Monday, January 27, 2014

নিউজ টুইস্টিং: স্যাম্পল প্রথম আলো

আমার ব্লগ লিখেছেনঃ চোর (তারিখঃ মঙ্গলবার, ২৮/০১/২০১৪ - ০০:১৯)

৪ টি সংবাদের শিরোনাম দেখা যাক:

১) নেতাদের হাত সোনার নৌকায়, শিশুরা না খেয়ে রাস্তায় (প্রথম আলো প্রিন্ট ভার্সন, ২৫শে জানুআরি, ২০১৪, আপডেট ০২:১১)

২) সোনার নৌকা বিক্রির টাকা দান করলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (প্রথম আলো, অনলাইন ভার্সন, ২৫শে জানুআরি, ২০১৪, আপডেট ২১:২৪)

৩) রাজসিক সংবর্ধনা: বর্ণিল তোরণ আর সোনার নৌকা (প্রথম আলো, প্রিন্ট সংস্করণ, ২৭শে জানুআরি, ২০১৪, আপডেট ০০:১৪)

৪) মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র: শিক্ষার্থীদের রাস্তায় দাঁড় করানো যাবে না (প্রথম আলো, অনলাইন ভার্সন, জানুআরি ২৭, ২০১৪, আপডেট ১৯:৪৩)

---------------

এখানে ইস্যু ২টা: 

ক)সোনার নৌকা উপহার নেয়ার বিলাস, 

খ)শিশুদেরকে না খাইয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করা।

-------------------

একটা নিউজের ফোকাস কি, সেটা তার শিরোনামই নির্ধারণ করে। এই নিউজগুলোর শিরোনাম থেকে দেখা যায়, প্রথম নিউজে রাজনৈতিক নেতাদের (এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের নেতা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম) হাতে উঠেছে উপহারপ্রাপ্ত সোনার নৌকা, যেখানে এই নেতাকে সম্বর্ধনা দিতে শিশুদেরকে না খাইয়ে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। খুবই হৃদয়-বিদারক দৃশ্য। নেতা নিজে বিলাশবহুল সোনার নৌকা উপহার নিচ্ছেন। আবার শিশুদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ নেই, তাদেরকে জোর করে দাঁড়িয়ে রাখা হচ্ছে তাকে সম্বর্ধনা দিতে!

দ্বিতীয় নিউজে দেখা যায় সোনার তৈরি সেই নৌকা বিক্রয়ের টাকা তিনি দান করে দিয়েছেন একটি প্রতিবন্ধী শিশুসংস্থায়। তবে উল্লেখ্য, প্রতিমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় দুই ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। শিশুদের অনেকে ক্ষুধায় কাহিল হয়ে পড়লেও দুপুরে তাদের কাউকে কিছুই খেতে দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ দুইটা ইস্যুর ১টা সুরাহা হলো।

তৃতীয় লেখাটা একটা কলাম, যা ঘটনার ২দিন পরে দুই ইস্যুকে ফোর্স করেই লেখা হয়েছে, যদিও আমরা জানি একটি ইস্যু ইতিমধ্যেই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। এটা অবশ্য সম্ভব। একটা কলাম প্রোসেস করতে সময় লাগে। তাছাড়া আলী ইমাম মজুমদারের লেখা, সোহরাব হাসান বা আসিফ নজরুলের না। সুতরাং প্রেস পর্যন্ত পৌঁছাতে একটু সময় লাগবেই।

চতুর্থ নিউজে দেখা যায়, প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটা সার্কুলার জারি করেছে যে, শিশুদেরকে এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা যাবে না। অর্থাৎ দ্বিতীয় ইস্যুতেও সরকারের টনক নড়লো।

এই চারটি নিউজ এক করলে যেটা দাঁড়ায়, তাহলো 'সরকারের' অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রথম আলো খুব সোচ্চার। প্রথম আলোর নিউজের চাপেই সরকারে টনক নড়েছে। অর্থাৎ সরকারকে সাইজে রাখতে দেশ ও জনগণের সেবার প্রথম আলো প্রকৃত বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করছে।------------------------------

সাদা চোখে মোটামুটিভাবে ওরকম একটা ইম্প্রেশনই সৃষ্টি হয়। কিন্তু চোখটা খুলে আরেকটু এদিক-ওদিক তাকিয়ে চেষ্টা করে দেখি অন্য কিছু দেখা যায় কিনা।

নিউজ ২-এই আছে,

ভবিষ্যতে তাঁকে আর এ ধরনের উপহার না দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান প্রতিমন্ত্রী। অনুষ্ঠানেই তিনি এ উপহারের সমপরিমাণ অর্থ স্থানীয় একটি প্রতিবন্ধী সংস্থায় দান করে দেওয়ার ঘোষণা দেন।

অর্থাৎ প্রথম আলো প্রথম নিউজটা করার আগেই প্রতিমন্ত্রী বিলাসবহুলভাবে চিত্রিত করা উপহারটির ব্যাপারে তার অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। এবং ওই অনুষ্ঠানেই উপহারটির অর্থ প্রতিবন্ধী শিশুদের সংস্থায় দান করার কথা বলেছেন। দেখা যাচ্ছে, প্রথম আলো চাপ প্রয়োগের আগেই মন্ত্রী কাজটি করে ফেলেছেন!

এক্ষেত্রে অবশ্য প্রথম আলো মন্ত্রীকে ভবিষ্যতদ্রষ্টা হিসেবে প্রচার করতে পারে। অর্থাৎ প্রথম আলো একটা চাপ-নিউজ করবে, এটা তিনি আগে থেকেই জানতেন। তাই ওই ঘোষণা দিয়েছেন! 

এখানে আরেকটা পয়েন্ট উল্লেখযোগ্য হলো, প্রিন্টভার্সনে, যেটাই মূলপত্রিকা এবং বেশিরভাগ পাঠকের হাতে পৌঁছায়, খবরের এই অংশটুকু চেপে যাওয়া হয়েছে!

এবার ইস্যু খ; অর্থাৎ শিশুদেরকে না খাইয়ে রাখার ব্যাপারে সার্কুলারের বিষয়ে আসা যাক। মন্ত্রণালয় কি প্রথম আলোর চাপেই এই ইস্তেহার জারি করেছে, নাকি এরকম নিয়ম-কানুন আগেই ছিলো?

এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে প্রথম নিউজটায় (২৫ তারিখ)।

 সেখানে নিউজটা শুরুই হয়েছে এভাবে,

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে মন্ত্রী-সাংসদদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার চলছেই। ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে রাস্তায় কষ্ট দিয়ে মন্ত্রী-সাংসদেরা নিজ এলাকায় সংবর্ধনা নিচ্ছেন, গ্রহণ করছেন সোনার নৌকা উপহার।

দেখা যাচ্ছে, প্রথম নিউজটা লেখার সময়ই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এরকম নির্দেশনা বলবৎ ছিলো! তাহলে প্রথম আলো চাপ দেয়ার সময় পেলো কই?

এক মন্ত্রীকে না হয় ভবিষ্যতদ্রষ্টা হিসেবে চালানো যাবে; কিন্তু পুরো মন্ত্রণালয়কে কি সেই আধ্যাত্মিক ক্ষমতা দেয়া ঠিক হবে!

দেখা যাচ্ছে, দুইটা ইস্যুর কোনোটাতেই প্রথম আলোর চাপের কোনো ভূমিকা নাই। সরকারের মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয় আগে থেকেই এই ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়ে রেখেছে। তাহলে এই ক্রেডিট ছিনতাইয়ের চেষ্টা কেন?

অবশ্য সুশীলদের নিয়ে এই সমস্যা, এরা গাছেরটাও খাবে, তলারটাও কুড়াবে। সারাক্ষণ সরকারকে ব্যতিব্যস্ত রেখে প্রকারান্তরে যুদ্ধাপরাধী শক্তিকে সুবিধা করে দিবে। আবার যখন কোনোভাবেই সরকারকে ঠেকাতে পারছে না, তখন আবার ক্রেডিটের সময় আগে থালা পেতে দিবে!

--------------------------------

একটা উদাহরণ দিয়া শেষ করি। নোবেল ইনুচের ভাই মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর জানুআরির ১২ তারিখে এটি কি অন্তর্বর্তী সরকার নয়? আর্টিকেলে লিখেছে,

এই নির্বাচনের স্বরূপ আরও উন্মোচিত হয়েছে। আগে থেকেই বলা হয়েছিল, এই নির্বাচন হবে প্রহসনের নির্বাচন। ৫ জানুয়ারি সরকার গায়ের জোরে ‘পোকা খাওয়া’ নির্বাচন করে তা ভালোভাবে প্রমাণ করেছে। ভারত ছাড়া আর কোনো বিদেশি রাষ্ট্র, সরকার, এমনকি জাতিসংঘ পর্যন্ত এই নির্বাচন মেনে নিতে পারেনি।

ভোটারবিহীন নির্বাচনে ‘বিজয়ী’ দলের সরকারকে বৈধ বলার সুযোগ নেই।

এই হারামজাদাই মাত্র এক সপ্তাহ পরে জানুয়ারির ২০ তারিখে' বিএনপি এখন কী করবে' শিরোনামের আর্টিকেলে লিখেছে,

আশা করি খালেদা জিয়া, বিএনপি বা ১৮-দলীয় জোট এখন উপলব্ধি করতে পারছে যে ৫ জানুয়ারি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করা আরও কঠিন কাজ হবে। নির্বাচন যতই প্রশ্নবিদ্ধ ও প্রহসনের হোক না কেন, বাস্তব সত্য হলো: একটা নির্বাচন হয়েছে। ১৪-দলীয় জোট নতুন সরকার গঠন করেছে। এটা বাস্তব। এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই বিএনপিকে নতুন আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান সরকারকে অবৈধ বলা যাবে না, জনসমর্থিতও বলা যাবে না। এটা নিয়ম রক্ষার প্রশ্নবিদ্ধ সরকার।

এক সপ্তাহের মধ্যেই সরকার অবৈধ থেকে বৈধ হয়ে গেছে!

এই না হলে সুশীল!

https://www.amarblog.com/index.php?q=chor%2Fposts%2F176921
(লেখার বক্তব্য সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব মত)

Sunday, January 26, 2014

সংগীতে অশিক্ষিত, অদক্ষ, বেরসিক ও সাংস্কৃতিক গুন্ডাদের রাজত্ব : কবির সুমন


এত বড় একটা ভূখণ্ড। উপমহাদেশ। এত রকমের মানুষ, তাদের এত রকমের ভাষা। জাতীয়, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় অভ্যেস ও বদভ্যেস, রীতি, পোশাক। গানবাজনাতেও কত বৈচিত্র। ধ্রুপদী সংগীত তো হিন্দুস্তানি ও কর্নাটকি এই দুই ভাগে স্পষ্ট বিভক্ত। তেমনই পল্লিগীতি, লোকসংগীতের অজস্র আলাদা রূপ, সুরের ধাঁচা, বিশেষ বিশেষ স্বরের প্রয়োগ, তাল, ছন্দ। আমরা বাঙালিরা, বিশেষ করে স্কুল-কলেজে পড়া সংস্কৃতিমান বাঙালিরা, কথায় কথায় বাউল-ভাটিয়ালি আওড়াই। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে নানান শহুরে ব্যান্ড দেশি-বিদেশি নানান যন্ত্রের সঙ্গতে সেই সব গান গেয়ে-বাজিয়ে নাম করেন, টাকা করেন, বেশ করেন। কিন্তু হাঙ্গেরির সংগীতরচয়িতা ও পিয়ানোশিল্পী বেলা বার্টোক (১৮৮১-১৯৪৫) যেমন নানান জায়গায় ঘুরে ঘুরে হাঙ্গেরীয় পল্লিগীতির স্বরলিপি করে রেখেছিলেন, রেকর্ডিং-ও করেছিলেন সে যুগের অনুন্নত যন্ত্র দিয়ে, আমাদের দেশে কেউ তা করেননি। করে থাকলেও, খুব সীমিত ভাবে। কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া আমাদের উপমহাদেশ সংগীত ও স্বরলিপিকে এক জায়গায় আনতে পারেনি আজও। তার ফলে এক দিকে দেখা দিয়েছে ব্যাপক সাংগীতিক নিরক্ষরতা, অন্য দিকে বিস্মৃতি। স্বরলিপি লেখার রীতি না থাকায়, ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত আমাদের দেশে, বিশেষ করে নগরসভ্যতার বাইরে, কী ধরনের সুর-তাল ছিল, গানবাজনার কাঠামো ও রূপগুলো কেমন ছিল, সেই ধারণা আমাদের সীমিত ও গোলমেলে। গুরুশিষ্য পরম্পরার দৌলতে ধ্রুপদ খেয়াল ও ঠুংরির বেশ কিছু ‘গান’ দীর্ঘকাল থেকে গেলেও কালের স্রোতে সেগুলির মধ্যে নতুন নতুন উপাদান ঢুকে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। ঘরানার হেরফেরেও ‘গান’-এর রূপে, এমনকী ‘কথা’তেও পার্থক্য লক্ষ করা গিয়েছে।

