Friday, July 11, 2014

ফিলিস্তিনের শান্তি এবং আইএসআইএস জঙ্গীবাদের হুমকিকে বাংলাদেশ - সুমি খান


ইহুদি বিজ্ঞানী ড. হেইস বাইজম্যানের বোমা বানানোর মূল উপকরণ ফসফরাস আবিষ্কারের পুরস্কার ফিলিস্তিন হস্তান্তর

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা শুরু। ১৯৫০ এর পর থেকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যা, ২০০৩ থেকে ইরাক যুদ্ধ এবং কয়েকদিন আগে আইএসআইএস জঙ্গি সংগঠনের গণহত্যার সূচনা, সিরিয়াতে গৃহযুদ্ধ এবং সে দেশের নাগরিকদের উপর অসহনীয় অত্যাচার- বিশ্বমানবতার বিবেক জাগছে না কেন  আরববিশ্ব এবং প্যালেস্টাইনের নিরীহ মানুষগুলোর জন্যে?
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার ওপর বর্বর ইহুদিবাদী ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসন অব্যাহত রয়েছে। দখলদার এ গোষ্ঠীর হামলায়  ১০ জুলাই বৃহস্পতিবার ৩৩ জন ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছেন এবং এ দিনকে গত কয়েকদিনের যুদ্ধে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিন হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
তেহরান বেতারের সংবাদ অনুযায়ী ১০ জুলাই শহীদ হওয়াদের মধ্যে অন্তত ছয়টি শিশু, চারজন নারী ও একজন ৭৫ বছরের বৃদ্ধ রয়েছেন। মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি আগ্রাসনে এ পর্যন্ত শহীদ হয়েছেন অন্তত ৯৭ জন। এর মধ্যে বহুসংখ্যক নারী, শিশু ও বয়স্ক লোকজন রয়েছেন।

বৃহস্পতিবার ইসরাইলি বিমান থেকে গাজার কয়েকশ লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা চালানো হয়। হামলায় গাজার ইরেজ ক্রসিং পয়েন্ট ধ্বংস হয়ে গেছে। বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে ৪৮ ঘণ্টায় ইসরাইল ৭৫০টি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে। এদিকে, সম্ভাব্য স্থল অভিযান শুরুর জন্য গাজা সীমান্তে ইসরাইল ২০,০০০ সেনা মোতায়েন করেছে। হামাস নেতা হামদান সম্ভাব্য স্থল অভিযানের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ইসরাইল যা আশা করছে তা হবে না। 

অন্যদিকে, গাজার আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য মিশর সরকার সাময়িকভাবে রাফাহ ক্রসিং পয়েন্ট খুলে দিয়েছে। গত বছর সাবেক প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ মুরসিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার পর থেকে এই সীমান্ত বন্ধ ছিল।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস এবং ইসলামি জিহাদ আন্দোলনের ছোঁড়া রকেটে ইসরাইলের আশদোদ শহরে আরো এক ইসরাইলি মারা গেছে। এছাড়া তেল আবিব, আশকেলোন, সিদরোত, জেরুজালেম এবং হাইফাসহ বিভিন্ন শহরে হামাসের রকেট আঘাত হেনেছে। কিছু কিছু রকেট ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম প্রতিহত করতে পারলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সফল হচ্ছে না। তবে হামাসের রকেট হামলায় ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করছে না ইসরাইল।

তিন ইসরায়েলি কিশোর হত্যার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে ইসরায়েল ফিলিস্তিনে নির্বিচারে মানুষ মারা শুরু করেছে। অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার চিকিৎসা ব্যবস্থা যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু। গাজায় ইসরাইলি বিমান হামলা জোরদার হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি।

হু এক বিবৃতিতে বলেছে, গাজা উপত্যকায় চিকিৎসা সামগ্রীর মারাত্মক অভাবের পাশাপাশি হাসপাতালগুলো চালানোর কাজে ব্যবহৃত জেনারেটরগুলোর প্রয়োজনীয় জ্বালানি দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজা উপত্যকায় সহিংসতা (ইসরাইলি পাশবিক হামলা) বেড়ে যাওয়ার কারণে হাসপাতালগুলোতে আহত মানুষের ভিড় প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে। কিন্তু এত রোগীর চাপ সহ্য করার ক্ষমতা অধিকৃত ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেই। হাসপাতালগুলোতে যে সীমিত পর্যায়ের চিকিৎসা সামগ্রী ছিল তা দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং অবরোধ থাকার কারণে এ ধরনের সামগ্রীর সরবরাহও বন্ধ রয়েছে। ফলে যেকোনো সময় গাজার চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

গাজা উপত্যকায় গত চারদিনের ইসরাইলি আগ্রাসনে অন্তত ৯৭ জন নিহত ও ৬০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছে। হতাহতদের মধ্যে বহু নারী ও শিশু রয়েছে। হুর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরাইলি হামলায় গাজার একটি শরণার্থী শিবিরের একটি হাসপাতাল, তিনটি ক্লিনিক এবং একটি পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে। ওই এলাকায় আরো হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছে।গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, সেখানকার হাসপাতালগুলোতে মাত্র ১০ দিনের জ্বালানি সরবরাহের মজুদ রয়েছে। এ ছাড়া, ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন বাকি পড়ে আছে বেশ কয়েক মাসের। প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাবে গত কয়েকদিনে বেশ কিছু অপারেশন করা সম্ভব হয় নি।
ভূমধ্যসাগরের পূর্বে ১০,৪২৯ বর্গমাইলব্যাপী ফিলিস্তিন দেশটি ছিল উসমানীয় খেলাফতের অধীন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যারা ছিল বৃটেন বিরোধী জোটে৷ তখন যুদ্ধ জয়ে ফিলিস্তিনদের সহযোগিতা পাওয়ার আশায় ১৯১৭ সালে বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড বেলফোর যুদ্ধে জয়ী হলে এই ভূমিতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হবে বলে আশ্বাস দেন  । যা ইতিহাসে ‘বেলফোর ঘোষণা’ হিসেবে পরিচিত। যেহেতু আরবরা ছিল ইহুদিদের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি, সেহেতু ঘোষণাটি তাদের অনুকূল বলে তারা ধরে নেয়৷ কিন্তু এর মাঝে যে শুভংকরের ফাঁকি, তা তারা বুঝতে পারেনি।

বৃটিশ শাসনের শুরু থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বৃটেনের প্রয়োজনে দুর্লভ বোমা তৈরির উপকরণ কৃত্রিম ফসফরাস তৈরি করতে সক্ষম হন ইহুদি বিজ্ঞানী ড. হেইস বাইজম্যান। ফলে আনন্দিত বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী জানতে চাইলেন, কী ধরনের পুরস্কার তিনি চান? উত্তর ছিল,  “ অর্থ নয় ,আমার স্বজাতির জন্য এক টুকরো ভূমি । আর তা হবে ফিলিস্তিন !” ফলে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডটি ইহুদিদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেয় বৃটেন ! প্রথম বিশ্বযুদ্ধ জয়ের পর বৃটেন স্বাধীনতা দেয়ার অঙ্গীকারে ১৯১৮ সাল থেকে ৩০ বছর দেশটিকে নিজেদের অধীন রাখে। মূলত: এই সময়টিই ফিলিস্তিনকে আরব শূন্য করার জন্য ভালোভাবে কাজে লাগায় ইহুদি বলয় দ্বারা প্রভাবিত ইঙ্গ-মার্কিন শক্তি।

আরবরা দাবি করেছিলো  ১৯৪৭ সালে জাতি সংঘ দ্বারা প্রস্তাবিত ফিলিস্তিন বিভাগ যেভাবে প্রস্তাবিত হয়েছিল, যেখানে ফিলিস্তিন ভূখন্ড (গাজা ভূখন্ড ও ওয়েস্ট ব্যাংক) ছাড়াও ইসরায়েল শাসনাধীন অঞ্চলও ছিল এবং জেরুজালেমকে ঘোষিত রাষ্টের রাজধানী আখ্যা দেওয়া হয়েছিলো।
১৯৭৪ আরব লীগ শীর্ষ বৈঠকে স্থির হয়েছিল, পিএলও ফিলিস্তিনের জনগণের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি এবং ও তাদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার আহবান জানিয়েছিল । ২২ নভেম্বর ১৯৭৪ থেকে একটিজাতি  হিসেবে পিএলও কে " রাষ্ট্রহীন-সত্তা " রূপে পর্‍্যবেক্ষক অবস্থায় রাখা হয়েছিল। যারা কেবলমাত্র জাতি সংঘে তাদের বক্তব্য রাখতে পারতেন, কিন্তু ভোট দেবার কোনো ক্ষমতা ছিল না।
বৃটিশরা একদিকে ইহুদিদের জন্য খুলে দেয় ফিলিস্তিনের দরজা, অন্যদিকে বৃটিশ বাহিনীর সহযোগিতায় ইহুদিরা ফিলিস্তিনদের বিতাড়িত করে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য গড়ে তোলে অনেক প্রশিক্ষিত গোপন সন্ত্রাসী সংগঠন৷ তার মধ্যে তিনটি প্রধান সংগঠন ছিল হাগানাহ, ইরগুন ও স্ট্যার্ন গ্যাং -যারা হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ আর ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টির মাধ্যমে নিরীহ ফিলিস্তিনদের বাধ্য করে নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যেতে ।

সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর গণহত্যার কথা যখন আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত হচ্ছিলো, তখন পরিস্থিতকে নিজেদের অনুকূলে আনার জন্য গুপ্ত সংগঠন ‘হাগানাহ’ আত্মহননের কৌশল করে  । ১৯৪০ সালে ‘এসএস প্যাট্রিয়া’ নামক একটি জাহাজকে হাইফা বন্দরে উড়িয়ে দিয়ে ২৭৬ জন ইহুদিকে হত্যা করে হাগানাহ বাহিনী । ১৯৪২ সালে আরেকটি জাহাজকে উড়িয়ে ৭৬৯ জন ইহুদিকে হত্যা করে তারা । উভয় জাহাজে করে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে আসছিল আর বৃটিশরা সামরিক কৌশলগত কারণে জাহাজ দুটিকে ফিলিস্তিনের বন্দরে ভিড়তে দিচ্ছিল না ।
ইহুদী সন্ত্রাসী দল হাগানাহ এভাবে  বিশ্ব জনমতকে নিজেদের পক্ষে আনার অপকৌশল করলো নিজেদের সম্প্রদায় ইহুদিদের হত্যা ক’রে । পাশাপাশি দ্রুততার সাথে ইহুদিদের বসতি স্থাপন ও আরবদের উচ্ছেদকরণ চলতে থাকে৷ এর ফলে ২০ লাখ বসতির মধ্যে বহিরাগত ইহুদির সংখ্যা দাড়ালো ৫ লাখ ৪০ হাজার ।

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ জাতিসংঘের মাধ্যমে পাস হয়ে যায় একটি অবৈধ ও অযৌক্তিক প্রস্তাব-
 ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার হীন লক্ষ্যে ইঙ্গ-মার্কিন চাপে জাতিসংঘে ভোট গ্রহণ হয় । এতে ৩৩টি রাষ্ট্র ইজরাইলের পক্ষে, ১৩টি বিরুদ্ধে এবং ১০টি ভোট দানে বিরত থাকে৷ প্রস্তাব অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ হয়েও ইহুদিরা পেল ভূমির ৫৭% আর ফিলিস্তিনরা পেল ৪৩% তবে প্রস্তাবিত ইহুদি রাষ্ট্রটির উত্তর-পশ্চিম সীমানা ছিল অনির্ধারিত।  ফলে ভবিষ্যতে ইহুদিরা সীমানা বাড়ানোর আশংকা রয়ে গেলো। ফলে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা চূড়ান্ত হলেও উপেক্ষিত থেকে যায় ফিলিস্তিন।

প্রহসনের নাটকে জিতে গিয়ে ইহুদিরা ;  হত্যা ধর্ষণের উন্মত্ততায় হয়ে ওঠে আরো হিংস্র

হত্যা সন্ত্রাসের পাশাপাশি ফিলিস্তিনদের উচ্ছেদ করার উদ্দেশে রাতে তাদের ফোন লাইন, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, বাড়িঘরে হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ, জোর করে জমি দখল এবং নারী নির্যাতন করে মৃত্যু বিভীষিকা ছড়িয়ে দিতে লাগলো । ফলে লাখ লাখ আরব বাধ্য হলো দেশ ত্যাগ করতে । এরপরই ১৯৪৮ সালের ১২ মে রাত ১২টা ১ মিনিটে ‘ইজরায়েল’ কে রাষ্ট্র ঘোষণা করলো ইহুদিরা । ১০ মিনিটের ভেতর যুক্তরাষ্ট্র স্বীকৃতি দিল, অতঃপর সোভিয়েত ইউনিয়ন-বৃটেন ।
 সেই পরিস্থিতিতে চরম  অস্তিত্বের সংকটে পড়ে ফিলিস্তিন বা প্যালেস্টাইন (আরবি: فلسطين, ফিলাস্‌ত্বীন্‌) সরকারিভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র (আরবি: دولة فلسطين, দাউলাৎ ফিলাস্‌ত্বীন্‌) ১৫ নভেম্বর ১৯৮৮ সালে আলজিয়ার্স শহরে নির্বাসনে ঘোষিত একটি রাষ্ট্র, যেখানে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অরগানাইজেশন (পিএলও) ও প্যালেস্টাইন জাতীয় পরিষদ (পিএনসি) একপাক্ষিক ভাবে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল । ১৯৮৮ ঘোষণার সময়ে কোনো অঞ্চলেই পিএলওর নিয়ন্ত্রণ ছিল না, যদিও তারা যে অঞ্চলগুলি দাবি করেছিল আন্তর্জাতিকভাবে সেইগুলি ইজরায়েলের দখলে ছিল।
অনেক দিন ধরে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল এর মধ্যে চলে আসা এ সংঘাতকে বৃহত্তর অর্থে আরব-ইসরায়েল সংঘাতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। দুইটি আলাদা জাতি করার জন্য অনেক পরিকল্পনাই করা হয়েছে। এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে ইসরায়েলের পাশে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রও গঠিত হতো।

 একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, দুই দেশের অধিকাংশ মানুষই এই সংঘাত নিরসনে অন্য যেকোন পরিকল্পনার তুলনায় দুই-জাতি পরিকল্পনাকে বেশি সমর্থন করে।
নিজেদের পুরো দেশ দখলে চলে যাবার কারণে অধিকাংশ প্যালেস্টাইনী মনে করে, তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র হওয়া উচিত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকাকে কেন্দ্র করে। অধিকাংশ ইসরায়েলীও এই ধারণা সমর্থন করে। হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন শিক্ষাবিদ সবকিছু বাদ দিয়ে একটিমাত্র রাষ্ট্র গঠনকে সমর্থন করে। তাদের মতে সমগ্র ইসরায়েল, পশ্চিম তীর ও গাজা মিলে একটি দ্বি-জাতীয় রাষ্ট্র গঠিত হওয়া উচিত যেখানে সবার সমান অধিকার থাকবে। কিন্তু এ নিয়ে কোন স্থির সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হয়নি।
এই সংঘাতে দেশী-বিদেশী অনেকগুলো শক্তি ও বিষয় জড়িয়ে পড়েছে। সংঘাতে  এক পক্ষে সরাসরি ইসরাইল সরকার -যার প্রধান নেতা এহুদ ওলমার্ট। আর অন্য পক্ষে ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) এবং এর বর্তমান প্রধান নেতা মাহমুদ আব্বাস। এই দুই পক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা তৈরীতে কেন্দ্রীয় চরিত্র কোয়ার্টেট অফ দ্য মিড্‌ল ইস্ট (শুধু কোয়ার্টেট) নামে পরিচিত একটি দল। এই দলে কূটনৈতিকভাবে অংশ নেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ। এই সংঘাতের আরেক নায়ক আরব লীগ যারা একটি বিকল্প শান্তি পরিকল্পনা পেশ করেছে। আরব লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মিশর এতে মুখ্য ভূমিকা রাখছে।
২০০৬ সালের পর থেকে প্যালেস্টাইনীয় অংশ দুটি প্রধান দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে: ফাতাহ এবং হামাস। এর মধ্যে ফাতাহ-ই বর্তমানে সবচেয়ে বড়। এর ফলে দেশের কেন্দ্রীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক শাসিত মূল ভূমি ব্যবহারিক অর্থে দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে: পশ্চিম তীরে ফাতাহ এবং গাজা উপত্যকায় হামাস প্রভাব বিস্তার করেছে। এতে সমস্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ ইসরায়েলসহ অনেকগুলো দেশই হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করে।

 যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের অ্যানাপোলিসে, ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে সমঝোতা অনুষ্ঠান হয় । এই আলোচনার মাধ্যমে ২০০৮ এর শেষ নাগাদ একটি চিরস্থায়ী শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছিল। অংশগ্রহণকারী দলগুলো বলেছে, ৬ টি প্রধান বিষয় আছে যেগুলোর সমাধান না হলে শান্তি আসবে না। এগুলো হচ্ছে: জেরুজালেম, শরণার্থী, আবাসন, নিরাপত্তা, সীমান্ত এবং পানি। এই বিষয়গুলো নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে।
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এই সংঘাত নিয়ে বিভিন্ন রকম মতামতের সৃষ্টি হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, সংঘাতটা শুধু ইসরায়েল আর ফিলিস্তিনের মধ্যে নয়, উভয়ের অভ্যন্তরেও অনেক অর্ন্তর্দ্বন্দ্ব্ব বিদ্যমান। এই সংঘাতের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী সহিংসতা। অনেক দিন ধরে এই অঞ্চলে এক নাগাড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটছে। এই যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে সেনাবাহিনী, আধাসামরিক বাহিনী এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো। শুধু সামরিক লোকই মারা যাচ্ছে না, সাথে প্রচুর বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটছে।
১৯৪৭ এর পর থেকেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র জোরজবরদস্তির শিকার হয়ে বর্তমানে অবরুদ্ধ হয়ে আছে।  ইসরাইলের দিমোনা শহরের পরমাণু স্থাপনায় দ্বিতীয় দফা রকেট হামলা চালিয়েছে ফিলিস্তিনের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। বৃহস্পতিবার এ হামলা চালানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে হামাস। হামাস বলেছে, দিমোনার পরমাণু চুল্লি ধ্বংস করে দেয়ার জন্য গাজা উপত্যকা থেকে তিন দফা রকেট হামলা চালানো হয়েছে।
এম-৭৫ রকেট দিয়ে এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জেদিন আল- কাসসাম ব্রিগেড।ইসরাইলে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছেক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম একটি রকেটকে ধ্বংস করে দিয়েছে। অন্য দুটি রকেট খোলা জায়গায় আঘাত হেনেছে। বুধবারও এ কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামাসের সাত দফা রকেট হামলা হয়েছিল। তার মধ্যে তিনটি ধ্বংস করে দিয়েছে আয়রন ডোম এবং অন্য চারটি তেমন কোনো ক্ষতি করতে পারে নি।
ইসরাইলের রয়েছে দু টি পরমাণু স্থাপনা। এর একটি রয়েছে দিমোনায় এবং অন্যটি আল-কুদস বা জেরুজালেম শহরে। ইসরাইলের বিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদরা দিমোনা পরমাণু স্থাপনা বন্ধ করে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছেন, পুরনো এ স্থাপনা ক্রমেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে।

এই পরিস্থিতি কবে স্থিতিশীল হবে,প্যালেষ্টাইনের নিরীহ শিশু, নারীরা কবে স্বাধীন মাতৃভূমি ফিরে পাবে? এর জবাব হয়তো কারো কাছেই নেই। তবে  ইঙ্গ-মার্কিন রাজনীতির বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত সোচ্চার হলে অনেকটা সহজ এবং সুগম হতে পারে এই নিরীহ মানুষগুলোর শান্তির পথ- একথা নিশ্চিত করে বলা যায়।
আবার ফিরে আসতে হয়  জঙ্গীগোষ্ঠী আলকায়দার নতুন সংস্করণ আইএসআইএল প্রসঙ্গে। আইএসআইএল এর প্রধান ও স্বঘোষিত খলিফা আবুবকর আল বাগদাদি এবার তার কথিত 'জিহাদ' লেবাননেও ছড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে।  বাগদাদি তার দাবিমতে কারাগারগুলো থেকে জঙ্গী  'ইসলামপন্থীদের' মুক্ত করার জন্যই লেবাননের বিরুদ্ধে কথিত জিহাদ শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে। 'জিহাদের এ পর্যায়ে' লেবাননের 'রুমিয়া' কারাগারসহ অন্য কারাগারগুলো থেকে ওই 'ইসলামপন্থীদের' মুক্ত করার নামে নতুন করে জঙ্গী হামলার পরিকল্পনা নিয়েছে আইএসআইএল প্রধান।

আয়েশা নামের একটি সংবাদ সংস্থা বাগদাদির এই নতুন পরিকল্পনা সংক্রান্ত বক্তব্যের ভিডিও প্রচার করেছে। বাগদাদি এই অভিযানের নাম দিয়েছে  ‘দেয়ালগুলোর বিনাশ’। আইএসআইএল-এর প্রধান জানায়, এই অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল সব অঞ্চল থেকে 'মুসলিম বন্দীদের মুক্ত করা' এবং তাদের 'জল্লাদদের' তথা হত্যাকারীদের তাড়া করা ও হত্যা করা; আর এই  কথিত 'জল্লাদদের' তালিকার শীর্ষে রয়েছে বিচারক ও কৌশলীরা। এই ভিডিওতে লেবাননের রুমিয়া কারাগারের দৃশ্য দেখানো হয় এবং সেখানকার বন্দীদেরকে 'রুমিয়া কারাগারের অপহৃতরা' বলে অভিহিত করা হয়েছে। বাগদাদির বক্তব্যে আরো এসেছে: আমেরিকার মিত্র লেবাননের 'তাগুতি সরকার' 'ফাতহুল ইসলাম'-এর সিংহদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিন সদস্যকে ফাঁসি দিয়েছে ও তাদের একদলকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়ার কথা ভাবছে; আর এইসব কাজই করা হয়েছে ইরান ও আমেরিকার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য! ...জিহাদি সিংহরা এখন কারাগারগুলোর দরজার পেছনে অবস্থান করছে এবং আল্লাহর ইচ্ছায় তারা যখন লেবাননে প্রবেশ করবে তখন কারাগারেও ঢুকে পড়বে। জেনে রাখুন যারা আবু গ্বারিব কারাগার ধ্বংস করতে পেরেছে তারা রুমিয়া কারাগারের ক্ষেত্রেও তা করতে পারবে।এই ভিডিওতে রুমিয়া কারাগার ভবন ও সেখানকার কথিত মুসলিম বন্দীদের কয়েকজনকে দেখানো হয়। একই ভিডিওতে দেখানো হয়েছে, এই কারাগারের অন্যতম বন্দী আবু ওমর সালিম কথা বলছেন। ভিডিওটিতে যেসব বন্দীদের দেখানো হয় তাদের পাশে ছিল আইএসআইএল-এর একটি পতাকা ও একটি প্ল্যাকার্ড যাতে লেখা ছিল 'রুমিয়া কারাগারের অপহৃতরা'

এই ভয়ংকর জঙ্গীদের ভাষা আর বাংলাদেশের জঙ্গীদের ভাষা এক। ‘তাগুতী সরকার’ , ‘জল্লাদ’ নামে গণতান্ত্রিক সরকার এবং প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের চিহ্ণিত করে হত্যার টার্গেট করার ভয়াবহতা থেকে মুক্ত নই আমরা । একথা বলার অনেক কারণ। তার মধ্যে অন্যতম আইএসআইএস এর বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত নেতা আবদুল রাকিব আমিন। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ‘জিহাদি’ রাকিবের ভিডিও পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, সিরিয়ায় যুদ্ধ করাই কেবল তাদের উদ্দেশ্য নয়। তারা জর্ডান, লেবানন ও ইরাকেও যাবে। আর এ জন্য সারা বিশ্ব থেকে জিহাদি আমদানি করছে। তারা বাংলাদেশ থেকেও জেহাদি সংগ্রহ করার দাবি করেছে।


মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ব্রাসেলসে ন্যাটো বিদেশ মন্ত্রীদের সঙ্গে সভা শেষে সাংবাদিকদের বলেছেন, আইএসআইএস-এর সশস্ত্র বিদ্রোহ এই অঞ্চলে একটি বৃহত্তর সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। এই সংগঠনের ডাকা জেহাদে অংশ নিতেই রাকিব আহ্বান জানিয়েছেন। আর  লন্ডনের আইটিভি বলেছে, বাংলাদেশ থেকেও জেহাদিরা ইতিমধ্যে ওই অঞ্চলে পৌঁছে গেছে।

মাত্র ১০ বছর বয়সে বাংলাদেশ ছেড়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে লন্ডনে গিয়েছিল আবদুল রাকিব আমিন। আরও দুজনের সঙ্গে রাকিবকে আল কায়েদার পক্ষে সিরিয়ার যুদ্ধে অংশ নেয়ার আহ্বান সংবলিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে সম্প্রতি। এই ভিডিও নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে বিবিসি সহ ব্রিটিশ মিডিয়ায় হৈচৈ চলছে।
আল কায়েদা থেকে বেরিয়ে গঠন করা হয়েছিল ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড দ্যা লেভান্ট (আইএসআইএস)। এই সংগঠনটি সিরিয়া ও ইরাক সীমান্তে একটি খাঁটি মুসলিম রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের স্বপ্ন দেখেছিল।

সিরিয়ায় বিমান বিধ্বংসী অস্ত্র হাতে রাকিবের ছবি ‘ডেইলি মিরর’ প্রথম প্রকাশ করে, যা আইটিভি ২৬ জুন সম্প্রচার করেছে।
 গার্ডিয়ান রিপোর্ট করেছে,  ইরাকি প্রধানমন্ত্রী মালিকি নিশ্চিত করেছেন যে, সিরীয় যুদ্ধ বিমান ইরাকে আইএএসআইএস-এর অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে। ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি সামরিক বাহিনীর পরস্পর বিরোধী উপস্থিতির পটভূমিতে গতকাল ওই বিমান হামলা শুরু হয়।
রাকিবরা বাংলাদেশ থেকে ইংল্যান্ড গিয়ে বাসা নিয়েছিল অ্যাবারদিনের ফ্রগহল এলাকায়। প্রথম দুবছর সে পড়েছিল সানিব্যাংক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর তাকে পাঠানো হয় সেইন্ট মাচার একাডেমিতে।  একাডেমিতে দ্বিতীয় বছর কাটানোর পরে তার পিতা তাকে বাংলাদেশে নিয়ে গিয়েছিল। তার বন্ধুদের মতে তার বাবা-মা লক্ষ্য করেছিলেন যে, রাকিব বড় বেশি পাশ্চাত্য ঘেঁষা হয়ে পড়েছে। দুবছর বাংলাদেশে কাটিয়ে রাকিব অ্যাবারদিনে ফিরে আসে। আর তখন তার বন্ধুরা লক্ষ্য করে রাকিবের মধ্যে একটি পরিবর্তন এসেছে। রাকিব দাড়ি রাখতে শুরু করেছে। আর বেশি ধার্মিক হয়ে পড়েছে। এরপর সে তার পরিবারের সঙ্গে লেসেস্টারে চলে যায়।

বাংলাদেশী কিশোর রাকিব বেড়ে উঠেছিল অ্যাবেরদিন শহরে। সে যে স্কুলে পড়েছে সেখানকার একজন সাবেক ছাত্র গতকাল লন্ডনের প্রেস অ্যান্ড জার্নাল নামের একটি পত্রিকায় রাকিবের সঙ্গে অতীতের স্মৃতিচারণ করেছেন। তিনি বলেন, ২৫ বছরের এই যুবককে তার চালাক ছেলে বলেই মনে হয়েছে। যে ভিডিওতে আল কায়েদা থেকে বেরিয়ে আসা গ্রুপ জিহাদি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, তাতে রাকিবের অংশ নেয়ার বিষয়টি সে বুঝতে পারেনি, এটা মনে করার কোন কারণ নেই। আইএসআইএস এখন ইরাকের বেশির ভাগ জায়গার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে জিহাদি নিয়োগের আহ্বান সংবলিত ভিডিও সিরিয়ায় ধারণ করা হয়েছে।

রাকিবের বন্ধু আরও বলেছে, রাকিব সব সময় মনোযোগের কেন্দ্রে থাকতে পছন্দ করতো। তার এটা ভালই বোঝার কথা যে, এই ভিডিও প্রকাশ পাবে। এবং ব্রিটেনে সেটা দেখানো হবে এবং তা বন্ধুবান্ধবরা তাকে এতে দেখবে। এবং এটা অনুমান করে তার ভাল লাগারই কথা। সর্বশেষ তাকে সে ১৮ মাস আগে দেখছিল। অ্যাবেরদিন স্পোর্টসভিলেজে সে তার সঙ্গে ফুটবল খেলেছিল। রাকিব গাইতে পারতো স্কটিশ গান।
তার আরও মন্তব্য: আমি আর কখনওই তার বন্ধু থাকতে পারি না। তবে তাকে যদি কখনও রাস্তায় দেখা পেয়ে যাই তাহলে ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করবো, কেন তুমি এমন করলে? আমি সত্যি বুঝতে পারি না, মাত্র ১৮ মাসের ব্যবধানে রাকিবের জীবনে এমন কি ঘটলো, যাতে সে এমন করে বদলে যেতে পারলো? আমি তার কাছে জানতে চাইবো, তাকে ওরা নিয়োগ করেছে। নাকি সেই নিজ থেকে ওদের দলে গিয়ে নাম লিখিয়েছে। কখনও কখনও আমরা যখন বেড়াতে বের হতাম ,তখন পথে লোকে তাকে বর্ণবাদী টিটকারি দিতো,তখন কোন কোন ঘটনায় তাকে রুখে দাঁড়াতে দেখেছি।গত কয়েকদিনে রাকিবের কিছু আলোকচিত্র ছাপা হয়েছে।

এতোদিন জঙ্গী পুষে এখন সতর্ক হয়েছে বৃটেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লন্ডনের মসজিদগুলোতে যাতে র‌্যাডিকেল বাণী প্রচার না করা হয় সে জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। সৌদি আরব বেড়াতে গিয়েছিলেন একটি মসজিদের ইমাম। তাকে আর লন্ডনে ফিরতে দেয়া হয়নি।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকেরা যতোটা প্রশস্তিতে আছেন, বাস্তবতা ততোটা প্রশস্তিসূচক না ও হতে পারে।  আমি এখনো বিশ্বাস করি সরকারের কাউন্টার টেররিজম টীমের সতর্ক এবং জরুরী পদক্ষেপ দমন করতে পারে এদেশে জঙ্গীবাদী গোষ্ঠীর সকল অপতৎপরতা। ####
Sumikhan29bdj@gmail.com


