Thursday, December 5, 2013

তওবা করলে গণহত্যাকারী গণধর্ষণকারীদের শাস্তি হবে না- হাসান মাহমুদ


জামাত, যুদ্ধাপরাধ ও শারিয়া আইন -(তওবা করলে গণহত্যাকারী গণধর্ষণকারীদের শাস্তি হবে না)
                                                                                 হাসান মাহমুদ ১৬ই ডিসেম্বর ৩৯ মুক্তিসন (২০০৯)

যুদ্ধাপরাধী-বিচারের বাতাস বইবার সাথে সাথে নিজামী গং উচ্চকন্ঠে বলে বেড়াচ্ছেন জাতিকে নাকি বিভক্ত করা হচ্ছে। জাতির ঐক্যের খাতিরে নাকি গণহত্যা-গণধর্ষণের মত ভয়ংকর অপরাধের বিচার শিকেয় তুলে লক্ষ ধর্ষিতাদের সাথে গণধর্ষণকারীদের এবং লক্ষ নিহতের কোটি স্বজনের সাথে গণহত্যাকারীদের ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা নাকি খুবই দরকার।

সাব্বাশ !

জনাব নিজামী, কিছু কথা ও প্রমাণ আপনার মাথায় না ঢুকুক , কানে ঢালা প্রয়োজন। ষড়যন্ত্রের খিড়কি দরজা দিয়ে নষ্ট রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পাওয়া আর জাতির হূদয়ে প্রতিষ্ঠা পাওয়া’র মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে। আজ বিপদে পড়ে ঐক্যের কথা বলছেন, জাতিকে বিভক্ত কে করেছে রক্তরেখায় ? আপনাদের আর জাতির মাঝখানে লক্ষ লাশ লক্ষ ধর্ষিতার হিমালয় কে তুলেছে ? আপনারাই তুলেছেন। পরাক্রান্ত বিদেশী সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে সেই জীবন-মরণ যুদ্ধে আপনারা আমাদের সাথে ঐক্য করলে আমাদের শক্তি আর মনোবল অনেক বাড়ত। কিন্তু আপনারা বাংলায় জন্মে বাঙ্গালীর সঙ্গে ঐক্য না করে বাঙ্গালীরই বিরুদ্ধে খোলাখুলি জিহাদ ঘোষণা করলেন, জাতির ওপরে বিদেশীদের গণহত্যা-গণধর্ষণে শরিক হওয়াকে ইবাদত মনে করলেন এবং প্রাণপনে সে ‘‘ইবাদত’’ করলেন-ও। আপনাদের সক্রিয় সাহায্য না পেলে অনেক বাঙ্গালী বেঁচে যেত অনেক বাঙ্গালিনী ধর্ষিতা হত না। এর পরেও আশা করেন আমরা আপনাদের সাথে ঐক্য করি ? আটত্রিশ বছর কেটে গেছে আপনারা সে অপরাধের জন্য আল্লা-রসুলের কাছে আর নিপীড়িতদের কাছে ক্ষমা তো চানই নি বরং সগর্বে বলেছেন - ‘‘একাত্তরে আমরা ভুল করিনি’’।

অবশ্যই করেছেন। মহাভুল করেছেন, ঘোর অপরাধ করেছেন। ঐক্য যে করবেন, করবেন-টা কার সাথে ? এ জাতি কখন আপনার নিজের ছিল ? কখনোই না। এ জাতির সংস্কৃতি কবে আপনার সংস্কৃতি ছিল ? কখনোই না। কখনো গেছেন রমণার বটমূলে বর্ষবরণে? যান নি। পালন করেছেন ষড়ঋতু-নবান্নর মায়াময় উৎসবগুলো? করেন নি। এ জাতির মরমীয়া ইসলাম কবে আপনাদের ইসলাম ছিল? কখনোই না। জাতির হাজার বছরের ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ঐতিহ্যে ঘুন ধরিয়ে ইসলামের হিংস্র ব্যাখ্যা আমদানী কে করেছে ? আপনারাই করেছেন। চোখের সামনে ফতোয়াবাজেরা বাঙ্গালিনীদেরকে হিলা বিয়ের নামে ধর্ষণ করায় আপনাদের ইসলামি বুক কাঁপে না। চোখের সামনে শারিয়াবাজেরা ধর্ষিতা বালিকাদের চাবুক আর জুতো দিয়ে পেটায় আপনাদের ইসলামি বুক কাঁপে না। অথচ আপনাদের অঙ্গুলী হেলনে ইসলামের নামে মা-বোনের এই জীবন-ধ্বংস বন্ধ হতে পারত। আপনারা করেন না কারণ ওই অসহায় মা-বোনেরা আপনাদের কেউ নয়। আপনারা যতনা বাংলাদেশী হয়েছেন তার চেয়ে বেশী হয়েছেন পাকিস্তানি। যতনা মুসলমান হয়েছেন তার চেয়ে বেশী হয়েছেন আরবী। তাই আগ্রহ আর উল্লাসের সাথে নিজের জাতিপরিচয়কে, বাংলাদেশীর রক্তকে আর নারীর সম্ভ্রমকে বিদেশীর পায়ে অর্ঘ্য দিয়েছেন। ধর্মীয় উন্মাদনা কতখানি  উদগ্র হলে মানুষ এমন করতে পারে তা জাতি ঠিকই বোঝে, এখন ডুডু-ও খাবেন টামাকও খাবেন তা হয় না। গাছের খাবেন তলারও কুড়োবেন তা হয়না।

কিছু মানুষ চিরকাল-ই হিংস্র কসাই থাকবে। কিন্তু আমাদের কষ্টটা হচ্ছে এই যে আপনারা এটা করেছেন ইসলামের নামে। ইসলামি রাষ্ট্র বানিয়ে শারিয়া আইন চালাতে চান। জাতির জানা দরকার একাত্তরের কসাইপনা ও কুকর্মের কি ব্যবস্থা শারিয়া আইনে আপনারা আগে থেকেই করে রেখেছেন, উদ্ধৃতিঃ -

‘‘হিরাবা’র অপরাধ ব্যতীত অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধী তওবা করিলেও শাস্তি হইতে রেহাই পাইবে না - হিরাবার অপরাধের শাস্তি ব্যতীত তওবা অন্য কোন শাস্তি বাতিল করে না’’ - শরিয়া আইন নং ১৩, বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা ২১৮ ও ২২২।

সুষ্পষ্ট আইন। অর্থাৎ হিরাবা’র অপরাধীরা তওবা করলে ‘‘শাস্তি হইতে রেহাই পাইবে’’। 
হিরাবা কি? আবার উদ্ধৃতি দিচ্ছি আপনাদেরই ওই কেতাব থেকেঃ- ‘‘হিরাবাহ্ বলিতে সংঘবদ্ধ শক্তির জোরে আক্রমণ চালাইয়া আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাইয়া জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা বোঝায়। সম্পদ লুন্ঠন, শ্লীলতাহানী, হত্যা ও রক্তপাত ইহাত অন্তর্ভুক্ত’’।

হল ?

ইসলামেরই নামে ইসলামের প্রতি এই ভয়ংকর বিশ্বাসঘাতকতা কে করেছে? আপনারা-ই করেছেন। ইসলামের নামে আইন বানিয়েছেন ইসলামি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হুদুদ অপরাধ অর্থাৎ খুন-জখম-চুরি-ডাকাতি-মদ্যপান -পরকীয়া-কুৎসা করলে শাস্তি তো দুরের কথা - ‘‘তাহার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা যাইবে না’’ - বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন ৩য় খণ্ড আইন নং ৯১৪ গ। এই একটা আইনই ইসলামকে শয়তানের হাতে তুলে দেবার জন্য যথেষ্ট নয়?   অজস্র উদাহরণ আছে।   যেখানে সুরা তালাক আয়াত ২-তে আল্ কোরাণে সুষ্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে রেখেছে স্ত্রী-তালাকের সময় দুইজন সাক্ষী রাখতে সেখানে আপনাদের আইনে স্বামীর জন্য - ‘‘তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য সাক্ষ্য শর্ত নহে’’ - বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন ১ম খণ্ড আইন নং ৩৪৪।

 কিছু তরুণ এসব না জেনে না পড়ে আপনাদের বিশ্বাস করে, সমর্থন করে। ওই তরুণরা যেদিন জানবে কি নিষ্ঠুরভাবে ওদের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে ওদের আপনারা ঠকিয়েছেন সেদিন ওরাই আপনাদের গলা চেপে ধরবে। তিন খণ্ডের বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন কোন একজনের লেখা নয়, আপনাদেরই ফেইথ-কাজিন ছয়জন পণ্ডিতের টিম-এর লেখা। ওটা কোন ব্যবসায়ী প্রকাশকের লাভের বই নয়, ওটা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ইসলামি ফাউন্ডেশন। একটা গণতান্ত্রিক দেশের সরকারী প্রতিষ্ঠান কিভাবে এ ধরণের বই প্রকাশ করেছে সে দড়িতেও একদিন টান পড়বে।

আমাদের হাজার দোষ থাকতে পারে কিন্তু ইসলাম-বিরোধী হত্যাকারী ধর্ষকদের সাথে আমরা বাংলাদেশীরা ঐক্য করি না ।

জাতি আর কোন চাতুরীতে ভুলবে না - যত হও তুমি সুদক্ষ অভিনেতা
লাশের ওজন ধর্মে যাবে না কেনা - যতই ধুর্ত হোক ক্রেতা-বিক্রেতা।

সাদাসিধে কথা - ডিসেম্বরের প্রথম প্রহর:মুহম্মদ জাফর ইকবাল

১.
বেশ কিছুদিন থেকে বাংলাদেশের সব মানুষের মতো আমিও আটকা পড়েছি। প্রথমে হরতালে আটকা পড়েছিলাম, এখন অবরোধে আটকা পড়েছি। দুটোর মাঝে পার্থক্যটা আমার কাছে এখনও পরিষ্কার নয়। হরতাল শুরু হওয়ার আগেই গাড়ি পোড়ানো হতো, অবরোধের আগেও গাড়ি পোড়ানো হয়। হরতালে গাড়ি পোড়ানোর সময় ভেতরে অনেক সময় যাত্রীরা থাকে, অবরোধেও তাই। সিলেটে থাকি, আমার মা ঢাকা থাকেন- অন্য কোন কাজ না থাকলেও শুধু মাকে দেখার জন্য ঢাকা যাই, এখন যেহেতু ঢাকা যেতে পারছি না দেখা করতে পারছি না, তাই টেলিফোনে কথা হয়। আমার মা জানেন আমার বাসায় টেলিভিশন নেই, তাই টেলিভিশনে কি কি দেখানো হয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমাকে জানান। ইদানীং আমার মা টেলিভিশন না দেখার জন্য আমার ওপর খুব বিরক্ত। মোটামুটি স্পষ্ট করেই বললেন, ‘সারা দেশে কি তাণ্ডব হচ্ছে কি নৃশংসতা হচ্ছে নিজের চোখে দেখবি না, পালিয়ে বেড়াবি, এটা হয় না। তোকে দেখতে হবে -এই দেশে কি হচ্ছে নিজের চোখে তোকে দেখতে হবে।’

তারপরেও আমি টেলিভিশনে সে ভয়াবহ ঘটনা দেখি না। ইন্টারনেটে খবর পড়ি, খবরের কাগজে ছবিগুলো দেখে দ্রুত পৃষ্ঠা উল্টিয়ে ফেলি। গত কিছুদিন বাংলাদেশের খবরের কাগজে যে ছবি ছাপা হচ্ছে তার থেকে হৃদয়হীন নৃশংস অমানুষিক বর্বরতার ঘটনা এ দেশের মানুষ এত নিয়মিতভাবে দেখেছে বলে আমার জানা নেই। কোনটা বেশি বড় নিষ্ঠুরতা আমি এখনও নিশ্চিত নই, একেবারে সাধারণ মানুষকে, স্কুলের ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে পথচারী কিংবা মহিলাদের পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা, নাকি যারা এটা করছে তাদের বিরুদ্ধে একটা শব্দ উচ্চারণ না করে চুপচাপ এ ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে সমর্থন করে যাওয়া। রাজনৈতিক সহিংসতা বলে একটা শব্দ চালু আছে আমরা জানতাম সেটি এক রাজনৈতিক দল অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীকে করে থাকে। এখন যেটাকে রাজনৈতিক সহিংসতা বলা হচ্ছে সেখানে রাজনৈতিক নেতাকর্মীর সংখ্যা খুব কম। বেশির ভাগ মানুষ সাধারণ মানুষ। আগুনে পুড়ে যাবার মতো ভয়ঙ্কর আর কি হতে পারে? যাঁরা মারা যাচ্ছেন তাঁদের আপনজনদের হাহাকার আর ক্ষোভের কথাটা আমি চিন্তাও করতে পারি না। যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁদের সেই অমানুষিক কষ্টের কথা কি বাইরে থেকে বোঝা সম্ভব? যাঁরা রাজনীতি করেন তাঁরা সবকিছুকে পরিসংখ্যান দিয়ে বিশ্লেষণ করে ফেলতে পারেন, আমরা পারি না। একটা মাত্র মৃত্যু কিংবা একটা মাত্র নিষ্ঠুরতার কথা আমাদের পীড়ন করতে থাকে, এতগুলো আমরা কেমন করে সহ্য করব!
আমরা সবাই গণআন্দোলনের কথা জানি, যখন নিয়মতান্ত্রিকভাবে আর কিছু করা যায় না তখন সাধারণ মানুষ পথে নেমে আসে। কিন্তু আন্দোলনের নামে এ নৃশংসতার কথা আমরা কি আগে কখনও দেখেছি? যারা মানুষকে পুড়িয়ে মারছে তারা যখন বাড়ি ফিরে যায় টেলিভিশনে সে ভয়াবহ ঘটনাগুলো দেখে তখন কি তাদের চোখমুখ আনন্দে ঝলমল করে ওঠে? সম্পূর্ণ নিরপরাধ মানুষগুলো যখন যন্ত্রণায় ছটফট করে, তাদের আপন জন যখন হতাশায়, ক্ষোভে, দুঃখে, ক্রোধে নিজেকে সংবরণ করতে পারে না তখন কি এই মানুষগুলো উল্লসিত হয়ে ভাবে তারা তাদের গন্তব্যে আরও একটু পৌঁছে গেছে? তাদের নেতাকর্মীরা কি ফোন করে তাদের অভিনন্দন জানান? যখন দেখা হয় তাদের পিঠ চাপড়ে দেন? আমার বড় জানতে ইচ্ছে করে।
যখন থেকে দেশে এ নতুন ধরনের সন্ত্রাস শুরু হয়েছে তখন আরও একটি বিচিত্র বিষয় আমার চোখে পড়তে শুরু করেছে। খবরের কাগজে প্রায়ই ছবি দেখতে শুরু করেছি যেগুলো দেখে মনে হয় আমরা বুঝি নাটকের দৃশ্য দেখছি। সন্ত্রাসী এ কাজকর্মের এত নিখুঁত ছবি দেখে আমরা মাঝে মাঝে হকচকিয়ে যাই, দেখে মনে হয় সাংবাদিকরা যেন ভাল করে ছবিগুলো তুলতে পারেন বুঝি সেজন্যই তাদের সামনে অনেক যতœ করে ঘটনাগুলো ঘটানো হচ্ছে। বিশ্বজিৎ নামের সেই ছেলেটিকে যখন ছাত্রলীগের ছেলেরা প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করল তখন সাংবাদিকরা এ দৃশ্যটি ক্যামেরায় ধারণ করার জন্য এত সময় না দিয়ে ছেলেটিকে যদি বাঁচানোর চেষ্টা করতেন তাহলে সে বেঁচে যেত কি না এ চিন্তাটি মাঝে মাঝেই আমার মাথায় উঁকি দেয়।

কেভিন কার্টার নামে একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফটোগ্রাফার ছিলেন, নব্বইয়ের দশকে এ ফটোগ্রাফার তাঁর একটি ছবির জন্য পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিলেন। ছবিটি ছিল আফ্রিকার দুর্ভিক্ষের সময়ের ছবি, একটি শীর্ণ শিশু নিজেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে খাবারের সন্ধানে, অদূরে তাকে অনুসরণ করছে একটি শকুন। দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতার সে ছবির জন্য কেভিন কার্টার পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিলেন সত্যি, কিন্তু একজন মানুষ হয়ে একটা শিশুকে রক্ষা না করে শকুনের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য সারা পৃথিবীতে তাঁর বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল সম্ভবত সে জন্যই তার কয়েক মাস পরে এই ফটোগ্রাফার আত্মহত্যা করেছিলেন।

একজন ফটোগ্রাফার চমকপ্রদ একটা ছবি তোলার জন্য সব সময় চোখ, কান খোলা রাখেন, কিন্তু সে ছবি তোলার সুযোগ করে দিয়ে যদি সন্ত্রাসীদের গোষ্ঠী সে ফটোগ্রাফার, সে পত্রিকা, পত্রিকার সম্পাদক সবাইকে ব্যবহার করে নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করে ফেলে তাহলে তার দায়িত্ব কে নেবে? আমাদের দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে তারা দুর্বৃত্ত, সন্ত্রাসী, হত্যাকারীদের মানুষকে আতঙ্কিত করে তোলার প্রক্রিয়াকে গায়ে পড়ে সাহায্য করছে না?