স্বরলিপি না থাকায় আমাদের দেশের সংগীত ও সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। কেউ কেউ বলবেন, তা কেন, আমাদের সংগীতবিদ্যা তো গুরুমুখী। গুরুর মুখে শুনে শুনে ছাত্রছাত্রীরা চিরকাল শিখে যাবে। দীর্ঘকাল সেটাই হয়েছে। বাদ সেধেছে চলতি যুগ ও তার হালচাল। ভাল শিক্ষক এখন পাওয়া ভার। সংগীতশিক্ষক হিসেবে যে-সে বাজারে নেমে পড়েছে। কোনও কোনও নবীন শিল্পী আবার গানের বাজারে একটু নাম করে গিয়ে শিক্ষকতা করতে শুরু করেছেন। এঁদের কাছেই অনেকে যাচ্ছেন গান শিখতে। যা শিখছেন, তার নমুনা আমরা টেলিভিশন চ্যানেলে-চ্যানেলে পাচ্ছি। সকলেই এখন গায়ক-গায়িকা, সকলেই গীতিকার-সুরকার, যেন শিক্ষার, দক্ষতা অর্জনের কোনও প্রয়োজনই নেই বাংলা গানের ক্ষেত্রে।

স্বরলিপি করে রাখার রীতি থাকলেই যে কোনও গানের ঐতিহ্য সুরক্ষিত হবে, তার স্থিরতা নেই; অন্তত আমাদের বাংলায়। রবীন্দ্রনাথের গানের ওপর কপিরাইট উঠে যাওয়ার পর থেকে বিজ্ঞাপন-গান থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের গান ব্যবহার করা হচ্ছে। বেশির ভাগ এমন ভাবে, যেন তাঁর গান নিয়ে যথেচ্ছাচার না করলে আমাদের ফাঁসি হবে বা মাওবাদী হিসেবে জেলে পচতে হবে। 

একটি বাংলা ছায়াছবিতে ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’ গানটির সঙ্গে ‘হুল্লা হুল্লা’ ধ্বনি প্রযুক্ত হওয়ায় আমি কয়েক জন শিক্ষিত বাঙালি তরুণের কাছে কারণটা জানতে চেয়েছিলাম। তাঁদের কেউ কেউ আবার ছবিও করেন, অভিনয় করেন। উত্তর পেলাম কেন? ‘পাগলা হাওয়া’, ‘পাগল আমার মন’ এই সব কথা তো মূল গানেই আছে। পাগলা আর পাগল আছে, সুতরাং হুল্লা হুল্লা হুপ্ হুপ্। একই যুক্তিতে তা হলে ‘পাখি বলে চাঁপা’ গানটিতে কাক-সমেত নানা রকমের পাখির ডাক জুড়ে দেওয়া যেতে পারে। 

সংগীতে অশিক্ষিত, অদক্ষ, বেরসিক ও সাংস্কৃতিক গুন্ডাদের রাজত্ব প্রায় কায়েম হয়ে যাওয়ায় যা যা হওয়ার, হচ্ছে তাই-ই। কথায় কথায় আমরা যাঁদের উদাহরণ দিই, সেই সাহেবদের দেশে কেউ এক বার চেষ্টা করে দেখুন তো শুবার্টের আর্টসং, গার্শ্উইনের সুর করা গান, বের্টোল্ট ব্রেশ্টের লেখা কুর্ট ও ভাইল বা হান্স আইজ্লারের সুর করা গান নিয়ে সমকালীন বাঙালিসুলভ যথেচ্ছাচার করতে! 

স্বরলিপি থেকে নড়তে পারবেন না কেউ। মূল সুর নিয়ে বা মূল সুরের সঙ্গে নিজেদের খামখেয়াল জুড়ে কোনও গান রেকর্ড করা বা সেই গান কোনও ছায়াছবিতে প্রয়োগ করার কথা কেউ ভাবতেও পারবেন না। আর তার দরকারই বা কী। প্রয়োজন মতো নতুন গান বানিয়ে নিলেই তো হয় ।

শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যার বিচার অবিলম্বে শেষ করতে হবে:মোনায়েম সরকার

বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সফল অর্থমন্ত্রী, সাবেক কূটনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা শাহ এএমএস কিবরিয়া ২৭ জানুয়ারি, ২০০৫ রাত ৮টায় ঘাতকের গ্রেনেড হামলায় মৃত্যুবরণ করেন। সেই সময়টায় তিনি ব্যস্ত থাকতেন সিরডাপ ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবৃস্থার সংস্কার’ নিয়ে। বিভিন্ন পত্রিকায় তিনি এ নিয়ে সিরিয়াস লেখালেখি করছিলেন শেষের দিনগুলোতে। প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানও চেয়ে নিয়ে এ বিষয়ে তার একটি লেখা ছাপালেন শেষ যাত্রার আগের দিন।

আমি প্রস্তাব করেছিলাম, এ বিষয়ে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে একটা সেমিনার করার জন্য। তিনি রাজি হয়েছিলেন। তারপর সেমিনার পেপারও তৈরি করে ফেললেন। মস্তিষ্ক খুব সক্রিয় ছিল। ওই বয়সেও দ্রুত লিখতে পারতেন। তার ইংরেজি লেখাও ছিল চমৎকার। সারাজীবন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে ইংরেজি ভাষায় লিখতেন। অভ্যাসমতো তিনি ওই সেমিনার পেপারটিও বাংলা ও ইংরেজি দু’ভাষাতেই তৈরি করেছিলেন। ফোনে তার সঙ্গে সেমিনারের প্রস্তুতি নিয়েও কথা হল। কিন্তু সিরডাপ মিলনায়তনে ৩১ জানুয়ারি সেমিনার আর করা হল না। এর আগেই চিরবিদায় নিলেন শামস কিবরিয়া।
১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল শাহ এএমএস কিবরিয়ার নেতৃত্বে। তার ইচ্ছায় আমি ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক পদের দায়িত্ব নিই। ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার ১০ বছরে অসংখ্য সেমিনার করেছি তার নেতৃত্বে। মনোগ্রাম, পুস্তক-পুস্তিকাসহ ২৫টি বই প্রকাশিত হয়েছে ফাউন্ডেশন থেকে। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ওপর ২২ পর্বের সিডি-ডিভিডি নির্মিত হয়েছে। শামস কিবরিয়ার উৎসাহ ও প্রেরণায় বঙ্গবন্ধুর জীবনীগ্রন্থ প্রকল্পের পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজও সম্পন্ন করেছিলাম আমরা। বাংলা একাডেমির সঙ্গে চুক্তি মোতাবেক দেরিতে হলেও একাডেমি ২০০৮ সালের বইমেলায় গ্রন্থটি প্রকাশ করেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ (প্রতিরোধ শিবির, মুজিবনগর সরকার ও শরণার্থী শিবিরের) ওপর তিনটি থিমেটিক ম্যাপ, আরও কত কী! কত স্মৃতি, কত কথা! ভাবতে গেলে এই বয়সেও বার বার শিশুর মতো কেঁদে উঠি।
সফল আমলার জীবনশেষে ১৯৯১-এ তার আওয়ামী লীগে যোগদানের পেছনে আমারও বিশেষ ভূমিকা ছিল। শেখ হাসিনা তাকে দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য করতে দ্বিধা করেননি। তিনি সভানেত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা পদের দায়িত্বে আসীন হন তার মেধা ও প্রজ্ঞার গুণে। ১৯৯৬ ও ২০০১-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনায় দলের পক্ষ থেকে মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে আমিও নির্বাচন-পরিচালনা কাজে যুক্ত ছিলাম। সেই সময় রাষ্ট্রপতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে অধিকাংশ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে তার নেতৃত্বেই আমরা গিয়েছি। প্রেস মিট করেছি কতবার। দেখেছি তার বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য, বলার ও বোঝানোর ক্ষমতা। ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে এসে আওয়ামী লীগ তাকে অর্থমন্ত্রী বানিয়ে যে ভুল করেনি, তা প্রমাণ করেছেন তিনি। আমি অর্থনীতি ভালো বুঝি না। কিন্তু কিবরিয়া ভাই যখন বলতেন, পার্লামেন্টে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতেন কিংবা মৃদুভাষণে বসে বিভুরঞ্জন বা হাসান মামুনকে ব্রিফ করতেন, আমার কাছে খুব সহজবোধ্য মনে হতো।
মৃদুভাষণ বের করার সময় তিনি আমার ওপরই নির্ভর করলেন বেশি, বললেন- যাদের নেয়া হল, আপনিই তো তাদের ভালো করে চেনেন। আমি হয়তো কাজের মধ্য দিয়ে চিনব। তিনি অল্প দিনেই তাদের চিনলেন, তাদের যোগ্যতায় আস্থা রাখলেন। মৃদুভাষণ অফিসে এলে প্রায়ই আমাকে যেতে বলতেন। বিদেশে গেলে বলতেন, আপনি সব দেখবেন। নিজের চেয়ার দেখিয়ে বলতেন, আপনি এখানে বসবেন।
নিহত হওয়ার আগে কিবরিয়া ভাইয়ের শরীর ভালো যাচ্ছিল না। দেশে ও বিদেশে তার চিকিৎসা চলছিল। আমাদের উৎকণ্ঠা ছিল। আবারও নির্বাচনে দাঁড়ানোর দৃঢ় মনোভাব ছিল তার। আমি কিবরিয়া ভাইকে বলেছিলাম, নির্বাচন না করে ’৯৬ সালের মতো অর্থমন্ত্রী হতে পারেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সরকার সাহেব, এমপি না হয়ে মন্ত্রী হলে অন্যেরা করুণার দৃষ্টিতে দেখে।’
দেশ নিয়ে, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার গভীর উৎকণ্ঠা ছিল। তিনি বলতেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় সংস্কার না হলে জনগণ চাইলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যেতে পারবে না। হরতালে তার ব্যক্তিগত আপত্তি ছিল, তারপরও তিনি বলতেন- ওরা যা করছে তাতে হরতাল ছাড়া করবেনটা কী। বেগম জিয়ার সরকারকে তিনি বলতেন, ‘টেফ্লন সরকার’। বলতেন, এর গায়ে কোনো কিছুই যেন লাগছে না, সব পিছলে যাচ্ছে।
দেশে মৌলবাদী উত্থানের শংকা তার মনে ছিল পুরোপুরি। বলতেন, মোনায়েম সাহেব, আপনি তো গ্রামে যান না, তাই বুঝতে পারছেন না, ভেতরে ভেতরে কী সর্বনাশ হয়ে চলেছে। গ্রামগঞ্জে সন্ত্রাসী মৌলবাদীরা মসজিদ ও মাদ্রাসাভিত্তিক ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। ক্ষমতায় গেলেও আমরা এই নেতিবাচক পরিবর্তনের ধারা ঠেকাতে পারব কি না কে জানে। মাঝে মাঝে খুব হতাশও হয়ে পড়তেন। বলতেন, চলেন দেশ-টেশ ছেড়ে চলে যাই। ওরাই থাকুক এ দেশে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার জনসভায় বোমা হামলায় কিবরিয়া ভাইয়ের সতর্ক বাণীর কথা স্মরণ হয়েছিল।
কিন্তু তার কাজকর্মে হতাশার কোনো ছাপ দেখতাম না। দারুণ প্রত্যয়ী হয়ে তিনি লিখতেন, বক্তৃতা করতেন। হবিগঞ্জে জীবনের শেষ যে বক্তৃতা করেছেন, তাতেও রয়েছে সেই প্রত্যয়ী মনোভাব। ‘বাংলাদেশের সামাজিক বিবর্তন কি পশ্চাতমুখী?’ শিরোনামে তার শেষ যে অসমাপ্ত লেখাটি পাওয়া গেছে, তা পড়লে বোঝা যাবে তার উৎকণ্ঠা। দেশের মানুষও তো উৎকণ্ঠিত। মৃদুভাষণ লিখেছে- ‘উদ্বিগ্ন মানুষের পাশে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। তাকে বেশিদিন দাঁড়িয়ে থাকতে দেয়া হল না।’
কিন্তু দেখতে তো পাচ্ছি, শামস কিবরিয়ার মৃত্যু গোটা জাতিকেই কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বিদেশেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। তার মতো একজন সজ্জন মানুষকেও যদি এভাবে হত্যা করা হয়, তাহলে এ দেশে কে নিরাপদ? দেশের ভবিষ্যৎই বা কী? তার নৃশংস হত্যাকাণ্ডে উদ্বেলিত হয়েছে জাতি ও বিশ্ব জনমত। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নেমে এসেছে রাস্তায়। সরব প্রতিবাদও জানানো হয়েছে একের পর এক হরতাল করে। দেশের বিশিষ্টজনেরা নতুন করে নেমে এসেছিল প্রতিবাদে।
মেধাবী ছাত্র, রাষ্ট্রদূত, পররাষ্ট্র সচিব, অর্থনীতিবিদ, সাবেক অর্থমন্ত্রী এসব অভিধা ছাড়িয়ে তিনি একজন প্রাজ্ঞ দেশপ্রেমিক রাজনীতিক ও দার্শনিক হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। তাই মানুষের শোকে-অশ্র“তে মহীয়ান হয়ে উঠেছে কিবরিয়া ভাইয়ের আত্মদান। আমরা তার প্রিয়জনেরাও শোক ভুলে আত্মশক্তিতে বলীয়ান হওয়ার অবকাশ পাচ্ছি যেন।
কিবরিয়া পরিবারের সদস্য, বিশেষ করে আসমা ভাবী, ড. রেজা ও ড. নাজলী শোককে শক্তিতে পরিণত করে দেশে-বিদেশে যে সাহসী প্রতিবাদী ভূমিকা রাখছেন- তা কিবরিয়া ভাইয়ের আপসহীন সংগ্রামী ভূমিকারই প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। 

