Wednesday, January 22, 2014

জামাতের লবিষ্ট হিউম্যান রাইটসওয়াচ নিরীহ মানুষ হত্যার পক্ষে ?- সুমি খান

রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মিথ্যা প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান জরুরী –সুমি খান
  ধর্মীয় কাজে রাজনীতির ব্যবহার, অথবা রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার- মানবতার জন্যে দুই-ই  বিপজ্জনক এবং সর্বনাশা। বিশ্বজুড়ে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে সবাই। ইসলামী দেশ তিউনিসিয়া ও নিজেদের ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ পরিচয় বদলে  রিপাবলিকান দেশ হিসেবে পরিচয় দিতে সংসদে প্রস্তাব পাশ করেছে। মসজিদে খুৎবা দিতে গিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে সৌদী আরব। এই আইন গুলো এদেশে ও কার্যকর জরুরী । নাহয় মসজিদ আর ‘ইসলামী জলসা’ কে ব্যবহার করে সংখ্যালঘু এবং নারীদের বিরুদ্ধে অশ্লীল প্রচারণা বন্ধ হবে না। সাম্প্রদায়িক অপশক্তির তৃণমূল পর্যায়ে মিথ্যা প্রচারণার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক হামলার উস্কানি দিয়ে এ দেশকে সংখ্যালঘু এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি শূন্য করার ষড়যন্ত্র  ঠেকানো কঠিন থেকে কঠিনতর হবে।
নতুন মন্ত্রীপরিষদ দায়িত্ব নিয়েই অভিনন্দন পাবার মতো কিছু কাজ করেছেন যার মধ্যে রয়েছে  সাতক্ষীরায় সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস দমনে ভারতীয় যৌথবাহিনীর অবস্থান সংক্রান্ত ভিত্তিহীন মিথ্যা প্রতিবেদন প্রকাশের দায়ে দৈনিক ইনকিলাব কর্তৃপক্ষ এবং তাদের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং তথ্যমন্ত্রী  হাসানুল হক ইনুকে এজন্যে অভিনন্দন জানাই।  এই ধারাবাহিকতা ব্যাহত হলে মিডিয়াকে ব্যবহার করে পরিকল্পিত মিথ্যাচারের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক হামলার উস্কানি ঠেকানো কঠিন হবে । দেশের সার্বভৌমতা কে চ্যালেঞ্জ করেছে বিভ্রান্তিকর এ প্রতিবেদন। এ ব্যাপারে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর স্পষ্ট বক্তব্য এই অপপ্রচার এবং সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি ঠেকাতে জরুরী।
দৈনিক  প্রথম আলো ৬ জানুয়ারী কলঙ্কিত নির্বাচন: জাল ভোট শিরোনামের  লিড রিপোর্টে  ফটোশপের মাধ্যমে সিঁদুর বসিয়ে হিন্দু নারী ভোটারদের আলোচিত  ছবি প্রকাশ করে। যা পরবর্তীতে সাম্প্রদায়িক হামলায় উস্কানি দেয়।জালভোটের মিথ্যা ছবি প্রকাশ করে; যার প্রতিবাদ জানায় ছবির তরুণ। তার জীবনের প্রথম ভোট দিতে গিয়ে ভোট কিভাবে দিতে হবে জিজ্ঞেস করছিলো ঐ তরুণ।ঐ তরুণের ব্যাপারে না জেনে এ ধরণের ছবি প্রকাশ সাংবাদিকতার নীতি নৈতিকতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তার জীবনের প্রারম্ভেই যে কলঙ্ক প্রথম আলো তার জীবনে লেপন করে দিলো- তার কী শাস্তি হওয়া উচিত? এ ধরণের হরুদ সাংবাদিকতা ঠেকাতে এর  বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারকে। একই ভাবে  ইনকিলাবের মিথ্যা ভিত্তিহীন প্রতিবেদনের রেফারেন্স ব্যবহার করে মানুষকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিভ্রান্ত করার অপরাজনীতি ও ঠেকাতে হবে ।
অভিযোগ রয়েছে, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি জামাত মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে  তাদের ঘাতকদের পক্ষে সমর্থনমূলক ভূমিকা  আদায় করে নিচ্ছে তথাকথিত মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ।এর বিপরীতে শুভ শক্তির ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস জরুরী। রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রদর্শন জরুরী। সরকারের প্রতিটি পর্যায় থেকে  সাম্প্রদায়িক শক্তি এবং তার সহযোগিদের বিরুদ্ধে সুষ্পষ্ট অবস্থান  নিতে হবে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবার এক পর্যায়ে দেখা গেলো,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিও) ধর্মব্যবসায়ীদের পক্ষে নির্লজ্জ অবস্থান নিয়েছে।কী কারণে তাদের এ  হঠকারী অবস্থান? এর ব্যাখ্যা দাবি রাখে।
  তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে  দাবি করা হয়েছে,মানবাধিকারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ২০১৩ সালে পিছনের দিকে চলে গেছে।”  কারণ  হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর সরকার কঠোর দমন-পীড়নে নিয়োজিত ছিল।হিউম্যান রাইটস ওয়াচের  এ প্রতিবেদনে সহিংসতার জন্য সরকারকে দায়ী করা হলেও এক্ষেত্রে জামায়াতের ভূমিকার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। গাড়ি পুড়িয়ে, পেট্রল বোমা মেরে মানুষ হত্যাকারীদের বিষয়েও বলা হয়নি কিছু।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার বিষয়েও কিছু নেই।
উল্টো ক্ষমতাসীনদের ‘নির্যাতনের শিকার ’ হিসেবে  বিএনপির অঙ্গ সংগঠন ‘অধিকার’ এর দুই কর্তাব্যক্তি আদিলুর রহমান খান ও নাসিরউদ্দিন এলানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। যারা হেফাজতবিরোধী মতিঝিল অভিযানের তথ্য বিকৃতির জন্য  সুনির্দিষ্টভাবে অভিযুক্ত।এছাড়া বিএনপি নেতা, ‘নাস্তিকব্লগার এবং  ‘আমারদেশ’কে ‘প্রধান সংবাদপত্র’ উল্লেখ করে এর  সম্পাদককে গ্রেপ্তারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।  অন্যায় আর মিথ্যাচারের প্রতি কী  নির্লজ্জ এবং ভয়ংকর সমর্থন!  আবারো বলছি, শুধু রাষ্ট্র বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নয়, এর প্রতিবাদ করতে হবে আমাদের সাধারণ নাগরিক সমাজ থেকেও।
 এই প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে আবারো প্রমাণিত হলো  যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে  মার্কিন মানবাধিকার সংগঠন 'হিউম্যান রাইটসওয়াচে'র অবস্থান  স্পষ্টভাবে  একাত্তর এবং সাম্প্রতিক সময়ের জামাত শিবিরের ঘাতকদের পক্ষে ।একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া আর রাজনৈতিক অস্থিরতা মিলিয়ে  ২০১৩ সালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়েছে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট প্রকাশিত হলো ২১ জানুয়ারী মঙ্গলবার ।
 ২০১৩ সালের বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই মানবাধিকার সংগঠনটি  যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে বাংলাদেশ সম্পর্কে যে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়, তাতে  বিক্ষোভ দমনে বাংলাদেশ সরকার বেআইনিভাবেশক্তি প্রয়োগ করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।  
  রিপোর্টে ব্যালেন্স দেখাতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস আবার বলেছেন, নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি মতপার্থক্যের কারণে সহিংস ঘটনার জন্য  দুই পক্ষই দায়ী । বিরোধী দলগুলো তাদের সমর্থকদেরকে হিংসা থেকে বিরত রাখতে ব্যর্থ হয়েছে, অন্য পক্ষে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কখনো কখনো চরম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলতে হয়, পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে নিরীহ মানুষদের জীবন্ত দগ্ধ করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কী সাজা দেয়া হতো?  গণহত্যা , ধর্ষণ , অগ্নিসংযোগের মতো অপরাধের  দায়ে তারা কী শাস্তি দিতেন?   সাদ্দাম , লাদেন , গাদ্দাফির শেষ পরিণতি কি মানবাধিকারের লঙ্ঘন নয়? তখন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ  এর  পর্যবেক্ষক টীম কোথায় ছিল? 
 একাত্তরের ঘাতককূল শিরোমণি গোলাম আযমের রায় নিয়ে  অনাকাঙ্খিত মন্তব্যের জন্য সংগঠনটির বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছিলো আন্তর্জাতিক অপরাধ  ট্রাইব্যুনাল  এর পর ও যেন ‘টাকা কথা বলে’- আর তাই  ঘাতকদের বিচার বন্ধ করার জন্যে লাগামছাড়া মন্তব্য করেই যাচ্ছে তথাকথিত এই মানবাধিকার সংগঠন- যা হত্যা আর নির্যাতনের পক্ষেই তাদের হঠকারী অবস্থান স্পষ্ট করছে বারবার।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে বলেছেন, “এই সরকার গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি এবং আইনের শাসন ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, কিন্তু বরং তারা ক্রমশ স্বৈরাচারী ও অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। তবে কি একাত্তরের ঘাতক দের মুক্তির দাবি তে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে সরকার বিরোধিতার নামে জনজীবন অচল করে দিয়ে বোমার মুখে মানুষকে জীবন যাপন করতে বাধ্য করেছে যারা, তাদের আইনী প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা স্বৈরাচারী এবং অসহিষ্ণুতার প্রকাশ?  
 অনেকের মতে ,মুসলিম ব্রাদারহুড  এর নামে সন্ত্রাস দমনে সিরিয়া, মিশর  এবং সৌদী আরবে নিয়মিত মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হচ্ছে , প্রকাশ্য রাজপথে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে।  সেই পথেই যেতে হবে বাংলাদেশ কে।
একাত্তরে গণহত্যাকারীদের বিচার ঠেকাতে লবিস্ট নিয়োগ করেছে জামায়াত।হিউম্যান রাইটস ওয়াচও  সেই লবিষ্ট দের অন্যতম । তাই গণহত্যাকারীদের বাঁচাতে চাইছে ।
সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের রাস্তায় সহিংস বিক্ষোভ শুরু হয় এবং সারা বছর তা চলতে থাকে এবং এতে প্রায় ২০০ জন মারা যায় এবং হাজারেরও বেশি আহত হয়।প্রতিবেদনে  আরো উল্লেখ করা হয়েছে ,আগের বিক্ষোভগুলোর সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইবুন্যাল (আইসিটি)-এর নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর যোগসূত্র ছিল, যা হল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ঘটা অপরাধ ও অন্যান্য নির্যাতনগুলোর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের জন্য গঠিত একটি দেশীয় আদালত।
যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত আব্দুল কাদের মোল্লার যুদ্ধাপরাধ গোপন করে তিনি জামায়াতে ইসলামীর একজন বর্ষীয়ান সদস্য – এই পরিচয়কে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়,“মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর বছর শেষে আরো বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। "
 আরো বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে আইসিটির আইনে  সংশোধনীগুলো অনুসরণ করে তাকে অভিযুক্ত করা হয় ও মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।এ ধরণের ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্যের ব্যাখ্যা দাবি করে এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জরুরী।
 আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের এ ধরণের হঠকারী ভূমিকা পরোক্ষভাবে সমর্থন দিচ্ছে সাম্প্রদায়িক  অপশক্তি কে। যে কারণে এখনো হিন্দু পরিবার গুলোর  উপর হামলা  অব্যাহত রয়েছে।
 মসজিদের মাইকে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পুলিশ ও জনগণের ওপর জামায়াতীদের হামলা করা হচ্ছে বারবার।  ১৮ জানুয়ারী শনিবার আবার সেই  ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি এলাকায়। শনিবার মধ্যরাতে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি সুনির্দিষ্ট এলাকায়  পুলিশ হত্যা মামলা সহ কয়েকটি হত্যা মামলার আসামি গ্রেফতার করতে অভিযান চালায় পুলিশ ।এ সময় একটি মসজিদ ও মাদ্রাসার মাইক থেকে প্রচার করা হয়, গ্রামে সশস্ত্র ডাকাতরা হামলা চালিয়েছে। গুজব ছড়ানো হয়, আওয়ামী লীগ, যুব লীগ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা ডাকাত সেজে হামলা চালিয়েছে। মসজিদ ও মাইকে এই মিথ্যা ঘোষণা শুরু হলে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায় এবং তাদের চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। তারা পুলিশের পিকআপ ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয়।  খানাবাড়ি গ্রামের ১২টি বসতবাড়ি ও খড়ের গাদায় আগুন দেয়া হয়। জামায়াতের ক্যাডার ও জামায়াত সমর্থক গ্রামবাসীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে ২২ পুলিশ জখম হয়। কিছু গ্রামবাসীও আহত হয়েছে ।এসবের দায় কার?
১১ এপ্রিল ২০১৩ দুপুরে ফটিকছড়ি উপজেলার ভুজপুরের কাজীরহাটে মসজিদের মাইকে মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে আওয়ামী লীগের হরতালবিরোধী মিছিলের ওপর হামলা হয়, যাতে জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। হামলায় স্বেচ্ছাসেবক ও ছাত্রলীগের তিন নেতাকর্মী নিহত হন, আহত হন দেড়শতাধিক। পুড়িয়ে দেয়া হয় মিছিলের সঙ্গে থাকা দুই শতাধিক মোটরসাইকেল, কার, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও জিপ। ভুজপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও থানা জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিউল্লাহ নুরী সরাসরি এই  হামলার ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত। সেদিন কাজীর হাট জামে মসজিদ থেকে মাইকে প্রচার করা হয় আওয়ামী লীগের মিছিল থেকে মসজিদে হামলা করা হয়েছে এবং স্থানীয় মাদ্রাসার বড়হুজুরকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরিকল্পিত এই ঘোষনার গুজবে কান দিয়ে জামায়াতকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় গ্রামবাসীরাও হামলায় অংশ নেয়।
সেই ভয়ংকর ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন এভাবে  মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে হত্যা এবং নির্যাতনে যেন  আর কোন মসজিদের মাইক ব্যবহার করা না হয়। এই ঘোষণার কোন কার্যকারিতা দেখা গেলো না। আবারো পুনরাবৃত্তি হলো, আক্রান্ত হলো স্বয়ং পুলিশ বাহিনীর সদস্য এবং তাদের বহন করা গাড়ি। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছাড়া আর কী বলা যায় একে?
 ৫ মে নবম সংসদ নির্বাচনের পর  অনেকের ধারণা ছিল, জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা হয়ত জঙ্গী তৎপরতা থেকে বিরত থাকবে। হয়তো তাদের কৌশল বদলাবে।
কিন্তু গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে পুলিশের ওপর জামায়াতী সন্ত্রাসীদের পরিকল্পিত হামলার পর প্রমাণ হলো, জামায়াত-শিবির চক্র  মরিয়া।  নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আরও বড় ধরনের হামলা চালানোর আশংকা স্পষ্ট। এ জন্য এখন থেকে নিরাপত্তা বাহিনীকে সর্বক্ষণিকভাবে সম্ভাব্য যে কোন ধরনের হামলা মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। জামায়াত-শিবির সন্ত্রাসী সংগঠন-  সেটা তাদের কর্মকান্ডে বারবার প্রমাণিত। 
এটাও প্রমাণিত হলো, তারা  পবিত্র ধর্মের কথা বলে, কিন্তু কল্যাণমূলক মূল্যবোধে বিশ্বাস করে না। মওদুদীর দীক্ষামতে মিথ্যাচার আর সন্ত্রাসের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ তাদের মূল লক্ষ্য।
মিথ্যাচার প্রতারণা ও লুটপাট তাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মূল ভিত্তি। মসজিদ মাদ্রাসার মতো পবিত্র স্থানকে তাদের হীন রাজনৈতিক কৌশল চরিতার্থের জন্য  ধর্মকে ব্যবহার করে। তারা ধর্মভীরু মানুষের সরল ধর্মবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে জিম্মি করে ফেলে। যে নিরীহ ছা-পোষা মানুষেরা ভাবতেও পারে না, কেউ কখনো মসজিদের মাইকে মিথ্যা প্রচার চালাতে পারে। কিন্তু জামায়াতী দুর্বৃত্তরা তাই করছে। তারা মাইকে মিথ্যা প্রচার চালিয়ে পুলিশ এবং সাধারণ জনগোষ্ঠীর উপর  পরিকল্পিত হামলা করছে। চট্টগ্রামের পাথরঘাটার জেলেপাড়া, হাটহাজারী , ফটিকছড়ি, সাতক্ষীরা , রামুর বৌদ্ধমন্দির  সহ অসংখ্য ঘটনার ধারাবাহিকতা তার ই প্রমাণ। পুলিশ বাহিনীর ওপর হামলা চালানোর নামে তারা মূলত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে।  একাত্তরের চরিত্র অপরিবর্তনীয়। কারণ, বাংলা এবং বাঙ্গালী কৃষ্টি সংস্কৃতি বিনাশে তাদের লক্ষ্যে তারা স্থির। 
জামায়াত-শিবির চক্র বারবার প্রমাণ করছে তারা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল এবং সন্ত্রাস বিধ্বস্ত  ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়।স্পষ্টত: তারা রাষ্ট্রদ্রোহী। আর তাই বাংলাদেশের মাটিতে রাষ্ট্রদ্রোহী জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীদের ক্ষমা করার সুযোগ নেই। এখন থেকে মাদ্রাসা ও মসজিদে রাখা প্রতিটি মাইক ব্যবহারের বিষয়ে কঠোর বিধিনিষেধ চালু করা দরকার। ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোন নাশকতার উদ্দেশে এসব মাইক ব্যবহার করা যাবে না। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে যারা হামলা করেছে, তাদের অবিলম্বে দ্রুত বিচারব্যবস্থায় বিচারের মুখোমুখি করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
১৫ জানুয়ারীর দ্য উইক পত্রিকা লিখেছে, আরব বসন্তের দু’টি দেশ মিসর এবং  তিউনিসিয়া গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইতে নেমেছে।  ৯৮% মুসলিমের দেশ তিউনিসিয়া। তাদের সংসদে মেজরিটি-ভোটে গঠনতন্ত্র পাশ হল । দেশের আইন ব্যবস্থা শারিয়া-ভিত্তিক হবে না, হবে আধুনিক। তিউনিসিয়াকে আর "ইসলামী রাষ্ট্র" বলা হবেনা, বলা হবে রিপাবলিক বা "প্রজাতন্ত্র"। বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের শিরোমণি সৌদি  আরবের মন্ত্রনালয় নির্দেশ দিয়েছে "জুমা'র নামাজের খুতবায় রাজনৈতিক বক্তব্য দিলে ইমাম চাকরী হারাবেন"।এটা জরুরী ভিত্তিতে চালু করতে হবে এদেশেও।আবারো বলছি,সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে যে দৃষ্টান্ত , সেটা অনুসরণ করতে হবে।
 অনেক বিপর্যয়ের পর দেশে আবার স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরছে মনে করছে মানুষ। এ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ সরকারকে মানবতা রক্ষার সংকল্পে অটল থাকতে হবে।আর এ কারণেই রাজনীতিতে ধর্ম এবং ধর্মে রাজনীতি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে হবে সরকারকে।রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় এর কোন বিকল্প নেই।  