২.
এই দেশে আজকাল মানুষের নিরাপত্তা নেই, যে কোন মানুষ যে কোন সময় আক্রান্ত হতে পারে। গত সপ্তাহে আমাদের ক্যাম্পাসে এক সঙ্গে অনেক ককটেল ফুটল। একটা আমাদের বাসার বারান্দায়। যখন সেটি ফাটানো হয়েছে তখন আমার স্ত্রী তাঁর কয়েক ফুট দূরে, মাঝখানে দেয়াল দরজা থাকার জন্য বড় ধরনের কিছু ঘটেনি। কিছুক্ষণের ভেতরেই সবাই বাসা থেকে বের হয়ে এলো। দেখতে দেখতে শত শত ছাত্র ভয় কিংবা আতঙ্কের বদলে বরং একটা উৎসব উৎসব ভাব। খুব কাছেই মেয়েদের হল, ককটেলের শব্দ তারা খুব ভালমতো পেয়েছে, টেলিফোনে আমাদের জানানো হলো তাদের কয়েকজন বের হতে চায়। প্রক্টর, রেজিস্ট্রার, শিক্ষক সবাই আছেন তাঁরা ভাবলেন, বরং আমরাই মেয়েদের সাহস দিয়ে আসি।
মেয়েদের হলের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই সব মেয়েরা বের হয়ে আমাদের ঘিরে দাঁড়াল। একজন বলল, ‘স্যার, খুব ভয় লাগছে।’ আমি বললাম, ‘ভয় লাগার কি আছে? এ দেশে জন্মেছ একটু সহ্য কর।’ মেয়েরা তখন বাধা দিয়ে বলল, ‘না, না, স্যার, আমাদের নিজেদের জন্য একটুও ভয় লাগছে না। আপনার আর ম্যাডামের জন্য ভয় লাগছে।’

যখন এই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে একদিন যেতে হবে এই ছেলেমেয়েদের ভালবাসা ছেড়ে কেমন করে যাব আমি জানি না। এরা আমাদের নতুন প্রজন্ম, ডিসেম্বর মাস এলে আমার এই দেশের তরুণ প্রজন্মের কথা মনে পড়ে। এই দেশটি তরুণ প্রজন্মের দেশ, তরুণ প্রজন্ম তীব্র আবেগ আর ভালবাসায় এই দেশটির জন্ম দিয়েছিল, আবার তীব্র আবেগ আর ভালবাসা দিয়ে এই দেশটিকে রক্ষা করবে, এই দেশটিকে গড়ে তুলবে।
সেদিন ভোরবেলা একটা টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক আমার অফিসে চলে এসেছেন ইন্টারভিউ নিতে। ডিসেম্বর মাসে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের ওপর অনুষ্ঠান করবেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার স্মৃতি জানতে চান, আমার কথা শুনতে চান।
আমি সে টেলিভিশন চ্যানেলকে বলেছি, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনেক বীরত্ব আর অনেক বড় অর্জনের ইতিহাস, কিন্তু সেটা একই সঙ্গে অনেক বড় একটা আত্মত্যাগের ইতিহাস। আত্মত্যাগের এত বড় ইতিহাস পৃথিবীর অন্য কোথাও এভাবে আছে কি না আমার জানা নেই। এ মুক্তিযুদ্ধের সময় সারা বাংলাদেশে একটি পরিবারও ছিল না যার কোন একজন আপনজন কিংবা কাছাকাছি একজন মানুষ মারা যায়নি। দেশ যেদিন মুক্ত হয়েছিল সে অবিশ্বাস্য আনন্দের পাশাপাশি অনুভূতিটি ছিল স্বজন হারানো একটি গভীর বেদনার অনুভূতি।

আমি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিককে মনে করিয়ে দিয়েছিলাম আমাদের প্রজন্ম সম্ভবত সবচেয়ে সৌভাগ্যবান প্রজন্ম। ভয়ঙ্কর দুঃসময় কিভাবে টিকে থাকতে হয় আমরা জানি। তার চাইতে বড় কথা একাত্তরের সে ভয়ঙ্কর দুঃসময়ে এ দেশের মানুষের সবচেয়ে সুন্দর রূপটি বের হয়ে এসেছিল। গভীর ভালবাসায় মানুষ তখন একে অন্যের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। আমাদের প্রজন্ম মানুষের সেই রূপটি দেখেছে আমরা তাই কখনও মানুষের ওপর বিশ্বাস হারাই না। আমরা জানি অতি সাধারণ অকিঞ্চিতকর একজন মানুষের ভেতর একজন অসাধারণ মানুষ লুকিয়ে থাকে। প্রয়োজনের সময় তাকে বের করে আনা যায়। আমি জানি এটা হচ্ছে আমাদের শক্তি। জ্ঞানী গুণী অল্প কজন সুশীল সমাজ আমাদের শক্তি নয়, অসংখ্য সাধারণ মানুষ আমাদের শক্তি। এ দেশে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ আমাদের ভয় কি?
এ সাধারণ মানুষদের পথ দেখাবে নতুন প্রজন্ম। তাই আমি সব সময়ে তাদের মুখ চেয়ে থাকি, তারা কখনও আমাদের নিরাশ করে না। অল্প একটু সুযোগ দিলে তারা ম্যাজিক করে ফেলতে পারে, আমি সবিস্ময়ে সেটি দেখি।
এ নুতন প্রজন্মকে আমি বার বার মনে করিয়ে দিতে চাই কখনও যেন তারা হতোদ্যম না হয়, কোন কিছু নিয়ে তারা যেন হতাশ না হয়। একাত্তরে অবিশ্বাস্য দানবের বিরুদ্ধে এই দেশের মানুষ বিজয়লাভ করেছিল শুধু একটি কারণে, তারা তাদের মনের জোর হারায়নি। এখনও তাদের মনের জোর হারালে চলবে না। আমাদের চারপাশে আমরা যেটি দেখছি সবকিছু সাময়িক। আমাদর তরুণদের ভেতরে যে শক্তি আছে তারা সব কিছু খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে নিতে পারবে আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি।

ডিসেম্বর মাস এলে আমার সেই তরুণদের কথা, কিশোরদের কথা মনে পড়ে। আমার সে কিশোর বন্ধুরা যারা অস্ত্রহাতে মুক্তিযুদ্ধ করে মারা গিয়েছিল। তারা এখনও কিশোর, এখনও তরুণ, তারা কোনদিন বড় হবে না, আজীবন কিশোর থেকে যাবে। আমরা যারা বেঁচে আছি আমাদের বয়স বাড়ছে আমাদের চুল পাকছে, কিন্তু সারাটি জীবন পরিশ্রম করেও আমরা কি সে কিশোর তরুণদের এক ফোঁটা রক্তের ঋণ শোধ করতে পারব?
আমাদের নতুন প্রজন্ম পারবে। শত বাধা বিপত্তি হরতাল, অবরোধ, সন্ত্রাস, অরাজকতা, ভায়োলেন্সের মাঝেও কিন্তু বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। যে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে রেখে দেয়ার জন্য একাত্তরে এ যুদ্ধাপরাধীরা এ দেশে নৃশংস হত্যাকা- ঘটিয়েছিল সেই পাকিস্তানের এখন বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করার সুযোগ নেই! অমর্ত্য সেন স্পষ্ট করে বলেছেন, মানুষের জীবনের মানের কথা চিন্তুা করলে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ ভারত থেকেও বাংলাদেশের মানুষ অনেক ভাল আছ। খাদ্যশস্য স্বাস্থ্য সেবার দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থাকে পৃথিবীর মানুষ এখন একটা বিস্ময় হিসেবে দেখে। সবচেয়ে বড় কথা এই দেশের স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার একটা যুগান্তকারী পরিবর্তন হয়েছে। এ প্রজন্ম যখন দেশের দায়িত্ব নেবে তখন আমাদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবে কার সে ক্ষমতা আছে?

এ মুহূর্তে খবরের কাগজ খুলে যখন একটি যন্ত্রণাকাতর শিশুর মুখ দেখি, একজন মায়ের কান্না দেখি, অগ্নিদগ্ধ একজন মানুষের হাহাকার দেখি তখন মনটা ভারি হয়ে যায়। এটি ডিসেম্বর মাস, এ মাসে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক, সব দুঃখ কষ্ট দূর করে আমাদের সে তরুণ কিশোর মুক্তিযোদ্ধার রক্তের ঋণ আমরা শোধ করবো। আমাদের তরুণ প্রজন্ম নিশ্চয়ই করবে।

৪.১২.১৩

টোনা টুনি: হাসান মাহমুদ

টোনা টুনি
(সত্য ঘটনা) ২৩শে মে, ৪২ মুক্তিসন (২০১২)

বহু বছর আগের কথা, ব্যতিব্যস্ত কাজ করছি আবুধাবী সেন্ট্রাল হাসপাতালের বায়োকেমিস্ট্রি ল্যাবের অফিসে - ল্যাবের ভেতর ব্যতিব্যস্ত আমার টেকনিশিয়ান টেকনোলজিস্টের দল। ফোন বাজল, ওধারে মহিলা:-


"হাসান মাহমুদ বলছেন?"
"বলছি !"
"একজনের কাছ থেকে আপনার ফোন নম্বর পেয়েছি. আমাকে একটু হেল্প করতে হবে"।

হাসি পেল। হাসপাতালে সবাইকে কখনো না কখনো আসতেই হয়। আমার ওপরে আবুধাবীর পঁয়ত্রিশ হাজার বাংলাদেশীর অখণ্ড অধিকার, এ আমার লেগেই আছে। ছোটখাট আইনও ভাঙ্গতে হয় কখনো। বললাম:-

"বলুন!"
"আমি পরশু ঢাকা থেকে এখানে ছেলের সংসারে এসেছি, - আগামী পরশু ফিরে যাব। এক পেশেন্টকে দেখতে চাই”.
“চলে আসুন ভিজিটিং আওয়ারে, কোনো অসুবিধে নেই"
"ভিজিটিং আওয়ারে না। আমি আসতে চাই যখন বাইরের কেউ থাকবে না"
একটু ধাক্কা খেলাম. বললাম – "কোন পেশেন্ট"?


নাম শুনে চুপ হয়ে গেলাম। পেশেন্ট ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে গভীর কমা'তে লাইফ সাপোর্টে আছেন। জীবনের আর কোনো আশা নেই, ডাক্তারেরা জবাব দিয়ে দিয়েছে। এখানে তাঁর স্ত্রী সন্তানেরা আছে - এখন শুধু অপেক্ষা লাইফ সাপোর্ট সরিয়ে নেবার। বললাম:- "উনি তো ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে আছেন. ওখানে অনেক রেস্ট্রিকশন !!"

মিনতিভরা কন্ঠে তিনি বললেন – "দেখুন, উনাকে শুধু একটিবার দেখার জন্য আমি অর্ধেক পৃথিবী পাড়ি দিয়েছি। অফিস আমাকে ছুটি দিচ্ছিল না, রিজাইন করে এসেছি। প্লিজ, প্লি--জ একটা ব্যবস্থা করে দিন!!”

আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে এল - "চাকরী ছেড়ে দিয়েছেন?"
“কি করব – ছুটি দিচ্ছিল না. আমার এত বছরের চাকরী !”

মনে হল জীবনের এমন এক দাবী এসেছে যাকে উপেক্ষা করা সম্ভবও নয়, উচিতও নয়। বললাম-

“যখন বাইরের কেউ থাকবে না......তাহলে তো মাঝরাতে আসতে হয়"
"তাই আসব। আপনি থাকবেন, নাহলে আমাকে ঢুকতে দেবে না"
"রাত দু'টোয় আসুন - আমি ইমার্জেন্সির গেটে থাকব।
"আচ্ছা। আমি সবুজ শাড়ী পরে আসব, চিনতে পারবেন"

রাত দু'টোয় তিনি ট্যাক্সি থেকে নামলেন, সবুজ শাড়ী পরা। আইসিইউ ওয়ার্ডে ঢুকতেই হাসিমুখে ছুটে এল হেড নার্স সুমাইয়া, বলল -“কি ব্যাপার, এত রাতে"? বললাম পেশেন্ট দেখতে এসেছি। সে মৃদু হেসে অন্যদিকে চলে গেল। 

নাকেমুখে বিভিন্ন যন্ত্র থেকে লাগানো নানা রকম পাইপ আর টিউব, ধীরে বইছে নি:শ্বাস। চোখদুটো আগের মতই বন্ধ। সরু টিউবের ভেতর দিয়ে হাতের সুঁচে শরীরে ঢুকছে টিপিএন ফ্লুইড, টোটাল প্যারেন্টারেল নিউট্রিশন. আস্তে তিনি বসলেন বেডের পাশে চেয়ারে। পেশেন্টের হাত ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন-

"টোনা ! আমি তোমার টুনি!!   মনে আছে ছোটবেলার কথা?”

আমি বিস্ফারিত তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছি। এ শরীর এতদিন বিন্দুমাত্র সাড়া দেয়নি শত আহ্বানে তার বন্ধু বান্ধবের, স্ত্রীর এমনকি সন্তানদেরও। সেটা এখনো পড়ে আছে একই রকম নিস্প্রাণ। ওই শরীর, ওই মন, ওই আত্মা কি আর কখনো কারো ডাকে সাড়া দেবে?  তিনি ফিসফিস করে বললেন-

“তোমার অসুখের কথা শুনে ঢাকা থেকে তোমাকে দেখতে এসেছি!"

তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছি. আগের মতই কাঠ হয়ে পড়ে আছে পেসেন্ট - ওটা মৃত শরীরে জীবন্ত আত্মা নাকি জীবন্ত শরীরে মৃত আত্মা বলা কঠিন। কিন্তু আমি কল্পনাও করতে পারিনি ওই নিথর দেহের কোন অতলান্ত গভীরে নড়তে শুরু করেছে রহস্যময় বিশাল কি যেন। মহিলা গভীর মমতায় পেশেন্টের গালে নিজের গাল রাখলেন। আবার ফিসফিস করে বললেন –

"আমি জানি তুমি শুনতে পাচ্ছ ! আমার কথা না শুনে তুমি পারবে না। সেই সবুজ শাড়ীটা তুলে রেখেছিলাম!
এত বছর পর আজ আবার পড়েছি!!”

অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটল। কোন সুদুর অতীত থেকে কত বছরের ক্ষুধার্ত বাল্যপ্রেম তীরবেগে ছুটে এসে যেন বোমার মত
বিস্ফোরিত হল হতচেতন দেহের ভেতরে। থরথর করে কেঁপে উঠল দেহ, নড়ে গেল নাক-মুখের পাইপ, হাতের সুঁচ নড়ে গিয়ে ফিনকি দিয়ে ছুটল রক্ত। আতংকে চীত্কার করে উঠলাম- "সুমাইয়া!" ছুটে এল নার্সের দল কিন্তু
সেই ভূমিকম্প থামায় কার সাধ্য। মহিলা ধরে আছেন তাঁর হাত, কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন,

"শান্ত হও, শান্ত হও টোনা! আমি তোমার পাশে এখনো আছি তো....আমি কখনোই তোমাকে ছেড়ে যাইনি....শান্ত হও....! ” 

কি এক নিবিড় প্রশান্তিতে স্থির হয়ে এল দেহ. আমি তাকিয়ে আছি পাথরের মূর্তির মত। পেশেন্টের হাতের একটা আঙ্গুল একটু একটু নড়ছে. মহিলা অনেক আদরে সেই আঙ্গুলটা ছুঁয়ে রইলেন। যেন স্পষ্ট দেখলাম দুটো টোনাটুনি পাখী ঠোঁটে ঠোঁট রেখে কোন অজানা ভাষায় কথা বলছে জীবনের শেষবার। এদিকে নার্সের চোখে ফুটে উঠেছে কাতর মিনতি। মহিলা সেটা বুঝলেন। অচেতন রোগীর চোখে মুখে গালে কপালে ক্ষুধার্তের মতো হাত বুলোলেন, তারপর গভীর নি:শ্বাস ফেলে বললেন – "চলুন"।

বাইরে ট্যাক্সিতে উঠতে গিয়ে আমার দিকে ফিরে তাকালেন। সে চোখে ফুটে উঠেছে অনুরোধ। আস্তে করে বললাম –"কেউ জানবে না"। 

মহিলা যেন নিজের মনে বললেন - "আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না”। 
তারপর একটু থেমে বললেন – “আপনাকে অনেক, অনেক ধন্যবাদ"

ট্যাক্সি চলে গেল।   আমি সম্মোহিতের মত, মূর্তির মত অপলক হতবাক দাঁড়িয়ে আছি সেই মরুভুমির মাঝরাতে।

Tuesday, December 3, 2013

আবার একাত্তর ॥ কার কোথায় অবস্থান?-আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী


ঢাকায় আমাদের এক পরিচিত জ্যোতিষীকে সম্প্রতি জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াবে? জ্যোতিষী বলেছেন, ‘আমার গণনা বলে, এই পরিস্থিতি সহসাই পরিবর্তিত হবে এবং মহাজোট ক্ষমতায় থাকবে।’ জ্যোতিষী-বাক্যে আমার খুব একটা বিশ্বাস নেই। কিন্তু আমার কোন কোন বন্ধু তাতে মহা উৎসাহী হয়েছেন, বিশেষ করে আমরা রাজনৈতিক-গবেষক বন্ধু মোনায়েম সরকার উৎসাহের আধিক্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একটা নোট পাঠিয়ে জ্যোতিষীর কথাটা তাঁকে জানিয়েছেন। হাসিনা জবাব দিয়েছেন, জ্যোতিষী আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন না। আল্লাহ আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন। ইংরেজীতে তিনি লিখেছেন, ‘‘অষষধয রিষষ ফবপরফব ড়ঁৎ ভধঃব.’’
আমি কথাটা জানার পর শেখ হাসিনার সাহস ও আত্মবিশ্বাস সম্পর্কে আরও বেশি প্রত্যয়ী হয়েছি। এই সাহস ও আত্মবিশ্বাস তিনি পেয়েছেন তাঁর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে। ১৯৭১ সালের গোড়ায় সেই ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক প্রলয়ের দিনগুলোর একটি দিনের কথা এখনও আমার মনে আছে। তখন অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে সারা বাংলা উত্তাল। ঢাকায় মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক চলছে। এই সময় বঙ্গবন্ধু এক সকালে বত্রিশ নম্বর ধানমণ্ডির বাসার বারান্দায় বসে আছেন। কথা বলছেন আমাদের সঙ্গে। লোকজন আসছে-যাচ্ছে। তখন এক যুবক তাঁর কাছে এসে দাঁড়ালেন। 
পরে জেনেছি, তিনি তখনকার ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) এক জুনিয়র বাঙালী অফিসার ছিলেন। ঢাকা বিমান বন্দরে তাঁর পোস্টিং ছিল। তিনি বঙ্গবন্ধুকে গোপনে নানা খবরাখবর জানাতেন। সেদিন তিনি বঙ্গবন্ধুকে জানালেন, ইয়াহিয়া একদিকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠক করছেন, ভাব দেখাচ্ছেন আলোচনা সফল হবে। অন্যদিকে গোপনে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্লেনভর্তি করে সৈন্য ও অস্ত্র আমদানি করা হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানে। ভারতের ওপর দিয়ে পাকিস্তানের প্লেন চলাচল করতে দেয়া হচ্ছে না। সুতরাং সিলোন (শ্রীলঙ্কা) হয়ে এই সৈন্য ও অস্ত্র আনা হচ্ছে। ইয়াহিয়ার মনে অন্য কোন মতলব আছে।
কথাটা শুনে বঙ্গবন্ধু ভাবিত হয়েছিলেন। ভাবিত হয়েছিলাম তখন ৩২ নম্বরে উপস্থিত কয়েকজন সাংবাদিকও। পরিস্থিতি তখন দিন দিন খুবই ঘোলাটে হচ্ছে। আজকের মহাজোটের মতো সেদিন দেশের বামদের একটা বড় অংশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ বটে; কিন্তু তখনকার চীনপন্থী বামরা স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ঘোট পাকাচ্ছে। মুসলিম লীগ, জামায়াত, নেজামে ইসলাম প্রভৃতি সাম্প্রদায়িক দল প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির বিপক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে। প্রবীণ বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশ আজকের বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশের মতো বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে নানা ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করছে, দেশময় বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। আজকের প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকার মতো তখনকার দৈনিক আজাদ ও মর্নিং নিউজের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত শঠতাপূর্ণ। বামপন্থী বলে পরিচিত এনায়েতুল্লা খানের ‘সাপ্তাহিক হলিডে’ পত্রিকাটি তো প্রতি সপ্তাহে প্রোপাগান্ডা চালাত, শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রিত্বের লোভে সামরিক জান্তার কাছে আত্মসমর্পণ করবেন, সংগ্রামে নামবেন না। তিনি সংগ্রামের নামে জনসাধারণকে প্রতারণা করছেন ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই যখন বাংলাদেশের পরিস্থিতি, চারদিকে জটিল ও কুটিল পন্থায় অনুসারীদের চক্রান্ত এবং এই বঙ্গবন্ধু একা নিরস্ত্র সেনাপতি, তখন আমরা ভেবেছি, তিনি কি পারবেন এই মহাদুর্যোগ পাড়ি দেয়ার শক্তি ও সাহস দেখাতে? নাকি পরাজয় বাঙালীর ললাটলিপি? ইপিআরের জুনিয়র বাঙালী অফিসারটি বঙ্গবন্ধুকে যে খবরটি দিয়ে গিয়েছিলেন, তা জেনে বঙ্গবন্ধুর মনে কী প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল জানি না; কিন্তু আমরা সেখানে উপস্থিত কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধু খুব ভেঙ্গে পড়েছিলাম। 
আমি বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বঙ্গবন্ধু, এখন কী হবে? ওরা তো বাংলাদেশের মাটিতে সৈন্য ও অস্ত্র নামাতে শুরু করেছে। ভাবচক্কর ভাল মনে হয় না, আমরা নিরস্ত্র। এখন কী হবে? বঙ্গবন্ধু পাইপ টানছিলেন, সেটি ঠোঁট থেকে সরালেন, রুমালে ঠোঁট মুছলেন। তার পর ধীরকণ্ঠে পাঠ করলেন, ‘নাসরুন মিনাল্লাহে ওয়া ফাতহুন কারিব।’ আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন, এর অর্থ এবং শানে নজুল জানো? 
আমি একটা সময় পর্যন্ত মাদ্রাসার ছাত্র ছিলাম। পবিত্র কোরানের এই পঙ্ক্তিটির অর্থ ও শানে নজুল জানতাম। বলেছিলাম, বঙ্গবন্ধু, আমি এর অর্থ জানি। শক্তিশালী কাফের সৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধে মহানবী (দ) পরাজয় যখন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, তখন এই আয়াত নাজেল হয়েছিল, আল্লাহ বলেছেন, হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা ভীত ও শঙ্কিত হয়ো না। আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় তোমাদের সন্নিকটবর্তী। এই যুদ্ধ অনিবার্য পরাজয় ঠেকিয়ে মুসলমানরা জয়ী হয়েছিল। আমার এই জবাব শুনে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত প্রত্যয়পূর্ণ কণ্ঠে বলেছিলেন, আমরা নিরস্ত্র ও শত্রুবেষ্টিত হতে পারি। কিন্তু আল্লাহ জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবেন। আমার বিশ্বাস এই যুদ্ধে জনগণ জয়ী হবে।
বহু বছর আগের কথা। আবার শেখ হাসিনার কণ্ঠে সেই কথার অনুরণন শুনলাম। এই যুদ্ধে শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জনগণের চূড়ান্ত জয়ে আস্থা না থাকলে শেখ হাসিনার পক্ষে জীবনবাজি রেখে নিজের কঠোর অবস্থানে টিকে থাকা সম্ভব হতো না। একদিক থেকে বঙ্গবন্ধুর চাইতেও অনেক বেশি কঠিন সংগ্রামে শেখ হাসিনা রত এবং বঙ্গবন্ধুর চাইতেও অনেক বেশি শত্রুবেষ্টিত এবং চারদিক থেকে অবরুদ্ধ। তাঁর দেশী-বিদেশী শত্রুপক্ষও অনেক বেশি শক্তিশালী। তাদের প্রোপাগান্ডা আরও বেশি চাতুর্যপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর। শেখ হাসিনা তবু নিজের অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন। গ্রেনেড হামলায় আহত হয়েও যেমন রণাঙ্গন ছেড়ে যাননি; আজও রণাঙ্গন ছাড়ছেন না। তাঁর এই সাহস ও দৃঢ়তাই হয়ত বাংলাদেশে পঁচাত্তরের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর সব চক্রান্ত ব্যর্থ করবে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বিপদমুক্ত রাখবে। 
শেখ হাসিনার হালের অবস্থা একনজরে একটু দেখা যাক। তাঁর মহাজোটের ঐক্য অক্ষুণœ আছে বটে, কিন্তু মহাজোট চারদিক থেকে আক্রান্ত। এটা একাত্তরের অসমাপ্ত যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি। একাত্তরের পরাজিত চক্র এবার অনেক বেশি শক্তি সংগ্রহ করে ডেসপারেট হয়ে যুদ্ধজয়ের চূড়ান্ত প্রচেষ্টায় নেমেছে। দেশময় চালাচ্ছে ধ্বংসাত্মক কর্মকা-। এক ফ্রন্টে স্বাধীনতার এই শত্রুপক্ষকে মোকাবেলা করা হাসিনা সরকারের পক্ষে কঠিন হতো না, যদি আর তিন ফ্রন্টে তিন ধরনের চক্র হাসিনা সরকারকে উচ্ছেদে দলবদ্ধ হামলা চালিয়ে স্বাধীনতার শত্রুপক্ষকে সাহায্য না জাগাতো। 
এই তিন ফ্রন্টের তিন চক্র হচ্ছে, (ক) একটি সুশীল সমাজ ও এলিট শ্রেণীর সুযোগসন্ধানী অংশ নিয়ে গঠিত ইউনুস শিবির; (খ) নিরপেক্ষতার মুখোশ ঢাকা একটি হাসিনা-বিদ্বেষী মিডিয়া সার্কেল, যাঁর নেতা প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার; যাঁরা আবার ইউনুস-শিবিরেরও অনুগ্রহভোগী; (গ) রাজনীতিতে বার বার জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত কিছু প্রবীণ ও নবীন রাজনৈতিক নেতা, যাঁদের মধ্যে আছেন ড. কামাল হোসেন, ডা. বদরুদ্দোজা, কাদের সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ অনেকে।
এই তিন চক্র সংঘবদ্ধ হয়ে যা করছে, অর্থাৎ হাসিনা সরকারের অবিরাম বিরোধিতা এবং হাসিনাবিরোধী প্রচার, তা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নয়, বিপক্ষের শিবিরকে সহায়তা যোগাচ্ছে। ড. ইউনূসের কাছে দেশের বৃহত্তর স্বার্থের চাইতে গ্রামীণ ব্যাংকের স্বার্থ অনেক বেশি বড়। এই স্বার্থের জন্য দেশ গোল্লায় যাক, সে জন্য তাঁর পরোয়া নেই। তিনি বিদেশে বসে শুধু সরকারের বিরুদ্ধে নয়, দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধেই ঘোট পাকাচ্ছেন।
হাসিনা সরকারকে আর কোনভাবে কাবু করতে না পেরে ২০০৮ সালের নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হয়নি তা প্রমাণ করার জন্য প্রায় মস্তিষ্কবিকৃত এক সাংবাদিকের দ্বারা সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের লেখা বলে প্রচারিত একটি পুরনো চিঠি আবার বাজারে ছাড়া হয়েছে। হিলারি ক্লিনটন যে ড. ইউনূসের পুরনো বান্ধবী এটা সর্বজনবিদিত। গ্রামীণ ব্যাংকে ইউনূসের মালিকানা বহাল রাখার জন্য আমেরিকার সকল প্রকার সরকারী প্রভাব হিলারি বাংলাদেশের ওপর খাটাবার চেষ্টা করেছেন। পারেননি। এখন তাঁর লেখা বলে প্রচারিত একটি পুরনো চিঠি ইউনূস-শিবিরের ঝোলা থেকে বের করে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইউনূস-শিবিরের দেউলিয়াত্বই এতে প্রমাণিত হয়।
মহাজোটের ভেতরেও শেখ হাসিনার জন্য সমস্যা আছে। তিনি চতুর্মুখী চক্রান্ত থেকে দেশ এবং গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্য মহাজোটে সিন্দবাদের বৃদ্ধ দৈত্যটিকেও গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন। এই দৈত্যের মতিগতি ভাল নয়। তিনি সকালে যা বলেন, বিকেলে নিজেই তাঁর প্রতিবাদ করেন। তিনি কারও পরীক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু সেটাও আজ পর্যন্ত প্রমাণ করতে পারেননি। তিনি শেখ হাসিনার নির্বাচনকালীন সরকারে বহু আসন নিয়েছেন। এখন আবার বলছেন, তিনি নির্বাচনে যাবেন না। কারণ, দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ নেই। এটাও তাঁর শেষ কথা, তা কেউ বিশ্বাস করছে না। এটা নতুন কোন দরকষাকষি কি না কে বলবে?
তবু এই বৃদ্ধ দৈত্যকেও সহ্য করে চলতে হচ্ছে মহাজোটকে। রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সেতুবন্ধ বাঁধার জন্য রামকে বানরদের সাহায্য গ্রহণ করতে হয়েছিল। বাংলাদেশেও রাবণ বধের যুদ্ধে শেখ হাসিনাকে কোন কোন বিতর্কিত ব্যক্তি ও দলের ওপর নির্ভর করতে হবে। তবে আমার একটি ধারণা, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই বৃদ্ধ সিন্দবাদ যেভাবে পানি ঘোলা করে চলেছেন, তাতে এই ঘোলাপানি তাঁকেই একদিন পান করতে হবে এবং দেশের রাজনীতি থেকে তাঁর বিদায়ের দৃশ্যটি হবে শিক্ষামূলক।
সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন, কিন্তু জনজীবনকে নিত্যবিড়ম্বনা থেকে মুক্ত করতে পারছেন না। দেশের হাইওয়েগুলোকে যদি সন্ত্রাসমুক্ত করা না যায়, তাহলে ঢাকায় বিভিন্ন জিনিসপত্র ও মাছ, তরিতরকারি সরবরাহ কমবে এবং দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে। দেশের আমদানি-রফতানিবাণিজ্যেও তা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। দেশের ব্যবসায়ী মহল তাই উদ্বিগ্ন। তাঁরা ইতোমধ্যেই এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সরকারকে এ ব্যাপারে সহসাই একটা পদক্ষেপ নিতে হবে। 
পরিস্থিতি কোন্্ দিকে গড়াবে, তা আগামী দু’এক দিনের মধ্যে পরিষ্কার হবে তা মনে হয় না। এই যুদ্ধ দুটি রাজনৈতিক দল বা পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ নয়। এই যুদ্ধ একাত্তরের অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্ব। এই যুদ্ধে শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের জয়-পরাজয়ের ওপর বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ভর করছে। শেখ হাসিনা যে অদম্য সাহস নিয়ে চতুর্দিকে পরাক্রান্ত দেশী-বিদেশী শত্রুবেষ্টিত অবস্থাতেও সাহসের সঙ্গে লড়াই করছেন, তা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে অতুলনীয়।
আমরা বলে থাকি চূড়ান্ত যুদ্ধে জনগণের কখনও পরাজয় ঘটে না। বর্তমানের ঘনায়মান দুর্যোগ যত ভয়ঙ্কর হোক, হাসিনার সাহসী নেতৃত্বে জনগণ তা অতিক্রম করবে সে বিশ্বাস আমার আছে। কিন্তু এই যুদ্ধে আমাদের সুশীল সমাজ ও এলিট ক্লাসের একটা বড় অংশের চতুর ও প্রতারণাপূর্ণ অবস্থান যুদ্ধজয়কে কঠিন করে তুলছে। যার জন্য ভোগান্তি হচ্ছে জনগণের। এর খেসারতও একদিন গত শতকের ত্রিশের ইউরোপের বুদ্ধিজীবী ও এলিট ক্লাসের মতো বাংলাদেশের বর্ণিত এলিট ক্লাস ও সুশীল সমাজকে অবশ্যই দিতে হবে।

[লন্ডন, ৩ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার, ২০১৩]

আবার একাত্তর ॥ কার কোথায় অবস্থান?-আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী


ঢাকায় আমাদের এক পরিচিত জ্যোতিষীকে সম্প্রতি জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াবে? জ্যোতিষী বলেছেন, ‘আমার গণনা বলে, এই পরিস্থিতি সহসাই পরিবর্তিত হবে এবং মহাজোট ক্ষমতায় থাকবে।’ জ্যোতিষী-বাক্যে আমার খুব একটা বিশ্বাস নেই। কিন্তু আমার কোন কোন বন্ধু তাতে মহা উৎসাহী হয়েছেন, বিশেষ করে আমরা রাজনৈতিক-গবেষক বন্ধু মোনায়েম সরকার উৎসাহের আধিক্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একটা নোট পাঠিয়ে জ্যোতিষীর কথাটা তাঁকে জানিয়েছেন। হাসিনা জবাব দিয়েছেন, জ্যোতিষী আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন না। আল্লাহ আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন। ইংরেজীতে তিনি লিখেছেন, ‘‘অষষধয রিষষ ফবপরফব ড়ঁৎ ভধঃব.’’