স্ট্র্যাটেজিক কারণেই আমেরিকা বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী : কে কে গঙ্গোপাধ্যায়


শেখ হাসিনা বাংলাদেশে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রীরূপে শপথগ্রহণ করলেন।এই নির্বাচনের পথ পাড়ি দেয়া মোটেই সহজ ছিল না। আগামী দিনেও শাসনক্ষমতা পরিচালনা করা সহজ হবে বলে মনে হয় না। 

কারণ বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বেগম খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) নির্বাচন প্রক্রিয়া চলাকালীন প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার সরে যাওয়া এবং নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দ্বারা ওই সময় সরকার এবং নির্বাচন পরিচালনা করার দাবিতে, নির্বাচন বানচাল করার সব রকম প্রয়াস করেছেন।

এ কাজে তিনি ব্যবহার করেছেন জামায়াত, হেফাজতে ইসলাম ইত্যাদি ধর্মীয় কট্টরপন্থী সংগঠনকে। এই দলগুলো পাকিস্তানপন্থী। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সরকারের দমননীতির এরা সহযোগী ছিলেন। লাখ লাখ নিরপরাধ সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিদগ্ধ সমাজের জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিদের এরা নৃশংসভাবে কতল করেছিল। আন্তর্জাতিক আদালতে তাদের বিচার চলছে। তাদের এক প্রধান কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে। বিস্ময়ের ব্যাপার ব্রিটিশ এবং মার্কিন সরকার এই রায় কার্যকর না করার জন্য শেখ হাসিনা সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছিল।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে এই বিএনপি সমর্থিত কট্টরপন্থীরা দেশব্যাপী সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিল সংখ্যাঘু সম্প্রদায়সহ বহু মানুষকে হত্যা, বাড়ি, দোকান বাজার লুট, বিভিন্ন গ্রামে, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে, রাস্তা অবরোধ, বাস অটো জ্বালিয়ে দেশব্যাপী সন্ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। বিএনপি নির্বাচন বয়কট করে কোনস্থানেই প্রার্থী দেয়নি।

কিন্তু শেখ হাসিনা তাঁর সঙ্কল্পে অনড়, অটল ছিলেন। অনন্ত সাহস এবং ধৈর্যের সঙ্গে তিনি পরিস্থিতির মোকাবেলা করেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া চলবে। তিনি ঘোষণা করেছিলেন এবং বিশেষ সুরক্ষার ব্যবস্থা করে নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে করতে নির্বাচন কমিশনকে সর্বপ্রকার সহায়তা করেন। ফলে ১৫০টির অধিক আসনে আওয়ামী লিগ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করে। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে।
ধারণা করা অবাস্তব হবে না, আগামী দিনে বেগম খালেদা জিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় জামায়াত এবং হেফাজতে ইসলাম ইত্যাদি সংগঠন প্রতি পদে সমগ্র রাষ্ট্রে অরাজকতা সৃষ্টি করে চলবে। প্রধানমন্ত্রীকে কঠোর হস্তে আইনের শাসন বলবত করতে হবে। এই ধর্মীয় কট্টরপন্থী সংগঠনগুলো পাকিস্তানের সর্ববিধ সাহায্য এবং সমর্থন লাভ করে চলেছে। এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কয়েকটি ধনী ইসলামিক রাষ্ট্র এদের বিভিন্ন এনজিও মারফত অর্থ সাহায্য দিয়ে চলেছে। তাদের উদ্দেশ্য আবার একটু ভিন্ন। যেমন বাংলাদেশে কট্টর ইসলামিক সরকার যাতে ক্ষমতায় আসতে পারে তার প্রয়াস করা। বিশেষ করে বাংলাদেশী সাহিত্য সংস্কৃতির যে ঐতিহ্য এবং ভা-ার বাংলাদেশে বর্তমান, তা ধ্বংস করে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের জায়গায় একমাত্র ইসলামিক জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ থেকে যত বেশি সংখ্যায় সম্ভব ইসলাম ধর্মীয় ব্যক্তিদের ভারতে অনুপ্রবেশ ঘটানোর ব্যবস্থা করা। ফলে ভবিষ্যতে এমন একদিন আসবে, যেদিন ভারতবর্ষে মুসলমান সম্প্রদায় প্রধান জনগোষ্ঠী হয়ে দেখা দেয়।সেজন্য দরিদ্র, ভূমিহীন, শিক্ষাহীন বাংলাদেশীদের হাতে মোটা টাকা এককালীন দান হিসাবে ধরিয়ে দিয়ে ভারতে তাদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে দেয়া। ভারতে জমি কিনে ঘর করে তারা ভারতীয় হয়ে বসবাস আরম্ভ করবে। বাংলাদেশ সরকার তাদের আর কোনদিন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করবে না। এই বিষয় সেই সব অনুপ্রবেশকারীদের প্রথম থেকেই বুঝিয়ে দেয়া হয়।

ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে ভোটে জয়লাভই প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য। সে কারণে সেই সব দলের সদস্যরা বিভিন্ন প্রশংসাপত্র জুগিয়ে দিয়ে এদের হাতে ভোটার কার্ড ধরিয়ে দিতে কাল হরণ করেন না। একটাই শর্ত, আগামী নির্বাচনে সেই দলের প্রতীক চিহ্নে ভোট দিতে হবে। অন্যায়ভাবে ভারতে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার অনেক প্রয়াস থমকে গিয়েছে। কারণ ভোটার পরিচিতি কার্ড দেখানোর পর প্রশাসন কোন কিছু করার পথ খুঁজে পাচ্ছে না। এই সব রাজনৈতকি দলের কাছে ভোটে জয়লাভই একমাত্র লক্ষ্য রাষ্ট্রের উন্নয়ন, অনুন্নয়ন, সুরক্ষা, অসুরক্ষা কোন ধর্তব্যের বিষয় নয়। শুধু এই রাজ্যই নয়, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে, এমনকি জম্মু কাশ্মীর রাজ্যেও এমন ভোটার পাওয়া যাবে বলেই আমার বিশ্বাস।
পাকিস্তান আজও মনে করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামী মানুষ পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান বিভাজিত করে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি করেননি, ভারতীয় সামরিক বাহিনীই এই অবস্থার জন্য দায়ী। অতএব তারা বাংলাদেশের জন্মাবধি সেই রাষ্ট্রে দেশদ্রোহী, পাকিস্তানপন্থীদের সর্বতোভাবে সাহায্য এবং সমর্থন দিয়ে এসেছে, আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন সেই সব কট্টরপন্থী, সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলোকে সমর্থন করে চলেছে, বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন রয়েছে পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। পাক-মার্কিন সম্পর্ক সেই সিয়েটোসেন্টো চুক্তির আমল থেকে চলে আসছে। ভারত জোটনিরপেক্ষ নীতির বিশ্বাসী কিন্তু মার্কিন সরকার অস্ত্র উপকরণ বিক্রয়ে আপেক্ষিক মূল্য ছাড়াও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দানে যেমন ভারতে সেইসব অস্ত্র নির্মাণের লাইসেন্স দেয়া ইত্যাদি বিষয়ে অনীহা প্রদর্শন করায় বাধ্য হয়ে ভারতকে সোভিয়েত ইউনিয়নের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। অতএব পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার এবং ভারত শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে একটি বাজার মাত্র। এমনকি পরমাণু চুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের চুক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট সাহায্য করা সত্ত্বেও ভারত নতুন পরমাণু চুক্তির বরাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দেয়নি। বিদেশী মূলধনের বিনিয়োগের বিষয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আশানুরূপ সুযোগ পায়নি। এর কারণ ভারতের প্রবল বিরুদ্ধ জনমত।


এইসব কারণে পাকিস্তানের ভারতের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধের বিশেষ করে কট্টর জিহাদী সংগঠন, আইএসআই এবং পাক সামরিক বাহিনীর সাহায্যের (২৬/১১ সমেত), অকাট্য প্রমাণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেখতে পায়নি। যদিও হেডলি গ্রেফতার হয়ে তাদেরই হেফাজতে রয়েছে বহুদিন। বর্তমানে চীন সমগ্র দক্ষিণ চীনসমুদ্র তাদের রাষ্ট্রীয় পরিধির অঞ্চল বলে অভিহিত করেছে। জানিয়েছে, ওই অঞ্চল তাদের প্রতিরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। সেনকাকুু দ্বীপগুলোর মালিকানা নিয়ে জাপান ও চীনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম সীমায় পৌঁছেছে। স্বভাবতই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের সমর্থনে আসরে পদার্পণ করেছে। এমতাবস্থায় “দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রের সংগঠন” (এ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ ইস্ট এশিয়ান নেশনস) যথেষ্ট সঙ্কটের সম্মুখীন। এই অঞ্চলে তারা কোনভাবেই বৃহৎ শক্তির রেষারেষি পছন্দ করছে না।

বাংলাদেশ ভূখন্ড ভৌগোলিক দিক দিয়ে এই অঞ্চলের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের নিরাপত্তার চুক্তি রয়েছে। চীন তার রাষ্ট্রীয় সীমার চারদিকে বিভিন্ন রাষ্ট্রে অর্থ সাহায্য এবং উন্নয়নের সহায়তা করে তাদের উপস্থিতি এবং প্রভাব বাড়িয়েছে। এমতাবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ ভূখন্ডে তাদের উপস্থিতি এবং প্রভাব বিস্তার করতে আগ্রহী কিন্তু এ কাজটি খুবই সহজ হয়ে যায় যদি জামায়াত সমর্থন নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারে।


এই সমস্ত কিছু বিবেচনা করলেই কী কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনা সরকারকে পুনর্নির্বাচনে যাওয়ার উপদেশ দিয়েছেন, তা কিছুটা পরিষ্কার হবে। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকার সেইসব উপদেশে কর্ণপাত করেনি। আগামী দিনে বিএনপি এবং জামায়াত সম্মিলিতভাবে এই সরকারকে গদিচ্যুত করার জন্য কী ধরনের আন্দোলনে নামবে, সে চিন্তাও তারা করেননি। তারা কঠোর হস্তে সেইসব অপচেষ্টার মোকাবেলা করতে বদ্ধ পরিকর।

আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশের মুক্তিসেনা ও তাঁদের সমর্থকরা শেখ হাসিনাকে শক্তি যোগাবে। ইতোমধ্যে ভারত এবং রাশিয়া শেখ হাসিনা সরকারকে সমর্থন জানিয়েছে। দেখা যাক কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