Sumikhan29bdj@gmail.com

Thursday, January 16, 2014

চলে গেলেন সাংস্কৃতিক সংগঠক ত্র্রিদিব চৌধুরী - সুমি খান

  সবার প্রিয় টুলু' দা, চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক সংগঠক,রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ চট্টগ্রামের সহ-সভাপতি ত্রিদিব চৌধুরী চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ৬৩ বছর বয়স হয়েছিলো তার।   কয়েকদিন আগেই দেশের বাইরে থেকে চলে এলেন ভোট দেবার জন্যে ।ভাই বারবার অনুরোধ করলেন দেশের এ পরিস্থিতিতে না ফিরতে, শোনেন নি ভাইয়ের কথা। দেশের এমন ক্রান্তিলগ্নে একজন সচেতন নাগরিক তার ভোটাধিকার প্রয়োগ না করে থাকেন কী করে?  আশা করি নির্বাচিত সাংসদরা এমন সচেতন দায়িত্বশীল নাগরিক দের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালন করবেন।
১০৫ ডিগ্রী জ্বর নিয়ে টুলু'দা কয়েক দিন বাড়িতেই ছিলেন । কোন চিকিৎসক দেখান নি।দেরি হয়ে গেলো বড়ো! তিনি চিরকুমার ছিলেন। প্রচন্ড জ্বর নিয়ে চট্টগ্র্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে ভর্তি হবার দু'দিনের মধ্যেই ১৫ জানুয়ারী  বুধবার সন্ধ্যায় হাসপাতাল থেকে জানানো হলো, টুলু'দার প্রত্যঙ্গ সমূহ একের পর একে  নিস্ক্র্রিয় হয়ে যাচ্ছে।১৭ জানুয়ারী রাত  প্রথম প্রহর ২টা ২০ মিনিটে সব চেষ্টাই ব্যর্থ  করে টুলু'দা চলে গেলেন। ভোর ৪টায় তাকে চট্টগ্রাম বৌদ্ধমন্দিরের পাশে এনায়েতবাজার 'কল্যাণী'  তে আনা হয়েছে। সেখানেই আছে  তার শবদেহ।
আজ বিকেল ৩ টায় কল্যাণী তে শোকসঙ্গীতের আয়োজন করা হয়েছে। বিকেল ৫টায় অভয়মিত্র শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন  করা হবে।
ধলঘাট.গ্রামে টুলু 'দার জন্ম ।উদিচী চট্টগ্রামের প্রথম কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন ত্রিদিব চৌধুরী।
   আজ খুব  মনে পড়ছে আমাদের বড়োদদিমিণির কথা!  অপর্ণা চরণ স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী প্রণতি সেন এর ভাগ্নে টুলু'দা। আমাদের বড়ো  দিদিমণি প্রণতি সেন  থাকতেন তাঁর বান্ধবী এবং তার আমৃত্যু সহযোদ্ধা কল্যাণী সেনের সাথে তাঁর এনায়েত বাজারের বাড়িতে।দুই বন্ধুই চিরকুমারী ছিলেন। কল্যানী সেন এবং  প্রণতি সেন বীরকন্যা প্রীতিলতার  শিষ্য অনুসারী  নিবেদিতা প্রাণ শিক্ষক ছিলেন। প্রীতিলতা অপর্ণা চরণ স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। প্রণতি সেন এবং কল্যাণী সেন তাদের মেধা মনন এবং জীবনযাত্র্রায়  অনন্য  ছিলেন। যা  স্মরণীয় হয়ে আছে তাঁদের ছাত্রীদের হৃদয়ে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক চিকিৎসক বিপ্লবী  ডা. কেশব সেনের  একমাত্র কন্যা   কল্যাণী সেন দেশমাতৃকার কল্যানে শিক্ষাব্রতী হিসেবেই আমৃত্যু নিবেদন করেন তার জীবন । অপর্ণা চরণ স্কুল পরচিালনা করতে গিয়ে চট্টগ্রামের সমাজপতিদের চরম অসহযোগিতা এবং অন্যায় হস্তক্ষেপের চাপে   ১৯৮৪ সালের ৭ জুন হৃদযন্ত্র্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু বরণ করেন   স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্র্রী প্রণতি সেন । সেদিন   আমাদের স্কুলে বড়োদিদিমণির মরদেহ আনার সাথে সাথে  বড়োদিদিমণির শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী  রবীন্দ্রসঙ্গীত শুরু হয়। কাবেরী সেনগুপ্তা , জয়ন্তী লালা আমাদের দিদিমণিরা একের পর একে গেয়ে গেলেন, তোমার অসীমে প্রাণ মন লয়ে, আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু,.....! সেদিন  প্র্রথম মায়ের সাথে কেশব ভবনে গেলাম। দেখলাম টুলু'দা, অরুণ কাকা ( কবি , সাংবাদিক অরুণ দাশগুপ্ত) সবাই মাটিতে বসে আছেন। রবীন্দ্র্র সঙ্গীত গাইছেন অনেকে।  দাদা (টুলু'দা) মাথা নেড়ে আমাকে ও গাইতে বললেন। বড়ো দিদিমণিকে হারিয়ে শোকগ্রস্থ হৃদয়ে গান ধরলাম, 'আগুনের পরশ মণি ছোঁয়াও প্রাণে, এ জীবন পূণ্য করো.....এ জীবন পূণ্য করো দহন দানে..।'

চিরবন্ধু  হারানোর শোক বুকে নিয়ে আরো কিছু দিন বেঁচে ছিলেন কল্যাণী সেন। তিনি মৃত্যু বরণ করেন ২০০০ সালের দিকে। এর আগে তিনি  টুলু'দাকে  বাড়িটি দান করে যান ।
কল্যানী সেনের বাড়ির জায়গাতেই ষ্টুডিও করে  ফটোগ্রাফী করতেন ত্রিদিব চৌধুরী। পরবর্তীতে  কল্যানী সেনের  এলাকার সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে অতীষ্ঠ হয়ে বাড়িটি ডেভেলাপার কে দিয়ে দেন।
 কল্যাণী দিদিমণিকে দেখতে  আমার অতুলন কে নিয়ে একবার গেছি '৯৯ সালের দিকে সম্ভবতঃ। খুব আশীর্বাদ করলেন!  এর পর আর ঐ বাড়িতে আর যাই নি।
 স্মিত হাস্য নিভৃতচারী মৃদুভাষী মানুষ টুলু 'দাকে শেষ দেখা দেখলাম  ১৫ জানুয়ারী রাত ১১টায় মেট্রোপলিটন হাসপাতালের এইচ ডিইউ বেডে শায়িত। আমার পুত্র ইরাবান আলীম অতুলন , আলেক্স আলীম আর আমি দরোজার বাইরে থেকে দেখলাম  টুলু'দা একটু নড়াচড়া করছেন !!  আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম সেরে উঠবেন ভেবে। না হয় নি!  টুলু'দা আর  ফিরলেন না আমাদের মাঝে!‍! সেখানে দেখা হলো ড. অনুপম সেন স্যার, অরুণ দাশগুপ্ত,  আবুল মোমেন, অনুপ সাহা,  কুন্তল বড়ুয়া, সোমা বড়ুয়া সহ অনেকের সাথে। সবার মধ্যেই হতাশা। কেন সময়মতো ডাক্তার দেখালেন না, টুলু'দা? কেন এতো উদাসীনতা নিজের প্রতি? ভারতের সহকারী হাই কমিশনার সোমনাথ সেনগুপ্ত বললেন, " খুব রাগ হচ্ছে আমার, কেন উনি এতো জ্বর নিয়ে বাড়িতে রয়ে গেলেন? ..." !! এমন ই নিভৃতচারী টুলু 'দা আজ আমাদের সব রাগের উর্ধ্বে !!
 সকালে মা ই প্রথম এ দুঃসংবাদ জানালেন কলম্বো থেকে। মা ক'দিন আগেই কলম্বো গেছেন আমার আপা বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী  কিশওয়ার কামাল খানের সাথে তার বাড়িতে। কিশু আপা আর টুলু'দা  সহপাঠী এবং  বন্ধু ! তিনি সকালেই এ দুঃসংবাদ পেয়েছেন। মা ও জেনেছেন ।  আমার মা নূর জাহান খান স্বাভাবিক ভাবেই টুলু'দা র এমন আকস্মিক প্রয়াণে ভীষণ মর্মাহত। সশরীরে আসতে না পারলে ও তিনি যেন সর্বক্ষণ চট্টগ্রামেই আছেন। বললেন তাঁর পক্ষ থেকে যেন ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানাই টুলু'দার শেষযাত্রায়!