আমি কথাটা জানার পর শেখ হাসিনার সাহস ও আত্মবিশ্বাস সম্পর্কে আরও বেশি প্রত্যয়ী হয়েছি। এই সাহস ও আত্মবিশ্বাস তিনি পেয়েছেন তাঁর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে। ১৯৭১ সালের গোড়ায় সেই ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক প্রলয়ের দিনগুলোর একটি দিনের কথা এখনও আমার মনে আছে। তখন অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে সারা বাংলা উত্তাল। ঢাকায় মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক চলছে। এই সময় বঙ্গবন্ধু এক সকালে বত্রিশ নম্বর ধানমণ্ডির বাসার বারান্দায় বসে আছেন। কথা বলছেন আমাদের সঙ্গে। লোকজন আসছে-যাচ্ছে। তখন এক যুবক তাঁর কাছে এসে দাঁড়ালেন। 
পরে জেনেছি, তিনি তখনকার ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) এক জুনিয়র বাঙালী অফিসার ছিলেন। ঢাকা বিমান বন্দরে তাঁর পোস্টিং ছিল। তিনি বঙ্গবন্ধুকে গোপনে নানা খবরাখবর জানাতেন। সেদিন তিনি বঙ্গবন্ধুকে জানালেন, ইয়াহিয়া একদিকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠক করছেন, ভাব দেখাচ্ছেন আলোচনা সফল হবে। অন্যদিকে গোপনে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্লেনভর্তি করে সৈন্য ও অস্ত্র আমদানি করা হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানে। ভারতের ওপর দিয়ে পাকিস্তানের প্লেন চলাচল করতে দেয়া হচ্ছে না। সুতরাং সিলোন (শ্রীলঙ্কা) হয়ে এই সৈন্য ও অস্ত্র আনা হচ্ছে। ইয়াহিয়ার মনে অন্য কোন মতলব আছে।
কথাটা শুনে বঙ্গবন্ধু ভাবিত হয়েছিলেন। ভাবিত হয়েছিলাম তখন ৩২ নম্বরে উপস্থিত কয়েকজন সাংবাদিকও। পরিস্থিতি তখন দিন দিন খুবই ঘোলাটে হচ্ছে। আজকের মহাজোটের মতো সেদিন দেশের বামদের একটা বড় অংশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ বটে; কিন্তু তখনকার চীনপন্থী বামরা স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ঘোট পাকাচ্ছে। মুসলিম লীগ, জামায়াত, নেজামে ইসলাম প্রভৃতি সাম্প্রদায়িক দল প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির বিপক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে। প্রবীণ বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশ আজকের বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশের মতো বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে নানা ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করছে, দেশময় বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। আজকের প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকার মতো তখনকার দৈনিক আজাদ ও মর্নিং নিউজের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত শঠতাপূর্ণ। বামপন্থী বলে পরিচিত এনায়েতুল্লা খানের ‘সাপ্তাহিক হলিডে’ পত্রিকাটি তো প্রতি সপ্তাহে প্রোপাগান্ডা চালাত, শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রিত্বের লোভে সামরিক জান্তার কাছে আত্মসমর্পণ করবেন, সংগ্রামে নামবেন না। তিনি সংগ্রামের নামে জনসাধারণকে প্রতারণা করছেন ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই যখন বাংলাদেশের পরিস্থিতি, চারদিকে জটিল ও কুটিল পন্থায় অনুসারীদের চক্রান্ত এবং এই বঙ্গবন্ধু একা নিরস্ত্র সেনাপতি, তখন আমরা ভেবেছি, তিনি কি পারবেন এই মহাদুর্যোগ পাড়ি দেয়ার শক্তি ও সাহস দেখাতে? নাকি পরাজয় বাঙালীর ললাটলিপি? ইপিআরের জুনিয়র বাঙালী অফিসারটি বঙ্গবন্ধুকে যে খবরটি দিয়ে গিয়েছিলেন, তা জেনে বঙ্গবন্ধুর মনে কী প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল জানি না; কিন্তু আমরা সেখানে উপস্থিত কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধু খুব ভেঙ্গে পড়েছিলাম। 
আমি বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বঙ্গবন্ধু, এখন কী হবে? ওরা তো বাংলাদেশের মাটিতে সৈন্য ও অস্ত্র নামাতে শুরু করেছে। ভাবচক্কর ভাল মনে হয় না, আমরা নিরস্ত্র। এখন কী হবে? বঙ্গবন্ধু পাইপ টানছিলেন, সেটি ঠোঁট থেকে সরালেন, রুমালে ঠোঁট মুছলেন। তার পর ধীরকণ্ঠে পাঠ করলেন, ‘নাসরুন মিনাল্লাহে ওয়া ফাতহুন কারিব।’ আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন, এর অর্থ এবং শানে নজুল জানো? 

আমি একটা সময় পর্যন্ত মাদ্রাসার ছাত্র ছিলাম। পবিত্র কোরানের এই পঙ্ক্তিটির অর্থ ও শানে নজুল জানতাম। বলেছিলাম, বঙ্গবন্ধু, আমি এর অর্থ জানি। শক্তিশালী কাফের সৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধে মহানবী (দ) পরাজয় যখন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, তখন এই আয়াত নাজেল হয়েছিল, আল্লাহ বলেছেন, হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা ভীত ও শঙ্কিত হয়ো না। আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় তোমাদের সন্নিকটবর্তী। এই যুদ্ধ অনিবার্য পরাজয় ঠেকিয়ে মুসলমানরা জয়ী হয়েছিল। আমার এই জবাব শুনে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত প্রত্যয়পূর্ণ কণ্ঠে বলেছিলেন, আমরা নিরস্ত্র ও শত্রুবেষ্টিত হতে পারি। কিন্তু আল্লাহ জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবেন। আমার বিশ্বাস এই যুদ্ধে জনগণ জয়ী হবে।

বহু বছর আগের কথা। আবার শেখ হাসিনার কণ্ঠে সেই কথার অনুরণন শুনলাম। এই যুদ্ধে শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জনগণের চূড়ান্ত জয়ে আস্থা না থাকলে শেখ হাসিনার পক্ষে জীবনবাজি রেখে নিজের কঠোর অবস্থানে টিকে থাকা সম্ভব হতো না। একদিক থেকে বঙ্গবন্ধুর চাইতেও অনেক বেশি কঠিন সংগ্রামে শেখ হাসিনা রত এবং বঙ্গবন্ধুর চাইতেও অনেক বেশি শত্রুবেষ্টিত এবং চারদিক থেকে অবরুদ্ধ। তাঁর দেশী-বিদেশী শত্রুপক্ষও অনেক বেশি শক্তিশালী। তাদের প্রোপাগান্ডা আরও বেশি চাতুর্যপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর। শেখ হাসিনা তবু নিজের অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন। গ্রেনেড হামলায় আহত হয়েও যেমন রণাঙ্গন ছেড়ে যাননি; আজও রণাঙ্গন ছাড়ছেন না। তাঁর এই সাহস ও দৃঢ়তাই হয়ত বাংলাদেশে পঁচাত্তরের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর সব চক্রান্ত ব্যর্থ করবে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বিপদমুক্ত রাখবে। 
শেখ হাসিনার হালের অবস্থা একনজরে একটু দেখা যাক। তাঁর মহাজোটের ঐক্য অক্ষুন্ন আছে বটে, কিন্তু মহাজোট চারদিক থেকে আক্রান্ত। এটা একাত্তরের অসমাপ্ত যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি। একাত্তরের পরাজিত চক্র এবার অনেক বেশি শক্তি সংগ্রহ করে ডেসপারেট হয়ে যুদ্ধজয়ের চূড়ান্ত প্রচেষ্টায় নেমেছে। দেশময় চালাচ্ছে ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড।
 এক ফ্রন্টে স্বাধীনতার এই শত্রুপক্ষকে মোকাবেলা করা হাসিনা সরকারের পক্ষে কঠিন হতো না, যদি আর তিন ফ্রন্টে তিন ধরনের চক্র হাসিনা সরকারকে উচ্ছেদে দলবদ্ধ হামলা চালিয়ে স্বাধীনতার শত্রুপক্ষকে সাহায্য না জাগাতো। 
এই তিন ফ্রন্টের তিন চক্র হচ্ছে, (ক) একটি সুশীল সমাজ ও এলিট শ্রেণীর সুযোগসন্ধানী অংশ নিয়ে গঠিত ইউনুস শিবির; (খ) নিরপেক্ষতার মুখোশ ঢাকা একটি হাসিনা-বিদ্বেষী মিডিয়া সার্কেল, যাঁর নেতা প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার; যাঁরা আবার ইউনুস-শিবিরেরও অনুগ্রহভোগী; (গ) রাজনীতিতে বার বার জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত কিছু প্রবীণ ও নবীন রাজনৈতিক নেতা, যাঁদের মধ্যে আছেন ড. কামাল হোসেন, ডা. বদরুদ্দোজা, কাদের সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ অনেকে।

এই তিন চক্র সংঘবদ্ধ হয়ে যা করছে, অর্থাৎ হাসিনা সরকারের অবিরাম বিরোধিতা এবং হাসিনাবিরোধী প্রচার, তা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নয়, বিপক্ষের শিবিরকে সহায়তা যোগাচ্ছে। ড. ইউনূসের কাছে দেশের বৃহত্তর স্বার্থের চাইতে গ্রামীণ ব্যাংকের স্বার্থ অনেক বেশি বড়। এই স্বার্থের জন্য দেশ গোল্লায় যাক, সে জন্য তাঁর পরোয়া নেই। তিনি বিদেশে বসে শুধু সরকারের বিরুদ্ধে নয়, দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধেই ঘোট পাকাচ্ছেন।

হাসিনা সরকারকে আর কোনভাবে কাবু করতে না পেরে ২০০৮ সালের নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হয়নি তা প্রমাণ করার জন্য প্রায় মস্তিষ্কবিকৃত এক সাংবাদিকের দ্বারা সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের লেখা বলে প্রচারিত একটি পুরনো চিঠি আবার বাজারে ছাড়া হয়েছে। হিলারি ক্লিনটন যে ড. ইউনূসের পুরনো বান্ধবী এটা সর্বজনবিদিত। গ্রামীণ ব্যাংকে ইউনূসের মালিকানা বহাল রাখার জন্য আমেরিকার সকল প্রকার সরকারী প্রভাব হিলারি বাংলাদেশের ওপর খাটাবার চেষ্টা করেছেন। পারেননি। এখন তাঁর লেখা বলে প্রচারিত একটি পুরনো চিঠি ইউনূস-শিবিরের ঝোলা থেকে বের করে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইউনূস-শিবিরের দেউলিয়াত্বই এতে প্রমাণিত হয়।

মহাজোটের ভেতরেও শেখ হাসিনার জন্য সমস্যা আছে। তিনি চতুর্মুখী চক্রান্ত থেকে দেশ এবং গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্য মহাজোটে সিন্দবাদের বৃদ্ধ দৈত্যটিকেও গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন। এই দৈত্যের মতিগতি ভাল নয়। তিনি সকালে যা বলেন, বিকেলে নিজেই তাঁর প্রতিবাদ করেন। তিনি কারও পরীক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু সেটাও আজ পর্যন্ত প্রমাণ করতে পারেননি। তিনি শেখ হাসিনার নির্বাচনকালীন সরকারে বহু আসন নিয়েছেন। এখন আবার বলছেন, তিনি নির্বাচনে যাবেন না। কারণ, দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ নেই। এটাও তাঁর শেষ কথা, তা কেউ বিশ্বাস করছে না। এটা নতুন কোন দরকষাকষি কি না কে বলবে?

তবু এই বৃদ্ধ দৈত্যকেও সহ্য করে চলতে হচ্ছে মহাজোটকে। রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সেতুবন্ধ বাঁধার জন্য রামকে বানরদের সাহায্য গ্রহণ করতে হয়েছিল। বাংলাদেশেও রাবণ বধের যুদ্ধে শেখ হাসিনাকে কোন কোন বিতর্কিত ব্যক্তি ও দলের ওপর নির্ভর করতে হবে। তবে আমার একটি ধারণা, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই বৃদ্ধ সিন্দবাদ যেভাবে পানি ঘোলা করে চলেছেন, তাতে এই ঘোলাপানি তাঁকেই একদিন পান করতে হবে এবং দেশের রাজনীতি থেকে তাঁর বিদায়ের দৃশ্যটি হবে শিক্ষামূলক।

সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন, কিন্তু জনজীবনকে নিত্যবিড়ম্বনা থেকে মুক্ত করতে পারছেন না। দেশের হাইওয়েগুলোকে যদি সন্ত্রাসমুক্ত করা না যায়, তাহলে ঢাকায় বিভিন্ন জিনিসপত্র ও মাছ, তরিতরকারি সরবরাহ কমবে এবং দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে। দেশের আমদানি-রফতানিবাণিজ্যেও তা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। দেশের ব্যবসায়ী মহল তাই উদ্বিগ্ন। তাঁরা ইতোমধ্যেই এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সরকারকে এ ব্যাপারে সহসাই একটা পদক্ষেপ নিতে হবে। 

পরিস্থিতি কোন্ দিকে গড়াবে, তা আগামী দু’এক দিনের মধ্যে পরিষ্কার হবে তা মনে হয় না। এই যুদ্ধ দুটি রাজনৈতিক দল বা পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ নয়। এই যুদ্ধ একাত্তরের অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্ব। এই যুদ্ধে শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের জয়-পরাজয়ের ওপর বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ভর করছে। শেখ হাসিনা যে অদম্য সাহস নিয়ে চতুর্দিকে পরাক্রান্ত দেশী-বিদেশী শত্রুবেষ্টিত অবস্থাতেও সাহসের সঙ্গে লড়াই করছেন, তা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে অতুলনীয়।

আমরা বলে থাকি চূড়ান্ত যুদ্ধে জনগণের কখনও পরাজয় ঘটে না। বর্তমানের ঘনায়মান দুর্যোগ যত ভয়ঙ্কর হোক, হাসিনার সাহসী নেতৃত্বে জনগণ তা অতিক্রম করবে সে বিশ্বাস আমার আছে। কিন্তু এই যুদ্ধে আমাদের সুশীল সমাজ ও এলিট ক্লাসের একটা বড় অংশের চতুর ও প্রতারণাপূর্ণ অবস্থান যুদ্ধজয়কে কঠিন করে তুলছে। যার জন্য ভোগান্তি হচ্ছে জনগণের। এর খেসারতও একদিন গত শতকের ত্রিশের ইউরোপের বুদ্ধিজীবী ও এলিট ক্লাসের মতো বাংলাদেশের বর্ণিত এলিট ক্লাস ও সুশীল সমাজকে অবশ্যই দিতে হবে।

[লন্ডন, ৩ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার, ২০১৩]

Saturday, November 30, 2013

বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিরুদ্ধে বঙ্গভবন ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অফিসারদের প্রতিরোধ- হাজারো সেনা হত্যাকারী জিয়া: মুসা সাদিক



১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর খুনীরা তড়িঘড়ি করে খন্দকার মোশতাককে প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর সামনে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নেয়। সেনাবাহিনী, রক্ষী বাহিনী ও দেশবাসীর সামনে তারা দেখাতে চায় যে, বঙ্গবন্ধু জীবিত নেই বলে বাংলাদেশে কোন ক্ষমতার বা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের শূন্যতা সৃষ্টি হয়নি।


১৫ আগস্ট বিকেলে বঙ্গভবনে খুনী খন্দকার মোশতাকের শপথ অনুষ্ঠানের তোড়জোড় শুরু করেন রাষ্ট্রপতির সচিব আব্দুর রহিম এবং স্বঘোষিত মুখ্য সচিব মাহবুব-উল-আলম চাষী (সিআইএ'র চর বলে প্রমাণিত হওয়ায় পাকিস্তান আমলে চাকরিচ্যুত) এবং তাদের আদেশে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খুনী মোশতাকের শপথ অনুষ্ঠানের ভাব-গাম্ভীর্য বৃদ্ধির জন্য খুনী মোশতাক-ডালিম-ফারুকদের সঙ্গে ঘন ঘন বৈঠক হয়। 
বঙ্গভবনে খুনীদের একদিন পার হলো। ১৬ আগস্ট সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্টের ফটোগ্রাফার আমির খসরুর কাছ থেকে খবর পেয়ে আমি ও কুমার শংকর হাজরা (খুনী মোশতাকের অফিসার) দোতলায় গেলাম খুনীদের মাতলামি করার ঘটনা দেখতে। আমরা দু'জন দোতলায় লিফটের দরজা খুলতেই দেখলাম লিফট থেকে ১০-১২ হাত দূরে বঙ্গবন্ধুর এক খুনী রিসালদার মহিউদ্দিনের এক হাতে মদের বোতল, আরেক হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। রাতে জানলাম আর্মি চীফ জেনারেল শফিউল্লাহ বঙ্গভবনে বন্দী। রাত ১১টার পরে খুনীদের দুটি মাইক্রোবাসে সুন্দরী মহিলারা এসে বঙ্গভবনে নামল। তাদের দোতলায় কিলারদের কক্ষের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। বলা হলো কিলারদের স্ত্রীরা এসেছেন। অনেকে বিশ্বাস করতে পারল না। 

১৭ আগস্ট সকাল ৯/১০টার দিকে বঙ্গভবন থেকে ফোন করে ঢাকার পত্রিকার সম্পাদকদের বঙ্গভবনে আসার ফরমান জারি হলো। ঢাকার সম্পাদকরা প্রবীণতম সম্পাদক জনাব ওবায়দুল হক সাহেবের নেতৃত্বে ১০-১২ জন সম্পাদক এলেন বঙ্গভবনে। বঙ্গভবনের গেট পেরিয়ে আসার পর বঙ্গভবনের সিঁড়িতে তাঁদের আটকে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় দাঁড় করিয়ে রাখল অস্ত্রধারীরা। আমরা তাদের সেখান থেকে আনার জন্য গেলাম। কিন্তু অস্ত্রধারী খুনীরা হাতের ইশারায় আমাদের দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে বলল। বাংলাদেশ অবজারভারের সম্পাদক জনাব ওবায়দুল হক সবার পক্ষ থেকে অস্ত্রধারীদের বললেন, বঙ্গভবনের বৈঠকের জন্য তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাঁদের যদি ভেতরে যেতে না দেয়া হয়, তবে তাঁরা চলে যাবেন।
 এ কথা বলামাত্র মাথায় খুন চেপে থাকা বঙ্গভবনের অস্ত্রধারী খুনীরা তাদের দিকে হিংস্রভাবে তেড়ে এসে তাদের মাথার ও বুকের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে চিৎকার করে বলে উঠল : “Shut up, shut up you bustards, if you say a word, you are dead, all of you are dead. 

