিউজ’ টিভি। অথচ এই ‘ডক্টর’ রহমান ২০০৪ বা ২০০৫ সালে বগুড়ার ধুনটে ২০০৬ এর নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির পরবর্তী সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়ে ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে এসেছিলেন। তাকে ধাওয়া দিয়েছিল বিএনপির তৎকালীন সিটিং এমপি জিএম সিরাজের লোকজন। জিএম সিরাজ ছিলেন বাংলাদেশ বাসমালিক সমিতির তৎকালীন সভাপতি।
ধাওয়া খাওয়ার এই খবরও দেখেছিলাম ‘ডক্টর’ মাহ্ফুজুর রহমানের এটিএন বাংলার খবরেই। সেদিন ১ অক্টোবর ‘ডক্টর’ মাহফুজুর রহমানকেও দুপুরের দিকে ‘চ্যানেল আই’এর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে দেখলাম। তবে তার সঙ্গে দেখলাম না বাংলাদেশের দ্বিতীয় ‘রুনা লায়লা’, ইভা রহমানকে।
‘চ্যানেল আই’ এর মালিকদের অনেক কিছু গত পনের বছরে হয়েছে। ত্রিশটির মতো কোম্পানি, শত শত কোটি টাকা তাদের এখন। কিন্তু তাদের নেই দ্বিতীয় কোনো চ্যানেল। কারণ তাদের টিমে নেই কোনো তদবিরবাজ, প্রধানমন্ত্রীকে ‘আপা’ ডাকার মতো কোনো সাংবাদিক।
চার
‘চ্যানেল আই’এর জন্মদিনের অনুষ্ঠানগুলো দেখতে দেখতে আমার বার বার একটি কথা মনে পড়ছিল। এর দুই প্রধান পুরুষ, ফরিদুর রেজা সাগর এবং শাইখ সিরাজদের জন্য বন্দনা এবং আত্মপ্রচারের যে প্রতিযোগিতা চলল, তাহলে বিটিভিকে ‘সাহেব-বিবি-গোলামের বাক্স’ বলে অপবাদ দেওয়া কেন? সরকারের মালিকানাধীন বিটিভি সরকারের প্রেসিডেন্ট, প্রাইম মিনিস্টার, ফার্স্ট লেডি, মিনিস্টারদের প্রচারণা চালিয়েছে অতীতে, এখনও চালায়; ‘চ্যানেল আই’ও তো তার মালিকবৃন্দ এবং তাদের স্ত্রী-মা-বোনদের প্রচার চালাচ্ছে!
মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে পরের কয়েক দিন বাংলাদেশের সবগুলো পত্রিকায়, সবগুলো চ্যানেলে লতিফ সিদ্দিকী এক নম্বর খবর। কিন্তু ‘চ্যানেল আই’তে লতিফ সিদ্দিকীর বিপরীতে ‘চ্যানেল আই’এর বন্দনা ও বিভিন্ন বিশিষ্টজনদের মধ্যে প্রচারের প্রতিযোগিতার খবর সবগুলো বুলেটিনে এক নম্বরে ছিল।
বুধবার সকালে ‘তৃতীয় মাত্রা’র অনুষ্ঠানে উপস্থাপক জিল্লুর রহমান তবু কিছুটা শালীনতা দেখালেন। ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক, সাবেক সচিব মোফাজ্জল করীম, সাবেক সিএসপি এবং লাহোর সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে ১৯৬৭-৬৮ তে আমার সিনিয়র ব্যাচমেট ড. মিজানুর রহমান শেলী এবং রাশেদা কে চৌধুরীকে জিল্লুর রহমান জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘‘চ্যানেল আই’এর কী কী ঘাটতি আছে, এই চ্যানেলে আপনারা নতুন কী দেখতে চান?’’
এখানেও ব্যারিস্টার রফিকউল-হক এবং রাশেদা কে চৌধুরীর মধ্যে বন্দনার প্রতিযোগিতা দেখলাম। রফিকুল হক বললেন, ইটালির ভেনিস সফরকালে তিনি দেখেছেন এক বাংলাদেশির ইটলিয়ান স্ত্রী ‘চ্যানেল আই’এর খবর দেখতে চারতলায় ছুটে গেলেন। আর রাশেদা চৌধুরী বললেন, ভারতের গুজরাটে তাঁর ছেলের শ্বশুরবাড়িতে ‘চ্যানেল আই’ দেখার প্রবল আগ্রহের কথা।
এমন বন্দনা সেদিন প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কথায়ও দেখলাম। গত বছর তিনি ‘চ্যানেল আই’এর ক্রোড়পত্রের জন্য লেখা দিয়েছিলেন। আমার কাছে তখন তা ‘চিপ’ সস্তা মনে হয়েছিল। টেলিফোন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এই শিক্ষককে তখন প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। লিখতে হলে তিনি সম্পাদকীয় পাতায় লিখবেন। যেমন আজ বৃহস্পতিবার ‘প্রথম আলো’তে সৈয়দ শামছুল হকের বন্দনামূলক একটি লেখা দেখছি। সৈয়দ শামসুল হকও ‘চ্যানেল আই’তে কোনো ঘাটতি ত্রুটি ব্যর্থতা দেখতে পান না। ‘চ্যানেল আই’তে তিনি কোনো বিজ্ঞাপন-সন্ত্রাস দেখেন না। সৈয়দ শামসুল হকের এই বন্দনা তাঁর অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে মনে করি।
এই বন্দনার প্রতিযোগিতা দেখতে দেখতে আমার আরও মনে হচ্ছিল, এই সব বিশিষ্টজন ‘চ্যানেল ৭১’, ‘এটিএন’ এবং ‘এনটিভি’র জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানেও প্রায়ই এই কথাগুলোই বলবেন। ‘চ্যানেল আই’এর জায়গায় শুধু জন্মদিনের অনুষ্ঠান উদযাপনকারী টিভি চ্যানেলের নাম বসিয়ে দিলেই হল। এই দিনের অনুষ্ঠানগুলোতে আরও বুঝলাম, বাঙালি মাত্রই প্রচারকাতর।
‘চ্যানেল আই’এর ‘কৃষি সংবাদ’টি আমি সুযোগ পেলেই দেখি। দেখি ‘প্রকৃতি ও জীবন’ সংবাদও। আরও দেখি সংবাদ, সকাল ৯টার বুলেটিনের শেষ দিকে প্রচারিত দিনের সংবাদপত্রগুলোর অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ শিরোনাম। তবে এই শিরোনামগুলোর পাঠক মৃদুলা মতিনের ছবি দেখানোতে আপত্তিটা কোথায়? মাঝে মাঝে বড় অশুদ্ধ উচ্চারণ থাকে তার। তারপরও তাকে ‘চ্যানেল আই’এর পর্দায় দেখার একটি আগ্রহ আমার অনেকদিনের।
‘চ্যানেল আই’এর খবর সব সময় বস্তুনিষ্ঠ নয়। উদাহরণ দিচ্ছি, আগের দিন মঙ্গলবার শাইখ সিরাজ ওয়াশিংটনে কোনো এক সেমিনারে গুটি সার সম্পর্কে কী বলেছেন, তা সকাল ৭টার বুলেটিন থেকে শুরু করে রাত ৯টার বুলেটিনেও প্রচার করতে হবে কেন? কারণ কি এই যে, তিনি শাইখ সিরাজ, তিনি একজন মালিক? আত্মপ্রচার কি এমন প্রকট হতে হবে?
জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও দেখলাম, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি ‘ইউনিলিভার’, তার সাবান সামগ্রী এবং মোবাইল কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপনের দাপট এবং প্রতাপ। পশ্চিমা দেশে, কোনো একজন ‘ইনভেস্টিগেটিভ’ রিপোর্টার, এই জন্মদিনে বিজ্ঞাপন খাতে ‘চ্যানেল আই’এর আয় কত কোটি টাকা, খরচই-বা কত, এমন সব খরচের যৌক্তিকতা, এসবের উপর দীর্ঘ প্রতিবেদন তৈরি করে ছাপাতেন।
আমাদের পত্রপত্রিকা এবং টিভি চ্যানেলগুলো দেশের মানুষদের সচেতনতা বাড়াতে, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করতে, মানবাধিকার রক্ষায়, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে প্রবল ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এতসব, বড় বড় নন্দিত ভূমিকার পরও যখন দেখি, বাংলাদেশের অনেক মানুষ অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে একদিকে, আবার চাঁদে দেলাওয়ার হোসেইন সাঈদীকেও দেখছে এবং বিশ্বাসও করছে, তখন আর মেলাতে পারি না। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অসাধারণ সময এখন বাংলাদেশে। বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব দুর্গাপুজা চলছে। কয়েক দিন পর কোরবানির ঈদ। পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের এক উত্তম সময় এখন। ক্ন্তিু লক্ষ্য করেছেন কি, হিন্দুদের উৎসব উদযাপিত হয়েছে পুলিশি প্রহরায়! এই দেশে সাম্প্রদায়িকতা বাড়ছে না কমছে? আমাদের গণমাধ্যমের প্রভাব এবং কার্যকারিতা নিয়ে তখন মনে প্রশ্ন জাগে।
‘চ্যানেল আই’তে জাঁকজমকের এত বড় বড় সব অনুষ্ঠান, এত বড় বড় সব লোকের দোয়া শুভকামনা এবং অভিনন্দন জ্ঞাপন, কিন্তু একজন মানুষকে এই বছরের অনুষ্ঠানে দেখলাম না, আগের বছরগুলোতও নয়। ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা এবং এখন চেয়ারম্যান সনজীদা খাতুনকে ‘চ্যানেল আই’এর কোনো অনুষ্ঠানে দেখা যায় না।