 আত্মকেন্দ্রীক ক্ষমতালোভী নেতৃত্বের এই দুঃসময়ে ত্রিদিব চৌধুরীর মতো সৎ, নিঃস্বার্থ এবং  সচেতন সংগঠক বিরল! তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই প্রজন্মের কাছে তার কর্ম এবং জীবন সঠিক ভাবে উপস্থাপনের আশা প্রকাশ করছি।
টুলু'দার আত্মার শান্তি কামনা করছি।

Tuesday, January 14, 2014

সংখ্যালঘুদের আজ ঘুরে দাঁড়ানোর সময় : দেবাহুতি চক্রবর্তী


 সাম্প্রতিককালে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশ সম্পর্কিত আলোচনার শীর্ষ বিষয়গুলোর অন্যতম বিষয় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা। এ বিষয়ে বিভিন্ন মহলের ও বিশিষ্টজনদের বক্তব্য, লেখনী আমরা পড়ছি, দেখছি। আমরা কেউ কেউ আবেগে আপ্লুত হচ্ছি। কেউ কেউ ক্ষোভে ফুঁসে উঠছি। অথচ বিষয়টা কোন অপ্রত্যাশিত নয়। বিস্মিত হওয়ার মতোও কোন ঘটনা নয়। বিভিন্ন সময়ে বিশেষত দেশে কোন নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ধরনের ঘটনা অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০০১ সালের নির্বাচনের পর এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংস ঘটনার প্রেক্ষিতে পত্র-পত্রিকায় আমি নিজেও কিছু লেখালেখি করেছি। মিলিয়ে দেখলাম, আবেগ দিয়ে লিখতে গেলে একই লেখার পুনরাবৃত্তি করতে হয়। একই লেখা হুবহু প্রকাশ করলেও পার্থক্য খুঁজে পাওয়া কঠিন।

কিন্তু আজ আমি সম্পূর্ণ আবেগমুক্ত। শরীরে কঠিন ব্যাধি ক্যান্সার নিয়ে ভারতে দীর্ঘ চিকিৎসার পর সম্প্রতি দেশে এসেছি। একটা কথা জেনেছি, ক্যান্সার কোন সংক্রামক ব্যাধি নয়। জেনেটিক কিনা সে বিষয়েও চিকিৎসাবিজ্ঞান দ্বিধাগ্রস্ত। দেশে ফিরে যা দেখছি, যা শুনছি তাতে মনে হচ্ছে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রযন্ত্রের অঙ্গে অঙ্গে ক্যান্সার। যার অন্যতম বহিঃপ্রকাশ এ নিরবচ্ছিন্ন সাম্প্রদায়িকতা। ভাবতে ইচ্ছে করে এ কি সংক্রামক হিসেবে না উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়াজ্জ?

তা না হলে এমনটি তো হওয়ার কথা ছিল না। এ ভূখ-ে সাম্প্রদায়িকতার উৎসজ্জ তার স্বরূপজ্জ তার বিবর্তিত ইতিহাস খুঁজতে বহুদূর যাওয়া যেতে পারে। একাত্তরজ্জ পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয়জ্জ ব্রিটিশ ভারতজ্জ মোগল আমলজ্জ সেসব অনেক দূরবর্তী ইতিহাস। সেসব বিষয়ে ইতিহাসবিদ এবং গবেষকরা এযাবৎ আলোচনা-পর্যালোচনায় রয়েছেন, থাকবেন। সেটাই স্বাভাবিক।

জ্জ আমরা সাধারণ মানুষ সোজাসুজি দেখেছি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূল চেতনা ছিল অসাম্প্রদায়িকতা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী এবং তার বাঙালি দোসরদের হাতে আনুপাতিক হিসাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও নির্যাতিত হিন্দু সম্প্রদায়। তবু মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জনের পরে খুব অল্পসংখ্যক হিন্দু পরিবারই ভারতে থেকে গেছে। নতুন বিশ্বাসে ফিরে এসেছে অধিকাংশ শরণার্থীই। বাহাত্তরের সংবিধানের মূল চারটি স্তম্ভে সে বিশ্বাস আরও গ্রথিত হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য একাত্তর পরবর্তী হিন্দু জনসংখ্যা আজ এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। এ কি শুধুই হিন্দুদের ভারতপ্রীতি আর দেশপ্রেমের অভাব?

বাস্তবতা অনেক কঠিন। ১৯৬৪'র পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর থেকে শত্রু সম্পত্তি আইনের নামে হিন্দু সম্পত্তি আত্মসাতের যে প্রক্রিয়া শুরু হয় তা স্বাধীন বাংলাদেশে নানা ছদ্মনামে; নানা বাতাবরণে রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১২ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

২০১২'র অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ আইন অবশ্যই বিগত সরকারের প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু ক্রমশ আইনের প্রায়োগিক সমস্যায় ও বিচারাঙ্গন এবং সরকারের রাজস্ব দফতরের দীর্ঘসূত্রতা ও অধিকাংশ ক্ষেত্রে চরম দুর্নীতির মুখে হিন্দু সম্প্রদায় এখানেও নানাভাবে নাজেহাল হচ্ছে। নিজের মাটি নিজের করে পেতে যে আর্থিক ও মানসিক খেসারত আইনের আড়ালে জোগান দিতে হচ্ছে তা দুঃখজনক এবং এক্ষেত্রেও নতুন করে নানাবিধ হুমকি ও শত্রুতা সৃষ্টি হচ্ছে। যার সবটা দৃশ্যমান নয়। কিন্তু সরকারের দূরদৃষ্টি স্বচ্ছ হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।

একাত্তর পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের যেসব তালিকা তৈরি হয়েছে তার মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্তি খুবই কম। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকবাহিনী ও তার বাঙালি দোসরদের হাতে নিহত হিন্দুদের তালিকা কখনই যথাযথভাবে প্রস্তুতের পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। আমার অসুস্থকালীন সময়ে আমি নিজে কিছু অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের দরখাস্ত তৈরি করতে যেয়ে দেখেছি হিন্দু পরিবারগুলোয় মুক্তিযুদ্ধে নিহত মানুষগুলোর নাম শহীদ হিসাবে অন্তর্ভুক্তি তো দূরের কথা তাদের সম্পত্তি ভিপি তালিকাভুক্ত হয়ে আছে। রাজবাড়ী জেলায় একমাত্র শহীদ অ্যাডভোকেট কালীশঙ্কর মৈত্রের সম্পত্তি ও ভিপি সম্পত্তি দাবি করে সরকার দীর্ঘদিন মামলায় লড়ে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছে। কিন্তু এ শহীদ অ্যাডভোকেটের নামে বহুবার প্রস্তাব দেয়া সত্ত্বেও রাজবাড়ী জেলায় কোন জনপ্রতিনিধি বা সরকারের পক্ষ থেকে একটা নামফলক পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যাবে না। দেশজুড়ে হিন্দুদের প্রাপ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ রকম।

পঞ্চম ও অষ্টম সংশোধনীর পর দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আসা মহাজোট সরকার যার মধ্যে কথিত প্রগতিশীল বাম নেতারাও রয়েছেন পঞ্চদশ সংশোধনী এনে হিন্দু ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ধর্মীয় সম্প্রদায়কে চিরস্থায়ীভাবে সংখ্যালঘু ও দ্বিতীয়  শ্রেণীর নাগরিক এ পরিণত করেছেন।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সহজেই চিনতে পারে। ভয় পায়। আওয়ামী লীগ বা বাম দলগুলোকে অপেক্ষাকৃত কাছের মনে করতেই পারে। তাদের সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ধ্যান-ধারণার জন্য। কিন্তু তাদের হাতেই ধর্ম নিরপেক্ষতার বকচ্ছপ মূর্তি। বিষয়টা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বোঝে না তা নয়। রাজনৈতিক ক্ষমতা রক্ষার জন্য এ আপসকামিতার হিসাব সাধারণ মানুষ গুনতে জানে।

সব সরকারের আমলেই মুষ্টিমেয় দু'চারজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিকে বেছে নেয়া হয়। যারা কখনই নিজেদের স্বার্থ সুবিধা আদায় ছাড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন না। তার সর্বশেষ উদাহরণ সুরঞ্জিৎ সেনগুপ্ত। যার ছত্রছায়ায় পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোকে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার বাইরে ছুড়ে দেয়া হয়েছে।

বিশ্বের অধিকাংশ স্থানেই যে কোন ধরনের অর্থাৎ ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় অনেক সমস্যার মুখোমুখি হয়। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র নিজেই যদি সাম্প্রদায়িক চরিত্রের হয় তাহলে প্রতিকার পাওয়ার অবকাশ কোথায়?

২০০১ থেকেই যদি ধরি। অদ্যাবধি খুব অল্পসংখ্যক সহিংসতার ঘটনার বিচারে দোষীরা শাস্তি পেয়েছে। তদন্ত কমিশন গঠিত হয়। তার প্রস্তাব চাপা পড়ে যায়। বিদায়ী সরকারের আমলে রামু, কক্সবাজার, হাটহাজারী, সাতক্ষীরা অন্যান্য জায়গার সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কয়টি ঘটনার বিচার হয়েছে? শত শত মানুষকে আসামি করে যেমন-তেমন একটা চার্জশিট গঠন করে আদৌ কি বিচার পাওয়া সম্ভব? পাবনার সাতক্ষীরার ঘটনার স্পষ্টত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার অনুসারীদের নামটা উঠে এলো। সত্য-মিথ্যা যেটাই হোক। কোন নিরপেক্ষ তদন্ত এযাবৎ হয়নি। কোন নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন জনগণের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঘুচানোর জন্য প্রকাশ না করে শাসকপক্ষ তাকেই আবার সংসদীয় প্রতিনিধি হিসেবে সম্মানিত করলেন।

এসব কথাগু উঠে আসার অর্থ সংখ্যালঘু ধর্মীয় বা জাতিগত সম্প্রদায়ের কোন মানুষই মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বিশ্বাস করতে পারে না। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কাছে টানার মতো যথেষ্ট প্রচেষ্টা রাখেনি। বৃহৎ বাম দলগুলোর প্রধানরা একই নৌকায় একই সুরে ভাটিয়ালি গান করছেন। অন্য বাম দলগুলো নিজেদের অন্তর্দ্বন্দ্বে এতই খ- বিখ- যে তারা কোন বিকল্প শক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। তাহলে কী চিরদিন এদেশে একদিকে নির্যাতন-ধর্ষণ-সর্বস্ব হারানো, অন্যদিকে করুণা আর সহানুভূতির পাত্র হয়েই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়দের দিন যাপনের গ্লানি বইতে হবেজ্জ ?

চিকিৎসার সুবাদে দীর্ঘ নয় মাস ভারতে থাকার সুবাদে নানা আলাপ-আলোচনায় যেটুকু বুঝেছি, এদেশের হিন্দুরা ভারত সরকারের কাছে সম্পূর্ণই এখন অবাঞ্ছিত, বহিরাগত ক্ষেত্রবিশেষে সন্ত্রাসী। একাত্তর পরবর্তী সময়ে ও ভারতে চলে যাওয়া হিন্দুর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। কিন্তু আইন-আদালত থেকে সব সময় নিজেদের রক্ষা করার জন্য সেখানেও তারা শামুকের মতো গুটিয়ে আছে। অন্যায়-অবৈধ পথে কাগজপত্র তৈরি করতে যেয়ে এ দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী শিক্ষিত ব্যক্তিকেও লিখতে হচ্ছে শুধুমাত্র স্বাক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন। আইনসম্মতভাবে ভারতীয় নাগরিকত্ব পেতে তাদের দু'চার প্রজন্মের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ফলে সেখানেও সব সময়ই নানা নিরাপত্তাহীনতায় তাদের দিন কাটছে। এ বাস্তবতায় এখান থেকে ঠেলা খেয়ে ভারতে যাওয়ার চিন্তাও এখন সচেতন হিন্দু সম্প্রদায় করতে পারে না। যাদের আর্থিক ক্ষমতা আছে, তারা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ইউরোপীয় দেশগুলো বেছে নিতে পারে। কিন্তু সেটা কজন?