Monday, July 7, 2014

আটকেপড়া পাকিস্তানী এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বহুমাত্রিক সঙ্কট -শাহরিয়ার কবির

উন্নত-উন্নয়নশীল-অনুন্নত নির্বিশেষে বিশ্বের যে কোনও দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিকরা কম বেশি বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার। এই নিপীড়ন বহু ক্ষেত্রে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, গৃহে অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন ও অপহরণের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধে পর্যবসিত হয়। সংখ্যালঘু ধর্মীয় হতে পারে, জাতি-ভাষা-লিঙ্গ-কায়িক-বর্ণগত হতে পারে, এমনকি মতাদর্শগতও হতে পারে।
কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অন্য সব দেশের মতো বাংলাদেশেও ধর্ম-জাতি-ভাষা-লিঙ্গ-কায়িক ও মতাদর্শগত সংখ্যালঘু রয়েছে। মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে নাগরিকদের ভেতর সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু বিভাজন অনভিপ্রেত হলেও রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল ও সম্প্রদায়ের আচরণ সর্বত্র এই বিভাজন সৃষ্টি করেছে যা অস্বীকার করার অর্থ হচ্ছে সংখ্যালঘুর সমমর্যাদা ও সমঅধিকারের দাবি অগ্রাহ্য করা।
বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া প্রায়ই বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সংখ্যাগুরু বলে কিছু নেই, বাংলাদেশে আমরা সবাই বাংলাদেশী। খালেদা জিয়ার এই বক্তব্য যদি সত্য হতো আমরা যারপরনাই প্রীত হতাম। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে ২০০১ সালের অক্টোবরে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জামায়াত-বিএনপি জোটের প্রধান হিসেবে খালেদা জিয়া যখন তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হলেন তখন বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু- বিশেষভাবে হিন্দু সম্প্রদায় নজিরবিহীন সহিংসতার শিকার হয়েছিল, যা বিস্তৃত হয়েছে বিরোধী দল ও মতের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের হত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠন ও অপহরণসহ যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধে। বিএনপি-জামায়াতের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ২০১৪-এর ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও ঘটেছে। এবার হিন্দু, খ্রীস্টান ও আদিবাসীদের একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল তারা জামায়াত-বিএনপির নির্বাচন বর্জনের ডাক উপেক্ষা করে ভোট দিতে গিয়েছিলেন। তারপরও সম্প্রতি (২৯ জুন, ২০১৪) ভারতের ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’কে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বেগম জিয়া বলেছেন, ‘বাংলাদেশে সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু বলে কিছু নেই’ এবং ‘সংখ্যালঘু নির্যাতনের জন্য জামায়াত-বিএনপি নয়, আওয়ামী লীগ দায়ী।’
গত ১৪ জুন (২০১৪) ঢাকার পল্লবীর বিহারি ক্যাম্পে দুর্বৃত্তদের হামলা ও অগ্নিসংযোগে ১০ জন অবাঙালী নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছেন। নিহত ১০ জনের ভেতর ৯ জনই একই পরিবারের সদস্য। বিহারি ক্যাম্পের এই নৃশংস হামলা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে জামায়াত-বিএনপির জোট সরকারের আমলের জ্যান্ত মানুষ পুড়িয়ে মারার ভয়ঙ্কর ঘটনা। ২০০৩-এর ১৯ নবেম্বর চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে শিশু-বৃদ্ধ-নির্বিশেষে তেজেন্দ্র শীলের পরিবারের ১১ জনকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছিল বিএনপি-জামায়াত জোটের সাম্প্রদায়িক দুষ্কৃতকারীরা। খালেদা জিয়ার শাসনামলে জ্যান্ত মানুষ পুড়িয়ে মারার বহু ঘটনা ঘটেছে। ২০১৩ সালে জামায়াত-বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল না তখনও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল এবং তাদের ডাকা হরতাল-অবরোধ সফল করবার জন্য নিরীহ বাসযাত্রী, পরিবহন শ্রমিক, পথচারী এমনকি পুলিশকেও পুড়িয়ে মারা হয়েছে।

পল্লবীর বিহারি ক্যাম্পে অগ্নিসংযোগ ও হত্যার নৃশংস ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করেছে সচেতন নাগরিক সমাজ। বিএনপি যথারীতি কোনও রকম তদন্ত ছাড়াই এ হত্যার দায় আওয়ামী লীগের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার যে কোন ঘটনা জাতির বিবেককে আহত করে। কোন ভয়ঙ্কর অপরাধীকেও এভাবে হত্যা করা সভ্য মানুষ সমর্থন করতে পারে না। গত ২ জুলাই (২০১৪) অগ্রজপ্রতীম কলাম লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ দৈনিক ‘প্রথম আলো’য় ‘বিহারিসহ সব সংখ্যালঘুর কাছে ক্ষমা চাই’ শিরোনামে মর্মস্পর্শী কলাম লিখেছেন। মহিউদ্দিন ভাই ছাড়াও বিভিন্ন দৈনিকে অগ্রজ ও অনুজপ্রতিম সাংবাদিক ও কলাম লেখকরা বিহারি ক্যাম্পের নৃশংস হামলা ও হত্যার নিন্দা করে লিখেছেন। আমাদের এসব লেখায় দুষ্কৃতকারীদের শুভবুদ্ধির উদয় না হতে পারে, প্রশাসনের টনকও হয়ত নড়তে না পারে, তবে আক্রান্ত সর্বহারা মানুষরা জানবেন তাদের পাশে দাঁড়াবার মতো মানুষ এখনও আছে।
বাংলাদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতি সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণ এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ধারাবাহিকভাবে চলছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে সরকারী চাকরি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে বৈষম্য কিছুটা কমলেও অন্য ক্ষেত্রে অবস্থার খুব বেশি পরিবর্তন হয় না। বার বার বলা সত্ত্বেও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ আইন, সংখ্যালঘু কমিশন বা পৃথক মন্ত্রণালয়ের দাবি উপেক্ষিত থেকেছে। সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ...’ ও ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ রেখে দেয়া হয়েছে এবং অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণের জটিলতাও দূর হয়নি। একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিচুক্তি এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি, যে শান্তিচুক্তির জন্য ১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছিলেন।
ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সমস্যার সঙ্গে বিহারি ও রোহিঙ্গাদের সমস্যার অনেক পার্থক্য আছে। এ দেশে বিহারি বলা হয়- যারা ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কারণে কিংবা উন্নততর জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে পূর্ব পাকিস্তান বা বর্তমান বাংলাদেশে এসেছিলেন। বাংলাদেশে আগত উদ্বাস্তুদের অধিকাংশ বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা উর্দুভাষী হওয়ার কারণে সাধারণভাবে এদের ‘বিহারি’ বলা হয়। একইভাবে দেশভাগের কারণে পাকিস্তানের উভয় অংশ থেকে বিপুল সংখ্যক হিন্দু ও শিখ মাতৃভূমি ত্যাগ করে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।
’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে অবস্থানকারী অধিকাংশ অবাঙালী পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে ছিলেন এবং অনেকে সরাসরি পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী বিভিন্ন অপরাধে অংশগ্রহণ করেছেন। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সহযোগী অবাঙালীরা তাদের বাঙালী জ্ঞাতিভাই জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামের নেতাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে যুদ্ধে পরাজয় অনিবার্য জেনে ’৭১-এর ডিসেম্বরের আগেই পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। যারা থেকে গিয়েছেন তাদের সিংহভাগের আনুগত্য ছিল পাকিস্তানের প্রতি, যারা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেননি। তারা আশা করেছিলেন বাংলাদেশ সরকার যেভাবে পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালীদের ফেরত এনেছে, একইভাবে পাকিস্তানও বাংলাদেশে আটকেপড়া অবাঙালী পাকিস্তানীদের ফেরত নেবে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ তাদের নাগরিকদের মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করলেও পাকিস্তান তা করেনি।
আটকেপড়া পাকিস্তানীরা গত ৪২ বছর ধরে পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার জন্য সংগঠন-আন্দোলন করছেন, ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে দেন-দরবার করছেন, কিন্তু পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের শুভবুদ্ধি জাগ্রত হয়নি। বরং পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইসিআই তাদের আঞ্চলিক সন্ত্রাসী বলয় বিস্তারে রোহিঙ্গাদের মতো বিহারিদেরও ব্যবহার করছে। মিরপুরের বিহারি ক্যাম্পের সাম্প্রতিক হত্যা ও সন্ত্রাসের ঘটনার জের ধরে গত ২ জুলাই (২০১৪) পুলিশ মোহাম্মদপুর থেকে জনৈক শান্নুকে গ্রেফতার করেছে। এ বিষয়ে ৫ জুলাই ‘বিহারি শান্নু গ্রেফতার’ শিরোনামে দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত এক প্রতিবদেন বলা হয়েছে-
‘১৯৭৮ সালে আটকেপড়া পাকিস্তানীদের পাকিস্তান পাঠানোর লক্ষ্যে এসপিজিআরসি নামের সংগঠনের সৃষ্টি হয়। সারাদেশের ১৩টি জেলায় ৭০টি বিহারি ক্যাম্প রয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুরে ২৭টি এবং মিরপুরে ৬টি ক্যাম্প রয়েছে। ১৯৯২ সালের মক্কাভিত্তিক সংগঠন রাবিতা ইসলাম নামের একটি এনজিওর জরিপ মোতাবেক দেশের ৭০টি ক্যাম্পে ওই সময় জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ৪২৩ জন। বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় ৫ লাখে দাঁড়িয়েছে। ভোটার সংখ্যা কমপক্ষে ২ লাখ। ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন রয়েছে ক্যাম্পগুলো।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এসপিজিআরসির প্রতিষ্ঠাতা নাসিম খান মারা গেলে এর প্রধান হন গ্রেফতারকৃত শান্নুর পিতা জব্বার খান। তিনি কাগজে-কলমে জেনেভা ক্যাম্পের অধিবাসী হলেও বসবাস করেন আসাদ এ্যাভিনিউয়ের ৩৬/সি নম্বর ওই বাড়িতে। ৪ ছেলে ২ মেয়ে। সবার ছোট ছেলে শান্নু।
জেনেভা ক্যাম্পের অবৈধ পানি, বিদ্যুত, মাদকের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত সন্ত্রাসী ছট্টু। জব্বার খান জনকণ্ঠের কাছে দাবি করেন, তিনি ২০০৫ সালে এসপিজিআরসির মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের নির্বাচিত সভাপতি।
সূত্র বলছে, জব্বার খান এসপিজিআরসির সভাপতি হওয়ার পর অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে তার ছেলে গ্রেফতারকৃত শান্নু। গড়ে তোলে শান্তি কমিটি। শান্নু সব অবৈধ ব্যবসার আধিপত্য নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এরপর শুরু হয় শান্নু ও ছট্টু গ্রুপের মধ্যে নিয়মিত মারামারি। কারণ জেনেভা ক্যাম্পগুলোতে ব্যবহৃত বিদ্যুত ও পানির কোন বিল সরকারকে দিতে হয় না। এমন সুযোগে জেনেভা ক্যাম্পগুলো থেকে আশপাশের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অবৈধ বিদ্যুত ও পানির সংযোগ দিয়ে মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণকারীরা।
দুই গ্রুপের আধিপত্যের জেরে ২০১৩ সালের ২৯ মার্চ জেনেভা ক্যাম্পে ব্যাপক মারামারি হয়। ওই মামলায় শান্নুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া এক অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, জেনেভা ক্যাম্পগুলো থেকে যে পরিমাণ অবৈধ বিদ্যুত সংযোগ দেয়া হয়েছে তাতে প্রতিমাসে সরকারের ১০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে।
ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে, শান্নু আত্মগোপনে থাকলেও তার আধিপত্য ছিল। বিশেষ করে গাঁজা, হেরোইন, আফিম, চরস, হালের ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদক ব্যবসার একাংশের নিয়ন্ত্রণ ছিল শান্নুর শান্তি কমিটির কাছে। মাদক ও জালমুদ্রার ব্যবসা ছাড়াও ঢাকার বিহারি ক্যাম্পগুলো দেশী-বিদেশী জঙ্গীদের নিরাপদ বাসস্থান। প্রসঙ্গত, বিশ্বখ্যাত সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব গুলশান কুমার হত্যা মামলার জেল পলাতক আসামি দাউদ মার্চেন্ট ও আন্তর্জাতিক মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহীম ও আরেক মাফিয়া ডন ছোট শাকিলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জাহিদ শেখ দীর্ঘদিন মোহাম্মদপুরের বিহারি ক্যাম্পে পলাতক ছিল। তারা আটকেপড়া পাকিস্তানীদের মাধ্যমে এ দেশীয় দালালদের সহযোগিতায় বাংলাদেশী পাসপোর্ট তৈরি করে দিব্যি বসবাস করছিলেন বলে ডিবির হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর এমন তথ্য প্রকাশ পায়। নিয়ন্ত্রণকারীদের সহযোগিতায় মোহাম্মদপুরের বিহারি ক্যাম্পে গড়ে ওঠে বেশ কয়েকটি বোমা তৈরির কারখানা।
গত বছরের ২০ ডিসেম্বর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টরের একটি বাড়িতে বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে শাহীন ও গ্রেফতারকৃত শান্নুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী নাদিম আহত হন। এ ঘটনায় আহত নাদিম ও তাঁর ভাই বশির এবং শাহীনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের তথ্য মতে, জেনেভা ক্যাম্পে বোমা তৈরির কারখানা ও কারখানায় মজুদ থাকা শতাধিক তাজা বোমা উদ্ধার হয়। (জনকণ্ঠ, ৫ জুলাই, ২০১৪)
আইএসআই-এর মদদে জামায়াতে ইসলামী কীভাবে গত ৩৫ বছর ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে অস্ত্র ও মাদক ব্যবসাসহ জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাসের নেটওয়ার্ক গঠন করেছে এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় গণমাধ্যমে বহু প্রতিবেদন প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে। জামায়াত-বিএনপির জোট সরকারের আমলে আমরা বাংলাদেশে জামায়াতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে গঠিত শতাধিক জঙ্গী মৌলবাদী সংগঠনের তালিকা প্রকাশ করেছিলাম, যেখানে ১৭টি ছিল রোহিঙ্গাদের। আইএসআই ও জামায়াতের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে বার্মার আরাকান এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি অংশ ও কক্সবাজারকে নিয়ে পৃথক রোহিঙ্গা মুসলিম রাষ্ট্র গঠন। যে কারণে জামায়াত ও জঙ্গীদের গোপন তৎপরতা ও সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের শতকরা ৯০ ভাগ পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত।
শতকরা ৯৫ ভাগ রোহিঙ্গা শরণার্থীর মতো বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় রেডক্রসের ক্যাম্পে অবস্থানকারী পাকিস্তানী শরণার্থী বা আটকেপড়া পাকিস্তানীরা অত্যন্ত মানবেতর জীবন-যাপন করছে। তবে এসব পাকিস্তানী নাগরিকদের সন্তানরা, যারা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছে, অধিকাংশই বাংলাদেশে লেখাপড়া করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে এবং বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে। রোহিঙ্গাদের মতো এদের অনেকে মাতৃভাষা ভুলে মূল স্রোতে মিশে গিয়েছে।
প্রায় পনের বছর আগে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প থেকে কিছু তরুণ তাদের নাগরিকত্বের সমস্যা নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা করতে এসেছিল। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে বা করতে যাচ্ছিল। তারা বলেছিল বাংলাদেশের নাগরিকত্ব চেয়ে তারা হাইকোর্টে রিট করেছে, আমরা যেন তাদের দাবি সমর্থন করি। আমি তাদের দাবি ন্যায়সঙ্গত বলেছি এবং সমর্থন করে লিখেছিও। শুধু তাই নয়, যখন জেনেছি স্কুল ও পাঠ্যপুস্তকের অভাবে উর্দুভাষার চর্চা উঠে যাচ্ছে, তাদের অনেকে উর্দু পড়ালেখা এমনকি বলাও ভুলে গেছে, আমি বলেছি তারা যদি চায় এ বিষয়েও আমি ভারত ও পাকিস্তানে আমার উর্দুভাষী বন্ধুদের সহযোগিতার জন্য বলতে পারি। আমরা মাতৃভাষার মর্যাদার জন্য লড়াই করেছি, রক্ত দিয়েছি, ২১শে ফেব্রুয়ারি এখন বিশ্বব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশ্বের সকল ভাষার অস্তিত্ব, বিকাশ ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে ’৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত অনেক উর্দুভাষী, অবাঙালী, পাহাড়ি, আদিবাসীও অবদান রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও বহু দেশ, বহু ভাষাভাষী, বহু জাতি ও বহু ধর্মের মানুষ আমাদের সমর্থন ও সহযোগিতা করেছেন। এসব অস্বীকার করা হলে নিজেদের দীনতা ও নীচতাই প্রকাশ পাবে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্ম, জাতিসত্তা, ভাষা ও মতের মানুষ যতদিন পর্যন্ত সমান অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বাস করতে না পারবে ততদিন আমরা বিশ্বসভায় সভ্য দেশ ও জাতি হিসেবে পরিচয় দিতে পারব না। জাতি-ধর্ম-ভাষা-লিঙ্গ-বিত্ত নির্বিশেষে সকল মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের যেমন দায়িত্ব, একই সঙ্গে নাগরিক সমাজেরও, বিশেষভাবে যারা সংখ্যাগুরুর অংশ। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার করাল গ্রাস থেকে নিরীহ রোহিঙ্গা ও আটকেপড়া পাকিস্তানীদের রক্ষা করতে হবে। রোহিঙ্গাদের ভেতর আইএসআই, সৌদি আরব ও জামায়াতের মদদপুষ্ট এনজিওদের তৎপরতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কারণ সমস্যাটি জাতীয় নিরাপত্তার অন্তর্গত। জামায়াত-বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন এক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর নাম ভোটার তালিকায় ঢোকানো হয়েছিল।
রোহিঙ্গা ও বিহারিদের দারিদ্র্য ও শিক্ষার অভাবসহ যাবতীয় অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে জামায়াত বা অন্য কেউ যাতে রাষ্ট্র ও জাতিবিরোধী কোন ষড়যন্ত্র করতে না পারে সে বিষয়ে সরকার ও নাগরিক সমাজকে যেমন সচেতন থাকতে হবে, একইভাবে সন্ত্রাসী খুঁজতে গিয়ে নিরীহ বিহারি ও রোহিঙ্গারা যাতে কোন নির্যাতন বা হয়রানির শিকার না হন সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। এসব শরণার্থীর ভেতর যারা পাকিস্তানে বা মিয়ানমারে ফেরত যেতে চান তাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় নিষ্পত্তি না হলে আন্তর্জাতিক ফোরামে উত্থাপন করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শরণার্থী সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে ভুক্তভোগী সকল দেশকে।
জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শরণার্থীর সংখ্যা চার কোটি তিরিশ লাখ। এদের ভেতর সর্বাধিক হচ্ছে প্যালেস্টাইনের শরণার্থী, যাদের সংখ্যা প্রায় অর্ধ কোটি। সরকারী হিসেবে বাংলাদেশে আটকেপড়া পাকিস্তানী ও রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা দেড় লাখের মতো হলেও বেসরকারী হিসেবে এদের সংখ্যা পাঁচ লাখের ওপরে। স্বদেশবঞ্চিত এই অসহায় মানুষদের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়াকে বলা হয় অভিবাসীদের দেশ, কারণ এ দুটি দেশ গঠন করেছে অভিবাসীরা। শরণার্থী সমস্যা নিরসনের ক্ষেত্রে এ দুটি দেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বাংলাদেশসহ এশিয়া ও আফ্রিকার শরণার্থী সমস্যা আক্রান্ত দেশগুলো সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করলে বর্তমান বিশ্বের এই জ্বলন্ত সমস্যা বহুলাংশে সমাধান সম্ভব। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে, কারণ উন্নয়নশীল জনবহুল এই দেশটি গত ৪২ বছর ধরে শরণার্থী লালন করছে। ক্রমবর্ধমান এই সঙ্কট নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি ব্যর্থ হয় তাতে জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাই শুধু উপেক্ষিত হবে নাÑ বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাস প্রতিহত করাও অসম্ভব হয়ে পড়বে।