সম্পাদকরা সেই রক্ত পিপাসু খুনীদের আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে ভয়ে আতঙ্কে ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে সিঁড়ির ওপর পড়ে যান। কেউ কেউ কাঁপতে কাঁপতে সিঁড়ির ওপর বসে পড়েন। দেশের গুণী সম্পাদকরা নিজেদের আত্মসম্মান বাঁচাতে বঙ্গভবনে খুনীদের হাতে তাঁদের লাঞ্ছিত হবার ও নিগৃহীত হবার ঘটনা সেদিন জনসম্মুখে প্রকাশ করেননি!! (গত ২০ জুলাই, ২০০৩ হোটেল শেরাটনে দৈনিক ভোরের কাগজের যুগপূর্তি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কৃত করেন দেশের প্রবীণতম সম্পাদক ৯৮ বছরের বর্ষীয়ান এই বিবেকের কণ্ঠস্বর জনাব ওবায়দুল হক।) 
অনুষ্ঠান শেষে আমি তাঁকে জানালাম যে, ''৭৫-এর ১৭ আগস্ট বঙ্গভবনে খুনীরা সম্পাদকদের বুকের ওপর যে আগ্নেয়াস্ত্র ধরেছিল, সেটা আমি বহুবার ১৫ আগস্টের পত্র-পত্রিকায় লিখেছি।' তিনি আমার হাত জড়িয়ে ধরে টেনে নিয়ে তাঁর পাশে বসালেন। তখন সেখানে বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক মমতাজউদদীন সাহেবও তাঁর আরেক পাশে ছিলেন। তিনি তাঁর পাশে বসিয়ে আমাকে বললেন, "মুসা সাদিক, আপনি 'খুনীদের মাথার মুকুট' শিরোনামে দৈনিক জনকণ্ঠে যেটা লিখেছেন, সেটা লেখার সাহস এদেশে আর কেউ দেখাতে পারেনি।

 সেজন্য আপনাকে আমি ধন্যবাদ দেই। আপনার অসীম সাহস। '৭১-এর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসটা আপনাকে দেখলে চেনা যায়। আমি দোয়া করি, আল্লাহতায়ালা যেন আমার চেয়েও আপনার আয়ু বেশি দেন।" তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "আচ্ছা জিয়ার সময় আইএসপিআরের ডিরেক্টর কে ছিল যেন? ওর নাম কি যেন? ওর নামটা কি ছিল? দেখুন না, বয়স হয়েছে, এখন আর কিছু মনে করতে পারি নে!" আমারও তখন নামটা মনে পড়ছিল না। তিনি নামটি মনে করার জন্য অনেকক্ষণ চেষ্টার পর বললেন, "হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে, জাহিদ। আপনার লেখায় জাহিদের একটা কথা লিখে দেবেন যে, জিয়ার সময় জাহিদ ১৯৮১ সালে একদিন অবজারভার অফিসে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে। এসে সে বলে যে, "ক'দিন আগের ক্যু'র জন্য আর্মির দু'হাজার অফিসার ও র‍্যাঙ্কার্স দের (জওয়ান) মৃত্যুদণ্ডের একটি ফাইলে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আজ সই করে দিলেন। ফাইল স্বাক্ষরের সময় আমি সেখানে ছিলাম। জানেন, এই ফাইল স্বাক্ষরের সময় তার মধ্যে আমি কোন ভাবান্তর দেখলাম না।" জাহিদ আমাকে আরও বলল, "তার বিরুদ্ধে এটা নিয়ে ১৮-১৯টা ক্যু হয়েছে।" প্রত্যেক ক্যুতে হাজার হাজার আর্মি অফিসার ও জওয়ানের মৃত্যুদণ্ড হলে জিয়া কত হাজার জওয়ান ও অফিসারের মৃতু্দন্ড দিয়েছে ঠান্ডা মাথায়, নিজের গদির জন্য, ভেবে দেখুন ...।" (২০০৩ সালের আগস্ট মাসে এ তথ্যসহ আমার এ আর্টিকেল অবজারভার পত্রিকাসহ দেশের অন্যান্য বাংলা ও ইংরেজী পত্রিকায় ছাপা হয় শ্রদ্ধেয় ওবায়দুল হক সাহেব বেঁচে থাকতে।) 
বঙ্গভবনে খুনীদের ২য় দিন পার হলো ঘন ঘন মিটিং করে এবং হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের থেকে আনা গাড়ি গাড়ি মদের বোতল ও হোটেল পূর্বাণীর রাশি রাশি অন্ন ধ্বংস করে। (খুনীরা আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে গাড়ি ভর্তি করে মদ এনে বঙ্গভবনের দোতলায় বোঝাই করে ফেলে। এসব মদের কোন টাকা পরিশোধ করেনি খুনীরা। হোটেল পূর্বাণীর খাবারের কোন টাকা দেয়নি তারা। উক্ত দুই হোটেল থেকে মদ ও খাবার অস্ত্রের মুখে হাইজ্যাক করে আনত তারা।) বঙ্গভবনের দোতলায় অতিথিদের থাকার রম্নমের সবগুলোতেই খুনীরা থাকতে শুরম্ন করে। সেখানে বঙ্গবন্ধুর খুনীরা ১৮ আগস্ট সোমবার রাতে হঠাৎ কয়েক রাউন্ড ফায়ার করে বসলে সমগ্র বঙ্গভবনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্টের পিএস-২ জনাব আব্দুল মান্নান (আমরা উভয়ে পশ্চিমবঙ্গের হিসেবে আমার সঙ্গে তার আস্থাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল এবং আমরা পারস্পরিক বিশ্বাসভাজন ছিলাম) পরদিন সকালে আমাকে বললেন : "কাল রাত ৯টার দিকে দোতলায় খুনীদের মধ্যে মাতলামো শুরু হয়। তারা আকাশে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুঁড়ে চিৎকার করে বলতে থাকে, "মীরজাফর শেখ মুজিব শেষ, বাংলাদেশ শেষ। কোন কুত্তাকা বাচ্চা শেখ মুজিবের বাচ্চার নাম লিয়া তো উয়ো বাস্টার্ড কো খতম কর দেংগে। উয়ো বাঙালী বাচ্চাকে হাম খতম কর দেংগে। বাংলাদেশ মর গিয়া। ইসলামী দেশ হো গিয়া ....। কোইয়ি, কাহা, কোন শালা মাদার...হঁযায়, হাম লোগোকে রোখেংগে। মুজিব কা বাচ্চা কোইয়ি, কাহা হঁযায় ...।" মদ খেয়ে মাতাল হয়ে অটোমেটিক মেশিন গান হাতে উদর্ুতে খিসত্মিখেউড় করে বঙ্গবন্ধুকে ও বাঙালী জাতিকে তারা গালাগাল দিচ্ছিল। বঙ্গভবনের সব সিভিল অফিসার ও স্টাফরা ভয়ে দূরে দূরে গিয়ে পিলার আড়াল করে তাদের এসব উদর্ু অশ্রাব্য গালাগাল শুনছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় টিক্কা-নিয়াজীরা বঙ্গভবনে বসে বাঙালী জাতির মা-বোন তুলে যেভাবে অশ্রাব্য গালাগাল করত সেভাবেই তারা আমাদের মা-বোনের জাত তুলে পাক সেনাদের কণ্ঠস্বরে গালাগাল করছিল।" 
বঙ্গভবনে তৃতীয় দিন পার হলো খুনী মোশতাকের কেবিনেট মিটিং করে। ওই মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয় যে, শেখ মুজিবের অর্থ ও ধন-সম্পদের বিবরণী রেডিও-টিভি এবং পত্রিকায় প্রকাশ করা হবে। বিকেলে সব ব্যাংকের এমডিকে বঙ্গভবনে ডাকা হলো। 
কর্নেল রশিদ নিজে দরবার হলে তাঁদের সবাইকে ১৫-২০ জওয়ানের স্টেনগান এবং এসএলআরের সামনে দাঁড় করিয়ে বলল : "মীরজাফর শেখ মুজিবের কোন ব্যাংকে কত টাকা আছে, আপনারা তার বিবরণী নিয়ে এসেছেন?" সব এমডি বললেন যে, তাদের কারও ব্যাংকে ওঁনার কোন এ্যাকাউন্ট বা টাকা-পয়সা নেই। সোনালী ব্যাংকের এমডি বললেন যে, সোনালী ব্যাংক, ধানমন্ডি শাখায় ওঁনার ৩৩০০/- (তিন হাজার তিন শ') টাকা আছে। তখন কর্নেল রশিদ স্টেনগান এবং এসএলআর তাক করে রাখা সৈনিকদের চিৎকার করে বললেন : They are bustard, dogs of Sheikh Mujib, fire them (তারা সব জারজ, শেখ মুজিবের কুত্তা, তাদের গুলি করে মেরে ফেলো।) এ কথা শোনা মাত্র এক ব্যাংকের জনৈক এমডি অজ্ঞান হয়ে বঙ্গভবনের দরবার হলের মেঝেতে ধপাস করে পড়ে গেলেন। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তখন আরেক ব্যাংকের এমডি বলে উঠলেন : "স্যার, স্যার, মারবেন না। স্যার, আমার ব্যাংকে একটা আছে?" 


কর্নেল রশিদ তার কাছে এগিয়ে গিয়ে টাইসহ তার কোটের কলার চেপে ধরে হুঙ্কার দিল, You bustard, now open your mouth. (তুমি জারজ, এখন তোমার মুখ খোল।) তিনি বললেন : "স্যার, আমি হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের এমডি। হাউস বিল্ডিং থেকে উনি (ভয়ে আতঙ্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামটাও উচ্চারণে অপারগ) ৩২ নম্বরের বাড়ি করার জন্য লোন নিয়েছিলেন। সে লোন পরিশোধ করেননি এবং সুদে আসলে তা এখন ৫-৬ লাখ টাকা হবে। এই টাকা ওঁনার কাছে সরকারের পাওনা আছে।" খুনী রশীদ হুকুম দিল : "বাড়ি এক্ষুনি জব্দ করে নিন।" এমডি সাহেব বললেন : "স্যার, নিউজ পেপারে একটা নোটিস দিয়ে দিতে হবে।" খুনী রশিদ বলল : "এক্ষুনি দিয়ে দিন। পত্রিকার লোক কে আছে এখানে?" সবার আগে সেই মার্শাল'র ধামাধরা ইবলিশ কুদ্দুস ছুটে এল। সে তৎক্ষণাৎ ড্রাফট করে দিল "মৃত শেখ লুৎফর রহমানের পুত্র মৃত শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির ঋণ বাবদ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের কাছে সুদে আসলে ৫-৬ লাখ টাকা ... বছর যাবত অপরিশোধ্য থাকার প্রেক্ষিতে উক্ত বাড়ি আগামী ৪৫ দিনের পরদিন প্রথম কার্যদিবসে হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন কর্তৃক প্রকাশ্যে নিলামে তোলা হবে। আগ্রহী ক্রেতাগণ ... তারিখে উক্ত বাড়ির সম্মুখে ডাকা প্রকাশ্য নিলামে অংশ গ্রহণ করতে পারেন। নিলামে সর্বোচ্চ দর ডাকার কাছে বাড়িটি বিক্রি করা হবে। খুনী মোশতাকের আরেক ডান হাত খ্যাত তাহের উদ্দীন ঠাকুরের নির্দেশে সেখানে উপস্থিত মর্নিং নিউজের সম্পাদক জনাব শামসুল হুদার হাতে এই নিলামের নোটিস এইচবিএফসির এমডি স্বাক্ষর করে দিয়ে দিলেন। ১ দিন পর ১৯ আগস্ট অথবা ২০ আগস্ট দৈনিক মর্নিং নিউজের পেছনের পাতায় বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়ির নিলামের বিজ্ঞপ্তি ছাপা হয়। এই হলো খুনী মোশতাক-রশিদ-ডালিম-ফারুক চক্রের জিঘাংসার শিকার বাংলার মুকুটহীন সম্রাটের অর্থ-বিত্ত ও ধন-সম্পদের সরকারীভাবে প্রকাশিত তথ্য বিবরণী। 
১৯৭৫-এর ১৭ আগস্ট কয়েকজন ডিসিকে বঙ্গভবনে ডাকা হলো। সে বিষয়ে আমাকে গত ১৭ আগস্ট (২০১১) সচিব মোকাম্মেল হকের বাসায় এক ইফতার পার্টিতে সে সময়ের (১৯৭৫ সালে) ডিসি জনাব হাসনাত আব্দুল হাই ১৫ আগস্ট প্রসঙ্গে আমাকে বললেন, "সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্রায় ১৫ জন ডিসির সঙ্গে আমাকে প্রেসিডেন্ট মোশতাকের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। প্রেসিডেন্ট মোশতাক আমাদের বললেন, 'শেখ মুজিবের ৩২ নম্বরের বাড়িতে ২০ ভরি সোনা পাওয়া গেছে। এগুলো আপনারা অফিসারদের সব জানাবেন। এসব অবৈধ সোনা এবং তাঁর দুর্নীতির প্রমাণ।' মিটিং শেষে আমার সহকর্মীরা সকলে বলাবলি করলেন যে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে মাত্র ২০ ভরি সোনা পাওয়া গেছে, যখন তাঁর দুই পুত্র শেখ জামাল ও শেখ কামালের বিয়ে হয়েছে মাত্র কয় মাস আগেই। এরপর এই ২০ ভরি সোনার গহনার কথা আমাদের অজস্র অফিসারের কাছে তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুর দুর্নীতি প্রমাণের চেষ্টা করা হলে তাদের কাছে ডিসিদের আর কোন মান-সম্মান থাকবে না। আমার সহকর্মীরা প্রায় কোরাস কণ্ঠে বললেন, খুন-খারাবি করে খুনী মোশতাকের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুর চেয়ারে বসার স্বপ্ন সে কী করে দেখে?" 
১৮ আগস্ট সোমবার প্রথমবারের মতো ভারতীয় রাষ্ট্রদূত শ্রী সমর সেন বঙ্গভবনে আসেন প্রেসিডেন্ট মোশতাকের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করতে। ১৫ আগস্ট ক্যুর সময় তিনি ভারতে ছিলেন। ১৭ আগস্ট বিকেলে তিনি কলকাতা থেকে ঢাকা আসেন। পরদিন দুপুরে আসেন বঙ্গভবনে। সমর সেন বঙ্গভবনে প্রবেশের পর সেখানকার সবাই জানত যে, প্রেসিডেন্ট তাকে ডাকেননি। তিনি স্বেচ্ছায় দেখা করতে এসেছেন। তখন প্রেসিডেন্টের সহকারী একান্ত সচিব মান্নান সাহেব জানালেন, "আগের রাতে পাকিস্তান ফেরত সেনাদের চাপে জেনারেল জিয়া ও খুনী মোশতাক বাংলাদেশকে "ইসলামী প্রজাতন্ত্রের' ঘোষণা অথবা 'পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশনের' ঘোষণা দেবার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারই ফলস্বরূপ বঙ্গভবনের দোতলায় খুনীরা সারারাত পিপে পিপে মদ গিলেছে, আনন্দ-ফুর্তি করেছে আর পাক সেনারা যেভাবে গালাগালি দিতে, সেভাবে বাঙালী মা-বোনদের অশ্রাব্য ভাষায় উর্দুতে তারা গালাগাল করেছে। বঙ্গবন্ধুকে গালাগাল করেছে ...।" 
রাষ্ট্রদূত সমর সেন আসার পর প্রেসিডেন্টের কক্ষের চারপাশে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেল। তখন আমাদের সহকর্মী মোশতাকের অফিসার শ্রী কুমার শংকর হাজরার মুখ থেকে সমর সেনের আগমনের মূল কারণ জানতে পারলাম। সে আমাকে বলল : "দোস্ত, 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র' অথবা 'পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশনের' যে কোন একটি ঘোষণা হলে আমি চাকুরি ছেড়ে ভারতে চলে যাব।" (জেল হত্যাকাণ্ডের পরই ক্ষুব্ধ চিত্তে মুক্তিযোদ্ধা হাজরা সত্যি সত্যি চাকুরি ছেড়ে দিয়ে ভারতে চলে যায়।) 
১৮ আগস্ট সোমবার কখন কি ঘোষণা হয়!! কি ঘোষণা হয়!! তা জানার জন্য বঙ্গভবনের মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা উদ্বেলিত চিত্তে সারাক্ষণ একতলা থেকে দোতলা এবং এ কক্ষ থেকে ওই কক্ষে ছোটাছুটি করতে লাগলাম। আমরা সবাই সারাক্ষণ চোখ কান পেতে রাখলাম। খুনী মোশতাককে সমর সেন কি বলে, কি বলে, সারাক্ষণ আমরা জপ করতে থাকলাম। 

জেনারেল জিয়া তখন বঙ্গভবনে। জেনারেল শফিউল্লাহ তখন বঙ্গভবনে বন্দী। সমর সেন সাক্ষাত শেষে চলে গেলেন। জিয়া খুনী মোশতাকের বঙ্গভবনের পেছনের কক্ষে (নিরাপত্তার জন্য প্রেসিডেন্টের জন্য নির্ধারিত সামনের কক্ষে না বসিয়ে প্রেসিডেন্টকে তখন খুনীরা বঙ্গভবনের পেছনের কক্ষে বসান) ঢুকলেন। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ডজন ডজন জেনারেল ও ব্রিগেডিয়াররা এসে তার সঙ্গে যোগ দিলেন। সারা বিকেল ও সারা সন্ধ্যা গ্রুপ, গ্রুপের সেনা অফিসাররা মিটিংয়ের পর মিটিং করল বঙ্গভবনে। ক্যান্টনমেন্ট থেকে এক গ্রুপ যায়, আরেক গ্রুপ আসে। 
১৮ আগস্ট রাত ১১টায় বন্ধু হাজরার মুখ থেকে যখন জানতে পারলাম 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র' অথবা 'পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন' এর কোনটাই হবে না ...
 তখন স্বস্তির  নিঃশ্বাস ফেলে আনন্দাশ্রুতে  বুক ভাসিয়ে আমরা বঙ্গভবন থেকে বের হলাম। চোখের ওপর ভেসে  উঠল একাত্তরের রণাঙ্গনে, রণাঙ্গনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শত-সহস্র বীর মুক্তিযোদ্ধার লাশ, আর বাঙালী ভাই-বোনের রক্তে ভেসে যাওয়া কালো পিচ্ছিল দূর্বা ঘাস, মাঠ-ঘাট।

বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিরুদ্ধে বঙ্গভবন ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অফিসারদের প্রতিরোধ
খুনী মোশতাকের অফিসার বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রী কুমার শংকর হাজরা জানাল সে ইতিহাস। ১৮ আগস্ট দুপুরে দিল্লীর কঠিন ও কঠোর বার্তা নিয়ে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হাসি হাসি মুখে খুনী মোশতাকের কক্ষে প্রবেশ করে। হাসি হাসি মুখে বিটিভির ক্যামেরার সামনে ও ফটোগ্রাফার আমির খসরুর সামনে পোজ দেয়। 

তারা বের হওয়া মাত্র খুনী মোশতাককে সমর সেন দিল্লীর অনুশাসনমূলক প্রথম বার্তাটি জানিয়ে দেন : Any change of the name of the “People’s Republic of Bangladesh” and any “Confederation” with any country, the Indian Army shall take appropriate measures in accordance with the legal and valid deed, which India possess. But if you abstain form changing the name of ‘Bangladesh’ and so called ‘Confederation’ idea, India will consider what ever had happened since August 15 as your internal matter." 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র' বা 'কোন দেশের সঙ্গে কনফেডারেশনের' ঘোষণা দেয়া হলো ভারতের সেনাবাহিনী '৭১-এর মিত্রবাহিনীর পরম্পরায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার অধিকার রাখে এবং এ রূপ পদক্ষেপের অনুকূলে আন্তর্জাতিকভাবে বৈধ দলিল ভারত সরকারের কাছে সংরক্ষিত আছে। উল্লিখিত ধরনের কোন কিছু পরিবর্তন করা না হলে এবং সবকিছু অব্যাহতভাবে অবিকল ও অপরিবর্তিত থাকলে বাংলাদেশে ইতোমধ্যে যা কিছু ঘটেছে, তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে গণ্য করা হবে।" 
১৮ ডিসেম্বর বঙ্গভবনে বাজ পড়ার মতো এসে পড়ল দিল্লীর হুকুম নামা! বঙ্গভবন থেকে জরুরী ডাক পেয়ে খুনী মোশতাক-জিয়া-ফারুক-রশিদদের মদদদাতা পাকিস্তান প্রত্যাগত ব্রিগেডিয়ারা-কর্নেলরা-মেজররা ১৭ ডিসেম্বরে বঙ্গভবনে দলে দলে হুমড়ি খেয়ে এসে পড়তে লাগল! বঙ্গভবনে ঢুকেই কবি সমর সেনের বার্তা জানতে পেরে তাদের হাঁটু কাঁপতে শুরু করল। ভিমরি খাওয়া রোগীর মতো গড়িয়ে দিয়ে পড়ল বঙ্গভবনের ফ্লোরে ও মাঠে। অথচ ২৪ ঘণ্টা আগে ১৭ ডিসেম্বর তারাই দলে দলে এসে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের সঙ্গে কোলাকুলি করে বলেছে, "সিকিম-ভুটান হবার হাত থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে 'পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশনের' ঘোষণা দিতেই হবে। ইহা আমাদের জন্য ফরজ কাজ। আর ইহা করা না গেলে 'ইসলামী প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ' ঘোষণা দেয়াই হইবে বাংলাদেশের সকল মুমিন-মুসলমানের জন্য ফরজ, ফরজ এবং ফরজ কাজ।" 
সকল ক্যু ও মার্শাল'ল ঘোষণার সময় তাদের যে তোস্য দালাল ন্যায় সর্বদা প্রস্তুত উপ-সচিব কুদ্দুসকে দেখলাম হাতে কলম ও প্যাড নিয়ে খুনী ডালিম-ফারুকদের সঙ্গে লাটিমের মতো ঘুর ঘুর করছে ... বাংলাদেশের নাম পাল্টিয়ে কখন 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র' বা 'পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন'-এর ড্রাফটে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর নেয়া যায় সেজন্য!! কিন্তু তখনও বাংলাদেশের পথে প্রান্তরে, বন্দরে-নগরে ৩০ লাখ বাঙালী ভাই-বোনের সঙ্গে শহীদ হয়ে যাওয়া হাজার হাজার ভারতীয় বীর জওয়ানদের রক্ত শুকায়নি ... সেখানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভারতীয় সেনাবাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করে টিকে থাকার সম্ভাবনার চেয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আশঙ্কা অধিক উপলব্ধি করে খুনী মোশতাক-জিয়া ও তাদের অনুসারী পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত সেনারা সেই হঠকারী ঘোষণা থেকে বাধ্য হয়ে পিছিয়ে আসে। ৩০ লাখ শহীদের রক্তস্নাত পুণ্যময় বাংলাদেশ সেদিন আল্লাহর অশেষ রহমতে রক্ষা পায়। আলহামদুলিল্লাহ। 
বঙ্গভবনের সেই গোপন অধ্যায় অজানা থাকায় বাংলাদেশের কিছু লোক এ যাবতকাল বলে এসেছে যে, মোশতাক-জিয়ার ক্ষমতারোহণকে ভারত সরকার সেদিন মেনে নিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের পক্ষ থেকে বঙ্গভবনের বহু গোপন অধ্যায়ের একটা অধ্যায় প্রিয় দেশবাসীর সামনে আজ উন্মোচিত করে দিলাম। ভারত সরকার কেন সেদিন খুনীদের সরকারকে ক্ষণস্থায়ীভাবে সময় দিয়েছিল_যখন বাংলাদেশের ওপর ভারত সরকারের যে কোন সামরিক পদক্ষেপের বিপরীতে বাংলাদেশের জন্মকালীন শত্রু আমেরিকা ভারতের রাজধানী দিল্লীর ওপর পারমাণবিক কার্যক্রমের হুমকি দিয়েছিল_সে অধ্যায় উন্মোচনের আগ্রহ আপাতত সংবরণ করলাম। 
১৯ আগস্ট ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বিবিসির সংবাদদাতা বিখ্যাত সাংবাদিক মার্ক টালির সঙ্গে দেখা করলাম। বিবিসিতে প্রচারের জন্য তাকে Mukthi Bahini and Mujib Bahini are organising in Dhaka against the killers of BangaBandhu. They will attack them any time in and around Dhaka. The killers of BangaBandhu are Pakistani agents and enemy of Bangladesh. People of Bangladesh shall never accept the killer. The killers shall be hanged by the people at the Race Course of Dhaka very soon. Freedom Fighters are now taking full preparations in and around Dhaka. Resistance will start at any moment. Killers will not be able to escape. People will hang them in race course you will see it.
১৮ আগস্ট বিবিসির দিল্লী ব্যুরো চীফ মার্ক টালি ঢাকা আসেন। এসেই বঙ্গভবনে আমাকে ফোন করে তার হোটেলে আসতে বলেন। স্বাধীন বাংলা বেতারের 'ওয়ার করেসপন্ডেন্ট' হিসেবে '৭১ সালে রণাঙ্গনের বহু সংবাদ আমি তাঁকে স্বতঃপ্রণোদিত চিত্তে দিয়ে দিয়েছি এবং পরে স্বাধীন বাংলাদেশে আমি তাঁকে বহু সার্ভিস দিয়েছি। তিনি আমাকে চিনতেন এবং আমার ওপর তাঁর আস্থা অগাধ ছিল। 

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আমি যখন আবার এই তথ্য উল্লেখ করছি, তখন ও must salute Mr. Mark Tully on behalf of all the Freedom Fighter Officers & Employees of the Republic for his kind favour to broadcast the news over the B.B.C on that evening. The news inspired all the Freedom-Fighters in resisting the killers in Dhaka and all over Bangladesh. 
মার্ক টালি আমাকে বললেন, "মুজিব বাহিনী কোথায় প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেখানে আমাকে নিয়ে চলো।" সেখানে এক্ষুনি নিয়ে যাওয়া সম্ভব না বলে জানিয়ে বললাম, "তুমি এক্ষুনি বিবিসি থেকে এই নিউজ প্রচার করিয়ে দাও। তাহলে পরে তোমাকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।" 
বিবিসির মাধ্যমে প্রচারিত সেই প্রথম সংবাদে দেশবাসী রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। বাংলার ঘরে ঘরে ৬৮ হাজার গ্রামে এই সংবাদে আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল যে, ঢাকায় মুক্তিবাহিনী ও মুজিববাহিনী বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ধরবে এবং ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ফাঁসিতে ঝুলাবে। বিবিসি সেদিন মার্ক টালির বরাতে সংবাদ প্রচার করল, "ঢাকার ঘরে ঘরে মুজিব বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী প্রস্তুত হচ্ছে এবং তারা যে কোন সময় সাঁড়াশি আক্রমণ চালিয়ে ঢাকা দখল করে ফেলবে এবং শেখ মুজিব হত্যার প্রতিশোধ নেবে মর্মে প্রতিজ্ঞা নিয়েছে বলে জানা যায়।" 
বিবিসিতে এই সংবাদ প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গভবনে খুনী মোশতাক ও তার সহযোগী খুনী ডালিম-ফারুকদের  হৃদকম্পন শুরু  হয়ে যায়। তারা বিডিআর থেকে অতিরিক্ত ফোর্স আনে বঙ্গভবন গার্ড দেবার জন্য। 
বিবিসির এই সংবাদে ঢাকার মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বেড়ে যায় এবং খুনী মোশতাক-ডালিম-ফারুকদের বিরুদ্ধে ঢাকাসহ আশপাশের জেলাগুলোয় প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য সবাই যে যার সাধ্যমতো চেষ্টা করতে থাকে। ১৯ আগস্ট ফেনীতে মুক্তিযোদ্ধারা রেল লাইন উপড়ে ফেলে। পরদিন ২০ আগস্ট খুলনা পোর্টে আগুন ধরায়। একই দিনে মিরপুরে এবং আসাদগেটে আর্মির ট্রাকে বোমা পড়ে। টাঙ্গাইলে বীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের কব্জায় চলে যায় টাঙ্গাইল। হালুয়াঘাটে বীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে কামানের গোলা নিক্ষেপ হয়। কাদের সিদ্দিকী ঘোষণা করে "বঙ্গবন্ধুর চতুর্থ সন্তান কাদের সিদ্দিকী পিতার খুনীদের রক্তে বাংলাদেশের মাটি সিক্ত না করে মাংস খাবে না"। চট্টগ্রামে যুবলীগের জঙ্গী নেতা এসএম ইউসুফের নেতৃত্বে রেজিস্টেন্স শুরু হয়ে যায় চট্টগ্রামব্যাপী। এসএম ইউসুফের দাপটে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের সেনারা সন্ধ্যার পূর্বেই ক্যান্টনমেন্টে ফিরে যেত আর সকালের আগে কেউ বেরুবার সাহস পেত না। 
এ সময় তথ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব বঙ্গবন্ধুর আত্মীয় ড. সেলিমুজ্জামান সাহেবের সঙ্গে ১৯ আগস্ট হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আমার সাক্ষাত হয়। আমি তাঁকে বললাম : Don’t worry, we will fight them back insha Allah. Resistance has started in Dhaka and all over the country, তিনি আমাকে বললেন, "তাহের উদ্দীন ঠাকুর আমার ক্ষতি করতে পারে। অন্য মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের বলে রেখো।" তিনি আমাকে আরও বললেন, "বঙ্গবন্ধুর কিলারদের বিরুদ্ধে আমি ধানমণ্ডি থানায় জিডি করব।" 
আমি তাঁকে আমার বাসার ও বঙ্গভবনের টেলিফোন নম্বর দিলাম এবং তাঁর অফিসের ও বাসার নম্বর নিলাম। যদিও তিনি বললেন যে, তিনি তখন বাসায় থাকেন না। বিএসএসের জেনারেল ম্যানেজার হাজারী ভাইয়ের বাসায় লুকিয়ে থাকেন। তাঁকে আরও বললাম, "আমরা এখন সিজিএস খালেদ মোশাররফ স্যারের দিকে তাকিয়ে আছি। আর্মির সকল মুক্তিযোদ্ধা অফিসার এখন তাঁর সঙ্গে আছে। কিছু একটা হতেই হবে। তিনি যেন খালেদ মোশাররফ সাহেবের ভাই রাশেদ মোশাররফের কলাবাগানের বাসায় যোগাযোগ রাখেন।
 আমরা ঢাকার মুক্তিযোদ্ধা সিভিল অফিসাররা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সব কিছু এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। দূতাবাসগুলোর সাথেও আমাদের মাধ্যমে তাঁর যোগাযোগ রক্ষা করছি। বঙ্গভবন থেকে খুনীদের ভেতরে বসে আমি তাদের সব মুভমেন্ট খালেদ মোশাররফ স্যারদের দিয়ে যাচ্ছি।"
সেলিমুজ্জামান সাহেব ছলছল চোখে বললেন, "আমাদের হারাবার আর কিছুই নেই। বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে আমরা এতিম হয়ে গেছি।" আমি বললাম : "মুক্তিযোদ্ধারা মনোবল হারায়নি। হিমালয়ের মতো বঙ্গবন্ধু আবার ফিরে আসবে ঘূর্ণিঝড়ের মধ্য থেকে। ঢাকার মুক্তিযোদ্ধারা ও আমরা শপথ নিয়েছি খুনীদের ওপর আঘাত হানব। মরতে হলে তাদের মেরে মরব। কাদের সিদ্দিকী তার কাদেরীয়া বাহিনী নিয়ে যে কোন সময় ঢাকায় প্রবেশ করবে। সচিবালয় ও বঙ্গভবন কাদেরীয়া বাহিনীর ভয়ে মৃগী রোগীর মতো কাঁপছে ....।" ২০ আগস্ট হারেস উদ্দীন সরকার বীরপ্রতীকের সঙ্গে দেখা হলো।
 '৭১-এ তিস্তার পাড়ের অসীম সাহসী বীর হারেস উদ্দীনের কথা শুনে বুক ভেঙ্গে গেল। তিনি বললেন যে, "তাদের মিশন ব্যর্থ হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী মনসুর আলীকে জিঞ্জিরা দিয়ে উত্তরবঙ্গে নিয়ে গিয়ে সরকার গঠনের যে পরিকল্পনা তারা নিয়েছিলেন তা ব্যর্থ হয়ে গেছে। সেনাবাহিনীর বীর মুক্তিযোদ্ধারা লে. কর্নেল দেলওয়ার হোসেন, লে. কর্নেল নওয়াজেশ, লে. কর্নেল ইয়াজদানী, লে. কর্নেল মোসলেম উদ্দীন প্রমুখ বাঙালী জাতির বীরদের নেতৃত্বে পবিত্র কোরআন শরীফ ছুঁয়ে শপথ করে বেরিয়ে এসেছিলেন।" লে. কর্নেল দেলওয়ারের বনানীর স্টাফ কোয়ার্টারে বসে তাঁরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন-ছাত্র, জনতা ও আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মনসুর আলীর নেতৃত্বে উত্তরবঙ্গে খুনী মোশতাকের বিরুদ্ধে পাল্টা সরকার গড়ে তুলবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই মহান বীর যোদ্ধাদের, সেই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে আওয়ামী লীগের নেতারা সাড়া না দিয়ে পিছিয়ে গিয়েছিলেন। "বঙ্গবন্ধুকে যারা মেরে ফেলেছে, আমাদেরও তারা মেরে ফেলবে"- এই ধুয়া তুলে কাপুরুষের মতো তাঁরা পিছিয়ে গিয়েছিলেন।শেক্সপীয়ারের অমর বাণী তাঁরা সেদিন বাস্তবে প্রমাণ করে ছেড়েছিলেন। যদিও ঢাকার বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। 
ঢাকাবাসী ও ছাত্র-জনতা, রিকশাওয়ালা, শ্রমিক, দিনমজুর তখন ক্রোধে রাগে ফুঁসছিল। বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা কাপুরষতা না দেখালে খুনীরা ঢাকাবাসীর রুদ্ররোষে কর্পুরের মতো হাওয়ায় মিলিয়ে যেত। কবর দেবার জন্য এই সব ভাড়াটে খুনীদের কারও লাশ পাওয়া যেত না। ঢাকার বাতাসে মিশে যেত।
এখানে বিশেষ করে, আমি এক বঙ্গ জননীর কথা গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করতে চাই, যিনি লে. কর্নেল দেলওয়ারের বনানী স্টাফ কোয়ার্টারে আগত ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার ও মেজর বজলুল হুদাকে প্রবেশ করতে দেখে চিৎকার করে বলেছিলেন, "তোমরা, বঙ্গবন্ধুর কিলার, এখানে কি জন্য এসেছ?" মেজর হুদা তাঁকে বলেছিলেন, "ভাবি, চা খেতে এসেছি।" উত্তরে ময়মনসিংহ মহিলা ক্যাডেট কলেজের অধ্যাপিকা সেই নির্ভীক বেগম নুরজাহান দেলওয়ার বলেছিলেন, "তোমরা এখনই বেরিয়ে যাও। তোমাদের মুখ যে দেখবে তার কবরে দোজখের আগুন জ্বলবে।"
সেখানে উপস্থিত হারেস উদ্দীন সরকার বীরপ্রতীকের সামনে এই ঘটনা ঘটে। অতঃপর কিলাররা হাসতে হাসতে চলে যায়। কিন্তু তারপরেও জাতির এই সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানরা প্রধানমন্ত্রী মনসুর আলীকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। তাঁরা প্রধানমন্ত্রী মনসুর আলীকে খুঁজে পাবার আগেই তাঁর সঙ্গে কর্মরত এক সিভিল অফিসার বিশ্বাসঘাতকতা করে (তিনি তাঁর বিশ্বাসঘাতকতার বড় পুরস্কার পেয়ে পরবর্তীতে সচিব ও যুক্তরাজ্যে রাষ্ট্রদূত হয়ে গাড়িতে বাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান। যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিশ্বাস করেন না) খুনীদের কাছে তাঁর গোপন আস্তানার তথ্য জানিয়ে দিয়ে তাঁকে ধরিয়ে দেয়। খুনী মোশতাক মনসুর আলীকে তাঁর অধীনে প্রধানমন্ত্রী হবার জন্য অনেক পীড়াপীড়ি করে ব্যর্থ হয়ে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। 
খুনী মোশতাকের জনসংযোগ কর্মকর্তা, আমার বিশ্বস্ত বন্ধু ও মুক্তিযোদ্ধা কুমার শংকর হাজরা আমাকে বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্টের সেই পীড়াপীড়ির ঘটনাবলী বর্ণনা করে বলেছিলেন, "প্রেসিডেন্ট মোশতাক হুঙ্কার দিয়ে মনসুর আলী স্যারকে বললেন, এবার যারা জেলে যাবে, তারা কেউ জীবন নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারবে না। প্রেসিডেন্ট মোশতাকের ও বঙ্গভবনের খুনীদের হুঙ্কার এবং প্রধানমন্ত্রী হবার প্রলোভন মনসুর আলী সাহেব ঘৃণাভরে দু'পায়ে দলে বঙ্গভবন থেকে চলে যান।" কুমার শংকর হাজরা তাঁর সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা নিবেদন করে মনসুর আলী সম্পর্কে বলেছিলেন, "মৃত্যুর পরোয়ানা -আর প্রধানমন্ত্রীর সিংহাসন '- এ্ই দু'য়ের মধ্যে কেউ যে মৃত্যু পরোয়ানা বেছে নিতে পারে- এমন মানুষ এই দুর্ভাগা দেশে আছে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না, দোস্ত।" ট্র্যাজেডি হলো, এই ঘটনার ক'মাস পরে দুঃখে-শোকে জর্জরিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধা অফিসার কুমার শংকর হাজরা সিভিল সার্ভিসের চাকরি ইস্তফা দেন।

২১ আগস্ট বৃহস্পতিবার বঙ্গভবন থেকে প্রথম যেদিন সচিবালয়ে গেলাম সেদিন এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের সমবায় বিভাগের সচিব খোরশেদ আলম সাহেবের রুমে তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাত হয়। তিনি জানতেন যে, আমি মুক্তিযোদ্ধা ও মুজিবনগর অফিসারদের সংগঠন করি। আমাকে দেখে বঙ্গবন্ধুর নাম বলতে বলতে তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁর বিপদ হবে ভেবে আমি তাড়াতাড়ি তাঁর রুমের দরজার নব টিপে বন্ধ করে দিলাম।

 তিনি আমাকে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন না করলে পাঞ্জাবী সিএসপিরা আমাদের দিয়ে তাদের জুতা মোছাতো আর এই সচিবালয়ে টিবয় করে চা আনিয়ে খেত। আমাদের বাঙালী সিএসপি এবং ইপিসিএস অফিসারদের এই দশাই হতো।" 

ওই দিন দুপুরে পিআইডির তৎকালীন সিনিয়র কর্মকর্তা মকবুল আহমেদের সামনে সচিবালয়ের মেডিকেল অফিসার উঁচু, লম্বা, কৃষ্ণ বর্ণের, স্বাস্থ্যবতী ডা. ফজিলা নবী পিআইডির শেডে এসে সজল চোখে বললেন, "দেখুন, আমরা ডাক্তার। আমাদের কাছে কোন ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নেই। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আজ সচিবালয়ে আসার পথে শেরেবাংলা নগর থেকে আমি যখন আমার মাইক্রোবাসে আসছিলাম, তখন ৩২ নম্বর রোডের মুখে নির্মম নির্যাতন দেখে এলাম। এমন নির্যাতন নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। আমার মাইক্রোবাস যখন ৩২ নম্বর রোডের মুখে আসে, তখন দেখলাম সেখানে বয়স্কা মহিলা, কিশোরী ও শিশুরা কিছু ফুল হাতে এসেছিল বঙ্গবন্ধুর রক্তের ওপর তাদের শ্রদ্ধা জানাতে। কিন্তু সেখানে কি বর্বরতা দেখলাম জানেন? ৩২ নম্বর রোডের মুখে পাহারারত আর্মিরা পাঞ্জাবী আর্মির চেয়েও নিষ্ঠুরভাবে তাদের বুট দিয়ে লাথি মারছে এবং রাইফেল-বন্দুকের বাঁট দিয়ে বুকে, ঘাড়ে, পিঠে, মাথায় যে যেভাবে পারছে, মারছে। থেতলে দিচ্ছে! সেই মা-বোনদের আর্তনাদ চিৎকার সহ্য করা যায় না! আমাদের মা-বোনরা-শিশুরা সেখানে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তাদের হাতের সাদা, লাল ফুল পিচের রাস্তার ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে। এক জননী বাচ্চাদের আগলাতে যাচ্ছে দেখে এক 'শয়তান' বুট দিয়ে তার গলায় চেপে দাঁড়িয়ে তার জিভ বের করে ফেলেছে। এমন পাপিষ্ঠ, দেখে মনে হয় মাতৃগর্ভে যেন এদের জন্ম হয়নি! পাকসেনাদের মতো এ রকম অত্যাচার যখন চলছিল, তখন গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে আমি এপ্রোন পরা অবস্থায় সচিবালয়ের ডাক্তার পরিচয় দিয়ে দু'হাত দিয়ে আগলে সেই আহত মা-বোন ও শিশুদের সেখান থেকে সরিয়ে আনি। আর আহত কয়েকজনকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে আসি।"
খুনী মোশতাক-ডালিম-ফারুকদের শ্বেত সন্ত্রাস ও নির্যাতনে সচিবালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, মতিঝিল, ব্যাংক, কোর্ট, কর্পোরেশনসহ সমগ্র রাজধানী ঢাকা কম্পমান এবং রাজধানীর মোড়ে মোড়ে ট্যাঙ্ক, ঢাকার সকল রেজিস্টেন্স ব্যর্থ প্রায়। 
তখন ঢাকার সচিবালয়ের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে চট্টগ্রামের যুবলীগের দুর্ধর্ষ কমান্ডো মুক্তিযোদ্ধা এসএম ইউসুফের যোগাযোগ হয়ে যায়। চট্টগ্রামে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে  তিনি খুনীদের বিরুদ্ধে অনেক সফল অপারেশন চালাচ্ছিলেন। 
চট্টগ্রামে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়েছিল, টাঙ্গাইলে যেমন বীর কাদের সিদ্দিকীর রেজিস্টেন্স খুনী মোশতাক-ডালিম-ফারুকদের মাথা ব্যথার কারণ হয়েছিল। টাঙ্গাইল থেকে বীর কাদেরীয়া বাহিনীর এক লিফলেট এসে পৌঁছায় শাহবাগের বিসিএস একাডেমীর প্রশিক্ষণার্থীদের কাছে। তার ঠেলায় বঙ্গভবন দুলে ওঠে। সচিবালয় কেঁপে ওঠে। জেনারেল ওসমানী তখন খুনী মোশতাকের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা। তিনি বিডিআরের ডিজি ব্রিগেডিয়ার খলিল সাহেবকে ফোন করে এক ঘণ্টার মধ্যে কয়েক ট্রাক বিডিআর আনালেন বঙ্গভবনের চারপাশে দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তোলার জন্য। বঙ্গভবনে খুনী মোশতাকের পিআরও ('৭২ সাল থেকে মন্ত্রী মোশতাকের পিআরও পদে কর্মরত ছিল) কুমার শংকর হাজরা ও আমি দেখলাম যে, "বঙ্গভবনের ভেতরে কাদের সিদ্দিকীর আতঙ্ক ঢুকে গেছে। বঙ্গভবনের সর্বত্র খুনীরা কাদেরীয়া বাহিনীর ভূত দেখছে। বঙ্গভবনে গাছের পাতার ফাঁকে পাখি উড়লেও গুলি করছে তারা। বঙ্গভবনের পুকুরে মাছ লাফানোর শব্দ হলে কয়েক ডজন সশস্ত্র বিডিআর পুকুরের চারপাশে মোতায়েন করা হলো পানির মধ্যে কাদেরীয়া বাহিনী ডুব মেরে আছে কিনা তা নিষ্পলক চোখে পাহারা দেবার ও গুলি করার জন্য। বঙ্গভবনের ছাদেই শুধু না, বঙ্গভবনের ভেতরে বড় বড় আম গাছের ডালে ডালে এসএলআর/স্টেনগান হাতে বিডিআরকে তুলে দেয়া হয়েছে কাদেরীয়া বাহিনীকে খোঁজার ও গুলি করার জন্য।" এদিকে সচিবালয়ে দৌড়াদৌড়ি ও তল্লাশি শুরু হলো কাদের সিদ্দিকীর লিফলেটের সন্ধানে। 
প্রেসিডেন্ট মোশতাকের ফটোগ্রাফার আমির খসরু (গবর্নর মোনেম খানের আমল থেকে বঙ্গভবনে নিয়োজিত) বঙ্গভবনের দোতলা থেকে নেমে এসে এমএসপির রুমে আমাকে পেয়ে ডেকে নিয়ে জানালেন যে, "কাদেরীয়া বাহিনী ঢাকা প্রবেশ করেছে শুনে বঙ্গবন্ধুর খুনী মাজেদ-ফারুক-ডালিমরা বঙ্গভবনের দোতলায় তাদের শয়ন কক্ষে গিয়ে আতঙ্কে সিদ্ধ হয়ে নোংরা-অশ্লীল মুখ খিস্তি করছে আর মদের বোতল খুলে ঢক ঢক করে মদ গিলছে। কাদের সিদ্দিকীর পায়ের ধুলাও আসেনি ঢাকায়, তার লিফলেট ঢাকায় এসে পড়ায় বঙ্গভবন ও সচিবালয়ে সেদিন ভূমিকম্প হয়ে গিয়েছিল।
অপরদিকে, চট্টগ্রামের রেজিস্টেন্সের নায়ক এসএম ইউসুফ, সেই দুর্ধর্ষ কমান্ডো মুক্তিযোদ্ধা, যিনি চট্টগ্রাম সেক্টরে ১৯৭১ সালে মুজিব বাহিনী গঠনের প্রক্রিয়ায় বাধাদান করার কারণে সেখানে এক মেজরকে রিভলবারের মুখে হ্যান্ডসআপ করিয়েছিলেন ('৭১-এর সেক্টর কমান্ডাররা তাঁর নাম জানেন ও ঘটনা জানেন)। ১৫ আগস্টের পর খুনীদের বিষয়ে ঢাকার কোন প্রেসে তখন হ্যান্ডবিল বা কোন লিফলেট ছাপা সম্ভব হচ্ছে না। সবাই আতঙ্কে ঠকঠক করে কাঁপছে। অথচ লন্ডন থেকে বঙ্গবন্ধুর মুখ্য সচিব আমার মামা রুহুল কুদ্দুস বার বার লিফলেট বিতরণের কথা, বিশেষ করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বিতরণের জন্য আমাকে ফোনে নির্দেশ দিচ্ছিলেন। আমি যখন ঢাকার অবস্থা বললাম। তখন তিনি চট্টগ্রাম থেকে লিফলেট ছাপানোর ব্যবস্থা করে ঢাকায় পাঠান। (চট্টগ্রাম দক্ষিণ আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট এই লিফলেট ছাপানোর জন্য লন্ডন থেকে রুহুল কুদ্দুসের নির্দেশ পান। তিনি এটা চট্টগ্রামের এক প্রেস থেকে ছাপিয়ে মনি ভাইয়ের বিশ্বস্ত ইউসুফকে দেন বলে ইউসুফ আমাকে পরে জানিয়েছেন।) এই লিফলেট ইউসুফের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনযোগে মুখে শাকের ‌আঁটি দিয়ে ৪ বস্তা  ২ রকমের লিফলেট তিনি ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন। 
খুনী মোশতাক-ডালিম-ফারুকের সরকারকে উৎখাত করে মুক্তিযুদ্ধের সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান সম্বলিত সেই লিফলেট ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশনে ঠিকমতো ডেলিভারি হয়েছিল। আমার নামে বঙ্গভবনের ঠিকানায় সেই লিফলেটের বস্তা পাঠানোয় কমলাপুর কর্তৃপক্ষ তা না দেখেই ডেলিভারি দিয়ে দেয় (ছাত্রনেতা এসএম ইউসুফ লিফলেটটি লেখেন)।

এই লিফলেট ঢাকায় আসার পর সচিবালয়ের বীর তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের মুজিবনগর সেলের প্রধান সিনিয়র সহকারী সচিব রাখাল দা'র কলাবাগানের স্টাফ কোয়ার্টারে আমরা গোপন বৈঠকে বসি। সে বৈঠকে হাজির ছিলেন তথ্য অফিসার গাজী মনসুর স্যারের অফিসার, খুনী মোশতাকের অফিসার কুমার শংকর হাজরা, তাজউদ্দীন স্যারের অফিসার আলী তারেক, নজরম্নল ইসলাম স্যারের অফিসার আমি এবং শেখ ফজলুল হক মণি ভাইয়ের দুই বিশ্বস্ত অফিসার ফকীর আব্দুর রাজ্জাক এবং শফিকুল আজিজ মুকুল (দৈনিক বাংলার বাণী বন্ধ হয়ে গেলে সরকারী সিদ্ধান্তে এই তিন সাংবাদিক তথ্য অফিসার হিসেবে সরকারী চাকুরিতে যোগ দান করেন)। আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় ও বয়োজ্যেষ্ঠ রাখাল দা' সেই গোপন বৈঠকে আমাদের পবিত্র কোরান শরিফ এবং ত্রিবেদী ও হাজরাকে পবিত্র গীতা ছুঁয়ে এই মর্মে শপথ করান যে, আমাদের কেউ ধরা পড়লে আমরা '৭১-এর বীর শহীদদের মতো আমাদের জীবন দেব, কিন্তু একে-অন্যের নাম বলব না। এই বৈঠকের কোন গোপনীয়তা ফাঁস করব না বা আমাদের সহযোদ্ধাদের কারও নাম প্রকাশ করব না। বৈঠকে ঠিক হয়, এই লিফলেট ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, বঙ্গভবন ও ঢাকার সচিবালয়ে গোপনে গভীর রাতে ছড়িয়ে দিতে হবে। 
ঠিক হয় বঙ্গভবনে কুমার শংকর হাজরা, সচিবালয়ে আলী তারেক, ত্রিবেদী, রাজ্জাক ও মুকুল এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গাজী মনসুর ও আমি বিতরণ করব। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ২৭ ও ২৮ আগস্ট আমরা দু'জন এক সঙ্গে রেকি করি সুশীল বাবুর জলপাই রঙের টয়োটা গাড়ি নিয়ে। কিন্তু ২৯ আগস্ট যখন লিফলেট সামনের ও পেছনের সিটে ভরা হয় তখন জায়গার অভাবে রাখাল দা' একজনকে যেতে বলেন। তখন প্রশ্ন ওঠে_ কে সে? রাখাল দা' মনসুরকে প্রশ্ন করেন তারা কয় ভাই। মনসুর বলে তারা দুই ভাই। আমাকে প্রশ্ন করলে আমি বলি আমরা ছয় ভাই। রাখাল দা' তখন সিদ্ধান্ত দেন_ "মুসা যাবে"। আমি তখন জোরে জোরে আয়াতুল কুরসি পড়তে শুরু করি এবং আমার চোখে তখন আমার প্রিয় জননীর মুখ ভেসে ওঠে।কিন্তু কিছুটা ভুল প্ল্যানিংয়ের কারণে ঢাকার মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে ঢাকার সর্বত্র সে লিফলেট বিতরণ করা সম্ভব হয়নি।
 প্রথম প্রচেষ্টায় বঙ্গবন্ধুর মুখ্য সচিব রুহুল কুদ্দুসের (তিনি তখন লন্ডনে চিকিৎসাধীন) স্নেহভাজন মতিঝিলের এক হিন্দু ব্যবসায়ী শ্রী সুশীল বাবুর আর্মির জলপাই রঙের নতুন টয়োটা গাড়ি নিয়ে ২৯ আগস্ট রাত ১০টায় গাড়িভর্তি লিফলেট নিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ঢুকি। ড্রাইভার জানতো না লিফলেটে কি আছে। এর আগে ২ দিন ক্যান্টনমেন্টের ভেতর আমরা রেকি করি। দেখা যায় যে, রাত ১০টার পর ক্যান্টনমেন্টের ভেতরের রাস্তাঘাট ভয়ে-আতঙ্কে জনশূন্য হয়ে যায়। অফিসার ও জওয়ানরা যে যার কোয়ার্টারে ঢুকে পড়ত রাত ১০টার আগেই। তাই পূর্ব পরিকল্পনা মতো রাত ১০টার দিকে আমি ক্যান্টনমেন্টের গেটে সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ স্যারের সঙ্গে এ্যাপয়েন্টমেন্টের নাম করে (খালেদ মোশাররফ স্যারের 'কড'-এর দেয়া পাস নিয়ে) স্যুটেড বুটেড হয়ে ঢুকে পড়ি। 
ক্যান্টনমেন্টের ভেতরের জনশূন্য রাস্তায় ড্রাইভারকে ফুল স্পিডে গাড়ি চালাতে বলে পেছনের সিটে বসে আমি দু'হাতে পাগলের মতো লিফলেট দু'দিকে ছুড়ে দিতে থাকি। খুনী মোশতাক-ডালিম-ফারুকদের উৎখাতের আহ্বান সংবলিত লিফলেট ছড়িয়ে আমি ক্যান্টনমেন্টের উত্তরে অফিসার কোয়ার্টারের গেটের দিক দিয়ে বেরিয়ে যেতে সমর্থ হই।  (সে গেটটি জেনারেল মাহবুবুর রহমান যখন আর্মির চীফ হন, তখন তা বন্ধ করে দেয়া হয়।) ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে আমি কোথাও বাধাপ্রাপ্ত হইনি_এটা আমার সৌভাগ্য বলতে হবে। তবে তখনকার বাসত্মব অবস্থা ছিল এরূপ যে, ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে রাত ১০টার পর রাসত্মা জনশূন্য হয়ে যেত। আর্মিরাও ভয়ে ব্যারাক থেকে বের হতো না। যত কিছু সিকিউরিটি এ্যাকটিভিটিজ, তখন সব কিছু ছিল বঙ্গভবন ও নাজিমউদ্দীন রোডে বন্দী ৪ জাতীয় নেতাকে নিয়ে।
২য় পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩০ আগস্ট দিবাগত রাতে সচিবালয়ে ও বঙ্গভবনে উক্ত লিফলেট বিলি করার দায়-দায়িত্ব মুজিবনগর-মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের ছিল। তা তাঁরা পুরোপুরি করতে পারেননি। ওই রাতে বঙ্গভবনে লিফলেট বিতরণের দায়িত্ব ছিল কুমার শংকর হাজরার। হাজরা ৭-৮শ' লিফলেট বঙ্গভবনের নিচতলার মুখ্য সচিবের পিএ-এর রুম ও আশপাশের প্রশাসনিক কয়েকটি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের রুমে ফেলে রাখতে সমর্থ হয়। অন্যান্য উল্লেখিত তিনজন অফিসারের দায়িত্ব ছিল সচিবালয়ে লিফলেট বিতরণের। ওই রাতে তারা লিফলেট নিয়ে পিআইডির গাড়িতে সচিবালয়ের ভেতরে রাত ১০টায় তারা ঠিকই ঢুকেছিলেন। কিন্তু আগের রাতে ক্যান্টনমেন্টে লিফলেট বিতরণ হওয়ায় সচিবালয়ে এনএসআই এবং এসবির অস্বাভাবিক উপস্থিতি টের পেয়ে সচিবালয়ের ২নং নয়তলা ভবনের ও পূর্ত মন্ত্রণালয়ের কলাপসিবল গেটের ভেতরে কিছু লিফলেট তারা ছুড়ে দিয়ে দ্রুত সচিবালয়ের মসজিদের ওজুখানার পাশের টিনের ছোট দরজা দিয়ে প্রেসক্লাবের পেছনের ডোবা দিয়ে পালিয়ে যেতে সমর্থ হন ('৭৫ সালে সচিবালয়ের মসজিদের পশ্চিমের বর্তমান সচিবালয় লিংক রোড ছিল না এবং প্রেসক্লাবের পেছনে বড় ডোবা ছিল)।
 কিন্তু সচিবালয়ের এই ব্যর্থতার সেই পরিণতি ভোগ করতে হয় সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের মুজিবনগর সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রী রাখাল ভট্টাচার্যকে। এই ঘটনার কয়েকদিন পরেই জেনারেল জিয়ার নির্দেশে আর্মির গোয়েন্দারা রাখাল দা'কে ধরে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করে এবং পরবর্তীতে তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করে। কারাগারেও বর্বরভাবে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। কিন্তু কোন মুক্তিযোদ্ধার বিষয়ে তিনি মুখ খোলেননি।মাষ্টার'দা সূর্যসেন,  ক্ষুদিরামের ন্যায় এই মহান দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসার রাখাল'দা কারাগারের নির্যাতন শেষে হাসপাতালে হস্তান্তরের কয়েকদিনের মধ্যে হাসপাতালেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

 আমার মনে পড়ে, ১৮ আগস্ট রাখাল দা'র সঙ্গে টেলিফোনে আমার ও প্রণোদিৎ দা'র কথা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, "মুসা কিছু একটা করো। বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলবে, আর আমরা বেঁচে থাকব তা হয় না..."। এইটুকু বলে তিনি কাঁদছিলেন। তাঁর সেই কান্নার মর্যাদা বঙ্গবন্ধুর জন্য জীবন দিয়ে তিনি প্রমাণ করে গেছেন। রাখাল দা'র নাম সচিবালয়ের মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের কাছে চিরকাল প্রাতঃস্মরণীয় নাম হয়ে থাকবে।তাঁর নেতৃত্বে সেদিন বঙ্গভবন ও সচিবালয়ের ক'জন তরুণ বীর মৃত্যুজ্ঞয়ী মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবন্ধুর খুনীদের রুখতে জীবন বাজি ধরেছিলেন_তার সুদূরপ্রসারী পরিণতি ঘটেছিল_যা তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

 প্রথমত, নিরাপত্তার নিশ্ছিদ্র বেড়াজাল ভেদ করে আতঙ্কগ্রস্ত মৃত্যুপুরী ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বহিরাগত কেউ সামরিক-বেসামরিক অফিসারদের পক্ষে আহ্বান সংবলিত লিফলেট ছড়িয়ে আসতে পারে_কোন জওয়ান ও অফিসার এমনটা ভাবেনি বা বিশ্বাস করেনি। দ্বিতীয়ত, উক্ত লিফলেট ৩০ আগস্ট প্রত্যুষে ক্যান্টনমেন্টের বিভিন্ন রাস্তায় পেয়ে জওয়ান ও অফিসাররা উক্ত লিফলেট তারা নিজেরা দিয়েছে বলে প্রচার চালায়। 
তার মূল কারণ, খুনীরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার অহঙ্কারে এমন উন্মত্ত হয়ে ওঠে যে, সৈনিকদের কাছে তাদের স্ব স্ব রেজিমেন্টের সিনিয়র কমান্ডিং অফিসার কর্নেল, ব্রিগেডিয়ার ও জেনারেলদের অবজ্ঞা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ডাস্টবিনের মল-মূত্রের বস্তুতে পরিণত করে!! সেজন্য মানসম্মানে আঘাত পড়ায় ভেতরে ভেতরে সেনা অফিসাররা আগুন হয়েছিল ও টগবগ করে ফুটছিল।

লেখক : কলামিস্ট ও সাবেক সচিব
৫,৭,৮,৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, দৈনিক জনকন্ঠ

মৃত্যুর মিছিলের শব যাত্রীরা মহিমান্বিত ক্ষমতার ভাগাভাগিতে! : জান্নাতুল বাকেয়া কেকা

মৃত্যুর মিছিলে প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে নতুন নতুন নাম। আনোয়ারা বেগম, মোজাম্মেল, মনির অথবা পল্টুরা। সরকার ও বিরোধী রাজনীতির পালে জোর হাওয়া দিচ্ছে শব মিছিলের এই যাত্রীরা। ক্ষমতাসীনরা বুক ফুলিয়ে বলতে পারছে, মানুষ মারা আর হত্যার রাজনীতি করছে বিরোধী দল। আর বিরোধী দল ভাবছে, আগুনে-পেট্রোলে জ্বলে পুড়ে ছাড়খার হওয়া যন্ত্রণা শেষে জীবন থেকে প্রাণ যাওয়া শব গুলো সরকারের বিরুদ্ধে তাদের হরতাল-অবরোধের রাজনীতির জলন্ত সাফল্য ! কারণ ? গরিব-খেটে খাওয়া-অসহায় মানুষ গুলো যে প্রাণ দিয়ে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের জয়োগান গাইছে ! তাই তো রাজনীতিকে আরো সহিংস করছে ক্ষমতালোভী আর ক্ষমতাভোগীরা। চলন্ত লেগুনায়-সিএনজিতে পেট্রোল ঢেলেই ক্ষান্ত হচ্ছে না ১৯-২০ বছর বয়সী যে ছেলেটি বাঁচার তাগিদে পালিয়ে বাঁচতে চাইছে তাকে জোর করে গাড়ীতে আটকে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। হায় ! মোজাম্মেল হায় ! তুমি মরলে তবে জানলে না তোমার মৃত্যু ক্ষমতাভোগী আর ক্ষমতালোভীদের সাফল্যেরও ভাগাভাগিতে কতটা দামী ? হায় ! তুমি জানলে না মোজাম্মেল ? আর তোমার অন্ধ মা যে তোমার প্রতিক্ষায় ? তুমি যে ছিলে সেই অন্ধের যষ্টি এক মাত্র অবলম্বন !
আর সিএনজি চালক সাবেত আলী- তুমিও মৃত্যুর লাইনে দাঁড়িয়ে, অপেক্ষায়, সরকার আর বিরোধীদের সাফল্যের ভাগিদার হবার। তোমার পাঁচ আর নয় বছরের ছেলে দুটি আব্বা কখন ফিরবে সেই প্রতীক্ষায় ? তুমি তো জানো না সাবেত আলী কার আহ্বানে সাড়া দিয়ে তোমার প্রতীক্ষার অবসান ঘটাবে ? তা তুমি জানবেও না সাবেত আলী। তুমি হাসপাতালের বিছানায় চিৎকার করো। যন্ত্রনায় গোঙ্গাতে থাকো। যন্ত্রনাময় গোঙ্গানীর স্বরে আধো আধো স্বরে বলতে থাকো ‘জ্বলে, জ্বলে, জ্বলে-জ্বলে যায় ডাক্তার ডাকো। আর তোমার চিকিৎসার খরচ যোগাতে গিয়ে দেয়ালে মাথা খুটে রক্তারক্তি কান্ড ঘটায় তোমার প্রিয়তম স্ত্রী। যেমনটি দুর্বৃত্তরা যেদিন তোমার শরীরে আগুনে জ্বালিয়ে দগ্ধ করেছিলো আর সেই খবরে মাটিতে গড়িয়ে কেঁদে-কেটে এলাহি কান্ড করেছিলো তোমার ঘরের লোক। মানুষ জমিয়ে কারো বা সহানুভুতি পেয়েছিলে। আর কেউ কেউ মজাও লুটেছিলো। কারণ ? কান্নার দাপটে বেদিশা সেই বেটি লোকের বুকের কাপড় সরে বেরিয়ে পড়েছিলো তুল তুলে নরম বুকের এক পাশ। সাবেত আালী একসময় কেউ একজন তোমার প্রিয়তম সেই স্ত্রীর হাতে ক’টাকা গুজে তোমার শুন্য স্থান পুরণের চেষ্টা চালাবে। প্রিয় সেই শরীরে ভাগ বসাবে। তাতে কি দোষের কিছু হবে কি সাবেত আলী ? না তুমি জানবে না সাবেত আলী। তোমার চিকিৎসা ব্যয়, অভুক্ত সন্তানের মুখ চেয়ে তোমার প্রিয়তম যদি কারো গুজে দেয়া ক’টাকার জন্য তার শরীরটি বিকিয়ে দেয় তাহলে তুমি কি কষ্ট পাবে সাবেত আলী ? একমাত্র উপার্জনকারী সাবেত তুমিই যে এখন উল্টো বোঝা হয়ে অভুক্ত রেখেছো মা স্ত্রী আর দুই সন্তানকে। বাঁচার জন্য আলোয়ারা যদি শরীর বেচেঁ-কিডনী বেঁচে শরীরের রক্ত বেঁচে তাতে কার কি এসে যায় সাবেত আলী ?
পিকেটারদের দেয়া আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষ(ফােইল ছবি)
পিকেটারদের দেয়া আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষ(ফােইল ছবি)
কুমিল্লার মতলবের সিএনজি চালক রুবেল হোসেন। তোমার স্ত্রী দারুণ‘ অসহায় অবস্থা তার বেচারি ঢাকা শহরের রং তামাসা কোখনোই দেখেনি। জীবনে প্রথম ঢাকায় আসা তাও আগুনে ঝলসে যাওয়া স্বামীর দেখভালের প্রযোজনে। খবর পেয়ে এক কাপড়ে। সম্বল এক হাজার টাকা। তাও প্রতিবেশীর কাছে ধার করে আনা, সেই টাকাও ফুরিয়েছে। স্বজন বলতেও কেউ নেই। নাবালক তিন বাচ্চাকে রেখে এসেছেন ঘরের পাহারায়। মতলবের সেই ছোট সংসারের পাহারায় থাকা বাবা-মা ছাড়া সেই বাচ্চারা আজ কদিন ধরেই অভুক্ত। মা হাসপাতালে বাবার শয্যা পাশে। শুন্য হাতে স্বামীর শিয়রে বসে অভুক্ত বাচ্চাদের মুখ মনে করে সকাল-সন্ধা নিয়ম করে চোখের জল ফেলছেন  স্নেহময়ী সেই মা সাজেদা। আর ভাবছে ক্লাস ফাইভে পড়া ছেলেটা বরাবরই ভালো রেজাল্ট করেছে। এখন চলছে প্রাথমিক সমাপনি পরীক্ষা। পরীক্ষার্থী যে ছেলেটি আজ কদিন ধরেই অভুক্ত। এই কদিন একবারও পড়া বা পরীক্ষার কথা মুখেই আনেনি। বাবা যে হাসপাতালের মৃত্যু শয্যায়। কদিন বাদেই পরীক্ষা না দিয়ে পথে নামবে পেটের দায়। হায় ? আরেকটি শিশু ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ে একটি সনদ অর্জনের পথে গিয়েও ঝরে গেল ! তাতে কি রুবেল হোসেন তুমি তো জানো না রাজনীতির মাঠের গোলে তোমার অবদান লেখা রবে রাজনীতির ভাগাভাগিতে, তুমি হয়তো তোমার জীবন দিয়ে দলাদলির-ভাগাভাগির সাফল্যে মহিমান্বিত্ব হবে। আর সেই মহিমাময় অবদানের ভাগিদার হয়ে তোমার সন্তানেরা প্রাথমিক সমাপনির বাকী পরীক্ষাটা নাই বা দিলো ? আর কদিনই বা মা-বাবার পথ চেয়ে অভুক্ত হয়ে মায়ের গোছানো সংসার জোগাবে ? নাকি কদিন বাদেই পথে নামবে পেটের দায়। আর্তনাদে ক্ষুধায়-যন্ত্রনায় তোমার সন্তান না হয়ে নতুন ডেরার সন্ধান করবে খুঁজবে খাদ্য আর আশ্রয়। অভিবাসিত হবে। ছুটে আসতে পারে আলোক সজ্জার এই রাজধানীতেও। শিশু অধিকার আইনকে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখিয়ে বাসে-লেগুনায় হেলপারের কাজে লাগতে পারে। বনে যেতে পারে চোর-বাটপার বা পকেট মারও। তাতে কি রুবেল হোসেন ? কে তোমায় দিব্বি দিয়েছে তোমার সন্তানদের লেখাপড়া শিখে মানুষ হতেই হবে ? পেতে হবে খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান আর শিক্ষার অধীকার ? ক্ষমতাসীন আর ক্ষমতালোভীরা আছেন না যাদের সন্তানেরা, বাবার অঢেল অর্থে জন্মের পর মুখে সোনার চামচ নিয়ে জন্মেছে। এখন রানী এলিজাবেথের মতো অবকাশকালীন উদযাপনের মতো লন্ডন-ইতালী-আমেরিকা-ইউরোপে কোথাও নিরাপদে বিত্ত-বৈভব্যের মধ্যে আয়েশী-বিলাসে জীবন ধারণ করছে। চলছে বিদ্যা অর্জনও। সময় মতো এদেশের মুক্ত বাতাসে, প্রজেক্ট পরিচালক হয়ে বা উচ্চ পদে আসীন হয়ে দেশে ফিরলেও ফিরতে পারেন। আর না ফিরলে বা কি ? উত্তরাধিকারীর সূত্রেই তাদের বাপ-দাদার সম্পত্তিসম এই দেশটির নির্যাস তো রূপে রুসে ভোগ করছে তারাই।
সাতেব আলীরা দেখে নিও এই সোনার বাংলার চুঁইয়ে পড়া সোনা ফলন নির্যাসে একদিন উদর পূর্তি করবে তোমার সন্তানেরাও। দু:খ করো না রুবেল হোসেন, দুদু মিয়ারা মোজাম্মেল-আনোয়ারা-আর পলটুদের মতো..অগ্নিদগ্ধ হও…যন্ত্রণা সহো ..প্রাণ দাও একদিন সব পাবে । সব । শুধু পাবে না খুব প্রিয় প্রাণ ভোমরাটা।
জান্নাতুল বাকেয়া কেকা
সিনিয়র রিপোর্টার, চ্যানেল আই ঢাকা।