আজ তাই সময় এসেছে, সত্যিকার অর্থে ঘুরে দাঁড়ানোর। ঘুরে দাঁড়ানোর অর্থ এই নয় সশস্ত্র সহিংসতার পথ। হিন্দুদের এবং অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিজ নিজ রাজনৈতিক চিন্তা, নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের কর্মী সংগঠন হিসেবে পরিচয় বা অন্তর্ভুক্তি থাকতেই পারে। সেখানে কোন বাধা নেই। কিন্তু সম্প্রদায়ের স্বার্থের প্রশ্নে দল মতের ঊর্ধ্বে দাঁড়ানোর আজ সময় এসেছে। সেখানে নিজেদের লেজুড় বৃত্তির বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে।

মনে রাখতে হবে একাত্তরে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে রাজাকার বা মৌলবাদীর সংখ্যা যা ছিল, আজ তার চেয়ে এই সংখ্যা অনেক অনেকগুণ বেশি। এর কারণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিভিন্ন আমলের সরকারি নীতি ও পৃষ্ঠপোষকতা। আজওজ্জ আগে বাঙালিজ্জ নাজ্জ মুসলমানজ্জ এ আত্মপরিচয়ের সংকট সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের অনেকেরই কাটেনি। বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পাশাপাশি আমরা লক্ষ্য করছি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম, বাংলাদেশের সত্যিকার প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার ধারক-বাহকরা আজ ধর্মীয় এবং জাতিগত-ভাষাগত বিভেদের বাইরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠিত দেখতে সাহসী পদক্ষেপ রেখে চলেছেন। আমরা তাদের অভিনন্দন জানাই। তাদের সঙ্গে তাদের পাশে এদেশের সব ধরনের সংখ্যালঘুদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে হবে। রাষ্ট্রীয় সাম্প্রদায়িকতার সংকট, বিভিন্ন শাসক ও রাজনৈতিক দলের সাম্প্রদায়িকতার সংকট নিরপেক্ষভাবে চিহ্নিত করতে হবে এবং এর বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ প্রতিরোধ সংহত করতে হবে। তবেই সম্ভব মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদী শক্তিকে এদেশ থেকে প্রতিহত করা। আজ আর পলায়নবাদের পথ নেই। কুণ্ঠিতজ্জ সংকুচিত হয়ে করুণা ভিক্ষার সময় নেই। আজ আত্মশক্তিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে এদেশের তরুণ প্রজন্ম ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার ধারক-বাহকদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিয়মতান্ত্রিক লড়াইয়ে এগিয়ে আসতে হবে। আজ তাই সব সংকোচের বিহবলতা; সব সংকটের দুঃসহতা কাটিয়ে নিজেদের আত্মশক্তিতে ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। কিছু কিছু প্রশ্ন জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে অমীমাংসিত আছে। কিন্তু এদেশের সব শ্রেণীর সংখ্যালঘুদের মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আত্মপরিচয়ের কোন সংকট নেই। এ গর্ব আর অধিকারবোধ নিয়েই নতুনভাবে পথ চলার পথ তৈরি করতে হবে। তা না হলে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।

Monday, January 13, 2014

তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রার্থনা: মুহম্মদ জাফর ইকবাল

জানুয়ারী ১২, ২০১৪

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালখুব সহজে আমার মন খারাপ হয় না। কিন্তু গত কয়েকদিন থেকে আমার খুব মনখারাপ। যারা এক নজর পত্রিকার দিকে তাকাবে কিংবা টেলিভিশনে খবর শুনবে তাদেরও মন খারাপ হয়ে যাবে। শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বী বলে এই দেশে মানুষের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভয়ে আতংকে জীবন বাঁচাবার জন্যে এই মানুষগুলো নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে। বাড়ির মেয়েদের বাড়ি থেকে সরিয়ে দিচ্ছে।
১৯৭১ সালে হিন্দু মুসলমান সবাই আক্রান্ত হয়েছিল। মুসলমান হলে কখনও কখনও হয়েতো মানুষ বেঁচে গিয়েছে। কিন্তু হিন্দু হলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাত থেকে কেউ কখনও প্রাণে বেঁচে ফিরে আসেনি। ১৯৭১ সালে আমরা গ্রামে লুকিয়ে আছি, তখন দেখেছি একজন হিন্দু মা তার শিশুসন্তানকে বুকে চেপে ধরে স্বামীর পিছু পিছু ছুটে যাচ্ছেন, তাদের চোখ-মুখের সেই উদভ্রান্ত অসহায় দৃষ্টি আমি কখনও ভুলতে পারব না।
তেতাল্লিশ বছর পর এই বাংলাদেশে এখনও একজন অসহায় হিন্দু মা তার সন্তানকে বুকে চেপে প্রাণ বাঁচানোর জন্যে ছুটে যাচ্ছেন। তার মানে যে দেশকে নিয়ে আমরা এত গর্ব করি সেই দেশটি আসলে তেতাল্লিশ বছরে এক ইঞ্চিও সামনে অগ্রসর হয়নি। এর চাইতে বড় দুঃখ, লজ্জা আর অপমান কী হতে পারে?
আমি মাঝে মাঝে কল্পনা করি আমি যদি এই দেশে একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হতাম তাহলে আমার কেমন লাগত। আমি জানি তাহলে গভীর হতাশায় আমার বুক ভেঙে যেত। আমি কোনো দোষ করিনি, কিন্তু শুধুমাত্র একটি হিন্দু পরিবারে জন্ম নিয়েছি বলে আমার উপর যে নৃশংস অত্যাচার করা হচ্ছে তার জন্যে আমার বুকে যেটুকু ক্ষোভ জন্ম নিত তার চাইতে শতগুণ বেশি অভিমান হত আমার চারপাশের নির্লিপ্ত মানুষজনকে দেখে। কেউ কোনো কথা বলছে না, নিরবে এক ধরনের করুণা নিয়ে আমাকে দেখছে।
সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ হত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। প্রতিবার নির্বাচনের পর, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় হবার পর, রায় কার্যকর হবার পর আমাদের উপর হামলা করা হবে। বিএনপি-জামাত হামলা করবে, আওয়ামী লীগ বা বাম দলগুলো সেটা ঘটতে দেবে। খুব বেশি হলে, নিরাপদ দূরত্ব থেকে প্রতিবাদ করবে। কিন্তু বুক আগলে কেউ রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে না।
এই দেশে আমি যদি হিন্দু ধর্মাবলম্বী হতাম তাহলে নিশ্চয়ই আমার বার বার মনে হত আমি এই দেশের মানুষ, কিন্তু এই দেশটি আমাকে রক্ষা করছে না। আমি নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তার কাছে অভিযোগ করে বলতাম– ‘‘তুমি কেন আমকে এমন একটি দেশে জন্ম দিয়েছ যেই দেশ আমাকে রক্ষা করার দায়িত্ব নেয় না? এই দেশে আমাকে প্রতি মূহুর্ত আতংকে থাকতে হয়?’’ কিন্তু আমি হিন্দু ধর্মাবলম্বী নই; তাই প্রকৃতপক্ষে তাদের বুকের ভেতর যে গভীর দুঃখ, ক্ষোভ, হতাশা আর অভিমান পুঞ্জিভূত হয়ে আছে আমি সেটা কোনোদিন অনুভব করতে পারব না।
আমাদের প্রিয় দেশটি নিয়ে আমাদের কত কল্পনা, কত স্বপ্ন। আমরা আশা করে আছি আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করবে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে যাবে, একদিন দেশটা মাথা তুলে দাঁড়াবে। আমরা এর মাঝে সেগুলো এই দেশে শুরু হতে দেখেছি। কিন্তু এই মূহুর্তে আমার কাছে সবকিছু অর্থহীন বলে মনে হচ্ছে। যদি আমরা একজন মানুষকে শুধুমাত্র ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হওয়ার জন্যে এই দেশে নিরাপত্তা দিতে না পারি তাহলে এই দেশটি কাদের জন্যে?
আমার মনে হয়, এই দেশ নিয়ে আমাদের যত কল্পনা, যত স্বপ্ন, যত পরিকল্পনা সবকিছু পেছনে সরিয়ে সবার আগে আমাদের এখন একটি মাত্র লক্ষ্য টেনে নিয়ে আসতে হবে। সেই লক্ষ্যটি হচ্ছে, এই দেশে একটি হিন্দু শিশু যেন নিশ্চিন্ত নিরাপত্তায় তার মায়ের বুকে মাথা রেখে ঘুমাতে পারে। গভীর রাতে ধর্মান্ধ মানুষের উম্মত্ত চিৎকারে তাদের যেন জেগে উঠতে না হয়। আগুনের লেলিহান শিখায় আপনজনের আতংকিত মুখ দেখতে না হয়। একজন হিন্দু কিশোরীকে যেন তার বাবার রক্তশূন্য মুখের দিকে তাকিয়ে থরথর কাঁপতে কাঁপতে বলতে না হয়– “এখন কী হবে বাবা?”
আমরা পদ্মা সেতু চাই না, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চাই না, যানজটমুক্ত বাংলাদেশ চাই না, শতকরা একশভাগ নিরক্ষর চাই না, ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ চাই না। শুধুমাত্র হিন্দু এবং অন্যসব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা চাই যেন তারাও ঠিক আমাদের মতো এই দেশটিকে তাদের নিজেদের ভালোবাসার দেশ বলে ভাবতে পারে। তীব্র অভিমানে তাদের বুক ভেঙে যেন আর কোনোদিন খান খান হয়ে না যায়।
আমি কার কাছে এটি চাইব জানি না, তাই তরুণ প্রজন্মের কাছে চাইছি। তোমরা আমাদেরকে একটি নূতন বাংলাদেশ উপহার দাও। যে বাংলাদেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প চিরদিনের জন্যে মুছে দেওয়া হবে। আমি জানি তোমরা পারবে।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল: লেখক ও অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Saturday, January 11, 2014

আত্মদানের ৮৯ বছর; মাষ্টার 'দা, তোমার দেশ আজো হিন্দু-মুসলিম প্রশ্নে রক্তগঙ্গায় ভাসছে- সুমি খান

'উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ,ভয় নাই ওরে ভয় নাই!নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান-ক্ষয় নাই  তার ক্ষয় নাই!"


 লাল সালাম মাষ্টার'দা সূর্যসেন !! বীর চট্টগ্রামের সূর্যসন্তান মাস্টার’দার প্রতি তাঁর আত্মদানের ৮৯ তম দিবসে গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। 
১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ এপ্রির ৬৫ জন বিপ্লবী  সহযোদ্ধা নিয়ে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করে পরাধীন অবিভক্ত  ভারতকে চারদিন স্বাধীন রেখেছিলে তুমি । আজ তোমার জয়ে স্বাধীন তোমার বাংলা, তুমি দেখে যেতে পারো নি। তোমার উত্তরসূরিরা তোমার আত্মদান বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছে। তোমার বাংলায়  অসাম্প্রদায়িক বাংলা প্রতিষ্ঠার লড়াইযে সোচ্চার তোমার উত্তরসূরীরা। চিরকাল এ বাংলায় অন্যায় অসত্য এবং সাম্প্রদায়িক অন্ধকারের শক্তির পরাজিত করে অসাম্প্রদায়িক ,মানবতার বাংলার ঝান্ডা উড়বে।, যার ভিত গড়ে দিয়েছো তুমি এবং তোমার অপ্রতিরোধ্য সহযোদ্ধা বিপ্লবীরা। 
 মাতৃভূমিকে মুক্ত করার সংগ্রামে নেতৃত্ব দানের সফলতায় ভীত বৃটিশ সরকার ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারী চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে  মাষ্টার'দা সূর্যসেনকে হত্যা করে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। 
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বর্বর ব্রিটিশ রাজের পুলিশ বাহিনী মাষ্টার'দা র পবিত্র দেহ বঙ্গোপসাগরে নিক্ষিপ্ত করেছিলো। সেদিন প্রাণহীন মাস্টার'দা সূর্যসেন ও ব্রিটিশ রাজের কাছে মূর্তিমান আতংক ছিল, এখনো অন্ধকারের শক্তি মাস্টার’দার সাহস ও দেশপ্রেম কে ভয় পায় !!
এ কারণে এখনো এদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তি উন্মাদ। সমাজ, সভ্য়তা ধর্মান্ধতা এবং সাম্প্রদায়িক বিষে জর্জরিত।
মাষ্টার 'দার জীবনী বারবার পড়তে হবে আমাদের; জানাতে হবে পরবর্তী প্রজন্মকে! সারা দেশে তার ভাস্কর্য স্থাপন করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে বীরগাথা!
মাষ্টার'দা  সূর্যসেন। ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবের অমর নায়ক। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনসহ বহু বিপ্লবের অধিনায়ক। পুরো নাম সূর্য কুমার সেন। সংক্ষেপে সূর্যসেন নামে অধিক পরিচিত। 'মাষ্টার 'দা' নামে সহযোদ্ধাদের কাছে পরিচিত ছিলেন। সূর্যকুমার সেন, ডাকনাম কালু, যিনি মাস্টারদা নামে সমধিক পরিচিত । ভারত উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের বীর ব্যক্তিত্ব।