Friday, July 4, 2014

বঙ্গবন্ধু ফেরাউন? বঙ্গবন্ধুকন্যা নাস্তিক? রাষ্ট্রপতি বটতলার উকিল? -মুনতাসীর মামুন

পত্রিকার মফস্বল পাতা অধিকাংশ পাঠকই এড়িয়ে যান। মফস্বল পাতা দূরে থাকুক, অধিকাংশ মানুষ তো পত্রিকাই পড়েন না। অধিকাংশ দেশেই তাই। তবে, একটি ব্যতিক্রম আছে। বাংলাদেশের বাইরে রাজনীতিবিদরা রুটিন করে পত্রিকা পড়েন এবং পত্রিকার মতামত গুরুত্বসহকারে নেন, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলে জবাব দেন। আমাদের রাজনীতিবিদদের অধিকাংশ পত্রিকা পড়েন না। গ্রাহ্যও করেন না। প্রবাসী এক বন্ধু জানালেন, এক বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ও মন্ত্রীকে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, পত্রিকার উপসম্পাদকীয়গুলো তিনি পড়েন কিনা। অক্লেশে তিনি বলেছেন, পত্রিকাই তিনি পড়েন না, কারণ তিনি সময় পান না। অথচ প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত পত্রিকা পড়েন, উপসম্পাদকীয়ও পছন্দ হলে পড়েন। এক ভোজসভায় বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ যখন আমাকে বললেন, তিনি জনকণ্ঠের জন্য অপেক্ষা করেন এবং আমার লেখা পড়েন। তখন আমি যারপরনাই বিস্মিত হয়েছি।

এত বড় ভনিতা করতে হলো বা হয়ে গেল একটি কারণে। দৈনিক জনকণ্ঠের ৩০ জুন মফস্বলের পাতায় বক্স করে গুরুত্ব দিয়ে একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে। এই সংবাদ হয়ত কারও কাছেই গুরুত্ব পাবে না। কিন্তু আমার শুধু নয়, আমাদের অনেকের কাছেই মনে হয়েছে সংবাদটি গুরুত্বপূর্ণ- আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষকদের মানসিকতা ইত্যাদি বোঝার জন্য। শুধু তাই নয়, এ সংবাদটি মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রীর গোচরে আনা শুধু উচিতই নয়, ব্যবস্থা নেয়াও কাম্য। এ সংবাদটি হয়ত আমারও চক্ষু এড়িয়ে যেত। কিন্তু রোজার প্রথম দিনেই শাহরিয়ার কবির ফোন করে ঘুম ভাঙ্গিয়ে আমাকে শুধু সংবাদটি পড়ানো নয়, লিখতেও বাধ্য করেছেন। শুধু তাই নয়, হাশেম খান, রবিউল হুসাইন, স্বদেশ রায়, তারিক সুজাত, আহমেদ মাফুজুল হক প্রমুখ অনেকেরই দেখলাম এই সংবাদটি চোখে পড়েছে এবং একই অনুরোধ তাঁরা আমাকে করেছেন। সে কারণেই ‘আমাদের’ শব্দটি আগে ব্যবহার করেছি। আমি পত্রিকার ভাষ্যটিই যথাযথ মনে করেই এ ভাষ্যটি লিখছি।

নর্দার্ন ইউনিভার্সিটির খুলনা ক্যাম্পাসে ঘটনাটি ঘটেছে। আমি জানতাম শাখা ক্যাম্পাস অবৈধ। এখন দেখছি আমার জানা ভুল। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস হয় না।
ওই শাখা ক্যাম্পাসের আইনের ছাত্র মোঃ নাঈম। সেখানে পড়ান রাজিব হাসনাত শাকিল নামের এক ব্যক্তি। পড়াতে গিয়ে তিনি যুদ্ধাপরাধ ও দেশের প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট শুধু নন স্বয়ং জাতির পিতা সম্পর্কে কটূক্তি করেন। নাঈম তার প্রতিবাদ করায় তাঁর ছাত্রত্ব বাতিল করা শুধু নয়, তাঁকে পেটানোরও বন্দোবস্ত করা হয়েছে। পুরো ঘটনাটি সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হয়েছে এবং জনকণ্ঠ ছাড়া আর কোন সংবাদপত্র সংবাদটি ছেপেছে বলে আমার মনে হয় না।
সংবাদ সম্মেলনে ছাত্র মোঃ নাঈম জানান, ‘২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের শেষদিকে দেওয়ানি কার্যবিধির ১০ ধারা পড়াতে গিয়ে শাকিল স্যার কাদের মোল্লার ফাঁসির ঘটনাকে অবৈধ হিসেবে উল্লেখ করেন। এ সময় তিনি বর্তমান সরকার অবৈধ ও প্রধানমন্ত্রীকে নাস্তিক আখ্যায়িত করেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে ফেরাউনের সঙ্গে তুলনা করে ১৫ আগস্টের ঘটনাকে স্বদেশ প্রেমের প্রতিচ্ছবি হিসেবে মন্তব্য করেন। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে বটতলার উকিল বলে কটূক্তি করেন ওই শিক্ষক।’

ছাত্র ছাত্রসুলভ আচরণ না করলে শিক্ষকের অধিকার আছে ছাত্রকে ভর্ৎসনা করার। তেমনি, শিক্ষক শিক্ষকসুলভ আচরণ না করলে ছাত্রেরও অধিকার আছে তার প্রতিবাদ করার। এখানে দেখা যাচ্ছে- শাকিল নামের ব্যক্তিটির আচরণ শুধু অশিক্ষকসুলভ নয়, রাষ্ট্রবিরোধীও বটে। এই ব্যক্তিটির বক্তব্য জামায়াত-বিএনপি নেতাদের থেকেও কট্টর। নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি এ ধরনের শিক্ষক নিযুক্ত করে এবং তার বক্তব্যের পক্ষ নেয় এ কারণে কি এটি জামায়াতের টাকায় পরিচালিত? বস্তুত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি ঝোঁক আছে জামায়াত-বিএনপির রাজনীতির প্রতি- এ রকম একটি ধারণা বাইরে প্রচলিত। কারণ হিজবুত তাহরির, ছাত্রশিবির সদস্য যারা নাশকতার জন্যে গ্রেফতার হয়েছে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশও মানে না এবং আদেশ না মানলে কোন শাস্তিও হয় না। কোন না কোন পর্যায়ে নিশ্চয়ই কেউ না কেউ টাকা খাচ্ছে। না হলে, নির্দেশ না মানলে শাস্তি হবে না কেন?

শাকিল নামের ব্যক্তিটি যাঁর কারণে আজকে একটি ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের’ শিক্ষক হিসেবে নিযুক্তি পেয়েছে তাঁকে যখন ফেরাউন বলে আখ্যা দেয়া হয়, তখন তার মনমানসিকতা ও তার পরিবার সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। কত বড় হারামজাদা হলে জাতির জনক সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য করা যায়! এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রধানমন্ত্রী নাস্তিক! এই শব্দটির অর্থও সে জানে কিনা সন্দেহ। যাঁর ধর্মাচরণে এবং মাঝে মাঝে অতি ধর্মাচরণে এবং মাঝে মাঝে হেজাবিদের প্রশ্রয় দানের কারণে আমরাই যারপরনাই ক্ষুব্ধ হই তিনি কিনা নাস্তিক! রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের চ্যান্সেলর। নর্দার্নের কিনা জানি না। না হন নর্দার্নের, কিন্তু দেশের প্রথম নাগরিক তো তিনি। মির্জা ফখরুলও তো রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে এ রকম উক্তি করেন না। সব রকমের সভ্যতা ভব্যতাবিরোধী এই মনোভঙ্গী। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এ ধরনের মন্তব্য অনেকে করতেও পারেন কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে? ভারতে কিছুদিন আগেও ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে কটূক্তি করায় কটূক্তকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শাকিল নামক ব্যক্তিটি ১৫ আগস্টের হত্যাকা-কে স্বদেশপ্রেম বলে আখ্যায়িত করেছেন। একজন শিক্ষক তো নৈতিকভাবে কোন হত্যাকা-ই সমর্থন করতে পারেন না। এই ব্যক্তিটি শুধু তাই নয়, কাদের মোল্লার ফাঁসিকে অবৈধ বলার অর্থ ট্রাইব্যুনাল বৈধ নয়, যা আদালত অবমাননার সমান। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।

কাহিনীর এখানেই শেষ নয়। মোঃ নাঈম বলেন, শিক্ষক ‘শাকিলের কটূক্তিমূলক বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করে তিনি ক্লাস বর্জন করেন। পরবর্তীতে ঘটনাটি ডিপার্টমেন্টের এ্যাডভাইজার, খুলনা ক্যাম্পাসের ইনচার্জ ও সহপাঠীদের জানান। এ্যাডভাইজার তাঁর কথার কোন গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো তাঁকে শাসিয়ে দেন। পরদিন ক্লাসে গেলে শিক্ষক শাকিল তাঁকে আওয়ামী লীগের চামচা বলতে থাকেন। কৌশলে ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে উস্কানি দেয়া হয়।’

নাঈমের সংবাদ সম্মেলনের পর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতার জন্য সংবাদকর্মীরা বৈঠক করেন। সেখানে প্রেসক্লাবের ‘সাধারণ সম্পাদকের মাধ্যমে তাঁর (নাঈমের) কাছ থেকে আন্ডার টেকেন চাওয়া হয়। এতে রাজি না হওয়ায় কয়েকজন বহিরাগত সন্ত্রাসী প্রকৃতির লোক দিয়ে তাঁকে জীবননাশের হুমকি দেয়া হয়। একপর্যায়ে ইউনির্ভাসিটির স্টোর রুমে ডেকে নিয়ে জোর করে তাঁকে দিয়ে একটি সাদা কাগজে সই করিয়ে নেয় খুলনা ক্যাম্পাস কর্তৃপক্ষ।’