লেখক : ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল

যুদ্ধাপরাধ বিচার ও নতুন ষড়যন্ত্র : তুরিন আফরোজ


একাত্তরে সংঘটিত অপরাধের বিচার চেয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে গত ১৫ জানুয়ারি মামলা করেছে প্রজন্ম ’৭১ নামের একটি বাংলাদেশী সংগঠন।

বাংলাদেশে আমরা যে ‘প্রজন্ম ’৭১-কে চিনি, যার সভাপতি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেনের পুত্র সাংবাদিক শাহীন রেজা নূর, যে সংগঠনকে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ ২০০০ সালে ‘জাহানারা ইমাম স্মৃতি পদক’-এ সম্মানিত করেছে ,এটি সেই সংগঠন নয়

অপরাধের বিচার দাবি করা, যে কোন সভ্য সমাজেরই নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। আর সেখানে অপরাধটি যদি হয় গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ তাহলে সামাজিক-রাজনৈতিক কোন রকম আপোসের প্রশ্নই আসে না। এ সকল ঘৃণ্য অপরাধের বিচার হওয়া মানব সভ্যতার জন্য অপরিহার্য।
কিন্তু বিচার দাবি করাটাই যদি কোন ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের অংশ হয়ে দাঁড়ায়, আইনী জটিলতার সুযোগ নিয়ে প্রকৃত অপরাধী ব্যক্তি বা সংগঠনের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন ভূলুন্ঠিত হয় মানবতা, সফল হয় অপরাধী-চক্রান্ত।
বিজয় লাভের পর থেকেই বাংলাদেশের জনগণ একাত্তরের সংঘটিত অপরাধের বিচার দাবি করে আসছে। এই দাবিকে সত্য মেনে প্রণীত হয়েছে ১৯৭২ সালের দালাল আইন এবং ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আইন।

১৯৭২-এ গঠিত হয়েছে দালাল আইনের অধীনে বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। বাংলাদেশ রাষ্ট্র শুধু আইন প্রণয়ন এবং ট্রাইব্যুনাল গঠন করেই থেমে থাকেনি, বরং দৃঢ়তার সঙ্গে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করে প্রমাণ করেছে এই বিচার বিষয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র জোর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

পঁচাত্তরপরবর্তী রাজনৈতিক মেরুকরণে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে বাধ্য করা হয়েছে যুদ্ধাপরাধ বিচারের অঙ্গীকার থেকে সরে দাঁড়াতে। রাজনৈতিক পরিম-লে যুদ্ধাপরাধী চক্রের পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধ বিচারের দাবিটিকে ‘সামগ্রিক বিস্মৃতি’ এর অন্তরালে পর্যবশিত করার পুরোদস্তুর প্রয়াস চালানো হয় বছরের পর বছর।

 ধ্বংস করা হয় প্রয়োজনীয় দলিলপত্র, নিপীড়ন চালানো হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর, জাতিগত মগজ ধোলাইয়ের উদ্দেশ্যে একাত্তরের ইতিহাসকে পাল্টে ফেলার নগ্ন-ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র চালানো হয়।

১৯৯২ সালে ‘শহীদ জননী জাহানারা ইমামের আন্দোলন’ সময়ের গতি পাল্টে দেয়। ‘গণআদালত’ থেকে যুদ্ধাপরাধ বিচারের দাবিটি আবারও ইতিহাসের রাজপথে নতুন স্লোগানের জন্ম দেয়, নতুন আবেগ নিয়ে আবির্ভূত হয়।
 কিন্তু থেমে থাকেনি বিচারবিরোধী চক্রান্ত। নিত্য নতুন কৌশল নিয়ে যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে তারা একের পর এক মারণাস্ত্র ব্যবহার করে আসছে।

॥ ষড়যন্ত্র ১৯৯৩ ॥

গণআদালতের অব্যাবহিত পরই হঠাৎ করে দেখা যায় দেশজুড়ে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিরুব্ধে একের পর এক ফৌজদারী আইনে মামলা করা হচ্ছে। এই তৎপরতায় অনেকেই যারপরনাই খুশি হলেন, ভাবলেন এই তো বেশ বিচার শুরু হয়ে গেছে।
 কিন্তু এই পুরো ব্যাপারটিই ছিল একটি গভীর চক্রান্তের অংশ। ফৌজদারী আইনের অধীনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে প্রচুর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মামলা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, এমনও হতে পারে যে একজন প্রকৃত অপরাধী বেকসুর খালাস পেয়ে যাচ্ছে। সুতরাং যুদ্ধাপরাধীরা নিজেদের লোক দিয়ে মামলা করিয়ে একবার খালাস পেয়ে গেলে তাদের আর পুনর্বার বিচারের সুযোগ থাকবে না। এতে লাভ অনেক  বিচারের নামে বিচারও হলো, আবার সসম্মানে খালাসও পেল। দায়মুক্তির এর চাইতে বেশি ভাল কৌশল আর কি-ই বা হতে পারে? 
জাহানারা ইমামের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সামাজিক প্রতিহতকরণ ও জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে এই ‘পাইকারী দরে’ ফৌজদারী আইনের অধীনে মামলা দায়ের করার ষড়যন্ত্রকে নস্যাত করা হয়েছে।

॥ ষড়যন্ত্র ২০০৬ ॥

এর পর যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয় দেশের বাইরে থেকে। রেমন্ড সোলেমান নামে এক অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী যুবক হঠাৎ করে অস্ট্রেলিয়ার আদালতে বাংলাদেশে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার চেয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে বসে। আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি বেশ দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এরূপ মামলা দায়ের করায় প্রবাসী স্বঘোষিত আন্তর্জাতিক আইন বিশারদ একজন তো সোলেমানকে ‘বাঘের বাচ্চা’ নামে অভিহিত করে ফেললেন, তাঁর পক্ষে আন্তর্জাতিক প্রচারণাও চালিয়ে গেলেন।
বললেন, নির্মূল কমিটি যা পারেনি, অস্ট্রেলিয়ার এক বাঙালী যুবক তা করে দেখিয়েছে।

 কিন্তু ষড়যন্ত্রটি ছিল অন্যরকম। কোনভাবে অস্ট্রেলিয়ার আদালত থেকে মামলাটি খারিজ করাতে পারলে প্রতিষ্ঠিত হবে যে, একাত্তরে পাকিস্তান বাংলাদেশে কোন যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করেনি। এতে লাভবান হবে দু’পক্ষ ।
এক, পাকিস্তান রাষ্ট্র কলঙ্কমুক্ত হবে; দুই, পাকিস্তান রাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধী বাংলাদেশী দোসররা পাবে দায়মুক্তি। এখতিয়ার বহির্ভূত হওয়ার কারণে মামলাটি অস্ট্রেলিয়ার কোর্ট গ্রহণ না করে ফেরত দিয়ে দেয়ায় সেই ষড়যন্ত্রটি সফলতার মুখ দেখতে ব্যর্থ হয়।
মজার ব্যাপারটি হলো, পরে অনুসন্ধান করে জানা যায়, এই সোলেমান ছিল একজন শিবিরকর্মী এবং আইএসআই-এর মদদপুষ্ট এবং অর্থাশ্রিত তথাকথিত ‘বাংলাদেশপ্রেমী’(!)।
 আর সেই যে আন্তর্জাতিক আইন বিশারদ যিনি সারাবিশ্বে ‘বাঘ মামা’ হয়ে সোলেমানের দায়েরকৃত মামলার পক্ষে ব্যাপক জনপ্রচারণা চালালেন, তিনি পরবর্তীতে ‘স্কাইপি কেলেঙ্কারির’ অন্যতম নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হলেন।

॥ ষড়যন্ত্র ২০০৯ ॥

২০০৮ সালের নির্বাচনপরবর্তী সময়ে যখন যুদ্ধাপরাধ বিচারের ইস্যুটি বাংলাদেশে নতুন গতি পায় ঠিক তখনই শুরু হলো আরেক নতুন ষড়যন্ত্র। এবার যুদ্ধাপরাধ বিচারবিরোধীরা নামল নতুন দাবিতে বিচার হলে তা করতে হবে ওঈঈ-তে।
সুতরাং রোম স্ট্যাটিউটে বাংলাদেশকে পক্ষ বানিয়ে ওঈঈ-তে বিচার না করা গেলে নাকি কোন বিচারই হবে না, ‘আন্তর্জাতিক মান’ লঙ্ঘিত হবে। সোলেমানের সেই ‘বাঘ মামা’-কে হঠাৎ দেখা গেল ঘন ঘন বাংলাদেশে আগমন করতে। উদ্দেশ্য একটাই - দেশীয় ট্রাইব্যুনাল নয়, বরং ওঈঈ-তে যেন যুদ্ধাপরাধ বিচারটি করা হয়।
 বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমন্ডলে জামায়াত-বিএনপি জোটও একই দাবি তুললো। তৎকালীন বিরোধীদলীয় অনেক প্রথিতযশা আইনজীবীকেও দেখা গেল নির্ভাবনায় দাবি জানাতে যেন ওঈঈ-তে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করা হয়। আর শুরু না হওয়াতে দেশে-বিদেশে সরকার পতনের আন্দোলনকে গতিশীল করার চেষ্টা চালানো হয়। 

কিন্তু একবার ভেবে দেখুন, ওঈঈ-র কোন এখতিয়ার নেই ২০০২ সালের ১ জুলাইয়ের পূর্বে সংঘটিত কোন অপরাধের বিচার করার। তাহলে ১৯৭১-এ সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার কি করে ওঈঈ-তে করা সম্ভব? একটি অর্থহীন অবাস্তব দাবিকে সামনে রেখে যুদ্ধাপরাধ বিচারকে নস্যাত করাই ছিল এই ষড়যন্ত্রের মূল লক্ষ্য।

॥ ষড়যন্ত্র ২০১৪ ॥

গত ১৫ জানুয়ারি হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একাত্তরের অপরাধের বিচার চেয়ে অভিযোগ এনেছে প্রজন্ম ’৭১ নামক সংগঠনটি। 

মামলার কপি ১৯ জানুয়ারি জাতিসংঘ অফিস নেদারল্যান্ডের দূতাবাসে দেয়া হয়েছে। (জনকণ্ঠ, ২৩ জানুয়ারি, ২০১৪, পৃষ্ঠা-১, কলাম-২) ঐ একই তারিখে (১৯ জানুয়ারি) জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমেদ এক বিবৃতিতে জানান যে, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল বাংলাদেশের ভূখন্ডের বাইরে কোথাও নতুন করে গঠন করার পদক্ষেপ নিতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। (প্রথম আলো, ২১ জানুয়ারি, ২০১৪, পৃষ্ঠা-১৪, কলাম-৮)

ঘটনাপ্রবাহে প্রতীয়মান হয় যে, গত ১৯ জানুয়ারি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মহলে একই সঙ্গে দুটো সংগঠন (প্রজন্ম ’৭১ ও জামায়াতে ইসলামী) বাংলাদেশে সংঘটিত একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের আন্তর্জাতিক বিচার এবং এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপ দাবি করেছে। বিশ্বাস করার জন্য ঘটনাটি খুব বেশি কাকতালীয়। তবে এটুকু নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, যে দাবিটি প্রজন্ম ’৭১ তুলেছে তা দূরভিসন্ধিমূলক। 
কারণ—
প্রথমত,
প্রজন্ম ’৭১ নামক সংগঠনটি পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিচার চেয়ে কোন দাবি এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অধীনে গঠিত তদন্ত সংস্থা, প্রসিকিউসন টিম বা মাননীয় ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছে বলে আমার জানা নেই।
উপরন্তু ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন রায়ে মাননীয় ট্রাইব্যুনাল স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছে যে, ১৯৭৩ সালের আইনের অধীনে পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা সম্ভব। কাদের মোল্লার আপীলের রায়েও একই সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।
ইতোমধ্যে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়ে তদন্তের কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের মাধ্যমে গঠিত তদন্ত সংস্থা এবং প্রসিকিউসন টিম। এই মর্মে বিশদ রিপোর্টও প্রকাশিত হয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে (উযধশধ ঞৎরনঁহব, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৪, পৃষ্ঠা-১, কলাম-৬)।
সুতরাং দেশীয় একটি তদন্ত ও বিচারিক কাঠামো বহাল থাকা অবস্থায় এবং সেখানে তদন্ত কাজ শুরু হওয়ার পরও কেন তারা ওঈঈ-তে মামলা দায়ের করতে গেলেন এটা মোটেও সুস্পষ্ট নয়।
দ্বিতীয়ত
ওঈঈ-তে যেখানে ২০০২ সালের ১ জুলাইয়ের পূর্বে সংঘটিত অপরাধের বিচার কোনক্রমেই সম্ভব নয়, সেখানে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবিতে ওঈঈ-তে মামলা করার মানেই হলো মূলত এই বিষয়ে আমাদের দেশীয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত ও মামলার অগ্রগতিকে অযাচিতভাবে প্রতিহত করা; অনর্থক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা; নতুবা নিহায়ত পক্ষে ওঈঈ-তে আন্তর্জাতিক বিচারের ধুয়া তুলে দেশীয় তদন্ত ও মামলার কাজকে দীর্ঘায়িত করা।
তৃতীয়ত
বাংলাদেশে চলমান নিরপেক্ষ ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ার দাবি জানানো বা ঐ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করা হলো বাংলাদেশে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকীস্বরূপ। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী এ ধরনের কর্মকান্ড  রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। অবিলম্বে এ ধরনের ষড়যন্ত্র প্রয়াস নস্যাত করা জরুরী।

লেখক : আইন সম্পাদক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি —

Friday, January 24, 2014

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯০ তম জন্মবার্ষিকীতে বিনম্র অভিবাদন- সুমি খান





হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন;-
তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,
পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ
পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।
কাটাইনু বহু দিন সুখ পরিহরি।
অনিদ্রায়, নিরাহারে সঁপি কায়, মনঃ,
মজিনু বিফল তপে অবরেণ্যে বরি;-
কেলিনু শৈবালে; ভুলি কমল কানন!
স্বপনে তব কুললক্ষ্মী কয়ে দিলা পরে—
“ওরে বাছা, মাতৃকোষে রতনের রাজি,
এ ভিখারী-দশা তবে কেন তোর আজি?
যা ফিরি, অজ্ঞান তুই যারে ফিরি ঘরে!”
পালিলাম আজ্ঞা সুখে; পাইলাম কালে
মাতৃভাষা-রূপে খনি, পুর্ণ মণিজালে।।

 বাংলা ভাষার প্রথম এই চতুর্দশপদী কবিতা বা সনেটের স্রষ্টা  মহাকবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত  বাংলা ভাষায় সনেট ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক । ঊনবিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি কবি ও নাট্যকার তথা বাংলার নবজাগরণ সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা  এ ব্যক্তিত্ব অবিভক্ত বাংলার যশোহর জেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে অবস্থিত সাগরদাঁড়ি গ্রামে   ২৫ জানুয়ারি, ১৮২৪ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। ২৯ জুন, ১৮৭৩ মাত্র ৪৯ বছর বয়সে কলকাতায় কপর্দকশূন্য করুণ অবস্থায় মৃত্যু হয় এই মহাকবির। তাঁর ছদ্মনাম ছিল টিমোথি পেনপোয়েম ।
তিনি ছিলেন রাজনারায়ণ বসু ও তাঁর প্রথমা পত্নী জাহ্নবী দেবীর একমাত্র সন্তান। রাজনারায়ণ বসু ছিলেন কলকাতার সদর দেওয়ানি আদালতের খ্যাতনামা উকিল। মধুসূদনের যখন সাত বছর বয়স, সেই সময় থেকেই তাঁকে কলকাতায় বসবাস করতে হত। খিদিরপুর সার্কুলার গার্ডেন রিচ রোডে (বর্তমানে কার্ল মার্কস সরণী) অঞ্চলে তিনি এক বিরাট অট্টালিকা নির্মাণ করেছিলেন।
মহাকবির জন্মস্থান 
 প্রায় দু'শো বছর আগে অসাম্প্রদায়িকতার  এক বিরল দৃষ্টান্ত  মধুসূদনের প্রাথমিক শিক্ষা তাঁর মা জাহ্নবী দেবীর কাছে। জাহ্নবী দেবীই তাঁকে রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ প্রভৃতির সঙ্গে সুপরিচিত করে তোলেন। সাগরদাঁড়ির পাশের গ্রাম শেখপুরা মসজিদের ইমাম মুফতি লুৎফুল হকের কাছে তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। বিদ্বান ইমামের কাছে তিনি বাংলা, ফারসী ও আরবি পড়েছেন।  এভাবেই  সাগরদাঁড়িতেই এক অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে মধুসূদনের বাল্যকাল অতিবাহিত হয়।
তেরো বছর বয়সে মধুসূদন কলকাতায় আসেন। স্থানীয় একটি স্কুলে কিছুদিন পড়ার পর তিনি তদনীন্তন হিন্দু কলেজে (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন।

মধুসূদন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তাই অচিরেই কলেজের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন ডি. এল. রিচার্ডসনের প্রিয় ছাত্র হয়ে ওঠেন। রিচার্ডসন মধুসূদনের মনে কাব্যপ্রীতি সঞ্চারিত করেছিলেন। হিন্দু কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক ডিরোজিওর স্বদেশানুরাগের স্মৃতিও তাঁকে বিশেষ উদ্বুদ্ধ করত। এছাড়া কলেজে তাঁর সহপাঠী ছিলেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজনারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক, প্যারীচরণ সরকার প্রমুখ ঊনবিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। আঠারো বছর বয়সেই মহাকবি হওয়ার ও বিলাতে যাওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাঁর মনে বদ্ধমূল হয়ে যায়।


১৮৪৩ সালে রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিকট মধুসূদন খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। এরপর ওই বছরই ১৩ ফেব্রুয়ারি মিশন রো-তে অবস্থিত ওল্ড মিশন চার্চ নামে এক অ্যাংলিক্যান চার্চে গিয়ে তিনি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁকে দীক্ষিত করেছিলেন পাদ্রী ডিলট্রি। তিনিই তাঁর "মাইকেল" নামকরণ করেন। মধুসূদন পরিচিত হন "মাইকেল মধুসূদন দত্ত" নামে।

 তাঁর এই ধর্মান্তর সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। রাজনারায়ণ দত্ত ধর্মত্যাগী পুত্র মধুসুদন কে  ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন। খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের পর মধুসূদন শিবপুরের বিশপস কলেজে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যান। এখানে তিনি গ্রিক, লাতিন, সংস্কৃত প্রভৃতি ভাষা শিক্ষা করেন। রাজনারায়ণ বসু তাঁকে পরিত্যাগ করলেও, বিশপস কলেজে পড়াশোনার ব্যয়ভার বহন করছিলেন। চার বছর পর তিনি টাকা পাঠানো বন্ধ করেন। বিশপস কলেজে কয়েকজন মাদ্রাজি ছাত্রের সঙ্গে মধুসূদনের বন্ধুত্ব হয়েছিল। বিশপস কলেজে অধ্যয়ন শেষ করে যখন কলকাতায় চাকরির চেষ্টা করে ব্যর্থ হন মধুসূদন। তখন তাঁর সেই মাদ্রাজি বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ্যান্বেষণে মাদ্রাজে (অধুনা চেন্নাই) চলে যান মধুসূদন। কথিত আছে, আত্মীয়স্বজনের অজ্ঞাতসারে নিজের পাঠ্যপুস্তক বিক্রি করে সেই টাকায় মাদ্রাজ গিয়েছিলেন তিনি।
মাদ্রাজেও বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারেননি মধুসূদন। স্থানীয় খ্রিষ্টান ও ইংরেজদের সহায়তায় তিনি একটি স্কুলে ইংরেজি শিক্ষকের চাকরি পান। তবে বেতন যা পেতেন, তাতে তাঁর ব্যয়সংকুলান হত না। এই সময় তাই তিনি ইংরেজি পত্রপত্রিকায় লিখতে শুরু করেন। মাদ্রাজ ক্রনিকল পত্রিকায় ছদ্মনামে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। হিন্দু ক্রনিকল নামে একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু অল্পকালের মধ্যেই অর্থাভাবে পত্রিকাটি বন্ধ করে দিতে হয়। পঁচিশ বছর বয়সে নিদারুণ দারিদ্র্যের মধ্যেই তিনি দ্য ক্যাপটিভ লেডি তাঁর প্রথম কাব্যটির রচনা করেন। কবি ও দক্ষ ইংরেজি লেখক হিসেবে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।
মাদ্রাজে আসার কিছুকাল পরেই মধুসূদন রেবেকা ম্যাকটিভিস নামে এক ইংরেজ যুবতীকে বিবাহ করেন। উভয়ের দাম্পত্যজীবন সাত বছর স্থায়ী হয়েছিল। রেবেকার গর্ভে মধুসূদনের দুই পুত্র ও দুই কন্যার জন্ম হয়। মাদ্রাজ জীবনের শেষ পর্বে রেবেকার সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়ার অল্পকাল পরে মধুসূদন এমিলিয়া আঁরিয়েতা সোফিয়া নামে এক ফরাসি তরুণীকে বিবাহ করেন। আঁরিয়েতা মধুসূদনের সারাজীবনের সঙ্গিনী ছিলেন।

এদিকে মাইকেল তাঁর এক কপি দ্য ক্যাপটিভ লেডি বন্ধু গৌরদাস বসাককে উপহার পাঠালে, গৌরদাস সেটিকে জে ই ডি বেথুনের কাছে উপহার হিসেবে পাঠান। উক্ত গ্রন্থ পাঠ করে অভিভূত বেথুন মাইকেলকে চিঠি লিখে দেশে ফিরে আসতে এবং বাংলায় কাব্যরচনা করতে পরামর্শ দেন।
১৮৫৬ সালে মধুসূদন কলকাতায় ফিরে আসেন। পত্নীকে সেই সময় তিনি সঙ্গে আনেননি। তাঁর বংশধরদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিখ্যাত টেনিস খেলোয়াড় লিয়েন্ডার পেজ ।

মধুসূদন দত্ত নাট্যকার হিসেবেই প্রথম বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে পদার্পণ করেন। রামনারায়ণ তর্করত্ন বিরচিত 'রত্নাবলী' নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যে উপযুক্ত নাটকের অভাব বোধ করেন। এই অভাব পূরণের লক্ষ্য নিয়েই তিনি নাটক লেখায় আগ্রহী হয়েছিলেন। ১৮৫৯ খৃস্টাব্দে তিনি রচনা করেন ‘শর্মিষ্ঠা' নাটক। এটিই প্রকৃত অর্থে বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক নাটক। ১৮৬০ খৃস্টাব্দে তিনি রচনা করেন দুটি প্রহসন, যথা: 'একেই কি বলে সভ্যতা' এবং 'বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ' এবং পূর্ণাঙ্গ 'পদ্মাবতী' নাটক। পদ্মাবতী নাটকেই তিনি প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন। ১৮৬০ খৃস্টাব্দেই তিনি অমিত্রাক্ষরে লেখেন 'তিলোত্তমাসম্ভব' কাব্য। এরপর একে একে রচিত হয় 'মেঘনাদ বধ কাব্য' (১৮৬১) নামে মহাকাব্য, 'ব্রজাঙ্গনা' কাব্য (১৮৬১), 'কৃষ্ণকুমারী' নাটক (১৮৬১), 'বীরাঙ্গনা' কাব্য (১৮৬২), চতুর্দশপদী কবিতা (১৮৬৬)।

বাংলা নাটকে মাইকেল মধুসূদনের আবির্ভাব আকস্মিক। ১৮৫২ সালে তারাচরণ শিকদার, জে. সি. গুপ্ত ও রামনারায়ণ তর্করত্নের হাত ধরে বাংলায় শৌখিন রঙ্গমঞ্চে নাট্য মঞ্চায়ন শুরু হয়। এই সময় লেখা নাটকগুলির গুণগত মান খুব ভাল ছিল না। ১৮৫৮ সালে পাইকপাড়ার জমিদার ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ ও প্রতাপচন্দ্র সিংহের পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতার বেলগাছিয়া নাট্যমঞ্চে রামনারায়ণ তর্করত্নের রত্নাবলী নাটকটি অভিনীত হয়। শিল্পগুণবিবর্জিত এই সাধারণ নাটকটির জন্য জমিদারদের বিপুল অর্থব্যয় ও উৎসাহ দেখে মধুসূদনের শিক্ষিত মন ব্যথিত হয়ে ওঠে। এরপর তিনি নিজেই নাট্যরচনায় ব্রতী হন। রামনারায়ণ তর্করত্নের সংস্কৃত নাট্যশৈলীর প্রথা ভেঙে তিনি পাশ্চাত্য শৈলীর অনুসরণে প্রথম আধুনিক বাংলা নাটক রচনা করেন।
মাইকেল মধুসূদনের নাট্যচর্চার কাল ও রচিত নাটকের সংখ্যা দুইই সীমিত। ১৮৫৯ থেকে ১৮৬১ - এই তিন বছর তিনি নাট্যচর্চা করেন। এই সময়ে তাঁর রচিত নাটকগুলি হল: শর্মিষ্ঠা (১৮৫৯), একেই কি বলে সভ্যতা (১৮৬০), বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ (১৮৬০), পদ্মাবতী (১৮৬০), কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১)।
এছাড়া মৃত্যুর পূর্বে মায়াকানন (১৮৭৪) নামে একটি অসমাপ্ত নাটক।