’ হিন্দু- না ওরা মুসলিম?  সাম্প্রদায়িক শক্তি এই প্রশ্ন দিয়ে হিংসা বিদ্বেষ বিভাজনে পরিবার পরিবেশ ,সমাজ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।


২০১৪ সালে মাস্টার'দার আবক্ষ মূর্তিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

মাষ্টার'দার বীরগাথা

 মাষ্টার'দার বীরত্বের পথ বেয়ে আমরা আজ পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত। 
স্বাধীন দেশে লাল সবুজের পতাকা উড়িয়ে আত্মপরিচয়  বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে পেরেছি মাষ্টার'দার আত্মদানের পথ বেয়ে! 
  এই বাঙালি বিপ্লবী তৎকালীন ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে নেতৃত্বদেন এবং হাসিমুখে ফাঁসিতে আত্মদান করেন।














২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারী  মাস্টার'দার আবক্ষ মূর্তিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পন করেন যাঁরা  ইরাবান আলীম অতুলন, ঋতবান আলীম গহন, আলেক্স  আলীম সহ চট্টগ্রাম বাসী



বাংলাদেশে তাঁর সম্মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে আবাসিক হলের নামকরণ করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সূর্য সেনের স্মরণে বাঁশদ্রোণী মেট্রো স্টেশনটির নামকরণ করা হয়েছে “মাস্টারদাসূর্য সেন মেট্রো স্টেশন”






































সূর্য সেন ১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়ায় অর্থনৈতিক ভাবে অস্বচ্ছল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম রাজমনি সেন এবং মাতার নাম শশী বালা সেন। রাজমনি সেনের দুই ছেলে আর চার মেয়ে। সূর্য সেন তাঁদের পরিবারের চতুর্থ সন্তান। দুই ছেলের নাম সূর্য ও কমল।চার মেয়ের নাম বরদা সুন্দরী, সাবিত্রী, ভানুমতি ও প্রমিলা। শৈশবে পিতা মাতাকে হারানো সূর্য সেন কাকা গৌরমণি সেনের কাছে মানুষ হয়েছেন। সূর্য সেন ছেলেবেলা থেকেই খুব মনোযোগী ছাত্র এবং ধর্মপ্রাণ গম্ভীর প্রকৃতির ছিলেন।
১৯১৬ সালে বহররমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে সূর্য সেন সরাসরি রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হন। বিপ্লবীদের গোপন ঘাঁটি এই কলেজ়ে তিনি অধ্যাপক সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীর সান্নিধ্যে আসেন। তিনি যুগান্তর দলের সাথে যুক্ত ছিলেন। সূর্য সেনকে তিনি বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষা দেন। 
 মাস্টার’দা সূর্য সেন ১৯১৮ সালে শিক্ষাজীবন শেষ করে চট্টগ্রামে এসে গোপনে বিপ্লবী দলে যোগ দেন। 
৪৯নং বেঙ্গল রেজিমেন্টের নগেন্দ্রনাথ সেন ১৯১৮ সালে চট্টগ্রামে এসে সূর্য সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী ও চারুবিকাশ দত্তের সাথে দেখা করেন। 
সূর্য সেন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী অম্বিকা চক্রবর্তী পাশাপাশি গ্রামের ছাত্র হিসেবে ছোটবেলা থেকেই পরস্পরের পরিচিত ছিলেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) শেষের দিকে অনুরূপ সেন, চারুবিকাশ দত্ত, অম্বিকা চক্রবর্তী, নগেন্দ্রনাথ সেন প্রমুখদের সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রামে গোপন বিপ্লবী দল গঠন করা হয়। 
এখানে উল্লেখ্য, শুরুতে চট্টগ্রামের বিপ্লবী দল একটিই ছিল। তারা বাংলার প্রধান দু'টি বিপ্লবী দল "যুগান্তর" এবং "অনুশীলন"- কোনটির সাথে একেবারে না মিশে স্বতন্ত্র কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। 
বিপ্লবী নেতা মাস্টার’দা সূর্য সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী তখন চট্টগ্রাম শহরের দেওয়ানবাজার দেওয়ানজী পুকুরপারে 'সাম্য আশ্রম' প্রতিষ্ঠা করে ওখানে থাকেন।সেখানে গোপনে বিপ্লবীরা জমায়েত হয়। 
পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিপ্লবী দলের অন্যতম নেতা চারুবিকাশ দত্ত তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে "অনুশীলন" দলের সাথে যুক্ত হন। এভাবে চট্টগ্রামেও বাংলার অন্যান্য জেলার মত দু'টি বিপ্লবী দল গড়ে ওঠে। দুই দলে বিভক্ত হওয়ার পর চট্টগ্রামে যে বিপ্লবী দলটি স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে কংগ্রেসের প্রকাশ্য আন্দোলনে কোলকাতার "যূগান্তর" দলের সঙ্গে সহযোগিতা করত, সে দলের সাংগঠনিক কমিটির সভাপতি ছিলেন সূর্য সেন; সহসভাপতি- অম্বিকা চক্রবর্তী; শহর সংগঠনের দায়িত্বে ছিলেন গণেশ ঘোষ ও অনন্ত সিংহ; গ্রামের সংগঠনের দায়িত্বে ছিলেন  নির্মল সেন।  লোকনাথ বলকে ছাত্র আন্দোলন ও ব্যায়ামাগার গঠন সহ বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়। 
অনুরূপ সেন বিপ্লবীদলের সংবিধান লিখলেন এবং তাঁকে ও নগেন্দ্রনাথ সেনকে কলকাতার অন্য দলগুলোর সাথে যোগাযোগ এবং অস্ত্র সংগ্রহের দায়িত্ব দেয়া হয়।

নাগরখানা পাহাড় খন্ডযুদ্ধ
১৯২০ সালে গান্ধীজী- কর্তৃক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে অনেক বিপ্লবী এই আন্দোলনে যোগ দেন। গান্ধীজীর অনুরোধে বিপ্লবীরা তাদের কর্মসূচি এক বছরের জন্য বন্ধ রাখেন।সূর্য সেন অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিলেন। 
চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুলের দশম শ্রেনীর ছাত্র বিপ্লবী অনন্ত সিংহ ছাত্র ধর্মঘট পরিচালনা করার দায়ে স্কুল থেকে বহিস্কৃত হন।
মহাত্মা গান্ধী ১৯২২ সালে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করলে বিপ্লবী দলগুলো আবার সক্রিয় হয়ে উঠে। তখন চট্টগ্রাম কোর্টের ট্রেজারী থেকে পাহাড়তলীতে অবস্থিত আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কারখানার শ্রমিক ও কর্মচারীদের বেতন নিয়ে যাওয়া হতো। 
১৯২৩-এর ১৩ ডিসেম্বর টাইগার পাস  সড়ক এর মোড়ে সূর্য সেনের গুপ্ত সমিতির সদস্যরা প্রকাশ্য দিবালোকে  রেল শ্রমিকদের বেতন ১৭,০০০ টাকার বস্তা ছিনতাই করেন। ছিনতাইয়ের প্রায় দুই সপ্তাহ পর গোপন বৈঠক চলাকালীন পুলিশ খবর পেয়ে বিপ্লবীদের আস্তানায় হানা দিলে পুলিশের সাথে বিপ্লবীদের খন্ডযুদ্ধ হয় যা "নাগরখানা পাহাড় খন্ডযুদ্ধ" নামে পরিচিত। সেই সম্মুখযুদ্ধের পর গ্রেফতার হন মাস্টার'দা সূর্য সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী। 

রেলওয়ে ডাকাতি মামলা শুরু হয় সূর্য সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে। অনন্ত সিং  এবং গণেশ ঘোষের নামে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হয়। কলকাতা হাইকোর্টের ব্যারিস্টার দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত এই মামলায় আসামি পক্ষের আইনজীবি ছিলেন। সূর্য সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী এ মামলা থেকে ছাড়া পেয়ে যান। গ্রেফতার করার পর বিপ্লবীদের উপর নির্যাতনের কারনে কলকাতা পুলিশ কমিশনার টেগার্টকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে বিপ্লবীরা। এ পরিকল্পনার কথা পুলিশ আগে থেকেই জানতে পারে। এ কারনে ২৫ অক্টোবর ১৯২৪ সালে গ্রেফতার হন গণেশ ঘোষ, নির্মল সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী, অনন্ত সিং সহ আরো কয়েকজন। পুলিশকে বার বার ফাঁকি দিয়ে শেষ পর্যন্ত ১৯২৬ সালের ৮ অক্টোবর সূর্য সেন কলকাতার ওয়েলিংটন স্ট্রীটে গ্রেফতার হন। বন্দী হবার পর তাঁকে মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলে রাখা হয়। পরে বোম্বের রত্নগিরি জেলে পাঠানো হয়, সেখান থেকে বেলগাঁও জেলে। ১৯২৭ সালে নির্মল সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী, অনন্ত সিং মুক্তি পান। আর ১৯২৮ সালের শেষভাগে সূর্য সেন ও গণেশ ঘোষ জেল থেকে ছাড়া পান।
বিপ্লবী ভাবধারায় দীক্ষিত সূর্য সেন দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগকে একমাত্র তপস্যা হিসেবে নিয়েছিলেন। তাই তিনি বিয়েবিরুদ্ধছিলেন। কিন্তু  স্নাতক পাশ করে চট্টগ্রামে আসার পর থেকেই তাঁর অভিভাবকরা বিয়ের কথা তোলেন। এক পর্যায়ে তাঁর বড় ভাই শিক্ষক চন্দ্রনাথ সেন (সহোদর নয়) ও অন্যান্য আত্মীয়দের বিশেষ অনুরোধে ১৯১৯ সালে তিনি চট্টগ্রামের কানুনগো পাড়ার নগেন্দ্রনাথ দত্তের ষোল বছরের কন্যা পুষ্পকুন্তলা দত্তকে বিয়ে করেন। আত্মীয়-স্বজনের চাপে বিয়ে করলেও মাস্টারদার মনে এ ধারণা ছিল যে, বিবাহিত জীবন তাকে কর্তব্যভ্রষ্ট করবে, আদর্শচ্যুত করবে। স্ত্রীর সংগে একদিনও তিনি কথা বলেন নি।  হিন্দুপ্রথামতে  বিবাহের তৃতীয় দিনে ফুলশয্যা।সেদিন মাস্টার'দা তাঁর বৌদিকে বলেন, তিনি স্বপ্ন দেখেছেন স্ত্রীর সংগে সহবাসে তাঁর মৃত্যু অনিবার্য।সেদিনই গ্রামের বাড়ি ছেড়ে শহরে চলে আসেন এবং স্ত্রীর সাথে আর কোনদিন দেখা করেন নি মাস্টার’দা। 
১৯২০ সালে গান্ধীজী স্বরাজ এনে দেওয়ার জন্য বিপ্লবীদের কাছ থেকে এক বছর সময় চেয়ে নেন। তৎকালীন বিপ্লবীরা অহিংস নীতিতে বিশ্বাসী না হলেও গান্ধীজির কথায় অনেকেই সহযোগিতা করেছিলেন।ঘোষিত এক বছর সময়সীমার মধ্যে অহিংস আন্দোলন ভারতের স্বরাজ আনতে ব্যর্থ হলে বিপ্লবীরা আবার সশস্ত্র বিপ্লবের পথ বেছে নেন।
 অসহযোগ আন্দোলনের সময় স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় মাস্টার'দা জাতীয় বিদ্যালয় গড়ে তোলেন এবং নন্দনকাননের প্রাথমিক  বিদ্যালয়ে  শিক্ষকতার কাজ শুরু করেন। তিনি খ্যাত হন 'মাস্টার'দা 'নামে। এই বিদ্যালয়টিই পরে তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।
১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই ডিসেম্বর চট্টগ্রাম শহরে একপ্রান্তে বাটালি পাহাড় এলাকায় সরকারি রেলের টাকা লুণ্ঠন করেন বিপ্লবী রা। এই লুণ্ঠনে অংশগ্রহণ করেন অনন্ত সিং, দেবেন দে ও নির্মল সেন। অম্বিকা চক্রবর্তী ও দলিলুর রহমান (পরবর্তীতে তিনি বিশিষ্ট চিকিৎসক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন) রেল ডাকাতির সতের হাজার টাকা নিয়ে অস্ত্র কেনার জন্য কলকাতায় চলে যান। সে সময় শুলকবহর এলাকায়  বিপ্লবীদের সদর দপ্তর ছিল। ২৪শে ডিসেম্বর এই দফতরে পুলিশ হানা দেয়। এখান থেকে তাঁরা পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের সাথে সংঘর্ষ হয়। তাঁরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।  পালানোর পর মাস্টার'দা প্রথমে নগরকানা পাহাড়ে আশ্রয় নেন। 
পুলিশের হাতে ধরা পড়া প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেলে মাস্টারদা, অম্বিকা চক্রবর্তী ও রাজেন দাস তাঁদের পকেটে রাখা পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। অন্যান্যরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও মৃতপ্রায় মাস্টারদা ও অম্বিকা চক্রবর্তী পুলিশের হাতে ধরা পড়েন।  পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়েছিলেন, কিন্তু ভালো থাকার সময় সীমা পেরিয়ে যাওয়ার কারণে কার্যকারিতা হারিয়েছিল। ফলে এই তীব্র বিষ খেয়ে ও তাঁরা বেঁচে গিয়েছিলেন। পরে পুলিশ হাসপাতালে তাঁদের চিকিৎসার পর তাঁরা সুস্থ হয়ে ওঠেন। এঁদের বিরুদ্ধে পুলিশ ডাকাতির মামলা রুজু করেছিল।  মাষ্টার'দা সহ বিপ্লবীদের পক্ষে ব্যারিষ্টার যতীন্দ্র্র মোহন  সেন এই মামলা পরিচালনা করেন এবং প্রায় ৯ মাস কারাবন্দী থাকার পর মামলা থেকে তাঁরা খালাস পান।
১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের নোয়াপাড়ায় একটি অস্ত্রলুটের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় মাস্টারদার নাম শোনা যায়। এই কারণে ১ নং বেঙ্গল অর্ডিনেন্স ঘোষণা করে সারা বাংলায় বিপ্লবীদের ব্যাপকহারে গ্রেফতার করা হয়। শুধু  ২৫ অক্টোবর তারিখেই বাংলার বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ২০০ বিপ্লবী কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। এই সময় গ্রেফতার হন নেতাজী সুভাষ, অনিলবরণ রায় প্রমুখ নেতারাও।
 চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের নিয়ে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে মাস্টারদা কলকাতা শোভাবাজার এলাকায় আশ্রয় নেন। ওই সময় তাঁরা কলকাতার দক্ষিণেশ্বরে বোমা তৈরীর প্রশিক্ষণ নিতেন। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই নভেম্বর সেখানে পুলিশ হানা দেয়। সূর্যসেন গায়ের জামা খুলে খালি গায়ে একটা অপরিষ্কার ময়লা গামছা কাঁধে ফেলে চায়ের কেতলি হাতে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসেন। পুলিশ তাঁকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি সাদাসিধেভাবে বলেন, বাবু লোকদের জন্য চা আনতে যাচ্ছি। পুলিশের দারোগা কিছুক্ষণ জেরা করার পর সন্দেহ করার মতো কোনো কিছু না পেয়ে তাঁকে ছেড়ে দেয়। 
এর প্রায় একবছর পর ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের ৮ অক্টোবর কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রিটের এক মেস থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় ‘মুরারিপুকুর ষড়যন্ত্র মামলা’।
এ মামলায় ১৯২৮ সাল পর্যন্ত দু’বছর তাঁকে মেদিনীপুর প্রেসিডেন্সি জেল, পুনার রায়েরোড়া জেল ও বম্বের রত্নগিরি জেলে কারাবাস করতে হয়।
১৯২৮ সালের শেষের দিকে তাঁর স্ত্রী পুষ্পকুন্তলা মূমূর্ষু থাকার সংবাদ পেয়ে সূর্যসেন তাঁকে দেখতে আসবার অনুমতি প্রার্থনা করেন। এই আবেদন মঞ্জুর করা হলে তিনি জেল থেকে ছাড়া পান।তাঁকে নজরবন্দী রাখা হয়।  মাস্টার'দা বাড়ি পৌঁছার পর তাঁর স্ত্রী পুষ্প কুন্তলা মৃত্যুবরণ করেন।এরপরই মাস্টার'দা টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে তিন মাস শয্যাশায়ী থাকলেন। এ সময় একজন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট তাকে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেন এবং এর বিনিময়ে সংসারের খরচ ব্রিটিশ সরকার চালাবে বলে জানানো হয়।মাস্টার'দা সূর্যসেন তার কোনো জবাব দেন নি। সূর্যসেনের দাদা চন্দ্রনাথ সেন বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে সময় চেয়ে নেন। এরপর একদিন পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয় েসূর্যসেন পালিয়ে যান।কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকেন।
১৯২৯ সালের প্রথম দিকে তিনি চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সময় সূর্য সেনের দলের উদ্যোগে চারটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।১৯৩০ সাল থেকেই তাঁর উদ্যোগে ভবিষ্যৎ সশস্ত্র আন্দোলনের ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়।