বিএনপি এরশাদ জামায়াত সামরিক শাসনে গত ৩০ বছরে এমন জেনারেশনের সৃষ্টি করা হয়েছে যারা শাকিলের মতো ধ্যান-ধারণাই পোষণ করে। এর কারণ হচ্ছে সামরিক শাসক বিএনপি-জামায়াত তাদের মনোজগতে আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের কর্তব্য ছিল সে আধিপত্য ভেঙ্গে নিজেদের বা সঠিক ইতিহাসের আধিপত্য বিস্তার করা। দুঃখের বিষয়, বর্তমান সরকার যথাযথভাবে এই কাজটি করতে পারেনি, এ ধরনের কাজের দিক-নির্দেশনাও নেই, যারা স্বইচ্ছায় এসব কাজ করতে পারতেন তাঁরা মনোজগতে আধিপত্য বিস্তারের চেয়ে টু-পাইস কামানোতে ব্যস্ত। এই আধিপত্য বিস্তারের প্রথম ধাপ পাঠ্যপুস্তক। শিক্ষা মন্ত্রণালয় পাঠ্যপুস্তকগুলো থেকে ইতিহাস বিকৃতি সংশোধন করেছে। এই ইতিহাস বিকৃতি ও সঠিক ইতিহাস জানার ওপর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কয়েক দিন আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন। আমি ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনীর পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রী, সচিব, মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন-অনুরোধ জানিয়েছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজ পর্যায়ে প্রতিটি ছাত্রের জন্য ১০০ নম্বরের বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসটি পাঠ্য করার। কেউ কর্ণপাত করেননি। তাদের অনীহার কারণ বোঝার ক্ষমতা আমার নেই কারণ তারা পদের অধিকারী। কিন্তু পদাধিকারী ব্যক্তিরাই তো যখন পদ পাননি তখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যে পড়া উচিত তা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন বলে শুনিনি। আগ্রহ দেখালে মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও শিক্ষামন্ত্রীর উদ্যোগের কোন ঘাটতি থাকত বলে মনে হয় না। তাদের কাছে এ দাবিটি সামান্য। কিন্তু কখনও তাদের মনে হয়নি, এ রকম একটি জেনারেশন রেখে বা তৈরি করে জিডিপি বৃদ্ধি কোন কাজে আসবে না। এই অনুরোধটি শুধু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলোর জন্য রেখেছেন এবং সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সভায় প্রত্যেক সদস্য এ উদ্যোগকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কারণ এতে কমপক্ষে ১০ লাখ ছাত্র প্রতিবছর বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস পড়বে এবং বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তাদের সঠিক ধারণা হবে। তবে, এটি কতটা কার্যকর হবে জানি না। কারণ খবর পেয়েছি, অনেক কলেজের শিক্ষকরা বলেছেন- ২০১৭ সাল থেকে বিষয়টি কার্যকর হবে। ২০১৪ সালে যাঁরা ডিগ্রী ক্লাসে পড়ছেন, তাঁদের জন্য কার্যকর হবে না। অর্থাৎ, এটি পড়ানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার মতোও যথেষ্ট লোক আছে। তবে, এই প্রতিবন্ধকতা দূর করার দায়িত্ব তো কর্তৃপক্ষের।

যে ঘটনাটি উল্লেখ করলাম তা তুচ্ছ করে দেখার মতো নয়। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করার জন্য এ রকম মুখিয়ে আছেন অজস্র শিক্ষক। জামায়াত-বিএনপি মনোজগতে আধিপত্য বিস্তারের জন্য এ চেষ্টা করবেই। এ প্রচেষ্টা প্রতিরোধ তো অবশ্যই করতে হবে।
আমি জানি না শিক্ষামন্ত্রী বা শিক্ষা সচিবের পত্রিকা পড়ার কোন সময় হয় কিনা। যদি হয়, তা হলে দাবি জানাব অবিলম্বে নর্দার্নের শাখা ক্যাম্পাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া, সেই শিক্ষককে গ্রেফতার করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্রটির সুরক্ষা দান।

খুলনা শহরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ছাত্র-শিক্ষক, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক কর্মী আছেন কিনা আমি জানি না। কারণ যে শহরের প্রধান সড়কের নাম খান এ সবুর রোড- সে শহর সম্পর্কে এ ধরনের ধারণা হতেই পারে। যদি এখনও ওই শহরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষজন থেকে থাকেন বিশেষ করে ছাত্ররা, তা হলে ওই কাম্পাস তাঁদের অবরোধ করা উচিত যতক্ষণ না কর্তৃপক্ষ করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং ওই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত ও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা না করে এবং ছাত্রটিকে সুরক্ষা দেয়। সরকার কী করবে না করবে তা নিয়ে মাথাব্যথার দরকার নেই, আমরা কী করতে পারি- সেটিই বিবেচ্য।

Friday, June 27, 2014

আমার চিরবন্ধু বাবা সাইফুদ্দিন খান আমার পথনির্দেশক




এ কোন্ সকাল, রাতের চেয়েও অন্ধকার!

 নশ্বর এ পৃথিবীতে কেউ চিরদিন থাকে না। বাবার শোকগাথায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের শতবর্ষী 
বিপ্লবী  বিনোদ বিহারী চৌধুরী লিখেছেন, " জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যু-জীবমাত্রেই জন্মগ্রহণ করলে মৃত্যুর করাল গ্রাসে নিপতিত হতে হয় । এ সত্য জেনেও মানুষ শোকাভিভূত হয়। স্থির-প্রতিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান লোক মৃত্যুতে মূহ্যমান হন না। অমরত্বের প্রত্যাশা কারো থাকে না। আমার বাবার ও সেই প্রত্যাশা কখনো ছিল না। তবে তিনি বেঁচে আছেন আমাদের মাঝে, তাঁর কর্মজগতে।তাঁর প্রিয়তম মাতৃভূমির মাটিতে। মৃত্যুকে খুব সহজে মেনে নেবার মতো মানসিক শক্তি আমি রাখিনা, তাই কাজের মাঝেও বারবার বাবার কথা ভেবে কষ্ট পাই,শোকগ্রস্থ হই।

২০০৭ সালের ২৮ জুন ভোরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের আইসিইউ বেডে আমাদের সামনেই ধীরে ধীরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন আমার বাবা সাইফুদ্দিন খান। 

সেই মুহূর্তে আমাদের মনে হচ্ছিলো, 'এ কোন্ সকাল, রাতের চেয়েও অন্ধকার!'

 সেই মুহুর্ত টির কথা মনে হলে গভীর শূন্যতার হাহাকার বুকের গহনে  ফিরে ফিরে আসে বারবার। আমার পরিশ্রম আর কাজের দায়বদ্ধতা যার কাছে অসীম ভালোবাসা আর সম্মানের ছিল। আমার অনুসন্ধানী  রিপোর্ট,  টপটেররদের এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ ....আমার  কাজ , মেধা, শ্রম আর সততার প্রতিটি স্বীকৃতি যিনি  নিজের সম্মান ভেবে 'মাথার মুকুট' হিসেবে প'রে নিতেন-তিনি আমার বাবা সাইফুদ্দিন খান!

বাবার সাথে মজা করতাম অনেক , একটা সময় পর্যন্ত সারাক্ষণ সাথে নিয়ে মিছিল , মিটিং, সহযোদ্ধা দের বাড়ি বাড়ি ঘুরতেন । তাই বলে খুব মিষ্টি মধুর বন্ধুত্ব ছিল না, তর্ক-ঝগড়াও হতো অনেক। 
তবু আমার বাবা যে  আমার প্রাণের দোসর ছিলেন ! আর তাই বাবার শূন্যতা আমায় আজীবন তাড়িয়ে ফিরবে!

একমাত্র কন্যা হবার সুযোগে সেই শৈশব থেকেই আমার খেলাধুলা, দুরন্তপনা,ফাঁকিবাজি , রাজপথে এরশাদ পতনের আন্দোলন , সংগ্রাম , রিপোর্টিংয়ের চ্যালেঞ্জ, বেপরোয়া স্বভাব-সবকিছুতেই বাবার অসীম প্রশ্রয়ে মনে মনে খুব আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলাম! আজ প্রতি মুহুর্তে বাবার অভাব প্রতি রক্তক্ষরণে শিরায় শিরায় উপলব্ধি করতে পারি ! স্নায়ুতে স্নায়ুতে বলে উঠি-তোমার এ অক্ষম সন্তান তোমার আদর্শের বাস্তবায়ন ঘটাতে পারলো না বাবা! তুমি চলে গেলে! 
আর কেউ তো নেই, যে আমায় হৃদয় উজাড় করে ভালোবেসে আমার কাজকে 'মাথার মুকুট' করে তোমার অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নেবে দূর- বহুদূর !

দেশমাতৃকাকে ভালোবেসে  পরাধীন দেশের মুক্তির স্বপ্নে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবার 'অপরাধে' তার সাথে যারা দিনের পর দিন অন্যায় অত্যাচার করে গেছে, সেই ঘাতকদের বিচার কাজ চলছে। নানান প্রতিকূলতার মাঝে  যদিও এই বিচার কাজ পদে পদে বাধা পাচ্ছে, মনে মনে বলি, আব্বু, তবু আমি বিশ্বাস করি যারা তোমাকে নির্মম ভাবে অত্যাচার করেছে দিনের পর দিন, তোমার সহযোদ্ধাদের ঘাতক-সেই অত্যাচারীদের বিচার হবেই ।

  সাইফুদ্দিন খানের সহযোদ্ধারা মনে করেন,সমাজ সংস্কারকের ভূমিকায় যে মানুষগুলোর মানবতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা  এ সমাজকে এগিয়ে নিয়েছে অনেক দূর, তাদের মধ্যে আমার বাবা অন্যতম!  আর তাই তার আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরী।  এর ফলে আমরা নতুন প্রজন্মে নিশ্চয়ই আরো অনেক সাইফুদ্দিন খান কে খুঁজে পাবো,যারা এই সমাজ কে এগিয়ে  নেবে অনেক অনেক দূর.....

সাইফুদ্দিন খানের প্রয়াণে শোকগাথায় বায়ান্নর প্রথম কবিতার কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী লিখেছেন," সাইফুদ্দিন যেমন মানুষকে  অকাতরে ভালোবেসেছেন, তেমনি সাম্যবাদী আদর্শকে বিশ্বাসে এবং কর্মে সারাজীবন ধরে রেখেছেন। শত নির্যাতন এবং সব ধরণের দুর্যোগের মধ্যে ও সাইফুদ্দিন কোনদিন নিজের আদর্শ থেকে সরে দাঁড়ান নি। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষ কে ভালোবেসে গেছেন। সারাজীবন মানবতাবাদী থেকে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। 

কমরেড আহসানউল্লাহ লিখেছেন, সাইফুদ্দিন খান মুসলিম লীগের দ্বি-জাতিতত্বের সমালোচক ছিলেন। তাঁর মধ্যে দ্বি-জাতিতত্বের প্রভাবের লেশমাত্র দেখেছি বলে মনে পড়ে না। ব্রিটিশ শাসনের সেই সময়কালে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান , মুসলিম প্রতিক্রিয়ার ধ্যান ধারণা থেকে মুক্ত হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। তাঁর চরিত্রের এ বলিষ্ঠতা আমাকে মুগ্ধ করতো। তিনি আমার অকৃত্রিম বন্ধুদের একজন। যুদ্ধাত্তর কালে আমার কাঁধে একটি বড়ো পরিবারের দায়িত্ব নেই । পরিবারের ব্যয় , চাহিদা কিভাবে মিটাবো কখনো কখনো চিন্তামগ্ন থাকতাম। সে সময়ে অযাচিতভাবে অর্থ ধার দিতেন যারা, তাদের মধ্যে দু'টো নাম উল্লেখযোগ্য। একজন প্রয়াত ডা. আজিম, দ্বিতীয়জন তাঁর আপন ফুপাতো ভাই সাইফুদ্দিন খান। 

এ কথাগুলো বাবার জীবদ্দশায় আমরা কখনো জানতে পারিনি।বাবা জানাতে চান নি। 

   সাইফুদ্দিন খানের শোকসভায় তাঁর সহযোদ্ধা এ্যাডভোকেট শফিউল আলম  ( বর্তমানে প্রয়াত) বলেছেন, " আজীবন প্রগতিশীল রাজনীতির ধারক নিষ্কলুষ স্পষ্টবাদী বন্ধু সাইফুদ্দিন খানের শোকের দিনে তার স্মুতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই । ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আউয়ুব এর শিক্ষানীতি বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়ে আমার সংকটকালে তার সাথে আমার যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো, তা মৃত্যুর দিন পর্যন্ত বহাল ছিল। সাইফুদ্দিন খানের চেতনার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারী মূল চেতনা , ১৯৭২ এর সংবিধানের মূল চেতনা, লুটেরা অর্থনীতিা ও রাজনীতি করে কিছু পাওয়ার আকাঙ্খা বিরোধী চেতনা তার মাঝে সবসময় অটুট ছিল। 

১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষের সময়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কিছু 'প্রগতিশীল' রাজনৈতিক কিছু ব্যক্তি এবং শক্তি যখন প্রশ্ন তুলেছিলো, "কী পেলাম?" সাইফুদ্দিন খান তখন বলতেন," আমরা আপাতত ৪টি জিনিস পেয়েছি,  (১) '৫২ র একুশের চেতনা, (২) '৭২ এর সংবিধান, (৩) একটি স্বাধীন ভূখন্ড এবং (৪) আর কিছু আশা ও স্বপ্ন । এর প্রেক্ষিতে যারা বলতো ," এই ভূখন্ড দিয়ে কি পেট ভরবে?"   এর জবাবে তিনি স্বাভাবিক ভাবেই বলতেন ," যদি লুটেরা অর্থনীতির পরিবর্তন ঘটে, জনগণের মধ্যে চেতনার বিকাশ হয়,সমগ্র বিশ্বে লুটেরা ধনবাদী অর্থনীতির বিস্তৃত কারেন্ট জাল ছিঁড়ে ফেলা যায়, লুটেরা নেতৃত্বের পরিবর্তে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্বে দেশের পরিচালন কাঠামো যদি গড়ে ওঠে -তাহলে একদিন পেট ভরতে পারে এবং চেতনার বাস্তবায়ন হতে পারে।" আজকের দিনে তার একথার যথার্থতা নিয়ে কারো প্রশ্ন আছে কি? এ প্রশ্ন রাখেন এডভোকেট শফিউল আলম।

তিনি আরো বলেছেন, খান সাহেব ধর্ম সম্পর্কে বলতেন, " মুসলমান রা হলো মধ্যপন্থী, তারা ডান বা উগ্রপন্থী নয়। " আমি তার সাথে একমত ছিলাম। খান সাহেব বলতেন, " মুসলমানেরা প্রতিদিন নামাজ পড়ে, প্রতিদিন একটি সুরা পাঠ করে  তারা নামাজে , তাতে বিশ্বাসী হয়ে ও ব্যক্তি জীবনে তা লালন করে না।" আমি ইতিমধ্যে সুরা কাফিরুন পড়েছি। তার ৬ নম্বর আয়াতে  লেখা আছে ," তোমার ধর্ম তোমাদের আমার ধর্ম আমার কাছে।" এ অবস্থায় একজন মুসলমান ব্যক্তি কী করে অন্য একজন ধর্মবিশ্বাসী ব্যক্তি কে আঘাত করতে পারে? কেমন করে একটি গোষ্ঠী কে 'অমুসলিম' ঘোষণা করার জন্যে 'জিহাদ' এর ডাক দিতে পারে?  এ প্রশ্ন  ও তুলেছিলেন  সাইফুদ্দিন খানের সহযোদ্ধা বন্ধু প্রয়াত এ্যাডভোকেট শফিউল আলম। 

১৯৮৮ সালে বাবা সন্ধানীকে চক্ষু দান করেন, ২০০২ সালে (সম্ভবত ) অনেক পরিশ্রম আর ছুটোছুটি করে নোটারী পাবলিকের মাধ্যমে দেহদান করেন। তবে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর এ মহৎ অঙ্গীকার পূরণে আমরা, তাঁর স্বজনেরা ব্যর্থ হয়েছি। এর প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ আমি আমার দেহদান করেছি। জানিনা, আমার মৃত্যু কিভাবে কোথায় হবে। আমি ও জানিনা আমার অঙ্গীকার পূরণ করা হবে কিনা।সর্বান্তকরণে চাই , বিশ্বের যে প্রান্তেই আমার মৃত্যু হোক না কেন-আমার একজন শুভাকাঙ্খীও যদি সেখানে থাকেন, আমার দেহদানের অঙ্গীকার পূরণ করবেন তাঁরা!