শিউলিতলা, উত্তরা
বৃহষ্পতিবার, ২ অক্টোবর, ২০১৪

Saturday, October 11, 2014

মানবের কর্মবিশ্বের সাধক শিল্পগুরু এস এম সুলতানের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ-সুমি খান

শেখ মোহাম্মদ সুলতান, যিনি এস. এম. সুলতান নামে সমধিক পরিচিত, (১০ আগস্ট, ১৯২৩ - ১০ অক্টোবর, ১৯৯৪) বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী।তাঁর জীবনের মূল সুর-ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, কৃষক এবং কৃষিকাজের মধ্যে। আবহমান বাংলার সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার ইতিহাস তাঁর শিল্পকর্মকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। তাঁর ছবিতে গ্রামীণ জীবনের পরিপূর্ণতা, প্রাণপ্রাচুর্যের পাশাপাশি শ্রেণীর দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির হালও অনেকটা ফুটে উঠেছে। তাঁর ছবিগুলোতে বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে গ্রামের মহিমা উঠে এসেছে এবং কৃষককে এই কেন্দ্রের রূপকার হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৯৮২ সালে তাঁকে এশিয়ার ব্যক্তিত্ব হিসেবে ঘোষণা করে। 

 
এস. এম. সুলতান ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১০ আগস্টে তৎকালীন পূর্ব বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ) যশোরের নড়াইলের মাছিমদিয়া নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম হয়েছিলো এক দরিদ্র পরিবারে। তাঁর বাবার নাম শেখ মোহাম্মদ মেছের আলী, তিনি পেশায় ছিলেন রাজমিস্ত্রী। শৈশবে পরিবারের সবাই তাকে লাল মিয়া বলে ডাকতো। তাঁকে বিদ্যালয়ে পড়ানোর মতো অতোটা সামর্থ্য তাঁর বাবার ছিলো না। বহু কষ্ট হওয়াসত্ত্বেও তাঁকে নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়। তিনি এখানে পাঁচ বছর অধ্যয়ন করেন। এরপর স্কুল ছেড়ে বাড়ি ফিরে রাজমিস্ত্রীর কাজ শুরু করেন। রাজমিস্ত্রীর কাজ করার পাশাপাশি তিনি সেই দালানগুলোর ছবি আঁকতেন। ১০ বছর বয়সে যখন তিনি স্কুলে পড়েন তখন ড: শাম্যপ্রসাদ মুখার্জ্জী স্কুল পরিদর্শনে এসে তাঁর আঁকা ছবি দেখে প্রশংসা করেছিলেন। তাঁর খুব ইচ্ছা ছিলো ছবি আঁকা শিখবেন, এজন্যে দরকার হলে কলকাতায় যাবেন। কিন্তু এরকম আর্থিক সঙ্গতি তাঁর পরিবারের কখনোই ছিলোনা। এসময় তাঁর এলাকার জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। জমিদারের সাহায্য নিয়ে সুলতান ১৯৩৮ সালে কলকাতা যান।


তাঁর ইচ্ছা ছিলো কলকাতায় গিয়ে অর্থ উপার্জনের কোনো চেষ্টা করার পাশাপাশি চিত্রশিল্পের শিক্ষা চালিয়ে যাবার। এই ইচ্ছা নিয়েই তিনি প্রথমে ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের কলকাতার বাড়িতে উঠেন। এসময় তৎকালীন সময়ের প্রখ্যাত শিল্প সমালোচক এবং কলকাতা আর্ট স্কুলের পরিচালনা পরিষদের সদস্য শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে তাঁর পরিচয় হয়। সোহরাওয়ার্দী, সুলতানকে সব ধরণের পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকেন। তাঁর গ্রন্থাগার সুলতানের জন্য সব সময় উন্মুক্ত ছিলো। ১৯৪১ সালে তিনি কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় সব যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও সোহরাওয়ার্দীর চেষ্টায় তিনি ভর্তি হতে পেরেছিলেন। এখানে তিনি তিন বছর পড়াশোনা করেন। পাশ করে একজন ফ্রিল্যান্স চিত্রশিল্পী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

আর্ট স্কুলে পড়লেও সেখানকার বাঁধাধরা জীবন এবং প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার কঠোর রীতিনীতি তাঁর জীবনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলোনা। তিনি ছিলেন বোহেমীয় জীবনাচারের অনুসারী। চেতনায় তিনি ছিলেন স্বাধীন এবং প্রকৃতিগতভাবে ছিলেন ভবঘুরে এবং ছন্নছাড়া। প্রকৃতিকে তিনি সবসময় রোমান্টিক কবির আবেগ দিয়ে ভালোবেসেছেন। আবার যান্ত্রিক নগর জীবনকে সেরকমই ঘৃণা করেছেন। ১৯৪৩ সালে তিনি খাকসার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। এর অব্যবহিত পরেই বেরিয়ে পড়েন এবং উপমাহাদেশের পথে পথে ঘুরে তাঁর অনেকটা সময় কেটে যায়। তখন ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। অনেক মার্কিন ও ব্রিটিশ সৈন্য ছিলো ভারতে। তিনি ছোট-বড় বিভিন্ন শহরে ঘুরে ঘুরে ছবি এঁকে তা সৈন্যদের কাছে বিক্রি করতেন। এভাবেই তিনি সেসময় জীবনধারণ করেছেন। মাঝে মাঝে তাঁর ছবির প্রদর্শনীও হয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি শিল্পী হিসেবে কিছুটা পরিচিতি লাভ করেন। কিন্তু সুলতানের চরিত্রে পার্থিব বিষয়ের প্রতি যে অনীহা এবং যে খামখেয়ালীপনা ছিলো তাঁর কারণে সেই ছবিগুলো রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। সেগুলোর কোনো আলোকচিত্রও এখন পাওয়া যায় না। এছাড়া তিনি কখনও এক স্থানে বেশি দিন থাকতেন না। তিনি বলেন:
একেক জায়গায় এভাবে পড়ে আছে সব। শ্রীনগরে গেলাম। সেখানকার কাজও নেই। শ্রীনগরে থাকাকালীন পাকিস্তান হয়ে গেলো। '৪৮-এ সেখান থেকে ফিরে এলাম। কোনো জিনিসই তো সেখান থেকে আনতে পারিনি। একটা কনভয় এনে বর্ডারে ছেড়ে দিয়ে গেলো। পাকিস্তান বর্ডারে। আমার সমস্ত কাজগুলোই সেখানে রয়ে গেলো। দেশে দেশে ঘুরেছি। সেখানে এঁকেছি। আর সেখানেই রেখে চলে এসেছি।
 
তবে এটুকু জানা গেছে যে, সেসময় তিনি প্রাকৃতিক নৈসর্গ্য এবং প্রতিকৃতি আঁকতেন। তাঁর আঁকা ছবির প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিলো ১৯৪৬ সালে সিমলায়
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারতের জন্ম হয়। এই বিভক্তির পর এস এম সুলতান কিছু দিনের জন্য নিজ দেশ তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসেন। এখানে কিছুদিন থেকেই করাচি চলে যান। সেখানে পারসি স্কুলের শিল্প শিক্ষক হিসেবে দুই বছর চাকুরি করেছিলেন। সেখানে চাকুরিরত থাকা অবস্থায় তাঁর সাথে পরিচয় হয় চুঘতাই এবং শাকের আলীর মত বিখ্যাত শিল্পীদের। এর কিছু আগে ১৯৫০ সালে চিত্রশিল্পীদের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখানে নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগো এবং বোস্টনে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয়। এরপর লন্ডনেও তিনি প্রদর্শনী করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে আবার নড়াইলে ফিরে আসেন। এবার এসে তিনি শিশু শিক্ষার প্রসারে কাজ শুরু করেন যা নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন ছিলো। শেষ বয়সে তিনি নড়াইলে শিশুস্বর্গ এবং চারুপীঠ নামে দুটি শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড় তুলেছিলেন। এছাড়া সেখানে "নন্দন কানন" নামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি উচ্চ বিদ্যালয় এবং "নন্দন কানন স্কুল অব ফাইন আর্টস" নামে[১] একটি আর্ট স্কুলও প্রতিষ্ঠা করেন।
অনেকটা সময় তাঁর নড়াইলেই কেটে যায়। ঢাকায় আধুনিক চিত্রশিল্পের বিকাশের সময়টায় তিনি প্রায় সকলের অজ্ঞাতেই ছিলেন। ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি শিল্পরসিকদের চোখের আড়ালেই থেকে যান। সত্তরের দশকের মধ্যভাগে তাঁর কিছু শুভানুধ্যায়ী তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। এখানে এসে তিনি কিছু ছবি আঁকেন। তাঁর আঁকা এইসব ছবি নিয়ে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী এক প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমেই তিনি নতুন করে শিল্পসমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। অবশ্য আশির দশক থেকে তিনি আবার নড়াইলেই থাকতে বাধ্য হোন। তাঁর কাছে যেসব মানুষ এবং শিশু আশ্রয় নিয়েছিলো তাদের জন্য তিনি নিজের ঘর ছেড়ে দেন। জীবজন্তুর প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি একটি চিড়িয়াখানা তৈরি করেন এবং সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে শিশুদের জন্য সুন্দরী কাঠ দিয়ে একটি বড় আকারের নৌকাও তৈরি করেছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিলো শিশুরা সেই নৌকায় চড়ে সমুদ্র পরিভ্রমণে বের হবে আর শিল্পচর্চার উপকরণ খুঁজে পাবে।[৫] আশির দশকের শেষদিকে তাঁর স্বাস্থ্য খারাপ হতে থাকে। ১৯৯৪ সালে ঢাকার গ্যালারি টোনে তাঁর সর্বশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সে বছরেরই আগস্ট মাসে নড়াইলে ঘটা করে তাঁর জন্মদিন পালন করা হয়। ১৯৯৪ সালেরই ১০ আগস্ট তিনি যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় আধুনিক চিত্রকলার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছিলো। অনেক শিল্পীই সেখানে নব নব শৈলী, গড়ন এবং মিডিয়া নিয়ে উপস্থিত হচ্ছিলেন। কিন্তু এস এম সুলতান সেসময়ও নড়াইলে থেকে যান, অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে। এর কারণ অবশ্য গ্রামীণ জীবনের প্রতি তাঁর চিরন্তন আকর্ষণ এবং সহমর্মিতা। তাঁর শিল্পকর্মের স্বরূপটিও খুঁজে পাওয়া যায় এই গ্রামীণ জীবনযাত্রার প্রেক্ষাপটে। তাঁর সে সময়কার ছবিগুলোতে গ্রামীণ কৃষকদের দেখা যায় পেশীবহুল এবং বলশালী হিসেবে। এর কারণ হিসেবে তাঁর বক্তব্য হলো[৫]:
আমাদের দেশের মানুষ তো অনেক রুগ্ন, কৃষকায়। একেবারে কৃষক যে সেও খুব রোগা, তার গরু দুটো, বলদ দুটো -সেটাও রোগা...। [আমার ছবিতে তাদের বলিষ্ঠ হওয়াটা] মনের ব্যাপার। মন থেকে ওদের যেমনভাবে আমি ভালোবাসি যে আমাদের দেশের কৃষক সম্প্রদায়ইতো ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়েছিলো। অর্থবিত্ত ওরাই তো যোগান দেয়। ...আর এই যত জমিদার রাজা মজারাজা আমাদের দেশের কম কেউ না। সবাই তো কৃষিনির্ভর একই জাতির ছেলে। আমার অতিকায় ছবিগুলোর কৃষকের অতিকায় অতিকায় দেহটা এই প্রশ্নই জাগায় যে, ওরা কৃশ কেন? ওরা রু্গ্ন কেন- যারা আমাদের অন্ন যোগায়। ফসল ফলায়।
তাঁর ছবিতে গ্রামীণ রমণীদের দেখা যায় সুডৌল ও সুঠাম গড়নে। নারীর মধ্যে উপস্থিত চিরাচরিত রূপলাবণ্যের সাথে তিনি শক্তির সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন। একই সাথে তাঁর এ ছবিগুলোতে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের শ্রেণী-দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির কিছু ক্রুর বাস্তবতা উঠে এসেছে। তাঁর এরকম দুটি বিখ্যাত ছবি হচ্ছে: হত্যাযজ্ঞ (১৯৮৭) এবং চরদখল(১৯৮৮)।
১৯৭৬ সালে তাঁর আঁকা শিল্পকর্ম নিয়ে শিল্পকলা একাডেমীর প্রদর্শনীতে তাঁর ছবির মহিমা নতুন করে প্রস্ফুটিত হয়। এই ছবিগুলোর মধ্যে দেখা যায় বিশ্বের কেন্দ্র হচ্ছে গ্রাম আর সেই কেন্দ্রের রূপকার কৃষককে আপন মহিমায় সেখানে অধিষ্ঠিত দেখা যায়। গ্রাম ও গ্রামের মানুষ ছিলো তাঁর শিল্পকর্মের অনুপ্রেরণা আর উপকরণ ছিলো কৃষক এবং কৃষকের জীবন চেতনা। এস এম সুলতান তেলরঙ এবং জলরঙ-এ ছবি আঁকতেন। আঁকার জন্য তিনি একেবারে সাধারণ কাগজ, রঙ এবং জটের ক্যানভাস ব্যবহার করেছেন। এজন্য তাঁর অনেক ছবিরই রঙ নষ্ট হয়ে যাচ্ছিলো, যদিও এসবের প্রতি তিনি তেমন ভ্রুক্ষেপ করতেন না।
এস এম সুলতান আধুনিকতার একটি নিজস্ব সংজ্ঞা গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর তেমন কোনো অনুসারী ছিলোনা যারা একই সংজ্ঞা মেনে শিল্পচর্চা করতেন। একারণেই তাঁর প্রতিষ্ঠিত আধুনিকতার স্বরূপ নিয়ে নতুন কোনো ধারার সৃষ্টি হয়নি। কেউ তাঁর মতো করে আধুনিকতার ব্যাখ্যাও দেননি। এছাড়া তাঁর মতো মাটির জীবন তখনকার কোনো শিল্পী যাপন করেননি। তাঁর কাছে আধুনিকতার সংজ্ঞা কেমন ছিলো তা বলতে গিয়ে বাংলাপিডিয়ায় তাঁর জীবনীর লেখক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লিখেছেন:
তাঁর কাছে অবয়বধর্মিতাই প্রধান। তিনি আধুনিক, বিমূর্ত শিল্পের চর্চা করেননি; তাঁর আধুনিকতা ছিলো জীবনের শাশ্বত বোধ ও শিকড়ের প্রতিষ্ঠা করা। তিনি ফর্মের নিরীক্ষাকে গুরুত্ব দেননি, দিয়েছেন মানুষের ভেতরের শক্তির উত্থানকে, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই এবং ঔপনিবেশিক সংগ্রামের নানা প্রকাশকে তিনি সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থাপন করেছেন। এটাই তাঁর কাছে ছিলো 'আধুনিকতা', অর্থাৎ তিনি ইউরো-কেন্দ্রিক, নগর নির্ভর, যান্ত্রিকতা-আবদ্ধ আধুনিকতার পরিবর্তে অন্বেষণ করেছেন অনেকটা ইউরোপের রেনেসাঁর শিল্পীদের মতো মানবের কর্মবিশ্বকে।
শিল্পী এস এম সুলতান শেষ জীবনে বলে গিয়েছেন:
আমি সুখী। আমার কোনো অভাব নেই। সকল দিক দিয়েই আমি প্রশান্তির মধ্যে দিন কাটাই। আমার সব অভাবেরই পরিসমাপ্তি ঘটেছে।
 

সিডও সনদে সংরক্ষণ-প্রত্যাহার জরুরী -সুমি খান


“কেউ নারী হয়ে জন্মায় না। তাকে নারী করে তোলা হয়…” নারীবাদের বেশিরভাগ সমর্থক সিমন দ্য ব্যুভেয়ারের এই অসামান্য পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত। নারী-পুরুষ হয়ে জন্মানো  এখনো কারো নিজের কৃতিত্ব নয় । ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা যদি এমন কিছু আবিষ্কার করেন, হয়তো তখন স্বেচ্ছা জন্মের সুযোগ থাকতে পারে। কিন্তু  এখনো নেই। 
তবে সমাজপতিদের নির্দেশনায় 'সভ্যসমাজ' একটি কন্যাশিশুকে ফ্রক পরিয়ে, পুতুল খেলতে দিয়ে, ঘরকন্নায় ব্যস্ত রেখে, ঘরের কোণে আটকে রেখে ধীরে ধীরে  একটি ' অনুগত নারী' হিসেবে গড়ে তোলে।
এর বিরুদ্ধে সঙঘবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে নারী-পুরুষের সমান অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং  সমান অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার সংঘবদ্ধ আন্দোলনের ইতিহাস  সমৃদ্ধ হলেও খুব প্রাচীন নয়।

 গত শতকের বিশের দশকে আমেরিকার নারীরা ভোটাধিকার অর্জন করে। এর ধারাবাহিকতায় ষাটের দশকে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে নারী সমাজে ব্যাপক সচেতনতার সৃষ্টি হয়। নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন, প্রতিষ্ঠান নারী-পুরুষের সমঅধিকারের দাবিতে বিশ্বের নানা প্রান্তে আন্দোলন গড়ে তোলে। 