এরপর থেকে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের জন্য পরিকল্পনা করতে থাকেন। এর চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই এপ্রিল। ১৮ এপ্রিল ১৯৩০, শুক্রবার রাত ৮টা বিদ্রোহের দিন হিসাবে ঠিক হয়। পরে তা দশটা করা হয়। চারটা বাড়ি হতে চারটা দল আক্রমণের জন্য বের হয়। সে রাতেই ধুম রেলস্টেশনে একটা মালবহনকারী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে উল্টে যায়। একদল বিপ্লবী আগে থেকেই রেল লাইনের ফিসপ্লেট খুলে নেয়। ফলে চট্টগ্রাম সমগ্র বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অন্য একটি দল চট্টগ্রামের নন্দনকাননে টেলিফোন এবং টেলিগ্রাফ অফিস আক্রমণ করে। হাতুড়ি দিয়ে তারা সব যন্ত্রপাতি ভেঙ্গে দেয় এবং পেট্রোল ঢেলে সেখানে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। আরেকটি দল পাহাড়তলীতে অবস্থিত চট্টগ্রাম রেলওয়ে অস্ত্রাগার দখল করে নেয়। উন্নতমানের রিভলবার ও রাইফেল গাড়ীতে নিয়ে অস্ত্রাগারটি পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগানো হয়। তবে সেখানে কোনো গুলি পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী বিপ্লবীরা দামপাড়ায় পুলিশ রিজার্ভ ব্যারাক দখল করে নেয়। ৬৫ জন যোদ্ধা নিয়ে প্রায় রাত দশটার দিকে আক্রমণ করে চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনে অবস্থিত অস্ত্রাগার দখল করেন তাঁরা। তখন তাঁদের পরনে ছিল সেনাবাহিনীর পোষাক। তাঁরা ব্যবহার করেছিলেন কয়েকটি রিভলবার এবং সাধারণ বন্দুক। অস্ত্রাগার ভেঙে তাঁরা মাস্কেট্রি রাইফেল, রিভলবার এবং কার্তুজ লাভ করেন। এই আক্রমণের শুরুতেই তাঁরা টেলিফোন লাইন কেটে দিয়েছিলেন। ফলে আক্রমণের সময়, ব্রিটিশ পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা শহরের অন্য প্রান্তের সৈন্যদের কাছে এই আক্রমণের যথার্থ সংবাদ পাঠাতে ব্যর্থ হয়। এই সময় বিপ্লবীরা এত দ্রুত আক্রমণ করে দখল করে নেয় যে, সার্জেন্ট ব্লাকবার্ন, কলোন, সার্জেন্ট মেজর ফেরেল-সহ অনেক অফিসার প্রতিরোধ করার আগেই মৃত্যুবরণ করেন। বিপ্লবীরা সফলভাবে টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হন এবং রেল চলাচল বন্ধ করে দেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী গণেশ ঘোষের নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী পুলিশ অস্ত্রাগারের এবং লোকনাথ বাউলের নেতৃত্বে দশজনের একটি দল সাহায্যকারী বাহিনীর অস্ত্রাগারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। এই দুঃসাহসী কাজের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে ছিলেন বিপ্লবের স্বপ্নপুরুষ মাস্টারদা সূর্য সেন।

 এতে ব্রিটিশ শাসকেরা ভয় পেয়ে যায়। তারা বুঝতে পারেবাংলা মায়ের সন্তানেরা পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙ্লো,  প্রায় দেড়শ বছরের মিথ্যা গৌরব ধুলোয় মিশে যায়। 

বিপ্লবীদের কাছে ব্রিটিশ আর্মি পরাজিত হয়ে পিছু হঠে যায়। সফল অভিযানের পর বিপ্লবী দলটি পুলিশ অস্ত্রাগারে সমবেত হয়ে মাস্টারদা সূর্য সেনকে মিলিটারি স্যালুট প্রদান করে। এ সময় সূর্য সেন জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার ঘোষণা করেন। এই আক্রমনে অংশ নেয়া বিপ্পবীরা দামপাড়া পুলিশ লাইনে সমবেত হয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। মিলিটারি কায়দায় কুচকাওয়াজ করে সূর্য সেনকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সূর্য সেন অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠনের ঘোষনা দেন। 

মাস্টার’দা তাঁর ঘোষনায় বলেন:"The great task of revolution in India has fallen on the Indian Republican Army. We in Chittagong have the honour to achieve this patriotic task of revolution for fulfilling the aspiration and urge of our nation. It is a matter of great glory that today our forces have seized the strongholds of Government in Chittagong…The oppressive foreign Government has closed to exist. The National Flag is flying high. It is our duty to defend it with our life and blood". 

 ব্রিটিশ পরাধীনতা থেকে বীর চট্টগ্রাম মুক্ত ছিল চারদিন। কিন্তু এরমধ্যে বিপ্লবীদের খাদ্যসংকট দেখা দিল।সূর্য সেন সহ অন্যদের কচি আম, তেঁতুল পাতা, কাঁচা তরমুজ এবং তরমুজের খোসা খেয়ে কাটাতে হয়। সূর্য সেন সহ ছয়জন শীর্ষস্থানীয় বিপ্লবীকে ধরার জন্য ইংরেজ সরকার ৫,০০০ টাকা পুরস্কার ঘোষনা করে।

 ১৯৩০ সালের ২২ এপ্রিল বিপ্লবীরা যখন জালালাবাদ পাহাড়ে ( বর্তমানে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের পাহাড়) অবস্থান করছিল সে সময় সশস্ত্র ইংরেজ সৈন্যরা তাঁদের আক্রমণ করে। দুই ঘন্টার প্রচন্ড যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর ৭০ থেকে ১০০ জন এবং বিপ্লবী বাহিনীর ১২ জন নিহত হয়। জালালাবাদ যুদ্ধের পর বিপ্লবী নেতাদের ধরার জন্য রেলস্টেশন, স্টীমারঘাট থেকে শুরু করে সব জায়গায় অভিযান চলছিলো। বিপ্লবীরা তখন বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে আত্মগোপন করেছিলো।

মাস্টার’দা সূর্য সেন ১৬ জন বিপ্লবীকে নিয়ে ২৪ এপ্রিল রাতে নিজ বাড়িতে ছিলেন। এর মধ্যে অনন্ত সিং পুলিশের কাছে স্বেচ্ছায় ধরা দেন এবং কয়েকজনকে পুলিশ আটক করে এদের বিরুদ্ধে অস্ত্রাগার লুন্ঠন মামলা শুরু করে। মামলা শুরু হওয়ার পর অসুস্থ অম্বিকা চক্রবর্তী পটিয়া থানার চক্রশালা গ্রামে গ্রেপ্তার হন। অম্বিকা চক্রবর্তী এবং সেসময় গ্রেপ্তার হওয়া অন্য বিপ্লবীদের নিয়ে দ্বিতীয় অস্ত্রাগার লুন্ঠন মামলা শুরু হয়। প্রায় ১৯ মাস বিচারের পর ১৯৩২ সালের ১লা মার্চ অস্ত্রাগার লুন্ঠন মামলার রায়ে অনন্ত সিং, লোকনাথ বল এবং গনেশ ঘোষসহ ১২ জনকে দ্বীপান্তর বাসের আদেশ দেয়া হয়। অপর মামলায় অম্বিকা চক্রবর্তীর প্রাণদন্ডের আদেশ হয়, পরে হাইকোর্টে আপিলের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়। 

রায়ের পর সূর্য সেনকে ধরার জন্য পটিয়া এবং গোমদন্ডীতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়। ব্রিটিশ সরকার ৫০০০টাকার দ্বিগুণ ১০,০০০ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করে মাস্টার’দা কে গ্রেফতার করবার জন্যে।১৯৩২ সালের ১৩ জুন রাত ৯টায় পটিয়ার ধলঘাট গ্রামে সাবিত্রী চক্রবর্তীর বাড়িতে তাঁকে ধরার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন ক্যামেরনকে গুলি করে সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এবং কল্পনা দত্ত পালিয়ে যেতে সক্ষম হন কিন্তু নির্মল সেন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

 ব্রিটিশ সৈন্যরা সশস্ত্র যুদ্ধে মাস্টার'দার বাঙ্গালী সহযোদ্ধাদের কাছে  গোহারা হেরে ইংরেজ সরকার  মাস্টার’দা কে ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে।  সেই পুরস্কারের লোভে ১৯৩৩ সালে আত্মগোপনে তাঁর বাড়িতে অবস্থানের সময় মাস্টার'দার প্রতিবেশী নেত্র সেন বিশ্বাসঘাতকতা করে মাস্টার’দা কে ধরিয়ে দেন পুলিশের হাতে ।ধরা পড়েন বিপ্লবী মাস্টার'দা সূর্যসেন। 