শর্মিষ্ঠা একটি পৌরাণিক নাটক। রচনাকাল ১৮৫৯।
এটিই আধুনিক পাশ্চাত্য শৈলীতে রচিত প্রথম বাংলা নাটক। নাটকের আখ্যানবস্তু মহাভারতের আদিপর্বে বর্ণিত রাজা যযাতি, শর্মিষ্ঠা ও দেবযানীর ত্রিকোণ প্রেমের কাহিনী থেকে গৃহীত। অবশ্য পাশ্চাত্য নাট্যশৈলীতে লিখলেও, মাইকেল এই নাটকে সংস্কৃত শৈলীকে সম্পূর্ণ বর্জন করেননি। এই নাটকের কাব্য ও অলংকার-বহুল দীর্ঘ সংলাপ, ঘটনার বর্ণনাত্মক রীতি, প্রবেশক, নটী, বিদুষক প্রভৃতির ব্যবহার সংস্কৃত শৈলীর অনুরূপ। আবার ইংরেজি সাহিত্যের রোম্যান্টিক ধারার প্রভাবও এই নাটকে স্পষ্ট। প্রথম রচনা হিসেবে ত্রুটিবিচ্যুতি থাকলেও, সেই যুগের ইংরেজি-শিক্ষিত পাঠকসমাজে এই নাটকটি খুবই সমাদৃত হয়। বেলগাছিয়া রঙ্গমঞ্চে সাফল্যের সঙ্গে নাটকটি অভিনীতও হয়।

শর্মিষ্ঠার পরে ১৮৬০ সালে মাইকেল রচনা করেন একেই কি বলে সভ্যতা ও বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ নামে দুটি প্রহসন। এই প্রহসন দুটি তাঁর দুটি শ্রেষ্ঠ নাট্যরচনা। প্রথম নাটকটির বিষয় ছিল ইংরেজি শিক্ষিত নব্য বাবু সম্প্রদায়ের উচ্ছৃঙ্খলতা ও দ্বিতীয়টির বিষয় ছিল সনাতনপন্থী সমাজপতিদের নৈতিক চরিত্রের অধঃপতন। এই নাটকে মাইকেলের পর্যবেক্ষণ শক্তি, সমাজবাস্তবতাবোধ ও কাহিনী, চরিত্র ও সংলাপ রচনায় কুশলতা বিশেষ প্রশংসা লাভ করে। কিন্তু নাটকের বিষয়বস্তু নব্য ও সনাতনপন্থী উভয় সমাজকেই বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। তাই বেলগাছিয়া রঙ্গমঞ্চে নাটকটি অভিনীত হওয়ার কথা থাকলেও, শেষপর্যন্ত তা হয়নি। এতে মাইকেল খুবই হতাশ হয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে প্রহসন রচনা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন।

১৮৬০ সালেই মধুসূদন রচনা করেন পদ্মাবতী নাটকটি। এটিও পৌরাণিক নাটক। তবে এই নাটকের ভিত্তি পুরোপুরি ভারতীয় পুরাণ নয়। গ্রিক পুরাণের ‘অ্যাপেল অফ ডিসকর্ড’ গল্পটি ভারতীয় পুরাণের মোড়কে পরিবেশন করেছেন মধুসূদন। গ্রিক পুরাণের জুনো, প্যালাস ও ভেনাস এই নাটকে হয়েছেন শচী, মুরজা ও রতি। হেলেন ও প্যারিস হয়েছেন পদ্মাবতী ও ইন্দ্রনীল। তিন দেবীর মধ্যে রতিকে শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নির্বাচিত করলে অন্য দুই দেবী ইন্দ্রনীলের প্রতি রুষ্টা হন এবং ইন্দ্রনীলের জীবনে বিপর্যয় নামিয়ে আনেন। শেষে রতি ও ভগবতীর চেষ্টায় ইন্দ্রনীল উদ্ধার পান এবং বিচ্ছিন্না স্ত্রী পদ্মাবতীর সঙ্গে তাঁর মিলন ঘটে। মূল গ্রিক উপাখ্যানটি বিয়োগান্তক হলেও, মাইকেল এই নাটকটিকে ইংরেজি ট্র্যাজি-কমেডির ধাঁচে করেছেন মিলনান্তক। এই নাটকে সংস্কৃত নাট্যরীতির প্রভাব অল্পই। প্লট-নির্মাণ, নাটকীয় দ্বন্দ্ব উপস্থাপনা ও চরিত্র চিত্রণে মাইকেল এখানে আগের থেকে পরিণত হয়েছেন।

কৃষ্ণকুমারী নাটক রচনার পর মাইকেল কাব্যরচনায় পুরোদমে মনোনিবেশ করেন। শেষ জীবনে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে বেঙ্গল থিয়েটারের কর্ণধার শরচ্চন্দ্র ঘোষের অনুরোধে তিনি মায়াকানন নাটকটি রচনায় হাত দেন। নাটকটি তিনি শেষ করতে পারেননি। করেছিলেন ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। এই নাটকটি শিল্পমূল্য বিশেষ নেই। এমনি মাইকেলের সৃষ্টিপ্রতিভার কোনো সাক্ষর এতে পাওয়া যায় না।

মধুসূদন দত্তের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হচ্ছে - অমিত্রাক্ষর ছন্দে রামায়ণ উপাখ্যান অবলম্বনে রচিত মেঘনাদবধ কাব্য নামক মহাকাব্যটি। চরিত্র-চিত্র হিসেবে রয়েছেন - রাবণ, ইন্দ্রজিৎ, সীতা, সরমা, প্রমীলা প্রমূখ। তিনি তাঁর কাব্যকে অষ্টাধিক সর্গে বিভক্ত করেছেন এবং সংস্কৃত অলঙ্কারশাস্ত্র অনুযায়ী এতে নগর, বন, উপবন, শৈল, সমুদ্র, প্রভাত, সন্ধ্যা, যুদ্ধ, মন্ত্রণা প্রভৃতির সমাবেশও করেছেন। কিন্তু সর্গান্তে তিনি নূতন ছন্দ ব্যবহার করেননি, সর্গশেষে পরবর্তী সর্গকথা আভাসিত করেননি। যদিও তিনি বলেছিলেন -
গাইব মা বীররসে ভাসি মহাগীত
তবুও কাব্যে করুণ রসেরই জয় হয়েছে। মেঘনাদবধ কাব্য রামায়ণ-আহৃত কাহিনীর পুণরাবৃত্তি নয় - এটি নবজাগ্রত বাঙালীর দৃষ্টি নিয়তি-লাঞ্ছিত নবমানবতাবোধের সকরুণ মহাকাব্যের রূপে অপূর্ব গীতি-কাব্য। মেঘনাদবধ কাব্য এ দিক দিয়ে বাংলা কাব্য সাহিত্যে একক সৃষ্টি।[৩]
মধুসূদন অতি আশ্চর্য্যজনকভাবে নির্মাণ-কুশলতা গুণে মহাকাব্যোচিত কাব্য-বিগ্রহ সৃষ্টি করেছেন। এ কাব্যের তাৎপর্য্য রাবণ-চরিত্রের প্রতীকতায়। তাঁর সৃষ্ট রাবণ চরিত্রে পরম দাম্ভিকতা প্রকট হয়ে উঠেনি। রামায়ণকে তিনি তাঁর মানবতার আলোকে বিধৌত করে যে মহাকাব্য রচনা করেছেন, তা আসলে রোমান্টিক মহাকাব্য। এ কারণে আকারে 'মেঘনাদবধ কাব্য' মহাকাব্যোচিত হলেও, এর প্রাণ-নন্দিনী সম্পূর্ণ রোমান্টিক এবং মধুসূদন এ কাব্যে জীবনের যে জয়গান করেছেন, তা বীররসের নয়, কারুণ্যের। কবি তাই, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,
সমুদ্রতীরের শ্মশানে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া কাব্যের উপসংহার করিয়াছেন।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের সমাধিস্মারক, কলকাতা
মধুসূদনের শেষ জীবন চরম দুঃখ ও দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। আইন ব্যবসায়ে তিনি তেমন সাফল্য লাভ করতে পারেননি। তাছাড়া অমিতব্যয়ী স্বভাবের জন্য তিনি ঋণগ্রস্তও হয়ে পড়েন। ১৮৭৩ খ্রীস্টাব্দের ২৯ জুন আলিপুর জেনারেল হাসপাতালে কপর্দকহীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মহাকবি জীবনের অন্তিম পর্যায়ে জন্মভূমির প্রতি তাঁর সুগভীর ভালবাসার চিহ্ন রেখে গেছেন অবিস্মরণীয় পংক্তিমালায়। তাঁর সমাধিস্থলে নিচের কবিতাটি লেখা রয়েছেঃ-

দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব
বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধি স্থলে
(জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি
বিরাম)মহীর পদে মহা নিদ্রাবৃত
দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন!
যশোরে সাগরদাঁড়ি কবতক্ষ-তীরে
জন্মভূমি, জন্মদাতা দত্ত মহামতি
রাজনারায়ণ নামে, জননী জাহ্নবী"

 তাঁর ৪ কাব্য  

মেঘনাদ বধ কাব্য
তিলোত্তমা সম্ভব
দি ক্যাপটিভ লেডী
ব্রজাঙ্গনা

নাটক ২টি
শর্মিষ্ঠা
কৃষ্ণকুমারী
পদ্মাবতী
প্রহসন ২টি 
বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ
একেই কি বলে সভ্যতা

সনেট ২টি
কপোতাক্ষ নদ
বঙ্গভাষা

মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর বিভাগ অধিগ্রহণ করেছে। এখানে তৈরি করা হয়েছে মধুপল্লী। বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়ে কবির আবক্ষ মূর্তি। বাড়ির উঠোনে জমিদারবাড়ির ঠাকুরঘর। তারপর প্রতিটি ঘরে কবির ব্যবহূত বিভিন্ন আসবাব রয়েছে। কবির বাড়ির পূর্ব ও পশ্চিম পাশ দিয়ে সরু ধারায় বয়ে গেছে কপোতাক্ষ নদ। জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর সামনেই রয়েছে স্মৃতিময় বাদামগাছ। মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি যেতে হলে প্রথমে যশোরে আসতে হবে, যশোর বাস টার্মিনাল থেকে বাসে কেশবপুর আসতে হবে। ৩২ কিলোমিটার পথের বাসভাড়া ২৫-৩০ টাকা। এরপর কেশবপুর থেকে পশ্চিমে ১২ কিলোমিটার ব্যাটারিচালিত গাড়ি অথবা ভ্যানে যাওয়া য়ায়। ভাড়া ২০ টাকা। সাগরদাঁড়িতে থাকার জন্য পর্যটনের একটি মোটেল আছে। ভাড়া ৩০০ টাকা।
 যুগে যুগান্তরে শত শত বছরে মাইকেল মধুসুদন অমর হয়ে থাকবেন বিশ্বসাহিত্যে তাঁর অমর কীর্তিতে। বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই  মহীর পদে মহা নিদ্রাবৃত দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন!



যাচ্ছো কোথায়? - সুমি খান

 বেলা ১২টা- বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিট , শুক্রবার ,২৪ জানুয়ারী ২০১৪ , উত্তরা

যাচ্ছো কোথায়?
তোমার আমার হিসেব আছে -
একটু দাঁড়াও-

না মেটানো হিসেব গুলো
সুদ- আসলে অনেক হলো!
 সামনে তাকাও-
অস্ত্র-বোমার পথ এড়িয়ে
সৎ সাহসে বিচার মেনে  
শাস্তিটি নাও মাথা পেতে!