ক্লারা জেটকিন, জার্মান সমাজতান্ত্রিক দলের নারী শাখার অন্যতম নেত্রী, ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে প্রথম নারী দিবস পালনের কথাটি উত্থাপন করেন। তিনি প্রস্তাব দেন প্রত্যেক দেশে নারীর অধিকার আদায়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট দিবস থাকা প্রয়োজন । সেই সম্মেলনে ১৭টি দেশ থেকে আসা শ’খানেক নারী ক্লারা জেটকিনের এই প্রস্তাবে সমর্থন জানান।


এর ভিত্তিতেই গত শতাব্দীর প্রথম দিকে, ১৯ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হলেও পরে, ১৯১০ সালের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার জন্য প্রস্তাব গৃহীত হয়। এরপর, ১৯৭৫ সালে প্রথমবারের মতো মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলন। এই সম্মেলনে ১৯৭৬-১৯৮৫ সময়কাল ‘‘নারী দশক’’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
অন্যদিকে জাতিসংঘ নারীর রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালটি ‘‘আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ’’ হিসেবে ঘোষণা করে। এরই ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ‘সিডও সনদ’ বা নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য নিরসন সনদ পরিগৃহীত হয়। এ সনদকে

 বলা হয় ‘উওম্যানস বিল অব রাইটস’।এতে ৩০ টি ধারা রয়েছে।এর ১ থেকে ১৬ নম্বর ধারা পর্যন্ত নারী -পুরুষের সমতা-সংক্রান্ত নীতিমালা বর্ণিত আছে। 

বাংলাদেশে নারী অধিকার নিয়ে আন্দোলনরত সংগঠনগুলোর অব্যাহত চাপের মুখে সরকার ১৯৮৪ সালের ৬ নভেম্বর সিডও সনদ স্বাক্ষর করে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই ঐতিহাসিক স্বাক্ষর করার সময়ে ৩ টি ধারার ৪ টি উপধারা সম্পর্কে সংরক্ষণমূলক নীতি অবলম্বন করে বাংলাদেশ। ধারাগুলো হচ্ছে– ২, ১৩.১ (ক), ১৬.১ (গ), (চ)। ২ নম্বর ধারাতে বর্ণিত আছে– বৈষম্য বিলোপের লক্ষ্যে রাষ্ট্র কর্তৃক যথাযথ নীতি ও পদ্ধতি গ্রহণ। সনদের ২ ধারার সাতটি উপধারায় সংবিধান ও অন্যান্য আইনে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের নীতি গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন, বৈষম্য নিষিদ্ধ করার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থাসহ আইনগত ও অন্যান্য পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা আছে। এছাড়া রয়েছে সমানাধিকারের আইনগত সুরক্ষা প্রতিষ্ঠায় আদালত, ট্রাইব্যুনাল এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার মাধ্যমে যে কোনো বৈষম্যমূলক কাজের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করা,নারীর প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করে বিদ্যমান এমন আইন, বিধান, সংশোধন বা বাতিল করার জন্য আইন প্রণয়নসহ উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং এমন সব ফৌজদারি বিধিবিধান বাতিল। ধারা ১৩ .১(ক) পারিবারিক কল্যাণের অধিকার। ১৬.১ (গ) ধারায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন হওয়ার ব্যাপারে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়। আর এই ধারা (চ) অনুচ্ছেদে অভিভাবকত্ব, সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়কত্ব ও পালক সন্তান গ্রহণ অথবা জাতীয় আইনে যেখানে অনুরূপ ধরনের ধারণা বিরাজমান রয়েছে সে সব ক্ষেত্রে সমান অধিকার ও দায়িত্ব, সব ক্ষেত্রেই সন্তানের স্বার্থ হবে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। সরকার কর্তৃক সংরক্ষিত চারটি অনুচ্ছেদ সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের আন্দোলনে নতুন প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। এর প্রেক্ষিতে নারী সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক আন্দোলনের ফলে ২ ও ১৬.১ (গ) অন্য দুটি ধারার ওপর থেকে আপত্তি তুলে নেওয়া হয় ১৯৯৭ সালে। 

 ২টি ধারার সংরক্ষণসহ সিডও সনদের স্বীকৃতি মূল সনদের চেতনার সঙ্গে কোনভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। জাতিসংঘের নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ বা সিডওর গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধারা থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করার জন্য আইন কমিশন সরকারকে সুপারিশ পাঠিয়েছে ২০১৩ সালে। এর বিপরীতে সরকার এখন পর্যন্ত এ সুপারিশ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি এবং কমিশনকেও এ বিষয়ে কিছু জানায়নি।
 
আইন কমিশনের সর্বশেষ সুপারিশে বলা হয়েছে, ধারা ২ পুরোটি কোন্ অর্থে 'কোরআন ও সুন্নাহবিরোধী' তার ব্যাখ্যা দেয়নি বাংলাদেশ। অন্য কোনো মুসলিম রাষ্ট্র পুরো ২ ধারাটি 'কোরআন-সুন্নাহবিরোধী' বলে চিহ্নিত করেনি, তা প্রত্যাখ্যান করেনি। এই সনদের সিগনেটরি অন্যান্য দেশ, জার্মানি, বেলজিয়াম, সুইডেন, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ডস এই শর্ত সংরক্ষণের বিরোধিতা করে আপত্তিও জানিয়েছে। ধারা ১৬ (১) গ বিষয়ে বলা যায়, এ ধারা সম্পূর্ণভাবে 'কোরআন ও সুন্নাহভিত্তিক শরীয়াহবিরোধী' বলা যাবে না। কেননা দেশে প্রচলিত আইনেই নারীর অনেক অধিকার রয়েছে।
  কমিশনের সদস্য শাহ আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, ১৯৯৬ সালের 'আইন কমিশন আইন' অনুযায়ী কোনো বিষয়ে কমিশন সুপারিশ দিলে সরকার প্রতি বছর সংসদের প্রথম অধিবেশনে কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন সংসদে পেশ করবে। তবে কমিশনের পক্ষ থেকে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আইন মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হলেও এ দুটি মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অবস্থান হচ্ছে, ‘‘সিডও সনদ বিষয়ে আইন কমিশনের সুপারিশ আমরা পেয়েছি। তবে তা এখনও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। চার বছর পরপর প্রতিবেদন পাঠানোর বাধ্যবাধকতায় আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ সিডও কমিটির কাছে বাংলাদেশকে প্রতিবেদন পাঠানোর কথা। সরকার সে প্রতিবেদন তৈরির কাজ করছে। সংরক্ষণ প্রত্যাহারের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’’
অন্যান্য বারের মতো সরকার সর্বশেষ প্রতিবেদনেও (২০১০) সিডও কমিটির কাছে সংরক্ষণ প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এবারও সরকার বলেছে, সংরক্ষণ প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করছে। অন্যদিকে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে জেনেভায় জাতিসংঘ সিডও কমিটির ৪৮তম অধিবেশনে সরকারের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি করণীয় সম্পর্কে সিডও কমিটি সমাপনী সভায় বরাবরের মতো বাংলাদেশ সরকারকে সংরক্ষণ প্রত্যাহারের তাগিদ দিয়েছে।
পারিবারিক বিষয়ে সমন্বিত আইন না থাকায় মুসলিম আইন, খ্রিস্টান আইন ও হিন্দু আইন ইত্যাদি ধর্মীয় আইন দ্বারা ওই সব ধর্মের অনুসারীরা তাদের পারিবারিক বিষয়াদি পরিচালনা করে এবং প্রতিটি ধর্মীয় পারিবারিক আইনেই নারীর প্রতি চরম বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। ১৬ ধারার সংরক্ষণ এরূপ বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে উৎসাহিত করেছে বলে মনে করা হয়।
অন্যদিকে, সিডও সনদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারা হচ্ছে ২ নম্বর ধারাটি। ১৬ এবং ২ নম্বর– এই ধারা দুটো অনুমোদন না করার ক্ষেত্রে শাসক শ্রেণির যুক্তি হচ্ছে, এগুলো ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে। 

অন্যান্য অনেক মুসলমান অধ্যুষিত দেশ সিডও সনদের সম্পূর্ণ অনুমোদন দিলেও, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ (যেহেতু ইসলামিক রিপাবলিক নয়) কেন সংরক্ষণ ব্যতীত অনুমোদন দিতে পারছে না সেটাই আশ্চর্যজনক। বাংলাদেশ  'শরীয়া আইন' দ্বারা পরিচালিত নয়।
 আমাদের সংবিধানের ১০ , ১৯, ২৭, ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদ সমূহ শোষণমুক্ত এবং নারী-পুরুষের বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের কথা বলে।
সিডও সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও অবস্থা পর্যালোচনামূলক দায়িত্বের অংশ হিসেবে প্রতি ৪ বছর পরপর সিডও কমিটির কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। পরবর্তী প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় বাংলাদেশ সরকার হয়তো সংরক্ষণ সংক্রান্ত নীতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এ অবস্থান পরিবর্তন করবে– এমন আশা করছেন সিডও নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো। সংরক্ষণ প্রত্যাহার করলেই সত্যিকার অর্থে কার্যকর হবে সিডও সনদ। 

 

নারী দিবস, সিডও সনদের বার্ষিকী পালনের আয়োজনের জৌলুসের পাশাপাশি নারীর অবস্থান ও অবস্থা পরিবর্তনে আন্তরিক প্রয়াস কাম্য। কেননা লিঙ্গবৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রধানতম হাতিয়ার।


Thursday, October 9, 2014

রাজিয়া ও আলিমার জঙ্গি প্রশিক্ষণ হয়েছিল পাকিস্তানের ওয়াজিরিস্থানে:সুমি খান



রাজিয়া ও আলিমার জঙ্গি প্রশিক্ষণ হয়েছিল পাকিস্তানের ওয়াজিরিস্থানে :চট্টগ্রাম, মুম্বই, চেন্নাই ও কাশ্মীরে যোগাযোগের সূত্র



কোলকাতার তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা নুরুল হাসান চৌধুরীর বর্ধমানের বাড়িতে বোমা বানানোর সময়ে নিহত বাংলাদেশের দুই জঙ্গী শাকিল আহমেদ এবং সোবহান মন্ডলের স্ত্রী রাজিয়া ও আলিমা পুলিশ হেফাজতে বিস্তারিত তথ্য দিচ্ছে বলে জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। এর সূত্র ধরে পলাতক চার জঙ্গীকে খুজছে ভারতের পুলিশ।  হিন্দুস্থান টাইমসের সংবাদে প্রকাশ,  বাংলাদেশে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে দিল্লি।গোয়েন্দা হেফাজতে শাকিল আহমেদ এবং সোবহান মন্ডলের স্ত্রীরা জানিয়েছেন, দশ বছর আগে বাংলাদেশে জেএমবি’র সদস্যপদ গ্রহণ করে আলিমা ও রাজিয়া। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল পাকিস্তানের ওয়াজিরিস্থানে। হাতের নাগালে পাওয়া রাসায়নিক দিয়ে কীভাবে প্রাণঘাতী বিস্ফোরক তৈরি করা যায়, সেই পদ্ধতি রাজিয়া ও আলিমা শিখেছিল ওয়াজিরিস্থানের শিকক এলাকায় । সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে ফেরে তারা। এদিকে বাংলাদেশের জঙ্গী সংগঠনের সাথে তৃণমূল নেতাদের সংশ্লিষ্টতা উদ্ঘাটন করে এই বোমা হামলা তদন্ত করার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি কে ‘জিহাদী দিদি’ সম্বোধন করে এ ঘটনায় রাজ্য প্রধান হিসেবে তার জবাবদিহিতা দাবি করেছেন সিনিয়র বিজেপি নেতা সুব্রাহ্মনীয়াম স্বামী ।  এই বোমা হামলার ঘটনায় বাংলাদেশী জঙ্গী সম্পৃক্ততার সূত্র নিশ্চিত করতে একই সাথে ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের গভীর তদন্ত দাবি করেছে সিপিআই(এম) কেন্দ্রীয় কমিটি।
গোয়েন্দা সূত্রে খবর, রাজিয়া ও আলিমার জঙ্গি প্রশিক্ষণ হয়েছিল পাকি¯তানের ওয়াজিরিস্থানে। সুন্দরবন দিয়ে নৌপথে বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রচুর অস্ত্র ঢুকেছে বলেও জানতে পেরেছে  ভারতের পুলিশ। একই সাথে জঙ্গিবাদে উঠে আসছে বাংলাদেশ ভারত সীমান্তবর্তী এলাকার একাধিক ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম। বর্ধমানের গ্রেনেড কারখানায় বিস্ফোরণ। তার থেকেই মিলল বিশাল এক জঙ্গি নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত। তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততোই একের পর এক রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে। জঙ্গিযোগের একের পর এক তথ্য বেরিয়ে আসছে। খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণস্থলে উদ্ধার সিমকার্ডের কললিস্ট খতিয়ে চট্টগ্রাম, মুম্বই, চেন্নাই ও কাশ্মীরে যোগাযোগের সূত্র পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ।
ঢাকায় ভারতীয় হাই-কমিশনের কাছে বর্ধমান বিস্ফোরণের যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ চেয়ে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। বুধবার ঢাকায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, বাংলাদেশ সরকার বিস্ফোরণ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানতে চেয়েছে। বাংলাদেশের কেউ এর সঙ্গে জড়িত কিনা এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে বাংলাদেশ ভারতকে কী ভাবে সাহায্য করতে পারে তা জানতে চাওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের গোয়েন্দা রিপোর্টেই বলা হয়েছে, বর্ধমান-বোমা বিষ্ফোরণ ঘটনায় বাংলাদেশের জঙ্গিরা যুক্ত।
 শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে জঙ্গিদমনে জোর তৎপরতা বাড়লে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে ঢুকে পড়ে  শাকিল আহমেদ এবং সোবহান মন্ডলের স্ত্রী  রাজিয়া, আলিমা ও তাদের সঙ্গীরা। জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ ও সন্ত্রাসবাদী মতাদর্শে মগজধোলাইয়ের ঘটনায় উঠে আসে বেশ কিছু ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামও। বর্ধমানের বোমা হামলা তদন্ত করতে গিয়ে গোয়েন্দা সূত্রে এসব তথ্য  বেরিয়ে আসছে। গত ২ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের খয়ড়াগড়ায় বোমা বানাতে গিয়ে  দুই বাংলাদেশি জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।  বর্ধমানে বোমা বিস্ফোরণের পেছনে বাংলাদেশের জঙ্গিদের হাত রয়েছে বলেও গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জঙ্গি তৎপরতা আটকাতে যে প্রশাসনিক যে উদ্যোগ নেওয়া উচিত,পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার তা নেয়নি বলে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের সরকারকে দায়ী করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম জনকন্ঠকে বলেন , ভারত, বাংলাদেশ , মায়ানমার এবং পাকিস্তানের আল-কায়দা অনুসারীরা সিøপিং সেল পদ্ধতিতে একসাথে সমান্তরাল ভাবে  কাজ করছে। এই পদ্ধতিতে এক বাহিনীর কাজ অন্য বাহিনী জানতে পারে না।

যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সন্ত্রাসবাদ দমনে ২০০৮-এর ৩১ ডিসেম্বর ভারতে গঠন করা হয় ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি। ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টার গঠনের প্রাথমিক ধাপ হিসাবে  তৈরি এনআইএ জাতীয় স্বার্থে সে দেশের যে কোনও প্রান্তে তদন্ত করতে পারে। সাধারণভাবে, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার চাইলে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট ঘটনার তদন্ত শুরু করে এনআইএ। তবে, ভারতের কেন্দ্র  সরকার যদি মনে করে কোনও ঘটনায় রাষ্ট্রের বিরদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, তাহলে রাজ্যকে অগ্রাহ্য করে এনআইকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় আঘাত লাগবে, এই যুক্তিতে বর্ধমান-বোমা হামলা ঘটনার ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ)‘র তদন্তে আপত্তি জানিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার। এরপরও যদি এনআইএ বর্ধমান বিস্ফোরণের তদন্ত শুরু করে,সেটাই হবে ভারতের ইতিহাসে প্রথম ঘটনা- যেখানে রাজ্যের আপত্তি সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের নির্দেশে তদন্ত করবে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ)। বর্ধমান-বোমা বিষ্ফোরণ ঘটনায় বাংলাদেশি জঙ্গিদের জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। তাই, খাগড়াগড় বিস্ফোরণকে শুধুমাত্র রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার ব্যাপার বলে দেখা উচিত নয়। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এনআইএ তদন্ত জর–রি বলে মনে করছেন  ভারতের রাজনীতিক এবং  বিশেষজ্ঞরা।

রাজ্যের আপত্তি অগ্রাহ্য করে কেন্দ্রের নির্দেশে এনআইএ কোনও ঘটনার তদন্ত করছে, এমন নজির এখনও পর্যন্ত ভারতে নেই। ২০১৩ সালের  অক্টোবরে পাটনার গান্ধী ময়দানে নরেন্দ্র মোদির সভায় বিস্ফোরণের তদন্ত প্রথমে এনআইএ-কে দিতে চায়নি বিহার সরকার। যদিও, পরে এনআইএকে তদন্ত করতে দিতে রাজি হন বিহারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী  নীতীশ কুমার। গত মে মাসে চেন্নাই সেন্ট্রাল রেল স্টেশনে বেঙ্গালুরু-গুয়াহাটি এক্সপ্রেসে বিস্ফোরণের পর এনআইএ’র তদন্তে আপত্তি জানান তামিলনাড়–র তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা। পরে রাজ্যের সম্মতি নিয়ে ঘটনাস্থলে যান এনআইএ-র গোয়েন্দারা।  রাজ্যের সম্মতি নিয়ে সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত চুরাশিটি মামলার তদন্ত করছে ভারতের এনআইএ। রাজ্য সরকারের সম্মতির ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গে দুটি ঘটনার তদন্ত করছে এনআইএ। কোলকাতার কলেজ স্ট্রিটে মাওবাদী নেতা সদানলা রামকৃষ্ণকে গ্রেফতার এবং দক্ষিণ কলকাতার একটি পাঁচতারা হোটেলে হুমকি দিয়ে চাঁদা চেয়ে ইন্ডিয়ান মুজাহেদিনের নামে ফোন করার ঘটনার তদন্ত করছে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ)।
তদন্ত একটু এগোতেই বোঝা যায় বর্ধমান-কান্ড মামুলি ঘটনা নয়। তদন্তে সিআইডির অধীনে টাস্ক ফোর্স গঠন করে রাজ্য সরকার। বিস্ফোরণের খোঁজখবর করতে গিয়ে রাজ্য পুলিসের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ করেন এনআইএ-র অফিসাররা। ভারতীয় গণমাধ্যমের সংবাদে প্রকাশ, ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ)’র অভিযোগ উড়িয়ে দেন ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব। স্বরাষ্ট্রসচিব এ কথা বললেও তা মানতে নারাজ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংকে বর্ধমানের বোমা বিষ্ফোরণের রিপোর্ট দিয়েছে তারা। তাতে  পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ আনা হয়েছে। বলা হয়েছে, ঘটনার গুরুত্ব বুঝতেই ব্যর্থ হয়েছে রাজ্য সরকার। নেওয়া হয়নি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও। পুলিসি বাধায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা যায়নি বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০০১ সালের  ২৩ জুলাই ভারতের  তিলজলায় নিজের কারখানার কাছে অপহৃত হন খাদিম কোম্পানীর কর্মকর্তা পার্থ রায়বর্মণ। মুক্তিপণের জন্য শিল্পকর্তার অপহরণের সেই ঘটনার তদন্তে জঙ্গি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পান তদন্তকারী দল।
২০০২ সালের ২২ জানুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আমেরিকান সেন্টারে জঙ্গী হামলার ঘটনা এখনো সেই  রাজ্যে সন্ত্রাসবাদী হামলার সবচেয়ে বড়ো ঘটনা। স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিয়ে আমেরিকান সেন্টারে হামলা চালায় বাইকে সওয়ার সশস্ত্র জঙ্গিরা। গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান আমেরিকান সেন্টারের বেশ কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী।
২০১৩ সালের একাধিক ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গে জঙ্গি তৎপরতার প্রমাণ পেয়েছে ভারতের পুলিশ এবং গোয়েন্দা দল। তদন্ত রিপোর্টে প্রকাশ, গত একদশক ধরে ভারতে নাশকতা করে জঙ্গীদের পালানোর পথ হিসেবে বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গকে ব্যবহার করেছে জঙ্গিরা।অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশ থেকে অনায়াসেই পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে ভারতের  বিভিন্ন  প্রদেশে ছড়িয়ে যায় জেএমবি জামায়াতের জঙ্গীরা এ তথ্য জনকন্ঠকে জানিয়েছে জেএমবির জঙ্গীরাও।
ভারতের মুম্বই ধারাবাহিক বিস্ফোরণ,হায়দরাবাদের মক্কা মসজিদ বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে জঙ্গিরা পশ্চিমবঙ্গকেই যাতায়াতের রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করেছিল বলে নিশ্চিত হয়েছে ভারতের গোয়েন্দারা। পশ্চিমবঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীগুলির একাধিক সিøপিং সেলের সক্রিয়তা নিয়ে বারবার সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় পালাবদলের পর পরিস্থিতির বদল হয় বলে জানায় ভারতের গোয়েন্দারা ।তাদের মতে,  বাংলাদেশে  আ্ওয়ামীলীগ প্রধান শেখ হাসনিার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর জঙ্গিগোষ্ঠীগুলিকে কঠোরহাতে দমন করে শেখ হাসিনা সরকার। গোয়েন্দা সূত্রে খবর, সে সময় বাংলাদেশ থেকে বহু জঙ্গিনেতা পালিয়ে এসে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেয়। গত কয়েক বছরে একাধিক ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গে জঙ্গি সক্রিয়তার প্রমাণ পেয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা।
২০১২ সালের ৮ এপ্রিল তারিখে মেটিয়াবুরুজের মসজিদ তালাওয়ে এলাকায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে দু‘জনের মৃত্যু হয়। ১২ জুলাই ২০১২ তারিখে মেটিয়াবুরুজ বিস্ফোরণের তদন্তে কলকাতায় গ্রেফতার সিমি নেতা হারুণ অররশিদ।২০ ডিসেম্বর ২০১২ তারিখে কলকাতার প্রিন্সেপ ঘাটে গ্রেফতার হুজি জঙ্গি মিজানুর রহমান । ২০১৩ সালের ১৯ ও ২৩ মে দার্জিলিং জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে পাঁচ আইএসআই চরকে গ্রেফতার করে ভারতীয় পুলিস।

তার ই ধারাবাহিকতায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য পাচ্ছেন গোয়েন্দারা।
বর্ধমান বিস্ফোরণ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে গোয়েন্দাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে। বর্ধমানের ঘটনায় যুক্ত ভারতের ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন, বাংলাদেশের জামাতুল মুজাহিদিন এবং পাকিস্তানের আল কায়দার শাখা আল জিহাদ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে অভিন্ন ইসলামিক রাষ্ট্র তৈরির আদর্শে হাত মিলিয়েছে এই তিনটি জঙ্গি সংগঠন।এই জিহাদি আদর্শেই দীক্ষিত ছিল পশ্চিমবঙ্গের খাগডাগড়ের ভাড়াবাড়িতে আশ্রয় নেয়া জঙ্গিরা।
২০১৩ সালের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া, মুর্শিদাবাদ ও মালদহের সীমান্তবর্তী কিছু ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের মৌলবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসলামির কিছু সংগঠক। বাংলাদেশে জামায়াত নিষিদ্ধ ঘোষণা হবার গুঞ্জন এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবার পর থেকে জেএমবি এবং হেফাজতে ইসলামির আডালেই জামাত নেতারা জঙ্গীবাদ প্রচার করতে থাকে। তবে শুধুমাত্র স্থলসীমান্ত নয়, সন্ত্রাস আমদানিতে কার্যত অরক্ষিত জলপথকে ব্যবহারের সুযোগও ছাড়েনি জঙ্গিরা। গোয়েন্দা সূত্রে প্রকাশ, কয়েকমাস আগেই চট্টগ্রাম থেকে জলপথে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র সুন্দরবনের খাঁড়িতে এসেছিল। সে অস্ত্র কোথায় গেল বা কী কাজে ব্যবহার হল তা খতিয়ে দেখছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ।
ভারতীয় গণমাধ্যমে এ নিয়ে তোলপাড় চললেও আসাদুজ্জামান খান জনকন্ঠকে বলেন, ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছু জানায়নি। অফিসিয়ালি জানানোর পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গত ২ জুলাই ২০১৪ চিত্পুরের কলকাতা স্টেশন থেকে গ্রেফতার হয় জার্মান বেকারি বিস্ফোরণে অভিযুক্ত ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন জঙ্গি জাহিদ হুসেন। ১৬ অগাস্ট ২০১৪ দিল্লী পুলিস জানিয়েছে আলিপুর জেলে বসেই স্মার্ট ফোনের স্কাইপে সফটওয়্যারের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে লস্কর জঙ্গি আর্শাদ খান ও সওকত।
আইমান জাওয়াহিরি গত ছয় মাসে দুইটি ভিডিও বার্তায় জোর আত্মবিশ্বাসে দাবি করেছেন বাংলাদেশে তাদের  বেশ কিছু জঙ্গী সংগঠক রয়েছে। এতে বলা হয়েছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) দক্ষিণ এশিয়া শাখা সংগঠিত করে ভারত, পাকিস্তান বাংলাদেশে সমন্বিত জঙ্গী তৎপরতা সংগঠিত করে বাংলাদেশে বড়ো ধরণের নাশকতা করার প্রস্তুতি নিয়েছে ইসলামিক স্টেটস (আইএস)। তারই প্রমাণ উঠে আসছে একের পর এক বিষ্ফোরণকে কেন্দ্র করে তদন্ত প্রতিবেদনে। এর আগে তৃণমূল নেতা এবং সংসদ সদস্য  ইমরানের মাধ্যমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিপুল আর্থিক বিনিয়োগের তথ্য প্রমাণ পেয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয়  গোয়েন্দাদল।
 ভারত সরকার বিস্তারিত তথ্য জানানোর পর বাংলাদেশের গোয়েন্দারা তদন্তে নামবেন বলে জানা গেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার  মনিরুল ইসলাম জনকন্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা পেলে তারা পশ্চিমবঙ্গে বোমা হামলায় নিহতদের অনুসন্ধানে মাঠে নামবেন। ০৯.১০.২০১৪