মাস্টার'দা কে ধরিয়ে দেয়ার পুরস্কারের টাকা দিয়ে বিশাল আকৃতির মাছ কিনে  এনে  রান্না করে খাওয়ার সময়ে সেই মাছের মাথার পাশেই বিশ্বাসঘাতক নেত্র সেনের খন্ডিত মস্তক পড়ে থাকে। মাস্টার'দা কে ধরিয়ে দেবার দন্ড এভাবেই ভোগ করতে হয় বিশ্বাসঘাতক নেত্র সেনকে।

১৯৩৩ সালের মার্চে বিপ্লবীরা জেল থেকে সূর্য সেনকে মুক্ত করার জন্য কয়েকবার চেষ্টা চালায়। প্রতিবারই ফাঁস হয়ে যায় তাদের গোপন পরিকল্পনা। 
সূর্য সেন, তারকেশ্বর দস্তিদার এবং কল্পনা দত্তকে বিচারের জন্য ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের ১২১/১২১এ ধারা অনুযায়ী স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। 
১৪ আগস্ট ১৯৩৩ সালে সূর্য সেন ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। ট্রাইব্যুনাল সূর্য সেনকে ১২১ ধারা অনুসারে দোষী সাব্যস্ত করে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করে। ওই একই ধারায় তারকেশ্বর দস্তিদারেরও প্রাণদণ্ডের আদেশ হয়। কুমারী কল্পনা দত্তকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২১ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।সূর্য সেনকে কনডেম সেলে কড়া পাহারায় নির্জন কুঠুরিতে রাখা হত। 

ফাঁসিতে দন্ডিত হবার আগে জেলে আটক বিপ্লবী কালীকিঙ্কর দে’র কাছে সূর্য সেন পেন্সিলে লেখা একটি বার্তা পাঠান। ধরে নেওয়া হয় এটি জীবদ্দশায় মাস্টারদার শেষ চিঠি। সে বার্তায় তিনি লেখেন “আমার শেষ বাণী-আদর্শ ও একতা”। তাঁর ভাষায় “ভারতের স্বাধীনতার বেদীমূলে যে সব দেশপ্রেমিক জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের নাম রক্তাক্ষরে অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে লিখে রেখো’।
সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের লাশ তাদের আত্মীয় স্বজনদের হাতে হস্তান্তর করা হয়নি এবং ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী পোড়ানোও হয়নি। ফাঁসির পর লাশদুটো জেলখানা থেকে ট্রাকে করে তৎকালীন ৪ নম্বর স্টিমারঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর মৃতদেহের বুকে লোহার টুকরা বেঁধে বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগরের সংলগ্ন কোনো স্থানে ফেলে দেয়া হয়।
অস্ত্রাগার লুন্ঠন  মামলায় ইন্ডিয়ান পেনাল কোড ১২১/১২১এ ধারা অনুযায়ী স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল ১৪ আগষ্ট ১৯৩৩ সালে মামলার রায় ঘোষনা করে। এবং ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জানুয়ারী তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। 
অস্তমিত হয় বীরত্বের মহান সূর্য! 

যিনি রচনা করে গেছেন এমন ইতিহাস  যা চিরদিন বাঙ্গালীর শৌর্য আর গৌরবের প্রমাণ হয়ে জ্বলজ্বল করবে বিশ্ববাসীর কাছে, নিপীড়িত মানুষের অন্তরে !!মাষ্টার দা সূর্যসেন চিরজীবী হোন।

মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, তাতে লেখা ছিল- 

"আমার শেষ বাণী – আদর্শ ও একতা। ফাঁসির রজ্জু আমার মাথার উপর ঝুলছে। মৃত্যু আমার দরজায় করাঘাত করছে। মন আমার অসীমের পানে ছুটে চলছে। এই তো আমার সাধনার সময়। এই তো আমার 
বন্ধুরূপে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সময়, হারানো দিনগুলোকে নতুন করে স্মরণ করার এই তো সময়।
কত মধুর তোমাদের সকলের স্মৃতি। তোমরা আমরা ভাই-বোনেরা তোমাদের মধুর স্মৃতি বৈচিত্র্যহীন আমার এই জীবনের একঘেয়েমিকে ভেঙে দেয়। উৎসাহ দেয় আমাকে। এই সুন্দর পরম মুহূর্তে আমি তোমাদের জন্য দিয়ে গেলাম স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন। আমার জীবনের এক শুভ মুহূর্তে এই স্বপ্ন আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। জীবনভর উৎসাহভরে ও অক্লান্তভাবে পাগলের মতো সেই স্বপ্নের পেছনে আমি ছুটেছি। জানি না কোথায় আজ আমাকে থেমে যেতে হচ্ছে। লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগে মৃত্যুর হিমশীতল হাত আমার মতো তোমাদের স্পর্শ করলে তোমরাও তোমাদের অনুগামীদের হাতে এই ভার তুলে দেবে, আজ যেমন আমি তোমাদের হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছি। আমরা বন্ধুরা – এগিয়ে চল, এগিয়ে চল – কখনো পিছিয়ে যেও না। পরাধীনতার অন্ধকার দূরে সরে যাচ্ছে। ঐ দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতার নবারুণ। কখনো হতাশ হয়ো না। সাফল্য আমাদের হবেই। ভগবান তোমাদের আশীর্বাদ করুন।
১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই এপ্রিলের চট্টগ্রাম ইস্টার বিদ্রোহের কথা কোনো দিনই ভুলে যেও না। জালালাবাদ, জুলধা, চন্দননগর ও ধলঘাটের সংগ্রামের কথা সব সময় মনে রেখো। ভারতের স্বাধীনতার বেদিমূলে যেসব দেশপ্রেমিক জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের নাম রক্তাক্ষরে অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে লিখে রেখো।
আমাদের সংগঠনে বিভেদ না আসে– এই আমার একান্ত আবেদন। যারা কারাগারের ভেতরে ও বাইরে রয়েছে, তাদের সকলকে জানাই আমার আশীর্বাদ। বিদায় নিলাম তোমাদের কাছ থেকে।বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক বন্দেমাতরম্।
চট্টগ্রাম কারাগার, ১১ জানুয়ারি ১৯৩৪ সকাল ৭টা।"


পরিশেষে বলতে হয়,  মাষ্টার'দা,  আপনার স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ আজ  'সংখ্যালঘু- সংখ্যাগুরু' প্রশ্নে সন্ত্রাস আর হত্যায় রক্তাক্ত! তবু আমরা বিশ্বাস করি,  স্বাধীনতার পতাকা হাতে সাম্য  আর পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্তির জন্য আপনার বীরত্বপূর্ণ লড়াই নতুন প্রজন্মের চেতনায় অগ্নিমশাল জ্বালাবেই।   মাস্টারদা সূর্যসেন অমর . চিরজীবী । মাষ্টার'দা, আপনার আত্মোৎসর্গের এই দিনে জানাই প্রণতি আর  শ্রদ্ধাঞ্জলি। প্রত্যাশা করি আমাদের নতুন প্রজন্ম আপনার আদর্শে দীক্ষা নেবে-  আপনার দীক্ষা আপনার আত্মদান ব্যর্থ হতে পারে না!
শত প্রণাম তোমার চরণে মাস্টার'দা সূর্য সেন!!!!

১২ জানুয়ারী ,২০১৪
পুনলিখন-১২ জানুয়ারী,২০২৩ 
সুমি খান, প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান
মাস্টার’দা সূর্যসেন ফাউন্ডেশন
সূর্য  মানসিক স্বাস্থ্যসহায়তা ও সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট

Thursday, January 9, 2014

আগামী সরকারের জন্য ১০ নম্বর বিপদ সংকেত: আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী


৫ জানুয়ারির নির্বাচনের দিনটা কেমন কাটল? রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলি, 'ভালোয় মন্দে আলোয় আধারে গিয়েছে মিশি।' এই নির্বাচন গণতন্ত্রের ব্যাকরণসম্মতভাবে হয়নি। কিন্তু গণস্বার্থ ও স্বাধীনতার পরিপূরকভাবে হয়েছে। এই নির্বাচনের বৈধতা হয়তো সীমাবদ্ধ, কিন্তু নৈতিকতা নয়। নৈতিক দিক থেকে এই নির্বাচনটির অনুষ্ঠান ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলা, তার স্বাধীনতার আদর্শ রক্ষার জন্য অপরিহার্য। এই নির্বাচনের বিকল্প ছিল দেশে গণতন্ত্রের মুখোশে জঙ্গিবাদের প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের আবার অঘোষিতভাবে পাকিস্তানের রাজনৈতিক কলোনিতে পরিণত হওয়া। যার পরিণাম ফল হতো মার্কিন ড্রোন হামলার সম্প্রসারিত এলাকা হওয়া।

এই সত্যটি এখন এক শ্রেণীর মতিভ্রষ্ট সম্পাদক, সাংবাদিক, টক শোর বক্তা, সুধীসমাজের নেতা নিজেদের স্বার্থে অথবা অপরের স্বার্থে অস্বীকার করতে পারেন, কিন্তু ইতিহাস একদিন সাক্ষ্য দেবে, শেখ হাসিনা একজন নারী রাজনীতিক ও সংসদীয় গণতন্ত্রের অনুসারী হয়েও এই গণতন্ত্র রক্ষার জন্য যে অসম সাহস ও অটল মনোবলের পরিচয় দিয়েছেন, তা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গণতন্ত্র ও গণরাজনীতিকে সুরক্ষা দিয়েছে।

বিভিন্ন ফ্রন্টে এত শত্রুর বিরুদ্ধে এত কম লোক যুদ্ধের জন্য দাঁড়িয়েছে- এমন নজির সাম্প্রতিক বিশ্বে বিরল। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ সেই নজির স্থাপন করেছে। ঐতিহাসিক আর্নল্ড টয়েনবি বলেছেন, 'গণতন্ত্র কেবল মেষশাবক হলে টিকে থাকতে পারত না। আত্মরক্ষার জন্য তাকেও মাঝেমধ্যে বাঘের মূর্তি ধারণ করতে হয়।' 
আমার মতে, বাংলাদেশকে বিএনপির সাম্প্রদায়িকতা ও জামায়াতের হিংস্র ধর্মান্ধতা থেকে রক্ষার জন্য হাসিনা সরকার যদি সত্য সত্যই আসল বাঘের মূর্তি ধারণ করত, তাহলেও আপত্তি করার কিছু ছিল না।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ফলে যে নতুন সংসদ গঠিত হতে যাচ্ছে এবং অনতিকাল পরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে নতুন সরকার গঠিত হবে, তাকে আগাম অভিনন্দন জানাই। প্রার্থনা করি, এবারের নির্বাচনের নৈতিকতার শক্তিতে তারা যেন বৈধতার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে এবং দেশ ও জাতিকে শুধু সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত করা নয়, প্রকৃত সুশাসন (good governance) উপহার দিতে পারে।

গত পাঁচ বছর মহাজোট সরকার দেশের জন্য অভূতপূর্ব উন্নয়নের কাজ সমাধা করেও যে জনসমর্থন ও জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেনি, তার বড় কারণ, কিছু যোগ্য মন্ত্রীর সঙ্গে মন্ত্রিসভায় অসংখ্য অযোগ্য, অসৎ ও অনভিজ্ঞ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ এবং মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও এক বিরাটসংখ্যক আওয়ামী এমপির দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও সন্ত্রাসে তাদের নির্বাচকমণ্ডলীর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়া। ফলে শেষদিকে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছিল, এই শ্রেণীর মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও এমপিরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় জনরোষের ভয়ে যেতে পারতেন না।

২০০৮ সালে শেখ হাসিনার দ্বিতীয় দফার মন্ত্রিসভায় সদস্যদের নামের তালিকা দেখেই যেমন কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলাম, আজও তেমনি আগামী সরকারের সদস্যদের নামের তালিকা দেখার আগেই আরো বেশি কঠোর ভাষায় শেখ হাসিনাকে সতর্ক করতে চাই। কারণ এবার যদি মন্ত্রিসভা গঠনে বা উপদেষ্টা নিয়োগে তিনি আগেরবারের নীতি অনুসরণ করেন, তাহলে তা হবে নিজের জন্য, তাঁর সরকারের জন্য ও তাঁর দলের জন্য 'ফ্যাটাল মিসটেক' বা চূড়ান্ত ভুল।

শেখ হাসিনা আমার চেয়েও ভালো করে জানেন, এবারের নির্বাচন দুটি গণতান্ত্রিক দলের মধ্যে নির্বাচনযুদ্ধ ছিল না। ছিল একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও তাদের নব্য দোসরদের মরিয়া হয়ে ক্ষমতা দখলের সন্ত্রাস ও বর্বরতার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার পক্ষ শক্তির প্রতিরোধ। ফলে শেখ হাসিনাকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বীকৃত কোনো কোনো পন্থা এড়িয়ে চলতে হয়েছে। তাতে দেশপ্রেমিক জনগণের আপত্তি থাকার কথা নয়। যদি কারো আপত্তি থাকে আগামী সরকার গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে নৈতিকতার ভিত্তি দৃঢ় করে তা শেখ হাসিনাকে কাটিয়ে উঠতে হবে। আর এই নৈতিকতার ভিত্তি জোরদার করার একমাত্র পথ জনগণকে তাদের পছন্দসই একটি সৎ ও যোগ্য সরকার এবং সেই সরকারের সুশাসন উপহার দেওয়া।