 যুদ্ধবাজ আর বোমাবাজের কোলে বসে
 ভ্রষ্ট ভ্রুণের নষ্ট বীজের সন্ত্রাস আর পেট্রোল বোম
 হাজার তিনেক প্রাণ কেড়েছে '১৩ সালের শেষ প্রহরে-

আমার মায়ের আঁচল আবার রক্তে ভেসে গেলো-
বিষন্ন দিন  শেষ বিকেলে  আবার এলোমেলো-

 রক্তবানে ভেসে গেছে ভুল রমনীর ছল!
 কোন্ মেজরের ছাউনী  থেকে ঘন্টাধ্বনি বল্?
কী ভেবেছিস্ জারজ খুনির দল? 
জলপাই রং ড্রামের ভেতর-
জন্ম তোদের হয়;
 বীর বাঙ্গালীর নয় !!

ইস্রাফিলের শিঙ্গা ফুঁড়ে
বুদ্ধ-যিশু -ভগবানের
খোদার আসন-আরশ ছুঁয়ে 
বলেছিলাম ধিক্!
 জ্যান্ত কবর হবে  তোদের 
 এই মাটিতে  ঠিক!!

 সাকা- গিকা- মুজাহিদ-সাঈদী 
কামারুজ্জামান- গোলাম আর 
কাশেম-মওদুদী
কসাই কাদের পথ দেখালো-
তোদের সে পথ এগিয়ে এলো 
লাখো শহীদের রক্তধারায় 
 এবার জাতির জিৎ!

বীর শহীদের রক্তধারায় 
রক্তমাখা ছুরির শানে কবর খুঁড়েছিলি -
পবিত্র এই মাতৃভূমে
বীর জনতার মনের জোরে
ফাঁসির দড়ি গলায় পরে 
সেই কবরে এবার তোদের ঠাঁই!

এমন ও দিন আসবে
 যেদিন  বীর বাঙ্গালী বলবে -
" জারজ তোরা খুনি কসাই-
কবরে ঠাঁই নাই-
এ পবিত্র বাংলায়!"
 সাগর ডেকে বলবে,"তোদের
জলে ও ঠাঁই নাই!"
মর্ রে কুলাঙ্গার-
 মায়ের ঘাতক হয়ে তোরা 
হইলি  রে ছারখার!"

Thursday, January 23, 2014

জীবন কথন ॥ গবেষণ ॥ মানবপরিচয়ের স্থানিক বিশেষণ রণজিৎ বিশ্বাস

রায়গঞ্জের হলে রায়গঞ্জি, গোলাপগঞ্জের হলে গোলাপি, জিলবাংলার হলে জিলাপি, গোপালগঞ্জের হলে গোপালিÑ এমন ফর্মুলায় নাম কি কারও হতে পারে?
: পারবে, এক শ’ বার নয়, দু’ শ’ তিনবার পারবে, দু’ শ’ তিনবার নয়, তিন শ’ উনিশবার পারবে, তিন শ’ উনিশ নয়, পাঁচ শ’ সাঁইত্রিশ বার পারবে, আট শ’ পঁয়তাল্লিশ বার পারবে, নয় শ’ পঞ্চান্নবার পারবে, এগারো শ’ আটানব্বইবার পারবে। যেমনÑরংপুরী, দিনাজপুরী, শরিয়তপুরী, টাঙ্গাইলি, বাসাইলি, পাতরাইলি, চৌদ্দগ্রামী, চাঁদপুরী, এনায়েতপুরী, মনোহরপুরী ইত্যাদি। বাখেরগঞ্জি, বালাগঞ্জি, ঈশ্বরঞ্জি, ফেঞ্চুগঞ্জি, শ্রীহটলি ইত্যাদিও হতে পারে। হওয়ালেই হয়, চালালেই চলে, বলালেই বলে, নাচালেই নাচে, ফাটালেই ফাটে। 
: তারপরও বলি, আপনার ই-ফর্মুলা বা ঈ-ফর্মুলা সব জায়গায় খাটবে না। 
: চাটগাঁর মানুষকে কী বলবেন? চাটলী? 
: সে রকম কেন বলব?! আমি পাগল নাকি? 
:অন্যের বেলা জানি না, আমার কোন সন্দেহ নেই।
: অমন বিড়বিড় করে কী বলছেন! যা বলবেন পরিষ্কার করে বলবেন, স্পষ্ট করে বলবেন। শুনিয়ে শানিয়ে বলবেন। এমনভাবে বলবেন আমাকে যেন বলতে না হয়- এই ভদ্রলোক, কী বলছিলেন এতক্ষণ! পরিষ্কার করে বলুনতো শুনি। বাড়ি, কোথায়? ইত্যাদি ইত্যাদি, ওগাইরা ওগাইরা। 
: আমি বলছি, কিছু কিছু জায়গা আছে, নাম এমন খটমট, আপনার ফর্মুলা প্রয়োগে ভজকট বাধবে। 
: বাধবে না। 
: আমি বলছি, বাধবে। চট্টগ্রামের লোকেদের না হয় আপনার দীর্ঘ ঈ-ফর্মুলায় চট্টগ্রামী বলে চালিয়ে দিলেন, ‘চাটগাঁ’ যদি আমি বলি? তখন কী করবেন?
: তখন ভিন্ন ফর্মুলা। তখন হবে, চাটগাঁইয়া, যেমন সোনারগাঁইয়া, বনগাঁইয়া ইত্যাদি। 
: যদি বলি নোয়াখালী, কুমিল্লা, বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার, স্বরূপকাঠি, নেছারাবাদ, চন্দ্রঘোনা, কাপ্তাই, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, ভোলা? 
: আমার কোন অসুবিধা হবে না। তখন স্থানিক বিশেষণগুলো হবে- নোয়াখাইল্যা, কুমিল্লাইয়া, বরিশাইল্যা, পউট্টাখাইল্যা, কক্সবাজাইরগ্যা, স্বরূপকাইট্টা, নেছারাবাইদ্যা, চন্দ্রঘোইন্যা, কাপ্তাইয়া, বান্দরবাইন্যা, খাগড়াছইড়গ্যা, ভোলাইয়া ইত্যাদি। 
: তারপরও দেখবেন, কোন কোন জায়গার নাম আপনি এমন পাবেন, স্থানিক বিশেষণ আপনি সহজে যোগাড় করতে পারবেন না। বড় মনের কিছু ছোট মানুষের মতো-আউটডেইটেড ও আউটফ্যাশানড মানুষগুলোর কথা বাদ দিন, ছোট মনের বড় মানুষগুলোর মতো অন্য মানুষকে অসম্মান করার মতো উপযুক্ত, উন্নত, লাগসই, উপযোগী, ও ‘খাপখাইটিং’ শব্দ আপনি খুঁজে পাবেন না। আপনার ফর্মুলা ছক মানবে না। 
: বুঝলাম না!
: বুঝতে হবে আপনাকে। সন্দ্বীপ, উড়িরচর, চরফ্যাশান, চরকুকড়িমুকড়ি, লালমোহন, দৌলতখান, তজুমদ্দিন, রাঙ্গুনিয়া, গোমদ-ী, রাজশাহী, সোনাদিয়া, কুতুবদিয়া, রাঙ্গাবালি, সুন্দরবন, কটকা, হিরণ পয়েন্ট, উল্লাপাড়া, হাটিকুমরুল, চৌহালি, কাজীপুর, লাহিড়ীমোহনপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, রাজবাড়ি, পলাশবাড়ি, পাকুন্দিয়া, কটিয়াদি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বাঞ্ছারামপুর, বিতঙ্গল, নাগরপুর, এলাসিন, চৌহালি, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, জয়পুরহাট, বগুড়া, বাদলগাছি, পঞ্চগড়, হাতিয়া, রামগতি, ময়নামতি, নারাঙগিরি চিৎমরং, আলুটিলা, সাজেক, দিঘীনালা, তাড়াশ, হরিণঘাটা, মেলাদহ, পোড়াদহ, ঈশ্বরদী, নরসিংদী, বেলাব, জামুর্কি, চরভদ্রাসন 
-এসব এলাকার মানুষগুলোকে অবজ্ঞা করার জন্য অসম্মান করার জন্য ছোট মনের বড় মানুষদের মুখে আপনি কী কী শব্দ তুলে দেবেন?!
: আমাকে একটু সময় দিন, গবেষণা করে দেখি!
: না। সময়ও আপনাকে দেয়া যাবে না, গবেষণা করে দেখতেও আপনার হবে না।
: আমি তাহলে কী করব?
: কিছুই আপনাকে করতে হবে না। আপনি শুধু বহু পুরনো একটি কথা মেনে নিন। খেলিলে খেলোযাড়, কিন্তু জানিলে জানোয়ার নয়, লিখিলে নয় লেখোয়াড়, আনিলে নয় আনোয়ার, মনে মনে ভাবিলেই নয় মনোয়ার। 
লেখক : শ্রমজীবী কথাসাহিত্যিক ও রম্যলেখক

Wednesday, January 22, 2014

শুভাশীষের সঙ্গে সতর্কবাণীও -আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জয়ী হয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল তাঁর হাতের দুই আঙুলে ভি চিহ্ন তৈরি করে তাঁর দেশের মানুষকে ভিক্টোরি বা বিজয়ের প্রতীক দেখিয়েছিলেন। এবার ২০১৪ সালে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতায় উগ্র সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয়ে ভি চিহ্ন দেখাননি, তাঁর নেতৃত্বে একটি নতুন সরকার গঠন করেছেন। ১২ জানুয়ারি রবিবার এ মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করেছে।
অনেকের ভয় ছিল, শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের মতো হয়তো এমন একটি মন্ত্রিসভা গঠন করবেন, যা জনগণের অনেকের পছন্দসই হবে না। আমিও কয়েক দিন যাবৎ আমার বিভিন্ন কলামে শেখ হাসিনাকে অনুরোধ জানিয়েছি, এবার যেন তিনি দেশকে একটি ক্লিন ও যোগ্য মন্ত্রিসভা উপহার দেন। যারা দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করবে। তা যদি হয়, তাহলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে যাঁরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রশ্ন তুলছেন, বিতর্ক সৃষ্টি করতে চাইছেন, তাঁরা নিশ্চুপ হবেন এবং জঙ্গি মৌলবাদ, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও একটি নিরপেক্ষতার মুখোশধারী সুধীসমাজ নতুন করে চক্রান্ত শুরু করার সুযোগ পাবে না।
নতুন মন্ত্রিসভায় ২৯ জন পূর্ণ মন্ত্রী, ১৭ জন প্রতিমন্ত্রী ও দুজন উপমন্ত্রী আছেন। সাকল্যে ৪৯ জনের মন্ত্রিসভা। আরো দু-একজন বেশি মন্ত্রী গ্রহণ করা না হলে একে একটি মাঝারি সাইজের মন্ত্রিসভা বলা চলবে। এই মন্ত্রিসভায় ২০০৮ সালে গঠিত মন্ত্রিসভার চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য, দক্ষ, প্রবীণ ও নতুন মন্ত্রী আছেন। তাতে আমরা আশ্বস্ত। এই মন্ত্রিসভা একেবারে ক্লিন- সে কথা আমি বলব না। কিছু বিতর্কিত ব্যক্তি অবশ্যই আছেন। কিন্তু শতভাগ ক্লিন মন্ত্রিসভা গঠনের মতো ফেরেশতা বাংলাদেশে কেন, কোনো দেশেই আজকাল পাওয়া যাবে, তা মনে হয় না। যদি পাওয়া যেত, তাহলে নয়াচীনের মতো একটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত কমিউনিস্ট দেশে ক্ষমতাসীন পার্টি ও সরকারের বহু শীর্ষস্থানীয় নেতাকে দুর্নীতির দায়ে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে হতো না।
বর্তমান যুগে ডান ও বাম দুই ধরনের রাজনীতিই অনেকটা সোনার গয়নার মতো। খাঁটি সোনা দিয়ে যেমন গয়না গড়া যায় না, তাতে খাদ মেশাতে হয়, তেমনি রাজনীতিতেও ভালোমন্দের মিশ্রণ না থাকলে তা কার্যকর রাজনীতি হয়ে ওঠে না। জনসাধারণও অতি ভালো মানুষ বা ফেরেশতাদের অক্ষম সরকার চায় না। তারা চায় ভালোমন্দে মিশ্রিত মানুষের সরকার। তবে সেই সরকারে ভালো ও দক্ষ মানুষের সংখ্যা যেন বেশি হয় এবং তাঁরা যেন দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সক্ষম হন। তাদের বিপদে-আপদে পাশে এসে দাঁড়ান।
শেখ হাসিনা এবার দেশকে এমন একটি সরকার উপহার দিতে পেরেছেন বলে অনেকেই মনে করেন। তোফায়েল আহমদ, আবুল মাল আবদুল মুহিত, মতিয়া চৌধুরী, নুরুল ইসলাম নাহিদ, রাশেদ খান মেননের মতো অভিজ্ঞ প্রবীণ মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতারা তো এই মন্ত্রিসভায় আছেনই; তাঁদের সঙ্গে গত মন্ত্রিসভায় যাঁরা দক্ষতা ও যোগ্যতার জন্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, তাঁরাও আছেন। যেমন ওবায়দুল কাদের ও হাসানুল হক ইনু। শেষোক্ত দুজনই তুলনামূলকভাবে তরুণ। নতুন আইনমন্ত্রী হয়েছেন আনিসুল হক। বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনায় তাঁর আইনি দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় পাওয়া গেছে। আশা করা যায়, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করা ও দণ্ডদানের কাজও তিনি যোগ্যতার সঙ্গে দ্রুত শেষ করে সারা দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূর্ণ করবেন। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন।
মন্ত্রিসভায় পানিসম্পদমন্ত্রী হিসেবে নতুন মুখ আনিসুল ইসলাম মাহমুদ জাতীয় পার্টি থেকে এসেছেন। জেনারেল এরশাদের শাসনামলে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীরও দায়িত্ব পালন করেছেন এবং যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। পানিসম্পদ নিয়ে দেশ এখন বড় ধরনের সংকটের সম্মুখীন। ফারাক্কার পানির ভাগ পাওয়া নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিতর্ক তো এখনো রয়েছেই। তার ওপর গোঁদের ওপর বিষফোড়া সৃষ্টি করেছে তিস্তার পানি, মনু নদী ও টিপাইমুখ বাঁধের সমস্যা। ভারতের সঙ্গে এসব সমস্যার আশু সুসমাধান না হলে বাংলাদেশ একদিকে ভয়াবহ খরা, অন্যদিকে অতিবৃষ্টি ও প্লাবনের দ্বারা ধ্বংস হবে।
এসব সমস্যা সমাধানে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার আগ্রহ ও আন্তরিকতা দেখালেও প্রচণ্ড বাধার সৃষ্টি করে রেখেছে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস সরকার। বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই দপ্তরের মন্ত্রীকে তাই তাঁর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দ্বারা এই পানি সমস্যা সমাধানে দ্রুত সাফল্য দেখাতে হবে। আমার ধারণা, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এ ব্যাপারে তাঁর যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রমাণ দেখাতে পারবেন।
বর্তমান মন্ত্রিসভায় আরেকজন প্রতিশ্রুতিশীল নতুন মুখ আসাদুজ্জামান নূর। তিনি একাধারে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। প্রয়াত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের একটি টেলিনাটকে বাকের ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করে সারা দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন। সব চেয়ে অভূতপূর্ব ঘটনা, নাটকের বাকের ভাইয়ের ফাঁসির আদেশ যাতে না হয় তার দাবি জানিয়ে ঢাকায় বিরাট মিছিল বের হয়েছিল। নূর সাংস্কৃতিক চিন্তাচেতনার ক্ষেত্রে প্রগতিশীল শিবিরের লোক। তিনি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী হয়েছেন। এই মন্ত্রী বাছাইয়ে শেখ হাসিনাকে প্রশংসা করতে হয়। তিনি যোগ্য হাতে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন।
বহুকাল এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব যোগ্য হাতে ছিল না। অথচ এই সাংস্কৃতিক ফ্রন্টেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শত্রুরা ক্রমাগত হামলা চালাচ্ছে, যাতে বাংলাদেশ ও বাঙালির লোকায়ত ভাষা-সংস্কৃতির ভিত্তি ধ্বংস করে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী অপসংস্কৃতির আগ্রাসনকে জয়যুক্ত করা যায়। সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে পরাজয় দেশের গণতান্ত্রিক শিবিরের রাজনৈতিক পরাজয়ও ডেকে আনবে। এদিকটা মনে রেখে আসাদুজ্জামান নূরের মতো একজন প্রগতিশীল মানুষের হাতে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পিত হওয়ায় আশা করা যায়, দেশের প্রায় ঝিমিয়ে পড়া প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ধারাটিকে তিনি পুনরুজ্জীবিত করতে পারবেন এবং সাংস্কৃতিক শিবির আবার সেক্যুলার আন্দোলনের সহযোদ্ধা হয়ে উঠবে।
মন্ত্রিসভায় দুটি নাম না দেখে একটু বিস্মিত হয়েছি। একজন সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, আরেকজন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক। সাবেক মন্ত্রিসভায় মতিয়া চৌধুরী কৃষিমন্ত্রী (বর্তমান মন্ত্রিসভায়ও একই পদে আছেন) ও ড. আবদুর রাজ্জাক খাদ্যমন্ত্রী থাকায় দুজনের আন্তরিকতা ও পরিশ্রমে দেশ শুধু কৃষি উৎপাদনেই উদ্বৃত্ত হয়নি, খাদ্যেও স্বনির্ভর হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই আবদুর রাজ্জাক নতুন সরকারেও একই পদে থাকবেন ভেবেছিলাম। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা কী বিবেচনা করেছেন, তা আমি জানি না। সুতরাং অধিক মন্তব্য আর করছি না।
জাহাঙ্গীর কবির নানক যুবলীগের নেতা হিসেবে যে সংগঠন শক্তির পরিচয় দেখিয়েছেন, তা প্রশংসাযোগ্য। এক-এগারোর সেই দুঃসময়ে আগরতলায় পলাতক অবস্থায় থেকে নানক কিভাবে দেশের ভেতরে ও বাইরে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছেন, তা আমি জানি। তিনি আগরতলায় বসে সুদূর লন্ডনে টেলিফোনে আমার সঙ্গে আলোচনা করতেন এবং প্রতিরোধ আন্দোলনে সহায়ক এমন লেখার উপাদান আমাকে সরবরাহ করতেন।
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর অনেক দুর্নাম রটেছিল, এ কথা সত্য, তা কতটা সঠিক তা আমি জানি না। নেহরু একবার বলেছিলেন, 'যেকোনো কাজেই যারা একটু বেশি সক্রিয় ও বেশি দায়িত্ব পালন করে, দুর্নামের বোঝা তাদের বইতেই হবে।' এ কথা নানকের বেলায় প্রযোজ্য কি না জানি না। বর্তমান মন্ত্রিসভাকে তুলনামূলকভাবে একটা ক্লিন চেহারা দানের জন্য বা অন্য কোনো কারণে যদি জাহাঙ্গীর কবির নানককে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে আপত্তি নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ ব্যাপারে আমার একটি নিবেদনও আছে। নিবেদনটি তাঁকে জানতে দ্বিধাবোধ করছি না।
জাহাঙ্গীর কবির নানকের বর্তমান জীবন বলতে গেলে এক প্রকার বিপর্যস্ত।
মাত্র কিছুদিন আগে তাঁর একমাত্র পুত্রের অত্যন্ত তরুণ বয়সে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। তাঁর মেয়েরও পারিবারিক জীবন সুখের নয়। নানক তার পরও রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন এবং শুধু সক্রিয় থাকা নয়, দলের কাজে তাঁর সাংগঠনিক শক্তির পরিচয় দেখাচ্ছেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা খুবই দুর্বল। সুতরাং আর কোনো কাজে না হোক, দলকে চাঙ্গা করে তোলার কাজে নানক ও তাঁর মতো অভিজ্ঞ নেতা-কর্মীদের লাগাতে হবে। আওয়ামী লীগের এক বন্ধু-নেতা আমাকে বলেছেন, 'নানক দুর্নীতি করেছেন।' আমি তাঁকে বলেছি, 'ঠগ বাছতে গেলে গাঁও উজাড় হয়ে যাবে।'
বর্তমান মন্ত্রিসভায় সব মন্ত্রী পদ এখনো পূর্ণ করা হয়নি। যেমন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি এই পদে মাত্র অভিজ্ঞ হয়ে উঠছিলেন। এখন প্রশ্ন মাহমুদ আলী এ পদে থাকবেন, না নতুন কেউ আসবেন? যদি নতুন কেউ আসেন, তাহলে পররাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে অভিজ্ঞ কেউ এলে ভালো হবে। এ পদে নতুন নতুন মুখ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা ঠিক হবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়টি তো সম্পূর্ণ ঢেলে সাজাতে হবে। কারণ দেশে যে জঙ্গি উৎপাত ও রাজনৈতিক সন্ত্রাস এখনো বন্ধ হয়নি, তা বন্ধ করে জনজীবনকে সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হলে একটি শক্তিশালী ও পুনর্গঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দরকার।
আগেই বলেছি, দেশের এক ভয়ানক অস্বাভাবিক অবস্থায় স্বাভাবিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। ফলে এই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সংসদ ও নতুন সরকারের গায়েও অস্বাভাবিকতার কিছু চিহ্ন সময়ের প্রয়োজনে আমাদের সাময়িকভাবে মেনে নিতে হবে। যেমন এই সংসদে জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দল হিসেবে অবস্থান নিয়েছে। আবার এ দলের কিছু সদস্য মন্ত্রিসভায়ও আছেন। তাহলে এটা কি একটি 'রেইনবো' বা রংধনু সরকার?
আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধির ধারণা, দেশের বর্তমান সরকার কতিপয় সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে হয়তো একটা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য (পূর্ণ মেয়াদের জন্য নয়) ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। এ লক্ষ্যগুলো হলো, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রুত শেষ করা, দেশে জামায়াতসহ জঙ্গিবাদী দলগুলোর উৎপাত ও সন্ত্রাস স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, আইনের শাসনের সুপ্রতিষ্ঠা ও কঠোর হাতে দুর্নীতি দমন, নারী ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বিধান এবং শিক্ষাঙ্গনের নৈরাজ্য দূর করা। সর্বোপরি দেশকে গণতান্ত্রিক রাজনীতির সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনা।
এই লক্ষ্য অর্জনের ব্যাপারে মহাজোটের সঙ্গে জাতীয় পার্টির কোনো মতানৈক্য আছে বা থাকবে বলে মনে হয় না। সুতরাং এই লক্ষ্য অর্জন ও দেশকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দল হয়েও অবশ্যই সরকারকে একটা সময় পর্যন্ত সমর্থন দিতে পারে এবং এই সমর্থনের প্রতীক হিসেবে তাদের কয়েকজন সদস্য মন্ত্রিসভায়ও থাকতে পারেন। আপৎকালীন সময়ে এ ধরনের সরকার গঠনের অনেক নজির আছে। তবে এই সমঝোতা সত্ত্বেও দেশের অন্যান্য সমস্যার ব্যাপারে বিরোধী দলকে অবশ্যই সরকারের ভুলত্রুটিকে সমালোচনা ও বাধাদানের নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং আপৎকালীন সময় পেরিয়ে গেলে মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে এসে সংসদীয় বিরোধী দলের স্বাভাবিক ভূমিকায় ফিরে যেতে হবে। সে ক্ষেত্রে এরশাদ সাহেবও আর মন্ত্রীর পদমর্যাদা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের ভূমিকায় থাকতে পারবেন না।
প্রচণ্ড বাধার মুখে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠান ও সরকার গঠনে সক্ষম হলেও শেখ হাসিনার সামনে এখনো কণ্টকাকীর্ণ পথ প্রসারিত। বিএনপি-জামায়াতি সন্ত্রাস ও ইউনূস-শিবিরের চক্রান্ত, সুধীসমাজের বিরোধিতা এবং সেই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর ঘোঁটপাকানো সাময়িকভাবে পিছু হটেছে; পরাজিত হয়নি। সুযোগ পেলেই তারা আবার মাথা তুলবে। আরো বড় ধরনের ছোবল মারার চেষ্টা করবে। এর একমাত্র প্রতিকার হচ্ছে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে চেতনা সৃষ্টি করা এবং জাতীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এই সরকারকে শুভাশীষ জানানোর সঙ্গে সঙ্গে আমার সতর্কবাণী হচ্ছে, বর্তমান সাফল্যে কমপ্লাসেনসিতে না ভুগে সরকার যেন নিজেদের আপৎকালীন সময়ের অস্থায়ী সরকার মনে করে সর্বশক্তি নিয়ে এই আপদ প্রতিরোধের জন্য নিজেরা ঐক্যবদ্ধ থাকে এবং জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে।
লন্ডন, সোমবার, ১৩ জানুয়ারি ২০১৪