 একাত্তরে ঘাতক আলবদর বাহিনীর নির্যাতনের শিকার সাইফুদ্দিন খান সম্পর্কে বাংলানিউজে  জুন ২০, ২০১২ সালে প্রকাশিত  রমেন দাশগুপ্তের প্রতিবেদনের কিছু অংশ-


মীর কাসেম আলী ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম জেলা ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন। সে-হিসেবে তিনি আলবদর বাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের কমান্ডার ছিলেন।

১৯৭১ সালের ৭ নভেম্বর ভোরে চট্টগ্রাম শহরের পশ্চিম মাদারবাড়ি এলাকায় আজিজ কলোনিতে সাইফুদ্দিন খানের বাসা থেকে সাইফুদ্দিন খান, ইরশাদ কামাল খান, পটিয়া মহকুমা ন্যাপের সভাপতি অ্যাডভোকেট নূরনবীসহ বেশ কয়েকজনকে ধরে ডালিম হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ইরশাদ কামাল খান ছিলেন সাইফুদ্দিন খানের বড় ভাই ডা. কামাল এ খানের সন্তান।

ইরশাদ কামাল জানান, দু’হাত পেছনে নিয়ে পিঠমোড়া করে বেঁধে তাদের ট্রাকে তোলা হয়েছিল। বাধ্য করা হয়েছিল, পাকিস্তান-জিন্দাবাদ বলতে। আলবদররা সবাই খাকি পোশাক পরা ছিল, তাদের সবার মুখে রুমাল বাঁধা ছিল। ডালিম হোটেলে নেয়ার পর তারা সবসময় নিরস্ত্র বাঙালিদের হাত রশি দিয়ে এবং চোখ কালো কাপড়ে বেঁধে রাখত। আমাদের খুব দুর্গন্ধময়, অন্ধকার, স্যাতস্যাতে একটি কক্ষে রাখা হয়েছিল।


আলবদররা সুযোগ পেলেই এসে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করত, অকথ্যভাবে নির্যাতন করত। পুরো কক্ষে শোনা যেত শুধু গোঙানির শব্দ। কেউ কাতরাচ্ছেন, কেউ পানি, পানি বলে চীৎকার করছেন। দু’হাত, চোখ বাঁধা অবস্থায় অনেকেই কক্ষের ভেতরেই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতেন।’

তিনি বলেন, ‘একদিন আমি শুনতে পেলাম, একজন খুব ক্ষীণ কণ্ঠে মা, মা বলে চীৎকার করছেন। 
পরে বুঝতে পারলাম, তিনি ছিলেন আমার চাচা সাইফুদ্দিন খান। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি এভাবে চীৎকার করছেন। অবিশ্বাস্য রকমের নির্যাতন করত তারা। জীবিত ফিরতে পারব একথা কখনও কল্পনাও করিনি।’

অন্যদিকে নূরজাহান খান বলেন, ‘মুক্ত হওয়ার পর সাইফুদ্দিন খান বলেছিলেন, তাদের লাথি মারত, লোহার রড দিয়ে পেটাত। পানি চাইলে মুখের উপর প্রস্রাব করে দিত। মরে গেলে লাথি মেরে ডালিম হোটেলের পাশে টিনের ছাদের ওপর ফেলে দিত। মুখের উপর মাছি ভনভন করতে দেখলে অন্যরা বুঝতে পারত আর বেঁচে নেই। আমার স্বামীকে ফিরে পাব, এটা আমি কখনোই ভাবিনি।’

ইরশাদ কামাল খান বলেন, ‘আলবদররা কেউ এলে আর্মি স্টাইলে স্যালুট দিতেন। তবে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতেন। কারও নাম বলত না। এ কারণে সেসময় তাদের পরিচয় জানা সম্ভব ছিল না। তারা আন্ডারগ্রাউন্ড সংস্কৃতির অনুসারী। তবে তারা যে ইসলামী ছাত্রসংঘের সঙ্গে জড়িত সেটা জানতাম।’

ইরশাদ কামাল খান জানান, তাকে ডালিম হোটেলে চারদিন রাখা হয়েছিল। পরে একটি কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ওই কাগজে লেখা ছিল, আওয়ামী লীগ ও ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত। আমি না বুঝে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলাম। আমি এজন্য অনুতপ্ত।’

এসব যতো ভাবি , ততোই বেদনায় কুঁকড়ে যাই! কী করছি আমরা? এতো রক্তক্ষয়, এতো আত্মদানেরএর পরিণতি বড়ো ভয়াবহ!!  বিনিময়ে এই পতাকা, এই দেশ ! আর আমরা বীরদর্পে সব ইতিহাস আর বাস্তবতা এড়িয়ে আত্মমগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি! কেউবা আবার দু'পা বাড়িয়ে ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে নিজের আত্মপ্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে তৎপর! এই তো আমাদের দেশ! এই তো দেশের মানুষের মানসিক অবস্থান! নিজের অস্তিত্ব বিলীনে সক্রিয় পুরো জাতি!

 তোমার নির্যাতনকারীদের বিচার এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র । তুমি দেখে যেতে পারলে না এ বিচার প্রক্রিয়া। আব্বু ,  আমায় একটু আশীর্বাদ করে যাও, যেন তোমার অসমাপ্ত কাজের কিছু অন্তত শেষ করে যেতে পারি! তোমার হাত আমার মাথায় অনুভব করছি -তুমিই আমার শক্তি ! অন্তরের অন্তঃস্থলে নিয়ত জেগে আছো আব্বু আমার! তোমার প্রিয় রবীন্দ্রনাথের গানের কলিতেই বলি,
"এসেছি কি হেথা যশের কাঙালি- কথা গেথেঁ নিতে করতালি-
মিছে কথা কয়ে, মিছে যশ লয়ে, মিছে কাজে নিশিযাপনা!
কে জাগিবে আজ, কে করিবে কাজ, কে ঘুচাতে চাহে জননীর লাজ? "
sumikhan29bdj@gmail.com

ডালিম হোটেলে নির্যাতন ‘শুধু মীর কাসেম নন, সব নির্যাতকের বিচার চাই’

‘শুধু মীর কাসেম নন, সব নির্যাতকের বিচার চাই’ ডালিম হোটেলে নির্যাতন
ছবি: সোহেল সারোয়ার/ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
একাত্তর সালে ‘আলবদরের কসাইখানা’ হিসেবে পরিচিত ডালিম হোটেলের নির্যাতন কেন্দ্রে নির্যাতিত ও তাদের স্বজনরা শুধু মীর কাসেম আলী নন, নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত সবাইকে বিচারের মুখোমুখি দেখতে চান।

ডালিম হোটেলে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তখনকার চট্টগ্রাম কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের মেধাবী ছাত্র (বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং বেসরকারি ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য) ইরশাদ কামাল খান।

মঙ্গলবার বিকেলে ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যালয়ে বসে আলাপকালে ইরশাদ কামাল বাংলানিউজকে বলেন, ‘শুধু মীর কাসেম আলী নন, যারা আমাদের ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করেছিলেন, তদন্ত করে সবার পরিচয় বের করে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হোক। আমরা নির্যাতনের বিচার চাই।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের যারা ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন, তারা সবাই আলবদর। ডালিম হোটেলও ছিল আলবদরদের নিয়ন্ত্রণে। আর আলবদর বাহিনী যারা গঠন করেছিলেন তারা সবাই তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতাকর্মী।’

অন্যদিকে একাত্তরে ডালিম হোটেলে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তৎকালীন চট্টগ্রামে জেলা ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন খান। জীবনভর নির্যাতনের চিহ্ন বয়ে বেড়িয়ে ২০০৭ সালের ২৮ জুন তিনি মারা যান।

মঙ্গলবার দুপুরে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা লিরো’র কার্যালয়ে বাংলানিউজের সঙ্গে আলাপকালে সাইফুদ্দিন খানের স্ত্রী নূরজাহান খান বলেন, ‘লোহার রড দিয়ে মাথায় আঘাত করে আমার স্বামীর স্মৃতিশক্তি নষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। তিনি স্বাভাবিকতা হারিয়েছিলেন। ডালিম হোটেলে যাদের কাছে আমার স্বামী নির্যাতিত হয়েছিলেন, আমি তাদের সবার শাস্তি চাই।’

মীর কাসেম আলী ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম জেলা ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন। সে-হিসেবে তিনি আলবদর বাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের কমান্ডার ছিলেন।

১৯৭১ সালের ৭ নভেম্বর ভোরে চট্টগ্রাম শহরের পশ্চিম মাদারবাড়ি এলাকায় আজিজ কলোনিতে সাইফুদ্দিন খানের বাসা থেকে তাকে ও ইরশাদ কামাল খান, পটিয়া মহকুমা ন্যাপের সভাপতি অ্যাডভোকেট নূরনবীসহ বেশ কয়েকজনকে ধরে ডালিম হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ইরশাদ কামাল খান ছিলেন সাইফুদ্দিন খানের বড় ভাই ডা. কামাল এ খানের সন্তান।

ইরশাদ কামাল জানান, দু’হাত পেছনে নিয়ে পিঠমোড়া করে বেঁধে তাদের ট্রাকে তোলা হয়েছিল। বাধ্য করা হয়েছিল, পাকিস্তান-জিন্দাবাদ বলতে। আলবদররা সবাই খাকি পোশাক পরা ছিল, তাদের সবার মুখে রুমাল বাঁধা ছিল। ডালিম হোটেলে নেয়ার পর তারা সবসময় নিরস্ত্র বাঙালিদের হাত রশি দিয়ে এবং চোখ কালো কাপড়ে বেঁধে রাখত। আমাদের খুব দুর্গন্ধময়, অন্ধকার, স্যাতস্যাতে একটি কক্ষে রাখা হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘আলবদররা সুযোগ পেলেই এসে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করত, অকথ্যভাবে নির্যাতন করত। পুরো কক্ষে শোনা যেত শুধু গোঙানির শব্দ। কেউ কাতরাচ্ছেন, কেউ পানি, পানি বলে চীৎকার করছেন। দু’হাত, চোখ বাঁধা অবস্থায় অনেকেই কক্ষের ভেতরেই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতেন।’

তিনি বলেন, ‘একদিন আমি শুনতে পেলাম, একজন খুব ক্ষীণ কণ্ঠে মা, মা বলে চীৎকার করছেন। পরে বুঝতে পারলাম, তিনি ছিলেন আমার চাচা সাইফুদ্দিন খান। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি এভাবে চীৎকার করছেন। অবিশ্বাস্য রকমের নির্যাতন করত তারা। জীবিত ফিরতে পারব একথা কখনও কল্পনাও করিনি।’

অন্যদিকে নূরজাহান খান বলেন, ‘মুক্ত হওয়ার পর সাইফুদ্দিন খান বলেছিলেন, তাদের লাথি মারত, লোহার রড দিয়ে পেটাত। পানি চাইলে মুখের উপর প্রস্রাব করে দিত। মরে গেলে লাথি মেরে ডালিম হোটেলের পাশে টিনের ছাদের ওপর ফেলে দিত। মুখের উপর মাছি ভনভন করতে দেখলে অন্যরা বুঝতে পারত আর বেঁচে নেই। আমার স্বামীকে ফিরে পাব, এটা আমি কখনোই ভাবিনি।’

ইরশাদ কামাল খান বলেন, ‘আলবদররা কেউ এলে আর্মি স্টাইলে স্যালুট দিতেন। তবে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতেন। কারও নাম বলত না। এ কারণে সেসময় তাদের পরিচয় জানা সম্ভব ছিল না। তারা আন্ডারগ্রাউন্ড সংস্কৃতির অনুসারী। তবে তারা যে ইসলামী ছাত্রসংঘের সঙ্গে জড়িত সেটা জানতাম।’
ইরশাদ কামাল খান জানান, তাকে ডালিম হোটেলে চারদিন রাখা হয়েছিল। পরে একটি কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ওই কাগজে লেখা ছিল, আওয়ামী লীগ ও ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত। আমি না বুঝে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলাম। আমি এজন্য অনুতপ্ত।’
তিনি জানান, চারদিনে তাকে দু’একবার তাকে পান্তা ভাত আর মাছের কাঁটা খেতে দেয়া হয়েছিল। ক্ষুধার কারণে এ খাবারই তিনি তৃপ্তি নিয়ে খেতেন।
নূরজাহান খান জানান, তার স্বামীকে ২০ নভেম্বর জেলা কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দেশ স্বাধীনের পর ১৭ ডিসেম্বর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
নূরজাহান খান বলেন, ‘মীর কাসেম আলীসহ যুদ্ধাপরাধীদের অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে, বিচার শুরু হয়েছে। আমরা তাদের শাস্তি দেখতে চাই। একসিঙ্গে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হোক। যেন তাদের অর্থের উৎস ধ্বংস হয়ে যায়। তারা যেন দুর্বল হয়ে যায়, যাতে তারা এ বিচার বন্ধের ষড়যন্ত্র করতে না পারে।’
ইরশাদ কামাল খান বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমি নির্যাতনকারীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলাম। কারা এ নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত তা জানার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তখন সবাই পালিয়ে গিয়েছিল। এরপর আমি বিদেশে চলে যাই। তারপর তো ১৯৭৫-এ দেশের পরিস্থিতিই পাল্টে যায়। উল্টোদিকে ঘুরতে শুরু করে দেশ। যা হোক, এখন ৪০ বছর পর যখন বিচার শুরু হয়েছে তখন আমি এ বিচারের শেষ দেখতে চাই।’
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আদেশে গত রোববার বিকেলে রাজধানীর মতিঝিল থেকে জামায়াতের মজলিশে শূরার সদস্য মীর কাসেম আলীকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে কারাগারে পাঠানো হয়।
- রমেন দাশগুপ্ত
http://www.ebanglanews24.com/Bangla/detailsnews.php?nssl=dd991b5b954e8bd574dd0e770ea07988&nttl=20062012120639

Thursday, June 26, 2014

হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের সংবাদ সংগ্রহের সময় নারী সাংবাদিকদের ওপর হামলার নিন্দা

 সোমবার ঢাকা ৮ এপ্রিল ২০১৩, ২৫ চৈত্র ১৪১৯, ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪

হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের সংবাদ সংগ্রহের সময় একুশে টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার নাদিয়া শারমীনসহ নারী সাংবাদিকদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছে বিভিন্ন মহল। গতকাল রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে নারী সাংবাদিক কেন্দ্র, জাতীয় কন্যা শিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম, কর্মজীবী নারীসহ বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক সমাবেশ করে এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। আরো প্রতিবাদ জানিয়েছে জাসদ, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, বামমোর্চা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ। এদিকে নারী সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে আগামী ৯ এপ্রিল প্রেসক্লাবে সাংবাদিক সমাবেশ করা হবে। নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ইকবাল সোবহান চৌধুরী, ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউটের (আইপিআই) ভাইস চেয়ারম্যান মনজুরুল আহসান বুলবুল, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা আবদুল জলিল ভূঁইয়া, নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনু, সহ-সভাপতি দিল মনোয়ারা মনু, সাধারণ সম্পাদক পারভীন সুলতানা ঝুমা, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নারীবিষয়ক সম্পাদক আইরিন নিয়াজী মান্না, নাদিয়ার বড় বোন অ্যাডভোকেট সাদিয়া আফরিনসহ আরো অনেকে। এতে সংহতি জানিয়েছে, গণজাগরণ মঞ্চের সমন্বয়ক ডা. ইমরান এইচ সরকার ও বেসরকারি সংস্থা ব্লাস্টসহ আরো অনেকেই। ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, তারা যে আচরণ করেছে এতে মনে হচ্ছে আফগানিস্তানে তালেবানরা নারীদের যেমন পশ্চাৎপদ করে ফেলেছিল, বাংলাদেশেও তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, হেফাজতে ইসলামের দেয়া ১৩ দফা দাবি কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব নয়। নাসিমুন আরা হক মিনু বলেন, তারা যে ১৩টি দাবি করেছে তার কোনোটিই বাংলাদেশের পক্ষে নয়। দেশের গার্মেন্টস শিল্পের ৯০ শতাংশ শ্রমিক নারী। এসব নারী যদি কাজ বন্ধ করে ঘরে চলে যায়, দেশের অর্থনীতির কি হবে? 
গত শনিবার হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে দায়িত্ব পালনকালে হামলার শিকার নাদিয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, শনিবার বেলা ১২টার দিকে লম্বা পাঞ্জাবি পরা কয়েকজন এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে আপনি মহিলা মানুষ, আপনার এখানে কি? আপনি এখান থেকে চলে যান। উত্তরে আমি বলি, আমি মহিলা না, একজন সাংবাদিক। সংবাদ সংগ্রহ করতে এখানে এসেছি। একথা শেষ হওয়া মাত্র হেফাজতের ৫০-৬০ জনকর্মী আমার দিকে তেড়ে আসে, আমাকে আচমকা চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করে। আমি সেখান থেকে দ্রুত চলে আসার চেষ্টা করি, এরপরও তারা আমাকে পেছন থেকে পানির বোতল ইট ছুড়ে মারতে থাকে।
তিনি বলেন, ওরা আমাকে পরিকল্পিতভাবে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার চেষ্টা করেছিল। সহকর্মীরা এগিয়ে না এলে ওরা আমাকে মেরে ফেলত। পল্টন মোড় থেকে বিজয়নগর পর্যন্ত ওরা আমাকে মারতে মারতে ৬ থেকে ৭ বার ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে এলোপাতাড়ি লাথি মারে। উঠে দৌড়ানো শুরু করলে পেছন থেকে আবার ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়, মাথায় লাথি মারে। বারবার তারা আমার কাপড় টেনে-হিঁচড়ে কিল ঘুষি মারে। 
নাদিয়া বর্তমানে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন আছেন। তাকে হাসপাতালে দেখতে গেছেন গণজাগরণ মঞ্চের সমন্বয়ক ডা. ইমরান এইচ সরকার, কর্মজীবী নারীর শিরিন আখতার, নাট্যকর্মী রোকেয়া প্রাচীসহ আরো অনেকে। হাসপাতালে দেখতে গিয়ে ইমরান এইচ সরকার বলেন, যারা একজন নারীকে হেফাজত করতে পারেন না তারা কিভাবে ইসলামের হেফাজত করবেন?
এছাড়া শনিবার ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সাংবাদিক আরাফাত আরা পল্টন মোড়ে তার অফিসে যাওয়ার পথে হয়রানির শিকার হন। তিনি হেঁটে অফিস যাওয়ার পথে তার পথরোধ করে তাকে মাথায় কাপড় দিয়ে অফিসে যাওয়ার জন্য বলে। একই ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন, বাংলানিউজের চিফ ল করেসপনডেন্ট জাকিয়া আহমেদ। তিনি জানান, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির কাছে দায়িত্বপালনকালে একজন মিছিল থেকে ওই মাইয়্যা মাথায় কাপড় নাই ক্যান বলে চিৎকার করে ওঠে। একথা শুনে জাকিয়া ভয় পেয়ে যান। মিছিলের অন্যরা এ সময় নারী সাংবাদিকদের নিয়ে বাজে মন্তব্য করতে থাকে। শুধু ঢাকায় নয় চট্টগ্রামে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন সাংবাদিক সুমি খান। 
নারীবিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রতিহত করার ঘোষণা নারী সমাজের : হেফাজতে ইসলাম কর্তৃক নারী সাংবাদিক নির্যাতন, পথচারী নারীদের নাজেহাল করা এবং নারীর প্রতি অবমাননামূলক বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে নারীবিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে নারী সমাজ। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নারীদের অংশগ্রহণে এক মানববন্ধন থেকে এ ঘোষণা দেয়া হয়। সমাবেশ থেকে এ ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকায় নারী মহাসমাবেশের ডাক দেয়া হয়েছে। তবে সমাবেশের তারিখ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।  
ডাকসুর সাবেক ভিপি অধ্যাপক মাহফুজা খানমের সভাপতিত্বে সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা জলি তালুকদারের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জাসদের শিরিন আক্তার, ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য হাজেরা সুলতানা, বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের শম্পা বসু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাবেরী গায়েন, জোবেদা নাসরিন কণা, রোকেয়া প্রাচী, অ্যাডভোকেট সালমা আলী, গণজাগরণ মঞ্চের নেত্রী লাকী আক্তার, গার্মেন্টস শ্রমিক নেত্রী নাসিমা আক্তার প্রমুখ। 
সমাবেশে শিরিন আক্তার বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দোষীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তিনি বলেন, ধর্মের নামে নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। মেয়েরা কাজ করতে পারবে না এমন কথা ইসলামে নেই। কর্মক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীদের অগ্রগতি যখন সারাবিশ্বে আলোচিত, তখন নারীদের ওপর হামলা এবং তাদের অগ্রযাত্রার পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে হেফাজতে ইসলাম। 
হাজেরা সুলতানা বলেন, ইসলাম রক্ষার নামে নারী নির্যাতন বন্ধ করে নারীবিদ্বেষী এই দলকে প্রতিহত করতে হবে। এসব মৌলবাদীদের হাত ভেঙে দিতে হবে। তাদের ডাকা হরতাল প্রতিহত করার ঘোষণা দেন তিনি। 
সমাবেশে সংহতি জানান, সাংস্কৃতিকব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, সংগীত শিল্পী মাহমুদুজ্জামান বাবু, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, স্টেপস টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট, নারী প্রগতি, কর্মজীবী নারী, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঢাবি রোকেয়া হল শাখা, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, বাংলাদেশ যুব মৈত্রী, বাঁচতে শিখ নারী, ইয়ুথ অ্যান্ড হাঙ্গার, হাজারীবাগ ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন, জাতীয় শ্রমিক জোট, স্বাধীন বাংলা গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ মুক্ত শ্রমিক ফেডারেশন, গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম, বিপ্লবী নারী ফোরাম, জাতীয় গার্হস্থ্য নারী শ্রমিক ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদ : দায়িত্বপালনকালে নারী সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ পরিবার এ সমাবেশ করে। নাদিয়া এ বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিভাগের চেয়ারম্যান গীতি আরা নাসরিন,  সহযোগী অধ্যাপক ফাহমিদুল হক, অধ্যাপক শেখ আব্দুস সালাম, য. আবুল মনসুর আহমদ, টেলিভিশন অ্যান্ড ফিল্ম স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শফিউল আলম ভূঁইয়া, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাজীব মীরসহ অন্যরা। গীতি আরা নাসরিন বলেন, এই হামলা কেবল একজন নারী সাংবাদিকের ওপর নয়, দেশের সব নারীর ওপর হামলা, দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হামলা। তিনি হামলাকারী এবং তাদের সহযোগীদের শাস্তি দাবি করেন। ফাহমিদুল হক বলেন, এই হামলায় নারী সমাজকে হেয় করা হয়েছে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত আনা হয়েছে। 
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর নিন্দা : এদিকে একুশে টেলিভিশনের রিপোর্টার নাদিয়া শারমিনের ওপর বর্বোরচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। গতকাল বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন একুশে টেলিভিশনের রিপোর্টার নাদিয়া শারমিনের শারীরিক অবস্থার খোঁজ-খবর নেয়ার সময় সাংবাদিকদের প্রতিমন্ত্রী বলেন, একজন গণমাধ্যম প্রতিনিধির ওপর হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয়। নারী সাংবাদিকের ওপর হামলায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান।
- See more at: http://manobkantha.com/2013/04/08/115720.html#sthash.PHf30PbE.dpuf

Tuesday, June 17, 2014

ডুবন্ত বিএনপিকে রক্ষায় ড. কামাল হোসেনের শেষ চেষ্টা -সরদার সিরাজুল ইসলাম


বাংলাদেশে এখন মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, জিয়াউর রহমান, সংবিধান, নির্বাচন ইত্যাদি নিয়ে ফ্রি স্টাইল কথাবার্তা, টকশো ও পত্র-পত্রিকায় সুশীলদের অক্লান্ত অপপ্রচার সরকারের বিরুদ্ধে এবং বিএনপি জামায়াতের পক্ষে। একথা সবাই জানেন যে, বিএনপির জন্ম ক্যান্টনমেন্টে। জিয়া সামরিক পোশাক পরে বেতার-টেলিভিশনের মাধ্যমে অন্তত তিনটি বাজেট ঘোষণা করেছিলেন (’৭৬, ’৭৭, ’৭৮)। এমনি অবৈধ কর্মকা-ের উত্তরাধিকার বিএনপি নেতারা কোন আক্কেলে গত ৫/৬/১৪ তারিখে জাতীয় সংসদে পেশকৃত বাজেটকে অবৈধ সরকারের অবৈধ বাজেট বলে?
জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে নিহত হওয়ার মাত্র ১৩দিন আগে শেখ হাসিনা দেশে ফেরেন। জিয়া খালি মাঠে গোল দিয়েছেন কিন্তু ৫ বছর রাজত্বকালে প্রতিদিনই ক্যান্টনমেন্টে সৈনিক হত্যা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তিনি যদি ওইভাবে মারা না যেতেন তাহলে শেখ হাসিনার গণআন্দোলনে ২/৩ বছরের মধ্যেই তাকে স্বৈরাচার খেতাব নিয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে হতো। কিন্তু চক্রান্তকারীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনর্প্রতিষ্ঠাকে বিলম্বিত করার লক্ষ্যে জিয়াকে হত্যা করে এরশাদের সৌজন্যে ঢাকঢোল পিটিয়ে ঢাকা শহরে সংসদ প্লাজায় একটি বিরাট উদ্যানে রাজকীয় দাফনের মাধ্যমে তাকে একটি অমরত্ব প্রদানের চেষ্টা করেন। তাকে শহীদ বা ঘোষক টাইটেল দেন তার ভক্তরা। জিয়াউর রহমান কিভাবে শহীদ হয় এর কোন ব্যাখ্যা নেই। কারণ তার মৃত্যু হয়েছিল জাতির কোন গৌরবময় পদক্ষেপ বা ধর্মযুদ্ধের জন্য নয়। জিয়াউর রহমানের কোন জীবনী গ্রন্থ এ পর্যন্ত কেউ লিখতে পারেননি। তার দলের লোকেরা বহুবার সরকারী টাকা খেয়ে শেষ পর্যন্ত তা লিখতে পারেননি। সর্বশেষ ৮লাখ টাকা খেয়েছিলেন মরহুম ড. আফতাব আহম্মেদ (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি)। 
বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ রাজনীতি বিষয়ক একজন ভাল লেখক কিন্তু জিয়াকে নিয়ে তার প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের এমন কোন মূল্যায়ন নেই যা তাকে শহীদের মর্যাদা দিতে পারে। বরং যা আছে তা পাঠ করলে তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করতে হবে। সে যাই হোক, মওদুদ আহমদ কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ওপর লিখিত গ্রন্থ Bangladesh: Era of Sheikh Mujibur Rahman
 গ্রন্থের উপসংহার তাকে শহীদের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন। 
জিয়াউর রহমানের পরবর্তীতে বিএনপির ভগ্নদশা থেকে সাইডলাইনে ম্যাডাম খালেদাকে নামালেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। কারণ এরশাদ নিশ্চিত ছিলেন যে, আওয়ামী লীগকে হত্যা করা যায়নি বরং তার শক্তি আরও প্রবল মাত্রা পেয়েছে। তাই শেখ হাসিনার আন্দোলনের (’৮৩-’৯০) মুখে এরশাদের পতনের সম্ভাব্য চিন্তায় জিয়া-এরশাদের অভিন্ন ধারা প্রলম্বিত করার জন্য ম্যাডাম খালেদাকে সাইডলাইনে রাজপথে নামালেন। ১৯৮৬ সালে বিএনপির ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয়ার মতো লোক ছিল না। এবং জিয়া-এরশাদের ভোট ভাগাভাগি ঠেকাতে বিএনপিকে নির্বাচন থেকে বাইরে রেখেছিলেন এরশাদ। চট্টগ্রামে শেখ হাসিনাকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা এরশাদও করেছিলেন ১৯৮৮ সালে ২৪ জানুয়ারি। এরশাদবিরোধী আন্দোলন এককভাবে চালিয়ে তুললেন শেখ হাসিনা। আর আপোসহীন খেতাব পেলেন এরশাদকে নেপথ্যে সহযোগিতাকারী ম্যাডাম খালেদা। এসব সুশীল মিডিয়ার কারসাজি। সেই সুশীলরাই ১৯৯১ সালে ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনাকে ঠেকাতে সফল হয়েছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে নানা কৌশল ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিএনপি বিজয়ী হয়ে যেসব অপকর্ম করেছে তার লম্বা ফিরিস্তি এখানে দেয়া সম্ভব নয়। তবে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ২৬ জানুয়ারি ২০০৮ সংখ্যায় ২১ আগস্টের হামলা: সত্য বেরিয়ে আসছে ‘আষাঢ়ে গল্পকারদের’ কী হবে? 
শিরোনামে বিএনপির ভবিষ্যত নিয়ে যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন সেই নিবন্ধ থেকে কিছুটা উদ্ধৃতি করা হলো-
‘মনে আছে, ২৬ আগস্ট অপরাহ্ণে বেগম জিয়ার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দীর্ঘ আলোচনার সময় তারেক রহমানও উপস্থিত ছিলেন। সেদিন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে বেশ বিচলিত মনে হয়েছিল। সে সময় খালেদা জিয়ার আমন্ত্রণে পত্রিকার সম্পাদকরা তাঁর সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে দেখা করেছিলেন। বেগম জিয়া শুরুতেই আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কারা এ ঘটনা ঘটাতে পারে বলে আপনি মনে করেন? আমার সরাসরি উত্তর ছিল ‘সুনির্দিষ্টভাবে আমার পক্ষে বলা মুশকিল। তবে হরকত-উল-জিহাদ, ভারতের অসমের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘উলফা’ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের সংগঠন ফ্রিডম পার্টি প্রভৃতি হয়ত এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। এসব গোষ্ঠীর পরস্পরের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তারা পরস্পরকে সাহায্য-সহযোগিতা করে বলেও শোনা যায়।’
বেগম জিয়া শুরুতেই ‘ফ্রিডম পার্টির এখন আর অস্তিত্ব নেই’ বলে তাদের জড়িত থাকার সম্ভবনা নাকচ করে দেন। কিন্তু হরকত-উল-জিহাদ ও উলফা সম্পর্কে তিনি কোন মন্তব্য করেননি। আমার এখনও মনে পড়ে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেই আলোচনাটি ছিল কখনও স্বাভাবিক, কখনও বেশ উত্তেজনাপূর্ণ। সেদিন অপরাহ্ণের আলোচনায় বেগম জিয়া বার বার আওয়ামী লীগকে প্রয়োজনে শায়েস্তা করা হবে এবং কিছুতেই ’৯৬ সালের অবস্থা তৈরি করতে দেবেন না বলে জানিয়েছিলেন। 
সম্প্রতি প্রথম আলোর অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, জোট সরকারের প্রভাবশালী অংশ থেকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থাকে সে সময়ে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে কোন তদন্ত করতে নিষেধ করে দেয়া হয়েছিল। তৎকালীন সরকার তাদের পছন্দের সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের দিয়ে ২১ আগস্টের হত্যাকা-ের উদ্দেশ্যমূলক তদন্ত করিয়েছিল বলে জানা যায়। এসব তথ্যের পটভূমিতে এখন যে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, তাহলে কি ২১ আগস্ট হামলার সঙ্গে জোট সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কোন যোগসাজশ ছিল? সে সময় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত কোন কোন কর্মকর্তার মনেও এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। ওই হামলার পরপর বিভিন্ন ঘটনা থেকে এমন ধারণাই হয়েছিল তাদের।
আজ যখন শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে হত্যা করতে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মতো অবিশ্বাস্য ভয়াবহ ঘটনাবলীর অনেক তথ্য বের হয়ে আসছে তখন এটা সত্যি বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে যে, একটি নির্বাচিত সরকার ও নেতৃত্ব কীভাবে তাদের প্রতিপক্ষ শক্তিকে ধ্বংস করতে কী নিলর্জ্জভাবে সত্যকে উল্টোপথে পরিচালিত করতে পারে! এবং সেই জঘন্য কাজটি হয়েছে এই ঢাকায়, এই বাংলাদেশে।
২১ আগস্টের মতো ভয়ঙ্কর ঘটনায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের এই ভূমিকাকে দেশের মানুষ কীভাবে গ্রহণ করবে? এক ঘটনা বিএনপির জন্য এখন এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হবে। 
এই বক্তব্যই সাক্ষ্য দেয় যে, বিএনপিকে জাতি ২০০৮ সালে বর্জন করেছেন এবং ভবিষ্যতে তার এগোবার আর কোন পথ নেই। সেই কারণেই তারা বিকল্প পথের সন্ধান না পেয়ে নির্বাচন বর্জন করেছে তার প্রধান কারণ যে ২০০৮ সালের আওয়ামী লীগ যে পরিমাণ ভোট পেয়েছিলেন তার চাইতে কম পেলেও তার বিএনপি জামায়াতের চেয়ে অনেক বেশি। 
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে জিয়াউর রহমান সামরিক ফরমান দিয়ে যে সংবিধান সংশোধন করেছিলেন তা গ্রহণযোগ্য ছিল না। পরে জিয়ার রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করেছে। সেই সংবিধানের আওতায় ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০২ এবং ২০০৮-এর নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা দু’দুবার ক্ষমতায় এসেছে।
২০০৮-এ ৯০ শতাংশ আসনে আওয়ামী জোট নির্বাচিত হয়েছে। সে নির্বাচনে শতভাগ স্বচ্ছতা ছিল; যা নিয়ে জামায়াত-বিএনপির সুশীল বাটপাররাও কোন প্রশ্ন তুলতে পারেননি। বিএনপি-জামায়াত জোট পেয়েছিল ৩০টি আসন। ২০০১ সালের কথিত নিরপেক্ষ নির্দলীয় দুই প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দীন-লতিফুর রহমান ম্যাডাম খালেদাকে অদেয় কিছু না রাখার নির্বাচনের কলঙ্ক দেশবাসী ভুলে যায়নি। দৃষ্টি এড়ায়নি সুপ্রীমকোর্টের। যার প্রমাণ পাওয়া যায় সুর্প্রীমকোর্টের আদেশ। তথাকথিত নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করেই সুপ্রীমকোর্ট ক্ষান্ত হয়নি বরং এই মর্মে একটি ড়নংবৎাধঃরড়হ (যা বাধ্যতামূলক নয়) দিয়েছে যে “সংসদ মনে করলে দশম ও একাদশ নির্বাচন করলে তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে তবে অনির্বাচিত কাউকে নেয়া যাবে না।” যারা তত্ত্ববধায়ক সরকার পদ্ধতির কথা বলেন তারা এর বাইরে একজন লোক ঠিক করুন তো? 
সুপ্রীমকোর্টের এই আদেশটির প্রেক্ষাপট্ হচ্ছে এক নাগরিক হাইকোর্টে একটি রিট করেন যাতে সামরিক শাসকদের বৈধতার প্রশ্ন প্রসঙ্গক্রমে উঠে আসে। সুপ্রীমকোর্ট জিয়া-এরশাদের শাসনকালকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং নির্দলীয় তত্ত্ববধায়ক সরকার প্রথা আর্টিকল ৫৮-(থ) বাতিল ঘোষণা করে।
যেহেতু আওয়ামী লীগ পঁচাত্তর পরবর্তীতে বিশেষ করে ২০০৮’র নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোটের নির্বাচনী ওয়াদা ছিল ১৯৭২- এর সংবিধান পুনঃস্থাপন করবেন এবং যেহেতু সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের জিয়া-এরশাদের সামরিক ফরমান দ্বারা সংবিধানের সংযোজনী বাতিল হয়ে যায় সেহেতু সংবিধানে সংশোধন অপরিহার্য হয়ে যায়। আওয়ামী জোটের তিন-চতুর্থাংশ সংসদীয় আসন থাকায় বাহাত্তরের সংবিধান (বিসমিল্লা-রাষ্ট্রধর্ম ব্যতীত) পুনর্বহাল হয় (৩০.০৬.২০১১)
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, সুপ্রীমকোর্টের আদেশের পর যদি সংবিধান সংশোধনের জন্য আওয়ামী লীগের প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্য নাও থাকত তবুও জিয়া-এরশাদের সামরিক ফরমানের সংবিধান অকার্যকর হওয়ায় এবং বিরোধী দল বিএনপিকেই পঞ্চদশ সংশোধনীতে ভোট দিতে হতো। অথবা বিএনপি রাজি না হলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে ১৯৭২-এর সংবিধান পুনঃস্থাপিত হতো। কেননা সুপ্রীমকোর্টের আদেশ বাধ্যতামূলক। তাই পঞ্চদশ সংশোধনী আইনও ন্যায়সঙ্গত।
কিন্তু বিএনপি-জামায়াত এই সংবিধান মানে না। পল্টনের জনসভায় ম্যাডাম খালেদা জিয়া বলেছেন, এই সংবিধান এখন ডাস্টবিনে ফেলে দেবেন অথচ সেই সংবিধানের আওতায় তিনি তখনও বিরোধী দলের নেত্রী। সংসদ থেকে পদত্যাগ করেই এ কথা বলতে পারতেন। যতদিন এই সংবিধান বহাল থাকবে তা মেনেই রাজনীতি করতে হবে। আর কোনদিন নির্বাচন না করলে সেই দলের শাস্তিস্বরূপ নিবন্ধন বাতিল হওয়া উচিত। অবাক হওয়ার কিছু নেই যখন দেখা যায় বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সভাপতি এবং বঙ্গবন্ধুর আইন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন তার সংবিধানের ফিরে যাওয়া ভাল লাগছে না বরং বাতিল চাইছেন। ড. কামাল হোসেনের মনে এখন গভীর বেদনা ও হতাশা। কারণ এখন দলে থাকলে রাষ্ট্রপতি হতে পারতেন। ১৯৯১ সালে তিনি আওয়ামী লীগ ঠেকাতে সচেষ্ট থেকে শেষ পর্যন্ত দলত্যাগ করেন। তার কাছে রাজনীতির মাধ্যমে দেশ সেবার চাইতে আইন ব্যবসা বেশি লাভজনক বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত। ড. কামাল হোসেন ছাড়াই শেখ হাসিনার অবিশাস্য সাফল্য কি তাকে রাতে নিদ্রাহীন করেছে? তিনি এখন বঙ্গবন্ধু খুনী জিয়ার বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। আবার দুঃশাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন, কিন্তু সেই দুর্নীতিবাজ রাজাকারের পক্ষে লড়াই করে বরং তা ‘শেয়ার’ (ংযধৎব) করেন।
সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন হয়েছে একথা সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৎকালীন বিরোধী নেতা ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে টেলিফোন সংলাপ করে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে দেখিয়েছেন এবং শুনিয়েছেন (২৬.১০.১৩)। শেখ হাসিনা হরতাল প্রত্যাহার করে ২৮.১০.১৩ তারিখে সন্ধ্যায় গণভবনে যতজন ইচ্ছা ততজন নিয়ে আসার আমন্ত্রণ জানান। ‘নির্বাচনসহ সবকিছু নিয়ে কথা হবে।’ কিন্তু খালেদা জিয়া তা প্রত্যাখ্যান করলেন এই বলে যে হরতাল প্রত্যাহার করবেন না। আর হরতালের মধ্যে তিনি নিজে বের হন না। সদিছা থাকলে ৩ দিনের হরতাল প্রথম একদিন (২৭.৬.১৩) পালন করে প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ বন্ধ করে পরবর্তী দুই দিন হরতাল প্রত্যাহার করে ২৮-১০-১৩ শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করতে পারতেন, নির্বাচনের ইচ্ছা থাকলে। তিনি নির্বাচনে যাওয়ার বদলে শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবিতে অটল থাকলেন আপোসহীনভাবে। 
২০০৮ সালের নির্বাচন আইন ও সংবিধানসম্মত হয়েছে। পরাজয়ের ভয়ে যদি কেউ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় তাতে নির্বাচনের বৈধতায় এতটুকু কমতি থাকে না। এতদসত্ত্বেও আন্দোলন-সংগ্রামে ব্যর্থ হয়ে ড. কামাল হোসেন এবার কোর্টে গেছেন নির্বাচন অবৈধ ঘোষণার আবদার নিয়ে। ডুবন্ত বিএনপিকে বাঁচানোর জন্য তিনি এখন আদালতে গেছেন। হায়রে! বঙ্গবন্ধুর প্রিয় ড. কামাল হোসেন। এরা এখন ইতিহাসের করুণার পাত্র। 
উত্তরা, ঢাকা।

২১ আগস্টের হামলা: সত্য বেরিয়ে আসছে ‘আষাঢ়ে গল্পকারদের’ কী হবে? 
মতিউর রহমান,সম্পাদক, প্রথম আলো

Saturday, June 14, 2014

বাবা দিবসে প্রিয়তম বাবা এবং চাচ্চুর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা- সুমি খান

আজ বাবা দিবস!

নশ্বর এ পৃথিবীতে কেউ চিরদিন থাকে না। আমিও থাকবো না।  আমার বাবা ও নেই ।


কিন্তু  ২০০৭ সালের ২৮ জুনের অন্ধকার ভোরের পর থেকে এক প্রগাঢ় শূন্যতার হাহাকার বুকের গহনে  ফিরে ফিরে আসে বারবার। আমার পরিশ্রম আর কাজের দায়বদ্ধতা যার কাছে অসীম ভালোবাসা আর সম্মানের ছিল। আমার অনুসন্ধানী  রিপোর্ট,  টপটেররদের এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ ....আমার  কাজ , মেধা, শ্রম আর সততার প্রতিটা স্বীকৃতি যিনি মাথার মুকুট হিসেবে পরে নিতেন নিজের সম্মান ভেবে-তিনি আমার বাবা সাইফুদ্দিন খান!



মিষ্টি মধুর বন্ধুত্ব নয়, ঝগড়াও হতো অনেক।

তবু আমার বাবা  আমার প্রাণের দোসর ছিলেন ।

 সেই শৈশব থেকেই আমার খেলাধুলা, দুরন্তপনা , ফাঁকিবাজি , রাজপথে আন্দোলন , সংগ্রাম , রিপোর্টিং য়ের চ্যালেঞ্জ, বেপরোয়া স্বভাব-সবকিছুতেই বাবার  যে কী অসীম প্রশ্রয় আর আত্মবিশ্বাস পেয়েছি! আজ প্রতি মুহুর্তে    বাবার অভাব প্রতিটি রক্তক্ষরণে আমি শিরায় শিরায় টের পাই! স্নায়ুতে স্নায়ুতে বলে উঠি-তোমার এ অক্ষম সন্তান তোমার আদর্শের বাস্তবায়ন ঘটাতে পারলো না বাবা! তুমি যে চলে গেলে!

আর যে কেউ নেই  যে আমায় হৃদয় উজাড় করে ভালোবেসে আমার কাজকে মাথার মুকুট করে আমার কাজ এগিয়ে নেবে দূর বহুদূর !

এসো না আব্বু ,  আমায় একটু আশীর্বাদ করে যাও! তোমার হাতের ছোঁয়া আমার মাথায় টের পাচ্ছি আব্বু!


তোমার সাথে যারা দিনের পর দিন অন্যায় অত্যাচার করে গেছে, সেই ঘাতকদের বিচার কাজ চলছে।  যদিও এই বিচার কাজ পদে পদে বাধা পাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি তোমার সহযোদ্ধাদের ঘাতক-তোমার অত্যাচারীদের বিচার হবেই ।


আমার কাজ যে  এগিয়ে নিতে হবে আরো আরো অনেক দূর! দূর আকাশে তাকিয়ে আছি- সেই ধ্রুবতারাটার দিকে। তোমার হাতটা দাও না , আব্বু! চোখের জল যে বাধ মানে না! অনেক অনেক কথা আজ বেদনার ঢল হয়ে অবিরল অশ্রুধারায় ঝরে পড়ছে!

বাবা দিবসেই শুধু নয়-সবসময়, সবখানে তুমি আছো আমার সাথে।

আমাকে পিছুটান বলতেন এক আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবী সেলিম চাচ্চু। তার প্রকৃত নাম পূর্ণেন্দু কানুনগো। কেলিশহরের বিশাল জমিদার পরিবারের এই সন্তান তাঁর সমস্ত জমিদারী মুসলিম প্রজাদের উৎসর্গ করে শ্রেণীভেদ প্রথা বিলুপ্ত করেছিলেন। কমিউনিষ্ট পার্টির কাজ করতে গিয়ে পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়ে নির্যাতিত নিগৃহীত হয়েছেন। অনেক বছর আন্ডারগ্রাউন্ড থেকেছেন।  একাত্তরে আমাদের বাসায় যখন ছিলেন -বেরুবার সময়ে পিছু ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে নাকি বলতেন, আমিই তার পিছুটান। বড়ো হয়েও চাচ্চুকে দেখেছি -অসীম মেধা আর ব্যক্তিত্ব ছিল তাঁর ।  তাঁকে আদর্শ হিসেবেই প্রতিটি  কাজে স্মরণ করেছি। নিজেকে সমাজের হিতের জন্যে পরের স্বার্থে বলি দিয়েছেন যাঁরা-এই প্রজন্মের কাছে তাঁদের অবদান তুলে ধরবার কোন কাজ কমিউনিষ্ট পার্টি করছে না। বড়ো দুর্ভাগ্যজনক!

আজ বাবা দিবসে আমার বাবা সাইফুদ্দিন খান এবং আমার  চাচ্চু পূর্ণেন্দু কানুনগো কে অনেক মিস্ করছি।
তাঁদের  দিকনির্দেশনা বড়ো প্রয়োজন ছিল আজকের দিনে।


এই দু'টি মানুষের মানবতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সমাজকে এগিয়ে নিয়েছে অনেক দূর! তাদের আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরী।  এর ফলে আমরা নতুন প্রজন্মে নিশ্চয়ই আরো অনেক পূর্ণেন্দু কানুনগো অথবা সাইফুদ্দিন খান কে খুঁজে পাবো। এই সমাজ কে যারা এগিয়ে  নেবে!!


লাল সালাম  চাচ্চু, লাল সালাম আব্বু!


sumikhan29bdj@gmail.com