নির্বাচন তরীটি কোনোমতে ঠেলেঠুলে তীরে নিয়ে আসতে পারায় আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট ও তার নেত্রী শেখ হাসিনা যেন না ভাবেন, তাঁরা বিপদ ও সংকটমুক্ত হয়েছেন। সামনে আরো বড় বিপদ ও বড় লড়াই অপেক্ষা করছে। আমি আগেও বলেছি, জনসমর্থন না থাকলে কেবল সন্ত্রাস দ্বারা কোনো আন্দোলনে সাফল্য লাভ করা যায় না। বিএনপি-জামায়াতও তাই সাফল্য লাভ করতে পারেনি। এ জন্য নির্বাচনের পরও তারা থেমে থাকবে, তা নয়। সর্বশক্তি নিয়ে তারা মরণছোবল দেওয়ার চেষ্টা করবে।

এই চেষ্টা করার প্রমাণ, নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি হরতাল ডেকেছে। এই হরতালে জনগণের সমর্থন না থাকলেও তারা সন্ত্রাসী জামায়াতিদের কাজে লাগাচ্ছে। আবার অগ্নিসংযোগ, হত্যা ও নির্যাতন দ্বারা প্রশাসন অচল করতে না পারুক, দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় বাড়িয়ে তুলবে। এই সন্ত্রাস যদি বন্ধ করা না যায়, তাহলে জনগণের ধৈর্যের সীমা ভেঙে যাবে। তারা সরকারের প্রতি আস্থা হারাবে এবং বিক্ষুব্ধ হবে। চাইলে কি তাদের একটা বড় অংশ সন্ত্রাসমুক্ত হওয়ার আশায় সন্ত্রাসীদের সমর্থন জানাতে পারে। যদি তা হয়, তাহলে আগামী সরকার চরম বিপদে পড়বে। তাদের জন্য রাজনৈতিক আবহাওয়া দপ্তরের দশ নম্বর বিপদ সংকেত আমি এখনই দেখতে পাচ্ছি।

এই বিপদ সংকেত অগ্রাহ্য করা শেখ হাসিনা ও তাঁর আগামী সরকারের জন্য হবে চরম ভ্রান্তি। গত ছয় মাসের বেশি সময় ধরে তারা নির্বাচনবিরোধী সন্ত্রাসের মোকাবিলা করেছে। এটা ছিল তাদের জন্য সাত, আট বা ৯ নম্বর বিপদ সংকেত। এখন নির্বাচনের পর তাদের জন্য যে বিপদ সংকেত দেখা যাচ্ছে, তা দশ নম্বরের। এই ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে হলে কেবল আইন প্রয়োগ, পুলিশ ও র‌্যাব মাঠে নামিয়ে কাজ হবে না। জামায়াতি সন্ত্রাসীরা এখন অনেক বেশি সশস্ত্র ও ট্রেনিংপ্রাপ্ত। তারা এতটাই সংগঠিত যে ইলেকট্রিক বা বৈদ্যুতিক করাত এনে বড় বড় গাছ কেটে রাস্তায় ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করতে পারে। কলকাতায় একটি কাগজে খবর দেখেছি, এই জামায়াতি সন্ত্রাসীরা পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত অঞ্চলে গিয়ে মাওবাদী ও সাবেক নকশালপন্থী সন্ত্রাসীদের কাছে বোমা বানানো ও অন্যান্য সন্ত্রাসের ট্রেনিং নিচ্ছে। ভারত সরকার সীমান্তে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েও তাদের ঠেকাতে পারছে না।

বাংলাদেশের আগামী সরকারকেও তাই কৌশল পাল্টাতে হবে। এই কৌশলটি হবে শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দ্বারা নয়, এই সন্ত্রাস দমনের জন্য জনপ্রতিরোধ গড়ে তোলা। গত পাঁচ বছরে বিএনপি-জামায়াত যেমন তাদের সন্ত্রাসের পক্ষে জনসমর্থন আদায় করতে পারেনি; তেমনি আওয়ামী লীগ সরকারও পারেনি এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে। কারণ সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার ছিল ব্যর্থ। অধিকাংশ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও এমপি ছিলেন জনগণের কাছে দুর্নীতি ও অন্যান্য অসাধু কার্যকলাপের জন্য বিতর্কিত, এমনকি নিন্দনীয়। তা ছাড়া আওয়ামী লীগও সংগঠন হিসেবে এখন অত্যন্ত দুর্বল। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের আগের সুনাম ও প্রতিষ্ঠা নেই সাধারণ মানুষের কাছে।

আমি বয়সে বড় হয়েও শেখ হাসিনার পায়ে পড়ি। এবার যেন মন্ত্রিসভা গঠনে তিনি জেদ, কানকথা ও চাটুকারিতাকে প্রশ্রয় না দেন। যোগ্যতা ও সততাকে মন্ত্রী ও উপদেষ্টা পদে নিয়োগের মাপকাঠি করেন। সাধারণ মানুষের পছন্দসই ও আস্থাভাজন ব্যক্তিদের দ্বারা একটি ছোট অথচ কর্মক্ষম মন্ত্রিসভা গঠন করেন। উপদেষ্টার সংখ্যা যেন পাঁচজনের বেশি না হয় এবং তাঁরা বিতর্কিত ব্যক্তি না হন। আল্লাহর দোহাই শেখ হাসিনা, এবার যেন ঢাকা ক্লাবে বসে যাঁরা সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ঢুলু ঢুলু চোখে 'সরকারি দায়িত্ব পালন' করেন, তাঁদের কোনো কারণেই মন্ত্রিসভায় স্থান না দেন।

দেশের সামরিক ও অসামরিক প্রশাসনে বিএনপি-জামায়াত আমলে ঢুকে পড়া অনেক 'সাবোটিয়ার' আছে। তা সত্ত্বেও এবার আমাদের সেনাবাহিনী, অসামরিক প্রশাসন, র‌্যাব, পুলিশ, আনসার প্রমুখ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নির্বাচিত সরকারের প্রতি যে আনুগত্য ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছে, তা অতুলনীয়। 

সন্ত্রাসী-হামলা ঠেকাতে বহু পুলিশ আত্মদান করেছে। আগামী সরকারকে তাদের দেশপ্রেম, কর্তব্যনিষ্ঠা ও আনুগত্যেরও মূল্যায়ন করতে হবে। সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমনে প্রশাসন ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে এবং তা পারবে একটি দক্ষ, যোগ্য ও সৎ সরকার।

শেখ হাসিনা যদি এবার একটি সৎ ও দক্ষ সরকার দেশবাসীকে উপহার দিতে পারেন, তাহলে বর্তমান নির্বাচনের বৈধতার সীমাবদ্ধতা তিনি কাটিয়ে উঠতে পারবেন। আর যে 'হিজ মাস্টার্স ভয়েসের' মতো এক শ্রেণীর মিডিয়া ও টক শোর অবিরাম প্রলাপোক্তি তা-ও বন্ধ হবে। সন্ত্রাস যত সিংহমূর্তি ধারণ করুক, তাকে লেজ গুটিয়ে পালাতে হবে। শেখ হাসিনা, দেশকে একটি মোটামুটি অনেস্ট গভর্নমেন্ট উপহার দিন, যে গভর্নমেন্ট দেশকে সুশাসন দিতে পারবে। রাতারাতি দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে, তা বলি না। কিন্তু আগামী সরকার তার শুভ সূচনা করুক।

নির্বাচনের দিনটি পার হওয়া গেছে। কিন্তু নতুন যে সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে, তার জন্য আগাম দশ নম্বর বিপদ সংকেতও দেখতে পাচ্ছি। দেশপ্রেমিক চক্ষুষ্মান ব্যক্তিমাত্রই তা দেখতে পাচ্ছে। আবারও বলি-

সামনে আছে ঝড় তুফান

শেখ হাসিনা, সাবধান!! 

(কালের কণ্ঠে প্রকাশিত)

Sunday, January 5, 2014

পোষ্টমর্টেম নির্বাচন - সুমি খান

এভাবে মানুষকে জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ করে পিটিয়ে হত্যা করে ও ভোট দেয়া ঠেকাতে পারলো না সন্ত্রাসী রা.....


 প্রাণভয়ে ভোটাররা অনেকেই যায় নি ভোট কেন্দ্রে। অনেকে দ্বিধান্বিত... তার ওপরে আবার অবরোধ-হরতাল। 

 আমার ভাইয়া কৃতি গবেষক চিন্তাবিদ হাসান মাহমুদ জানালেন, ইংল্যাণ্ডে ২১% ভোটারের ভোটে সরকার গঠন হয়েছিল কবে যেন, কিন্তু ওসব দেশে, ক্যানাডাতেও বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম লোক ভোট দেয়. আমাদের জন্য কমপক্ষে ৪০% হলে চলে যায় বোধহয় ।

3:30 PM - আজ এ পর্য্যন্ত নিহত ১৩জন ও মোট ১৮১০৮টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৫২ টি স্থগিত। 

3:00 PM - SAME AS BEFORE. খুলনায় সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে ২০% 

2:30 PM - মোট নিহত ১২জন। সি-ই-সি জানাচ্ছে মোট ভোট কেন্দ্র ১৮১০৮ টি, স্থগিত ১৪৩ - স্থগিত কেন্দ্রগুলোতে ২৪ শে জানুয়ারীর মধ্যে আবার নির্বাচন হবে. 

2:00 PM - এখনো এ পর্য্যন্ত নিহত ৯ জন ও মোট ১৮২০৮ টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৪০টি স্থগিত। অর্থাৎ ভোট গ্রহণ চলছে ৯৯.২৫% কেন্দ্রে, স্থগিত ০.৭৫% কেন্দ্রে। 

1:30PM - এখনো মোট ১৪০টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত - এ পর্য্যন্ত নিহত ৯ জন - বেশী সহিংস এলাকার মধ্যে আছে ফেনী, মুন্সিগঞ্জ, দিনাজপুর, লক্ষ্মীপুর, রংপুর ও নীলফামারী। শুধু চোখ-খোলা চেহারা-ঢাকা নেকাবী নারী-ভোটারও দেখা গেছে - দক্ষিন এশীয় ২ দেশের পর্য্যবেক্ষক দল সন্তুষ্ট। 

1:00 PM - এখনো মোট ১৪০টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত - এ পর্য্যন্ত সর্বমোট নিহত ৮জন - কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ চলছে - বোমা বানাতে গিয়ে শিবির আহত, ব্যালট বাক্স ছিনতাই-এর সময় যুবদল নেতা গুলিবিদ্ধ ইত্যাদি।... 

12:45 PM - (১) বেগম খালেদা জিয়া জাতির প্রতি ভিডিও বার্তা দিতে পারেন। (২) পার্বতীপুরে জামাতের হামলায় এক আনসার নিহত। (৩) সামগ্রিকভাবে নারী-ভোটারের উপস্থিতি বেশী। 

12:30 PM - এখনো মোট ১৪০টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত; নীলফামারীতে ডিমলা ও জলঢাকায় পুলিশের সাথে সংঘর্ষে ২জন জামাত নেতা নিহত। দেশে সর্বমোট ভোটকেন্দ্র কতো কেউ জানাবেন? 

12 NOON - বিভিন্ন জায়গায় নিহত ৬ - এখনো মোট ১৪০টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত - ফেনীতে ব্যালট বাক্স ছিনতাই চেষ্টায় পুলিশের গুলিতে নিহত একজন 

11:30 AM - মোট ১৪০টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত 

11:15 AM - মোট ১৩৮টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত.. সর্বমোট ১৪৭ আসন, ভোটার সাড়ে ৪ কোটি। দেশে সর্বমোট ভোটকেন্দ্র কতো তা বলতে পারছি না. 

11:00 AM - মোট ১৩৬টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত - বিভিন্ন জায়গায় আগুন দেয়া, ককটেল বিস্ফোরণ, আহত, কয়েকজন নিহত, ককটেল সহ আটক কয়েকজন - পটুয়াখালীর খাসেরহাট স্কুলের ভোটকেন্দ্র থেকে ২২টি ককটেল সহ অন্যান্য জায়গায় ককটেল, ভারী বোমা ও পেট্রল বোমা উদ্ধার।

ব্যালট ছিনতাই আগুন দেয়া সহ সর্বাত্মক সহিংসতার মধ্যে চলছে ভোট - মোট ৩৭টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত - আজিমপুরে রাস্তায় পড়ে থাকা ককটেলে শিশু আহত - BD time 10 AM.

10:15 AM - জামাতের শক্তি বিশেষে কোন জায়গায় হিংস্রতা বেশী ও ভোট স্থগিত, অন্যান্য জায়গায় ভোট ভালই চলছে। কেউ জানেন সারা দেশে সব মিলিয়ে কতো ভোট কেন্দ্র? 

রংপুর ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টায় ২জন নিহত। 

10:22 AM - মোট ১২৬টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত - এ পর্য্যন্ত মোটামুটি ৫% ভোট দেয়া হয়েছে - খুলনার পুলিশ কর্মকর্তা। ভোট চলবে বিকেল ৪টা পর্য্যন্ত। কোথাও কোথাও শীত প্রচণ্ড 
10:30 AM - মোট ১৩৩টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত -